ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০:৩১:১৩

আশুরার মর্যাদা ও কারবালা

আশুরার মর্যাদা ও কারবালা

মহররম ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। চারটি পবিত্রতম মাসের মধ্যে এটি একটি। মহররম শব্দটি আরবি, যার অর্থ পবিত্র, সম্মানিত। প্রাচীনকাল থেকে মহররম মাস পবিত্র হিসেবে গণ্য। মহররমের ১০ তারিখ বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন দিন, যাকে আশুরা বলা হয়ে থাকে। মহররম মাসের পরবর্তী মাসের নাম সফর। মহররম মাস প্রসঙ্গে কোরআনে কারিম ও হাদিস শরিফে যা এসেছে তা হলো, এ মাস অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ মাস। পবিত্র কোরআনে কারিমের ভাষায়, এটি `আরবাআতুন হুরুম` অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসে রোজা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, `রমজানের পর আলল্গাহর মাস মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।` মহররম মাসের রোজাগুলোর মাঝে আশুরার রোজার ফজিলত আরও বেশি। আশুরার রোজা প্রসঙ্গে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, `আমি রাসুলুলল্গাহকে (সা.) রমজান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য সময় তা দেখিনি।` হজরত আলীকে (রা.) এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমজানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোজা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন হজরত রাসুলুলল্গাহর (সা.) কাছে জনৈক সাহাবি করেছিলেন, তখন আমি তার খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে হজরত রাসুলুলল্গাহ (সা.) বললেন, `রমজানের পর যদি তুমি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আলল্গাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যেদিনে আলল্গাহতায়ালা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।` অন্য এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, `আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আলল্গাহতায়ালা অতীতের এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।` আশুরার রোজা সম্পর্কে আরেক হাদিসে আছে যে, `তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করো; আশুরার আগে বা পরে আরও একদিন রোজা রাখ।` হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, `আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোজা রাখব।` এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আলল্গাহতায়ালা তার কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদের ডুবিয়ে মেরেছেন। তবে এদিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথাও বলে থাকেন। যেমন- এদিন হজরত ইউসুফ (আ.) জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হজরত ইয়াকুব (আ.) চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন। হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। হজরত ইদরিসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেকে বলেন, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই (আল আসারুল মারফুয়া/আবদুল হাই লাখনবি)। এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হজরত হুসাইনের (রা.)। বলা বাহুল্য, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু নবী করিমেরই (সা.) তো শিক্ষা-`নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না, যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।` বহুবিধ কারণে এ মাসটি মুসলিম উম্মাহের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ং আলল্গাহর রাসুল (সা.) নিজে এ মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, `রমজানের পরে সর্বোত্তম রোজা হলো আলল্গাহর প্রিয় মহররম মাসের সাওম এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের নামাজ।` অন্যদিকে মানবতার মুক্তির দিশারি, সব নবী-রাসুলের নেতা এবং আমাদের পথপ্রদর্শক হজরত মুহাম্মদ (সা.) ধরাবাসীর প্রতি তার দায়িত্ব অর্থাৎ মানুষকে শান্তির ধর্ম ইসলামের পথে আহ্বানের শুরু করেছিলেন মহররম মাসে। মহররম মাসের ১০ তারিখ গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে পবিত্র আশুরা নামে পরিচিত। আশুরা ও মহররম শব্দদ্বয় শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে এক ভয়ঙ্কর, বীভৎস, নিষ্ঠুর, নির্মম ও ইসলামের ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক ঘটনা। রাসুলুলল্গাহর (সা.) নয়নের পুতুলি, কলিজার টুকরা হজরত হোসাইনের কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের মর্মন্তুদ ঘটনা; যা এ পৃথিবীর এক করুণ ইতিহাস। বিশ্বের সব মুসলিম নর-নারী আজও ধর্মীয় রীতিনীতির মাধ্যমে দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করে। হজরত মুহাম্মদের (সা.) ওফাতের মাত্র ৫০ বছর পর ফোরাতের তীরে কারবালার কঙ্করময় প্রান্তরে মুহাম্মদের (সা.) অন্যতম প্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) সপরিবারে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মোয়াবিয়াপুত্র ইয়াজিদের হাতে শাহাদাতবরণ করেন। তবে কারবালার এ করুণ ট্র্যাজেডির পরেই ইসলাম নবরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে বলেই ইসলামী স্কলারদের বিশ্বাস। তাদের মতে, `কারবালার ত্যাগের পরেই ইসলাম জিন্দা হয়েছে।` কারবালাই মুসলমানদের শিক্ষা দিয়ে গেছে, মর্সিয়া কিংবা ক্রন্দন নয় বরং ত্যাগ চাই। এক হাদিসে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, `তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, যারা (শোক প্রকাশ করতে গিয়ে) মুখ চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের কথাবার্তা বলে।` অতএব শাহাদাতে হোসাইনকে (রা.) কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলি রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। এ মাসে আরও যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় সেগুলো হলো- তাজিয়া মিছিল, শোকগাথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেকের মাঝে লক্ষ্য করা যায়। এ জন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদি থেকে বিরত থাকেন। বলা বাহুল্য, এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার। এসব অবশ্যই বর্জনীয়। এ মাসের করণীয়গুলো হলো- বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করা, দান-খয়রাত করা, নফল রোজা পালন করা এবং অন্যান্য নেক আমল করা। এর অন্যথা কাম্য নয়। প্রভাষক (আরবি বিভাগ), চাটখিল কামিল (এমএ) মাদ্রাসা, চাটখিল, নোয়াখালী। এসএইচ/
আজ পবিত্র আশুরা 

আজ পবিত্র আশুরা। কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এ দিনটি মুসলমানদের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ত্যাগ ও শোকের প্রতীকের পাশাপাশি বিশেষ পবিত্র দিবস হিসেবে দিনটি পালন করা হয় মুসলিম বিশ্বে। বাংলাদেশেও আজ শুক্রবার যথাযোগ্য মর্যাদায় ও কর্মসূচিতে পবিত্র আশুরা পালিত হবে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।  হিজরি ৬১ সনের ১০ মহররম এই দিনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও অনুসারীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন। এ ঘটনা স্মরণ করে বিশ্ব মুসলিম যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করে থাকে। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে তাদের এই আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা ও পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী সকলকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা যোগায়। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এদিন হোসনি দালানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাজিয়া মিছিল বের হবে। মিছিলটি ধানমন্ডি লেকে এসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক বিশেষ প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি রেডিও-টিভি চ্যানেলও এই দিনের তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে। এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া শোক মিছিলে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন। রাজধানীর বড় কাটারা ইমামবাড়া, খোজা শিয়া ইমামবাড়া এবং বিবিকা রওজায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি ইমামবাড়া সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে প্রত্যেক দর্শনার্থীর দেহ তল্লাশি করে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করানো হবে।   ডিএমপি কমিশনার তাজিয়া মিছিলে ঢোল বাজিয়ে দা, ছুরি, তলোয়ার ও লাঠিখেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে জানিয়ে আরও বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১২ ফুটের বেশি বড় নিশান মিছিলে ব্যবহার করা যাবে না। আগুনের ব্যবহার করা যাবে না। মিছিলে ব্যাগ, পোঁটলা, টিফিন ক্যারিয়ার বহন করা যাবে না। মাঝপথে কেউ মিছিলে অংশ নিতে পারবেন না বলেও জানান তিনি। এসি  

যুগে যুগে মেডিটেশন: ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে 

যুগে যুগে মানুষ মেডিটেশন বা ধ্যানকে আত্ম উপলব্ধির জন্যে ব্যবহার করে আসছে। ধর্মীয়ভাবে হাজার হাজার বছর ধরে ধ্যানের চর্চা হয়ে আসছে। অন্যদিকে বর্তমান আধুনিক এই বিজ্ঞানের যুগে মেডিটেশন এক অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগ মুক্তি থেকে শুরু করে জীবনের সব ক্ষেত্রেই এখন মেডিটেশনের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।   ধ্যান মেডিটেশন মোরাকাবা, তাফাক্কুর- শব্দগুলো ভিন্ন হলেও মূল নির্যাস একই। বিভিন্ন ধর্ম আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এটি প্রায়োগিকভাবে ভিন্ন রূপ নিলেও পানির সার্বজনীনতার মতোই ধ্যানের নির্যাস সার্বজনীন, সকল মানুষের জন্যে। “নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাত্রির আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে, বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয় এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি কর নি।” [সূরা আলে ইমরান : ১৯০-১৯১] প্রাচ্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য এই ধ্যান, মোরাকাবা বা মেডিটেশনই এখন পাশ্চাত্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। প্রয়োগ হচ্ছে মূলত প্রশান্তি ও আত্মনিরাময় লাভের ক্ষেত্রে। ৫০০০ বছর আগের লিখিত নিদর্শন প্রাচীন মানুষ যে ধ্যান বা মেডিটেশন চর্চা করতেন তার লিখিত প্রমাণের বয়সই কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর। ৫ হাজার বছরের প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্রশাস্ত্রে ধ্যানের উল্লেখ আছে। এটি সতের শতকের একটি দুর্লভ উপনিষদ পান্ডুলিপির খণ্ডাংশ। এখানে ধ্যানের কথা বলা আছে। মোজেস বা মুসা ইহুদি ধর্মের প্রাণপুরুষ মোজেস বা মুসা সিনাই পাহাড়ে ৪০ দিন ধ্যানমগ্ন থেকে আল্লাহর বাণী লাভ করেন। তাওরাতে পিতা আইজ্যাকের সান্ধ্যকালীন প্রার্থনার জন্যে মাঠে যাওয়া প্রসঙ্গে হিব্রুতে যে ‘লাসাচ’ (Lasuach) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, এটা আসলে ধ্যানেরই একটি পরিভাষা। মহেঞ্জোদারো সভ্যতা ধ্যানচর্চার প্রাচীন ইতিহাসের আরো কিছু নিদর্শন মিলেছে মহেঞ্জোদারো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে। আজ থেকে ৪৬০০ বছর আগে সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে বিকশিত এ সভ্যতার একটি প্রাচীন সিলমোহরে দেখা যায় ধ্যানাসনে বসে একজন যোগী গভীর ধ্যানে মগ্ন। মহামতি বুদ্ধ মহামতি বুদ্ধ ধ্যানের পথে বোধি লাভ করেছেন। ধ্যানের মাধ্যমেই নির্বাণ লাভের পন্থা শিখিয়েছেন অনুসারীদের। তাঁর ধ্যান পদ্ধতিকে ইউরোপ-আমেরিকায় এখন নানাভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক-মানসিক নিরাময়ের ক্ষেত্রে। যিশু যিশুখ্রিষ্টের জীবনে ধ্যান এবং প্রার্থনা হয়ে গিয়েছিল একাকার। যখনই সুযোগ পেতেন তিনি ধ্যান ও প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকতেন। শিষ্যদেরও উৎসাহিত করতেন ধ্যানমগ্ন হতে। হযরত মোহাম্মদ (স) মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স) বছরের পর বছর হেরা গুহায় কাটিয়েছেন ধ্যানমগ্ন অবস্থায়। ধ্যানের স্তরেই পবিত্র কোরআনের বাণী নাযিল হয়েছে তাঁর ওপর। পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৯০-১৯১ আয়াতে বলা হয়েছে- “নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাত্রির আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে, বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে। তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয় এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি কর নি।” কোরআনের আরো বেশ কটি আয়াতে তাফাক্কুর বা তাদাব্বুরের যে কথা বলা হয়েছে, তা আসলে সৃষ্টিরহস্য নিয়ে ধ্যানেরই তাগিদ। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। আজ থেকে হাজার বছর আগে বাংলার এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ধ্যানের শিক্ষা দিয়ে উপমহাদেশ, তিববত ও চীনের সমাজ-জীবনের পঙ্কিলতা দূর করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। ইমাম গাজ্জালী ইমাম গাজ্জালী। দীর্ঘ ১০ বছর নির্জনবাসের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করেন আত্মশুদ্ধি এবং ধ্যানের পথেই মুক্তি। শরিয়তের সাথে সাধনাকে সম্পৃক্ত করে তিনি ইসলামি জীবনদৃষ্টির পুনর্জাগরণ ঘটান। পরবর্তী হাজার বছরে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সাধক-দার্শনিকদের তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তার লেখা থেকেই পাওয়া যায় যে, হযরত ইমাম বোখারীও মেডিটেশন করতেন। হযরত মওলানা জালালুদ্দিন রুমি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী কবি দার্শনিক হযরত মওলানা জালালুদ্দিন রুমি। তিনি মোরাকাবায় নতুন মাত্রা যোগ করেন নৃত্য সংযোজন করে। তাঁর স্রষ্টায় সমর্পণ এবং বিশ্বজনীন প্রেমের দর্শন শতাব্দী পরিক্রমায় প্রভাবিত করে এসেছে চিন্তাশীলদের। বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছে তাঁর রচনা। আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিদের একজন তিনি। তাঁর প্রেমের কবিতা অবলম্বনে রচিত গানের এলবাম স্থান পেয়েছে বিলবোর্ড টপচার্টে। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে মিস্টিক অফ দি ইয়ার হিসেবে উল্লেখ করে বলে, "The sufi sect of the whirling dervishes dances to his rhyme. New age meditation echo his songs." ২০০৭ সালে ইউনেস্কো তাঁর ৮০০ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে এবং ‘শান্তির সপক্ষে মানুষের হৃদয়ে স্থান’ শীর্ষক অবদানের স্বীকৃতি দেয়। কবি হাফেজ সিরাজী ইরানের কবি হাফেজ সিরাজী সুফিধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। মধ্যযুগীয় সুফিধারা সুফিধারায় ধ্যান বা মেডিটেশনের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। জিকর বা স্রষ্টার স্মরণ এবং ফিকর বা আত্মমগ্ন ভাবনার চর্চার ধারাই পরে পরিণত হয়েছে বিশেষ প্রক্রিয়ার ধ্যানে। ১৬৩০ সালের একটি ছবিতে একজন সুফিকে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেখা যায়। বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী। বিশ্বাস, ভক্তি ও ভালবাসার সহজ সরল শিক্ষার মধ্য দিয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন বাংলার লক্ষ ঘরে স্মরণীয় মহামানবে। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস। ইংরেজ শাসনাধীন উপমহাদেশে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আত্মিক পুনর্জাগরণের সূচনা করেন। বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের কাছে ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতাকে সমাদৃত করে তোলেন। স্বামী বিবেকানন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর বিশ্বধর্মসভায় তাঁর বিখ্যাত ভাষণ প্রাচ্যের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক বিজয়ের সূচনা করে। পাশ্চাত্য অনুভব করতে পারে তাদের অন্তঃসারশূন্যতা। আধ্যাত্মিকতার প্রসারের জন্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বেদান্ত সোসাইটি এবং ভারতে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত এনায়েত খান সুফিবাদের আন্তর্জাতিক ধারার প্রবর্তক হযরত এনায়েত খান। ইউরোপ এবং আমেরিকায় তিনিই ধ্যানের এই ধারাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র। তিনি বলেছিলেন, বাংলা জাগলে ভারত জাগবে... জগৎ জাগবে...। একেশ্বরবাদ এবং সকল ধর্ম ও মতসহিষ্ণুতা ছিল তাঁর শিক্ষার ভিত্তি। সবাইকে তিনি মিলিতভাবে সাধনার পথে ডাক দিয়েছেন। মহাঋষি মহেশ যোগী মহাঋষি মহেশ যোগী ষাটের দশকে পাশ্চাত্যে বেদান্ত দর্শনকেন্দ্রিক টিএম-কে পরিচিত করান। পরবর্তীতে যা পাশ্চাত্যের মিডিয়া এবং জনজীবনে ধ্যানচর্চাকে জনপ্রিয় করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। দালাই লামা তিববতের আধ্যাত্মিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা। বুদ্ধের ধ্যান পদ্ধতিকে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবী ও বিজ্ঞানী মহলে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নতুন যুগের সূত্রপাত ১৯৬৯-১৯৭০ দশকে মেডিটেশন চর্চায় নতুন যুগের সূত্রপাত হয়। নতুন নতুন পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। এর মধ্যে টিএম, বা ট্রান্সেনডেন্টাল মেডিটেশন, সহজ যোগ, ন্যাচারাল স্ট্রেস রিলিফ, ফাইভ রিদম, থিটা হিলিং, সিলভা মেথড, ডা. হার্বার্ট বেনসনের রিলাক্সেশন রেসপন্স, ডা. কাবাত জিনের মাইন্ডফুলনেস বা মনোনিবেশায়ন উল্লেখ্যযোগ্য। ধর্মের আলোকে মেডিটেশন ধর্মাচার ভিন্ন হলেও সব ধর্মের মূলবাণী একই। আর তা হলো অনৈতিকতা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হয়ে আদর্শ জীবন গঠন। আত্মপর্যালোচনা এবং আত্মউপলব্ধির মাধ্যমে নিজের পরিবর্তন। আর এই উপলব্ধির প্রক্রিয়ায় ধ্যান বা মেডিটেশনকে পৃথিবীর সব ধর্মেই বিবেচনা করা হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে। ধ্যান একটি সার্বজনীন প্রক্রিয়া। বিভিন্ন ধর্ম আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এর প্রয়োগ ভিন্নরূপে হলেও ধ্যানের নির্যাস সকল মানুষের জন্যে একই। যুগে যুগে দেশে দেশে সাধকরা আত্ম উপলব্ধির জন্যে এ প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করেছেন। সনাতন ধর্মে ধ্যান মহাভারত, বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে, ধ্যানে মগ্ন হলে একজন মানুষ আত্মার সন্ধান পেতে পারে নিজের মাঝেই। ভগবতগীতায় ধ্যানযোগের ওপর রয়েছে বিশেষ অধ্যায়। আর পতাঞ্জলির সময় থেকে যোগসাধনায় সংযুক্ত হয়েছে ধ্যান, যার পরিণতি সমাধির স্তরে। বৈদিক হিন্দুধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র হলো গায়ত্রী মন্ত্র। এ মন্ত্রকে বলা হয় সমস্ত মন্ত্রের জননী। পন্ডিত সত্যকাম বিদ্যালংকারের অনুবাদ দি The Holy Vedas এ রয়েছে — O Supreme LordThou art ever existent, ever conscious, ever blissful. We meditate on Thy most adorable glory. Mayest Thou guide and inspire our intellect on the path of highest divinity! May we be able to discriminate between truth and falsehood. (Rig.3.62.10) সদাসর্বত্র বিরাজমান তন্দ্রা-নিদ্রাহীন সদা সজাগ প্রতিনিয়ত করুণা বর্ষণকারী সর্বশক্তিমান হে প্রভু! আমরা শুধু তোমারই মহিমার ধ্যান করি, প্রভু হে! তুমি আমাদের সর্বোত্তম আলোকিত পথে পরিচালিত করো। [ঋগ্বেদ : ৩.৬২.১০] রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী স্থিরাত্মানন্দজী মহারাজ। ২০০৯ সালে কোয়ান্টাম মুক্ত আলোচনার এক বিশেষ সেশনে তিনি সনাতন ধর্মে ধ্যান বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যান বৌদ্ধ ধর্মমতে ধ্যান বা মেডিটেশনই হলো নির্বাণপ্রাপ্তির উপায়। দুঃখসংক্রান্ত চতুরার্থ সত্য উপলব্ধির পর মহামতি বুদ্ধ এর প্রতিকারের জন্যে যে দুই ধর্মচক্রের কথা বলেন, তার প্রথম হলো মধ্যপন্থা অনুসরণ অর্থাৎ জীবনে অতি সুখ-বিলাস-ব্যসন যেমন পরিত্যাজ্য, তেমনি অতি সংযম ও কৃচ্ছ্রসাধনও অপ্রয়োজনীয়। আর ২য় ধর্মচক্রে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে তিনি আটটি সৎপথের কথা বলেন। আর তা হলো, সৎদৃষ্টি, সৎসংকল্প, সৎবাক্য, সৎকর্ম, সৎজীবিকা, সৎপ্রচেষ্টা, সৎস্মৃতি এবং সৎসমাধি। আর এর যথার্থ উপলব্ধির জন্যে একজন মানুষকে মেডিটেশন বা ধ্যানে আত্মমগ্ন হতে হবে। বুদ্ধের মতে মেডিটেশনের প্রাপ্তি হলো দুটি–এক, সমাধি বা স্থিরতা যা মনকে কেন্দ্রীভূত করে; দুই, বিপাসন বা প্রজ্ঞা, যা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাইরেও উপলব্ধির চেতনাকে জাগ্রত করে। ফলে একজন মানুষ তার স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করে ত্রিকাল দর্শনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। অর্থাৎ মহামতি বুদ্ধ ধ্যানের পথে বোধি লাভ করেছেন। ধ্যানের মাধ্যমেই নির্বাণ লাভের পন্থা শিখিয়েছেন অনুসারীদের। ২০০৯ সালে কোয়ান্টাম মুক্ত আলোচনার এক বিশেষ সেশনে `মহামতি বুদ্ধের জীবন ও শিক্ষা` বিষয়ক এক বিশেষ আলোচনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বৌদ্ধব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ বৌদ্ধকৃষ্টি প্রচার সঙ্ঘের সভাপতি ও ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের অধ্যক্ষ মহামান্য শুদ্ধানন্দ মহাথের এ বক্তব্যই তুলে ধরেন। খ্রিষ্ট ধর্মে ধ্যান যিশুখ্রিষ্টের জীবনে ধ্যান এবং প্রার্থনা হয়ে গিয়েছিল একাকার। যিশুর শক্তির উৎস ছিল তাঁর ধ্যান, তাঁর প্রার্থনা—যে ধ্যানে তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতেন। যে প্রার্থনা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, প্রার্থনায় যা-কিছু তোমরা চাও, বিশ্বাস করবে তা পেয়েছ, তাহলে তা-ই পাবে। সারাদিন ধরে ভক্ত-শিষ্য-অভ্যাগতদের সাথে সময় কাটানোর পর সন্ধ্যাবেলা খানিকটা নির্জনে গিয়ে তিনি প্রার্থনায় নিমগ্ন হতেন, ভুলে যেতেন সমস্ত ক্ষুধা-ক্লান্তি-অবসাদ। অন্যদেরকেও তিনি বলতেন, অনেক কাজ করেছ, এখন ধ্যান করো। নিজেকে পর্যালোচনা করো, ভুলগুলো খুঁজে বের করো, মনের পর্দায় নিজেকে দাঁড় করাও, জীবন পরিবর্তন করো। যিশুখ্রিষ্টের এ আদর্শের অনুসরণে যারা অনুপ্রাণিত, তারা চর্চা করেন খ্রিষ্টীয় মেডিটেশন। স্রষ্টার মহিমা ও বাণী নিয়ে বিশেষ প্রার্থনা। খ্রিষ্টীয় মেডিটেশনের একজন একনিষ্ঠ প্রবক্তা সেইন্ট পিয়েত্রিলসিনা। তিনি বলেন, বাইবেল পড়ে একজন মানুষ স্রষ্টাকে খোঁজে, আর মেডিটেশনের মধ্য দিয়ে সে স্রষ্টাকে পায়। যিশুখ্রিষ্টের জীবনে ধ্যান বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেন ফাদার পৌলিনুস কস্তা। ঢাকার আর্চবিশপ পৌলিনুস কস্তা বাংলাদেশে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা । ইসলাম ধর্মে ধ্যান ইসলামে ধ্যান বা মেডিটেশনকে একটি উচ্চস্তরের ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র গ্রন্থ কোরআনের বহু জায়গায় সরাসরি মেডিটেশনের কথা বলা হয়েছে। কোরআনে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে তাফাক্কুর। এর অর্থ হচ্ছে কনটেমপ্লেশন, মেডিটেশন বা ধ্যান। সূরা আলে ইমরানের ১৯০-৯১ আয়াতে আল্লাহ জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য নিয়ে গভীর ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয়’। আল কোরআনের সূরা আনআমে আল্লাহ বলেন, হে নবী! ওদের জিজ্ঞেস করো, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি কখনো সমান হতে পারে? তোমরা কি এরপরও (কোরআনের শিক্ষা অনুধাবনে) গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হবে না (বা তোমাদের সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবে না)? (আনআম: ৫০ ) সূরা সাদে আল্লাহ বলেন, হে নবী! আমি তোমার ওপর এই কল্যাণময় কিতাব নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এই কোরআনের বাণী নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়! (সেইসাথে সহজাত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে) এর শিক্ষা অনুসরণ করে। একইভাবে সূরা মুহাম্মদের ২২, ২৩, ২৪ আয়াতে আল্লাহ বলেন, (হে নবী! ওদের জিজ্ঞেস করো) তোমরা যদি (আল্লাহর আনুগত্য থেকে বেরিয়ে পুরনো ধ্যানধারণায়) ফিরে যাও, তবে কি তোমরা দুনিয়ার বুকে পুনরায় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে? বন্ধন ছিন্ন করে পরস্পর বিবাদ-বিসংবাদে লিপ্ত হবে? এদেরকেই আল্লাহ তার রহমত থেকে বঞ্চিত করেন, (সত্যের ব্যাপারে) বধির ও অন্ধ করেন। এরপরও কি ওরা কোরআন নিয়ে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে তা অন্তরে ধারণ করবে না? নাকি মনের দরজা বন্ধই করে রাখবে? আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী বর্তমান বিশ্বের একজন সর্বজনমান্য ইসলামি চিন্তাবিদ। তিনি ১৯৭৩ সালে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উসূল আদ-দ্বীন অনুষদ হতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি মিশর সরকারের বোর্ড অফ রিলিজিয়াস এফেয়ার্স-এর সদস্যপদসহ আন্তর্জাতিক বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া এন্ড রিসার্চ-এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেছেন, মেডিটেশন বা ধ্যান হচ্ছে উচ্চস্তরের ইবাদত। বিশিষ্ট গবেষক ও মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মালিক বাদরি’র মেডিটেশন বিষয়ক গ্রন্থ `Contemplation : An Islamic Psycho-Spiritual study` -এর ভূমিকায় ইউসুফ আল কারযাভী বলেন, ‘গ্রন্থকার তার গ্রন্থে ধ্যান ও প্রশান্ত মনে সৎচিন্তার আলোকে বিচার করার ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনাকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন’। হাদীসেও ধ্যানের গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, এক ঘণ্টার ধ্যান সারা বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। এছাড়া হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে, নবীজী (স) বলেছেন, সৃষ্টি সম্পর্কে এক ঘণ্টার ধ্যান ৭০ বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম (মেশকাত)। বছরের পর বছর হেরা গুহায় যে তিনি ধ্যানে কাটিয়েছেন, তা তো সবাই জানেন। তিনি যে মেডিটেশন করতেন তা বোঝা যায় বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ড. তারিক রামাদানের The Messenger : The meanings of the life of Muhammad বই থেকে। সেখানে তিনি বলেছেন, He did not demand of his companions the worship, fasting and meditation that he exacted of himself. অর্থাৎ রসুলুল্লাহ (স) যেভাবে ইবাদত করতেন, রোজা রাখতেন এবং মেডিটেশন করতেন, তিনি তাঁর অনুসারীদের ওপর সে কঠোরতাকে চাপিয়ে দিতে চান নি। অনেক কিছু তিনি নিজে করেছেন কিন্তু অন্যদের জন্যে বলেছেন, তোমরা করলেও করতে পারো। দেশে-বিদেশে কোয়ান্টাম মেথড মেডিটেশনের হাজার হাজার চর্চাকারীদের মধ্যে রয়েছেন সব ধর্মের অনুসারীরাই। কারণ কোয়ান্টাম বিশ্বাস করে সকল ধর্মের মূল শিক্ষা এক। স্থান কাল ভাষা পরিবেশ অনুসারে ধর্মাচারে পার্থক্য রয়েছে। স্বধর্ম পালন ও অন্যের ধর্মপালনের অধিকার নিশ্চিত করাই ধর্মের শিক্ষা। কোরআন কণিকার পাশাপাশি বেদ ও গীতা কণিকা, বাইবেল ও ধম্মপদ কণিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সকল ধর্মের প্রতি কোয়ান্টামের শ্রদ্ধাবোধেরই প্রকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু তিনটি প্রধান ধর্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বরাও সাদরে আমন্ত্রিত হয়েছেন কোয়ান্টামে, আলোচনা করেছেন ধ্যান, ধর্ম আর নৈতিকতা নিয়ে। মেডিটেশন: বিজ্ঞানের চোখে মেডিটেশন হচ্ছে বিজ্ঞান। এটা অলৌকিক কিছু নয় বা নয় কোনো আশ্রম, খানকা বা শ্রেণি সম্প্রদায়ের বিষয়। বরং মেডিটেশন হলো এক সার্বজনীন কল্যাণ প্রক্রিয়া। মেডিটেশন চর্চা করে নারী-পুরুষ, কিশোর-বৃদ্ধ, পাপী-পুণ্যাত্মা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ শারীরিক মানসিক সামাজিক ও আত্মিক কল্যাণ লাভ করতে পারেন। গত ৬০ বছরের অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্য দিয়ে এটা এখন এক প্রমাণিত সত্য। ‘এভরিবডি সে ওম’ নিউসায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনে ৮ জানুয়ারি, ২০১১ সংখ্যায় মেডিটেশনের ওপর একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘এভরিবডি সে ওম’ শিরোনামের এ প্রচ্ছদ নিবন্ধে মেডিটেশন নিয়ে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ব্যাপক গবেষণার ফল তুলে ধরা হয়। নিবন্ধে বলা হয় — মেডিটেশন শুধু সাধকদের জন্যে নয় বা এ থেকে উপকার লাভের জন্যে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যে-কেউ মেডিটেশন করে উপকৃত হতে পারে। মেডিটেশনে সময় ব্যয় করা হচ্ছে ফলপ্রসূ সময় ব্যয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর মাইন্ড এন্ড ব্রেন’-এর বিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড স্যারনের নেতৃত্বে একদল গবেষক অনেকদিন ধরে মেডিটেশন করছেন এমন ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর তিন মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। মেডিটেশন মনোযোগ বাড়ায় প্রথম পরীক্ষাটি ছিল মনোযোগ নিয়ে। কম্পিউটার স্ক্রিনে অনেকগুলো খাড়া খাড়া দাগ দেখিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের বলা হয়, এগুলোর মধ্যে যখনই বাকিগুলোর চেয়ে ছোট কোনো দাগ তাদের চোখে পড়বে তৎক্ষণাৎ মাউস ক্লিক করে তারা যাতে সেটাকে চিহ্নিত করে। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, যত বেশি সময় গড়াচ্ছে ধ্যানীরা তত নির্ভুলভাবে ছোট দাগগুলোকে শনাক্ত করতে পারছেন। মেডিটেশন যে মনোযোগ বাড়ায় তা অবশ্য আগের আরো বেশ কয়েকটি গবেষণা থেকেও প্রমাণিত। উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত মেডিটেশন করে স্বেচ্ছাসেবীরা বিভিন্ন স্বরের পার্থক্যকে খুব সহজে বুঝতে পারছে। জার্নাল অব নিউরোসায়েন্সে এ গবেষণার ফলাফলটি প্রকাশিত হয়। মেডিটেশন মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রবণতা কমায় সামাথা প্রকল্পের দ্বিতীয় গবেষণাটি ছিল আবেগ-অনুভূতির ওপর মেডিটেশনের প্রভাব নিয়ে। যে প্রক্রিয়ায় গবেষণাটি চালানো হয় তা-ও খুব মজার। এর আগে স্বেচ্ছাসেবীদের যে-রকম ছোট দাগ দেখলে মাউসে ক্লিক করতে বলা হয়েছিল, এবার তাদের বলা হলো লম্বা দাগগুলোকে ক্লিক করতে। কাজটা একাধারে একঘেয়ে, বিরক্তিকর এবং বেশ ধৈর্যসাপেক্ষও। কারণ অনেকক্ষণ ধরে আসা লম্বা দাগগুলোর পরে হঠাৎ হঠাৎ আসত ছোট দাগগুলো। একদিকে দীর্ঘ সময় ধরে লম্বা দাগে ক্লিক করা এবং ছোট দাগগুলোকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকা — মধ্য দিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখতে চাচ্ছিলেন বিরক্তি বা একঘেয়েমিজনিত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা তাদের কতটা বেড়েছে। গবেষকদলের নেতা বালজিন্ডার সাহাদ্রা বলেন, আমরা দেখলাম, মেডিটেশন চর্চার ফলে স্বেচ্ছাসেবীদের টেনশন করার প্রবণতা কমেছে; বেড়েছে নেতিবাচক আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতা। মেডিটেশন একজন মানুষের রি-একটিভিটি বা মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রবণতা কমায়। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, মেডিটেশন ব্রেনের এমিগডালা অংশের তৎপরতাকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যক্তির আবেগকে সংহত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এটিও প্রকাশিত হয় ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের জার্নালে। সবচেয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের শারীরিক-মানসিক সুস্থতায় বিজ্ঞানীরা বলেন, মেডিটেশনের ফলে সবচেয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের শারীরিক-মানসিক সুস্থতায়। কিছু অসুস্থতা যেমন — ক্ষুধামান্দ্য, বদহজম, মাদকাসক্তি, দুরারোগ্য চর্মরোগ সোরিয়াসিস, ডিপ্রেশন এবং ক্রনিক ব্যথা সারাতে মেডিটেশনের কার্যকর ভূমিকা দেখা গেছে। মেডিটেশন বার্ধক্যকে নিয়ন্ত্রণ করে মেডিটেশন বার্ধক্যকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সামাথা প্রকল্পের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেডিটেশনের ফলে দেহে টেলোমেরেজ নামে একটি এনজাইমের উৎপাদন বেড়ে যায়, যা কোষের বুড়িয়ে যাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এ-সংক্রান্ত লেখাটি এসেছে জার্নাল ‘সাইকো-নিউরো-এনডোক্রাইনোলজি’-তে। মেডিটেশন অন্যের প্রতি আবেগ-অনুভূতিকে বাড়ায় সামাথা প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাটি হচ্ছে, মেডিটেশন অন্যের প্রতি আবেগ-অনুভূতিকে বাড়ায় কিনা। দীর্ঘদিন মেডিটেশন করেছেন এমন ব্যক্তিদের ব্রেনের ফাংশনাল MRI করে গবেষক লাজ এবং তার সহযোগীরা দেখেন, ইনসুলা বা এন্টেরিওর সিংগুলেট করটেক্সের মতো মস্তিষ্কের যে অংশগুলো মমতা, অন্যদের প্রতি ভালবাসা ইত্যাদি অনুভূতিকে জাগ্রত করে, তাদের মস্তিষ্কে তা অনেক বেশি সক্রিয়। নিউরো-ইমেজ জার্নালে এটি প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৯ সালে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে খোলা হয় সেন্টার ফর কমপ্যাশন এন্ড আলট্রুয়িজম রিসার্চ এন্ড এডুকেশন। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন এই ইনস্টিটিউটের কাজ হলো মমতা সহানুভূতি সমমর্মিতা ইত্যাদি মানবিক আবেগগুলোর নিউরোবায়োলজিকেল যোগসূত্র বোঝা, গবেষণা করা। এই ইনস্টিটিউটের সাথে নিউরোসায়েন্টিস্টরা যেমন আছেন, আছেন সিলিকন ভ্যালির বড় বড় বিনিয়োগকারীরা এবং আছেন তিব্বতীয় ধর্মগুরু দালাইলামা। তাদের সবার একটাই উদ্দেশ্য। আর তা হলো, মেডিটেশন চর্চা করে কীভাবে একজন মানুষ অন্যের প্রতি তার নিঃস্বার্থ মমতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা সৃষ্টি করতে পারে। আর এসব উদ্যোগের ফলেই বোধ হয় মেন্টাল ট্রেনিং জিমনেসিয়ামের মতো ধারণার উদ্ভব ঘটেছে, যেখানে গিয়ে একজন মানুষ তার আবেগকে জাগ্রত করার অনুশীলন করবে, বাড়াবে তার সহমর্মিতার অনুভূতি যে-রকম সে জিমে গিয়ে বাড়াতে পারে তার পেশির কার্যকারিতা। আপনি যে-ই হোন বা যেখানেই থাকুন, মেডিটেশন থেকে আপনি উপকৃত হবেনই এসব গবেষণার মধ্য দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, আপনি যে-ই হোন বা যেখানেই থাকুন, মেডিটেশন থেকে আপনি উপকৃত হবেনই। আপনাকে এজন্যে মেডিটেশনে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না, দিনে পাঁচ ঘণ্টা করে অনুশীলন করতে হবে না, ঘরবাড়ি ছেড়ে জঙ্গলেও যেতে হবে না। মেডিটেশনের ব্যথানিরোধক ক্ষমতার ওপর মনোবিজ্ঞানী ফিদেল জাইদানের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ২০ মিনিট করে মাত্র তিন দিন অনুশীলন করেই উপকার পেতে শুরু করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। তার দ্বিতীয় গবেষণায়ও দেখা গেছে, অল্পসময়ের জন্যে একটুখানি মেডিটেশন করেই বেড়ে গেছে তাদের মনোযোগের ক্ষমতা, বেড়েছে বড় বড় সংখ্যা মনে রাখা ও বলতে পারার দক্ষতা। তার এই গবেষণালব্ধ তথ্য বেরিয়েছে কনশাসনেস এন্ড কগনিশন জার্নালে। প্রতিদিন ৩০ মিনিট অনুশীলন করেই দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রখ্যাত মেডিটেশন গবেষক রিচার্ড ডেভিডসন এজন্যেই বলেন, দেহ-মনের ওপর মেডিটেশনের প্রভাব এত তাড়াতাড়ি পড়ে যে, আমরা আমাদের গবেষণায় দেখেছি, একদল নতুন মানুষ মেডিটেশন শেখার পর মাত্র দুই সপ্তাহ প্রতিদিন ৩০ মিনিট অনুশীলন করেই তার মস্তিষ্কের কর্মকাঠামোয় ঘটাতে পেরেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। তাই বলা যায়, মন ও মস্তিষ্কের বিশাল কর্মক্ষমতা নিয়ে এখন যে লাগাতার গবেষণা চলছে, তা থেকে প্রতিনিয়তই বেরিয়ে আসছে মেডিটেশনের ইতিবাচক ফলাফলের নতুন নতুন তথ্য। মেডিটেশন ও ব্রেনওয়েভ আমরা জানি বিশ্রাম, তন্দ্রা বা নিদ্রাকালীন সময়ে অবচেতন মন সবচেয়ে সৃজনশীল থাকে ও ভালোভাবে কাজ করে। আর বিশ্রাম বা তন্দ্রাকালীন সময় দেহ-মন পুরোপুরি শিথিল হয়ে গিয়ে ব্রেন ওয়েভ নেমে যায় প্রতি সেকেন্ডে ১৩ থেকে ৪ সাইকেলে, বিজ্ঞানের পরিভাষায় আলফা/ থিটা লেভেলে। আসলে সক্রিয় অবস্থায় ব্রেন থেকে প্রতিনিয়ত খুব মৃদু বিদ্যুৎ তরঙ্গ বিকিরিত হয়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন, ব্রেন ওয়েভ। ১৯২৯ সালে ডা. হ্যান্স বার্জার ইলেকক্ট্রো এনসেফেলোগ্রাফ (ইইজি) যন্ত্র দ্বারা এই ওয়েভ বা তরঙ্গ মাপেন। মানসিক চাপ, সতর্কতা, তৎপরতামূলক পরিস্থিতিতে ব্রেনের বৈদ্যুতিক বিকিরণ বেড়ে যায়। তখন ব্রেন ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সি দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে ১৪ সাইকেল থেকে ২৬ সাইকেল পর্যন্ত। একে বলা হয় বিটা ব্রেন ওয়েভ। চোখ বন্ধ করে বিশ্রামকালে একটু তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব সৃষ্টি হলে ব্রেনের বৈদ্যুতিক তৎপরতা কমে যায়। এ অবস্থায় ব্রেন ওয়েভের ফ্রিকোয়েন্সি দাঁড়ায় প্রতি সেকেন্ডে ৮ থেকে ১৩ সাইকেল। একে বলা হয়, আলফা ব্রেন ওয়েভ। থিটা ব্রেন ওয়েভ আলফার চেয়ে ধীর। এর ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৪ থেকে ৭ সাইকেল। এরপর রয়েছে গভীর নিদ্রাকালীন ব্রেন ওয়েভ। এর ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ০.৫ থেকে ৩ সাইকেল। একে বলা হয় ডেল্টা ব্রেন ওয়েভ। ব্রেন ওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি প্রতি সেকেন্ডে ২৭ বা তার ওপরে উঠে যেতে পারে হঠাৎ উত্তেজিত অবস্থার ফলে। একে বলা হয় গামা ব্রেন ওয়েভ। এখন যদি আমরা কৃত্রিমভাবে শিথিলায়নের (Relaxation) মাধ্যমে শরীর-মনে বিশ্রাম ও তন্দ্রাকালীন আবহ সৃষ্টি করতে পারি, তাহলেও ব্রেন ওয়েভ নেমে আসবে আলফা/থিটা লেভেলে। আর ব্রেন ওয়েভকে আলফা/ থিটা লেভেলে নামিয়ে আনতে পারলেই ধ্যানাবস্থা সৃষ্টি হবে। অবচেতন মনের গভীরের শক্তিকে কাজে লাগানোর পথ হবে মুক্ত। আপনি প্রবেশ করতে পারবেন মনের আরও গভীরে। সচেতন মন যেমন অবচেতনকে যথাযথ নির্দেশ প্রদান করতে ও সৃজনশীলভাবে কাজে লাগাতে পারবে, তেমনি পারবে অচেতন বলয়ের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে। আর অবচেতন তখন সেই নির্দেশকে বা ধারণাকে যুক্তিসঙ্গত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অনুকূল ব্রেন ফ্রিকোয়েন্সিতে নিরলস কাজে নেমে পড়বে। শরীর-মনকে শিথিলায়নের মাধ্যমে ব্রেন ওয়েভকে আলফা লেভেলে নিয়ে মনের ধ্যানাবস্থা সৃষ্টিই হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, মন নিয়ন্ত্রণ, মেডিটেশন বা পরিকল্পিত ধ্যানের প্রথম ধাপ। আর ধ্যান বা মেডিটেশনের প্রয়োজনীয়তাও এখানেই। এসি     

২১ সেপ্টেম্বর আশুরা পালিত হতে পারে

আগামী ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখার সাপেক্ষে ১২ সেপ্টেম্বর বুধবার থেকে আরবি ১৪৪০ হিজরীর ‘মহররম’ মাসের গণনা শুরু হবে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর পবিত্র আশুরা পালিত হতে পারে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে বর্তমান চাঁদের অমাবস্যা কলা পূর্ণ করে নতুন চাঁদের জন্ম হবে। এটি পরদিন সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৮ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত রেখা হতে ৮ ডিগ্রি ওপরে ২৭১ ডিগ্রি দিঘাংশে অবস্থান করবে এবং ৪১ মিনিট পরে সন্ধ্যা ৬টা ৪৮ মিনিটে অস্ত যাবে। এই সন্ধ্যায় চাঁদের ১ শতাংশ আলোকিত থাকলেও বাংলাদেশের আকাশে তা দেখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। চাঁদটি পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত রেখা হতে ১৮ ডিগ্রি ওপরে ২৬১ ডিগ্রি দিঘাংশে অবস্থান করবে এবং প্রায় ১ ঘণ্টা ২৪ মিনিট দেশের আকাশে অবস্থান করে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে ২৬৯ ডিগ্রি দিঘাংশে অস্ত যাবে। এ সময়ে চাঁদটির প্রায় ৪ শতাংশ অংশ আলোকিত থাকবে এবং দেশের আকাশ মেঘমুক্ত পরিষ্কার থাকলে একে বেশ স্পষ্টভাবেই দেখা যাবে। এই সন্ধ্যায় চাঁদের বয়স হবে ৪২ ঘণ্টা ৬ মিনিট এবং সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে। বিজ্ঞপ্তি। এসএইচ/  

শুভ জন্মাষ্টমী, শান্তি আসুক ধরাধামে

বিশ্বের একমাত্র অধীশ্বর যিনি, তিনি আদি ও অনাদি, সর্বকারণের কারণ, তিনিই গোবিন্দ এবং তিনিই হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ঈশ্বর সনাতন, চিরস্থায়ী এবং তিনিই সনাতন ধর্মের স্রষ্টা। মানুষ নশ্বর, তার দ্বারা এরূপ কোনো চিরস্থায়ী বা সনাতন কিছুই হতে পারে না। স্বয়ং ঈশ্বর সনাতন হিন্দুধর্মের প্রবর্তক ও প্রচারক, ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী ঋষিদের মাধ্যমে এভাবে পৃথিবীতে প্রবর্তিত হয়েছে। তাই সনাতন অর্থ শাশ্বত বা চিরস্থায়ী, যা আগে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।ত্রিলোকদর্শী ঋষিরা ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে ঈশ্বর থেকে এ জ্ঞান লাভ করেছেন যে, সবকিছুই ঈশ্বর সৃষ্ট। তিনিই একমাত্র প্রভু, মহাজ্ঞানী এবং মহাশক্তিধর, তিনিই বিশ্বব্রহ্মা-ের নিয়ন্ত্রা। ঈশ্বর সম্পর্কে যে জ্ঞান গভীর তপস্যার ফলে জ্ঞাত ঋষিদের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়েছিল তাকেই ‘বেদ’ বলা হয়। লিপিমালার উদ্ভব হয়নি প্রথমদিকে তাই এই জ্ঞান ঋষিদের মুখে মুখেই প্রচলিত ছিল বলে একে বলা হয়, ‘শ্রুতি’। পরবর্তীকালে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন প্রচুর পরিশ্রম করে ঋষিদের শিষ্যদের কাছ থেকে এ জ্ঞান সংগ্রহ করে ও সঙ্কলন করে লিপিবদ্ধ করেন। তিনিই ‘বেদব্যাস’ নামে বহুল পরিচিত। এভাবেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বতন্ত্রধর্মী ও দর্শনভিত্তিক ধর্ম হিসেবে ‘সনাতন ধর্ম’ রূপলাভ করে।এই সনাতন ধর্মে ঈশ্বর অত্যন্ত আপনজন বলে স্বীকৃত। তিনি সর্বশক্তিমান এবং সর্বব্যাপী। বিশ্বব্রহ্মা- তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে ঈশ্বর সতত বিরাজমান। ঈশ্বর সাকার এবং নিরাকার। সাকাররূপে প্রকৃতিতে তিনি প্রকাশিত, নিরাকাররূপে সমগ্র নভোম-লে তিনি বিরাজিত। তিনি ইচ্ছা করলেই রূপ পরিগ্রহ করতে পারেন। তিনি তা করেছেন এবং করবেন যুগের সন্ধিক্ষণে, সাধুদের পরিত্রাণের লক্ষ্যে, দুষ্টের দমনের জন্য এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে।শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় উল্লেখ আছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘হে অর্জুন! যে সময়ে ধর্মের গ্লানি বা অধঃপতন হয়, সেই সময়ে আমি নিজেকে সৃষ্টি করি। সাধুদের পরিত্রাণ, পাপীদের বিনাশ এবং ধর্মকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমি যুগে যুগে ধরায় অবতীর্ণ হই।’ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধরায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৩২২০ বছর আগে অর্থাৎ প্রায় এখন থেকে ৫২৩৬ বছর আগে। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। শ্রীকৃষ্ণ ধরায় আগমন করে সাধুদের রক্ষা এবং দুর্বৃত্তদের বিনাশ করেছেন এবং বিশ্বব্রহ্মা-ের সর্বোচ্চ মহাধিকরণ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন, এসব বর্ণনা আছে গর্গ সংহিতায়, বিষ্ণুপুরাণে, ব্রহ্মাবৈর্বত্যপুরাণে, মহাভারতে, হরিবংশে, ভাগবতসহ অসংখ্য ধর্মগ্রন্থে।বিষ্ণুর অষ্টম অবতার, জননীর অষ্টম গর্ভের সন্তান, অষ্টমীতে আবির্ভূত হয়েছেন এ ধরায়। তাই ভগবানের আবির্ভাবের মুহূর্তকে বলা হয় জন্মাষ্টমী। বিবেকের চেতনাকে বিকশিত করে বিশ্বকে প্রেম, প্রীতি ও প্রকৃতির ধারায় প্রবাহিত করে ধর্মকে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে তার আবির্ভাব। শ্রীকৃষ্ণের নীলাভ রঙ হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মা-ের প্রতীক, অনন্ত আকাশের নীলাভ ছবির রূপ, এ হচ্ছে গভীর সমুদ্রের নীল রঙের অসাধারণ অবয়ব। অসীম ভালবাসা, দুঃখ-বেদনা, জয়-পরাজয়, সংগ্রাম ও সংহতির মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, মাথায় যার ময়ূর পুচ্ছ, সৌন্দর্য ও জ্ঞানের প্রতীক, হাতে পাঞ্চজন্য, সত্য ও সংহতির সুর। তাই ভগবান বলছেন, ‘আমি পৃথিবীতে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে স্বকীয় শক্তির বলে সৌরজগৎকে ধারণ করে আছি।’ (গীতা১৫/১৩)ভগবান একাধারে বালগোপাল, ভ্রাতা, রথের সারথি, যোদ্ধা, দক্ষ কূটনীতিজ্ঞ, দার্শনিক, জ্ঞানপিপাসু শিষ্য, রক্ষাকর্তা। তিনি একই সঙ্গে ব্রজের রাখাল, বৃন্দাবনের গোপী মনমনোহারিনী, আবার দ্বারকার রাজা। এর অর্থ হচ্ছে, বিশ্বভুবনে এ শৃঙ্খলিত জীবনকে সাথী করে, মহামায়া ছেড়ে দিলেন মহাকাশে, পরিণতি হলো উন্মুক্ত বিশ্বভুবন তার বিচরণক্ষেত্র। অর্থাৎ হে মানব, শৃঙ্খলকে পরাভূত করে বিচরণ করো মুক্ত আকাশে, অত্যাচারীর নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে বা অসত্যের বিনাশ করে মুক্ত বিশ্বে সত্যকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হও। তাই বেদান্তের শিক্ষক চিনময়ানন্দ বলেছেন, ‘গীতার মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উপনিষদের জ্ঞানকে হিমালয় থেকে সাধারণ পণ্যের বাজার অবধি পরিব্যাপ্ত করেছেন।’স্বামী শিবানন্দ গীতার ওপর ব্যাপক গবেষণা করে বলেছেন, ‘গীতা দৈনন্দিন জীবন এবং ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। গীতা জীব ও জগতের কল্যাণে, ভালবাসার মধ্য দিয়ে কর্তব্য পালনের এক শিক্ষা। হৃদয় থেকে স্বার্থপরায়ণতা, লালসা এবং কামনা দূরীভূত করে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করাই গীতার শিক্ষা।’ গীতার এসব বাণীই হচ্ছে পার্থসারথি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখ নিঃসৃত বাণী।পরমগুরু শংকরাচার্য, শ্রী রামানুজ, শ্রীমাধব এবং বিশ্বের অনেক দার্শনিক গীতার ওপর গবেষণা করেছেন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী অবলোকন করে বিমোহিত হয়েছেন। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণননের মতে, ‘গীতা শুধু চিন্তার শক্তি এবং দর্শনের মহিমায় আমাদের আকর্ষণ করে না, ভগদ্ভক্তির উত্তাপে এবং আধ্যাত্মিক আবেগের মধুরতায় আমাদের বিমুগ্ধ করে।’ লোকমান্য তিলক বলেন, ‘ইহা অত্যন্ত প্রোজ্জ্বল ও অমূল্য রতন যা উৎপীড়িত আত্মাকে শান্তি দেয় এবং আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞায় প্রভু করে তোলে।’সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-প্রীতি, জন্ম-মৃত্যু সবই জীবনের অঙ্গ। এগুলোকে সহজভাবে সত্য ও ন্যায়ের আলোকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সনাতন ধর্মীয় গ্রন্থগুলো প্রায় সবই ঋষি মুখে কথিত। একমাত্র ব্যতিক্রম শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। এখানে স্বয়ং শ্রীভগবান নিজেই বক্তা। গীতা হচ্ছে ঐশ্বর্যময় ঈশ্বরের গান। ভগবানের গুণকীর্তন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে হতাশ তৃতীয় পা-ব অর্জুনকে মানুষের ভবিতব্য, নৈতিকতার অনন্তসার এবং পার্থিব ও স্বর্গীয় জীবনের মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।বাস্তবে অর্জুন হচ্ছে জীবন সংগ্রামের প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণ সর্বশক্তিমান, পার্থিব রূপ পরিগ্রহ করে বা অবতার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ধরাধামে। শ্রীকৃষ্ণ দিব্যচক্ষু দান করলে অর্জুন দর্শন করলেন বিশ্বরূপ এবং বললেন, ‘হে জগতের প্রভু, বিশ্বেশ্বর, তোমার আদি, মধ্য ও অন্ত কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তুমি অনন্ত বীর্যশালী, বাহুধারী, চন্দ্র-সূর্য তোমার চক্ষুদ্বয়, তোমার মুখদীপ্ত অগ্নির ন্যায়। তুমি নিজের তেজে জগৎকে তাপিত করেছ। তুমি স্বর্গ, মর্ত্য আর মধ্যবর্তী স্থল সর্বত্র ব্যাপিয়া বিরাজমান। তুমি বায়ু-যম-অগ্নি-বরুণ-চন্দ্র, প্রজাপতি-প্রপিতামহ, সকল দেবতার দেবতা তুমি। তোমাকে সম্মুখে, পশ্চাতে এবং সর্বদিকে প্রণাম করি।’ অর্জুন ভীত হলেন। ভগবান বললেন, কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে কী হবে সব আমি নির্ধারণ করে রেখেছি, তুমি উপলক্ষ মাত্র। কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়। ফলদানের অধিকার স্বয়ং ভগবানের।মানবজীবনের লক্ষ্য হলো ঈশ্বর লাভ, পরমাত্মার সঙ্গে মিলন। কৃষ্ণভক্তরা ভগবানকে দেখতে পায় বহুরূপে, বহুভাবে, সব জীবের মাঝে। কখনো শালগ্রাম শিলায়, কখনো সূর্যের কিরণে, কখনো সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে, আবার কখনো বিবিধ মর্ম্মর মূর্তিতে।ঈশ্বর প্রাণের প্রিয় বস্তুটির মাঝে অবস্থান করেন, দুঃখীজনের অশ্রুর মধ্যে বিরাজ করেন। তাই স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায়,‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর,জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’অনন্ত কোটি ব্রহ্মা-ের যিনি স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং সংহারকর্তা, তিনিই মনুষ্যরূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন শ্রীকৃষ্ণরূপে। তিনি পরমাত্মা, পরমতেজ, যার আদি নেই, অন্ত নেই, তিনি সবার প্রভু। জন্মাষ্টমীর এ মহাযজ্ঞে সব ধর্মপ্রাণ মানুষ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ধরাধামে অবতীর্ণ হওয়ার দিনটি উদযাপন করে ভক্তি, বিশ্বাস, প্রার্থনা এবং গীতাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। সঙ্গে চলে আনন্দ সংগীত, নাটক ও নৃত্য।ঢাকার জন্মাষ্টমী মিছিল ঐতিহাসিক। চলে আসছে অনেকদিন থেকে। বাংলাদেশের সব মানুষের কল্যাণে, জঙ্গিবাদ নিরসনে, জন্মাষ্টমীর মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে সব মানুষের মহামিলনের মাঝে, সব ধরনের মতানৈক্য ও বিপরীত চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে। আসুন, এ শুভদিনটিকে আনন্দমুখর করে রাখি বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষের মহামিলনের মাঝে, দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করি ঘরে ঘরে।লেখক : সাবেক সচিব ও উপদেষ্টা, শ্রী শ্রী গীতাসংঘ বাংলাদেশ। / এআর /

শুভ জন্মাষ্টমী আজ

  আজ শুভ জন্মাষ্টমী। সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রবর্তক ও প্রাণপুরুষ মহাবতার পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন। তাই এই দিনটি উপলক্ষ্যে আজ রোববার সনাতন ধর্মাবলম্বিরা বিভিন্ন  কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গীতাযজ্ঞ, জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা, কৃষ্ণপূজা, আলোচনা সভা, কীর্তন, আরতি, প্রসাদ বিতরণ, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও কুইজ প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গীতিনৃত্য, নাটক প্রভৃতি। এদিকে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো.আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণীতে হিন্দু সম্প্রদায়সহ দেশবাসীর প্রতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মহাবতার শ্রীকৃষ্ণ ধরাধামে আবির্ভূত হন। অত্যাচারী ও দুর্জনের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় সাধুজনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কংসের কারাগারে জন্ম নেন তিনি। শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমনে তিনি ব্রতী ছিলেন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ তাই ভগবানের আসনে অধিষ্ঠিত। পৃথক বিবৃতিতে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীরউত্তম, ঊষাতন তালুকদার ও হিউবার্ট গোমেজ, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত, সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কিশোর রঞ্জন মণ্ডল, ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতিদ্বয় উইলিয়াম প্রলয় সমদ্দার বাপ্পী ও অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ বড়ূয়া এবং সাধারণ সম্পাদক রমেন মণ্ডল জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করবে। রাষ্ট্রপতি সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির দু`দিনের কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী উৎসব রোববার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে শুরু হচ্ছে। রোববার সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ, বিকেল ৩টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির সংলগ্ন পলাশীর মোড় থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক পর্যন্ত জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা এবং রাতে কৃষ্ণপূজা অনুষ্ঠিত হবে। শোভাযাত্রায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। উদ্বোধন করবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। বিশেষ অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও স্থানীয় এমপি হাজি মো. সেলিম।  আগামী ৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেল ৪টায় ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে আলোচনা সভা ও সন্ধ্যায় ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার উপস্থিত থাকবেন।   এমএইচ/ এসএইচ/

ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানির আগে ও পরে করণীয়

‘কোরবানি’ শব্দটির আরবি ‘কুরব’; আর আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় আত্মোৎসর্গ করাকে বলা হয় কোরবানি। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তার উদ্দেশ্যে পশু জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়।হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর ছেলে ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি করার ঐশী নির্দেশের পরীক্ষা থেকে বর্তমান পদ্ধতির কোরবানির সূচনা হয়েছে। ঈদুল আজহার তিনদিনের মধ্যে (জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত) আল্লাহের নামে জীবন্ত চার পা ওয়ালা পশু জবাই করা হয়। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের যদি সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার মালিক হয় অথবা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থের মালিক হয় তার জন্য কোরবানি করা হবে ওয়াজিব।তবে এ কোরবানি দেওয়ার আগে ও পরে ইসলামের দৃষ্টিতে আছে কিছু করণীয় দিক। যা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো- কোরবানির পশু ক্রয়ের আগে:হালাল উপার্জন দিয়ে কোরবানির পশু ক্রয় করুন।আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের স্পৃহা ও ওয়াজিব আদায়ের প্রেরণা মনে জাগ্রত করুন। কোরবানিকে সুখ্যাতি ও প্রদর্শন ইচ্ছার চিন্তা মন থেকে দূর করুন। ভাগে কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে পশু কেনার আগেই ভাগিদার নির্বাচিত করুন। এটা মোস্তাহাব আমল।যার ব্যাপারে নিশ্চিত জানা আছে, তার উপার্জন হারাম, তাকে কোর‍বানির শরিক করবেন না। কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করলে, জিলহজ মাসের চাঁদ উঠার আগে নখ, চুল এবং অবাঞ্চিত লোম কেটে ফেলুন। এটাও মোস্তাহাব আমল। পশু কেনার সময় করণীয় যে পশুর ব্যাপারে ধারণা হবে যে, তা চুরি করে আনা তা কিনবেন না। কোরবানি পশু ক্রয়-বিক্রয়কালে মিথ্যা কথা ও মিথ্যা শপথ বর্জন করুন। কোনো পশুর মূল্য চূড়ান্ত করার পর কোনো দাম বলবেন না অথবা ক্রয়ের প্রস্তাব দেবেন না। এটা মাকরূহ। কেনা পশুটি ভালোভাবে দেখে নিন। খেয়াল রাখতে হবে গরু, মহিষের বয়স যেনো দুই বছরের কম না হয়, উটের বয়স যেনো পাঁচ বছরের কম না হয়, ছাগলের বয়স যেনো এক বছরের কম না হয়। ছয় মাস বা তদূর্ধ্ব বয়সের ভেড়া, দুম্বা দেখতে যদি এক বছর বয়সের মতো মনে হয় তবে তা দ্বারা কোরবানি করা যাবে। গরু, মহিষ, উট ও ছাগলের জন্য বয়সের কোনো ছাড় নেই। যতোই হৃষ্ট-পুষ্ট হোক নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হতে হবে। কান, জিহ্বা ও লেজ যেনো অর্ধেকের বেশি কাটা না থাকে। চোখের দৃষ্টি শক্তি অর্ধেকের বেশি যেনো নষ্ট না থাকে।পশুর শিং যেনো এ পরিমাণ ভাঙা না থাকে যার প্রভাব মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। জানাশোনায় প্রসব সময় নিকটবর্তী এমন পশু ক্রয় করে কোরবানি করা মাকরূহ। তবে কোরবানি আদায় হবে।ব+ন্ধ্যা পশুর কোরবানি জায়েজ। অণ্ডকোষ কাটা পশু কোরবানি করা উত্তম।খাবার খেতে পারে না বা নড়া-চড়া করতে পারে না এতো দুর্বল পশুর কোরবানি শুদ্ধ নয়। বন্য ও হিজড়া প্রজাতির পশুর কোরবানি জায়েজ নেই। কোরবানির পশু ক্রয়ের পর করণীয়: পশুর সেবা-যত্ন করুন। অহেতুক পশুকে কোনো কষ্ট দেবেন না। পশু এমন স্থানে বাঁধুন যেনো পথচারীদের কষ্ট না হয়। পশুর গলায় ঘণ্টি বাঁধবেন না। কোরবানির জন্য ক্রয়কৃত পশুর ওপর আরোহণ করবেন না বা কোনো কাজে ব্যবহার করবেন না।যদি দুধ দোহন করা হয় তবে গরিব-মিসকিনকে দান করে দিন। আবার দুধের বাজার মূল্য দান করে নিজেও সে দুধ পান করতে পারবেন। কোনো অবস্থাতেই কোরবানির পশুর প্রদর্শনী করবেন না। ভাগে কোরবানি দিলে ভাগিদার সবাইকে সবকাজে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন। আরকে//

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখর আরাফাতের ময়দান

পবিত্র হজের মূলপর্ব শুরু হয়েছে আজ সোমবার থেকে। মিনা প্রান্তর থেকে ২০ লাখের অধিক হাজী আরাফাতের ময়দানে পৌঁছাতে শুরু করেছেন। হাজীদের লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান। আজ ফজরের নামাজের পর থেকেই আরাফাতের ময়দানে পৌঁছাতে শুরু করেছেন তারা। কাল মঙ্গলবার সৌদি আরবে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের আনুষ্ঠানিকতা। প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলিম হজ করার জন্যে আসেন। এর আগে মিনায় অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে শনিবার সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে পবিত্র হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতা। রোববার সারা দিন ও রাত তারা মিনায় কাটান ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় মশগুল ছিলেন জিকির ও তালবিয়াতে। আজ সকালে হাজীরা সমবেত হয়েছেন প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে বিদায় হজের স্মৃতিজড়িত আরাফাতের ময়দানে। চার বর্গমাইল আয়তনের এ বিশাল সমতল মাঠের দক্ষিণ দিকে মক্কা হাদা তায়েফ রিংরোড, উত্তরে সাদ পাহাড়। সৌদি দৈনিক আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, বাদশাহ সালমান এবার হজের খুতবা পড়ার দায়িত্ব দিয়েছেন মসজিদে নববীর ইমাম শেখ হুসেইন বিন আবদুল আজিজকে। এ খুতবা রেডিও ও টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হবে।এ আরাফাতে উপস্থিত না হলে হজ পূর্ণ হয় না। তাই হজে এসে যারা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদেরও অ্যাম্বুলেন্সে করে আরাফাতের ময়দানে নিয়ে আসা হয় স্বল্প সময়ের জন্য। ইসলামি রীতি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের নবম দিনটি আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে ইবাদতে কাটানোই হল হজ। আরাফাত থেকে মিনায় ফেরার পথে আজ সন্ধ্যায় মুজদালিফায় মাগরিব ও এশার নামাজ পড়বেন সমবেত মুসলমানরা। মুজদালিফায় রাতে খোলা আকাশের নিচে থাকবেন তারা। এ সময়েই তারা সাতটি পাথর সংগ্রহ করবেন, যা মিনার জামারায় শয়তানকে উদ্দেশ্য করে ছোড়া হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকালে মিনায় ফিরে সেই পাথর তারা প্রতীকী শয়তানকে লক্ষ্য করে ছুড়বেন। এর পর কোরবানি দিয়ে ইহরাম ত্যাগ করবেন। সবশেষে কাবা শরিফকে বিদায়ী তাওয়াফের মধ্য দিয়ে শেষ হবে হজের আনুষ্ঠানিকতা। সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ১৬৪ দেশের ২০ লাখের বেশি মুসলমান এবার হজ করছেন, যাদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় সোয়া লাখ।

হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু সোমবার

পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মিনায় পৌঁছেছেন হাজিরা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা শনিবার রাতেই কেউ গাড়িতে, কেউবা হেঁটে মিনায় পৌঁছান। আজ রোববার সারাদিন তারা সেখানেই অবস্থান করবেন। সেখান থেকে তারা আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা হবেন। সৌদি আরবে ৯ জিলহজ অর্থাৎ আগামীকাল সোমবার হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। হজের খুতবা শোনা, এক আজানে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন মুসল্লিরা। সন্ধ্যায় তারা মুজদালিফার উদ্দেশে আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করবেন। সৌদি হজ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বের ১৫০টি দেশের ২০ লক্ষাধিক মুসল্লি হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব এসেছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের এক লাখের বেশি মুসল্লি রয়েছেন। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে ১২ তারিখে। গতকাল রাতে এশার নামাজের পর মুসল্লিরা মক্কার মসজিদ আল হারাম থেকে ৯ কিলোমিটার দূরত্বে মিনায় যান। সেখানে সারাদিন অবস্থানের পর তালবিয়া পাঠ করে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে পাপমুক্তির আকুল বাসনায় তারা আরাফাতের ময়দানে সমবেত হবেন।হজে এসে অসুস্থতার জন্য যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদেরও অ্যাম্বুলেন্সে করে আরাফাতের ময়দানে স্বল্প সময়ের জন্য নেওয়া হবে। অন্যরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে থাকবেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত-বন্দেগি করবেন। মসজিদে নামিরাহ থেকে হজের খুতবা পাঠ করা হবে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দৃশ্য টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়ানিন’ মাতা লাকা ওয়ালমুলক’- এই ধ্বনিতে ওইদিন মুখর হবে আরাফাতের ময়দান। সাদা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় লাখ লাখ হাজির পদচারণায় আরাফাতের ময়দান পরিণত হবে শুভ্রতার সমুদ্রে। ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর জামারায় পাথর নিক্ষেপের জন্য রওনা দেবেন তারা। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যাওয়ার আগেই জামারাতুল আকাবায় (বড় শয়তান) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করা হবে। পাথর নিক্ষেপের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তারা পশু কোরবানি দেবেন। ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থান করে সূর্য হেলে পড়ার পর প্রতিদিন ছোট, মধ্য ও বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগে তারা মিনা ত্যাগ করবেন।এদিকে হাজিদের নির্বিঘ্নে হজ পালনের জন্য সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাজিদের চিকিৎসা ও কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হাজার হাজার চিকিৎসা কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। মক্কা, মিনা, মদিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় বহু অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া হাজিদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তার জন্য কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন। উল্লেখ্য, ‘হজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘ইচ্ছা করা’। এটি ইসলাম ধর্মের পাঁচ স্তম্ভের একটি।সূত্র : আল জাজিরা, সৌদি গেজেট ও এনডিটিভি এসএ/  

জাপানের যে শহর দেবী লক্ষ্মীর নামে

বৌদ্ধ ধর্মের জাপান৷ বৌদ্ধদের জাপান৷ সে জাপানে একটা শহরের নামই রাখা হয়েছে হিন্দুদের দেবী লক্ষ্মীর নামে৷ টোকিওর অদূরেই একটি ছোট্ট শহর কিছিজোজি৷ এই শহরের নামকরণ করা হয়েছে দেবী লক্ষ্মীর নামে৷ এমনই জানিয়েছেন কনসাল জেনারেল টাকাইউকি কিটাগাওয়া৷ তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ জাপানের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের ওতপ্রোত সম্পর্ক, এমনই জানান কনসাল জেনারেল৷ তিনি বলেন টোকিও শহরের কাছে অবস্থিত একটা মন্দির লক্ষ্মী মন্দিরের আদলে তৈরি হয়েছে। জাপানি ভাষায় কিছিজোজি কথার অর্থ হল লক্ষ্মী মন্দির৷ তিনি আরও বলেন, এক জাপানি পণ্ডিতের মতে প্রায় ৫০০ জাপানি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে তামিল এবং সংস্কৃত শব্দ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জাপানীরা ৭ জন দেবতাকে সৌভাগ্যের দেবতা হিসেবে পুজা করেন৷ তার মধ্যে ৪ জনই হিন্দু ধর্ম প্রভাবিত৷ তাই কিছিজোজিতে যে দেবী লক্ষ্মীর মন্দির রয়েছে, সেখানে জাপানীরাই প্রার্থনা করেন৷ ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক অনুষ্ঠানে জাপানের কনসাল জেনারেল বলেন, জাপানের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ভারতের সরাসরি প্রভাব রয়েছে৷ তাই জাপানের বহু মন্দিরেই ভারতীয় দেবদেবীর পুজা হয়। এছাড়াও তিনি জানান, জাপানি ভাষাতেও বহু শব্দ ভারতীয় ভাষা থেকে অনুপ্রাণিত। জাপানি স্ক্রিপ্টে সংস্কৃত শব্দ থেকে গৃহীত বহু শব্দের নিদর্শন পাওয়া গেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে কনসাল জেনারেল বলেন, জাপানী খাবার সুশি ভাত ও ভিনিগার দিয়ে তৈরি হয়৷ সুশির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত সারি শব্দটি৷ এই সারি সংস্কৃত শব্দ জালি থেকে এসেছে, যার অর্থ ভাত৷ সূত্র: কলকাতা ২৪x৭ একে//

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি