ঢাকা, শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১, || বৈশাখ ৩ ১৪২৮

রমজানে সবাইকে আগে সালাম দিন

প্রকাশিত : ১৫:১৪, ৩ মে ২০১৯

‘সালাম’ আল্লাহ পাকের এক বিশেষ নেয়ামত, রহমত, বরকতময়পূর্ণ শব্দ। এটি একটি দোয়া। অর্থ হলো আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক। জবাবে সালামের উত্তরদাতা বলেন, ওয়াআলাইকুমুস সালাম, অর্থাৎ সালাম দাতার ওপরও আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক। ইসলামি সংকৃতিতে সালামের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মেরাজে নবী করিম (স.) কে সর্ব প্রথম সালাম দিয়ে কথোপকথন শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ স্রষ্টা তার সৃস্টিকে সাক্ষাতের শুরুতে সালাম দিয়েছেন, এ থেকে সালামের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়।


নবীজী (স) বলেছেন, হে মানুষ! তোমাদের কাছে এসেছে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ও বরকতপূর্ণ একটি মাস। এ মাসের নফল ইবাদত ফরজ আদায়ের সমান সওয়াবের। আর একটি ফরজ পালন ৭০টি ফরজ পালনের সমান সওয়াবের! আসুন এ মাসটিকে আত্মশুদ্ধি ও সৃষ্টির সেবায় পুরোপুরি নিয়োগের মাধ্যমে পরিপূর্ণভাবে আমরা কাজে লাগাই। এবারের রমজানকে (২০১৯) আমরা স্মরণীয় করে রাখতে চাই আগে সালাম দেয়ার মাধ্যমে শান্তিকামনার বাণীকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে।
শান্তি কামনার চিরন্তন বাণী
আসসালামু আলাইকুম। একটি সহজ সাবলীল বাক্য। বাক্যটির মধ্যেই রয়েছে পারস্পরিক শান্তি কামনার এক অসাধারণ স্পন্দন, চমৎকার কল্যাণশক্তি যা একে দিয়েছে দেশ-কাল-ভাষার সীমানা অতিক্রমের সুযোগ। ফলে সালাম পেয়েছে পারস্পরিক কল্যাণ ও শান্তি কামনার চিরন্তন বাণীর সার্বজনীনতা। পাশ্চাত্যের অর্থহীন সম্ভাষণ হাই-হ্যালো-র পরিবর্তে ‘সালাম’টিকে থাকবে যুগ যুগ ধরে, শান্তি ও কল্যাণকামী বাক্য হিসেবে।

সালাম- আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের প্রিয়
আল্লাহ সালাম বিনিময় পছন্দ করেন। নবী ও রসুলদের প্রতি তিনি সালাম জানিয়েছেন। পবিত্র মেরাজে নবীজীর (স) প্রতি তাঁর প্রথম বাক্যই ছিল—‘আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবীইয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহু’। বিশ্বাসীদেরকেও তিনি সালাম দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন-‘বিশ্বাসীরা যেদিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, সেদিন তাদেরকে স্বাগত জানানো হবে ‘সালাম’ বলে।’ [সূরা আহজাব : ৪৪]

সালাম দেয়া সুন্নত। নবীজী (স) এর জীবনে সবচেয়ে বেশি চর্চিত বাক্য হচ্ছে সালাম। মসনদে আহমাদের একটি হাদীস হচ্ছে রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, "সর্বত্র সালামের প্রচলন কর (প্রথম সুযোগে আগে সালাম দাও)। তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবে।"

আল কোরআনে সালাম
‘যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি সেদিন আমার প্রতি ছিল সালাম, যেদিন আমি মারা যাব আর যেদিন পুনরুত্থিত হবো সেদিনও থাকবে সালাম।’ [সূরা মরিয়ম : ৩৩]

‘নূহ আমার কাছে প্রার্থনা করেছিল। দেখ, কত সুন্দরভাবে আমি তার প্রার্থনা কবুল করেছিলাম! পরিবারবর্গসহ আমি তাকে মহাবিপদ থেকে রক্ষা করেছিলাম। তার বংশধারা জমিনে বিস্তার লাভ করল। আর পরবর্তী প্রজন্মপরম্পরায় তাকে স্মরণীয় করে রাখলাম। ‘উভয়কালেই নূহের প্রতি সালাম!’। [সূরা সাফফাত : ৭৫-৭৯]

‘মনে রেখ, এ ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে সুযোগ দিলাম এক মহান কোরবানির। পুরো বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখলাম প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ইব্রাহিমের প্রতি সালাম। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি।’ [সূরা সাফফাত : ১০৬-১১০] ‘এদিন যাদের ঠিকানা হবে জান্নাত, ...দয়াময় প্রতিপালকের পক্ষ হতে তাদের জানানো হবে সালাম ও সম্ভাষণ।’[সূরা ইয়া-সীন : ৫৫-৫৮]

‘হে নবী! বলো, সকল প্রশংসা আল্লাহর! আর সালাম তাঁর মনোনীত বান্দাদের প্রতি। (ওদের জিজ্ঞেস করো) শ্রেষ্ঠ কে? আল্লাহ? না যাদেরকে ওরা উপাস্য হিসেবে আল্লাহর সাথে শরিক করে, তারা?’ [সূরা নমল : ৫৯]

‘হে নবী! ইব্রাহিমের সম্মানিত মেহমানদের কথা তোমার কাছে পৌঁছেছে কি? মেহমানরা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, সালাম। উত্তরে সে-ও বলল, সালাম। (স্বগতোক্তি করল) ওরা তো অচেনা।’ [সূরা জারিয়াত : ২৪-২৫]

‘এরপর আল্লাহ বললেন, হে নূহ! জাহাজ থেকে নেমে পড়ো। আমার তরফ থেকে সালাম। বরকতে পূর্ণ হবে তোমার ও তোমার সাথে অবতরণকারীদের (এবং তাদের সৎকর্মশীল উত্তরসূরিদের) জীবন। ...’ [সূরা হুদ : ৪৮]

সালাম দিন সবাইকে
একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আমরসহ আরো কয়েকজন সাহাবী বসেছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এলেন। রসুলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামে সর্বোত্তম কাজ কী? রসুলুল্লাহ (স) বললেন, পরিচিত অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে সালাম দেয়া। দ্বিতীয় সর্বোত্তম হলো- অভুক্ত মানুষকে খাওয়ানো।

তো অভুক্ত মানুষকে এখন পাওয়া কঠিন। কারণ এরকম মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। তাছাড়া এ এমন এক ব্যাপার- যা কেউ না বললে সাধারণভাবে বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু সালাম দেয়ার মানুষ কমে নি, বরং বেড়েছে। কাজেই ছোট-বড়, ধনী-গরিব, জাত-পাত, পরিচিত-অপরিচিত বাছবিচার না করে স্থান কাল পাত্র বুঝে যে কাউকে সালাম দিতে পারেন। সকালে ঘুম ভাঙার পর ‘শোকর আলহামদুলিল্লাহ’ বলে প্রথম যাকে দেখছেন তাকেই সালাম দিয়ে আপনার দিন শুরু করুন।

আগে সালাম দিন
আগে সালাম দেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। যিনি আগে সালাম দেবেন, সাদাকা ও বিশ্বজনীন মমতায় তিনিই অগ্রগামী থাকবেন। এ ব্যাপারে একটি হাদিস হচ্ছে-যে যত বেশি আল্লাহর নিকটবর্তী, সালাম প্রদানের ক্ষেত্রে সে তত অগ্রবর্তী। যে কারণে রসুলুল্লাহ (স)-কে কেউ আগে সালাম দিতে পারত না। তিনি সবাইকে আগে সালাম দিতেন-ছোট-বড়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে।

শিশুদের সালাম দিন
সালামের ব্যাপারে একটি ভুল ধারণা হচ্ছে- ছোটরা বড়দের আগে সালাম দেবে। আর বড়রা সালাম নেবে।

আসলে শিশুদেরই বরং আগে সালাম দেয়া উচিত। সালাম দিতে শেখে ওরা তখনই। যেমন, বাইরে থেকে বাসায় গেলে ঢোকার সময়ই প্রথম সালাম দিন যিনি দরজা খুলছেন তাকে। এরপর যার যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে তাদের। তাদের মধ্যে যদি শিশু থাকে, তাহলে তাকেও। দেখবেন এতে করে শিশুটি নিজেকে সম্মানিত মনে করছে এবং আপনাকেও সম্মান করছে।

এক আধদিন এরকম করার পর দেখবেন, আপনি আর বাচ্চাদের সাথে পারছেন না। বাচ্চারাই আগে সালাম দিচ্ছে আপনাকে। আসলে আমরা অনেক সময় অভিযোগ করি যে- বাচ্চা বেয়াদব হয়ে যাচ্ছে, সালাম-কালাম দেয় না। কিন্তু বাচ্চা সালাম দেয়া শিখবে কার কাছ থেকে? আপনি দিলে না সে শিখবে। আপনি যেহেতু দেন না, কাজেই সে-ও শেখে নি সালাম দিতে!

নবীজী (স) সবসময় শিশুদের আগে সালাম দিতেন।

জড়তা ভাঙতে হবে আমাদের অবস্থা হচ্ছে- আমরা এখন কেউ সালাম দিতে চাই না। অপেক্ষা করি আরেকজন সালাম দেবে আর আমরা একটু মাথা নাড়াব। এমনকি অনেক সময় মুখে পুরোটাও বলি না-যেন মুখে তালা লেগে গেছে। এরকম নয়, বরং সালাম দিতে হবে স্পষ্টভাবে, সুন্দর উচ্চারণে। রসুলুল্লাহ (স) এর একটি হাদিস হচ্ছে- তুমি যে তোমার আরেক ভাইকে ভালবাস, এটা তাকে বল।

সালামের মাধ্যমে আমরা একজন মানুষের শান্তি কামনা করি। শুভেচ্ছার এর চেয়ে বড় প্রকাশ আর কী হতে পারে! কাজেই সালামের মাধ্যমে যখন কারো শুভকামনা-শান্তিকামনা করছেন, তখন স্পষ্টভাবে, সুন্দর উচ্চারণে বলুন- আসসালামু আলাইকুম।

আসলে ভালো কাজে জড়তা ভাঙতে হবে আমাদের। অশান্তির কথা যদি মানুষ এত উচ্চকণ্ঠে বলতে পারে, তাহলে শান্তির কথা কেন আমরা স্পষ্ট স্বরে বলতে পারব না!

সালাম দিন সর্বত্র
ঘর থেকে বেরোতে, ঘরে ফিরে, ঘুমানোর আগে সালাম দিন। ‘ঘরে প্রবেশের পূর্বে অভিবাদন জানাবে, সালাম করবে। এ কল্যাণের দোয়া আল্লাহর কাছ থেকে নির্ধারিত, কল্যাণময় ও পবিত্র। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্যে তাঁর বিধান সুস্পষ্টভাবে বয়ান করেন, যাতে তোমরা তোমাদের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে শেখো।’ [সূরা নূর : ৬১]

কাউকে বিদায় দেয়ার সময় সালাম দিন। এমনকি খাওয়ার সময়ও সালাম দিতে বা সালামের জবাব দিতে কোনো বাধা নেই। অন্যের বাড়িতে প্রবেশ করার আগে তাদের সালাম জানান ও অনুমতি নিন। ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্যের বাড়িতে অনুমতি না নিয়ে প্রবেশ কোরো না। অন্যের বাড়িতে প্রবেশ করার আগে তাদের সালাম জানাও ও অনুমতি নাও। এ নিয়ম তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। এ ব্যাপারে তোমরা সচেতন থাকবে।’ [সূরা নূর : ২৭]

শুদ্ধভাবে সালাম দিন
শুদ্ধভাবে সালাম দিন। বলুন, আসসালামু আলাইকুম। কেউ সালাম দিলে জবাবে তার প্রতি মনোযোগী হয়ে হাসিমুখে আরো সুন্দর ও আন্তরিকভাবে বলুন, ওয়ালাইকুম আসসালাম। সালামের জবাব দেয়া ওয়াজিব। ‘আর কেউ যখন তোমাদের সালাম দেয়, তখন তোমরা কমপক্ষে সে-রকম অথবা তার চেয়েও বেশি সম্মানসহকারে সালামের জবাব দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়েই হিসাব গ্রহণকারী।’ [সূরা নিসা : ৮৬]

‘...আর মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কৃপণ ঐ ব্যক্তি, যে সালামের ক্ষেত্রে কৃপণতা দেখায়।’ [আল-হাদীস (ইবনু হিব্বান, আস-সহীহা : ৬০১)]

বহুমুখী উপকার
সালাম শুধু কুশল বিনিময়ের মধ্যেই সীমিত নেই, শান্তির এই বাণীর রয়েছে বিবিধ ব্যবহার। রয়েছে বহুমুখী উপকার।

·মানসিক প্রশান্তি পেতে চান? সালাম দিন। অন্যের শান্তি কামনায় প্রকৃতির প্রতিদান হিসেবে বাড়বে নিজের শান্তি।

·জড়তা, সংকোচ, হীনম্মন্যতা দূর করতে চান? সালাম দিন। সালাম দানে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

·অহমমুক্ত হতে চান? সালাম দিন। সালাম স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটায়।

·বিনয়ী ও শিষ্টাচারী হতে চান? সালাম দিন। অন্যের প্রতি সম্মানবোধ বাড়বে। পরনিন্দা-পরচর্চা ও গীবত-প্রবণতা কমবে।

·নতুন কারো সাথে পরিচিত হতে যাচ্ছেন? পরিচিত বলয় বাড়াতে চাচ্ছেন? সবচেয়ে সহজ একটি পথ-সালাম।

·কর্মক্ষেত্রে সবার কাছে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে চান? সালাম চর্চা করুন। অধীনস্থদের সালাম দিন। কাজের প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও আন্তরিকতা বেড়ে যাবে।

·কারো সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে? সমঝোতার পথ তৈরি করতে চাচ্ছেন? হাসিমুখে সালাম দিয়ে নিজেই এগিয়ে যান। সম্পর্কে নতুন প্রাণ সৃষ্টি হবে।

·সালাম পূর্বশত্রুতা, ঈর্ষা, ঘৃণা ও ক্রোধ প্রশমিত করে। সবার সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি করে।

·যে-কোনো গুরুগম্ভীর পরিবেশকে সালাম সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত করে। কেউ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন? তাকে কয়েকবার সালাম দিন। কিছুটা হলেও শান্ত হতে শুরু করেন।

·ছোটদের সাথে আগে সালাম দেয়ার প্রতিযোগিতা করুন। এতে তারাও শিষ্টাচারী হয়ে উঠবে।

· চিকিৎসক হিসেবে রোগের বিবরণ শোনার আগে রোগীকে সালাম দেয়া চিকিৎসকের ওপর রোগীর আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ায়, যা তার নিরাময় প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

·পরিবারে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও শান্তি বাড়াতে চান? সালাম দিন। পরিবারে বরকত নিয়ে আসবে।

·সালাম একটি শক্তিশালী অটোসাজেশন। বার বার সালামের উচ্চারণ পুরো পরিবেশে শান্তির অনুরণন সৃষ্টি করে।

·আন্তরিক সালাম বিনিময় পারস্পরিক সম্পর্কে মমতা বৃদ্ধি করে। প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেয়ায় অন্যের হৃদয়ে স্থান পাবেন সহজে।

 

 টিআর/

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি