ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ১৭:১৬:১৭

রাজধানীতে ভাড়ায় মিলছে পাঠ্যবই

রাজধানীতে ভাড়ায় মিলছে পাঠ্যবই

বইয়ের মার্কেটের জন্য বিখ্যাত রাজধানীর নীলক্ষেত। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, ইতিহাস, পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি এখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ আন্তর্জাতিক মানের বই পাওয়া যায়। হাতের কাছে সুবিধামতো দামে বই পাওয়ায় রাজধানীর অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেতে ভিড় জমায়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ইডেন কলেজ ও ঢাকা কলেজ নীলক্ষেতের পাশে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের সুবিধামতো সময় বই কিনতে পারে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই মাকের্টের কয়েকটি দোকান থেকে পাঠ্যবই ভাড়া হিসেবে নেওয়া যায়। অনেকেই পরীক্ষার আগের দিন এসে চুক্তিভিত্তিক দামে ভাড়া করে বই সংগ্রহ করে। পরীক্ষা শেষ হলে কিছু টাকা যোগ করে আবার বই দিয়ে যায়। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাসও ভাড়ায় পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নীলক্ষেতের বই বিক্রেতা আরিফ হোসেন জানান, অনেক শিক্ষার্থী নতুন বইয়ের দাম বেশি হওয়ায় পুরানো বই কিনতে আসে। অনেকে আবার পরীক্ষার আগে এসে বই নিয়ে যায়। পরীক্ষা শেষ হল কিছু টাকা যোগ করে বই ফিরিয়ে দিয়ে যায় । পুরনো বই বিক্রেতা আহাসান আলী জানান, ১৯ বছর হইয়া গেছে পুরান বই বেচতাছি। আমরা সব ধরনের বই-ই বেচি। এখানে পাওয়া যাইবো না, এমন কোনো বই নাই। যেসব বই আর নতুন পাওয়া যাইবো না, সেগুলার পুরান সংস্করণও এখানে আছে। ছাত্ররা নিজেদের পছন্দমতো বই কিনে নিয়ে যায়। তবে আগের মতো আর ব্যবসা হয় না। একদিকে যেমন ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে পুরান বইয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমেছে। বই কিনতে আসা ইডেন কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সানজেদা আক্তার বলেন, ৮০ টাকা দিয়ে ইসলামী ইতিহাসের একটা বই নিয়েছি। আগামী সপ্তাহে পরীক্ষা আছে। পরীক্ষা শেষ করে আবার বই দিয়ে যাবো। দোকানদার ভাই ৬০ টাকা ফিরিয়ে দেবে। এছাড়া মাঝে মাঝে পুরানো বই এখান থেকে কিনে নিয়ে যাই। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আল ইমরান বলেন, ছাত্র রাজনীতি করার কারণে বই পড়ার তেমন সময় পাই না। পরীক্ষার সময় এলেই কেবল বই খোঁজ করি। বেশির ভাগ সময় নীলক্ষেত থেকে পুরানো বই নিয়ে যাই। পরীক্ষা শেষ করে তাদের কাছে আবার বিক্রি করে দেই। অনেক সময় চুক্তির মাধ্যমে এখান থেকে বই নিয়ে যাই। আসাদ নামের এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, নীলক্ষেতের বই ব্যবসায়ীদের কাছে আমারা এক প্রকার জিম্মি। আমরা তাদের কাছ থেকে নতুন বই ২০০ টাকা দিয়ে কিনি। একই বই যখন পরীক্ষার পর বিক্রি করতে যাই, তখন ৩০ থেকে ৪০ টাকার বেশি দিতে চায় না। কিন্তু একই বই পুরনো হিসেবে কিনতে গেলে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা গুণতে হয়। এটা এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী কে এম আবু ইউসুফ জানান, নীলক্ষেত থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের কিছু বন্ধু পরীক্ষার আগের রাতে বই ভাড়া করে নেয়। পরীক্ষার পর সেই বই দিয়ে আসে। এভাবে অনেকেই অনার্স শেষ করেছেন। আজিজ নামের এক অভিভাবক বলেন, আমার ছেলে ৭ম শ্রেণিতে পড়ে। তার জন্য গল্পের বই কিনতে এখানে এসেছি। মাঝে মাঝে সাধারণ জ্ঞানসহ বিভিন্ন ধরনের বই কিনতেও এখানে আসি। অন্য মার্কেটের চেয়ে এখানকার বইয়ের দাম কিছুটা কম।   ডিডি/টিকে
‘দুদক এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি’

২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায়। এ আইনের মাধ্যমে দেশের দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ, সমাজে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টির দায়িত্ব দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর বর্তায়। দুদক গঠিত হওয়ার পর প্রথম আড়াই বছর অনেকটা নিষ্ক্রিয় ছিল। মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রিতা, বিত্তশালী-ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সময়ক্ষেপনসহ নানা কারণে দুদককে নিয়ে অনাস্থা তৈরি হচ্ছিল জনমনে। তবে সময়ের পরিক্রমায় বাস্তবতা উপলব্ধি করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দুদক। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদক কর্মকর্তাদের কিছু সাহসী পদক্ষেপ মানুষের নজর কেড়েছে।মঙ্গলবার দুদক-এর ত্রয়োদশ বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটির পথচলা, সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং সামনের দিনগুলোতে পরিকল্পনা নিয়ে একুশে টিভি (ইটিভি) অনলাইনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিনের। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইটিভি অনলাইনের প্রতিবেদক আলী আদনান।

ব্লু -ইকোনমি ঘিরে নতুন আশা দেখছে বাংলাদেশ

ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্র সম্পদনির্ভর অর্থনীতি। সাগরের অজস্র জলরাশি ও এর তলদেশের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণে এক অর্থনৈতিক বিপ্লব। বিশাল সমুদ্র জয়ের পর এবার সে বিপ্লব বাস্তবায়নের রোডম্যাপে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সমুদ্র অর্থনীতি ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে দেশ। সাগরের সম্পদ আহরণে একদিকে নেওয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কর্মপন্থা। অন্যদিকে উপকূলীয় দেশগুলোর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে আগে থেকেই নেওয়া হয়েছে কার্যকরী পরিকল্পনা। এরইমধ্যে সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কার্যক্রম পরিচালনায় স্থায়ী একটি ব্লু-ইকোনমি সেল গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রে অনুসন্ধান চালাতে খুব শিগগিরই একটি জাহাজও কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গণপরিবহনে নারী হয়রানি বাড়ছে

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী মিষ্টি বড়ুয়া। পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করছেন। তাই রোজ তাকে পাবলিক বাসে চড়তে হচ্ছে। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্বীকার করেন, নিতান্ত বাধ্য হয়েই তারা বাসে উঠে যাতায়াত করেন। তার ভাষায়, যদিও এখন পুরুষ ও নারী যাত্রীর সংখ্যা সব জায়গায় সমান, তবুও মেয়েদের জন্য বাসে সিট থাকে গুটিকয়েক। তার ওপর সেই সিটগুলো সব সময় পুরুষের দখলে থাকে। অনেক সময় বাসের হেল্পার-চালক বলার পরও সেসব পুরুষ যাত্রীরা সিট ছাড়ে না। পুরুষ যাত্রীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে দাঁড়ানোর মতো পরিবেশ আমাদের দেশে এখনো সৃষ্টি হয়নি। কারণ অনেক পুরুষ যাত্রী ইচ্ছাকৃতভাবেই গায়ে পড়ে অশোভন আচরণ করার সুযোগ খুঁজে। কিছুদিন ধরে মেয়েদের জামার পিছন দিকে ব্লেড দিয়ে কেটে দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়টিও সম্প্রতি মিষ্টির মত অনেক তরুণীর ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ফৌজিয়া হাসনাত জানালেন, ভিড়ের মধ্যে বাসে ওঠতে বেগ পেতে হয়। কারণ একই দরজা দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠা কষ্টকর। ছাড়া এক্ষেত্রে কিছু পুরুষ যাত্রী পেশীর জোর দেখায়, নয়তো গায়ে হাত দিয়ে অশোভন আচরণ করে। তাছাড়া সাধারণত সিটে বসলে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ যাত্রী ইচ্ছা করেই মেয়েদের গা ঘেষে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করে। উপরের অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করেই নতুন সমস্যার কথা জানালেন স্কুল শিক্ষিকা নুসরাত হেনা। তিনি বলেন, বাসে ওঠার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা হেল্পার গায়ে হাত দিবেই। বিনা প্রয়োজনে পিঠে হাত দেওয়া হেল্পারদের বদ অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরো জানালেন, টেম্পুতে জায়গা সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে অনেক পুরুষ যাত্রী হাঁটুর সঙ্গে হাঁটু লাগিয়ে অশোভন আচরণ করে বা কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। হেনা, ফৌজিয়া বা মিষ্টিদের এসব অভিযোগ নতুন নয়। মানুষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী যাত্রীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু বাসে নারীদের জন্য সিট সংখ্যা বাড়ছে না। নারী যাত্রীর জন্য বিআরটিসি কিছুদিন আগেও আটটি বাস চালু রেখেছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত নারী যাত্রী নেই, তাই লস দিতে হচ্ছে- এমন অজুহাতে বাসগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ওই আটটি বাসও নারীদের জন্য রাজধানীতে অপর্যাপ্ত ছিল। রাজধানীর ৭৩টি মোড়ে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ভিড় থাকে। এ ভিড়ের মধ্যে নারী যাত্রীদের পোহাতে হয়- এসব সমস্যা। অপরাধী অপরিচিত হওয়ায়ও আমাদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের এসব ভোগান্তি মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না। শুধু পুরুষ যাত্রী নয়; বাসের চালক ও হেল্পারদের আচরণও নারীদের জন্য বিব্রতকর। এমনটাই মনে করেন, ফিমেল এডুকেশন ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান জিনাত রেহানা ইলোরা। তিনি বলেন, নারীদের অসম্মান বা বিব্রত করার সস্তা একটা ধরন হল, নারীদের উদ্দেশ্য করে বা তাদের সামনে অশ্লীল শব্দ, বাক্য ও অঙ্গভঙ্গি করা। এ বিষয়ে লোকাল বাসের ড্রাইভার ও হেল্পাররা বেশ পারদর্শী। তবে এ ব্যাপারে শিক্ষা ও সামাজিক-সচেতনতার বিকল্প নেই, এমনটাই বোঝা যায়, কবি ঋতুপর্ণা আজাদ অর্চির কথায়। তিনি বলেন, গণপরিবহনে বেশি সমস্যা তৈরি করে মধ্যবয়স্ক লোকজন। তারা গায়ে পড়ে বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন শুরু করে, যা কোনোভাবেই অপরিচিত লোকের কাছে কাম্য নয়। এখনকার শিক্ষিত সচেতেন তরুণরা এ ব্যাপারে বেশ ভদ্র। তবে শ্রমিকশ্রেণির লোকেরা গায়েপড়ে নোংরামী করে। এটাকে যৌন হয়রানি ছাড়া অন্য কোনোভাবেই অভিযুক্ত করা যায় না। প্রতিনিয়ত নারী যাত্রীরা এভাবে হয়রানির শিকার হলেও নীরব প্রশাসন। নেই বিকল্প কোনো উদ্যোগ। কেন? এ ব্যাপারে আইন কী বলে? হ্যা, আইন জানতেই যোগাযোগ করেছিলাম ব্যারিস্টার মিতি সানজানার সঙ্গে। তিনি বলেন, এ জাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে মানবিক সচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পেনালকোড, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আইন- এ ধরনের হয়রানিমূলক আচরণের জন্য শাস্তির বিধান রেখেছে। কিন্তু খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীকে যেভাবে চিহ্নিত করা যায়, গণপরিবহনে নারীকে হয়রানির ক্ষেত্রে সেভাবে শনাক্ত করা যায় না। পুরো ব্যাপারটিতে নারীদের ঝামেলা পোহাতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে নারী মুখ খোলার বা বিচার চাওয়ার ঝামেলায় যান না। এ ব্যাপারে মহামান্য হাইকোর্টে ২০০৮ সালের দিক নির্দেশনা আছে। যতক্ষণ কোনো আইন নেই, ততোক্ষণ এ দিক নির্দেশনা আইন হিসেবে গণ্য হবে। তবে সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। সামাজিকভাবে আমরা এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সক্ষম হবো, জনসচেতনতা গড়ে উঠবে- এটাই প্রত্যাশা।   /ডিডি/

আমৃত্যু মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই : দিদারুল আলম এমপি

পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্ম নিজের তরে নয়, মানুষের উপকারের জন্য। তারা মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান। এমন মানুষ আগে পাওয়া যেত ঢের। কিন্তু এখন এমন মানুষ দিন দিন কেন জানি কমে যাচ্ছে। মানুষ যার যার চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। তবে নানা রঙে-রূপে ও উপাদানে সাজানো বৈচিত্রময় এ সমাজে ব্যতিক্রম কিছু মানুষ আছে বলেই হয়তো সামাজিক কাঠামো টিকে আছে। পাঠক, আজ ব্যাতিক্রম এমন একজন মানুষের কথা তুলে ধরব, যিনি নিজে এবং তার পরিবার বংশ পরম্পরায় সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছেন। নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ-সম্পদ বিলাসিতায় ব্যয় না করে দু:খী-অসহায়-দরিদ্র মানুষের কল্যাণে অকাতরে ব্যয় করে আসছেন। চট্টগ্রামের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তার ও তাদের অবদান এককথায় অতুলনীয়। তিনি আলহাজ্ব দিদারুল আলম এমপি।

নারীর ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেন দোহারের আরিফা

কিছু মানুষ নিজের পাশাপাশি অন্যের জন্যও চিন্তা করে থাকেন। এজন্য হয়ে উঠেন উদ্যোক্তা। স্বপ্ন দেখেন এবং অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতে পছন্দ করেন। তেমনি একজন হলেন দোহারের শতাধিক বেকার নারীর কর্মসংস্থান করে দেওয়া আরিফা আক্তার বেপারী। তিনি স্বপ্ন দেখেন তার এলাকায় বেকার থাকবে না। সবাই কাজ করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাবেন। এলাকায় তিনি কারো কাছে আরিফা আপা আবার কারো কাছে আরিফা ভাবি হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। ব্যক্তিগত জীবনে তার দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সংসার। বড় ছেলে রিজুয়ান বেপারী উপজেলার মইতপাড়ায় ড্যাফোডিলস্ হাই স্কুলের ৭ম শ্রেণির ও ছোট ছেলে রায়য়ান বেপারী সাতভিটা ফাস্টগ্লোরি স্কুলে ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্বামী রজ্জব আলী বেপরী প্রবাসী। সব মিলে আরিফা আক্তার বেপারীর পরিবার সুখী পরিবার হিসেবে পরিচিত।  তবে সুখী এ জীবনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের এক ইতিহাস। এই সংগ্রামের কাহিনী জানতে শনিবার একুশে টেলিভিশন অনলাইনের এ প্রতিবেদক গিয়েছিল আরিফা আক্তার বেপারীর বাড়িতে। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই নিজে কিছু করার জন্য এগিয়ে চলেছেন। কখনো পেরেছেন আবার কখনো পারেননি। তাতে কখনো দুঃখ হয়নি। চেষ্টা করেছি অনবরত। একসময়ে তার ভাবনার আকাশে দোলা দিতে থাকে কীভাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রসার ও সম্প্রসাণের মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত নারীসমাজ গঠন করা যায়। আর এ ইচ্ছাকে মনে প্রাণে ধারন করে বিরামহীনভাবে তার মেধাশক্তিকে কাজে লাগাতে থাকেন। এরমধ্যে পরিবারের সম্মতিতে আরিফা আক্তারের স্বপ্নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বিয়ে। কিন্তু তীল তীল করে গড়ে ওঠা আরিফার লালিত স্বপ্নের মৃত্যুঘটেনি বিয়ের কারণে। উল্টো বিয়ের পরেই তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এক ধাপ এগিয়ে আসে। শুরু হয় আরিফার নতুন করে পথচলা। আর এ কাজে অনুপ্রেরণা ও সহায়তা  দিয়েছেন তার স্বামী রজ্জব আলী বেপারী। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) থেকে পাটের বহুমুখী ব্যবহারের উপর কসটিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, হায়ার স্কিল ডেভেলপমেন্ট, কোয়ালিটি ইনপ্রুপমেন্ট, ডাইং, প্রিন্টিংও ফিনিমিয়ের ওপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নতুন করে উদ্যোগী হন তিনি। সেখান থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। নিজ বাড়িতে সাতটা সেলাইমেশিন দিয়ে প্রথমে নারীদেরকে হাতে কলমে কাজ শেখান আরিফা আক্তার। এক সময়ে তা ব্যাপক আকার ধারন করে। তার হাতে অন্তত শতাধিক নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে সমাজে মাথা উচু করে বাঁচার চেষ্টা করছেন। তাদের একজন নারিশা এলাকার ফরিদা ইয়াসমিন। গত তিন বছর যাবৎ শিখছেন এ কাজ। এখন তিনি থ্রি-পিচ সেলাই, ব্লক, বাটিকের কাজ করেন। তাতে মাসে বেশ টাকা পান ঘরে কাজ করে। এতো গেল ফরিদার কথা। আরিফার কাছ থেকে থ্রি-পিচ, ব্লক বাটিক, ফ্লোর ম্যাট ও চুমকির কাজ শিখে দোহারের চরাঞ্চল নারিশা জোয়ার এলাকার রাসেদা এখন বাড়িতে বসে কাজ করে মাসে অন্তত ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করেন। এছাড়া নারিশা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা আক্তার, সাদিয়া আক্তারসহ আরও অনেক নারী আরিফার বাতিঘরে এসে নিজের বাতিঘর তৈরি করছেন। তবে আরিফা আক্তার বেপারী একুশে টেলিভিশনের অনলাইনের এ প্রতিবেদককে আরও জানান, আমার স্বামী ব্যতীত আমার এ কাজের পিছনে যেই মানুষগুলোর সব চাইতে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি তারা হলেন- সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমুল হক পাভেল, নুরুল করিম ভূঁইয়া, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম আরা নিপা ও বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম আল-আমীন, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন ও সাবেক মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রহিমা বেগম। তিনি বলেন, তাদের অনুপ্রেরণা ও সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া কখনো আমি এতদূর আসতে পারতাম না। বর্তমান ইউএনও কেএম আল-আমীন স্যার আমার এ কাজটাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে আমাদের এই কর্মমুখী নারীদের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করেছেন। যাতে করে আমরা দোহারের প্রাণকেন্দ্র জয়পাড়ায় বসে আমাদের এ শিল্পটাকে এগিয়ে নিতে পারি। চলতি সপ্তাহে জেএসসি পরীক্ষা শেষ হলে উপজেলা জয়পাড়া মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় চালু হতে যাচ্ছে নারীদের কর্মমুখী শিক্ষার কার্যক্রম। যেখানে নারীরা শিখবে ও তৈরি করবে, থ্রি-পিচ, ব্লকবাটিক এর কাজ, পুথি দিয়ে বিভিন্ন হস্তশিল্প, যেমন পার্স ব্যাগ, ফুলদানি ও ঘর সাজানোর জন্য দৃষ্টিনন্দন শো-পিচসহ আরও কত কি। এছাড়া পাট দিয়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানা ধরনের ব্যাগ, ফ্লোর ম্যাড, জায়নামাজের পাটিসহ আরও অনেক কিছু। পাটের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সহজেই বাজারজাত করা যায়, সে লক্ষে তিনি প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি একুশে টেলিভিশনের অনলাইনের এই প্রতিবেদককে আরও বলেন, আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। আমার স্বপ্ন ছিল আমি সমাজের অবহেলিত নারীদের জন্য কাজ করবো। সেই স্বপ্ন আমার অনেকটা পূরণ হয়েছে। বাকি জীবনটাও নারীদের জন্য কাজ করতে চাই। এদিকে আরিফার মেধা ও প্রতিভামূল্যায়ন ঝুলিতে ইতোমধ্যেই আছে ২০১৩ সালে দোহার উপজেলা সেরা জয়িতা পুরস্কার, ২০১৪ সালে ঢাকা জেলা সেরা জয়িতা এবং ২০১৬ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তিনি একাধারে উপজেলা, জেলা ও ঢাকা বিভাগীয়ভাবে সেরা জয়িতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। একাধারে তিনি দোহার উপজেলা মহিলা অধিদপ্তর পরিচালিত উপজেলা মহিলা উন্নয়ন সংস্থার সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।  আরিফার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৩০ জন নারী কাজ করেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র শিল্পের মাধ্যমে আমাদের নারীরা ঘরে বসেই কাজ করে স্বাবলম্বী হতে পারেন। কেবল প্রয়োজন ইচ্ছা শক্তি। এজন্য সরকারের কাছে তার আবেদন নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সরকারিভাবে সহায়তা করা। যাতে এ শিল্প দক্ষ শিল্পে পরিণত হবে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম আল আমীন বলেন, আরিফা আক্তার বেপারীর কথা আমি শুনেছি। তার সুদক্ষ নেত্রীত্বে একঝাক নারী তার বাড়িতে হাতে কলমে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। আমি তার ওখানে সরেজমিনে গিয়েছিলাম। তিনি বলেন, ইতমধ্যে আমি এই শিল্পটাকে এগিয়ে নিতে জয়পাড়া মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে নিজ দায়িত্বে একটি দোকান নিয়ে দিয়েছি। যাতে করে তিনি তার স্বপ্নটাকে আরও এগিয়ে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যা যা করার প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাব। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন বলেন, নারীর ক্ষমতায়নে আরিফা আক্তার দোহার উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া সে উপজেলার আটটি বাল্যবিবাহ বন্ধে তার সাহসী ভূমিকা প্রশাসনে অত্যন্ত প্রসংশিত হয়েছে। এজন্য আমাদের দোহার উপজেলা মহিলা অধিদপ্তর তাকে সব সময় সার্বিক সহযোগিতা করে আসছি। এমএ/এসএইচ/ডব্লিউএন

খান কিচেন : সাধ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ফেরিওয়ালা

‘‘আমার স্বামী চাকরিজীবী। আমিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। সকাল হলেই দু’জনের তাড়া থাকে অফিসের। ইচ্ছা হয় সকালে একটু স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তৈরি করি নিজেদের জন্য। কিন্তু অফিস সময় মেনে চলার জন্য তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই হাতের কাছের কোনো রেষ্টুরেন্টে পরাটা কিংবা রুটি দিয়েই সকালের নাস্তাটা সারি। দুপুরেও বাইরের খাবার খেতে হয়। জানি বাহিরের খাবার স্বাস্থসম্মত নয়, তারপরও কোনো উপায় নেই।’’— কথাগুলো বলছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী নুপুর আক্তার (ছদ্ম নাম)। আশ্চর্য হলেও সত্য নুপুর আক্তারের এ কথাগুলো দারুণ এক ধারণা এনে দেয় আফরোজা খান-এর মাথায়। যে ধারণা থেকে আফরোজা খান এখন ‘খান কিচেন’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। প্রতিদিন যেখানে রান্না হচ্ছে লাখো মানুষের খাবার। যেখানে কর্মসংস্থান হচ্ছে চার হাজার মানুষের। রাজধানীর নতুন বাজারের পূর্ব পাশে বেরাইদ এলাকায় ১৫ বিঘা জমির উপর নিজ উদ্যোগে রান্নাঘরটি প্রতিষ্ঠা করছেন তিনি। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় রান্নাঘর বলে দাবি করেন তিনি।

প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়

পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পথশিশু আর ছিন্নমূল মানুষ রাস্তা বা উদ্যান থেকে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করছেন— দেশের সর্বত্র এমন চিত্র কমবেশি সবার চোখে পড়ে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক অঞ্চলে কিছু মানুষের পেশায় পরিণত হয়েছে প্লাস্টিকের বর্জ্য সংগ্রহ। আর ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি অকেদূর এগিয়েছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য থেকে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশে প্রায় ১৫০টি কারখানা গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে হাজার হাজার মানুষের। গত বছর বর্জ্য প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানি করে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশ। নতুন করে অনেক দেশ প্লাস্টিকের বর্জ্য আমদানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রপ্তানিকারক সংগঠন বাংলাদেশ পেট ফ্লেকস ম্যানুফ্যাকচারাস এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএফএমইএ) মতে, সরকারি সরকারি সহযোগিতা পেলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে এ খাত।

এনআইডি সংশোধনে ভোগান্তির শেষ নেই

শাহ মো. মর্তুজ আলী। বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে। জরুরিভিত্তিতে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি)বয়স সংশোধন করা দরকার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংশোধনের জন্য আবেদন করেন। নিয়মানুযায়ী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন এনআইডি পেয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এরইমধ্যে ১ বছর ১১ মাস কেটে গেছে। প্রতিনিয়ত হবিগঞ্জ জেলা নির্বাচন কমিশন শাখায় কর্মকর্তাদের টেবিলে টেবিলে ঘুরে কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না মর্তুজ আলী। অবশেষে ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনে ইসির এনআইডি শাখায় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এতেও কোনো লাভ হয়নি। শুধু মর্তুজ নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ প্রতিনিয়ত এভাবেই এসে এনআইডি কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। সেবা প্রদানের কথা বলে এনআইডি দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হলেও এখন রীতিমত তা দুর্ভোগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর অলিগলিতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ইলিশ

ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। দেশের অন্যান্য স্থানের মত রাজধানীর কারওয়ান বাজার বা যাত্রাবাড়ির আড়তে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে দামও কিছুটা সহনশীল। পাশাপাশি ইলিশের প্রভাবেই বাজারে অন্য সব মাছের দামও কমছে। একদিকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে অন্যদিকে দামেও সাশ্রয়, এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই ‘খুশি’। কিন্তু বাজারে এখন ইলিশের পরিমাণ বেশি হলেও রাজধানীর অলিগলিতে ইলিশ পরিচয়ে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ‘চন্দনা’, ‘সার্ডিন’ ও ‘চৌক্কা’। এসব মাছের সাইজ অনুযায়ী রয়েছে দামেরও ভিন্নতা রয়েছে। এগুলো আসল ইলিশ ভেবে কিনে প্রতিদিনই প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা। পাশাপাশি তারা আসল ইলিশের স্বাদ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণত সবার কাছেই আকর্ষণীয় পদ্মার ইলিশ। সরেজমিনে জানা গেছে, রোজ সন্ধ্যার পরই রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলিতে কিছু ব্যবসায়ী ‘চন্দনা’, ‘সার্ডিন’ ও ‘চৌক্কা’ মাছ ইলিশ বলে বিক্রি করছেন। এসব মাছ স্বাদে-গন্ধে ইলিশের ধারের কাছেও নেই। কিন্তু ক্রেতাদের কেউ না চিনে কেউ বা কম দামে পেয়ে এগুলো লুফে নিচ্ছেন। এভাবে সাগরের কিংবা নদীর ইলিশ বলে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, ক্রেতার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় পদ্মার ইলিশ। নদীর ইলিশের স্বাদ সাগরের ইলিশের তুলনায় বেশি। তাই এই ইলিশই বেশি পছন্দ সবার। এদিকে জাটকা ছাড়াও ইলিশের মতো দেখতে চন্দনা, চাপিলা, সার্ডিন ও চৌক্কা পাওয়া যায় বাজারে। ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত ছোট ইলিশকে সরকার জাটকা ঘোষণা করেছে। সার্ডিনকে টাকিয়া আর চৌক্কাকে চৌক্কা ফ্যাঁইসা বা চটপটিও বলা হয়। একটি পরিপূর্ণ ইলিশ লম্বায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। স্বাদে এসব মাছ ইলিশের ধারেকাছেও নেই। ক্রেতারা বলছেন, ভরা মৌসুম হওয়ায় স্বস্তায় ইলিশ পাচ্ছেন। তাই কিনেও নিচ্ছেন। কিন্তু এগুলো প্রকৃত ইলিশ নয়, সেটি অনেকের অজানাই রয়ে গেছে। অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফার লোভে জেনেবুঝেই এসব মাছ বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন। বাজার সয়লাভ হয়ে পড়ছে ভেজাল ইলিশে। ইলিশ বলে যা বিক্রি হচ্ছে সার্ডিন: সার্ডিন মাছ অনেকটা জাটকার মতো দেখতে। এগুলো আকারে ছোট হয়, চোখের আকার বড়। এটির মাথা বড় এবং সামনের অংশ ভোঁতা থাকে। বাজারে জাটকা বা ছোট ইলিশ হিসাবে এগুলো বিক্রি হচ্ছে। সার্ডিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাভেদে ২ হালির দাম ৫০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিটির ওজন সাড়ে তিনশ’ থেকে চারশ’ গ্রাম। মাছগুলো জাটকার মতো দেখতে হলেও স্বাদে-গন্ধে ইলিশের ধারের কাছেও নেই। বিক্রেতারা বলছেন, ডিম ছাড়ার কারণে মাছগুলো চিকন হয়ে গেছে। চৌক্কা: চৌক্কা মাছিটি বেশ লম্বা আকারের হয়। লম্বায় এরা ইলিশের সমান। চৌক্কার মাথা লম্বাটে ও সুচালো আর চোখের আকার বড়। তবে ইলিশের চেয়ে কম চওড়ার আর পাতলা হয় মাছগুলো। রাজধানীর বেশির ভাগ বাজারেই এটি পাওয়া যায়। সাধারণ ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হন এই মাছটি কিনে। ফেরি করে বিক্রির পাশাপাশি এটি অভিজাত বাজারেরও পাওয়া যায়। এটি বিক্রি হয় হালি হিসাবে আবার কেজি হিসাবেও। প্রতি কেজি ইলিশের দাম হাঁকা হয় ৫০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। আর হালি হিসাবে ‘প্রতি হালি’ বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। সাধারণত বিক্রেতারা থালা নিয়ে বাসাবাড়ির সামনে ফেরি করে এসব বিক্রি করছেন। চন্দনা: রাজধানীর বাজারে এ মাছটি না পাওয়া গেলেও সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন অলি-গলি কিংবা রাস্তার পাশে বসে ফেরিওয়ালারা বিক্রি করে। এ মাছটিরও চোখ বড় আকারের হয়। মাছটি আকারে প্রায় ইলিশের সমান হলেও ওজনে হালকা আর পেটের দিকটা চ্যাপ্টা আকারের হয়। এটি হালি হিসাবে বিক্রি হয়। এ মাছটি প্রতি হালি বিক্রি হয় ৫০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এ মাছগুলো বেশির ভাগই রাজধানীর যাত্রাবাড়ি বাজার থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে চোক্কা মাছ বিক্রেতা আমজাদ হোসেন বলেন, এগুলোও ইলিশ মাছ। তবে ডিম ছেড়ে দেওয়ায় মাছগুলোর আকারের পরিবর্তন হয়, পাতলা হয়ে যায়। কিভাবে কম দামে ইলিশ (চৌক্কা)বিক্রি করছেন জানতে চাইলে বলেন, না এগুলো বাজারে বেশি আসলে আমরা কম দামে পাই। ওই সময় বেশি করে কিনে রাখি পরে ধীরে ধীরে তা বিক্রি করি। ইদ্রিস আলী নামের অপর মাছ বিক্রেতার দাবি, মাছগুলো সাগরের ইলিশ। সাগরে বেশি মাছ পাওয়া যায় তাই দামও কম থাকে। আমরা বিকালের দিকে যাত্রাবাড়ি থেকে কিনে সন্ধায় ফেরি করে বিক্রি করি। দাম কম হওয়ায় এগুলো চাহিদাও বেশি থাকে। কিছুক্ষণ জেরার পর অবশেষে এ প্রতিবেদকের কাছে সত্য স্বীকার করেন ইদ্রিস। বলেন, এগুলো আসলে ইলিশ মাছ না, তবে ইলিশ মাছের মতো। কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা আহম্মেদ হোসেন ইটিভি অনলাইনকে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এসব মাছ বিক্রি হয় এটা আমিও দেখেছি। তবে এ মাছগুলো কারওয়ান বাজারে আসলে বিক্রি হবে না। আসল ইলিশের পিট মোটা আকারের হয়, ওজন ভাল থাকে, দামও বেশি। আর সার্ডিন বা চৌক্কা ইলিশ মাছ না। তবে সাধারণ ক্রেতারা এটা চিনতে পারেন না অনেক সময়, এ জন্য প্রতারিত হয়। তবে চন্দনা, সার্ডিন ও চৌক্কার গন্ধ ইলিশের মতো নয়। তিনি বলেন, এ মাছগুলো সব চেয়ে বেশি বাজারে আসে ১ বৈশাখকে সামনে রেখে। এদিকে আজ বুধবার কারওয়ান বাজারের পাইকারি মাছ বাজারে প্রতি ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশের হালি ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা। ৮০০ গ্রামের ওপরে হলে প্রতি হালির দাম পড়বে ২৪০০ টাকা। আর ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, ৪০০ গ্রামের ইলিশের কেজি ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শফিফুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, নদীতে ইলিশ বেশি ধরা পরায় বাজারে সরবারহ ভালো। আর এটি আমার পছন্দের মাছ। এসব ইলিশের দামও কম হলেও বড় ইলিশের দাম কমেনি। এদিকে বুধবার অন্যান্য মাছের মধ্যে প্রতি কেজি রুই ও কাতলা ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, পাঙ্গাস ১২০ থেকে ২০০ টাকা, টেংরা ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, সরপুঁটি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা, তেলাপিয়া ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, সিলভার কার্প ১২০ থেকে ২৫০ টাকা, চাষের কৈ ১৬০ থেকে ২২০ টাকা, মাগুর ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। উল্লেখ্য, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে প্রধান প্রজনন মৌসুম হিসেবে গত ১ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত (২২ দিন) ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। / আর / এআর

বাউল গান দিয়ে তরুণদের বদলে দিতে চান মোশাররফ

‘যে ভাবনায় জীবন কেটেছে বাবার। আমারও কাটছে সে ভাবনায়। ছেলেটা? সেও তো একই ভাবনায়। অহর্নিশ কাদি (কান্না) এ ভাবনায়, কেমনে চিনাবো বাউল গান। কেমনে বদলাব তরুণদের মানসিকতা। কীভাবে বুঝাবো তাদেরকে (তরুণ) এ গান শিকড়ের গান। জীবনের গান। মাটি ও মানুষের গান।’ কথাগুলো এক নাগারে বলে যাচ্ছিলেন বাউল শিল্পী মোশাররফ হোসেন। রাজধানীর রামপুরা সংলগ্ন হাতিরঝিলের আলো ঝিলমিলে পরিবেশে প্রায় রাতেই গানের আসর বসান বাউল শিল্পী মোশাররফ ও তার দল ‘বন্ধু বাউল’। না, আর্থিক স্বার্থসিদ্ধি কিংবা খ্যাতির তাড়না থেকে নয়। স্রেফ মনের টানে। ইট কাঠের যান্ত্রিক এ শহরের ব্যস্ত মানুষগুলোকে একটু বিনোদন দিতে, লোকজ সংস্কৃতি মনে করিয়ে দিতে দীর্ঘদিন ধরে তার এ সাধনা। তিনি চান নতুন প্রজন্ম বাউল গান ভুলে না যাক। মাটির এ গান তাদের এক সুঁতোয় বেঁধে রাখুক। নরম এ সুরের মর্ম হৃদয়ে গেথে মাদকসহ নানা অন্যায় ছেড়ে ঠিকপথে চলুক আজ ও আগামীর তরুণরা। মাদক, সন্ত্রাসসহ সব অপরাধ ও অপসংস্কৃতির প্রতিবাদ আসুক বাউলের সুরে সুরে। শুক্রবার রাত ১১টায় বাসায় ফেরার পথে দেখা মেলে এ ‘নগরবাউলের’। চারদিকে গাড়ির হর্ণ আর শব্দদূষণের ভিড়ে হঠাৎ কানে বেজে উঠে মাটির সুর। একটু এগিয়ে যেতেই দেখা গেল মানুষের জটলা। গানের সুর শুনে পাশ দিয়ে যাওয়া পথিকরা থমকে দাঁড়াচ্ছেন। কেউবা দূর থেকে গুটিগুটি পায়ে আসরের দিকে এগিয়ে আসছেন। কেউ বা মোটরবাইক ও প্রাইভেট কার থামিয়ে আসর ঘিরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। রাত বেশি হওয়ায় হাতিরঝিল ঘিরে চা বিক্রেতাসহ অন্য হকাররাও তাদের ব্যবসা ছেড়ে যোগ দিচ্ছেন আসরে। আসরে হাতির ঝিলের লাল, নীল, সবুজ আর হলুদ বাতির আলো এসে চুইয়ে পড়ছে। হাতির ঝিলে বাতির আলো-আধারের খেলা গানের আসরকে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। যা সত্যিই শ্রোতাদের নিয়ে যাচ্ছে সুর আর ভাবনার অন্য এক জগতে। বাউল শিল্পীর সুরের লহরীতে রাত যে গভীর হচ্ছে সেদিকে যেন কারো খেয়ালই নেই। কেউ অপলক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকছে আসরের দিকে। কেউ কান পেতে গান শুনছে। কেউ গানে সুর মিলাচ্ছে। আবার কেউ গায়কদের সঙ্গে ঠোট মেলানোসহ নৃত্যও করছে। একটি গান শেষ না হতেই দর্শকরা বলে উঠছে, ভাই আরও একটা গান হোক। এভাবেই চলছে গানের পর গান। ফাঁকে ফাঁকে চলছে চা ও পানসহ হালকা কিছু খাওয়ার বিরতি। আসরের পাশে দাঁড়াতে প্রথমে শুনতে পেলাম মোশাররফ বাউল গানের সুরে আপন ভঙ্গিমায় মনের সুখে গেয়ে চলেছেন- ‘আমাকে পাগল বলো না- আমি নই পাগল জামানায়; কাঙ্গাল হয়েছি ভবের, এই দুনিয়ায়- আমি কাঙ্গাল হয়েছি ভবের, এই দুনিয়ায়। তোমাকে খুঁজে বেড়াই মসজিদ মন্দির, মাঝারে- আসল খুঁজলে নকল মিলে ভবের, এই বাজারে; পাগল মনে খুঁজি যে তাই- কোথায় গেলে তোমাকে-ই পাই আল্লাহ বিনে মাবুদ কেহ নাই- আমি নই পাগল, জামানায়।  পিতা আদম গন্ধম খাইলো ভুলে পড়িয়া- সেই ভুলের মাশুল দিতে আইলো দুনিয়া মা হাওয়া আইলো ভবে- মানবের-ই কল্যাণে; সেই মানবের-ই জন্ম হলো অনুশোচনায়। গানটি শেষ না হতেই চা ও সিগারেট বিক্রেতা হাশেম বলে উঠলেন, মামারা আমি বহুত নাচ্ছি (নেচেছি)। আমার চা বিক্রি কম অইছে। আমনেরা কিন্তু হোশায় দিয়েন। আমারেও কিছু বকশিশ দিয়েন। বয়স পশ্চাশোর্ধ এ বিক্রেতা এ প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে বললেন, সাম্বাদিক (সাংবাদিক) ছ্যার-আমারে ভিডিওতে নিছেন তো? আমি কিন্তু বহুত জমাইছি। চা বিক্রি বন্ধ কইচ্ছি। টিভিতে দ্যাহায়েন আমারে। আমনেরে এক কাপ চা দেব ছ্যার? চা না দেওয়ার কথা বলতে না বলতে-ই বয়স্ক লোকটি আবারও বললেন, ‘খান খান ছ্যার, আজ মরলে কাল দু’দিন। আমরাও তো মানুষ-আমাগো তা খাইবেন না ক্যান? আরে হুনেন (শুনেন) হেয় (যেই) গান হুনছি। হে গানে পাপ নাই। হেয় গান হুনলে আল্লাহ এর কথা মনে পরে। এতো কষ্টের মাঝেও মনডা বালা থাহে। পরানডা জুরাই আহ।’ হাশেমের কথার ফাঁকে আবারও শুরু হয়ে গেল মোশাররফের গানের আসর। এবার মোশাররফ নতুন আর একটি গান গাইছেন- ভালোবাসার ময়না পাখি, কেথায় গেলে পাই?- পিঞ্জর ভাইঙ্গা চইলা গ্যাছে, কাহারে জানায়? এতো আপন করে পোষলাম তোরে, পিঞ্জিরার ভিতর- ফাক পাইয়া চইলা গেলি, ভাঙ্গিয়া অন্তর। গানটি শেষ করে-ই আসরের মূল উদ্যোক্তা মোশাররফ ডেকে বলেন, ভাই শোনেন-এটা বাউল সঙ্গীত। মাটি ও মানুষের গান। যে গানের সুরে বেজে ওঠে গ্রাম বাংলা আর খেটে খাওয়া মানুষের কথা। আগের দিনগুলোতে এ গান ছিল মানুষের প্রাণের সুর। একসময় তরুণ-যুব সমাজের বিনোদনের মাধ্যমই ছিল বাউল গান। এই ‍সুর এক সুঁতোয় বাধত তরুণ থেকে বয়স্ক সব বয়সীদের। সমাজের নানা অনাচার ও অসঙ্গতির প্রতিবাদের ভাষা ছিল বাউল গান। কিন্তু এখন সে কদর যেন দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। যা আমাকে খুব ব্যথিত করে। ‘‘ভাবনায় বারবার ঘুরপাক খায়- নতুন প্রজন্ম কি শিকড়ের এ গান শুনছে? অসংখ্য সুর আর গানের ভিড়ে নতুনরা হয়তো জানেই না, বাউল গানের সাধ ও মাধুর্যতা। তরুণরা যদি এভাবে বাউলকে না চিনে, বাউল গানকে না জানে, একদিন এ গান হারিয়ে যাবে। মুছে যাবে এ গানের অতীত।’’ তাই আমি মনের ব্যাথা ঘুচাতে ও তরুণদের মধ্যে এ গান বাঁচিয়ে রাখতে হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন ফুটপাতের খোলা জায়গায় গানের আসর বসাই। আমার ‘বন্ধু বাউল’ এর ৭ সদস্যকে নিয়ে আসরে বসি। তরুণ প্রজন্মকে বাউলগানে বেঁধে রাখা যায় এমন কথামালায় গান লিখি। নিজেই সেটার সুর দিই। দলের সবাইকে নিয়ে সেটি গাই। আমার লেখা ও সুর করা পঞ্চাশের বেশি গান আছে। হাতিরঝিলের এ ব্রিজের আশপাশে জায়গাতে প্রতি শুক্রবার আসর বসাই। বিকালের দিকে অনেক তরুণ-তরুণী দাঁড়িয়ে আমাদের এ গান শুনে। ঠোট মিলায়। এমনকি অনেকেই ভিডিও করে। যা আমার খুব ভালো লাগে। তখন একটু হলেও নিজেকে স্বার্থক বলে মনে হয়। মোশাররফ জানান, ঢাকার নবাবগঞ্জ জেলার কলাকোপা গ্রামে তার বাড়ি। বাবা আবদুল জলিল চৌধুরীও ছিলেন একজন বাউল শিল্পী। বাবার গুরু ছিলেন সিদ্দিক পাগলা। তিনি গুরুর কাছ থেকে গানসহ সাধক জীবনের বিভিন্ন তালিম নিয়েছিলেন। বাবা গ্রামে গ্রামে ঘুরে গানের আসরে বাউল গান গাইতেন। বাবার কণ্ঠে শুনেই বাউল গানের প্রতি ভক্তি আসে মোশাররফের। তাই বাবা-ই মোশাররফের গানের গুরু। মোশাররফ শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তার বাবা ১৯৯৪ সালে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন। উনি জীবতাবস্থায় আমাদের বাড়িতে প্রতি বছর উরস হতো। সেখানেও গানের আসর বসতো। কী-যে ভালো লাগতো ওই সময়ে, আমার পিতার গলায় গান শুনতে; বলে বোঝানো যাবে না। আমার পিতা সৌদি ও জাপানে ১০ বছর চাকরি করে এসেছেন। দেশে ফিরে এ গানই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। আমার পিতার একটা হারমোনিয়াম ছিল। আমাদের সংসারে যখন কোন সমস্যা হতো। তখন তিনি ওই হারমোনিয়াম নিয়ে গান ধরতেন। সুর ছাড়লে মনে হতো আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। যার মনে কোনো কষ্ট নেই, অসুখ নেই। নির্বাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আমার সঙ্গে আমার মা ও তাকিয়ে থাকতেন বাবার দিকে। গান শেষে বাবা বলতেন, বাবা এ জীবন নশ্বর। সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। কী হবে মিছামিছি দুনিয়ার চিন্তা করে। তার চেয়ে মালিককে স্মরণ করো। উনি সব মুশকিলে আহসান করে দিবেন। আমি বলতাম আব্বা মালিক কে? বাপ উত্তর দিতেন মালিক হলো তোমার আমার জীবন দাতা। এ দুনিয়াই আইছো ফসল ফলাইবার লাইগা। ফসল ফলাইবার পারলেই তোমার জীবন স্বার্থক। মানুষকে জানাতে হবে- তুমি মাটির তৈরি, দাঁড়িয়ে আছো সেই মাটিতেই, যতদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে- ততোদিনই তোমার দুনিয়াবী জীবন। দম যখনই ফুরাবে আর দাঁড়াতে পারবে না। তখন ওই মাটিতেই আবার মিশে যেতে হবে। তাই সময় থাকতে অহঙ্কার, হিংসা, বিদ্যেষ ভুলে মানুষকে মানুষ ভাবো। মনে রাখবে মানুষ খোদা নয়, কিন্তু মানুষ-ই খোদা। অর্থাৎ মানুষকে কদর করলেই তার মাঝে তুমি তোমার প্রভু নিরঞ্জনকে খুঁজে পাবে। কথাগুলো বলতে বলতে অনেকটা হাপিয়ে উঠলেন মোশাররফ। চোখের দুকোনে জ্বল ছলছল করছে। বুঝতে না দিয়ে সেটা খুব দ্রুতই মুছে ফেলার চেষ্টা করলেন মোশাররফ। রাজধানীতে রাস্তায় রাস্তায় গান করে সমাজকে কি বার্তা দিতে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ বলেন, আমার বয়স ৪৩ চলছে। বাবার সেই সাধনা আজও আমি করে যাচ্ছি। তবে গ্রামে নয়, রাজধানীর এ মনোমুগ্ধকর পরিবেশের হাতিরঝিলে। আমার বড় ছেলে সাব্বির এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ে। ছেলেও তার দাদুর পথে হাটছে। ওর দাদুর হারমনিয়ামটা নিয়ে গান গায়। নবাবগঞ্জ কলেজের পাশে ললিতকলা একাডেমিতে ছেলে নিয়মিত গান চর্চা করে। এরইমধ্যে সে উপজেলা স্কুল পর্যায়ে গান প্রতিযোগীতার ২টি বিভাগে প্রথম হয়েছে। আর একটিতে দ্বিতীয় হয়েছে। আমি মনে করি আমার বাবা গান গেয়ে সাধনা করেছেন। কিন্তু সেভাবে পরিচিতি পাননি। ‘‘আমিও গান গেয়ে যাচ্ছি ছোট বেলা থেকে। প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছি, মানুষের মাঝে এ গান তুলে ধরতে। হয়তো বা সেভাবে এখনও কোনো পরিচিতি পাই নি। কিন্তু আমার ছেলে অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্ম যেন এ গানেই প্রতিষ্ঠা পায়, আমি সেটাই চাই। আমার বাসনা বাউল গানে-ই সমাজের সব অসঙ্গতি উঠে আসুক। প্রতিবাদের ভাষা হোক বাউল সঙ্গীত। মাদক ছেড়ে তরুণদের পথচলার দিশা হোক বাউল সঙ্গীত।’’   সংসারের খরচ কীভাবে আসে-জানতে চাইলে মোশাররফ বলেন, আমি ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে দুবাই ছিলাম। এ সময় কিছু অর্থ উপার্জন করেছি। এছাড়া আমার স্ত্রী নাসরিন কোলাকোপা শিশুপার্ক কাউন্টারে চাকরি করেন। আর আমার বড় ভাই কাইয়ুম চৌধুরী। যিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। উনি মাঝেমধ্যে কিছু টাকা পাঠান, যা দিয়ে দিন কেটে যায়। মোশাররফ জানান, রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। গানের জন্য তার বাসায় আছে ২টি বায়না, ২টি হারমনিয়াম, ৩টি গিটার, ১ জোড়া খনজুরি, ১টি চোটি, ১টি দোতারা ও কয়েকটি আড়বাঁশিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। ‘বন্ধু বাউল’ নামে তার গানের দলের সদস্যরাই চাঁদা তুলে এ যন্ত্রগুলি কিনেছেন। তিনি জানান, তার গানের দলে রনি, সুমন, নাসিমা, খোকনসহ সব সদস্যই তরুণ। তরুণদের নিয়ে এ দল গঠন করার উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হলো- তারুণ্য দিয়ে-ই তরুণ-তরুণীদের মনে বাউল গানের জায়গা করে নেওয়া। মাটি, মানুষ, সৃষ্টি আর স্রষ্টার কথা তুলে ধরা। মোশাররফ জানান, দুটি টিভি চ্যানেল এরইমধ্যে তার গান প্রচার হয়েছে। এভাবে অন্য মাধ্যমগুলোও এগিয়ে এলে তরুণ প্রজন্মের কাছে বাউল গান তুলে ধরা সহজ হবে বলে তার বিশ্বাস।  / এআর /

বিষমুক্ত খাবারের সন্ধানে- শেষ পর্ব

গ্রামাঞ্চলের মানুষ নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে বাড়ির আঙ্গিনায় শিম, বেগুন, মুলা, ধনিয়া ইত্যাদি সবজি চাষ করে থাকেন। ভালো ফসলের জন্য তারা গোবর কিংবা অন্য জৈব সার ব্যবহার করেন। নিজেদের সংগ্রহে রাখা বীজ ব্যবহার করেন, যেগুলো পোকার আক্রমণ থেকে নিজেরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম। কিন্তু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যেসব ফসল ফলানো হয় তাতে জৈব সার ব্যবহার করা হয় না। সেখানে বিভিন্ন রাসায়নিক সারের পাশাপাশি কীটনাশক এবং হরমোন ব্যবহার করা হয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। যার ফলে উৎপাদিত ফসল থেকে মানুষের শরীরে ঢুকছে বিষ। এ ধারণা পাল্টে দিতে কাজ করছে প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র। খুব অল্প পরিসরে হলেও রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সারের মাধ্যমে চাষ করার পদ্ধতি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে তারা। কৃষকদের বুঝিয়ে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনে উৎসাহী করছে প্রাকৃতিক বিপণন কেন্দ্র।  ‍

কাজের সন্ধানে ৭ দিন ধরে নীলক্ষেত মোড়ে বিমল

বিমল চন্দ্র হাওলাদার (৫২)। পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মুরাদিয়া গ্রামে। কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসা। একসময় নীলক্ষেত বাকুশাহ মার্কেটে তার ফার্নিচারের দোকান ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে দরজা, জানালা, খাটসহ আসবাব তৈরির অর্ডার আসত তার দোকানে। একা সামাল দিতে না পেরে দোকানে দু’জন লেবারও খাটাতেন বিমল। দোকান থেকে যা আয় হত তা দিয়ে দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে সংসার ভালোই কাটছিল এ কাঠমিস্ত্রীর। কিন্তু হঠাৎ করে তার বাবা অসুস্থ হওয়ায় সব এলোমেলো হয়ে যায়। বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসা করানো আর পরিবারের ৫ সদস্যের ভরন পোষন করানোর খরচ যোগাতে হিমশিম খেয়ে বসেন বিমল। ছোট্ট দোকান থেকে আসা আয় দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ভার মিটাতে না পেরে ২০১১ সালের মাঝামাঝি ঢাকার মায়া ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হন বিমল। শহর হোক আর গ্রাম হোক, জীবনযুদ্ধ তো চালিয়ে যেতে হবে। তাই বসে না থেকে নেমে পড়েন কাজে। গ্রামে দিনভর কাঠমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় হতো তা দিয়ে খুব কষ্টে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন বিমল। এরইমধ্যে অর্শ্ব রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন বিমল। তাই রিকশা চালানোসহ রোদ-বৃষ্টি গায়ে মাখার কাজগুলো করতে পারেন না বিমল। এখন গ্রামে তার করার মত কোনো কাজ নাই। এদিকে ছোট মেয়েটি আবার বাণিজ্য ব্যবসায় শাখা থেকে এইচএসসি পাশ করেছে। চড়া দ্রব্যমূল্যের এই বাজারে সংসারের খরচ অন্যদিকে মেয়ের পড়া-লেখার ব্যয়ভার বহন করা তার জন্য আরও কষ্টসাধ্য হয়ে পরে। কোনো দিশা না পেয়ে ফের ঢাকায় আসেন বিমল। উদ্দেশ্য যদি কোনো একটা কাজ মেলে। এরইমধ্যে দিন কয়েক হলো ছেলে একটা কোম্পানিতে সিকিউরিটির কাজ পেয়ে গেছে, তবে তার বেতন ধার‌্য করেনি কোম্পানী। ছেলের একার আয়ে যে সংসার চলবে না, সেটি বুঝতে পারছেন বিমল। তাছাড়া ছেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে থাকতে চান না কর্মঠ বিমল। সম্ভাব্য জায়গাগুলোতে কাজের সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু কাজ মিলছে না।   বিমল চন্দ্র কাজের আশায় রোজ ভোর ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত নীলক্ষেত মোড়ের ঠিক বিপরীতে নিউমার্কেটে যাওয়ার পথে পুলিশ বক্সের কাছাকাছি বসে থাকেন। বসে থাকেন আর মনে মনে ভাবেন এই বুঝি কেউ এসে একটা কাজের কথা বলবেন। আর তিনি কাজে লেগে যাবেন। এই আশায় ৭টা দিন কেটে গেছে, কিন্তু কেউ কাজের কথা বলেনি বিমলকে। তবে আশা ছাড়েননি। জীবনযুদ্ধে যে অত সহজে পরাজিত হতে চান না বিমল। এ প্রতিবেদককে বিমল বলেন, ‘কাজের সন্ধানে আমি গত সপ্তাহে ঢাকায় এসেছি। এখনও কোনো কাজ পাইনি, কাজ পেলে আমি আমার ছোট মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে পড়ালেখা করাতে পারব। সে বাণিজ্য বিভাগ থেকে এবার জিপিএ-৪ পেয়ে পাশ করেছে। প্রিয়াঙ্কা বরিশাল বিএম কলেজে অনার্সে ভর্তির জন্য ফর্ম তুলেছে। তার লেখাপড়া নির্বিঘ্ন রাখতে একটা কাজ চান বিমল। বিমল জানান, তিনি কারো সাহায্য নিবেন না। ঈশ্বর তাকে দু-হাত দিয়েছেন, শরীরে শক্তি দিয়েছেন। তাই কারো কাছে হাত পাতবেন না। কাজ করতে চান। তার বিশ্বাস যে কোনো উপায়ে একটা কাজের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে।    এ ক’দিন কী খেয়েছেন, কোথায় থাকছেন-জানতে চাইলে বিমল বলেন, ‘তিনদিন আগে পূর্বপরিচিত এক মানুষ জোর করে তাকে ১শ’ টাকা দেন। কাজ পেলে সেই টাকা ফেরত নিতে তাকে অনুরোধ করবো। ওই টাকাটা দিয়েই দিনে একবেলা খেয়ে আছি। রাতের বেলায় মার্কেটের ভেতর ফাঁকা জায়গায় ঘুমাই। মার্কেটে যেহেতু আমার আগে দোকান ছিল তাই কেউ বাধা দেয়না, সবার পরিচিত আমি।’ বিমল এক পোশাকেই কাটিয়ে দিয়েছেন কয়েকটা দিন। কাজ না পেলে হয়তো এভাবে আর কতদিন থাকতে হবে সেটি স্রষ্টা-ই জানেন। তবুও ভিক্ষা করবেন না বিমল। কাজ করবেন। বিমলের বয়স চলে যাচ্ছে, চেহারায় পড়েছে বার্ধ্যকের ছাপ। তবুও স্বপ্ন দেখেন পরিবারের জন্য ভালো কিছু করার। বিমল চান শত কষ্ট সহ্য করে হলেও মেয়েকে পড়ালেখা করাবেন। মেয়ে গ্রাজুয়েট হতে পারলে তার সব কষ্ট সার্থক। পাঠক, এভাবে বিমলের মতো আরও বহু লোক কাজের আশায় বসে থাকেন দিনের পর দিন ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে। তারা ভিক্ষাবৃত্তি নয়, কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে চান। সেই সেই ইচ্ছা কি পূরণ হওয়ার নয়?    //এআর

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি