ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৮ ১:৪৮:৪২

রবীন্দ্র সরোবরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বর্ষবরণ

রবীন্দ্র সরোবরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বর্ষবরণ

`বাংলার মাটি / বাংলার জল/ বাংলার ফুল/ বাংলার ফল/পূণ্য হোক পূণ্য হোক, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম,  কিংবা আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশী কিনে এসেছি”-এরকম বেশ কিছু গানের মূর্ছনায় রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে বর্ষবরণ করেছে সম্মিলতি সাংস্কৃতিক জোট। " জীর্ণ পুরাতন যাক, ভেসে যাক" শিরোনামে তাদের এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। বৈশাখের শেষ বিকেলে কয়েক হাজার নারী পুরুষ জড়ো হয় রবীন্দ্র সরোবর এলাকায়। চেয়ারে জায়গা না পেয়ে বসে পড়ে কংক্রিটের বেঞ্চে। কেউ বা মাটিতে। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে আসেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন। তিনি বলেন, বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব। বাঙালি হিসেবে আমি আমার ঐতিহ্য ও জাতিসত্ত্বাকে ধারণ করতে চাই। তাই এখানে আসলাম। স্কুল শিক্ষক নওরীন জামান। তাকেও দেখা গেল স্বামীকে নিয়ে সুর মিলাচ্ছেন শিল্পীদের তালে তালে। এ প্রতিবেদক কে তিনি বলেন, বাঙালিয়ানা শুধু একটি শব্দ নয়। এটি আমাদের জাতি সত্ত্বার স্বীকৃতি। এতেই আমার অহংকার।  আআ/টিকে
স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৫

`মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা…।` বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় বৈশাখকে এভাবেই ধরাতলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবির কিরণে হাসি ছড়িয়ে পুরনো বছরের সব গ্লানি, অপ্রাপ্তি, বেদনা ভুলে নব আনন্দে জাগবে গোটা জাতি। আজ পহেলা বৈশাখ। একটি নতুন বছরের শুভ সূচনা। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৫। চৈত্রের রুদ্র দিনের পরিসমাপ্তির মাধ্যমে গতকাল শুক্রবার ১৪২৪ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে আজ শনিবার যুক্ত হয়েছে নতুন বছর। আজ পহেলা বৈশাখ। একটি নতুন বছরের শুভ সূচনা। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৫। জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করবে বাঙালি জাতি। বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। সকালে ভোরের আলো রাঙিয়ে দেয় নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। রাজধানী জুড়ে রয়েছে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃখক পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড মো. আখতারুজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারসহ সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন। ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথম দিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলা বর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের সার্বজনীন উৎসবে। পহেলা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারাদেশ। বর্ষবরণের এ উৎসব আমেজে মুখরিত থাকবে বাংলার চারদিক। গ্রীষ্মের খরতাপ উপেক্ষা করে বাঙালি মিলিত হবে তার সর্বজনীন এই অসাম্প্রদায়িক উৎসবে। দেশের পথে-ঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসব মুখরতার বিহ্বলতা। পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব উল্লেখ করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলা নববর্ষে মহামিলনের আনন্দ উৎসব থেকেই বাঙালি ধর্মান্ধ অপশক্তির কূট ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করবার আর কুসংস্কার ও কুপমণ্ডুকতা বিরুদ্ধে লড়াই করবার অনুপ্রেরণা পায় এবং জাতি হয় ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, নতুন বছর মানেই এক নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথ চলা। বুকভরা তেমনি প্রত্যাশা নিয়ে নতুন উদ্যোমে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতি আজ আরও সোচ্চার হবে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মৌলবাদ ও জঙ্গি নিধনের দাবিতে। নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। শুধু রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেক পোস্ট। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম। বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান: বর্ষবরণে আজ রাজধানী জুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন করেছে। দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ছায়ানট’ ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করেছে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপন ১৪২৫ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ প্রতিপাদ্য ও মর্মবাণী ধারণ করে অনুষ্ঠিত হবে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দুই বছর বিরতি দিয়ে এবার পহেলা বৈশাখে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলা একাডেমি সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে একাডেমি চত্বরে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে হাজারো কণ্ঠে’ বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। মুত্তিযুদ্ধ জাদুঘর সকাল ৯টায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাব বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবারের আয়োজন রেখেছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও অনুরূপ আয়োজন রেখেছে তাদের সদস্য ও পরিবারের সদস্যদের জন্য।  আর/টিকে

ধর্মবোধ-সংস্কৃতি এবং জাতিতে জাতিতে বর্ষবরণ

একটি জাতির টিকে থাকার প্রধান অন্তর্নিহিত শক্তি হলো তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ইতিহাস না জানলে জাতি হবে দ্বিধাগ্রস্থ। তাই জাতির সংস্কৃতির ইতিহাসের সত্যগুলো জানতে হয় এবং জানাতে হয়। ইদানিং আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের অনেকে মোলবাদীদের মিথ্যে প্রচার প্রোপাগাণ্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে বিশ্বাস করে থাকেন বাংলা বর্ষবরণ একটি হিন্দু সংস্কৃতি।  আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকে ইসলাম ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করেছে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা মোলবাদীরা। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেই সাত চল্লিশে পাকিস্তান আন্দোলন সফল হওয়ার পর থেকে। তখন সবকিছুতে ইসলাম টেনে আনার একটি প্রবণতা শুরু হয়ে যায়। অবস্থা এমন হয় যে, শেষের দিকে পাকিস্তানের আইন সভাকে মনে হতো যেনবা একটি ধর্মসভা। পাকিস্তান ভেঙ্গেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু সেই ধর্মীয় রাজনীতি আমাদের দেশে আজো রয়ে গেছে। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে আজো ধর্ম দিয়ে আঘাত করে। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন মোগল সম্রাট আকবর। মোঘলরা হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে ফসলের খাজনা আদায় করতো। হিজরি সন গণনা হতো চান্দ্র মাস অনুসারে। যেহেতু চান্দ্রমাসের হিসেব এই অঞ্চলের কৃষির ফলনের সাথে মিলতো না তাই সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসল আহরণের সময়ের সাথে সমন্বয় রেখে নতুন বছর শুরুর তাগিদ অনুভব করেন। সেই মতে আকবরের নির্দেশে বাংলা সনের হিসাব বিনির্মাণ করেন বাংলার সেই সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। তিনি বাংলা সনের সৃষ্টি করেন সৌর সন আর হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে। পৃথিবীর প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। প্রতিটি সভ্যতার প্রতিটি জাতি বর্ষবরণ পালন করে থাকেন। মানুষের বর্ষবরণে ইতিহাস সুপ্রাচীন। অন্তত চার হাজার বছর আগের মানব সভ্যতার বর্ষবরণের প্রামাণিক ইতিহাস আমরা পাই। আজকের পৃথিবীতে আমরা যে হিসেবে বছর গণনা করি তাতে ২১শে মার্চ ও ২৩ শে সেপ্টেম্বর পৃথিবীর সর্বত্র দিনরাত্রি সমান। প্রাচীন ব্যবিলনে যে হিসেবে বছর গণনা করা হতো তাতে তাদের হিসেবে মার্চ মাসে পৃথিবীতে দিনরাত্রি সমান। ঐ দিনের পর যেদিন প্রথম পূর্ণচন্দ্র উদিত হতো সে দিনটিকেই তারা বছরের শুরুর দিন হিসেবে বিবেচনা করে বর্ষবরণ উৎসব শুরু করতো। তাদের উৎসবের নাম ছিলো আকিতু। এই উৎসব এগার দিন ধরে চলতো। চৈনিক সভ্যতায় আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের বর্ষবরণের ইতিহাস পাওয়া যায়। পহেলা জানুয়ারীকে নতুন বছরের শুরু হিসেবে প্রচলন করেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার। রোমানরা এই দিনে দেবতা জানুসের প্রতি তাদের অর্ঘ্য নিবেদন করতো। ইরানের নববর্ষ হলো নওরোজ। এটি পালিত হয় বসন্তের পূর্ণিমায়। আরবরা নববর্ষ পালন করেন হিজরি সন অনুসারে মুহররম মাসের ১ তারিখে। ইহুদিদের নববর্ষ উৎসবের নাম রাশ হুশনা। তারা এটি পালন করতো খ্রিস্টের জন্মের অনেক অনেক বছর আগে থেকে। এভাবে সব জাতির বর্ষ গণনা যেমন এক নয় তেমনি সব জাতির নববর্ষের উৎসবও এক নয়। আমাদের দেশে এখন যারা বাংলা নববর্ষের বিরুদ্ধে জিহাদে নেমেছে তারা বলে থাকেন--বাংলা নববর্ষ পালনের ঢং অনেকটা হিন্দু সংস্কৃতির স্টাইলের। এই অভিযোগের সত্যতা আছে। আর তা হলো ঐতিহাসিক সত্যতা। তবে হিন্দু সংস্কৃতি নয়, সহিহ অভিযোগ হবে সুপ্রাচীনকালের আবহমান বাংলার ঐতিহ্য মাখামাখি করে আছে নববর্ষ উৎসবের পরতে পরতে।   হিন্দু আর বাঙালি সংস্কৃতির মাঝে মিলের কারণ হলো হিন্দুরা এই অঞ্চলে আসার পর তারা বাঙালি সংস্কৃতির সাথে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নেয়। হিন্দু ধর্মকে যারা এই ভূখন্ডে নিয়ে আসেন সেই আর্যরা ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী এবং ধীশক্তিসম্পন্ন দার্শনিক। তাঁরা জানতো, সংস্কৃতির সাথে সংঘাত করে এই ভূখন্ডে তারা দাঁড়াতে পারবেনা। তাই তাঁরা সংস্কৃতির সাথে সমন্বয় করে। আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে প্রথমে আসে ভারতের পাঞ্জাবে। সে সময়ে বাঙালিরা রীতিমত সভ্য এক জাতি। আর্যরা দেখলো এই বিশাল ভূখণ্ডে একটাই বীরের জাতি আছে আর তা হলো বাঙালি। বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব দেখে আর্যরা বাঙালিদের বলতো ধর্মহীন অসুর। এখন যে হিন্দুদের দূর্গাদেবী অসুর বধ করে থাকেন-সেই অসুর হলো কোন বীর্যবান তেজোদীপ্ত বাঙালি প্রতিরোধী যুবকের বাহিনী যাঁকে পরাজিত করা আর্যদের পক্ষে ছিলো ভীষণ অসম্ভব। আর দূর্গা মানে হলো দুর্গতি নাশিনী। মানে যে শক্তি আর্যদের দুর্গতি নাশ করেছিলো। সে হিসেবে দুর্গা মানে হলো আর্য সাম্রাজ্যবাদীদের সকল সামরিক শক্তির সম্মিলনে প্রতিষ্ঠিত একটি কমাণ্ডো ইউনিট। সেই কম্বাইন অপারেশনের মাধ্যমে কোন তেজোদীপ্ত বাঙালি যুবকের বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাকে দখলের কাহিনী আর্যরা ধর্মে জুড়ে দেন। আর্যদের ঋগ্বেদ ও ঐতরেয় আরণ্যকে ‘দস্যু’ ‘রাক্ষস’ ‘পক্ষি’ বলে যাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছিল সেই অনার্য দ্রাবিড় জাতির বঙ্গ মগধের আদিম অধিবাসীরাই আমাদের পূর্ব পুরুষ--বাঙালি। আর্যদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগে ভূমধ্যসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এক বিস্তৃত সভ্যতা ছিলো আমাদের পূর্বপুরুষ অনার্যদের। গৌতম বুদ্ধের জন্মের পূর্বে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগেই বাঙালি জলে-স্থলে এতখানিই অপ্রতিরোধ্য হয়েছিল যে, বঙ্গরাজ্যের ত্যাজ্যপুত্র বিজয়সিংহ মাত্র সাতশো বাঙালিকে নিয়ে লঙ্কা জয় করে রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। মনে রাখতে হবে লক্ষণ সেন হিন্দু হলেও বাঙালি নন, তিনি দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেন রাজ বংশের লোক যিনি আফগান আক্রমণকারী বখতিয়ার খিলজির আক্রমনে খিড়কি দিয়ে পালিয়ে যান। বলছিলাম বাঙালি সংস্কৃতি কোন হিন্দু সংস্কৃতি নয়। এটি বাঙালিদের একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি। তো বাঙালি সংস্কৃতি `নববর্ষে` যাদের আপত্তি তাদেরকে বুঝাতে হবে, ভাতও একটি বাঙালি সংস্কৃতির খাদ্য। আমরা নিশ্চয় করাচি থেকে রুটি কিংবা মধ্যপ্রাচ্য থেকে খবুজ এনে খাই না, ভাতই খাই। `বাংলা` বাঙালি সংস্কৃতির একটি ভাষা। আমরাতো মধ্যপ্রাচ্যের আরবি ভাষায় কিংবা করাচির উর্দু ভাষায় কথাবার্তা বলিনা! লুঙ্গিও একটি বাঙালি সংস্কৃতির পোষাক। আমরা নিশ্চয় পাকিস্তানীদের স্যালোয়ার কামিজ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের আলখাল্লা পরে ঘরে-বাজারে হাঁটি না। এভাবে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমরা বাঙালি হয়েও `পহেলা বৈশাখ` আসলে মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখলে `ধর্ম গেল` `ধর্ম গেল` বলে সোরগোল করে উঠি! জীবনের সবক্ষেত্রে বাঙালি থাকলে যদি আমাদের ধর্মবোধের কোন ক্ষতি না হয়ে থাকে তবে মঙ্গলশোভা যাত্রা করলে ধর্ম কেন বিপদগ্রস্থ হবে! বখতিয়ার খিলজির আগেই এদেশে ইসলাম এনেছিলেন সূফী দরবেশগণ। তাঁদেরকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছেন উদার বাঙালিরা। তারপর তাঁদের উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী দেখে বাঙালিরা ইসলাম গ্রহণ করেন। আজ আমাদের বিত্ত বিভব হয়েছে, জনবল হয়েছে তাই আমরা কথায় কথায় মানুষ হত্যা করে ইসলাম বাঁচাতে চাই। অথচ বাঙালিরাতো সেই জাতি যারা মহানবীর মৃত্যুর শত শত বছর পর কিছু আরব এসে রাসুলের কাহিনী বললেই বিশ্বাস করেন এবং ঈমান আনেন। অথচ আরবরা স্বচক্ষে নবীকে দেখেও ইসলাম গ্রহনতো করেনইনি বরং তায়েফে তাঁকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করেছিলেন, উহুদ পর্বতের উপত্যকায় তাঁর দাঁত শহীদ করে। সেই বাঙালির ঈমান নিয়ে মোলবাদীদের ভাবনার দরকার ছিলোনা। বরং তাদের ভাবার দরকার তাদের দুর্ভাগ্য নিয়ে। কারণ মানুষ সর্বনিন্ম মানের পতিত আর নিকৃষ্ট হলেই নিজ জাতির খেয়ে পরে অন্য জাতির জন্যে কাঁদে ! ইসলাম সর্ববিচারে একটি আন্তর্জাতিক ধর্ম। সবচেয়ে কনিষ্ঠ বয়সের ধর্ম হয়েও সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ধর্ম। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় একশ সাতান্ন কোটি মুসলমান রয়েছেন। এটি এ কারণে সম্ভব হয়েছে যে, ইসলাম যে ভূখন্ডেই গিয়েছেন সেখানেরই সংস্কৃতির সাথে নিবিড় যোগসূত্র স্থাপন করেছেন। সে জন্যে একজন ইরানিয়ান সর্ববিচারে একজন ইরানি এবং মুসলমান। তেমনি একজন তুর্কি, পাকিস্তানী, আফগানি, ইন্দোনেশিয়ান স্ব স্ব জাতির হলেও সবাই মুসলমান। তাদের কোন সমস্যা হয়না, বাংলাদেশে কেন হয়! মহানবীতো সমগ্র বিশ্বের নবী। তাঁকে কেন ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ করতে হবে। যারা বাঙালি সংস্কৃতিকে ইসলামী সংস্কৃতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে চায়, যারা চাপাতি, বোমা দিয়ে ইসলামকে লাঞ্ছিত করতে চায়--তারাই ইসলামের শত্রু। এদের প্রতিহত করতে হবে। ধর্মপ্রাণদেরই এই যুদ্ধে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের এই সত্য বুঝাতে হবে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে দূর হয়ে যাক ধর্মের নামে অধর্মে সব অপচ্ছায়া। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট টিকে

বৈশাখী শাড়ি-পাঞ্জাবি বিক্রির ধুম

‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ রবীন্দ্রনাথের মতো দীপ্ত পায়ে হেঁটে আবারও এসেছে বাঙ্গালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। চৈত্রের রোদের পর বৈশাখী উদ্দীপনায় শুরু হতে যাচ্ছে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। তাই পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিতে বাঙ্গালিও সাজছে নবরূপে। কেউবা লাল-শাড়িতে, কেউবা হলুদ পাঞ্চাবিতে, কেউবা অ-অা বর্ণমালা খচিত জামায় হাজির করবেন নিজেকে।  এরইমধ্যে গ্রাম থেকে শহরে সর্বত্রই বৈশাখী আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বৈশাবি, বিঝু অনুষ্ঠান। এত জন-জীবনেও যেন নতুন মাত্রা যোগ করছে। পহেলা বৈশাখের নানা অনুষঙ্গের মধ্যে নতুন পোশাকের প্রতি তরুণ-তরুণীদের রয়েছে বাড়তি আকর্ষণ। লাল-সাদা কাপড়ের ওপর গ্রামীণ বাংলার নানা ঐতিহ্য তুলে ধরা পোশাক পরিধানেই বর্ষবরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বাঙালিরা। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ক্রেতাদের আগ্রহের কথা চিন্তা করে এবারও পহেলা বৈশাখের পোশাকে লাল-সাদাকে প্রাধান্য দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নারীদের জন্য রয়েছে ব্লক,অ্যাপ্লিক, এমব্রয়ডারি নকশা করা লাল-সাদা শাড়ির পাশাপাশি কামিজ, টপস, ফতুয়া ও টু-পিস। ছেলেদের জন্য রয়েছে বাহারি পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। শিশুদের জন্য পাঞ্জাবি, ফতুয়া, গেঞ্জি সেট তো আছেই। এসব পোশাকের ওপর ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শীতল পাটি, প্রাচীন স্থাপনা, কাঁথাফোঁড়, পাখিসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। বাহারি এসব পোশাক কিনতে সপ্তাহখানেক ধরে রাজধানীর মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন উৎসবপ্রেমীরা । ফলে মার্কেটগুলোতে বৈশাখ কেন্দ্রীক কেনা-কাটা বেশ জমেছে। কোনো কোনো স্টলে সকাল থেকে রাত অবধি ব্যস্ত বিক্রয়কর্মীরা। তবে সব মার্কেটের বিক্রি পরিস্থিতি এক রকম নয়। বৈশাখের পোশাক বিক্রিতে এগিয়ে নিউ মার্কেট ও শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট। এসব মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে বৈশাখের পোশাক বলতে শাড়ি ও পাঞ্জাবিকে বোঝানো হতো। কিন্তু এখন সেই চিন্তাধারার পরিবর্তন এসেছে। শাড়ি-পাঞ্জাবির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পোশাক কিনছেন। ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ফ্যাশন হাউজগুলোও পোশাকে বৈচিত্র্য এনেছে। কামিজ, টপস, ট্যাংকটপ,পালাজো, শার্ট, জিন্স, টি-শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের সমাহার ঘটিয়েছেন বিক্রেতারা। এপ্রিলের শুরু থেকে এসব পোশাক দোকানে দোকানে প্রদর্শিত হচ্ছে। আজিজ সুপার মার্কেটের এক ব্যবসায়ী বলেন, পহেলা বৈশাখে আমাদের বিক্রি বেশ ভালো হয়। বৈশাখের বাহারি পোশাকের প্রতি তরুণীদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়। এই কারণে আমাদের কালেকশনের ক্ষেত্রেও তরুণী ও শিশুদের পোশাক প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বিক্রয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে এ ব্যবসায়ী বলেন, বিক্রি মোটামুটি ভালো। তবে বেশি বিক্রি হচ্ছে কামিজ, দাম ৯০০-১৮০০ টাকা। আর ছোটদের ফুতয়া ও গেঞ্জিসেট ৪০০-৭০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। নিউ মার্কেটের শাড়ি বিক্রেতা কামাল উদ্দিন বলেন, `লাল-সাদা শাড়ির চাহিদা বেশি। পাশাপাশি হলুদ, ক্রিম কালারসহ বাহারি রঙের কালেকশন রয়েছে। তবে ক্রেতাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে লাল-সাদা শাড়ির প্রাধান্যই বেশি। এসব শাড়ি দেড় হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। বিক্রি পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এ ব্যবসায়ী বলেন, গত সপ্তাহে ভালোই বিক্রি হয়েছে। প্রত্যাশা ছিল চলতি সপ্তাহে আরও ভালো বিক্রি হবে। কিন্তু গত সপ্তাহের তুলনায় এখন বিক্রি কিছুটা কম। গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, এবার বিক্রি ভালো না, আবার খারাপও না। কেআই/ এমজে  

এলো নববর্ষ, শুভ নববর্ষ

‘‘সকল জীর্ণতা দীর্ণ করে তুমি এসো হে বৈশাখ এসো উত্তপ্ত বদ্বীপে, সবুজ পল্লবে, নবরূপে এসো স্বপ্ন-সম্ভাবনা বুকে নিয়ে, এসো বারবার, মুছে দাও ব্যর্থতার যত গ্লানি, জীবনের ভার।’’ বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখকে কবিতায় এভাবেই আবাহন করেছেন কবি মোশাররফ হোসেন খান। আজ শুক্রবার চৈত্র সংক্রান্তির দিন। রাত পোহালেই পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। সব অশুভ ও অসুন্দরকে পেছনে ফেলে নতুনের কেতন উড়িয়ে আগমন ঘটবে নতুন বছরের। শুভ নববর্ষ ১৪২৫। নববর্ষ মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয়। নববর্ষ মানেই জীর্ণ-পুরোনোকে বিদায় জানানো। নববর্ষ মানেই কবি শামসুর রাহমানের গান: ‘এলো নববর্ষ, শুভ নববর্ষ’। নববর্ষ মানেই কবি সুফিয়া কামালের কবিতা: চৈত্রের বিষন্ন রাত্রি তার দিয়ে গেল শেষ উপহার প্রসন্ন নবীন বৈশাখের ঝলোমলো দিন। পুরাতন গত হোক! যবনিকা করি উন্মোচন তুমি এসো হে নবীন! হে বৈশাখ! নববর্ষ! এসো হে নতুন!   সর্বজনীন উৎসবের দিন পয়লা বৈশাখ। বাংলাদেশের সকল মানুষের হৃদয়কে এ দিনটি স্পর্শ করে। নানা ঝামেলার মধ্যেও পয়লা বৈশাখ আমাদের একটু অন্যভাবে নাড়া দেয়। এর কারণ বঙ্গাব্দের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋতু চক্র এবং কৃষি উৎপাদনের নিবিড় সম্পর্ক। বৈশাখ আমাদের সাহিত্যে, বৈশাখ আমাদের কবিতায়, বৈশাখ আমাদের গানে, বৈশাখ আমাদের জীবনের। অর্থ থাকুক আর নাই থাকুক পয়লা বৈশাখে আমাদের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সুর জেগে উঠবে- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...। কিংবা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর...।’ পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই বর্ষবরণ উৎসব এখন বিশাল রূপ নিয়েছে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যে উৎসবের শুরু তা চলে রাত অবধি। কতই না আনন্দ! এই আনন্দ রবীন্দ্রনাথের উৎসব প্রবন্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়! রবন্দ্রিনাথ লিখেছিলেন: “উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুলপাতার দ্বারা সাজাই, দ্বীপমালা দ্বারা উজ্জ্বল করি, সঙ্গীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি। এইরূপ মনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎসবের দিনকে বৎসরের সাধারণ দিনগুলোর মুকুটমণির স্বরূপ করিয়া তুলি।” উৎসব এভাবে মানবজীবনে বেঁচে থাকার সত্যকে অর্থবহ করে তোলে। আমাদের বাংলা নববর্ষ এভাবে জাতি গোষ্ঠির শেকড় সন্ধানী এক অনুপ্রেরণা। বৈশাখ এখন আর শুধু ছায়ানটের বর্ষবরণ আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় সীমাবদ্ধ নেই। বৈশাখ মানেই বর্ণিল আনন্দ। ছোটদের হৈ-হুল্লোর, জয়ধ্বনি। বৈশাখ মানেই তরুণীদের হাতভর্তি রেশমী চুড়ি, খোঁপায় গোঁজা রঙিন ফুল, দেশীয় ঐতিহ্যের নতুন পোশাক, গ্রামীণ মেলা, নাগরদোলা, হাওয়াই মিঠাই, মুখোশ, পুতুল নাচ, হালখাতা, রাজপথে আল্পনা আরও কত কী! চারদিকেই রঙের ছড়াছড়ি।   বৈশাখে বড়দের চেয়ে ছোটদের আনন্দই বেশি। বৈশাখী মেলায় ঘুরে বেড়ানো, নাগরদোলায় চড়া, হাওয়াই মিঠাই খেতে খেতে এটা-ওটা কেনা। বৈশাখে দেশের নানা অঞ্চলে নানা অনুষ্ঠান হয়। সিলেটের গ্রাম ও চা-বাগান এলাকায় হয় মোরগের লড়াই, পার্বত্য অঞ্চলে হয় বৈশাবী উৎসব, দক্ষিণাঞ্চলে হয় নীলনৃত্য বা অষ্টক গানের উৎসব, রাজশাহীতে হয় লাঠিখেলা, গম্ভীরা গান। চট্টগ্রামে বলী খেলা। হাওর অঞ্চলে হয় ঢপযাত্রা। এক কথায় মজার আনন্দে ভরপুর আমাদের নববর্ষ।  পয়লা বৈশাখ আমরা ঐতিহ্যগতভাবে পালন করি। ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্যরে দিন হিসেবে এদিনটি একেবারেই ‘মৃত্তিকাজাত’। ছোটবেলায় দেখেছি এই দিনে শুভ হালখাতার আয়োজন করতেন ব্যবসায়ীরা। হালখাতায় ব্যবসায়ীদের পাওনা শোধ করে দেওয়া হতো। ওই দিনে দেখতাম দেশি খাবার, রসগোল্লা, বুন্দিয়া, লুচি, নিমকি, মুড়ি-মুড়কি পেটপুরে খাওয়ানো হতো। এখন হালখাতার উৎসব আগের মতো হয় না। পয়লা বৈশাখের আগের দিন দেখতাম গ্রামে চৈত্র সংক্রান্তির মেলাও বসত। তেমনি নববর্ষের দিনটিতেও দেশব্যাপী হতো মেলা। লোক বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে অন্তত: ৭/৮ হাজার মেলার বিবরণ পাওয়া যায়। এসব মেলায় দিকদিগন্ত উদ্বেল হয়ে উঠত। এখনও মনে আছে আমাদের গ্রাম নাছিরপুরের ছাডের (মাঠ) বান্নির কথা। তেমনি আমায় শৈশব কেটেছে পীরের গাঁওয়ে, সেই হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বান্নির কথা ভুলতে পারিনা। নববর্ষের দিনে একেবারে ভোরে ঘুম থেকে উঠে যেতাম। ভাগ্নে-ভাগ্নিরা ছিল আমার ছেলেবেলার সাথী। সেফুল, কুকুল, মুকুল, ইলিয়াস, ইকবাল, কামাল, তোজাম্মেল, সবাই আমরা আনন্দে মেতে উঠতাম। বড়রা বিশেষ করে সেফুলের দাদা আমাদের সবাইকে ওইদিন ডেকে ডেকে চার আনা, আট আনা, এক টাকা করে দিতেন। নতুন পোশাক পরে চুনারুঘাটের বান্নিতে (মেলা) গিয়ে পছন্দের জিনিষ কিনে আনতাম। আমরা কিনতাম নানা রকমের মিষ্টি, আম কাটার চাকু, মোহন বাঁশী, ঢোল, পুতুল, সে যে কী আনন্দ! মাঠ জুড়ে বৈশাখী মেলায় কত সামগ্রীই না দেখা যেত! ভাজা জিলাপীর গন্ধে গোটা মেলার বাতাস মৌ মৌ করত। ওই সময় আম কুড়াতে খুব ভালো লাগতো। আমরা কাঁচা আম কুড়াতাম এবং মেলা থেকে কেনা চাকু দিয়ে কেটে কেটে খেতাম। ছেলেবেলার সেই স্মৃতি বড়ই মধুর। প্রতিমা ব্যানার্জীর উদাস করা সেই গানÑ“আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি। বাঁশি কই আগের মতো বাজে না, মন আমার তেমন কেন সাজে না, তবে কি ছেলেবেলা অনেক দূরে ফেলে এসেছি।” সত্যিই কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে সেই ছেলেবেলা।  এখনকার পয়লা বৈশাখ নগরে ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। গ্রামের সেই তরতাজা আমেজ নেই। তবে জৌলুস বেড়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে পান্তা-ইলিশ। প্রকৃতপক্ষে এই পান্তা-ইলিশ পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতি কোনো কালেই ছিল না। এই কালচার নববর্ষের কোনো কালচার নয়। গরীব মানুষের খাবার পান্তা ভাত। গ্রাম বাংলায় রাতে খাওয়ার পর অবিশিষ্ট ভাত রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না; তাই পানি দিয়ে রাখা হতো এবং সকালে আলু ভর্তা, পোড়া শুকনো মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়ে খাওয়া হতো। ছোটবেলায় আমরাও খেয়েছি। কিন্তু এখন পান্তা-ইলিশ ধনী লোকের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। নববর্ষ পৃথিবীর নানা দেশে নানাভাবে পালিত হয়। পৃথিবীতে নববর্ষের উৎসব চার হাজার বছরের পুরনো উৎসব। আমাদের দেশে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ মোঘল সম্রাট আকবরের ফরমান অনুযায়ী আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী উদ্ভাবিত বাংলা ফসলি সাল নববর্ষ চালু হয়। ১০ মার্চ থেকেই (১ বৈশাখ ছিল) তখন সাল গননা হতো। ফতেউল্লাহ খান সিরাজী প্রায় চারশ বছর আগে হিজরী সনের সঙ্গে মিল রেখে ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন। শস্য ভিত্তিক ঋতুকে সামনে রেখে কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রচলন করা হয়েছিল বাংলা সনের। তখনই বঙ্গাব্দের সূচনা হয় বৈশাখের প্রথম দিন থেকে। এরসঙ্গে যতই উৎসব আনুষ্ঠানিকতা থাক, মূলে ছিল অর্থনীতি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা এই জনপদের মানুষের গর্বিত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। বৈশাখী উৎসব তাই সংস্কৃতির অন্যতম সমৃদ্ধ এক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরেও এখন পয়লা বৈশাখে বাঙালির নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ বাংলা একাডেমির সুপারিশকৃত পঞ্জিকা অনুসরণ করে উদযাপন করা হয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ পঞ্চিকার সুপারিশ করেন বলে একে শহীদুল্লাহ পঞ্জিকাও বলা হয়। এসেছে নতুন বছর। নতুন বছরের কাছে মানুষের প্রত্যাশা- শোনাও নতুন গান। ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা’ পুড়িয়ে ফেলে, হতাশা-অবসাদ-ক্লেদ ঝেড়ে-মুছে ফেলে নতুন উদ্দীপনায় জাগরণের আহ্বান নিয়ে আসুক বৈশাখ। প্রতিহিংসা, ক্ষুদ্রতা, কলুষতা, কুসংস্কার এবং পশ্চাৎপদতার নিগড় ভেঙ্গে ফেলে, অসুন্দরকে হটিয়ে সমাজ মুক্ত হোক, প্রগতির আলোয় স্নিগ্ধ প্রশান্ত হোক, সমাজ- এ আহ্বান নিয়ে আসুক বৈশাখ। নতুন বছর দেশে পরিবর্তন নিয়ে আসুক। ‘যাক পুরাতন স্মৃতি, যাঁক ভুলে যাওয়া গীতি। অশ্রুবাষ্প সদূরে মিলাক- এসো হে বৈশাখ।’ লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবকে সাধারণ সম্পাদক

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস আজ

আজ ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস। এবছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ক্রীড়ায় শান্তির সমাবেশ, উন্নয়নে বাংলাদেশ’। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও ক্রীড়া আয়োজন। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবসে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ১ নম্বর গেট থেকে একটি র‌্যালি বের করা হবে। র‌্যালিটি জিপিও, শিক্ষাভবন, জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে এনএসসি টাওয়ারে এসে শেষ হবে। বিভিন্ন শ্লোগান, ব্যানার ও ফেষ্ঠুনসহ দেশের বরেণ্য ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়ামোদী জনগণ এ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করবে। র‌্যালি শেষে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আয়োজিত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলন কক্ষে ‘শান্তি ও উন্নয়নে ক্রীড়া’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। বরেণ্য ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠকবৃন্দ এ আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন নিজ নিজ কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের জন্য প্রীতিম্যাচের আয়োজন করবে। আর/টিকে

‘এপ্রিল ফুল’ বা ‘ধোকা দেয়া’ দিবস

পহেলা এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হয় April Fools’ Day বা ‘এপ্রিল ফুল দিবস’। অনেক অনেক বছর ধরেই এই Prank Day চলে আসছে। কিন্তু কীভাবে, কেন শুরু হয়েছিল এ প্রথাটি? তা আজও অজানা। আমাদের সমাজেও এই দিবসটি নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মতামত। রয়েছে অন্যরকম গল্প। এপ্রিল ফুল শুরুর ইতিহাস নিয়ে অনেক রকমের কাহিনী প্রচার করা হয়ে থাকে। তবে সব কাহিনীর মধ্যে একটি Anti-Muslim কাহিনী উপমহাদেশের মুসলিমপ্রধান সমাজে ব্যাপক পরিমাণে জনপ্রিয়। আর মানুষের একটা স্বভাব হলো, যাচাই না করেই বিশ্বাস করে ফেলা। তবে সত্যি কথা বলতে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র জন্ম ইতিহাস আজও রহস্যজনক। সভ্যতার ইতিহাসে ঠিক কোন বছর থেকে এই দিনটি চালু হয়েছে তা আজ পর্যন্ত অজানা। ইংরেজি সাহিত্যের জনক জিওফ্রে চসার ১৩৯২ সালে লেখা ‘নানস প্রিস্ট টেল’ কবিতায় মার্চ মাসের একটি ৩২তম দিনের কথা উল্লেখ করেন। কারও কারও মতে, এই ৩২তম দিনটি বলতে চসার পয়লা এপ্রিলকে বুঝিয়েছিলেন। তবে ঐতিহাসিক পিটার ট্রাভিস বলেন, ৩২তম দিন বলতে চসার কোনো নির্দিষ্ট দিনের কথা বোঝাননি। তিনি মূলত মধ্যযুগীয় দার্শনিকতা নিয়ে ঠাট্টাচ্ছলে এটি ব্যবহার করেছেন। ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র জন্ম ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘পঞ্জিকা-পরিবর্তন তত্ত্ব’। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে রোমান শাসক জুলিয়াস সিজার রোমান পঞ্জিকা সংস্কার করে জুলিয়ান পঞ্জিকা চালু করেন। এ পঞ্জিকা অনুসারে ঈস্টার (যিশুখ্রিষ্টের পুনর্জন্মের দিন) ছিল বছরের প্রথম দিন। তবে চান্দ্রচক্রের সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে ঈস্টারের তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়ে যেত। মোটামুটিভাবে ব্যতিক্রম বাদ দিলে ঈস্টার পড়ত প্রতি বছরের ৩১ মার্চ বা পয়লা এপ্রিল। এ পরিবর্তনের কারণে সাল গণনায় মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দিত। ১৫৮২ সালে ১৩তম পোপ গ্রেগরি তাঁর এক আদেশে ইতালিতে জুলিয়ান পঞ্জিকার পরিবর্তে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা চালু করেন। ১৫৮৩ সালে ফ্রান্সের রাজা নবম চার্লস গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে পয়লা জানুয়ারিকে নববর্ষ বলে ঘোষণা করেন। ২২ ডিসেম্বর, ১৫৬৪ সালে এটি ফ্রান্সের পার্লামেন্টে আইন হিসেবে পাস হয়। তবে ফ্রান্সের অনেকেই এ আইনটিকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা আগের মতই পয়লা এপ্রিলকেই নববর্ষ হিসেবে পালন করতেন। ফলে নববর্ষ পালন নিয়ে জনগণ দু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যাঁরা পয়লা জানুয়ারিকে নববর্ষ বলে পালন করতেন তাঁরা পয়লা এপ্রিলকে নববর্ষ হিসেবে পালনকারীদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা আরম্ভ করে দিলেন। পয়লা এপ্রিলে তাঁরা প্রতিপক্ষের পিঠে গোপনে মাছের ছবি আঁকা স্টিকার লাগিয়ে দিতেন। যাঁর পিঠে স্টিকার লাগানো হতো তাঁকে বলা হতো ‘পওয়াহসোঁ ডাভরিল’। ‘পওয়াহসোঁ ডাভরিল’ শব্দগুচ্ছটি এসেছে ‘এলয় দ্য আমেরভাল’ নামক একজন ফরাসি কবির কাছ থেকে। তিনি ১৫০৮ তার ‘লে লিভরে ডে লা ডিয়াবলেরিয়ে’ কবিতায় ‘বোকা লোক’ বোঝাতে প্রথম এ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন। এর আক্ষরিক অর্থ ‘এপ্রিলের মাছ’; তত্রাপি ফরাসি ‘পওয়াহসোঁ ডাভরিল’ বলতে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’কে বোঝায়। তবে এই পঞ্জিকা-তত্ত্ব নিয়ে অনেকেই একমত নন। ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ নিয়ে জার্মানদের ধারণা আবার ভিন্ন। তাদের মতে, ১৫৩০ সালের পয়লা এপ্রিল জার্মানির অগসবার্গে তৎকালীন আইনসভা সদস্যদের মধ্যে অর্থনৈতিক বিষয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল। তবে সময় সংকুলানের অভাবে ওই সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ দেখা যায়। সভা দেখতে আসা অসংখ্য দর্শক সভা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পারস্পরিক বাজিতে জড়িয়ে পড়েন। সভাটি হয়নি। ফলে যাঁরা সভা অনুষ্ঠানের পক্ষে বাজি ধরেছিলেন তাঁরা হেরে গিয়ে অন্য সবার ঠাট্টা-তামাশার পাত্র হয়ে পড়েন। তবে পয়লা এপ্রিলে মানুষকে বোকা বানানোর প্রথাটি আসে ১৫৩৯ সালে ফ্লেমিশ (জার্মানদের একটি উপজাতি, যারা বেলজিয়ামের নাগরিক এবং ডাচ ভাষায় কথা বলে; এরা মূলত ‘বেলজিয়ান ডাচ’) কবি ‘এডুয়ার্ড ডে ডেনে’ একটি হাস্য রসাত্মক কবিতা থেকে। কবিতাটির ইংরেজি নাম ছিল ‘রিফ্রেইন অন এরান্ড-ডে, হুইচ হু দ্য ফারস্ট অভ এপ্রিল’ অর্থাৎ এপ্রিলের প্রথম দিনে অপ্রাপ্তি। কবিতাটির কাহিনিতে একজন ভদ্রলোক পয়লা এপ্রিলে তাঁর চাকরকে বোকা বানিয়েছিলেন। এভাবেই নাকি জার্মানিতে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র প্রথা প্রচলিত হয়। অন্যদিকে জামার্নির সীমান্তবর্তী দেশ নেদারল্যান্ডসের অধিবাসী ডাচদের কাছে পয়লা এপ্রিলের গুরুত্ব ভিন্ন। ১৫৭২ সালের এই দিনে তারা লর্ড আলভা নামক সেনার নেতৃত্বে স্প্যানিশ সৈন্যদের কাছ থেকে ‘ডান ব্রিয়েল’ নামে একটি শহর দখল করে নেয়। শহরটি দখলের ঘটনা পরম্পরায় নেদারল্যান্ডস স্প্যানিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে বলে ডাচরা মনে করে। তাই এই দিনটি তাদের কাছে সৌভাগ্যের দিন বলে গণ্য। ১৬৯৮ সালের ২ এপ্রিল ব্রিটিশ পত্রিকা ‘ডকস নিউজ-লেটার’ এক রিপোর্টে লিখেছিল, ‘গতকাল পয়লা এপ্রিল ছিল বলে গুটিকতক লোককে লন্ডন টাওয়ারে সিংহের গোসল দেখতে পাঠানো হয়েছে’। ‘ওয়াশিং দ্য লায়ন্স’ বা ‘সিংহের গোসল’ বাগধারাটি তৎকালে ব্রিটেনের একটি জনপ্রিয় প্রাঙ্ক ছিল, যা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো অসম্ভব বস্তু বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। এ রিপোর্ট থেকে বোধ্যগম্য যে, ওই সময়ে এই দিনটি ব্রিটেনেও পুরোদমে পালিত হতো। এ কথা অনস্বীকার্য যে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র সুনির্দিষ্ট জন্ম ইতিহাস ও এর কালানুক্রমিক বিস্তৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য বিদ্যমান। এসএ/

‘বঙ্গবন্ধু না জন্মালে বাঙালি স্বাধীনতা-ই পেত না’

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা। যখনই বাঙালিদের উপর কোনো আঘাত এসেছে তখনই রুখে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা থেকে বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে জাতির জনক-তার পুরোটা জীবন কেটেছে বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠা করবার লড়াইয়ে। তিনি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং জাতীয়তাবাদের আলোয় উদ্ভাসিত একজন রাষ্ট্রনায়ক। তার জন্ম না হলে বাঙালি স্বাধীনতা-ই পেত না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি-দর্শনের মূল্যায়নে এসব কথা বলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন ? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজঃ এই দাবিটি পুরোপুরি যৌক্তিক। বঙ্গবন্ধুর সব আন্দোলনের একটিই উদ্দেশ্য ছিল। আর তা হচ্ছে বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা। বাঙালি জাতির জাতিসত্ত্বার উপর যখনই আঘাত এসেছে তখনই বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ মুখর হয়ে সেই আঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, আইয়ুবের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৭০ এর নির্বাচন- যখনই বাঙ্গালির অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এসেছে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বজ্র কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে জয়লাভের পর যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে তখন তিনি তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণেও জাতীয়তাবাদকে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি বলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে, আমরা শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস, বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্তদানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস।’ অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের আলোকে উদ্ভাসিত। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হল। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলায়। রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু তাঁর দেশের মাটিতে আরও জোরালো ভাবে দিলেন জাতীয়তাবাদের ঘোষণা। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চরম মরণ সংগ্রামে। জাতীয়তাবাদ না হলে কোন জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। ... এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন, সবার সঙ্গে  একটা জিনিস রয়েছে, সেটা হলো অনুভূতি। ... অনেক দেশ আছে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে, তারা একটি জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর। আজ বাঙ্গালি জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; এই সংগ্রাম হয়েছিল যার উপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ।’ অতি সাধারণ ভাষায় তিনি জাতীয়তাবাদের যে গভীর ব্যাখা দিয়েছেন তা সত্যিই অনন্য। তিনি প্রথমেই বলেছেন, জাতীয়তাবাদ না হলে একটি জাতি এগোতে পারে না এবং জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাবার মূলনীতি হবে জাতীয়তাবাদ । কাজেই আমরা দেখতে পাই রাজনৈতিক নেতা থেকে বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে জাতির জনক-তার পুরো জীবনই কেটেছে বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠা করবার লড়াইয়ে। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং জাতীয়তাবাদের আলোয় উদ্ভাসিত একজন রাষ্ট্রনায়ক। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। তার স্বপ্নে সেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র পরবর্তীতে কতোটা বাস্তবায়ন হয়েছে। আপনার মূল্যায়ন। ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজঃ দেখুন মানুষের জন্য আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়। একটি আইন করার আগে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে সমাজ সেই আইনের জন্য প্রস্তুত কিনা। নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিরপেক্ষ ছিলেন এমনকি তিনি তার এক ভাষণে বলেছেন ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না’। ১৯৭২’র সংবিধানে বঙ্গবন্ধু তার চিন্তার প্রতিফলন ঘটান। কিন্তু তার পরের ইতিহাস বাঙালি জাতির অন্ধকার যুগের ইতিহাস। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। অবৈধভাবে সামরিক জান্তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। সংবিধানে একের পর এক অবৈধ সংশোধনী আনা হয়। ১৯৭২’র সংবিধানকে ভূলুণ্ঠিত করে পাকিস্তানি চেতনার আলোকে একের পর এক সংশোধনী আনা হয়। পাকিস্তানি পরাজিত শক্তির দোসরদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়। সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প রোপণ করা হয়। সমাজ এক ভুল ইতিহাস ও মূল্যবোধের চোরাবালিতে নিমজ্জিত হতে থাকে। ইতিহাসের বিশাল এক সময় ধরে চলে এই অধঃপতন। অবৈধ সামরিক সরকারের আমলে রোপিত সাম্প্রদায়িকতার বৃক্ষটি সমাজে ডাল-পালা ছড়িয়ে বটবৃক্ষে পরিণত হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। একটি সরকারের পক্ষে সাম্প্রদায়িকতাকে একা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন বা রাষ্ট্র ধর্মের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সমাজকে সেই মোতাবেক তৈরি করতে হবে এবং সেই তৈরির দায়িত্ব কিন্তু সবার। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সমাজকে তৈরি না করে যেকোনো আইন চাপিয়ে দিলে তা সমাজের জন্য বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনি একজন আইনজীবী। বর্তমানে প্রচলিত আইনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার বাস্তবায়ন কতটুকু ঘটেছে? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজঃ দেখুন আমাদের দেশের ইতিহাসে একটি লম্বা সময় ধরে পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন অবৈধ সামরিক শাসকেরা এবং তাদের সমর্থকেরা দেশ পরিচালনা করেছেন। তারা সে সময় তাদের পাকিস্তানি ভাবধারা অনুযায়ী বিভিন্নভাবে সংবিধানকে কাটাছেঁড়া ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এর মত কালা আইন ও করেছেন। যা ছিল বঙ্গবন্ধুর চিন্তার সঙ্গে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক। পরে আমরা দেখেছি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় বসিয়ে এদেশকে পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত করা হয়েছে। তবে আশার বিষয় আওয়ামী লীগ সরকার এসব চক্রান্ত কারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এর মত জঘন্য কালা আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে। পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মত দুরুহ কাজটি সম্পন্ন করেছে। ধন্যবাদ দিতে হয় আমাদের উচ্চ আদালতকেও যেখান থেকে কিছু যুগান্তকারী রায় এসেছে এসব অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী ও তাদেরকৃত সংশোধনের বিরুদ্ধে। সর্বোপরি আমি আশাবাদী যে আমরা শিগগিরই এমন একটি আইনি ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারবো যেখানে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন আমরা দেখবো। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বঙ্গবন্ধুর দর্শন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কতটুকু সফল মনে করেন? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজঃ বঙ্গবন্ধুর দর্শন বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শতভাগ সফল। তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়ন করে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে একটি বিষয় আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে বাংলাদেশ তার ইতিহাসে অবৈধ সামরিক শাসক ও পাকিস্তানিদের দোসর দ্বারা শাসিত হয়েছে। সেই সময়ে কিছু জঞ্জাল সমাজে জমেছে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই জঞ্জাল পরিষ্কার করে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন তা সত্যি অতুলনীয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ জাতির জনককে নিয়ে এখনও যারা কটুক্তি করার দু:সাহস দেখায় কিংবা মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাদের বিষয়ে আইন কী বলে? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজঃ মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অস্বীকার করা মানে প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করা। মনে রাখতে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু না জন্মালে বাঙালি জাতি কোনো দিন-ই স্বাধীনতা পেত না। আমরা যদি এবার আইনি দৃষ্টিকোন থেকে দেখি, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ষষ্ঠ এবং সপ্তম তফসিল স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্রের মূল পাঠকে সংবিধানের সঙ্গে সংযোজিত করেছে। কিন্তু যেটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই সেটা হল, ১৯৭২ সালের আদি সংবিধান থেকেই এই দুটি বিষয় আমাদের সংবিধানের অন্তর্গত করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র দুটি আমাদের সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলেও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী হিসেবে চিহ্নিত করে সংবিধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত রয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। সুতরাং এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। / এআর /

‘ছোট বেলা থেকেই লক্ষ্যভেদী ছিলেন বঙ্গবন্ধু’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় গুণ তিনি জনগণের পালস বুঝতেন। মানুষ কি চায় তিনি সেটা দ্রুত উপলব্ধি করতে পারতেন। জনগণের হৃদয়ের আওয়াজটাই তাঁর কন্ঠ দিয়ে বের হয়ে আসতো। ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কখনো এলোমেলো বা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটেননি। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর লক্ষ্য স্থির ছিল। টুঙ্গিপাড়ার অতি সাধারণ খোকার জাতির জনক হয়ে উঠার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। জেল-জুলুম-হুলিয়া যেমন বঙ্গবন্ধুকে মাথা পেতে নিতে হয়েছে, তেমনি বুকে ধারণ করতে হয়েছে বাংলার জন্য নিবেদিত অসংখ্য দামাল ছেলের ভালোবাসা। সমসাময়িক নেতাদের তুলনায় বঙ্গবন্ধু তাঁর দাবির পক্ষে সব সময় যেমন সোচ্চার ছিলেন তেমনি লক্ষ্য অটুট রেখে এগিয়ে গেছেন। কখনো উদ্দেশ্যহীন হাটেননি। লক্ষ্যচ্যুতও হননি। যা অন্যরা পারেননি। এজন্য ইতিহাস তাঁকে ঠাঁয় দিয়েছে জাতির জনকের মর্যাদায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অালী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ টুঙ্গিপাড়ার খোকা একদিন হয়ে উঠলেন একটি জাতির জনক। হাজারো আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থপতির স্বীকৃতি পেলেন। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? ড. মুনতাসির মামুনঃ বঙ্গবন্ধু কখনো এলোমেলো বা উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটেননি। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর লক্ষ্য স্থির ছিল। ছেলেবেলায়ই তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলী সবার চোখে পড়ত। তিনি রোজ একটু একটু করে এগিয়েছেন। তিনি যখন কলকাতা থেকে ব্রিটিশমুক্ত ঢাকায় ফিরে আসেন, তখনই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁকে অনেক কিছু করতে হবে। কাঁধে অনেক দায়িত্ব। জনগণকে ভালোবেসে এই দায়িত্ব তিনি কাঁধে নিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই তিনি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ভাষা আন্দোলনের পর তাঁর সেই স্বপ্ন গতি পায়। তাঁর আগে অনেক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তারা বেশিক্ষণ লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারতেন না। সেই বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু রাতারাতি আবির্ভূত হননি। তিনি নীতিতে অটল থেকে জীবনের প্রতিটি দিন-ক্ষণ এগিয়ে গেছেন। কখনও লক্ষচ্যুত হননি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ সমসাময়িককালের রাজনীতিকদের চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বিশেষত্ব কি ছিল? ড. মুনতাসির মামুনঃ বঙ্গবন্ধুর সমসাময়িক বহু রাজনৈতিক নেতা থাকলেও তাঁরা বেশিক্ষণ তাদের বক্তব্যে-সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারতেন না। হ্যাঁ, তারাও শোষিত মানুষের কথা বলতেন। কিন্তু তারা কেউ আলাদা রাষ্ট্রের কথা বা স্বাধীন জাতিস্বত্ত্বার কথা বলেননি। বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র একজন বিচক্ষণ সংগঠক বা ভালো রাজনৈতিকই ছিলেন না বরং একটি দর্শনে বিশ্বাস করতেন। যেমন-আমাদের আজকের সংবিধানের মূল ভিত্তি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র কিন্তু বঙ্গবন্ধুর-ই দর্শন। তিনি ওই সময়েই কতোটা আধুনিক ছিলেন তা এখান থেকে বুঝা যায়। ১৯৭২ সালে তিনি এই বিষয়গুলো সংবিধানে প্রয়োগ করেছিলেন। যখন মানুষ আরও বেশী অসচেতন ছিল। অর্থাৎ, তিনি বুঝতেন, জাতিগতভাবে আমাদের জন্য কোনো দর্শন মঙ্গলজনক। এককথায় বলতে হয়, বঙ্গবন্ধু মানুষকে ভালবাসতেন। সেই ভালবাসায় আবেগ যেমন ছিল তেমনি বাস্তবচিন্তা ও বিচক্ষণতাও ছিল। তিনি জনগণের পালস বুঝতেন। দেশবাসী কী চায়, সেটা তিনি বুঝতেন। জনগণের আওয়াজটা তাঁর কণ্ঠ দিয়ে বের হতো। এসব কারণেই বঙ্গবন্ধু সমসাময়িককালে অন্য অনেক রাজনীতিবিদদের ডিঙিয়ে গিয়েছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ কোনো কোনো সমালোচক অভিযোগ করেন বঙ্গবন্ধু রাজনীতিক হিসেবে শতভাগ সফল হলেও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি সমালোচনা ঊর্দ্ধে নন- এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আপনি কী বলবেন? ড. মুনতাসির মামুনঃ এটা একটা অপপ্রচার। আমি নিজে বঙ্গবন্ধুর বহু সংবাদ কাভার করেছি। আমি কাছ থেকে দেখেছি, আজকে বাংলাদেশে যত আইন আছে সব আইনের ভিত্তি, এমনকি সমুদ্র আইন পর্যন্ত- সব বঙ্গবন্ধু করে গেছেন। বিধ্বস্ত একটি দেশে তিনি হাল ধরেছিলেন। সদ্য স্বাধীন একটা দেশে তখন তার চারদিকে শত্রু। যে উদ্যোগগুলো তিনি নিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নের জন্য সময় পেলে বাংলাদেশ আজকে অন্য এক উচ্চতায় থাকতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁকে সে সুযোগ দেওয়া হলো না। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁকে খুন করা হয়। আবার তাঁকে খুন করার পর যে শক্তিটি ক্ষমতায় আসে, সেই শক্তিটি বঙ্গবন্ধুর অর্জনগুলো মুছে ফেলার জন্য উঠে পড়ে লাগে। এমন অবস্থায় যারা প্রশাসক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেন তারা একচোখা। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নে তাঁর মেয়ে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটুকু সফল বলে আপনি মনে করেন? ড. মুনতাসির মামুনঃ বঙ্গবন্ধু যে সময়ে রাজনীতি করেছেন, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে আর এখনকার প্রেক্ষাপট এক নয়। ফলে দুটো বিষয়ে তুলনা করলে চলবে না। বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু এখন আমাদের সমাজতন্ত্রে যাওয়ার সুযোগ নাই। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুজনেই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু সেই আদর্শ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিয়ত অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যা সব সময় তিনি অতিক্রম করতে পারছেন না। তবে আদর্শের জায়গা থেকে আমরা তাকে বিশ্বাস করি ও মেনে চলি। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ বঙ্গবন্ধুর এই জন্মদিনে তরুণদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন? ড.মুনতাসির মামুনঃ বঙ্গবন্ধু কর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। মানুষের কল্যাণে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন এবং অন্তরে সবসময় ধর্মনিরপেক্ষতা লালন করতেন। আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে হলে তরুণদেরও কর্মে একাগ্রতা থাকতে হবে। সৎ হতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। ড. মুনতাসির মামুনঃ আপনাকে এবং একুশে পরিবারকে অনেক শুভেচ্ছা। / এআর /

আজ বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস

আজ ১৫ মার্চ বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। ১৯৮৩ সাল থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ’। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর এবং কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস উদযাপিত হচ্ছে। সংগঠন দুটি ভোক্তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, সতর্ক, দায়িত্বশীল ও সোচ্চার হওয়ার আহবান জানিয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করেছে। জনবান্ধব এ আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে প্রয়োজন জনপ্রতিনিধি,  প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ‘সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বর্তমানে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থার সুফল ভোগ করছে। ভোক্তা সাধারণের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করেছে যা দেশের ভোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন। ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা আনয়ন ও তার স্থায়িত্বদানে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে।’ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারি নিষ্ঠার সাথে যথাযথ ভূমিকা রাখবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে গুনগত মানসম্পন্ন নিরাপদ ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিতকরণের দাবি জানিয়েছে ভলান্টরি কনজ্যুমারস ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস সোসাইটি (ভোক্তা)। দেশে ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণে নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন-ভোক্তা বলছে, দেশে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণের পূর্বশর্ত হলো সাশ্রয়ী মূল্যে গুনগত মানসম্পন্ন নিরাপদ ইন্টারনেট সেবা। আর/টিকে

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৭৫ সাল থেকে প্রতি বছরের ন্যায় এ বারও বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বা স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে “সময় এখন নারীর : উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা”। নারী দিবসের রঙ নির্ধারিত হয়েছে বেগুনি এবং সাদা। এ রঙ ভেনাসের, যা নারীরও প্রতীক। বেগুনি রঙ নির্দেশ করে সুবিচার ও মর্যাদা, যা দৃঢ়ভাবে নারীর সমতায়নে সংশ্লিষ্ট। বেগুনি রঙটা নারীবাদীদের প্রতিবাদের এক ধরনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯৮৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক এবং নারীবাদী অ্যালিস ওয়াকারের প্রশংসিত উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ বইটি এই রঙ নির্ধারণে অনুপ্রেরণা জোগায়। এ বইতে তিনি নারীদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন । ধারণা করা হয়, সেখান থেকেই নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গেছে বেগুনি-সাদা রঙ। পেছনের ইতিহাস আজকের নারী দিবস পালনের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে নারীদের ওপর হওয়া বৈষম্য, নির্যাতন এবং এসবের বিরুদ্ধে করা প্রতিবাদ। আলোড়ন সৃষ্টি করা প্রথম প্রতিবাদের কথা শোনা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ সড়কে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন নিউ ইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারীরা। বেতন বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা আর কাজের বৈরি পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে একজোট হয়েছিলেন তারা। আর সেই মিছিলে দমন-পীড়ন চালায় কারখানা মালিকেরা আর তাদের মদদপুষ্ট পুলিশ বাহিনী। এরপর নানান কর্মকান্ডের মধ্যে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ১৯০৮ সালে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় জার্মানীতে। জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে প্রায় ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছিলেন। এ সম্মেলনেই প্রথমবারের মত ক্লারা প্রতি বছরের ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সেই সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হতে লাগল। স্বাধীন বাংলাদেশেও ১৯৭১ সাল থেকেই ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে দিবসটি বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক দিবসের স্বীকৃতি পায় ১৯৭৫ সালে। সে বছর জাতিসংঘ তাঁর সদস্য দেশগুলোকে ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আহবান করে। এরপর থেকেই মূলত সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতই বাংলাদেশেও যথাযথ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে পালিত হবে এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পীকার ড.শিরিন শারমিন চৌধুরী এবং সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। এদিকে দিবসটি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী এবং নারী অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্যোগেও নেয়া হয়েছে নানান কর্মসূচি। ফেসবুক ভিত্তিক জনপ্রিয় গ্রুপ ‘ড্যু সামথিং এক্সেপশনাল’ এর উদ্যোগে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন রুটে চলমান গণপরিবহনে সচেতনতামূলক স্টিকার সংযোজন করা হবে। //এস এইচ এস//এসি

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি