ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৮ ১:৫১:০৮

কোটা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ রাখা যেতে পারে: ড. মীজানুর রহমান

কোটা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ রাখা যেতে পারে: ড. মীজানুর রহমান

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সর্বোচ্চ সনদ নিয়ে করতে হচ্ছে কোচিংও। তাতেও অনেকের চাকরি মিলছে না। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোটার মারপ্যাঁচে ধুঁকছে মেধাবীরা। কোটা সুবিধা নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা ক্ষেত্রবিশেষে মেধাহীনরাও চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জোরালো হয়ে উঠছে কোটার সংস্কার ও চাকরির বয়স ৩৫ বছর করার দাবি। 
কোটার কারণে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে : ড. আনিসুজ্জামান

‘যেদেশে গুণীর কদর হয় না, সেদেশে গুণীরা জন্মায় না’- এমন কথা বলে গেছেন কবিরা। বর্তমান সময় চাকরিতে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থার কারণে আমাদের দেশে প্রশাসনে মেধাবীদের চেয়ে কোটাধারী কম মেধাবীরা বেশি জায়গা করে নিচ্ছেন। আর শুধু সাধারণ ক্যাডার কেন, কলেজের শিক্ষক, বিচার বিভাগ সবখানেই তো কোটার কারণে অতি মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। কাজেই কোটা পদ্ধতির অবশ্যই সংস্কার হওয়া উচিত। কিছু কোটা থাকতে পারে শারীরিক প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য। তবে সব মিলিয়ে ১০ শতাংশের বেশি কোটা থাকা উচিত নয়। এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সম্প্রতি একুশে টিভি অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। দেশবরেণ্য এ শিক্ষাবিদনের কথায় উঠে এসেছে কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের চাকরির সমস্যাসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি-গলদ। এছাড়া সাম্প্রতিক সময় চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের সমালোচনা এবং এ থেকে বেরিয়ে আসার দিশাও খুঁজে পাওয়া যাবে তার সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান। একুশে টিভি অনলাইন: সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটার সংস্কারে ভূক্তভোগীরা দাবি জানিয়ে আসছেন, আন্দোলন করছেন, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন ? ড. আনিসুজ্জামান: আমি মনে করি যে, তাদের আন্দোলনের অবশ্যই যৌক্তিকতা আছে। তাদের দাবি অযৌক্তিক নয়। সব মিলিয়ে শতকরা ১০ শতাংশ কোটা রাখা যেতে পারে। এর বেশি রাখা উচিত নয়। তাহলে মেধার অবমূল্যায়ন হয়। দেশে বর্তমানে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ২৫৮ ধরনের কোটা বিদ্যমান। শতাংশের হিসাবে যেটি ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি একশ জন চাকুরিপ্রার্থী থেকে ৫৬ জন কোটা ও ৪৪ জন মেধা অনুসারে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই অনুপাত মেধাবীদের প্রতি অবিচার। সারাদেশে কোটাবিরোধী যে দাবি উঠছে-আন্দোলন চলছে তার যৌক্তিকতা  রয়েছে। একুশে টিভি অনলাইন : সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ আন্দোলন করছে। এটি কতটা যৌক্তিক বলে মনে করেন ? ড.আনিসুজ্জামান: তারা অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশের  সময়সীমা করতে আবেদন করবে এটা তেমন যৌক্তিক না হলেও যেহেতু পড়াশুনা শেষ করতে অনেকটা সময় চলে যায় সেক্ষেতে কিছুটা হলেও বাড়ানও উচিত বলে আমি মনে করি। একুশে টিভি অনলাইন: বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কি? শিক্ষার গুনগত মান নিশ্চিতে শিক্ষার আমূল পরিবর্তন দরকার আছে কি না ? ড. আনিসুজ্জামান:  আমাদের দেশে শিক্ষার মান নিয়ে গত ১৫০ বছরে অনেক দু:চিন্তা চলছে। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার যথাযথ মান নিয়ে বেড়ে উঠছে না। বিশেষ করে যারা উচ্চ শিক্ষা লাভ করছে। তারা বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এখানে থেকে বুঝা যায়। তাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন করা দরকার। তারা যে বিষয় গবেষণা করতে চায় সে বিষয়গুলোর সুযোগ কেমন আছে তা দেখার বিষয়। অনেক সময় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাস করার জন্য পড়ালেখা করান। ফলে শিক্ষকরা ইচ্ছা করলেও যথাযথ শিক্ষা নিশ্চিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আমাদের কর্তব্য হবে শিক্ষার্থীরা যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে আসতে চায় তাদের উচ্চ শিক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। একুশে টিভি অনলাইন: সৃজনশীল পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না ? ড. আনিসুজ্জামান:  সৃজনশীলের মাধ্যমে কিভাবে পাঠদান করে এ বিষয় আমার তেমন ধারণা নেই। তবে আমার মনে হয় শিক্ষার্থীদের আগে সৃজনশীল পদ্ধতি সর্ম্পকে শিক্ষকদের ধারণা দিতে হতে। শিক্ষকদের এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা  করতে হবে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে নিজেদের মতো করে লিখতে আগ্রহ তৈরি করেন না। তার চান ছাত্ররা মুখস্ত করে এসে পরীক্ষা দিক। ছাত্ররা নিজেদের থেকে লিখলে লিখার মান একটু খারাপ হবে এটাই স্বাভাবিক। এটাকে তার মেনে নিতে চাই না ফলে। সৃজনশীল মুখস্ত করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর অনেক চাপ পড়ছে। ফলে শিক্ষার সঠিক মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। একুশে টিভি অনলাইন: অনেকের অভিমত শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলো চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটনো যায় ? ড.আনিসুজ্জামান: একথা অবশ্যই ঠিক বর্তমানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পাশ করার জন্য লেখাপড়া করছে। নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার উপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। নৈতিক শিক্ষা দিতে শিক্ষকদের আগ্রহ নেই। আমার মনে হয় শিক্ষা ব্যবস্থা নৈতিক শিক্ষা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আর শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। এজন্য প্রত্যেক শিক্ষক শ্রেনিকক্ষে যদি অল্প সময় ধরে ধর্মীয় ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়া ক্লাস রুমের বাহিরেও শিক্ষার্থীকে এ সামাজ পরিবার ও  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নৈকিত শিক্ষা নিতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কী কারণে বারবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটছে, এটা থেকে উত্তরণের উপায় কি হতে পারে? ড. আনিসুজ্জামান : প্রশ্নফাঁস হবার মূল কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা সবাই পরীক্ষার্থী হয়ে যাচ্ছে। তাই পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করার কারার জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করছে। ফলে তারা যেভাবেই হক প্রশ্নে সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সরকারের উচিত প্রশ্নফাঁসের মূল কারণ বের করে। এবং এর সাথে যারা জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি  আওয়াত আনা উচিত। সম্প্রতি সময়  শিক্ষা মন্ত্রণায়ন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এখন দেখার বিষয় এধরনের পদক্ষেপ কোন কাজে আসে কি না। পদক্ষেপ যদি ইতিবাচক মনে হয় তাহলে প্রশ্নফাঁস রোধ হবে।  একুশে টিভি অনলাইন : আমাদের দেশে কোচিংয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে শিক্ষা কিভাবে নিরেট সেবায় রূপান্তর করা যায়। ড. আনিসুজ্জামান : সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা অনেকটাই সনদ বাণিজ্য করে। সব  ‍শিক্ষাটা পরীক্ষা পদ্ধতি হওয়ার কারণে লেখাপড়া সদননির্ভর হয়ে পড়েছে। আমি আশা করব শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। যারা শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ করছে তাদের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আর যারা শিক্ষার মান  নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে তাদের ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া উচিত। একুশে টিভি অনলাইন : বাংলাদেশে ডোমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে (জনসংখ্যার বোনাসকালে) প্রবেশ করছে। এবিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে আমরা কিভাবে নিশ্চিত করতে পারি। এছাড়া প্রতিবছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশুনা শেষ করে ২২ লাখ শিক্ষার্থী বের হলেও তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছি না। এর কারণ কি? ড. আনিসুজ্জামান: শিল্প উদ্যোক্তা তৈরি না করতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়নো যাবে না। কিন্তু আমাদের দেশে উদ্যোক্তা তৈরি করতে তেমন কোন  উদ্যোগ নেই। সেটা সরকার বলেন আর বেসরকারি। তরুণ সমাজকে সঠিকভাবে কাজে লাগতে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা ব্যবস্থা ও কারিগরি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী আছে। যারা নিজেরা উদ্যোক্তা হতে চাই। তাদের যদি সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। তাহলে উদ্যোক্ত বৃদ্ধি পাবে। বছরে সে যে হারে শিক্ষার্থী বের হচ্ছে সেহারে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়ছে না যে কারণে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশুনা করে চাকরি পাচ্ছে। ফলে তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা বাজারমুখী করতে হবে। তাহলে আমার সফল লাভ করতে পারবো। একুশে টিভি অললাইন: মূল্যাবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।   ড. আনিসুজ্জামান :  একুশে পরিবারকেও ধন্যবাদ। ‘‘আনিসুজ্জামান একজন শিক্ষাবিদ ও লেখক। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক।  তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তাঁর গবেষণা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আনিসুজ্জামান ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ই ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম এ টি এম মোয়াজ্জেম। তিনি ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিনী হলেও লেখালেখির অভ্যাস ছিল।   কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে শিক্ষাজীবনের শুরু করেন আনিসুজ্জামান। ওখানে পড়েছেন তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। পরে এদেশে চলে আসার পর অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। কিন্তু বেশিদিন এখানে পড়া হয় নি। একবছর পরই পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় ভর্তি হন প্রিয়নাথ হাইস্কুলে। আনিসুজ্জামান ছিলেন প্রিয়নাথ স্কুলের শেষ ব্যাচ। কারণ তাঁদের ব্যাচের পরেই ওই স্কুলটি সরকারি হয়ে যায় এবং এর নাম-পরিবর্তন করে রাখা হয় নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল। সেখান থেকে ১৯৫১ সালে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ড. আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৫৩খ্রিষ্টাব্দে। সে সময়ে বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন শহিদ মুনীর চৌধুরীকে। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে স্নাতক সম্মান এবং এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। অনার্সে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৃতিত্বস্বরূপ "নীলকান্ত সরকার" বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণার বিষয় ছিল `উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস। আনিসুজ্জামান শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য তাঁকে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদক প্রদান করা হয়। ’’  

‘অনৈতিকতা চর্চার ভয়াবহ রূপ প্রশ্নফাঁস’

পাবলিক পরীক্ষাসহ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এখন নিয়মিত ঘটনা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিস্তর অভিযোগ উঠে। পরীক্ষার আগের রাতে হয় পরীক্ষার আগের রাতে কিংবা পরীক্ষার দিন সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে প্রশ্নপত্র পৌছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে। শিক্ষামন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিলেও প্রশ্নফাঁস রোধ করতে ব্যর্থ হয়। সমাজে অনৈতিকতা চর্চার ভয়াবহ রূপ হচ্ছে প্রশ্নফাঁস। প্রশ্নফাঁস বেশি ক্ষতি করছে মেধাবী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। অবিলম্বে এটি বন্ধ করতে না পারলে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে, মেধাহীন হবে জাতি। এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সম্প্রতি একুশে টিভি অনলাইনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাতকার এসব কথা বলেন। দেশবরেণ্য এ শিক্ষাবিদনের কথায় উঠে এসেছে কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের চাকরির সমস্যাসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি-গলদ। এছাড়া সাম্প্রতিক সময় চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের সমালোচনা এবং এ থেকে বেরিয়ে আসার দিশাও খুঁজে পাওয়া যাবে তার সাক্ষাৎকারে। তিনি মনে করেন বিদ্যমান সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি পরীক্ষার্থী হিসাবে গড়ে উঠছে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান। এর চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন : কী কারণে বারবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটছে, এটা থেকে উত্তরণের উপায় কি হতে পারে ? ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: প্রশ্নফাঁস ঘটনার সঙ্গে আমাদের নৈতিক বিষয়টি জড়িত। সমাজে অনৈতিকতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এটাই তার প্রমাণ। এখন প্রশ্নফাঁস হলে আগে মা-বাবাও দৌড়ান ফাঁস হাওয়া প্রশ্ন যোগার করার জন্য। সন্তানও মা-বাবাকে দ্বিধাহীনভাবে বলছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন যোগার করে দিতে। কারণ প্রশ্ন যোগার করতে না পারলে তার সন্তানও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।  যে বাবা মা সন্তানকে নৈতিকতা শিক্ষা দিবে সে বাবা মা যদি সন্তানকে অনৈতিক সুবিধা দিতে কাজ করেন তাহলে আমাদের সমাজ নৈতিকতা শিখবে কিভাবে? এই যে চিত্রটা, এটা জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে একদিকে যেমন দুর্বল মেধার শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে যোগ্য শিক্ষার্থী বঞ্চিত হচ্ছে তার কাঙ্ক্ষিত ফল ও চাকরি থেকে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মেধাবীরা কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় তাদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। তাদের অনেকের নৈতিক স্খলন হয়ে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এদের একটি বড় অংশ হতাশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে মাদকে। এই করুণ পরিণতি এখনি ঠেকাতে না পারলে ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। একুশে টিভি অনলাইন: প্রশ্নফাঁস রোধে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন? ড.সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: একে অন্যকে দোষারুপ না করে প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে আসলে কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে হবে। প্রশ্নফাঁসকারী যে হোক না কেন তার কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রশ্নফাঁসের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার গোটা সিস্টেমটাই দায়ী। শিক্ষার বাণিজ্য করণ রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রশ্নফাঁস রোধে গোটা পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আসনে হবে। তাহলে এমনিতেই কমে আসবে প্রশ্নপত্র ফাঁস। এখন আমাদের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই হয়ে গেছে পরীক্ষানির্ভর। এত পরীক্ষা হওয়া উচিত নয়। আমাদের সময় তো এত পরীক্ষা হতো না। তখনকার শিক্ষার্থীরা কি শেখেনি? আর স্কুলের ভিক্তিক পরীক্ষা নিতে হবে। তাহলে এক স্কুলের প্রশ্নের সঙ্গে অন্য স্কুলের মিল থাকবে। কারণে এক স্কুল যা পড়িয়েছে অন্য স্কুল তা নাও পড়াতে পারে। একুশে টিভি অনলাইন: সৃজনশীল পদ্ধতিকে আপনি কিভাবে মূলায়ন করেন? ড.সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি পরীক্ষার্থী হিসাবে গড়ে উঠছে। এ পদ্ধতি আরও বেশি সমস্যার সৃষ্টি করছে শিক্ষা ব্যবস্থায়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেউ সৃজনশীল বোঝে না। তারা নোট-গাইডের আশ্রয় নেয়। শিক্ষার্থীরা গাইড পড়ে, কোচিংয়ে যায়। শিক্ষকরাও গাইড থেকে প্রশ্ন করে। এখন যারা সৃজনশীলই বোঝে না তারা তো প্রশ্ন ফাঁসের পেছনে দৌঁড়াবেই। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অনেকের অভিমত, শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? ড.সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তন হচ্ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, বস্তুতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা আমাদের একাকী করে দিচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাছে। সামাজিক বিকাশ ব্যহত হচ্ছে। যে কারণে দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে নানান অপরাধ। এ থেকে উত্তোরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সমাজে প্রযুক্তির অপব্যবহারে সময় নষ্টকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ তরুণ বিপদগামী হচ্ছে। পশ্চিমারা প্রযুক্তিকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে তরুণ সমাজ শুধু নয় যেকোনো বয়সের ব্যক্তিও ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি দিনের পর দিনও তাতে আবদ্ধ থাকতে অতিক্রম করতে অনেকটা বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে গুগল ও ইউটিউবকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, তরুণরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অপব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণরা। নষ্ট হচ্ছে তরুণদের নৈতিকতা। তাদের যে সময় ব্যয়ের কথা ছিল নিজেদের গোছানোর, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিপাটি করতে, নিজেদের যোগ্য রূপে গড়ে তুলতে অথচ সে সময়টুকু যাচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে। সিনেমার কাহিনী,নাচ-গানে সাজ-সজ্জার দৃশ্য এমনভাবে নির্মিত হয়, তরুণসমাজ বাস্তবজীবনেও এর প্রয়োগ ঘটাতে আগ্রহ দেখায়। ফলে সমাজজীবন হচ্ছে ব্যাহত। বিয়ে-সংসার বেশিদিন টিকছে না। সামান্য অজুহাত, মান-অভিমানে একে অপরকে আলাদা করে দিচ্ছে। বাড়ছে সন্দেহপ্রবণতা, কমছে বিশ্বস্ততা। বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। বিবাহরীতি ভেঙে বেড়েছে লিভ টুগেদার প্রথা। ভিনদেশি নাটক-সিরিয়াল দেখে নিজেদের চরিত্রে রূপ দিতে গিয়ে সংসারে নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে হারিয়ে যায় সন্তানাদি শোনে না বাবা-মায়ের কথা। কেউ মানে না কারো নিয়ন্ত্রণ করে না। এজন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার শিক্ষা রাখতে হবে। এবং সমাজে প্রত্যেক ক্ষেতে নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। তাহলে দক্ষতা সম্পন্ন মানুষ তৈরি হবে। একুশে টিভি অনলাইন: কীভাবে শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার না করে নিরেট সেবায় রূপান্তর করা যায়? ড.সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন অনেক ভাল মানের শিক্ষা নিশ্চিতে কাজ করছে। তবে কিছু কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই আবার টাকার মাধ্যমে সনদ বাণিজ্য করছে। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হলে আমাদের নিজেদের মানসিকাতার পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষাকে সেবা হিসাবে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। একুশে টিভি অনলাইন: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : একুশে পরিবারের প্রতিও শুভ কামনা। ‘‘অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ইংরেজির ছাত্র হয়েও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গদ্যশিল্পী, মননশীল লেখক হিসেবে পরিচিত তিনি। সৃষ্টিশীল জীবনে প্রায় ৮০টিরও বেশি গ্রন্থের স্রষ্টা। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় থেকে অসংখ্য স্বপ্নবাজকে জন্ম দিয়েছেন সুন্দর পৃথিবীর বিনির্মাণে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর অগণিত শিষ্য। সফল ও সার্থক জীবনে শুধু সাহিত্য রচনা ও শিক্ষকতায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। জাতির ক্রান্তিলগ্নে কলমের খুরধারায় মোকাবেলা করেছেন সব অপশক্তিকে। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৫০ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগোরিস হাই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করে ভর্তি হন নটরডেম কলেজে। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েটে সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। ১৯৫৬ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর নিজ এলাকা মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। এসময় জগন্নাথ কলেজেও খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন এ শিক্ষাবিদ। পরের বছর ১৯৫৭ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েট এবং লেজিস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে তিনি মাসিক পরিক্রমা (১৯৬০-৬২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা (১৯৭২), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র (১৯৮৪) ইত্যাদি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।’’ / এআর /      

‘শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে আনন্দের সঙ্গে’

নিরলস পরিশ্রম, প্রবল আত্মবিশ্বাস, আর অসীম সাহসিকতার অপূর্ব মেলবন্ধনে মোহনীয় ব্যক্তিত্বের অনন্য উদাহরণ ড. সালেহা কাদের। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ ও  শিক্ষা উদ্যোক্তা, সমাজসেবক। নিজ প্রচেষ্টায় রাজধানীর মিরপুরে গড়ে তুলেছেন আন্তর্জাতিক মানের চেরি ব্লসমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।  স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তার স্বকীয় শিক্ষা পদ্ধতি এবং আধুনিকতার কারণে ইতোমধ্যেই অভিভাবক মহলে ভূয়সী প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি নিজেই। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নন তিনি, সমাজের পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন অবিরাম। শিক্ষা বিস্তারে এবং সমাজ সেবাই বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন সম্মানসূচক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তিনি ‘চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস অব ইংলিশ মিডিয়াম এডুকেশন ইন বাংলাদেশ’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি মনের করেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদের পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করতে না পারলে শিশুরা তা গ্রহণ করতে চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদেরকে অসুস্থ্য করে তুলছে। শিশুদের খেলাধুলার সময় না দিয়ে লাগাতার লেখাপড়ার চাপ দেওয়াতে তাদের মধ্যে পড়াশুনার বিষয়ে এক ধরনের ভীতি তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তোলার বিষয় নিয়ে খ্যাতিমান এই শিক্ষাবিদ একুশের টেলিভিশন অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: একজন নারী হয়ে কীভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন? ড. সালেহা কাদের: আমি ১৯৯১-৯৫ সাল পর্যন্ত একটি সংস্থায় অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে কাজ করেছি। এখানে কম্পিউটার প্রগ্রামিংয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছি। এ সময় একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি। মিরপুরে কিন্ডারগার্টেন স্কুল থাকলেও তখনও কোনো ইংরেজি মাধ্যম স্কুল গড়ে ওঠেনি। ১৯৯৬ সালে শুরু হয় আমার স্কুলের কার্যক্রম। মূলত এর সূচনা তারও এক-দেড় বছর আগে থেকেই ছিল। সে সময় অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় ও ছুটির দিনগুলোতে প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পরামর্শ নিতাম। আমার বাবা তখন চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ায় সংসারের খরচ চালাতে তার ওপর কোনো অতিরিক্ত চাপ পড়ুক এটা আমি কোনোভাবেই চাইনি। যে কারণে বাড়ির নিচতলা থেকে যে ভাড়া পেতেন সেই ভাড়াতেই তার কাছ থেকে স্কুলের জন্য ভাড়া নিয়েছিলাম। সাড়ে সাত কাঠার ওপরে নির্মিত আমাদের এই দ্বিতল বাড়িটি। আমার স্বামীও তার কিছুদিন পরে চাকরি থেকে অবসরে যায়। কম্পিউটার ও স্পোকেন ইংলিশ শেখানো থেকে সঞ্চিত অর্থ ও চাকরির মাধ্যমে অর্জিত পুঁজি দিয়েই স্কুল শুরু করি। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের আসা-যাওয়ার জন্য একটা বাস কিনতে গিয়ে ছোট বোনের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ঋণ করতে হয়েছে। শুরুর বছর ছাত্র-ছাত্রী ছিল ৬০ জন। ছয় মাসের মধ্যেই ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১০০ তে গিয়ে দাঁড়ায়। তখন শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১০-১২ জন। পল্লবীর বিভিন্ন বাসায় গিয়ে আমি নিজেই স্কুলের প্রচার করেছি। শুরুতে প্লে গ্রুপ থেকে স্ট্যান্ডার্ড ফাইভ পর্যন্ত ছিল স্কুলের কার্যক্রম। ছাত্র-ছাত্রী বেড়ে যাওয়ায় ১৯৯৯ সালে স্কুল স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পৈতৃক ভিটার কাছেই মিরপুর ১০ নম্বর বেনারসি পল্লীতে অবস্থিত ছয় কাঠার ওপর নির্মিত একটি বাড়ির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা ভাড়া নিই। দুটি ফ্লোরের মাসিক ভাড়া ছিল ৪০ হাজার টাকা। অ্যাডভান্স ছিল চার লাখ টাকা। এত ব্যাপক টাকার সংকুলান করতে না পেরে লন্ডন প্রবাসী আমার ছোট বোনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিই। সে সময় শিক্ষকদের বেতন ছিল সর্বনিম্ন তিন হাজার এবং সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। স্কুলের মাসিক ব্যয় ছিল প্রায় এক লাখ টাকা। আয়ও ছিল তার কাছাকাছি। স্কুল সময়ের বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের ফক্সপ্রো  প্রোগ্রামিং ও স্পোকেন ইংলিশ শিখিয়ে বাড়তি আয়ের জন্য ধীরে ধীরে স্কুলের জন্য তিনটি কম্পিউটার কিনি। সেই আয়ও স্কুলে বিনিয়োগ করেছি। স্কুল থেকে লভ্যাংশ নেওয়ার চিন্তা করিনি। এরই মধ্যে শিক্ষক সংখ্যা বেড়ে হলো ১৮-২০ জন। এরি মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে এই স্কুলেই যোগদান করে একমাত্র মেয়ে। এখন আমার ছাত্র-ছাত্রী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০ জন। এছাড়া ২০০৩ সালে ইউকে থেকে প্রথম ‘ও’ লেভেল পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির অনুমতি পাই। দিনের পর দিন বাড়ি ভাড়া উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকঋণ নিয়ে স্কুলের জন্য একটি আলাদা ভবনের চিন্তা মাথায় আসে। মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে সাত কাঠা জমির ওপর নির্মিত একটি সাড়ে চারতলা বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেল। সুদের হার ও সময় বাড়িয়ে ডাউনপেমেন্ট কমিয়ে প্রথম ইনস্টলমেন্ট ২২ লাখ টাকা নির্ধারণ করে একটা লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে ঋণের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু লিজিং কোম্পানি থেকে পাওয়া সেই ঋণ এখনও পরিশোধ করে চলেছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল ও যুগোপযোগী করার জন্য আধুনিকায়নের প্রয়োজন কতটুকু? ড. সালেহা কাদের: আমার মতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা শতভাগ। পড়াশোনার মানোন্নয়নের জন্য বর্তমানে এর বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে ক্লাসটিউন  কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে ক্লাসটিউন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটি এমন একটি স্কুল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার যেটির মাধ্যমে এখন আমাদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে। সবাই স্কুলের যেকোনো ব্যাপারে নিয়মিত আপডেট পাচ্ছে। মাসিক অভিভাবক সভাগুলো এখন প্রতিদিনকার সভায় রূপ নিয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আধুনিকায়নের দিক থেকে চিন্তা করলে চেরি ব্লোসমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কতটা আধুনিক? শিক্ষাদান পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন? ড. সালেহা কাদের: বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষে সব সেক্টরে ডিজিটালাইজেশন করছে। সেই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাখাতও পিছিয়ে নেই। আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর। এই ক্ষেত্রে আধুনিকতার কথা যদি বলেন তাহলে আমি বলব চেরি ব্লুসমস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অনেকটাই এগিয়ে কিন্তু তারপরও আমার মনে হয় আমরা মাত্র ৬০ শতাংশ আধুনিকতা অর্জন করতে পেরেছি। আমার মনে হয় আমাদের আরও অনেক পথ এখনো যেতে হবে। শুধু আমরাই নয়, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই আরও বেশি আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাদান পদ্ধতিতে শিক্ষকদেরকে আরও মোলায়েম হতে হবে। উদারচিত্তে জ্ঞান বিতরণের মধ্য দিয়েই শিক্ষকদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা সেরা। নচেৎ আমাদের আগামী  প্রজন্মের বাংলাদেশের স্বপ্নের জায়গাগুলো শক্তিশালী হবে না।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাকে আনন্দময় করে তুলতে আপনার পরামর্শ কি? ড. সালেহা কাদের: শিক্ষা আমাদের সবার অধিকার। শিশুদের বইমুখী করতে হলে আনন্দময়ী করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। শিশুরা তো অবুঝ। পড়াশোনার ব্যাপারে তাদেরকে চাপ দেওয়া উচিত না। পড়াশোনাকে তাদের কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন তারা এটিকে আনন্দদায়ক একটি বিষয় বলে মনে করে। আনন্দ দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষাদান করলেই শিশুদের কাছে সেটি সহজ মনে হবে। আর আধুনিক যুগে এর অনেক পদ্ধতি আমাদের সামনে রয়েছে। যেকোনো বিষয়কেই আমাদের ব্যবহারিকভাবে শিক্ষা দেওয়া উচিত। যেমন সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় কি এটা একটা শিশুকে বই পড়ে বোঝালে সে যতটুকু বুঝবে একটা ছবি বা ভিডিও দেখালে সেটা তার বুঝতে আরও অনেক বেশি সহজ হবে। আবার ভূমিকম্পের সময় আমাদের কি করণীয় সেগুলো যদি আমরা ব্যবহারিকভাবে বা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে শেখাতে পারি তাহলে সেটা আরও বেশি কার্যকরী হবে। ক্লাসরুমে প্রোজেক্টর ব্যবহার করে আমরা এগুলো দেখাতে পারি। এছাড়া অনেক সময় অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না। তাদের জন্য এ লেকচারগুলো যদি বাসায় বসে করার কোন উপায় বের করা যায় তাহলে খুব ভালো হবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে শিক্ষা শুধু সনদ অর্জন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সুনাগরিক হতে হলে তাকে অবশ্যই মানবিক ও সমাজবান্ধব হতে হবে। একজন শিক্ষিত মানুষের পক্ষেই কেবল তার চারপাশ আলোকিত করা সম্ভব বলে মনে করি। আর এই ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রধান হাতিয়ার। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় চেরি ব্লুসমস কেন আলাদা মনে করছেন?   ড. সালেহা কাদের: দেখুন ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলে চেরি ব্লোজমস-এর ছাত্র-ছাত্রীরা বেশ সফলতা অর্জন করছে। স্কুলটি নিয়মিত অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছে। বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছি অভিভাবকদের তরফ থেকে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ভীরে আমাদের স্কুল বরাবরের মতই সাফল্য ধরে রেখেছে। আর সাধারণ পরিবারের সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ধার্য করা হয়েছে। এই ব্যাপারে আমি কমিটেট। এছাড়া বাণিজ্যিক কোন চিন্তা চেতনা থেকে আমি মুক্ত রয়েছি কারণ এটি ভালো লাগার জায়গা। শিক্ষাকে সেবার মাধ্যমেই সবার কাছে পৌঁছে দিতে দেওয়ায় আমার ব্রত। আমি নিজেই অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে থাকি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি সামাজিক কার্যক্রম করছেন সে সঙ্গে অনেকগুলি পুরুস্কার আপনার সাফল্যের জুড়িতে এই প্রসঙ্গে শুনতে চাই? ড. সালেহা কাদের: আমি সব সময় মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। মানুষের কষ্ট আমাকে দারুণভাবে আমাকে তাড়িত করে। স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছি। এ ছাড়া অনগ্রসর শিশুদের জন্য শিক্ষাবৃত্তিসহ সামাজিক ও মানবিক কাজ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। এসব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেস গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ডসহ আরও বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করার ভাবনা এলো কেন? এই পথে কাজ করতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলেন? ড. সালেহা কাদের: যেহেতু একাধিক সুযোগ থাকার পরেও আমি পারিবারিক, সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এসব পেশায় যেতে পারিনি,তাই চিন্তা করলাম আমি শিক্ষক হব। সমাজে শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলবো। নারী পুরুষের ভেদাভেদ দূর করতে মানুষকে সচেতন করব। এরপর থেকে এই পথে আমি কাজ শুরু করি। আর এই জন্য আমি প্রাণি বিজ্ঞানের পাশাপাশি এডুকেশনেও মাস্টার্স করেছি। মাস্টার্স শেষে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখি। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ-অবধি প্রথম স্থান আমার দখলে ছিল। বিয়ের সময় মায়ের কাছ থেকে পাওয়া গয়না বিক্রি করে এক লাখ টাকা দিয়ে কম্পিউটার কিনি। এ কারণে সে সময় বাসায় বেশ বকুনিও খেতে হয়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা বাসায় এসে কম্পিউটার ও স্পোকেন ইংলিশ শিখত। একুশের টেলিভিশন অনলাইন: আপনার সম্পর্কে যদি বলেন? ড. সালেহা কাদের: মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার বেড়ে উঠা। বাবা ছিলেন বিটিএমসির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় আমি। আশির দশকের দিকে সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীদের অধিক পড়াশোনাকে তেমন উৎসাহিত করা হতো না। আমার পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পড়ালেখা অবস্থায় আমাকে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ছিল বেশ। এরই মধ্যে এককন্যা সন্তানের জননী হলেও নিজের প্রচেষ্টায় বদরুন্নেসা কলেজ থেকে পাস করে মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজ ও ঢাকা ডেন্টালে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম। তখনকার প্রেক্ষাপটে পরিবার থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াটাকে অনুৎসাহিত করা হতো। এরপরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে পুত্র সন্তানের জননী হই। এর মধ্যেই ১১তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অ্যাডমিন ক্যাডারে যোগদানের সুযোগ পাই। কিন্তু বদলি চাকরির কারণে পারিবারিক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে ভেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া হলো না। পরে অবশ্য বেসরকারি সংস্থায় অপেক্ষাকৃত উচ্চ বেতনে যোগদান করি। আমি অনেক কষ্ট করে এই জায়গায় এসেছি। গত বছরের জুলাই মাসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আমার একমাত্র ছেলে মোজাক্কির হোসেন খান মিশু মারা যায়। সে নৌ-বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ও একজন অভিজ্ঞ হেলিকপ্টার প্রশিক্ষক ছিলেন। এছাড়া আমার মেয়ে বর্তমানে স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে আমাকে সহযোগিতা করছে। ছেলের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য পড়াশোনা ও কাজের মধ্যে অধিকতর ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছি। এসএইচ/

প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রশ্নফাঁস করা হয়েছে

প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু এর অপপ্রয়োগ বয়ে আনে অকল্যাণ। অামরা প্রযুক্তিকে সঠিক ব্যবহার না করে প্রযুক্তির দাস হয়ে গেছি। পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতে সবার হাতে কিন্তু মোবাইল ফোন নেই। তারা সবসময় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে না। পুঁজিবাজারের কৌশল হিসেবে বড় বড় কোম্পানীগুলো অামাদেরকে বেছে নিয়েছে টাকা চুষে নেওয়ার জন্য। এজন্য সবার হাতে মোবাইল ফোন, সবার হাতে ইন্টারনেট ধরিয়ে দিয়েছে। এটি মোটেও ভাল কথা নয়। প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণেই প্রশ্নফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নফাঁস বন্ধে প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন শিক্ষাবিদ ও গবেষক টিচার্স ট্রেনিং কলেজের কম্পিউটার অপারেশন সুপারভাইজার/সহকারী অধ্যাপক সালেহা খন্দকার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক অালী অাদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অামদের শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশ্নফাঁস। এই প্রশ্নফাঁসের জন্য অাপনি কাকে দায়ী করবেন?সালেহা খন্দকার: প্রশ্নফাঁসের জন্য শুধুমাত্র একজনকে দায়ী করার সুযোগ নেই। শিক্ষার পুরো সিস্টেমটাই প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দায়ী। একটি সহজ কথা বলি। প্রশ্ন প্রনয়ণ করা থেকে শুরু করে পরীক্ষার হলে যাওয়া পর্যন্ত অনেকগুলো প্রক্রিয়া অাছে। এসব প্রক্রিয়ায় অনেকগুলো জনবল জড়িত। যেসব জনবল জড়িত তাদের ছেলেমেয়েরা কী পরীক্ষা দিচ্ছে না? সেখান থেকেও তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে পারে। এখানে প্রত্যেকটা স্টেজে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা অাছে। অাবার সবসময় যে একই প্রক্রিয়ায় ফাঁস হচ্ছে তা নাও হতে পারে। এবছর হয়তো একভাবে প্রশ্ন ফাঁস হলো,  গত বছর বা তার অাগের বছর হয়তো অন্যভাবে ফাঁস হয়েছিল। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রশ্নফাঁসের জন্য প্রযুক্তিকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু উন্নত বিশ্বে প্রযুক্তি অারো অনেক বেশী উন্নত। সেখানে কিন্তু প্রশ্নফাঁস হচ্ছে না। কেন?সালেহা খন্দকার: প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু অামাদের এখানে হয়ে গেছে উল্টো। অামরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার না করে প্রযুক্তির দাস হয়ে গেছি। বিদেশে সবার হাতে কিন্তু মোবাইল ফোন নেই। তারা সবসময় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু পুঁজিবাজারের কৌশল হিসেবে বড় বড় কোম্পানিগুলো অামাদেরকে বেছে নিয়েছে টাকা চুষে নেওয়ার জন্য। সবার হাতে মোবাইল ফোন, সবার হাতে ইন্টারনেট মোটেও ভাল কথা নয়। একটা ছোট বাচ্চার হাতে যদি ছুরি দেওয়া হয় সে বুঝবে না ছুরি দিয়ে অাপেল কাটতে হবে নাকি হাত কাটতে হবে। ঠিক তেমনি অনেক মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাবহারকারী জানে না প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। এ ব্যাপারে কঠোর নীতিমালা অানা উচিত।একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অাপনি প্রযুক্তির অপব্যাবহার বলতে কী বুঝাতে চাচ্ছেন? সালেহা খন্দকার: এদেশে কত বছর বয়স হলে বা কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে তা নিয়ে সঠিক কোন নীতিমালার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ছোট ছোট শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া হয় খেলার জন্য। এর ফলে খুব অল্প বয়সে শিশুদের মধ্যে পর্ণো অাসক্তি অাসার সম্ভাবনা দেখা দেয়। রাত জেগে ফেসবুক ব্যবহার করার ফলে ঘুমের ক্ষতি হয়। এর ফলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তেমনি পড়াশুনার ক্ষতি হয়। অামাদের প্রশ্নফাঁস, ইয়াবা, পর্ণো অাসক্তি এক সুতোয় বাধা। এগুলোর পেছনে অবশ্যই প্রযুক্তির অপব্যহার দায়ী। হ্যাঁ, অামি প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করার কথা বলছি না। অামি বলছি, স্কুলে চক-ডাস্টার অামরা যেভাবে টুলস হিসেবে ব্যবহার করি, প্রযুক্তিও সেভাবে ব্যবহার করা উচিত। প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া বা প্রযুক্তি অামাদেরকে নিয়ন্ত্রন করবে- তা কোনো ভাল দিক নয়। নির্দিষ্ট বয়সের অাগে শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন অাসা উচিত নয়।একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অাপনি বিভিন্ন সময় কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বলে অাসছেন। অনেকে তো কোচিংকে দরকারিও দাবি করছে...সালেহা খন্দকার: কোচিং বাণিজ্য যারা করছে তারা কিন্তু বাইরের কেউ নয়। এরাই কোনো না কোনো ভাবে বোর্ডে প্রশ্ন করার সঙ্গে জড়িত। মডারেশন করার সঙ্গে জড়িত। প্রশ্নফাঁসে জড়িত। এরাই কোনো না কোনোভাবে স্কুল পরিচালনা করছে। প্রশ্নফাঁসে এবার কোচিং সেন্টারগুলো সম্পৃক্ত থাকার কথা কিন্তু এবার গণমাধ্যমে এসেছে। প্রতিযোগিতার বাজারে তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিবছর বেশি এ প্লাস দাবি করছে। অার এ প্লাসের জন্য বেছে নিচ্ছে প্রশ্নফাঁসের মতো নৈতিক অবক্ষয়ের পথ।একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন হাতে পেতে অামাদের অভিভাবকরা মরিয়া ছিল। এটা কী একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত নয়?সালেহা খন্দকার: অবশ্যই। বলার অপেক্ষা রাখে না অামাদের নৈতিক অবক্ষয় খুব চরম পর্যায়ে অাছে। অাবার একটু বিপরীত দিক থেকে চিন্তা করি। সমাজ, রাষ্ট্র অামাকে শিখিয়েছে অামার সন্তানকে  এ প্লাস পেতে হবে। এ প্লাস না পেলে চলবেই না। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে। না হলে জীবন বৃথা। এরকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ওই জায়গা থেকে সব বাবা-মা এখন এ প্লাস পাওয়াটাকে সন্তানের ভবিষ্যতের অন্যতম নিশ্চয়তা মনে করে। তারা যখন দেখেন অন্য ছাত্র ছাত্রীরা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পাচ্ছে তখন তারা নিশ্চিন্তে বসে থাকবেন কীভাবে? তারাও সেই একই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন।একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে বলছেন। অামরা তো তাদের বিনোদনের কোনো সুযোগ দিতে পারছি না। তাদের কোনো খেলার মাঠও নেই। তাহলে তাদের বিকেলটা কাটবে কোথায়?সালেহা খন্দকার: হ্যাঁ, অামিও সেজন্যই বলছি পুরো সিস্টেমটাই পরিবর্তন করা দরকার। প্রযুক্তির অপব্যবহার-প্রশ্নফাঁস শুধু একটা সমস্যা নয়। বরং অনেকগুলো সমস্যার মধ্যে একটা দিক মাত্র। তাদের খেলার মাঠ নেই। টিভিতে শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান নেই। তাদের এখন বই পড়ার অভ্যাস নেই। নোংরা অপসংস্কৃতি অামাদের অাগামী প্রজন্মকে গ্রাস করার জন্য হা করে দাঁড়িয়ে অাছে। অামরা যদি শিশুদেরকে সুন্দর পরিচর্যা দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে অাগামীতে এ জাতি বনসাই হয়ে যাবে।একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাব্যবস্থায় বড় কোন ধরনের গলদগুলো অাপনার চোখে পড়ে? সালেহা খন্দকার: শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকে বড় বড় গলদ অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে অাছে। তাই বাহির থেকে হঠাৎ করে চোখে পড়ে না। গলদগুলোর জন্য কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দায়ী করার সুযোগ নেই। যেমন ধরুন, গ্রামের স্কুলগুলোতে কোন ভাল শিক্ষক বদলি হয়ে যেতে চান না। সবাই চান শহরে থাকতে। তিন বছর পর পর সরকারী নিয়ম অনুযায়ী সরকারী শিক্ষক বদলি হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু দেখা যায় কোনো কোনে প্রতিষ্ঠানে এক শিক্ষক ২৪-২৫ বছর করে থেকে যাচ্ছেন। অাবার সেখানে রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতা থাকছে। গ্রামের কলেজ- স্কুলগুলোতে নিয়োগ হয় রাজনৈতিক সুপারিশে। মেধাবী যোগ্য নিয়োগ প্রার্থীরা এক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়। অাবার ধরুন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের পদ অাছে চল্লিশটি। কিন্তু শিক্ষক অাছেন ১২০ জন। কারণ তারা গ্রামে যাবেন না। তাহলে সেখানে পড়াশুনার পরিবেশটা থাকে কীভাবে? অাবার গ্রামের দিকে বিপরীত চিত্র অাছে। সাবজেক্ট অাছে। কিন্তু শিক্ষক নেই। সব স্কুলে অাইসিটি সাবজেক্টটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অধিকাংশ স্কুলে অাইসিটি শিক্ষক নেই। এটা কী ফান? একুশে টেলিভিশন অনলাইন: এসব সমস্যা থেকে  উত্তোরনের উপায় কী? সালেহা খন্দকার: সুশাসন। সব জায়গায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করা না গেলে এসব সমস্যা কখনো মিটবে না। বরং বাড়তেই থাকবে। পরীক্ষা পদ্ধতি কী রকম হলো, সিলেবাস কেমন করলো, সৃজনশীল নৈর্বত্তিক থাকলো কী থাকলো না- এসবের চেয়ে এই অনিয়মগুলো দূর করা বেশী জরুরী। গ্রামে- মফস্বলে খেয়াল করলে দেখবেন, অল্পশিক্ষিত-অশিক্ষিত লোকগুলো রাজনৈতিক দাপটে স্কুল বা কলেজ পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে অাসে। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কী উন্নতি করবে? এসব ব্যাপারে অাইন অাসা দরকার। রাজনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন অাসবে না।/ এআর /

‘শিক্ষা কর্মমুখী না হওয়াই বেকারত্বের কারণ’

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সর্বোচ্চ সনদ নিয়ে করতে হচ্ছে কোচিংও। তাতেও অনেকের চাকরি মিলছে না। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোটার মারপ্যাঁচে ধুঁকছে মেধাবীরা। কোটা সুবিধা নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা ক্ষেত্রবিশেষে মেধাহীনরাও চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরি পরীক্ষা সর্বত্র দেদারসে চলছে প্রশ্নফাঁস। এতে লেখাপড়া না করেও ফাঁকফোকরে সনদ পেয়ে যাচ্ছে মেধাহীনরা। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা কোথায়? এর সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, লেখক ও  প্রাবন্ধিক ড. সৌমিত্র শেখরের। তার কথায় উঠে এসেছে প্রশ্নফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, কোটা পদ্ধতির সংস্কার, শিক্ষার্থীদের চাকরির সমস্যাসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি-গলদ। সৌমিত্র শেখর মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি না পাওয়ার বড় কারণ মনোস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। আমরা এখনও মনে করি যে, এমএ পাশ না করলে আমাদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মাস্টার্স পাশ করেও যদি সে বেকার থাকে তারপরও বাপ-মা মনে করে যে আমরা ছেলে এম এ পাশ। আর এসএসসি পাশ করেও যদি কেউ নিজ চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় তারপরও তার মনে কষ্ট থাকে যে, আমি কেন পোস্ট গ্রাজুয়েট হতে পারলাম না। অর্থাৎ আমরা ডিগ্রিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আর যে ডিগ্রিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি সেটা কর্মমুখী শিক্ষা না। এজন্যই গ্রাজুয়েশন করেও চাকরি হচ্ছে না বহু তরুণের। বাড়ছে বেকারত্ব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম । দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? সৌমিত্র শেখর : চাকরি না হওয়ার বড় কারণ মনস্তাত্ত্বিক। আমরা এখনও মনে করি যে এমএ পাশ না করলে আমাদের শিক্ষা শেষ হবে না। এম এ পাশ করেও যদি সে বেকার থাকে তারপরও বাপ-মা মনে করে যে আমরা ছেলে এমএ পাশ। আর এসএসসি পাশ করেও যদি কেউ নিজ চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় তারপরও তার মনে কষ্ট থাকে যে আমি কেন গ্রাজুয়েট হতে পারলাম না। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশে এর উল্টো চিত্র পাওয়া যাবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষ মনে করে যে, তাকে স্বাভলম্বী হতে হবে। এই যে আমাদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশে গেলে সহজে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হতে পারে, তার কারণটা কি? কারণ একটাই, ওখানে যারা থাকে তাকে গ্রাজুয়েশন করলেই হয়। পোস্ট গ্রাজুয়েশনে তারা আর ভর্তি হয় না। ওইযে আসনগুলো ফাঁকা থাকে ওই আসনগুলোতে আমাদের সন্তানেরা খুব সহজেই ভর্তি হতে পারে। আর ওইসব দেশের আসন যারা ফাঁকা করলো অর্থাৎ পোস্ট গ্রাজুয়েশন করলো না, তারা কিন্তু বসে থাকছে না। চাকরিতে ঢুকে যাচ্ছে। কারণ তারা আঠারো বছর বয়স থেকেই নিজের দায়িত্ব নিজেই নেয়। মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তাদের লেখা-পড়ার মধ্যে একটা বিষয় গুরুত্ব পায় সেটা হলো বৃত্তি বা চাকরি। সে ভাবতে থাকে কীভাবে জীবন-জীবিকা চালাবে। ভাবনা অনুযায়ী সেটা তারা পেয়েও যায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে সে বৃত্তিমূলক লেখা-পড়া গড়ে ওঠে নাই। যেহেতু মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমাদের মাথার মধ্যে কাজ করে যে, এমএ পাশ করতে হবে। এ কারণে কলেজগুলোতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন বাড়ছে কিন্তু পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেও ছেলে-মেয়েরা চাকরি পাচ্ছে না। মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে এটা আরও ভয়াবহ। মাদ্রাসায় একটি ছেলে ১২ বছর পড়েও আধুনিক আরবিতে ভালোভাবে কথা বলতে পারে না। এটা কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও মনস্তাত্ত্বিক কারণে আমরা সেটার খোঁজও নিই না। জানি না তাদের কারিকুলামটা কি। এমনকি যে সন্তানটা কারিগরিতে ভর্তি হলো আমরা তাদের অগ্রগতি সম্পর্কে জানিও না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে কোচিংয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বাণিজ্য থেকে বেরিয়ে শিক্ষাকে কীভাবে নিরেট সেবায় রূপান্তর করা যায়? সৌমিত্র শেখর : এটা আসলে সরকার একা পারবে না। যদি আমরা সহযোগিতা না করি। আমাদের রন্দ্রে রন্দ্রে ষঠতা। আমাদের আইন আছে, সেটা বলবার বা দেখাবারও মানুষ আছে। কিন্তু মান্য করার প্রবণতা কম আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ রোজগারের একটা বুনো উল্লাস চলছে। যাদের টাকা আছে তারাই এ উল্লাস করছে। একটি কম্পিউটার কোম্পানি বা সিমেন্ট কোম্পানি লাখ লাখ টাকা মুনাফা করে। এখন তারা যদি এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তো লাভ তো করবেই। কারণ তাদের মাথায় তো লাভের বিষয়টা আগে থেকেই রয়ে গেছে। এটাই সমস্যা। আমাদের দেশে যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছে তাদের অধিকাংশ শিক্ষা প্রসারে দেননি। মুনাফার জন্য দিয়েছেন। যে কারণে লবণ কারখানার কাছ থেকে যে মুনাফা প্রত্যাশা করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সে মুনাফা প্রত্যাশা করা হয়। এটা যতদিন না বন্ধ হবে, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন যতদিন না আসবে ততদিন ব্যবসা বন্ধ হবে না। মনে রাখবেন আমাদের দেশের গণতন্ত্র আর যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র কিন্তু এক না। অ্যারিস্টোটল, প্লেটো এমনকি জর্জ ওয়াশিংটনের শিক্ষাটা ছিল সমশিক্ষিতের মধ্যে। অর্থাৎ এলিট শ্রেণী যারা তারা চিন্তা করে ভোট দেবে। সেক্ষেত্রে চিন্তার দিক দিয়ে সব ভোটারের মধ্যে সমতা থাকবে। আর আমাদের দেশে প্রত্যেকেই ভোটার। এখানে পিএইচডি হোল্ডার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার তাদের ভোটের মূল্য যা একজন হেরোইন খোরের ভোটের মূল্য তা। দু’জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক যদি ভোট দেন, আর ৫ জন হেরোইন খোর যদি ভোট দেন। তবে ৫জনের মতটা স্বীকৃত হবে। আমাদের গণতন্ত্রের মূল চেতনাটা এখানে। এ কারণে যারা ভোটের রাজনীতি করে তারা একটা সংকটে থাকেন। কারণ সিমেন্ট বা লবণ কারখানার মালিক যে বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছে, তার কথায় হাজার মানুষ উঠবস করে। আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাণিজ্য বন্ধ্ করবো? তার আগে ভাবতে হয় যে লবণ কারখানার মালিকের কাছে হাজারটি ভোট আছে। সুতরাং এটা করা যাবে না। তাই কোনো সরকার এ কাজে হাত দিতে পারে না। গণতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা কাজ করে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাসকাল (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) অতিবাহিত করছে দেশ। অথচ সরকারি হিসেবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। আমরা দেশের এই বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তিকে কেন কাজে লাগাতে পারছি না? মূল সমস্যা ও সমাধান কোথায় নিহিত? সৌমিত্র শেখর : ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট একটা টেকনিক্যাল বিষয়। কারণ আধুনিক বিশ্বে শারীরিক ক্ষমতা কোনো ক্ষমতা না। এই ব্যারোমিটারটা ৬০ বছর আগে ঠিক ছিল। কিন্তু আজকে আমাদের এখানে এটা ঠিক না। কারণ এখন শারীরিক শক্তির জায়গাতে টেকনোলজিটাই বড় ব্যাপার। মানুষ এখন কাপড় কাঁচে মেশিনে, ঘর মুছে মেশিনে, ক্রেন দিয়ে ভারি জিনিস তোলে। ফলে আমরা যেটা নিয়ে গর্ব করছি সেটা প্রকৃত অর্থে ৬০ বছর আগে হলে ঠিক ছিল। যখন টেকনলজি ছিল না। এখন বরং জনসংখ্যা আমাদের এখানে একটা ভার। জনসম্পদের কথা বলে বলে আবার দেশের জনসংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। মানুষ কয়েক বছর আগে পরিবার পরিকল্পনার প্রতি ঝুঁকে গেলেও এখন আবার বহু সন্তানের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। বহির্বিশ্ব টেকনোলজিকে গুরুত্ব দিয়েছে। যে কারণে তারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। তারা মানুষের আয়ুস্কাল বাড়িয়েছে। তারা ১২০ বছরে বৃদ্ধ হয়। আমাদের দেশে ৬০ পেরুতেই বৃদ্ধ হয়ে পড়ি। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে এ যুবশক্তি বা শ্রমঘণ্টা কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। সেক্ষেত্রে প্রযোজনে বহির্বিশ্বের সহযোগিতা কাজে লাগানো।অতি দ্রুত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। তা না হলে গায়ের শক্তি দিয়ে কিছু হবে না। বোঝা-ই বাড়বে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অনেকের অভিমত, শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? সৌমিত্র শেখর : আমাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা ধ্বসে যাচ্ছে। একশ’ বছর আগে আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি আজ তা পাচ্ছি না। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুখ জিনিসটার সংঙ্গা খুঁজে না পাওয়া। সুখটা যে নীতির ওপর, সন্তুষ্টির ওপর, আত্মতৃপ্তির ওপর নির্ভর করে। সেটা অনুধাবন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। যে কারণে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শিক্ষিত হয়েও নীতি-নৈতিকতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারিবিারিক শিক্ষা, মমত্ববোধ, সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। পারিবারিকভাবে অনুধাবনে আনতে হবে যে জীবনে নীতি-নৈতিকতার মধ্যেই সুখ। মা-বাবাকে আগে পরিশুদ্ধ হতে হবে। তারপর সন্তানদেরও নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মানুষকে  বোঝানো হয় না পরার্থে জীবন দেওয়ার গল্প। অন্যের উপকারে নিজের সুখ পাওয়া গল্প। যার কারণে শিক্ষিত হয়েও ছেলে-মেয়েরা নীতি-নৈতিকতা, অন্যের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে যাচ্ছে। ছেলে-মেয়েরা ক্যারিয়ার নিয়েই ব্যস্ত থাকছে। প্রতিবেশির খোঁজ নিচ্ছে না। আর সে ক্যারিয়ার হচ্ছে শুধুমাত্রা নিজেকে ঘিরে। তাই আগের মতো এখন আর যৌথ পরিবারও দেখা যায় না। টেকনোলজির অপব্যবহার আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। পরস্পর যোগাযোগ ও মমত্ববোধ বিনষ্ট করছে। চারজন ঘরে থাকলে কেউ মোবাইল, কেউ টেলিভিশন, কেউ ল্যাপটপ, কেউবা একা একাই ঘুরছে। এসব থেকে রক্ষা পেতে আমাদের আবার ফিরে আসতে হবে আমাদের মাটির কাছে, বাঙালির সংস্কৃতির কাছে। আবার ফিরতে হবে আমাদের অতিত ঐতিহ্যের কাছে। একাডেমিক ক্ষেত্রে পড়া-লেখার ভারটা কমাতে হবে। আমি মনে করি ছেলে-মেয়েদের যুক্ত করে রাখা হয়েছে তথাকথিত পাঠ্যপুস্তকে। এটা আসলে পাঠ্যপুস্তক না, অপাঠ্যপুস্তক। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন দরকার আছে কি না? সৌমিত্র শেখর : আমরা তো শিক্ষানীতি নিয়ে এগোতেই পরিনি। পরিবর্তন কী করবো। শিক্ষানীতির পরিবর্তন দরকার নেই। তবে ২০১০ সালে যে শিক্ষানীতি আছে সেটা ধরেও আমরা এগোতে পারছি না। এগোতে পারলে হয়তো আমরা সুফল পাবো। আরকে// এআর

‘বংশ পরম্পরায় কোটার সুবিধা পুনর্বিবেচনা দরকার’

একসময় নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যেতো। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়-মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে। এখন তো সেটি আরও ব্যাপকতা পেয়েছে। এইচএসসি-এসএসসির পর প্রাথমিক সমাপনীর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনাও ঘটছে। প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের রাতেই প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। সেই প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে সার্টিফিকেট নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে হুমকির মুখে এমনকি বিপর্যায়ে ফেলে দিচ্ছে এ প্রশ্নফাঁস। গত একমাস জুড়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বড় জায়গাজুড়ে স্থান পেয়েছে এসএসসিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর। এ নিয়ে তুমুল বির্তক চলছে দেশজুড়ে। একের পর এক প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। এ থেকে উত্তরণে ওপেন বুক এক্সামের প্রস্তাব করেছেন শিক্ষাসচিব। কেউ কেউ বলছেন, সব পরীক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটানো দরকার। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অনেকেই বলছেন শিক্ষকদের তৈরি না করে শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতি সংযোজন করায় বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। যার কারণে বাধ্য হয়ে কোচিংয়ের ধারস্থ হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাই সৃজনশীল পদ্ধতিকে আদর্শ শিক্ষাপদ্ধতি মানতে নারাজ বহু শিক্ষাবিদ। এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী না হওয়ার কারণে একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। আবার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোটার মারপ্যাঁচে ধুঁকছে মেধাবীরা। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? এর সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, লেখক ও  প্রাবন্ধিক ড. সৌমিত্র শেখর এর। তার কথায় উঠে এসেছে প্রশ্নফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, কোটা পদ্ধতির সংস্কার, শিক্ষার্থীদের চাকরির সমস্যাসহ শিক্ষাব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি-গলদ। সৌমিত্র শেখর মনে করেন, বংশ পরম্পরায় কোটা ব্যবস্থা চলমান থাকার ব্যাপারটি পুনর্বিবেচনার দরকার। বড়জোর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কোটা সুবিধা ভোগ করতে পারে। কিন্তু নাতি-নাততিরা এ সুবিধা ভোগ করাটা কতটা যৌক্তিক সেটি ভেবে দেখা দরকার। এছাড়া সব সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বয়সসীমা বেধে দেওয়ার মধ্যেও কোনো যুক্তি নেই বলে মনে করেন এ শিক্ষাবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম । দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সম্প্রতি বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বির্তক চলছে দেশজুড়ে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে নানা মহল থেকে। ইতোমধ্যে ওপেন বুক এক্সামের প্রস্তাব করেছেন শিক্ষাসচিব। পরীক্ষা পদ্ধতিটা আসলে কেমন হওয়া উচিত? সৌমিত্র শেখর: আমাদের দেশে পরীক্ষা এমন একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে শুধুমাত্র একটি সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে।বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষাগুলো যে পর্যাযে গেছে, তাতে প্রকৃত মেধাবী যারা, তাদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন। আমি পরীক্ষাকে দুটি ভাগে ভাগ করতে চাই। এর একটি হচ্ছে সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্যে যে পাবলিক পরীক্ষাগুলো হয় সেটা। অপরটি হচ্ছে চাকরি দেওয়ার জন্যে যে পরীক্ষা হয় সেটা। দুটি পরীক্ষার চরিত্র ভিন্ন, পাবলিক পরীক্ষায় সনদ দেওয়া বা নেওয়ার ব্যাপার থাকে।এই জায়গায় পরীক্ষা গ্রহণ, খাতা মূল্যায়ন এবং সবশেষে সনদ দেওয়া। এসবের সঙ্গে সরকারের ভাবমূর্তি নির্ভর করে, পরিবারের শান্তি নির্ভর করে; যে পরীক্ষার্থীর সন্তুষ্টি নির্ভর করে। এ পরীক্ষাটি খানিকটা উৎসবে মতো হয়। পিইসি, জেএসসি ও এসএসসি অনেকটা এ উৎসবের মধ্যে পড়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে পরীক্ষার্থীসহ মা-বাবা চান যেন জীবনের প্রথম পরীক্ষায় ভালো ফল হয়। কিন্তু দ্বিতীয় যে ধাপটি আছে সেটি হলো-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা বা চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা। এই পরীক্ষাটি হলো এক্সামিনেশন অব এলিমিনেশন। অর্থাৎ এটি সার্টিফিকেট দেওয়ার পরীক্ষা নয়, বাদ দেওয়ার পরীক্ষা। প্রথম পাবলিক পরীক্ষাটা কত বেশি পাশ করলো এ ক্রেডিট নেওয়ার পরীক্ষা। সে ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে থাকে, পরিবারের পক্ষ থেকে থাকে; পরীক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও থাকে। মা-বাবা বলে আনন্দ পান যে, তার সন্তান এতো পয়েন্ট পেয়ে পাশ করেছে। আর যারা পরীক্ষা নেন অর্থাৎ সরকারও ফলাও করে প্রচার করে যে তাদের এতো শতাংশ পাশ করেছে। ওমুক বোর্ড থেকে ওমুক বোর্ডে পাশের হার এতো বেশি। অথবা গত বছরের তুলনায় এ বছর পাশের হার এতো বেশি।শিক্ষার হার বাড়ছে। এই যে উৎসব মুখরপরিবেশ ও প্রতিযোগিতা। এখানেই প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রকৃত শিক্ষা এখানে গৌণ হয়ে পড়ে। মুখ্য হয় সনদ নেওয়া। এছাড়া পরীক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপও প্রশ্নফাঁসের কারণ। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি বলতে চাচ্ছেন পরীক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপও প্রশ্নফাঁসের কারণ? সৌমিত্র শেখর: পরীক্ষায় অনেক বেশি বিষয় থেকে প্রশ্ন আসাও প্রশ্নফাঁসের কারণ।আমরা যদি শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞান এ চারটি বিষয় ছেলে-মেয়েদের শিখাতে চাই, সেখানে যে বিষয়ে প্রশ্নফাঁস হবে সে বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ধরতে হবে। কেন তার প্রশ্ন ফাঁস হলো। এছাড়া আমাদের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও দশম তথা শ্রেণীভিত্তিক যে পাঠ্য বিষয় আছে সেটা ঠিক নেই। দেখা যাচ্ছে পঞ্চম শ্রেণীতে যে ছাত্র ৬টি বিষয়ে পড়লো। এক বছর পরেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে তাকে পড়তে হচ্ছে ১০টা বা তার অধিক বই। আবার দশম শ্রেণীতে পড়ানো হচ্ছে আরো বেশি। এখন কথা হচ্ছে যে শিক্ষার্থী ২০১৬ সালে ৬টি বিষয়ে পড়লো। সে এমন কী যোগ্যতা অর্জন করেছে যে, পরের বছর ২০১৭ তে তার ঘাড়ে ১০টি বই চাপিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের শিক্ষায় এই যে বাড়তি চাপ শিক্ষার্থীরা হয়তো নিতে পারছে না। এই যে পূর্বাপর বিবেচনা ছাড়া বাড়তি চাপ। এটার কারণে ছেলে-মেয়েরা সব বিষয় আয়ত্ব করতে পারছে না। যার কারণে পরীক্ষার সময় এলে তারা প্রশ্নফাঁস বা অসদুপায় অবলম্বন করতে থাকে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সনদের বিষয়টি পাবলিক পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নিয়োগ পরীক্ষায় তো সনদ নাই, তবে কেন এ পরীক্ষাতেও প্রশ্নফাঁস হচ্ছে? সৌমিত্র শেখর: পরীক্ষা নিয়ে যখন আলোচনা করবো তখন একমুখী আলোচনা করা যাবে না। সরকারি চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এটা এক রকম। আবার পাবলিক পরীক্ষাগুলো আর এক রকম। সরকারি চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় সিজিপিএ অপেক্ষাকৃত বেশি রাখা উচিত। যাদের বেশি সিজিপিএ আছে শুধু তারাই অংশ নিতে পারবে।এসব পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরিধি কমিয়ে আনতে হবে।এটা করলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নফাঁস কমে যাবে। পরীক্ষায় প্রার্থী বেশি থাকার কারণে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গাতে এক যোগে পরীক্ষা নিতে হয়। দূরত্বের জায়গাগুলোতে আগে থেকেই প্রশ্ন পাঠাতে হয়। সেখানেই হয় গলদ।অর্থাৎ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গাতে প্রশ্ন নেওয়ার সময় প্রশ্নফাঁস হয়। অল্প সংখ্যক পরীক্ষার্থী হলে অল্পসংখ্যক কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়। তাতে প্রশ্নফাঁস বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে প্রশ্নফাঁসে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আমরা প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে পারি নাই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারি নাই। এটা করতে পারলে প্রশ্নফাঁস বন্ধ করা যেতো। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি কী বলতে চাইছেন পরীক্ষা সনদ কেন্দ্রীক হয়ে পড়েছে, যার জন্য এমন প্রশ্নফাঁস হচ্ছে? সৌমিত্র শেখর: অনেকটা তাই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ শতাংশ পাশ করলে পত্রিকায় বড় করে সংবাদ আসে যে মাত্র এতো শতাংশ পাশ করেছে।কম পাশ করার সমালোচনা হয়।কিন্তু অনেকে বুঝেই না যে এটা ফেল করানোর পরীক্ষা, পাশ করানোর না। পারলে ২ শতাংশ না, ১ শতাংশ পাশ করাবে। সেটাই ভালো।তাতে যারা মেধাবী তারাই আসতে পারবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বর্তমান সময়ে সাধারণ চাকরি প্রত্যাশীদের মধ্যে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবি বেশ জোরালো হয়ে উঠছে। দাবির প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে কোটায় কোন পদ শূণ্য থাকলে তা মেধাতালিকা থেকে নেওয়ার পরিপত্রও জারি হয়েছে। আসলে কোটা বাতিলের দাবি কতটা যৌক্তিক? আর সেটার প্রেক্ষাপটে মেধাতালিকা থেকে নেওয়ার ঘোষণাও বা কতটা বাস্তবসম্মত? সৌমিত্র শেখর: মেধাতালিকা থেকে নেওয়ার ঘোষণাটা মন্দের ভালো। তবে এ ব্যাপারে আমার স্পষ্ট বক্তব্য হলো-বংশ পরম্পরায় চাকরির ব্যাপারটি পুনর্বিবেচনার দরকার। এখানে বড় জোর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পর্যন্ত ঠিক আছে।এ সন্তানদেরও না দিলে-ই ভালো হয়। তবে সার্বিক দিক বিবেচনায় শুধু সন্তান পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। পরবর্তী ধাপগুলোর সুযোগ উঠিয়ে দেওয়া উচিত। এটা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ থেকে স্বাভাবিকভাবে কমে আসতে থাকবে। অর্থাৎ আমরা ঘোষণা দিয়ে বন্ধ না করেও পদ্ধতিগতভাবে এটা বন্ধ করে দিতে পারি। পদ্ধতিটা হলো আমরা যদি বলি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাহলে মুক্তিযোদ্ধার নাতি আর আবেদন করতে পারবে না। এটা সরকারে একটা এক্সিট পয়েন্ট বলে আমি মনে করি। সরকারের পক্ষ থেকে একটা সিদ্ধান্ত দিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করি। আমাদের পরিবার থেকেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন। বহুজনের পরিবার থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এদের অনেকে সার্টিফিকেট নিয়েছেন, আবার অনেকে সার্টিফিকেট নেননি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে মনে করি। তার মানে এই নয় যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর হতে যাচ্ছে। সেই জায়গাই যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে কিন্তু সার্টিফিকেট নেননি, অথবা পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ বা এ ধরণের ক্ষেত্র তৈরি হয়নি বলে মুক্তিযোদ্ধা হতে পারিনি। তাদেরকে চাকরির ক্ষেত্রে কোটার মাধ্যমে সঙ্কুচিত করে ফেলি। সরকার যদি মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানদের জায়গাই এসে কোটার বিষয় পুনর্বিবেচনা করেন।তাহলেই আমার মনে সরকারের জন্য এটি ইতিবাচক হবে। এটা বর্তমান প্রজন্মের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে। সরকারের জন্য ভালো হবে। বিষয়টি একটা সম্মানজনক জায়গায় দাঁড়াবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর। পৃথিবীর অন্যদেশের তুলনায় এ বয়স বাড়িযে ৩৫ বছর করতে সাধারণ চাকরি প্রত্যাশিরা দাবি তুলেছে। তাদের দাবিকে আপনি কতটা যৌক্তিক মনে করছেন? সৌমিত্র শেখর: চাকরি পাওয়ার অধিকার আসলে সবার-ই আছে। আমার মনে হয়, চাকরির ক্ষেত্রে আমরা যে বিষয়টা মাথায় রাখছি; সেটা হচ্ছে সব চাকরির ক্ষেত্রে বয়স একই হওয়া উচিত। সেজন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আসলে ঢালাওভাবে সব চাকরির  ক্ষেত্রে এমন বয়স বেঁধে দেওয়া বাস্তব সম্মত না। কোনো কোনো চাকরির ক্ষেত্রে বয়সসীমা বাড়ানো যেতে পারে। যেখানে অপেক্ষাকৃত শারীরিক পরিশ্রম কম হবে। সেখানে অবশ্যই চাকরির বয়স বাড়ানো যেতে পারে। তাছাড়া যারা চাকরিতে প্রবেশ করবে তারা তো যোগ্যতার পরিচয় দিয়েই ঢুকবে। তবে কেন বয়স দিয়ে তাদের আটকে দেওয়া হচ্ছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরি প্রত্যাশিদের যুক্তি পৃথিবীর অনেক দেশে কোন বয়সসীমা নাই। আবার থাকলেও তা বাংলাদেশের ৩০ বছরের চেয়ে বেশি। তাদের বক্তব্য কতটা যৌক্তিক মনে করছেন? সৌমিত্র শেখর: পৃথিবীর বহুদেশে এমনকি আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা এতোটা শক্ত করে ধরা হয়নি। যেমন সেনাবাহিনীতে যারা চাকরিতে যোগ দিবে তাদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর নয়। অর্থাৎ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে শারীরিকভাবে শক্তিশালীদের নিয়োগ দিতে হয়। যে কারণে ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে তাদের প্রবেশের বয়সসীমা রাখা হয়। কিন্তু যারা রেলওয়ে বা পোষ্ট অফিসে যাবে তার জন্যে তো বয়সসীমা দরকার নেই। সে তো সেখানে ৪০ বছরেও কাজ করতে পারে। পার্শবর্তী দেশ ভারতে এমন পদ্ধতি আছে। তারা প্যানেল করে রাখে। প্যানেল অনুসারে চাকরিতে ডাকে।সে অনুযায়ী প্রার্থীরা চাকরিতে যোগ দিতে পারে। অর্থাৎ এক একটা পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এক একটা পৃথক প্যানেল গঠন করা হয়।ওই দেশগুলোর নিয়ম হচ্ছে রেলওয়েতে চাকরির জন্য বাংলাদেশের মতো পিএসসির মাধ্যমেই যেতে হবে তা নয়। তারা পৃথক চাকরির জন্য পৃথক পৃথক বোর্ড করেছে। আবার পদমর্যাদার ক্ষেত্রে সমন্বয় করেছে।তাদের এটি সুদূর প্রসারী আমলাতান্ত্রিক চিন্তার প্রতিফল। সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে আগামীকাল। / এআর /    

‘প্রশ্নফাঁস নিয়ে আমরা কেউ অনুতপ্ত হচ্ছি না’

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড বলা হলেও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন। প্রশ্নফাঁস আজ বড় ধরনের সমস্যা। এই সমস্যার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অনেকটাই উদাসীন বলে মনে করেন অধ্যাপক শফি আহমেদ। অধ্যাপক শফি আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ বছর ধরে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি শিক্ষা আন্দোলন, শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। পাঠ্য বই সংস্কার, শিক্ষার মান, শিক্ষক সমস্যাসহ শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশ্নফাঁস। এজন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ প্রশ্নফাঁসের ব্যপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যতোটা তৎপর হওয়া দরকার ততোটা তৎপর হচ্ছে না। প্রশ্নফাঁসের জন্য সরকার দায়ী তা আমি বলব না। কারণ, এতে সরকারের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। তবে, শিক্ষা মন্ত্রনালয় ব্যপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছেন এটাও মনে হচ্ছেনা। আমাদের সমাজে একটা ট্রেন্ড দাঁড়িয়ে গেছে, অন্যায় করলেও নানা ফন্দি ফিকির করে বেরিয়ে যাওয়া যায়। এর ফলেও অপরাধীরা খুব বেশি ভয় পায় না বা পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিটাই এমন যার ফলে প্রশ্নফাঁস করা সম্ভব হচ্ছে। পরীক্ষা পদ্ধতিটা এমন হতে পারে যাতে প্রশ্নফাঁস করা যাবেনা বা ফাঁস করলেও লাভ হবেনা। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ প্রশ্নফাঁস পুরোপুরি রোধ করা কি সম্ভব? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি প্রশ্নফাঁস রোধ করা সম্ভব। একটা উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। প্রশ্নের প্যাকেট সিলগালা করে রাখা ও পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে না খোলা। দ্বিতীয়ত, দাবি করা হচ্ছে, প্রশ্নের নৈর্ব্যক্তিক অংশ ফাঁস হয়। তাহলে তা একেবারেই আলাদা করে রাখা যায়। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর প্রথমে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন দিয়ে ত্রিশ মিনিটে তা শেষ করে খামবন্ধ করে ফেলা যায়। এরপর বর্ণনামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়া যেতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা ব্যবস্থার মানকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একদম শেষ হয়ে গেছে তা মনে করি না। মনে করুন আমাদের এবারের পরীক্ষার্থী বিশ লাখ। প্রশ্নফাঁসের ফলে হয়তো পঞ্চাশ ষাট হাজার পরীক্ষার্থী তার ফল পেয়েছে। তাই বলে আমি সাড়ে উনিশ লাখ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করব তা হতে পারেনা। কিন্তু নোংরা ব্যাপার হচ্ছে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে তা আমরা জেনে যাচ্ছি এবং এটা নিয়ে কেউ অনুতপ্ত হচ্ছি না। এই  প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে পাস করছি। এই ছেলেমেয়েগুলো এমএ পাস করে যখন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসবে, তখন ইন্টারভিউ বোর্ড বলবে, আপনি যে সময় পাস করেছেন তখন প্রশ্নফাঁস সহজ ব্যাপার ছিল। এতে ওই প্রার্থী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন প্রবর্তন সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসছে। আপনি কী সৃজনশীল পদ্ধতি বাতিল করার পক্ষে? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ না, আমি মোটেও সৃজনশীল পদ্ধতি বাতিল করার পক্ষে নই। বরং আমি মনে করি এটা আধুনিক ও সত্যিকারের পরীক্ষা পদ্ধতি। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতি পড়ানোর যে প্রক্রিয়া বা পরীক্ষা নেওয়ার যে প্রক্রিয়া তা সঠিক নয়। অত্যন্ত হাস্যকর একটা ব্যপার, সৃজনশীলেরও গাইড বেরিয়েছে। গাইড বা নোট বইয়ের ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচার জন্যই সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল, একজন শিক্ষার্থী সারা জীবন বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাথা খাটিয়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারা। কিন্তু এখন দেখি বিভিন্ন স্কুলে ষান্মাসিক বা অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় গাইড বই থেকে সৃজনশীল প্রশ্ন করা হচ্ছে। তার মানে আমরা আমাদের শিক্ষকদেরও শেখাতে পারিনি, সৃজনশীল পদ্ধতিটা কী বা কীভাবে এর প্রয়োগ করতে হয়। পৃথিবীর সব জায়গায় দাঁড়ানোর জন্য, নিজের মেধা খাটানোর জন্য সৃজনশীল পদ্ধতিটা দরকার। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ একটা সময় নকলের জয়জয়কার ছিল। এখন প্রশ্নফাঁসের জোয়ার চলছে। কিন্তু পরীক্ষার্থীরা উপলব্ধি করবে, আমি সৎ থাকব। নকল করব না বা প্রশ্নফাঁস করব না- এমন কোনো বোধ কী তৈরি করা যায়? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ একজন শিক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থী তো আমাদের পরিবারে জন্মায়। আমাদের সমাজেই তার বেড়ে উঠা। সে যদি তার পরিবারে নীতি নৈতিকতার চর্চা দেখে, স্কুলে তার শিক্ষকের মধ্যে আদর্শবোধ ও সততা দেখে, তাহলে তার মধ্যে একটা নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে। দু:খের বিষয় হলেও সত্য আমরা সেই আদর্শবোধ আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জন্ম দিতে পারছি না। এটার জন্য ওরা নয়, আমরাই দায়ী। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষে বিভিন্ন দাবি আসছে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে টেনথ্ গ্রেডের আগে কোনো পরীক্ষা নাই। এখন যে পরীক্ষা হচ্ছে, আগে তাও ছিল না। তার মানে হলো, একজন ছাত্রের বয়স অনুযায়ী তাকে যা দেওয়ার শিক্ষক তা দিচ্ছে ও ছাত্র তা ধারণ করতে পারছে। অতটুকু সততা ও বিশ্বাস ওরা নিজের প্রতি রাখে। আমরাও সেরকম উদ্যোগ নিতে পারি। কিন্তু সেজন্য প্রথম কাজ হবে এখন মান্ধারতার পদ্ধতির সঙ্গে অভ্যস্ত যেসব শিক্ষকরা আছে তাদের বিদায় দেওয়া। তবে হ্যাঁ, তাই বলে আমি শুধু শিক্ষকদের দোষ দিচ্ছি না। অভিভাবকরা কী করছেন? এই মাত্র X এর ক্লাস থেকে বেরিয়ে আবার Y এর ক্লাসে যাওয়া, সেখান থেকে Z এর ক্লাসে। এভাবে একটা ছাত্রকে বইয়ের ব্যাগের নিচে সব সময় চাপিয়ে রেখে তার বিকাশের পথটাকেই তো বন্ধ করে দেওয়া হল। এভাবে চলতে থাকলে তো এই প্রজন্ম অসুস্থ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের ছাত্রদের মুখস্থ বিদ্যার দিকে ঠেলে দেই। এটার জন্য আমাদের সিলেবাস দায়ী। যদি আমরা আধুনিক বিশ্বের মতো সৃজনশীল পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে পারতাম, তাহলে কিন্তু ছাত্ররা মুখস্থ করতো না। এখন বইগুলোতে যা দেওয়া আছে তা মুখস্থ না করে কোন উপায় নেই। আমাদের এখনকার স্কুল বইগুলো পড়ে শিক্ষার্থীরা খুব মজা পাবে তা ভাবার কোন কারণ নেই। শিক্ষার্থীরা মনে করছে, ওটা মুখস্থই করতে হবে। আবার কিছু কিছু শিক্ষক মনে করছেন, ওই প্রশ্নের উত্তরে ওই অংশটুকুই লিখতে হবে। নয়তো নাম্বার দেওয়া যাবেনা। এভাবে শিক্ষার্থীর বিকাশ হওয়া সম্ভব না। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ ইতোমধ্যে তো বেশ কয়েকবার পাঠ্য বই সংস্কার হয়েছে। এর ফলে কোন সুফল কী আমরা পেয়েছি? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ আমি পাঠ্যবই সংস্কারের ব্যপারে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। তারা বলছেন, সংস্কার করছেন। কিন্তু যে সংস্কার হচ্ছে তার কোন ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছেনা। পাঠ্য বইয়ে নাম থাকে খুব বড় বড় লোকের। কিন্তু তারা কতোটা কাজ করেন, তা আমি জানি না। তারা নিজেরাও মাঝে মাঝে স্বীকার করেন, তারা অতোটা কাজ করেন না। পাঠ্যবই সংস্কারে খুব ইতিবাচক ফল না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, খুব তাড়াহুড়ো করে পাঠ্যবই প্রনয়ণ করা। আমি বলি, ক্লাস থ্রি, ফোর, ফাইভের বাচ্চাদের বই তৈরি করতে কয়েকজন নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকের অন্তত এক থেকে দেড়বছর সময় লাগা উচিত। আরেকটা ব্যপার হলো বই তৈরির সময় তাদের বয়স, মনস্তত্ব, শিক্ষার্থীদের পারিপার্শ্বিক আবহ- এসব বিবেচনায় আনা। কিন্তু এখন এসব মোটেও বিবেচনা করা হয়না। যে ক্লাসের শিক্ষার্থী বইগুলো পড়বে তাদের নিউট্রিশন লেভেল নিয়েও ভাবা উচিত। যেন তারা তা গ্রহণ করতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সিলেবাস পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত? অধ্যাপক শফি আহমেদঃ আমাদের সিলেবাসের সূচিপত্রে বৈচিত্র থাকলেও বিষয়বস্তু খুব একঘেয়ে ও বৈচিত্রহীন। যা শুধুমাত্র মুখস্থবিদ্যায় উৎসাহী করে। এর কোন বিশ্লেষণী দিক নেই। একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার- যে ভালো চোর, সে ভালো পুলিশ হতে পারে। কারণ, সে জানে অপরাধ কোন জায়গায় সংগঠিত হতে পারে। এটাই বিশ্লেষণী ক্ষমতা। যা আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অনুপুস্থিত। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেওয়ার পরও অনেককে বেকার থাকতে হয়। অর্থাৎ, শিক্ষা তার পেশাগত জীবনে ফল দিচ্ছে না। মুখস্থ বিদ্যার দৌড় খুব বেশি নয়। দ্বিতীয়ত, অল্প কিছুদিন পরপর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা উচিত। একবার প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনমাস খবর নিলাম না। তা হলে তো হবে না। প্রত্যেক শিক্ষককে দশ পনের দিন অন্তর অন্তর একদিনের জন্য হলেও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। কারণ, পৃথিবী প্রত্যেক দিন আপডেট হয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইনঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য। অধ্যাপক শফি আহমেদঃ আপনার প্রতিও কৃতজ্ঞতা ও একুশে টেলিভিশন পরিবারের প্রতি শুভ কামনা। / এআর /

‘প্রতিবন্ধী-উপজাতি ছাড়া সব কোটা তুলে দিতে হবে’

‘শারীরিক প্রতিবন্ধী ও দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ছাড়া চাকরির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত। কোটা পদ্ধতির কারণে তৈরি হচ্ছে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদি গোষ্ঠী। ফলে অনেক শিক্ষিত যুবক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কোটার জাতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজেকে মেলে ধরতে পারছেন না। কোটা পদ্ধতি বহাল থাকলে দেশের মঙ্গল তো দূরের কথা জাতি সম্পূর্ণ মেধাহীন হয়ে পড়বে।’ এমনটাই মনে করেন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ। সম্প্রতি একুশে টিভিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকার তিনি এসব কথা করেন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান । দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব পাঠকের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো-

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি