মানুষের জীবন বাঁচানোর এক নীরব যোদ্ধা আনসার-ভিডিপি সদস্য সরোয়ার
প্রকাশিত : ১১:৪৪, ৩ জুন ২০২৬
সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা প্রচারের আলোয় না থেকেও মানুষের কল্যাণে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত সুবিধা, আর্থিক লাভ কিংবা স্বীকৃতির কথা না ভেবে মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তেমনই একজন মানবিক মানুষ হলেন সরোয়ার উদ্দিন আনসারী, যিনি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন সদস্য।
দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে স্বেচ্ছাসেবী ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন সরোয়ার উদ্দিন আনসারী। রক্তের অভাবে যেন কোনো রোগীর জীবন ঝরে না যায় এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বছরের পর বছর কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
জরুরি মুহূর্তে রক্তদাতা সংগ্রহ, রোগীর স্বজনদের সাথে সমন্বয়, হাসপাতালভিত্তিক সহযোগিতা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ইতোমধ্যে হাজারেও বেশি রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। দিন হোক কিংবা গভীর রাত, কোনো অসহায় পরিবার রক্তের জন্য সাহায্য চাইলে তিনি সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।
তার এই মানবিক কাজের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো, তিনি কখনো এই সেবার বিনিময়ে কোনো অর্থ, উপহার, সম্মানী কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করেননি। বরং রক্তদাতাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে আবার তাদের নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিজের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচ, যাতায়াত ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ তিনি নিজের পকেট থেকেই বহন করেন।
শুধু তাই নয়, রক্তসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিমাসে তার মোবাইল ফোন বিল বাবদ প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগী, তাদের স্বজন এবং রক্তদাতাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে গিয়ে এই ব্যয় বহন করতে হয় তাকে। কিন্তু কখনোই তিনি এই খরচের বোঝা মানুষের ওপর চাপিয়ে দেননি কিংবা কারও কাছ থেকে অর্থ দাবি করেননি।
সরোয়ার উদ্দিন আনসারীর মানবিক কর্মকাণ্ড শুধু রক্তসেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, এতিম ও পথশিশুদের কল্যাণেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে এতিমখানা, মাদ্রাসা এবং পথশিশুদের মাঝে খাবার বিতরণ, ইফতার মাহফিলের আয়োজন, বৃক্ষ রোপণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযান, ঈদ উপহার বিতরণ এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন দুর্যোগকালীন সময়ে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে মানুষের দুর্দিনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার অবদান অনেকের কাছেই সুপরিচিত। টানা প্রায় তিন বছর তিনি হাসপাতালটিতে দূর-দূরান্ত থেকে আগত অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের ভর্তি সংক্রান্ত সহযোগিতা, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য প্রদান, রক্তের ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সেবামূলক কার্যক্রমে নিয়মিত কাজ করেছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, অচেনা শহরে এসে যখন তারা দিশেহারা হয়ে পড়তেন, তখন সরোয়ার উদ্দিন আনসারীর সহযোগিতা তাদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতো।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী মহল এবং সাধারণ মানুষের মতে, সরোয়ার উদ্দিন আনসারীর মতো মানুষেরাই সমাজে মানবতার প্রকৃত উদাহরণ। কারণ তিনি কোনো পদ-পদবি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট মনে করেই এই কাজগুলো করে যাচ্ছেন।
সরোয়ার উদ্দিন আনসারী বলেন, মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়াতে পারাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অনেক সময় রাতের ঘুম, ব্যক্তিগত কাজ কিংবা নিজের আর্থিক বিষয়গুলোও পিছিয়ে রাখতে হয়েছে। তবুও যখন দেখি একজন রোগী রক্ত পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন অথবা কোনো অসহায় পরিবার একটু স্বস্তি পেয়েছে, তখন মনে হয় আমার কষ্ট সার্থক হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমি বিশ্বাস করি, সমাজের প্রত্যেক মানুষ যদি নিজের অবস্থান থেকে সামান্য হলেও মানবিক কাজে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমি যতদিন পারি, মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।
মানবতার এই নীরব সৈনিক প্রমাণ করে চলেছেন যে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় পদ বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি মানবিক হৃদয়, মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিক ইচ্ছা এবং নিঃস্বার্থ মানসিকতা।
মানুষের জীবন বাঁচানোর যে সংগ্রাম সরোয়ার উদ্দিন আনসারী চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প।
এএইচ










