ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

মুজিবাদর্শে শাণিত আমরা

র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী

প্রকাশিত : ১২:৫৭ ১৬ আগস্ট ২০১৯

শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যয়। কিন্তু তিনটি প্রত্যয় একই সূত্রে গাঁথা। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটির কথা ভাবা যায় না। একটির সাথে আরেকটি গ্রথিত গভীর সম্পর্কের জালে। শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা (Founding Father)।

মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। মুজিবাদর্শ হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তার (Bangladesh State of Nation) বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু উভয় প্রত্যয়কে এভাবে তুলে ধরেছেন : ‘১৯৭১-এর ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সময়ে দুই অসম শক্তি এক ভয়াবহ নিষ্ঠুর সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। সে সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনুপস্থিত। (তবুও) বঙ্গবন্ধু এবং শুধু বঙ্গবন্ধু একাই ছিলেন সেই প্রতীক যার চারদিকে নিঃসহায় এক উদ্দেশ্যের সমর্থকেরা একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল। কিন্তু এটা কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না। এই অন্ধকার দিনগুলোতে, ওই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোতে, যে কোটি কোটি জনতা, যা ভবিষ্যতের জাতিকে সৃষ্টি করবে তাদের মধ্যে কোন ভুল বুঝাবুঝি ছিল না বা দ্বিধা ছিল না। বঙ্গবন্ধু একটাই ছিলেন প্রতীক।’

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু মুজিব কী ভূমিকা পালন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে? এ সম্পর্কে আমার অন্য একটি লেখা থেকে যে উদ্ধৃতি আমি এখানে তুলে আনতে চাই, তা খুবই যুক্তিসঙ্গত এবং সঠিক পরিস্থিতির যথার্থ ব্যাখ্যা বলেই আমি মনে করি। তা হচ্ছে এই- ‘২৫ মার্চের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র তার প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যিনি জনক সেই শেখ মুজিবকে বন্দি করে প্রহসনের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। অসম্ভব অকল্পনীয় মানসিক চাপ প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুজিব কখনও মচকাননি বা ভেঙেও পড়েন নি। নিজ লক্ষ্যে অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রেখে তিনি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এক অসম ও সুকঠিন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। একদিকে তার প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ ও দেশবাসী প্রবাসী বিপ্লবী সরকার গঠন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন, অন্যদিকে তিনি নিজে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে একা লড়ে গেছেন হিমালয়ের অটলতা নিয়ে। তার সামান্যতম পদস্খলন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বিপথগামী করতে পারত এবং আমাদের স্বাধীনতাকে করে দিতে পারত ব্যর্থ। আর এখানেই মুজিব নেতৃত্বের বিশালতা, সৌন্দর্য আর মহিমা নিহিত। নিঃসঙ্গ এক মানুষের নির্জন কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে একটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস বিরল দৃষ্টান্ত।’ (আলোর পথযাত্রী। ১০ জানুয়ারি ২০০৩। সাপ্তাহিক বিচিত্রা)।

যে বক্তব্য দিয়ে এ লেখার শুরু তার সমর্থনে আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে জাতির জনকের অবস্থান সম্পর্কে সবার মনযোগ আকর্ষণ করতে চাই। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ তার Era of Sheikh Mujibur Rahman গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর কঠোর সমালোচনা সত্ত্বেও বলতে বাধ্য হন : ‘আমাদের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা হচ্ছে মুজিব। মৃত্যুতে তার সমাপ্তি ঘটেনি। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে একজন আলোচিত ও মহান ব্যক্তি হিসেবে বিরাজ করবেন। বাঙালিরা হয়তো বা শেখ মুজিবের চেয়েও মেধাবী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও গতিশীল নেতা পেয়ে থাকতে পারে, কিন্তু (তারা) তাদের (বাঙালিদের) রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জাতীয় পরিচিতি দিতে বড় কিছু একটা করতে পারেনি। মুজিবই শেষ পর্যন্ত শুধু তাদের বাঙালিদের উদ্দেশ্যের সঙ্গেই নয়, স্বপ্নের সঙ্গেও নিজেকে একিভূত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরিণতিতে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক রূপ নিয়েছিলেন যা এমন এক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল যে, স্বাধীন ও সার্বভৌম পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। যেভাবেই বা যে পরিচিতিতেই বাংলাদেশ টিকে থাকুক না কেন বা এর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে রূপান্তরই ঘটুক না কেন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা হিসেবে মুজিবের অবস্থানে কোন পরিবর্তন আসবে না। সমাজতন্ত্র কি পুঁজিবাদ কি নয়া ঐতিহ্যবাদ যাই দেশের আর্থ-সামাজিক জীবনে প্রোথিত হোক না কেন, অথবা প্রতিক্রিয়াশীল কি বিপ্লবী যে ধরনের সরকারই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকুক না কেন, বাংলাদেশ নামের দেশটির অস্তিত্বই আমাদের সময়ের এক মহত্তম ব্যক্তিত্ব হিসেবে শেখ মুজিবের অবস্থানের বিঘোষণা হয়ে আছে ও থাকবে।’

উপরিউক্ত আলোচনার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাব যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান কঠিন কঠোর ছিল বলেই পঁচিশে মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার আগে বেতার টিভি ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করেছিলেন : Mujib is a traitor to the nation, this time he will not go unpunished. অর্থাৎ ‘মুজিব হচ্ছেন জাতীয় মেঈমান। শাস্তি তাকে এবার পেতেই হবে।’ পাকিস্তানিদের এই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুই হচ্ছেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে কেন্দ্র করেই সমগ্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ৬-দফা আর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বা সত্তরের নির্বাচন সব কিছুই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। ইতিহাস তাকে সৃষ্টি করেছে, তিনি ইতিহাস বিনির্মাণে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। মুজিবের এই ঐতিহাসিক অবস্থান তাকে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের সাথে একীভূত করে দেয়। আর এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তি সর্বদাই তাদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল করেছে বঙ্গবন্ধুকে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিরাজমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত সঙ্কটকে পুঁজি করে, ইতিহাসের ওই বিশ্বাসঘাতক চক্র যারা বাংলাদেশের মুজিব প্রশ্নে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের প্রশ্নে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছে।

অথচ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের শাসনদণ্ড হাতে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত একটি অর্থনীতির। প্রথমত, বাংলাদেশে কোনো কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো ছিল না। ছিল একটি দুর্বল প্রকৃতির ক্ষণভঙ্গুর প্রাদেশিক শাসন, যা কার্যত রাওয়ালপিন্ডি থেকে পরিচালিত হতো। রাস্তাঘাট ব্রিজ কালভার্ট রেলপথ নৌপথ সব কিছুই বিধ্বস্ত ছিল। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে অকার্যকর করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা বলতে যা বুঝায় তার কিছুই ছিল না। অতএব শূন্য থেকে তাকে সব কিছু গড়ে তুলতে হয়েছিল। অতি দ্রুত ও স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। একটি জাতীয় সেনবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, সীমান্ত রক্ষীবাহিনী, পুলিশ বাহিনী গঠন করেন এবং একটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠা করা হয় মিলিটারি একাডেমি, জাতীয় এয়ারলাইনস বাংলাদেশ বিমান। জাতিসংঘের স্বীকৃতি আদায় করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দিয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন। ইসলামি সম্মেলন সংস্থা, কমনওয়েলথ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হয় বাংলাদেশ এই স্বল্প সময়ে। প্রতিটি আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি বাংলাদেশের অবস্থানকে মজবুত ভিত্তি প্রদান করে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার সক্রিয় নিরপেক্ষতার নীতি (active non-alignment) সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের ভাবাদর্শেও দেশীয় দালালেরা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তারা বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়কে রুখতে না পেরে তাকে নেতৃত্ব শূন্য করে দিয়ে দুর্বল করে দেয়ার পথ অনুসরণ করে। বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের সাফল্যকে ব্যর্থ করে দুর্বল করে দিতে নানা ষড়যন্ত্রের পথ অনুসরণ করে। মন্ত্রিসভার অভ্যন্তরে, দলের ভেতর ষড়যন্ত্রকারীরা বাইরের প্রতিক্রিয়ার শক্তির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে। দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিতে সংঘটিত করা হয় পনের আগস্টের কালরাত্রির নির্মম হত্যাযজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে আদর্শ ও মূল্যবোধ আমরা অর্জন করেছিলাম, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তা নস্যাৎ করে দিতে উদ্যত হয় হত্যাযজ্ঞ পরিচালনাকারী সামরিক-বেসামরিক শাসকচক্র- তথা মোশতাক-জিয়া চক্র। অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতি, সুশীল সমাজের প্রাধান্য (সিভিল রুল), গণতান্ত্রিক সমাজ, আধুনিকতা, শোষণমুক্তির অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইত্যাদি হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন এবং মুজিবাদর্শ। অন্যদিকে পাকিস্তানি ভাবধারা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রপরিচালনায় ধর্মকে যুক্ত করা, সামরিকতন্ত্রের আধিপত্য, ফ্যাসিবাদী সমাজ তথা পুলিশি রাষ্ট্র, আধুনিকতা, শোষণ ও বড় পুঁজির আধিপত্য।

রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে মুজিবের অপসারণের মধ্য দিয়ে প্রতিক্রিয়ার শক্তি প্রাথমিক সফলতা অর্জন করে। পরবর্তীতে রাষ্ট্র ও সমাজকে সামরিক ও ছদ্মবেশী সামরিক (গণতন্ত্রের আচরণে) শাসনের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিয়ে তারা নিজেদের শক্তিকে সংহত করতে সক্ষম হয়। মোশতাকের চানক্য নীতির পথ ধরে জিয়াউর রহমান একনায়কতান্ত্রিক সামরিক শাসন চালিয়ে বাংলাদেশের চলার পথকে উল্টো দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী কায়দায় সংবিধানকে কেটে ছিঁড়ে ফেলা হয়, সাম্প্রদায়িকতাকে অনুপ্রবিষ্ট করে মুক্তিযুদ্ধের ধারা থেকে দেশকে পেছনে ঠেলে দেয়া হয় এবং তার ক্ষমতাপসারণের পর আরেক সামরিক স্বৈরশাসক ক্ষমতা দখল করে পুরো রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতিকে সাম্প্রদায়িকতার ছাঁচে সাজিয়ে নেন। শাসন আর শোষণ হয়ে ওঠে তাদের কর্মধারা, সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতা হয়ে ওঠে রাজনীতির হাতিয়ার। বঙ্গবন্ধুর গৃহীত পথ থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে নেয়া হয় অনেক দূরে যোজন যোজন দূরে।

কিন্তু মুজিবাদর্শকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। পঁচাত্তর-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে অগ্রসর হয় দেশের ছাত্র-যুব সমাজ। অচিরেই দেশের প্রগতিশীল কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী মহল এবং রাজনীতির লোকেরাও এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সমবেত হতে থাকেন। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ, বন্ধুপ্রতীম কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ (অবাক লাগে বাকশালে বিলীন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ কীভাবে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল, তা ভেবে), ন্যাপের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ প্রথম দিকে একত্রে ও পরবর্তীতে স্বতন্ত্রভাবে এই গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে বেগবান করতে সচেষ্ট হয়। ১৯৮১ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ হাসিনার নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বার্থেই এক নতুন মাত্রা এনে দেয়। এবং ১৭ মে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পালে যে বাতাস লাগে তা মুজিবাদর্শ বাস্তবায়নের সংগ্রামকে লক্ষ গুণ বেগবান করে দেয়।

শেখ হাসিনা পিতার আদর্শের পতাকাকে শক্ত হাতে ধারণ করে অগ্রসর হন সম্মুখ পানে দৃঢ় পদক্ষেপে। ষড়যন্ত্র আবারও। বামপন্থার নামে ষড়যন্ত্র, ডানপন্থিদের ষড়যন্ত্র, যেমনটা মোকাবেলা করে পথ চলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তেমনি শেখ হাসিনাও পথ চলতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু কোন ষড়যন্ত্রই তাকে লক্ষ্যার্জনের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মুজিবের অজেয় আদর্শ শেখ হাসিনার চলার পথে আলো হয়ে পথ দেখায়। ১৯৯৬-তে দেশ সেবার সুযোগ গ্রহণ করে দেশকে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে দাঁড় করার একটা প্রয়াস পাওযা যায়। বলতে দ্বিধা নেই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল শাসনামল তথা স্বর্ণযুগ ছিল সে সময়টা। সুদীর্ঘ প্রায় দুই যুগের পশ্চাৎপদতা ও স্বৈরতান্ত্রিকতার প্রভাব খাটিয়ে মাত্র পাঁচ বছরের সময়ে যে সফলতা অর্জন করা গিয়েছিল তা যে কোনো মানদণ্ডেই ঈর্ষণীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাংলার মানুষের। স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের যে অবশেষ রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে প্রোথিত হয়েছিল তার বেড়াজাল আমরা পুরোপুরি ছিন্ন করতে পারিনি। তাই আমাদের পুনরায় পশ্চাৎ যাত্রা করতে হয়েছিল ২০০১ সালে।

প্রতিক্রিয়ার দোসরেরা ২০০১ সালে প্রত্যাবর্তনকে নির্মমতার হাতিয়ার দিয়ে সাজিয়ে নিজেদের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে দীর্ঘ পাঁচটি বছর কাজ করে গেছে। ২০০৭ সালে তাদেরই আদর্শের ধার করে নতুন কায়দায় সমরতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে এবং পুরনো পথে যাত্রা শুরু করে (তথাকথিত ফখরুদ্দীন তত্ত্বাবধায়কের সিভিল নেতৃত্বের প্রায় সবাই ছাত্রজীবনে পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুবের ভাবাদর্শের লোক ছিল- এনএসএফের সাথে যুক্ত ছিল)। মুজিবীয় আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সাথে এই কঠিন দুর্যোগময় সময় অতিক্রম করেন। অবশেষে পঞ্চদশতম সংবিধান সংশোধনী এনে কিয়দংশে হলেও দেশকে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতামুক্ত রাজনীতির একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ইতিহাসকে সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনার একটা প্রয়াস নেয়া হয়েছে। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে জাতির অগ্রযাত্রার যে পথকে পাল্টে দিতে চেয়েছিল প্রতিক্রিয়ার দোসরেরা, তা থেকে দেশকে অনেকটাই মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের তরফ থেকে বড় ধরনের কোন ভুল না হলে যে আদর্শের জন্য মুজিব ও তার স্বজন সহযোদ্ধারা জীবন দিয়ে গেছেন সে আদর্শের পথে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনা দুঃসাধ্য কিছু নয়। বুক ভরা আশা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মিছিলে শামিল হয়েছি, সে আশা যেন ব্যর্থ না হয়ে যায়, এই আমাদের প্রার্থনা।

(লেখাটি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু গ্রন্থ থেকে নেওয়া)

এএইচ/
 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি