ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০:৫২:৩৩

Ekushey Television Ltd.

যে গল্প পথের, সে গল্প আনন্দের....

বেনজির আবরার

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:০৪ পিএম, ৩ জুন ২০১৮ রবিবার | আপডেট: ০৪:০৩ পিএম, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার

ইচ্ছা মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারে না। প্রবল ইচ্ছা শক্তি মানুষকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তেমনই একজন মানুষ মো. আদনান হোসাইন। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাধনার ফলে গড়ে তুলেছেন অসহায় বঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি সংগঠন। নাম "ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন"।  এই সংগঠনটির পেছনে রয়েছে  আদনানের ঘাম ঝরানো স্বপ্ন।  

২০০৯ সালের দিকে আদনান তখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন। বাবা সৈয়দপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী,বলা যায় সৈয়দপুর কেন্দ্রীক নামী পরিবার তাদের। ২০০৯ এর ডিসেম্বরেই ইষ্ট ওয়েষ্টে পড়ুয়া বড়ভাইর বন্ধুরা যাবেন কুড়িগ্রাম একটি "উইন্টার ক্যাম্পেইন" করতে। বড়ভাইর কাছে আদনান আবদার করলেন তাকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য। পরিবারকে রাজি করিয়ে আদনান বড় ভাইদের সঙ্গে চলে গেলেন কুড়িগ্রাম। সেখানে গিয়ে প্রথমবার বেশ কিছু বিষয় তার মনকে নাড়া দেয়। সাধারণ গরীব মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তার মনটা উদাস হয়ে যায়। তাদের কষ্ট এবং অসহায়ত্ব দেখে তার কাছে খারাপ লাগে। ফিরে এসে আদনান তার বাবাকে বলেন, ‘এসব অসহায় সাধারণ মানুষদের জন্য আমি কিছু করতে চাই। বাবা সরাসরি না করে দিয়ে বলেন, এসব করার দরকার নেই, পড়াশোনা করে ব্যবসা দেখ।’ আদনান বাবার কথায় কষ্ট পেলেও সে দমে যায়নি। সে তার মতো চেষ্টা করতে থাকে।

২০১০ সালের জানুয়ারীতে একজন ব্রিটিশ ভদ্রলোকের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন। তার সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করলেন। তিনি সাড়া দিয়ে বললেন, "তুমি উদ্যোগ নাও,আমি পাশে থাকবো।" এরপর বন্ধু সৈয়দ ফজলে নিয়াজের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। নিয়াজ তাকে পরামর্শ দিলেন, তোমার মানসিক শান্তির জন্য এখানেই আশাপাশে কিছু কর। এ বিষয়টা পরিবারকেও জানালেন আদনান। বাবা-মা তার এমন কাজে খুব অবাক হন। এসময়ই সবচেয়ে বড় ধরনের সমর্থন দিলেন তার বড়বোন নিলুফার আক্তার, তিনি তাকে বললেন, "ভাই, তুই সৈয়দপুরেই এই কাজ শুরু কর। আমি তোর সঙ্গে আছি।" 

বড়বোনের আশ্বাস, পাশাপাশি সৈয়দপুরস্থ মেডিক্যাল শিক্ষার্থী মনিরের সহযোগীতায় আদনান চলে গেলেন সৈয়দপুর। সেখানে একটি খ্রিষ্টান বাড়ির মালিক তার বাড়ির বারান্দাতে তাদেরকে ব্যবহারের জন্য দেন। হতাশ হলেও স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করে সেখানেই ২০১০ সালের জুনের ৪ তারিখ ১৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে "কাইটস একাডেমী"। সেখানে তারা একজন অভিভাবকও পেয়ে গেলেন। বর্তমানে স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা ইভা রহমান। যার সাথে পরামর্শ করে চলছিলো স্কুলটির নানাদিক। স্কুল চলছে ঠিক মতো কিন্তু সংকট দেখা দিল অর্থের। আদনান সমস্যা সমাধানের জন্য নিজের ভার্সিটির দুই সেমিস্টারের টাকা এনে বানালেন বাচ্চাদের ড্রেস, আইডি কার্ড আর বসার বেঞ্চ। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়ে গেলো তিনমাসে ৪০ জন, ছয়মাস শেষে ১০০ তে। এরপর বারান্দায় তাদের আর হচ্ছেনা। ফলে খ্রিষ্টান পরিবারটি তাদের শিক্ষার্থীদের বেড়ে যাওয়া দেখে একটি রুম ছেড়ে দিলেন।

এরপর বন্ধু নিয়াজসহ পরামর্শ করে তাদের কার্যক্রমের নাম দিলেন "ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন"। এসময় আদনান আবার কাজ করছিলেন বিবিসির একটি প্রজেক্টে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। এর মধ্যে হঠাৎ শিক্ষার্থী কমে যেতে লাগলো স্কুলের। আদনান ও তার দল চিন্তিত হয়ে পড়লো। স্থানীয়রা জানালেন, ‘‘যে সময়টাতে স্কুল, সে সময়টা কোনো হোটেলে কাজ করলে টাকা পাবে তাদের বাচ্চারা। আবার একটি স্থানীয় এনজিও পড়ালেখার বিনিময়ে তাদের টাকা দিচ্ছে বলে তারা কাইটস একাডেমীতে আসা বন্ধ করে দিচ্ছে।" সম্পূর্ন বিনামূল্যের এই স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বিবিসির দুজন কলিগের পরামর্শ মতো টিফিনের ব্যাবস্থা করলেন তারা। আগ্রহ কিছুটা বাড়লেও মূলত অর্থনৈতিক সমস্যা তারা জর্জরিত এই গ্রামের মানুষগুলো। তখন তারা বাচ্চাদের মায়েদের জন্য একটি প্রজেক্ট হাতে নেন। তাদের বলেন, "আপনাদের যদি আমরা সেলাই এর ট্রেনিং দেই এবং আপনাদের তৈরী পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করে দেই বাচ্চাদের আমাদের স্কুলে রাখবেন?" মায়েরা কথা দিলেন, তারা স্বাবলম্বী হলে বাচ্চাদের পড়াশোনাতেই রাখবেন। শুরু হলো নতুন কার্যক্রম "প্রতিভা"। যেটির মাধ্যমে নারীদের ফ্রি প্রফেশনাল ক্রাফটিং ট্রেনিং" করান, পাঁচজন নারী সেখানে প্রথম প্রশিক্ষন নেন। তাদের কাজের মান ভালো হবার ফলে ফলাফলটাও ভালো হয়। দেখা গেলো এই মা`দের তৈরী পণ্য আদনান ঢাকায় এনে বিভিন্ন ফেস্টের মাধ্যমে বিক্রয় করিয়ে তাদের ভালো লাভ দিতে পারছেন। আদনান ভাবলেন, এটা থেকে উঠে আসতে পারে স্কুলের সব খরচও!

যেই ভাবা সেই কাজ। প্রশিক্ষিত পাঁচজন নারীকে বললেন," এখন সবাইকে শেখাবেন আপনারা।" যেহেতু তারা তখন হাতে নিয়মিত অর্থ পাচ্ছেন, তারাও প্রস্তাবটা নিলো। অন্য যারা প্রশিক্ষন নেয়নি তারাও ভিড়তে লাগলো এদিকে। বর্তমানে সৈয়দপুর ও টঙ্গী মিলিয়ে ২৫৫ জন নারী ট্রেনিং শেষ করে স্বাবলম্বীতা অর্জন করেছেন বলে জানালেন আদনান।

পাশাপাশি বর্তমানে সৈয়দপুর ছাড়াও টঙ্গী, পাটোয়ারী পাড়ায় রয়েছে তাদের আরো দুটো স্কুল, সেগুলোও সম্পূর্ন বিনাখরচে গরীব পরিবারের সবার জন্য উন্মুক্ত। আদনানের কাছে এর খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, " আমাদের স্টুডেন্ট স্পন্সরশীপ পোগ্রাম চলছে নিয়মিত, আমরা চ্যারিটি গালা নাইট করি যেখানে ২৫০০ টাকা করে টিকেট। ২০১৬ এবং ১৮ তে আমরা এটি করেছি। সর্বশেষ গালা নাইটে ইউএস অ্যাম্বাসেড়র স্বয়ং চিফ গেষ্ট ছিলেন। এছাড়া হোটেল সেরিনার সহযোগীতায় আমরা "চ্যারিটি কফি মর্ণিং" করি। সবমিলিয়ে আমাদের চারপাশে "ফ্যামেলি ফ্রেন্ডস আর বিভিন্ন দেশের ভালো মানুষজন রয়েছেন" এমনটাই বিশ্বাস মো.আদনান হোসাইনের। এর ধারাবাহিকতায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সহযোগীতায় স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে করেছেন " সায়েন্স ফেয়ার"। কোনোদিন সায়েন্স না বোঝা বাচ্চাগুলো চমকে দিয়েছিলো তাদের ছোটছোট প্রজেক্ট দাঁড় করিয়ে। ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের চিফ এডভাইজর স্টিভ উইলস, যিনি আরএনএলআই এর হেড অফ ইন্টারন্যাশনাল পোগ্রাম। তার পরামর্শ পুরো ফাউন্ডেশনকে জমিয়ে রাখে।

বর্তমানে রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসে ১৫ জন কর্মী নিয়ে চলছে আদনানের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। পরিবারতো প্রথম বাধা দিয়েছিল, পরে উৎসাহে যুক্ত হলো কিভাবে? আদনান বলেন, " ২০১৫ তে আমি মোষ্ট প্রমিজিং সোশ্যাল এন্টারপ্রিনিয়রশীপ বাই জলকনা ক্যাটালিষ্ট" এর জন্য ইউএসএ থেকে মনোনীত হই, বলা যায় তখন প্রথম বাবা আমার কাজে অবাক হয়ে উৎসাহ দেয়া শুরু করেন।’’

এরমধ্যেই মো. আদনান হোসাইন টেডএক্স বেইলি রোড, ওভার৩০ গেস্ট স্পিকার, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন গেষ্ট লেকচারার হিসেবে। স্টার্টাপ ইস্তাম্বুলের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করছেন মো. আদনান হোসাইন।

ক্যারিয়ার বিসর্জন সম্পর্কে আদনান বললেন, "আমি সত্যিকারে আনন্দ পাচ্ছি এই কাজগুলোতে এসে, বাচ্চাগুলোর হাসি আমার সবকিছুর অনুপ্রেরণা। আমি মনে করি এটা একটা লাইফস্টাইল যা সবাই ভাবতে পারেনা নিজের জন্য। আমি গর্বিত আমার কাজগুলো নিয়ে।"

এসি

  



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি