ঢাকা, ২০১৯-০৪-২৪ ১২:২৭:০১, বুধবার

এখনও কাঁদে নিহত শ্রমিকদের আত্মা

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির অর্ধযুগ

এখনও কাঁদে নিহত শ্রমিকদের আত্মা

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ছয় বছর আজ। ঘটনার অর্ধযুগ পরেও, সেই দিনের ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাড়া করে ফেরে, প্রাণে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের। এখনও সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন নি; কাটাচ্ছেন দুর্বিসহ বেকারত্ব। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। সাভারে ধসে পড়েছিল ৯ তলা ভবন রানা প্লাজা। ছয় বছর পার হয়ে গেলেও এ ঘটনায় হতাহত শ্রমিক ও তার স্বজনেরা সুবিচার পাননি। বিচার হয়নি অভিযুক্তদের। মামলাগুলোর তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। নিহত শ্রমিকদের স্বজনেরা যেমন যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি, তেমনি যথাযথ সহায়তা না পাওয়ায় আহত অনেক শ্রমিকই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়ে আজও ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। সরকারী হিসেবে ১১শ’ ৩৮ জন; বে-সরকারী হিসেবে ১১শ’ ৭৪ জন নিহত হয় ওই ঘটনায়। উদ্ধার অভিযান চলে, ২১ দিন ধরে। সনাক্ত করা যায়নি অনেককে, লাশের ঠিকানা হয়, জুরাইন কবরস্থানে। রানা প্লাজা ঘটনায় চ্যালেঞ্জের মুখে পরে, পুরো পোষাক শিল্প। ক্রেতারা নানান শর্ত আরোপ করে; জিএসপি সুবিধা বাতিল করে। টনক নড়ে, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর। এরপর, শ্রম আইনের সংস্কার হয়েছে, নিরাপদ কর্ম পরিবেশ উন্নয়নে কাজও চলমান। কিন্তু, ছয় বছর পরে এসে হিসেব নিকেশে দাড়ায়, যারা বা যাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ, তাদের অবস্থা কি? অনেকেই, পাননি সঠিক চিকিৎসা। অনেকেই, এখনও বেকার। আবার এক মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যাক্তির অকাল মৃত্যুতে অনেক পরিবারের চলার পথ নেই। প্রকৃত ক্ষতি পূরন বলতে যা বোঝায় তা পাননি, বেশীরভাগ ক্ষতিগ্রস্তরা। ভবন মালিকসহ জড়িতদের সঠিক বিচার চান তারা। ঐদিনের দুর্বিসহ স্মৃতি থেকে জীবনকে আলাদা করার আসলে আর সুযোগ নেই। কিন্তু, ঘটনার পরবর্তী রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধাগুলো যথাযথ ব্যবহার হয়নি। তবে ঘটনার পর পোশাক শিল্পখাতে কর্মপরিবেশ উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসাও করেছেন বিশ্লেষকরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, দুর্ঘটনা পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণ একসঙ্গে না দেয়ায় (যারা পেয়েছেন) এসব শ্রমিকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়নি। প্রায় ৫১ শতাংশ শ্রমিক এখনও বেকার। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে গড়া হাইকোর্ট বেঞ্চ ভেঙে যাওয়ায় যথাযথ ক্ষতিপূরণ পেতে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন হতাহত ও তাদের স্বজনেরা। তবে ওই দুর্ঘটনার পর ছয় বছরে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগে কারখানা নিরাপত্তা, তদারকি, শ্রমিকের মজুরি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অগ্রগতি হয়েছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে আজ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। এসএ/  
বিশ্ব গ্রন্থ ও কপিরাইট দিবস আজ

আজ মঙ্গলবার বিশ্ব গ্রন্থ ও কপিরাইট দিবস। ১৯৯৫ সালের ২৩ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পঠন-পাঠন, প্রকাশনা ও কপিরাইটকে উৎসাহ দিতে দিবসটি উদযাপন শুরু করে ইউনেস্কো। ১৯৮২ সালে ইউনেস্কো লন্ডনে আন্তর্জাতিক গ্রন্থ সম্মেলনের আয়োজন করে। পরবর্তী ১০ বছর ‘পড়ুয়া সমাজ’ গঠনের ঘোষণা সেই সম্মেলনে। এরপর ১৯৯৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি উদযাপন শুরু হয়। কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, সৃজনশীল কাজগুলোর কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি ভূমিকা রাখে। এ উপলক্ষে আজ রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যৌথ উদ্যোগে ‘আমাদের সৃজনশীল গ্রন্থ ও মেধাস্বত্ব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এসএ/

আজ থেকে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ শুরু

জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার থেকে। এবারও দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘খাদ্যের কথা ভাবলে, পুষ্টির কথাও ভাবুন’। পুষ্টি সপ্তাহ শেষ হবে আগামী ২৯ এপ্রিল। পুষ্টি সপ্তাহ উপলক্ষে রোববার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, ‘সপ্তাহের প্রথম দিন রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে র‌্যালি ও হোটেলে আলোচনা সভা হবে। একইসঙ্গে হোটেলে পুষ্টি মেলারও আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় পুষ্টি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২২টি মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের স্টল থাকবে।’ সপ্তাহ উপলক্ষে সেমিনার, মাতৃপুষ্টির বিষয়ে সব ধরনের গণমাধ্যমে সেলিব্রেটিদের বক্তব্য প্রচারসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য সেবা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই পুষ্টি সপ্তাহেরও উদ্বোধন করেন।’ ১০০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে পুষ্টি সপ্তাহের বিষয়টি ছিল জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১০০ দিনের কর্মসূচির প্রায় সব বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘দারিদ্র্যতা আমরা কমিয়ে আনতে চাই। দারিদ্র্যতা কমলে পুষ্টিহীনতা কমবে। নারীর ক্ষমতায়ন করলে শিশুরা পুষ্টিহীনতায় ভুগবে না। পুষ্টিহীনতায় ভুগলে শিশুর নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ হয়ে থাকে।’ ‘পুষ্টি সপ্তাহে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি শাক-সবজি, ফলমূলসহ সুষম খাবার খেতে হবে। তেল, চিনি, লবণ কম খান। এ ম্যাসেজ আমরা মানুষকে দিতে চাই।’ এসএ/  

আজ বিশ্ব ধরিত্রী দিবস

আজ ২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। যাকে বলা হয় ‘আর্থ ডে। পৃথিবীকে নিরাপদ এবং বসবাসযোগ্য রাখতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এ দিবস পালিত হচ্ছে। এই ধরিত্রীকে রক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে। সর্বপ্রথম ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে দিবসটি পালিত হয়, এবং বর্তমানে আর্থ ডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৩ সংখ্যারও অধিক দেশে প্রতি বছর পালন করা হয়ে থাকে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারিভাবে এই দিবস পালিত করা হয়। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। এই দিবস ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ সংখ্যক জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল। একই ধরনের আরেকটি উৎসব হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ৫ জুন এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পালিত হয়। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং অন্যান্য ১২০ সংখ্যক দেশ দ্বারা এক দিকনির্দেশ প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক খসড়া আবহাওয়া রক্ষা চুক্তির একটা আসল প্রয়োজনীয় সক্রিয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে স্বস্তি এসেছিল, যে সিদ্ধান্ত প্যারিসে ২০১৫ জাতি সংঘ আবহাওয়া পরিবর্তন সম্মেলন-এ উপস্থিত ১৯৫টা দেশের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে, উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ২১ মার্চ, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যেটা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতি সংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্র সেনেটর গেলর্ড নেলসন, যেটা প্রথম সংঘটিত হয় ২২ এপ্রিল, ১৯৭০। এই নেলসন পরবর্তীকালে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যখন এই ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত, তখন ডেনিস হায়েস একটা সংগঠন চালু করেন, যিনি ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে আসল জাতীয় সমন্বয়সাধক ছিলেন; যেটা ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল এবং ১৪১টা দেশে সংগঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। এক বিরাট সংখ্যক সামাজিক গোষ্ঠী ধরিত্রী সপ্তাহ উদযাপন করে, বিশ্ব আজ যেসব পরিবেশগত বিষয়াদির সম্মুখীন হয় সেগুলো নিয়ে সারা সপ্তাহ জুড়ে নানা কার্যাবলি চলে। টিআর/

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘খোকা যখন ছোট্ট ছিলেন’ গ্রাফিক নভেল প্রকাশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘আমার পিতা শেখ মুজিব’ শিরোনামে স্মৃতিচারণামূলক বই লিখেছেন। এবার এই বই অবলম্বনে রাকীব রাজ্জাক ও আবদুল্লাহ মামুনের চিত্রাঙ্কণে প্রকাশিত হয়েছে গ্রাফিক নভেল ‘খোকা যখন ছোট্ট ছিলেন’। একই সঙ্গে গ্রাফিক নভেলটি অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে গ্রাফিক চলচ্চিত্রও। সাজ্জাদ আহমেদের চিত্রনাট্যে এটি পরিচালনা করেছেন সুদীপ্ত সাহা। সুদীপ্ত সাহা ও সাজ্জাদ আহমেদ রচিত বইটি সম্পাদনা করেছেন জুনায়েদ হালিম ও দুরন্ত বিপ্লব। এটি প্রকাশ করেছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হাসুমণির পাঠশালা। শনিবার জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনালয়ে বইটির মোড়ক উন্মোচন ও চলচ্চিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। উদ্বোধন করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ অনুষ্ঠানে চিত্রশিল্পী জাকির হোসেন পুলকের আঁকা ‘খোকা যখন ছোট্ট ছিলেন’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর শিশু-কিশোর জীবনের ২০টি সিরিজ চিত্রকর্ম প্রদর্শন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপসহীন নেতা। জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে আজীবন অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধুর জীবন, আদর্শ আমাদের তার গভীর জীবনবোধ, রাজনৈতিক দর্শন এবং দেশ ও জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার কথাই মনে করিয়ে দেয় প্রতিনিয়ত।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা জাতির জীবনে সব সময় আসে না। আমরা ধন্য যে, বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা পেয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর মানবিক গুণগুলো শিশুদের কোমল মনে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বইটির মোড়ক উন্মোচন ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনভিত্তিক ধারাবাহিক চিত্রকর্মের উদ্বোধন করা হয়। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ওপরে বয়নকৃত সূচিশিল্পও প্রদর্শিত হচ্ছে। এ প্রদর্শনী আজ রোববার পর্যন্ত চলবে। এসএ/  

মুজিববর্ষ পালনে কর্মসূচি নেবে উপকমিটিগুলো

মুজিববর্ষ পালনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটিগুলোকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপকমিটিগুলো উৎসবমুখর ও যথাযোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে মুজিববর্ষ পালনে কর্মসূচি পরিকল্পনা ঠিক করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জমা দেবে। কেন্দ্র তা চূড়ান্ত করবে। শনিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভার একাধিক সূত্র এমনটা জানিয়েছে। ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সকাল ১১টায় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভার সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে তৃণমূলের সংগঠনের মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন দ্রুত শেষ করার বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়। আগামী ঈদুল ফিতরের পর সম্মেলনের কাজ শুরু হবে। তবে এর আগেই আট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দ্রুততার সঙ্গে সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করবেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহ্মুদ স্বপন বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে আমরা তৃণমূলে সংগঠন গোছানোর কাজে গুরুত্ব দিচ্ছি। আগামী ২৯ এপ্রিল সকাল ১১টায় খুলনা বিভাগের সব জেলা ও মহানগরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হবে। এখানে খুলনা বিভাগে সংগঠন গোছানোর বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা ঠিক হবে।’ আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী বলেন, মুজিববর্ষ পালনে আওয়ামী লীগের উপকমিটিগুলো নিজেদের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে কেন্দ্রে জমা দেবে।   এসএ/  

২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস

আগামীকাল ২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। যাকে বলা হয় ‘আর্থ ডে’। পৃথিবীকে নিরাপদ এবং বসবাসযোগ্য রাখতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এ দিবস পালিত হচ্ছে। এই ধরিত্রীকে রক্ষায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মানুষকে সচেতন হতে হবে। সর্বপ্রথম ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে দিবসটি পালিত হয়, এবং বর্তমানে আর্থ ডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিতভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৩ সংখ্যারও অধিক দেশে প্রতি বছর পালন করা হয়ে থাকে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারিভাবে এই দিবস পালিত করা হয়। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে বসন্তকালে আর দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলিতে শরতে ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। এই দিবস ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয় এবং ১৪১ সংখ্যক জাতি দ্বারা আয়োজন করা হয়েছিল। একই ধরনের আরেকটি উৎসব হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে ৫ জুন এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পালিত হয়। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং অন্যান্য ১২০ সংখ্যক দেশ দ্বারা এক দিকনির্দেশ প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলস্বরূপ ঐতিহাসিক খসড়া আবহাওয়া রক্ষা চুক্তির একটা আসল প্রয়োজনীয় সক্রিয়তার মধ্যে প্রবেশ করতে স্বস্তি এসেছিল, যে সিদ্ধান্ত প্যারিসে ২০১৫ জাতি সংঘ আবহাওয়া পরিবর্তন সম্মেলন-এ উপস্থিত ১৯৫টা দেশের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে, উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ২১ মার্চ, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যেটা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতি সংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্র সেনেটর গেলর্ড নেলসন, যেটা প্রথম সংঘটিত হয় ২২ এপ্রিল, ১৯৭০। এই নেলসন পরবর্তীকালে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যখন এই ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত, তখন ডেনিস হায়েস একটা সংগঠন চালু করেন, যিনি ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে আসল জাতীয় সমন্বয়সাধক ছিলেন; যেটা ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল এবং ১৪১টা দেশে সংগঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল। এক বিরাট সংখ্যক সামাজিক গোষ্ঠী ধরিত্রী সপ্তাহ উদযাপন করে, বিশ্ব আজ যেসব পরিবেশগত বিষয়াদির সম্মুখীন হয় সেগুলো নিয়ে সারা সপ্তাহ জুড়ে নানা কার্যাবলি চলে। এসএ/

আমার জীবনের এক বিশেষ দিন

১৯৭১-এর ২০ এপ্রিল আমার জীবনের এক বিশেষ দিন। এই দিনে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের মহামান্য উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, বেতারের উপদেষ্টা আবদুল মান্নান এমসিএ, দ্য পিপল পত্রিকার সম্পাদক আবিদুর রহমান এবং আমাকে ২৬ এপ্রিল সকাল ৮টায় সামরিক আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। ’৭১-এর এই দিনে প্রকাশিত সব পত্রিকায় আমাদের পাঁচজনকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশটি সিঙ্গেল কলামে ছাপা হয়েছিল। শিরোনাম ছিল ‘পাঁচ ব্যক্তির প্রতি সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ সকাশে হাজির হওয়ার নির্দেশ’। আমাদের সবার বিরুদ্ধে পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২১, ১২৩ক, ১৩১ ও ১৩২ এবং সামরিক বিধি ৬, ১৪, ১৭ ও ২০ এবং ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক নির্দেশ-১২৪ ও ১২৯ আইনের আওতায় অভিযোগ আনা হয়। এ নির্দেশে একমাত্র আবিদুর রহমান ছাড়া অন্য কারও কোনো পেশাগত পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। এটি ছিল পাকিস্তান সামরিক সরকারের একটি হাস্যকর অপপ্রয়াস। কারণ যাদেরকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তারা বাংলার মানুষের কাছে সুপরিচিত রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধি। বলা বাহুল্য, সেদিন আমরা কেউই বেলুচিনের কসাইখ্যাত জেনারেল টিক্কা খানের আদালতে হাজির হইনি। সামরিক আদালত ’৭১-এর ৮ জুন আমাদের অনুপস্থিতিতে প্রত্যেককে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকে পাকিস্তান বহির্বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিল, পুরো এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতকারী’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করে প্রচার করা হতো ‘তাদের নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে।’ প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর ২৫ মার্চ পাকবাহিনী কর্তৃক গণহত্যা শুরুর পর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ফলে অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে যে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়েছিল, ’৭১-এর ১০ এপ্রিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ অনুসারে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুক্তাঞ্চল বৈদ্যনাথতলাকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ‘মুজিবনগর’ ঘোষণা করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই কফিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নিয়মতান্ত্রিক এবং বৈপ্লবিক অভ্যুদয়। দেশের অভ্যন্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি নিষ্ঠুর গণহত্যার খলনায়ক জেনারেল টিক্কা খান ও সামরিক শাসকদের জন্য ছিল চরম আঘাত। এ রকম আঘাতের পর জেনারেল টিক্কা খান আরও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক নির্দেশ জারি করে। আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক ট্রাইব্যুনালের রায় ভারতের মাটিতে বসে শুনলাম এবং হাসলাম। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তখন এগিয়ে চলেছে। মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান হিসেবে ৭টি জেলার দায়িত্বে ছিলাম আমি: পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী। এ অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর সদস্যদের দেরাদুনে প্রশিক্ষণের পর বিমানে করে দমদম বিমানবন্দর হয়ে ব্যারাকপুরে আমার যে ক্যাম্প ছিল, সেখানে তারা অবস্থান করত। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করাতাম। কতজনের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছি; তাদের অনেকের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে আর কোনোদিন দেখা হয়নি। ব্যারাকপুরে আমার ক্যাম্পেই মুজিব বাহিনীর জন্য ভারতীয় সাহায্য আসত। এ সাহায্য আমি, মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাইয়ের কাছে পৌঁছাতাম। আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করতেন ভারত সরকারের একটি সংস্থার পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রী ফণীন্দ্র নাথ ব্যানার্জি (যিনি ‘নাথ বাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন)। তিনি আমাদের সর্বাত্মক সাহায্য করেছেন। ’৬৯-এর অক্টোবরে লন্ডনে বঙ্গবন্ধু এই ‘নাথ বাবু’র সঙ্গে মিটিং করেছিলেন। ‘নাথ বাবু’ মুক্তিযুদ্ধে অক্লান্ত পরিশ্রম ও আমাদের অপরিসীম সাহায্য করেছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানকালে তিনি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। কৃতজ্ঞচিত্তে তার অবদান স্মরণ করছি। পাকিস্তান সামরিক শাসকগোষ্ঠী আমাদের প্রতি যে কী নিষ্ঠুর ছিল; তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এবং এ মামলার রায় থেকে উপলব্ধি করা যায়। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভাবতে কত ভালো লাগে, জাতির জনকের নির্দেশিত পথেই আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘তোমাদের জন্য আমি সব রেখে গেছি, যে নির্দেশ আমি দিয়েছি, সেই নির্দেশিত পথে তোমরা পরিচালিত হও। বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে গেলে তোমরা সর্বাÍক সাহায্য পাবে।’ ভারতে গিয়ে চিত্তরঞ্জন সুতার (সূত্রধর) যে বাড়িতে অবস্থান করতেন; অর্থাৎ ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা’, সেই বাড়িতেই আমরা অবস্থান করেছি; সেখান থেকেই মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনা করেছি। চিত্তরঞ্জন সুতার ছিলেন বামপন্থী নেতা। তিনি জীবনে বহুবার কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন। ’ ৭০-এর নির্বাচনের আগে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগে যোগদান করে স্বরূপকাঠি থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক ছিলেন এবং আমাদের সর্বাত্মক সাহায্য করেছেন। তার অমর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য খরচ হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। নির্বাচনে খরচ হয়েছিল ২১ হাজার টাকা। বাকি ৪ হাজার টাকা ইউনাইটেড ব্যাংকের ভোলা শাখায় জমা ছিল। পাকিস্তান সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে। তবে দেশ স্বাধীনের পর তা ফেরত পেয়েছিলাম। সেদিন অভিযুক্তদের মধ্যে চারজনই আজ প্রয়াত। জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ উভয়েই ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যের গুলিতে শহীদ হন। মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও বেতার উপদেষ্টা আবদুল মান্নান স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন; কয়েক বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কবি-সাংবাদিক-শিল্পপতি হিসেবে সুপরিচিত ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক নিভৃতচারী সজ্জন মানুষ আবিদুর রহমান ইতিমধ্যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। এখন বেঁচে আছি কেবল আমি। যে প্রশ্নটি আমায় নিয়তই তাড়া করে- সেদিন কেন আমাদের সঙ্গে আবিদুর রহমানকেও পাকিস্তান সামরিক সরকার জড়িত করেছিল? আসলে সামরিক সরকার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। কারণ আবিদুর রহমান সম্পাদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য পিপল’ ছিল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নির্ভীক কণ্ঠস্বর। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীতে অবস্থিত ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার দফতরটি ’৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে গ্রেনেড ও ট্যাংক হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় পাক বাহিনী। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর অফিসটির ধ্বংসস্তূপ থেকে পত্রিকাটির দু’জন কর্মীর পোড়া কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। কত ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি; বিভীষিকাময় ২৫ মার্চ কালরাতে গ্রিনরোডে অবস্থিত ‘চন্দ্রশিলা’ নামে যে বাসায় আমি এবং প্রয়াত শ্রদ্ধাভাজন নেতা আবদুর রাজ্জাক থাকতাম, পাক বাহিনী তা ধ্বংস করে দেয়। সেখানে সংরক্ষিত ’৬৯-এর গণআন্দোলনের দুর্লভ ছবি, দেশি-বিদেশি খবরের কাগজ ও দলিলপত্রাদি ভস্মীভূত হয়। আজ যখন পাকিস্তান সামরিক আদালতের একটি নির্দেশের ওপর স্মৃতিচারণ করছি, তখন মনে পড়ছে- যে বাংলাদেশের জন্য সংগ্রাম করেছি, যুদ্ধ করেছি, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যেখানে আমাদের অবর্তমানে ১৪ বছর সাজা দিয়েছে, সেই বাংলাদেশেও আমাকে অন্তত ৭ বার কারাগারে যেতে হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একনাগাড়ে ৩৩ মাস ময়মনসিংহ এবং কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দি ছিলাম। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি অবস্থায় আমাকে কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল। ৩ মাস আমি সূর্যের আলো দেখিনি। এ সময় আবিদুর রহমান ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি ছিলেন। তাকে ২০ মাস কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। ’৮২-এর ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের পর আমাদের এক কর্মীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ করলে সাজেদা চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম এবং আমাকে পুলিশ গ্রেফতার করে সাভার থানায় আটকে রাখে। একই বছর জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমাকে গ্রেফতার করে চোখ বেঁধে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে ৮ দিন, এরপর কেন্দ্রীয় কারাগারে ২ দিন রেখে সিলেট কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। ’৮৪-তে গ্রেফতার করে কুমিল্লা কারাগারে ৬ মাস বন্দি করে রেখেছিল। ’৮৭-তে ভোলা থেকে আমাকে গ্রেফতার করে বরিশাল কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা হয়েছিল। ’৯৬-তে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে আমাকে গ্রেফতার করে; তখন রাজশাহী কারাগারে ফাঁসির আসামির মতো দিন কাটাতে হয়েছে। ২০০২-এ চিকিৎসা শেষে বিদেশ থেকে ফেরার পর গ্রেফতার করে প্রথমে ক্যান্টনমেন্ট থানায় ১ রাত, পরে কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির আসামি এরশাদ শিকদারকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল; সেই কক্ষে রেখে ১২ দিন পর কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। জীবনে অনেক জেল-জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করেছি। তবে সবচেয়ে দুঃখ পেয়েছি ২০০২ সালে; যখন কাশিমপুর কারাগার থেকে আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়, আরিচা ফেরিঘাটে একটি পতাকাবাহী গাড়ি দেখলাম, জানলাম- স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী তৎকালীন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ গাড়িতে করে যাচ্ছেন। ভাবলাম- যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, সংগ্রাম করেছি; সেই দেশের মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আমার হাতে হাতকড়া আর স্বাধীনতাবিরোধী মুজাহিদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা! আবার ২০০৭ সালে ১/১১-এর মধ্যে আমাকে এবং আমার স্ত্রী ও মেয়েকে দুর্নীতি মামলার আসামি করা হয়েছিল। এ দুঃখ রাখব কোথায়? জীবনে এসব সহ্য করতে হয়েছে। যখন ’৮২-তে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদকালে আমার চোখ ছিল বাঁধা; তখন ভাবছিলাম, পাকিস্তান আমলে সেই ’৬৯-এর ১৭ সেপ্টেম্বর আমরা যখন সামরিক আইন ভঙ্গ করেছিলাম, তখন ‘সামারি মিলিটারি কোর্টে’ আমাকে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার চোখ ছিল খোলা। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? কর্নেল আকবর, আমি দেখতে পেয়েছি একজন কর্নেল আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। যে স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখে ভাবতাম, একদিন বাংলার সন্তানরাই হবে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীর প্রধান; সে স্বপ্নপূরণ হয়েছে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস- পাকিস্তান আমলে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমার চোখ ছিল খোলা আর স্বাধীন বাংলাদেশে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চোখ ছিল বাঁধা। কোনো কিছুতেই কোনো দুঃখ নেই! কেননা, এ ক্ষুদ্র জীবনে এমন এক মহান নেতার সান্নিধ্য পেয়েছি যে, জীবন আমার ধন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সবকিছুই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে বীজ তিনি রোপণ করেন, তা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬৬-র ৬ দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং পরিশেষে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। ’৭০-এর নির্বাচনের পরপরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সামরিক শাসকগোষ্ঠী বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তখন থেকেই তিনি স্থির করেন রাজনৈতিক ঘটনাধারাকে এমনভাবে নিয়ে যাবেন যে, ওরা হবে আক্রমণকারী আর আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে সারা বিশ্বের সমর্থন পাবেন; যাতে কোনো পক্ষই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ তুলতে না পারে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতা। শ্রী চিত্তরঞ্জন সুতারকে বঙ্গবন্ধু ভারতে পাঠিয়েছিলেন। চিত্তরঞ্জন সুতার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ভারতে গিয়ে আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু ক্ষান্ত হননি। সিরাজগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য আমার প্রিয় বন্ধু ডা. আবু হেনাকে অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ভারতে পাঠিয়েছিলেন। আবু হেনা যে পথে গিয়েছিলেন ও যে পথে ফিরে এসেছিলেন, ঠিক সেই পথেই ২৯ মার্চ কেরানীগঞ্জ থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সারিয়াকান্দি-বগুড়া হয়ে ৪ এপ্রিল আমরা ভারতে পৌঁছাই। সঙ্গে ছিলেন জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, জাতীয় নেতা এএইচএম কামরুজ্জামান ও শেখ ফজলুল হক মণি। আর ডা. আবু হেনা ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক। মুক্তিযুদ্ধের ৯টি মাস আবু হেনা আমাদের সঙ্গে থেকে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। মনে পড়ে, ১৭ এপ্রিল প্রথম বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান তুলেছিলাম- ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’; ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’; ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’; ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’; ‘আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’; ‘জয় বাংলা’। শত-সহস্র মুক্তিযোদ্ধা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সমবেতভাবে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেছে মুজিবনগরের আম্রকানন। সেদিন আমার পরিবার-পরিজন জানত না আমি কোথায় আছি, কীভাবে আছি বা আদৌ বেঁচে আছি কিনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের মহিমান্বিত সেসব দিনের কথা ভাবলে গর্বে আজও বুক ভরে ওঠে। লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি tofailahmed69@gmail.com এসএ/  

উদযাপন উপকমিটিতে মাশরাফি-সাকিব

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতি বছর ১৭ মার্চ বর্ণাঢ্য আয়োজনে তার জন্মদিন উদযাপন করা হয়। এই মহান নেতার জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যা বাস্তবায়নে কাজ করছে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। একই সঙ্গে জন্মশতবার্ষিকী সামনে রেখে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনে আটটি উপকমিটি করা হয়েছে। এর একটি হলো- ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গঠন করেছে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট সেই কমিটি। এতে রাখা হয়েছে দেশের দুই সেরা ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা ও সাকিব আল হাসানকে। এ ছাড়া সেটিতে দেশের বরেণ্য ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিরা রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেলের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো বৈঠক করেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজক উপকমিটিও। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। দেশব্যাপী ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। আমাদের বিশ্বাস, সবার চেষ্টা ও আন্তরিকতায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তৈরি করবে নতুন ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সব কিছু দেখভাল করবে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। এর আগে তার জন্মশতবর্ষ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনে আটটি বিষয়ভিত্তিক উপকমিটি গঠন করে এটি। উপকমিটিগুলো হলো- সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও আলোচনাসভা আয়োজন; আন্তর্জাতিক কর্মসূচি ও যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী আয়োজন, প্রকাশনা ও সাহিত্য, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও অনুবাদ, ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন, মিডিয়া, প্রচার ও ডকুমেন্টেশন এবং চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২০২০ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা আগেই দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসএ/  

জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২৮ এপ্রিল

আগামী ২৮ এপ্রিল সপ্তমবারের মতো দেশে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ পালিত হবে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় শেখ হাসিনার অবদান বিনামূল্যে লিগ্যাল এইডে আইনি সেবাদান।’ উন্নয়ন আর আইনের শাসনে এগিয়ে চলছে দেশ/ লিগ্যাল এইডের সুফল পাচ্ছে সারা বাংলাদেশ’ এ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে সামনে রেখে গত বছরও ২৮ এপ্রিল দেশব্যাপি পালিত হয়েছে ষষ্ঠ ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার সহকারি পরিচালক (প্রশসান) ও সিনিয়র সহকারি জজ কাজী ইয়াসিন হাবিব এ কথা জানান। তিনি বলেন, আগামী ২৮ এপ্রিল বিগত বছরের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জাতীয় আইনগত সুবিধা প্রদান দিবসের’ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে এবছরও দিবসটি পালনে দেশব্যাপি ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, শ্রমিক, সহিংসতার শিকার নারী-শিশু এবং পাচারের শিকার মানুষের জন্য আইনি সেবা নিশ্চিত করতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আইন প্রণয়নের মধ্যদিয়ে সরকারি খরচায় আইনগত সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে। পরে এই আইনের অধীনে বিভিন্ন বিধি প্রণীত হয়। বিধিতে কারা আইনি সহায়তা পাবেন তা নির্ধারণ করা হয়। দেশের সবক’টি জেলা আদালত, চৌকি আদালত এবং সুপ্রিমকোর্টে লিগ্যাল এইড সার্ভিস চালু রয়েছে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলোকে এখন শুধু আইনি সহায়তা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, মামলা জট কমানোর লক্ষ্যে এ অফিসগুলোকে ‘এডিআর কর্ণার’ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্রস্থল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পক্ষসমূহের সম্মতির ভিত্তিতে লিগ্যাল এইড অফিসে বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে। জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসটির প্রথম অনুষ্ঠান ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিগ্যাল এইড কল সেন্টার ‘জাতীয় হেল্পলাইন’-এর উদ্বোধন করেন। এ হেল্পলাইনে ১৬৪৩০ নম্বরে ফোন করে যেকোন ব্যক্তি জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাচ্ছেন। সূত্র : বাসস এসএ/  

আজ বিশ্ব কলা দিবস

আজ ১৮ এপ্রিল, বিশ্ব কলা দিবস। এই কলা অতি জনপ্রিয় একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। এ ফলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, ভিটামিন এ বি সি এবং ক্যালসিয়াম, লৌহ ও পর্যাপ্ত খাদ্যশক্তি রয়েছে। অন্যান্য ফলের তুলনায় কলা দামে সস্তা এবং প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়। তাই ধনী গরিব নির্বিশেষে সব মানুষ সহজেই কলা খেতে পারেন। উৎপাদন, স্বাদ ও সুগন্ধের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ হওয়ায় কলাকে বলা হয় ফলের রানী। আমরা সাধারণত সবুজ, হলুদ রঙের ভাল কলা বাজার থেকে কিনি। সেগুলো বাড়িতে রাখলে অনেক সময়েই কয়েকদিন বাদে তা পেকে যায়। কালো কালো ছোপ পড়ে কলার উপর। কিন্তু সেগুলোতেই নাকি স্বাস্থ্যের দিক থেকে বেশি কাজের। এমনটি জানিয়েছেন গবেষক ও পুষ্টিবিদরা। তারা জাানান- বাড়িতে পরে থাকা কলা পচা বলে ফেলে দেবেন না। বরং সেগুলো পারলে এমনি খান, না হলে দুধের শেক বানিয়ে খান। কারণ এতে পুষ্টি অনেক বেশি। তাই পচা ভেবে পাকা কলা ফেলে না দিয়ে, সেটাই খেলে শরীরের লাভ অনেকটাই বাড়বে। দিনে অন্তত একটি কলা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।  জেনে নিন কলার কি কি স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে - হৃদরোগে :কলার মধ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে রক্ত জমাট বাধার কোনও সুযোগ থাকে না। এছাড়াও কলা অন্য যে কোনও খাবারের পরিপূরক। এছাড়াও কলার মধ্য়ে থাকা ম্যাগনেসিয়াম স্ট্রোকের হাত থেকে বাঁচায়। তাই বলা হয় ব্রেকফাস্টে কলা অবশ্যই রাখুন। হজমে সাহায্য করে : কলার মধ্যে থাকা কার্বোহাইড্রেট ও সুগার হজমে সাহায্য করে। এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে। তাই যাদের কোষ্ঠকাঠ্যিনের সমস্যা আছে তাদের বলা হয় কলা খেতে। শক্তি বাড়ে : কলা খেলে এনার্জি বাড়ে। এছাড়াও এর মধ্যে থাকা প্রয়োজনীয় খনিজ শরীরের উপকারে লাগে। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে।  এসএ/  

মুজিবনগর দিবসের স্মৃতিকথা

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতিকথা লিখতে বসে আজ কত কথা আমার মানসপটে ভেসে উঠছে। ’৭১-এর ২৫ মার্চ দিনটির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। এদিন মণি ভাই এবং আমি জাতির জনকের কাছ থেকে বিদায় নেই। বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে টেনে আদর করে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের যে নির্দেশ দিয়েছি, সেই নির্দেশিত পথে তোমরা এগিয়ে যেও। আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আমার কথা ভেবো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা আমাকে গ্রেফতার করবে। হয়তো ওরা আমাকে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। তোমাদের যে নির্দেশ দিয়েছি, তা যথাযথভাবে পালন করো।’ অসাধারণ দৃঢ়চেতা মহান নেতা ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ রাতে মতিঝিলের আরামবাগে মণি ভাইয়ের বাসভবনে আমরা অবস্থান করি। রাত ১২টায় অর্থাৎ জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা শুরু করে। চারদিকে প্রচণ্ড গোলাগুলি। এক রাতেই পাকবাহিনী লক্ষাধিক লোককে হত্যা করে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনি। ভাষণে তিনি জাতির জনককে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের আরও আগেই গ্রেফতার করা উচিত ছিল, আমি ভুল করেছি।’ ২৬ তারিখ থেকে কারফিউ জারি হয়। ২৭ তারিখ ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল হলে আমরা কেরানীগঞ্জ চলে যাই। কেরানীগঞ্জ পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই রেডিওতে শুনতে পেলাম, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নানের ভাষণ। বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ তথা ‘Declaration of Independence’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ প্রদান করে বলেছেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ কেরানীগঞ্জে আমাদের সাবেক সংসদ সদস্য বোরহানউদ্দিন গগনের বাড়িতে আমরা আশ্রয় গ্রহণ করি। জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সাহেব এবং এএইচএম কামরুজ্জামান সাহেব, মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমিসহ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হল, মণি ভাই ও আমি, মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামান সাহেবকে নিয়ে ভারতের দিকে যাব। বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য আগেই বাসস্থান নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে ভুট্টো যখন টালবাহানা শুরু করে, তখন সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছিল- পাকিস্তানিরা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। বঙ্গবন্ধু এটা উপলব্ধি করেছিলেন আরও আগেই। বলতে গেলে নির্বাচনের পরপরই তিনি বুঝেছিলেন, ওরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না এবং তিনিও চাননি ক্ষমতা হস্তান্তর করুক। সে জন্যই ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ১০ লক্ষাধিক সংগ্রামী মানুষের মহাসমাবেশে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ করিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ৬ দফা প্রশ্নে তিনি কোনো আপস করবেন না। ’৭১-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনক জাতীয় চার নেতার সামনে আমাদের এই ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন, ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।’ বলেছিলেন, ‘এখানে থাকবে। তোমাদের জন্য সব ব্যবস্থা আমরা করে রেখেছি।’ ২৯ মার্চ কেরানীগঞ্জ থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সারিয়াকান্দি বগুড়া হয়ে এপ্রিলের ৪ তারিখ আমরা ভারতের মাটি স্পর্শ করি এবং সানি ভিলায় আশ্রয় নেই। এখানে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। তাজউদ্দীন ভাইয়ের সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। একটি বিশেষ প্লেনে তাজউদ্দীন ভাই, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মণি ভাই এবং আমি যখন শিলিগুঁড়ি পৌঁছাই, তখন পূর্বাহ্নে ধারণকৃত তাজউদ্দীন ভাইয়ের বেতার ভাষণ শুনলাম। বাংলার মানুষ তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপসহীন, এক কাতারে দণ্ডায়মান। এপ্রিলের ১০ তারিখ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ গঠন, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলাকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে রাজধানী ঘোষণা করা হয় এবং জারি করা হয় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ তথা ‘Proclamation of Independence’। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন করা হয়; ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’- এই সাংবিধানিক দলিলটির মহত্তর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আমরা ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ সদস্যরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম- ‘আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে মার্চ হইতে কার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।’ জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা অনুসারে বলতে হয়, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সনদ। এই সনদ মোতাবেক স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের আগে ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমি- মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, নবগঠিত সরকারের সফরসঙ্গী হিসেবে কলকাতা থেকে একটা গাড়িতে করে রাত ৩টায় রওনা করি সীমান্ত সন্নিহিত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা তথা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মুজিবনগরের উদ্দেশ্যে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করি প্রিয় মাতৃভূমির মুক্তাঞ্চল মেহেরপুরের আম্রকাননে। আমাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিক ছিলেন। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল পাকিস্তান বাহিনী সেখানে বোমা হামলা চালাতে পারে। মেহেরপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। মুহুর্মুহু ‘তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব’ এবং ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিতে আকাশ-বাতাস তখন মুখরিত। আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছিল নবীন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভবকালীন দৃশ্যপট। দিনটি ছিল শনিবার। বেলা ১১টা ১০ মিনিটে পশ্চিম দিক থেকে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে এলেন। দেশ স্বাধীন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সমবেত সংগ্রামী জনতা গগনবিদারী স্বরে ‘জয়বাংলা’ জয়ধ্বনি দিল। মুজিবনগরে শপথ অনুষ্ঠানস্থলে একটি ছোট্ট মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথমে মঞ্চে আরোহণ করেন। ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের (এসপি মাহবুব, বীর বিক্রম) নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সশস্ত্র দল রাষ্ট্রপ্রধানকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করেন। এরপর মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবকরা পুষ্পবৃষ্টি বর্ষণ করে নেতৃবৃন্দকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানান। সরকারের মুখপত্র ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি আবদুল মান্নান, এমসিএ’র (Member of Constituent Assembly) উপস্থাপনায় শপথ অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়। প্রথমেই নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সনদ ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। আকাশে তখন থোকা থোকা মেঘ। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা মায়ের চারজন বীরসন্তান প্রাণ ঢেলে গাইলেন জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ উপস্থিত সবাই তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলালাম। অপূর্ব এক ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল তখন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ইংরেজিতে প্রদত্ত ভাষণের শুরুতে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেছি এবং তার পরামর্শক্রমে আরও তিনজনকে মন্ত্রীরূপে নিয়োগ করেছি।’ এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দকে পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর ঘোষণা করেন প্রধান সেনাপতি পদে কর্নেল ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার আবেগময় ভাষণের শেষে দৃপ্তকণ্ঠে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের রাষ্ট্রপতি জনগণনন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নির্যাতিত মানুষের মূর্ত প্রতীক শেখ মুজিব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দি। তার নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম জয়ী হবেই।’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তাজউদ্দীন আহমদ অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় বলেন, ‘পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে। পূর্ব পরিকল্পিত গণহত্যায় মত্ত হয়ে ওঠার আগে ইয়াহিয়ার ভাবা উচিত ছিল, তিনি নিজেই পাকিস্তানের কবর রচনা করছেন।’ মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বক্তৃতার শেষে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমরা কামনা করি বিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড় জাতির বন্ধুত্ব।’ ‘বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম। বিশ্বের আর কোনো জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোনো জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি, অধিকতর সংগ্রাম করেনি। জয়বাংলা।’ মহামান্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উভয়েই তৎকালীন বাস্তবতায় যা বলার প্রয়োজন ছিল, তাই বলেছেন। আমাদের শীর্ষ দুই নেতার এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ ছিল ঐতিহাসিক ও অনন্য। পাবনার জেলা প্রশাসক জনাব নুরুল কাদের খান, মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক জনাব তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিকসহ আরও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তথা ’৭১-এর এপ্রিলের ১০ ও ১৭ তারিখে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করে মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করে সুমহান বিজয় ছিনিয়ে আনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক হিসেবে ভারত সরকারের সঙ্গে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করতাম আমি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা শ্রী দুর্গাপ্রসাদ ধর (যিনি ‘ডিপি ধর’ নামে পরিচিত) মাঝে মাঝে কলকাতাস্থ হোটেল ‘হিন্দুস্থান ইন্টারন্যাশনালে’ আমাদের মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করতেন। মিস্টার ব্যানার্জী (যার ছদ্মনাম ছিল মিস্টার নাথ) নামে ভারত সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। সেই ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, ভবানীপুর, কলকাতায় আমাদের সঙ্গে এসে তিনি দেখা করে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। এই সাহায্য আমি মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতাম। দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং হতো। সেখান থেকে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা দমদম বিমানবন্দরে নামার পরে তাদের ব্যারাকপুরে নিয়ে যেতাম। সবাই তখন নিরলস পরিশ্রম করেছি। দেরাদুনে প্রশিক্ষণ শেষে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু, আপনি কোথায় আছেন; কেমন আছেন জানি না। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার নির্দেশিত পথে আমরা এ যুদ্ধ চালিয়ে যাব এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ অনেকেই বলে যে, মুজিব বাহিনীর সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের ভুল বোঝাবুঝি ছিল। কথাটি মোটেই সত্য নয়। সরকারের সঙ্গে মুজিব বাহিনীর সমন্বয়কের দায়িত্ব পালনে আমি নিয়মিত ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে সরকারের দফতরে যেতাম। জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা করে মুজিব বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে সবকিছু তাদের অবহিত করতাম। আমরা যে মুজিব বাহিনী গঠন করেছিলাম, তার প্রকৃত নাম ছিল ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’, সংক্ষেপে বিএলএফ। সেটাকেই আমরা বঙ্গবন্ধু মুজিবের নামে ‘মুজিব বাহিনী’ নামকরণ করেছি। শুধু মুজিব বাহিনী না, স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা ‘মুজিবনগর’ নামে ইতিহাস হয়ে আছে। অনেক অজানা ইতিহাস রয়েছে। একদিকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করছি, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সেই মিয়ানওয়ালী কারাগারে বন্দি। তার বিচার চলছে। বিচার চলাকালে ডিফেন্স ল’ইয়ার হিসেবে এ কে ব্রোহিকে নিয়োগ দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান সরকার। বঙ্গবন্ধু সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, আই উইল নট ডিফেন্ড মাইসেলফ। বিকজ ইয়াহিয়া খান ইজ দি প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান। ইয়াহিয়া খান ইজ দি চিফ মার্শাল’ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। হি ইজ দি কনফার্মিং অথরিটি অব মাই ডেথ সেনটেন্স। অলরেডি হি টোল্ড, মুজিব ইজ এ ট্রেইটর। যেহেতু রায় দেয়া হয়ে গেছে। সুতরাং আমি নিজকে ডিফেন্ড করব না।’ পৃ থিবীতে অনেক নেতা এসেছেন, অনেক নেতা আসবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো এরকম বিচক্ষণ, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো নেতা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে আমার জানা নেই। তার জীবনীটা যদি আমরা আলোচনা করি দেখবো, বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি দিন, প্রত্যেকটা মুহূর্ত ছিল সংগ্রামী। ২০২০-এর ১৭ মার্চ আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে চলেছি- যা হবে মুজিববর্ষ। আশা করি, ‘মুজিববর্ষ’ পালনের মধ্য দিয়ে দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধুর জীবনী পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হব। আজ দেশের সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করে। গত বছর ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ জাতীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। আমি মনে করি, যারা ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করেন না, যারা ১৭ এপ্রিল ‘মুজিবনগর দিবস’ পালন করেন না, তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদী মৃত্যুকে বরণ করেছেন; তাদের রক্তের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দুঃসময়ে ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। মিত্রবাহিনী গঠন করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় সৈনিকরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণোৎসর্গ করেছে। দেশ স্বাধীনের পর জাতির জনকের অনুরোধে স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ’৭২-এর ১২ মার্চ ভারত তার সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। অথচ ভারতের সুমহান আত্মত্যাগকে তাচ্ছিল্য করে আজও যারা ‘দেশ বিক্রির’ কথা বলে; বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সঠিকভাবেই তাদের চিহ্নিত করেন ‘অর্বাচীন’ হিসেবে। ২০১৯’র ১৭ এপ্রিল ৪৮তম মুজিবনগর দিবসে আমাদের প্রত্যাশা- যে লক্ষ্য ও স্বপ্ন নিয়ে জাতির জনক বাংলাদেশকে স্বাধীন করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে গেছেন, সেই পথ ধরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলে দেশের মানুষের সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে। লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি tofailahmed69@gmail.com এসএ/  

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ব শেখ হাসিনার নেতৃত্বে

বাঙালির অবিসংবাদিক নেতা ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে। সেই অবস্থায় আজ থেকে ৪৯ বছর আগের আজকের দিনে তাকেই রাষ্ট্রপতি করে ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার শপথগ্রহণ করেছিল। মেহেরপুরের ভবেরপাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথতলায় সাদামাটা পরিবেশে একটি আমবাগানে সেদিন বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে জাতীয় চার নেতার অন্যতম সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এ শপথ শুধু একটি সরকার গঠনের শপথ ছিল না। এ শপথ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার শপথ। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তার ঠিক ২১৪ বছর পর, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরের আরেক আম্রকাননে বাংলার সেই অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্য আবারও উদিত হয়েছিল। মুজিবনগরের সেই সরকারের নেতৃত্বে পরবর্তীতে দীর্ঘ ৯ মাস অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সংগ্রামের পাশাপাশি ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নামক দেশটি জায়গা করে নেয়। সে দিনের সেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি কেমন ছিল- সে সময় যারা বয়স্ক কিংবা তরুণ ছিলেন তারা অনেকে ইতিহাসটি জানলেও আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছে তা হয়তো এখনও অজানা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ইতিহাস অনেকবার ক্ষতবিক্ষত হওয়ার কারণে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে তরুণদের অনেকে হয়তো ওয়াকিবহাল নয়। তাই ঐতিহাসিক সত্য ঘটনাগুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য শহীদ এম মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাগুলো কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ অন্য অনেকের তুলনায় হয়তো আমার একটু বেশি হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল দিনটি ছিল শনিবার। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আমবাগানের চারদিকে রাইফেল হাতে কড়া প্রহরায় ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ভোরের আলো ফোটার পরপরই নেতারা ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সেখানে আগমন শুরু হয়ে গিয়েছিল। সমবেত হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরাও। বেলা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আম্রকানন লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। আনন্দ-আবেগে উদ্বেলিত হাজারও কণ্ঠের ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’- গগনবিদারি স্লোগান বৈদ্যনাথতলার আকাশ-বাতাস সেদিন প্রকম্পিত করে তুলেছিল। খোলা আকাশের নিচে চৌকি পেতে শপথমঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বেলা ১১টায় শুরু হয়েছিল সেই কাক্সিক্ষত শপথ অনুষ্ঠান। একে একে মঞ্চে উঠলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামানসহ অন্যরা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলাদেশকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ রূপে ঘোষণা করা হয়েছিল। স্ বাধীনতার সেই ঘোষণাপত্রটিই হল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান আইনি দলিল, যা আমাদের সংবিধান এবং সরকার গঠনের মূল ভিত্তি। এর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম একে একে তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, কামরুজ্জামানসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেই মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের নাম এ লেখার মধ্যে আনার অভিপ্রায় ছিল না। তবে ইতিহাস বলতে গেলে অনেক সময় অনেক কিছু না চাইলেও লিখতে হয়। সে জন্যই ওই বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর যাকে সেদিন মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয়েছিল সেই মোশতাকের নামটি উচ্চারণ করতে হল। বিশ্বাসঘাতক মোশতাক মনে করতেন জ্যেষ্ঠতার কারণে তাকেই মুজিবনগর সরকারের প্রধান করা হবে। কিন্তু জাতীয় চার নেতা মোশতাকের পরিকল্পনা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। হয়তো সে কারণেই তাকে মন্ত্রিসভায় নামেমাত্র রাখা হয়েছিল। বেঈমান মোশতাক সুযোগ বুঝে পাকিস্তান ও সিআইএ’র হয়ে কনফেডারেশন গঠন করতে চেয়েছিলেন। খন্দকার মোশতাক কত বড় মীরজাফর সপরিবারে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই তা আমরা বুঝতে পারি। মুজিবনগর সরকারও গঠন করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। এ শপথ অনুষ্ঠানটি বাঙালি জাতিকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সাহস জুগিয়েছিল। পাকিস্তানি শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াইয়ে আমাদের বীর সৈনিকরা উজ্জীবিত হয়েছিল। মুজিবনগর সরকার আত্মপ্রকাশের পরপরই হানাদার বাহিনী মেহেরপুর মহকুমা এলাকা দখল নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বেশ কয়েকবার তারা ইপিআর ক্যাম্প দখলের ব্যর্থ চেষ্টাও চালায়। এতে করে মুজিবনগর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে মুজিবনগর প্রশাসন সুবিধামতো মুক্তাঞ্চলে চলে যায়। পরে ভারতের কলকাতা থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে প্রবাসী সরকার। এ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান প্রতীক। সেই প্রবাসী সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, কূটনৈতিক প্রচারণা চালিয়ে বিশ্ব জনমত গঠন করেছিল। একইসঙ্গে এক কোটিরও বেশি উদ্বাস্তু মানুষের পুনর্বাসন কার্যক্রম অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ও তার সরকার এবং সে দেশের জনগণ যেভাবে আমাদের সহায়তা করেছিলেন, তা কোনোদিন ভুলব না। ইন্দিরা গান্ধী আমাদের শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করেন। তার সৈন্যরা আমাদের সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেন। এমনকি বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করতে ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। সে জন্য বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ। এবার আসি মুজিবনগর সরকার প্রসঙ্গে। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে মুজিবনগর সরকার যে দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনা করেছিল, তা যে কোনো সরকারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। তীব্র প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে এক কোটির ওপর শরণার্থীর জন্য ত্রাণ ব্যবস্থা, দেশের অভ্যন্তর থেকে লাখ লাখ মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলা বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানিদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করেছিল। একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ রাখা, বিশ্ব জনমত গঠনসহ বিভিন্ন অবিস্মরণীয় কীর্তি সম্পন্ন করে। সমকালীন বিচারে তা ছিল অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির সেনাবাহিনী ফ্রান্স দখল করে নিলে জেনারেল দ্য গলে লন্ডনে যেভাবে ফ্রান্সের প্রবাসী সরকার গঠন করেছিলেন, অনেকটা সেভাবেই বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার আদর্শের উত্তরসূরিরা মুজিবনগর সরকার গঠন করেছিলেন। পরে ভারতের কলকাতায় অবস্থান করে তারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে কম্বোডিয়ার প্রিন্স নরোদম সিহানুকের সরকার তুলনীয়। যার সঙ্গে পলপটের খেমাররুজ যুক্ত ছিল। এদের সদর দফতর দীর্ঘকাল চীনের বেইজিংয়ে ছিল। কোনো কোনো সময় থাইল্যান্ডেও ছিল। সিহানুকের স্বাধীন কম্বোডিয়া সরকার একদিকে প্রবাসী ছিল, অন্যদিকে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের দখলে ছিল, যেখানে তারা সরকার পরিচালনা করত। যাই হোক, প্রবাসী সরকার ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গাকে রাজধানী করে সেখানে সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সনদ ঘোষণা ও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের গোপন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিশ্ববাসীকে দেখাতে চেয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতার যুদ্ধ ভারতের মাটিতে বসে সংগঠিত হচ্ছে। ইয়াহিয়ার সেই প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণ করতেই বাংলাদেশের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যে কোনোভাবেই হোক খবরটি পৌঁছে যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে। সেজন্য ১৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় বিমান থেকে বৃষ্টির মতো বোমাবর্ষণ করে ওরা। ফলে শপথ অনুষ্ঠান পিছিয়ে যায়। ১৭ এপ্রিল খুবই সতর্কতার সঙ্গে শপথ অনুষ্ঠানের তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করেন জাতীয় চার নেতা। শহীদ এম মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে আমি দেখেছি, বাবাসহ জাতীয় চার নেতা কীভাবে ছুটে বেড়িয়েছেন। খাওয়া, ঘুম বন্ধ রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করাসহ মুক্তি সংগ্রামকে বেগবান করতে তারা মাঠের পর মাঠ গ্রামের পর গ্রাম ছুটেছেন। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। তারা নিজেদের মধ্যে যে আলাপ-আলোচনা করতেন, তাতে স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মপ্রকাশ নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। জাতীয় চার নেতা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তাদের সেই মন্ত্রেই দীক্ষা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও জাতীয় চার নেতা বিশ্বাস করতেন বঙ্গবন্ধু তাদের সঙ্গেই আছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই তারা বিজয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছিলেন। জাতীয় চার নেতা জীবনেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন, মরণেও তার সঙ্গে ছিলেন। ন্যূনতম বেঈমানি করলে কারা অভ্যন্তরে তাদের মৃত্যুবরণ করতে হতো না। জীবন দিয়ে তারা নেতার বিশ্বাসের প্রমাণ দিয়ে গেছেন। শহীদ এম মনসুর আলীর রক্তের উত্তরসূরি হিসেবে বলতে পারি- আমাদের রক্ত কোনোদিন বেঈমানি ও বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা যখন দেশ গঠনের কাজে হাত দিয়েছিলেন, ঠিক সে সময়ই একদল বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক তাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। স্বাধীনতাবিরোধীদের দেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজের পতাকা তাদের গাড়িতে তুলে দেয়। তাদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়। শুরু হয় ইতিহাস বিকৃতি। দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে রাখে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে। হত্যা করে হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করতে অর্ধশতাধিকবার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে তিনি বেঁচে গেছেন। শেখ হাসিনাকে খুন করতে এখনও বুলেট তাড়া করে বেড়ায়। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েও তিনি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে আজ বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, কোনো কোনো সূচকে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে গেছে। তাই আজকের এই দিনের দীপ্ত শপথ হোক- শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গড়ে তুলব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এসএ/  

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি