টেকসই পর্যটনে প্রয়োজন দক্ষ ট্যুর গাইডিং ও ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনা
প্রকাশিত : ১৮:০৫, ১০ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৮:০৭, ১০ আগস্ট ২০২৬
একটি ট্যুরকে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সফলভাবে পরিচালনার জন্য একজন ট্যুর গাইডকে নানা ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। পর্যটকদের ভ্রমণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া, যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভ্রমণ গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে ট্যুর গাইডিং বলা হয়। আর যে ব্যক্তি একটি ট্যুর পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে থাকেন, তিনি ট্যুর গাইড। যে প্রতিষ্ঠান ট্যুর পরিচালনা করে, তাকে বলা হয় ট্যুর অপারেটর।
ট্যুর পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু পর্যটকদের একটি স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট নয়। একটি সফল ট্যুরের জন্য যাতায়াতের যানবাহন সেবা, থাকার জন্য আবাসন, খাবারের ব্যবস্থা, ভ্রমণ গন্তব্যের বিস্তৃত বিবরণ, আশপাশের প্রকৃতি ও পরিবেশ, শিল্প-সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং ইতিহাস সম্পর্কে পর্যটকদের জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুরো ভ্রমণকে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব কার্যক্রমের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাই ট্যুর গাইডিং ম্যানেজমেন্টের অংশ।
একজন ট্যুর গাইডের প্রধান দায়িত্ব হলো সঠিকভাবে একটি ট্যুর পরিচালনা করা। অল্প সময়ে দক্ষতার সঙ্গে পুরো ট্যুরের ব্যবস্থাপনা করা এবং পর্যটকদের ভ্রমণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দিকনির্দেশনা দেওয়া তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পাশাপাশি পর্যটন গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা এবং ট্যুরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ট্যুর গাইডের অন্যতম দায়িত্ব। একটি ট্যুর সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও একজন ট্যুর গাইডের ওপর বর্তায়।
ট্যুর গাইডিংয়ের গুরুত্বও অনেক। এটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং মানুষকে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করে। একজন ট্যুর গাইডের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে ভ্রমণ এবং নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার পাশাপাশি ভ্রমণ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতেও ট্যুর গাইডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে বর্তমান সময়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ট্যুর গাইডিংয়ের পাশাপাশি ইকো-ট্যুরিজমের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইকো-ট্যুরিজম এমন একটি পর্যটনব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা হয় এবং স্থানীয় মানুষের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইকোট্যুরিজম সোসাইটি ১৯৯১ সালে ইকো-ট্যুরিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে, প্রাকৃতিক অঞ্চলে দায়িত্বশীল ভ্রমণ, যা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের মঙ্গল সাধন করে, সেটিই ইকো-ট্যুরিজম। অর্থাৎ ইকো-ট্যুরিজমের মূল উদ্দেশ্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়; বরং প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং সেই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
ইকো-ট্যুরিজমের ধারণা নিয়ে হেক্টর সেবালাস ল্যাসকুরেন (Hector Ceballas Lascurain) ১৯৮৭ সালে বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ এবং সর্বোপরি বিদ্যমান সংস্কৃতির—অতীত ও বর্তমান—উপভোগের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে অপেক্ষাকৃত শান্ত বা অনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে পর্যটনই ইকো-ট্যুরিজম।
অন্যদিকে হেটজার (Hetzer) ১৯৬৫ সালে ইকো-ট্যুরিজমের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের কথা বলেন। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশের ওপর সর্বনিম্ন প্রভাব সৃষ্টি করা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সর্বাধিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে প্রভাবিত না করা, ভ্রমণকারী এলাকার স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখা এবং পর্যটকদের সর্বাধিক বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করা।
ইকো-ট্যুরিজমের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সুসংগত ও টেকসই পর্যটন সরবরাহ করা। এর মাধ্যমে পর্যটকদের বিভিন্ন বন্য উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে পর্যটকদের সচেতন করা এবং ইকো-ট্যুরিজম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
ইকো-ট্যুরিজমের গুরুত্বও বহুমাত্রিক। এটি পিছিয়ে থাকা প্রত্যন্ত এলাকার অর্থনৈতিক বিকাশে সহায়তা করতে পারে। বিভিন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পর্কে মানুষকে জানার সুযোগ করে দেয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মানুষকে স্বনির্ভর হতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সমাগম ঘটিয়ে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। প্রকৃতির মধ্যে থেকে মানুষ বিনোদনের সুযোগ পায় এবং স্থানীয় এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নও ঘটে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোও এর সঙ্গে যুক্ত।
ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ তৈরি হয়। মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। সর্বোপরি, পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম দেশের অর্থনৈতিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান সময়ে ইকো-ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করা তাই সময়ের দাবি। টেকসই পর্যটন উন্নয়ন ও বিকাশে ইকো-ট্যুরিজম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যে আমাদের অনেক প্রতিবেশী দেশ ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে টেকসই পর্যটনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে। বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনতে হলে ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস, কক্সবাজারের বিভিন্ন গন্তব্য, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, সুন্দরবন, নিঝুম দ্বীপসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রকে ইকো-ট্যুরিজমের আওতায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা গেলে টেকসই পর্যটনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা যাবে, অন্যদিকে পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
পরিশেষে বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নিতে হলে ট্যুর গাইডিং ও ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ট্যুর গাইড এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যেতে পারে।
লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সেবার ট্রাভেল নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ লিমিটেড
** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।










