ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:০৬:৪৫

প্রীতিলতার প্রতি শ্রদ্ধা

প্রীতিলতার প্রতি শ্রদ্ধা

প্রীতিলতা এক মহীয়সী বাঙালি নারীর নাম, তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী বীরকন্যা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ৮৩ বছর আগে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ২১ বছর বয়সে যে ত্যাগ আর বীরত্বের নিদর্শন রেখে গেছেন বাঙালি জাতি, আমাদের পিছিয়ে থাকা সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে লৈঙ্গিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে প্রেরণা হয়ে থাকবেন। মাতৃভূমিকে বিদেশি নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে উপমহাদেশের প্রথম আত্মোৎসর্গকারী নারী শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। আদর করে মা প্রতিভাদেবী তাকে "রাণী" ডাকতেন। পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম শহরের আসকার খানের দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে টিনের ছাউনি দেয়া মাটির একটা দোতলা বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতেন ওয়াদ্দেদার পরিবার। অন্তর্মুখী,লাজুক এবং মুখচোরা স্বভাবের প্রীতিলতা ছেলেবেলায় ঘর ঝাঁট দেওয়া,বাসন মাজা ইত্যাদি কাজে মা-কে সাহায্য করতেন। ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ছিল প্রীতিলতার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯১৮ সালে তিনি এই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। প্রতি ক্লাসে ভালো ফলাফলের জন্য তিনি সব শিক্ষকের খুব প্রিয় ছিলেন। সেই শিক্ষকের একজন ছিলেন ইতিহাসের ঊষাদি। তিনি প্রীতিলতাকে পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষীবাই এর ইংরেজ সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস বলতেন। স্কুলে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন কল্পনা দত্ত (পরবর্তীকালে বিপ্লবী)। এক ক্লাসের বড় প্রীতিলতা কল্পনার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তাদের স্বপ্নের কথা লিখেছেন কল্পনা দত্ত. "কোন কোন সময় আমরা স্বপ্ন দেখতাম বড় বিজ্ঞানি হব। সেই সময়ে ঝাঁসীর রানী আমাদের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। নিজেদের আমরা অকুতোভয় বিপ্লবী হিসাবে দেখা শুরু করলাম।" স্কুলে আর্টস এবং সাহিত্য প্রীতিলতার প্রিয় বিষয় ছিলো। ১৯২৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলাপ পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি কয়েকটি বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অঙ্কের নম্বর খারাপ ছিল বলে তিনি বৃত্তি পেলেন না। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বন্ধের সময় তিনি নাটক লেখেন এবং মেয়েরা সবাই মিলে সে নাটক চৌকি দিয়ে তৈরি মঞ্চে পরিবেশন করেন। পরীক্ষার ফলাফল দেওয়ার সময়টাতে তার বাড়িতে এক বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু প্রীতিলতার প্রবল আপত্তির কারণে বিয়ের ব্যবস্থা তখনকার মতো স্থগিত হয়ে যায়। আই.এ. পড়ার জন্য তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজের ছাত্রী নিবাসের মাসিক থাকা খাওয়ার খরচ ছিল ১০ টাকা এবং এর মধ্যে কলেজের বেতন ও হয়ে যেত। এ কারণেই অল্প বেতনের চাকুরে জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার মেয়েকে আই.এ. পড়তে ঢাকায় পাঠান। ১৯৩০ সালে আই.এ. পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম এবং সবার মধ্যে পঞ্চম স্থান লাভ করে। এই ফলাফলের জন্য তিনি মাসিক ২০ টাকার বৃত্তি পান এবং কলকাতার বেথুন কলেজ়ে বি এ পড়তে যান। বেথুন কলেজে মেয়েদের সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বানারসী ঘোষ স্ট্রীটের হোস্টেলের ছাদে বসে প্রীতিলতার বাশীঁ বাজানো উপভোগ করতো কলেজের মেয়েরা। প্রীতিলতার বি.এ. তে অন্যতম বিষয় ছিল দর্শন। দর্শনের পরীক্ষায় তিনি ক্লাসে সবার চাইতে ভালো ফলাফল লাভ করতেন। এই বিষয়ে তিনি অনার্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিপ্পবের সঙ্গে যুক্ত হবার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে অনার্স পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। ১৯৩২ সালে ডিসটিংশান নিয়ে তিনি বি.এ. পাশ করেন। কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তার সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা হয়। অবশেষে তাদের ২০১২ সালের ২২ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মরণোত্তর স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করা হয়। `মাগো, অমন করে কেঁদো না! আমি যে সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে এসেছি, তুমি কি তাতে আনন্দ পাও না? কী করব মা? দেশ যে পরাধীন! দেশবাসী বিদেশির অত্যাচারে জর্জরিত! দেশমাতৃকা যে শৃঙ্খলভাবে অবনতা, লাঞ্ছিতা, অবমানিতা! তুমি কি সবই নীরবে সহ্য করবে মা? একটি সন্তানকেও কি তুমি মুক্তির জন্য উৎসর্গ করতে পারবে না? তুমি কি কেবলই কাঁদবে?` -স্বেচ্ছা-আত্মাহুতির আগে প্রীতিলতা তার মায়ের কাছে লিখেছিলেন। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী স্টেশনের কাছে `ইউরোপিয়ান ক্লাব`-এর বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা "কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ"। ক্লাবের ভেতরে চলছে বড় বড় সব ব্রিটিশ অফিসারদের পার্টি। ধুতি, পাঞ্জাবি আর মাথায় পাগড়ি পরা একজন ক্লাবের বাইরের রাস্তায় অনেকক্ষণ ধরে ওঁত পেতে আছেন।`ফুলতার` নামে সবাইকে নিজের পরিচয় দেন তিনি। একটু পরে ঘড়িতে সময় দেখলেন ফুলতার। রাত ১০টা বেজে ৪৫ মিনিটে হুইসেল বাজালেন। তখন অন্ধকার থেকে মূর্তিমান আতংকের মতো বেরিয়ে আসলো আরো ৬-৭ জন। তারা হলেন কালীকিংকর দে, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, শান্তি চক্রবর্তী, মহেন্দ্র চৌধুরী, সুশীল দে আর পান্না সেন। হাতে তাদের `ওয়েবলি রিভলভার`। মুহূর্তের মাঝে সুশীল দে আর মহেন্দ্র চৌধুরী ক্লাবের দেয়াল টপকে দক্ষিণের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন, আর গুলি করে বিশাল বড় হলরুমের বাতিগুলো নিভিয়ে দেন। ব্রিটিশ অফিসারদের বুঝে উঠতে একটু সময় লাগলো, আসলে কী ঘটেছে! যখন তারা বুঝলো, তখন তারাও পাল্টা গুলি ছুঁড়তে লাগলো। মুহূর্তেই ক্লাব ঘর পরিণত হলো রণক্ষেত্রে। ফুলতার নামের ধুতি-পাঞ্জাবি পরা যে ব্যক্তি হুইসেল বাজিয়ে আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি আসলে কোনো পুরুষ নন। তিনি পুরুষের ছদ্মবেশে একজন নারী। তার আসল নাম `প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার`। আক্রমণ শেষে পালানোর সময় বুঝলেন ব্রিটিশরা কুকুর নিয়ে তাড়া করেছে। এদিকে প্রীতিলতা গুলি খেয়ে দৌড়ুতেও পারছেন না। কিন্তু ধরা দেওয়া যাবে না ব্রিটিশদের হাতে কোনোমতেই। প্রীতিলতা তার সঙ্গে দৌড়াতে থাকা কালীকিংকরের কাছে পটাশিয়াম সায়ানাইড চাইলেন। সেটা পেয়েই মুখে ঢেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন প্রীতিলতা। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে রাতের আঁধারে মিশে গেলেন সাথের কমরেডরা। প্রীতিলতার মৃত্যুর পর তার পরিবারের অবস্থা নিয়ে কল্পনা দত্ত লিখেছেন- `প্রীতির বাবা শোকে দুঃখে পাগলের মত হয়ে গেলেন, কিন্তু প্রীতির মা গর্ব করে বলতেন,`আমার মেয়ে দেশের কাজে প্রাণ দিয়েছে`। তাদের দুঃখের পরিসীমা ছিল না। তবু তিনি তারা দুঃখেকে দুঃখ মনে করেননি। ধাত্রীর কাজ নিয়ে তিনি সংসার চালিয়ে নিয়েছেন। প্রীতির বাবা প্রীতির দুঃখ ভুলতে পারেননি। আমাকে দেখলেই তার প্রীতির কথা মনে পড়ে যায়। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন`। প্রীতিলতা কালো ছিলেন। আত্মীয়স্বজনের বিরূপ মন্তব্যের উত্তরে মা প্রতিভাময়ী দেবী বলেছিলেন, ‘আমার কালো মেয়ে তোমাদের সবার মুখ আলো করবে।’ হ্যাঁ, প্রীতিলতা আলোর যে মশাল জ্বেলেছিলেন ধলঘাটের মতো প্রত্যন্ত গ্রামে, সেই আলো ছড়িয়ে যাক সারা দেশে, সারা বিশ্বে—এ প্রত্যাশা বিপ্লবী কন্য প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। একটি নাম। শতকোটি চেতনার গর্বিত শিহরণ। যিনি ছিলেন সদা অবিচল তার কর্তব্যনিষ্ঠায়, দেশপ্রেম চেতনায়, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। যার কাছে তার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান ছিল দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মুক্তি। প্রয়াণ দিবসে বলি বিপ্লবের জননী,আমি আজও বিশ্বাস করি প্রীতিলতার জন্ম যে মাটি সে মাটিতে মৌলবাদের কবর রচিত হবেই। লেখক: সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মী। আআ / এসএইচ/
আমি সব সময় আনন্দ খুঁজি: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এক বক্তৃতায় বলেন, আমাদের পাশের বাড়িতে একজন কন্ট্রাক্টর এলেন। কন্ট্রাক্টরের অনেক টাকা। তার স্ত্রীর হাতের কবজি থেকে শুরু করে কনুই পর্যন্ত গহনা। আমাদের এখানে আসার পরে কন্ট্রাক্টরের স্ত্রী কাজকর্ম শেষ করে দুপুর বেলা আমাদের বাড়িতে এলেন। আমার স্ত্রীর সঙ্গে একটু পরিচিত হওয়ার জন্য।এসেই বল্লেন, আভা কেমন আছেন? সে আবার আপা বলতে পারেন না। তো আমার স্ত্রী বল্লেন যে ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন? উনি তখন হাত ঘুরিয়ে এদিক সেদিক করে বল্লেন এই আরকি আছি আরকি। এই সবের মধ্য দিয়ে জীবন গেছে। তবে আনন্দ যায়নি। কত যে বন্ধ। কত যে আড্ডা। কত যে গল্প। কত যে কাজ। কত রকম আনন্দ। মানে আনন্দে আনন্দে আমার জীবন একদম ভরে আছে। একদিন আব্দুল মান্নান সৈয়দ আমার একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিল। ও  হচ্ছে নৈরাশ্যবাদী আমি হচ্ছি আশাবাদী। সে শুধু নৈরাশ্যের দিকে টানতে চায়। আমি বল্লাম যে মান্নান এই যে আমি জন্মেছি এই পৃথিবীতে মানুষ হয়ে। এ রকম একটা নীল আকাশ দেখছি। এতো সন্দর একটা ফুল ফোটা পৃথিবী দেখছি। আমি তো অবিশ্বাস্য অসাধারণ জীবনের মধ্যে এসে গেছি। আমি তো নাও আসতে পারতাম। আমি তো একটা ব্যাঙ হয়ে জন্মাতে পারতাম। কেচো হয়ে জন্মে যেতে পারতাম। তাহলে কি দুর্ভাগ্যই না হতো। অথবা হয়তো জন্মাতামই না। সেখানে আমার জীবনের এই যে জন্ম। এর জন্যই তো আমাদের পাগল হয়ে যাওয়া উচিৎ। আমাদের প্রত্যেকের মারা যাওয়া উচিৎ। আত্ম হত্যা করা উচিৎ। যে এই রকম জীব আমরা কি করে পেলাম। একটা জিনিসের জন্যে আজ আমার দুঃখ। রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনে কোন বন্ধু ছিল না। ওনার বন্ধু ছিল লেখা, ওনার বন্ধু ছিল গান, ওনার বন্ধু ছিল ছবি। পাগলের মতো। এক জায়গাতে উনি লিখেছেন- ঘরে লাগাইয়া খিল-স্বর্গে মর্তে খুঁজিতেছি মিল। পাগলের মতো কাজ করেছেন। কিন্তু আমি জানতাম না। আমি দেখেছি যে আমার মধ্যে কোথায় যেন একটু আলসেমি আছে। কোথায় যেন একটু আরাম। কোথায় যেন একটু  আড্ডা। কোথায় যেন একটু গল্প। কোথায় যেন একটু মানুষের মুখ। কোথায় যেন একটু আনন্দ। মানুষের মুখের অট্টহাঁসি না শুনলে আমার ভালো লাগে না। মানুষের মুখ না দেখলে আমার ভালো লাগে না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৭৯তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান। জন্মদিনে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মী ও ভক্ত-অনুরাগীরা। তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হুবহু বক্তব্যের কিছু অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হয়। অনুলেখক-রিজাউল করিম আরকে//এসএইচ/

অন্যের বাড়িতে গিয়ে টেলিভিশন দেখতাম: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৭৯তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান। জন্মদিনে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মী ও ভক্ত-অনুরাগীরা। তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হুবহু বক্তব্যের কিছু অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো। আমার জীবন কেমন অস্বচ্ছল ছিল একটু বলি। আমার স্ত্রীকে একজন বলেছে যে আপনার হাসবেন্ডকে অমুক জায়গায় দেখলাম। তখন আমার স্ত্রী বলছে যে আপনি অন্য কাউকে দেখেছেন। আমার  হাসবেন্ডকে দেখেন নাই। কেন দেখি নাই? উত্তরে স্ত্রী বলছে, অতদূর যেতে গেলে যে পরিমান টাকা দরকার, সে টাকা তাকে দেওয়া হয়নি। তবে একেবারে অস্বচ্ছল জীবনে কিছু চাপকানিও আছে। আমার এক আত্মীয়া হঠাৎ একদিন জিজ্ঞেস করলেন যে এবার ঈদে বউকে কি দিলি? আমি উত্তরে গর্বের সঙ্গে বল্লাম যে একটা শাড়ী দিয়েছি। জিজ্ঞেস করলেন দাম কত? আমি বল্লাম ৩৫ টাকা। শুনে উনি বিমর্শ হয়ে গেলেন। মাত্র ৩৫ টাকার শাড়ী দিলি! আমি বল্লাম আরে বাবা আমার বেতন-ই তো মাত্র ৩০০ টাকা। ৩০ টাকা মানে তো ১৩ শতাংশ। তার ধারণা যে আমি যেন স্ত্রীর শাড়ী কেনার জন্যেই জন্মগ্রহণ করেছি। তখন তো আর বোনাস ছিল না। তখন  ৩০ টাকার বেশি দামের  শাড়ী কি না খেয়ে দেবো নাকী? তারপরে করি টেলিভিশন। তখন সারাদেশ টেলিভিশনে আমার প্রগ্রামে আনন্দ পেয়ে গেছে। এতই আনন্দ পেয়ে গেছে যে, শেষ পর্যন্ত টেলিভিশনে জাতীয় পুরস্কার ছিল না। সেই জাতীয় পুরস্কার ইন্ট্রোডিউস করে আমাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। জাতীয় পুরস্কার দেওয়ার পরও ৭ বছর পর্যন্ত আমার ঘরে টেলিভিশন ছিল না। আমি নিজে অন্যের বাড়ীতে গিয়ে টেলিভিশন দেখতাম। আমাদের কলোনীর মধ্যে বিরাট উচু স্থানে টেলিভিশন বসানো হতো। চারপাশের লোক দেখতো আর আমি পিছনে বসে বসে দেখতাম। টেলিভিশন না থাকার কারণে আমি যখন জাতীয় পুরস্কার পেলাম আমার দুই মেয়ে বুঝতে পারলো না, যে তাদের বাবা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। এভাবেই যে কত রকম দু:খ দারিদ্র সৈহ্য করতে হয় মানুষকে। অনুলেখক-রিজাউল করিম আরকে//

অস্বচ্ছলতার মধ্যেই জীবন সবচেয়ে আনন্দের ছিল: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৭৯তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান। জন্মদিনে তাকে  ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মী ও  ভক্ত-অনুরাগীরা। তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হুবহু বক্তব্যের কিছু অংশ পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো। গত ৩৫ বছর ধরে কে বা কাহারা অদৃশ্য থেকে আমার এ জন্মদিনের অনুষ্ঠানটার আয়োজন করে। আমি তাদের কাউকে কাউকে কখনও কখনও দেখি, কাউকে কাউকে দেখিও না, জানিও না। তো বুড়ো মানুষদের জন্মদিন এমনিতেই একটা বিরক্তিকর ব্যাপার। তবুও এর মধ্যে যে কিছু ভালো যে  একেবারে নাই, তা না। তবে আমার জন্যে যেটা সেটা হচ্ছে একটা আতঙ্কের। আতঙ্ক এই জন্য যে প্রত্যেক বছর জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা করে বক্তব্য করতে হবে। ৩৫ বছর আমার জন্মদিনে এক বিষয়ের উপর আমি ৩৫টি বক্তব্য করেছি। আর কত এটা পারা যায়। আমি যদি তোমাদের মতো তরুণ-তরুণি হতাম। তাহলে এটা হয়তো পারা যেত। কারণ মুস্তফা আলী বলেছেন, আজকালকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মাথায় এতো প্যাচ, যে মাথার ভিতর পেরেক ঢুকিয়ে টেনে বের করলে স্ক্রু হয়ে বের হয়ে আসে। কিন্তু আমাদের বুড়োদের বেলাইতো ব্যাপারটা উল্টো। আমাদের স্ক্রু ঢুকিয়ে টেনে বের করলে পেরেক হয়ে বের হয়। আমাদের তো সব সাদা। আমি নিজের কথা  খুব একটা বলি না। আজকে দু-একটা নিজের কথা বলি। নিজের কথার একটি হচ্ছে যে আমি সেই  ছেলেবেলা থেকে- কেন যে আমারে মনে এসেছিল আমি জানি না। আমার মনে হয়েছিল যে আমি সারাজীবন অন্যদের জন্য কাজ করবো। তো পরে দেখলাম যে অন্যদের জন্য কাজ করার আবার অসুবিধাও আছে। অন্যদের জন্য কাজ করতে গেলে নিজের জন্য টাকা রোজগার করা যায় না। আজকাল যারা টাকা রোজগার করে তাদের জীবন তো দেখি। সকাল ৮টার সময় দৌড়াতে দৌড়াতে অফিসে ছুট লাগায়। সারাদিন অফিস করে কেউ ৮টা কেউ ৯টার সময় ফেরে। তাহলে তো ১২-১৩ ঘণ্টা চলেই গেল। তারপর ঘুমায় ৬-৭ ঘণ্টা। তারপর কাজটাজ করে। এটা সেটা করে। আবার দৌড় দেয়। আগে ব্যাংকারদের বলা হতো যে তোমার ছেলে কত বড়। তো বলে যে এতোটুকু। কারণ যখন বাবা অফিসে যায় তখনও সন্তান ঘুমায়। আর যখন ফেরে তখনও সে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুতরাং তাকে উচু অবস্থায় দেখা যায় না। তো আমাদের জীবন তো একটা সময়, সেই সময়-ই যদি চলে গেল তাহলে জীবনের কি থাকলো। সেই নাসির উদ্দিন হোজ্জার কথাটা মনে পড়ে গেলে আমার হাঁসি পায়। যে এটা যদি সময় হয়, তো জীবন কোথায়। আর সময় যদি জীবন হয় তো সময় কোথায়। এইভাবেই তো আমাদের জীবনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি তখন ঠিক করেছিলাম যে একটা গড়পড়তা জীবন আমি যাপন করবো। শেষ পর্যন্ত একটা চাকরিও পেলাম। বেতন ২৫০ টাকা। আর ৩০ টাকা হচ্ছে মহার্ঘ ভাতা। মোট হলো ২৮০ টাকা। তৃতীয়টা বড়ই দু:খজনক। সেটা শুধু যারা বিয়ে করেছে তাদের জন্য। বিয়ে করলে ১৮ টাকা অতিরিক্ত। যেন একটা বউ ১৮ টাকা তার দাম। আমার তখনও বিয়ে হয়নি। আমার সামনে দিয়ে এরা কড়কড়ে ১৮টাকা গুণে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। সেই ক্ষোভে এবং ক্রোধে আমি বিয়ের জন্য উতলা হয়ে উঠলাম। তো এখন চাকরি পেলাম। চাকরিতে বেশ আরামে আছি। সাহিত্য আন্দোলন করছি। টেলিভিশন করি। সবকিছু করি। কিন্তু একটা অস্বচ্ছল জীবন। যদিও আনন্দ কম ছিল না। আমার মনে হয় আমর জীবনে যখন আমি সবচেয়ে অস্বচ্ছলতায় ভুগেছি, তখন আমার জীবন সবচেয়ে আনন্দময় ছিল। অনুলেখক-রিজাউল করিম আরকে//

বিএনপির ১০ ঐতিহাসিক ভুল

জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করা অবৈধ সেনাশাসকের পরিচয় মুছে ফেলে ইতিহাসে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বিএনপি এমন একটি দল যার জন্ম হয়েছে সেনা ছাউনি থেকে। সাধারণত সেনা ছাউনি থেকে জন্ম নেওয়া দলগুলো খুব বেশিদিন জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। এদিক থেকে বিএনপি ব্যতিক্রম। এই দলটি কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। বিএনপির জন্মের ইতিহাস বলে, গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে দলটির মেলবন্ধন কোনো কালেই ছিল না। সময়ের চক্রে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সত্যি কিন্তু তাদের আদর্শিক দেউলিয়াপনা সবসময়ই রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনার বিষয় হয়েছে। মেজর জিয়াউর রহমান একবার বলেছিলেন, ‘আই উইল মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান।’ অর্থ্যাৎ ‘আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করে তুলবো।’ কিন্তু কালের কী অদ্ভুত বিচার। প্রতিষ্ঠার ৪০ তম বার্ষিকীতে এসে বিএনপি দেখতে পাচ্ছে, অন্যদের জন্য রাজনীতি কঠিন করতে গিয়ে তাঁদের নিজেদের জন্যই রাজনীতিটা এখন কঠিন হয়ে গেছে। নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত সঙ্কটময় কাল বিএনপির জন্য আর আসেনি। এই সঙ্কটের জন্য মোটা দাগে বিএনপির ১০টা ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। সেগুলো নিন্মরুপ- ১) জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করেন তখন তিনি জামায়াতে ইসলামী, স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বিএনপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। এই শাহ আজিজ ছিলেন একজন স্বীকৃত রাজাকার। এই থেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে জিয়ার দহরম-মহরম কেমন তা বোঝা যায়। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রচিত যে সংবিধান সে সংবিধান কাটাছেড়া করে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র বাদ দিয়েছিলেন এবং গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রথমেই স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষক দল হিসেবে এই দলটির একটি চরিত্র দাঁড়িয়ে যায়। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির যে ধারা বিএনপি চালু করেছিল, বিএনপিকে আজকে তার মূল্য দিতে হচ্ছে। ২) বিএনপি বাংলাদেশে টাকা দিয়ে কেনাবেচার রাজনীতি চালু করে। দল কেনাবেচা, দল ভাঙা, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভেঙে নিজেদের দল ভারী করার ধারার প্রবর্তন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিএনপির এই কর্মকাণ্ডের ভূক্তভোগী হয়। টাকা দিয়ে আদর্শ কেনাবেচা করে দল গঠন করার মূল্য এখন বিএনপিকে দিতে হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ৩) বিএনপির রাজনীতির আরেকটি বড় ভুল ছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে পাস করিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দেওয়া। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি থেকে রক্ষা করার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। মোশতাক অধ্যাদেশ জারি করলেও জিয়াউর রহমানই ছিলেন তখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু উনি এই অধ্যাদেশ বাতিল করেননি। ওই সময় যদি জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করতেন তাহলে বিএনপি রাজনৈতিক আদর্শের একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারতো। কিন্তু তা না করে জিয়া কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদের মতো বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করলেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন। এর মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের পচাত্তরের খুনিদের রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রমাণ করলো। ওই সময়টাতে রাজনৈতিক বিভাজনের যে ধারা বিএনপি সূচনা করেছিল তার প্রতিফল এখন তারা ভোগ করছে। ৪) বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি কলুষিত করার দায়টিও নিতে হবে বিএনপিকে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হিজবুল বাহার নামক একটি জাহাজে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়ে ভ্রমণে যেতেন। সেই ভ্রমণগুলোতেই শিক্ষার্থীদের ব্রেইন ওয়াশ করে বিএনপির ভ্রষ্ট আদর্শে তাদের দীক্ষা দেওয়া হতো। গোলাম ফারুক অভি, নীরুর মতো অনেক মেধাবী ছাত্র এই হিজবুল বাহারের বলি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আদর্শের বদলে অর্থ দিয়ে রাজনীতি করার ধারা শুরু করেছিল বিএনপি। রাজনীতিতে অস্ত্র, পেশীশক্তি, কালো টাকার ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বিএনপি আজকে তার মূল্যই বিএনপিকে দিতে হচ্ছে। দলের ক্রান্তিকালীন সময়ে যে বিএনপি আন্দোলন করতে পারছে না তার কারণ তাদের কোনো ত্যাগী, আদর্শিক কর্মী নেই। একটি রাজনৈতিক দলের যদি কোনো আদর্শ না থাকে তবে শুধু টাকা পয়সা দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করা যায় না। নিজেদের আদর্শহীন রাজনীতির কারণেই এখন ভুগছে বিএনপি। ৫) জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তখনো তাদের সামনে সুযোগ ছিল জিয়ার অপকর্ম, রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বিএনপি গড়ার। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে বিএনপির সামনে এমন একটি পথ সৃষ্টিও হয়েছিল। এর ফলেই একটি দিনবদলের  প্রত্যাশা থেকে ’৯১ এর নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে জনগণ। কিন্তু ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার বিএনপিও জিয়াউর রহমানের বিএনপির ধারাবাহিকতাই রক্ষা করলো। যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে থাকা, স্বাধীনতাবিরোধীদের মদদ দেওয়া, পচাত্তরের খুনিদের সঙ্গে মিত্রতা করার কাজগুলো নব উদ্যমে শুরু করলো বিএনপি। ফলে স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির বদনাম আর ঘুচলো না। গণতান্ত্রিক পথে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেও গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করার সুযোগটি না নিয়ে বিএনপি আরও একটি ভুল করলো। ৬) ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির রাজনীতিতে অভ্যুদয় ঘটলো জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক জিয়ার। তারেক জিয়ার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বিএনপির রাজনীতিকে আরও কলুষিত করলো। বিএনপি হয়ে গেল দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকার আখড়া। সেবার বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ পরপর তিনবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। তারেকের বাসভবন হাওয়া ভবন থেকে আসতে থাকলো সরকারি গুরুত্বপুর্ন অনেক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির মচ্ছব বসলো সেখানে। দুর্নীতিবাজ হিসেবে ব্র্যান্ডিং হয়ে গেল তারেক জিয়ার। তাঁকে মানুষ চিনতে লাগলো দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে। তারেক জিয়ার কর্মকাণ্ডে তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপির অর্থনৈতিক সততার যে একটা প্রলেপ ছিল সেটিও ধ্বংস হয়ে গেল। বিএনপির যে সকল নেতাকর্মী-সমর্থক আদর্শ ছাড়াই শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সততা দেখে বিএনপিকে পছন্দ করতেন তাদের কাছেও দলটি আস্থা হারিয়ে ফেললো। ৭) জামায়াত নির্ভরতা বিএনপির আরেকটি বড় ভুল। জিয়াউর রহমান জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন আর খালেদা জিয়া শুরু করেন পুরোপুরি জামায়াত নির্ভর রাজনীতি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে একাত্তরের রাজাকার-আলবদরদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিলেন বেগম জিয়া। এসব ঘটনায় জামায়াত থেকে বিএনপিকে আর আলাদা করার সুযোগ রইলো না, জামায়াত-বিএনপি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এর ফলে দেশের তরুণ সমাজ, সেক্যুলার সমাজ, মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী সমাজের আস্থাও হারিয়ে ফেললো বিএনপি। ৮) বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি সবচেয়ে বড় বিভাজন রেখাটি তৈরি করেছিল ২০০৪ সালে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে। ওই হামলার মাধ্যমে যে  সন্ত্রাস ও প্রতিপক্ষকে নির্মূলের রাজনীতি চালু করেছিল বিএনপি তাই দলটিকে সবচেয়ে বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ৯) বিএনপির আরেকটি ভুল ছিল আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা সংলাপে বসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে যে টেলিফোন করেছিলেন, তাকে অগ্রাহ্য করা। শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বসলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত তা কেউ মনে করে না। তবে এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হতো, এটাই বা কম কিসে। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পর সান্তনা দিতে গুলশানে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তাঁকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে ফিরে এসেছিলেন শেখ হাসিনা। এই ঘটনাটিকেও রাজনৈতিক মহল ভালো চোখে দেখেননি। বিএনপি এখানেও যে ফেল মেরেছে, তা হলফ করে বলে দেওয়া যায়। ১০) বিএনপির সর্বশেষ বড় ভুল হলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। রাজনৈতিক মহল মনে করেন, ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা বিএনপির উচিত ছিল। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে একাধারে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া। দেশজুড়ে জ্বালাও-পোড়াও করা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনকে গণতন্ত্রের কালো দিবস আখ্যায়িত করে এ আন্দোলন এতদূর টেনে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এই আন্দোলনে যে জ্বালাও-পোড়াও ও মানুষের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে, তার পুরো দায়ভার সরকার বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। যদিও বিএনপি দাবি করেছে, এর জন্য ক্ষমতাসীন দল ও সরকার দায়ী। কিন্তু এতদিন আন্দোলন করার কারণে অনেক নেতা-কর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন অনেকে। আবার অনেকের নামে দেওয়া হয়েছে মামলা। বলা হয়, মামলায় পর্যুদস্ত দল হচ্ছে বিএনপি। বিএনপি যদি ওই নির্বাচনে যেত তাহলে আজকে তাঁদের ৪০ বছর পূর্তির দিনটি এতটা বিবর্ণ, এতটা সংকটময় হতো না। / এআর /

মুহিত ভাই অন্তত ১০০ বছর বাঁচবেন: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন জাতীয় অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বঙ্কিম চন্দ্রের এক বইয়ের কমলাকান্ত চরিত্রের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস কাহারো কাহারো কিছু কিছু আপত্তি থাকিলেও মুহিত ভাই (অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত) অন্তত ১০০ বছর বাঁচবেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ৮৫ তম জন্মদিন এবং সংকট ও সুযোগ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করেন তিনি। এ সময় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলামসহ বরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের দেওয়া বক্তব্য পাঠকের উদ্দেশ্যে হুবহু তলে ধরা হলো- এটা খুবই আনন্দের কথা যে একজন মানুষ আমাদের দেশে ৮৫ বছরে পা দিচ্ছেন। এ জন্য তাকে অভিনন্দন জানানো উচিত। অর্থমন্ত্রী নিজেকে ৮৫ বছরের বলে গর্ব করতে পারেন। কারণ আমাদের দেশে এই সেদিনও কিন্তু ৬০ বছর ছিল বিরাট বয়স। বঙ্কিমের কমলাকান্তের দপ্তর বইটা আছে। তার মধ্যে কমলাকান্ত নামে একজন লোক আছে। সেই লোকের বয়স মনে হয় ৫৫-৫৬ বছর। বঙ্কিম যখন লিখেছেন তখন তার বয়স ৩৭ বছর। কিন্তু এমনভাবেই তিনি কমলাকান্তের ছবি বইটাতে একেছেন, যে মনে হয় কমলাকান্ত অশিতিপরবৃত্ত। আদালতে জর্জ জিজ্ঞেস করছেন যে কমলাকান্ত তুমি কি জীবিত আছো? কারণ ইতিমধ্যে রটে গিয়েছিল যে কমলাকান্ত আর বেঁচে নেই। ধর্মাবতর জিজ্ঞেস করলেন যে, কমলাকান্ত তুমি কি জীবিত আছো? তখন কমলাকান্ত উত্তর দিলো- ধর্মাবতর আমি এখনও জীবিত আছি এবং কাহারো কাহারো কিছু কিছু আপত্তি থাকলেও আরো কিছুদিন বেঁচে থাকিব। তো তখন যেটা ছিল ৫৬ বছর। আজ সেটা হয়েছে ৮৫ বছর। সুতরাং আমার দৃঢ় বিশ্বাস কাহারো কাহারো কিছু কিছু আপত্তি থাকিলেও মুহিত ভাই (অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত) অন্তত ১০০ বছর বাঁচবেন। উপেন্দ্র কেশর রায় চৌধুরী। সত্যজিত রায়ের বাবা সুকুমার রায়, তার বাবা। তার একটা বই আছে। বইটা সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন। সেটা হচ্ছে ‘ছেলেদের রামায়ণ’। তার  প্রথম লাইন হচ্ছে অযোদ্ধার রাজা দশরাতের ৬০ বছর পূর্ণ হইয়াছে। কাজেই বুঝিতে পারিতেছ কি বুড়াটাই না তিনি হইয়াছে। যদিও মূল রামায়ণে আছে ৬০ হাজার বছর। আর মুহিত ভাই আজকে চিন্তা করেন। সেই বৃদ্ধ রাজা দশরাতের চেয়ে ২৫ বছর পর একদম তারুণ্যদীপ্ত চেহারা নিয়ে বসে আছেন মুহিত ভাই। এখনও তার স্মৃতির কোন গোলমাল নেই। উনার পাশে যে আনিস স্যার বসে আছেন এ দু’জনেরই স্মৃতি ঘটিত কোন সমস্যা নেই। এটা আমাদের জন্য খুবই বিপদজনক। আমি চিন্তা করে দেখলাম আজ সকাল বেলা। ৮৫ বছর কত বয়স!  আমি দেখলাম কনফুসিয়াসের চেয়ে ১২ বছর বেশি। চীন ২ হাজার বছর ধরে যাকে অনুস্মরণ করছে তার চেয়ে ১২ বছর বেশি। যদি শুধুমাত্র বয়স দিয়ে সিনিয়র-জুনিয়র মাপা হতো। তাহলে এসব বিরাট বিরাট লোকেরা মুহিত ভাইয়ের কাছে কি? কনফুসিয়াস ছাড়া তিনি সক্রেটিসের চেয়ে ১২ বছরের বড়। উনি গৌতম বুদ্ধের চেয়ে ৪ বছরের বড়। রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ৫ বছরের বড়। গেটের চেয়ে ৩ বছরের বড়। যাহোক আমার খুব প্রিয় একজন লেখক আছে। রোমান লেখক সিসেরোর একটা কথা আছে। যে বেঁচে থাকাটা একটা যোগ্যতা। সব লোক সমান বেঁচে থাকতে পারে না। অসংযত লোক, অনিয়ন্ত্রিত লোক, উচ্ছৃঙ্খল লোক দীর্ঘায়ু হয় না। সুতরাং বেঁচে আছে মানেই বুঝতে হবে জীবনের মাঝে কোথাও না কোথাও ভারসাম্য আছে। পরিমিত বোধ আছে এবং জীবনকে ধারণ করার একটা নিদ্রাহীন চেষ্টা তার মধ্যে আছে। তো মুহিত ভাইয়ের মধ্যে এই যে দীর্ঘায়ু, এটা এমনি না। অনেকে বলতে পারেন যে আজকে তো মানুষ চেষ্টা করছে যে দেড়শো বছর বাঁচবে। ঠিক আছে আমি মেনে নিলাম যে দেড়শো বছর বাঁচবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বলছে। এমনও হতে পারে যে ১ হাজার বছর বাঁচবে মানুষ। কিন্তু তাই বলে সবাই কি ১ হাজার বছর বাঁচবে। বাঁচবে না। তখনও ২শ’ বছরে মরার লোক অনেক পাওয়া যাবে। আমাদের বয়স যদি ৩শ’ বছর হতো তবে কি  লাভ হতো? তাহলে তো ৬০ বছরে আমরা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হতাম। আমাদের এক কলেজের হেড ক্লার্ক বলতেন স্যার গাধার আবার বয়স কি? সে ১০ বছরেও গাধা, ৮০ বছরেও গাধা।  সুতরাং বয়স দিয়ে কিছু হয় না। যতই বয়স বাড়ুক আমাদের। ১ হাজার বছর পর্যন্ত যাওয়া কঠিন-ই থাকবে। এটা এভারেস্টে যাওয়ার মতোই কঠিন থাকবে। আমি ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়ি, তখন উনি পাস করে বেরিয়ে গেছেন। তখন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। দেখা হয়েছে মধ্য বয়সে। যখন উনার বয়স হয়তো ৫০ বছর। আমাদের হয়তো ৪৪ বছর। মুহিত ভাই তখন বুঝতে পারছিলেন না। যে আমি সাহিত্যের লোক। তখন উনি ইআরডির সেক্রেটারি। তার কাছে আমার কি কাজ। কিন্তু টাকা যার কাছে আছে। তার কাছে কাজও আছে। উনি যদি এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যান, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে যান, তখন সেটা হয়তো আমাদের….। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী দিয়েই বা কি হবে। কারণ আমি এই স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়টাই বিশ্বাস করি না। যেখানে রোগ, ইনজেকশন, ওষুধ, ডাক্তার, পথ্য, মৃত্যু এসবকিছু। সেটা স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় হয় কিভাবে? ওটার নাম তো হওয়া উচিত রোগ মন্ত্রণালয়। আর যদি কিছু সম্মান করে বলতে হয়, তবে বলা যায় আরোগ্যমন্ত্রণালয়। কিন্তু স্বাস্থ্য হলে বাঙ্গালীর এই চেহারা থাকে? তো মুহিত ভাইকে যখন প্রথম দেখলাম। সেই দীর্ঘ দেহি মানুষটা। আমি অবাক হলাম। তখন তাকে সুপুরুষ মনে হলো। আপনারা কেমন বলবেন জানি না। হাদিসে আছে যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ-যে তার স্ত্রীর কাছে শ্রেষ্ঠ। এখন আমরা কি কেউ শ্রেষ্ঠ? বলেন বুকে হাত  দিয়ে। সুপুরুষ মানে আমি এটা বুঝাচ্ছি না। যে বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো সুপুরুষ। অনেক মডেল আছে পুরুষ। নায়ক আছে পুরুষ। তাদের আমার অনেক সময় পুরুষ বলেই মনে হয় না। আমার মনে হয় যে বড় সাইজের একটা নারী। আমাদের এ ভারত উপমহাদেশের সব জায়গাতে একটা নারী প্রাধান্য বেশি। নাচের মধ্যে পুরুষ থাকলে সে পুরুষটার প্রতি করুণা হয়। যে সে এখানে কি চায়। আমাদের সবকিছুতে নারী প্রাধান্য। চেহারার মধ্যেও। যে পুরুষদের চেহারা নারীসুলভ। তারাই হচ্ছে সবচেয়ে সুদর্শণ। কিন্তু ইউরোপে তা না। ইউরোপে পুরুষ মানে পুরুষ। আমার কাছে উনাকে সেই রকম মনে হয়েছে। সমর্থ, সুঠাম ও বলিষ্ঠ। জীবনকে যিনি নানা দিক থেকে ফেস করতে পারেন এবং ধারণ করতে পারেন। তাকে দেখে আস্থা জাগে এবং আশা জাগে। হতে পারে তার সঙ্গে আমার মতের মিল হলো কিংবা হলো না। তাতে কিছুই আশে যায় না। এই যে আনিসুল হক মারা গেল। তাতে আমি আজও স্বাভাবিক হতে পারি নাই। কারণ আনিসুল হক আমার সঙ্গে প্রায় ৪০ বছর ছিল। আনিসুল হক মানেই আমার কাছে আস্থা। আনিসুল হক মানেই আমার পাশে কেউ আছে। আমার কিছুদিন আগে হিপের হাড্ডিটা ভেঙ্গে গেল। সেই সময়ে আমার কানের কাছে আমি আনিসের গলার শব্দ শুনলাম। আনিস বলছে যে, স্যার চিকিৎসা নিয়ে ভাববেন না। ও দায়িত্ব আমার। এই যে বলার মানুষটা। ও দায়িত্ব না নিলেও হয়তো কিছুই হবে না। সবকিছু ঠিকঠাক চলবে। কিন্তু এই যে একজন মানুষ পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে যার উপর নির্ভর করা যায়। এটা কিন্তু খুব বড় কথা। মুহিত ভাইয়ের উপর নির্ভর করা যায়। অনেক আগে ৫০ বা ৬০ এর দশকে পুরানো ঢাকায় একজন যুবক রিক্সায় করে যাচ্ছে। হঠাৎ সে পিছনের দিকে তাকিয়েছে। পিছনের রিক্সায় দুই দুটো সুন্দরী মেয়ে বসে আছে। তখন পিছনের দিকে কি করে মেয়ে দুটোকে দেখা যায়। বুদ্ধি বের করলো। সে পকেট থেকে সিগারেট ও  দিয়াশলাই বের করলো। দিয়াশলাই জ্বালালো। আর রিক্সাওয়ালাকে বল্ল- এই রিক্সা আস্তে চালাও। দেখনা আমি সিগারেট ধরাচ্ছি। কিন্তু রিক্সাওয়ালা থামে না। সে আবার বলছে এই রিক্সা থামো। আস্তে যাও। তো রিক্সাওয়ালা আস্তে করেছে। এরপর পিছনের রিক্সাটা পাশ কাটিয়ে গেছে। সে চোখ ঘুরিয়ে তৃপ্তিসহকারে তাদের দেখেছে। কিন্তু রিক্সা যখন অনেক  দূরে চলে গেছে। তখনও সে একটা দীর্ঘাশ্বাসে ওই দিকেই তাকিয়ে আছে। তখন রিক্সাওয়ালা তাকে বলছে যে, সাব বাতাস তো গেল গিয়া। অহন যামু? তো আমাদের বাতাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মুহিত ভাইয়ের বাতাস যেন শেষ না হয়। / আরকে / এআর  

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

গত ৬ জুলাই দিল্লিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি করলেন তার মধ্য দিয়ে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সব জল্পনা-কল্পনাকে পেছনে ফেলে নতুন এক উচ্চতায় পৌছে গেলো। কূটনৈতিক জগতে এটি পরিচিতি লাভ করেছে ২+২ ডায়ালগ বা সংলাপ হিসেবে। চলমান বৈশ্বিক রাজনীতি, ক্ষমতাবলয়ের নতুন মেরুকরণ এবং এরই মধ্যে সূচিত নতুন বিশ্বব্যবস্থার যে চিত্র তার বাস্তবতায় আলোচ্য ২+২ সংলাপের গুরুত্ব অনেক। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারী স্বাধীনতার প্রবক্তা পশ্চিমা বিশ্বের দুই পুরুষ মন্ত্রী যখন এশিয়ার রক্ষণশীল দেশ ভারতের দুই নারী মন্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে দরকষাকষির টেবিলে ঘাম ঝরান, তখন প্রতীকী হলেও যে সত্যটি উন্মোচিত হয় সেটি হলো আর পশ্চিম নয়, ভবিষ্যতে এশিয়াই হবে বিশ্বের সব কর্মকাণ্ডের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি বা ভরকেন্দ্র।দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই ২+২ বৈঠকটি অনেক আগেই ওয়াশিংটনে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের চলমান সম্পর্ক এবং লেনদেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণে সেটি হতে পারেনি। কিন্তু সব আপত্তিকে  পেছনে ঠেলে এবং উহ্য রেখে আমেরিকার দুই টপ নীতিনির্ধারক দিল্লি ছুটে এসেছেন এবং উভয় দেশের জন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি বহু দেন-দরবারের পর স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তিটির শিরোনাম—কমিউনিকেশন কম্প্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাগ্রিমেন্ট, সংক্ষেপে কমকাসা (Communication Compatibility and Security Agreement-COMCASA)। এই চুক্তির বাইরে উভয় দেশ ২০১৯ সালে ভারত মহাসাগরে বড় আকারের যৌথ সামরিক মহড়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে এখন থেকে উভয় দেশ পারস্পরিক অত্যন্ত সংবেদনশীল গোপনীয় সামরিক যোগাযোগ সম্পর্কে অবহিত থাকবে। তাতে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অন্য সব দেশের চলাচল ও তৎপরতার তথ্য দুই দেশের জন্যই নিজস্ব সোর্সের বাইরে অন্য আরেকটি সোর্স থেকে পাওয়ার অতিরিক্ত একটি সুযোগ সৃষ্টি হলো।ভারত এর বাইরে আরো বড় দুটি সুবিধা পাবে। পাকিস্তানের ওপর আমেরিকার যে সার্ভেইল্যান্স বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে তার মাধ্যমে যেসব জঙ্গি সন্ত্রাসীদের ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ব্যবহার করবে সেটির আগাম তথ্য যুক্তরাষ্ট্র পেলে ভারতের কাছেও চলে আসবে। এই যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত এতদসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্রয় করবে এবং তার মাধ্যমে এই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির প্রযুক্তিও ভারতের হাতে চলে আসবে। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন কোন পর্যায়ে এসে উঠেছে তা বোঝার জন্য আরো কয়েকটি বিষয়ের ওপর নজর দেওয়া প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সম্প্রতি স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড অথরাইজেশন-১ (এসটিএ-১) মর্যাদা দিয়েছে। এর ফলে ভারতের কাছে উচ্চ প্রযুক্তি, যার মধ্যে প্রতিরক্ষা ও পারমাণবিক প্রযুক্তিও অন্তর্ভুক্ত, বিক্রির অনুমোদন দেওয়া মার্কিন প্রশাসনের জন্য সহজ হবে। সারা বিশ্বের মাত্র ৩৭টি দেশকে আমেরিকা এই সুবিধা দিয়ে থাকে। পুরো এশিয়ায় এই সুবিধাপ্রাপ্তদের মধ্যে ভারত হলো তৃতীয় দেশ। এর আগে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এই সুবিধা পেয়েছে। এই তালিকাভুক্তির জন্য পূর্বশর্ত হিসেবে একটি দেশকে আগেই অন্য চারটি সংস্থার সদস্য হতে হয়। বাকি তিনটিতে হলেও এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার গ্রুপের (এনএসজি) সদস্য ভারত এখনো হতে পারেনি চীনের বিরোধিতার কারণে। কিন্তু এটি একেবারে ব্যতিক্রম ঘটনা যে এনএসজির সদস্য হওয়ার আগেই আমেরিকা ভারতকে এসটিএ-১ এর মর্যাদা দিল। এর আগে চারটিতে অন্তর্ভুক্তির আগে কোনো দেশকেই এই সুবিধা আমেরিকা দেয়নি।আমেরিকার পক্ষ থেকে এতখানি ছাড় দেওয়া হয়েছে বলেই ৬ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে কমকাসা স্বাক্ষর সম্ভব হয়েছে। তবে বিগত সময়ের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ঘটনার জন্য ভারতের নীতিনির্ধারক ও  থিংকট্যাংকের একাংশ আমেরিকাকে এখনো পুরোপুরি আস্থায় নিতে পারছে না। যেমন—১৯৮২ সালে পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গোপন বার্তা পাঠায় এই মর্মে যে ভারত-ইসরায়েল একসঙ্গে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর আক্রমণ চালাতে পারে। দ্বিতীয়ত, ১৯৯৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি এক গোপন বার্তায় প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে বলেছিলেন, চীনের হুমকি মোকাবেলা করার জন্যই ভারতকে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালাতে হয়েছে। এই গোপন বার্তাটির বিষয়ে আমেরিকা চীনকে জানিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৮ সালের নভেম্বরে ভারতের মুম্বাইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়। তাতে ভারতের অনেকেই সন্দেহ করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক সন্ত্রাসীদের প্রস্তুতিকরণের খবর আমেরিকা ভারতকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর নয়তো জানার পরও তা গোপন করেছে। তবে গত কয়েক বছরে আমেরিকার অবস্থান ও কার্যক্রম দেখে বোঝা যায় ভবিষ্যতে এতদঞ্চল-সংক্রান্ত যেকোনো ইস্যুতে ভারতের চাওয়া-পাওয়াটা আমেরিকার কাছে অগ্রাধিকারের শীর্ষে থাকবে।পক্ষান্তরে পাকিস্তানকে ভবিষ্যতে আমেরিকার দুয়োরানি হয়েই থাকতে হবে। গত ৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত ডন পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য বাতিল হওয়ার পরপরই আবার আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও কি জন্য পাকিস্তানে আসছেন। তিনি কি পাকিস্তানি নেতাদের বকাবকি করবেন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার শেখাবেন, নাকি ভারতে যাওয়ার আগমুহূর্তে দুয়োরানির দরজায় একবার কড়া নেড়ে যাওয়া। দু’দেশের সম্পর্ক এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকলেও আফগানিস্তান ও পারমাণবিক অস্ত্রের অপব্যবহারের আশঙ্কায় পাকিস্তানকে এই মুহূর্তে আমেরিকা একেবারে ত্যাগ করতে পারছে না। পাকিস্তানের পক্ষেও এই মুহূর্তে আমেরিকাকে ত্যাগ করা সম্ভব নয়। কারণ এখনো পাকিস্তানের সমরাস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ আমেরিকান অরিজিন। আফগানিস্তান ইস্যুতে আমেরিকা চায় পাকিস্তান যেন আমেরিকার নির্দেশিত পথে থাকে। কিন্তু আফগানিস্তানে পাকিস্তানের নিজস্ব এজেন্ডা রয়েছে। পাকিস্তানের মাটিতে উৎপত্তি হওয়া আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যথেষ্ট করছে বলে আমেরিকা মনে করে না। পাকিস্তানও হয়তো বুঝতে পেরেছে তেলে-জলে মিশবে না। তাই হয়তো আমেরিকার শত্রু ও প্রতিপক্ষ ইরান ও রাশিয়ার দিকে পাকিস্তান ঝুঁকে যাচ্ছে, আর চীনের সঙ্গে তো পাকিস্তান সর্বতোভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক শক্তিবলয়ের অবস্থান পরিবর্তনের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যদিও সেটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখার জন্য আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।কমকাসা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আমেরিকা ভারতকে বিশাল ছাড় দিলেও ভারত কিন্তু এখনো চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে একটা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, যদিও এই অঞ্চলকে ঘিরে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। গত মে মাসে চীনের পর্যটননগরী উহানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত সফল অনানুষ্ঠানিক বৈঠকটি প্রমাণ করে চীন-ভারত উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন অনেক পরিপক্ব এবং নানা ইস্যুতে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থাকলেও তাঁরা জানেন কোথায় থামতে হবে। ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। কিন্তু তার পরও ভারতের প্রতি আমেরিকার প্রবল আগ্রহের অনেক কারণ আছে। ভবিষ্যতে বিশ্বের ভরকেন্দ্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব কাটিয়ে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ রক্ষা করতে চাইলে ভারতকে পাশে পাওয়া আমেরিকার জন্য একান্ত অপরিহার্য। অন্যদিকে আমেরিকাকে ভারতের প্রয়োজন, যাতে চীনকে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের মধ্যে রাখা যায়।ভূ-রাজনীতির খেলায় কেউই কাউকে শতভাগ বিশ্বাস করে না, ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় করা যায় না। সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা এক অবস্থানে আছে তা মোটেও নয়, যা এরই মধ্যে ওপরের আলোচনায় এসেছে। ওপরের আলোচনায় এটিও মোটামুটি পরিষ্কার যে এ অঞ্চলের রাজনীতি ও নিরাপত্তার ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য হলেও শেষ কথা বলার সুযোগ থাকবে ভারতের হাতে। আর সংগত কারণেই ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য যা প্রয়োজন সেটাই করবে, কাউকে কোনো ছাড় দেবে না।লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকsikder52@gmail.com

আমার মায়ের গল্প

আমার মায়ের গল্প- আমি দেশের সর্বোচ্চ স্কুল ভারতেশ্বরী হোমসে পড়েছি একথা সবাই জানো, বাবার আয় কম হলেও কপাল খুলেছিলো বড় চাচার সহায়তায়। মা ছিলো আমার আনাড়ি, পল্লী গায়ের ঘরোণী। মা ছিলো আমার শ্যামল অঞ্চলের স্নিগ্ধ ছায়ার মত সরলা। বিশাল অট্টালিকার স্কুল কপাটের সামনে দাঁড়াতো মা জড়োসড়ো হয়ে, এরকম দালান গেটে আসেনি যে কখনো আগে। পড়নে থাকতো মায়ের সবুজ জমিনে লাল পেড়ে একটি আটপৌরে শাড়ি। গর্বিত হতো মা, মেয়েটি তার এই স্কুলে পড়ে অন্যকোনো ধনীর দুলালিদের সঙ্গে।মেয়ে অট্টালিকায় হলেও মায়ের স্থানতো ছিলো পাড়াগায়েই। আটপৌরে জীবনে। প্রীতি আর ভালোবাসায়,পৃথিবীর বিলাস দেখিনি কখোনো, জানেনিও কি হয় তাদের সাজ। একই শাড়িতে মা আসতো মাসের পর মাস, আমার অভিবাবক দিবসে আমাকে দেখতে। হাতে থাকতো একই ভেনেটি ব্যাগ, পায়ে থাকতো একই জুতো। আমার বান্ধবী নিলা, তার মায়ের জরুয়া শাড়ি আর হাতে মুক্তখচিত ভ্যানিটি ব্যাগ দেখে আমার মনের কোনটা চিনচিন করতো, মনের ভাষায় বলতাম"মা একই শাড়ি কেনো পড়ে আসো বার বার? মায়া ভরা মায়ের অন্তর চোখ বুঝে নিতো আমার মনের স্বচ্ছ অনুবাদ। স্মিত হেসে বলতো- ক্ষেতে এবার এসেছে সোনালী পাকা ধান, ধান বেচে কিনবো এবার জোতস্না রঙ এর নতুন শাড়ি। এরপর আমার চিন্তিত কপালে দিতো রাশি রাশি ভালোবাসার সোহাগ।"তুমি জানো ও মা আমাকে ভুলানোর শুদ্ধ শিল্পকলা।" আমি জানি, বাবার আয়ের সবটাই যাবে আমাদের খরচে তোমার শাড়ি কেনার কথা নির্ঘাৎ ভুলে থাকবে তুমি আরো কয়েক বছর। বন্ধু মিতার চাকরিজীবী মা আসতো আটশাট পোশাকে, লজ্জিত হয়ে মা চোখ সরিয়ে নিতো আমার চোখ থেকে। কথা রাখতে পারেনি বলে। একই শাড়িতে এসেছে মা আমাকে দেখতে, কড়কড়ে মাড়ের আইরন করেছে শুধু শাড়ীতে এটুকুই ব্যবধান। মা কে নিয়ে স্বপ্নে ডুবে যাই নিমিষেই, চাকরিতে যদি মায়ের যাওয়া হতো, মায়ের হাতে টাকা যদি হতো। শেফালিফুলের মত মুখটা মায়ের আজ কালোবরণ মেঘ ঢেকে দিতোনা সংকুচে। সেইবার প্রাথমিক বিত্তি পেলাম। হাতে পেলাম বিত্তির চারশো টাকা, বিত্তি প্রাপ্তীর সঙ্গে বন্ধুরা কিনলো তাদের শখের ড্রেস, আমি কিনলাম কলাপাতা রঙ এর শাড়ির কাপড় আর খয়েরি রঙ এর ঝিলমিলে সুতা। বন্ধুদের নিয়ে শুই সুতাই করলাম কাজ শাড়িতে। মাকে সাজাবো বলে। ছুটিতে গিয়ে মায়ের হাতে দিলাম তুলে। হেসে বললো মা, " পাগলি মেয়ে। একি তোর পাগলামি, আমাকে কেনো? তোর আব্বার তো এক্টাই শার্ট।""আছে মা আব্বার জন্যও আছে কাল দোকানে নিয়ে যাবো আব্বাকে কিনে দিবো পছন্দ মত শার্ট।"চারশো টাকার বিত্তির আয়ে আমি ভবিষ্যত এর জীবনযাপনের মানচিত্র দেখতে পাই। আব্বার একটা শার্ট এর জন্য বিষাদ আর কষ্টে মায়ের দগ্ধ হওয়ার সমাধি দেখতে পাই। নিজের আয়ের টাকা মায়ের যদি হতো? কিনে দিতো মা এক রাজ্যের মূল্যবান পোশাক আব্বাকে, মেয়ের লজ্জা ঘুচাতে নিজে কিনতেন রানীর বেশি সাজ।মায়ের আয়ের টাকা যদি হতো! স্নেহ ভরা মায়ের হাত প্রসারিত হতো অনেকদূর- আমার বুক কিপিং বই কেনা হতো, বাল্যবন্ধু রা তিরস্কার করতো ক্লাসের প্রথম ছাত্রী হয়েও বই কেনো চেয়ে বেড়াও। ব্যাটমিন্টন কেনা হতো যখন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতাম বন্ধুদের সিলবার রঙের ব্যাট মিন্টন দেখে। খেলতে চাইলে শুনতাম কিনে কেনো নাওনা ক্লাসের প্রথম যদি হয়েছো।অমলাদিদির কাছ থেকে বিকেল বেলা বাটারবান আর ক্রিম রোল কিনে খাওয়া হতো। বন্ধুরা খেতো চেয়ে চেয়ে থাকতাম শুধু। খাইনি কখোনো স্বাদ মিটিয়ে।মাকে বলেছি এই সব কথা কতবার। নিশেষ করেছেন আব্বাকে জেনো না বলি কষ্ট পাবেন দিন রাত খাটুনির পর। অপরাগতার কষ্ট। মা ও ভাবতেন দুটাকা আয়ের পথ যদি হতো গড়তাম সুসজ্জিত স্নিগ্ধ জীবন, সহায়তা দিতো আব্বাকে যে কিনা গোপন রুমালে লুকিয়ে বেড়াচ্ছে অশ্রু জল। আব্বাকে সহায়তা দিতে পারেনি মা তাই বেদনাও দিতে চাইনি৷ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলো মা। আমি জানলাম। আব্বাকে জানালো হলো না। ভেংগে যাবে তার মন। আব্বার আয়ের টাকার আমাদের প্রয়োজন লেখা পড়া চালাবার জন্যে। একাকি অন্ধকারে নিমজ্জিত জীবনের পরেও ভোরের আলোর মত উদ্ভাসিত মন আমি দেখিনি কখনো মা কে দেখা ছাড়া। অসুস্থতা বেশি হলে একদিন আব্বার প্রশ্নে মা জবাব দেন, তুমিতো জানোনা আমার ক্যান্সার হয়েছে, দিন গত হয়েছে অনেক। আর কেউ নয় মেয়ে আর আমি জানি।জমিন ফেটে যায় আব্বার যখন জানতে পারে কয়েক যুগ আর শতাব্দী নয় সল্প আয়ুর দিন শেষে আকাশের উপরে হবে আমার মায়ের ঠিকানা। কয়েকদিন করালেন হোমোউপথিক দাওয়ায় সাধ্যমত আব্বার। তারপর রোগ বাড়তেই থাকলো বাড়তেই থাকলো। আমরা রইলাম ইউনিভার্সিটিতে ভাই বোনেরা, মা একা বাড়ি। ক্ষণস্থায়ী জীবনের ডাক এসে গেছে জেনেও বার্তা পাঠাইনি পড়ার ক্ষতি হবে সন্তানদের। একা হাস্পাতালে ৪ সন্তানের জননী, আমার সেই মহিয়সী মা জোতস্নাপ্লাবিত এক রাতে চলে গেছেন এক কুটি বছরের স্বপ্ন নিয়ে। বলেছিলো নাকি পরশিদের ডেকে, ডেকোনা ওদের, ওদের পরিক্ষা চলতেছে, আমিতো চলেই যাচ্ছি, কেনো পড়ার ক্ষতি করবে। ওরা বড় হবে, আয় করবে জীবন চালাবে নিজের স্বপ্নমত। আমি আজো দেখি আমার মায়ের মুখ অসংখ্য মায়ের মুখে, আজো দেখি পতাকার মত আমার মায়ের সবুজ জমিনে লাল পাড়ের শাড়িটি অসংখ্য মায়েদের পড়নে। যাদের সন্তানেরা সরমে নত থাকে বন্ধুদের কাছে একি শাড়ি মা কেনো পরো বারে বারে। মায়ের মুখটিও থাকে বিষন্নতাতে।আমি তাই গড়েছি আর্ন এন্ড লিভ, প্রতিবন্ধী শিশুদের মায়েদের জন্য, প্রতিবন্ধী বোনদের জন্য, অসহায় মায়েদের জন্যে। মা তুমি অনন্ত জীবনের উপারে বসে দেখছো কি তোমার সেই পাগলি মেয়েটি মায়েদের জন্য করেছে একটি প্লাটফর্ম, ওদের আয়ে তাদের সন্তানেরা থাকবে দুধে ভাতে আর সংসার হবে দুজনের আয়ের টাকায় একে অপরের সহায়ক। মায়েরা ধরবে হাল বাবার সঙ্গে, সন্তান এর চাওয়া করবে পুরন সহাস্যে। বি.দ্র. আমার মায়ের চারটি সন্তান আজ চারটি দেশে থাকে - বাংলাদেশ, লন্ডন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া। আমরা একে অন্যের সন্তানকে মা বলে ডাকি। মধুমাখা এই ডাক। জুড়িয়ে দেয় অন্তর। এসএইচ/

বিজ্ঞান গবেষণা : বাংলাদেশ

গত সপ্তাহটি আমার জন্য খুব আনন্দের একটি সপ্তাহ ছিল। একসপ্তাহ বাংলাদেশের ল্যাবরেটরিতে করা তিনটি সফল গবেষণা খবর দেশের মানুষ জানতে পেরেছে। প্রথমটি অবশ্যই আমি আগে থেকেই জানি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা- পদার্থ বিজ্ঞানের অত্যন্ত বিশেষ একটা প্রক্রিয়া ক্যানসার রোগীদের রক্তে প্রয়োগ করে সেখানে আলাদা এক ধরনের সংকেত পাওয়া। অন্য দুটি হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, দুই জায়গাতেই ইলিশ মাছের জিনোম বের করা হয়েছে। আমাদের ইলিশ মাছের জিনোম যদি আমরা বের না করি, তাহলে কে বের করবে? আমার মনে আছে, ২০১০ সালে আমার প্রিয় একজন মানুষ মাকসুদুল আলম পাটের জিনোম বের করেছিলেন। আমরা আগেই খবর পেয়েছি, পরের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে এর ঘোষণা দেবেন। কিন্তু আমাদের দেশের খবরের কাগজগুলো কি খবরটা ঠিক করে ছাপাবে? আমার মনে আছে এর আগেরদিন আমরা দেশের সব খবরের কাগজের সম্পাদকদের সঙ্গে দেখা করে তাদের বলেছি, ‘আগামীকাল সংসদে বিজ্ঞানের অনেক বড় একটা খবর ঘোষণা করা হবে। আপনারা প্লিজ খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় খবরটা বড় করে ছাপাবেন।’ খবরের কাগজগুলো আমাদের অনুরোধ রেখেছিল, সব খবরের কাগজ বড় বড় করে খবরটা ছাপিয়েছিল। দেশের বাইরে থেকে দেশে গবেষণার জন্যে মাকসুদুল আলম অনেক চেষ্টা করতেন, হঠাৎ করে সবাইকে ছেড়ে একদিন চলে গেলেন। আমাদের দেশের অনেকের ধারণা, এই দেশে বুঝি বিজ্ঞানের বড় গবেষণা হতে পারে না। সে জন্য জুট জিনোমের খবরটা আমরা অনেক বড় করে সবাইকে জানাতে চেয়েছিলাম। গত সপ্তাহে একইভাবে তিনটি বড় গবেষণার খবর এসেছে, যারা নিজের দেশের বিজ্ঞানীদের ওপর বিশ্বাস রাখে না, তারা নিশ্চয়ই এবার নতুন করে ভাববে। আমি যতটুকু জানি, আরও কিছুদিনের ভেতর পেটেন্টের আরও কিছু খবর আসবে। পেটেন্টের জন্যে আবেদন করার আগে যেহেতু কোনও তথ্য জানাতে হয় না তাই আমরা এই মুহূর্তে সেই গবেষণাগুলোর খবর সম্পর্কে এখনও কিছু জানাতে পারছি না। পেটেন্টের বিষয়টা সবাই ঠিকভাবে জানে কিনা, আমার জানা নেই। এটি হচ্ছে আবিষ্কারের স্বত্ব রক্ষা করার পদ্ধতি। পৃথিবীর যেকোনো মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় রেডিও কে আবিষ্কার করেছেন, সেই মানুষটি মার্কোনির নাম বলবে। আমিও ছোটবেলায় তার নাম মুখস্ত করে এসেছি। অথচ বিজ্ঞান জগতের ইতিহাস যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে আমাদের বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু রেডিও প্রযুক্তির খুটিনাটি মার্কোনির সমসাময়িককালে আবিষ্কার করেছিলেন। জগদীশ চন্দ্র বসু কিছুতেই তার আবিষ্কারের পেটেন্ট করতে রাজি হননি, (এই ব্যাপারে তার একটা চমৎকার চিঠি আছে, তিনি কতটা নির্লোভ মানুষ এবং জ্ঞানের ব্যাপারে কতটা উদার সেই চিঠি পড়লে বোঝা যায়।) মার্কোনি তার উল্টো, প্রথম সুযোগে তিনি তার কাজ পেটেন্ট করে ফেলেছিলেন, সে জন্য সারা পৃথিবী রেডিও’র আবিষ্কারক হিসেবে মার্কোনির নাম জানে, জগদীশ চন্দ্র বসুর কথা কেউ জানে না। (তবে সম্প্রতি জগদীশ চন্দ্র বসুকে ইতিহাসে তার যোগ্য স্থান দেয়ার জন্য অনেক কাজ শুরু হয়েছে।) পেটেন্ট করা হয় একটা আবিষ্কারের স্বত্বকে রক্ষা করার জন্যে। কাজেই পেটেন্টটি কোন দেশে করা হচ্ছে, সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট সম্পর্কে আমার অল্প কিছু ধারণা আছে। আমি যখন বেল কমিউনিকেশন্স রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যোগ দেই, একেবারে প্রথম দিনেই সেই ল্যাবরেটরি আমার সমস্ত মেধাস্বত্ব এক ডলার দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিনে নিয়েছিল। হ্যাঁ, লিখতে ভুল হয়নি, পরিমাণটা এক ডলার। আমাকে দেয়ার জন্য তারা নতুন ঝকঝকে একটা এক ডলারের নোট নিয়ে এসেছিল। বেল কমিউনিকেশন্স ল্যাবরেটরিতে থাকার সময় আমরা যে বিষয় নিয়ে কাজ করেছি সেগুলো নিয়ে গোটা তিনেক পেটেন্ট হয়েছে। তবে তার কোনোটারই মেধাস্বত্ব আমার নিজের না, ল্যাবরেটরি প্রথম দিনই এক ডলার দিয়ে কিনে রেখেছে! মজার ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রে পেটেন্ট করতে অনেক টাকা লাগে, পরিমাণটা একশ হাজার ডলারও হতে পারে! যার আবিষ্কার পেটেন্ট হয়েছে সে চাইলে তাকে খুব সুন্দর করে ফ্রেম করে পেটেন্টের একটা কপি তৈরি করে দেয়, তার বেশি কিছু নয়। তবে পেটেন্ট নিয়ে আমার একটা মজার স্মৃতি আছে। আমি যখন বেল কমিউনিকেশন্স ল্যাবরেটরিতে ফাইবার অপটিক সংক্রান্ত একটা বিষয় নিয়ে কাজ করছি, তখন ইতালি থেকে একজন বিজ্ঞানী আমার সঙ্গে কাজ করতে এসেছে। আমি একটি এক্সপেরিমেন্ট করছি, এক্সপেরিমেন্টটি ঠিক করে করার জন্য আমি সেখানে দুটি অপটিক্যাল আইসোলেটর নামে ডিভাইস লাগিয়েছি। ইতালির বিজ্ঞানী আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি ওই দুটি কেন লাগিয়েছ?’ আমি তাকে কারণটা ব্যাখ্যা করে বললাম, আমাদের এক্সপেরিমেন্টে এগুলো সবসময় ব্যবহার করতে হয়। ইতালির বিজ্ঞানীর চোখ চকচক করে উঠলো! সে বলল, ‘এই বিষয়টা পেটেন্ট করে ফেলি!’ আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম সে নতুন এসেছে বলে জানে না, আমরা যারা এ ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করে আসছি তারা জানি বিষয়টা একটা কমনসেন্স ছাড়া কিছু না। আমি বললাম, ‘তুমি এটা পেটেন্ট করতে চাও?’ এটা হচ্ছে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ এর মতো একটা কমনসেন্স। কেউ কখনও একশ হাজার ডলার খরচ করে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ কে পেটেন্ট করে?’ ইতালীয় বিজ্ঞানী পিরেলি নামে অনেক বড় একটা কোম্পানি থেকে এসেছে তাদের টাকার অভাব নেই। সে আমার কথায় বিচলিত হলো না, আমাকে জানালো সে আসলেই এটা পেটেন্ট করে ফেলবে! বলাই বাহুল্য আমি তার ছেলেমানুষী কাজকর্ম দেখে খুবই হতাশ! তাকে বললাম, ‘তোমার যা ইচ্ছে হয় করো! আমি এর মাঝে নেই।’ বিজ্ঞানী মানুষটি শেষ পর্যন্ত কী করেছে আমি সেটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। তার পর কয়েক বছর কেটে গেছে। আমি দেশে চলে এসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের জীবনের সঙ্গে আর বিশেষ সম্পর্ক নেই। তখন হঠাৎ একদিন আমি আমার প্রাক্তন বসের কাছ থেকে একটা টেলিফোন পেলাম। বেচারা প্রায় পাগলের মতো আমাকে ফোন করেছে, চিৎকার করে বলল, ‘তুমি জানো এখানে হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘কী হয়েছে?’ ‘মনে আছে তোমার সঙ্গে ইতালীর একজন বিজ্ঞানী কাজ করছিল?’ আমি বললাম, ‘মনে আছে।’ ‘সে অপটিক্যাল আইসোলেটর ব্যবহার করার বিষয়টা পেটেন্ট করে ফেলেছে। এখন আমরা আর এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি না- সেই কোম্পানি আমাদের কাছে লাইসেন্সিং ফি চায়!’ আমি শুনে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারি না। আমার কাছে ব্যাপারটা অনেকটা এরকম, ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ বিষয়টা কেউ পেটেন্ট করে ফেলেছে, এখন সত্যি কথা বললেই তাকে টাকা দিতে হচ্ছে! যাই হোক, আমার বস আমাকে অনুরোধ করলো আমার সব ল্যাবরিটরি নোটবুক যেন ফটোকপি করে তার কাছে পাঠাই। এগুলো দেখিয়ে তারা দাবি করবে যেহেতু গবেষণার কাজে আমারও অবদান আছে, অন্তত আমাদের কাছে যেন লাইসেন্সের ফি দাবি না করে। আমি সব কাগজপত্র পাঠিয়েছিলাম, শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল আমার জানা নেই। আমাদের দেশের জন্যে পেটেন্ট বিষয়টি নতুন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার যে বিষয়টির জন্যে পেটেন্টের আবেদন করা হয়েছে- আমার জানা মতে এটি এই দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক পেটেন্ট। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বড় কর্মকর্তার নিজের মুখে শুনেও আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে, এর আগে এই দেশ থেকে পেটেন্টের আবেদন করা হয়নি। পেটেন্ট আসলে এক ধরনের সম্পদ। সব পেটেন্টেই যে বড় সম্পদ তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু কোনও আবিষ্কার যদি হঠাৎ করে বড় কোনো কাজে লেগে যায় তখন সেটি অনেক বড় সম্পদ হতে পারে। নতুন পৃথিবীটিতে জ্ঞান হচ্ছে সম্পদ এবং সেই সম্পদের পরিমাপ করা হয় পেটেন্ট দিয়ে। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের যেহেতু গবেষণা করার ক্ষমতা আছে, তারা তাদের আবিষ্কারগুলো পেটেন্ট করে দেশের জন্য সম্পদ সৃষ্টি করবে সেটি তো আমরা আশা করতেই পারি। ঘটনাটি এই দেশে আগে ঘটেনি, এই প্রথমবার শুরু হলো। বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে সেটি একেকজন একেকভাবে অনুভব করেন। আমি সেটা অনুভব করি এই দেশে বিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়টি দিয়ে। গবেষণা কিন্তু খরচ সাপেক্ষ, সব গবেষণা যে সফল হয় তাও নয়। অনেক গবেষণারই ফল হয় শূন্য কিন্তু তারপরেও গবেষণায় লেগে থাকতে হয়। গবেষণার পরিমাপের সবচেয়ে নিখুঁত সূচক হচ্ছে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। আমার মনে আছে বেশ কয়েক বছর আগে আমরা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। সেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়েই পিএইচডি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল ১২ শতাধিক। অথচ আমাদের সারাদেশ মিলিয়েও সংখ্যাটি তার ধারে কাছে নয়। আমার মনে আছে ফিরে এসে আমি পত্রিকায় একটা লেখা লিখেছিলাম যে এক হাজার পিএইচডি চাই। আমার সেই লেখা পড়ে কেউ কেউ পিএইচডি নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা লিখেছিলেন- কিন্তু মজার ব্যাপার হলো কানাডা প্রবাসী একজন প্রাক্তন কূটনীতিক একজনের পিএইচডি গবেষণার জন্যে প্রয়োজনীয় অর্থের একটা চেক আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এদিক দিয়ে আমি খুবই সৌভাগ্যবান সারাটি জীবনই আমি চমৎকার হৃদয়বান মানুষের দেখা পেয়েছি। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও মূলত আন্ডারগ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়- অর্থাৎ আমরা ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে একটা ব্যাচেলর ডিগ্রি দেই। সোজা বাংলায় জ্ঞান বিতরণ করি। শুধু জ্ঞান বিতরণ করা হলে কিন্তু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না। সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হতে হলে তাকে জ্ঞান সৃষ্টি করতে হয়। জ্ঞান সৃষ্টি করার জন্য গবেষণা করতে হয় এবং গবেষণা করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে পিএইচডি প্রোগ্রাম। কারণ পিএইচডি করার সময় শিক্ষার্থীরা টানা কয়েক বছর নিরবিচ্ছিন্নভাবে সময় দেয়। একটা সময় ছিল যখন পিএইচডি শিক্ষার্থীদের কোনো স্কলারশিপ দেয়ার উপায় ছিল না। যদিওবা দেয়া হতো তার পরিমাণ এত কম ছিল যে কোনো শিক্ষার্থীর যদি নিজের আলাদা উপার্জন না থাকতো তার পক্ষে পিএইচডি গবেষণা করার কোনো উপায় ছিল না। গত কয়েক বছর থেকে আমি লক্ষ্য করছি যে পিএইচডি গবেষণার জন্যে স্কলারশিপ বাড়ছে এবং সেটি মোটামুটি একটা সম্মানজনক পরিমাণে পৌঁছে গেছে। আমার কাছে মনে হয় দেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে এটি তার একটা বড় প্রমাণ। আমরা গবেষণার জন্য টাকা খরচ করতে প্রস্তুত হয়েছি। তবে এখনও কিছু কিছু বিষয় নিষ্পত্তি হয়নি। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা এখনও নিজ দেশে পিএইচডি করার বিষয়টি অন্তর থেকে গ্রহণ করেনি। এই দেশের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী পিএইচডি করার জন্যে দেশের বাইরে যাচ্ছে। একবার দেশের বাইরে গেলে তাদের খুব ছোট একটা অংশ দেশে ফিরে আসছে। আমরা যদি আমাদের দেশের ল্যাবরেটরিতে সত্যিকারের গবেষণা করতে পারি তাহলে হয়তো এই নতুন প্রজন্মকে বোঝানো সম্ভব হবে দেশেও সত্যিকারের গবেষণা করা সম্ভব। যারা দেশে ছেড়ে গিয়ে দেশের কথা স্মরণ করে লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে তাদের কাউকে কাউকে হয়তো তখন দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। যেদিন আমরা আবিষ্কার করবো আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বিদেশ গিয়ে তাদের লেখাপড়া গবেষণা শেষ করে আবার দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছে, সেদিন বুঝতে পারবো যে আমাদের দেশটি এবারে সত্যি সত্যি নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে শুরু করেছে। অনেক আশা নিয়ে সেই দিনগুলোর জন্যে অপেক্ষা করে আছি। লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।এসএ/

ভূমিকম্প সহনীয় বিল্ডিং তৈরী করবেন কিভাবে

সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে ভূমিকম্পের পর আমাদের দেশের অনেকেই এখন বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। যদিও এটা আরও আগেই ভাবা উচিত ছিল। কারণ ভূমিকম্প তথা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখন হবে তা সঠিক করে বলা যায় না। আবার এটা আমরা বন্ধও করতে পারি না। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষতির হাত থেকে রেহায় পেতে প্রস্তুতি তো নিতে পারি। সেই প্রস্তুতি এখনই নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নেপালের ভূমিকম্পের ঘটনায় অসংখ্য প্রানহানি আর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন উঠেছে ওই মাত্রা কিংবা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে আমাদের অবস্থা কী হবে? একটা ভবন তৈরির সময় অনেক কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো ভাল ‘স্ট্রাকচারালার ডিজাইন’। ভূমিকম্পের বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে আমাদেরকে সেইদিকটাতেই অনেক বেশি নজর দিতে হবে। সঠিক নিয়ম মেনে ভবন তৈরি করা না হলে ভূমিকম্পের আঘাতে তা ভেঙ্গে পড়তে পারে কিংবা ভাল পাইলিংয়ের অভাবে ভীত মজবুত না হলে ভবন ধ্বসে পড়তে পারে। এজন্য ভীতটাকে মজবুত করতে হবে। এমনভাবে ভবন তৈরি করতে হবে যাতে এটি সহজে হেলে কিংবা ধ্বসে না পড়ে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিমাত্রার ভূমিকম্প হলে হেলে গেলেও ভবনের ছাদ কিংবা দেওয়াল যেন ধ্বসে না পড়ে। এই কাজটি নিশ্চিত করতে পারলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে অনেকাংশে রেহাই পাওয়া যাবে। এখন প্রশ্ন হলো এই কাজটি আমরা কিভাবে করব? আমাদের চারপাশে অনেকেই তো অনেক টাকা খরচ করে বড় বড় ভবন তৈরি করছেন। প্রকৌশলীদের দিয়ে নকশা তৈরির পরই তো এসব ভবন নির্মিত হচ্ছে। তবুও কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রশ্ন হলো ভবনের নকশা কী অভিজ্ঞ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে? যদি এই প্রশ্নের উত্তর না হয় তাহলেই কিন্তু আশঙ্কা রয়ে যায়। দু:খজনক হলেও সত্যি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় দেশে অনেক টাকা খরচ করে ভবন নির্মাণ করা হলেও তা অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের দিয়ে নকশা তৈরি করা হয় না। ভবন তৈরিতে দামি দামি নির্মাণ সামগ্রী কিংবা সাজসজ্জার পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করলেও ‘স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা খুবই কার্পন্য করি। একটা ভবন বাইরে থেকে যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন তা যদি মজবুত না হয় তাহলে দেখা যাবে একসময় তা আমাদেরই মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ছে। ইদানিং অনেকেই প্রকৌশলীদের বাদ দিয়ে আর্কিটেক্ট (স্থপতি) দিয়ে ডিজাইনের কাজ করান। এটা আরেকটা ভূল। ভবনের সৌন্দর্য্য বর্ধনে স্থপতিদের জুড়ি নেই। কিন্তু তাদের দিয়ে যদি স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের কাজ করানো হয় তাহলে সেটা কতটা টেকসই হবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ তাদের মূল কাজ কিন্তু এটা না। ঢাকা শহরে ভবন নির্মাণের আগে রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন নেওয়ার বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক নিয়ম কানুন মেনে নকশা তৈরি করা হয় না। চোখ বুঝে এগুলোর অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। যারা এসব অনুমোদন দিচ্ছেন অনেকক্ষেত্রে তারাও অভিজ্ঞ নন। আরও আশ্চর্য বিষয় হলো ভবনের নকশা তদারকির যে টিম গঠন করা হয় সেখানেও অভিজ্ঞ স্টাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদেরকে রাখা হয়না। অনেকসময় দেখা যায় কমিটির প্রধান একজন স্থপতি। ফলে ভবনের কোন ক্ষয়ক্ষতির পরই টনক নড়ে কর্তা ব্যক্তিদের। কিন্তু ততক্ষণে অনেক অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে যায়। সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসে বহু প্রানহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। যদিও এটি অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছিল। প্রশ্ন হলো এই অনুমোদন কারা কিভাবে দিলো? এত টাকা খরচ করে যিনি ওই ভবন নির্মাণ করেছিলেন তিনি কেন সামান্য কিছু টাকা খরচ বাঁচাতে গিয়ে এতবড় সর্বনাশ কেন ডেকে আনলেন? ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে। বিভিন্ন মহলে হৈ চৈ হয়েছে। আস্তে আস্তে তা থেমে গেছে, ভুলেও গেছেন অনেকে। আবারও সেই একই কায়দায় ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি যিনি নকশা তৈরি করছেন বা অনুমোদন দিচ্ছেন প্রকৌশল বিদ্যা সম্পর্কে তার কোন জ্ঞানই নেই। ফলে তিনি আন্দাজে নকশা তৈরি করেন। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। আবার কখনও ভবন হয় নড়বড়ে। এই ধরনের ভবন নির্মাণ করা হলে ভূমিকম্পের সময় একটা ভবন যত প্রকার উপায়ে নড়াচড়া করা উচিত তার চেয়ে কম বা বেশি করবে। ঝুঁকিটা এখানেই। অনেকটা হাতুড়ে কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক রোগির প্রকৃত অসুখ জেনেই ওষুধ দেন। এতে রোগি যেমন সুস্থ হন আবার তার খরচও তুলনামূলক কম হয়। কিন্তু যিনি অভিজ্ঞ না তিনি রোগের ধরন না বুঝে আন্দাজে একগাঁদা ওষুধ দিয়ে দেন। যেটা লেগে যায়। ফলে রোগ ভাল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আবার কখনও কখনও ভাল হলেও বাড়তি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বেশি ওষুধের কারণে রোগির খরচও বেড়ে যায় অনেক। ভুল চিকিৎসার কারণে একজন মানুষের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু অনভিজ্ঞদের দিয়ে যদি ভবনের নকশা তৈরি করা হয় তাহলে অসংখ্যা মানুষের প্রানহানিসহ বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। অন্যান্য দেশে ভবন নির্মাণের আগে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী নকশা তৈরির পর তা আবার অন্য আরেকজন অভিজ্ঞকে দেখানো হয়। তিনি তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি দেখেন কোন সমস্যা আছে তাহলে যিনি নকশা করেছেন তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। প্রয়োজনে তারা দু’পক্ষ একসঙ্গে বসে সমাধান করেন। কারণ একজন মানুষ যতই অভিজ্ঞ হোন না কেন অনেক সময় তার অনিচ্ছাকৃত ভূলও হতে পারে। বিষয়টা অনেকটা চিকিৎসকদের বোর্ড বসানোর মতো। অভিজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার পরও জটিল অস্ত্রপচারের আগে আরও কয়েকজন চিকিৎসক একসঙ্গে বসে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে উপনিত হন। অস্ত্রপচার কিন্তু একজনই করেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন সবাই মিলে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। আমরা বলি ভূমিকম্পের সময় ঘর থেকে বের হওয়া বেশি বিপদজ্জনক। কথা সত্যি। ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পিলার কিংবা বিমের নিচে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে করে ছাঁদ বা দেওয়াল ভেঙ্গে গায়ে আঘাত না লাগে। কিন্তু পিলার কিংবা বিম যদি মজবুতই না হয় তাহলে তো সেটিই আগে মাথার উপর ভেঙ্গে পড়বে। তো ঘর থেকে বের হওয়া আর না হওয়া তো সমান কথা হলো। আধুনিক বিশ্বে ইটের বদলে কংক্রিট দিয়ে ভবন নির্মিত হচ্ছে। কারণ এটি মজবুত বেশি। খরচ বড়জোর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি হয়। আমরা অনেকেই এই সামান্য খরচ বাঁচাতে গিয়ে সারাজীবন ঝুঁকির মধ্যে বসত করি। ভবনের নকশা তৈরির ক্ষেত্রে বেশ কিছু গাণিতিক বিষয় জড়িত। আমেরিকাসহ অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে আমাদের দেশের ছেলেরা গণিতে বেশ এগিয়ে। অথচ ভাল স্ট্রাকচারাল ডিজাইনে আমরা বেশ পিছিয়ে। এখনও বড় কোন ব্রিজ কিংবা স্থাপনার ক্ষেত্রে আমাদেরকে বাইরের থেকে ভাড়া করা প্রকৌশলী নিয়ে আসতে হয় (যদিও আমাদের দেশে কিছু অভিজ্ঞ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হয়েছেন) এটা খুবই দু:খজনক। অথচ আমরা চাইলেই এক্ষেত্রে অনেক ভাল করতে পারি। সমস্যা হলো আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের অধিকাংশই প্রকৌশল ডিগ্রী নেওয়ার পর আর পড়ালেখা করতে চায় না। অথচ ভাল প্রকৌশলী হতে কর্মজীবনে বেশি বেশি চর্চা ও পড়ালেখার কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা প্রতিষ্টানে অনেক কিছুই হাতে কলমে শেখার কিংবা শেখানোর সুযোগ নেই। এখনকার সময় আরও কঠিন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই তাদের শিক্ষকতা পেশাকে খণ্ডকালীন চাকরি হিসেবে নিয়ে বাইরের কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ক্যাম্পাসে বসেই তারা নিজেদের কাজে সময় দেন বেশি। অন্তত ৯০ শতাংশ সময়ই অনেকে বাইরের প্রতিষ্ঠানে কনসাল্টেন্সী কিংবা ব্যক্তি কাজে ব্যয় করেন। বাকি ১০ ভাগ সময় দিলে শিক্ষার্থীরা আর কতটুকুই বা শিখবে? আমরা যখন শিক্ষকতা করেছি তখন এই রেওয়াজ এত বেশি ছিল না। ইদানিং অনেকেই পুরনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ কি না তা যাচাইয়ে জন্যই কম্পন পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেখেন আসলেই ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ কিনা। এগুলোর একেবারেই ভিত্তিহীন। একটা ভবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা নির্ণয়ের জন্য ভবন তৈরির সময়ের নকশা না থাকলে তা বলা মুশকিল। নকশা দেখেই ভবনটি সম্পর্কে মন্তব্য করা যাবে। আবার কিছু কোম্পানী বিজ্ঞাপন দিচ্ছে- তাদের রড নাকি ভূমিকম্প সহনশীল। কথা হলো- ভূমিকম্পে তো রডের ক্ষতি হয়না। এগুলো তো এমনিতেই ভূমিকম্প সহনশীল। দেখতে হবে এই রড যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা আসলে সঠিক প্রক্রিয়ায় করা হচ্ছে কি না। এভাবে মানুষকে বোকা বানানো মোটেও ঠিক না।   আসলে আমরা যে যেখানেই কাজ করি না কেন কাজের প্রতি আন্তরিক হতে হবে। সততা, দায়বদ্ধতার সঙ্গে সবাই যদি নিজের পেশায় কাজ করেন তাইলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। সামান্য খরচ বাঁচাতে গিয়ে যেন নিজেদের ক্ষতি ডেকে না আনি। প্রকৌশলীদেরকে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। একটা বিষয়কে কিভাবে আরও উন্নত করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের দেশে বেশি বেশি গবেষণা করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এজন্য সময় দিতে হবে। যারা এসব ব্যাপারে আগ্রহী তাদেরকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়ায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে এ ব্যাপারে আরও আন্তরিক হওয়া দরকার। তবেই তো না একটা ভাল কিছু করা সম্ভব।

জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির উপরে আছে ঢাকা

ঢাকা শহরের মানুষ আগ্নেয়গিরির উপর বসবাস করছে। এতে ভয়ের কোন কারণ নেই। এটার সমাধানও রয়েছে। ঢাকা শহরে মাকড়সার জ্বালের মতো গ্যাসের লাইন রয়েছে। আমার জানামতে এই গ্যাসের লাইনের কোন নকশা নেই। আমি বহু চেষ্টা করেও পাইনি। তিতাসের কেউ বলতে পারবেন না কোনখানে গিয়ে কোনটা থামানোর জায়গা আছে কোথায় কী করার আছে। এগুলি নিয়ে নিয়ে আমরা একাধিকবার আলোচনা করেছি। নেপালে ভূমিকম্পের সময় বৈদ্যুতিক তার ছিড়েছে। বৈদ্যুতিক শকে বহু লোক মারাও গেছে। আমরা তার চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছি। নেপালের কাছাকাছি যদি একটা ভূমিকম্প হয় তাহলে ঢাকা শহরের গ্যাস লাইনগুলো বিস্ফোরণ হবে। তার মানে ঢাকার চারদিকে গ্যাস বের হবে। ভবন চাপা পড়ার ২১ দিন বেঁচে থাকার ইতিহাস রয়েছে পৃথিবীতে। কিন্তু আগুন লাগলে তো এক থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি মানুষ বাঁচার তো কোনো সম্ভাবনা নেই। জাপানের নতুন উন্নত শহর কোবেতে প্রায় সাতদিনের উপর আগুন জ্বলেছে কারণ ওখানে প্রচুর ফার্নেস ছিল। আমাদের ঢাকা শহরের আগুন ১০/১৫ দিনে কেউ থামাতে পারবে বলে আমার মনে হয়না। এই দুর্ঘটনার পর আমরা হাসপাতালে যাব। কিন্তু ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় দুটি হাসপাতাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ। এই দুটো সবার আগে ভেঙ্গে পড়বে। অর্থাৎ আপনি আহতদেরকে সেখানে নিতে পারবেন না। ঢাকা শহর এবং বাংলাদেশকে যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন সেই সচিবালয় ভবন ভেঙ্গে পড়বে। এগুলো সবই গবেষণায় পাওয়া গেছে। এরপর আসেন ফায়ার ব্রিগেড যারা আমাদেরকে উদ্ধার করবে তারা যেখানে থাকেন কিংবা গাড়িগুলো যেখানে রাখা হয় সেগুলো প্রায় সবগুলোই ভেঙ্গে পড়ার আশংকা আছে। আমরা বিভিন্নভাবে বারবার বলার পর এখন নতুন ভবনগুলো সঠিক পরিকল্পনা ও মজবুতভাবে তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষভাবে রক্ষা করার ব্যবস্থা হচ্ছে। চার পাঁচ বছর আগে একাধিক সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিশেষ বিশেষ ভবনগুলো জরুরিভিত্তিতে রেকটোফিটিং করা হোক। এটা অনেক ব্যয়বহুল। সেক্ষেত্রে ভেঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণ করা ভাল। কিন্তু যেসব ভবনগুলো ইতিহাস এতিহ্য হিসটোরিক্যাল ভ্যালু বহন করে সেগুলো না ভেঙ্গে রেকটোফিটিং করা যায়। এর জন্য আমরা আন্তর্জাতিকভাবেও তহবিল পেতে পারি। অথচ আমরা এই কাজ গত ছয় বছরেও করতে পারিনি। বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা হলো প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমার চোখে না দেখা পর্যন্ত সেটা নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। ফলে আমরা সেই অবস্থায় রয়ে গেছি। ফায়ার ব্রিগেড হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাগলের তিন নম্বর বাঁচ্চা। অর্থাৎ একেবারে অসহায়। সে শুধু লাফাই মায়ের দুধ কখনো খেতে পারে না। এই অবস্থা বদলাতে হবে। তাকে নিয়ে আসতে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে। কারণ দুর্যোগের সময় দুর্যোগ মন্ত্রণালয় তাদেরকে ব্যবহার করবে অথচ তারা ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেই। এটা একটা অদ্ভুত ব্যপার। এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হলে ফায়ার ব্রিগেডকে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে এসে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলে তাদেরকে পরিচিত করাতে হবে। তাদেরকে তৈরি করতে হবে। আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- দুর্যোগকালীন সময়ে বড় হলো কমান্ড কাউন্সিল। আপনি কমান্ড কিভাবে করবেন? ধরেন যিনি মূল দায়িত্বে রয়েছেন তিনি মারা গেলেন এরপর কে দায়িত্ব পালন করবেন? এমন কয়েকটি ধাপে এটা তৈরি করতে হবে। জনবসতির ভিত্তিতে জোনিং করতে হবে। দুর্যোগের সময় মানুষ কোন জায়গায় যাবেন? কিভাবে সাহায্য পাবেন? সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে জানতে হবে ভবন ভেঙ্গে পড়লে আমি কোন জায়গায় যাব। কার সঙ্গে যোগাযোগ করব? আমি ওই জায়গায় গেলে পানি পাব, খাবার পাব, আশ্রয় পাব। ঢাকা শহরের উন্মুক্ত স্থানগুলোকে এভাবে তৈরি করতে হবে যাতে দুর্যোগ আক্রান্ত মানুষেরা এসব সুবিধা সেখানে পান। সেখানে স্থায়ী ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই জিনিসগুলো পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় রয়েছে। সুইজারল্যান্ডে মাটির নিচে এমন ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলার অসংখ্য গৌরবজ্জল ইতিহাস রয়েছে। নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। সুতরাং এখন থেকেই আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। দুর্যোগ যেকোন সময় যেকোন দেশেই হতে পারে। কিন্তু আমাদের সেটাকে মোকাবিলা করার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। একটা ভবন তৈরির পর সেটা সঠিক নিয়ম মেনে করা হয়েছে কী না তার জন্য একটা সনদ দিতে হবে। সেই সনদ দিয়ে ওই ভবনে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এই জায়গাতে আমাদেরকে কঠোর থেকে কঠোরতম হতে হবে। কিন্তু আমরা পারছি না কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তির কারণে। এই ক্ষমতাধর ব্যক্তিগুলোই আমাদের মৃত্যুর কারণ হবে। ৫৬ টা বাপ নিয়ে একটা সন্তান বেঁচে থাকতে পারে না। যারজন্য আমার তটস্থ অবস্থায় থাকি। এই ৫৬ টা বাপ প্রত্যেকেই আইনের দিক থেকে শক্তিশালী। সিটি মেয়র কিংবা সরকার কাউকে এটার জন্য প্রধান দায়িত্ব দিতে পারে। যদি একটা কমিটি রয়েছে যেখানে মেয়র সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু তা অতোটা শক্তিশালী নয়। আইনের শাসন যদি প্রতিষ্ঠা না করা যায় তাহলে কোন পরিকল্পনাই কাজে আসবে না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শহরে এখন বেশ কিছু বড় ভবন তৈরি হচ্ছে। সেখানে ভূমিকম্প হলে ঢাকার চেয়েও বেশি ঝুঁকি। কিন্তু ওখানে প্রাণহানি তুলনামূলক কম হবে। কারণ সেখানে উন্মুক্ত স্থান রয়েছে অনেক। আমাদের ২০ শতাংশ মানুষ মারা যাবে ভবনের ভেতর চাপা পড়ে। আর ৮০ শতাংশ মানুষ মারা যাবে রাস্তায় ভবন চাপা পড়ে। আমি শক্তিশালী ভবন তৈরি করলাম কিন্তু আশপাশের ভবনগুলো নড়বড়ে তাহলে অবস্থা কী হবে? আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো ঢাকা শহরের অধিকাংশ ভবনগুলোতে সাধারন কাঁচ ব্যবহার করা হয় যেগুলো একটা ঢিল ছুঁড়লেই ভেঙ্গে যায়। ভূমিকম্পের সময় এই কাঁচগুলো আগে ভেঙ্গে পড়বে। এগুলো শক্তিশালী বুলেট হয়ে মানুষের গায়ে আঘাত করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর নজীর রয়েছে। এ ভবনগুলোতে সবসময় টেম্পারড গ্লাস ব্যবহার করতে হবে। কারণ এটি ভাঙলে গুড়ো গুড়ো হয়ে যায়। মানুষের তেমন ক্ষতি হবে না। এগুলো ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করা দরকার। যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। নেপালে যে মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে তা যদি ঢাকার ২শ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসত কিংবা নেপালের চেয়ে কিছুটা কম মাত্রার ভূমিকম্প ঢাকায় হতো তাহলে আমাদের অবস্থা যে কী হতো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। শুধু ঢাকা শহরেই ৭০ থেকে ৮০ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। যেগুলো আইডেন্টিফাইড। এমন আনআইডেন্টিফাইড অজস্র ভবন রয়েছে যেগুলো বাইরে থেকে খুব সন্দর ও আধুনিক মর্ডানের মনে হবে কিন্তু নির্মাণ কাজের গুনগত মান ঠিক নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে এগুলো তাহলে দাঁড়িয়ে আছে কীভাবে? যখন আমরা একটা ভবনের নকশা তৈরি করি তখন সম্ভাব্য ভূমিকম্পের বিষয়টি মাথায় রেখেই করা হয়। সেই কাজটি করতে খরচ কিছুটা বেশি হয়। এবং আপনি যদি ঝুঁকি নেন এই ভূমিকম্প কবে হবে না হবে তার ঠিক নেই। তার চেয়ে আমি এখান থেকে কিছু টাকা সাশ্রয় করি। তাহলে ভবনটি থেকে যাবে যতদিন তা বড় মাত্রার ভূমিকম্প না হয়। ভুমিকম্পের পর নেপালে যে ঘটনা ঘটেছে ঢাকায় হবে অন্যটা। ঢাকার মানুষজন আগ্নেয়গিরি উপর বসবাস করছে। মাকড়সার জ্বালের মতো বৈদ্যুতিক লাইন, তিতাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাইপ ছড়িয়ে আছে। তার বড় প্রমাণ হলো কিছুদিন আগে বৈশাখি টেলিভিশন এলাকায় একটা আগুন লেগেছিল তিতাস গ্যাসের লাইনে। ওই আগুন দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে নেভানো যায়নি। পরবর্তীতে আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি ওই গ্যাসের লাইন যে ঠিকাদার করেছিলেন তাকে ডেকে এনে নাকি আগুন নেভাতে হয়েছে। ঢাকা শহরে যেসব গ্যাসের লাইনগুলো রয়েছে তার সেফটি ভালব নেই। অর্থাৎ ভূমিকম্পে যে লাইনগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যেমন বৈদ্যুতিক লাইনে কোন সমস্যা হলো ব্রেকার অটোমেটিকালি সাটডাউন হয়ে আগুন লাগা বা অন্য দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করে গ্যাস লাইনের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেই। সে কারণেই এগুলো বিপদজনক। ভূমিকম্পে এগুলো বিস্ফোরণ হবে।  নেপালে দেখেছি ভূমিকম্পে প্রচুর বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে গেছে। স্পার্ক তৈরি হয়েছে। তার মানে নিচে গ্যাস উপরে ইলেকট্রিক স্পার্ক। সুতরাং ঢাকা শহর একটা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হবে। ঢাকা মেডিকেল ও অন্যান্য ভবন সবার আগে ভেঙ্গে পড়বে। ফায়ার ব্রিগেডের কর্মীদের যে পরিবার রয়েছে তাদেরকে যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করা হয় এবং তাদের পরিবার যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে তারা কীভাবে উদ্ধারকাজ চালাবে? এই যে ৭০ হাজার ভবন যদি ভেঙে পড়ে তাহলে উদ্ধার কাজ কীভাবে হবে? ৭০ হাজারের যায়গায় যদি ৭০ টা ভবনও ভেঙ্গে পড়ে তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে? এটার জন্য বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বেশ আগে। কিন্তু এর একটারও বাস্তবায়ন হয়নি। এগুলো শুধু আলোচনায় চলছে। জামিলুর রেজা কে নিয়ে সাবেক মন্ত্রী রাজ্জাক সাহেব একটা কমিটি করলেন। সেখানে সব সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো। কী কী যন্ত্রপাতি কিনতে হবে, গ্যাস লাইনগুলোতে অটো সেন্সর বসানো হবে (অর্থ্যাৎ একটা নির্দিষ্ট মাত্রার উপর যদি কম্পন হয় তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন এলাকার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। লসেঞ্জে বিভিন্ন জায়গায় এ ব্যবস্থাগুলো করা আছে। এগুলো খুব সহজেই বাংলাদেশে করা যায়। এগুলো খুব ব্যয়বহুলও নয়। আরেকটি জিনিস আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্যাসের সুবিধা পায় না। মুস্টিমেয় কিছু মানুষ এ সুবিধা ভোগ করেন। তাই লাইনের মাধ্যমে শুধু শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ ছাড়া বাসা-বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিতে হবে। প্রয়োজনে তারা সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহার করবেন। এই জিনিষগুলো না করতে পারি তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। এখন আমরা কী করতে পারি? গ্যাস লাইনগুলোতে সেন্সর লাগানো, একটি বাড়িতে একাধিক লাইন না দিয়ে একটিমাত্র মেইন লাইন দিতে হবে যাতে ওই লাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই পুরো বাড়ির গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ একটা ফ্লাটে যদি ২০ টা পরিবারের জন্য ২০ টা আলাদা লাইন থাকে তাহলে কোন একটা বাসায় আগুন লাগলে অন্যরাও ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এক্ষেত্রে গ্যাসের সুইচ দৃশ্যমান রাখতে হবে। যাতে খুব সহজেই তা বন্ধ করা যায়। এই জিনিসগুলো আমরা কিছুতেই তিতাসকে দিয়ে করাতে পারিনি। কারণ এখানে লেনদেনের বিষয় রয়েছে। একটি ভবনে যদি আলাদা আলাদা সংযোগ দেওয়া যায় তাহলে সেখানে ঘুষের পরিমানও বেশি হবে। যেমন বসুন্ধরা সিটিতে কিন্তু টেম্পারড গ্লাস লাগানো হয়েছিল। যেকারণে বসুন্ধরাতে যখন আগুন লেগেছিল তখন কাঁচ গুড়ো গুড়ো হয়ে ভেঙ্গে পড়েছিল। একটা গাড়িতে যে কাঁচ লাগানো হয় সে কাঁচগুলো লাগানোর কথা বহুতল ভবনে। গ্লাসগুলো বদলাতে হবে। এই মুহূর্তে এই গ্লাসগুলোর গায়ে স্ট্রিকার লাগানো যাতে সহজে এটি ভেঙ্গে না পড়ে। এই যে ৭৮ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ তার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে রাজউক জড়িত। রাজউক হলো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভূমিদস্যু। তারা ভূমি ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। যখনই এই ভবনের কথা বলবেন তখনই রাজউকের চেয়ারম্যান বা শীর্ষস্থানীয়রা প্রথমেই বলবেন আমাদের লোকবল নেই। প্রশ্ন হলো জমির ব্যবসা যখন করেন তখন কী সরকারকে বলেছেন আমাদের লোকবল নেই, জমির ব্যবসা করতে পারব না। সরকারের আরেকটি প্রতিষ্ঠান হাউজিং সেটেলমেন্ট আছে জমির ব্যবসা করার জন্য। রাজউক কী করছেন ফ্লাইওভার বানাচ্ছেন যেজন্য রোডস অন হাইওয়ে আছে, সিটি কর্পোরেশন আছে। লোকবলই যদি না থাকে তাহলে এত বড় বড় ফ্লাইওভার বানানোর দায়িত্ব আপনাকে কে নিতে বলেছে। এসব করার জন্য তো সরকারের আলাদা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওনারা এখানে কোন উত্তর দেবেন না। শুধু ব্যবস্থাপনা কিংবা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করার কথা বলা হবে তখনই ওনারা নানা অজুহাত দেখান। এখানে তো কোন পয়সা নেই। উনারা জমির ব্যবসা করে প্রচুর চাঁদা পান। এই কাজের সঙ্গে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এই কাজের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে যতরকম লোকের নামের প্লট বরাদ্ধ দেওয়া হয় তারমধ্যে একটা লোকও দেখাতে পারবেন না যিনি ব্লাক মার্কেটে এই কাগজটি বিক্রি করেন নাই। যারাই ডেভেলপারকে দিয়েছেন তারাই ব্লাকের দামে দিয়েছেন। আর এই মানুষগুলোই আমরা বলে থাকি ১শ টাকার ট্রেনের টিকেট দেড়শো টাকায় বিক্রি হয় যেদেশে সেদেশে বাস করব কীভাবে? বাংলাদেশে বসবাস করা যাবে না কালোবাজারীদের অত্যাচারে। এরাই সবচেয়ে বড় কালোবাজারী। আমরা যারা প্লট নিয়ে দুটি ইন্সটলমেন্ট দিয়ে ডেভলপারের কাছে বিক্রি করি। তারাই বড় কালোবাজারী। এমন কোন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই, এমন কোন জ্ঞানী-গুণী শিক্ষিত ব্যক্তি নেই যারা অনেক নীতি কথা বলেন কিন্তু এই প্লট বিক্রির কালোবাজারীর সঙ্গে অতোপ্রতভাবে জড়িত নয়। এই মানুষগুলো এই লোকগুলিই রাজউককে ধ্বংস করেছে। আপনি যখন এক্সপার্টদের দিয়ে খোঁজ নেবেন তখন দেখা যাবে হয়তো এই ৭৮ হাজারের যায়গায় ৭৮ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বের হবে। করনীয়: সরকারকে এখনই চিন্তা করতে হবে যেগুলো আমরা এর আগে করতে বলেছি যেমন হাসপাতালগুলোকে, ফায়ার ব্রিগেড, প্রশাসনিক সহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো আগে রেক্টোফিটিং করে দ্রুত এগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশে সেই প্রযুক্তি আছে এগুলো করারও অভিজ্ঞ লোক রয়েছে। সরকারকে অনুরোধ করব ফ্লাইওভার আপাতত না করলেও চলবে। এগুলো বন্ধ করে হলেও জরুরী এই কাজগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করবে। না হলে ঢাকার শহরকে বাঁচানো যাবে না। যখন দুর্ঘটনা ঘটবে তখন কিন্তু এই ফ্লাইওভার আপনাকে উদ্ধার করবে না। ফ্লাইওভার আগে বানানোর কথাও বলা হয়নি। রাস্তা বানাও, ফুটপাত বানাও, ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিক করো এবং সবার পরে ফ্লাইওভার। কিন্তু সরকার কী করলো-জামা পরালো, টাই পরালো প্যান্ট তোমাকে পরে দেব এই অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। এখান থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।  

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি