ঢাকা, শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ৫:২৭:২০

রোহিঙ্গা সংকটের দ্বিতীয় ফ্রন্ট আরো বিপজ্জনক

রোহিঙ্গা সংকটের দ্বিতীয় ফ্রন্ট আরো বিপজ্জনক

অবর্ণনীয় ও সীমাহীন হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, জ্বালাও-পোড়াওয়ের শিকার হয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কঠিন চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি মাথার ওপর পড়ছে জেনেও তাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। লাখ লাখ নারী-শিশুসহ এ রকম অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া বাংলাদেশের কাছে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মানুষ আশ্রয় প্রদানসহ সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এ রকম অনাবিল হৃদয়স্পর্শী মানবিক ঔদার্যের পরিচয় বিশ্বে বিরল। বাঙালি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা এককথায় অভূতপূর্ব ও অসাধারণ। কিন্তু সংগত কারণেই প্রায় ১০ লাখ উদ্বাস্তু মানুষের বোঝা দীর্ঘদিন বহন করা বাংলাদেশের জন্য হবে অসহনীয় চ্যালেঞ্জ। তাই এদের যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক ফ্রন্টে বিরামহীন অক্লান্ত এক যুদ্ধসম পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। প্রথম ফ্রন্টের এই রাজনৈতিক কূটনৈতিক যুদ্ধে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্জন ও অগ্রগতি কম নয়, তবে বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন, জটিল, নির্মম ও হৃদয়হীন। বৃহৎ শক্তির ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার কারণেই মূলত এই ফ্রন্টে চূড়ান্ত বিজয় অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব হবে বলে কেউ মনে করছে না। এ রকম পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি ফ্রন্ট সৃষ্টি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রথম ফ্রন্ট থেকেও আরো বড় বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে, যার আলামত দিন যত যাচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে গঠিত গণতদন্ত কমিশন গত ২১ ও ২২ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে আমিও এই দলের সঙ্গে ছিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের জবানবন্দি নির্দিষ্ট ফরমে রেকর্ড করেছেন নিজ হাতে তিনজন আপিল বিভাগের বিচারপতিসহ অন্য সদস্যরা। আমি সমস্ত শিবির এলাকা ঘুরেছি। ছোট-বড়, বয়স্ক, পুরুষ-নারীসহ নির্যাতিত মানুষের কথা শুনেছি। বুঝতে চেষ্টা করেছি কেন তারা বাপ-দাদার ভিটামাটি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। উখিয়ার স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে কী করে সম্ভব হচ্ছে, উখিয়ার কলেজ মাঠে অবস্থিত সেনাক্যাম্পে গিয়ে সে কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। কক্সবাজারের স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ বাহিনীসহ সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাদের মতবিনিময় হয়েছে। তাই দুই দিন রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থানের অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েকটি উদ্ঘাটিত তথ্য তুলে ধরি। এক. এবারের ঘটনার শুরুর দিকে বিরাজমান মানসিক বিপর্যয়কর ও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে অবিরাম সমন্বয়ের ফলে উদ্বাস্তুদের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা ও স্বস্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুই. আগত রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিশু, যুবক, নারী-পুরুষের শ্রেণিবিন্যাসে দেখা যায় ১৫ থেকে ৩৫ বছরের যুবক ও পুরুষের সংখ্যা স্বাভাবিক থেকে অনেক কম। কেন কম, এ কথা জিজ্ঞাস করে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে যে উত্তর পেয়েছি তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। মনে হয়েছে তারা কারো শেখানো কথা বলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার রোহিঙ্গাদের মধ্যে বোধ হয় বিশ্বের সর্বোচ্চ হবে। তিন. নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা পেলে তারা সবাই ফিরে যেতে ইচ্ছুক। চার. আরাকানের বাইরে মিয়ানমারের অন্যান্য জায়গায় অনেক মুসলমান আছে, যারা সবাই সমান অধিকার ভোগ করছে, তাদের কোনো অসুবিধা নেই। আমি জানতে চেয়েছিলাম রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এত খ্যাপা কেন? তাদের উত্তর ছিল, বার্মিজরা মনে করে এত বিশালসংখ্যক রোহিঙ্গা সম্প্রদায় এক জায়গায় থাকলে একদিন তারা আরাকানকে মিয়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। এটাই বার্মিজদের রাগের বড় কারণ। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গুরুতর। ১৯৮৪ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বার্মিজ মূলস্রোতের সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক কখনো অবিরাম মসৃণ ছিল না, এটা ঐতিহাসিক সত্য। এ রকম জটিল পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রচেষ্টার বিপরীতে কিভাবে আরেকটি বড় সংকটের ফ্রন্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হতে চলেছে, সে সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখসহ ছোট করে একটু বর্ণনা দিই। এক. গত সপ্তাহে কক্সবাজারের বালুখালীতে রোহিঙ্গাদের একটা সংঘবদ্ধ দল একজন বাঙালিকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে। ঘটনার পরম্পরা যা-ই হোক না কেন, এগুলো অশনিসংকেত দেয়। দুই. কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানালেন, কিছুদিন আগে স্থানীয় এক ব্যক্তি তার নিজের পাঁচটি গরু মাঠে এনেছিল। এ সময় এক রোহিঙ্গা যুবক এসে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করে ওই পাঁচটি গরুই তার এবং ওই স্থানীয় বাসিন্দা গরুগুলো জোর করে নিয়ে গেছে। পরে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে রোহিঙ্গা যুবক কর্তৃক ওই অভিযোগটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। স্থানীয়দের ভয়, ভবিষ্যতে গরু-ছাগল বাড়ির বাইরে আনা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। তিন. এটি চট্টগ্রাম শহরের ঘটনা। এবারের সংকটটি শুরু হওয়ার প্রথম দিকে পাঁচ-ছয়জন রোহিঙ্গা যুবক কলিংবেল চেপে হঠাৎ এক বাড়িতে ঢুকে বাড়িতে অবস্থানকারী একমাত্র মহিলার কাছে দুপুরের খাবার দাবি করে। ওই সময়ে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা ও খাবারের সমস্যার কথা সবাই জানতেন। তাই মহিলা ভাত-তরকারি রান্না করে তাদের খেতে দেন। খাওয়া শেষ হতেই ওই যুবকরা পকেট থেকে ছুরি বের করে ওই মহিলাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে এবং হুমকি দেয় এখন থেকে এ বাড়ি তাদের। বুদ্ধিমান মহিলা দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে চিৎকার শুরু করলে পাড়া-প্রতিবেশী ও পুলিশ এসে ওই রোহিঙ্গা যুবকদের ধরে নিয়ে যায়। স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে এই অল্প কয়েক দিনেই মনে হচ্ছে, তাদের উৎপাত, উচ্ছৃঙ্খলতা ও বেপরোয়া আচরণে স্থানীয়দের জীবন দুর্বিষসহ হয়ে উঠছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের অভিভাবকরা চিন্তিত, তাঁদের মেয়েরা আগের মতো অবাধে ও নিশ্চিন্তে যখন-তখন উখিয়া-টেকনাফের রাস্তা ও হাটবাজারে যাতায়াত করতে পারবে কি না। উখিয়া ও টেকনাফ, দুই উপজেলায় স্থানীয় লোকসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ, আর রোহিঙ্গা হয়ে গেছে প্রায় ১১ লাখ। তাই রোহিঙ্গারা সংঘবদ্ধ সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মানুষের জন্য মহাসংকটের সৃষ্টি করবে। ১৯৭৮ ও ১৯৯১-৯২ সালে আসা অনেক রোহিঙ্গা এরই মধ্যে স্থানীয়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। আগে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেমা্বরও হয়েছেন। স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী, অর্থলোভী প্রভাবশালী মানুষ এবং আগে আসা রোহিঙ্গারা মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করে মাদক, মানবপাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের মতো ভয়ংকর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক আগে থেকে বহুমুখী অপতত্পরতায় লিপ্ত আছে। বর্তমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর চারদিক খোলা থাকায় অবাধে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী। জামায়াত, হরকাতুল জিহাদ, হিযবুত তাহ্রীরের কথা বেশি শোনা যায়। এরা নানা ধর্মীয় ছদ্মবেশে লিফলেটসহ বহুমুখী কৌশলে জিহাদিতন্ত্র ছড়াচ্ছে। এ রকম দু-একটি দল চিহ্নিত হওয়ায় তাদের ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকে রোহিঙ্গা ছদ্মবেশে ক্যাম্পের ভেতরে অবস্থান করছে এমন কথাও শুনেছি। স্থানীয় কিছু সিনিয়র সাংবাদিক এটিকে সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করছেন। জানা যায়, এরা এমন কিছু জায়গা থেকে গোপন সহায়তা পাচ্ছে, যার জন্য এদের বিরুদ্ধে কিছু করার ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। এটি নিয়ন্ত্রণ ও বন্ধ করতে না পারলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন কেউ কেউ। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূ-রাজনীতি ও করপোরেট স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও খেলার কাহিনি বড় নির্মম ও নিষ্ঠুর। সেখানে মানবতা শুধুই মুখের বুলি। ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তানের লাখ লাখ মানুষ বছরের পর বছর এবং যুগের পর যুগ ধরে শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। কিন্তু বৃহৎ শক্তির মন টলছে না, যদিও মাঝেমধ্যে কুমিরের কান্না কাঁদতে দেখা যায়। রোহিঙ্গা সংকটের কারণ খুঁজতে মাটির ওপর থেকে শিকড় ধরে গভীরে যেতে থাকলে দেখা যাবে, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ঘিরে দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তা না হলে এত বড় গণহত্যা চালাতে তারা সাহস পেত না। তাই এই রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতদের বাংলাদেশের ভূমিতে দীর্ঘদিন রাখতে হবে—এটা ধরেই সব পরিকল্পনা করা উচিত। বিদেশি শক্তির প্ররোচনা, স্থানীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অপতত্পরতা; বাস্তুচ্যুত হলেও জনসংখ্যার হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব কিছু মিলে যে চিত্রটি ক্রমান্বয়ে সামনে আসছে তা আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। সুতরাং বহুমুখী আশঙ্কা সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই যত দ্রুত সম্ভব সব রোহিঙ্গাকে নির্দিষ্ট শিবিরে স্থানান্তর এবং সেখানে অত্যন্ত কঠোর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন, যাতে দুরভিসন্ধিমূলক তত্পরতায় লিপ্ত গোষ্ঠী যেন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বিপজ্জনক ফ্রন্ট সৃষ্টি করতে না পারে। লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক sikder52@gmail.com আরকে//
এই দেশের কোচিং ব্যবসা

আমি জানি আমার এই লেখাটির জন্য আমাকে অনেক গালমন্দ শুনতে হবে, তারপরেও লিখছি। লিখে খুব কাজ হয় সে রকম উদাহরণ আমার হাতে খুব বেশী নেই কিন্তু অন্তত নিজের ভেতরের ক্ষোভটুকু বের করা যায় সেটাই আমার জন্যে অনেক। আগেই বলে রাখছি আমি কোচিং ব্যবসার ঘোরতর বিরুদ্ধে, কাজেই কেউ এখানে কোচিংয়ের পক্ষে বিপক্ষে নিরপেক্ষ নৈব্যক্তিক আলোচনা খুঁজে পাবে না। এই দেশে কোচিংয়ের রমরমা ব্যবসার কারণে ছেলে মেয়েদের শৈশবটি কেমন বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে সেটি নিয়ে আমার ক্ষোভ এবং দুঃখটুকু হয়তো টের পাওয়া যাবে। পাঠকেরা নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করে দেবেন, যে কোনও কারণেই হোক আমার অবস্থানটুকু অন্য অনেকের থেকে ভিন্ন। আমি যেহেতু প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ছোট ছেলে মেয়েদের জন্য লিখছি তাই এই দেশের ছোট ছেলে মেয়েদের আমার জন্যে এক ধরনের মায়া আছে। আমার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি তারপরও তারা আমাকে একজন আপনজন মনে করে অকপটে তাদের মনের কথা খুলে বলে। আমি মাঝে মাঝে তাদের কাছ থেকে এমন অনেক চিঠি কিংবা ই-মেইল পাই যেগুলো পড়লে যে কোনও বড় মানুষের চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়তে শুরু করবে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি আমাদের দেশের শিশু কিশোরদের শৈশবটি আনন্দহীন, এবং এর প্রধান কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। দেশের একেবারে সাধারণ মানুষটিও শিক্ষার গুরুত্বটি বুঝতে পেরেছে কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তারা বেশোরভাগ সময়েই সেটি ভুলভাবে বুঝেছে। তাদের প্রায় সবারই ধারণা ভালো লেখাপড়া মানে হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো গ্রেড, কাজেই লেখাপড়ার উদ্দেশ্য এখন শেখা নয়, লেখাপড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে পরীক্ষা দেওয়া। সেই পরীক্ষটি কতো ভালোভাবে দেওয়া যায় সেটিই হচ্ছে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। ভালোভাবে শেখা এবং ভালোভাবে পরীক্ষা দেওয়ার মাঝে পার্থক্যটুকু যারা ধরতে পারেননি তাদেরকে একটা উদাহরণ দিতে পারি। ধরা যাক, একটি ছেলে বা মেয়েকে আমার এই লেখাটিই পড়তে দেয়া হলো। ছেলে বা মেয়েটি যদি লেখাটি মন দিয়ে পড়ে তাহলে তাকে শুধু যে এখানে যেসব কথা বলা আছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন করলেই উত্তর দিতে পারবে তা নয়। এর বাইরে থেকে প্রশ্ন করলেও উত্তর দিতে পারবে (যেমন লেখকেরা কোন বক্তব্যটি সঙ্গে তুমি একমত নও? কিংবা লেখকের এই বক্তব্যটি কি সাধারণ মানুষের ভেতর একটি ভুল ধারণার জন্ম দেবে? ইত্যাদি)। এখন যদি এই লেখাটি নিয়ে ছেলে বা মেয়েটিকে পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুত করতে হয় তাহলে কোনো একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এই লেখাটি নিয়ে বসে তার থেকে কী প্রশ্ন বের করা সম্ভব এবং তার সম্ভাব্য উত্তরগুলো লিখে ফেলবেন। যেমন, ছেলে মেয়েরা কেন লেখকের কাছে মনের কথা অকপটে খুলে বলে? উত্তর- (ক) হোমওয়ার্কের অংশ হিসেবে (খ) পিতা মাতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য (গ) লেখককে আপনজন মনে করে (ঘ) মনের কথা খুলে বললে মন ভালো থাকে। সঠিক উত্তর (গ)। এরকম অনেকগুলো প্রশ্ন এবং তার উত্তর লেখা হবে এবং ছেলেমেয়েরা পুরোটুকু মুখস্ত করে ফেলবে। পরীক্ষায় এই প্রশ্নগুলো এলে তার চোখ বন্ধ করে উগলে দেবে। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, লেখাটির মূল বিষয়টি অনুভব না করেই তারা কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। যারা আমার কথা বিশ্বাস করতে রাজী না তারা ইচ্ছে করলে দেশের যে কোনও একটি সম্ভ্রান্ত দৈনিক পত্রিকা খুললেই দেখতে পারবেন সেখানে এরকম প্রশ্ন এবং উত্তর ছাপা হয়। গাইড বইয়ের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য নেই। গাইড বই বেআইনি এবং গাইড বই প্রকাশ করলে সম্ভবত পুলিশ র‌্যাব কোমরে দড়ি বেঁধে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে। কিন্তু সবার চোখের সামনে নিয়মিতভাবে গাইড বই প্রকাশ করার জন্য কোনও পত্রিকার সম্পাদককে কখনও কারো সামনে জবাবদিহি করতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই! সব দৈনিক পত্রিকারই আলাদাভাবে শিক্ষা সংক্রান্ত সাংবাদিক আছে (তাদের আলাদা সংগঠনও আছে)। এই সাংবাদিকেরা আমাকে দুই চোখে দেখতে পারে না কারণ তাদের সঙ্গে দেখা হলেই আমি তাদের জিজ্ঞেস করি তাদের সংবাদপত্রটি যে নিয়মিতভাবে বেআইনি গাইড বই ছাপিয়ে যাচ্ছে কখনো তার বিরুদ্ধে তারা কোনও প্রতিবেদন প্রকাশ করে না কেন? যাই হোক, আজকে আমি কোচিং সম্পর্কে লিখতে বসেছি, কাজেই সেই বিষয়টিতেই ফিরে যাই। কীভাবে কীভাবে জানি কোচিং ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশটিকে পুরোপুরি দখল করে ফেলেছে। যারা হতদরিদ্র- ছেলে মেয়েদের কোচিং পড়ানোর মতো টাকা পয়সা নেই (এবং এক দুইজন আদর্শবাদী শিক্ষার্থী কিংবা বাতিকগ্রস্থ বাবা মায়ের সন্তান ছাড়া) বাংলাদেশের সব ছেলে মেয়ে কোনও না কোনওভাবে কোচিং করেছে। এতো সফলভাবে সারা পৃথিবীতে অন্য কোনও পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হয়েছে কিনা আমার জানার নেই। আমার ধারণা আমাদের শিল্প-সাহিত্যেও কোচিং বিষয়টি ঢুকে গেছে, গল্প উপন্যাসের চরিত্ররা, দাঁত ব্রাশ করে, স্কুলে যায়, কোচিং করে। আমি নিশ্চিত ‘ক্লাশ ফ্রেন্ড’ বলে যেরকম একটি শব্দ আছে ঠিক সেরকম ‘কোচিং ফ্রেন্ড’ জাতীয় একটি শব্দ আছে এবং স্কুলের কালচারের মতই কোচিংয়ের নিজস্ব একটা কালচার আছে। কোচিং ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত সফলভাবে এই দেশের সকল অভিভাবকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে স্কুল কলেজের লেখাপড়া পরিপূর্ণ নয়, এর সঙ্গে যেভাবে হোক যতখানি সম্ভব কোচিংয়ের স্পর্শ থাকতে হবে। এখন অভিভাবকরা এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে, তারা মনে করে যেহেতু সবার ছেলে মেয়ে কোচিং করছে তাই যদি নিজের ছেলে মেয়েদের কোচিং করতে না দেওয়া হয় তাহলে কোনো এক ধরনের অপরাধ করা হয়ে যাবে। সেই অপরাধের কারণে তাদের ছেলেমেয়েদের কোনও একটা ক্ষতি হয়ে গেলে তারা কখনোই নিজেদের ক্ষমা করতে পারবে না। সেজন্যে ভালো হচ্ছে, না মন্দ হচ্ছে- সেটা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। নিজের ছেলে মেয়েদের চোখ বন্ধ করে কোচিং করতে পাঠায়। এই কোচিং করার কারণে তাদের ছেলে মেয়েদের জীবনে যে এতোটুকু বিনোদনের সময় নেই সেটি নিয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। নিজের সন্তানদের এভাবে নির্যাতন করার আর কোনও উদাহরণ আছে কী না আমার জানা নেই। কোচিং বিষয়টি আমাদের সমাজে কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থায় কতো গভীরভাবে ঢুকেছি আমি সেটা টের পেয়েছিলাম কয়েক বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা আইনের খসড়া দেখে। যেখানে কোচিং ব্যবসাকে শুধু জায়েজ করা হয়নি, এটাকে ‘ছায়া শিক্ষা’ নাম দিয়ে একটা সম্মানজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমাদের সম্মিলিত তীব্র প্রতিবাদের কারণে শেষ পর্যন্ত সেটা বন্ধ করা হয়েছিল। একবার যখন দেশের সব ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের বাবা মাদের বোঝানো সম্ভব হয়েছে যে এই দেশে লেখাপড়া করতে হলে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে কিংবা মেডকিলে ভর্তি হলে কোচিং করতেই হবে তারপর কোচিং ব্যবসায়ীদের জীবনটুকু খুবই সহজ হয়ে গেছে। সবাই তাদের কাছে আসছে এবং তারা সবাইকে ‘কোচিং’ করে যাচ্ছে। যদিও এই ছাত্র-ছাত্রীরা শুধু একটুখানি সাহস করে কোনও কোচিং ব্যবসায়ীর কাছে না গিয়ে নিজেরা নিজেরা লেখাপড়া করতো তাহলে তাদের জীবনটা অন্যরকম হতো। তাদের ভেতর একধরনের আত্মবিশ্বাসের জন্ম হতো, লেখাপড়া করার বাইরে তাদের নিজেদের জন্য প্রচুর সময় থাকতো, যেই সময়টিতে তারা গল্পের বই পড়তে পারতো, ছবি আঁকতে পারতো, গান গাইতে পারতো, বন্ধুর সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে পারতো! এখন তারা স্কুলের শেষে এক কোচিং থেকে অন্য কোচিংয়ে ছুটে যায়, তাদের জীবনে বিন্দুমাত্র অবসর নেই। আমরা কেমন করে আমাদের সন্তানদের জন্য এই ভবিষ্যৎ বেছে নিয়েছি? সেই কারণে আমি যখন দেখেছি হাইকোর্ট থেকে রায় দিয়েছে স্কুলের শিক্ষকেরা কোচিং করাতে পারবে না আমি অসম্ভব খুশি হয়েছি। শুধু খুশি হইনি, আমি এই ভেবে আনন্দিত হয়েছি যে এই দেশে আমাদের ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার মতো মানুষ আছে। আপাতত রায়টি হচ্ছে স্কুল কলেজের শিক্ষকেরা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের কোচিং করাতে পারবে না। এটি অনেক বড় একটি পদক্ষেপ। কারণ আমরা সবাই জানি বিখ্যাত এবং অখ্যাত সব স্কুলেরই একটা বড় সমস্যা যে শিক্ষকেরা তাদের স্কুলে কিংবা কলেজে ঠিক করে পড়ান না যেন তার ছাত্র ছাত্রীরা তাদের কাছে কোচিং করে। এই রায়ের পর পত্রপত্রিকায় লেখালেখিতে অনেককেই শিক্ষকদের জন্যে মায়া প্রদর্শন করতে শুরু করেছেন। দেখেছি, তারা বলছেন এই শিক্ষকেরা আর কতোই বা বেতন পান, যদি একটু বাড়তি টাকা উপার্জন করতে পারেন তাতে সমস্যা কী? এই যুক্তিটি সঠিক যুক্তি নয় কারণ, সব বিষয়ের কিছু বিষয়ের শিক্ষকদের অনেক চাহিদা। যারা এই ধরনের ‘সেলিব্রেটি কোচিং শিক্ষক’ তারা আসলে তাদের স্কুল কিংবা কলেজের চাকরিটি ছেড়ে দিয়ে চুটিয়ে কোচিং করাতে পারবেন তাদের টাকার কোনো অভাব হবে না, এবং তখন কেউ তাদের কিছু বলবে না। ইদানিং কোচিংয়ের পক্ষে আমি নতুন আরেকটি যুক্তি দেখতে শুরু করেছি, যুক্তিটি হচ্ছে, উন্নত দেশে ছেলেমেয়েরা কোচিং করছে কাজেই এটি নিশ্চয়ই খুবই ভালো একটি কাজ। দীর্ঘদিন কলোনি হিসেবে থেকে এটা আমাদের রক্তের মাঝে ঢুকে গেছে, বিদেশিরা যেটা করে আমাদেরকেও সেটা করতে হবে। আর বিদেশিদের চামড়া যদি সাদা হয় তাহলে তো কথাই নেই, যে কোনও মূল্যে সেটা আমাদের করতেই হবে। কেউ কী লক্ষ্য করেছে ইউরোপের সাদা চামড়ার মানুষ কতো নির্দয়ভাবে শরণার্থীদের খেদিয়ে দিচ্ছে সে জায়গায় আমরা একজন নয়, দুইজন নয়, দশ লাখ রোহিঙ্গাদের জায়গা দিয়েছি, খেতে পড়তে দিচ্ছি? আমেরিকার কথা শুনলে আমাদের মুখে ফেনা উঠে যায়। অথচ সেই দেশে একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই দোকান থেকে একটা একেফোরটি সেভেন কিনে এনে একটা স্কুলে হামলা করে ডজন খানেক বাচ্চাকে মেরে ফেলতে পারে। গড়ে মাসে একটা করে এরকম হামলা হয় এবং সেটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই! সেই দেশেও কোচিং ব্যবসা শুরু হয়েছে, যারা জানে না তাদেরকে বলে দিতে পারি বিষয়টা আমরা সেখানে রপ্তানি করেছি। সেখানে জ্যাকসন হাইটস হচ্ছে বাংলাদেশির ঘাঁটি, সেখানে কোচিংয়ের রমরসা ব্যবসা! জাপানের উদাহরণও দেওয়া হচ্ছে, সেখানে প্রায় পনেরো লক্ষ তরুণ তরুণী হিকিকোমোরি! হিকিকিমোরি একটি নতুন শব্দ, যারা জগৎ সংসারের সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে নিজেকে একটা ঘরের মাঝে বন্ধ করে রাখে তাদেরকে বলে হিকিকোমোরি। যে দেশের সমাজটি এরকম তরুণ তরুণী তৈরি করে যাচ্ছে তাদেরকে আমরা চোখ বন্ধ করে অনুকরণ করে যাব? সবাই কী জানে বাংলাদেশের ধড়িবাজ তরুণেরা ডলারের বিনিময়ে অস্ট্রেলিয়ার ফাঁকিবাজ ছাত্র ছাত্রীদের থিসিস লিখে দেয়? কাজেই বিদেশকে অনুকরণ করতে হবে কে বলেছে? যারা কোচিং ব্যবসা করে টু পাইস কামাই করছেন এবং কামাই করে যেতে চান তাদের কাছে করজোড়ে নিবেদন করে বলছি আপনাদের ব্যবসাতে খুব সহজে কেউ হাত দিতে পারবে না। আপনারা যেভাবেই এই দেশের ছেলেমেয়েদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছেন সেখান থেকে তাদের ছুটে যাবার কোনো উপায় নেই, কাজেই আপনারা নিশ্চিন্তে আপনাদের ব্যবসা করে যেতে পারবেন। তবে দোহাই আপনাদের, এই কোচিং ব্যবসা কতো মহান এবং এই মহত্বের অবদানে এই দেশের ছেলেমেয়েদের কতো উপকার হচ্ছে সেই কথাগুলো বলে আমাদের অপমান করবেন না। লেখাপড়ার একটা বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে শেখা। কাজেই আমরা সবাই চাই আমাদের ছেলেমেয়েরা শিখুক। কী শিখেছে তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার হচ্ছে কীভাবে শিখেছে। কারণ একজনকে কোচিং করে জোর করে কিছু একটা শিখিয়ে দেওয়া হয়তো সম্ভব কিন্তু একবার শিখলেই তো বিষয়টা শেষ হয়ে যায় না। একজন মানুষকে সারা জীবন শিখতে হয়। কাজেই যে নিজে নিজে শিখতে পারে সে সারাটি জীবন শিখতে পারবে। একটি প্রবাদ আছে, কাউকে একটা মাছ কিনে দিলে সে সেইদিন মাছ খেতে পারে। কিন্তু তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দিলে সে সারা জীবন মাছ ধরে খেতে পারবে। শেখার বেলাতেও সেটি সত্যি। কোচিং করে কাউকে কিছু একটা শিখিয়ে দিলে সে সেই বিষয়টি শিখতে পারে। কিন্তু কীভাবে শিখতে হয় কাউকে সেটি জানিয়ে দিলে সারা জীবন সে শিখতে পারবে। আমরা চাই আমাদের ছেলেমেয়েদের ভেতর সেই আত্মবিশ্বাসটুকু গড়ে উঠুক যে কোনো রকম কোচিং ছাড়াই তারা নিজেরাই নতুন কিছু শিখতে পারবে। তথ্যপ্রযুক্তি-ই বলি কিংবা অটোমেশান বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সই বলি না কেন খুবই দ্রুত এগুলো পৃথিবীর মানুষের জায়গা দখল করে নিতে থাকবে। আমরা চাই আমাদের দেশের ছলেমেয়েগুলো আত্মবিশ্বাস সৃজনশীল মানুষ হিসেবে বড় হোক, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কোনো একটা যন্ত্র এসে যেন তাদের অপ্রয়োজনীয় করে ফেলতে না পারে। যদি আমাদের স্কুল কলেজে ঠিক করে লেখাপড়া করানো হতো তাহলে কখনই এই দেশে এভাবে কোচিং ব্যবসা শুরু হতে পারতো না। যখনই আমরা কোচিংয়ের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলি তখনই সবাই স্কুল কলেজের লেখাপড়ার মান নিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেন। আমরা যে লেখাপড়ার মান নিয়ে অভিযোগ করব তারও সুযোগ নেই, কারণ এই দেশে লেখাপড়ার জন্যে যতো টাকা বরাদ্দ হওয়া উচিৎ তার তিনভাগের এক ভাগ অর্থ বরাদ্দ হয়। পৃথিবীর আধুনিক দেশগুলোর ভেতরে কোনও দেশেই এতো কম টাকায় এতো বেশি ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করানো হয় না, আমার ধারণা এতো কম টাকায় এর চাইতে ভালো লেখাপড়া করানের উদাহরণ আর কোথাও নাই। তাই সত্যিই যদি আমরা আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের ঠিক করে লেখা পড়া শিখাতে চাই তাহলে আমাদের চিৎকার আর চেঁচামেচি করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত পড়ালেখার জন্যে আরও টাকা বরাদ্দ করা না হয়। আমাদের দেশে যতরকম কোচিং ব্যবসা হয় তার মাঝে এক ধরনের ব্যবসা রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব সেটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং। দুই বছর হয়ে গেলো যখন আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার কথা বলেছিলেন। একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের যে অচিন্ত্যনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়। সেই কষ্ট দেখে আক্ষরিক অর্থে পাষাণের হৃদয় গলে যাবে, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মনে এতোটুকু দাগ কাটে না। তাই মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধের পরেও বছরের পর বছর প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই এর কারণে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কিছু বাড়তি টাকা রোজগার করতে পারছেন, তার সঙ্গে সঙ্গে লাভবান হচ্ছে কোচিং ব্যবসায়ীরা। তারা চুটিয়ে ভর্তি কোচিংয়ের নাম করে টাকা উপার্জন করে যাচ্ছে। ভর্তি কোচিং করছে কারা? বিত্তশালী মানুষের ছেলে মেয়েরা। দরিদ্র মানুষের ছেলে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ছে, সেটা কী কারো চোখে পড়েছে? যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে নিতো তাহলে আমরা যে শুধু আমাদের ছেলে মেয়েদের প্রতি একটু ভালোবাসা দেখাতে পারতাম তা নয়, কোচিং ব্যবসাটুকু রাতারাতি বন্ধ করে দিতে পারতাম। আমরা সেটা পারছি না। কোচিং ব্যবসায়ীরা অনেক শক্তিশালী, সেটাই কী কারণ? লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

বাঙালির চেতনায় বসন্ত বরণ

জরাজীর্ণ শীতের পর বসন্তের আগমনে প্রকৃতি সেজেছে নতুন রুপে। বাঙালি প্রাণ যখন বসন্ত বরণ করছে ঠিক তখন সম্ভাবনার এক নতুন বাংলাদেশ দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব বাঙালি। এ স্বপ্নকে চেতনায় ধারণ করেই প্রকৃতিতে লেগেছে বসন্তের ছোঁয়া। বসন্ত অনন্ত সম্ভাবনার ঋতু। প্রেম, বিরহ, মিলন, দ্রোহ-সংগ্রাম, বিজয় আর অনিবার্য নিয়তির পথে নতুন স্বপ্নে পাড়ি দেওয়া এক অধ্যায়ের অনন্য নাম। বসন্ত মানেই চোখ-ধাঁধানো ফুলের সমাহার। ফাল্গুন এলেই কেবলই উঁকি দেয় সে রাঙা সম্ভাবনার সমস্থ দ্বার। এদিনেই সকলকে স্মরণ করে দেয় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই ভূবন বিখ্যাত পঙতিদ্বয় ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক/আজ বসন্ত।’ বসন্তকে নিয়ে বাঙালির কৌতূহলের শেষ নেই। বসন্তকে নিয়ে আবেগ তাড়িত বাঙালি- কবি- সাহিত্যিকরা লিখেছেন অনন্য অসাধারণ সব গান-কবিতা।   বসন্তের গানে মাতোয়ারা বাঙালির কণ্ঠে উঠে বসন্ত বন্দনা- ‘বাতাসে বহিছে প্রেম নয়নে লাগিল নেশা/ কারা যে ডাকিল পিছু বসন্ত এসে গেছে/ মধুর অমৃত গানে জানা গেল সহজে / মরমে এসেছে বাণী বসন্ত এসে গেছে.....! বসন্ত বন্দনায় মন আনমনে গেয়ে উঠে - ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/ তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান...আমার আপনহারা প্রাণ/ আমার বাঁধন ছেঁড়া প্রাণ....../ তোমার অশোকে কিং সুখে, অলক্ষে রঙ লাগলো আমার অকারণের সুখে..../ পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনী গন্ধায়/ রুপ সাগরের পাড়ের পানি উদাসী মন দায়।’ এছাড়া- ‘রঙ লাগালে বনে বনে, ঢেউ জাগালে সমীরণে, আজ ভুবনের দুয়ার খোলা, দোল দিয়েছে বনের দোলা’- প্রকৃতি আজ খুলে দেবে দখিন দুয়ার। বইবে ফাগুনের মৃদুমন্দ দখিনা হাওয়া।’ নতুন করে জেগে উঠা, নতুন আনন্দে-আশায় রঙিন হয়ে ওঠার আবাহনে সে হাওয়া গাইবে- ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল/ স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল, দ্বার খোল দ্বার খোল।’ এদিকে বসন্তের উন্মাদনায় বাতাসে কোকিলের কুহুতান। মাতাল হাওয়ায় কুসুম বনের বুকের কাঁপনে, উতরোল মৌমাছিদের ডানায় ডানায়, নিরাভরণ বৃক্ষে কচি কিশলয় জেগে উঠবার আভাসে, আমের মুকুলে, পল্লব মর্মরে আর বনতলে কোকিলের কুহুতান জানান দিচ্ছে শীতের রুক্ষ দিনের অবসান: ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে...। ‘বাংলার প্রকৃতিতে আজ ফাগুনের ছোঁয়া, আগুনরাঙা বসন্তের মোহময় সুর। হিম-কুয়াশায় ঢাকা শীতের পর রুক্ষ মৃতপ্রায় নিসর্গে উষ্ণতার স্পর্শ দিয়ে জীবনের স্পন্দন ফিরিয়ে এনেছে বসন্ত। বসন্তের প্রথম সকালে বাংলার চপলা নারীরা যেদিন বাসন্তী রং শাড়ি পড়ে, কপালে টিপ, হাতে কাঁচের চুড়ি, পায়ে নূপুর, খোঁপায় ফুল জড়িয়ে বেড়িয়ে পড়বে সেদিন চির যৌবনা বসন্ত প্রকৃতিতে স্পস্ট হয়ে উঠে। বসন্ত পোশাক পাঞ্জাবি, ফতুয়া পরা ছেলেরাও সঙ্গী হবে বসন্তবরণের বিভিন্ন আয়োজনে। দখিনা হাওয়া, মৌমাছির গুঞ্জরণ, কচি-কিশলয় আর কোকিলের কুহুতানে জেগে ওঠার দিন আজ। প্রাকৃতিক রূপ-রসে, কোকিলের কুহুতান, আমের মুকুলের সৌরভে আর পিঠাপুলির মৌতাতে বসন্তের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। বসন্তের রঙিনদোলা, উচ্ছলতা ও উন্মাদনায় ভাসবে বাঙালি। কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে- ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে/ ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে/ আড়ালে আড়ালে কোণে কোণে।’ অবশ্যই পলাশ-শিমুলের অভাব ঘুচিয়ে দেয় হলুদ গাঁদা। বসন্ত মানেই সুন্দরের আহ্বান, জীবনের জয়গান। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। দখিনা হাওয়ার টানে ধূসর প্রকৃতি জাগবে প্রাণের সাড়ায়। ঝরা পাতার দিন শেষে গাছের শাখায় শাখায় উঁকি দেবে আজ কচি পাতা। প্রকৃতি সাজবে নতুনরূপে। শীতের খোলসে ঢুকে থাকা পলাশ, শিমূল, কাঞ্চন, পারিজাত, মাধবী, কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া জেগে উঠবে অলৌকিক স্পর্শে। প্রকৃতিতে নৈসর্গিক প্রাণ ও রূপের আগমনে গুঞ্জন তুলবে ভ্রমর। গাছে-গাছে ছড়িয়ে পড়বে পলাশ আর শিমূলের রূপের আগুন। আজ কেবলই শুরু, পাতার আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে কুহু কুহু ডাকে হৃদয় উচাটন করে তুলবে বসন্তের দূত কোকিল। আকুল ব্যাকুল করে তুলবে বিরহী অন্তর। নিসর্গের বর্ণচ্ছটায় প্রকৃতি হয়ে উঠবে বাঙ্ঘময়। বসন্ত কেবল একটি ঋতুই নয়। আমাদের নতুন করে জেগে উঠার, বেঁচে থাকার প্রেরণাও বটে।  সকল কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে, বিভেদ-ব্যর্থতা ভুলে, নতুন কিছুর প্রত্যয়ে সামনে এগিয়ে যাওবার দুর্নিবার প্রচেষ্টার বার্তা আমরা বসন্তে পেয়ে থাকি। বসন্ত এলেই বনের নিভৃত কোণে, মেঠোপথের ধারে কারও দেখার অপেক্ষা না করেই ফোটে কত নাম না-জানা ফুল। আমাদের কবিতায় সংগীতে সুর মাধুরীতে বসন্ত ঋতু ভিন্ন ভাবেই ধরা দিয়েছে। ঋতুরাজ বসন্তের রুপ মাধুরী আর মানুষের জীবনে বসন্তের প্রভাব নিয়ে অসংখ্য গান রচিত হয়েছে। যা অন্য কোন ঋতুর ভাগ্যে এমনটা জোটেনি। বসন্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আন্দোলিত করে গেছে। তিনি বসন্ত নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য গান-কবিতা। তার অমর সৃষ্টি-‘আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়।’ বাউল হৃদয় গেয়ে উঠে-‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে/ ময়ূরের মতো নাচেরে।’ প্রেমের ঋতু বসন্তে প্রেমিক মন আনমনে গেয়ে উঠবে- ‘শোন গো দখিনা হাওয়া/প্রেম করেছি আমি...।‘ বসন্তের বন্দনা আছে কবিতা, গান, নৃত্য আর চিত্রকলায়। বিশেষত কবিতা ও গানে ফাল্গুন আর বসন্তের রূপ চিত্রিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শনেও বসন্ত ঠাঁই করে নিয়েছে নানা অনুষঙ্গে- অনুপ্রাস, উপমা, উৎপ্রেক্ষায়। কাজী নজরুল ইসলাম বসন্তের আগমনীতে গেয়েছেন- ‘বসন্ত এলো এলো এলো রে, পঞ্চম স্বরে কোকিল কুহরে মুহু মুহু কুহু কুহু তানে।’ বাংলার ঘরে ঘরে উচ্চারিত একটি বাউল গান- ‘নারী হয় লজ্জাতে লাল, ফাল্গুনে লাল শিমূল বন, এ কোন রঙে রঙিন হলো বাউল মন... মন রে...’। ভাটিবাংলার গান-‘বসন্ত বাতাসে...সই গো/ বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে...।’ উদাসী মনে বসন্ত প্রেমের বার্তা নিয়ে আসে–‘কে তুমি বাঁশরিয়া মধু ভরা বসন্তে... বাঁশির সুরে পাগল করেছো।’ কিশোরী আনমনা প্রেমিকা তাঁর কাঙ্খিত হলুদ গাঁদা ফুলের অপেক্ষায় থেকে প্রেমিকের উদ্দেশ্যে গায়তে থাকে ‘হলুদ গাঁদার ফুল রাঙা ফুল এনে দে এনে দে নইলে বাঁধবো না, বাঁধবো না চুল।’ আমাদের জীবনে বসন্তের আগমনী বার্তায় দ্রোহ বিপ্লব আর যেকোন অপশক্তির বিরুদ্বে সোচ্ছার হওয়ার বার্তা দেয়। বসন্ত আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তরঙিন পুষ্পিত রক্তের স্মৃতির ওপর রং ছড়ায়। ১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা ‘বাংলা’র জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, সফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে। সে আত্মত্যাগ আজ বিশ্বস্বীকৃত। বারবার ফিরে আসে ফাল্গুন, আসে বসন্ত, শোক নয় সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী মোকাবিলায় দুর্বিনীত সাহস আর অপরিমেয় শক্তি নিয়ে। একুশের পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার মিলেমিশে একাকার হয় এদিনে। প্রতিবছর বসন্তেই আমরা হৃদয়ের শতত আবেগ নিয়ে ভাষা শহীদদের স্মৃতির স্মরণে আমরা গেয়ে উঠি অমর সে গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভূলিতে পারি.....? সেই সাথে প্রকৃতির অগণিত ফোটা ফুলের পাঁপড়ির মতো শব্দের বাগানে ফুটে অসংখ্য নতুন বই। বাঙালির মননশীলতার কাননে মুক্তচিন্তার ঝংকার যেকোন অশুভ শক্তির বিরুদ্বে উচ্ছারিত হয় বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ থেকে। ফাগুন তথা বসন্তকাল এলেই গ্রাম থেকে নগর-আবহমান বাংলার সর্বত্রই শুরু হয়ে মেলার মৌসুম। পুরো বসন্তকালে সারা দেশে বসবে লোকজ মেলা। সেই সাথে লোকসংস্কৃতির অনন্য প্রতীক –কারুশিল্প, হস্তশিল্পের পণ্যের মেলায়। বসন্তের রাতগুলোতে প্রত্যন্ত গ্রামে শুনা যেত ঢাক-ঢোলক আর কীর্তনের গান। যা এখন প্রায় বিলুপ্ত। বসন্তের উচ্ছলতা ও উন্মাদনায় ভাসবে নাগরিক বাঙালির মন। বসন্তের আনন্দযজ্ঞ চলবে শহর থেকে গ্রামীণ জীবনেও। বসন্তকে তারা আরও নিবিড়ভাবে বরণ করে। বাংলা পঞ্জিকা বর্ষের শেষ ঋতু বসন্তের প্রথম দিনকে বাঙালি পালন করে ‘পহেলা ফাল্গুন-বসন্ত উৎসব’ হিসেবে। সর্বজনীন প্রাণের উৎসবে বাঙালি হৃদয় অনুভব করবে প্রেম-বিরহ আর নতুনের আবাহন। বসন্ত শুধু অশোক-পলাশ-শিমুলেই উচ্ছ্বাসের রং ছড়ায় না, আমাদের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্তের উপরও রং ছড়ায়। এই বসন্তে বাঙালির দ্রোহ প্রেম আর দেশপ্রেমের অনন্য নজির রয়েছে। কেননা আমাদের ভাষা- স্বাধীনতা সংগ্রাম এই বসন্তে শুরু হয়েছিল। তাই এই বসন্তে বাঙালি হৃদয় কিছুতেই ঘরে থাকে না। যেমনি থাকেনি- বাহান্ন ও একাত্তরে। যেকোনো সংকটে বাঙালিকে জেগে উঠতে এই বসন্ত সাহস যুগিয়েছে। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বিশ্ব দরবারে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে সামনে এগিয়ে যাবে এই মর্মে আমাদের কাজ করতে হবে এ হোক আমাদের শপথ।    লেখক-সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক।

ঊনসত্তরের শপথ দিবস

১৯৬৯-এর ৯ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন এবং আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। পল্টনে জীবনের প্রথম জনসভা। এ দিনেই আমরা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দশজন ছাত্রনেতা লাখ লাখ মানুষের সামনে ‘জীবনের বিনিময়ে ১১ দফা দাবি আদায়ের শপথ গ্রহণ’ করি। ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ‘শপথ দিবস’ পালিত হয়। জনসভা তো নয়, যেন বিশাল এক গণমহাসমুদ্র! চারদিক কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তিলধারণের ঠাঁই নেই। সেদিনের সুবিশাল পল্টন ময়দান সংগ্রামী জনতাকে ধারণ করতে পারেনি। কাজ বন্ধ রেখে দাবি আদায়ে কারখানার শ্রমিক, মেহনতি কৃষক, নৌকার মাঝি, জেলে, কামার-কুমার-তাঁতি, ছাত্র, অফিসের কেরানি, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী- সবাই জনসভায় ছুটে এসেছে প্রাণের টানে। মানুষ ঠাঁই নিয়েছে স্টেডিয়ামের দোতলা-তিনতলার বারান্দায়, কার্নিশে। যে যেখানে পেরেছে স্থান করে নিয়েছে। গণতরঙ্গে উত্তাল বিশাল সেই জনসভায় আগত জনসাধারণ ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ। তাদের মুখে ছিল স্বাধিকারের দৃপ্ত স্লোগান আর চোখ ছিল দুর্জয় সংকল্পে অটল।সেই অভূতপূর্ব দৃশ্যপট এখনও আমার স্মৃতিতে অম্লান। পল্টনের সেই জনসমুদ্রে শিল্পী অজিত রায়ের ভরাট কণ্ঠে যখন গীত হলো, `বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা`, তখন জনতরঙ্গে যে ঢেউ উঠেছিল তা অভূতপূর্ব। সে দৃশ্য কোনোদিন ভুলবার নয়! সুতরাং এমন একটি দিন, যেদিনে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেদিন ডাকসুর ভিপি হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করার। সেদিনের শপথ দিবসের সভায় দেশের বিভিন্নমুখী সমস্যার উল্লেখ করে, ঐতিহাসিক ১১ দফা ব্যাখ্যা করে, ছাত্রদের রাজনীতি করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে, আইয়ুব খান প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠক প্রশ্নে ছাত্র সমাজের অভিমত ব্যাখ্যা করে দশজন ছাত্রনেতার প্রত্যেকের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল, `অবিলম্বে আইয়ুব খানের পদত্যাগ, বর্তমান শাসনতন্ত্র বাতিল, রাজবন্দিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং ১১ দফা দাবির ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ভোটে গণপরিষদ গঠন।` সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক এবং সভার সভাপতি হিসেবে পিনপতন নীরবতার মধ্যে একটানা ৪৫ মিনিট বক্তৃতা করি। সেদিনের বক্তৃতায় যা বলেছিলাম, দৈনিক ইত্তেফাকের পাতা থেকে তার কিয়দংশ আজ পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি- "এ দেশের যে নেতা জন্মের পর হতে বাংলার মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছেন, জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন, সেই প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। ছাত্র-জনতার দাবি-দাওয়া যদি পূরণ না করা হয়, শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দির যদি মুক্তি দেওয়া না হয়, তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে প্রচণ্ড বিস্টেম্ফারণ ঘটবে। রাজনীতির অর্থ যদি হয় শ্রমিক-কৃষকের অধিকার নস্যাৎ করা, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা, ছাত্রসমাজ সেই রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিন্তু রাজনীতির অর্থ যদি হয়, দেশের ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নতুন সমাজ গঠন করা- ছাত্রসমাজ সেই রাজনীতি অবশ্যই করবে। ছাত্রদের ১১ দফা এই দৃষ্টিতেই প্রণীত হয়েছে এবং এই ১১ দফা কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের মুক্তিসনদ। আমরা শিল্পপতি-জমিদারের ছেলে নই, আমরা কৃষক-মজুর-মধ্যবিত্তের সন্তান। আমাদের মাতাপিতার যদি অধিক ট্যাক্স দিতে হয়, তারা যদি পাটের ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে আমাদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাত্রদের পড়াশোনার সাথে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বিচ্ছিন্ন নয়।" বক্তৃতার শেষে সমবেত জনতার তুমুল গর্জনের সঙ্গে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান তুলি, `শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মাগো তোমায় মুক্ত করবো।` `৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি সর্বব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণআন্দোলন সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করে ৯ ফেব্রুয়ারি এক মোহনায় শামিল করেছিল। ভাবতে আজ কত ভালো লাগে, ঐতিহাসিক শপথ দিবসের এই সেল্গাগানের দুটি লক্ষ্যই সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি। সোনার বাংলার ৩৯ জন সোনার সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে `৬৯-এর ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্ত করেছি। আর `৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ৬ দফা ও ১১ দফার পক্ষে গণরায় নিয়ে, `৭১-এর মহত্তর মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষাধিক মানুষের সুমহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে সেদিনের সেই শপথবাক্যের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করেছি। সেদিন পল্টনের জনসভা শেষে সংগ্রামী ছাত্র-জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় আমরা তৎক্ষণাৎ সেখানে যাই এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে শান্ত করে ইকবাল হলে (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ফিরিয়ে আনি। স্বৈরশাসকের শত উস্কানি সত্ত্বেও আমরা নৈরাজ্যের পথে যাইনি। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলন করেছি। নিজেদের মধ্যে মত ও পথের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেদিন ১১ দফা দাবি আদায়ের প্রশ্নে ছিলাম ঐক্যবদ্ধ। দলীয় আদর্শ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে মতদ্বৈধতা থাকলেও আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক ছিল চমৎকার। এক টেবিলে বসেই আহার করতাম। বিপদে-আপদে একে অপরের খবর নিতাম এবং হৃদ্যতাপূর্ণ এই সম্পর্কই ছিল আমাদের আন্দোলনের ভিত্তি। `৬৯-এর গণআন্দোলনে আমাদের সংগ্রামী ভূমিকা, কর্মসূচি পালনে নিষ্ঠা, সততা ও জনদরদি আবেদন মানুষের হৃদয়ে এতটাই সাড়া জাগিয়েছিল যে, বাংলার মানুষ আমাদের মাথায় তুলে নিয়েছিল। ৯ ফেব্রুয়ারির শপথ দিবসের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি ডাক-এর (ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি) মিটিংয়ে সভাপতি হিসেবে নূরুল আমীনের নাম প্রস্তাব করা হলে সংগ্রামী জনতা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে আমাকে মঞ্চে তুলে নিয়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হককে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন আন্দোলন চরম উচ্চতায় উঠেছিল; ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করে সান্ধ্য আইন জারি করা হলে বাংলার মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়ার পর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের স্বৈরশাসক তথাকথিত লৌহমানব আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আজ যখন ইতিহাসের সেই গৌরবোজ্জ্বল ৯ ফেব্রুয়ারি `শপথ দিবস`-এর সোনালি দিনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন ফেলে আসা সংগ্রামী দিনগুলোর জ্যোতির্ময় বৈপ্লবিক বহিঃপ্রকাশ, অনন্যসাধারণ মনে হয়! সংগ্রামমুখর সেই দিনগুলোর কথা এবার আরও বেশি করে মনে পড়ে। মনে পড়ার অনেক কারণ আছে। মনে হয়, আমরা বেঁচে আছি ঠিকই। কিন্তু আমাদের জীবনে এই দিনগুলোই ছিল শ্রেষ্ঠতম সময়। প্রতিনিয়তই ভাবি, একদিন আমিও চলে যাব। কিন্তু রয়ে যাবে আমাদের এসব ঐতিহাসিক কীর্তি। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই সৌভাগ্যবান। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপজেলা ভোলার অবহেলিত গাঁয়ের সন্তান আমি। সেই ছোট্টবেলায় কষ্ট করে লেখাপড়া করেছি। পায়ে হেঁটে স্কুলে গিয়েছি। সেই অজপাড়াগাঁ থেকে উঠে এসে আজ জাতীয় রাজনীতির যে পর্যায়ে আমার অধিষ্ঠান, তা সম্ভব হয়েছে কেবলই গণমানুষের অপার ভালোবাসায়। সেই `৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছি; `৭২-এ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব; আবার `৭৫-এ বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হলে আমাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী করেছেন। `৯৬-এ বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব লাভ করলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করেছেন। ২০০৯-এ জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছি। এরপর ২০১৩-তে নির্বাচনকালীন সরকারে শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে, ২০১৪-এর বিজয়ের পর বিগত পাঁচ বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। এবারের সর্বশেষ নির্বাচনে অষ্টমবারের মতো জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। জীবনে যা প্রাপ্য তার সবই পেয়েছি।যতদিন বেঁচে আছি স্মৃতির পাতায় ভেসে থাকবে `৬৯-এর অগ্নিঝরা উত্তাল সেই দিনগুলো। যে দিনগুলো আমার মতো একজন অখ্যাত মানুষকে সারা বাংলার মানুষের কাছে পরিচিত করেছিল। পরম করুণাময়ের কাছে একটাই প্রার্থনা, আমি যেন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শেষজীবন ত্যাগ করতে পারি।লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্যtofailahmed69@gmail.comএসএ/

দুর্নীতি দমনই হতে পারে সোনার বাংলা গড়ার প্রধান অনুঘটক

দুর্নীতি একটা রাষ্ট্রের জন্য রাসায়নিক অস্ত্র ও আণবিক বোমার চাইতেও বেশি ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র। দুর্নীতি শুধু উন্নয়নকে ব্যাহত করে তাই নয়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকেও হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। যক্ষ্মার মতো সমগ্র জাতিকে কুরে কুরে খেয়ে নিঃশেষ ও নিস্তেজ করে ফেলে। শক্তিহীন মানুষের মতো তখন শক্তিহীন জাতিকে কেউ বাইরে থেকে একটু ধাক্কা দিলেই পড়ে যায়। সুতরাং, দুর্নীতি দমন ও নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে রাষ্ট্রের কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হবে না এবং অর্জিত সাফল্যও টেকসই হবে না। একটা দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে। রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন তিনি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চান, সোনার বাংলা গড়তে চান। তিনি আরো বলেছিলেন, সোনার বাংলা গড়ার জন্য সোনার মানুষ চাই। বঙ্গবন্ধু জানতেন— চাইলেই সোনার মানুষ পাওয়া যায় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সোনার মানুষ তৈরি করতে হয়। দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমই কেবল একজন মানুষকে সোনার মানুষ করতে পারে। পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে সেটা ছিল একেবারেই অসম্ভব বিষয়। তাই বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, এদেশের মানুষকে সমস্ত অশুভ রাহুর কবল থেকে মুক্ত করতে হলে প্রথমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে এবং তার জন্য সমগ্র জাতির রাজনৈতিক মানসকাঠামোর ঐক্যবদ্ধতা প্রয়োজন। ক্যারিশমেটিক বা সম্মোহনী নেতৃত্বের গুণে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু সেটা করতে পেরেছিলেন। সমগ্র জাতির মানসকাঠামো যদি এক জায়গায় মিলিত না হতো তাহলে স্বাধীনতা লাভের মতো এতবড় সাফল্য এত অল্প সময়ের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব হতো না।রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে সমস্ত অশুভ শক্তির কবল থেকে মুক্ত করবেন, এটি তাঁর ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে ছিল। তাই দুর্নীতিমুক্ত শোষণহীন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় মানসকাঠামো তৈরির জন্য অর্থাত্ তাঁর আকাঙ্ক্ষিত সোনার মানুষ গড়ার উদ্দেশ্যে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনি ঢেলে সাজাতে চাইলেন। কারণ উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। নীতি-নৈতিকতা সংবলিত আদর্শবান মানুষ তৈরি করতে হলে উপযুক্ত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে কমিশন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার মানুষ তৈরির উপযোগী একটা অনন্য শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। একটা জাতির মানসকাঠামো তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সে সুযোগ পেলেন না। ১৯৭৫ সালের পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কুদরত-ই-খুদা কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল করে দিলেন। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শগত যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য বঙ্গবন্ধু তৈরি করেছিলেন সেটাও জিয়াউর রহমান ভেঙে তছনছ করে দিলেন। রাষ্ট্র ও রাজনীতির একেবারে মৌলিক আদর্শগত জায়গায় জাতি আবার বিভক্ত হয়ে গেল। এটাই ছিল মহা সর্বনাশের শুরু। তারপর পালাক্রমে দুই সামরিক শাসক ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করার নীতি গ্রহণ করলেন। ১৫ বছর চললো এই ধারা। তাতে যা হবার তা-ই হলো।সামরিক শাসকদ্বয়ের মেহেরবাণীতে অনেক মানুষ লোভনীয় পদ-পদবি, এমপি, মন্ত্রী হয়ে গেলেন বিনাশ্রমে রাতারাতি। এমন হয়েছে, অনেককেই রাতের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে বলা হয়েছে আপনি মন্ত্রী-এমপি হবেন। আপনার কিছু করতে হবে না, যা কিছু করার আমরা করব। সুতরাং, জনগণের কথা ভেবে যন্ত্রণা পোহাবার পরিবর্তে এসব পদপ্রাপ্তরা হয়ে গেলেন সামরিক শাসকের চাটুকার ও পদলেহী। তাতে প্রাপ্তিও যেমন, তেমনি সাত খুন মাপ। সামরিক শাসকদ্বয়ের হাত ধরে আবির্ভূত হওয়া সুবিধাবাদিদের দৌরাত্ম্যে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা মূল্যবোধ সবকিছুই কেবল কেতাবি বস্তু হয়ে গেল, বাস্তবতায় তার কোনো চিহ্ন আর রইল না। সুবচন নির্বাসনে চলে গেল। সামরিক শাসনের বদৌলতে দুর্নীতির যে সিংহ-দুয়ার সেদিন খুলে গেল সেটি পরবর্তীকালে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সংক্রামক ব্যাধির মতো প্রবেশ করে আজ মহাপ্লাবনের রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন দুর্নীতি। রাষ্ট্রনীতি ও রাজনীতি যদি মতাদর্শগতভাবে নীতি-নৈতিকতা এবং শুভচিন্তার পক্ষে না থাকে তাহলে সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে যায়। বিগত সময়ে বাংলাদেশে সেটাই ঘটেছে। তাই এই বাস্তবতায় ১৬ কোটি মানুষের এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে শুভচিন্তার পক্ষে ফিরিয়ে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। এর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ দরকার। সর্বপ্রথম কাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে সঠিক জায়গায় ফিরিয়ে আনা। এই কঠিন কাজটিই গত ৩৮ বছর ধরে করে চলেছেন বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের একান্ত অনুসারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।মহাগ্রাসী দুর্নীতির মতো সুবিশাল জাতীয় ইস্যুকে বিচ্ছিন্ন ও এককভাবে বিবেচনা করলে হবে না, বিগতদিনের সমস্ত ঘটনাবলি এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতির সামগ্রিক ইস্যুর সঙ্গে মিলিয়ে এক সঙ্গে দেখতে হবে। গত দশ বছর এক নাগাড়ে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে শেখ হাসিনা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তিনি বিশ্বের নজর কেড়েছেন। রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জায়গায় ফিরিয়ে আনার পথেও অগ্রগতি অনেক। বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধী দল জামায়াতের রাজনীতি প্রায় নিঃশেষিত। তারপর বাংলাদেশে জামায়াতের পুনর্জন্মদাতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী দল বিএনপির রাজনীতি আজ ভঙ্গুর অবস্থায়। তবে আত্মতুষ্টি ও আত্মপ্রসাদের সুযোগ নেই। রাজনীতিকে শুদ্ধিকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর ফিরিয়ে আনার পথে এখনো বড় বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। তবে এদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সবচাইতে বড় আশার জায়গা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুড়ি এখন অনেক গভীর ও বিস্তৃত। শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয়, বিশ্বের সচেতন মানুষ এবং নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনাকে একজন পরিপক্ব নেতা হিসেবে চেনেন ও জানেন। বৈশ্বিক সংকট ও ইস্যুতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং কথার মূল্য অনেক বেশি। বৈশ্বিক জলবায়ু ইস্যুতে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাস, জঙ্গি দমনে শেখ হাসিনার অবস্থান, বক্তব্য ও সাফল্য সর্বত্রই প্রশংসিত। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চরম জটিল এবং দ্বন্দ্বময় সমীকরণে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় তিনি অসামান্য দূরদৃষ্টি ও পরিপক্বতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং, প্রকৃতই সোনার বাংলা গড়ার কাজে আগামী পাঁচ বছরেও পূর্বের দশ বছরের মতো শেখ হাসিনা আঞ্চলিক সব বড় শক্তিসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাবেন।তবে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে প্রধান চ্যালেঞ্জ দুটি। প্রথমত, দুর্নীতি দমন ও নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বিতীয়ত, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র প্রতিহতকরণ। তাই এখন শুরু থেকেই নতুন সরকারকে একই সঙ্গে ও সময়ে সমানতালে তিনটি অ্যাপ্রোচে মার্চ করে সামনে এগোতে হবে। প্রথমত, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অ্যাপ্রোচে বুলডজিং এবং অনমনীয় কঠিন ও হূদয়হীন অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ও মালয়েশিয়ার মাহাথির যে বিশ্বের রোল মডেল হয়েছেন, তার পিছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের আপসহীন অবস্থান। দুইজনের আত্মজীবনীতেই একথার উল্লেখ আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অ্যাপ্রোচের সমান্তরালে দ্বিতীয় কাজটি হবে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার অ্যাপ্রোচ এবং তৃতীয় সমান্তরাল অ্যাপ্রোচ হবে, নির্ঘাত ষড়যন্ত্র হবে ধরে নিয়ে সেটি প্রতিহতকরণের অ্যাপ্রোচ। ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র এখন পূর্বের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সতর্ক। তবে আধুনিক যুগেও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের জাল ভেদ করে ১৯৯৫ সালের ৪ নভেম্বর দিনে দুপুরে ইসরাইলের শান্তিকামী প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনকে হত্যা করতে সক্ষম হয় ইহুদি ধর্মান্ধ এক যুবক আইগাল আমির। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের অভ্যন্তরে নিজের বিশ্বস্ত দেহরক্ষীর হাতে নিহত হন ভারতের অন্যতম দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। সুতরাং পথ মসৃণ নয়।উন্নয়নের কথা বলতে গেলেই এখন বলতে হবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে গেছে। এই চলাকে নির্বিঘ্ন রাখার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। অর্থাত্ দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা গেলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তাতে ব্যাপক হারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য আকাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। তখন ষড়যন্ত্রকারীরাও হালে পানি পাবে না। প্রোপাগান্ডা, অপপ্রচার কাজে আসবে না। সুতরাং, রাজনীতি শুদ্ধিকরণসহ সুশাসন, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন ও ষড়যন্ত্র প্রতিহতকরণের প্রধান অনুঘটক হবে দুর্নীতি দমন ও নিয়ন্ত্রণ। সেটা করতে পারলেই আমাদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আর শুধু স্বপ্ন থাকবে না, বাস্তবে রূপ নেবে।লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকএসএ/  

ধানভিত্তিক কৃষি এবং কিছু চ্যালেঞ্জ

দেশে এখন ভাতের অভাব নেই। এ কথা আমরা আজ জোর গলায় বলতে পারি। শুধু কি ভাত! ভাতের সঙ্গে আনুষঙ্গিক যা কিছু যেমন—তরিতরকারি, মাছ-মাংস, ফলমূল কোনো কিছুরই অভাব আছে বলে মনে হয় না। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে। অন্য কিছু নয়, প্রধান ফসল চাল উৎপাদনের একটা হিসাব যদি দেখি। ১৯৯১-৯২ থেকে ১৯৯৫-৯৬ পর্যন্ত চালের মোট গড় উৎপাদন ছিল ১৮.৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। তখন ছিল বিএনপির আমল। আওয়ামী লীগের পরবর্তী পাঁচ বছরে (১৯৯০-৯৭ থেকে ২০০০-০১ পর্যন্ত) এই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ২৬.০১ মিলিয়ন মেট্রিক টনে। যা ৭.৩১ মিলিয়ন মেট্রিক টন বেশি। এরপর আবার ক্ষমতার পালাবদল। বিএনপি আসে ক্ষমতায়। ২০০১-০২ থেকে ২০০৫-০৬ পর্যন্ত এই পাঁচ বছরে চালের মোট গড় উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ০.০৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ বাড়েনি। এরপর আবার আওয়ামী লীগের পালা। ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৭-১৮ পর্যন্ত দুই টার্ম। এ সময়ে গড় মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩৪.১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এবারে আট মিলিয়ন মেট্রিক টন বেশি। যদি আলাদা করে এবারের উৎপাদন দেখা হয়, তবে এর পরিমাণ ৩৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। পরিমাণটা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় দুই মিলিয়ন মেট্রিক টন বেশি। এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের সময়ে ধানের ফলন বেড়েছে। দেশ চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। আমার বিশ্বাস ধান ছাড়া অন্যান্য কৃষিপণ্যের বেলায়ও একই চিত্র দেখা যাবে। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর যথাযথ দিকনির্দেশনার কারণে। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতি করেছেন বলে শুনেছি। আর সেখান থেকেই প্রাত্যহিক কৃষির ভালো-মন্দ তাঁর রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। এ কারণেই তিনি সারের সুষম ব্যবহারের গুরুত্বটা বুঝতে পেরেছিলেন সময়মতো। যে জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করে নন-ইউরিয়া সারের দাম চাষিদের সামর্থ্যের মধ্যে নিয়ে আসেন। পাশাপাশি ধান ছাড়াও অন্যান্য ফসলের দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিল। কৃষি যান্ত্রিকায়নের বিষয়টি তিনি খেয়াল করেছিলেন। আওয়ামী লীগের আবার যাত্রা শুরু ২০১৯ সালের প্রথম দিন থেকে; ভিশন ২০২১ মাথায় রেখে। সামনে ২০৪১-এ উন্নত বিশ্বের হাতছানি। এর মাঝে ২০৩০-এ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলে পৌঁছাতে হবে। আর দূরের লক্ষ্য হলো ডেল্টা প্ল্যান। অতএব আমাদের কৃষির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। ধান আমাদের প্রধান ফসল। তাই ধান নিয়ে কিভাবে আমরা এগিয়ে যেতে পারি! এই সরকার ২০২৫ পর্যন্ত থাকবে। এখন আমাদের জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটির মতো। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা হবে ১৮ কোটির কাছাকাছি। আমাদের হিসাব অনুসারে ২০২৫ সাল নাগাদ এখন থেকে আর মাত্র তিন মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল বেশি উৎপাদন করতে পারলেই হয়। কিন্তু সেটা কতখানি সম্ভব হবে? বিশেষত যেখানে আমাদের যথেষ্ট ফসলের জমি নেই। আবহাওয়া ক্রমান্বয়ে বৈরী হয়ে উঠছে। মাটি দুর্বল হয়ে গেছে। পরিবেশদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে। কৃষি বাজারে সুস্থিরতার অভাব। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ তো আছেই। এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সহজ কথা নয়। তবে ব্রির কিছু পরামর্শ আছে। প্রথমেই আসে ফলন পার্থক্যের বিষয়। একটি জাতের ফলন দেওয়ার প্রকৃত সামর্থ্য থেকে চাষির মাঠের প্রকৃত ফলনের মধ্যে বেশ ফারাক। গড়ে প্রায় এক টনের কাছাকাছি। এই ফলন-ফারাক কমিয়ে আনা একটা চ্যালেঞ্জ। চাষির বুদ্ধি-বিবেক, তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সার বা আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদির সহজপ্রাপ্যতা, কৃষিঋণ, স্থান-কাল-পাত্রভেদে উপযুক্ত জাত নির্বাচন এবং কৃষিবিষয়ক পরামর্শ এমনকি যথাযথ বাজার ব্যবস্থাপনা—এ সবই ভালো ফলনের জন্য জরুরি। জাত নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু বলার আছে। কৃষক থেকে শুরু করে বীজ ব্যবসায়ী এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএডিসিও শুধু বাজারে কাটতির কথা মাথায় রেখে বীজ উৎপাদন করে থাকে। ফলে কয়েকটি মাত্র জাত নিয়েই চাষিদের চিন্তাভাবনা। এ জাতগুলো এরই মধ্যে ১৫ থেকে ২০ বছর মাঠে থাকায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। তবুও চাষিরা এগুলো ছাড়তে চান না। এর প্রধান কারণ তাঁরা হালফিল উদ্ভাবিত জাতগুলোর বীজ হাতের কাছে পান না। এ জন্য এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত যেন উদ্ভাবনের পরপরই কোনো জাত চাষির কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় এবং জাতটি কোনোক্রমেই যেন পাঁচ বছরের বেশি মাঠে না থাকে। তাহলে ফলন পার্থক্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। কারণ নতুন জাত সব সময় ফলন বেশি দেয়। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—মাটির উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনা। আমরা জানি আমাদের ফসলের জমির কোনো বিশ্রাম নেই। ফলে মাটি দুর্বল হয়ে গেছে। এ জন্য দরকার মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কিভাবে বাড়ানো যায় সে চিন্তা করা। ব্রিসহ বাংলাদেশের প্রতিটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু প্রযুক্তি আছে, যা দিয়ে মাটির জৈব পদার্থ বাড়ানো সম্ভব। যেমন ব্রি বলছে, কিছুটা খড় রেখে যদি ধান কাটা যায় তাহলে মাটির জৈব পদার্থ যেমন বাড়ে তেমনি পরবর্তী ফসলের জন্য বেশ খানেকটা সার সাশ্রয় করা যায়। আরেকটি বিষয় হলো বৈরী পরিবেশ। যেমন—খরা, বন্যা ও লবণাক্ত এলাকায় কিভাবে ধান জন্মানো যায়। এ জন্য ব্রি বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত জাতগুলো সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যেহেতু এ ধরনের পরিবেশে ফসলের আবাদ করতে গিয়ে চাষিদের যথেষ্ট ঝুঁকির মোকাবেলা করতে হয়। তাই সরকারের উচিত চাষিদের পরিবেশ বুঝে ফসল-বীমার আওতায় নিয়ে আসা। সুখের কথা, এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কৃষিবিদ ও বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। আমার বিশ্বাস, কৃষি নিয়ে এই সরকারের প্রথম তিন টার্ম যতটা কঠিন ছিল; চলতি টার্ম তার চেয়েও কঠিন হবে। এ জন্যই একজন কৃষিবিজ্ঞানীকে কৃষির দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত সত্যি যুগান্তকারী। যদিও সারা বিশ্বে কৃষি মন্ত্রণালয় দেখভাল করার জন্য কৃষি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মন্ত্রী নিয়োগের উদাহরণ তেমন নেই। তবে যাঁরা নিয়োজিত হয়েছেন তাঁরা সার্থকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন। রুয়ান্ডার কৃষিমন্ত্রী মিস অ্যাগনেস মাটিলডা কালিবাটার কথা জানি। তিনি কৃষিবিজ্ঞানে পিএইচডিধারী। জাতীয় নীতিনির্ধারণে তিনি সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকেন। তিনি তাঁর দেশে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিরও প্রবক্তা। নাইজেরিয়ার কৃষিমন্ত্রী ড. আকিনুওমি অ্যাডিসিনাও কৃষিবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী। আফ্রিকা এবং সারা পৃথিবীর কৃষি উন্নয়নে একজন স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি পূজনীয়। বায়োফর্টিফায়েড ফসল উদ্ভাবনসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ। তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ দেশে কৃষি উন্নয়নের ব্যাপারে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারছেন বলে জেনেছি। সদ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। আমাদের কৃষি ও কৃষি ব্যবস্থার নাড়ি-নক্ষত্র তাঁর জানা আছে। কারণ তিনি একসময় কৃষি গবেষণার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। সেই নিরিখেই আমি বলতে চাই, আমাদের কৃষিমন্ত্রীও একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতির কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবেন। লেখক : সাবেক মহাপরিচালক ব্রি এবং ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, ইরি।  

বই উৎসব হোক দক্ষতার মাদকতা

গত কয়েক বছর ধরে বছরের প্রথম দিন একটি দৃশ্য মন কাড়ে। শহরাঞ্চলে এমন দৃশ্য দেখা না গেলেও এমন দৃশ্যের দেখা মেলে সারাদেশ জুড়েই, প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রামগুলোতেও। হলুদাভ শর্ষে ক্ষেতের আল ধরে হেঁটে যাচ্ছে একদল কিশোর-কিশোরী। সবার হাতে নতুন বই। এই তো কিছুক্ষণ আগেই স্কুল থেকে পাওয়া। সবার চোখে মুখে হাসির আলোকছটা। শিশুরা বারবার বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরা বইয়ে বারবার মুখ গুঁজে ঘ্রাণ নিচ্ছে। শর্ষে ফুলের মৌ মৌ গন্ধের মাঝে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ যেন আরেক মাদকতা তৈরি করে। এ মাদকতা সৃষ্টির, নিজেকে ছাড়িয়ে জ্ঞানের অসীমে মেলে ধরার। এ মাদকতা আধুনিক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে প্রমাণের, বিশ্বজনীন প্রতিযোগিতায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে লালসবুজের পতাকাটাকে পতপত করে আরও উঁচুতে তুলে ধরার। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে উৎসবের খাতায় যোগ হয়েছে বই উৎসব। বর্ষবরণ, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ধারাক্রমের বাইরে বাংলাদেশের বই উৎসব এক নতুন সংযোজন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মনোযোগী হন শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে। এ লক্ষ্যে নেওয়া হয় বিভিন্ন কর্মসূচি। এরই অংশ হিসেবে নতুন বছরের শুরুতে বই বিতরণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে রাজধানীর পাশাপাশি সারাদেশে, এক্কেবারে তৃণমূল পর্যায়েও আনন্দের বার্তা বয়ে যাওয়ার একটা রীতি তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। আর অভিভাবকদের মাঝে বাড়ে সচেতনতা। আগে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে বিনামূল্যে বই পেলেও মাধ্যমিকের ছাত্র-ছাত্রীদের কিনে নিতে হতো লাইব্রেরি থেকে। বই কিনতে অপেক্ষা করতে হতো মাসের পর মাস। অনেক সময় প্রয়োজনীয় বই না পেয়েই ত্রৈমাসিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হতো শিক্ষার্থীদের। ২০১০ শিক্ষাবর্ষে বর্তমান সরকার প্রথমবার বিনামূল্যে বই বিতরণের উদ্যোগ নেয়। সে বছরই ১৯ কোটি ৯০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬১টি বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করে সরকার। এর পর থেকে প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে বিতরণ করা বইয়ের সংখ্যাও। এর পর থেকে প্রতি বছর প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বিতরণ করা হয়েছে নতুন বই। চলতি ইংরেজি বছরের প্রথমদিন দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের চার কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন পাঠ্যবই। এ বছর মোট ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২ খানা বই বিতরণ করা হয়েছে এসব শিক্ষার্থীদের মাঝে। নতুন বছরের আনন্দে নতুন ক্লাসে ওঠা শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর হাতে সদ্য ছাপানো ঝকঝকে পাঠ্যবই। মজার ব্যাপার হলো, সারাদেশে এক যোগে বই বিতরণ করা হয়। শীতের সকালে গরম রোদে নতুনত্বের উঞ্চতায় এসব শিক্ষার্থীরা প্রবল আগ্রহে বই গ্রহণ করে। সঙ্গে উপস্থিত অভিভাবকদের মাঝেও দেখা যায় আনন্দের ঝিলিক। গত কয়েকবছরের মধ্যে কয়েকটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। এই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কচি শিক্ষার্থীদের মাঝে যখন বই বিতরণ করা হয়, তখন আনন্দ ও খুশিতে তারা বইয়ের উল্টাতে শুরু করে পাতা। প্রাণখোলা হাসিতে বই নিয়ে খুনসুটিতে মেতে উঠে সহপাঠীদের সঙ্গে। এ দৃশ্যের উৎসব ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশের সবক`টি বিদ্যালয়ে। `নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে ফুলের মতো ফুটব, বর্ণমালার গরব নিয়ে আকাশজুড়ে উড়ব’ প্রতিপাদ্যের মতোই শিশু কিশোর শিক্ষার্থীরা যেন আনন্দের ঢেউয়ে ভাসতে থাকে। বই হাতে পেয়ে এর গন্ধ শুঁকে হাতে নতুন বই উঁচিয়ে ঢাক- ঢোলের তালে মাঠ জুড়ে ছোটাছুটি করে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে বছরের প্রথম দিনেই শুরু হয় আনন্দের যাত্রা, জ্ঞানার্জনের স্পৃহা। আগ্রহ তৈরি হয় শ্রেণির সবগুলো বই আত্মস্থ করার। এটা যে একধরণের আগ্রহ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের মাঝে, তা অন্য কোনো উদ্দীপনার বক্তব্য থেকে তৈরি করা সম্ভব নয়। আবার, শিক্ষকরাও সচেষ্ট হয়ে উঠেন দায়িত্বপালনে। আর অভিভাবকদের মাঝেও জাগে সন্তানের প্রতি নজর দেওয়ার বাসনার। দেশের অনাগত ভবিষ্যৎকে যেসব শিশু-কিশোর নির্মাণ করবে, তাদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করতেই সরকারের সৃজনশীল এই পদক্ষেপ। হিমের পরশমাখা শুভ্র সকালে নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে সারাদেশের শিশু-কিশোররা আনন্দের আকাশে পাখনা মেলে। তাদের চোখেমুখে বিচ্ছুরিত হতে থাকে অজানাকে জানতে চাওয়ার আনন্দ। শিশু-কিশোরদের উল্লাস দেখে অভিভাবক আর শিক্ষকদের মুখেও ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। শিক্ষা-পরিবার ও জাতির জন্য এই দিনটি অনন্য গুরুত্ব বহন করে নিঃসন্দেহে। কেননা এক যোগে সারাদেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের মধ্যেই জ্ঞানপিপাসা মেটানোর উদ্ভাবনী এই উদ্যোগ, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের দারুণ উদ্দীপণা তৈরি করে। দেশের শিক্ষার ইতিহাসে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কেননা, শিক্ষা, জ্ঞানার্জন, সভ্যতার দিক দিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশই হয়তো বাংলাদেশকে অতিক্রম করে গেছে। যুগোপযোগী শিক্ষা হতে আমরা হয়তো এখনও খানিকটা পিছিয়ে। তবে, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে ও আধুনিক শিক্ষায় দক্ষ নাগরিক তৈরিতে আমাদের যে উদ্যোগ, তা পৃথিবীর আর কোনো দেশেই নেই। আর কোনো দেশই পারেনি শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে এত বই বিতরণ করতে। কেবল আমরাই পেরেছি দায়িত্ব নিয়ে সরকারি উদ্যোগে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ তৈরির উদ্যোগ নিতে। একসময় হয়তো আমরা গরিব ছিলাম। কিন্তু তা এখন কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছি। এখন আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাথা উঁচু করে বলতে শিখেছি, আমার দেশের ছেলেমেয়েরা মেধায় দরিদ্র্য নয়। তারা মেধায় বিশ্বমানের। তারা এমনভাবে গড়ে উঠছে যে, তারা বিশ্ব জয় করতে সক্ষম। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালের প্রথম দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎসবের মধ্য দিয়ে চার কোটি ২৬ লাখ ১৯ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে ৩৫ কোটি ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৮২টি বই বিতরণ করা হয়। গত নয় বছর বছরে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝে ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ এক হাজার ৯১২টি বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১০ বছরে ২৯৬ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৯৪টি বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্দেশনায়। এই পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে পৌঁছে দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সফলতার অনন্য রেকর্ড করেছে। এই বিরল কৃতিত্বের অধিকার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও। এ কথা বলা যায় নির্ধিদ্বায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জনের কোনো শেষ নেই। তবে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার অর্জন হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্জন। শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে না পারলে জ্ঞানভিত্তিক জাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকার শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। যেন আমাদের ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর উপযোগী মানসম্মত হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে যেন অবদান রাখতে পারে। যদিও এখন চ্যালেঞ্জের রকমফেরেও পরিবর্তন আসছে। সব জায়গায় ডিজিটাইশেসনের প্রভাব। এখন নতুন বইয়ের প্রভাবে ডিজিটাইজেশনের নেতিবাচক দিককে প্রতিহত করা এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করাটাও আমাদের দায়িত্বের বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশি সংস্কৃতির আধিপত্যে আমাদের শিশুরা যেন হারিয়ে না যায়, তাদের জ্ঞানার্জনের পথে যেন সামান্য বাধাও তৈরি করতে না পারে, তার বড় সিদ্ধান্তটা কিন্তু জানান দেয় এই বিপুল সমারোহের বই উৎসবই। ডোরিমন আর পাতলা মোটুর পৃথিবী যেন বিস্তৃত না হয় আমাদের কচিমনের শিশুদের পড়ার টেবিলে। শোলকবলা কাজলা দিদির গল্পের কথা হয়তো আগের মতো করে নতুন প্রজন্ম জানার সুযোগ পাবে না, তবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস, আমাদের জাতীয় বীর শ্রেষ্ঠ, একুশের অহংকার, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব নানা স্মারক যেন আমাদের শিশু কিশোরদের মনে গ্রথিত হয়, তার চেষ্টাও কিন্তু আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে থাকতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান রক্ষার বিষয়টি সবসময়ই চ্যালেঞ্জের। তবে এসব চ্যালেঞ্জের উত্তোরণে স্বক্রিয় সরকার। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মান উন্নয়নের জন্য সরকার অনেকগুলো প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কলেজ শিক্ষার মান, শিখন ও শিক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিচালনা মান উন্নয়নের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্প। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে সৃজনশীল কর্মসূচি। শিক্ষার্থীরা যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই উন্নত মানসম্পন্ন শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে সেদিকেও নজর রয়েছে সরকারের। কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা যাতে সমাজের সার্বিক পরিবর্তন ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি ও পদক্ষেপ। আর দক্ষতা অর্জন করে বাস্তব জীবনে তা কাজে লাগাতে পারে, এ লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রামও চালু রয়েছে। তবে, একটি কথা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার উন্নয়নে বরাবরই উদার। শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে আগের চেয়ে তিনি বহুগুণ বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এসব প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে মাঠ পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তাদের দায়িত্বপালনে মনোযোগী হতে হবে। সবপর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিতের তৎপরতা বাড়াতে হবে। কেন্দ্র থেকে গৃহীত পদক্ষেপ যদি তৃণমূল পর্যায়ে ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হয়, তবেই বই উৎসবের মতো জ্ঞানী ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে উঠবে। তখন দক্ষতা উৎসব করে আনন্দের পূর্ণতা উপভোগ করার জন্য আয়োজন করা যাবে আরেকটি সার্বজনীন উৎসবের। সে পথেই হাঁটুক আগামীর বাংলাদেশ, বই উৎসব হোক আমাদের প্রেরণার। লেখক: সাবেক সদস্য, পাবলিক সার্ভিস কমিশন,সাবেক ভিসি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এসএইচ/

ভাষার মাস, বইয়ের মাস ফেব্রুয়ারি

১. ফেব্রুয়ারি মাস এসে গেছে। পৃথিবীর সব দেশেই বিশেষ একটা দিবস সেই একটা দিনের মধ্যেই আটকে থাকে। আমরা যেহেতু আবেগের জন্য বিখ্যাত, তাই একটা দিবসকে স্মরণ করে আমরা সারা মাস ধরে সেটি পালন করি। ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস, আগস্ট মাস শোকের মাস এবং ফেব্রুয়ারি মাস হচ্ছে ভাষার মাস। আমি অনেককেই বলতে শুনেছি শুধু আমরাই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। এটি কিন্তু সত্যি নয়। আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন করায় ১৯৬১ সালের মে মাসের ১৯ তারিখ ১১ জনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, তার মধ্যে কমলা নামে ১৬ বছরের একটি মেয়ে ছিল, যে মাত্র আগের দিন তার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ করেছিল। সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল সাউথ আফ্রিকায়, ১৯৭৬ সালের জুন মাসের ১৬ তারিখ, প্রায় সাত’শ স্কুলের ছেলে-মেয়েকে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের ভাষা আন্দোলন থামানোর জন্যে। পৃথিবীর অনেক ভাষা আন্দোলনের মধ্যে আমাদের ভাষা আন্দোলনটি সারা পৃথিবীতেই বিশেষ একটা গুরুত্ব পেয়েছে, ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এবং আমরা যারা বাংলাদেশের মানুষ তারা জানি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনটি দিয়েই আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নের বীজটি বপন করা হয়েছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষার নানা খুঁটিনাটি বিষয় আমাদের মনে পড়ে। একটা সময় ছিল যখন শুধুমাত্র কবি সাহিত্যিক কিংবা ভাষাবিদেরা ভাষা নিয়ে কাজ করতেন। এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রটিতে প্রযুক্তিবিদেরা বাংলা ভাষার জন্যে কাজ করে যাচ্ছেন। কাজেই ভাষার জন্যে অবদান রাখার ব্যাপারে আজকাল প্রযুক্তিবিদদের কেউ হেলাফেলা করতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কী, একটা ভাষা পৃথিবীতে কতো গুরুত্বপূর্ণ সেটা পরিমাপ করার জন্য প্রযুক্তিবিদদের কাছে যেতে হয়। একটা ভাষায় তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক মানুষ কথা বলার পরও সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে পরিচিত হতে পারে (উদাহরণ, ফরাসি ভাষা), আবার একটা ভাষায় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মানুষ কথা বলার পরও সেই ভাষাটি পৃথিবীতে কম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে পরিচিত হতে পারে (উদাহরণ, বাংলা ভাষা।)। তথ্যপ্রযুক্তিবিদেরা যখনই বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলেন তারা ভাষাটিকে কম সমৃদ্ধ (Low Resource) ভাষা হিসেবে বর্ণনা করেন। সে কারণে ভাষাটি এখনো তথ্যপ্রযুক্তিতে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাত্র ভাষা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। এই ভাষার রিসোর্স বাড়ানোর জন্য কিংবা ভাষাটিকে সমৃদ্ধ করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির কিছু প্রয়োজনীয় কলকব্জা তৈরি করার জন্য সরকার থেকে বেশ বড় একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই উদ্যোগটি সফল হলে বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রয়োজনীয় মাল-মসলা কিংবা প্রয়োজনীয় কলকব্জা আমাদের হাতে চলে আসার কথা। ১৬০ কোটি টাকার সেই উদ্যোগটি সত্যি সত্যি হাতে নেওয়া হলে আমরা এরই মধ্যে অনেক কিছু পেয়ে যেতাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা কিছুই পাইনি, এমনকি মাঝে মাঝে সন্দেহ হতে শুরু হয়েছে সত্যিই কিছু পাবো, নাকি অসমাপ্ত প্রজেক্ট হিসেবে টাকাটা ফেরত যাবে, না হয় নষ্ট হবে! আমরা যারা বাংলা নিয়ে কাজকর্ম করি তারা সবাই জানি তথ্যপ্রযুক্তি জগতের মহাশক্তিশালী প্রতিষ্ঠান “গুগল” বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এবং আমরা হাভাতের মতো তাদের কাজের ওপর নির্ভর করে আছি। শুধু যে নির্ভর করে আছি তা নয়, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তাদের সাহায্য করে যাচ্ছি। কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলোর জন্য আমরা যদি তাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে থাকি তাহলে আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি কখনোই দাঁড়া হবে না। কাজেই বাংলা ভাষার প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের আরো অনেক বেশি আগ্রহী হতে হবে। আমাদের মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণার কাজটি আমাদেরই করতে হবে, অন্য কেউ সেটি করে দেবে না। এই বিষয়টা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবো ততই মঙ্গল। ভাষা নিয়েই যেহেতু আলোচনা হচ্ছে আমরা এখানে সবাইকে একটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে পারি। সবাই কী লক্ষ করেছেন আমরা বাংলা কীভাবে লিখবো এটা এখনো ঠিক করতে পারিনি? আমরা যদি বর্ণমালার সবক’টি বর্ণ শিখে নিই তাহলেই কিন্তু আমরা পরিপূর্ণ বাংলা লিখতে বা পড়তে পারি না। পরিপূর্ণ বাংলায় প্রচুর যুক্তাক্ষর আছে এবং বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে সঙ্গে এই যুক্তাক্ষরগুলো শেখা হলেই আমরা বাংলা লিখতে এবং পড়তে পারি। আমরা সবাই এই যুক্তাক্ষরগুলোর সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে এই যুক্তাক্ষরগুলো কিন্তু ভিন্নভাবে লেখা হয়। আমরা অনুমান করতে পারি, স্কুলের পাঠ্যবইয়ের দায়িত্বে যারা আছেন তারা কোনো একটা সময়ে ধারণা করেছেন স্কুলের ছেলে-মেয়েদের জন্য প্রচলিত যুক্তাক্ষরগুলো বেশি ‘কঠিন’ তাদের বিষয়টা আর সহজভাবে শেখাতে হবে। তাই স্কুলের পাঠ্যবইয়ে যুক্তাক্ষরগুলো ভেঙে লেখা হয়, যুক্তাক্ষরগুলো যে বর্ণ দিয়ে তৈরি হয়েছে সেই বর্ণগুলো পাশাপাশি এবং কাছাকাছি লিখে যুক্তাক্ষর তৈরি করা হয়। যদি এটা সর্বজনীনভাবে গ্রহণ করা হতো আমাদের কারও কোনো আপত্তি থাকতো না, আমরা সবাই মেনে নিতাম। কিন্তু এটি সর্বজনীন নয়, এটি শুধুমাত্র স্কুলের পাঠ্যবইয়ের জন্য সত্যি। যার অর্থ আমরা স্কুলের ছেলে-মেয়েদের পরিপূর্ণভাবে বাংলা লিখতে কিংবা পড়তে শেখাই না। তারা বিশেষ একটি রূপে বাংলা পড়তে এবং লিখতে শিখে। অন্যভাবে বলা যায়, আমরা যখন স্কুলের ছেলে-মেয়ের জন্য পাঠ্যবই তৈরি করি, আমরা তখন ধরেই নিয়েছি তারা স্কুলের সেই পাঠ্যবইগুলো ছাড়া জীবনেও অন্য কোনো বাংলা বই পড়বে না। এই পাঠ্যবইগুলো ছাড়া অন্য কোনো বাংলা বইয়ে যুক্তাক্ষর এভাবে লেখা হয় না। কম্পিউটারে বাংলা লেখার জন্য অসংখ্য ফন্ট রয়েছে এবং আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে আরও অনেক ফন্ট তৈরি হবে। কিন্তু যেহেতু পাঠ্যবইয়ে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে বাংলা লেখা হয় সেখানে আমরা যেকোনো ফন্ট ব্যবহার করতে পারি না। পাঠ্যবইয়ে একটি এবং শুধুমাত্র একটি বিশেষ ফন্ট ব্যবহার করতে হয়। (আমরা কয়েকজন মিলে ছয়টি পাঠ্যবই লেখার দায়িত্ব নিয়েছিলাম, আমরা মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি ব্যবহার না করে আধুনিক ইউনিকোডে লেখার চেষ্টা করেছিলাম বলে আলাদাভাবে সেই বিশেষ একটি ফন্ট তৈরি করিয়ে নিতে হয়েছিল!)। আমি যখন শিক্ষাসংক্রান্ত আলোচনার কথা বলার সুযোগ পাই অনেকবার এই বিষয়টিতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারিনি! আমার মনে হয় যারা শিশুদের মনোজগত বিশেষজ্ঞ এবং যারা শিক্ষার বিষয়টি জানেন তারা সবাই মিলে আলোচনা করে এ ব্যাপারটি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তারা পরিষ্কারভাবে আমাদের বলতে পারেন প্রকৃত যুক্তাক্ষর না শিখিয়ে ভিন্ন এক ধরনের যুক্তাক্ষর ব্যবহার করে বাংলা শিখিয়ে আমরা তাদের সাহায্য করছি না ক্ষতি করছি। (আমি বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবে জানি কম বয়সী শিশুরা একসাথে একটি নয় দু’টি নয়, পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা শিখে ফেলতে পারে। যে শিশুদের মস্তিষ্ক এতো জটিল কাজ করতে সক্ষম তারা সত্যিকারের যুক্তাক্ষর ব্যবহার করে বাংলা পড়তে কিংবা লিখতে পারবে না আমার সেটা বিশ্বাস হয় না।) ২. আমাদের ফেব্রুয়ারি মাসটি ভাষার মাস, এর বাইরেও তার আরেকটি পরিচয় আছে, সেটি হচ্ছে, এই মাসটি একই সঙ্গে বই মেলার মাস। এই বই মেলাটি যে শুধু বই বিক্রি করার মেলা তা কিন্তু নয়। সব মিলিয়ে যত বই কেনাবেচা হয় তার পরিমাণটুকু খুব বেশি নয় (আজকাল যেকোনো হিসাব হাজার কোটি টাকা দিয়ে করা হয়, কয়েক হাজার কোটি টাকা চুরি হয়ে গেলেও কেউ বিচলিত হয় না!)। বই বেচাকেনার পরিমাণ যতই হোক না কেন এই মেলাটির গুরুত্ব কিন্তু অনেক বেশি, এটি আমাদের কালচারের একটা পরিচয়। মেলা থেকে কোনো বই না কিনেও একজন এখানে আনন্দে ঘুরে বেড়াতে পারে। লেখকেরা সারা বছর আলসেমি করে কাটিয়ে দিয়ে মেলার আগে নাক-মুখ গুঁজে বই লিখতে বসে। প্রকাশকেরা সারা বছর বই প্রকাশ না করে মেলার সময় এক সঙ্গে সব বই প্রকাশ করেন। পাঠকেরা সারা বছর টাকা জমিয়ে রেখে বই মেলায় এক ধাক্কায় সব বই কিনে ফেলেন। (বই মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ করে সব বই চোখের আড়াল হয়ে যায়, ইন্টারনেটে বই অর্ডার দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।) যতই দিন যাচ্ছে বই মেলার গুরুত্ব ততই বেড়ে যাচ্ছে। তার প্রধান কারণ, সারা পৃথিবীতেই মানুষজনের বই পড়ার অভ্যাস চলে যাচ্ছে। আমরা যখন বড় হয়েছি তখন বই ছিল আমাদের প্রধান বিনোদন, আমরা শৈশবে মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে খেলেছি, বাসায় এসে ঘাড়গুঁজে গল্পের বই পড়েছি। এখন বিনোদনের কোনো অভাব নেই। একেবারে দুধের শিশুটিও ইউটিউবে কার্টুন দেখতে দেখতে তার দুধের বোতল মুখে দেয়। স্মার্টফোন, নোট প্যাড, ল্যাপটপ আর টেলিভিশনের স্ক্রিনের বিনোদন যত তীব্রই হোক না কেন, বই পড়ার সঙ্গে তার কোনো তুলনা নেই। বই পড়া হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কের একটি অসাধারণ প্রক্রিয়া, যেটি আমাদের একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়। মোটামুটিভাবে পৃথিবীর সবাই স্বীকার করে নিয়েছেন নতুন পৃথিবীর সম্পদ হচ্ছে জ্ঞান। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, কল্পনাশক্তি জ্ঞান থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যদি কল্পনা করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে দামি একটা কম্পিউটারের জটিল একটা এলগরিদমের সঙ্গে আমাদের মৌলিক পার্থক্য কোথায়? পৃথিবীর প্রত্যেকটা শিশু এই কল্পনা করার ক্ষমতা নিয়ে জন্ম নেয় কিন্তু যদি সেটার চর্চা করা না হয় সেই অমূল্য ক্ষমতাটি একদিন হারিয়ে যায়। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, তখন শুধুমাত্র একটা বুদ্ধিমান প্রাণী হয়ে যায়! আমি সেই জন্যে বই মেলাটিকে অনেক গুরুত্ব দিই। আমি আশা করে থাকি বাবা মায়েরা তার শিশুসন্তানদের হাত ধরে বই মেলায় আসবেন। শিশুরা বই মেলার অসংখ্য স্টলে সাজানো হাজার হাজার বই দেখে বুকের মধ্যে এক ধরনের শিহরণ অনুভব করবে। নিজের প্রিয় বইটি কিনে বুকের মধ্যে চেপে ধরে রেখে বাসায় ফিরে যাবে। রাত জেগে সেই বইটি পড়ে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাবে। একবার যদি বই পড়ার অভ্যাস করে ফেলে তাহলে সারা জীবনের জন্য আমরা তাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো। সে তখন স্মার্টফোনের জঞ্জালে পা দেবে না, সময় কাটাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে। আজ হোক কাল হোক এটি ঘটবেই। একটি সময় আসবে যখন পৃথিবীর মানুষ আর নিজ হাতে তাদের সন্তানদের ইন্টারনেটের কানাগলিতে ঠেলে দেবে না। তাদের হাত ধরে নিয়ে যাবে বইয়ের অপূর্ব বৈচিত্র্যময় কল্পনার জগতে। লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

অনন্য প্রেরণা কিবরিয়া ভাই 

২৭ জানুয়ারি ২০১৯ শামস কিবরিয়ার ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। এ দিনটি সামনে এলে ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতায় অনেক স্মৃতি এসে ভিড় করে কিবরিয়া ভাইকে নিয়ে। আবেগে আক্রান্ত হই, চোখের কোণে ঝিলিক দিয়ে ওঠে বেদনার অবাধ্য অশ্রু। বহুদিন একসঙ্গে দু`জন কাজ করেছি, পথ চলেছি, ক্ষত-বিক্ষত হয়েছি। আজ কিবরিয়া ভাই নেই- ভাবতেই মনটা কেমন করে ওঠে!        কিবরিয়া ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা হতো না- এমন দিনের কথা আমার মনে পড়ে না। দেখাও হতো ঘন ঘন। সেই ১৯৯১ সাল থেকে তার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ক্রমে বন্ধুত্বে রূপ নিয়েছিল। বইমেলা ২০০৪-এ প্রকাশিত তার বই `চিত্ত যেথা ভয়শূন্য` হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষবারের মতো হবিগঞ্জ যাওয়ার আগের রাতেও ফোনে আমাদের কথা হয়। আমি কিছুটা অনুযোগ করে বলেছিলাম, অসুস্থ শরীরে এত দৌড়ঝাঁপ না করলে হতো না! তিনি বললেন, `এই তো যাব আর আসব।` `মোনায়েম` বলে ডাকতে পারতেন আমাকে, `তুমি`ও বলতে পারতেন বয়সের কারণে। কিন্তু আমাকে তিনি বরাবরই বলতেন `মোনায়েম সাহেব`। সেদিনও বললেন, নির্বাচনী এলাকায় মাঝেমধ্যে যেতে হয়। সবাই প্রত্যাশা করে আমাকে। স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও চাঙ্গা রাখতে হয়। আর আওয়ামী লীগকে তো আন্দোলন-সংগ্রামেই থাকতে হবে। নির্বাচনই তার একমাত্র পথ। খুব যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন কিবরিয়া ভাই। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনতেন। সব কাজ করতেন গুছিয়ে। আমি কিছুটা অগোছালো, আবেগপ্রবণ। কিবরিয়া ভাই মাঝেমধ্যে ঠাট্টা করতেন সংসার করিনি বলে। ভুল-ত্রুটি মার্জনা করতেন। আমিও ভেতরে ভেতরে তার আশ্রয় ও স্নেহের কাঙাল হয়ে পড়েছিলাম। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে দেশের শত শত বিশিষ্টজনের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। কই, কারও সঙ্গে তো এত অল্প সময়ে এত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি! নিজ গুণে তিনি তার পরিবারের একজন সদস্য করে নিয়েছিলেন আমাকে। ২৭ জানুয়ারি রাত ৮টায় যখন সেই দুঃসংবাদ এলো, বিশ্বাসই হচ্ছিল না। ৩১ জানুয়ারি সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ আয়োজিত সেমিনারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সংস্কার বিষয়ে সেখানে তার মূল প্রবন্ধ পাঠ করার কথা। বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি এ নিয়ে সিরিয়াস লেখালেখি করছিলেন। আমি প্রস্তাব করেছিলাম, এ বিষয়ে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে একটা সেমিনারও করি। তিনি রাজি হয়েছিলেন। সেমিনার পেপার তৈরি করলেন। মস্তিস্ক খুব সক্রিয় ছিল। ওই বয়সেও দ্রুত লিখতে পারতেন কিবরিয়া ভাই। তার ইংরেজি লেখাও ছিল চমৎকার। সারাজীবন ইংরেজি ভাষায় লিখতেন দেশে-বিদেশে। চির অভ্যাসমতো তিনি সেমিনার পেপার ইংরেজিতেই তৈরি করে দিয়ে গেলেন। ফোনে তার সঙ্গে সেমিনারের প্রস্তুতি নিয়েও কথা হলো। কিন্তু সিরডাপ মিলনায়তনে ৩১ জানুয়ারি সেমিনার আর করা হয়নি। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল কিবরিয়া ভাইয়ের নেতৃত্বে। তার ইচ্ছায় আমি ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদের দায়িত্ব নিই। ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার ১০ বছরে অসংখ্য সেমিনার করেছি। মনোগ্রাফ, পুস্তক-পুস্তিকাসহ ১৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে ফাউন্ডেশন থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ওপর ২২ পর্বের সিডি নির্মিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনীগ্রন্থ প্রকল্পের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজও সম্পন্ন করেছি আমরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের (প্রতিরোধ শিবির, মুজিবনগর সরকার ও শরণার্থী শিবির) ওপর তিনটি থিমেটিক ম্যাপ, আরও কত কী! কত স্মৃতি, কত কথা! ভাবতে গেলে এই বয়সেও বারবার শিশুর মতো কেঁদে উঠি। সফল আমলার জীবন শেষে ১৯৯১-এ তার আওয়ামী লীগে যোগদানের পেছনে আমারও যৎসামান্য ভূমিকা ছিল। শেখ হাসিনা তাকে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করতে দ্বিধা করেননি। তিনি সভানেত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা পদের দায়িত্বে আসীন হন তার মেধা ও প্রজ্ঞার গুণে। ১৯৯৬ ও ২০০১-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় দলের পক্ষ থেকে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আমিও নির্বাচন পরিচালনা কাজে যুক্ত ছিলাম। সেই সময় রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে অধিকাংশ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তার নেতৃত্বেই আমরা গিয়েছি। প্রেস মিট করেছি। দেখেছি তার বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, বলার ও বোঝানোর ক্ষমতা। ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসে আওয়ামী লীগ তাকে অর্থমন্ত্রী বানিয়ে যে ভুল করেনি, গোটা জাতি এখন স্বীকার করে। আমি অর্থনীতি ভালো বুঝি না। কিন্তু কিবরিয়া ভাই যখন বলতেন, পার্লামেন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতেন কিংবা মৃদুভাষণে বসে বিভুরঞ্জন বা হাসান মামুনকে ব্রিফ করতেন, আমার কাছে খুব সহজবোধ্য মনে হতো। `মৃদুভাষণ` বের করার সময় তিনি আমার ওপরই নির্ভর করলেন বেশি। বললেন- যাদের নেওয়া হলো, আপনিই তো তাদের ভালো করে চেনেন। আমি হয়তো কাজের মধ্য দিয়ে চিনব। তিনি অল্পদিনেই তাদের চিনলেন, তাদের যোগ্যতায় আস্থা রাখলেন। মৃদুভাষণ অফিসে এলে প্রায়ই আমাকে যেতে বলতেন। বিদেশে গেলে বলতেন, আপনি সব দেখবেন। নিজের চেয়ার দেখিয়ে বলতেন, আপনি এখানে বসবেন। আমি দেখতাম না তেমন কিছুই। যারা কাজ করে, তারাই দেখত। তারাও দ্রুত বুঝে নিয়েছিল তাদের সম্পাদককে। আমি জানি, অমন মর্মান্তিকভাবে তাকে হারিয়ে মৃদুভাষণ পরিবার কতটা বেদনার্ত। প্রিয় সম্পাদককে নিয়েই এখন তাদের লিখতে হচ্ছে। আর আমাকে ৩১ জানুয়ারির সেমিনারটি বাতিল ঘোষণা করে পত্রিকায় প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়েছিল। দারুণ প্রত্যয়ী হয়ে তিনি লিখতেন, বক্তৃতা করতেন। হবিগঞ্জে জীবনের শেষ যে বক্তৃতা করেছেন, তাতেও রয়েছে সেই প্রত্যয়ী মনোভাব। `বাংলাদেশের সামাজিক বিবর্তন কি পশ্চাৎমুখী?` শিরোনামে তার শেষ যে অসমাপ্ত লেখাটি পাওয়া গেছে, তা পড়লে বোঝা যাবে তার উৎকণ্ঠা। দেশের মানুষও তো উৎকণ্ঠিত। মৃদুভাষণ লিখেছে- `উদ্বিগ্ন মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। তাকে বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া হলো না।` কিন্তু দেখতে তো পাচ্ছি, শামস কিবরিয়ার মৃত্যু গোটা জাতিকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিদেশেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তার মতো একজন সজ্জন মানুষকেও যদি এভাবে হত্যা করা হয়, তাহলে এ দেশে কে নিরাপদ? দেশের ভবিষ্যৎই-বা কী? মেধাবী ছাত্র, রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র সচিব, অর্থনীতিবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী- এসব অভিধা ছাড়িয়ে তিনি একজন প্রাজ্ঞ দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দার্শনিক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উদ্বেলিত হয়েছে জাতি ও বিশ্ব জনমত। মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে নেমে এসেছে রাস্তায়। সরব প্রতিবাদও জানানো হয়েছে একের পর এক হরতাল করে। দেশের বিশিষ্টজন নতুন করে নেমে এসেছেন প্রতিবাদে। শাহ এএমএস কিবরিয়ার মতো মানুষের হত্যাকাণ্ডে তারা বুঝতে পেরেছেন, দেশ কোনদিকে যাচ্ছে। ঘরে ঘরে কান্না। মানুষের শোকে-অশ্রুতে মহীয়ান হয়ে উঠেছে কিবরিয়া ভাইয়ের আত্মদান। আমরা তার প্রিয়জনরাও শোক ভুলে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার অবকাশ পাচ্ছি যেন। কিবরিয়া পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে আসমা ভাবিও আজ প্রয়াত। ড. রেজা ও ড. নাজলী শোককে শক্তিতে পরিণত করে দেশে-বিদেশে যে সাহসী প্রতিবাদী ভূমিকা রেখেছে, তা কিবরিয়া ভাইয়ের আপসহীন সংগ্রামী ভূমিকারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। শাহ এএমএস কিবরিয়া স্মরণে দেশে-বিদেশে শোক সভা, প্রতিবাদ সভা, সমাবেশ, মিছিল, হরতাল, মৌন মিছিল, রক্তের অক্ষরে শপথের স্বাক্ষর অভিযানে লাখ লাখ স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছে। সর্বোপরি গ্রেনেড হামলায় কিবরিয়া ভাই নিহত হওয়ার পর দেশে-বিদেশে পত্রপত্রিকায় ও সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবীবৃন্দ যেসব সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন, তার সংখ্যা আমার সংগ্রহেই রয়েছে দুই শতাধিক। কিবরিয়া ভাই আদর্শ ও লক্ষ্যে ছিলেন অচঞ্চল। কি দেশে, কি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার মেধা, প্রজ্ঞা ও গুণের কথা কারও অবিদিত নয়। কর্তব্যনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ এই ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সব বোদ্ধা নারী-পুরুষের মনে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। উত্তর আকাশের উত্তর মেরুবিন্দুর নিকটতম নক্ষত্র ধ্রুবতারার মতো তার স্থির অবস্থান। সমাজ ও মানুষকুলের জন্য এক অনন্য প্রেরণা। অথৈ সমুদ্রে দিকহারা নাবিক অথবা গভীর অরণ্যে পথহারা পথিক যেমন ধ্রুবতারার অবস্থান দেখে সঠিক দিক নির্ণয় করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়, তেমনি ধ্রুবতারাসম কিবরিয়া ভাইয়ের লক্ষ্য ও আদর্শ আমাদের নিরন্তর প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ২০০৫-এর সূচনায় প্রিয় কিবরিয়া ভাইয়ের মৃত্যু, ক্ষণজন্মা কিবরিয়ার আত্মদান জাতিকে স্বাধীনতার মূলধারায় অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে পুনঃস্থাপনে শক্তি জোগাবে- এ বিশ্বাসই এখন আমাদের পথ দেখাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসীন। এই সরকারের আমলে জাতির পিতার হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পৃথিবীব্যাপী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা চাই, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের নৃশংস গ্রেনেড হামলার বিচারের মতো কিবরিয়া হত্যার বিচার করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশে অনন্য নজির সৃষ্টি করবে। গবেষক ও রাজনৈতিক কর্মী এসি    

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সেকাল একাল

দেশে আগামী ২ ফেব্রুয়ারী থেকে এস.এস.সি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থীর কাছে এটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি ব্যক্তির মনে দৃঢ় ভাবে গেঁথে থাকে এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোর কথা। চট্টগ্রামের সেই উপজেলা (তৎকালীন থানা) সদরে অবস্থিত বিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা আমি ও ভুলতে পারিনি। পূর্বকথা- পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে চালু হয়েছিল ব্রিটিশদের উদ্যোগে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত রীতি অনুসারে ১০ বছরের স্কুল পাঠক্রম শেষ করার পর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা বা এস.এস.সি নামে প্রথম পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো এদেশের শিক্ষার্থীদের। ২০০৯ সালে প্রবর্তিত নতুন শিক্ষানীতির আওতায় ওই বছর থেকে পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণশেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নামে একটি নতুন পাবলিক পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। পরের বছর থেকে চালু হয়েছে ৮ বছরের নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষাশেষে অনুষ্ঠেয় জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা বা জে.এস.সি। শুরুতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এই পরীক্ষা পরিচালিত হতো। ১৮৫৭ সালে কলকাতা, মাদ্রাজ (চেন্নাই) এবং বোম্বেতে (মুম্বাই) বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা (পরবর্তী সময়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা নামে অভিহিত) পরিচালনার দায়িত্ব এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অর্পিত হয়। ম্যাট্রিক সার্টিফিকেট দুটি উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহ্রত হতো: প্রথমত, সরকারি চাকুরি প্রাপ্তি এবং দ্বিতীয়ত, কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ। একটি সুষ্ঠু শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সরকার ১৯১৭ সালে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন লীডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জনাব ডক্টর মাইকেল ই স্যাডলার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন বা স্যাডলার কমিশন নামে বহুল পরিচিত এই কমিশন দীর্ঘ ১৭ মাস কাজ করে ১৯১৯ সালে এর সুপারিশমালা প্রকাশ করে। http://lib.banbeis.gov.bd/BANBEIS_PDF/CUC.1917-19.V-VI.pdf কমিশনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ছিলেন ডক্টর গ্রেগরি, প্রফেসর রামসে ম্যুর, স্যার হার্টগ, ডক্টর হর্নিয়েল, ডক্টর জিয়াউদ্দীন আহমেদ, ও স্যার আশুতোষ মুখার্জি। কমিটির কার্যপরিধি ছিল "কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা এবং সম্ভাবনার অনুসন্ধান" ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি বোর্ড প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল উক্ত কমিশনের সুপারিশসমূহের মধ্যে অন্যতম। স্যাডলার কমিশনের সুপারিশমালার ভিত্তিতে ১৯২১ সালে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা শহরের সকল কলেজকে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে রূপান্তর করা হয় এবং এসব কলেজসহ মাধ্যমিক ইংরেজি বিদ্যালয়সমূহ ঢাকা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তৎকালীন বাংলা ও আসাম প্রদেশের ইসলামি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত সকল ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট এবং ম্যাট্রিক স্তরের পরীক্ষা একটি অ্যাডভাইজারি বোর্ডের মাধ্যমে জনশিক্ষা পরিচালক (ডিপিআই) কর্তৃক পরিচালিত হতো। ভারত বিভাগ এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বিলুপ্ত করে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ববঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হয়। এই বোর্ডের অধীনে পূর্ববঙ্গের মাধ্যমিক শিক্ষা ন্যস্ত হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অর্পণ করা হয় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাসহ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব। ১৯৫৫ সালে পূর্ববঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।১৯৬১ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পাকিস্তানের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে পুনরায় বোর্ডসমূহের ওপর ন্যস্ত হয়। এ ব্যবস্থা অনুযায়ী সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় ঢাকা বোর্ডের ওপর। পরে এর নাম আবার পরিবর্তিত হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড নামে অভিহিত হয়।পরবর্তী সময়ে স্কুল ও ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নতুন বোর্ড স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬২ সালে ঢাকার বাইরে তিনটি প্রশাসনিক বিভাগ রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনায় তিনটি মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বোর্ডসমূহ রাজশাহী, কুমিল্লা ও যশোরে অবস্থিত। ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রামে আরেকটি বোর্ড স্থাপিত হয়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সিলেট ও বরিশাল ও রংপুর বিভাগের দিনাজপুরে বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ময়মনসিংহ বোর্ড ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসমূহ তাদের এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা নামে একটি ধর্মীয় শিক্ষার ধারা বিদ্যমান। এই ধারায় এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষার সমমানের পাবলিক পরীক্ষা যথাক্রমে দাখিল ও আলিম নামে অভিহিত। অনুরূপভাবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষার নাম যথাক্রমে ফাজিল ও কামিল। মাদ্রাসা শিক্ষার এই পরীক্ষাসমূহ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড নামে একটি স্বতন্ত্র বোর্ড-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান, ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করা হয়। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষার ক্ষেত্রে কয়েক প্রকার ডিগ্রি, ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত হয় ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট পর্যায়ের পরীক্ষাসমূহ। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও কাজ শুরু করে ১৯৬৯ সাল থেকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে এই বোর্ডসমূহ স্বায়ত্তশাসিত। ২০০১ সালের আগে পাবলিক পরীক্ষাসমূহের ফলাফল পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে গৃহীত স্কোরের মাধ্যমে প্রকাশ করা হতো। সাধারণত একজন পরীক্ষার্থী গড়ে ৩৬% নম্বর পেলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বলে গণ্য করা হতো। একজন পরীক্ষার্থী ৩৬% থেকে ৪৫%-এর কম নম্বর পেলে তৃতীয় বিভাগ, ৪৫% থেকে ৬০%-এর নিচে পর্যন্ত নম্বর পেলে দ্বিতীয় বিভাগ এবং ৬০% বা তদূর্ধ্ব নম্বর পেলে প্রথম বিভাগ প্রাপ্তির সনদ প্রদান করা হতো। ৭৫% বা তদূর্ধ্ব নম্বরপ্রাপ্ত পরীক্ষার্থীদের স্টার মার্কস (তারকা চিহ্নিত মার্কস) প্রাপ্ত বলে গণ্য করা হতো এবং মার্কস স্কোরিং বা প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে একটি মেধা তালিকা প্রস্ত্তত করা হতো। ২০০১ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে এবং ২০০৩ সাল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এ পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ বা তদুর্ধ্ব নম্বর পেলে জিপিএ-৫, ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশ নম্বর পেলে জিপিএ-৪, ৬০ থেকে ৬৯ শতাংশ নম্বর পেলে জিপিএ-৩.৫, ৫০ থেকে ৫৯ শতাংশ নম্বর পেলে জিপিএ-৩, ৪০ থেকে ৪৯ শতাংশ নম্বর পেলে জিপিএ-২ এবং ৩৩ থেকে ৩৯ শতাংশ নম্বর পেলে জিপিএ-১ প্রাপ্তির সনদ দেওয়া হয়। পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে স্কলারশিপ প্রদান করা হয়ে থাকে।দেশে প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় কেবল মুখস্থ করার মাধ্যমে ভাল ফল লাভের প্রবণতা দেখা যায় এবং এতে শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধার প্রতিফলন না ঘটায় এসএসসি পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রচুর আলোচনা সমালোচনা থাকলেও সৃজনশীল পদ্ধতি একটি বহুল স্বীকৃত পদ্ধতি হিসাবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞের নিকট সমাদৃত।উদ্ধৃতিঃ বাংলাপেডিয়া(লেখকঃ যুগ্ম সচিব, শিক্ষা মন্ত্রনালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)এসএ/আআ    

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ছিল গৌরবের

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরপরই বাঙালিরা বুঝেছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দেবে না। ষড়যন্ত্র করে, হামলা-মামলা দিয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে তারা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। ভাষার জন্য সংগ্রাম, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম, শিক্ষার জন্য সংগ্রাম, বৈষম্য অবসানের জন্য সংগ্রামের পথেই এসেছিল ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান। স্বাধীনতা আন্দোলনের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান একটি মাইলফলক। এই অভ্যুত্থান হলো শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, বিদেশি প্রভুত্বের বিরুদ্ধে, সব ধরনের অনাচার, অন্যায় আর লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে একযোগে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। যার ফলে পতন ঘটে আইয়ুব খানের। স্বৈরশাসনের নাগপাশ থেকে শোষিত-বঞ্চিত দেশকে মুক্ত করতে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান যে ভূমিকা রেখেছিল, জাতির জীবনে তা অবিস্মরণীয়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানের শাসন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করতে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু। এতে স্বাধিকার আন্দোলনের গতি তীব্র হলে পাকিস্তানি শাসকরা একে নস্যাৎ করতে ছয় দফাকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে শেখ মুজিবকে বন্দি করে এবং ছয় দফার আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন শুরু করে। ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি ও সামরিক-বেসামরিক অন্য ৩৪ জনকে আসামি করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে আইয়ুব সরকার। ফলে ছয় দফার পক্ষে এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহর এবং গ্রামের শ্রমিক-কৃষক ও নিম্ন আয়ের পেশাজীবীসহ বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের মধ্যে। আইয়ুব খানের পদত্যাগের দাবি তুলে পাকিস্তানের সব অংশের মানুষ একযোগে পথে নামে। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে দেশের ছাত্রসমাজ আইয়ুবের স্বৈরশাসন উৎখাতের জন্য আন্দোলনকে দিন দিনই বেগবান ও বিস্তৃত করেছিল। ডাকসুর তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজ জোটবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রনেতারা ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে এবং তাদের ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১১ দফার মধ্যে ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত ছয় দফার সঙ্গে ছাত্র সমস্যাকেন্দ্রিক দাবিদাওয়ার পাশাপাশি কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থসংক্রান্ত দাবিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বস্তুত ১১ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্রনেতারা যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি আন্দোলনগত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় থেকেই শেখ মুজিবের মুক্তি ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ছাত্ররা দেশব্যাপী সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ডাক দেয় এবং পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী কর্তৃক ছাত্র-জনতার ওপর বর্বর নির্যাতন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী পূর্ণ হরতাল পালনের আহ্বান জানায়। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছাত্র-জনতার সক্রিয় সহযোগিতায় সেদিন পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সেদিন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা ছিল। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। আসাদের মৃত্যু সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে শহরে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। আসাদের জীবনাহুতির মধ্য দিয়ে অধিকারহারা জনতার মুমূর্ষু অন্তর যেন মৃত্যুঞ্জয়ী শক্তির বিজলি স্পর্শে জেগে উঠেছিল। অপ্রত্যাশিত এই মর্মান্তিক সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা মেডিক্যাল কলেজের দিকে ছুটে আসেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে উত্তোলন করা হয় একটি কালো পতাকা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় বিরাট শোক মিছিল। পরের দিন ২১ জানুয়ারি হরতাল পালিত হয় এবং পল্টন ময়দানে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লক্ষাধিক লোক নগ্নপদে মৌন মিছিল বের করে রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। আসাদের মৃত্যুতে ডাকসু ভিপি ও সংগ্রাম পরিষদের মুখপাত্র হিসেবে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন তোফায়েল ভাই। ২২ জানুয়ারি কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৩ তারিখ মশাল মিছিল আর ২৪ তারিখ ২টা পর্যন্ত হরতাল। কর্মসূচির শেষ দিনটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। ২৪ তারিখের হরতালে সকাল থেকে ছাত্র-জনতা নেমে আসে ঢাকায়। বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ। সচিবালয়ের পাশে আবদুল গণি রোডে মন্ত্রীর বাড়িতে আক্রমণ, পুলিশের গুলিতে নবকুমার ইনস্টিটিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর এবং আলমগীর মনসুর, রুস্তম আলী ও জানু মিঞা নিহত হলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঢাকার সব মানুষ যেন বিক্ষোভে নেমে আসে রাজপথে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলল ঢাকায়। দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ অফিসে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এমএনএ লস্করের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বিচারপতি এস এ রহমানের বাড়িতে আক্রমণ হলে তিনি লুঙ্গি পরে পালান। আমি তখন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। ঢাকার এই আন্দোলনের দাবানল সেখানেও পৌঁছে গিয়েছিল। আমি অন্যান্য ছাত্রনেতার সঙ্গে সেই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলাম। উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সামনে থেকে সেনাপতির ভূমিকা পালন করেছেন আজকের তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদ ভাই। তা ছাড়া নাজিম কামরান চৌধুরী, সিরাজুল আলম খান, শামসুদ্দোহা, সাইফুদ্দীন আহমেদ মানিক, মোস্তাফা জামাল হায়দার, খালেদ মোহাম্মদ আলী, আবদুর রউফ, মাহবুব উল্লাহ, মাহবুবুল হক দোলন, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরীসহ অন্যান্য ছাত্রনেতার (কারো নাম বাদ পড়লে তা অনিচ্ছাকৃত) ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ওই দিন পল্টনে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। মানুষ, মানুষ আর মানুষ। বিকেল ৩টার পর পাকিস্তানি শাসকরা জারি করে সান্ধ্য আইন। মানুষ তা অমান্য করে বানের স্রোতের মতো নেমে আসে রাজপথে। ঘটে যায় গণ-অভ্যুত্থান। এবং সেই অভ্যুত্থানের ব্যাপকতা এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে স্বৈরাচারী সরকার একুশে ফেব্রুয়ারি সাজানো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। এবং তারই ধারাবাহিকতায় ২২ ফেব্রুয়ারি গণদাবির জোয়ারে এই মামলার প্রধান আসামি দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাগারে আটক প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য আসামিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় আইয়ুব সরকার। শুধু তা-ই নয়, গণ-অভ্যুত্থানের জোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে শেষাবধি ২৫ মার্চ পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ হিসেবে খ্যাত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলার জনগণের মধ্যে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। বাঙালি শুধু নিজেদের স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্যে থেমে না থেকে ক্রমান্বয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানি শাসকদের হটিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি