ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ৩:৫১:০৩

নুর আহমেদ ছিলেন শ্রমজীবী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু

মৃত্যু মানুষের জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি হলেও কিছু কিছু মৃত্যু আপনজনদের দারুণভাবে নাড়া দেয়। মৃত্যুবরণকারী যদি রাজনৈতিক নেতা হন, তাহলে তা শুধু পরিবার-পরিজনে সীমিত থাকে না- তার ঢেউ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মনেও লাগে। হঠাৎ করে যে ত্যাগী রাজনীতিকের জীবন প্রদীপ নিভে গেলো তিনি হলেন-শ্রমজীবী মানুষের বিশ্বস্ত ও নির্ভরশীল নেতা, গরীব-দুঃখী মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক, একসময়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে (সীতাকুণ্ড বাকশালের সাধারণ সম্পাদক) আমার অগ্রজ সহযোদ্ধা ও অভিভাবক, সীতাকুণ্ডের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্লাটুন কমান্ডার, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক,বীরমুক্তিযোদ্ধা নুর আহমেদ (৮০)। গত ৫ডিসেম্বর সকালে তিনি চমেক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ৪ মেয়ে ২ ছেলেসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মৃত্যুর দিন বিকেলে সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রথম নামাজে জানাজা ও সন্ধ্যায় নিজগ্রাম সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় জানাজাশেষে পারিবারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয়মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা নুর আহমেদকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর আগে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ সদস্য আ ম ম দিলসাদের সঞ্চালনায় মরহুম নুর আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের ওপর আলোকপাত করে বক্তৃতা করেন স্থানীয় এমপি দিদারুল আলম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ সালাম, সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল বাকের ভূঁইয়া, সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এস এস আল মামুন, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায়, সীতাকুণ্ড উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলীম উল্রাহ ও মরহুম নুর আহমেদের ছোটভাই সৌদি আরব প্রবাসী সাংবাদিক ইউছুফ খান। শ্রমিকনেতা নুর আহমেদ, আমাদের সবার প্রিয় নুর আহমেদ। সীতাকুণ্ডের এক সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তিনি। সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক-কর্মচারিদের যিনি ছিলেন অত্যন্ত আপনজন ও সুখ-দুঃখের সাথী। শ্রমজীবী মানুষের এ প্রিয় নেতাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে এরশাদ সরকারের আমলে শ্রমিক-জনতা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলসড়ক অবরোধ তৈরি করে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিলে তখনকার শাসকগোষ্ঠী তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বাড়বকুণ্ডের প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ (যেখানে তিনি চাকরি করতেন) থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ড সদরের বর্ণালী ক্লাব ও সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিতের কাকার মালিকানাধীন ইউনাইটেড ফার্মেসির দোতলায় ছিল তার বসারস্থান। শিল্প-কারখানার শ্রমিক-কর্মচারিসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ নানা সমস্যা নিয়ে নুর আহমেদ ভাইয়ের কাছে ছুটে আসতো। মনোযোগ সহকারে তিনি সবার কথা শোনতেন এবং সাধ্যমতো তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। তার মধ্যে কোনও ছলচাতুরি ছিল না, ছিল না কোনও ভণ্ডামি। অত্যন্ত সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শবান নেতা ছিলেন তিনি। নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন বরাবরই আপোসহীন ও অটল। ১৯৮৮ সালে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করার কথা। কিন্তু কেন্দ্রবন্ধ করে জালভোট দ্বারা প্রতিপক্ষ শাসকদল সমর্থিত প্রার্থী তাকে পরাজিত করে। একইভাবে ভোট নেওয়ার তারও শক্তি-সামর্থ সবই ছিল কিন্তু তিনি অনিয়মের আশ্রয় নেননি। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘দু’নম্বরী করে আমার উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার কোনও দরকার নেই।’ স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনসহ রাজনীতির কঠিন সময়ে নুর আহমেদভাই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ছিলেন সীতাকুণ্ড বাকশালের সাধারণ সম্পাদক। তারই নেতৃত্বে সৈয়দপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ মঞ্জু ও আমি (মোহাম্মদ ইউসুফ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সীতাকুণ্ড উপজেলা জাতীয় ছাত্রলীগ) বাকশালকে সীতাকুণ্ডে সাংগঠনিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাপক শ্রম-মেধা ব্যয় করেছিলাম।সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কর্তৃক বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়ে আমাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।রাজনীতির এ দুঃসময়ে নুর আহমেদভাই ছিলেন আমাদের ছায়ার মতো। দলীয় নেতা-কর্মীদের সাহস ও অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন তিনি। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সংগ্রামী চেতনা ও অসীম সাহস আমাদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করতো। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও বাকশাল একিভূত হওয়ায় রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যায়। কাছ থেকে দেখা সহজ-সরল এ মানুষটি আগাগোড়াই ছিলেন রাজনীতিক। চট্টগ্রাম অঞ্চলে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়সহ প্রতিটি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিজ বিত্তবৈভবের কথা চিন্তা না করে জীবনের বেশিরভাগ সময় রাজনীতির জন্যে ব্যয় করেছেন; মানুষের জন্যে কাজ করেছেন। ভোগের চেয়ে ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে তিনি গণমানুষের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। ত্যাগের মহিমায় তিনি ভাস্বর হয়ে ওঠেছিলেন। জীবনের শেষসময়ে এসে অসুস্থ রাজনীতির হিসাব নিকাশ মেলাতে না পেরে তিনি মানসিক যাতনায় ভোগতেন। নিজের মতো করে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করতে না পেরে চরম হতাশার কথা ব্যক্ত করতেন রাজনৈতিক সতীর্থদের কাছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার যৌক্তিক পরিণতি না ঘটলেও মৃত্যুর একদিন আগেও মধ্যরাত পর্যন্ত দলীয় নেতাদের নিয়ে সীতাকুণ্ডের আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পরদিন সকালে হঠাৎ হার্টস্ট্রোক করে দলীয় নেতা-কর্মী ও পরিবারের সদস্যদের শোকসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে চিরতরে বিদায় নিলেন। পরিশেষে প্রয়াত নুর আহমেদভাইয়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। লেখকঃ প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী

নির্বাচনী টুকিটাকি এবং বাড়াবাড়ি

দ্রুত নির্বাচন এগিয়ে আসছে এবং আমরা সেই নির্বাচনের উত্তেজনা এবং তাপ অনুভব করতে শুরু করেছি। তবে সেই উত্তেজনা এবং তাপের প্রায় পুরোটুকুই আসছে রাজনৈতিক দল এবং মনোনয়ন প্রত্যাশীদের থেকে। সাধারণ ভোটারদের ভেতর আপাতত এক ধরনের কৌতুহল এবং কারো কারো ভেতর এক ধরণের শংকা ছাড়া অন্য কিছু কাজ করছে বলে মনে হয় না। আমি সব সময়েই আশা করে থাকি যে, একটি সময় আসবে যখন ভোট নিয়ে আমাদের আগ্রহ এবং কৌতুহল থাকবে কিন্তু কোনো শংকা থাকবে না। কারণ আমরা আগে থেকে জানব, যে দলই আসুক সেই দলই হবে অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক প্রগতিশীল এবং দেশ প্রেমিক, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই স্বপ্নে বিশ্বাসী। তখন দিনের বেলা ভোট দিয়ে আমরা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যাব, ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে আমরা দেখব কারা এই বছর সরকার গঠন করছে! এ বছরে নির্বাচনের শুরুতে যে বিষয়টা আলাদা ভাবে সবার চোখে পড়েছে সেটি হচ্ছে বড় দল থেকে নির্বাচন করার আগ্রহ। বড় দলের তিনশ সিটের জন্য চার হাজার থেকে বেশি মনোনয়ন প্রত্যাশী। এমন নয় যে একটি ফর্ম পূরণ করে জমা দিলেই হয়ে গেল, এর জন্যে রীতিমত ভালো টাকা খরচ করতে হয়, তারপরও প্রার্থীর কোনো অভাব নেই। প্রার্থীরা যে একা আসছেন তাও নয় রীতিমত দলবল নিয়ে আসছেন, পার্টি অফিস এবং তার আশে পাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য। ক্ষমতা দেখানোর জন্য মারামারি গাড়ি পোড়ানো কিছুই বাকী নেই। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় হেলমেট পরে মারামারি করার একটা নূতন ধারা শুরু হয়েছে, মনে হয় এখন থেকে আমরা প্রায়ই এটা দেখতে পাব। (সরকারি দল না হলে অবশ্যই এই টেকনিক ভালো কাজ করে না, পুলিশ ধরে ফেলতে পারে, তখন এক ধরনের বেইজ্জুতি হয়!) প্রশ্ন হচ্ছে সাংসদ হওয়ার জন্যে সবার এতো আগ্রহ কেন? যদি এরকম হতো যে একটা আদর্শের ধারক হয়ে দেশ সেবার জন্যে আগ্রহ তাহলে অবশ্যই আমরা খুশি হতাম। কিন্তু মনে হচ্ছে ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয়, সাংসদ হতে পারলে অনেক ক্ষমতা এবং সেই ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থবিত্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য চলে আসে এবং সেটাই মূল আগ্রহ। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত সেটা নিয়ে দু:খ করে বলেছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী হতে হলে সেই বিষয়ে লেখাপড়া করতে হয়, কিন্তু সাংসদ হতে হলে কিছ্ইু করতে হয় না। সারা জীবন ব্যবসা করে, না হয় আমলা থেকে রিটায়ার করার পর কোনো দলের টিকেট নিয়ে সাংসদ হয়ে যাওয়া যায়! আমি তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত, আমিও মনে করি যিনি সারা জীবন নিজের এলাকায় রাজনীতি করেছেন, একেবারে তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন শুধু তাদেরই মনোনয়ন পাওয়া উচিৎ। মনোনয়ন দেওয়ার পর যারা মনোনয়ন পাননি তাদের কর্মকাণ্ড আরেকটি দর্শনীয় বিষয় ছিল। একজন মনোনয়ন না পেয়ে যদি বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করেন আমি সেটা পর্যন্ত বুঝতে পারব। কিন্তু মনোনয়ন না পেয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে রাস্তা ঘাট বন্ধ করে সবকিছু অচল করে দেওয়ার ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতে পারি না। যিনি দলের মনোনয়ন না পেয়ে নিজের এলাকার মানুষকে জিম্মি করে ফেলেন, তিনি নিজের মানুষের জন্যে কী কাজ করবেন অনুমান করা খুবই কঠিন। শুধু তাই নয়, যারা একটু চালাক-চতুর তারা ঝটপট ফুল হাতে অন্য দলে যোগ দিয়ে সেখান থেকে মনোনয়ন নিয়ে যাচ্ছেন। নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না। রাজনৈতিক আদর্শ বলে তাহলে কিছু নেই? এতোদিন আমরা নিয়োগ বাণিজ্য বলে একটা কথা শুনে এসেছি, আমাদের মতো ‘সৌভাগ্যবান’ মানুষ সেগুলো অল্প বিস্তর দেখেও এসেছি। এই বছর আমার শব্দ ভাণ্ডারে ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ নামে একটা নূতন শব্দ যোগ হয়েছে! নিজের রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দলের কর্তা ব্যক্তিদের ঘুষ দেওয়া হচ্ছে মনোনয়ন বাণিজ্যের কার্য পদ্ধতি। জাতীয় পার্টি এই নূতন অভিযোগে অভিযুক্ত। যিনি ঘুষ দিয়েও মনোনয়ন পাননি তিনি স্বয়ং এই অভিযোগ করেছেন আমার হিসেবে একেবারে ‘হই হই কাণ্ড রই রই ব্যাপার’ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেরকম কিছু দেখছি না। কিংবা কে জানে রাজনীতির বেলায় এগুলো নেহায়েতই স্বাভাবিক ব্যাপার, আমাদেরই কমনসেন্সের অভাব বলে বুঝতে পারছি না। ‘স্বশিক্ষিত’ বলে আরেকটা নূতন শব্দের সঙ্গে এবারে পরিচিত হলাম। এতোদিন জেনে এসেছি যে কোনো শিক্ষিত মানুষই হচ্ছে স্বশিক্ষিত, কারণ শিক্ষার কোনো ট্যাবলেট নাই, যেটা পানি দিয়ে খেলেই আমরা শিক্ষিত হয়ে যাই। সবারই নিজের লেখাপড়া করতে হয় শিখতে হয় এবং স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে হয়। শিক্ষিত মানুষ মানেই স্বশিক্ষিত মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলে একজন সম্ভবত সেটা জানাতে সংকোচ বোধ করেন সে জন্যে এই শব্দটি ব্যবহার করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেই একজনকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে রাজী নই। ম্যাক্সিম গোর্কীর ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে অসাধারণ একটি বই আছে, বইটি পড়ার সময় আমি ভেবেছিলাম সেটি তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কাহিনী। পড়ার পরে বুঝেছিলাম তিনি মোটেও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেননি। এই পৃথিবীটা ছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়, তিনি পৃথিবীতে তার কঠোর একটা জীবন থেকে সবকিছু শিখেছিলেন। যারা রাজনীতি করেন, প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই কিন্তু আজীবন গণ মানুষের সঙ্গে থেকে কাজ করেছেন সেটি আমার কাছে বিন্দুমাত্র অগৌরবের কিছু নয়। নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। সবাইকে নিজের ধন সম্পদের বর্ণনা দিতে হচ্ছে। আমি খুবই আগ্রহ নিয়ে সেগুলো পড়ছি। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে কাজেই দশ বছর আগে একজনের যত ধন সম্পদ যত ছিল এতোদিনে সেটা বাড়তেই পারে। কিন্তু যখন দেখি দশগুণ বেড়ে গেছে তখন একটু চমকে উঠি। তবে যখন দেখি স্বামী বেচারা এখনো টেনে টুনে দিন কাটাচ্ছে, কিন্তু স্ত্রীর ব্যাংকে টাকা রাখার জায়গা নেই- তখন একটুখানি কৌতুক অনুভব করি। আশা করছি, স্ত্রীরা বিপদে আপদে তাদের স্বামীদের টাকা পয়সা দিয়ে একটু সাহায্য করবেন। এতোক্ষণ যে সব বিষয় নিয়ে কথা বলেছি সেগুলো ছিল টুকিটাকি বিষয় এবারে বাড়াবাড়ি বিষয় নিয়ে একটু কথা বলি। আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি কিছুদিন আগে বিএনপি এর একজন দায়িত্বশীল মানুষ বলেছেন যে, জামায়াতে ইসলামীতেও মুক্তিযোদ্ধা আছেন। সংবাদ মাধ্যমে কথাটি পড়ে আমি কী হাসব নাকী কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। এই দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র জ্ঞানও আছে সেও জানে ১৯৭১ সালে জামায়েতে ইসলামী এই দেশের স্বাধীনতা বিরোধিতা করেছিল, শুধুমাত্র মৌখিক বিবৃতি দিয়ে বিরোধিতা নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। আক্ষরিক অর্থে মুক্তিযোদ্ধাদের জবাই করেছিল। তাদের তৈরি বদর বাহিনী স্বাধীনতার পূর্ব মুহূর্তে এই দেশের কবি সাহিত্যিক-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-সাংবাদিকদের হত্যা করেছে। বধ্যভূমি থেকে উদ্ধার করা সেইসব বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহে ছিল অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতার ছাপ, যিনি হৃদরোগের চিকিৎসক তার বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে আনা হয়েছে, যিনি চক্ষু চিকিৎসক তার চোখ খুবলে নেয়া হয়েছে, যিনি লেখক তার হাত কেটে নেয়া হয়েছে। সেই সব মুহূর্তের কথা চিন্তা করলে এখনো আমরা শিউরে উঠি। তারপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে, পৃথিবীর অন্য যেকোনও দেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা রাজনীতি করার সুযোগ পায় না। আমাদের অনেক বড় দুর্ভাগ্য তারা শুধু যে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে তা নয়, বিএনপি এর হাত ধরে তারা ক্ষমতার অংশ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে তারা কখনো এই দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চায়নি, কখনো বলেনি যে একাত্তরে তারা ভুল করেছিল। তাই যখন কেউ বলে জামায়াতে ইসলামীতে মুক্তিযোদ্ধা আছে তখন আমি চমকে উঠি। সত্যি যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে থাকেন তার অর্থ এই নয় যে জামায়াতে ইসলামী এখন মুক্তিযুদ্ধের ধারক বাহক হয়ে গেছে। বুঝতে হবে সেই মুক্তিযোদ্ধার মতিভ্রম হয়েছে। আমাদের চারপাশে এখন এরকম অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, আমরা তাদের দেখি এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলি। বিএনপি নির্বাচন করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়েছে, দেশের অনেক বড় রাজনীতিবিদরা তার মাঝে কোনো দোষ খুঁজে পাননি। জামায়াতে ইসলামীর মতোই তারাও ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আমরা সেগুলো মেনে নিতে পারি কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য তাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা আছে সেরকম ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করবেন সেটা আমরা কখনো মেনে নেব না। আমি চাই আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম দায়িত্ব নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী এই রাজনৈতিক দলটিকে এই দেশে পুরোপুরি গুরুত্বহীন একটি সংগঠনে পাল্টে দিক। এবারে সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলি। যখন এই লেখাটা লিখছি তখন হঠাৎ করে দেখলাম ভিকারুননিসা স্কুলের একটি কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি সব সময়েই এক ধরনের আত্মার সংযোগ অনুভব করি। খবরটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, আহা অভিমানী এই কিশোরীটির সঙ্গে আমি যদি একটিবার কথা বলার সুযোগ পেতাম তাহলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারতাম, পৃথিবীটা অনেক বিশাল, একটা মানুষের জীবন তার থেকেও বিশাল। সবার জীবনেই কখনো না কখনো দুঃখ-হতাশা-লজ্জা-অপমান আসে সেগুলো দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে এগিয়ে যেতে হয় কারণ সবকিছুর পর এই জীবনটি অনেক সুন্দর। আমি তাকে কিছু বলতে পারিনি, সারা পৃথিবীর উপর তীব্র একটা অভিমান নিয়ে সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। আমি নিজে তীব্র অপরাধবোধে ভুগছি, মনে হচ্ছে তার মৃত্যুর জন্যে আমিও বুঝি কোনো না কোনোভাবে দায়ী। বড় মানুষদের আমরা শুধু শাসন করতে শিখিয়েছি, ছেলে-মেয়েদের ভালোবাসতে শিখাইনি। কেউ কী জানে না যদি তাদেরকে গভীর মমতা দিয়ে ভালোবাসা যায় তাহলে শুধুমাত্র ভালোবাসার মানুষটি যেন মনে কষ্ট না পায় সেজন্যে তারা কখনো কোনো অন্যায় করে না? কেউ কী জানে না এই বয়সটি কী অসম্ভব স্পর্শকাতর একটি বয়স? কেউ কী জানে না অপমানের জ্বালা কতো তীব্র? কেউ কী জানে না পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ব্যবহার করেও একটি হারিয়ে যাওয়া প্রাণকে ফিরিয়ে আনা যায় না? অরিত্রী, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই। আমরা তোমাকে এই পৃথিবীতে বাঁচতে দিইনি। লেখক : লেখক ও শিক্ষাবিদ এসএ/

সে যে মানে না মানা... 

টিন এজ। জীবনের সূচীপাতা। অন্যমনস্কতা, নতুন কিছু জানার কৌতুহল, নিয়মনীতি ভেঙে বাঁধন ছেড়ার ইচ্ছে জাগে মনে বিশেষ করে এই টিনএজটাতে। টিনএজকে নিয়ে এক কবি লিখেছিলেন ‘‘গ্রীষ্মের দুপুরে চড়ুই পাখিরা যেমন মনের আনন্দে ধুলোর মধ্যে লুটোপুটি খায়, টিন এজাররাও এদের চেয়ে কম নয়।” আসলেই খুব সুন্দর উপমা। এই সময়ে মনে জাগে হাজারো প্রশ্ন আর আজব যতো জিজ্ঞাসা। মুক্ত আকাশে ডানা মেলা পাখির মতো টিনএজারদের কল্পনাগুলোও যেনো ঘুরে বেড়ায় । এ সময়টাকে তারা বারণ বা নিষেদ মানতে চায় না, এ যেনো বাঁধ ভেঙে দাও.... বাঁধ ভেঙে দাও.... এমনটা অবস্থা।      আর যে সকল টিন এজাররা এই বয়সে একটু বেশী পাকা হয়ে যায়, তাদের অভিভাবকরা সারাক্ষণই চিন্তায় থাকেন ছেলেমেয়ে কখন কি-না-কি কাণ্ড করে বসে। বয়েসটা বয়োসন্ধিকাল - না কৈশোর না যৌবন। আর এই সময়টাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিনই হয়ে পড়ে। এই বয়সে ছেলেদের কণ্ঠস্বর পাল্টে যায়। চেহারায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। অস্পষ্ট গোঁফ স্পষ্ট হতে শুরেু করে। মেয়েদেরও আসে শারীরিক পরিবর্তন । পাশাপাশি কারনে-অকারণে বারে বারে ওড়না ছিটকে পড়ে যাওয়া আবার গুছিয়ে নেয়া সম্ভবত: এই বয়েসেরই দোষ। টিনএজারদের কাছে প্রেমটা বড় রোমান্টিক। নিজের অজান্তে কখন কিভাবে যে প্রেম এসে মনের মধ্যে ঠাঁই করে নেয় তা তারা হয়তো নিজেও জানে না। আর তাই প্রেমিক-প্রেমিকারা হাতে হাত রেখে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় নীল আকাশে কখনও বা চলে যায় পরীর দেশে। প্রজাপতি হয়ে উড়ে উড়ে ফুলে ফুলে বসে। পড়ার টেবিলে বসে পাশের বাড়ির মনি-রাজুর দিকে মন চলে যাওয়া বেশি কিছু নয়। স্কুল-কলেজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রেমিক-বন্ধুর সাথে আড্ডা দেয় অনেক টিনএজাররা। আর এ আড্ডায় উঠে আসে কতনা স্বপ্নের কথা, বাস্তবতা কম অবাস্তব আর আজগুবি সব প্ল্যান। বিশেষ করে প্রেম-ভালোবাসার বিষয়টি অধিক স্থান পায়। নিরলস আর দ্বিধাহীন সে গল্প। আমাদের দেশে টিনএজাররা বেড়ে উঠছে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে। টিনএজে কেউবা রাত জেগে পড়া তৈরী করছে, কেউবা সমাজ সেবায়, কেউবা সুন্দর ভবিষ্যতের কল্পনা করছে, আর কেউবা তাস পেটাচ্ছে রাত জেগে। কেউবা নেশায় আসক্ত হয়ে বিপদগামী হচ্ছে। কেউবা ফেইসবুক আর ইন্টারনেট এ আসক্ত হয়ে বিপথে যাচ্ছে, জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানোর এই সময়টাতে অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে খেটে খেটে ঘাম ঝরাচ্ছে। কেউ কউ ছিনতাই করছে, ছিটকে চোরের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। কেউবা বখাটে হয়ে উঠছে, মেয়েদের উত্যক্ত করছে । এমনি আরও কতভাবে টিনএজাররা বেড়ে উঠছে সুখ-দুখ, আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে। সবমিলিয়ে বলা যায়, আমাদের দেশে টিনএজাররা বেড়ে উঠছেনা ঠিক যেভাবে বেড়ে ওঠার কথা। এ সকল টিনএজারদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে বিশেষ করে অভিভাবকদের। কারণ এ বয়সটাতে বিপথে যাবার সম্ভাবনা খুব বেশী থাকে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, সে নজরটুকু রাখলে হয়তো অনেক অনাকাঙ্খিত সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। টিনএজাররা ফুল বাগানের ফোটার আশায় ফুলের একেকটা কলি। এই কলিগুলোকে ফুটতে দিতে হবে। ফুটে যেনো সৌরভ ছড়ায় চারিদিকে। শুভ কামনা সকল টিনএজারদের। এসি    

স্বপ্নের চেয়েও বড় যে জন 

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হয়। আর স্বপ্নই পারে মানুষকে বদলে দিতে, তার চারপাশকে বদলে দিতে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রথম প্রয়াণ বর্ষ পূরণের দিনে এ ভাবনাটিই বারবার মাথায় ঘুরছে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মেয়র প্রার্থী মনোনীত ও নির্দেশিত হওয়ার পরপরই তাঁর সঙ্গে যে কথোপকথন, তাতে আর যাই হোক, এই কথাগুলো `নগরপিতা` আনিসুল হক সম্বন্ধে ভাবব, তা মনে হয়নি। কারণ আমার `সত্য ভাবনায়` একজন ব্যবসায়ী নেতা তাঁর ওপর ন্যস্ত প্রধানমন্ত্রী আর জনমানুষের আস্থাকে `আমানত` হিসেবে নিয়ে দ্রুতই জনমানুষের নেতায় রূপান্তরিত হবেন- এ আমার বোধের অতীত, জানার নতুন অধ্যায়।     মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্যায় ছিল সমাজ, প্রতিষ্ঠান, জনমানুষ সংশ্নিষ্ট `সবার কাছ থেকে জানা` এবং সে অনুযায়ী `কৌশলপত্র` নির্ধারণ। এই সময়ে তিনি একনিষ্ঠ ছাত্রের মতো জেনেছেন, বুঝেছেন আর দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। এ সময় তাঁকে প্রণোদিত করায় তিনি বেশ কিছু অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষায় নেমে পড়েন। আর তার ফলাফলের ওপরে রচিত হলো তাঁর `সমস্যা চিহ্নিত, এবার সমাধান যাত্রা`র সেই মহাযজ্ঞ। নির্বাচনকালীন এই মহাযজ্ঞের সূচনায় তিনি অনুপ্রাণিত করলেন আপামর ঢাকাবাসীকে আর একদল পেশাজীবী, চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের। নির্বাচন-পরবর্তী কয়েক মাসের প্রস্তুতির পর সবার সম্মিলিত শক্তি আর আগ্রহকে পুঁজি করে তিনি খাতওয়ারি অনেক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন মাত্রায় `সমাধানযাত্রা`কে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ী উদ্যোগী হন। প্রথমত ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে বাস-ট্রাক স্ট্যান্ডসহ সড়কগুলো দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। বেদখলের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধংদেহী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে শুরু করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়ক, গুলশান এভিনিউর শক্তিশালী বাণিজ্যিক গোষ্ঠী থেকে বিদেশি দূতাবাস কর্তৃক অবৈধ দখলকৃত ফুটপাত, বনানী কবরস্থান সংলগ্ন দখলকৃত জমিসহ বাড্ডার লেকপাড় সড়ক, প্রতিবন্ধকতাকারী ভবন ইত্যাদি `দখলমুক্ত` করে সেসব সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁর এ সফলতায় মানুষ শুধু তাঁকে সমর্থন জোগানোই নয়, উজ্জীবিত হয়েছে এক নতুন বিশ্বাসে। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাপক সড়ক ও ফুটপাত, সেই সঙ্গে `সিগন্যালিং ব্যবস্থা` উন্নয়নের পাশাপাশি প্রায় ৫৭টি বাস রুটকে ৬-৭টি রুটে কোম্পানিভিত্তিক `একীভূত`করণের মাধ্যমে তিনি পরিশীলিত `বাসভিত্তিক` টেকসই ও মানসম্পন্ন `গণপরিবহন`-এর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। দেনদরবারের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা আদায় করেছিলেন। এই সহযোগিতার মাধ্যমে এ খাতের ব্যবসায়ীদের `সেবা`র মানসিকতায় উজ্জীবিত করতে পুরনো ও প্রায় বাতিল ৪ হাজার বাসের বদলে স্বল্প সুদে নতুন এবং বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীবান্ধব বাস আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি `করিডোর`ভিত্তিক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার জন্য ফুটপাত, যথাযথ বাসস্টপ, সিগন্যাল ব্যবস্থা, রোড মার্কিং ও সবুজায়নের একটি সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। গুলশান এলাকায় `ঢাকা চাকা`সহ ফুটপাত, সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল তাঁর `পাইলট` উদ্যোগ। মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত `ইউলুপ` পদ্ধতিতে `সিগন্যালবিহীন` করিডোর উদ্যোগের মাধ্যমে `গতিশীল ও নিরাপদ` সড়ক তৈরিতে তিনি একটি আধুনিক ও যুগান্তকারী কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন। পদচারীবান্ধব `র‌্যাম্পভিত্তিক` ফুটপাত যুক্ত করে এ উদ্যোগকে মানবিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়। কত রাত এ আলোচনায় তাঁকে আমরা প্রাঞ্জল ও উদ্বুদ্ধ হতে দেখেছি। ঢাকা শহরের দৃষ্টিদূষণের বিরুদ্ধে প্রায় আন্দোলন গড়ে তুলে একটি যথাযথ `নীতিমালাভিত্তিক নতুন বিজ্ঞাপন ধারায়` নগরসজ্জাকরণের উদ্যোগ নেন। শুধু উত্তর ঢাকায় নয়; দক্ষিণের মেয়রকে নিয়ে একটি যুগপৎ `দৃষ্টিবান্ধব নগর` গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক কার্যকর আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমরা ক`জন দিনরাত এ কাজে তাঁর পাশে থেকেছি। আর যার সুফল অনেক দিন ধরে তাঁর অকালমৃত্যুর পরও এই ঢাকা শহরবাসী ভোগ করছে। তবে তাঁর সেই উদ্যোগে প্রণীত `নীতিমালা` আজও সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায়। বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে সবুজ ঢাকা আন্দোলনে নব নব উদ্যোগ আর উদ্যোগীরা তাঁর কাছে ছিল আদরণীয়। নগর বাগান, ছাদ বাগান ইত্যাদি আন্দোলনের পাশাপাশি `ট্যাক্স প্রণোদনা`ভিত্তিক উদ্যোগ নগরজীবনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ঢাকা শহরের জলজট আর জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রথমেই পরামর্শ সভা করলেন তিনি। তার পর উদ্যোগ গ্রহণে সচেষ্ট হলেন। জনজট ও জলাবদ্ধতা এর বহুমাত্রিক জটিলতায় স্বল্পমেয়াদি ব্যাপক ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগগুলোকে সামলে নিয়ে `আমাদের কয়েকজন স্থপতি-পরিকল্পনাবিদকে` সম্পৃক্ত করে চারটি `বিশাল` প্রকল্প সরকারপ্রধানের নজরে আনেন। প্রধানমন্ত্রী তাতে সাড়া দিয়ে `প্রকল্প পরিপত্র` তৈরির উদ্যোগ নিতে বলেন। প্রকল্পগুলোর মধ্যে দ্বিগুণ মৌজায় `জল-নিসর্গ` প্রকল্প, যার পরিধি হাতিরঝিলের প্রায় সাড়ে তিনগুণ; এগুলোর সঙ্গে কল্যাণপুর `ক`, `খ`, `গ`, `ঘ` খালগুলোর সঙ্গে ওয়াপদার `জল সংরক্ষণ` অঞ্চল একটি `নগর জলউদ্যান` প্রকল্প আর হাতিরঝিল-বালু নদীর সংযোগ হিসেবে `নড়াই খাল` বা বনশ্রী খাল উন্নয়ন প্রকল্পগুলো উল্লেখযোগ্য। `জলবান্ধব` নগরী গঠনের লক্ষ্যে `ব্লু নেটওয়ার্ক` পুনরুদ্ধার কার্যক্রম প্রকল্পগুলো ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারত। স্বপ্নবাজ মেয়রের অকালমৃত্যুতে প্রকল্পগুলো এখনও ধুঁকছে। একই সঙ্গে গত ২০১৭ সালের জুনের মাঝামাঝি প্রথমবারের মতো তিনি সফলভাবে সব `অংশীজন` সমন্বয়ে একটি `সম্মিলিত` কর্মধারার মাধ্যমে ঢাকার জলজট আর নগরবন্যা নিরসনে একটি জনসম্পৃক্ত কর্মভিত্তিক আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করাতে পেরেছিলেন। সরকারের স্থানীয় সরকার ও সমবায়মন্ত্রী সেই দায়িত্বপূর্ণ নেতৃত্ব গ্রহণে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। তার পর্যায়ক্রমিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতের পূর্বেই পরের মাসে আনিসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই উদ্যোগ এখনও আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায়। বরং চলছে সেই পুরনো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আর প্রকল্পের জোয়ারে সমস্যা সমাধানের ব্যর্থ চেষ্টা। জনগণের প্রতি আনিসুল হকের সংবেদনশীলতা কিংবদন্তিতুল্য হয়ে উঠেছিল। গুলশান-১-এর বিপণিবিতানের অগ্নিদুর্ঘটনা কিংবা কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে তাঁর কায়িক অংশগ্রহণ ও দ্রুত পরবর্তী পুনর্বাসন উদ্যোগ সে সাক্ষ্য বহন করে। সাক্ষ্য হয়ে থাকবে তাঁর সর্বশেষ সমাপ্ত প্রকল্প `বনানী কবরস্থান উন্নয়ন`। জাতির পিতার শহীদ পরিবার ও শহীদ তিন নেতার কবরসহ পুরো কবরস্থানকে পুনঃসংস্কারের প্রকল্পটি মাত্র ৫ মাসে সম্পাদন করার মধ্য দিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ ও প্রকল্প সময়ানুযায়ী সংবেদনশীলতায় বাস্তবায়ন তাঁর দক্ষতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার উদাহরণস্বরূপ। প্রকল্পটির স্থপতি হিসেবে এটি আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। জনগণকে শুনতে, জানতে আর বুঝতে এক রকম আকুল হয়ে থাকতেন আনিসুল হক। এর ফলে `বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আরবান ল্যাব`-এর উদ্যোগে তিনি `নগর` নামে একটি মোবাইলভিত্তিক `অ্যাপ` তৈরি করান। `অ্যাপটি সাধারণ নাগরিককে ছবিসহ অভিযোগ করা আর তা পর্যায়ক্রমিক প্রতিকার না হলে মেয়র পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। এভাবে একান্তেই সিটি করপোরেশনকে এক স্বচ্ছ জবাবদিহিতে উপনীত করেছিলেন। `ডিজিটাল বাংলাদেশ` আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে জনসম্পৃক্ততার এই কর্মোদ্যোগ একটি `যুগভৈরবী` সৃষ্টি করেছিল। এসব কারণেই একজন আনিসুল হক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে একটি `আস্থা`র নামে পরিণত হয়েছিলেন। আজও তাই মানুষটি আমাদের কাঁদায়। প্রতিজ্ঞায় মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ধরার শক্তি জোগায়। সবাই মিললে `সমাধানযাত্রা` তাঁর সাফল্যের পঙ্‌ক্তিতে কবিতার ভোর ডেকে আনবে- এই অমিত সংকল্পে বলীয়ান করে। ৩০ নভেম্বর ২০১৭ সালে অকালমৃত্যু হয় আমাদের এই স্বপ্নবাজ নায়কের। এর সঙ্গে মৃত্যু হয় ক্রমধারায় জনবান্ধব `উচ্চাভিলাষী` উদ্যোগের। বেঁচে থাকলে এটির স্থবিরতা এই মানুষটি কিছুতেই মানতে পারতেন না। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। `মৃত্যু মানে বিরতি নয়`। আনিসুল হক রেখে গেছেন কিছু স্বপ্ন, চিন্তা ও কাজ। আমরা তার পরম্পরা তৈরি করে `সমাধানযাত্রা` নিরন্তর রাখব- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। `নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে,/ রয়েছ নয়নে নয়নে।/ হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে।` লেখক: নগরবিদ এসি   

‘ধানের শীষে’ কামাল হাসে

বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘নির্বাচনী প্রতীক’ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। প্রার্থীর চেয়ে প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় জয়-পরাজয়ের বাটখারা। আর হবেই বা না কেন, ফলাফল ঘোষণার পর যে ‘নির্বাচনী প্রতীক’-এর সংখ্যা যত বেশি তার কদর তত বেশি। দিনের শেষে ‘নির্বাচনী প্রতীক’এর সংখ্যাইতো নির্ধারণ করবে কে বা কাহারা সরকার গঠন করবে, তাই না? আমাদের রাজনৈতিক জীবনে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর মশাল জ্বালিয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন দিশারী হয়ে আবির্ভুত হয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন। আমরা তাকে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে ‘উধাও’ হতে দেখি বরাবর। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। কেউ দেশে মুক্তিযুদ্ধে গেল, কেউ সীমানা অতিক্রম করে ভারতে ট্রেইনিং-এ। আবার কেউ বা মুজিব সরকারের পক্ষে প্রচারণায়। কিন্তু ‘উধাও কামাল’ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কোলে স্বেচ্ছায় ‘উধাও’ হল। এ কারণে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে এম আর আখতার মুকুল ‘চরম পত্রে’র ভাষায় ‘পাকিস্তানি জামাই কামাইল্লা’কে নিয়ে তিনটি চরমপত্র পাঠ করেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রথম নির্বাচনেই ড. কামাল হোসেন ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। কোনবারই ‘নৌকা’ প্রতীক তার জন্য সরাসরি বরমাল্য নিয়ে আসেনি। ১৯৭৩ সালে জাতির জনক নিজে সরে বসে ড. কামাল হোসেনকে ‘নৌকা’তে ঠাই দিয়েছিলেন বৈকি! ড. কামাল হোসেনও তখন ‘বিনা প্রতিদন্দ্বিতায়’ বাকুম বাকুম করে ‘নৌকা’য় চেপে বসেছিলেন। ‘বিনা প্রতিদন্দ্বিতা’-র নির্বাচন ব্যাপারটি তখন তার একটুও অগণতান্ত্রিক মনে হয়নি।  কিন্তু সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঠিক আগে আগেই বঙ্গবন্ধু সরকারের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘উধাও কামাল’ ব্যাক্তিগত সফরে বিদেশে ‘উধাও’ হলেন। এতটাই ‘উধাও’ হলেন যে একটি প্রেস কনফারেন্স করে বিশ্ব মিডিয়াকে তখনকার প্রকৃত অবস্থা জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। আফসোস! পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় থেকে তিনি বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি গঠন করেন। আর দলের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে বেছে নেন ধানের ছড়াকে। কিন্তু ধানের ছড়াকে তিনি কি যেন মনে করে ‘ধানের শীষ’ নাম দিয়ে দিলেন। আর সেই থেকে ধানের ছড়া হয়ে গেল ‘ধানের শীষ’। আমরা জানি যে, ধানের মুকুল থেকে যখন সবে সবুজ ধান বের হয় তখন তাকে ধানের শীষ বলে। এই অবস্থায় ধানের কাণ্ডের মাথায় মুকুল থেকে পাতা পরিবেষ্ঠিত ধানের শীষটি সবেমাত্র বের হয়। অপরদিকে ধানের শীষ যখন কিছুদিনের মাথায় পুষ্ট ধানের আকার ধারণ করে ও পাকে তখন তাকে ধানের ছড়া বলে। ধানের ছড়াকে ধানের ছড়া বলাই উচিত। বিএনপি তার নির্বাচনী প্রতীকে ধানের ছড়ার ছবি ব্যাবহার করে কেন সেটিকে ‘ধানের শীষ’ বলছে এটা আমার মাথায় আসে না। হয়তো ব্যাপারটি হাতির দাঁতের মত। হাতির এক জোড়া দাঁত থাকে দুনিয়াকে দেখানোর জন্য। হাতি কিন্তু সেই দাঁত দিয়ে খাবার খায় না। আবার হাতির লুকানো অন্য দাঁত রয়েছে, যা দুনিয়ার কেউ দেখতে পায় না। হাতি এই লুকানো দাঁত খাবার খাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। হয়তো বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি এই হাতির দাঁতের মাজেজা-কেই তাদের রাজনৈতিক মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেখাব এক, করবো আরেক! এরপর ১৯৮১ সালে ড. কামাল হোসেন ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু সেবার তিনি নৌকার কাণ্ডারী হতে পারেননি। পরাজয় বরণ করে নিয়েছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের কাছে। ১৯৮১ সালের নির্বাচন বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘ধানের শীষ’। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত ‘উধাও কামাল’ ঘরে ফিরবেন না বলে তিন দিব্যি দিলেন। ১৯৮৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ অনেক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঠিক তিন দিনের মাথায় ‘উধাও কামাল’ লন্ডনে ‘উধাও’ হলেন। ৯০’র এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ২৭ নভেম্বর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘উধাও’ হলেন। ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর হাতে নিহত হন ডা শামসুল আলম মিলন। আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান এরশাদ। আর ঠিক তার পরদিনই অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ঘটল। ড. কামাল হোসেন ১৯৯১ সালে আবারও ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু এবারো সেই একই ঘটনা। ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীর নিকট হেরে যান। অতএব, ঘটনা পর্যবেক্ষণে বোঝা গেল ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে ড. কামাল হোসেনের সরাসরি বিজয় লাভের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এটা তিনি বুঝে গেছেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে ‘উধাও কামাল’ একেবারে আওয়ামী লীগ থেকেই ‘উধাও’ হয়ে গেলেন। ১৯৯২ সালে ড. কামাল হোসেন তৈরি করলেন নতুন রাজনৈতিক দল- ‘গণফোরাম’। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত গণফোরামের নির্বাচনী প্রতীক হচ্ছে ‘উদীয়মান সুর্য’ আর নিবন্ধন নং হোল ২৪। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘চির উদীয়মান সুর্য’ ‘গণফোরাম’ মোট ১০৪টি আসনে প্রার্থী দেয় যাদের সবার জামানত বিপুলভাবে বাজেয়াপ্ত হয়। দলটি ঢাকা বিভাগে ২২ হাজার ৬২৩টি, বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৮২৯টি, খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৫৬৫টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮ হাজার ৬৪০টি, রাজশাহী বিভাগে ১২ হাজার ১৭ টি এবং সিলেট বিভাগে ৭ হাজার ৫৭৬টি অর্থাৎ মোট ভোট পেয়েছিলো ৫৪ হাজার ২৫০টি। যা ছিল ওই নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের (৫ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫) শূন্য দশমিক শূন্য ৯৫ ভাগ।   তো এবার ‘উধাও কামাল’ ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর মশাল হাতে আলাপ-বিলাপ-প্রলাপ-সংলাপ সব কিছুই করলেন। জনগণ ভাবলো ‘উদীয়মান সুর্য’ বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্য গগনে নব কুমারের (‘উধাও কামাল’) নব উদ্যমে জ্বলজ্বল করে জ্বলবে। কিন্তু গত ১৫ নভেম্বর আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘গণফোরাম’ দলটি ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে! ১৯৮১ সালে ড. কামাল হোসেন যখন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হয়েছিলেন এবং বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন, তখন তিনি ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে এক বিশালসংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে ড. কামাল হোসেন দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ধানের শীষ’ প্রতীক বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করেছে। ‘ধানের শীষ’ প্রতীক হলো প্রতারণা-প্রবঞ্ছনার প্রতীক। ‘ধানের শীষ’ প্রতীক হলো জনগণের ভোটাধিকার হরণের প্রতীক। ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে কলঙ্ক রচনা করা হয়েছে। তাহলে, আজ ড. কামাল হোসেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে দেশ ও জাতিকে কি উপহার দিতে চাইছেন - কলঙ্কিত নির্বাচনী ব্যাবস্থা, প্রতারণা-প্রবঞ্ছনা, জনগনের ভোটাধিকারের প্রহসন?   আর তাই, বঙ্কিমচন্দ্রের কপাল কুন্তলার মত ‘উদীয়মান সুর্য’-এর ‘নব কুমারের’ কাছে জাতির এখন একটাই প্রশ্ন – ‘পথিক, তুমি কি (প্রতীক নিয়া) পথ হারাইয়াছ?’ লেখক: আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক। আআ//

গণঅভ্যুত্থান, চিকিৎসক সমাজ ও শহীদ ডা. মিলন

২৭ নভেম্বর ১৯৯০। এদিন ছিল বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও চিকিৎসকদের ২৩ দফা বাস্তবায়ন আন্দোলনের এক পর্যায়ের কর্মসূচি- সারাদেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি এবং পিজি হাসপাতালের বটতলায় সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় চিকিৎসক সমাবেশ। গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর উত্তপ্ত এবং সমাবেশ-মিছিল-স্লোগানমুখর। এরশাদের সশস্ত্র পেটোয়া বাহিনী শহীদ মিনার থেকে চানখাঁরপুল ও দোয়েল চত্বর দখল নিয়েছে। গত রাতে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য বেশ কয়েক দফা তাড়া করে সরিয়ে দিয়েছে। বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি, বোমাবাজি চলছে থেকে থেকে। ডাকসুসহ সব ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠন তখন ঘোষণা দিয়েছে-‘স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না।’২৫ নভেম্বর ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির সরকারি ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া গেল। ডা. মিলন তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক আর আমি প্যাথলজি বিভাগের। প্রতিদিন সকালে ওর তিনতলার বিভাগে এসে কাজ সেরে আমাদের দ্বিতীয় তলার প্যাথলজি বিভাগে চলে আসত এবং কলেজ-হাসপাতাল ঘুরে আমরা আন্দোলন সংঘটিত করতাম অন্যদের সঙ্গে নিয়ে। ২৬ নভেম্বর ডা. মিলন যথারীতি সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ওর বিভাগ হয়ে আমার বিভাগে এলো। দু`জনে মিলে কলেজ ও হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে আগামীকালের বিএমএর কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য জনসংযোগ করলাম। হাসপাতালের ডক্টরস ক্যাফেটোরিয়ার বন্ধু ডা. রঞ্জুসহ দুপুরের খাবার খেয়ে ওদের বিদায় দিতে গিয়ে দেখলাম, শহীদ মিনার থেকে চানখাঁরপুল এবং দোয়েল চত্বর সশস্ত্র যুবকদের দখলে, প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছে সরকারের লেলিয়ে দেওয়া বাহিনী- সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের সঙ্গে চলছে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ।২৭ নভেম্বর সকালে মিলনের অপেক্ষায় থেকে না পেয়ে আমি আর সাইদ পিজি হাসপাতালের দিকে যেই পা বাড়িয়েছি, ঠিক তখনি খবর পেলাম, টিএসসির সামনে একজন চিকিৎসক গুলিতে আহত হয়েছে- তাকে ইমার্জেন্সিতে আনা হচ্ছে। আমরা দৌড়ে ইমার্জেন্সিতে গিয়ে দেখলাম, ডা. আমজাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে মিলনকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।মুহূর্তেই বিদ্যুতের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এই মর্মান্তিক সংবাদ- গর্জে ওঠে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ, জনপথের সর্বত্র জনগণের কণ্ঠ- `মিলন ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না।` আন্দোলন ঝড়ের গতি পায়, যে ঝড়ে কোনো রাজন্য, কোনো স্বৈরাচার কখনও টিকে থাকতে পারে না। চারদিক থেকে চিকিৎসক-ছাত্র-জনতা বিশাল বিশাল মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তা এক মহাসমুদ্রে পরিণত করে। এখানে তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কবির উদ্দীন আহমেদ কলেজের শিক্ষকদের পদত্যাগের ঘোষণা করেন এবং বিএমএর নেতা ডা. ইউনুস আলী সরকার দেশের সব চিকিৎসককে পদত্যাগের জন্য আহ্বান জানান। তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এসজিএম স্যারের রুমে বিএমএর এক জরুরি সভার আয়োজন করি। এ সভায় কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হয় : ১. ২৮ নভেম্বর বিএমএর পক্ষ থেকে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান; ২. অবিলম্বে এরশাদ সরকারের পদত্যাগ দাবি; ৩. এরশাদ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম চিকিৎসক কর্মবিরতি। তৎকালীন সব রাজনৈতিক জোট বিএমএর সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচিকে সমর্থন করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেদিনের সব আয়োজনের দায়িত্ব বর্তেছিল আমার ওপর। পরিস্থিতি এমনই হতবিহ্বল ছিল, মিলনের মৃত্যু সনদটিও আমাকে লিখতে হয়েছিল। মিলনকে শায়িত করার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম, এরশাদ সরকার ইতিমধ্যে কারফিউ জারি করেছে। ঘোষণা করেছে জরুরি আইন; ব্যবহার করল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার শেষ অস্ত্র। জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করল সেই ঘোষণা। ঘোষণার রাতেই কারফিউ ও জরুরি আইন অমান্য করে লাখো মানুষের ঢল নামল ঢাকার রাজপথে ও সারাদেশে। ২৮ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব মেডিকেল শিক্ষক ও সরকারি চিকিৎসক পদত্যাগ করে এরশাদ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানান।ডা. শামসুল আলম খান মিলন তৎকালীন বিএমএর যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ এবং বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। ১৯৮৩ সালে ডাক্তার হওয়ার পর থেকে চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের সব আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে নেতৃত্ব প্রদান করেন। প্রতিটি আন্দোলনে তাকে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে; এমনকি চাকরিচ্যুত পর্যন্ত হতে হয়েছে। যদিও চিকিৎসক পেশাজীবীদের চাপের মুখে সরকার বারবারই তা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে। মিলন তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এ দেশের চিকিৎসক, পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের হৃদয়ে এক মর্যাদাকর আসন অর্জন করেছিল। অমায়িক ব্যক্তিত্বের মানুষ মিলনের সঙ্গে ঢামেক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। আমি জয়ী হলে ওকে কোষাধ্যক্ষ পদের প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যান করেনি। দিনরাত একসঙ্গে বিএমএ, শিক্ষক সমিতি, পেশাজীবী আন্দোলনে কাজ করেছি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। আন্দোলন সংঘটিত করার জন্য গোটা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাতে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে দু`জনে একসঙ্গে ঘুমিয়েছি।’৯০-এর প্রথম দিকে সরকার কর্তৃক একটি স্বাস্থ্যনীতি ঘোষণার কথা শোনা যায়। অবশেষে সে বছর ২৫ জুলাই জেনারেল এরশাদ জাতীয় প্রচারমাধ্যমে একটি ‘জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি’ ঘোষণা করেন। বিএমএ ও জনগণ এই স্বাস্থ্যনীতিকে পর্যালোচনা করে যুক্তিযুক্তভাবে এ প্রস্তাবকে গণবিরোধী এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণের মাধ্যমে এনজিওনির্ভর করার অপচেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে। ২৭ জুলাই বিএমএ পর্যায়ক্রমে আন্দোলনের শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় চিকিৎসক মহাসমাবেশ থেকে গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও চিকিৎসকদের প্রাণের ২৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করে। চিকিৎসকদের এ আন্দোলনকে দেশের তৎকালীন তিন জোট, সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য, অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠন সমর্থন করে। তুমুল আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকার ১৪ আগস্ট স্বাস্থ্যনীতি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ইতিমধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সুসংগঠিত হতে থাকে, তিন জোট ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর মধ্যে ২৭ নভেম্বর মিলন শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে দ্রুত স্বৈরাচারী সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তাদের পতন ঘটে।ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এ দেশের চিকিৎসক সমাজ তথা বিএমএ, পেশাজীবী সমাজ জনগণের কাছে এক মর্যাদার আসন পেয়েছে।আমাদের একটি দুঃখ থেকেই গেল, ডা. মিলন হত্যার বিচার হলো না। মিলনের রাজনৈতিক আদর্শের দল ক্ষমতার অংশ হিসেবে থাকলেও মিলন হত্যার বিচার করার জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।ইতিমধ্যে দেশের মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার তিন দফায় দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিসহ চিকিৎসকদের সব দাবি পূরণ করেছেন। নবীন চিকিৎসকদের সরকারের সাধ্যমতো নিয়োগ হচ্ছে। বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন বিশ্বের দরবারে সমাদৃত, অনেক ক্ষেত্রেই ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জনগণের পূর্ণ সন্তুষ্টি পাওয়া সহজ নয়। কারণ স্বাস্থ্য বাজেটের অপ্রতুলতা, রোগীর অকল্পনীয় চাপ, দুর্বল ব্যবস্থাপনাসহ রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। তারপরও আমাদের দায়বদ্ধ থাকতে হবে সর্বস্তরে। নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ কিন্তু প্রধানত চিকিৎসকদের হাতে।আজকে শহীদ ডা. মিলনের ২৮তম শাহাদতবার্ষিকীতে শহীদ ডা. আলীম, শহীদ ডা. ফজলে রাব্বী, শহীদ ডা. মিলনসহ লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা এ দেশের চিকিৎসক সমাজ চিকিৎসাক্ষেত্রে ভেদাভেদ ভুলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ মেধা, শক্তি, সুযোগ ব্যয় করব- এটিই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এসএ/

মিলনের পোস্টার দেখিয়ে গিয়েছে আপোস বিহীন রক্তের নির্দেশ

আজ ২৭ নভেম্বর শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন দিবস। ১৯৯০ সালের এইদিনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিঝরা উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন টিএসসি এলাকায় তৎকালীন স্বৈরশাসকের গুপ্ত বাহিনীর গুলিতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন আরো বেগবান হয় এবং এক ঐতিহাসিক ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসকের পতন ঘটে।প্রতি বছর ২৭ নভেম্বর আসে। আমরা দিনটিকে শহীদ ডা. মিলন গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালন করি। পরম যত্নে আমাদের গণতন্ত্রের প্রতীক শহীদ মিলনের মায়ের মুখ থেকে হতাশার কথা শুনি। মিলনের সহযোদ্ধারা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে চির নিদ্রায় শায়িত মিলনের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে জাতির বিবেকের সমাধিসৌধ। সভা সেমিনার করা হয়-করা হয় নানান অঙ্গীকার। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা গলা ফাটিয়ে বিভিন্ন নতুন নতুন প্রতিজ্ঞা করেন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার আশায়। বছরের ঐ একটি দিনই। আবার পিনপতন নীরবতা। মিলনের সমাধিতে সদ্য রাঙানো রঙ আস্তে আস্তে মলিন হতে থাকে। আবার ঠিক একটি বছরের অপেক্ষা। পচিশটি বছর ধরে ২৭ নভেম্বরের চিরায়ত বাস্তব চিত্র এটি।নটরডেম কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা. শামসুল আলম খান (মিলন) ন সমাজের আমূল পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন, শোষনমূলক সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। প্রচলিত পথে না গিয়ে নতুন অথচ বন্ধুর পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। তিনি সেসব পোশাকি পেশাজীবী নেতার মতো ছিলেন না, যারা কেবলই ক্ষুদ্র বলয়ের মাঝে থেকে সংকীর্ণ গোষ্ঠী-স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার লেজুড়বৃত্তি করে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরাচারের উচ্ছেদ হবে এমনটি আশা করেছিল এদেশের আপামর মানুষ। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্রই থাকবে স্বাধীন দেশের উপযোগী রাজনীতি। স্বাধীন দেশে শোষণ মুক্তির সংগ্রাম তাই স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট করেছিল মিলনের মত অসংখ্য যুবককে। মিলনের স্বপ্নের সমাজ আজো তেমনি করে প্রেরণা যোগায় এখানকার মানুষকে। রাজপথে এখনো জীবন দেয় মুক্তিকামী মানুষ। এ দেশের মানুষ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে বারবার ফিরেছে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র নিয়ে। তবু থেমে থাকেনি, আবারও জীবন দিতে এগিয়ে গিয়েছে বীরের মত বিজয় ছিনিয়ে আনতে। কিন্তু স্বৈরাচারের ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে বিজয়ের পতাকা ওড়াতে পারেনি। পারেনি বিজয়ের নাগপাশগুলো ছিন্ন করতে বরং শোষনের জাল আরও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে নতুন নতুন কৌশলে- যোগ হয়েছে শোষনের নতুন নতুন মাত্রা।গুলিবিদ্ধ মিলনের পোস্টার দেখিয়ে গিয়েছে আপোস বিহীন রক্তের নির্দেশ। (লেখক: সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মী)অা অা//

নারীর কথা শুনবে বিশ্ব   

 ২৫ নভেম্বর নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূলের আন্তর্জাতিক দিবস এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের সক্রিয়তা প্রচারাভিযানের প্রথম দিন। এ উপলক্ষে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি সেসব নারী ও মেয়েদের জন্য, যারা বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে সহিংসতার শিকার হয়। অ্যাম্বাসাডরস অব চেঞ্জ- এই প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের দূত হিসেবে, আমরা সহিংসতা ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই; যা লাখ লাখ নারী এবং মেয়েশিশুদের প্রতিদিন মুখোমুখি হতে হয়। বিশ্বজুড়ে নারী ও মেয়েশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা রয়ে গেছে সবচেয়ে রীতিসিদ্ধ এবং সবচেয়ে ব্যাপক একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন নারীর মাঝে একজন তাদের জীবনকালে সহিংসতা ভোগ করবে। আমদের স্বীকার করতেই হবে যে, এটি একটি বিশ্বব্যাপী মহামারী, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে অসমান ক্ষমতা ও নৈতিক সক্রিয়তায় আবদ্ধ। ক্ষতিকারক সামাজিক নিয়ম এবং আইনের অধীন বৈষম্য এটাকে পুনরায় বলবৎ করে। এটা প্রতিটি সমাজে দৃঢ়ভাবে নিহিত রয়েছে। তাদের জাতি, ধর্ম, বয়স, শারীরিক অক্ষমতা বা যৌন অভিযোজনের কারণে সহিংসতার ঝুঁকি বেশি রয়েছে বৈষম্যের শিকার, দুর্বল গোষ্ঠীর নারীদের জন্য। কোনো দেশেই লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা থেকে অনাক্রম্য নেই। বাংলাদেশের বর্তমান পরিসংখ্যানও বিপজ্জনক। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রত্যেক পাঁচটি কিশোরীর মধ্যে একজন কিশোরী, নিকট আত্মীয়, স্বামী বা পুরুষ বন্ধুর কাছ থেকে যৌন সহিংসতার শিকার হয়। বর্তমানে বিবাহিত নারীর ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী, তাদের বিবাহকালীন সময়ে অন্তত একবার নির্যাতনের শিকার হন প্রায়ই পরিচিত এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রতি চারজন নারীর মধ্যে একেরও অধিক যৌন বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হন। প্রতি ১০ নারীর মাঝে সাতজন নারী (৭৩ শতাংশ) তাদের জীবনে, অন্তত একবার গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হন। আমাদের শেখানো হয়েছে যে, সমাজে নারী ও পুরুষের বিভিন্ন ভূমিকা রয়েছে। নারী ও মেয়েদের মৃদু, বিনীত এবং বিনয়ী চরিত্র এই সমাজে প্রত্যাশিত করা হয়। প্রায়ই নারীদের তাদের মতামত প্রকাশ করা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়। এমনকি অপব্যবহারের মুখে নারীদের চুপ থাকতেই শেখানো হয়েছে! কারণ প্রতিশোধের, প্রতিহিংসার ঝুঁকি অনেক বেশি। নারীদের নানা ক্ষতিকারক, অলিখিত নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য করা হয়। যদি তারা সামাজিক মানদণ্ডের সঙ্গে মানানসই না হয়, তবে তারা খারাপ, চরিত্রহীন নারী হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে যে নারীকে হয়রানি করা হয় এবং প্রায়ই নির্যাতন করা হয়, সে নারী তা নীরবে সহ্য করে। তারা সমাজের অবিশ্বাসকে ভয় করে। কারণ নির্যাতনকারীকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে দুর্ভাগ্যবশত এই সমাজে নারীদেরই অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়। তাদের নিন্দিত করা হয় সহিংসতার শিকার হওয়ার কারণে তিনি কীভাবে অপরাধীর সঙ্গে মিশতেন, আচরণ করতেন অথবা তিনি কী পোশাক পরতেন। ফলে সমাজই সহিংসতার একটি অবিরাম, নিষ্ঠুর চক্র সমর্থন করে চলছে। # মি টুর বিশ্বব্যাপী প্রচারাভিযান বিস্ময়কর সাফল্যের কারণে, সমাজে দমনপ্রাপ্ত নারীদের ভূমিকার নীরব প্রতিগ্রহণকে সম্প্রতি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে এমনকি বাংলাদেশেও সাহসী নারীরা জানান দিচ্ছেন তাদের দুঃখের কথা, এগিয়ে আসছেন তাদের হয়রানি ও সহিংসতার গল্প নিয়ে। ১৬ দিনের অ্যাক্টিভেশনের জন্য এই বছরের থিম বা প্রতিপাদ্য হলো # হিয়ার-মি টু বা # ঐবধৎ গব ঞড়ড়। এই প্রতিপাদ্যটি, গত বছরে নারীর অধিকার আদায়ের জন্য উত্থাপিত # মি টু আন্দোলনের এবং অন্যান্য সহিংসতা প্রচারণার ধারাবাহিকতা। আমরা যদি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার অবসান করতে চাই, তবে তার মূল এবং কাঠামোগত কারণগুলো মোকাবেলা করা জরুরি, যেমন পিতৃপুরুষতা এবং নারী ও পুরুষের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা। আমাদের আরও ন্যায়সঙ্গত সমাজের পক্ষে লড়াই করা প্রয়োজন; যাতে নারীর সমান গুরুত্ব থাকা উচিত সামাজিকভাবে, আর্থিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এবং জীবনের প্রতিটি স্তরে। এই পরিবর্তনের জন্য দূত হিসেবে আমরা কাজ করতে চাই এবং আমরা সেসব নারী ও মেয়েকে সমর্থন করি, যারা সহিংসতার শিকার হতে এবং সমাজ দ্বারা দমন হতে ও নীরব থাকতে বাধ্য হয়েছেন। আমরা সহিংসতার শিকার সব নারীকে সমর্থন করি এবং সেসব কর্মীকে, যারা এই নারীদের তাদের অধিকারের জন্য যুদ্ধ করতে, প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেন। বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে আমরা সাহায্য করতে চাই তাদের কণ্ঠ জোরালো করার জন্য। আমরা সব প্রতিষ্ঠানকে দায়বদ্ধ করতে চাই, যাতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার সব নারী তাদের গল্পকথা বলতে পারেন, নালিশ জানাতে পারেন কর্তৃপক্ষকে। আমরা পুরুষদের অনুরোধ করি, চ্যালেঞ্জ করার জন্য সেসব বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং সামাজিক মানদণ্ডগুলো যা জোরদার করে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ও বৈষম্যের। আমরা আইনের অধীনে এবং ন্যায়বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে, সহিংসতার শিকার নারী ও মেয়েদের পক্ষে সমান সুরক্ষা চাই। আমরা নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় দোষী অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং দৃঢ় আইনি ব্যবস্থা চাই। আমরা সরকারকে অনুরোধ করছি মেয়েদের ক্ষমতায়ন করার জন্য চিন্তাহীনভাবে বাঁধাধরা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে এসে একটি উচ্চমানের, পরিপূরক শিক্ষাব্যবস্থা প্রসারিত করতে। আমরা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিরাপদ নিশ্চিত করতে চাই, যাতে কোনো নারী বা মেয়েকে হয়রানি ও আক্রমণের হুমকির মুখোমুখি হয়ে তার শিক্ষার অধিকার ত্যাগ না করতে হয়। আমরা যৌন প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য নারী ও মেয়েদের অধিকার রক্ষার দাবি জানাই। আমরা কর্মস্থলে, গণপরিবহনে, সব স্থানে সব নারী ও মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা নারী ও মেয়েশিশুদের ক্ষমতায়ন চাই, যাতে প্রত্যেকে তাদের প্রতিটি কথা শোনে; তারা সমর্থিত এবং প্রেরিতবোধ করে; তারা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং নিজেদের অধিকারের জন্য লড়তে পারে। আমরা সমাজের সব শ্রেণির, সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছি এই আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে, যাতে তারা প্রত্যেক নারী ও মেয়ের কথা শোনে, বিশ্বাস করে  এবং সমর্থন জানায়। সব নারী যেন সহিংসতা  থেকে মুক্তি পায়। বি.দ্র: [লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের কার্যক্রম প্রচার, অ্যাম্বাসাডরস অব চেঞ্জ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ বার্তা] লেখকবৃন্দ: জুলিয়া নিবলেট, রেঞ্জে তেরিংক, বেনয়েট প্রফন্টাইন, উইনি এস্ট্রুপ পিটারসেন, মারি-এনিক বুর্দিন, হ্যারি ভারওয়েজ, সিডেল ব্লেকেন, অ্যালিসন ব্ল্যাক, সিএমজি, আর্ল রবার্ট মিলার, শার্লাটা স্কিলটার, রেনে হোলেনস্টাইন ডেরিক ব্রাউন, মিয়া সেপ্পো, বিয়াত্রাইস কালদুন, ডা. আসা টর্কেলসন, শোকো ইশিকাওয়া। লেখকরা হলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার আবাসিক প্রতিনিধি।

ফেসবুক সীমানা মানে না   

ইন্টারনেট প্রযুক্তির যুগে ও ফেসবুকের কারণে পৃথিবীর মানুষ পরস্পরের মুখোমুখি হতে পারে, ভাবের আদান-প্রদানে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ সুবিধা থেকে বাংলাদেশের মানুষও দূরে নয়, সেও তথ্যপ্রযুক্তির সুপার হাইওয়ের যাত্রী। দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বসবাসের কারণে একই ধরনের সামাজিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ায় ভিন্ন রুচি, ভিন্ন সামাজিক জীবনের মুখোমুখি হতে আমাদের অস্বস্তি হয়; কেমন যেন বিসাদৃশ লাগে। কিন্তু এসবকে অতিক্রম করে প্রেমের টানে আমেরিকা থেকে বরিশালে এসে প্রেমিককে সম্প্রতি বিয়ে করলেন সমাজকর্মী সারা মেরিয়ান। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা। বর বরিশাল নগরীর কাউনিয়া প্রধান সড়কের খ্রিস্টান কলোনির মাইকেল অপু মণ্ডল, পেশায় রঙমিস্ত্রি। ২১ নভেম্বর তারা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাও শেষ করেন। ২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর ফেসবুকে একটি বিতর্ক (ডিবেট) গ্রুপের মাধ্যমে সারার সঙ্গে অপুর পরিচয় ঘটে। এরপর থেকে ফেসবুকে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের দু`জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে; তা পারিবারিক সম্পর্কে রূপ নেয়। যদিও তারা একই ধর্মাবলম্বী; তারপরও ভালোবেসে সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সারা বরিশালে অপুর কাছে এসেছেন। তারা ভৌগোলিকভাবে বা সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন দুটি দেশের কৃষ্টি, রীতিনীতি, সামাজিক বাধা, নানা অবিশ্বাসকে অতিক্রম করে পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পেরেছেন, তা মানবিক সম্পর্কের শক্তির কথাই বলে। বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অন্তরের আলো নিয়ে পরস্পরকে দেখেছেন, তা বর্তমানের অসহিষুষ্ণ সমাজের জন্য আশাবাদ। প্রাযুক্তিক সুবিধার কারণে ২-৩ বছরে এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। গত বছরই ভিন্ন দুটি দেশের দুই নারী শত শত মাইল পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন তাদের মনের মানুষের কাছে। তাদের পরিচয় হয়েছিল অনলাইনে। একজন এসেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন থেকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রাখালগাছি গ্রামে। এই তরুণী এলিজাবেথ গ্র্যাজুয়েশন করেছেন; সম্প্রতি ওয়ালমার্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। গ্রামেরই নির্মল বিশ্বাসের ছেলে মিঠুন বিশ্বাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়েছিল। আরেকজন ব্রাজিলের ৪৭ বছর বয়সী নারী সেওমা বিজেরা ছুটে এসেছিলেন সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার হালিতলা বারৈইকান্দি গ্রামে। এই দুই নারী বাংলাদেশের দুই পুরুষকে ভালোবেসে কাছাকাছি এসেছেন এবং ঘর বেঁধেছেন। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- সবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে নয়, পরিবার-পরিজনের সবাইকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে। এগুলো আমাদের সমাজের নমনীয় দিকটির বিকাশের কথাই বলছে। ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন সামাজিক আচরণকে নিয়েই আমরা সমাজকে এগিয়ে নিতে চাচ্ছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মানবিক বিশ্বের দিকেই এগিয়ে চলেছে, ভিন্নতাকে নিয়ে বাঁচতে শিখছে। যদিও রাজনীতির ক্ষেত্রে সে ধরনের সহনশীলতা এবং ভিন্নতাকে গ্রহণ করে একসঙ্গে চলার কৌশল রপ্ত করার প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না আমাদের। সার্বিকভাবে একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে আমাদের সমাজ জীবন এক ধরনের অসহিষুষ্ণতার মুখোমুখি। আমরা নানাভাবে আতঙ্কিত। নানাভাবে নিজেদের নিরাপদ করার চেষ্টা করছি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সতর্কতার সঙ্গে নজর রাখছি; তাদের উপস্থিতি ঠিক আছে কিনা, তারা কোথায় যাচ্ছে, না যাচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু এই যে পৃথিবীটা খুলে গেছে, প্রত্যেক মানুষের চোখের সামনে চলে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন সামাজিক আচার-আচরণ থেকে খাদ্যাভ্যাস, পরিচিত হচ্ছি ভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে, কখনও কখনও তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অনলাইনে অংশগ্রহণ করছি এবং প্রবলভাবে প্রভাবিত হচ্ছি। তার জন্য যে উপযোগিতা দরকার, মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা দরকার, সে ব্যাপারে আমরা এখনও উদ্যোগ নিতে সামর্থ্য হইনি। আমাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, আদর্শ রীতি সামাজিক আচরণকে চূড়ান্ত হিসেবে নিয়েছে- এটাই শেষ কথা ও সর্বোত্তম। ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি অবস্থান করে একে অপরকে ক্ষতি না করে বরং সমৃদ্ধ করে সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন সময় ও সহনশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি করা; যাতে রাজনীতিকরাই বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। লেখক: আসিফ 

নির্বাচনী ইশতেহারে যা চাই

নির্বাচন আসছে, তাই রাজনৈতিক দলগুলো এখন অনেক খাটাখাটুনি করে তাদের দলের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করবে। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে এই নির্বাচনী ইশতেহারে আমি দেখতে চাই এরকম দশটি বিষয়ের কথা বলতে, তাহলে আমার তালিকাটি হবে এরকম :১. মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ : সবার প্রথমে আমি চাইব সব রাজনৈতিক দল যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে খুবই স্পষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কথা বলে। এই দেশে রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের কথা বলে রাজাকার কমান্ডারদের একবার ক্ষমতায় আসতে দেখে আমি ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ’ কথাটির ব্যাপারে অনেক স্পর্শকাতর হয়ে গেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ থেকে এ কথাটি খুব স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হতে না শুনলে আমি স্বস্তি অনুভব করি না। একাত্তর সালে আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি যারা রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার, তারাই একদিন এই দেশের মন্ত্রী হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে আর কখনও যেন এরকম কিছু ঘটতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গড়ে তোলা হবে বলা হলে আসলে অনেক কিছু বলা হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝে যাই আমরা সব ধর্ম, সব বর্ণ-সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে একটা আধুনিক দেশ গড়ে তোলার কথা বলছি। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যাই, আমরা একটা অসাম্প্রদায়িক দেশের কথা বলছি, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলছি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি। সে জন্য এ তালিকার প্রথম বিষয়টি সব সময়ই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ।২. বঙ্গবন্ধু : বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায় কোনটি জিজ্ঞেস করা হলে অনেকগুলো ঘটনার কথা উঠে আসবে, যার একটি হচ্ছে ১৯৭৫ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসন দেয়া। ১৯৭৫ সালে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়ে গেছে; কিন্তু তার স্মৃতিটুকুও যেন এই দেশে না থাকে তার জন্য সব রকম চেষ্টা করা হয়েছে। রেডিও-টেলিভিশনে তার নাম পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কথা না জেনে। অথচ এই মানুষটি এবং বাংলাদেশ আসলে সমার্থক। আমাদের অনেক বড় সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধু এই দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যদি তার জন্ম না হতো আমরা সম্ভবত বাংলাদেশটিকে পেতাম না। বেঁচে থাকতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন; কিন্তু এখন তিনি আর কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, সারা বাংলাদেশের সব মানুষের নেতা। কাজেই আমি চাই এ দেশের সব রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করবে। অকৃতজ্ঞ মানুষকে আমরা ঘেন্না করি, তার থেকে শত হাত দূরে থাকি। ঠিক একই কারণে অকৃতজ্ঞ রাজনৈতিক দলের জন্য সেটা অন্যরকম হবে কেন? তাদের কাছে অন্যেরা কে কী আশা করে, আমি জানি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি অকৃতজ্ঞ রাজনৈতিক দলের কাছে কিছুই আশা করতে পারি না।৩. অসাম্প্রদায়িক : বাংলাদেশ গত দশ বছরে অনেক অগ্রসর হয়েছে। সংখ্যা দিয়ে বিচার করতে চাইলে বলা যায়, জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১৭৫২ ডলার, দারিদ্র্য হার কমে হয়েছে ২২ শতাংশ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি করা পদ্মা ব্রিজের কাজ শেষ হয়ে গেছে ৬০ শতাংশ। বিদেশি পত্র-পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা দেখানোর জন্য খুবই ব্যস্ত, তারা প্রায় সময়ই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের রগরগে চটুল তথ্য দিয়ে হেডলাইন করে থাকে। সেরকম একটি সাপ্তাহিকী দি ইকোনমিস্ট পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো।বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অবশ্যই দেশের উন্নয়ন দেখে আমরা সবাই খুশি। আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, চাইলেই আমরা অনেক দ্রুত দেশকে উন্নত করে ফেলতে পারব।কিন্তু আমাদের সমস্ত আনন্দ এবং উৎসাহ মাঝে মাঝেই ছোট একটা সাম্প্রদায়িক ঘটনা দেখে পুরাপুরি ম্লান হয়ে যায়। যত সময় যাবে আমাদের হৃদয়ের প্রসারতা তত বাড়ার কথা, আমাদের তত উদার হওয়ার কথা। কিন্তু যখন দেখি সাম্প্রদায়িক মানসিকতা কমেনি বরং বেড়েছে তখন আমরা খুবই অসহায় বোধ করি। আমি সব সময়ই বলে এসেছি একটা দেশ ভালো চলছে না খারাপ চলছে, সেটি জানার জন্য বড় বড় গবেষণা করতে হয় না, সেমিনার কিংবা গোলটেবিল বৈঠক করতে হয় না। দেশের একজন সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসী মানুষকে জিজ্ঞেস করতে হয়। তারা যদি বলে দেশটি ভালো চলছে, তাহলে বুঝতে হবে দেশটি আসলেই ভালো চলছে। যদি তারা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তাহলে বুঝতে হবে দেশটি ভালো চলছে না। এই দেশে এখনও মানুষে মানুষে বিভাজন রয়ে গেছে। বেশ কয়েক বছর আগে আমি দলিত শিশুদের একটা সমাবেশে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি ফুটফুটে শিশুদের কাছে শুনে ছিলাম, তারা সেই এলাকায় অস্পৃশ্য। পানি খাওয়ার জন্য একটা গ্লাসকে পর্যন্ত তারা স্পর্শ করতে পারে না।কাজেই আমি চাইব। নির্বাচনী ইশতেহারে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে, দেশের সব মানুষের ভেতর থেকে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা দূর করে সবাইকে নিয়ে আধুনিক একটা বাংলাদেশ তৈরি করা হবে।৪. নারী-পুরুষ সমতা : আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কী, আমি সব সময়ই তার উত্তরে বলে থাকি, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে এখানে সব ক্ষেত্রে ছেলেরা এবং মেয়েরা সমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলগুলোতে বরং মেয়েদের সংখ্যা একটু বেশি, মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের লেখাপড়ার মান ভালো। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যখন বইপড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, সেখানে মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক মেয়েদের খেলায়ও মেয়েরা অনেক ভালো করছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে দেখা যায়, ছেলেদের সংখ্যা থেকে মেয়েদের সংখ্যা কম, কারণ তখন বাবা-মায়েদের ধারণা হয়, ভালো একটা পাত্র দেখে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলা দরকার। মেয়েরা যে শুধু লেখাপড়ার সব জায়গায় আছে তা নয়, গার্মেন্টস শ্রমিক প্রায় সবাই মেয়ে এবং তারা আমাদের অর্থনীতিটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।তবে ক্যারিয়ার বলে একটা নিষ্ঠুর শব্দ আছে। যে কোনো পর্যায়েই এ ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতায় পুরুষের কাছে মেয়েরা হেরে যায়। কারণ যখন ক্যারিয়ার গড়ার সময়, সেটি সন্তান জন্ম দেয়ার সময়, সন্তানকে বড় করার সময়। পুরুষ মানুষ অনেক কিছু করতে পারলেও সন্তান জন্ম দিতে পারে না, সন্তানের মা হতে পারে না।কাজেই রাষ্ট্র ইচ্ছে করলে নারীদের এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। যেখানে মেয়েরা কাজ করে, সেখানে চমৎকার ডে কেয়ার গড়ে তুলতে পারে। সেটি গার্মেন্ট ক্যাক্টরিই হোক আর বিশ্ববিদ্যালয়ই হোক। যদি মায়েরা জানে তার শিশুসন্তানের দায়িত্ব নেয়ার একটা জায়গা আছে, তাহলে তাদের জীবনটাই অন্যরকম হয়ে যেতে পারে। নির্বাচনকালীন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে একটা শব্দ খুবই জনপ্রিয় হয়েছে, তাহলে পুরুষ এবং নারীর ক্যারিয়ার গড়ে তোলার ব্যাপারে কেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না? মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়ার বেলায় বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে এগিয়ে আছে। তাহলে মায়েদের কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার বেলায় আমাদের দেশ কেন এগিয়ে থাকবে না? কাজেই নির্বাচনী ইশতেহারে আমি নারী-পুরুষের মাঝে সমতা আনার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝ থেকে এরকম একটি অঙ্গীকার দেখতে চাই।৫. জ্ঞানভিত্তিক দেশ : প্রথম যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছিল, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল এবং বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি। কিন্তু এখন মোটামুটি সবাই বিষয়টা গ্রহণ করেছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে উদ্যোগ নেয়ার কারণে অনেক কিছু ঘটছে, যেটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঘটা সম্ভব ছিল না। যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হয়, তখন দেশের মানুষের কথা আলাদাভাবে বলা হয় না; কিন্তু যদি এর পরের ধাপ হিসেবে আমরা জ্ঞানভিত্তিক দেশের কথা বলি, তখন কিন্তু আমরা দেশের মানুষের কথা বলি। আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ কোটি। যদি এদের সবাইকে ঠিকভাবে লেখাপড়া করানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে সে রকম দেশ আর কয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে? আমরা সবাই দেখেছি, এই দেশের একেবারে সাধারণ মানুষটিও কিন্তু লেখাপড়ার গুরুত্বটি ধরতে পেরেছে। লেখাপড়ার মান নিয়ে আমরা এখনও সন্তুষ্ট নই; কিন্তু যদি লেখাপড়ার মানটুকু বাড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে জোর দিয়ে বলা যাবে আমাদের দেশটিকে জ্ঞানভিত্তিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সব উপাদান আছে।দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এখনও এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের শরীরের ঘাম। তাদের পাশে যদি মেধা নিয়ে নতুন প্রজন্ম দাঁড়াতে শুরু করে, তাহলেই আমরা জ্ঞানভিত্তিক দেশের স্বপ্নে পা দিতে শুরু করব। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশা করতেই পারি, তারা আমাদের দেশকে জ্ঞানভিত্তিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখাবে।৬. শিক্ষায় জিডিপির চার শতাংশ : বাংলাদেশ ঢাকার সম্মেলনে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা দেশের জিডিপির ৬ শতাংশ খরচ করবে। এখন বাংলাদেশ খরচ করছে ২.৫ শতাংশ থেকেও কম। আমি সব সময়ই বলে থাকি, লেখাপড়ার পেছনে এত কম টাকা খরচ করে পৃথিবীর আর কোনো দেশ এত ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করানোর কথা চিন্তাও করতে পারবে না! আমরা ইচ্ছা করলে তো দাবি করতেই পারি যে, যতটুকু অঙ্গীকার করা হয়েছিল ততটুকু খরচ করতে হবে, কিন্তু তাহলে হয়তো আমাদের দাবিটা কেউ বিশ্বাস করবে না। এ মুহূর্তে যেটুকু খরচ করা হচ্ছে তার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি কেমন করে চাই?তাই আমার মনে হয়, আমরা আপাতত নির্বাচনী ইশতেহারের জন্য জিডিপির চার শতাংশ চাইতে পারি! যারা বাজেট করেন তাদের বিশ্বাস করতে হবে, লেখাপড়ার পেছনে যদি এক টাকাও বাড়তি খরচ করা হয় তাহলে সেটারও একটা ফল পাওয়া যায়। তার কারণ লেখাপড়ার পেছনে যে টাকা খরচ করা হয়, সেটি মোটেও খরচ নয়, সেটি হচ্ছে বিনিয়োগ।৭. সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা : কেন সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নেয়া উচিত, সেটি নিশ্চয়ই নতুন করে কাউকে বোঝাতে হবে না। ভর্তি পরীক্ষার নামে ছেলেমেয়েদের এমন একটি নিষ্ঠুরতার ভেতর দিয়ে নেয়া হয়, যেটি রীতিমতো অবিশ্বাস্য। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সেটি লক্ষ করেছেন এবং একাধিকবার সব ভিসিকে ডেকে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার কথা বলেছেন। গত বছর সেটি নেয়া সম্ভব হয়নি, আমি ভেবেছিলাম এ বছর নিশ্চয়ই সেটি হবে; কিন্তু আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছি যে, এই বছরেও কেউ এটি নিয়ে কথা বলছে না! সত্যি কথা বলতে কী, এ বছর অবস্থা আগের থেকে খারাপ। আগে যে পরীক্ষাটি একবার নেয়া হয়েছে, প্রশ্নফাঁস হওয়ার কারণে এবার সেই পরীক্ষা দু’বার নিতে হয়েছে। কেমন করে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের রক্ষা করব জানি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অঙ্গীকার এ দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং তাদের বাবা-মা একবাক্যে লুফে নেবেন।কাজেই নির্বাচনী ইশতেহারে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অঙ্গীকার করে তরুণ প্রজন্মকে খুব সহজে উৎসাহী করা সম্ভব বলে আমি মনে করি!৮. সাইকেল লেন : বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম। বিশেষ করে যারা ঢাকা শহরের বাইরে থাকে, তারা যদি ঢাকায় এসে একবার ট্রাফিক জ্যামের যন্ত্রণাটা অনুভব করে, তাহলে সাধারণত তাদের ঢাকা আসার সাধ জন্মের মতো মিটে যায়। ঢাকা শহরে নানা মিটিংয়ের জন্য আমাকে প্রায়ই আসতে হয়, আমি একটা বিচিত্র বিষয় আবিষ্কার করেছি। ঢাকা শহরে কোথাও আমি সময়মতো যেতে পারি না। বেশি সময় হাতে নিয়ে রওনা দেয়ার পরও ঠিক সময় পৌঁছতে পারি না, কিংবা বেশি সময় হাতে নিয়ে রওনা দেয়ার কারণে অনেক আগে পৌঁছে গিয়ে সময় কাটানোর জন্য রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটাই। সোজা কথায় বলা যায়, কতটুকু দূরত্ব, কত সময়ে পৌঁছানো যাবে, সে দুটির মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই! এ কারণে ঢাকার মানুষজনের যে কী পরিমাণ সময় নষ্ট হয়, তার কোনো হিসাব নেই। সেই সময়টাকে যদি টাকা দিয়ে বিবেচনা করা যায়, আমার ধারণা তাহলে আমরা প্রতি মাসে একটা করে পদ্মা ব্রিজ তৈরি করে ফেলতে পারব।আমার ধারণা এর একটা খুব সহজ সমাধান আছে, সেটা হচ্ছে সাইকেলে যাতায়াত করা। আমাদের নতুন একটা আধুনিক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে যারা ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সাইকেলে যেতে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। শুধু তাই না, স্কুলের অনেক ছেলেমেয়েও সাইকেলে করে স্কুলে যাবে। এখন যেতে পারে না শুধু একটি কারণে সেটা হচ্ছে- ব্যাপারটা মোটেও নিরাপদ না। যে রাস্তায় দৈত্যের মতো বড় বড় বাস-ট্রাক গাড়ি একজনের সঙ্গে আরেকজন প্রতিযোগিতা করে ছুটে যাচ্ছে, সেই রাস্তায় কে সাইকেলে যেতে সাহস পাবে? কিন্তু যদি রাস্তার এক পাশে ছোট একটি লেন তৈরি করে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে আলাদা করে দেয়া হয়, তাহলে সবাই সেই পথে যেতে পারবে। আমার এই কথাগুলো মোটেও আজগুবি কথাবার্তা নয়। পৃথিবীর অনেক বড় শহরে সাইকেল যাত্রীদের জন্য আলাদা পথের ব্যবস্থা করে রাখা আছে। আজকাল শুধু যে সাইকেলের পথ তৈরি হয়েছে তা নয়, সাইকেল ভাড়া করার জন্য একটু পরে পরে সারি সারি সাইকেল রাখা আছে, কাউকে আর সাইকেল কিনতেও হয় না।তাই আমি মনে করি, নির্বাচনী ইশতেহারে যদি সব বড় বড় শহরে সাইকেলের আলাদা লেন তৈরি করে দেয়ার অঙ্গীকার করা হয় নতুন প্রজন্ম অনেক আগ্রহ নিয়ে সেটি গ্রহণ করবে।৯. সোশ্যাল নেটওয়ার্কের অভিশাপ থেকে মুক্তি : আমি এখন যেটা বলতে চাইছি, সেটি সবাই মানতে রাজি হবেন কিনা, আমি জানি না; কিন্তু আমি যেহেতু আমার নিজের পছন্দের কথা বলছি, অন্যেরা রাজি না হলেও ক্ষতি নেই।আমি জানি না সবাই এটি লক্ষ করেছে কিনা, ছাত্রছাত্রীদের মাঝে একটা মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, যে পরিবর্তনটি ভালো নয়। ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে কমে এসেছে। এটি শুধু যে আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ঘটেছে তা নয়, সারা পৃথিবীর সব দেশের ছাত্রছাত্রীদের বেলায় এটা ঘটেছে। এর কারণটিও এখন আর কারও অজানা নয়, সেটা হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নামক বিষয়টির প্রতি আসক্তি। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, সারা পৃথিবীটি এখন দুটি জগতে ভাগ হয়ে গেছে। একটি হচ্ছে রক্ত-মাংসের বাস্তব জগৎ। আরেকটি ইন্টারনেটের পরাবাস্তব জগৎ। ইন্টারনেটের জগতে একেবারে তুলকালাম ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু বাস্তব জগতের কেউ সেটি সম্পর্কে কিছু জানে না, সেটি এখন এমন কিছু বিচিত্র ব্যাপার নয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত না থেকে আক্ষরিক অর্থে এক মুহূর্তে থাকতে পারে না, সেরকম মানুষের সংখ্যা খুব কম নয়। সাধারণ মানুষজন হয়তো খুব বেশি জানে না, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি জগতের বাঘা বাঘা প্রতিষ্ঠান এখন আমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানে, যেগুলো হয়তো আমরা নিজেরাই জানি না। তথ্য এখন সোনা থেকেও দামি এবং আমরা না জেনে আমাদের সমস্ত তথ্যভাণ্ডার বড় বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিচ্ছি। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে যেটি ফ্রি সার্ভিস মনে হচ্ছে, সেটি যে ফ্রি নয় এবং একবার আমাদের ভালো করে হাতে পেয়ে নিলে হঠাৎ করে গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট, আমাজন বা অ্যাপলের মতো বাঘা বাঘা প্রতিষ্ঠান যে আমাদের সর্বস্ব সুদে-আসলে তুলে নেবে না, আমরা সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারি না।সারা পৃথিবীতে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা কোথায় আছি এবং কোথায় যাব সেটি কেউ ভালো করে জানে না। কিছু বোঝার আগে আমরা হয়তো আবিষ্কার করব, আমরা অন্যের হাতের পুতুল হয়ে বসে আছি।তাই আমি চাই নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকুক। পরিবর্তনশীল এই নাজুক পৃথিবীতে পৃথিবীর বড় বড় তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পুরোপুরি কব্জা করে ফেলার আগে আমাদের যেন নিজেদের রক্ষা করার একটা পথ খোলা থাকে। সেইসঙ্গে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আসক্ত ছেলেমেয়েদের রক্ত-মাংসের জগতে ফিরিয়ে আনার একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে।১০. বাকস্বাধীনতা : আমি জানি, বাকস্বাধীনতা কথাটি খুব বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ অনেকবার দেখেছি ঠিক কোথায় বাকস্বাধীনতা খিস্তিখেউড় গালাগাল হয়ে যাচ্ছে সেটা অনেকেই জানে না। সামনাসামনি অনেকেই একে অন্যকে গাল-মন্দ করে না; কিন্তু ইন্টারনেটের পরাবাস্তব জগতে খুব সহজেই একজন অন্যজনকে তুলোধোনা করে ফেলে। এসব কিছুর পরও আমি মনে করি, একজনের বাকস্বাধীনতা থাকুক, বাড়াবাড়ি করে ফেললে সেটাকে প্রতিবাদ করার ব্যবস্থা থাকুক; কিন্তু মনখুলে কথা বলা নিয়ে সবার ভেতরে যদি একটা আতঙ্ক কাজ করে তাহলে সেটি ভালো কথা নয়।আমার মনে হয়, আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা সবার মাঝে এক ধরনের ভীতি ঢুকিয়ে দিয়েছে। ইন্টারনেটে খিস্তিখেউড় হয়তো কমেছে; কিন্তু অনেক জায়গায়ই মানুষজন তাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভয় পেতে শুরু করেছে। এটি আমরা কখনও চাই না। ধারাগুলোর বাক্যগুলো খুবই ঢিলেঢালা, ইচ্ছে করলেই যে কোনো মানুষের যে কোনো কথাকে ব্যবহার করে তাকে বিপদে ফেলে দেয়া যাবে।তাই আমি মনে করি, নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা বাকস্বাধীনতা নিয়ে আরেকটু গুছিয়ে তৈরি করা একটি প্রস্তাব আশা করতে পারি।এই হচ্ছে নির্বাচনী ইশতেহারে আমি কী দেখতে চাই সেরকম দশটি বিষয়ের তালিকা। দেখাই যাচ্ছে এটি কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ নয় এবং আমি যে বিষয়গুলো নিয়ে মাথাঘামাই ঘুরেফিরে সেগুলোই এসেছে- কিন্তু ক্ষতি কী? এটাই তো বাকস্বাধীনতা- আমার যেটা বলতে ইচ্ছে করছে সেটা বলছি! সবাইকে সেটা শুনতে হবে কিংবা বিশ্বাস করতে হবে কে বলেছে?লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এসএ/  

চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিচার বিভাগের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র

১৪ নভেম্বর এলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে চিরচেনা দুটি মুখ। বিচার বিভাগের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে ও সিনিয়র সহকারী জজ শহীদ সোহেল আহমেদ। ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তারা উগ্র জঙ্গিবাদীদের বোমা হামলায় নিহত হন। সেদিন বিশ্ববাসী জেনেছিল, বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ জঙ্গিবাদীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বোমা হামলায় নিহত দুই বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও শহীদ সোহেল আহমেদ আমার সহকর্মী ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ২৪ জুন তারা দু`জনসহ আমরা ৯৯ জন সহকারী জজ দেশের বিভিন্ন জেলার জাজশিপে যোগদান করেছিলাম। অধস্তন আদালতের সর্বোচ্চ পদ জেলা ও দায়রা জজ। এই পদে বর্তমানে কর্মরত আমরা। বেঁচে থাকলে তারা দু`জনও আমাদের সঙ্গে জেলা ও দায়রা জজ হতে পারতেন। জঙ্গিদের নির্মম আঘাত শুধু তাদের ওপর ছিল না; ছিল দেশের বিচার বিভাগ তথা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্র হত্যাকারীদের বিচার করে তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। রায় কার্যকর হয়েছে; কিন্তু এ দেশে জঙ্গিবাদীদের হামলা এবং চক্রান্ত এখনও শেষ হয়ে যায়নি। তারা এ দেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। শেখ হাসিনা সরকার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের অনেক বেআইনি কার্যক্রমকে রুখে দিতে পেরেছে। এ কারণেও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত `বাংলাদেশ`-এর সংবিধানের মূল লক্ষ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাষ্ট্র হবে এটি। ফলে `বাংলাদেশ` নামক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাগরণ গড়ে তুলে সব সময় এটিকে চলমান রাখতে হবে। জঙ্গিবাদীরা হিংসা বা ধ্বংসের মাধ্যমে যে সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তা অব্যাহত থাকলে মানবসভ্যতা বিপন্ন হতে বাধ্য। সে কারণে আমাদের সমাজকে একটি শক্তিশালী প্রগতিশীল-সুকুমারবৃত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চিন্তা ও চর্চার প্রচার এবং প্রসার ঘটিয়ে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবকিছু করতে হবে। সহকর্মী বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও শহীদ সোহেল আহমেদ জীবন উৎসর্গ করে আমাদের সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথ দেখিয়ে গেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তাদের দেখিয়ে যাওয়া পথে আমরা হাঁটতে পারলে মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদসহ এ দেশে এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঝরে যাওয়া রক্ত কখনও বৃথা যাবে না; আমরা এগিয়ে যেতে পারব। ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সাল। দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় আমরা চাকরি জীবন অতিক্রম করেছি। ২০০৫ সালে জগন্নাথ-সোহেল নিহত হওয়ার পর ২০১৮ সালে আমরা সহকর্মী জগন্নাথ পাঁড়ের পৈতৃক ভিটা বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে বিস্মিত হয়েছি! আজও পদ্মা গ্রামে যাওয়ার সরাসরি কোনো রাস্তা নেই। গ্রামের আইল ধরে হাঁটতে হয়। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এখন অবধি পদ্মা গ্রামে বিদ্যুৎ যায়নি। সেই গ্রামের একটি ছেলে পদ্মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-হাইস্কুল পেরিয়ে রাজধানী ঢাকার ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। এ ঘটনা শুধু গল্প বা উপন্যাসে পাওয়া যাবে। জগন্নাথ পাঁড়ের জন্য ঢাকায় এসে জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার লড়াইটা সত্যিই কঠিন ছিল। বিচার বিভাগেও মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন তিনি। জগন্নাথ পাঁড়ের পরিবার যে সময় একটু আশার আলো দেখেছিল, ঠিক সেই সময়েই জঙ্গিবাদীদের হামলায় তার পরিবারের স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটে। জগন্নাথ পাঁড়ের সেই বাড়িতে গিয়ে আমাদের চোখের জলে আমরা প্রিয় সহকর্মীকে স্মরণ করেছি। শহীদ সোহেল আহমেদ ছিলেন সচ্ছল পরিবারের সন্তান। ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্র এখন সুযোগ্য নেতৃত্বে সঠিক পথে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই গতি চলমান রাখতেই হবে। আমাদের সম্পদ লুটকারী পাকিস্তান রাষ্ট্র বাংলাদেশের সমকক্ষ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তবে বিচার বিভাগের এই দুই শহীদের পরিবারকে আমাদের সব রকম পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। তবেই তাদের আত্মবলিদান সার্থক হবে। আমরা বিচার বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় জঙ্গিবাদীদের হামলায় শহীদ হওয়া বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও শহীদ সোহেল আহমেদকে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করি। বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ), জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, বরিশাল

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি