নিজেদের ব্যর্থতা বিরোধীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে: জামায়াত আমির
প্রকাশিত : ১৬:২৪, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৬:২৬, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
সরকার নিজেদের ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের ওপর চাপিয়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরানোর চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
রোববার প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জুলাই সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আলোচনা সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ করতে না পারা, দ্রব্যমূল্যের চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে। চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করানোর মাধ্যমে জনসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করলেও শুধু পদত্যাগের মধ্য দিয়ে অপরাধের বিচার শেষ হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু জনগণের সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে এবং বৈষম্য আরও বাড়ছে। যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তরুণেরা জীবন দিয়েছেন, সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জামায়াত আমির বলেন, দীর্ঘ সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আলোচনার মধ্য দিয়ে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সনদ বাস্তবায়নের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নির্বাচন ও সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। জামায়াতের অবস্থান ছিল, আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে, এরপর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু একই দিনে দুটি নির্বাচন বা কার্যক্রম আয়োজনের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে কোনো ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কমিটির সঙ্গে বিরোধী দলের আলোচনায় বসা উচিত। জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকেই নিতে হবে। অতীতে সংবিধান সংশোধনের পর আদালতে তা বাতিল হওয়ার নজির রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন কোনো প্রক্রিয়ায় এগোনো উচিত নয়, যাতে শেষ পর্যন্ত সংস্কারের উদ্যোগ আইনি জটিলতায় পড়ে ব্যর্থ হয়।
জামায়াত আমির বলেন, অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরিবর্তনের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। একসময় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আন্দোলন করতে হয়েছে, মিছিল করতে হয়েছে এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের অধিকার ও সংস্কারের প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ডা.শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে বিরোধীদের দোষারোপ করা হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার দায় কেন বিরোধী দলের ওপর চাপানো হবে? সরকারের ভুলত্রুটি থাকলে তা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় স্থান দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তিনি বলেন, একদিকে সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ আসা ও অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে এসব অভিযোগ প্রতিরোধে সরকারের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও মাদক প্রবেশের অভিযোগ থাকলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, জনগণকে বিভিন্ন ধরনের কার্ড দেয়ার উদ্যোগের কথা বলা হলেও মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। দুর্নীতির বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের চাপের পাশাপাশি চাঁদাবাজির কারণে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। একদিকে ক্রেতাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।
তিনি পঞ্চগড়ে চারটি লাউ এক টাকায় বিক্রির খবরের উল্লেখ করে বলেন, উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত দাম না পেয়ে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ রাজধানীতে সেই পণ্য একই দামে পাওয়া যায় না। কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে দামের এই ব্যবধানের কারণ খতিয়ে দেখা এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন










