মানুষের মতো কাজ শিখছে চীনা রোবট!
প্রকাশিত : ২১:৪৫, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৪, ১০ অক্টোবর ২০২৬
একটা কারখানার কথা ভাবুন। চারদিকে যন্ত্রপাতির শব্দ। কেউ বৈদ্যুতিক প্যানেল পরীক্ষা করছেন, কেউ ভারী যন্ত্রের ভালভ খুলছেন, আবার কেউ খুব সাবধানে একটি যন্ত্রের ছোট্ট অংশ ঠিক জায়গায় বসাচ্ছেন। কাজগুলো মানুষের কাছে হয়তো খুব স্বাভাবিক। কিন্তু একটি রোবটকে দিয়ে একই কাজ করাতে গেলে প্রয়োজন হয় দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, অসংখ্য তথ্য আর বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
এখন সেই রোবটকেই মানুষের কাজের ভিডিও দেখিয়ে, কম্পিউটারে তৈরি কৃত্রিম পরিবেশে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা চলছে চীনে। লক্ষ্য শুধু রোবটকে নির্দেশ মেনে চলতে শেখানো নয়, বরং এমনভাবে তৈরি করা, যাতে সে চারপাশের পরিবেশ বুঝে বাস্তব কাজও করতে পারে। প্রযুক্তির এই নতুন ধারার নাম ‘এমবডিড এআই’ (Embodied AI)। আর এই প্রযুক্তিকে গবেষণাগার থেকে বের করে কারখানা ও কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন।
রোবটেরও চাই কাজ শেখার অভিজ্ঞতা
এত দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা উঠলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠত কম্পিউটার, চ্যাটবট কিংবা এমন কোনো সফটওয়্যার, যা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, ছবি তৈরি করতে পারে বা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু এমবডিড এআইয়ের ধারণাটি একটু আলাদা। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি বাস্তব কাঠামো, যেমন রোবট। ফলে সে শুধু তথ্য নিয়ে কাজ করে না, বরং ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সরের সাহায্যে পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই অনুযায়ী বাস্তব জগতে কাজ করার চেষ্টা করে।
ধরা যাক, একটি রোবটকে কারখানার ভালভ বন্ধ করতে হবে। শুধু ভালভ চিনতে পারলেই তার কাজ শেষ নয়। তাকে বুঝতে হবে ভালভটি কোথায়, কীভাবে সেখানে পৌঁছাতে হবে, কোন দিকে ঘোরাতে হবে এবং কাজটি ঠিকমতো হয়েছে কি না। মানুষ এসব কাজ করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে। ভুল হলে শুধরে নেয়, পরিস্থিতি বদলালে নিজের কাজের ধরনও বদলায়। রোবটকে এই ধরনের দক্ষতা শেখানোই এমবডিড এআইয়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মানুষের কাজের ভিডিও থেকে তৈরি হচ্ছে প্রশিক্ষণের ভাণ্ডার
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন ব্যবহার করছে বিপুল পরিমাণ ডেটা। মানুষের কাজ করার ভিডিও থেকে শুরু করে কম্পিউটারে তৈরি সিমুলেশন, সবকিছুই কাজে লাগানো হচ্ছে রোবটের প্রশিক্ষণে। বিষয়টি অনেকটা একজন নতুন কর্মীকে কাজ শেখানোর মতো। প্রথমে সে অভিজ্ঞ কাউকে কাজ করতে দেখে। এরপর নিজে চেষ্টা করে। ভুল হলে সংশোধন করে আবার চেষ্টা করে। রোবটের ক্ষেত্রে অবশ্য এই শেখার প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয় ডেটা, অ্যালগরিদম ও প্রশিক্ষিত এআই মডেলের মাধ্যমে।
বেইজিংয়ের চাংকুয়ানকুন প্রযুক্তি এলাকায় কাজ করছে লাইটহুইল এআই নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের পরিচালিত ডেটা প্ল্যাটফর্মে দেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য, মানুষের কাজের ভিডিও এবং সিমুলেশনের মাধ্যমে তৈরি কৃত্রিম ডেটা একত্র করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তারা ১৫ লাখ ঘণ্টারও বেশি মানুষের কাজের ভিডিও ডেটা সরবরাহ করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংগ্রহ বিশ্বের অন্যতম বড় ডেটাভাণ্ডার।
কেন এত বিপুল পরিমাণ ভিডিও দরকার? কারণ, একটি কাজের ধরন এক হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সব সময় এক থাকে না। কখনো যন্ত্রের অবস্থান বদলায়, কখনো বস্তুটি অন্যভাবে ধরতে হয়, আবার কখনো আশপাশের পরিবেশের কারণে কাজের পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হয়। বিভিন্ন পরিস্থিতির তথ্য থাকলে রোবটকে আরও বিস্তৃত অভিজ্ঞতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।
লাইটহুইল এআইয়ের নির্বাহী তু শিচি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির কথা বলেছেন, যেখানে রোবট বাস্তবে কাজ করার পর অর্জিত অভিজ্ঞতাও আবার প্রশিক্ষণের কাজে লাগানো যাবে। অর্থাৎ, রোবটের শেখার প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে থেমে থাকবে না। বাস্তব ব্যবহারের তথ্য থেকে তার দক্ষতা আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু পরীক্ষাগারে নয়, বাস্তবেও ব্যবহার হচ্ছে
দক্ষিণ চীনের কুয়াংতং প্রদেশের শেনচেন শহরে কিছু চাকাযুক্ত হিউম্যানয়েড রোবটকে বৈদ্যুতিক নিয়ন্ত্রণ প্যানেল পরিচালনা এবং শিল্পকারখানার ভালভ খোলা বা বন্ধ করার মতো কাজের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শেনচেন সাইবর্গ রোবোটিক্সের নির্বাহী তং তিয়ানবিয়াওয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার ডেটা নমুনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণের পর তাদের একটি রোবট নির্দিষ্ট কিছু কাজ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সফলতার হারে সম্পন্ন করতে পারছে। এই সংখ্যাটি অবশ্য সব ধরনের কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নির্দিষ্ট কাজ ও পরীক্ষার পরিস্থিতিতে রোবটটির পারফরম্যান্স বোঝাতেই এই হার উল্লেখ করা হয়েছে। তবু বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রোবটের দক্ষতা বাড়ানো মানে শুধু তাকে নতুন একটি কাজ শেখানো নয়, বরং এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে বাস্তব কর্মক্ষেত্রেও সে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজটি করতে পারে।
প্রশিক্ষণকেন্দ্র বাড়াচ্ছে চীন
এই প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে দেশটিতে তৈরি হচ্ছে বড় প্রশিক্ষণ অবকাঠামো। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চীনে ৭০টিরও বেশি এমবডিড এআই প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু রয়েছে। আরও ৪০টির বেশি কেন্দ্র নির্মাণাধীন অথবা পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পূর্ব চীনের ইয়াংচি নদী বদ্বীপ, উত্তরাঞ্চলের বেইজিং-তিয়ানচিন-হুবেই অঞ্চল এবং দক্ষিণের পার্ল নদী বদ্বীপ।
এই অঞ্চলগুলোতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার সমন্বয়ে রোবটের প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব প্রয়োজন। রোবটকে প্রশিক্ষণ দিতে যেমন ডেটা দরকার, তেমনি দরকার এমন পরিবেশ, যেখানে তাকে বাস্তব কাজের পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করা যাবে। প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো সেই সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি পরিকল্পনায়ও গুরুত্ব পাচ্ছে এমবডিড এআই
চীনের এই উদ্যোগ দেশটির সামগ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের সম্প্রসারণের অংশ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মূল এআই শিল্পের বাজারমূল্য ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে এবং এ খাতে ৬ হাজার ২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
২০২৬ সালের জুনে চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ তদারককারী সংস্থা এমবডিড এআই নিয়ে একটি কর্মসূচি চালু করে। শিল্পোৎপাদন, সেবাখাত এবং বিশেষায়িত কাজের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এর অন্যতম লক্ষ্য। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রও রয়েছে এই পরিকল্পনায়।
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ১০০টিরও বেশি উচ্চ-মূল্যের প্রয়োগক্ষেত্র চিহ্নিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনাটির মূল ধারণা হলো, বাস্তব পরিবেশে রোবটের কাজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, সেই তথ্য দিয়ে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটানো হবে, তারপর উন্নত ব্যবস্থাকে আরও বেশি ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে। এভাবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন একে অন্যকে এগিয়ে নিতে পারে।
ভবিষ্যতের কারখানায় মানুষের জায়গা কোথায়?
রোবটের দক্ষতা বাড়লে কারখানার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ, বিপজ্জনক যন্ত্র পরিচালনা কিংবা এমন কিছু দায়িত্বে তাদের ব্যবহার বাড়তে পারে, যেখানে মানুষের জন্য ঝুঁকি বেশি। একই সঙ্গে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে রোবট রাতারাতি মানুষের সব কাজ করে ফেলবে। ভিন্ন পরিবেশে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করা, অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামলানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাস্তব প্রয়োগের খরচ কমানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে বড় কথা, একটি নির্দিষ্ট কাজ সফলভাবে করতে পারা আর প্রতিদিন নানা পরিস্থিতিতে একই কাজ নির্ভুলভাবে করতে পারা এক বিষয় নয়। চীন এখন সেই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে। মানুষের কাজের অভিজ্ঞতা, বিপুল ডেটা এবং কৃত্রিম পরিবেশে প্রশিক্ষণকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে রোবটকে আরও দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ চলছে।
এই প্রযুক্তি কত দ্রুত বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়বে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভবিষ্যতের রোবটকে শুধু নির্দেশ পালন করতে শেখানোই যথেষ্ট হবে না। তাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে সে চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে কাজ করতে পারে এবং পরিবর্তিত পরিবেশেও নিরাপদে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
আর সেই ভবিষ্যৎ তৈরির দৌড়ে চীন এখন বড় পরিসরে বিনিয়োগ করছে।
এএইচ
আরও পড়ুন










