ঢাকা, মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

অভিনেত্রী তাজিন আহমেদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২০:৪২ ২৩ মে ২০১৮ | আপডেট: ১১:৩০ ২৮ মে ২০১৮

তাজিন আহমেদ

তাজিন আহমেদ

‘আমরা কিন্তু বেশ মৃত্যু নিয়ে উৎসবমুখর জাতিতে পরিণত হচ্ছি। অথচ মূল্যবান জীবিত মানুষটা ভুলে হোক, অভিমানে, অবহেলায় হোক, হারিয়ে গেলে খুঁজি না একবারও! সময় কোথায়! অথচ হাঁটা চলা মানুষটার জন্য একটু থমকে দাঁড়ালে, একটু ভাবলেই কিন্তু নড়ে চড়ে দম ফেলে সে। জীবিত অবস্থায় একটা ছবি দিয়ে যদি এমন নিউজ হতো, এই ধরেন- ‘তুখোড় অভিনেত্রী ছিলেন তাজিন, এখন দেখছি না কেন।’

আবার ধরেন, ‘একটা ফোন করে কেউ যদি বলে উঠতো, ‘তুমি কই, তুমি ছাড়া এই চরিত্র কেউ করতে পারবে না, আসো তো!’ আমার বিশ্বাস বেঁচে উঠতো এমন অনেক তাজিন/মিতারা।

কেউ সেটা করবে না কোনোদিনই। কারণ তখন সমাজ এবং পরিবারের গল্প থাকতে হবে, সংলাপ থাকতে হবে, প্রকৃত শিল্পী লাগবে! শিল্পের খোঁজ হবে পুরাদস্তুর। দরকার কি এসবের?

পুরনো পাতাটা কেবল সাহস করে ছিঁড়ে ফেললেই ব্যস, ল্যাটা চুকে যায়। এখন নাটকে মিতা, তাজিনদের লাগে না, কিছু অসাধারণ কাজিন আর চড়া মূল্যের পেছনে ভুলে যাওয়া, কিছু অর্বাচীন হলেই হলো! শিল্পী ছাড়াই শিল্পের বড্ড বেশি জয়জয়কার। কথা কোনো একজন তাজিনের নয়। অসংখ্য তাজিনরা বিলুপ্ত হচ্ছে নিদারুন উদাসিনতায়। আমরা বেশ বিবেক কে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে টক শো’র বিবেকের ভূমিকায় দিব্যি অভিনয় করে যাচ্ছি!

শুনছেন কি আপনারা! সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে! এ দায় যে আপনার, আমার সবার।’

ওপরের এই কথাগুলো অভিনেত্রী শাহনাজ খুশির। অভিনেত্রী তাজিন আহমেদের অকাল মৃত্যুতে তিনি ক্ষোভ মিশ্রিত এই মন্তব্য করেছেন। কাছের মানুষ বলেই তিনি এমনটি বলতে পেরেছেন। সত্যিই তাই আমরা জানিনা বা জানার চেষ্টাও করিনা, দেশের অসংখ্য গুণি শিল্পী নিজের কষ্ট নিয়ে অকালে এভাবেই চলে যায় অনেক অভিমানে।

সম্প্রতি একুশে টিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা হয় অভিনেত্রী তাজিন আহমেদের। সেই সময় তিনি মনের কষ্ট ও অভিমানগুলো প্রকাশ করেন শৌল্পিক বক্তব্যে। যে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিনোদন প্রতিবেদক- সোহাগ আশরাফ।

প্রয়াত এই গুনি শিল্পীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে অপ্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারটির কিছু অংশ তুলে ধরা হলো-

ইটিভি অনলাইন : আমরা আপনার অভিনয় দেখেছি অসাধারণ অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন আপনি আজও সেই অবস্থানটি দর্শকদের মাঝে রয়েছে কিন্তু সেই তাজিনকে কেনো আমরা নিয়মিত টেলিভিশনের পর্দায় দেখছি না?

তাজিন আহমেদ : আমি আসলে খুব বেশি কাজ এক সঙ্গে করতে অভ্যস্থ নই। করতেও চাই না। কারণ যা কিছু আজ করছি সব কিছুই হচ্ছে আমার জীবনের জন্য। আর জীবন মানেই হচ্ছে আমার পরিবার। সেই পরিবার আর জীবনকে উপেক্ষা করে কোন কিছুই করতে চাই না। পরিবারটা আমার একটা বড় জগৎ, সেটাকে অবহেলা করতে চাই না।

ইটিভি অনলাইন : অভিনয়ে কি আবারও নিয়মিত হবেন?

তাজিন আহমেদ : অভিনয় আমার ভালো লাগার একটা জায়গা। লোভের একটা জায়গা।  এখনও যে কাজ করছি না তা নয়। করছি, করব। যতদিন আমার শরীর, আমার মানসিক অবস্থা সাপোর্ট করবে ততদিন পর্যন্ত আমি অভিনয় করে যাবো। একটু কমিয়েছি, অত ব্যস্ত আর কখনও-ই হবো না। তবে খুব মনযোগ দিয়ে একটা কাজ আবার শুরু করছি। মানে আমার লেখালেখিটা করতে যাচ্ছি। নির্দেশনায় যাচ্ছি। অনেক আগে নির্দেশনা দিয়েছি। কিন্তু ওই সময় মনে হলো যে না আমার আরও অনেক কিছু শেখার আছে। আমাদের কে মানুষ একটা সেক্টরে খুব ভালোভাবে চেনে। তাই অন্য সেক্টরে কাজ করতে গেলে একটু যত্ন নিয়ে তবেই করতে হবে। মিডিয়ার অনেক বন্ধু আমাকে বলছে যে শুরু করো। করতে করতে এক সময় পারবে।

ইটিভি অনলাইন : গত বছর আপনার একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে পত্র-পত্রিকায় বেশ কিছু নিউজ হয়েছিল আত্মহত্যা নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন আপনি বিষয়টি একটু খুলে বলবেন? কোন প্রকার হতাশা থেকেই কি আপনি এটা দিয়েছিলেন?

তাজিন আহমেদ : বিষয়টি খুলেই বলি। আসলে ওই বিষয়টি কেউই বোঝেনি। বোঝার চেষ্টাও করেনি। একজন নারী সাংবাদিক লিখেছিলেন নিউজটা। তিনি হয়তো এমন সব নিউজের অপেক্ষাতেই থাকেন। শ্রদ্ধা রেখেই বলছি- এটা কোন সাংবাদিকতার মধ্যেই পড়ে না। উনি যদি ভালো করে লেখাটা পড়তেন, কমেন্টগুলো দেখতেন তবে বুঝতে পারতেন।

আমি ওই জায়গাটা অনুধাবন করেছি, তার মানেই এই না যে- আমি সুইসাইড (আত্মহত্যা) করছি। আশপাশে কিছু ঘটনা আছে না যে- যাদের নাম মুখে বলতে পারছি না, কিন্তু আমার তো বয়সটা বেড়েছে, চিন্তাভাবনাও কিছুটার পরিবর্তন হয়েছে। আশেপাশের কিছু পরিচিত মানুষদের দেখছিলাম, একজন সম্প্রতি এমনভাবে মারাও গিয়েছে, সে আত্মহত্যা করেছে, সবকিছু মিলিয়ে আমি আসলে অনুধাবন করছিলাম একটা মানুষ কোন পর্যায়ে গেলে এমন কাজ করতে পারে। আমরা কেউই আত্মহত্যাকে সাপোর্ট করি না। কিন্তু কোন পর্যায়ে গেলে একটা মানুষ আত্মাহত্যা করে এটা আগে বুঝতাম না।

এখন বুঝি ওই মানুষটার মানসিক অবস্থা কতটুকু শক্ত থাকে বা থাকে না যার কারণে সে এমন কাজ করতে পারে। যেটা আগে বুঝতাম না, এখন বুঝি।

আমার জীবনে কিন্তু অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। উত্থান, পতন সবই হচ্ছে। তারপরেও প্রতি নিয়ত আমি ফাইট করে যাচ্ছি। আমিও কিন্তু ভেঙে পড়ি। আমার একজন ঘনিষ্ট বন্ধু আছে যে আমাকে অনেক সাহস যোগায়। সে বলে- এখানেই শেষ নয় জীবন। আমার মা-ও বলে-এখানেই শেষ না। আমার মা যদি এই বয়সেও যুদ্ধ করেত পারেন এবং প্রতিটা মুহুর্ত ফেস করার মানষিকতা থাকে, তার বয়স ৬৯+, সেখানে আমি কেনো পারবো না?

ভেঙে পড়ি, আবারও নিজেই নিজেকে দাঁড় করাই। জীবনতো একবারের জন্যই। শেষ হয়ে গেলেই তো শেষ। দেখি না কি হয়! সব কিছু ফেস করে জীবনের শেষটা দেখি কি হয়?

ইটিভি অনলাইন : মাঝে আমরা রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখিছি আপনি কি রাজনীতিতে অংশ নিতে চাচ্ছেন?

তাজিন আহমেদ : না, না, না। কিছু দিনের জন্য যোগ দিয়েছিলাম। ববি হাজ্জাজ আমার পরিচিত। ওনার সঙ্গে কিছু কাজ করেছিলাম। তখন উনি আমাকে বলেছিলেন আমাদের হয়ে কিছু কাজ করেন না! আমি তখন জানতে চাই কি ধরণের কাজ? তখন সে বলে-পলিটিক্স। আমি বললাম- পলিটিক্স তো বুঝি না। তখন সে বললো যে, আপনি আপনার সেক্টরেই কাজ করবেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলন। তখন বললাম যে- ঠিক আছে। তাকে বললাম- আপনাদের নীতি কেমন? কি নীতি নিয়ে কাজ করেন? আমি একটা বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাসের বিপরীতে কিছু হলে আমি করবো না। তখন সে বললো- না সেরকম কিছু না। আমরাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। অন্যরা যেভাষায় বলছে আমরা হয়তো ভিন্নভাবে বলছি। যেমন ধরুণ- আমরা জয় বাংলা বলবো না, আমরা বলছি- ‘জয় বাংলাদেশ’। তখন কিছু কিছু বিষয় মনে হলো যে না ঠিক আছে। তখন ভাবলাম জীবনে আর কয়দিন বাঁচব? আজ আমি যে জন্য তজিন আহমেদ হতে পেরেছি, সেই জায়গাটার জন্য যদি আমিও কিছু করতে পারি, কোন একটা জায়গা, কোন একটা প্লাটফর্ম বা আন্দোলন করা যায়, যেটা আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। সবাইকে নিয়ে যদি কিছু করা যায় মনে হয় খুব ভলো হয়। সেই চিন্তায় তাদের সঙ্গে কাজের আগ্রহ দেখাই। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো- না বিষয়টার মধ্যে পলিটিক্যাল অন্যে বিষয়গুলো বেশি চলে আসছে। আরাম পাচ্ছি না। আমি আবার এরকম যে খুব মুডে চলি। ব্যাটে বলে মিললো না ধুপ করে ছেড়ি দেই। আর এটা সবাই জানে।

(হেসে বললেন) আমাকে নিয়ে কেউ কাজ করতে গেলে সবাই প্রথমে জিজ্ঞাস করে- কি মাথা ঠাণ্ডা রেখে করবা তো? তারা বলে যে- তুমি যখন শুরু করো পাগলের মত খেটে করো, তবে কেনো হুট করে তোমার পাগলামী হয়? তখন তাদের বলি ওই যে- ব্যাটে বলে মেলে না। এরপর থেকে আর রাজনীতির পথে নেই। তবে ওনারা অনেক ভালো মানুষ। যোগাযোগ আছে। অনেকের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে ভবিষতে যে করব না তা বলছি না। সেরকম ভালো জায়গা পেলে করতেও পারি।

এসএ/ এসএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি