ঢাকা, মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

একটা সময় সবাই অনলাইনেই পড়ালেখা করবে: আয়মান সাদিক

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৭:৩১ ২৪ জুলাই ২০১৮ | আপডেট: ১৯:৪০ ২৬ জুলাই ২০১৮

টেন মিনিট স্কুল। বাংলাদেশে অনলাইন জগত নিয়ে যাদের টুকটাক ধারণা আছে তাদের সবার কাছে পরিচিত নাম। অনলাইনে যে পড়ালেখা করা যায়, পাঠদান করা যায় দেশে সেই ধারণাটিই বাস্তবায়ন করেছে ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্ম। কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ ব্রিটিশ রাণীর ‘কুইন্স ইয়ং অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’সহ পেয়েছে বেশ কয়েকটি পুরস্কার। প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক টেন মিনিট স্কুলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ইটিভি অনলাইনের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইটিভি অনলাইনের সহ সম্পাদক শাওন সোলায়মান।   

ইটিভি অনলাইনঃ টেন মিনিট স্কুল শুরু করার তাগিদ অনুভব করলেন কী থেকে?

আয়মানঃ আমি যখন আইবিএ তে পড়া শুরু করি তখন স্টুডেন্ট পড়াতাম। কোচিং এ যখন পড়াতাম তখন অনেক স্টুডেন্ট এমন পেতাম যে বলত, ‘ভাইয়া সাত হাজার টাকা নিয়ে বাবা ঢাকা পাঠিয়েছে। কোচিং এর ফি ১৩ হাজার টাকা। কী করব?’ কোচিং-কে আমরা বলতাম যে, ৫০% মূল্যছাড় দিয়ে ও’কে ভর্তি করা হোক। কিন্তু ও থাকবে কোথায়? খাবে কী? এরকম একজন বা দুইজন না বরং প্রচুর স্টুডেন্ট আসত। তখন আমি দেখলাম যে, শুধু সামর্থ্য না থাকার কারণে অনেকে মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে না।

এটা তো ধরেন যারা ঢাকা আসতে পেরেছে তাদের ক্ষেত্রে। কিন্তু অনেকে আছে যারা ঢাকা আসতে পারছে না দেখে স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে না। যেমন ধরেন, ময়মনসিংহের একটা মেয়ের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। তার জন্য কোচিং করতে আসতে হবে ঢাকায়। কিন্তু ওই মেয়ের কোনো আত্মীয় নেই ঢাকায়। তাই বাবা-মা মেয়েটিকে ঢাকা পাঠাবে না। মেয়েটির আর স্বপ্ন পূরণ হয় না। তখন আমরা একটা পরিকল্পনা করলাম যে, শুধু সামর্থ্যের অভাবে অথবা ঢাকার বাইরে থাকা ছাত্ররা যেন বঞ্চিত না হয়। আমরা একটা তাগিদ অনুভব করলাম যে, ফ্রি (বিনামূল্যে) এবং অনলাইন এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবো।

ফ্রি তাই টাকা পয়সার বালাই নাই আর অনলাইন তাই যেকোনো জায়গা থেকেই শিক্ষার্থী এর থেকে সুযোগ নিতে পারবে। সেই থেকেই টেন মিনিট স্কুল প্রতিষ্ঠার তাগিদ বলতে পারেন।

ইটিভি অনলাইনঃ এই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করলেন এবং এখন তা বড় একটা সফলতা। তবে গল্পটা নিশ্চয়ই এতটা সহজ ছিল না। অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেগুলো কী ছিল?

আয়মানঃ আমাদেরকে মূলত দুই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে সবথেকে বেশি। প্রথমটা হচ্ছে যে, মানুষ প্রথমে বুঝত না যে, আমরা কী করি। এক আন্টি আমার আম্মুকে বলতো যে, ‘ভাবি, আয়মান কী করে?’ আম্মু বলতো, ‘ভিডিও-ঢিডিও বানায়’। তখন আম্মুকে অনেকে প্রশ্ন করত যে, ‘ভিডিও বানায়! কী ভিডিও বানায়?’ আম্মু বলতো, ‘ভাবি, তা তো জানি না। শুধু দেখি রাতের বেলা যায় সকালে চলে আসে’। যে শুনত তারা তো ভয়ই পেতো যে, কী করি আমরা!

এটা অবশ্য খুব স্বাভাবিক ছিল কারণ মানুষ তো বুঝত না। তারা এটা জানতই না যে, অনলাইনে কীভাবে পড়ায়।

আরেকটা সমস্যা ছিল যে, একটা পর্যায়ে গিয়ে আমাদের অর্থের প্রয়োজন হয়। পৃষ্ঠপোষক খুঁজে পাওয়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

ইটিভি অনলাইনঃ  তো সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবেলা করলেন?

আয়মানঃ প্রথম সমস্যাটা আমরা আমাদের কাজ দিয়েই কাটিয়ে উঠেছি। মানুষ দেখেছে যে আমরা করছি। ধীরে ধীরে মানুষের দ্বিধা ভেঙেছে। আমরা এখন রোজ প্রায় আড়াই লাখ স্টুডেন্টদের অনলাইনে পড়াচ্ছি। কেউ যখন ইউটিউব বা ফেসবুকে টেন মিনিট স্কুল সার্চ দিয়ে আমাদের পেইজে যাচ্ছে তখন তারা দেখছে যে, ‘আমার পাঠ্যবইয়ের জিনিসটিই ভিডিও করে দিয়েছে। বাহ!’

আমরা যখন প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সব ক্লাসের পড়ার কনটেন্টের ভিডিও করে অনলাইনে দিয়েছি তখন কেউ মিলিয়ে দেখে যে, ‘আরে আমার বিজ্ঞান তৃতীয় অধ্যায়ের ভিডিও!’ তখন জিনিসটা সবার মাঝে স্বাভাবিক হতে থাকে।

আর দ্বিতীয় সমস্যাটির জন্য আমরা কৃতজ্ঞ মোবাইল ফোন অপারেটর রবি এবং বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি বিভাগের কাছে। তাদের সরাসরি সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এটা সম্ভব হতো না। এভাবেই ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠি আমরা। এখনও যা আছে সামনে দিনগুলোতে আরও কেটে যাবে।  

ইটিভি অনলাইনঃ মুদ্রার অন্য পিঠ নিয়ে একটু আলাপ করি। আপনারা খুবই দারুণ একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রজীবনে টিউশনি বা কোচিং করান। স্কুল কলেজের শিক্ষকরা তো করানই। আপনাদের প্ল্যাটফর্মের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সব শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি আয়ের যে একটা সুযোগ ছিল, সেটা কি নষ্ট হবে না?

আয়মানঃ আমার তেমনটা মনে হয় না। আর মনে না হওয়ার কারণটা একটু ব্যাখ্যা করি। আমরা টেন মিনিট স্কুল এখনও খুবই ছোট আর সীমিত পরিসরে আছি। কিন্তু তারপরেও আমাদের সঙ্গে এখন প্রায় দেড়শ’ জন কাজ করেন। অনেক শিক্ষকরা আছেন যারা আমাদের এখানে ক্লাস নেন; তার জন্য একটা পারিশ্রমিক পান। অনেকে লাইভে ক্লাস নেন। তাদেরকে কিন্তু আমরা একটা ‘সম্মানী’ দেই। আমার মনে হয়, আমাদের প্ল্যাটফর্মের কারণে এই পড়ানো বিষয়টা আরও সহজ হয়েছে। কারণ এখন কাউকে স্বশরীরে গিয়ে পড়াতে হচ্ছে না। বরং নিজ জায়গা থেকে অধিক মানুষকে পড়াতে পারছে।

আর এখন আমাদের সঙ্গে দেড়শ’ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু টেন মিনিট স্কুল যখন বড় হবে, তখন আঞ্চলিক হাব তৈরি হবে। তখন আরও মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এখন আমাদের প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী আছে। সামনে তো এটা আরও বাড়বে। তাই আমরা কোনো প্ল্যাটফর্ম নষ্ট করে কিছু করছি না বরং আমরা একটি সহজ এবং ফলপ্রসূ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি।

ইটিভি অনলাইনঃ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনি কী মন্তব্য করবেন? মানে, আমাদের কেন আসলে এই কোচিং, টিউশনি দরকার হয়। স্টুডেন্টদের ‘টেন মিনিট স্কুল’ই বা কেন দরকার হলো? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটা যদি এমন হতো যে, কারও কোচিং লাগবে না, টেন মিনিট স্কুল লাগবে। তাহলে কেমন হতো?

আয়মানঃ সার্বিকভাবে মানুষকে শেখানোর দরকার। মানুষ কোন জায়গা থেকে কোনো না কোনোভাবে শিখবে। এখন শেখার মাধ্যমটা আমার কাছে মনে হয় যে, অনলাইনে হলে অনেক সহজ হয়ে যায়। বিনামূল্যে হয়ে যায়। যেকোন জায়গা থেকে মানুষ এর ফল পেতে পারে।

আমি একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরে নেন আমি ভালো পড়াই। আমি একটা ক্লাস নিই। ক্লাসে ৪০ জন আছে। কিন্তু এই ক্লাসটা আমি অনলাইনে নিলে ৪০ হাজার মানুষ দেখতে পারে। আপনি যদি ৪০ জন করে এই ৪০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান তাহলে তো জনম পার হয়ে যাবে।

আপনার কাছে একটা প্রযুক্তি আছে, সুযোগ আছে। আপনি কেন এই সুযোগটা নেবেন না? এখন আপনি যদি চিন্তা করেন যে, আমার চাকা আবিষ্কার করে কী লাভ বা আমার মোটর আবিষ্কার করে কী লাভ? আমার ঘোড়ার গাড়ি তো নষ্ট হয়ে যাবে। আর পরিবর্তনটা যদি না আনেন তাহলে তো সমস্যা। তাহলে তো আপনি সামনের দিকে আগাতে পারবেন না। আমার মনে হয় মানুষ এখন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে। আর এডুকেশন সিস্টেমে অনলাইনে একটা বিশাল প্রভাব আসবে। একটা সময় সবাই অনলাইনেই পড়ালেখা করবে।

ইটিভি অনলাইনঃ এবার ‘হ্যাপি মোমেন্টস’ নিয়ে আলাপ করি। আপনি যখন জানতে পারলেন যে, আপনি কুইন্স অ্যাওয়ার্ড পেতে যাচ্ছেন। তখন কেমন অনুভব করেছিলেন আপনি?

আয়মানঃ আমার জানার মুহুর্তটা বেশ অবাক করার মতো ছিল। আর সবথেকে অবাক করা বিষয় ছিলো যে, খুশির মুহুর্তটা উদযাপন করতে পারছিলাম না।

আমাকে বলা হলো যে, একটা সেশন হবে। আমি ভাবলাম ইন্টারভিউ (সাক্ষাৎকার) সেশন হবে। আমরা ইতোমধ্যে দুই তিনটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। ভাবলাম হয়তো আরও হবে।

সুন্দর কাপড়চোপড় পরে আমার স্টুডিও’তে গিয়ে স্কাইপ অন করে বসেছিলাম। ইন্টারভিউ দিবো খাতা কলম নিয়ে। তখন তারা আমাকে বলল যে, এটা ফাইনাল কল। ইন্টারভিউ না। অনেক খুশি হয়েছিলাম। আমি পুরস্কারটা পেয়েছি। খুশি হলে মানুষ কী করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। কিন্তু শর্ত দিলো যে, এই খবর এখনই প্রকাশ করা যাবে না। ফেসবুকে দেওয়া যাবে না। দুই সপ্তাহ পর আনুষ্ঠানিকভাবে তারা জানাবে তখন প্রকাশ করতে পারব। তো খুব ভালো লাগতেছিল কিন্তু আনন্দটা চাপিয়েও রাখতো হয়েছিল।

ইটিভি অনলাইনঃ ইদানীং আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে বিসিএস নিয়ে এক ধরনের একটা ক্রেজ চলছে। সরকারি চাকরি না হলে বুঝি আর কিছুই না। আপনারা এমন স্রোতের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু যারা এই চিরাচরিত স্রোতেই আছে তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হবে?

আয়মানঃ বিসিএস অবশ্যই খুব ভালো একোটা জায়গা। কিন্তু এর বাইরে যে একটা বিশাল জায়গা আছে সেটা বুঝতে হবে। এরজন্য অনলাইনে পড়াশুনা করতে হবে। ইউটিউব তো এখন বড় একটা পাঠশালা। সেখান থেকে শিখে কাজে নামা যেতে পারে। বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হচ্ছে। এখানে কাজ করার যে বড় সুযোগ আছে তা কিন্তু আমাদের তরুণদের বুঝতে হবে। এখানে কাজ করার, সফলতা অর্জন করার অনেক সুযোগ আছে।        

ইটিভি অনলাইনঃ আপনারা সফল হলে। পুরো এই সফরটা নিয়ে যখন ভাবেন তখন কী চিন্তা করেন? এতদূর আসছেন বা এই যে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেন। একটা তারকা তকমা লেগে গেছে। কেমন লাগে?

আয়মানঃ তিন বছর হলো। শুরুর দিন মাত্র ১৫৭ জনকে পড়িয়েছিলাম। ঐদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। এখন আড়াই লাখ ছাত্রছাত্রীদের পড়াই। আমার কাছে মনে হয়, সফরটা মাত্র শুরু হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি ২৭ লাখ রেজিস্টার্ড শিক্ষার্থী আছে। এক লক্ষ ৭০ হাজার স্কুল আছে। আমরা সবাইকে এখনও ধরতে পারি নাই। আমি বলব যে, আমার স্বপ্ন মাত্র হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করেছে। আরও বহুদূর যাওয়া বাকি।

ইটিভি অনলাইনঃ সেই ‘দূর’টা কত দূরে?

আয়মানঃ এক লক্ষ ৭০ হাজার স্কুল আমাদের সাথে যুক্ত থাকবে। চার কোটি ২৭ লক্ষ শিক্ষার্থীই আমাদের এই প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত হয়ে বিনামূল্যে বিশ্বমানের পড়াশুনা করবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য, স্বপ্ন।

ইটিভি অনলাইনঃ ইদানীং আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে বিসিএস নিয়ে এক ধরনের একটা ক্রেজ চলছে। সরকারি চাকরি না হলে বুঝি আর কিছুই না। আপনারা এমন স্রোতের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু যারা এই চিরাচরিত স্রোতেই আছে তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হবে?

আয়মানঃ বিসিএস অবশ্যই খুব ভালো একোটা জায়গা। কিন্তু এর বাইরে যে একটা বিশাল জায়গা আছে সেটা বুঝতে হবে। এরজন্য অনলাইনে পড়াশুনা করতে হবে। ইউটিউব তো এখন বড় একটা পাঠশালা। সেখান থেকে শিখে কাজে নামা যেতে পারে। বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হচ্ছে। এখানে কাজ করার যে বড় সুযোগ আছে তা কিন্তু আমাদের তরুণদের বুঝতে হবে। এখানে কাজ করার, সফলতা অর্জন করার অনেক সুযোগ আছে।  

টেন মিনিট স্কুলের ওয়েব লিঙ্কঃ

http://10minuteschool.com        

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি