ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৪ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

একুশের শ্রেণিচরিত্র একাত্তর পেরিয়ে ভিন্ন চরিত্রে

প্রকাশিত : ২০:১১ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার একুশের সংগ্রাম, পরবর্তীকালে উনসত্তর-একাত্তরের সংগ্রাম— শেষোক্তটিকে মুক্তির সংগ্রাম বা স্বাধীনতার সংগ্রাম যা-ই বলি না কেন, এ গর্ব ও অহংকারের পেছনে কিছুটা বাস্তব সত্য রয়েছে, রয়েছে এর ভিন্ন দিকও—অনেকটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। একুশ (ফেব্রুয়ারি) বা একাত্তর (মার্চ বা ডিসেম্বর) এলে আমরা তাই আনন্দে-উল্লাসে মাতি জাতীয় চেতনার সরোবরে দুধেরই নয়, মধুর নহর বয়ে যায়।

জাতীয়তাবাদের চরিত্রটিই বোধ হয় এমন যে সে একদিকে আত্মগরিমায় অন্ধ, অন্যদিকে বিপরীত দিকে সত্যকে বুঝে নিতে, দেখে নিতে অনেকটাই উদাসীন। ব্যতিক্রমীরা যেমন অতীব সংখ্যালঘু অথবা শক্তিহীন, দুর্বল। তাঁরা সমাজকে এসব বিষয়ে সচেতন করার জন্য যথেষ্ট মাত্রায় শক্তিমান নন। কাজেই পরিস্থিতি পূর্ববৎ, অটল, অনড়। অথচ সময় ঠিকই বয়ে যাচ্ছে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে।

কথাটি বহু লেখক-বুদ্ধিজীবী কর্তৃক উদ্ধৃত—একুশের সংগ্রাম আমাদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের সূতিকাগার। একুশের পথ বেয়ে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত মুক্তিসংগ্রামে পরিণত হয়েছে, পরিণামে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র। প্রসঙ্গ একুশের সংগ্রামী চরিত্র, এর শ্রেণিচরিত্র নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবু একুশের সর্বজনীন অহংকারের গায়ে দাগ পড়েনি, সব সত্য ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসেনি, আংশিক সত্য নিয়ে আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছি। বিষয়টি ভিন্ন নয় একাত্তরের ক্ষেত্রে—বরং পরিণত সংগ্রাম বিচারে তা অধিক মাত্রায় সত্য।

দুই.

একুশের কথা দিয়েই শুরু করি। এই যে আমাদের কোনো কোনো শ্রেণিসচেতন লেখক একুশের শ্রেণিচরিত্র বিচার-ব্যাখ্যায় একে যাচাই করতে যুক্তিতর্ক তথ্যের ধোপাখানায় পাঠান, তারপর সাফাই শেষে এর চারিত্রিক যে বড় দিকটা স্বচ্ছ শুভ্র হয়ে ওঠে তা হলো বাংলা রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি। যে দাবি ভাষা আন্দোলনের মূল স্লোগান হিসেবে শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, জেলা-মহকুমা-থানা শহর হয়ে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল।

সেসব ক্ষেত্রে প্রধান স্লোগান ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। গ্রামের মানুষ, নিরক্ষর মানুষ রাষ্ট্রভাষার তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য বোঝে না। বোঝে লোকসংগীতে বয়ানে—‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’—এটুকুই। এটা তাদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাতৃভাষায় কথা বলে ভাব বিনিময়, চিত্তবিনিময়ের প্রয়োজন সারে। এই ভাষিক সংস্কৃতির মধ্যে তাদের বসবাস, জীবনযাপন। এর মাধ্যমেই তারা দিন, তারিখ, মাস, বছরের হিসাব-নিকাশ করে, সংখ্যাগত গোনাগুনতি করে—হোক তা টাকা-পয়সা বা অন্যকিছু।

মাতৃভাষা-সংস্কৃতি এভাবে তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। শিক্ষিত বাঙালি বঙ্গাব্দের দিন-তারিখের কথা জিজ্ঞেস করলে বিব্রত হয়, গ্রামের মানুষ ঠিক দিন-তারিখটি বলে দেয়, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষ। এসব কারণে মাতৃভাষার বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, যা তাদের অস্তিত্বের অংশ বৈ কিছু নয়। শহরের বা শিক্ষিত মানুষের কাছে মাতৃভাষা উল্লিখিত নিরিখে ধৃত নয়। তারা এর গুরুত্ব বোঝে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে রয়েছে ইতি ও নেতি—এই দুইয়েরই প্রভাব।

এই পার্থক্যটুকু মনে রেখে ভাষা আন্দোলনে আমাদের শিক্ষিত শ্রেণি বা তাঁদের সন্তানদের ভূমিকা বিচার করতে হবে। এটাই বাস্তবতা। তবে ব্যতিক্রম নেহাত কম নয়, যাঁরা একুশকে রাজনৈতিক শ্রেণিচরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে আন্দোলনের চরিত্র বিশ্লেষণ করেন। করেন আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ভাষাসংগ্রামীদের ভাষিক চরিত্র বিচার। সেখানে যেমন রয়েছে স্ববিরোধিতা, তেমনি ভিন্ন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।

আমরা জানি, একুশের আন্দোলনকে বাস্তবায়িত করেছিল মূলত শিক্ষায়তনের ছাত্র-ছাত্রীরা। ঢাকায় যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাধান্য পেয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায় বড় শহরে কলেজছাত্রদের প্রাধান্য এবং ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ভাষা আন্দোলনের মূল কারিগর—টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, বাজিতপুর থেকে চাটমোটর বা আক্কেলপুর।

এ বিভাজনে রয়েছে শ্রেণি বিভাজনের দিকটি বিশেষ তাৎপর্যে, মধ্য বা উচ্চবর্গীয় পরিবারের সন্তানদের এতে যোগদান মননশীল বিচার-ভাবনার মাধ্যমে। অবশ্য আবেগ যে সেখানে ছিল না, তা নয়। তাদের বিচার-ব্যাখ্যায় প্রাধান্য ছিল দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের গুরুত্ব। অন্যদিকে নিম্নবর্গীয়দের হিসাবে ভাষিক আবেগটি ছিল প্রধান বিষয়। তা ছাড়া ছিল বড়দের তাৎপর্য ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রভাষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা—যা না হলে বাঙালির রাষ্ট্রিক স্বার্থ সব নষ্ট হয়ে যাবে—অবাঙালি স্বার্থ প্রাধান্য পাবে, বাঙালি আবার দাসে পরিণত হবে। ভাব বিনিময়ের ভাষার (মুখের ভাষা) কোনো প্রকার দুর্গতি কে মানতে চায়? প্রতিবাদ তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তিন.

শ্রেণিগত এই ভিন্নতা বিবেচনায় রেখেও আমরা দেখতে পাই, একুশের ভাষা আন্দোলনের বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শহরে এবং গ্রামাঞ্চলে—এবং এর চরিত্র সর্বজনীন শ্রেণি-নির্বিশেষ। তদুপরি এর প্রধান চরিত্র শিক্ষায়তনিক চরিত্রের পাশাপাশি রয়েছে শ্রমজীবীকর্মী মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা। শেষোক্তদের অনেকে মিছিল-সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছে, আবার অনেকে নানাভাবে এতে সমর্থন জুগিয়েছে। সমর্থন দিয়েছে বা অংশ নিয়েছে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বড়সড় অংশ, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদেরও অংশবিশেষ (যেমন নীলক্ষেত ব্যারাক বা সচিবালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী)।

একুশের এই সর্বজনীন শ্রেণি-নির্বিশেষ চরিত্র সত্ত্বেও একটি বাস্তব সত্য মনে রাখতে হবে যে এ আন্দোলনের প্রধান কুশীলব ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়—কলেজকেন্দ্রিক ছাত্র-ছাত্রী, শহরে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এবং গ্রামাঞ্চলের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী। এককথায় প্রধানত শিক্ষিত শ্রেণির বা মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী শ্রেণির সন্তানরা। তারা স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় এ আন্দোলনে তৈরি করেছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠায়, সেই সঙ্গে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে।

এখানেও রয়েছে ভিন্নতর শ্রেণি বিভাজন। রাজধানী ঢাকা থেকে শহরে উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা এবং ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে নিম্নবর্গীয় পরিবারের ছাত্র-ছাত্রীরা। এরা এদের শ্রেণিগত অবস্থানে থেকেই আন্দোলন পরিচালনা করেছে—যেমন চাটমোহরের আবুল হোসেন কিংবা মেহেরপুরের নজির হোসেন। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাবীবুর রহমান শেলী বা গোলাম আরিফ কিংবা আনোয়ারুল হক খান বা কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ।

লক্ষণীয় যে নানা বাধা-বিপত্তি বা জেল বা আত্মগোপন সত্ত্বেও এদের ভবিষ্যৎ জীবন তথা ক্যারিয়ার উজ্জ্বলই থেকেছে। এদের কেউ বিচারপতি, কেউ আইনজীবী, কেউ সিএসপি আমলা। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন এদের আর্থ-সামাজিক গৌরব কেড়ে নিতে পারেনি। আর রাজনীতিকরা যাঁরা এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তাঁরা তো ভবিষ্যতে দিব্যি মন্ত্রিত্বের আসনে বসে কীর্তিমান হয়েছেন।

অন্যদিকে নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবর্গীয় ভাষাসংগ্রামী অনেকেরই জীবনকাহিনি করুণ। স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ক্যারিয়ার গড়া দূরে থাক, ভবিষ্যৎ জীবনটাই গড়ে তুলতে পারেননি চলনসই মানে। আবুল হোসেন দরিদ্র গ্রামডাক্তার—কোনো রকমে জীবিকা নির্বাহ করেন। গাইবান্ধার কার্জন আলী অর্থের অভাবে যথাযথ চিকিৎসা চালাতে পারেননি, অবশেষে মৃত্যু।

এমন একাধিক উদাহরণ একুশের শ্রেণিচরিত্র ও শ্রেণিবৈষম্যের প্রকাশ ঘটিয়ে এর প্রচারিত মহিমা ক্ষুণ্ন করেছে। একাডেমি প্রাঙ্গণের উজ্জ্বল আলোয় এরা আলোচিত, অনুপস্থিত। ব্যতিক্রম নয় টেকনাফ, রামু, উখিয়া বা বাজিতপুর। শুনেছি রফিক উদ্দিন ভুঁইয়ার মতো জাঁদরেল ভাষাসংগ্রামী নেতার শেষ জীবন কেটেছে দারিদ্র্য, দুস্থ ও চিকিৎসাহীন অবস্থায়। বিত্তবান ভাষাসংগ্রামীরা যে অঞ্চলের হোন, এদের সাহায্যে এগিয়ে আসেননি, সরকার তো নয়ই।

শ্রেণিবৈষম্য যে কত বড় সত্য, কী নিদারুণ বাস্তবতা, এসব ঘটনা তার প্রমাণ। এগুলো যেমন ভাষা আন্দোলনের শ্রেণিচরিত্র তুলে ধরে, তুলে ধরে শ্রেণিবৈষম্যের পরিণাম। একই মাত্রায় মুক্তিযুদ্ধও একই ঘটনাচরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এখানে অর্থনীতি-রাজনীতি শ্রেণিগত বিভাজন একভাবে প্রকাশিত, বরং কিছুটা অধিক মাত্রায়। একাত্তর বহুজনকে মন্ত্রিত্বের মহিমায় খ্যাতিমান করেছে, অনেককে আটপৌরে জীবন যাপনে বাধ্য করেছে, স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে আবার কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়েও চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় জীবন কাটিয়েছেন। যেমন—গাইবান্ধার মুক্তিযোদ্ধা হেলাল উদ্দিন, চালের গুদামের কুলি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া-আসা তাঁর এবং সহযাত্রীদের জীবনে কোনো প্রকার রং ফোটাতে পারেনি।

শ্রেণি বিভাজনের এই পরিণতি যেমন একুশেকে, তেমনি একাত্তরকে বৈষম্যের কালো দাগে চিহ্নিত করেছে। সর্বজনীন ভাষাসংগ্রাম কিংবা একাত্তরের জনযুদ্ধ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘জন’-কে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে পারেনি। পারেনি শক্তিমান মধ্যবিত্ত বা উচ্চ শ্রেণির নিজ নিজ স্বার্থপরতার কারণে। তারা আপন ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ ও শ্রেণিস্বার্থের সমৃদ্ধি ঘটিয়েছে চেতায় বিন্দুমাত্র গ্লানির রেখা চিহ্নিত না করে। তাঁরা গাড়ি-বাড়ি, প্রাসাদোপম ভবনে জীবনযাপন করে ভুলে থেকেছেন সহযোদ্ধাদের কথা।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট? কী এক পরিহাসজ্ঞাপন শব্দ? আর ভাষা আন্দোলন? সে এমনই অবহেলিত যে দুস্থ ভাষাসংগ্রামীদের জন্য কোনো কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের কথা সরকার বা সুবিধাভোগী শ্রেণির মনে হয়নি। কারণ তারা শ্রেণিগত সুবিধার প্রসাদপুষ্ট পৃথুল দেহাবয়বের মানুষ। চিত্তে একই প্রকার মেদসূ্থলতা। মস্তিষ্ক কোষগুলোতে মেদভার। সহযোদ্ধাদের কথা বিস্তৃতির গভীরে চাপা পড়ে আছে। এটাই আর্থ-সামাজিক দর্শনের নিয়ম।

একুশ বা একাত্তরের সংগ্রাম আমাদের শ্রেণিচরিত্রে বিন্দুমাত্র ছাপ ফেলেনি, শ্রেণিচরিত্রের পরিবর্তন তো দূরের কথা। কোনো বন্ধু যখন বিদায়ক্ষণে সহযোদ্ধাকে বলেন, ‘মনে রেখো’, তখন বলতে ইচ্ছা করে—কে কাকে মনে রাখে? একমাত্র শ্রেণিচরিত্রই স্মরণের বিষয়টি নির্ধারণ করে, অন্য কোনো নিরিখে নয়।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, ভাষাসংগ্রামী।

 

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি