ঢাকা, বুধবার   ২৮ অক্টোবর ২০২০, || কার্তিক ১৩ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

কালো আফ্রিকান মেয়ে বারাকাহ’র গল্প

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:৪০ ১৪ আগস্ট ২০২০

আমাদের নবীজী (স.)’র পিতা আব্দুল্লাহ একদিন মক্কার বাজারে গিয়েছিলেন কিছু কেনা-কাটার জন্য। সেখানে গিয়ে এক জায়গায় তিনি দেখলেন, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এক লোক কিছু দাস-দাসী বিক্রি করছেন। আব্দুল্লাহ দেখলেন তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, একটি ছোট নয় বছরের কালো আফ্রিকান আবিসিনিয়ার মেয়ে। মেয়েটি কিছুটা রুগ্ন, হালকা-পাতলা গঠনের। কেমন মায়াবী ও অসহায় দৃষ্টি দিয়ে তাঁকিয়ে আছে সে। মেয়েটাকে দেখে তাঁর মায়া হলো। তিনি ভাবলেন, ঘরে আমেনা একা থাকেন, মেয়েটা পাশে থাকলে তার একজন সঙ্গী হবে। এই ভেবে তিনি মেয়েটাকে কিনে নিলেন।

মেয়েটিকে আব্দুল্লাহ ও আমেনা অনেক ভালোবাসতেন। স্নেহ করতেন এবং তারা লক্ষ্য করলেন যে, তাদের সংসারে আগের চেয়েও বেশি রহমত ও বরকত চলে এসেছে। এই কারণে আব্দুল্লাহ ও আমেনা মেয়েটিকে আদর করে নাম দিলেন ‘বারাকাহ’।

তারপর একদিন আব্দুল্লাহ ব্যবসার কারণে সিরিয়া রওনা দিলেন। আমেনার সাথে সেটাই ছিল তাঁর শেষ বিদায়। তাঁর যাত্রার দু’ এক দিন পর আমেনা একরাতে স্বপ্নে দেখলেন। তিনি দেখেন যে- আকাশের একটা তারা যেন খুব আলো করে তার কোলে এসে পড়লো। পরদিন ভোরে তিনি বারাকাহকে এই স্বপ্নের কথা বললেন। 

উত্তরে বারাকাহ মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার মন বলছে আপনার একটা সুন্দর সন্তানের জন্ম হবে।’

আমেনা তখনও জানতেন না তিনি গর্ভধারণ করেছেন। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি বুঝতে পারলেন, বারাকাহর ধারণাই সত্যি। 

আব্দুল্লাহ আর ফিরে আসেন নি, সিরিয়ার পথেই ইন্তেকাল করেছেন। আমেনার সেই বিরহ ও কষ্টের সময়ে, বারাকাহ ছিলেন  সবচেয়ে কাছের একমাত্র সঙ্গী। এক সময় আমেনার অপেক্ষা শেষ হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনইয়াতে তাশরীফ আনলেন।

আমাদের নবীকে দেখার ও স্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়েছিল যে মানুষটির, সে হলো এই আফ্রিকান ক্রিতদাসী ছোট কালো মেয়েটি। তিনি আমাদের নবীকে নিজ হাতে আমেনার কোলে তুলে দিয়েছিলেন এবং আনন্দ ও খুশিতে বলেছিলেন, ‘আমি কল্পনায় ভেবেছিলাম সে হবে চাঁদের মত, কিন্তু এখন দেখছি, সে চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’

এই সেই বারাকাহ যিনি নবীজি (স.)’র জন্মের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র তের বছর। ছোটবেলায় শিশু নবীজী (স,) আমেনার সাথে যত্ন নিয়েছেন, গোসল দিয়েছেন, খাওয়াতে সাহায্য করেছেন, আদর করে ঘুম পাড়িয়েছেন। ইন্তেকালের সময় আমেনা বারাকাহর হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন তাঁর সন্তানকে দেখে শুনে রাখেন। বারাকাহ তাই করেছিলেন। বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়ে, ইয়াতিম নবীজী (স.) আসলেন দাদা আবদুল মোত্তালিবের ঘরে। উত্তরাধিকার সূত্রে নবীজী (স.) বারাকাহর নতুন মনিব। তিনি একদিন বারাকাহকে মুক্ত করে দিলেন, বললেন, ‘আপনি যেখানে ইচ্ছে চলে যেতে পারেন, আপনি স্বাধীন ও মুক্ত।’

সেই শিশুকাল থেকেই নবীজী (স.) ক্রীতদাস প্রথাকে দূর করতে চেয়েছিলেন। বারাকাহ নবীজী (স.)-কে ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না, থেকে গেলেন। মায়ের ছায়া হয়ে পাশে থেকে গেলেন। এমনকি নবীজির (স.) দাদা তাঁকে বিয়ে দেয়ার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। তাঁর একই কথা, ‘আমি আমেনাকে কথা দিয়েছি, আমি কোথাও যাবো না।’

তারপর একদিন খাদিজা (রা.) এর সাথে নবীজি (স.)’র বিয়ে হলো। বিয়ের দিন রাসূল (স.) খাদিজা (রা.)-এর সাথে বারাকাহকে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

তিনি বললেন, ‘উনি হলেন আমার মায়ের পর আরেক মা।’ বিয়ের পর রাসূল (স.) একদিন বারাকাহকে ডেকে বললেন, ‘উম্মি!  আমাকে দেখাশুনা করার জন্য এখন খাদিজা (রা.) আছেন, আপনাকে এখন বিয়ে করতেই হবে।’ (নবীজি (স.) তাকে উম্মি ডাকতেন, নাম ধরে ডাকতেন না)।

তারপর রাসূল (স.) ও খাদিজা (রা.) মিলে তাঁকে উবাইদ ইবনে জায়েদে (রা.)’র সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। কিছুদিন পর বারাকাহর নিজের একটা ছেলে হলো, নাম আইমান। এরপর থেকে বারাকাহর নতুন নাম হয়ে গেলো ‘উম্মে আইমান’ (রা.)।

একদিন বারাকাহর স্বামী উবাইদ (রা.) মৃত্যু বরণ করেন। নবীজি (স.) আইমান ও বারাকাহকে সাথে করে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন এবং সেখানেই থাকতে দিলেন। কিছুদিন যাওয়ার পর নবীজি (স.) একদিন বেশ কয়েকজন সাহাবীকে ডেকে বললেন, ‘আমি একজন নারীকে জানি, যার কোন সম্পদ নেই, বয়স্কা এবং সাথে একটা ইয়াতিম সন্তান আছে কিন্তু তিনি জান্নাতি। তোমাদের মধ্যে কেউ কি একজন জান্নাতি নারীকে বিয়ে করতে চাও?’

এইকথা শুনে জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) নবীজি (স.)’র কাছে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। নবীজি সা. উম্মে আইমান (রা.) এর সাথে কথা বলে বিয়ের আয়োজন করলেন। বিয়ের দিন রাসূল (স.) জায়েদ (রা.)-কে বুকে জড়িয়ে আনন্দে ও ভালোবাসায়, ভেজা চোখে, কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি কাকে বিয়ে করেছো, জানো জায়েদ?’ 

জায়েদ (রা.) উত্তর দিলেন- ‘হ্যাঁ, উম্মে আইমানকে।’

নবীজি (সা.) বললেন, ‘না, তুমি বিয়ে করেছো, আমার মাকে।’

সাহাবীরা বলতেন, রাসূল (স.)-কে খাওয়া নিয়ে কখনো জোর করা যেত না। উনি সেটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু উম্মে আইমান একমাত্র নারী, যিনি রাসূল (স.)-কে খাবার দিয়ে ‘খাও’, ‘খাও’ বলে তাড়া দিতেন। আর খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাশে বসে থাকতেন। নবীজি মৃদু হেসে, চুপচাপ খেয়ে নিতেন।

রাসূল (স.) উনার দুধমাতা হালিমা (রা.)-কে দেখলে যেমন করে নিজের গায়ের চাদর খুলে বিছিয়ে তার উপর হালিমা (রা.) কে বসতে, দিতেন ঠিক তেমনি মদিনা শরীফে হিজরতের পর দীর্ঘ যাত্রা শেষে উম্মে আইমান (রা.) যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন নবীজি (স.) তাঁর গায়ের চাদরে একটা অংশ পানিতে ভিজিয়ে, উম্মে আইমান (রা.)’র মুখের ঘাম ও ধুলোবালি নিজ হাতে মুছে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘উম্মি! জান্নাতে আপনার এইরকম কোন কষ্ট হবে না।’

নবীজি (স.)’র ওফাতের আগে সাহাবীদের অনেক কিছুই বলে গিয়েছিলেন। সেই সব কথার মধ্যে একটা ছিল, উম্মে আইমান (রা.)-এর কথা। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা উম্মে আইমানে (রা.)-এর যত্ন নিবে, তিনি আমার মায়ের মত। তিনিই একমাত্র নারী, যিনি আমাকে জন্ম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছেন। আমার পরিবারের একমাত্র সদস্য, যিনি সারা জীবন আমার পাশে ছিলেন।’

সাহাবীরাও সেই কথা রেখেছিলেন। গায়ের কালো রং নয়, কোনো ক্রীতদাসী নয়, তাঁর পরিচয় তিনি নবীর আরেক মা। তাই মায়ের মতোই তাঁরা এই বৃদ্ধ নারীকে ভালোবেসে আগলে রেখেছিলেন।


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি