ঢাকা, রবিবার   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ চুরি

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

প্রকাশিত : ২২:১৫ ২০ নভেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ১৭:৩৫ ২১ নভেম্বর ২০১৯

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত যোগ্যতায় নয়ছয় করে স্নাতকে (সম্মান) দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়া এক প্রার্থীকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিষয়টিকে নিয়মের বাইরে রেখে কৌশল অবলম্বন করেছেন খোদ উপাচার্য ও রেজিষ্ট্রার।

নিয়োগে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে একুশে টেলিভিশনকে জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক, কর্মকর্তা। এছাড়াও অনুসন্ধানে উঠে আসে বিভিন্ন নিয়মবর্হিভূত কর্মকাণ্ড। 

জানা যায়, গেল বছরের ডিসেম্বরে প্রত্নতত্ত্বসহ বেশ কয়েকটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। তবে স্নাতকে ২য় শ্রেণি প্রাপ্ত একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য নিয়মবর্হিভূতভাবে শর্ত কমিয়ে প্রত্নতত্ব বিভাগে প্রভাষক পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ৫০তম একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল ৬৮ তম সিন্ডিকেট সভা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে কলা অনুষদ থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভূক্ত করে। তৎকালীন সময়ে চলমান নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভূক্ত বিভাগসমূহে প্রভাষক পদে আবেদনের যোগ্যতা স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে নূন্যতম সিজিপিএ ৩.৬০ (৪ এর মধ্যে) র্নিধারিত ছিল। ঐ বছরের ৮ আগষ্ট সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভূক্ত গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, নৃবিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। 

তবে বিজ্ঞপ্তিতে অন্যান্য বিভাগের জন্য প্রার্থীর যোগ্যতা ঠিক রাখা হলেও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ক্ষেত্রে কম যোগ্যতা চাওয়া হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ক্ষেত্রে বলা হয়, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির উভয়টিতে জিপিএ/সিজিপিএ ৩.৫০ অথবা উভয়টির যে কোন একটিতে ১ম শ্রেণি ও অপরটিতে ৫৫ শতাংশ নম্বরসহ ২য় শ্রেণি থাকতে হবে। এমনকি বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি ও এইচএসসি’র যোগ্যতাও কমিয়ে রাখা হয়েছিল। নিয়মের বাইরে গিয়ে এমন শর্ত করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়োগ দেওয়ায় বিষয়টি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. আবু তাহের নির্দিষ্ট প্রার্থীর জন্য আইনবর্হিভূত শর্ত উল্লেখিত বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন। বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীনের স্ত্রীকে এ বিজ্ঞপ্তির আলোকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে শর্তে কারসাজির মাধ্যমে দুর্নীতি করা হয়েছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।

নিয়োগ পাওয়া ঐ প্রভাষক ১৯৯৭-১৯৯৮ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে ৩ বছরের স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭তম ব্যাচের এ শিক্ষার্থী ২য় শ্রেণিতে স্নাতক অর্জন করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এমন গোঁজামিল করায় আর্থিক লেনদেন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান হোসেন ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। সে সময় ক্ষমতার দাপটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক লাঞ্ছনারও অভিযোগ রয়েছে ইমরানের বিরুদ্ধে। ইমরান নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সাবেক শিক্ষার্থী ড. আবু তাহেরের অনুসারী ও দলীয় আস্থাভাজন। সোহরাব উদ্দীনের স্ত্রীকে নিয়োগ দেয়ার জন্য ইমরানের আবদারেই ড. আবু তাহের এমন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন বলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এক শিক্ষক জানান।
 
বিজ্ঞপ্তির এমন কারসাজির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি মো. সাদেকুজ্জামান বলেন, ‘ঐ বিজ্ঞপ্তি বিভাগের সুপারিশে দেওয়া হয়নি। বিজ্ঞপ্তি তো রেজিষ্ট্রার দেন। বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়ে বিভাগকে জানানো হয়নি। বিষয়টা প্রশাসন বলতে পারবে। তারা যদি তাদের মতো কাজ করে তাহলে বিভাগের কি করার আছে।’ বিজ্ঞপ্তিতে নয়ছয় করার পর বিভাগের সভাপতি হিসেবে আপনার দায়িত্ব কি ছিল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞপ্তি তারা দিয়েছে এখানে আমার কি করার ছিল। আমি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কাজ করেছি।’ সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী বিভাগ থেকে নিয়োগের এমন যোগ্যতা দেওয়া না হলে কিসের শর্ত কমিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ?

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্বে ছিলেন বা এখনও রয়েছেন এমন প্রায় ২০ জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোন বিভাগের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়াবলীতে শর্ত নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিভাগ ভিত্তিক প্লানিং কমিটি থাকে। এই প্লানিং কমিটি নিয়োগের শর্তসহ শিক্ষক চাহিদা ও পদোন্নতির বিষয় নির্ধারণ করে তা অনুষদের নির্বাহী পরিষদে প্রেরণ করে। অনুষদের ডিনের সভাপতিত্বে ঐ নির্বাহী পরিষদের সদস্যদের (অনুষদভুক্ত বিভাগসমূহের প্রধান) সঙ্গে বিষয়টি আলোচনার পর চূড়ান্ত করা হয়। পরে ডিন বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করেন। কাউন্সিল বিষয়টিতে সম্মতি দিলে তা সিন্ডিকেট চূড়ান্ত অনুমোদন করে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ঐ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ‘তখন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোর প্রভাষক পদে আবেদনের জন্য প্রার্থীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ৩.৬০ নির্ধারণ ছিল। বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে আমি বলতে পারছি না। এটা ভুল হতে পারে তবে বৈধ কি অবৈধ তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলতে পারবে।’ অনুষদের প্রধান ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য হয়ে বিজ্ঞপ্তির এমন বিষয়টি কেন এড়িয়ে গেলেন বা ডিন হিসেবে আপনি দায় এড়াতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত বিষয় তো জানি না। যারা (নিয়োগ প্রত্যাশীরা) নিয়োগ বোর্ডে এসেছিলেন তাদের মধ্যে মেধাবীদের আমরা বাছাই করেছি। বিজ্ঞপ্তি কেন এমন হলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলবে।’

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে অবহিত করলে বিস্মিত হন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন’র (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম। বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতার শর্ত নিয়মবর্হিভূতভাবে কমানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ দিলে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। ড. দিল আফরোজা বেগম একুশে টেলিভিশন’কে বলেন, ‘বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষদের মধ্যে বিভাগগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্তের তারতম্য থাকতে পারে। তবে তা অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ায় হতে হবে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ বিজ্ঞপ্তি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের জন্য উল্লেখিত শর্ত অনুষদ নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিভাগের চেয়ারম্যান বা অনুষদের ডিন বিজ্ঞপ্তিতে কি উল্লেখ করা হয়েছে তা জানেন না, তা হতে পারে না। কেউ অভিযোগ দিলে আমরা ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে কারণ ব্যাখ্যা করতে বলব।’

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভূক্ত বিভাগ হলেও প্রত্নতত্ত্বের ক্ষেত্রে ভিন্ন কেন করা হয়েছিল এমন প্রশ্নে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পূর্বের উপাচার্যের সময়কার শর্ত সাপেক্ষে করা হয়েছে। এতে কোন নিয়মের ব্যত্যয় করা হয়নি।’ সে সময় বিভাগটি কলা অনুষদভূক্ত ছিল তবে সামাজিক বিজ্ঞানে আসার পর কেন সমন্বয় করা হয়নি এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা উপাচার্যকে অবহিত করেই দেওয়া হয়েছিল।’ তবে ঐ শিক্ষককে নিয়োগে তার কোন প্রভাব ছিল না বলে জানান আবু তাহের।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগের সকল কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। 

এ ছাড়া কর্মকর্তা নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, বোর্ডের সুপারিশ ব্যতিত কর্মকর্তার পদোন্নতি, বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ডিন নিয়োগ করা হয়নি বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে- ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির জন্য রেজিষ্ট্রার ও উপাচার্য বিভিন্ন অনিয়ম করছেন। ছাত্র জীবনে প্রতিক্রীয়াশীল রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও প্রগতিশীলতার ফেনা তুলে নিয়মবর্হিভূতভাবে সুবিধা নিচ্ছেন অনেক শিক্ষক। আইন অনুযায়ী হচ্ছে না সিন্ডিকেট সভাও। 

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের ক্যাশিয়ার মো. ছালেহ আহমেদকে সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওর্গানোগ্রাম’এ (প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান চাকরি বিধিমালা এবং পদ-কাঠামো) ছালেহ আহমেদের পদ না থাকার পরও সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। পদোন্নতি বোর্ডের সামনে উপস্থিত না হলেও তাকে ২০১৮ সালে মে মাসে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিষয়টিকে ‘গায়েবি’ বলছেন শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। নিজ গ্রাম কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ছালেহ আহমদের বাড়ি হওয়ায় উপাচার্য গ্রাম্য রাজনীতির মতো অনুমোদনহীন পদে তাকে পদোন্নতি দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওর্গানোগ্রামে অনেক অসংগতি রয়েছে এবং এগুলো সংশোধনের কাজ চলছে বলে জানান রেজিষ্ট্রার ড. মো. আবু তাহের। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহাদী হাসান বিষয়গুলো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়করণ, স্বেচ্ছাচারীতা করতে করতে ন্যায়ের ধারণ হারিয়ে ফেলেছে প্রশাসন। প্রার্থী নিয়োগ পেলে কার গ্রুপে থাকবেন সে হিসাব ও করার কথা আমরা শুনেছি। এমনকি নিয়োগের আগে আনুগত্যের শপথ পড়ানোরও ঘটনা শোনা যায়। নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ আজ নতুন নয়।’

জানা যায়, গেল বছরের ডিসেম্বরে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এগুলোয় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলেও ৭০ তম সিন্ডেকেট সভার পর মাত্র ১৪ দিনের মাথায় (২০ ডিসেম্বর) জরুরি সিন্ডিকেট সভা (৭১ তম) করে নিয়োগ চূড়ান্ত করেন উপাচার্য। 

অন্যদিকে ডিন নিয়োগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২২ (৫) ধারা মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেন এক শিক্ষক। সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের অধ্যাপকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে দুই বছরের জন্য ডিন নিয়োগের কথা বলা ঐ ধারায়। অনুষদভূক্ত বিভাগসমূহে অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক না থাকলে অন্য অনুষদ থেকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন অনুষদে ডিন নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা মানা হয়নি। নেওয়া হয়নি সিন্ডিকেটের অনুমোদন। এর আগেও কয়েকটি অনুষদে ডিন নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে আইন অনুযায়ী ডিন নিয়োগ হচ্ছে বলে দাবি করেন রেজিষ্ট্রার।   

এ ছাড়া সম্প্রতি বিভিন্ন বিভাগে প্রভাষক নিয়োগের বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছাত্রাবস্থায় ইসলামী ছাত্র শিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এমন কয়েকজনকে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে বলে বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়। সুপারিশগুলো সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষাধীন। সুপারিশ পাওয়া এসব প্রার্থী উপাচার্য ড. এমরান কবির চৌধুরীর আস্থাভাজন এবং বিষয়টিতে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে রেজিষ্ট্রারের স্থায়ী পদ থেকে মো. মজিবুর রহমান মজুমদারকে সরিয়ে শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ও পদার্থ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহেরকে রেজিষ্ট্রারের চলিত দায়িত্ব দেন উপাচার্য। অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর রেজিষ্ট্রার (অতিরিক্ত) পালন করা ড. আবু তাহের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য নিয়োগ বোর্ডকে চাপে রাখেন। সদস্য না হয়েও বেশ কয়েকটি নিয়োগ বোর্ডে প্রবেশ করে নিয়োগ প্রভাবিতও করেছেন বলে উপাচার্যের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান। 

নিজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে ড. মো. আবু তাহের বলেন, ‘রেজিষ্ট্রার কোন নিয়োগ বোর্ডেরই সদস্য না। বর্তমান ভিসি স্যারের শুরুর দিকে কয়েক বোর্ড শেষে শুধু সুপারিশ লিখতে ডাকা হলে আমি গিয়েছিলাম। আর অমি এত বড় কোন ব্যক্তি হইনি যে আমার চাপেই বোর্ড নিয়োগ দেবে। কিছু সুপারিশ থাকতেই পারে কিন্তু তা হলে হলো, না হলে তো চাপ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি যখন এ দায়িত্বে ছিলাম না তখন এত অভিযোগও আসেনি। এগুলো মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে।’

এদিকে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে ২০১৭ সালের পুরোটা জুড়ে তৎকালীন উপাচার্যের অপসারণের আন্দোলন করেন শিক্ষকরা। বছর জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থবির থাকে। একই বছরের ৩ ডিসেম্বর চার বছরের মেয়াদ শেষে করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আশরাফ। এরপর প্রায় দুই মাস পর ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ৬ষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পান বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। এরপরও ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে অনিয়ম।  

বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন’র (পিএসসি) সদস্য থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা এমরান কবির চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনিয়মের পসরা সাজিয়ে বসেন। স্বেচ্ছাচারীতার অংশ হিসেবেই মানছেন না সিন্ডিকেট (বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পর্ষদ) সভার সময়সীমা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৬ (সংশোধিত) এর ১৮ (২) ধারা অনুযায়ী নূন্যতম প্রতি তিন মাসে একটি সিন্ডিকেট সভা করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা নেই। এমরান কবির চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬৮, ৬৯, ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩ তম সিন্ডিকেট যথাক্রমে ৩০ এপ্রিল, ৩০ জুলাই, ০৬ ডিসেম্বর, ২০ ডিসেম্বর (এগুলো ২০১৮ সালে), ২৫ ফেব্রুয়ারি ও ২৪ জুন (২০১৯) অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

প্রতিটি সিন্ডিকেট সভা করা হয়েছে কোন না কোন নিয়োগ বা পদোন্নতি কার্যকর করার জন্য বলে বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জুনে বাজেট সিন্ডিকেট না করে উপাচার্য প্রমোদ ভ্রমনে বিদেশ যান। সিন্ডিকেট সভা নিয়মিত না হওয়ায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতারও দেখা মেলে। একাডেমিক ও প্রশাসনিক কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সভা করা হয় না বলে সিন্ডিকেটে অনেক সদস্য উপস্থিত হন না বলে জানা যায়।  সিন্ডিকেট সভা আইন অনুযায়ী হচ্ছে না বলে স্বীকার করেন রেজিষ্ট্রার ও সিন্ডিকেটে সদস্য সচিব ড. মো. আবু তাহের। তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক মতো হচ্ছে না। তবে আমরা তা করার জন্য চেষ্টা করছি।’

সকল অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য ড. এমরান কবির চৌধুরী বলেন, ‘আমি তো একা কিছু করিনি। সব কিছু কমিটির মাধ্যমে করা হয়েছে। কোনটা কি হয়েছে তা এ মুহূর্তে আমার মনে নেই।’

এমএস/এসি

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি