ঢাকা, বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

কুরবানী হোক ত্যাগের, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২৩:৫৭ ১১ আগস্ট ২০১৯

আল্লাহ তায়ালা মানব জাতি সৃষ্টির পর থেকেই কুরবানীর বিধান দিয়েছেন। পৃথিবীর সব জাতি ও সম্প্রদায় কোন না কোনওভাবে আল্লাহর দরবারে নিজেদের প্রিয় বস্তু কুরবানী দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানীর এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি। যেন তারা এসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নিতে পারে। যে সব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন”। (সূরা আল হজ্জ-৩৪)।

কুরবানীর ইতিহাস:
পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ:)-এর সন্তান হাবিল ও কাবিলের মধ্যে বিয়ে নিয়ে মতভেদ দেখা দিল। আদম (আ.) তার এ দুই সন্তান হাবীল ও কাবীলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন: ‘তোমরা উভয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী গৃহীত হবে, তার সাথেই আকলিমার বিয়ে দেয়া হবে।’ 

সে সময় কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটা সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে সে কুরবানীকে জ্বালিয়ে দিত। আর যার কুরবানী কবুল হতো না তার টা সেখানেই পড়ে থকত। 

তখনকার কুরবানীর পদ্ধতি সম্পর্কে জনা যায়, কাবিল ছিলেন চাষী। তিনি গমের শীষ থেকে ভাল ভালগুলো বের করে নিয়ে খারাপ গুলোর একটি আটি কুরবানীর জন্য পেশ করলেন। আর হাবিল ছিলেন পশুপালনকারী। তিনি তার জন্তুর মধ্যে থেকে সবচেয়ে ভাল একটি দুম্বা কুরবানীর জন্য পেশ করেন। এরপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কুরবানীটি ভষ্মীভূত করে দিল। আর কাবিলের কুরবানী যথাস্থানেই পড়ে থাকল। (সংক্ষেপ; তাফসীর ইবনু কাসীর, দুররে মনসূর, ফতহুল বায়ান, ৩/৪৫ ও ফতহুল ক্বাদীর, ২/২৮-২৯)

হাবিল ও কাবিলের কুরবানীর ঘটনা পবিত্র কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে- “আপনি তাদেরকে আদমের দু’ পুত্রের ঘটনাটি ঠিকভাবে শুনিয়ে দিন। যখন তারা উভয়ে কুরবানী পেশ করলো, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহীত হল, আর অপর জনের কুরবানী গৃহীত হলোনা। (সূরা আল মায়িদাহ, ২৭ আয়াত)। ‘আদম (আ.) থেকে মুহাম্মাদ (সা.) পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে আল্লাহ তা’আলা তার নৈকট্য লাভের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছেন। (তাফসীরে নাসাফী ৩/৭৯; কাশশাফ, ২/৩৩)।

মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাযিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কুরবানী করার বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ।

বর্তমান কুরবানীর ইতিহাস: 
বর্তমান কুরবানীর ইতিহাস নবী ইব্রাহীম (আ:) থেকে এসছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ইব্রাহীম (আ.) যখন আমার কাছে দু’আ করল- হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে এক সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান কর। অতঃপর আমি তাকে এক অতি ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহীম (আ:) বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি। এখন বল, তোমার অভিমত কী? সে বলল, ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন। আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দু’জনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিল আর ইবরাহীম তাকে কাত করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, ‘হে ইবরাহীম! স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এক মহান কুরবাণীর বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম। আর আমি তাঁকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি। সে ছিল আমার মু’মিন বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আস-সাফফাত: ১০০-১১১)। 

সেই থেকে মুসলমানরাও তেমনি ঈদুল আযহার দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ তারিখে পশু কুরবানীর মাধ্যমে নিজেদের প্রিয় জান-মাল আল্লাহর পথে কুরবানী করার সাক্ষ্য প্রদান করেন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম আ. এর সেই কুরবানীকে শাশ্বত রূপদানের জন্যেই আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সা. এই দিনে মুসলমানদেরকে ঈদুল আযহা উপহার দিয়েছেন এবং এ কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন।

কুরবানীর সাওয়াব: 
কুরবানীর সাওয়াব সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা:) এর সাহাবাগণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ: এই কুরবানী কী? রাসূল (সা.) বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আ.)-এর সুন্নত। তারা আবার জানতে চাইলেন, কুরবানীতে আমাদের জন্য কি রয়েছে? রাসূল (সা.) বললেন, কুরবানীর পশুর প্রত্যেক লোম পরিবর্তে সওয়ার রয়েছে...।

হাদীস শরীফে এসেছে- তোমাদের কুরবানীর পশুগুলোকে সুন্দর ও সাস্থ্যবান কর, কেননা এগুলো পুলসিরাতে তোমাদের বাহন হবে। (দায়লামী)। 

যারা নিসাবের মালিক হয়েও কুরবানী করবেন না, তাদের ব্যপারে রাসূল (সা.) বলেন, যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫)।

ইবাদতের মূল কথা হল- আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যে কোনও ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উল্লেখ হল।

যার উপর কুরবানী ওয়াজিব: 
যাদের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে তাদের উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়তি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। 

আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল- এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনও একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-(আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫)। 

কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোন দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-(বাদাযয়েউস সানাযয়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২)। 

মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। (-মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানাযয়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫)।

নাবালেগ শিশু-কিশোর এবং যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬)। 

নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫)।

দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম: 
দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনও পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২)। 

যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনও ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয। (সহীহ বুখারী, ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮)।

কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে: 
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন- হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। (কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫)।

যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদা দুটোর যে কোন একটি দিয়ে কুরবানী করা যায়। (কাযীখান ৩/৩৪৮)।

কুরবানীর পশুর বয়সসীমা: 
উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। এক্ষেত্রে দাত উঠা আব্যশক নয়। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনও অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। (কাযীখান ৩/৩৪৮)।

এক পশুতে শরীকের সংখ্যা: 
একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কযয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারওটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারও কুরবানী সহীহ হবে না। (সহীহ মুসলিম ১৩১৮)।

সাত শরীকের কুরবানী: 
সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারও আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ। এমন হলে কোনও শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। (বাদাযয়েউস সানায়ে ৪/২০৭)।

কোনও অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে: 
যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারোরই কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। (কাযীখান ৩/৩৪৯)।

কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ: 
কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে। (তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২)। 

শরীকদের কারও পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারও কুরবানী সহীহ হবে না।

কুরবানীর উত্তম পশু: 
কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। (মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস সানাযয়ে ৪/২২৩)।

খোড়া পশুর কুরবানী: 
যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানী জায়েয নয়। -(জামে তিরমিযী ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩, আলমগীরী ৫/২৯৭)।

রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী: 
এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। (জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী ৫/২৯৭)।

দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী: 
যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। (আলমগীরী ৫/২৯৮)। 

যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। (জামে তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮)।

কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী: 
যে পশুর লেজ বা কোনও কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। (জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০, ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ৫/২৯৭-২৯৮)।

যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। (জামে তিরমিযী ১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭)।

গর্ভবতী পশুর কুরবানী: 
গর্ভবতী পশু কুরবানী করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। (কাযীখান ৩/৩৫০)।

পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে: 
কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনও দোষ দেখা দেয় যে কারণে কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর কুরবানী সহীহ হবে না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী করতে পারবে। বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫)।

নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা: 
কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। (মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭, আলমগীরী ৫/৩০০)।

কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে: 
জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। (আদ দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫১)।

মৃতের পক্ষ  থেকে কুরবানী: 
মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমদ ১/১০৭, হাদীস ৮৪৫, কাযীখান ৩/৩৫২)।

কুরবানীর গোশত বণ্টন: 
শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়। কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। (আলমগীরী ৫/৩০০)।

গোশত-চর্বি বিক্রি করা: 
কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। (আলমগীরী ৫/৩০১)।

জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া: 
জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা: 
জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া।

কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেয়া: 
কুরবানীর গোশত অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয। (ইলাউস সুনান ৭/২৮৩)।

ঋণ করে কুরবানী করা: 
কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিযয়ে কুরবানী করা যাবে না।

নবী কারীম (সা:)’র পক্ষ থেকে কুরবানী করা: 
সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ (সা:)’র পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। (সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে তিরমিযী ১/২৭৫)।

কোন দিন কুরবানী করা উত্তম: 
১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন।

কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা: 
কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। (জামে তিরমিযী ১/১২০)।

জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেয়া: 
কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া

মোরগ কুরবানী করা: 
কোনও কোনও এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি জায়েয নয়। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না।

কুরবানীর শীক্ষা:
সুতরাং কুরবানীর ঘটনার দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর হুকুম পালন করতে গিয়ে যতই বিপদের ঝুকি থাকুক না কেন, সে ঝুকি মাথায় নিয়ে তা পালনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তায়ালার হুকুম মানতে গিয়ে যদি সম্পদ হারানোর ভয় থাকে, যদি সন্তানের বা নিজের জীবন বিপন্ন হওয়ারও আশঙ্কা থাকে, তাহলেও আল্লাহর হুকুম মানা থেকে পিছিয়ে আসা যাবে না, বরং সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার হুকুম মানার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। কোন ভাবেই পাশ কাটানোর মনোভাব, ওজর, আপত্তি বা অজুহাত তুলে হুকুম পালনের পথ থেকে সরে আসা যাবে না। 

ইব্রাহীম (আঃ) সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য কোন রকম অজুহাত উত্থাপন করেন নাই রবং আল্লাহর হুকুমকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, এটাই হচ্ছে কুরবানীর শিক্ষা।

কিন্তু আমাদের সমাজের মধ্যে একদিকে মহা উৎসবে কুরবানী করা হয়, আর অন্যদিকে যখন আল্লাহ তায়ালার হুকুম প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোন বিপদের আশঙ্কা থাকে তখন পাশ কাটানোর জন্য নানা রকম অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। যেমন সমাজের মধ্যে যখন সৎ কাজ প্রতিষ্ঠা করা, অন্যায় কাজের নিষেধ করা, সুদী অর্থতৈনিক ব্যবস্থা অপসারণ করা, ইসলামী আইন-কানুন বাস্তবায়নের কথা বলা হয়, তখন এ কুরবানী করা মুসলমানরাই নানা রকম অজুহাত তুলে ধরেন। 

এ কুরবানী করা মানুষেরাই মসজিদের মধ্যে নামাজ আদায় করেন কিন্তু সমাজের মধ্যে ইসলাম বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে নানা অজুহাত তুলে ধরেন, কেউ কেউ আবার এটাকে দায়িত্ব হিসেবেই মনে করেন না। তাহলে আল্লাহর আদেশের কাছে অত্মসমর্পন করা বলতে কি বুঝলাম? 

ইব্রাহীম (আঃ) সন্তান উৎসর্গ করা থেকে আমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করালাম? মূলতঃ কুরবানীর আসল শিক্ষা হচ্ছে যে আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালনের জন্য কোন রকম ওযর আপত্তি বা অজুহাত তুলে না ধরে যে কোন অবস্থায় তৈরি থাকতে হবে, তাতে যত বড় আত্মত্যাগের প্রয়োজন হোক না কেন।

আসুন আমরা জীবনের সকল অবস্থায় যে কোন আত্মত্যাগের বিনিময়ে নামায রোযার মতো সমাজে ও রাষ্ট্রের মধ্যে আল্লাহর হুকুম পালন করার জন্য সচেষ্ট হই এবং বুঝতে চেষ্টা করি যে-- 

“নিশ্চয় আমার নামায, আমার সকল ইবাদত, আমার জীবন ও জীবনের যাবতীয় কর্ম কার্য এমন কি আমার মরণ পর্যন্ত বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ পাকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। তার কোন শরীক নাই এবং আমি এটাই আদিষ্ট হয়েছি, আত্মসমর্পনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম। [সুরা আনআম ১৬২-১৬৩]” আমিন।

এনএস/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি