ঢাকা, বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, || আশ্বিন ৮ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

তিস্তা নদীর দুই পাড় ঘিরে স্থায়ী উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৬:২৪ ৩ আগস্ট ২০২০

তিস্তা নদীর দুই পাড় ঘিরে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। আগামীতে তিস্তা নদীর দুই পাড় একটি পর্যটন নগরী রূপে গড়ে উঠতে যাচ্ছে।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরিদ্রপীড়িত জেলা লালমনিরহাটকে কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।

এর আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে লালমনিরহাট জেলাকে দারিদ্র মুক্ত করতে কাকিনার মহিপুরে তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্প নির্মাণের
পরিকল্পনা হাতে নেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে লালমনিরহাট জেলা তিস্তা ব্যারেজের সেচ প্রকল্পের আওতায় আসতো। কিন্তু জাতির জনককে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট সপরিবারে হত্যা করার ফলে কাকিনায় সেচ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।

এক সময়ে খরস্রোতা তিস্তা নদী জেলার জন্য অভিশাপে পরিণত হয়। সেচ প্রকল্পের কারণে বর্ষা মৌসুমে ভারত অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহার করায় তিস্তা নদীর পানির তোড়ে জেলাবাসী দফায় দফায় বন্যার কবলে পড়ে। আবার শুস্কমৌসুমে ভারত সরকার পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ফলে তিস্তা নদী শুকিয়ে যায়। তিস্তা হয়ে উঠে মরুভুমির মত।

১৯৮৯ সালের পর তিস্তা নদীকে ঘিরে পেশাজীবী, মৎস্যজীবী, খেয়াঘাটের নৌকার মাল্লা, কৃষিজীবীসহ নানা পেশার হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পথে বসে যায়। লাখ লাখ হেক্টর ফসলের জমি নদী গর্ভে বিলীণ হয়ে যায়। এক সময়ের বিত্তবান জোতদার কৃষক পরিবারগুলো রাতারাতি পথের ফকিরে পরিণত হয়ে যায়। নেমে আসে দারিদ্রতা। তিস্তা পাড়ে গৃহহীন মানুষরা ঝুঁপড়ি ঘরে বসবাস শুরু করে। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটে তাদের, দেখা দেয় মঙ্গা।

পরবর্তিতে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ বছরের ঐকান্তিক চেষ্টায় ও নানা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে তিস্তাপাড়ের মানুষকে নিয়ে আসেন। তিস্তা নদীর চরের বাড়িগুলোকে বন্যামুক্ত করতে ভিটা উঁচু করে দেয়া হয়। বাড়িতে বাড়িতে খামার করতে সরকারি কর্মসূচি হাতে নেয়। গবাদি পশু পালনসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চরের নারীদের সম্পৃক্ত করাসহ শুস্ক মৌসুমে নানা ফসল ফলাতে সরকার ভর্তুকি দেয়। 

বিনামূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি সর্ম্পকে কৃষক ও কৃষাণীদের সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রায় প্রতিটি চরে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। চরবাসীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ৬ হাজার জনবসতি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। চরে অভাবের সময় কর্মহীন মানুষের কাজ নিশ্চিত করতে বছরে দুই বার ৪০দিন ৪০ দিন করে কর্মসৃজন কর্মসূচি সরকারিভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। এসব নানা উদ্যোগে এখন তিস্তা পাড়ের মানুষ মঙ্গামুক্ত হয়েছে।

এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে তিস্তা পাড়ের মানুষের র্দুদশা লাঘবে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এই প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদীর দুই পাড় মিলে ২২০ কিলোমিটার উচুঁ গাইড বাধ নির্মাণ করা হবে। বাধের দুই পাশে থাকবে সমুদ্র সৈকতের মত মেরিন ড্রাইভ। যাতে পর্যটকরা লং ড্রাইবে যেতে পারেন। এছাড়াও এই রাস্তা দিয়ে পণ্য পরিবহন করা হবে। নদীর দুই ধারে গড়ে তোলা হবে হোটেল, মোটেল ও রেষ্টুরেন্ট।

তিস্তা নদীর বর্তমান নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে। তাই তিস্তা নদীর প্রশস্ততা কোথাও ৮ কিলোমিটার, কোথাও আবার ১২ কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে পানি শুকিয়ে গেলে দেখা দেয় মরুভূমির মত। এই পরিকল্পনায় তিস্তা নদীর গভীরতা বাড়াতে মেজর খনন কাজ করা হবে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো: আবু জাফর জানান, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ জেলা একদিন শিক্ষা ও সম্পদে সমৃদ্ধশালী হবে।’

নদীর দুই ধারের প্রস্ততা করা হবে মাত্র দুই কিলোমিটার। এতে করে নদীর দুই ধারের কয়েক লাখ হেক্টর ফসলের জমি উদ্ধার হবে। উদ্ধারকৃত জমিতে ১৫০ মেগাওয়ার্ড সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাওয়ার গ্রীড বসানো হবে। সেখানে সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। নদী পাড়ে থাকবে ইকোনমি জোন। নদী খনন করে গভীরতা বাড়িয়ে চালু করা হবে নৌ পথের রুট। যাতে স্বল্প খরচে নদী পথে অনেক বেশি পণ্য পরিবহন করা যায়। 

গড়ে তোলা হবে সরকারি কর্মকর্তা-কমচারিদের বসবাসযোগ্য সকল নাগরিক সুবিধা সমৃদ্ধ নগর। উদ্ধারকৃত জমি ভূমিহীনদের মাঝে কৃষি কাজের জন্য বিতরণ করা হবে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে জেলায় কোন বেকার সম্যসা থাকবে না। জেলা হয়ে উঠবে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ।

ইতিমধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই বছর আগে তিস্তা নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ, নগর নির্মাণ, সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, নদী খনন, নদীর প্রশস্ততা হ্রাস, রিভার ড্রাইভ, পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল, মোটেল ও রেষ্টুরেন্টসহ নানা পরিকল্পা বাস্তবায়ন করতে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পাওয়ারকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি দুই বছর ধরে তিস্তা নদী সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা ডিজাইনসহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কৌশল ও সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ধরে একটি প্রজেক্ট সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।

সেখানে প্রকল্পটি যাচাই-বাচাই হয়েছে। এরপর প্রস্তাবটি ইআরডিতে জমা পড়েছে। আর্ন্তজাতিক পানি সম্পদ বিভাগ ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এমওই স্বাক্ষর হয়েছে। এখন প্রজেক্ট প্রোফোজাল বাস্তাবায়নে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা প্রাথমিক খরচ ধরেছে।

জানা গেছে, মন্ত্রণালয় হতে প্রজেক্টের অর্থ বিনিয়ককারী খোঁজা হচ্ছে। এমন কী কয়েকটি দাতা দেশ সহজ শর্তে অর্থ দিতে সম্মত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রজেক্ট যত দ্রুত শুরু করা যায় তার জন্য ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এমন কী জিও’র মাধ্যমেও হলেও তিনি প্রকল্প শুরু করতে চান। এদিকে রংপুর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহাসড়কে ফোর লেনের কাজ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় রংপুর হতে বুড়িমারী পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফোর লেনের কাজ শুরু হবে।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় লালমনিরহাট জেলা শহরের অদূরে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এ্যারোনোটিক্যাল এভিয়েশন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকায় অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলতি ২০১৮-১৯ শিক্ষা বছরে অর্নাস ও মাষ্টার্স কোর্সে ৪০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। চলছে তাদের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম। আগামী বছরের জানুয়ারী মাসে প্রায় ৬৬০ একর জমিতে মূল ক্যাম্পাসে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ৩ মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র ও আবেদনপত্র জেলা প্রশাসনের কাঝে জমা দিয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঢাকা হতে তাদের সামরিক বাহিনীর পাইলট প্রশিক্ষণের এভিয়েশন স্কুল লালমনিরহাটে স্থানান্তর করেছে। বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল
আজিজ আহম্মেদ এই পাইলট প্রশিক্ষণের স্কুলটি প্রায় কয়েক মাস আগে উদ্বোধন করেন।

এখানেই শেষ নয়, জানা গেছে শহরে সাপটানায় ৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেখানে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর আইটি পার্ক নির্মাণ করা হবে। মহেন্দ্রনগরে প্রায় ৭শ’ একর জমিতে গড়ে উঠবে ইকোনমি জোন ও ইপিজেড। সেখানে দেশি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে মাঝারি ও ভারি শিল্প কলকারখানা।

সদ্য যোগদানকৃত লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মিজানুর রহমান জানান, চায়না পাওয়ার কোম্পানি দুই বছর ধরে তিস্তা পাড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাপরিকল্পনায় নির্মাণকৃত প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করেছে। তারা সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরেছে। পৃথক প্রজেক্ট আকারে পানি উন্নয়ন বোর্ড এই কাজ বাস্তবায়ন করবে। খুব শিগগির টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হলে এই জেলার বর্তমান চিত্র রাতারাতি পাল্টে যাবে। অভিশপ্ত দারিদ্র্যের দুর্নাম হতে মুক্ত হবে। বিশ্বের নানা দেশ হতে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসবে।

তিনি বলেন, ইকোনমি জোনে ও নানা প্রকল্পে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সমৃদ্ধশালী হিসেবে পরিচয় বহন করবে জেলাটি। এসব প্রকল্প বাস্তাবায়নের অবদান
একজনের ইচ্ছায় হচ্ছে। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সত্যিই তিনি রংপুরবাসীকে অনেক ভালবাসেন। রংপুরের যত উন্নয়ন চোখে পড়ে সব তার
অবদান। তিনি রংপুরকে বিভাগ করায় দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে। রাতারাতি পাল্টে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও ব্যবসা বাণিজ্য।

তিস্তা পাড়ের সব চেয়ে নদী ভাঙ্গনের শিকার খুনিয়াগাছ ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ মোফাজ্জল হোসেন মোফা বলেন, মানুষের দাবি ছিল স্থায়ী নদী
ভাঙ্গনরোধ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা সহ তিস্তা পাড়ের মানুষকে সমৃদ্ধশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এখানকার মানুষের উন্নয়নে কারও মুখের দিকে চেয়ে থাকতে হবে না।

সূত্র: বাসস

এএইচ/


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি