ঢাকা, সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৪ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

থামছে না উইলস লিটল ফ্লাওয়ার কলেজের পরিচালনা পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতা

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ

প্রকাশিত : ১৯:৩১ ৩০ অক্টোবর ২০১৯ | আপডেট: ১৯:৩৯ ৩০ অক্টোবর ২০১৯

একটার পর একটা অভিযোগ। শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, কলেজের অর্থের নয়-ছয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় শিক্ষক বরখাস্তসহ নানা অভিযোগ রাজধানীর রমনায় খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগের পর গত মে মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অদৃশ্য কারণে তদন্ত প্রতিবেদন এখনও দাখিল করা হয়নি। সম্প্রতি ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার এ কলেজের এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করার পর প্রতিবেদনে কয়েকটি অসংগতির কথা উল্লেখ করেন। তবে এর মধ্যেই বেড়ে চলছে অভিযোগের ফিরিস্তি। 

কলেজের পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের এ সব কর্মকাণ্ড পর্ষদের সভাপতি আরিফুর রহমান টিটুর ইচ্ছায় পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন আরিফুর রহমান টিটু। তিনি এ কলেজের সভাপতি হওয়ার পর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে কলেজকে ধংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন বলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ।  

পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি, টিটুর নানা অপকর্মের বিষয়ে একুশে টেলিভিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয়রা। এছাড়াও তার বিভিন্ন অনিয়মের বেশ কিছু কাজগপত্রও এ প্রতিবেদকের হাতে আসে। এ নিয়ে গত ১২ অক্টোবর একুশে টেলিভিশন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার কবজায় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার কলেজ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

এর মধ্যে গত ২১ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড (ঢাকা) কলেজটির নানা অনিয়মের অভিযোগের তদন্তের পর বেশ কয়েকটি সুপারিশ জানায়। শিক্ষার্বোডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ স্বাক্ষরিত ঐ চিঠিতে ৮টি সুপারিশ করা হয়।

এতে বলা হয়, এক শিক্ষক প্রতিনিধির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্তে বেশ কিছু অনিয়ম উঠে আসে। তাতে উল্লেখ করা হয়, কলেজের অধ্যক্ষের নিয়োগ বিধি মোতাবেক হয়নি। পদোন্নতির বিধান না থাকলেও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পদোন্নতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতি করা হচ্ছে, প্রয়োজন ছাড়া কাঠামোর বাইরে বেশ কয়েকটি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, বিধি অনুসরণ না করে যোগ্যতাহীন শিক্ষককে শাখা প্রধান করা হয়েছে, ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার্থে পদোন্নতিতে অনিয়ম করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বেতন-ভাতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা বোর্ডকে সুপারিশ করা হয়।

দুই বছর আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা টিটু প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ভেঙ্গে পড়েছে এর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। তার একচ্ছত্র রাজত্বে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির শিকার হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। টিটুর সঙ্গে মিলে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংস্কৃতিক সম্পাদক আশিকুর রহমান নাদিম, পর্ষদের দাতা সদস্য মোজ্জাম্মেল হোসেন, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন এবং আরেক ভাই বিএনপি নেতা আনিসুর রহমান লাভলু নানা দুর্নীতি করছেন। 
কেনাকাটার নামে প্রতিষ্ঠানের টাকা লোপাট এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের যখন-তখন বরখাস্ত ও হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন তারা। বিশেষ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বরখাস্ত করা একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

তাদের দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় গত ৩ অক্টোবর কলেজের প্রভাতি শাখার ইংরেজি মাধ্যমে সিনিয়র শিক্ষক নাজমা হোসেন লাকীকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করে সেই সিদ্ধান্ত শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়। এর আগে গত ৭ আগস্ট তাকে দুই মাসের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছিল। বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ে পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন লাকী। 

কি কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে এমনটি জানতে চাইলে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ‘পেশাগত অসাদাচরণের কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’ তবে অসাদাচরণের কোন অভিযোগ অধ্যক্ষ এ প্রতিবেদককে জানাতে পারেননি। 

পরিচালনা পর্ষদের সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তকে বরখাস্ত করা হয়েছে এমনটি চিঠিতে বলা হয়েছে। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরের একজন উপ-পরিচালক এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, কোন কলেজ বা স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের এ ক্ষমতা নেই। 

জানা যায়, পরিচালনা পর্ষদের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ করার পরও কোন প্রতিকার পাননি এক শিক্ষক। বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রতিবাদ করায় মাধ্যমিক শাখার বাংলা মিডিয়ামের এক শিক্ষককে জীবননাশের হুমকিও দেয় টিটুর বাহিনী বলে অভিযোগ রয়েছে। টিটুর বাহিনী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে ঘোরাঘুরি করেন। যখন-তখন অস্ত্র প্রদর্শন করে শিক্ষক-কর্মচারীদের গালিগালাজ ও প্রাণনাশেরও হুমকি দিয়ে থাকেন। 

এছাড়াও আলোচিত ক্যাসিনো কারবারে টিটু সরাসরি জড়িত বলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। সভাপতির ছোট ভাই ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশিকুর রহমান নাদিম ও তাদের দলবল নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঢাকা-৮) রাশেদ খান মেননের সহযোগিতায় টিটু এ কলেজের সভাপতির পদ ভাগিয়ে নিয়েছেন বলে জানা যায়। করছেন নানামুখি অনিয়ম ও দুর্নীতি। এ বিষয়ে রাশেদ খান মেননের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী প্রথম ফোন রিসিভ করে পরে যোগাযোগ করতে বলেন। সর্বশেষ বুধবার সন্ধ্যায় আবারও তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে রাশেদ খান মেনন প্রথম অভিযোগগুলো শুনে অনুষ্ঠানে আছেন বলে ফোন রেখে দেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মে অভিভাবকদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) উপ-পরিচালক নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের অনিয়মের বিষয়ে গত ৩০ মে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হলেও এখনও প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। 

তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে জানতে চাইলে নাসির উদ্দিন একুশে টেলিভিশনকে বলেন, ‘আমাদের তদন্তের কাজ শেষ। আমরা খুব দ্রুতই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করব।’ কবে নাগাদ এ প্রতিবেদন দাখিল করা হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা শীঘ্রই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবো।’

তদন্তের সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছিল কিনা এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সভাপতি ও অধ্যক্ষের কাছে লিখিত তথ্য চেয়েছিলাম। অনেক তথ্য তারা দেননি। সব বিষয় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে। আপনাকে এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারছি না।’

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ‘আপনাদের কাছে বিভিন্ন সময়ে যে সব অভিযোগ এসেছে তা ভিত্তিহীন।’ শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রথমে উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং বানোয়াট বললেও পরে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদন আমি এখনও দেখিনি।’

অধ্যক্ষ পদে আপনার নিয়োগ বিধি মোতাবেক হয়নি যা শিক্ষা বোর্ডের তদন্তেও উঠে এসেছে এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোর্ড তো অনেক আগের আইন নিয়ে কথা বলছে। বিজ্ঞপ্তি দিয়েই আমি এ পদে এসেছি। আমি এখানে সবচেয়ে সিনিয়র।’ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিটুর সঙ্গে একুশে টেলিভিশনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি। তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার রিং করলেও তিনি ফোন তোলেননি। পরে তার মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

এমএস/এসি

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি