ঢাকা, সোমবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ধর্ষণের হাত থেকে আপনার সন্তানকে বাঁচান

আউয়াল চৌধুরী

প্রকাশিত : ১৭:৫৫ ২৫ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট: ১৮:৩৬ ২৫ আগস্ট ২০১৯

ক্যান্সার মানুষের জীবনকে যেভাবে শেষ করে দেয় তেমনি ধর্ষণ নামক ক্যান্সার আমাদের এই সমাজকে কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে। দেশের প্রতিটি জায়গা থেকে এখন এমন ক্যান্সার নামক মহামারিতে আক্রান্ত মানুষের আত্বচিৎকার শোনা যাচ্ছে। কখনো তনুর খবর শিরোনাম হলে কখনো হচ্ছে ছোট্ট সায়মার খবর। দেশের আনাচে কানাচে উঁচু নিচু সব স্তরেই এই ক্যান্সারের ছড়াছড়ি। কখনো বৃদ্ধের হাতে, কখনো জীবন রক্ষাকারী পুলিশের ছোবলে, কখনো বা খুব কাছের কোন আপনজন বা বিশ্বস্ত মানুষটির হাতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

আমার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। ১৯৯৮ সালের দিকের ঘটনা। আমি তখন একটি মফস্বল শহরে থাকতাম। আমি যেখানে থাকতাম তার পাশে একটি ঘটনা ঘটে। ওই সময় মধ্য রাতে কিছু মানুষের ছোটাছুটি নজরে আসে, কারো চাপা কান্নার আওয়াজও শুনতে পেলাম। সকালে আমার কাছে ঘটনাটি পরিস্কার হয়ে গেল- পনের বছরের এক মেয়েকে তার এক আত্মীয় ধর্ষণ করেছে। বিশ্বস্ত এবং কাছের মানুষ হওয়ার কারণে মেয়েটির সঙ্গে লোকটির সখ্যতা ছিল। ফলে তিনি সুযোগটি নিয়ে ফেলেছেন। লজ্জা আর ভয়ে মেয়েটি কাউকে কিছু বলেনি। পরবর্তীতে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। তার মধ্যে প্রানের সঞ্চার হলেও সে হয়ত প্রথমে বুঝতে পারেনি। এই রাতে সেই সন্তানটির জন্ম হয়েছে। কিন্তু আলো ফোটার আগেই অন্ধকারে সেই প্রানটিকে মাটি চাপা দেয়া হয়। কেউ বলছে সন্তান মৃত হয়েছে আবার কেউ বলছে জীবিত। এটা নিয়ে কারো উচ্চস্বরে কথা বলার সুযোগও নেই। এভাবে একটি প্রান ও আত্বচিৎকারকে রাতের অন্ধকারে মাটি চাপা দেওয়া হয়।

২০১৭ সালে আরেকটি ঘটনা কাছ থেকে দেখা হয়। ঢাকায় আমি যে বাসায় থাকি তার পাশের বাসায় এটি ঘটে। নিয়মিতই মধ্যরাতে অফিস থেকে বাসায় ফেরা হয়। সকালবেলা মানুষের হৈচৈ এর আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙ্গে। উঠে দেখি বাসার নিচে পুলিশ আর অনেক মানুষের জটলা। জানার চেষ্টা করলাম হঠাৎ কি ঘটলো। যেটুকু জানলাম তার সারমর্ম হলো, ওই বাসায় একটি কাজের মেয়ে থাকতো। ঘরের বৃদ্ধার সেবা যত্ন এবং সার্বক্ষণিক কাজে সে সহায়তা করতো। সেই মেয়েটি গতরাতে ফ্যানে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। বৃদ্ধা মাকে রেখে বাসার বড় দুই ছেলে ও বাকিরা সবাই পালিয়েছে। পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করছে। একজন জানালো, মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তারা বাচ্চা নষ্ট করার চেষ্টা করলেও সে রাজি হয়নি। ফলে অসহায় মেয়েটি তার প্রাণ বিসর্জন দিয়ে সবকিছুর পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।

১৯৯৮ সালে ঘটে যাওয়া যে ঘটনা মানসপটে দাগ কেটেছিল, আজ ২০ বছর পরেও এমন ঘটনা আমাদের চারপাশে দেখতে পাচ্ছি। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক কিছুর উন্নয়ন ঘটলেও এই একটি বিষয়ে আমরা আগের মতোই আছি। বরং বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই সময় খবরের কাগজে এমন সংবাদ তেমন একটা আসতো না। এখন অনলাইনের এই যুগে, প্রতিনিয়ত এমন খবরের মুখোমুখি হচ্ছি। এ যেন মহামারি চলছে। একজন দোকানদার লজেন্সের প্রলোভন দেখিয়ে চার দিন চারটি শিশুকে ধর্ষণ করেছে। এমন খবর শুনে আমরা আঁতকে উঠি। আহসান উল্লাহ নামের একজন বৃদ্ধ দুপুর বেলায় একটি উপজেলার বাজারে পাঁচ বছরের এক শিশুকে চিপসের প্রলোভন দেখিয়ে ছাদে নিয়ে ধর্ষণ করে। গত কয়েক দিনে মাদ্রাসার শিক্ষকের হাতেও ধর্ষণের খবর আসে। আমরা এসব দেখে হতভম্ব হয়ে যাই। এটাও কি সম্ভব! ৭ বছরের শিশু সায়মাকে পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। সন্ধ্যার কিছু পর খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় সায়মা। তারপর ভবনের পরিত্যক্ত একটি রুম থেকে তার মৃত দেহ উদ্ধার করা হয়। নিস্তব্ধ নিথর দেহটি তার সেখানে পড়ে থাকে। এদিকে সমাজের মানুষদের রক্ষক হিসেবে যারা নিয়োজিত, অভিযোগ উঠেছে তাদের হাতে দলবদ্ধভাবে খুলনায় থানার ওসিসহ ধর্ষণ করেছে এক তরুণীকে। এমন ঘটনায় আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই। আর ভাবতে পারি না। জাহেলিয়াতকে হার বানিয়ে দিচ্ছে একের পর এক এমন ঘটনাগুলো। তিন বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধাও আজ রেহাই পাচ্ছে না এই নরপশুদের হাত থেকে। আধুনিক এই যুগে আমাদের সমাজ কি এমন ক্ষত নিয়ে ক্রমান্বয়ে এভাবে এগিয়ে যাবে। আমি তা মোটেই মনে করি না।

বহু কারণেই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে। কখনো নিজের গাফিলতির কারণে, কখনো জোরপূর্বক। জোরপূর্বক ঘটনার ক্ষেত্রে বলার কিছু থাকে না। একমাত্র আইন তার বিচার করতে পারে। রাষ্ট্রই উপসম দিতে পারে। আর নিজেদের ভুলের বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই।

ধর্ষণের ঘটনায় এ পর্যন্ত বহু শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে কিন্তু এরপরও এটি বেড়েই চলেছে। এ জন্য ধর্ষণ প্রতিরোধে কঠিন শাস্তি যেমন দরকার তেমনি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনেরও প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দিক থেকেও ভুমিকা অনস্বীকার্য। ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা, টেলিভিশন বা মিডিয়ায় সচেতনতামূলক টিভিসি প্রচার, সঠিক বিচারের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এছাড়া সমাজে অতি মাত্রায় ধর্ষণ মানসিকতা বেড়ে যাওয়ার কারন কি সেটিও আগে খুঁজে বের করা দরকার। কেন একটি সমাজের অনেক মানুষের মধ্যে এমন চিন্তা বিরাজ করছে। সুযোগ পেলেই বিবেককে তালা দিয়ে এমন লজ্জাজনক কাজটি করতে দ্বিধাবোধ করছে না। ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া, সামাজিক মাধ্যমগুলো এর জন্য কিছুটা দায়ী কি না সেটিও দেখা দরকার।

দশ বা বিশ বছর আগে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও সংখ্যায় ছিল কম। মা-বাবা বা পরিবার অনেক সতর্ক ছিল, সচেতন ছিল। এখনকার আধুনিক ও প্রযুক্তির এই যুগে সময়ের প্রয়োজনে মা- বাবাদের যেখানে আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়া দরকার আমার কাছে মনে হয়েছে সেখানে তারা অনেক বেশি উদাসীন। সায়মার নিথর দেহটি দেখে আমাদের কলিজা বিদীর্ণ হয়ে যায়, ওই পাষণ্ডকে হাজারবার ফাঁসি দিলেও হয়ত এই কষ্ট লাগব হবে না। কিন্তু এরপরেও একটি প্রশ্ন আসে সায়মাকে কেন সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হলো। বিশ্লষণ করলে দেখা যায়, প্রায় ঘটনার পেছনে এমনই কিছু কারণ পরিলক্ষিত হয়। নির্জন বাসে এমন ঘটনার খবর আমরা প্রায়ই ঘটতে দেখি। এমন নির্জনতায় তাদের সঙ্গী না হলে কিছুই হতো না। বন্ধু কলিগদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে রাজধানীতে মাইক্রোবাসে গন ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এক তরুণী। এ নিয়ে বেশ হৈচৈও হয়েছিল। কিন্তু এমন আড্ডায় তিনি যুক্ত না হলে হয়ত ঘটনার শিকার হতেন না। যে মা বাবা নিজের কিশোরী মেয়েকে সামান্য কিছু টাকার জন্য কারো বাসায় বন্ধক দিয়ে দিয়েছেন, এমনটি না করলে হয়তো মেয়েটি অকালে হারিয়ে যেতো না। ছোট্ট সায়মাকে সন্ধ্যার পর বের হতে না দিলে হয়তো এমন নির্মমতার শিকার হতো না।

কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর হয়ত বিচার পাওয়া যাবে কিন্তু যা হারাবে সেটা কোনো দিন ফেরত পাওয়া যাবে না। তাই সায়মাদের মতো এমন অসংখ্য শিশু দেশের আনাচে কানাচে নির্যাতিত হচ্ছে, মাইক্রোর মতো ঘটনা যখন তখন ঘটছে, একটু সচেতন হলেই এমন ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

একজন মা, তাকেই সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হয় তার মেয়েটির প্রতি। সে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কার সঙ্গে ঘুরছে, এসব বিষয়ে খেয়াল রাখা দায়িত্ব। আমার ছোট্ট মেয়েটি বাসা থেকে বের হয়ে কোথায় গেল বা কোন আত্মীয় এর সঙ্গে গেল, আদরের বড় মেয়েটি কার সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে, এসবে নজর রাখা জরুরি। সরল বিশ্বাসে আমি মেয়েটিকে ছেড়ে দিলাম। গরল এই পৃথিবীতে এমন সরল হতে কেউ আপনাকে বলেনি। বলছি না আত্মীয়, বন্ধু বা প্রতিবেশিকে অবিশ্বাস করতে হবে। রক্ত মাংসের পশু সমতুল্য একজন মানুষ কখন একটি অঘটন ঘটিয়ে সারা জীবনের বেদনার কারন হয়ে দাঁড়াবে, সেটি আপনি জানেন না। তাই বলবো নিজের সন্তানের পাহারাদার নিজেকেই হতে হবে। আমরা যদি নিজেদের সন্তানকে রক্ষা না করি, তাহলে সরকার কেন সারা পৃথিবীও রক্ষা করতে পারবে না।

অনেকেই কাজের জন্য বা ক্লাসের প্রয়োজনে একাকী বের হচ্ছেন। নির্জন বাসে একাকী গন্তব্যে রওয়ানা দিয়েছেন। আপনি আপনার চার পাশটি দেখুন। অন্ধের মতো পথ না চলে নিজেকে সজাগ রাখুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় যার সঙ্গে ফেসবুকিং করছেন তার কথায় নির্জন জায়গায় দৌড় দেওয়ার আগে একশবার ভাবুন। আপনি তাকে চেনেন না কিন্তু চোখ বন্ধ করেই চলে গেলেন। এমন অদৃশ্য বিপদ থেকে কেউ আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না।

আমাদের চারপাশে এক শ্রেণীর হায়েনা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট বাচ্চাটাকে দোকানে পাঠানোর আগে বা ঘর থেকে বাইরে খেলতে যাওয়ার পূর্বে, সন্ধ্যার পর চৌকাঠ পেরোনোর আগে ভাবা দরকার তাকে যেতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে কি না। বেশির ভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে আপনজন বা প্রতিবেশির দ্বারাই নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটছে। সুতরাং আমার ভাই হয়, প্রতিবেশি, কাকা এদের উপর নির্ভরশীল বেশি না হয়ে, নিজেকেই সতর্ক দৃষ্টিতে রাখা দরকার।

যে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, সে যতই ভালো হোক তার সঙ্গে আপনি কতটুকু যেতে পারেন, আপনাকে আপনার লিমিটের জায়গাটা নিয়ে ভাবা দরকার। রাতের অন্ধকারে বের হচ্ছেন এ সময়টা আপনার জন্য কতটুকু উপযুক্ত, একবার ভাবুন। এসব ভাবনা সবার মধ্যে জাগরিত হওয়া সময়ের দাবি।

উপরে যে ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করেছি তার কারণ ওই পরিবারগুলোতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা কোন দিন মুছে যাবার নয়। যে মেয়েটির সঙ্গে এমনটি হয়েছে তার রেশ কোন দিন শেষ হবে না। তার ভেতরের চাপা কান্না বছরের পর বছর হয়ত চলতে থাকবে। বিশ বছর আগে যে মেয়েটির সঙ্গে এমনটি হয়েছে, সে এখনো কাঁদছে। কাঁদছে সায়মার পরিবার। এমন অগণিত মেয়ে শহর নগর বন্দরে অন্ধকারে বসে কাঁদছে। কেউ নিজের সামান্য ভুলে বা কেউ জোর পূর্বক ঘটনার শিকার হয়ে। তাই বলবো সচেতনতাই পারে এই মহামারি থেকে আমাদের কিছুটা রক্ষা করতে। সবাই সতর্ক হলেই এমন ঘটনা বহুলাংশে কমে যাবে। নিজেরাই নিজেদের সন্তানকে রক্ষা করতে হবে, তাদেরকে আগলে রাখতে হবে। একজন নারী তার অসচেতনতা বা ছোট্ট ভুলে ঘটনার শিকার হতে যাচ্ছেন কি না পা ফেলার আগে সেটি গভীরভাবে ভাবা দরকার। কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আক্ষেপ না করে আগেই আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: সাংবাদিক
 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি