ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

উপাস্য ও উপাসনা

প্রেক্ষিত : শারদীয় দুর্গোৎসব

প্রকাশিত : ১৭:৫৮ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ২২:৪৯ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

এ মহাবিশ্ব এক অপার বিস্ময়। আমাদের এ সৌরমণ্ডলটিতে কেবল সূর্যই নক্ষত্র এবং অন্যসব গ্রহ ও উপগ্রহ। বিজ্ঞানীগণ বলেছেন, আমাদের পৃথিবীটার মত ১৩ লক্ষটি পৃথিবীর সমান হচ্ছে এ সূর্যটা। আর সূর্যটার মত অজস্র নক্ষত্র ধূলিকণাসম বিদ্যমান রয়েছে এ ছায়াপথে। আর আমাদের নিকটতম একটি নক্ষত্রপুঞ্জ বা ছায়াপথে এক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। সেখানে অর্ধেক নক্ষত্র খেয়ে ফেলেছে একটি অন্ধকুপ। বাকি অর্ধেক খেয়ে ফেলার পরে সেটি হবে এক ঘন কুয়াশা। এটি নাকি আমাদের পৃথিবী থেকে পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। চোখের পলকে বা এক সেকেন্ডে যে আলো চলে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, সে হিসাবে পাঁচ কোটি বছরে আলো যেখানে পৌঁছে, সেখানে ঐ নক্ষত্র পুঞ্জটি অবস্থান করছে। এটি যদি নিকটতম হয়, তাহলে দূরতমটি কোথায়Ñ কত দূরে? আর পৃথিবীটার আয়ুষ্কাল সম্পর্কে এক বিজ্ঞানী বলেছেনÑ এর বয়স অন্তত দুইশ কোটি বছর।

সনাতনী শাস্ত্রমতে কল্প, মন্বন্তর ও যুগ বিন্যাসে কাল নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি কল্পকালের আয়ুষ্কাল মনুষ্য পরিমিত ৮৬৪ কোটি বছর যা ১৪ (চৌদ্দ) টি মন্বন্তর এবং সহস্র চতুর্যুগে (সত্য, ক্রেতা, দ্বাপর ও কলি) বিন্যস্ত হয়েছে। এখন চলছে শ্বেত বরাহ কল্প এবং ৭ম (বৈবস্বত) মন্বন্তর। একটি মন্বন্তরে প্রায় ৭২টি চতুর্যুগ বা মহাযুগ। একটি চতুর্যুগের আয়ুষ্কাল হলোÑ ৪৩,২০,০০০ বছর। আমার এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্যে হলো একবার ভেবে দেখা কত বিস্তৃত ও দীর্ঘবয়স্ক এ মহাবিশ্ব এবং সৃষ্টি-রহস্য কতটা গভীর অনুধ্যানের বিয়ষ। আর এ থেকে অনুমেয় যে, সীমাহীন পরিব্যাপ্ত এবং অনন্ত দীর্ঘ বয়স্ক এ মহাবিশ্ব মাঝে আমাদের এ পৃথিবীটা কত ক্ষুদ্র। সেই পৃথিবীতেই বিদ্যমান বিশাল সমুদ্র, প্রবল ঊর্মিমালায় উত্তাল নদনদী, সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত, গহীন অরণ্য আর নিঃসীম নীলাকাশসহ তাবৎ সৃষ্টি-রহস্যের সামান্য অংশ দেখে-শুনেই মানুষ ভীত, বিস্মিত আর বিমুগ্ধ হয়ে ভাবতে শুরু করেÑ কে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেনÑ কোথায় তিনি থাকেনÑ কি তার রূপাবয়ব ইত্যাকার নানা প্রসঙ্গে। আর, এ ভাবনা থেকেই একদিন শুরু হয়েছিল উপাসনা তথা সাধনার।

মানুষ যেদিন থেকে ভাবতে শিখেছে সেদিন থেকেই প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সভ্যতারও শুরু হয়েছে। স্থান, কাল ও সীমানাভেদে আবার উপাসনার পথ ও পদ্ধতি হয়েছে বিভিন্ন। আর, এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে আধ্যাত্মিক তথা ধর্মীয় বিভিন্ন মত পথের। যেমনÑ সনাতন ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদি। সব মত-পথেই সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজা, জানা এবং সৃষ্টি রহস্যকে বোঝার চেষ্টা পরিদৃষ্ট।

প্রকৃতপক্ষে, মানুষের ধর্ম একটাই, তা হলো মানবধর্ম বা মনুষ্যত্ব। আর সৃষ্টিকর্তাও একজনই। তাঁকে যে যেনাম ধরে ডাকে তিনি তাই। সৃষ্টিকর্তা আলাদা আলাদা হলে কোন একজন সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্ট মানুষদের পেছনে আরও দু’টো চোখ দিয়ে দিতে পারতেন। একেক ধর্মমতের মানুষের রক্তের রং একেক রকম হতে পারত। তাই, বলা যায় আমাদের উৎস এক এবং গন্তব্যও এক। কেবল পথ ও পাথেয়র ভিন্নতা। যেমন : পটুয়াখালী থেকে কেউ ঢাকা আসতে চাইলে যেমন পারবেন, দিনাজপুর থেকে অথবা চট্টগ্রাম থেকে কেউ আসতে চাইলে তিনিও পারবেন। তবে, পটুয়াখালী থেকে কেউ ট্রেনে আসতে চাইলে যেমন ভুল করবেন, তেমনি দিনাজপুর থেকে কেউ লঞ্চে আসতে চাইলেও ভুল করবেন। তাই, প্রত্যেককে যার যার পথের উপযুক্ত যানবাহনটি বেছে নিতে হবে এবং সঠিক পাথেয় নিয়ে আসতে হবে।

সে যাই হোক, পৃথিবীর বড় ধর্মমতগুলোর একটি অন্যতম ধর্মমত হলো সনাতন ধর্ম। এই সনাতন ধর্মে সাধনার প্রধান ৫টি ধারা বা শাখা সৃষ্টি হয়েছে। যথাÑ বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, সৌর ও গাণপত্য। এই পাঁচটি শাখার অনুসারীগণই আবার সনাতন ধর্মের বড় বড় ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানসমূহে কমবেশি একাকার হয়েই উৎসবাদি পালন করেন।

আমাদের আজকের প্রেক্ষিত হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। এই শারদীয় দুর্গোৎসব-এর পূর্বাপর উৎসব হিসেবে মহালয়া উৎসব, লক্ষ্মীপূজা ও শ্যামাপূজা সমন্বয়েই এখন শারদোৎসব উদযাপিত হয়; বিশেষত বাঙালি সনাতনী সমাজে। প্রকৃতপক্ষে মহালয়া দিয়ে শুভারম্ভ এবং দীপাবলি ও শ্যামাপূজা দিয়ে শারদোৎসবের সমাপন। শ্যামাপূজা হেমন্ত ঋতুর প্রারম্ভে হলেও বিন্যাসটি শারদীয় উৎসবেরই অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হয় (যদিও শাস্ত্র বলছেনÑ ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অগ্রহায়ন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা পর্যন্তই মহালয়ার কাল। সুতরাং এর ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত)।

কেননা, মহালয়া অমাবস্যায় (পার্বণ শ্রাদ্ধে) যে পূর্ব পুরুষগণকে শ্রদ্ধা সহকারে আমন্ত্রণ জানিয়ে মহাশক্তি দেবী দুর্গার জাগরণ তথা বোধন করা হয় তাদেরকেই আবার দীপান্বিতা আমাবস্যায় দীপাবলি উৎসবের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় বলে প্রথাগত অনুসৃতি রয়েছে। আর, দীপান্বিতা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় আবাহনের মধ্য দিয়ে শ্যামামায়ের পূজা সেদিন কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি অমাবস্যায় সম্পন্ন হয়। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক মা দুর্গার চালচিত্রের শিরোভাগে দেবাদিদেব শিব; আবার কালী বা শ্যামা মায়ের বিগ্রহচিত্রে দেখা যায় শিবের বক্ষোপরি পদস্থাপিতা মহামাতা কালী এবং শিবকে কালীমায়েরও স্বামী বলা হচ্ছে, আবার মা দুর্গারও স্বামী বলা হচ্ছে। তাহলে কি দেবীদুর্গা এবং কালী-দু’জনেরই একই স্বামী? বিষয়টি অনুধ্যানে না আসলে বোধভ্রান্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। শিব হচ্ছেন বিশ্বের স্বামীÑব্রহ্মেরই একরূপ। মা দুর্গা এবং কালী তারই মহাশক্তির ভিন্ন রূপ মাত্র। নিরাকার পরব্রহ্ম সম্পর্কে পবিত্র মহাগ্রন্থ বেদে বিধৃত রয়েছেÑ ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয় (একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম)। এই নিরাকার ব্রহ্মের সাধনা কেবল সাধকই করতে পারেন, সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয়। উপনিষদের ঋঝিপ্রোক্ত মন্ত্রোচ্চারণে তাই ভক্ত বলেছেনÑ

 ‘‘অসতোমা সদগময়

তমসোমা জ্যোতির্গময়

মৃত্যোর্ম্মাহমৃতং গময়

আবিরাবির্মএধি।’’

আমাকে অসত্য থেকে সত্যের পথে নিয়ে চলো, অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে চলো, মৃত্যু থেকে অমৃতত্বে নিয়ে চলো; হে সপ্রকাশ ব্রহ্ম! তুমি আবির্ভূত হও। ভক্তের এরূপ আকিঞ্চনে সেই অঘনঘটনপটিয়সী সর্বশক্তিমান এক থেকে বহু হতে চাইলেনÑ

 ‘‘একোহহং বহুস্যাম প্রজায়েম।’’

তিনি স্বয়ং বিভাজিত হয়ে পুরুষ ও প্রকৃতিরূপে আত্মপ্রকাশ করলেনÑ

সেই পুরুষ থেকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব রূপে প্রকটিত হলেন। আর তিনিই ব্রহ্মারূপে সৃজন করেন, বিষ্ণুরূপে পালন করেন এবং শিবরূপে প্রলয় করেন। আর তার প্রকৃতিই সেই আদিশক্তি বা আদ্যাশক্তি। শক্তিমানের শক্তি। অর্থাৎ, বিশ্বের স্বামীও একজনই এবং তাঁর মহাশক্তিও একই। শক্তিমান ছাড়া শক্তি থাকে না এবং শক্তি ছাড়া শক্তিমান হয় না। যুগে যুগে- বারে বারে তিনি নানারূপে প্রকাটিতা-বিরাজিতা। সেই একই মহাশক্তি সমরে সিংহবাহিনী-ভোগে ভবানী-জগৎপালনে জগদ্ধাত্রীÑঅসুর নিধনে করালী কালীÑসম্পদে লক্ষ্মী এবং জ্ঞানে সরস্বতী। চণ্ডমুণ্ড বধে মহাদেবী দুর্গার ভ্রুকুটি থেকে নির্গতা হলেন ভয়ঙ্করী ভীষণবদনা ভীষণকায়া মহাকালীরূপে, যিনি চামুন্ডা নামে অভিহিতা হলেন। এভাবে তিনি নানারূপে প্রকাশিতা হন যুগে যুগে। যখন অনন্বীকার্য তখনই কেবল তার মহিমা এবং শক্তিমানতা প্রয়োজনমত প্রয়োগ করেন। সেই অখণ্ড মহাশক্তি মহামাতা দেবীদুর্গা শ্রীশ্রীচণ্ডীগ্রন্থের প্রথম চরিতে মহাকালিকা, মধ্যম চরিতে মহালক্ষ্মী এবং উত্তর চরিতে মহাসরস্বতী।

আবার তিনি অষ্টশক্তির প্রকাশে রক্তবীজ অসুরকে নিধন করেন। এই অষ্টশক্তি হলেনÑ ব্রাহ্মণী, মহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, ঐন্দ্রী, যজ্ঞবারাহী, নারসিংহী ও চণ্ডিকা।

নবদুর্গারূপে তিনি শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী (উমা/হৈমবতী), চণ্ডঘণ্টা, (হিমালয় দুহিতা), কুষ্মাণ্ডা, কাত্যায়নী, স্কন্দমাতা, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রীরূপে অভিহিতা।

দশমহাবিদ্যারূপে তিনি কালী, তারা, ছিন্নমস্তা, ভুবনেশ্বরী, বগলা, ধুমাবতী, কমলা, মাতঙ্গী, ষোড়শী ও ভৈরবী।

দেবী দুর্গা দশভূজারূপেই মূলত পূজিতা হন। তবে, অষ্টভূজা, অষ্টাদশভূজা, শতভূজা এমনকি সহস্রভূজা রূপেও অঞ্চলভেদে পূজিতা হন। এর প্রত্যেকটিরই এক একেকটি তাৎপর্য রয়েছে। তবে, মা যে সবদিকই দেখছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন সেটাই এর মাধ্যমে নির্দেশিত হচ্ছে।

তাঁর দশহাতে দশ প্রহরণের যেমন ব্যাখ্যা রয়েছে, তেমনি তাৎপর্য বিমণ্ডিত রয়েছে মহামাতার চালচিত্রে বিন্যস্ত সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের প্রতীক সমাহার এবং সকল বর্ণের প্রতীকের সম্মিলন।

প্রকৃতি প্রতিনিধি নয়টি গাছের চারা (কদলী, কচু, হরিদ্রা, বেল, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান) দিয়ে নবপত্রিকা বা কলাবৌ সাজিয়ে মঞ্চশোভিত করা হয় যা একাধারে প্রকৃতি পূজার প্রতীক।

এভাবে দুর্গাপূজায় বিবিধ উপচার ও বিষয়ের সমন্বয় ও সমাহারে পূজার সর্বতোমুখী আয়োজনে দুর্গোৎসব সার্বজনীন এক মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। তাইতো, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে উৎসারিত হয়েছেÑ

 ‘‘মার অভিষেক এসো এসো ত্বরা

মঙ্গল ঘট হয়নি ভরা

সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে।’’

দুর্গোৎসব বছরে দু’টি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। একটি শরৎকালে এবং অন্যটি বসন্তকালে। শরৎকালের পূজা অকালের পূজা। কেননা, শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস (সূর্য যখন বিষুবরেখার দক্ষিণ অয়ন বা দিকে) বা দক্ষিণায়নে থাকে তখন দেবতাদের রাত্রিকাল। তাই, এ সময়ে দেবীর জাগরণের জন্যে বোধন করতে হয়। আর, মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত ছয় মাস সূর্য বিষুবরেখার উত্তরে থাকে বলে এ সময়কে উত্তরায়ণ বলা হয়। দেবতাগণ এ সময়ে জাগ্রত থাকেন।

উল্লেখ্য যে, দেবতাদের এক দিবারাত্র মনুষ্য পরিমিত এক বছর। তাই, বসন্তকালের পূজায় বোধন করতে হয় না। তবে, উভয় ক্ষেত্রেই দেবীপূজার বিগ্রহ বিন্যাস সম্বলিত চালচিত্র একই রকম হয়েছে কালক্রমে। তবে, শরৎকালে পূজা মূলত ত্রেতাযুগের অবতার শ্রীরামচন্দ্রের পূজা বিধি বা রীতি অনুসরণে চলছে যার একটি অতিসুন্দর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে (পরিসর সীমাবদ্ধতায় কারণে বর্ণনা পরিহার করা হলো)। আর, বাসন্তী পূজা হচ্ছে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য কর্তৃক অনুষ্ঠিত দেবী পূজার রীতিতে যা স্বারোচিষ মন্বন্তরে করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, একটি মন্বন্তরে প্রায় ৭২টি চতুর্যুগ (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি) থাকে এবং একটি চতুর্যুগ বা মহাযুগেরই আয়ুষ্কাল হচ্ছে ৪৩,২০,০০০ বছর। সুতরাং, বহুকাল পূর্ব থেকে যে পূজার ইতিহাস তাতে যুগে যুগে কিছুটা সমন্বয়, সংস্কৃতিচেতনা ও যুগ ভাবনা প্রযুক্ত হয়েছে। যেমন দুর্গাপূজার বিগ্রহ বিন্যাসাদিতে একাধারে একটি যুদ্ধচিত্র এবং একটি পারিবারিক বিন্যাস সম্বলিত চিত্র পরিদৃষ্ট হচ্ছে।

এখানে দেবীদুর্গা কর্তৃক মহিষাসুর বধের যুদ্ধ চিত্রটি প্রযুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পরিলক্ষিত যে, দেবী দুর্গা যেন সন্তানদের নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে পিত্রালয়ে বছরান্তে নাইয়র এসছেন। তাই, বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে যেন কন্যার আগমনে অনেক আয়োজন করা হয়। মা মেনকার মাতৃভাব যেন সকল মায়ের হৃদয়ে বাজে। যেমন করে মা মেনকা তাঁর স্বামী গিরিরাজকে বলেছেনÑ

 ‘‘যাও যাও গিরি আনগে উমায়,

উমা যেন কেঁদে ডাকিছে আমায়।’’

পরিশেষে, প্রাণিধানযোগ্য সংবাদটি হলো এই যে, যুগে যুগে যখনই প্রয়োজন দুর্গতিনাশিনী মহামাতা দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হয়ে অসুর তথা দানবীয় শক্তির বিনাশ সাধন করেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী ভগবতী তাই বললেনÑ

 ‘‘ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি

তদাতদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরি সংক্ষয়ম।’’

(যখন যখন দানবের অত্যাচার সংঘটিত হবে তখন তখন আমি অবতীর্ণ হয়ে অসুরদেরকে বিনাশ করব।) দেবী দুর্গা যুগে যুগে অসুরদের অত্যাচার যখনই দুর্যোগের সৃষ্টি করেছে তখনই আবির্ভূতা হয়ে মহিষাসুর, চন্ডমুণ্ড, ধূম্রালোচন, রক্তবীজ, শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রভৃতি অসুরদেরকে বধ করেছেন।

আজ আবার দুর্যোগের কালো মেঘরাশি যেন আচ্ছন্ন করে ফেলতে চাইছে দিকচক্রকাল। প্রমত্ত মেঘের গগন বিদারী গর্জন আর বজ্র বিদ্যুৎ সম্পাতে পৃথিবী আজ কম্পমান। অশুভ শক্তির দোর্দণ্ড প্রতাপেÑ দানবের পাষাণ কঠিন পদভারে ত্রস্ত সভ্যতা।

তবে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায়, অশুভ শক্তি যতই দোর্দণ্ড হোক না কেন, শুভ শক্তির কাছে অশুভ শক্তিকে পরাভব মানতেই হবে। কেননা, সৎসাধকের শিরায় শিরায় যে অমিতবীর্যের তেজ প্রবহমান, তার সম্মিলিত স্রোতধারায় চূর্ণিত হবে বাধার বিন্ধ্যাচল।

তাই, আজ শারদীয় দুর্গোৎসবের এ শুভক্ষণে অসুর বিনাশিনী দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা সকাশে আমাদের প্রার্থনাÑ এসো হে জগৎজননী! দুর্যোগ-পীড়িত আজকের এ সমাজ ও সভ্যতার দুর্যোগ কাটিয়ে শান্তি ও কল্যাণের দীপ্র আলোয় ভরিয়ে দাও পৃথিবীকে। জয় হোক শুভশক্তিরÑ জয় হোক তাবৎ শুভবাদী মানুষের।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি