ঢাকা, বুধবার   ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বনাম কারিগরি শিক্ষা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৬:৫২, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ | আপডেট: ১৭:৩৭, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩

চীন ১২ বছর বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম বন্ধ রেখেছিল। এখন মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করা মানে তো একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করা। সেই জাতিকে হাজার বছর পিছনে ঠেলে দেয়া।

তাহলে চীনের ১২ বছর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কিভাবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়? সেটি কিভাবে নাগরিকদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে?

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার পেছনে চীন সরকার খুবই সহজ যুক্তি প্রদর্শন করে— বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এতো ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ কি? তারা চাকরি কোথায় পাবে? এতো ছেলেমেয়েদের চাকরি দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠান চীনে তখন ছিলো না। তার মানে এই যে এইসব ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করে শিক্ষিত বেকারে পরিণত হবে। তাই চীন সরকার সিদ্ধান্ত নেয় দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে আধুনিক প্রশিক্ষন দেয়ার। স্বল্প মেয়াদী ট্রেড কোর্সে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর চীনের ছেলে মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠে।

চীনের প্রতিটি বাড়ি পরিণত হয় এক একটি ছোট-খাটো কারখানায়। পুরো পরিবারের সবাই সেখানে কাজ করতে শুরু করে। ফ্যাক্টরি আলাদা করে নির্মাণ করতে হয়নি, বাড়তি খরচও লাগেনি। ফলে ধীরে ধীরে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমে যায়। আজকের দিনে এসে যে কোনো পণ্য এতো সস্তায় উৎপাদন করার সক্ষমতার দিক দিয়ে চীনের আশেপাশেও কোনো দেশ এখন ঘেষতে পারেনি। দুনিয়াজুড়ে চীনা পণ্যের কদর বাড়ছে। 'মেড ইন চায়না' কথাটার সাথে তাইতো আমরা সবাই এতো ভালোভাবে পরিচিত।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন যদি তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয় তবে দেশের বিরাট কোনো অমঙ্গল হবে বলে আমার মনে হয়না। আমার এমন বক্তব্যে কেউ যদি দোষ দেখেন তাহলে আমার জিজ্ঞাসা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্বাধীনতার পর আমাদের কি মঙ্গল হয়েছে? দেশে আজ হাজারো বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ দেশজুড়ে অজস্র বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এখনো অসংখ্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন এমনকি কলেজগুলোর নাম পরিবর্তন করেও বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে। কিন্তু এতে কিছু করে লাভ কি হলো? কি পেলাম আমরা!! 

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, "দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে, শিক্ষকদের শিক্ষাসেবার মান কমে যাচ্ছে।" যেখানে শিক্ষকদের এই দুরাবস্থা সেখানে ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা তো কল্পনাতীত। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে রিকশা টানতে হচ্ছে, চায়ের দোকান দিতে হচ্ছে তাদের। এখন হয়তো 'কথিত নৈতিকতা ও আদর্শের' বাণী আওড়াতে এসে আত্মস্বীকৃত বুদ্ধিজীবী বা তাদের প্রেতাত্মারা বলবে কোনো কাজকেই ছোটো করা উচিত না। সব কাজ মর্যাদাপূর্ণ। 

তাহলে আমার প্রশ্ন রিকশা চালানোর জন্য, চা বানানোর জন্য, ফেরিওয়ালা হবার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কি প্রয়োজন ছিলো? সেখানে চা বানানো শেখানো হয় নাকি রিকশা চালানো শিখানো হয়? রিকশাই যদি চালাতে হয়, পেশা হিসেবে চায়ের দোকানি বা ফেরিওয়ালার জীবনই যদি বেছে নিতে হয় তবে রাষ্ট্রের, পরিবারের কাড়ি কাড়ি টাকা নষ্ট করবার কি প্রয়োজন ছিলো? প্রাথমিক বা বুনিয়াদি শিক্ষা অর্জনের পরেই যদি তারা এই পেশায় নেমে যেতো তাহলে সময় এবং অর্থ দুটোই সাশ্রয় হতো। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকার পরেও যদি চাকরির প্রশ্নের জন্য নতুন করে বই গিলতে হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যায় কি শেখাল এতো বছর? উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে সুযোগের কি সদ্ব্যাবহার হলো? মেহনতি মানুষের ঘাম ঝরানো অর্থে পরিচালিত পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলার কৃষককে কি দিলো গত ৫০ বছরে? শ্রমিকেরা কি পেলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে?

রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত না করতে পারে তবে রাষ্ট্র ব্যার্থ— এই কথা বলে আমাদের মতো সুশীলরা সবাই দায় এড়িয়ে সাধু হবার চেষ্টা করি। আপনি আপনার সন্তানকে কি পড়াচ্ছেন সেটা কখনো ভাবছেন না তাকে গাধা বানিয়ে ছেড়েছেন আর সমস্ত দোষ রাষ্ট্রের ঘাড়ে। পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাবার জন্য, জিপিএ-৫ পাবার জন্য হেন কোনো অপকর্ম নেই যা আমাদের অভিভাবকরা করেননা। সরকার তথা রাষ্ট্র যেমন তার ব্যার্থতার দায় এড়াতে পারেনা তেমনি এই সমাজেও পারেনা। 

বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝানো হয় তার অস্তিত্ব কি আদৌ বাংলাদেশে আছে নাকি সব বিশ্ববিদ্যালয় গোয়াল ঘর হয়ে গেছে— ভাববার সময় এখন এসেছে আমি তা বলবোনা বরং বলোবো ভাববার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। সময় তো সেদিনই হয়েছিলো যেদিন আহমদ ছফাকে 'গাভী বিত্তান্ত' রচনা করতে হয়েছে। এখন যদি না ভাবেন তবে আর কবে?

 

(লেখাটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

এসি
 


Ekushey Television Ltd.


Nagad Limted


© ২০২৪ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি