ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ১১:৫৫:৩৭

Ekushey Television Ltd.

‘ব্লু –ইকোনমির সুবিধা পেতে দরকার গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:৩৩ পিএম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ১১:৫৭ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সোমবার

ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ

ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ

বাংলাদেশের সমুদ্র তলদেশ ও এর তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। তেল-গ্যাসসহ নানাবিধ সম্পদের হাতছানি রয়েছে এ সমুদ্র বক্ষে। এসব সমুদ্র ও নদী থেকে আহরিত মৎস্য সম্পদে জীবিকা নির্বাহ করে লাখো মানুষ। লবণ চাষ, শুঁটকি উৎপাদন, কাঁকড়া চাষ, চিংড়ি চাষে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সমুদ্র সৈকতের খনিজ বালু এই জনপদের আরেকটি সম্ভাবনা।

পর্যটন খাতেও উপকূলজুড়ে রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। বাংলাদেশ এতোদিন নিজস্ব সক্ষমতায় মাছ ধরাসহ সমুদ্র ও নদী তীরবর্তী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারতো।

কিন্তু এখন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে মাছ ধরাসহ সাগরের তলদেশে বিদ্যমান তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের। কারণ আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্তৃত্ব পেয়েছে। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে অবস্থিত সব ধরণের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠারও অধিকার পেয়েছে।

সমুদ্র সম্পদ ঘিরে বাংলাদেশের অসীম সম্ভাবনা বিষয়ে সম্প্রতি কথা হয় অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদের। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদকে ঘিরে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্নটা অনেক বেড়ে গেছে। কারণ মিয়ানমারসহ পার্শবর্তী দেশগুলোর দৃশ্যপট আমাদের বলছে সমুদ্রে আমাদের অপার সম্ভাবনা আছে। এখন কথা হলো সে সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে আমাদের পরিকল্পনা নিতে হবে। যে পরিকল্পনা হতে হবে গবেষণাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম । 

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কেমন আছেন, স্যার?

কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ: হ্যা, ভালো।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় কী ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ: মিয়ানমারসহ পার্শবর্তীদেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের বলছে সমুদ্রে আমাদের বিপুল সম্ভাবনা আছে। যেগুলো কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে দেশ আরও এগিয়ে যাবে। আমরা সেখান থেকে তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য সম্পদ আহরণ করতে পারি। ব্লু-ইকোনমিতে বিপ্লবের মাধ্যমে অন্যের ঈর্ষার জায়গাতেও যেতে পারি।

তবে সম্ভাবনা এক জিনিস আর সেটাকে কাজে লাগানো আর এক জিনিস। বাস্তবায়ন এক জিনিস। যেমন আমাদের প্রচুর তরুণ প্রজন্ম আছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টে আমরা সময় পার করছি। সাড়ে পাঁচ কোটি তরুণ আমাদের দেশে। সেটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। এ ক্ষেত্রে যথাযথ উদ্যোগের ঘাটতি রয়ে গেছে। আমাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এ সমুদ্র ও তরুণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি বলছিলেন পার্শবর্তী দেশের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যাচ্ছে বিপুল সম্ভাবনা আছে, তবে সে দেশগুলো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে- আমরা কেন পারছি না?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: আসলে আমাদের এ সম্ভাবনা খুব বেশি দিন আগে তৈরি হয়নি। আবার যতদিন হয়েছে তাতে আমরা আরও অনেক এগিয়েও যেতে পারতাম। কিন্তু তা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদের বড় দূর্বলতা গবেষণাভিত্তিক বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার অভাব। গবেষণার ক্ষেত্রে কী কী কাজ আগে করা দরকার, সে অগ্রাধিকার নির্বাচনের অভাব। সর্বোপরি এ কাজকে এগিয়ে নিবে এমন উপযুক্ত পৃথক একটি প্রতিষ্ঠানের অভাব।

একটি বিষয় হলো বাংলাদেশে আমরা অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা করি। কিন্তু পরিকল্পনার অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নে গিয়ে যেভাবে কাজ হওয়ার কথা সেভাবে হয় না। তো সমুদ্র অর্থনীতির বিষয়ে আমরা পরিকল্পনারও আগে রয়ে গেছি। সে জন্য এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে অগ্রাধিকার ঠিক করে পরিকল্পনা করা। যদিও এরই মধ্যে বেশকিছু কাজ শুরু হয়ে গেছে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সাগরে অনুসন্ধান কাজ এগিয়ে নিতে ব্লু -ইকোনমি নামে একটি সেল এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে। যা স্থায়ী পৃথক সেল হিসেবে গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আপনি কী এটা ছাড়াও অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের কথা বলছেন?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: কথা হচ্ছে সরকারের একটা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য একটা প্রতিষ্ঠান লাগবে-ই। এ ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি না করতে পারে, তবে নতুন প্রতিষ্ঠান করতে হবে। আমাদের যে, নৌমন্ত্রণালয় আছে-পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় আছে, তাদের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া আছে। তাদের এ কাজগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটা স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে একটা স্থায়ী সেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আমি মনে করি এ কাজ এগিয়ে নিতে সেলের চেয়েও শক্তিশালী উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া দরকার।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সমুদ্রে এ সম্পদ আহরণে দরকার ব্যাপক অনুসন্ধান ও গবেষণা, বাংলাদেশের সে সক্ষমতা কতটুকু আছে বলে মনে করেন?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: সোজা কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের এ ধরণের অনুসন্ধানের সক্ষমতা নেই। কারণ সমুদ্রে কতগুলো জিনিস- যেমন তেল বা গ্যাস। এগুলো অনুসন্ধান করার সেই প্রযুক্তি বা দক্ষ জনবল বাংলাদেশে নেই। এখানে যে টেকনিক্যাল বিষয় দরকার সেই ক্ষমতাও পুরোপুরি আমাদের নেই।

আবার ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষ জনবল আমাদের আছে এ  কথা খুব জোর দিয়ে বলা যাবে না। তবে বলা যেতে পারে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: তবে কী এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিদেশি কোন কোম্পানিকে আনতে পারে?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: যেহেতু আমাদের সক্ষমতা নেই, সেহেতু বিদেশের সহায়তা এখানে নিতেই হবে। তবে আস্তে আস্তে আমাদের সে সক্ষমতা অর্জন করতে-ই হবে।এ মুহুর্তে বাইরের কোম্পানিগুলোকে তা অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিতে হবে। সাগরে হয়তো মাছ ধরাসহ ছোট ছোট কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা আমাদের আছে। অনুসন্ধানের জন্য দরকার বড় জাহাজ ও প্রযু্ক্তির। তাই সে জন্য বিদেশি কোন কোম্পানিকে তো আনতেই হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া বিষয়টি কোন প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: বিদেশি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এ ক্ষেত্রে বিদেশিদের হাতে কাজ দিতে আগেই চুক্তি করতে হবে এবং সে চুক্তি হবে বাংলাদেশের অনুকূলেই। অনেক সময় এমন হয়, যে ওরা শর্ত দিয়ে আমাদের সম্পদ সব নিয়ে চলে গেল। সে রকম হলে হবে না। নিজেদের স্বার্থ বজাই রেখেই তাদের কাজ দিতে হবে। তবে সব কাজ দিলে কিন্তু হবে না।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অনুসন্ধানের এ কাজ দেশীয় বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়া যায় কী না?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: বিশাল এ কর্মকাণ্ড সরকারি নিয়ন্ত্রণে-ই হওয়া উচিত। বেসরকারি খাতে কোন অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে বেসরকারি পর্যায়ে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। অনেকটা এমনও হতে পারে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতি। তবে এ ক্ষেত্রে সব কাজ আবার প্রাইভেট কোম্পানির সঙ্গে ভাগাভাগি করা যাবে না। সে ক্ষেত্রেও যাচাইয়ের ব্যাপার আছে। যে কাজগুলো বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেওয়া যায়, শুধুমাত্র সে কাজগুলোই দিতে হবে। আর সে কাজগুলোর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে সরকারের-ই হাতে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সমুদ্র বিষয়ে আরও জোর দেওয়া দরকার কী না?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে কোথায় কী ধরণের দক্ষতা লাগবে। সেইভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমুদ্র বিষয়ে যারা উচ্চ শিক্ষা অর্জন করবে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্চ শিক্ষায় গবেষণার ক্ষেত্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানবিষয়ক পাঠ্যসূচিসহ প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: এ ক্ষেত্রে অর্থায়নে বাজেটে থোক বরাদ্দ দরকার আছে কী না?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার আগে ঠিক করতে হবে। অগ্রাধিকার অনুযায়ী খরচটা নির্ধারণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বাজেটেও থোক বরাদ্দ আসতে পারে। আর বিদেশি কোম্পনিকে কাজ দিলে খরচটা তো তারাই দিবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অনেকে বলে থাকেন- সরকার গবেষণার নামে সময় আর টাকা খরচ না করে সরাসরি তেল-গ্যাস উত্তোলনে যেতে পারে, এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

কাজী খলীকুজ্জামান আহমেদ: গবেষণা ছাড়া কিছুই হয় না। তাই এতো বড় কাজে গবেষণা তো দরকার-ই। তবে এটা একটা বড় ব্যাপার যে, আমাদের বিনিয়োগটা কী পরিমান হবে? বা বিনিয়োগ থেকে আমরা কতটুকু লাভবান হবো, তা হিসেব করা। এখানে সম্ভাবনা এতটাই বেশি যে প্রথম দিকে কিছু বিনিয়োগ না করলে তা আমাদের দখলে রাখতে পারবো না। কারণ অন্যের হাতে পুরোটাই দিয়ে দিলে তারাই তো সব নিয়ে যাবে। তাই বিনিয়োগ করতে হবে এবং বিনিয়োগের সুফল ঘরে তুলতে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। কাজে দক্ষ, সৎ ও নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ লাগাতে হবে।

 

এসএইচ/ এআর

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি