ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:০৪:১১

Ekushey Television Ltd.

ভিক্ষাবৃত্তি থেকে আত্ম-মর্যাদার পথের যাত্রী যারা

মাহমুদুল হাসান, জয়পুরহাট থেকে ফিরে

প্রকাশিত : ০৭:৪৬ পিএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ রবিবার

যে হাত দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতেন জয়পুরহাটের সুফিয়া বেওয়া, তার সেই হাত এখন কর্মের হাতে পরিণত হয়েছে। এখানে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে পল্লিকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন।

সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে সমৃদ্ধি কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় সুফিয়াকে ১ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। শুধু টাকা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি সংস্থাটি। টাকাটা যেন সুফিয়া উত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারে তা সার্বিকভাবে তদারকি করেছে পিকেএসএফ এর সহযোগী সংগঠন জয়পুরহাটের জাকস ফাউন্ডেশন।

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করেছেন জয়পুরহাট জেলার নিক্তিপাড়া গ্রামের সুফিয়া বেওয়া। দরিদ্র দিনমজুর বাবার অভাবের সংসারে ছোট বয়স থেকেই মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে তাকে। মাত্র ১২ বছর বয়সে পাশের নিত্তিপাড়া গ্রামের মকবুল হোসেন নামে এক ভ্যানচালকের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয় সুফিয়াকে।

স্বামী মকবুল ২০০২ সালে পঙ্গু হয়ে গেলে সুফিয়ার সংসারে শোকের ছায়া নেমে আসে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে সুফিয়া বেছে নেন ভিক্ষার পথ।

চিকিৎসার অভাবে ২০০৮ সালে তার স্বামী মকবুল মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ে সখিনাকে নিয়ে খুব বিপদে পড়েন। কোনো উপায় না পেয়ে গাইবান্ধা জেলার কামদিয়া এলাকার একজন দিনমজুরের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে দেন। এতে তাদের কষ্ট লাগব না হয়ে বরং আরও বেড়ে যায়।

এরই মধ্যে ২০১০ সালে আশার আলো হয়ে আসে পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ)। সংস্থাটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সমৃদ্ধি কর্মসূচি ধলাহার ইউনিয়নে জরিপের মাধ্যমে ১০৪ জন ভিক্ষুকের একটি তালিকা করে। পুনর্বাসন কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে সুফিয়ার পরিবারকে পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য মনোনীত করা হয়।

জাকস ফাউন্ডেশন ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেয়ার মৌখিক ও লিখিত চুক্তির মাধ্যমে সুফিয়াকে দুটি গাভি ও একটি বাছুর কিনে দেন । আর এর মাধ্যমে জীবনযুদ্ধে হার না মানা সুফিয়ার ভিক্ষাবৃত্তির অবসান ঘটে। বর্তমানে দুটি গাভি দুটি বাছুরের মাধ্যমে প্রতিদিন পাঁচ কেজি দুধ পান। ওই দুধ বিক্রি করে মাসিক আয় আসে ৫ হাজার ২৫০ টাকা। এছাড়া মুরগী, কবুতর, বিভিন্ন ফল ও সবজি চাষ করেও আয় করেন সুফিয়া। বর্তমানে সুফিয়ার বাড়িটি একটি সমৃদ্ধ বাড়ি হিসেবে পরিচিত।

ভিক্ষার মত একটা লজ্জাকর পেশা থেকে বের করে টেকসইভাবে আয় ও সম্পদ বৃদ্ধি এবং মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন’ শীর্ষক এক প্রকল্প হাতে নেয় পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। তারা প্রতি ভিক্ষুককে এক লাখ টাকা দেয় নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য।

এই প্রকল্পের একজন সুবিধাভোগী হচ্ছেন সুফিয়া। সুফিয়ার মতো সমৃদ্ধি কর্মসূচীর আওতায় নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন আরও অনেক ভিক্ষুক। এদের মধ্যে রয়েছেন জয়পুরহাটের আবু বকর, চুয়াডাঙ্গার নূর ইসলাম-ছকিনা খাতুন দম্পতি, দিনাজপুর শহরের ফাসিলাডাঙ্গার কামরুজ্জামান, কবিতা রানি, জুলেখা খাতুন, জবেদা বেওয়া, রাবেয়া বেওয়া, পিরোজপুর জেলার সদর উপজেলার সিকদারমল্লিক ইউনিয়নের মনোরঞ্জন, পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের টগড়া গ্রামের আমেনা বেগম, চাপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রাণীহাটি ইউনিয়নের ওমর আলী, জামালপুর জেলার বকশিগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নের হাফেজা বেগম, খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের বদনখালী গ্রামের মোঃ সামাদ গাজী, সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের  বৃন্দাবালা, শরীয়তপুর জেলায় কাঁচিকাটা ইউনিয়নের চরজিংকিং গ্রামের নূরজাহান বেগম, কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলায় ঘোগাদহ ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী সাইফুল ইসলাম, যশোরের অভয়নগর উপজেলার পায়রা ইউনিয়নের মরিয়ম বেগম, ঢাকার ধামরাই উপজেলার সোমভাগ ইউনিয়নের আব্দুস সামাদ এবং ময়মনসিংহের ফুলপুরের এরশাদ আলী। এরা ছাড়াও আরও অনেকে ভিক্ষুক থেকে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

পিকেএসএফ জানায়, সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ৮৩৭ জন ভিক্ষুককে সহায়তা করা হয়েছে। এছাড়া আরও ১৯৬ জন ভিক্ষুককে এই কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ হচ্ছে।

যারা সাহায্য পেয়েছেন তাদের মধ্যে ৮০০ জনই ইতিমধ্যেই দারিদ্র্যসীমার উপরে চলে এসেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আওতায় ১৫২টি ইউনিয়নে ১১১টি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচির আওতায় ভিক্ষুক পুনর্বাসন সংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

পিকেএসএফ এর সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় ভিক্ষুক পুর্নবাসন কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে পিকেএসএফ এর চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার জন্য সরকার ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই সমৃদ্ধি কার্যক্রম গ্রহণ করেছে পিকেএসএফ। এর মধ্যে অন্যতম হল ভিক্ষুকদের স্বাবলম্বী করা। এই উদ্যোগে আমরা ব্যাপক সফলতা ও সাড়া পাচ্ছি।

এ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে পিকেএসএফ’র উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) ড. মোঃ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনে একদিকে যেমন নীতি ও নৈতিকতার প্রয়োজন, অন্যদিকে তেমন মানুষের আত্মশক্তির বিকাশ ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার অপরিহার্য। ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচি মানুষকে কেন্দ্র করে বিন্যাস করা হয়েছে, মানুষের সক্ষমতার উপর জোর দেয়া হয়েছে। মানুষের জীবনচক্রকে সামনে রেখে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই: শিশু, নবীন, প্রবীণ - প্রত্যেক মানুষকে মানব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা এবং এর মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ জাতি গঠন।”

পিকেএসএফ এর কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্বে থাকা স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা জাকস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. নূরুল আমিন বলেন, এটা আমাদের অন্যতম প্রজেক্ট। সুফিয়া ছাড়াও পিকেএসএফ এর সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় আরও বেশ কয়েকজন আমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। তাদের এ সফলতা ধরে রাখা এখন আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। তারা যেন আবার আর্থিক অসুবিধায় না পড়ে সেজন্য আমাদের টিম সবসময় দেখাশোনা এবং পরামর্শ দিয়ে থাকে।”

/এম/এএ

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি