ঢাকা, মঙ্গলবার   ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ভোক্তা প্রতিবাদী হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে: গোলাম রহমান

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৯:১৭ ২৮ মে ২০১৮ | আপডেট: ১৪:৩৩ ২ জুন ২০১৮

গোলাম রহমান

গোলাম রহমান

চলছে রমজান, আসন্ন ঈদ। রমজান ও ঈদকে ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজধানীসহ সারা দেশের কাঁচাবাজার, ফুটপাতসহ বড় বড় বিপনী-বিতান। ক্রেতাদের মাঝে বেড়েছে রমজান ও ঈদ নির্ভর পণ্যের চাহিদা। ক্রেতাদের এ চাহিদাকে পুঁজি করে এক ধরণের অসাধু ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছে পণ্যের লাগামহীন দাম। এতে ক্রেতা সাধারণের পকেট ঠিকই খালি হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অথচ সরকারসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সংস্থা প্রতিবারের মতো ঘোষণা দিয়েছিল এবারের রমজানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পণ্যের মজুদ পর্যাপ্ত আছে। মূল্য ক্রেতাদের নাগালে রাখতে সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া হযেছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে দেখা গেছে রমজানের আগের দিনেই বেগুন, পেয়াজ, চিনিসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। যার কারণ অনুসন্ধানে একুশে টেলিভিশন মুখোমুখি হয় দেশে ভোক্তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানাবিধ দিক নিয়ে কাজ করা কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের

একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাজারে রমজান নির্ভর পণ্যের মধ্যে চিনি ও পেয়াজের দাম বেড়েছে। চিনির দাম কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। আর পেয়াজের দাম একটু বেশিই বেড়েছে। এ বাড়ার জন্য আমরা বিভিন্ন  সংস্থার কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা পেয়েছি তা হলো, যেহেতু চিনির সরবরাহটা নিয়ন্ত্রণ করে হাতে গোনা ৪ থেকে  ৫জন রিফাইনার। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো বাজার কারসাজি করার চেষ্টা করেছিল। তবে চিনির যে দাম বেড়েছে তা কিন্তু খুব বেশি না। এটা স্বাভাবিক পর্যায় বলা যায়। কারণ রোজায় ভোক্তাদের মাঝে যে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়, সেটার জন্য খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। ভোক্তাদের উচিত হবে একই সঙ্গে পণ্যের অনেক বেশি চাহিদা তৈরি না করা। তবেই দাম বাড়ানোর সুযোগ পাবেন না ব্যবসায়ীরা।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রতিবারের মতো এবারও রমজানে পণ্যমূল্য বাড়বে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। তারপরও দেখা গেছে বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। এর কারণটা আসলে কি?

গোলাম রহমান: আমরা তো মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি, এখন মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটা প্রত্যাশা করা ঠিক নয় যে, সব সময় সব পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে। পণ্যের দাম উঠানামা করবে এটাই স্বাভাবিক। এবারের রোজার আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং হিসেব নিকেশ করেছেন। তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রমজান নির্ভর পণ্যের যথেষ্ট মজুদ আছে। দেশর অভ্যন্তরে রমজান নির্ভর পণ্যের উৎপাদনও ভালো হয়েছে। আবার বিশ্ববাজারও স্থিতিশীল। এসব বিবেচনায় তারা বলেছেন যে, এবার রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না।

তবে রমজান নির্ভর পণ্যের মধ্যে চিনি ও পেয়াজের দাম কিছুটা বেড়েছে। চিনির দাম কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। আর পেয়াজের দাম একটু বেশিই বেড়েছে। এ বাড়ার জন্য আমরা বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা পেয়েছি তা হলো, যেহেতু চিনির সরবরাহটা নিয়ন্ত্রণ করে হাতে গোনা ৪ থেকে ৫জন রিফাইনার। তাদের মধ্যে কেউ হয়তো বাজার কারসাজি করার চেষ্টা করেছিল। তবে চিনিরি যে দাম বেড়েছে তা কিন্তু খুব বেশি না। এটা স্বাভাবিক পর্যায়-ই বলা যায়। কারণ রোজায় ভোক্তাদের মাঝে যে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়, সেটার জন্য খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। সেজন্য দাম কিছুটা বেড়েছে হয়তো কোনো কোনো পণ্যের।

অন্যদিকে পেয়াজের দাম বাড়ার কারণ রোজার ঠিক আগে বেশ কয়েকদিন সরকারি ছুটি ছিল। তখন স্থলবন্দরগুলো বন্ধ ছিল। বন্দর বন্ধ থাকার কারণে সরবরাহ ব্যহত হয়েছে। যার প্রভাবে বাজারে পেয়াজের সরবরাহ কমে যায়। সরবরাহ কমে গেলেও রমজানের আগে চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। সরবরাহ কম অথচ চাহিদা বেশি। যার কারণে পেয়াজের দাম বেড়েছিল। তবে এখন কিন্তু পিয়াজের দামও সাধ্যের মধ্যে আছে। তাই বলবো অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার রমজানে আমদানি নির্ভর শুকনা পণ্যের দাম সহনীয় আছে। আর কাচা পণ্যের  কিছুটা দাম বাড়ার জন্য দায়ী রোজার সপ্তাহ খানেক আগে লাগাতার বৃষ্টি, যানযট, রমজানকে ঘিরে চাহিদা বেড়ে যাওয়া। যার কারণে বেগুণের দাম ১২০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু এখন তার দাম কমে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় চলে এসেছে।

আশা করা যায়, যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, যানজট না থাকে, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে থাকে তবে অতীতের যে কোনো রমজানের তুলনায় এবার ১৫ রোজার পরে এসব পণ্যের দাম স্থিতিশীল-ই থাকবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ক্রেতাদের অভিযোগ বাজারে সবজির দাম রমজানের আগের সঙ্গে তুলনা করলে এখন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ক্রেতাদের এ অভিযোগকে কিভাবে দেখবেন ?

গোলাম রহমান: এবার গ্রীষ্মের সবজি এখনও বাজারে আসেনি। বাজার দর যদি এমন অসহনীয়-ই থাকে ভোক্তাদের উচিত হবে প্রতিবাদ করা। পণ্যের দাম কমাতে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিবাদ আসতে হবে। তবে যানজট, চাঁদাবজি না থাকলে বাজার সহনীয় থাকবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বাজারে মূল্য তালিকা টানিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক বাজারে তা দেখা যায়নি। আবার যেগুলোতে দেখা গেছে, সে বাজারে আবার তালিকায় দেওয়া মূ্ল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে? কারণটা আসলে কি?

গোলাম রহমান: মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মূল্য তালিকা দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। সরবরাহকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে হবে। পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দাম বেধে দিলাম ১০ টাকায় চাল। এটা হবে না। তবে এটা একটা ভালো দিক যে এবার রমজানে চালের দাম স্থিতিশীল।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বাজারে মাংস ও ফল থেকে শুরু করে অনেক পণ্যেই দেখা গেছে ফরমালিন, ভেজাল, নকল ও  ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। ক্রেতাদের এ অভিযোগ নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন আসলে কি করছে?

গোলাম রহমান: রমজানের সমস্যা হলো ভেজাল, নকল এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করা। এজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা র‌্যাব, মেট্রোপলিটন পুলিশ, জেলা প্রশাসক, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই সবাইকে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। যারা বাজারে ভোক্তাদের ঠকানোর চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে বাজারে যেন আবার ভীতির সৃষ্টি না হয়, সৎ ব্যবসায়ী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন। কারণ সৎ ব্যবসায়ীরা ভীতিতে থাকলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে। পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।

এক্ষেত্রে ফরমালিনের কথা বলা যায়। ফরমালিন ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যারা এটা ফলসহ বিভিন্ন পণ্যে মেশায়, তাদের  আইনের আশ্রয় নিয়ে আসাই যুক্তিযুক্ত। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাই করছে বলে মনে হয়। এটা আরো বাড়াতে হবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দীর্ঘদিনের একটা অভিযোগ রয়েছে যে, পণ্য উৎপাদন করে কৃষকরা এর সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। কিন্তু কৃষকের শ্রমের পণ্য বিক্রিতে অতি মুনাফায় পকেট ভরছে মধ্যস্বত্তভোগীর। পণ্যের সঠিক দাম কৃষক পর্যায়ে পৌছে দেওয়ার ক্ষেত্রে করণীয়টা কি হতে পারে?

গোলাম রহমান: যদি ব্যবসায়ীরা উৎপাদন পর্যায় থেকে পণ্য না আনে তবে তো পণ্য ক্ষেতেই রয়ে যাবে। তখন কৃষক লাভবান হবে না। আবার ভোক্তাও পণ্য পাবে না। এ বিবেচনায় মধ্যস্বত্তভোগীদের প্রয়োজন আছে। তবে তাদের অতি মুনাফা করার মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু অতি মুনাফাকারীর সংখ্যা খুবই কম।

এসব কাঁচা পণ্যের দাম কমে রাখতে দরকার আমাদের স্টোরেজ বা গুদামজাত ব্যবস্থা বাড়ানো। পরিবহণ ব্যয় কমানো ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা। তবে ভালো মূল্য পাওয়ার জন্য কৃষক যদি সংগঠিত না হয়, তারা দাবি না তোলে তবে এভাবেই চলতে থাকবে। মধ্য স্বত্তভোগীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি তারাই বাজারজাত করার জন্য কোন ব্যবস্থা গড়ে তুললেই তারা পণ্যের সঠিক মূল্য পাবে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: পণ্যমূল্য সহনীয় রাখতে ভোক্তা সমিতি কি কি কাজ করছে?

গোলাম রহমান: আমরা কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নই। আমরা বিশাল একটি সংস্থা। আমরা সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করি। প্রয়োজনে মামলা মোকদ্দমা করি। আমাদের বক্তব্য হলো ভোক্তারা যেন সংগঠিত হয়, প্রতিবাদী হয়, সোচ্চার হয়। আর কৃষকদেরও বলবো আপনারাও প্রতিবাদী হন, নিজেদের স্বার্থ নিজেরাই রক্ষা করুন।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বলছিলেন মামলার কথা। ভোক্তার কথা বিবেচনায় আসলে কতগুলো মামলা এ পর্যন্ত সমিতির পক্ষ থেকে করা হয়েছে?

গোলাম রহমান: গ্যাসের দাম বাড়িয়ে প্রথমে দুই চুলা ৮৫০ টাকা করা হয়েছিল। আবার ৮৫০ থেকে বাড়িয়ে ৯৫০ টাকা করা হয়েছিল। আমরা হাইকোর্টে মামলা করলে এটা আবার ৮৫০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ভোক্তার স্বার্থে আমরা আরও মামলা করেছি। যেমন নাইকোর বিরুদ্ধে আমরা মামলা করেছিলাম। যে গ্যাস ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ফলে অনেক গ্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্যাস কমে যাওয়ার কারণে ভোক্তারাই মূলত বঞ্চিত হয়েছে। তাই হাইকোর্টে মামলা করার পরে নাইকোর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে কোর্ট। এখন সেটা উচ্চ আদালতের অ্যাপিলেড বিভিশনে বিচারাধীন আছে।

একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ভোক্তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কি?

গোলাম রহমান: ভোক্তা যদি প্রতিবাদী হন, অধিক দামের পণ্য না ক্রয় করেন, তবে সেটার দাম এমনিতেই কমে যাবে। বাজারও নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

ভোক্তাদের বলবো আপনারা যাচাই করে সঠিক পণ্য, গুণগত পণ্য ক্রয় করুন। যদি গুণগত পণ্য না পান,  বাজারে অসংগতি দেখেন, আপনারা প্রতিবাদী হন, সোচ্চার হন।

/ এআর /

 

 

 

 

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি