ঢাকা, সোমবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ২৫ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

মরুকরণের কারণে মানুষের জীবনাচার বদলে যাচ্ছে: ড. আইনুন নিশাত

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২০:৩২ ২ অক্টোবর ২০১৯ | আপডেট: ২০:৩৩ ২ অক্টোবর ২০১৯

মরুকরণের ফলে দেশের কৃষিতে যেমন প্রভাব পড়ছে তেমনি পড়েছে সংস্কৃতিতেও। বিভিন্ন কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও ঠিক রাখা যেত কিন্তু বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জলাধারও আমাদের দেশে নেই।

বাংলাদেশকে ‘নদীমাতৃক দেশ’ বলা হয়। তবে নদীগুলো সময়ের পরিক্রমায় হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক নদী মানচিত্র ছাড়া এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। যদিও সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়ে নদীগুলো বাঁচাতে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে নদী নিয়ে নেই তেমন একটা গবেষণা এবং সাধারণ মানুষের জানাশোনা।

এ বিষয়ে একুশে টেলিভিশনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নদী, নদীর মনস্তত্ত্ব, ড্রেজিং, মরুকরণ, বৃষ্টির পানি ব্যবহার, নদী দুষণ, দখল ও নৌপথ পকিল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি সম্পদ প্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ। 

একুশে টেলিভিশনের পাঠকের কথা বিবেচনা করে তার এই বিশেষ সাক্ষাৎকারকে চার পর্বে ভাগ করা হয়েছে। আজ প্রকাশ করা হলো এর তৃতীয় পর্ব (মরুকরণ ও বৃষ্টির পানি ব্যবহার)। 

একুশে টেলিভিশন: মরে যাওয়া নদীর কারণে দেশে মরুকরণ হচ্ছে কিনা?
ড. আইনুন নিশাত: মরুকরণ হচ্ছে মানুষের কোন কর্মকাণ্ডের কারণে উৎপাদনশীল জমি অনুৎপাদনশীল হয়ে যাওয়া। পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়া মরুকরণের একটা কারণ হতে পারে তবে পুরোটা নয়, সেটা পানির স্তর নেমে যাওয়া কিংবা পানি ধারণে মাটির ক্ষমতা কমে যাওয়া। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রাজশাহী, বগুড়া ও রংপুরে এখন থেকে এক হাজার বছর আগে প্রচন্ড ঘন বন ছিল। মানুষ বসতি স্থাপনের জন্য বন কেটে পরিষ্কার করে ফেলেছে। একটা বনের নীচে কিন্তু ওর্গানিক লেয়ার (স্তর) থাকে। যেমন বন কেটে পরিষ্কার করে ফেলেছে একই সঙ্গে ফারাক্কার কারণে রাজশাহীতে নদীর পানির স্তর নেমে গেছে। এখন প্রচুর বনায়ন হয়েছে। আগে যে মাটিটা সূর্যের তাপে শুকিয়ে যেত বনায়নের কারণে সেটা কিন্তু নেই। বনায়ন প্রকল্পের সেচ প্রকল্পের কারণে মরুকরণ শব্দটা উচ্চরণ করি না। 

                               রাজশাহীতে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মরুকরণ হয়েছে: সংগৃহীত

একুশে টেলিভিশন: পানির স্তর নীচে নামায় পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির মুখে কতটুকু?
ডা আইনুন নিশাত: শুধু পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ার কারণে ক্ষতি হচ্ছে এটা ঠিক নয়। কিন্তু পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ার পিছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। পানির প্রবাহ, বৃষ্টি, ফারাক্কা বাধ নানা কারণে পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। আর পরিবেশের ভারসাম্য অনেক কারণেই হুমকির মুখে।  

একুশে টেলিভিশন: নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক না থাকা, শুকিয়ে যাওয়া এসব কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে কিনা?
ড. আইনুন নিশাত: নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া বা নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে বিষয়টি ঠিক নয় বরং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে নদীর এই দশার সৃষ্টি হয়েছে। 

একুশে টেলিভিশন: দেশে বৃষ্টিপাতের পানি ব্যবহার করে নদীর প্রবাহ ঠিক রাখা যায় কিনা? 
ড. আইনুন নিশাত: দেশের মধ্যে যে বৃষ্টিপাত হয় তাতে নদীর পানি তেমন একটা প্রভাবিত হয় না। কেননা দেশের মধ্যে বৃষ্টির পানি তো খুব কম। বাংলাদেশে নদীতে পানির যে প্রবাহ তার মাত্র ৮ ভাগ বৃষ্টি থেকে আসে। বাকি ৯২ ভাগই কিন্তু ভারতের বৃষ্টি বা অন্যান্য উৎসের পানি। এই আট ভাগ দিয়ে আপনি নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে কতটুকু পারবেন। 

যেমন আজকে আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঐ বৃষ্টির পানি সেদিকে বাংলাদেশের যে নদীগুলো আছে তা দিয়ে প্রবাহিত হবে। কিন্তু নদীর চ্যানেল যদি ঠিক না থাকে তাহলে ঐ নূন্যতম পানির প্রবাহও ঠিক থাকবে না।

একুশে টেলিভিশন: বৃষ্টির পানি ব্যবহারের উত্তম পন্থা কি?
ড. আইনুন নিশাত: নদীর পানির ব্যবহার তো এক রকম নয়। দেশে বৃষ্টির কারণে আমরা যে পানি পেয়ে থাকি তা বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ ও সঞ্চয় করে রাখতে হবে। এটা সঞ্চয় করে রাখা হতো পুকুরের মাধ্যমে। পুকুরের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিলগুলোর যে ধারণ ক্ষমতা ছিল তা কমে গেছে। রাজশাহী থেকে নওগার দিকে যান বিরাট বিরাট বিল ছিল এখন আর নাই, ভরাট হয়ে গেছে। একসময় চলনবিল পাড়ি দিতে মানুষ ভয় পেত। কারণ এপার থেকে ওপারে সময় মতো পৌঁছানো সম্ভব হতো না। আমাদের জলাধার কমে গেছে। বৃষ্টির পানির ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। পুকুরগুলো যদি খনন করা যায়। বিলগুলোকে যদি আগের অবস্থায় আনা যায় তাহলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যাবে। বৃষ্টির পানি ধরে রাখলেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উপরে উঠবে।

                                       নদী প্রবাহের ৮ ভাগ পানি আসে বৃষ্টি থেকে: সংগৃহীত

একুশে টেলিভিশন: মরুকরণ ও পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিপর্যয় হয়েছে কিনা?
ড. আইনুন নিশাত: নদীকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সভ্যতাও গড়ে উঠেছে। নদী হারিয়ে গেলে সংস্কৃতির ক্ষতি হওয়াটা স্বাভাবিক নয় কি? নদীর সঙ্গে সঙ্গে অনেক পেশাও পরির্বতন হয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে জীবনাচারও বদলে গেছে। একটা সময় কৃষক অনেক জ্ঞান রাখতেন যে জ্ঞানগুলো বিজ্ঞান সম্মত কিন্তু এখন সে জ্ঞান কি আর আছে। মরুকরণের প্রভাবে কৃষির পরির্বতন হয়েছে এবং এর ফলে জীবনাচারে প্রভাব পড়েছে। 

অনেক সামাজিক প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। একটা সময় সামাজিক প্রথার মাধ্যমে কৃষির কাজ হতো। কৃষকরা বিভিন্ন ধরণের মাটির সাথে সমন্বয় করে তারা ধান/কৃষিকাজ করতেন। সব জমিতে তো এক ধান/কৃষি হয় না। এ সকল সামাজিক প্রথা কিন্তু অবৈজ্ঞানিক ছিল না। 

এমএস/এসি
 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি