ঢাকা, ২০১৯-০৭-১৬ ১০:২৪:১৪

রং ফর্সা করা সামগ্রী ব্যবহারে কি ক্ষতি জেনে নিন

 প্রকাশিত: ১৬:০৭ ৬ জুলাই ২০১৯  

ত্বকের রঙ সুন্দর করার জন্য আমাদের অনেকেরই থাকে আপ্রাণ চেষ্টা, এমন কি নেই যা আমরা ব্যবহার করি না। তারপরও মনে হয় কোন লাভ হচ্ছে না, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। বাড়িতে দৈনিক রূপচর্চার পাশাপাশি পার্লারে যাওয়ার প্রবণতাও রয়েছে অনেকের। বিশেষ করে বিয়ের সাজে অবশ্যই পার্লারে যেতে হবে। কিন্তু পার্লারে বা বাড়িতে আমরা রং ফর্সা করার যেসব সামগ্রী ব্যবহার করছি সেগুলো যে আপনার জীবনে সমস্যা বয়ে নিয়ে আসতে পারে তা কিন্তু কেউ জানি না।

আমেরিকান ত্বক বিজ্ঞানী শুয়াই জু বলেন, লোকেরা মনে করেন যে ত্বকের ক্রিম সাধারণত নিরাপদ। এর ফলে যে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে তা নিয়ে তারা চিন্তাও করেন না। এই মানসিকতা পরিবর্তন প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে যেসব রোগী আসেন তারা আমাকে বিভিন্ন রকমের ক্রিম দেখান যেগুলো তারা কোন ধরনের প্রেসক্রিপশান ছাড়াই বাজার থেকে কিনেছেন। সেগুলো দেখে সত্যিই আমি অবাক হয়ে যাই। এর মধ্যে কিছু কিছু ক্রিম আছে যা ঠিকমতো ব্যবহার না করলে শরীরের ক্ষতি করতে পারে।’

রং ফর্সাকারী এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে সাবান, ক্রিম, ব্রাশ, ট্যাবলেট। এমনকি ইঞ্জেকশনও রয়েছে। মানব দেহে মেলানিন পিগমেন্টের উৎপাদন কমিয়ে দেয় এই ইঞ্জেকশন, তারপরেও এগুলো অনেক জনপ্রিয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেবে দেখা গেছে, আফ্রিকাতে প্রতি ১০ জন নারীর চারজন রং ফর্সাকারী পণ্য ব্যবহার করে থাকেন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় নাইজেরিয়াতে। সেখানে ৭৭% নারী ত্বকের রং উজ্জ্বল করার জন্যে নানা ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করে থাকেন। তারপরেই রয়েছে টোগো, ৫৯% এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৫%। এশিয়ায় ৬১%  নারী এবং চীনে ৪০% নারী এসব ব্যবহার করেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব জিনিসের প্রতি ভোক্তাদের চাহিদাও বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব মোকাবেলা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সারাবিশ্বে গায়ের রং ফর্সা করার পণ্যের বাজারের আকার ২০১৭ সালে ছিল প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার। ধারণা করা হচ্ছে ২০২৭ সালের মধ্যে এই বাজার দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ৮৯০ কোটি ডলারে। এর চাহিদা মূলত এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যবিত্ত পরিবারে।

গত বছর ঘানাতে কর্তৃপক্ষ গর্ভবতী নারীদেরকে সতর্ক করে দিয়েছিল রং ফর্সাকারী ট্যাবলেট না খাওয়ার জন্যে। কারণ এসব ট্যাবলেটে পাওয়া গেছে এন্টিঅক্সিডেন্ট গ্লুটাথিওন। গর্ভবতী নারীরা মনে করেন তারা যদি এই ট্যাবলেট খান তাহলে তাদের গর্ভে থাকা সন্তানের গায়ের রং ফর্সা হবে।

শরীরে মেলানিনের (বাদামী কিম্বা কালো পিগমেন্ট, যার কারণে ত্বকের রঙ নির্ধারিত হয়) উৎপাদন কমিয়ে দেয় হাইড্রোকুইনোন। একই সঙ্গে এটি স্থায়ীভাবে ত্বকের ক্ষতিও করতে পারে।

ব্রিটিশ স্কিন ফাউন্ডেশন বলছে, পুরো ত্বক ফর্সা করার নিরাপদ কোন উপায় নেই। দোকানে যেসব ক্রিম বিক্রি হয় সেগুলো যে আসলেই গায়ের রং ফর্সা করে এমন প্রমাণ নেই। এর উল্টো ফলও হতে পারে। এই ক্রিম আপনার ত্বককে অস্বাভাবিক রকমের সাদা অথবা আরো কালোও করে দিতে পারে। এর ফলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে ত্বকের স্বাভাবিক গুণাবলীও।

বয়স হলে শরীরে এরকম সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। এতে ত্বকে বাদামী কিম্বা ধূসর রঙের দাগ তৈরি হয়। বিশেষ করে মুখে। নারীদের দেহে এরকম হওয়ার হার বেশি। বিশেষ করে গর্ভধারণের সময়।

ব্রিটিশ স্কিন ফাউন্ডেশনের গবেষক আলেকজানড্রফ বলেন, একজন চর্ম চিকিৎসকের মাধ্যমে ত্বকের রং ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে সেজন্যে অনুমোদিত কিছু ক্রিম আছে যা ডাক্তারদের পরামর্শে ব্যবহার করা যেতে পারে।

পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া :

গবেষণায় বলা হয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা চিকিৎসকদের পরামর্শ ও নজরদারি ছাড়াই এসব রং ফর্সাকারী কসমেটিক ব্যবহার শুরু করে দেন। কিন্তু এসব প্রসাধনীর গুরুতর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন:

* ত্বকে চুলকানি

* প্রদাহ

* জ্বালাপোড়া

* ফুলে যাওয়া

* ফুসকুড়ি পড়া

মার্কারির ক্ষতিকর দিক

কিছু কিছু পণ্য যেগুলো দ্রুত রং ফর্সা করার দাবি করে সেগুলোতে নানা রকমের ক্ষতিকর উপাদানও থাকতে পারে। শরীরে মেলানিন গঠনের প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দেয় এই হাইড্রোকুইনোন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যেসব পণ্যে মার্কারি আছে সেগুলো স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর। কিন্তু তারপরেও মার্কারি আছে এরকম পণ্য চীন, লেবানন. মেক্সিকো, পাকিস্তান, ফিলিপিন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হচ্ছে।

যেসব পণ্যে মার্কারি আছে সেগুলোর বিক্রি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আফ্রিকার বহু দেশে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফিলিপিন এবং আরও কয়েকটি দেশ অল্প পরিমাণে মার্কারি আছে যেসব পণ্যে সেগুলো বিক্রির অনুমোদন দিয়ে থাকে।

মার্কারিতে যেসব ক্ষতি হতে পারে :

* কিডনির ক্ষতি

* ত্বকে ফুসকুড়ি হওয়া, রং বদলে যাওয়া, কালশিটে দাগ পড়া

* ব্যাকটেরিয়া ও ফাংগাল সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যাওয়া

* উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, বিষণ্ণতা, মানসিক অস্থিরতা থেকে বৈকল্য

* স্নায়ু-জনিত সমস্যা

সামাজিক আন্দোলন :

গায়ের রং ফর্সা হতে হবে - এই মানসিকতার পরিবর্তনের জন্যে বিভিন্ন সমাজে নানা ধরনের আন্দোলন চলছে। ভারতে এরকম এক আন্দোলনের নাম: ‘কালোই সুন্দর।’ পাকিস্তানের স্লোগান হচ্ছে: ‘সুন্দর হতে হলে আপনার ত্বকের রং ফর্সা হতে হবে না।’

সূত্র : বিবিসি

এএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

শিরোনাম