ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৪ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

রঙ্গিন স্বপ্নে অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রায় মর্মান্তিক মৃত্যু

প্রকাশিত : ২৩:১৬ ৬ মে ২০১৯ | আপডেট: ২১:১৯ ১৩ মে ২০১৯

‘ইউরোপ’ শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে উঠে উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আর্থিক স্বচ্ছলতা থেকে শুরু করে জীবনযাপনের রঙ্গিন এক মোহবন্ধনের হাতছানি। কিন্তু বিষয়টি সত্যিই কি তেমন? ইউরোপে গিয়ে আর্থিক অবস্থার রূপান্তর হওয়া মানুষের সংখ্যা গণনার মত নয়। এর উপরে মিলছে না ইউরোপের বেশির ভাগ দেশের ভিসা।

ইউরোপ পাড়ি জমানোর চরম স্পৃহা থেকে বাংলাদেশীরা দাঁড়ান দালালদের দরজায়। তখনই দেশ ও বিদেশজুড়ে বিশাল দালাল চক্রগুলো সরল বাংলাদেশীদের রঙ্গিন দৃষ্টিকে আরও উষ্কে দিয়ে হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের টাকা। বিনীময়ে প্রবাসের স্বপ্নবাজরা পান নিরাপদ ও বৈধ প্রবাস জীবনের বিপরীতে অনিরাপদ, অবৈধ ও অনিশ্চিত প্রবাসজীবন। এর মধ্যে প্রায়শই ঘটে মর্মান্তিক মৃত্যু। এমনই এক মর্মান্তিক ঘটান ঘটেছে এক বাংলাদেশীর।

যিনি আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। পরিবার হয়তো ভেবেছিল তার টাকা দিয়ে রঙিন নতুন স্বপ্ন বুনবে, ঘুচবে অভাব। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে যে টাকা রোজগার করতে চেয়েছিলেন তিনি, সে টাকার কাছেই আটকে গেল তার জীবন। বলছি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর গ্রামের ইমরান খানের কথা। ভয়ংকর পদ্ধতিতে সুদূর ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝপথে থেমে যায় তার যাত্রা।

ইমরান খান ২০১৮ সালের শুরুর দিকে দালালের মাধ্যমে লিবিয়া’য় পাড়ি জমান। সেখান থেকে ইউরোপে যেতে পাড়ি দেন ভূমধ্যসাগর। গেল বছরের ১৬ আগস্ট ৮৪জন যাত্রী নিয়ে অবৈধ পথে এক নৌকা নিয়ে যাত্রা করে ইউরোপ অভিমুখে। সমুদ্রেই অনাহারে কাটে পাচঁ পাঁচটা দিন। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় সকলেরই নাজেহাল অবস্থা। এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন ইমরানসহ আরও কয়েক জন। বিশাল পানিরাশির মধ্যে অদৃশ্য কূলের দিকে তাকিয়ে দিশেহারা আরোহীরা। ধুকে ধুকে ইমরান এক সময় আশ্রয় নিলেন যমদূতের কোলে। পরে দিকহীনভাবে ভাসতে থাকা নৌ যাত্রীদের সাথে দেখা হয় মাল্টা কোস্ট গার্ডের। সকলকে উদ্ধার করে তারা নিয়ে যান শরণার্থী শিবিরে। আর মৃতদের নেওয়া হয় মাল্টা সরকারী মর্গে। এরপর গুনে গুনে কেটে যায় ৮ মাস। পরিবার ইমরানের আর কোন খবর পায় না। কি হয়েছে ইমরানের? বেঁচে আছেন নাকি নেই। কোন সংবাদ না পেয়ে পরিবার তাকে মৃত হিসেবে ধরে নিয়েছিল। প্রিয়জনের সন্ধান না পেয়ে যখন হারানো শোক কিছুটা ম্লান হতে চলল তখনই পরিবারের কাছে খবর আসে ইমরানের সন্ধান পাওয়া গেছে। সুদূর ইউরোপীয় দ্বীপ রাষ্ট্র মাল্টার মর্গে আছে ইমরানের মরদেহ।

মাল্টায় বসবাসরত বাংলাদেশীরা ইমরানের মৃতদেহ সনাক্ত করে তার পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে। ভাই-বোন সকলের সাথে যোগাযোগ করেও মৃতদেহটি দেশে পাঠানোর কোন ব্যবস্থাই যেন করা যাচ্ছে না। কেননা মাল্টায় নেই বাংলাদেশী দূতাবাস। সর্বশান্ত পরিবার তার মৃতদেহ আনতে এখন করতে পারছে না কোন কিনারা। মৃতদেহ দেশে আনতে দরকার প্রায় ৭ লক্ষাধিক টাকা। ইমরানের পরিবারের পক্ষে এই টাকার যোগান দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।

মাল্টা প্রবাসী কাওসার ফয়জুর একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে জানান, টাকার যোগান হলে এ মাসের মধ্যেই ইমরানের মৃতদেহ দেশে পাঠানো যাবে। ইমরানের মৃতদেহ দেশে পাঠানোর জন্য তারা অর্থ যোগানের চেষ্টা করছেন। এ জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। মাল্টায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকার কারণে পোহাতে হচ্ছে নানান প্রশাসনিক জটিলতা। মাল্টায় বাংলাদেশের দূতাবাস প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান মাল্টা প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর লক্ষাধিক বাংলাদেশী নাগরিক অবৈধ পথে ইউরোপ প্রবেশ করতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছেন। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নৌকা ডুবে বা ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকেই। মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সম্মুখিন হতে হচ্ছে নানা প্রতিবন্ধকতা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে ১৭  লাখ ৬৬ হাজার ১৮৬ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন। এভাবে সাগরপথে আসতে গিয়ে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ প্রাণও হারিয়েছেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রয়েছেন বাংলাদেশী।

বাংলাদেশের একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার শ্যালিকার ভাগ্যে ঘটেছিল এমনই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। তুরস্কে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার মৃতদেহ দেশে আনতে সৃষ্টি হয়েছিল নানা প্রশাসনিক জটিলতা। মৃতদেহটি দেশে আনতে প্রায় ১১ লক্ষাধিক টাকাও খরচ করতে হয়েছিল পরিবারটিকে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মারা গেলেও মৃতদেহ দেশে আনতে সময় লেগেছিল বেশ কয়েক মাস।

এসি

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি