ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:৫০:৫৬

‘জীবন যেন আর চলে না’

গার্মেন্ট কর্মী রহিমার আর্তি

‘জীবন যেন আর চলে না’

ভোর ৬টা। ঘড়ির কাটা কিড়িং কিড়িং। অসম্পূর্ণ ঘুম নিয়েই জেগে ওঠার চেষ্টা। চোখ কচলাতে কচলাতে ওয়াশরুমে প্রবেশ। রাতে ভিজিয়ে রাখা কাপড়গুলো পরিস্কারের চেষ্টা। তারমধ্যে আবার চুলায় ভাত বসানো। কাপড় পরিস্কার করা, গোসল করা ও ভাত রান্না দেড় ঘণ্টার মধ্যে শেষ। এবার আধা ঘন্টার মধ্যে কাজে যোগ দেওয়ার তাড়া। কারণ ৮টার মধ্যেই শুরু করতে হবে কাজ। দেরি হলে অনুপস্থিতি আবার কোনো কোনো সময় জরিমানা গুণার তাড়া। তখন রাত ১০টা পর্যন্ত খেটেও পুরো দিনের বেতন থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
জীবন যুদ্ধে হার না মানা মুকলেচুর

পৃথিবীতে সবাই সমান ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। কেউ সুখে বসবাস করেন আবার কাউকে সারা জীবন সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। তাদের জীবনের সংগ্রাম যেন শেষ হয় না। ভাগ্য তাদের পক্ষে কাজ করতে চায় বলেই এমন মানুষরা মনে করেন। তেমনি একজন হলেন মো. মুকলেচুর রহমান দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সফলতার আশায় বুক বেধে পথ চেয়ে আছেন আজও। তিনি চোখে না দেখেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেছেন। তার পিতার মো. আবুল মুনসুর। মাতা মোছা. রাশিদা বেগম। তিনি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার ধলা ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আড়াই বছর বয়সে অন্ধ সেটা বুঝতে পারে। তারপর তার জীবন স্বাভাবিক থেকে অস্বাভাবিক হয়ে গেলো। তখন তার মা জামালপুরে এবিসি অন্ধ স্কুলে ভর্তি করে দেয় কিন্তু তিনি এটা মেনে নিতে পারেনি। তিনি মনে প্রাণে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার জন্য লড়াই করে যান। এভাবে তিনি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে পড়েন। তখন তিনি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য অন্ধ স্কুল ত্যাগ করে চলে আসেন। এবার জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য বাসে বাসে চকলেট বিক্রি করতে শুরু করেন। যার কিছু আয় করা অর্থ জমা হয়। তিনি এইবার পড়াশোনা করার জন্য গাজীপুর বিওপি স্কুলে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। গাজীপুরে পড়াশোনার সময় তাকে কোন বেতন দিতে হতো না। যার ফলে তার একটু চিন্তা কমে। স্কুল জীবনে সব থেকে বেশি সাহায্য করেছে তার বন্ধু নুহান। এছাড়া তার শিক্ষক, সহপাঠীরাও সব প্রকার সাহায্য করেছে। এভাবে তিনি মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৪.০৬ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। তারপরে তিনি গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে এইচএসসি ভর্তি হোন। সেখানেও তার সহপাঠী, শিক্ষজরা সব প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করেছে। এভাবি তিনি এইচএসসি পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন। তিনি মানবিক বিভাগপ জিপিএ-৪.৩০ পেয়ে কৃতকার্য হন। এইবার স্বপ্ন দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। কিন্তু কোচিং করার কোন সামর্থ্য তার মোটেও ছিল না। এমন সময় হাজির হোন তার এক বান্ধুবী।তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন বলে ইউসিসি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন। তার বান্ধুবী কোচিং এর সিটগুলো কঠিন বলে বুঝতে পারতো না। তাই তার বান্ধুবী একসঙ্গে সিট পড়ার জন্য প্রস্তাব করে। এইভাবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার জন্য মোটামুটি প্রস্তুতি নেন। সব প্রস্তুতি শেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ২৭৬তম মেধাক্রম হয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন।তিনি জানান, অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলাম কিন্তু আর্থিকভাবে আমি বিপর্যস্ত হয়ে গেলাম। তবে সব কিছু পাশ কাটিয়ে "ক্ষুদ্র মেধার ক্ষুদ্র প্রয়াস" নামে গল্প কবিতার বই লিখলেন। এই বই বিক্রি করে কোনোভাবে চলতে থাকলেন। কিছুদিন পরে ডাচবাংলা ব্যাংকের শিক্ষা বৃত্তি পেলেন। এরপর প্রতিমাসে ২০০০ টাকা করে পেতেন যা তার খরচের তুলনায় নগণ্য। তাই তিনি কিছু অর্থ আয় করার জন্য "দম্ভ"নামে একটা উপন্যাস লিখলেন। বাসে, ট্রেনে, বিভিন্ন দোকানে উপন্যাস বিক্রি করে পড়াশোনা শেষ করলেন। পড়া শেষ করে ৭ বার বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। তবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অতিরিক্ত সময় না থাকায় তিনি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন না। এছাড়া বেসরকারি অনেক জায়গায় আবেদন করেছেন কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বলে বাদ দিয়ে দেয়। তিনি একটি চাকরির জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বলেছেন তবুও কোন সাড়া পাননি। বর্তমানে তিনি "আমার জীবনী" নামের একটা বই লিখেছেন। প্রতিদিন তিনি গড়ে ১০-১৫ বই বিক্রি করেন যার প্রত্যেকটির মূল্য ১০০ টাকা।এভাবে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি গাজীপুর শিমুলতলি এটিআই গেটে একটি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। দোকানে বিকাশে টাকা লেনদেন, কম্পিউটারের কাজ, মোবাইলে ফ্ল্যাকসিলোড, বই বিক্রি ইত্যাদি কাজ করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এসএইচ/

বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যাচ্ছে শিশুরা [ভিডিও]

পিরোজপুরের ছেলে রাফি। ১০ বছরের এই শিশু ধরেছে সংসারের হাল। বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। বাংলাদেশে রাফির মতো শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা সাড়ে ৩৪ লাখ; আইএলও’র হিসেবে বিশ্বে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু কোনও না কোনও শ্রমে জড়িত। বাবা মায়ের সুখের সংসারে জন্ম নিলেও পরে, বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে রাফিকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে শিশু বয়সেই। শুধু একা রাফি নয়, তার মতো অসংখ্য শিশুকে জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আর এদের বেশিরভাগই যুক্ত হচ্ছে নানা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়। শিশুর জীবন ও পরিবেশ আনন্দ মুখর করতে সরকারের পাশাপাশি সবার আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পিরোজপুর জেলার শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন। শিশুদের সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সরকার এমনই প্রত্যাশা সবার। একে//

আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে চায় সৌরভ

মানুষের পছন্দের খাবারের তালিকায় কতো কিছুই না থাকে। বিশেষ করে শিশুদের। অনেক কিছু আবদার। কিন্তু ৬ বছরের শিশু সৌরভ চায় শুধু ভাত আর আলু ভর্তা। দুই পা প্রায় হারাতে বসা আর হাসপাতালের মেঝে শুয়ে থাকা  সৌরভের চাহিদা শুধু এটুকুই। মাত্র চার বছর বয়সে বাবা ও মা দুইজনকেই হারায় সৌরভ। এরপর বেড়ে উঠতে থাকেন ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে। কিছুদিনের জন্য তাকে দত্তক নেয় একটি নিঃসন্তান পরিবার। তবে সেই দম্পতিদের সন্তান হওয়ায় সৌরভের স্থান হয় আবারও কমলাপুর রেলস্টেশনে। স্টেশনে মাল টানার কাজ শুরু করে সৌরভ। এক পর্যায়ে জড়িয়ে পরে মাদক সেবনে। এরপরেও সবকিছু মোটামুটি চলছিল। কিন্তু হঠাতই সবকিছু থেমে যায় সৌরভের। ট্রেনে আঘাত পেয়ে দুই পা হারানোর পথে সে। রেল পুলিশের সহায়তায় সৌরভের জায়গা হয় ঢাকার পনংু হাসপাতালে। তবে অযত্ন অবহেলায় আর অনেকটা বিনা চিকিৎসায় দিন কাটছে সৌরভের। দেখার মতো কাছের মানুষ কেউ নেই। নীলা, সামিয়া, মহান, জয়, জনি এবং বিপ্লবের মতো কিছু স্বেচ্ছাসেবকই এখন তার আপনজন, দেখভালকারী। গত রোববার রাতে রক্ত দিতে গিয়ে সৌরভের সঙ্গে দেখা হয় এই প্রতিবেদকের। স্বেচ্ছাসেবক নীলা সৌরভের কাছে জানতে চায় আগামীকাল (সোমবার) সকালে কী খাবে সৌরভ। প্রথম বলে কিছু না। এক পর্যায়ে বলে, “আলু ভর্তা দিয়ে ভাত”। সৌরভের জন্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা সামিয়া সুলতানা জানান, “গত প্রায় চার মাসের মতো সময় ধরে এই হাসপাতালে আছে সৌরভ। তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না। হাসপাতালে অন্য রোগীরা কখনও কিছু খাবার বা টাকা দিত সৌরভকে। হাসপাতালের আয়া বা অন্য রোগীর সঙ্গে লোকদের সেই টাকা দিয়ে কয়েকবার খাবার এনে খেয়েছে সৌরভ। কখনও কখনও কেউ টাকা নিয়ে গেলেও সেই খাবার নিয়ে আসেনি কেউ।” সামিয়া জানায়, হাসপাতালে সৌরভকে যারা দেখাশোনা করছেন তাদের মধ্যে আছে নীলা ইসলাম, মহান, জয়, জনি এবং সামিয়া নিজে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বিদ্যানন্দ থেকে সৌরভকে দেখভাল করছেন বিপ্লব। সামিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ ‘ড্যু সামথিং এক্সেপশাল’ এর স্বেচ্ছাসেবক। সামিয়া-নীলা জয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি খরচে চিকিৎসা চলছে সৌরভের। তবে সেই চিকিৎসা শুধু নামেই। চার মাস যাবত একই মেঝেতে পরে আছে সে। এতদিনেও পায়নি হাসপাতালের বেড। সৌরভের চিকিৎসায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গড়িমসি করছে বলে তাদের অভিযোগ। গত চারমাসের অবহেলায় ইতোমধ্যে সৌরভের পায়ে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। মাঝে মাঝে রাতে ব্যথায় কাতরে ওঠে সৌরভ। আজ সোমবার সৌরভের পায় ড্রেসিং করার কথা থাকলেও তা করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কোনো মন্তব্য করেনি রেড ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। আগামীকাল (মঙ্গলবার) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সৌরভের চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এই স্বেচ্ছাসেবকেরা। পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার সুষ্ঠু ব্যবস্থা না হলে বেসরকারি হাসপাতালে সৌরভের চিকিৎসার চিন্তা ভাবনা আছে। তবে সেক্ষেত্রে দরকার হবে মোটা অংকের টাকা। সৌরভ এই প্রতিবেদককে জানায়, সুস্থ হয়ে নতুন জামা পরে স্কুলে যেতে চায় সৌরভ। আর পার্কে পার্কে ঘুরে বেড়াতে চায় পায়ের ব্যথায় কাতর এই ছেলেটি।  এসএইচ/

আনন্দ নিবাসের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে পথশিশুদের জীবন

বাবার মৃত্যুর পর ঋতুর (ছদ্মনাম) মা আরেকটি বিয়ে করে। ঋতুর ঠাঁই হয় তার মায়ের নতুন সংসারে। তার নতুন বাবা আগেও আরেকটি বিয়ে করেছিল। সেই সংসারে সন্তান ছিল আরো ছয়জন। অভাব, অনটন লেগেই থাকতো। নতুন বাবা মেয়েটিকে সহ্য করতে পারতো না। সুযোগ পেলেই চলতো চড়, থাপ্পড়, গালাগালি। মেয়েটির মা মেয়েটিকে এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে ঢাকায় বাসা-বাড়িতে কাজে পাঠিয়ে দেন। সেখানেও নতুন ঝামেলা। মেয়েটি একদিন কাজ করতে গিয়ে গ্লাস ভেঙ্গে ফেলে। শাস্তি হিসেবে মেয়েটিকে মেরে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয় পরিবারটি। তারপর থেকে মেয়েটির ঠাঁই হয় বাজারে। বিভিন্ন দোকানের সামনে ঘুরঘুর করে। কেউ কোন কাজ করে দিলে দু`চার টাকা দেয়। পেলে খায়, না পেলে খালি পেটে ঘুমায়। এভাবেই চলছিল ভাসমান জীবন। কিন্তু একদিন ঘটনাচক্রে পরিচয় হয় এএসডিতে (এ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট) কর্মরত এক ‘আপার’ সঙ্গে। আপা তাকে নিয়ে যায় আনন্দ নিবাস- ২ এ। প্রথমদিকে মেয়েটার মধ্যে কিছুটা সংশয় ও দ্বিধা থাকলেও আস্তে আস্তে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠে নতুন জীবনে। ঋতু পড়ছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে। ঋতু ভালো ছবি আঁকে, ভালো গান গায়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথমস্থান অর্জন করেছে সে। মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করার সময় জিজ্ঞেশ করলাম, বড় হয়ে কী হতে চাও। মেয়েটির ঝটপট উত্তর, পুলিশ। মেয়েটির নাম ঋতু (ছদ্মনাম)। শুধু ঋতু নয়, এরকম অনেক পথশিশুর জীবনের গল্প বদলে দেওয়ার ঠিকানা আনন্দ নিবাস। এএসডি- র `ডেভেলপমেন্ট অব চিলড্রেন এ্যাট হাই রিস্ক` (DCHR) প্রকল্পের আওতায় আনন্দ নিবাস পরিচালিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে এরকম তিনটি আনন্দ নিবাস। যা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থিত। অধিকার ও সুবিধা বঞ্চিত এবং মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য বলে জানালেন প্রকল্পটির প্রধান প্রজেক্ট ম্যানেজার ফারহানা সুলতানা। আনন্দ নিবাস- ২ এর আরেক অতিথি অন্তু। বয়স যখন মাত্র একমাস তখন তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। তার মা তাকে নিয়ে আশ্রয় নেয় বাপের বাড়িতে। কিন্তু সেখানে বেশিদিন ঠাঁই মেলেনি অন্তুর। নিদারুণ অভাব-অনটনে ক্লিষ্ট হয়ে একদিন অন্তুকে নিয়ে তার মা পাড়ি জমায় ঢাকায়। মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় তার মা। একপর্যায়ে তার মা আরেকটি বিয়ে করে। অন্তু`র নতুন বাবা অন্তু কে সহ্য করতে পারে না। একদিন তার বাবা-মা তাকে না জানিয়ে বাসা পরিবর্তন করে। অন্তু মাকে হারায়। শেষ হয়ে যায় তার পারিবারিক ঠিকানা। যে বয়সে শিশুরা পড়াশুনা করে, স্কুলে যায়, মায়ের স্নেহে উষ্ণতা খোঁজে সেই বয়সে অন্তু পথশিশু হিসেবে নেমে আসে রাস্তায়। কেউ কিছু খেতে দিলে খায়, নয়তো উপোষ পেঠেই ফুটপাতে ঘুমায়। একদিন সে এএসডি`র DCHR-প্রকল্পের একজন কর্মীর চোখে পড়ে। এরপর ওই কর্মী তাকে নিয়ে যায় আনন্দ নিবাস- এ। অন্তু বর্তমানে রাজধানীর একটি স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ছে। অন্তুর ছবি আঁকার হাত খুব ভালো। তাই তাকে একটি সাইনবোর্ড/ ব্যানার তৈরির দোকানে কাজ শেখার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। অন্তু এ প্রতিবেদককে জানায়, আনন্দ নিবাস তার জীবনে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখানে সে তিনবেলা ভরপেট খেতে পারে। পায় নিয়মিত চিকিৎসা। পড়াশুনার পরিবেশ ভালো। আপু- ভাইয়ারা সবাই খুব আন্তরিক। অন্তুকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বড় হয়ে কী হতে চায়। উত্তরে অন্তু জানায় সে বড় হয়ে একজন শিল্পী হতে চায়। DCHR -এর প্রজেক্ট ম্যানেজার ফারহানা সুলতানা জানান, এই প্রকল্পের আওতায় তিনটি আনন্দ নিবাস পরিচালনা করছেন তারা। এর মধ্যে দুটি মেয়েদের ও একটি ছেলেদের। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে ভাসমান পথশিশুদের জরিপের আওতায় আনেন তারা। তারপর চারটি ক্যাটাগরিতে পথশিশুদের ভাগ করেন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে রয়েছে সেসব পথশিশুরা যারা সব সময় রাস্তায় থাকে, দ্বিতীয় ধাপে আছে তারা, যারা বাবা-মাসহ রাস্তায় থাকে, আর যারা দিনের বেলায় ভাসমান কাজ করে রাতে কোনো না কোনো আত্মীয়ের বাসায় থাকে তাদের কে ফেলা হয় তৃতীয় ক্যাটাগরীতে, আর যারা দিনে কাজ করে রাতে বাবা মায়ের সঙ্গে থাকে তারা চতুর্থ ক্যাটাগরীর পথশিশু। সাধারণত প্রথম ক্যাটাগরির পথশিশু তারা, যারা দিন রাত চব্বিশ ঘন্টায় রাস্তায় থাকে তাদের কে DCHR- এর প্রকল্পের আওতায় বেশী আনা হয়। বর্তমানে তাদের তিনটি আনন্দ নিবাসে রয়েছে ৯০জন শিশু, যাদের বয়স সর্বনিম্ন চার বছর থেকে সর্বোচ্চ আঠারো বছর পর্যন্ত। প্রকল্পটির প্রধান ফারহানা সুলতানা`র সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ২০১২ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত আনন্দ নিবাসে ভর্তি করানো হয়েছে ৪০৩ জন শিশু। এর মধ্যে ৩৩ জনকে বিভিন্ন সময়ে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে তাদেরকেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় যাদের পরিবার শিশুটির ভার বহনে ও সার্বিক নিরাপত্তাদানে সক্ষমতা রাখে। তবে ড্রপ আউট হয়ে যাওয়া শিশুর সংখ্যাও কম নয়। এখনো পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশী শিশু ড্রপ আউট হয়েছে। DCHR- প্রকল্পের ভাষায় এখানে যারা আনন্দ নিবাস- এর গোছানো ও নিয়মানুবর্তী জীবন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে গেছে, তাদের কে বলা হয় ড্রপ আউট। ফারহানা সুলতানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিশুদের বয়স আঠারো হওয়া পর্যন্ত তারা এ আনন্দ নিবাসে থাকার সুযোগ পায়। এর মধ্যে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পছন্দ ও দক্ষতা অনুযায়ী কোনো একটি কর্মমূখী শিক্ষায় দক্ষ করা হয়, যাতে পরবর্তীতে তারা সাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এর মধ্যে কোনো পরিবার যদি তার সন্তানকে ফেরত নিতে চায় ও ফেরত নেওয়ার পর ভরন-পোষনে সক্ষমতার নিশ্চয়তা দিতে পারে তাহলে কয়েকটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে শিশুদের তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পথশিশুদের জীবনের গল্প পাল্টে দিচ্ছে আনন্দ নিবাস -আলী আদনান বাবার মৃত্যুর পর ঋতুর (ছদ্মনাম) মা আরেকটি বিয়ে করে। ঋতুর ঠাঁই হয় তার মায়ের নতুন সংসারে। তার নতুন বাবা আগেও আরেকটি বিয়ে করেছিল। সেই সংসারে সন্তান ছিল আরো ছয়জন। অভাব, অনটন লেগেই থাকতো। নতুন বাবা মেয়েটিকে সহ্য করতে পারতো না। সুযোগ পেলেই চলতো চড়, থাপ্পড়, গালাগালি। মেয়েটির মা মেয়েটিকে এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে ঢাকায় বাসা-বাড়িতে কাজে পাঠিয়ে দেন। সেখানেও নতুন ঝামেলা। মেয়েটি একদিন কাজ করতে গিয়ে গ্লাস ভেঙ্গে ফেলে। শাস্তি হিসেবে মেয়েটিকে মেরে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয় পরিবারটি। তারপর থেকে মেয়েটির ঠাঁই হয় বাজারে। বিভিন্ন দোকানের সামনে ঘুরঘুর করে। কেউ কোন কাজ করে দিলে দু`চার টাকা দেয়। পেলে খায়, না পেলে খালি পেটে ঘুমায়। এভাবেই চলছিল ভাসমান জীবন। কিন্তু একদিন ঘটনাচক্রে পরিচয় হয় এএসডিতে (এ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট) কর্মরত এক ‘আপার’ সঙ্গে। আপা তাকে নিয়ে যায় আনন্দ নিবাস- ২ এ। প্রথমদিকে মেয়েটার মধ্যে কিছুটা সংশয় ও দ্বিধা থাকলেও আস্তে আস্তে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠে নতুন জীবনে। ঋতু পড়ছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে। ঋতু ভালো ছবি আঁকে, ভালো গান গায়। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথমস্থান অর্জন করেছে সে। মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করার সময় জিজ্ঞেশ করলাম, বড় হয়ে কী হতে চাও। মেয়েটির ঝটপট উত্তর, পুলিশ। মেয়েটির নাম ঋতু (ছদ্মনাম)। শুধু ঋতু নয়, এরকম অনেক পথশিশুর জীবনের গল্প বদলে দেওয়ার ঠিকানা আনন্দ নিবাস। এএসডি- র `ডেভেলপমেন্ট অব চিলড্রেন এ্যাট হাই রিস্ক` (DCHR) প্রকল্পের আওতায় আনন্দ নিবাস পরিচালিত হয়। এ প্রকল্পের আওতায় রয়েছে এরকম তিনটি আনন্দ নিবাস। যা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থিত। অধিকার ও সুবিধা বঞ্চিত এবং মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য বলে জানালেন প্রকল্পটির প্রধান প্রজেক্ট ম্যানেজার ফারহানা সুলতানা। আনন্দ নিবাস- ২ এর আরেক অতিথি অন্তু। বয়স যখন মাত্র একমাস তখন তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। তার মা তাকে নিয়ে আশ্রয় নেয় বাপের বাড়িতে। কিন্তু সেখানে বেশিদিন ঠাঁই মেলেনি অন্তুর। নিদারুণ অভাব-অনটনে ক্লিষ্ট হয়ে একদিন অন্তুকে নিয়ে তার মা পাড়ি জমায় ঢাকায়। মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় তার মা। একপর্যায়ে তার মা আরেকটি বিয়ে করে। অন্তু`র নতুন বাবা অন্তু কে সহ্য করতে পারে না। একদিন তার বাবা-মা তাকে না জানিয়ে বাসা পরিবর্তন করে। অন্তু মাকে হারায়। শেষ হয়ে যায় তার পারিবারিক ঠিকানা। যে বয়সে শিশুরা পড়াশুনা করে, স্কুলে যায়, মায়ের স্নেহে উষ্ণতা খোঁজে সেই বয়সে অন্তু পথশিশু হিসেবে নেমে আসে রাস্তায়। কেউ কিছু খেতে দিলে খায়, নয়তো উপোষ পেঠেই ফুটপাতে ঘুমায়। একদিন সে এএসডি`র DCHR-প্রকল্পের একজন কর্মীর চোখে পড়ে। এরপর ওই কর্মী তাকে নিয়ে যায় আনন্দ নিবাস- এ। অন্তু বর্তমানে রাজধানীর একটি স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ছে। অন্তুর ছবি আঁকার হাত খুব ভালো। তাই তাকে একটি সাইনবোর্ড/ ব্যানার তৈরির দোকানে কাজ শেখার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। অন্তু এ প্রতিবেদককে জানায়, আনন্দ নিবাস তার জীবনে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এখানে সে তিনবেলা ভরপেট খেতে পারে। পায় নিয়মিত চিকিৎসা। পড়াশুনার পরিবেশ ভালো। আপু- ভাইয়ারা সবাই খুব আন্তরিক। অন্তুকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বড় হয়ে কী হতে চায়। উত্তরে অন্তু জানায় সে বড় হয়ে একজন শিল্পী হতে চায়। DCHR -এর প্রজেক্ট ম্যানেজার ফারহানা সুলতানা জানান, এই প্রকল্পের আওতায় তিনটি আনন্দ নিবাস পরিচালনা করছেন তারা। এর মধ্যে দুটি মেয়েদের ও একটি ছেলেদের। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে ভাসমান পথশিশুদের জরিপের আওতায় আনেন তারা। তারপর চারটি ক্যাটাগরিতে পথশিশুদের ভাগ করেন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে রয়েছে সেসব পথশিশুরা যারা সব সময় রাস্তায় থাকে, দ্বিতীয় ধাপে আছে তারা, যারা বাবা-মাসহ রাস্তায় থাকে, আর যারা দিনের বেলায় ভাসমান কাজ করে রাতে কোনো না কোনো আত্মীয়ের বাসায় থাকে তাদের কে ফেলা হয় তৃতীয় ক্যাটাগরীতে, আর যারা দিনে কাজ করে রাতে বাবা মায়ের সঙ্গে থাকে তারা চতুর্থ ক্যাটাগরীর পথশিশু। সাধারণত প্রথম ক্যাটাগরির পথশিশু তারা, যারা দিন রাত চব্বিশ ঘন্টায় রাস্তায় থাকে তাদের কে DCHR- এর প্রকল্পের আওতায় বেশী আনা হয়। বর্তমানে তাদের তিনটি আনন্দ নিবাসে রয়েছে ৯০জন শিশু, যাদের বয়স সর্বনিম্ন চার বছর থেকে সর্বোচ্চ আঠারো বছর পর্যন্ত। প্রকল্পটির প্রধান ফারহানা সুলতানা`র সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ২০১২ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত আনন্দ নিবাসে ভর্তি করানো হয়েছে ৪০৩ জন শিশু। এর মধ্যে ৩৩ জনকে বিভিন্ন সময়ে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে তাদেরকেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় যাদের পরিবার শিশুটির ভার বহনে ও সার্বিক নিরাপত্তাদানে সক্ষমতা রাখে। তবে ড্রপ আউট হয়ে যাওয়া শিশুর সংখ্যাও কম নয়। এখনো পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশী শিশু ড্রপ আউট হয়েছে। DCHR- প্রকল্পের ভাষায় এখানে যারা আনন্দ নিবাস- এর গোছানো ও নিয়মানুবর্তী জীবন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে গেছে, তাদের কে বলা হয় ড্রপ আউট। ফারহানা সুলতানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিশুদের বয়স আঠারো হওয়া পর্যন্ত তারা এ আনন্দ নিবাসে থাকার সুযোগ পায়। এর মধ্যে তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পছন্দ ও দক্ষতা অনুযায়ী কোনো একটি কর্মমূখী শিক্ষায় দক্ষ করা হয়, যাতে পরবর্তীতে তারা সাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এর মধ্যে কোনো পরিবার যদি তার সন্তানকে ফেরত নিতে চায় ও ফেরত নেওয়ার পর ভরন-পোষনে সক্ষমতার নিশ্চয়তা দিতে পারে তাহলে কয়েকটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে শিশুদের তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জানা গেছে আনন্দ নিবাসের বেশিরভাগ শিশুকে সংগ্রহ করা হয়েছে রাজধানীর মীরপুর মাজার এলাকা, হাইকোর্ট এলাকা ও গাবতলী বাস স্টেশন এলাকা থেকে। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের তাগিদে ওরা যখন রাস্তায় ঘুরে তখন প্রকল্পটির কর্মীরা এসব পথশিশুদের তালিকাভুক্ত করে নিয়ে আসে আনন্দ নিবাসে। ১৯৮৮ সাল থেকে দেশের হতদরিদ্র, অবহেলিত, বঞ্চিত জনগোষ্টীকে নিয়ে এএসডি কাজ করছে। এএসডি- র DCHR প্রকল্পটির মাধ্যমে শিশুদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে প্রত্যাহার করে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে মূল ধারার প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বয়স ভেদে শোভন কাজে শিশুদের নিয়োগ দেওয়া, শিশুদের জন্য বিশ্রাম ও বিনোদনের আয়োজন করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। (আগামী পর্বে থাকছে অধিকাংশ পথশিশুর পছন্দ অপরাধ জগৎ) এমজে/     এএ/ এমজে

রিকশার সাথে ৩৫ বছরের সংসার নাজমার

পরিবেশবান্ধব যানবাহন হিসেবে রিকশার গ্রহণযোগ্যতা অনেক। রাজধানী ঢাকাকেও বলা হয় রিকশার নগরী। এ রিকশা নিয়ে মাতামাতিও কম হয়নি। কেউ কেউ রিকশাকে যানঝটের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করলেও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা রিকশার পক্ষেই মত দিয়েছেন সব সময়। শুধু এই ঢাকা শহরেই পাঁচ লাখ রিকশা নিয়মিত চলাচল করে বলে জানা যায় বিভিন্ন জরিপে। তবে আজ কোনো রিকশা নয়, বরং রিকশার পেছনে লুকিয়ে থাকা একজন সংগ্রামী নারীরর কারিগরের কথা জানবো। যিনি টানা পঁয়ত্রিশ বছর রিকশার পেছনে শ্রম দিচ্ছেন। নিজে যেমন একজন দক্ষ রিকশা মিস্ত্রি তেমনি তার কাছে কাজ শিখে ঢাকা শহরেই মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন আরো পনের বিশজন। ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের পশ্চিশ পাশে ফুটপাতে রিকশা মেরামতের কাজ করেন নাজমা আক্তার। রিকশার কাজ মানে নানাবিধ কাজ। রিকশা চলতে চলতে নানা যন্ত্রপাতি বিগড়ে যায়। দিতে হয় তেল। চাকায় হাওয়া দিতে হয়। টাল ভেঙ্গে গেলে জোড়া লাগাতে হয়। সাইকেলের গিয়ারের কাজ করতে হয়।  আর এসব কাজ দক্ষ হাতে নিমিষেই করে থাকেন নাজমা। গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেন বলেন সারাদিন কাজের ভীড় লেগেই থাকে। সূর্য যখন মাথার উপরে তখন নাজমার সাথে ফুটপাতের দোকানে বসে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। স্মৃতিচারণ করে বলে চলেন অতীতের কথা। ছোট বেলায় বাবা মায়ের সাথে ধানমন্ডির শঙ্কর এলাকায় থাকতেন। বাবা ছিলেন দিনমজুর। সেখানে নাজমার মামা সম্পর্কের একজনের রিকশা মেরামতের দোকান ছিল। সেই দোকানে ফ্রক পরা গায়ে খালি পায়ে বসতেন তিনি। এটা ওটা নেড়ে চেড়ে দেখতেন। আস্তে আস্তে সেখান থেকেই কাজ রপ্ত করেন নাজমা। দিনের পর দিন যায়, মাস যায়। বছর যায়। একদিন বুঝতে পারেন তিনি রিকশার সব কাজ পারেন। তখন নিজেই ফুটপাতের ভিন্ন একটি জায়গায় রিকশা মেরামতের কাজ শুরু করেন। সেটাও প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। ভাঙ্গা রিকশা মেরামত করে সচল করে তুলেন নাজমা আকক্তার। আর সেই টাকায় চলে সংসার। কালি মাখা হাত তার উপার্যনের হাতিয়ার। নাজমা আক্তার এখন যেখানে রিকশা মেরামতের কাজ করেন সেখানে আছেন গত তের বছর ধরে। স্বামী, তিন মেয়ে ও নাতি নাতনী নিয়ে তার সংসার। রিকশা মেরামতের টাকা দিয়ে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের জামাই রিকশা চালায়। মেজ মেয়ে তার স্বামীকে নিয়ে মায়ের সাথেই থাকে। মেজো মেয়ের স্বামী শ্বাশুড়ীর কাজের শিষ্য।  ছোট মেয়েরও বিয়ে হয়েছে কিছুদিন আগে।  তার বরও রিকশা চালাক। নাজমা আক্তারের বড় সহযোগী তার স্বামী হৃদয়। হৃদয়ের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি প্রথম জীবনে চায়ের দোকানে চাকরি করতেন। নাজমা আক্তারের সাথে বিয়ের পর স্ত্রীর আগ্রহে রিকশা মেরামতের কাজ শিখেন। নাজমার ভাষায়, ওনি (হৃদয়) মানুষের দোকানে কাজ না করে নিজে স্বাধীনভাবে কিছু করুক সেটাই চেয়েছিলাম। হৃদয় কাজ শিখেন স্ত্রীর কাছেই। এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বলেন, আমি বেশির ভাগ সাইকেলের কাজ করি। সাইকেলের গিয়ারের কাজ, টাল ভাঙ্গা ও ব্রেক সংক্রান্ত কাজগুলো করি। নাজমা আক্তারের সংরক্ষণে আছে কুড়ি-বাইশ হাজার টাকার যন্ত্র। যা রিকশা মেরামতের নানা কাজে লাগে। নাজমা আক্তার বলেন, একটা সংসারে যেমন ছোটো বড় অনেক জিনিসের দরকার হয়, তেমনি রিকশা মেরামতের কাজেও লাগে নানা জিনিস। রিকশা নিয়েই তো আমার সংসার। তাই চেষ্টা করি যত্ন করে কাজ করতে। এই ঢাকা শহরেই ছড়িয়ে আছে তার পনের বিশ জন শিষ্য। তাদের একজন মাহবুব। মাহবুব বলেন, নাজমা আক্তার আমার ওস্তাদ। ঢাকা শহরে এ লাইনে তিনি সেরা। তার কাছে কাজ শিখলে সারা জীবন নিশ্চিন্তে কাজ করা যায়। রিকশার চাকার মতো জীবন ঘুরে। নাজমা আক্তারদের শরীরের পড়ে বয়সের ছাপ। কিন্তু ভাগ্য পাল্টায় না। রিকশায় চড়ে বাতাস খেতে খেতে আমরা যখন সুখানুভূতি লাভ করি তখন রিকশার পেছনে থেকে যায় নাজমা আক্তারদের অদেখা জীবনগাঁথা। আআ/টিকে

রাস্তায়ও ঠাঁই নেই ছোট আসমার

ফুলের মতো ছোট্ট শিশু ফারজানা আক্তার আসমা। বয়স ৮ বছরের মতো। তার একটি পা নেই। অনেকের মতো অট্টালিকায় থাকে না। রাস্তার পাশে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরেই তার বাস। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বাংলা মোটরের পাশে সোনারগাঁও রোডে তার সঙ্গে দেখা।    কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোমার নাম কি?    স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে এসে ‘ফারজানা আক্তার আসমা’। তোমার বাবা কি করে?         আসমার মুখটা হঠাৎ করে মলিন হয়ে গেল। সুন্দর যে হাসিটা ছিল সেটা যেন মিলিয়ে গেল। এরমাঝে একজন মাঝ বয়সী মহিলা এগিয়ে এলেন। তিনি জানতে চাইলেন কি হয়েছে? আমি বললাম ওর কেউ কি আছে? মহিলা জানালেন, সে তার নাতনি। জানতে চাইলাম, কিভাবে ও পা হারিয়েছে? দাদির নাম হোসনে আরা। তিনি জানালেন, জন্মগতভাবেই সে পা হারা। তার বাবা-মা কোথায়?                   হোসনে আরা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, ওর মা তার জন্মের সময়ই মারা গেছে। আমার ছেলে তার মাকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। আমরা কেউ রাজি ছিলাম না। পরে ছেলে সবার অমতে তাকে বিয়ে করে ফেলে। আমরাও পরে মেনে নেই। কি আর করা ছেলে পছন্দ করেছে। কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় ওর মা দুনিয়া থেকে চলে যায়। তারপর ওর সব দায়িত্ব আমার ওপরে এসে পড়ে। আমার তো বয়স হয়েছে অনেক কষ্ট হয় তবু নাতনিকেতো ফেলে দিতে পারি না। ওর জন্য আমার খুব চিন্তা হয়। আমি মরে গেলে ওর কি হবে। ওতো প্রতিবন্ধী। ওর বাবাও কি নেই?      হোসনে আরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘তার বাবা থেকেও নেই। মেয়েটা জন্মের এতিম।’ হোসনে আরার ছেলের কথা বলতে বলতে চোখে পানি চলে আসলো। চোখ মুছে বললেন, ওর মা মারা যাওয়ার পর ওর বাবার সঙ্গে অন্য একটি মেয়ের সম্পর্ক হয়ে যায়। সে গাজীপুরে একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। বিয়ে করে তারা সেখানেই থাকে। আমাদের কোনো খোঁজ খবর নেয় না। ফুটফুটে মেয়েটার প্রতিও তার কোনো খেয়াল নেই। আমার আরেকটি ছেলে আছে তার অবস্থাও ভালো না। আমাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরের পীরগাছা। ছেলের ওপর নির্ভর হয়ে চলতে হতো। গ্রামে তেমন কিছু নেই। ছেলেও তেমন খোঁজ খবর নেয় না। তাই নাতনিকে নিয়ে বাঁচার আশায় তিন বছর আগে এই ঢাকা শহরে চলে আসি। বাসা বাড়িতে কাজ করি। থাকার কোথাও জায়গা না পাওয়ায় ফুটপাতের ওপর এই ঝুপড়ি ঘরেই কোনো রকম থাকি।  আসমাকে তার বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘বাবা মাঝে মাঝে ফোন করে। আসে না। এখানে আমার অনেক বন্ধু আছে তাদের সঙ্গে আমি খেলি।’ স্কুলে যাওয়া হয়? এর উত্তরে আসমা বলে, ‘এখানে একটা স্কুল আছে আমি মাঝে মাঝে যাই। আমার পড়ালেখা করতে মন চায়। ওই যে সাদা কাপড় পরে ‘ডাক্তার’ সেই রকম হইতে মন চায়। দাদির অনেক টাকা নেই। সারাদিন কাজ করে। আমাকে কিছু করতে দেয়না।’ আসমার স্বপ্ন অনেক বড় হওয়ার। কিন্তু কিভাবে সে বড় হবে সেটা সে জানেনা। স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে ছুটে চলেছে অজানা গন্তব্যের দিকে। রাস্তার পাশের ঝুপড়ি ঘরেই ছোট্ট বয়সে কত কি স্বপ্ন দেখে। ঝলমলে রোদ ওঠলে খিল খিলিয়ে হেসে বেড়ায়। কিন্তু কেউ তার ভেতরের কষ্টটা দেখে না।    এভাবে কত আসমা যে রাস্তার পাশে পড়ে আছে; সে খবর কে রাখে। রাস্তার ধুলাবালি আর ঝড় বৃষ্টিতে ওদের স্বপ্নগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আবার কখনো কখনো বুলডোজারের চাপায় প্রাণ বাঁচাতে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করে। ঠাঁইহীন নগরে ছোট্ট ঠিকানা যেটুকু আছে সেটাও মাঝে মাঝে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। আর আসমা তখন ফ্লাড লাইটের আবছা আলোতে দাঁড়িয়ে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদে। আসমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ কি নেই? এসি   

জীবন সংগ্রামে জয়ী জবেদা

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছিল শেরপুরের মেয়ে জবেদার। তুষারের সঙ্গে যখন তার বিয়ে হয় যখন তার বয়স মাত্র ১৪। তাদের সংসারে চলছিল ভালোভাবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জবেদার বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় একটি দুর্ঘটনায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়। ততো দিনে তার কোলজুড়ে এসেছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। এর মধ্যে ছেলেটি প্রতিবন্ধী। দুই সন্তানকে নিয়ে স্বামীহারা জবেদা যেন দু’চোখে অন্ধকার দেখছেন। স্বামীর তেমন কোনো সম্পদ না থাকায় দুই সন্তানকে নিয়ে শেরপুর থেকে রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। কারওয়ান বাজার রেল লাইনের পাশের বস্তিতে এক রুম ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ঢাকায় আসার কয়েক বছর পর শফিক মিয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পুনরায় বিয়ে হয়। তিনি নতুন সংসার করলেও তা গড়ায়নি বেশি দূর। নতুন করে গড়ে ওঠা সংসারেও রয়েছে তার এক সন্তান। সন্তান আর জোবেদাকে ফেলে রেখে চলে যান শফিক। অন্ধকার আরও ঘনিভূত হয়। কিন্তু এসব অন্ধকারকে বিদায় জানিয়ে আলোর দিকেই যেন ছুটছেন জোবেদা। জবেদা এখন কাজ করেন কারওয়ান বাজারের পাইকারী কাঁচা বাজার মার্কেটে। দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করেন। কাজ শেষে যে টাকা পান তা দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। বেশি পরিশ্রম করায় এখন তার চেহারায় বাধ্যর্কের ছাপ এসেছে। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপরও তার সংগ্রাম থেমে নেই। কারণ তার আয়েই যে চলে চারজনের সংসার। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পাইকারী মার্কেটে পড়ে থাকা সবজিগুলো নিজের সংগ্রহে রাখেন। কাজ শেষে এসব সবজি নিয়ে নিজেই দোকান নিয়ে বসে যান। অস্থায়ী দোকান থেকে প্রতিদিন ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা পর্যন্ত আয় আসে তার। কিন্তু এখানে তার আয়ে ভাগ বসায় বাজার কমিটি। প্রতিদিন বাজার কমিটিকে ১শ’ টাকা হারে চাঁদা না দিলে অস্থায়ী দোকান বসতে দেয় না বলে জানান তিনি। তার মেঝ ছেলে হৃদয় এখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ২০ বছর বয়সী মেয়ে ময়নাকে খুব বেশি লেখা-পড়া করাতে পারেননি জবেদা। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। এখন মেয়েটি একটি গার্মেন্টসে চাকরি করছেন। মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা বাসা ভাড়া আর ছেলে-মেয়েদের খরচ যোগাতে যেন হাপিয়ে উঠছেন তিনি। তারপরও মাসে মাসে খরচ বাঁচিয়ে এক থেকে দেড় হাজার টাকা করে সঞ্চয় করে থাকেন। তিনি এ প্রতিদেককে বললেন, তার সঞ্চয়ের কাহিনী। জবেদার সঙ্গে কথা হতেই হাসি মুখে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেও তার মাঝে যেন হতাশার ছাপ ছড়িয়ে আছে। সে জানাল, আমার এই সামান্য সঞ্চয়গুলো মেয়ের (ময়না) জন্য করা। তার বিয়ে দিতে হবে, ছেলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করাতে হবে। এ জন্যই এ সঞ্চয়। স্বামী বেঁচে না থাকলেও জবেদাই এখন সন্তানদের বাবা-মা। তাদের মুখে হাঁসি ফোটাতে এখনও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিনই ভোর ৩টায় কাঁচাবাজারে আসেন। পাইকার ব্যবসায়ীদের কাজে সহযোগিতা করেন তিনি। বিনিময়ে তারা কিছু কিছু সবজি দেয় জোবেদাকে। এসব সবজি নিয়ে তিনি অস্থায়ী বাজার বসান। এ দিয়ে যা আয় হচ্ছে তা দিয়ে চলছে সংসার, ছেলের পড়া আর সামান্য সঞ্চয়। তিনি এ প্রতিবেদককে জানালেন, আমার সংসারের হাল কাউকে ধরতে হবে না। তবে আমার প্রতিবন্ধী ছেলেটার জন্য যদি একটু সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যেত তাহলে আমার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতো। আমি আমার মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারতাম। মেয়েটার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। টাকার অভাবে এখনও বিয়ে দিতে পারিনি। জোবেদার মতো আরও অনেক নারী এভাবেই কাজ করছেন রাজধানীর বৃহতম এ পাইকার বাজারে। তারা দিনের পর দিন কাজ করে অভাবকে জয় করে চলেছেন। এরপর কোনো ভিক্ষাবৃত্তিকে পুঁজি হিসেবে নেননি। হাত পাতেননি কারো কাছে।   আর/এসএইচ/

মমতাময়ী রোকেয়া কি হেরে যাবেন?

কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজারের কাছে ফুটপাতে বসে দূরে তাকিয়ে আছেন এক বৃদ্ধা নারী। নাম বেগম রোকেয়া। বয়স ষাটের বেশি, জীর্ণ-শীর্ণ শরীর। কখনো কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে, কখনো রাস্তার মোড়ে আবার কখনো বিভিন্ন অফিসের পাশে- খোলা আকাশের নিচে কাটে তাঁর দিন। সঙ্গী বলতে একটা ছোট ভিক্ষার থালা, আর এক পুটলি। গ্রীস্মের কাকফাটা রোদ কিংবা বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টি সবই যেন পরাজিত জীবনযুদ্ধে লড়াকু এ নারীর কাছে। কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন জায়গায় ভিক্ষা করে ৬০ থেকে ৭০ টাকা আয় করেন তিনি। একটা সিঙ্গারা, পুরি আর এক গ্লাস পানি খেয়ে কাটিয়ে দেন দিন-রাত। আবার কখনো অফিসগামী লোকজনের দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে পেট পুরেন তিনি। তবে টাকা আয় করলেও, বুদ্ধিপ্রতিবন্দ্বী অসুস্থ ছেলে, ছেলের বউ আর নাতনীর উপোস মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠায় কোনোরকমে পেটে পাথর বেঁধে দিন কাটিয়ে দেন মমতাময়ী এ মা। তাদের মুখের খাবার যোগাতে সাত বছর আগে তিনি ঢাকায় আসেন। মমতাময়ী রোকেয়া জানান, অসুস্থ তাঁর ছেলে। থাকেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁর পাঠানো টাকার উপর উম্মুখ হয়ে চেয়ে থাকে পরিবারের বাকি তিন সদস্য। অভাবের সংসারে ছেলের বোঝা হয়ে থাকতে চাননি তিনি, তাই ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে অভাবের তাড়নায়। শুধু দু’বেলা দু মুঠো খাবারের অভাবে আর ছেলের মঙ্গল কামনায় তিনি আজ রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা করছেন। ছেলের জন্য প্রাথনায় তাঁর অষ্ট প্রহর কাটে। ছেলের কথা বলতে বলতেই চোখের পাতা ভিজে যায় এ নারীর। তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন আমিরের অসুস্থতা তাঁকে সারাক্ষণ বেদনায় আচ্ছন্ন করে রাখে। যে বয়সে মায়েরা সন্তানের আয়ের টাকায় দিনানিপাত করে থাকেন, সে বয়সে উল্টো তাঁকে ছেলেকে টাকা পাঠাতে হচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে পায়ে হেঁটে ভিক্ষে পাওয়া অর্থ দিয়ে সন্তানের মুখের খাবার আর ওষুধ যোগাতে হচ্ছে। যশোরে থাকা অবস্থায় অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন রোকেয়া। কিন্তু জরায়ুতে টিউমার অপারেশন হওয়ার পর আর ভারী কাজ করতে পারেননা তিনি। বেগম রোকেয়া ভাগ্য বিড়ম্বিত এক অসহায় নারী। এই রোকেয়া সমাজের অসহায় নিরন্ন নারীদের একজন। খুলনার সুন্দরবনের কয়রা গ্রামে তাঁর জন্ম। আনুমানিক বয়স ষাটের কিছু বেশি। তবে ঘটনাবহুল একাত্তর সালের স্মৃতি তাঁর মনে এখনও চিরজাগরুক । মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার খুলনা থেকে যশোরের ঝিকরগাছা উপেজলায় চলে আসে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা যখন হত্যাকাণ্ড,অগ্নি-সংযোগ নারী ধর্ষণ শুরু করে কয়রা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয়ে চলে যায়। সে সময় পাকবাহিনী পাখির মত মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। শত্রুর হাত থেকে পালাতে গিয়ে ৩ ভাই ও এক বোনকে যশোরের বেনাপোলের কাছে হারিয়ে ফেলেন তিনি। সীমান্ত পার হওয়ার সময় মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর সম্যক যুদ্ধবাঁধে । পাকবাহিনীর আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে একেক জন একেক দিকে চলে যায়। ওই দিন তাঁর বাবা মাকে খুঁজে পেলেও ফিরে পাননি পরিবারের বাকি চার সদস্যকে। যুদ্ধদিনের কথা বলতেই বেগম রোকেয়া আবেগ প্রবণ হয়ে পরেন। তিনি বলেন, ‘‘রেজাকাররা ঘরে ঘরে বউ ঝিদের বেইজ্জতি করছে, লুটপাট করছে, আমাগো গ্রামেও করছে। চারদিকে আগুন লাগাইয়া দিছে, যুদ্ধের সময় আমি তখন সেয়ানা হইছি। ভয়ে ঘরবাড়ি ছাইড়া বাগানে পলাইছি। মুসলমান বাড়িতে চাইয়া চাইয়া খাইছি।’রেজাকাররা হিন্দুদের ভাতের প্লেটে মাটিতে ফেলাইয়া দিত। হিন্দুমেয়েদের অত্যাচার করতো। সেই সব কথা আমার এহেনও মনে পরলে ডর লাগে। পাঞ্জাবিদের ভয়ে ইজ্জত বাঁচাইতে আমার বাপে আমাগোরে লুকায় রাখছিল। কিন্তু পলাইতে যাইয়া আমার ভাইবোন হারাই গেছে, এহেন পাই নাই; ওরা কোথায় আছে, কেমন আছে জানি না। মরবার আগে একবার দেখবার চাই’’ যুদ্ধের পরই যশোরের ঝিকরগাছার কাশেম মোল্লার সঙ্গে রোকেয়ার বিয়ে হয়। রোকেয়ার স্বামী স্থানীয় একটি আটার মিলে দিন মজুরি করে সংসার চালাত । রোকেয়া ও কাশেমের সংসারে অভাব থাকলেও সুখের অভাব ছিল না তাদের জীবনে। বিয়ের এক বছর পরে তাদের ঘর আলো করে এলো এক পুত্র সন্তান। জন্ম থেকেই সেই সন্তান বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। এর পর থেকে সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর আরেক সংগ্রামের জীবন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সে পরিবারের বাড়তি উপার্জনে সহযোগিতা করতো। সতের বছর আগে রোকেয়ার স্বামী মারা যায়। একমাত্র সন্তানের অসুস্থতা নিয়ে তাঁর দুর্ভোগ পৌঁছায় চরমে। জীবন সংগ্রামে নেমে আসে অমোঘ বাস্তবতা। রোকেয়ার দিনে দিনে বয়স আরও বাড়ছে। শরীরে রোগজীবাণু বাসা বাঁধছে। কতদিন এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিক্ষা করে সন্তান ও নিজের জীবন চালাতে পারবেন তা নিয়ে মারাত্মক শঙ্কায় আছেন ষাটোর্ধা এ নারী। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমার মৃত্যু হলে, কে দেখবে আমার সন্তান ও নাতনীকে। কেউ কি নেই, আমাদের এ দুঃখের জীবনে একটু আলোক শিখা জ্বালানোর’? এমজে/

১দিন খাইলে ২দিন অনাহারে; তার আবার নববর্ষ!

আসমা আক্তার অভাব অনটনে হারিয়েছেন স্বাস্থ্য। লড়াই করতে করতে হারিয়েছেন মুখের লাবণ্য। ছোট বেলায় দেখতে মোটেও এমন ছিলেন না। এমনটাই দাবি করলেন এ প্রতিবেদকের কাছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী ছোট বেলায় সুন্দর ছিলেন। যতোটা সুন্দর থাকলে এলাকার ছেলেরা বিরক্ত করে, বাড়ীতে ঘন ঘর বিয়ের প্রস্তাব আসে। তার চেয়েও বেশি সুন্দরী ছিলেন। বাবা কলিম উদ্দিন ছিলেন দিনমজুর। ঢাকার পাশে মুন্সীগঞ্জে নদীর পাড়ে ছিল কলিমউদ্দিনের ঘরভিটা। নদী যখন ঘর ভিটা গ্রাস করলো তখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই কলিম উদ্দিন তার মেয়েকে এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে বিয়ে দেন। না দিয়ে উপায় ছিলনা। জলে বাস করতে তো আর কুমিরের সাথে লড়াই করা যায়না। তবে এলাকার সবাই বলেছিল, বিয়ের পর আসমা আক্তার সুখী হবে। `সুখ`! শব্দটি উচ্চারণ করে ফ্যাকাশে হাসি হাসেন আসমা আক্তার। তার সাথে কথা হচ্ছিল রাজধানী শাহবাগের মোড়ে বসে। পরনে আধময়লা কাপড়। দু`পাশে দুটো শিশু। একটা ছ`সাত বছরের ছেলে। অন্যটা তিন বছরের মেয়ে। সামনে ঝুড়ি ভর্তি ডুগডুগি। নববর্ষের শোভাযাত্রায় আসা মানুষ ডুগডুগি দরদাম করছে। কেউ কেউ দাম শুনে ধমক দিচ্ছেন। আসমা আক্তার দাম চায় বিশ টাকা। ক্রেতারা দিতে চায় পনের টাকা। আসমা আক্তার বলেন, "প্রত্যেকটা ডুগডুাগি কিনে আনি পনের টাকা থেকে আঠার টাকায়। বিশ টাকা করে না বেচলে লাভ আসবে কোথেকে? আসমার বিয়ের পর কয়েক বছরের ব্যবধানে তিন সন্তানের মা হন। দু`মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়েটির বয়স এখন বারো বছর। স্বামী কিছুই করতো না। বিয়ের পর থেকে আসমাকে কিছু না কিছু করতে হতো। কখনো মানুষের বাসার বুয়া, তো কখনো মিলের শ্রমিক। এতো কিছুর পরও তার স্বামী তাকে মারধর করতো বলে অভিযোগ করেন তিনি। কখনো মদের টাকা, কখনো অন্য খরচের জন্য মার খেতে হতো থাকে। এরপরও স্বামীকে ধরে রাখতে পারেননি আসমা। এখন ছাই বিক্রি করেন বলে জানান আসমা। মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন মিল থেকে বস্তা প্রতি দু`শত টাকায় ছাই কিনেন। সেই ছাই ঢাকায় বিক্রি করেন বস্তা প্রতি তিন`শ টাকা। আগে হাড়ি পাতিল ধোয়ার কাজে মানুষ ছাই ব্যবহার করলেও এখন কেউ করেনা। তাই আসমার ছাইয়ের ব্যবসাও তেমন চলেনা। মাথার উপর গনগনে রোদ। চারপাশে নববর্ষকে বরণ করার উৎসব। নববর্ষ কেমন লাগছে?- এমন প্রশ্নের জবাবে মাথার ঘাম মুছতে মুছতে আসমা বলেন, এক দিন খেলে দু`দিন খেতে পাইনা। আমাদের আবার নববর্ষ! টিকে

কুলসুমের স্বপ্ন!

ধানমণ্ডি লেক। রাত ৯ টা। ইমরান ও কুলসুম কাঁধে কাঁধ দিয়ে গলাগলি করে দ্রুত হাঁটছে! দুজনের চেহারায় শঙ্কার ছাপ ! কখনো এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ভদ্রোজন দেখলে একগাল মুচকি হাসি দিচ্ছে। ভাইয়্য-আপু, আঙ্কেল-আন্টি বলে কাছে গিয়ে ভিড়ছে। কখনো অফুরাণ হাসি নিয়ে ওই ভাইয়্যা-আপু-আঙ্কেল-আন্টি থেকে ফিরে আসছে, আবার কখনো রাজ্যের শঙ্কামাখা মলিন মুখখানা নিয়ে ফের গলাগলি করে লেকের পাড়ে হাঁটছে। ইমরান! বয়স কত হবে, বড়জোর ৮ বছর। কালো-ঘন লম্বা ও জ্বলজ্বলে চুলগুলো কপাল পেরিয়ে নেত্রকেও ঢেকে ফেলেছে। স্লিম দেহের শিশুটিকে প্রথম দর্শনে দেখলে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে। ওদিকে কুলসুমের বয়স ছয় বছর। অথচ তাঁর বাগ্মীতা, বলার ধরণ, উপস্থাপনার ভঙ্গি, আদরমাখা শব্দচয়ন কোমলতাকেও ছাড়িয়ে যায়। ছাড়িয়ে যায় কোটি কোটি মাইল দূরের দীপ্তিমান `লিটল স্টারের‘ সৌন্দর্যকেও। প্রতিদিন বিকেলে ইমরান-কুলসুম গলাগলি করে বের হয় ভিক্ষা করার উদ্দেশ্যে। আর তাদের গন্তব্য হয় ধানমণ্ডি লেক। লক্ষ্য একটাই দৈনিক ৫০ টাকা আয়। ভাই-বোন মিলে কোনোরকমে ১০০ টাকা আয় করতে পারলেই মনের সুখে গান ধরে বাসার দিকে রওয়ানা হয়। পরদিন আবারও আসে ধানমণ্ডি লেকে। আবারও ভাইবোন বাসায় ফিরে। এভাবেই কাটে তাদের দিন। ৮ এপ্রিল রাত ৯টা। ধামণ্ডি লেকের ভেতর বসে আছি। পাশে কেউ নেই। একদল লোক জগিং করছে। আরেকদল হাঁটছে। এক শ্রেণীর তরুণ-তরুণী জোড়া হয়ে বসে প্রেম বিনিময় করছে। এসবে আমার মন নেই। বসে আছি আর বসে আছি। এরই মধ্যে দূর থেকে সুললিত কণ্ঠের এক মেয়ে বলে ওঠলো, ভাইয়্যা, ভাইয়্যা একটা গল্প বলব? `হুম বলো‘। `না, না ভাইয়্যা, একটা গান গাইব‘? `হুম গাও‘। `না ভাইয়্যা, একটা কবিতা পড়ি‘? `হুম পড়ো‘। এবার পুরো মনোনিবেশ করলাম তাঁর উপর। দেখি এরইমধ্যে দুই ভাইবোন গলাগলি করেই দাঁড়িয়ে আছে। নাম জিজ্ঞেস করতেই মেয়েটি বলে ওঠলো, `ভাইয়্যা, আমি কুলসুম। আর অ ইমরান‘। কে বড় মুখ থেকে পড়ার আগেই, কুলসুম ছট করে বলে ওঠলো `ভাইয়্যা অ বড়‘। ইমরানের মুখে স্বর নেই। সে মুচকি মুচকি হাঁসছে। দুই ভাই-বোন আমার সঙ্গে ঘেঁষে বসে পড়লো। এরপর শুরু হলো আলাপন। গল্প-গান-আড্ডা। কুলসুমের কণ্ঠে `মধু হয় হয় আরে বিষ হাবাইলা‘ `টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার‘ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেই গেলাম। ইমরান-কুলসুমদের ৬ জনের সংসার। কুলসুম বলে জানো ভাইয়্যা `বাবা রিক্সা চালায়। বিড়ি, গাঁজা খাইয়্যা বাবা প্রায়ই মাতাল হইয়্যা বাসায় আসে। দাদী অন্যের বাসায় রান্নার কাজ করে। আর মা ছোট ভাইকে নিয়ে ঘরে থাকে। আগে মা অন্যের বাসায় কাজ করতেন। ছোট ভাইয়ের জন্মের পর থেকে মা বাসায় থাকে। জানো ভাইয়্যা, বাবা প্রতিদিন মাকে বকে। মাঝেমধ্যে পিটাই। আর জানো ভাইয়্যা, আমরা দুইজনে যদি ৫০ টাকা করে বাবাকে না দিই, তাহলে বাবা আমাদেরও ধরে পিটাই। ইমরান ভাইয়্যা তো ৫০ টাকা কামাইতে পারে না। আমি প্রতিদিন ২০-৩০ টাকা দিয়ে ভাইয়্যার ৫০ টাকা মিলাই বাবাকে ১০০ টাকা দিই। আর যেদিন আমি ভাইয়্যাকে টাকা দিতে পারি না, ভাইয়্যাও বাবাকে টাকা দিতে না পারার কারণে মার খায়‘। ইমরান-কুলসুমের বাসা রায়ের বাজার বস্তিতে। দুই রুমের ঘর, ভাড়া তিন হাজার টাকা। টিনশেটের ঘরে দাদীর সঙ্গে থাকে ইমরান-কুলসুম। কুলসুম পড়ে স্থানীয় একটি ভ্রাম্যমাণ স্কুলে। ইমরানও পড়ে একই স্কুলে। সকাল হতে দুপুর অবধি স্কুলের পড়া শেষে বিকেলে ভিক্ষা করতে ধানমণ্ডি লেকে ছুটে আসে দুই মানিকজোড়। ইমরান বুঝে, বাবার পিটুনির হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে তাকে ৫০ টাকা রুজগার করতেই হবে। আর কুলসুম বুঝে, ভিক্ষা না নিলে খাবে কি? মায়ের-ছোট ভাইয়ের ওষুধ আনবে কিভাবে? স্কুলে কলম-খাতা নিয়ে যাবে কিভাবে? ভিক্ষা করে জীবন চালালেও কুলসুমের চোখেমুখে রাজ্যের স্বপ্ন এসে ভিড় করে। মাত্র ছয় বছর বয়সে কুলসুম স্বপ্ন দেখে বড় হওয়ার। বাবা-মাকে টাকা কামাই করে খাওয়ানোর। ভাই ইমরানকে পড়ালেখা করানোর। টাকা জমিয়ে জায়গা কিনে ছোট্ট একটি ঘর করার। কুলসুম যখন বলছিল, `টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার, হাউ আই ওয়ান্ডার হোয়াটস ইউ আর‘। সত্যি কুলসুম ‘হাউ ইউ ওয়ান্ডার‘। এই লেকের পাড়ে অন্য শিশুরা যখন বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে এসে দই-পুচকা-আইসক্রি খায়, তখন তুমি ভিক্ষা মাগো। সত্যিই এর চেয়ে বড় বিস্ময়ের আর কি থাকে? এরপরও স্বপ্নের রাজ্যে ভেসে কুলসুম স্বপ্ন দেখে বড় একজন অভিনেত্রী হওয়ার। বিশ্বাস করুন, তার গলার স্বর এত সুন্দর, এত সাবলীল তার বাক্যচয়ন , একটু যত্ন পেলে সে নিঃসন্দেহে দেশসেরা অভিনেত্রী হয়ে ওঠবে একদিন। এটাই পুঁজিবাদী সমাজের বৈষম্যপূর্ণ জীবন। কেউ স্বপ্ন দেখে আর কেউ স্বপ্ন বিক্রি করে। রাত ৯ টায় এক কুলসুম রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ভিখ মেগে স্বপ্ন বিক্রি করে। হয়তো আরেক কুলসুম- ধনীর দুলালী সোফায় বসে হাউজ টিউটরের সামনে স্বপ্নের বীজ গলাধঃকরণ করে। এক কুলসুম ৫০টা টাকার আশায় বিকাল থেকে রাত অবধি ভিক্ষা করে, আরেক কুলসুম হয়তো বাবা-মায়ের পরম মমতায় ভবিষ্যতের বীজ বুনে। যে কুলসুমকে বারবার সাধার পরও একটা আইসক্রিম নেয়নি, সেই কুলসুমের ব্যক্তিত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন আসে? আসে না, হয়তো কোনদিন অর্থ হলে, বিত্তবান হলে কুলসুম-ই হবে দেশের সবচেয়ে ব্যক্তিত্ববাণ নারী। কুলসুম এগিয়ে যাও...। সমাজ তোমার চোখের পানি মুছে দেবে না। তোমার চোখের পানি তোমাকেই মুছতে হবে। তোমার চলার পথ তোমাকেই রচনা করতে হবে। দেশে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এরপরও তোমার মতো কুলসুমদের ভাগ্যের সিকিটুকুনও পরিবর্তন ঘটেনি। বরং দিনে দিনে কুলসুমদের সংখ্যা আরও বাড়ছে। ১৭ মার্চ আসলে আবারও হয়তো তোমাদের চকোলেট দিয়ে, রং মাখিয়ে মিডিয়ায় উন্নয়নের ফেনা তোলা হবে। কিন্তু তোমাদের ভাগ্যের কি কোন পরিবর্তন ঘটবে? শাসক মহল, বিত্তবান ও সমাজের দায়িত্বশীল মানুষদের কাছে প্রশ্ন, আমাদের কি কোন দায়িত্ব নেই? বিবেককে প্রশ্ন করুন, তাহলেই জবাবটা পেয়ে যাবেন। এমজে/

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি