ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:১০:৩৩

পাঠ্য বই হতে হবে চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী: আলী আহসান

পাঠ্য বই হতে হবে চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী: আলী আহসান

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের বা জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে। যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। কিন্তু কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে সে কর্মক্ষমের সুযোগ? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আলী আহসানের। তিনি বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েরা যে হারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করছে সে হারে চাকরি হচ্ছে না। কারণ আমাদের চাকরির বাজার সংকীর্ণ। আমাদের ছেলে-মেয়েদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিধিও কম। তারা সর্টিফিকেট নিচ্ছে কিন্তু ভিতরে জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষিত ও জ্ঞানী না হওয়ার কারণে তারা চাকরি পাচ্ছে না। তাদের বদলে বাহিরের লোক এসে চাকরির বাজার দখল করে নিচ্ছে। তাই ছেলে-মেয়েদের চাকিরির উপযোগী করে তুলতে জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে।  বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যবই তৈরি করতে হবে। দুই পর্বের সাক্ষাতকারটি প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে দেশ। অথচ সরকারি হিসেবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে কেন কাজে লাগাতে পারছি না? মূল সমস্যা ও সমাধান কোথায়? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? আলী আহসান: আমাদের শিক্ষিতের হার বাড়ছে কিনা বলতে পারবো না, তবে সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা বাড়ছে এটা বলতে পারি। আপনি যেখানেই যাবেন, হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শর্টকাটে পড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আমরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। তাতে অবিজ্ঞতা হলো যে সর্টকাটে পড়াতে পারলেই ভালো শিক্ষক। যারা বেশি পড়ায় বছর শেষে দেখা যায় তার গ্রেট অনেক নিচে নেমে গেছে। বেশি পড়ানো শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে মূল্যায়ন করে না। কাজেই আমরা একেবারেই শর্টকাটে চলে গেছি। গত বছর পরীক্ষায় যতটুকু পড়েছিল, শিক্ষক পড়িয়েছে ৫ পাতা, আর সিলেবাসে আছে ১০ পাতা। এসব কিছু কাটছাট করে আড়াই পাতা পড়েই আমাদের ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষা দিচ্ছে। যার কারণে তাদের জ্ঞানের প্রসার ঘটছে না। সর্টকাটের কারণে আমাদের ছেলে-মেয়েদের জ্ঞান ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমাদের প্রাইমারি লেভেল থেকে সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত  ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাসিকে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। যার কারণে তারা উপরে এসে হাবিডুবি খাচ্ছে। চাকরির জন্যও যোগ্য হয়ে উঠছে না।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) এর সুযোগ কাজে লাগাতে আমাদের করণীয় কি হতে পারে? আলী আহসান: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের অ্যাডভ্যান্টেজ অনেক দেশই নিয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের পর বাঁচ্চার সংখ্যা হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেল। পরে ওই বাঁচ্চারাই বড় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিল। আমাদের দেশেও তেমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা কি আমাদের সে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজের উপযোগী দক্ষ করে তুলতে পেরেছি। না পারি নাই। চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী কি তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছি। পারি নাই। আমাদের গার্মেন্টসগুলোতে যান। দেখবেন আগে যে কাজগুলো মানুষ করতো এখন তার অনেকটা ম্যাশিনে করছে। আর সেই একটি ম্যাশিন ১শ’ মানুষের কাজ করছে। ফলে ম্যাশিনের ওই কাজ শিখে বসে থাকলে তো বেকারই থাকতে হবে। কারণ যে কাজ এখন ম্যাশিনে হচ্ছে তার জন্য তো কোন প্রতিষ্ঠান ইমপ্লয়ি নিয়োগ দিবে না। তবে ইমপ্লয়িকে কি করতে হবে। ওই ম্যাশিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তবেই আমাদের দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগানো সম্ভব হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? আলী আহসান: আগেই বলেছি গার্মেন্টসে এখন একটি ম্যাশিন কাজ করছে ১শ’ লোকের। তাই আমাদের কাজের পরিধি কমে আসছে। যতদিন আমরা ওই ম্যাশিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ না নিতে পারছি। ততদিন বেকারের সংখ্যা বাড়বে। আর ম্যাশিন পরিচালনা করবে বিদেশীরা এসে। তারা নিয়ে যাবে দেশের বড় একটি অংশ। কারণ তাদের শিক্ষার বিষয়ে ম্যাশিন পরিচালনা ছিল। তারা শিক্ষার সঙ্গে শিখেছে কিভাবে ম্যাশিন পরিচালনা করতে হয়। আমাদের ক্রিয়েটিভ প্রকৃত জ্ঞানিদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে তারাই আমাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হয়েছে। এখন বাংলাদেশকে ৬ বছর পর্য্যবেক্ষণে রাখা হবে।পর্য্যবেক্ষণকালে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে গিয়ে আমাদের কী ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা লাগতে পারে? আলী আহসান: উন্নয়নশীল হলে আমাদের কিছু ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে। যেমন আমাদের অর্থনীতির প্রাণ গার্মেন্টস খাত বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়।যেগুলো উঠিয়ে নেওয়া হবে। তাই আমাদের যাতে সেটা না উঠাতে পারে তার জন্য দেনদরবার করতে হবে। আর একান্ত উঠিয়ে নিলে তার বিকল্প  কিছু বের করতে হবে। আবার আমাদের স্বল্পসুদে যে বৈদেশীক ঋণ পায়তাম তাও উঠে যাবে। সে জন্য আমাদের বিকল্প ঋণের উৎস্য খুঁজতে হবে। এছাড়া আমাদের প্রকৃতিক দুর্যোগসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে। তা না হলে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েও আমাদের কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে। আরকে/ এআর /    
মেধার মূল্যায়নে বন্ধ করতে হবে শিক্ষা বাণিজ্য: সিরাজুল ইসলাম

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। অনেকেই কোচিংও করেছেন। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের বা জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে। যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। এই সুযোগটা কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অধ্যয়ন অনুষদের সাবেক ডিন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও একই বিভাগের অধ্যাপক মো. সিরাজুল  ইসলামের। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রতিবছর শিক্ষিতের হার বাড়ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্র তত বাড়ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে যখন এ বেকারত্মের সংখ্যা বাড়ছে। ঠিক তখন আবার বিদেশীরা আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিচ্ছেন। যা আমাদের চাকরির বাজারকে সঙ্কুচিত করছে। তবে এর জন্য আমাদের শিক্ষা বাণিজ্যও অনেকটা দায়ী। বাণিজ্যের আড়ালে আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখা-পড়া না করেই বছর শেষে সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতায় ঘাটতি থাকায় আমাদের ছেলে-মেয়েদের সে সার্টিফিকেট চাকরির পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন কাজে আসছে না।তাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের  প্রকৃত শিক্ষিত, জ্ঞানি ও দক্ষ করে তুলতে হলে, তাদের মেধার মূল্যায়ন করতে হলে, চাকরি  উপযোগি করতে হলে দরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান অসুস্থ্ বাণিজ্য। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির শেষ পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে কোচিংয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বাণিজ্যের বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?  সিরাজুল ইসলাম: আসলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোন একটি খাত গড়ে উঠলে প্রাথমিকভাবে সেখানে কিছু অনিয়ম হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা এদেশে বেশিদিন আগে হয়নি। বড়জোর ২০ বছর আগে থেকে এর প্রসার ঘটেছে। এখন সময় এসেছে এগুলোকে তদারকি করার। তারা কি পড়ায়, কি পরিমান টাকা তারা আয় করছে। সরকারের খাতায় কি পরিমাণ দিচ্ছে।তাদের আরোপিত বিভিন্ন ফি শিক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে কি না।  আমাদের একটি ছেলে গ্রাজুয়েট পাসের পরও ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। কিন্তু এই দেখুন পাশের দেশ ভারত।এখানকার সব ক্রিকেটার সহজেই ইংরেজি বলতে পারে। আর আমাদের অনেক ক্রিকেটার ইংরেজি ভালো বলতে পারে না। শিক্ষাঙ্গনে আমাদের ইংরেজিসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছু যোগ হয়নি। যার কারনে ক্রিড়াসহ যব মার্কেটেও আমরা পিছিয়ে পড়ি। আসলে আমরা যে ধরণের লেখা-পড়া করার দরকার সে ধরণের লেখা-পড়া করাচ্ছি না। সেই মানের লেখা-পড়া আমরা না করিয়ে বছর শেষে সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছি। যে সার্টিফিকেট আসলে কোন কাজেই আসছে না।তাই শিক্ষা বাণিজ্যের যে অভিযোগ রয়েছে এটা অহেতুক নয়। এটা বন্ধে সরকার তথা রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে শিক্ষায় বস্তুনিষ্ঠতা আসবে। দেশে প্রকৃত শিক্ষিত, দক্ষ ও জ্ঞানি মানবসম্পদ গড়ে উঠবে।তখনই দেশে টেকসই উন্নয়ন হবে। জ্ঞানের ঘাটতি রেখে কেউ সার্টিফিকেট না পেলে আগামী প্রজন্ম প্রকৃত জ্ঞানি হয়ে উঠবে। কেননা তারা বুঝবে যে অধ্যায়ন বা শিক্ষা ছাড়া সার্টিফিকেট   মিলবে না। কাজেই আমাকে প্রকৃত অর্থে শিখতে হবে। জানতে হবে। তখন আামদের গ্রাজুয়েটদের একটি মেইল লিখতে বা ইংরেজিতে কোন আবেদন করতে দূর্বলতা দেখা যাবে না। তারা অন্যান্য দেশের মতো শানিত মেধার অধিকারি হবে। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার মেধার মূল্যায়ন হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাকে কীভাবে নিরেট সেবায় রূপান্তর করা যায়? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের দেশের স্কুল ও কলেজগুলোতে লেখা-পড়া হয় কতদিন।বছরে তারা সময় পায় ১২ মাস। যার মধ্যে গৃষ্মের বন্ধসহ নানাবিধ বন্ধে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার মাস বন্ধ থাকে। এর ভিতরে আবার প্রতিষ্ঠানে এসএসসি পরীক্ষা, অনার্স পরীক্ষা, মাস্টার্স পরীক্ষা হচ্ছে।এতোসব পররীক্ষার সময় ক্লাস হয় কম। এসবের  মধ্যে একজন শিক্ষক পড়ানোরই সুযোগ পায় না।আর শিক্ষকের পাঠদানের ঘাটতিতে ছাত্ররা কোচিংয়ের উপযোগীতা অনুভব করে।যার কারণে কোচিং প্রসার দিনের পর দিন বাড়ছে। কোচিংগুলো সবই খারাপ না। তারা কিছু জানে বা জানায়-শিখায়। এখন কলেজ বা স্কুলে আমরা যদি ঠিকমতো পড়াতে না পারি।সময়টা ঠিকমতো না দেয়।স্বাভাবিকভাবে অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন।অভিভাবকরা চায় তার সন্তান যেন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এসে বিশ্ববিদ্যালযে ভর্তি হতে পারে।আগে স্কুল বা কলেজে এতো পরীক্ষাও ছিল না। আবার প্রতিযোগিতাও ছিল না।বিভিন্ন পরীক্ষার পাশাপাশি কলেজগুলোতে থাকে ক্লাস নেওয়া তাড়া। সবকিছুর ডামাডোলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতি তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।শিক্ষকরা মনে করি আমি গবেষণা বা ক্লাসের ফাঁকি দিয়ে বাইরে একটা ক্লাস করাই সেখানে লাভ বেশি।লাভের বিষয়টি সেখানে বড় হয়ে দেখা দেয়। যেটা সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা উচিত। সরকারকেও ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।যেমন শিক্ষক যেন তার ক্লাস টাইম তথা সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোন কোচিং বা প্রাইভেট না পড়াতে পারে সে জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? সিরাজুল ইসলাম: আমরা শিক্ষক বা ছাত্র কেউই সমাজের বিচ্ছিন্ন অংশ নয়।যখন দেখা যায় পরিবারে কারো সঙ্গে কারো ভালো সম্পর্ক নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।এটা আমার দলের না। সেটা আমার দলের। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। তার সঙ্গে করো না।পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকট হয়েছে।যেখানে শিক্ষকরাও জড়িয়ে পড়েছে। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।যার ফলে দেখা যায় শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ আগের তুলনায় কম। এছাড়া মাদকের একটা ভয়াবহ রূপ আমাদের গ্রাস করেছে।এই মাদকের কারণে যে লোকটাকে আমরা উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে পারতাম।সেটা পারছি না।উল্টো তরুণ সমাজ এর ছোবলে নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে নানা অকারণে জড়িয়ে পড়ছে। খুব দ্রুত আমাদের দেশে মাদক ছড়িযে পড়ছে।কারণ একটা লোক দেখে উৎপাদনমুখী কাজে তার আয় হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। আর মাদকের কাজে গেলে তার আয় হচ্ছে ১০ লাখ টাকা।কাজেই মাদকগুলো বন্ধ করা এবং তাদের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করার উপর জোর দিতে হবে। / এআর /  

বেকারত্ব ঘোচাতে দরকার বেসরকারি খাতের উন্নয়ন: সিরাজুল ইসলাম  

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। অনেকেই কোচিংও করেছেন। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের বা জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে। যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। কিন্তু কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অধ্যয়ন অনুষদের সাবেক ডিন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও একই বিভাগের বর্তমান অধ্যাপক মো. সিরাজুল  ইসলামের। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রতিবছর শিক্ষিতের হার বাড়ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্র তত বাড়ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এ বেকারের সংখ্যা কমাতে দরকার দেশে বেসরকারি খাতকে আরও বেশি এগিযে নেওয়া। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে দরকার ‘বেসরকারিখাত উন্নয়ন নীতি’। এটা করা গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগানো সহজ হবে। দেশ উন্নয়নশীল হওয়ার মর্যাদাও ধরে রাখা সহজ হবে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে দেশ। অথচ সরকারি হিসেবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে কেন কাজে লাগাতে পারছি না? মূল সমস্যা ও সমাধান কোথায়? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের দেশে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমান ছাত্র পাস করে বের হচ্ছে, সেই তুলনায় চাকরির সুযোগ হচ্ছে না। এর কারণ হলো- দেশের বেসরকারিখাতে প্রয়োজনীয় পলিসি না থাকা। চাকরিটা মুলত আসবে বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু বেসরকারি খাতে যে ধরনের পলিসি দরকার ছিল, সে ধরনের পলিসি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অর্থাৎ কোপ্রাইভেট সেক্টর ডিভলপমেন্ট পলিসি দরকার। প্রাইভেট সেক্টর সামনে আগাতে গেলে যে বাঁধাগুলো পড়ে সেগুলো সরকারকে দূর করতে হবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। কারণ বৃহৎ এ শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সবাইকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া সম্ভব না। সে জন্য সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে চাকরি পাওয়ার উপযোগী করে তুলতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) এর সুযোগ কাজে লাগাতে আমাদের করণীয় কি হতে পারে? সিরাজুল ইসলাম: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগাতে আমাদের ইনকাম জেনারেটিং এক্টিভিটিসগুলো বাড়াতে হবে। যেমন আমাদের দেশে বিভিন্ন এনজিও আছ। তারা গ্রাম পর্যায়ে হ্যান্ডিক্রাফ্ট ও নকশি কাঁথাসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনে নারীদের কাজে লাগায়। সেখানে কিন্তু সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ রয়ে গেছে। আমাদের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়াতে হবে। তাতে এ ধরনের শিক্ষিত যুব সমাজকে কাজে লাগানো চেষ্টা করতে হবে। তবেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগানো যেতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের দেশে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে চাকরির জন্য মূলত শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীন ও কোরিয়া থেকে আসে। কারণ আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা বাইরের এসব লোকদের বেশি পছন্দ করে। দুটি কারণে তারা বাইরের এসব ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়। প্রথমটি হলো- বাইরের লোকদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। দ্বিতীয় হলো- বাইরের লোকজন তাদের বিভিন্ন ধরনের যুব এক্সপেরিয়েন্স নিয়েই তারা আসছে। তাদের দিয়ে কাজটা অনেক সহজ হয়। কিন্তু আমাদের দেশের লোকজনকে এই লেভেলে নিলে বিভিন্ন ধরনের পলিটিক্স ঢুকে যায়। যেখানে বিভিন্ন ধরনের গ্রুপের সুবিধা কাজ করে। তাই আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরনের ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট দরকার। আমাদের আছে যেমন বিএমডিসি ও বিআইবিএম। এ ধরনের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আরও বেশি দরকার। সেখানে আমাদের ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারাই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট লেভেলে চাকরি পাবে। তখন বিদেশিদের ওপর নির্ভর করতে হবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? সিরাজুল ইসলাম: চাকরির বাজার আসলে কি ধরনের দক্ষ লোক চায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ধরনের গ্রাজুয়েট প্রডিউস করছে? এ দু’টার মধ্যে কোন সমন্বয় বা সমতা নেই। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ। এখানে আমরা আমাদের নিজস্ব আঙ্গিকে সিলেবাস তৈরি করি। জব মার্কেটে ন্যাশনাল ব্যাংক কি চায়। প্রাইম ব্যাংক কি চায়। বেসরকারি অন্য প্রতিষ্ঠান কি ধরনের দক্ষ লোক চায়। সেদিকে আমাদের নজর নেই। অপরদিকে প্রত্যেকটা প্রাইভেট ভার্সিটি তাদের সিলেবাস নিজেস্ব আঙ্গিকে তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাস তৈরি করে। তাদের সিলেবাসের বিষয়গুলো ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একটা যোগসূত্র থাকে। ফলে সেখানে ছেলে-মেয়েরা লেখা-পড়া শেষের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও না কোথাও চাকরির সুযোগ নিতে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাসের সঙ্গে ইন্ডস্ট্রির চাহিদার কোন মিল নেই। ফলে গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করার পরও তাদের বেকার থাকতে হয়। সিলেবাস চাহিদা অনুযায়ী না হওয়ার কারণে ছাত্রদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা কাজ করে। কোনটা নিয়ে পড়বে আর কোনটা নিয়ে পড়বে না। এ জন্য দেখা যায় একজন ছাত্র এসএসসি পর্যন্ত হয়তোবা বিজ্ঞান শাখায় পড়লো। এসএসসি পাসের পর দেখা যায় সে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে মানবিকের কোন সাবজেক্ট নিয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে আমাদের করণীয়টা আসলে কি হতে পারে? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের শিক্ষার একটি বড় অংশই কর্মমুখী নয়। কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে প্রয়োজন শিল্প উদ্যোক্তাদের মতামত নেওয়া। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানতে হবে তাদের কি ধরনের লোক দরকার। সিলেবাসে কি কি হলে আপনাদের সঠিক দক্ষতাসম্পন্ন লোক দিতে পারি। যেমন আমাদের মেডিকেলগুলোতে নার্সের ব্যাপক চাহিদা আছে। সে কারণে কেহ নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে বেকার থাকে না। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজারমুখী সাবজেক্ট পড়ানো হয়। বিবিএ এমবিএসহ চাকরির চাহিদা সম্পন্ন মেজর সাবজেক্টগুলো এখানে পড়ানো হয়। এ রকম আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মার্কেট ওরিয়েন্টেড সাবজেক্ট হলো শিক্ষার্থীদের বেকার থাকতে হতো না। তাহলে সমস্যা অনেকটা সমাধান হয়ে আসবে। অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিভালপমেন্ট প্রসেসে যেভাবে ইন্ডাস্ট্রিগুলো হওয়া উচিৎ। সে প্রকৃয়া খুব ধীর গতির। আমাদের কৃষিক্ষেত্রকে আরও ম্যাকানাইজ করতে হবে। তাহলে শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কৃষিতেও কাজ করার সুযোগ থাকবে। তারা কৃষিতে তারা লেবারের কাজ করবে না। তারা ম্যাশিনের কাজ করবে। ফুড প্রসেসিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে সফিস্টেকেটিড ওয়েতে কাজ করতে পারবে। এভাবেই আমাদের কৃষি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলে আমুল পরিবর্তন আনতে পারলে চাকরির সুযোগ বাড়বে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হয়েছে। এখন বাংলাদেশকে ৬ বছর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। পর্যবেক্ষণের সময় উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে গিয়ে আমাদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হতে পারে? সিরাজুল ইসলাম: উন্নয়নশীল দেশ এক দিনে হয়নি। এটা অনেক দিনের ফসল। এটাকে সামনে নিয়ে যেতে গেলে অর্থনীতির সব খাতকে চাঙ্গা করতে হবে। আমাদের শেয়ারমার্কেট, হাউজবিল্ডিং, রফতানি, বিনিয়োগ, পণ্যের উৎপাদন সবকিছু বাড়াতে হবে। কারণ  আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে। এসবগুলো নজরে রাখলে আমাদের উন্নয়নশীল হওয়াটা টেকসই ও অর্থবহ হবে।   এসএইচ/    

পিএসসি-জেএসসি ও এমসিকিউ বাদ দিতে হবে : মনজুরুল ইসলাম

কথা‌সাহিত্যিক, শিক্ষা‌বিদ  ও রাজনৈ‌তিক বি‌শ্লেষক হি‌সে‌ব সুপ‌রি‌চি‌তি অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। প্রতিথযশা এ শিক্ষাবিদ শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে আসছেন। যেগুলো জাতির জন্য দিশা হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান শিক্ষা ও প‌রীক্ষা পদ্ধ‌তি এবং কোটা পদ্ধতির সংস্কার, চাকরিতে প্রবেশের বয়সীমাসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জানতে সম্প্রতি একুশে টিভি অনলাইন মুখোমুখি হয় এ শিক্ষাবিদের। তি‌নি মনে করেন বাংলাদেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার গুণগত মানে পরিবর্তন আনতে হবে। সনদমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে উৎপাদনমুখী শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাথা থেকে পরীক্ষার বোঝা কমাতে হবে।  সেজন্য পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষার পাশাপাশি এমসিকিউ পরীক্ষাও তুলে দিতে হবে।

‘চাকরির বাজার বিবেচনায় শিক্ষায় পরির্বতন আনতে হবে’

বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনসংখ্যার বোনাসকাল) কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কোনো দেশে যদি ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কর্মক্ষম থাকে তাহলে সে দেশকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের আওতাভুক্ত করা হয়। সে হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ডেমোগ্রাফিকট ডিভিডেন্ডে প্রকাশ করছে। ইউএনডিপির তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালের সুবিধা ভোগ করছে (১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের জনসংখ্যার অধিক্য)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ গ্রহণ করে ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে জিডিপির প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিকভাবে বহু দূর এগিয়ে যাবে। আর ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডেকে যথাযথভাব কাজ লাগতে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন দরকার। এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মাদ আলী আক্কাস। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান। একুশে টিভি অনলাইন : ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট (জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল) প্রবেশ করেছে দেশ। এ সুযোগটা আমরা কতটা কাজে লাগতে পারছি বলে আপনি মনে করেন ?    অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বাংলাদেশে ২০০৭ সালে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল শুরু হলেও পুরোপুরি প্রবেশ করছে ২০১৪ সাল থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। দেশের ১০ কোটি ৬১ লাখ লোক রয়েছে কর্মক্ষম। এর মধ্যে আমাদের কর্মশক্তি শ্রমিক রয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ। উন্নত এবং উন্নয়নশীল খুব কম দেশই এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পেয়েছে। এই শ্রমশক্তিকে আমরা বাজার মুখী পড়াশোনা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলে এরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে। আমরা এই সুযোগটা পুরোপোরি কাজে লাগতে পারছি না। আমাদের এ জনসংখ্যাকে জনসম্পদ  সৃষ্টি করতে দরকার শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এ সব মানুষকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে জনসংখ্যাকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ মানুষ কখনও বেকার থাকে না। গ্রামের মানুষ অশিক্ষিত হলেও বেকার নেই কারণ তারা নিজেদের কাজে দক্ষ। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত লোক ৬০ শতাংশ বেকার। এর মূল কারণ শিক্ষার্থীদের বাজারমূখী শিক্ষা দিতে পারছি না। চাকরির বাজারে কোন বিষয় চাহিদা আছে এচিন্তা মাথায় রেখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরির্বতন করতে হবে। দেখতে হবে বাজারে কি চাকরির চাহিদা বেশি্ এবং তা পেতে কি কি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন সেসব বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের শিক্ষা বব্যস্থা বাজারমূখী করতে হবে। আমাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা চাকরির সঙ্গে কোন সর্ম্পক নেই। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বর্তমান বাজারের চাকরির কথা মাথায় রেখেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাস নির্ধারণ করতে হবে। বাজারমূখী ‍শিক্ষাব্যবস্থা না থাকার কারণে আমাদের দেশের বেশি বেতনের চাকরিগুলোতে আমেরিকা, ভারত, ভুটানের লোকেরা করছে। আমাদের শিক্ষা কৌশলগত পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষকদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ শিক্ষক অভাবের ফলে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে দক্ষ হচ্ছে না। ফলে চাকরি পেতে অনেক দুর্ভোগ পেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। একুশে টিভি অনলাইন : এসুযোগ কাজে লাগাদে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সঠিভাবে কাজে লাগতে হলে আমাদের আগে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আকার পরিবর্তন করতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের মানুষের এই বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যাকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। চাকরির বাজারে গুরুত্ব কথা মাথায় রেখেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তিতে কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারলে কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। বর্তমানের চীনে তথ্য-প্রযুক্তিতে কাজ করে ১০ কোটি মানুষ। ভারতে এক কোটি মানুষ কাজ করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের কয়েক লাখ মানুষ এ খাতে কাজ করে। এর সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যাকে আইটিতে দক্ষ করে তুলতে পারি। দিনে দিনে আইটির প্রসার ঘটছে। ফলে আর কিছুদিন পর মানুষ বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করবে না। অনলাইনে বসে সব কিছু করবে। এ কারণে তথ্য প্রযুক্তি প্রসার বাড়তে হবে। এছাড়া আমাদের বিপুল সংখ্যাক জনশক্তিকে কৃষি, সার্ভিস সেক্টর, ই-বিসনেজে কাজে লাগতে পারি। একুশে টিভি অনলাইন : বিশ্বে আর কোন কোন দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে (জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল) প্রবেশ করেছে। ওইসব দেশ কিভাবে এ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: চীন, থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে প্রবেশ করেছে। অনেকেই এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। এ সুযোগ আমরা কাজে লাগতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা দরকার। বাজারমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আর শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা কেন্দ্রিক হওয়া উচিৎ। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। যুব সমাজকে সঠিকভাবে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য দেশগুলো কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আগে ‘মাস্টারপ্ল্যান করেছে। সেই অনুযায়ী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সে অনুযায়ী  বাংলাদেশে এ বিষয়ে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাই নেই। একুশে টিভি অনলাইন : ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল) সুযোগ কাজে লাগাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো যে সব কৌশল নিয়েছে আমরা সেগুলো অনুস্মরণ করতে পারি কি না? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বিশ্ববাজারে চাকরির  ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিপুল কর্মক্ষম মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাকে বাজারমুখী করতে হবে। চাকরি বাজারে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত তাদেরকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা তাদের চাকরির বাস্তব অভিজ্ঞতা কথা বলবে। সঙ্গে সঙ্গে চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে কি কি করতে হবে তারা সেবিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে শেয়ার করবে। এর মধ্যমে দুপক্ষে মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা বৃদ্ধি পাবে। ছাত্রজীবনে রাজনীতি সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন :  দেশে প্রচুর কর্মক্ষম মানুষ। তারা কাজ পাচ্ছে না। এদের দক্ষ করে কাজে লাগাতে হলে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বিশ্বের অন্যান দেশের মতো আমরা বিপুলসংখ্যাক কর্মক্ষম মানুষকে কর্মংস্থান নিশ্চিত করতে পচ্ছি না। আমাদের দেশের মালিক শ্রেণির তেমন কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করছে না। মালিক শ্রেণির শ্রমিকদের ভালো করে প্রশিক্ষণ দিতে পাচ্ছে না। সমন্বয়ের অভাবে দক্ষ বা কোন প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়ায় আমাদের শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাচ্ছে। ফলে অন্যন্যা দেশের শ্রমিক থেকে আমাদের শ্রমিকরা বেতন কম পায়। একুশে টিভি অনলাইন : অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। কিভাবে আমরা এর সঠিক ব্যবহার করতে পারি? অধ্যাপক এম এ আক্কাস : প্রত্যেক দেশে বিভিন্ন সময় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (কর্মক্ষম বা জনসংখ্যা) সুযোগ আসে। বাংলাদেশেও ২০০৭ সালে আসলেও পুরোপরি এসেছে ২০১৪ সালে। ইতোমধ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সবার সম্মিলিতি প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব। দেশ-বিদেশের কাজের সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলতে হবে। তাদের কাজে লাগাতে না পারলে এই সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হবো। একুশে টিভি অনলাইন : কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটা প্রশ্ন চলে আসে। আমরা সঠিকভাবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে পারছি কি না? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: আমরা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে পারছি না। আমাদের শ্রমিকদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারছি না। আমরা যদি কোন শ্রমিকের গাড়ি চালক হিসেবে বিদেশে পাঠাই। যদি পাঠানোর আগে দেশে এক বছরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে সঠিক বেতন নিশ্চিত করতে পারতাম। একুশে টিভি অনলাইন: বর্তমানে বিপুলসংখ্যাক জনসংখ্যা দেশের জন্য বুঝা না সম্পদ? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: আমি কখনোই বুঝা বলবো না। কারণ আমরা যদি তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগতে পারি। তাহলে অবশ্যই সম্পদ হিসেবে পরিণত হবে। আমার মনে হয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার করা সরকারের দায়িত্ব। তেমনি কর্মসংস্থান সঠিক কাজের মাধ্যমে কাজটি ধরে রাখা আমাদের কর্তব্য। এসুযোগ যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থানের নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। একুশে টিভি অনলাইন : বর্তমানে কোন কোন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি বলে আপনি মনে করেন? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বর্তমানে  প্রযুক্তি খাতে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া পোষাক শিল্প অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। একুশে টিভি অনলাইন: আপনাকে ধন্যবাদ। অধ্যাপক এমএ আক্কাস: একুশে পরিবারকেও ধন্যবাদ। এসএইচ/

কোটার প্রজ্ঞাপনে প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত : গীতি আরা নাসরীন

প্রধানমন্ত্রী নিজে কোটা পদ্ধতির বিষয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে যে ঘোষণা দিয়েছেন সেটি আইন হয়ে গেছে। তাই কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া দরকার ছিল। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির সংস্কারে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে এভাবেই নিজের অভিমত তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার সময়ের দাবি। এর প্রতি আমারও সমর্থন আছে। তবে কোটার সংস্কারই একমাত্র সমাধান না। বরং রাষ্ট্র যেনো কাজের সুযোগ তৈরির বিষয়ে আরও মনোযোগী হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কাজের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, যে কাজের যোগ্য তাকে সেখানে প্রয়োগ করা- রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় প্রাধান্য পাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের তরুনদের বড় একটি অংশ কোটা সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার। আপনার অভিমত কী? গীতি আরা নাসরীন: আমাদের দেশে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু তরুণদের সমস্যা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। ফলে সমস্যাগুলো প্রকট হতে হতে তরুনদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। তাদের হতাশার জায়গাটা গভীর হচ্ছে। এদেশে শিক্ষিত বেকারের হার কম নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন এর ফলে কিছু সার্টিফিকেট ধারী বা ডিগ্রিধারী তৈরি হয় বছর বছর। কিন্তু দক্ষ জনশক্তি তৈরী হয় না। আমাদের দেশের চাকরির বাজার সীমিত। কিন্তু এর পরেও যে পরিমাণ কর্মদক্ষ লোকের চাহিদা আছে সে পরিমাণ কর্মদক্ষ লোক কিন্তু আমরা তৈরী করতে পারিনি। আবার এখানে সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী লোকের সংখ্যা অনেক। এখন যারা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে, তারা যদি ভেবে থাকে যে, কোটা তুলে দিলে বা কোটা সংস্কার করলে সব সমস্যা মিটে যাবে তা ভুল। কারণ, কোটা শুধু সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং আমাদের দেশে সরকারি চাকরির সংখ্যা খুব বেশি না। কথার কথা বলছি, যদি কোটা তুলে দেওয়া হয় বা এখন যেভাবে সংস্কারের কথা চলছে যদি সেভাবে সংস্কার হয় তাহলে কি বেকারত্ব মিটবে? মিটবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনি এক্ষেত্রে কি সুপারিশ করবেন? গীতি আরা নাসরীন: যারা কোটা সংস্কারের দাবি তুলেছেন বা আন্দোলন করছেন তারা হয়তো নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে অবলোকন করছেন। কিন্তু যারা রাষ্ট্রীয় বিষয় পরিচালনা করছেন তাদের দৃষ্টি কোনো কিছু এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। কোটা সংস্কারের প্রতি আমারও সমর্থন আছে। তবে কোটা একমাত্র সমাধান না। বরং রাষ্ট্র যেনো কাজের সুযোগ তৈরির বিষয়ে আরো মনোযোগী হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। কাজের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পিতভাকে দক্ষ জনশক্তি তৈরী করা, যে কাজের যোগ্য তাকে সেখানে প্রয়োগ করা- রাষ্ট্রের পরিকল্পনায় প্রাধান্য পাওয়া উচিত। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা সংস্কার আন্দোলন কি আপনি সমর্থন করছেন? গীতি আরা নাসরীন: এখানে একটা বিষয় অনেকে গুলিয়ে ফেলছেন। সেটি হচ্ছে কোটা বাতিল ও সংস্কার। কোটা বাতিলের কথা কিন্তু কোথাও আসেনি। ছাত্ররা শুরু থেকেই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। আমিও কোটা বাতিলের বিরুদ্বে। বরং কোটা সংস্কারটাই আজ সময়ের দাবি। আমাদের সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী যারা আছে তাদের সমান তালে নিয়ে আসার জন্য তাদের জীবন মান থেকে বৈষম্য দূর করার জন্যই কোটা প্রয়োজন। কিন্তু এতোদিন নির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধীনে কোটা পদ্ধতি নিয়ম মেনে চলেছে, এমনটা দাবি করা যাবে না। বরং পরিকল্পনাহীনভাবে যখন যেরকম চাওয়া হয়েছে সেরকম খুশি মতো কোটা পদ্ধতি চলেছে। কোটা প্রথায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপাদান সংযুক্ত হয়েছে। ফলে এভাবে চলতে চলতে ৫৬% কোটা আমাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসেছে। এরফলে তরুণদের যে অংশটি কোটার সুবিধা বঞ্চিত তারা সংকটে পড়ছে। তারা উপলব্ধি করছে যে তারা বৈষম্যের স্বীকার। সেই জায়গা থেকে তাদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। যার বহি:প্রকাশ ঘটছে রাজপথে। সেই বিবেচণায় আমি বলব, কোটা বাতিল নয়, সংস্কার-ই জরুরি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটার সংস্কার কীভাবে হতে পারে? গীতি আরা নাসরীন: যেই কোটাই থাকুক না কেন সেটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য থাকা উচিত। সেটা দশ বছর, বিশ বছর, পঁচিশ বছর হতে পারে। সেই নির্দিষ্ট সময় পর সেই কোটা কতটুকু কার্যকর হয়েছে বা তার কার্যকারীতা এখন কতোটুকু এসব বিবেচনায় আনা উচিত। সেই কোটা বহাল থাকবে কিনা, থাকলে কেন থাকবে, সেই কোটা কি প্রত্যাহার করা হবে নাকি বহাল থাকবে, কেন বহাল থাকবে বা কেন প্রত্যাহার হবে সব পর্যালোচনার দাবি রাখে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের সংসদে নারী সদস্যদের কোটা নিয়েও কিন্তু সংস্কার করা হয়… গীতি আরা নাসরীন: রাইট। আমিও সেটাই বলছিলাম। সংসদে যেমন নির্দিষ্ট সময় পর পর পর্যালোচনা করা হয় তেমনি চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষত জনপ্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিয়োগের বেলায় কোটা নিয়ে পর্যালোচনা হওয়া উচিত। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমরা কোটা সংস্কার পদ্ধতি নিয়ে কথা বলছিলাম? গীতি আরা নাসরীন: একই পরিবারের সব সদস্য কোটার সুবিধা পাবে এটা যেমন কাম্য নয় তেমনি কোটার আওতায় থাকা সত্ত্বেও অনেকে কোটা বঞ্চিত হচ্ছে, এটাও প্রত্যাশিত নয়। আবার অনেকে পদে পদে কোটার সুবিধা ভোগ করে থাকে। দেখা গেল একজন একটি চাকরিতে নিয়োগ নিতে গিয়ে কোটার সুবিধা পেল। কিছুদিন পর সেই চাকরি তার ভাল লাগলো না। তখন সে আবার অন্য চাকরিতে নিয়োগ পেতে গেল। সেখানেও সে কোটার সুবিধা নিচ্ছে। এভাবে সব সময় সব জায়গায় একজন লোক বারবার কোটার সুবিধা পাওয়া কোনো অবস্থায়-ই ভালো কথা নয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা সংস্কার হলে কোন কোন ক্ষেত্রে কোটা রাখা যেতে পারে? গীতি আরা নাসরীন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টী ও প্রতিবন্ধীদের কোটায় রাখার কথা বিবেচনা করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা কত পার্সেন্ট রাখা হবে তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। আমি মনে করি বিতর্কের কিছু নেই। সব মুক্তিযোদ্ধার অবস্থা এক রকম নয়। কারো কারো অবস্থা খু্বই খারাপ। দিন এনে দিন খায় এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে। তারা কোটার আওতায় আসবেন না কেন? পক্ষান্তরে এমপি, মন্ত্রী ও শিল্পপতি পর্যায়েও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তারা কেন কোটা সুবিধা নেবেন? অর্থাৎ যিনি কোটা সুবিধা নিচ্ছেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা বড় কথা নয় বরং তার বর্তমান অর্থনৈতিক- সামাজিক অবস্থা কেমন সেটাই বড় কথা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সেক্ষেত্রে কত পার্সেন্ট কোটা রাখার পক্ষে আপনি? গীতি আরা নাসরীন: আমি সবমিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫- ২০পার্সেন্ট কোটা রাখার পক্ষপাতী। তবে এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে রাখা দরকার। অনেকের মধ্যে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তা হলো, যারা কোটায় নিয়োগ পায় তারা মেধাবী নয়। এটা ভুল ধারণা। কোটায় অনেক মেধাবীও নিয়োগ পায়। আমি নিজে তা প্রত্যক্ষ করেছি। আবার কোটা পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোটা সুবিধা নেননি, এমনটাও কম নয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন কোটা বাতিল করা হবে। সেই আশ্বাসে ছাত্ররা আন্দোলন স্থগিত করলো। কিন্তু এখনো প্রজ্ঞাপন আসেনি… গীতি আরা নাসরীন: দেখুন, রাষ্ট্রীয় যেকোনো কাজেই সময় লাগে। তাছাড়া কোটা সংক্রান্ত বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের। আমাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দায় এড়াতে পারে না। সব মিলিয়ে কিছুটা সময় লাগতেই পারে। তবে আমি বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী নিজে যে বিষয়টি সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষনা দিয়ে দিয়েছেন সেটি আইন হয়ে গেছে। সরকারের প্রধান ও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সিদ্ধান্ত আইন। পাশাপাশি এটাও সত্য একটা আনুষ্ঠানিকতা সব ক্ষেত্রে দরকার। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমাদের প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিদের দরকার ছিল প্রজ্ঞাপন জারির ব্যাপারে আরও সক্রিয় হওয়া। / এআর /

বৈষম্যের দোহাই দিয়ে কোটা আন্দোলন ন্যায়বিচার পরিপন্থী:অহিদুজ্জামান

বিসিএসসহ সব ধরণের সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলনের একপর্যায়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা পদ্ধতি তুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মাস পেরোলেও কোটার সংস্কার বা বাতিলের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। আশা-নিরাশার দোলাচলে কাটছে চাকরি প্রত্যাশী লাখো তরুণের সময়। এ পরিস্থিতিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, চাকরিতের প্রবেশের বয়সসীমা, গ্রাজুয়েশনের পরও চাকরির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান, পাবলিক ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসসহ শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এম অহিদুজ্জামানের। কোটা পদ্ধতি ছাড়াও তাঁর কথায় উঠে এসেছে প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা পদ্ধতি, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা, কোচিং বাণিজ্য, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানসহ নানা বিষয়ে।  দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি নিয়ে আপনার মত কি? অহিদুজ্জামান: কোটা সংস্কার বা যেকোনো সংস্কার সময়ের ব্যবধানে হতে পারে। কোটা করা হয়েছিল সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। এটা করা হয়েছিল আমাদের বৈষম্য নিরসনের জন্য। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নামে যে বিষয়টা বলা হচ্ছে যে, বৈষম্য কমানোর জন্য কোটা বাতিল করতে হবে, এখানে একটা বিষয়ে ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে। একটা আন্দোলনে তো নানা ধরণের লোক আসে। আমার মনে এখানে অনেকেই এসেছে স্বার্থ হাসিলের জন্য। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা পদ্ধতি সংস্কারে জোর দাবি উঠেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ নিয়ে সংসদে কথা বলেছেন। কোটা সংস্কারের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? অহিদুজ্জামান: মনে রাখতে হবে আমাদের দেশটা হলো মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হওয়া দেশ। ২৩ লাখ  মানুষ, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, আপামর জনতা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বলা হয়েছে মানুষের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। বৈষম্যের বিষয়। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এ শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৫ এ মৌলিক চাহিদার কথা বলা হয়েছে। আর অনুচ্ছেদ ১৯ এ গিয়ে নারী-পুরুষ সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৮ ও ২৯ এ নারী-পুরুষ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। চাকরি থেকে শুরু করে যেকোন প্রতিষ্ঠানে সবার প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। এখানে আবার বলা হয়েছে নারী ও শিশুদের এগিয়ে আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা যাবে। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা করা যাবে। যেটি সমতার দিকটা ব্যাহত করবে না। সেই সমতার দিকটা নিশ্চিত করতেই কিন্তু কোটার বিষয়টা এসেছে। কিন্তু যে সমতা নিশ্চিতের জন্য কোটা চালু করা হলো, সে সমতা কি নিশ্চিত হয়েছে? আমাদের মোট চাকরিজীবির মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ নারী আছে। তাও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, সেবিকা এসব ক্ষেত্রে। আমরা কয়জন সচিবকে নারী হিসেবে দেখেছি? সেখানে হয়তো হাতে গোনা ৪ থেকে ৫ জন সচিব নারী আছে। এদের মধ্যে কেউ হয়তো মেধায় আসছে। কেউ নারী কোটায় আসছে। এখন তারা কি খারাপ করছে? তারা কি মেধাবী না? তারা কি অযোগ্য? কোনভাবে না। কেউ কোটায় চাকরি নিতে হলে, তাকেও তো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে মেধার পরিচয় দিতে হচ্ছে। অথচ আমাদের জনশক্তির ৫১ ভাগ নারী। আর তাদের জন্য কোটা আছে মাত্র ১০ ভাগ। সচিবালয় ছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দেখেন নারী সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু নারী তো দরকার হয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর অনেকটিতেও নারীর কোটা রয়েছে। পিছিয়ে পড়া নানা জনগোষ্ঠীর কোটা আছে। আর আমাদের এটা আছে সাংবিধানিক ও বাধ্যতামূলকভাবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ সবার দেশ। এটি মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী দেশ। আপামর জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল বলেই তাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা বরাদ্দ করা হয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নীতি হলো সামাজিক ন্যায়বিচার। ভারতে এখনও ট্রেন ও বিমানে ফাস্ট ক্লাস টিকেট দিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের। চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। সেদেশের হাসপাতালগুলোয় একটা বেড থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। বাংলাদেশে এখনও সেসব হয়নি। এটা করা উচিত। এরপর আসেন জেলা কোটা। তারা বলে ৫৬ শতাংশ কোটার দখলে। আমি জানি না তারা কোথা থেকে এটা শিখছে। আমি মনে করি ১০০ ভাগ মানুষের জন্যই ৫৬ শতাংশ কোটা। ১০০ ভাগ মানুষের সমতা নিশ্চিতের জন্যই কোটা। শতভাগ মানুষের ন্যায় বিচার নিশ্চিতের জন্য এ কোটা। সুতরাং যারা কোটার মাধ্যমে বৈষম্য হচ্ছে বলছে, তাদের এটা একটা ভুল ধারণা। কোটা সংস্কারকে যেভাবে সামনে আনা হয়েছে, আমি মনে করি সেটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এটার সঙ্গে ন্যায়বিচার যায় না। যেমন জেলা কোটা আমাদের প্রত্যেকের কোনো না কোনো জেলায় বাড়ি আছে। জেলা কোটা আনা হয়েছে শতভাগ মানুষের সমতা নিশ্চিতের জন্য। ধরেন লেখা-পড়ায় বরিশাল জেলা এগিয়ে আছে। এখন আমরা যদি শতভাগ মেধায় যাই, তবে তারাই তো বেশি পাবে। অথবা রাজনৈতিকভাবে কোনো এলাকা, যেমন ফরিদপুর বা গোপালগঞ্জ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। তারা তো একটা সুযোগ পেতে পারে। সেখানে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা আমলারা যদি বেশি থাকেন। সবাই তো নিজের এলাকার উন্নয়ন চান। এজন্য দেশের সামগ্রিক সমতাভিত্তিক উন্নয়নের স্বার্থেই এ কোটা ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেকোনো বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিন্তু পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি সামনে আনা ন্যায় বিচার। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে কথা বলেছেন। সে কারণে ছাত্ররা আন্দোলন স্থগিত রেখেছিল। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলেও এখনও সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোন প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। বিষয়টির সমাধান কোন দিকে যাচ্ছে? অহিদুজ্জামান: প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন তা তিনি হয়তো করবেন। সে প্রক্রিয়া তো শুরু হয়ে গেছে। একেবারে এখনই করতে হবে এমন ঠেকায় তো কেউ পড়ে নাই। এটা তো হুট করে করা যায়ও না। এটার তো একটি আইনী ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আছে। আর বিলম্বের কথা কোন ছাত্র বলতে পারে না। এটা বলছে গুটিকয়েক লোক, যাদের অন্য উদ্দেশ্য আছে। এটার জন্য তো কমিটি লাগবে। কমিটি এরই মধ্যে হয়েছে। তো এটার জন্য এতো অস্থির হওয়ার কি আছে? এখনও তো নতুন কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসেনি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা সংস্কারে কোন প্রশাসনিক জটিলতা দেখছেন কি না? অহিদুজ্জামান: তবে এ আন্দোলন বিশেষ নিয়োগ বন্ধের জন্য যৌক্তিক হতে পারে। তরুণদের মধ্যে এই জায়গাটিতে ক্ষোভ এসেছে বলে আমার পর্যবেক্ষণ বলে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রায় আছে যদি নিয়োগে খালি থাকে তবে খালি রাখতে হবে। এখন কোর্টের যেখানে আদেশ আছে সেখানে সরকার কি করবে? এখন ছাত্ররা কোর্টের বিষয় কোর্টে গিয়ে আপিল করতে পারতো। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটার এ আন্দোলনকে অনেকে বিশেষ মহলের ইন্ধন বলছেন। আবার অনেকে এটাকে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন হিসেবে দেখছেন। বিষয়টি আপনার কাছে কি মনে হয়? অহিদুজ্জামান: এবারের আন্দোলনে বাম-ডান নানা রঙের লোক আছে। কিছু লোক আছে যারা হয়তো যৌক্তিক জায়গা থেকেই এসেছে। মানুষ আমরা তো প্রায়ই সবাই আত্মকেন্দ্রীক। সাধারণরা মনে করে নিয়োগে ৯৯টা হয়েছে আমার হয়নি। যদি ১০০ হতো তবে আমার হতো। এখানে কতজন মানুষ আন্দোলন করেছে? কয়টা মেয়ে আন্দোলনে ছিল? যারা আন্দোলন করেছে তাদের মধ্যে কয়টা মেয়ে বিসিএস দেবে? এরা সবাই মূলত মিসগাইডেড।এভাবে যদি বলা হয় যে, তিনভাগ মানুষের জন্য ৫৬ ভাগ কোটা। আমাদের যারা জ্ঞানপাপী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, টকশোয়ার তারাই এসব কথা বলছেন। কোন হিসেবে তারা এটা বলছে আমার বুঝে আসে না। এ সংস্কারের জন্য আন্দোলন যেভাবে রূপ লাভ করেছিল, সেটা খুবই অযৌক্তিক। এর মধ্যে নানা উপসর্গ ছিল। সেটা এখন স্পষ্ট। অনেকে আবার রাজনীতি ছাড়াও আসছে। তারা না বুঝে আসছে। তাদেরকে এর জন্য দুর্ভোগও পোহাতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটার আন্দোলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা হয়েছে। একজন উপাচার্য হিসেবে বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন? অহিদুজ্জামান: এটা আন্দোলনের নামে বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এটার রাজনৈতিক একটা ব্যাপার আছে। এটা যেন একটা কালচারে পরিণত হয়েছে। আমরা সংসদে, টকশোতে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন হিংসাত্মক বিষয় দেখতে পাই। আমাদের এ ধরণের কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোটা বিধি সংস্কারের দাবি আছে। দাবি হতে পারে। কারণ না কাঁদলে মাও দুধ দেয় না। তার জন্য দাবিগুলো সেমিনারে তুলে ধরা যায়, স্মারকলিপি দেওয়া যায়, ক্লাস বর্জন করা যায়, প্রতীকি অনশন করা যায়, এমনকি রাস্তার উপর বসে পড়াও ঠিক আছে। কিন্তু এ দাবিতে আন্দোলনের নামে দাঙ্গাটা কোন পর্যায়ে যেতে পারে। এ আন্দোলন যৌক্তিকতার সঙ্গে এ সহিংসতার কোনো সম্পর্ক নেই। এ সহিংসতা কোনো দেশেই কাম্য নয়। আমি মনে করি এগুলো ভালোভাবে তদন্ত করে দেখা উচিত। কারা করেছে তাদের খুঁজে বের করা উচিত।এটা ছাত্রদের কাজ না। এর আগে ওই উপাচার্যের অফিসেও হামলা হয়েছিল।হামলাকারীরা তথাকথিত বাম-ডান নানা রঙের ছাত্র নেতা। একুশে টিভি অনলাইন : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। ওহিদুজ্জামান : আপনাকেও ধন্যবাদ। / এআর /  

কোটা বিলুপ্ত করলেও বেকারত্ব দূর হবে না : অধ্যাপক আমিনুল হক

বিপুল কর্মক্ষম জনশ‌ক্তি‌কে কা‌জে লা‌গি‌য়ে অর্থ‌নৈ‌তিকভা‌বে সমৃদ্ধশালী হওয়ার অপার সম্ভাবনার দাঁড়প্রা‌ন্তে বাংলা‌দেশ। কিন্তু এ জনসংখ্যার সুফল পাওয়ার অন্যতম শর্ত হ‌চ্ছে- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বি‌নি‌য়োগ এবং সুশাসন প্র‌তিষ্ঠা।  এর সঙ্গে রাজ‌নৈ‌তিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও জ‌ড়িত। এ চার‌টি য‌দি একসঙ্গে কাজ না হয় তাহ‌লে অতিরিক্ত জন‌গোষ্ঠী কোনো সুফল ব‌য়ে আন‌বে না। তাই ডে‌মোগ্রা‌ফিক ডি‌ভি‌ডেন্ড‌কে কা‌জে লাগা‌তে শর্তগু‌লো পূরণ করতে হবে। তেম‌নি চলমান অর্থনী‌তির গ‌তি ধ‌রে রাখার জন্য ধারাবা‌হিক রাজনৈ‌তিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। যেকোনো দে‌শে অর্থনী‌তির উন্ন‌য়নের অন্যতম পূর্বশর্ত ‘গুড গভর্নেন্স’ এবং এরসঙ্গে জ‌ড়িত রাজনী‌তিও। সম্প্র‌তি বাংলাদেশের জন্য ডে‌মোগ্রা‌ফিক ডি‌ভি‌ডেন্টের (জনসংখ্যার বোনাসকাল) সুযোগ ও সম্ভাবনা নি‌য়ে একু‌শে টে‌লি‌ভিশন অনলাই‌ন মুখমু‌খি হ‌য় ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের পপু‌লেশন সাইন্স বিভা‌গের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আমিনুল হকের। তার কথায় উঠে আসে চলমান শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার, কোটা সংস্কার ইস্যু, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা, গ্রাজুয়েশন শেষেও তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের চাকরি না পাওয়াসহ নানা বিষয়।  তিনি ব‌লেন, বর্ত‌মা‌নে বাংলা‌দে‌শে কর্মক্ষম লোক অনেক বে‌শি। প্র‌তি‌ বছর ২০ লাখ লোক কর্মক্ষম হ‌চ্ছে। স‌র্বোচ্চ ১০ লাখ লো‌কের কর্ম‌সংস্থান হচ্ছে। ১০ লাখ লো‌ক বেকার থেকেই যাচ্ছে। কোটা য‌দি উ‌ঠি‌য়ে দে‌ওয়াও হয় তবুও ১০ লাখ কর্ম‌হীন থে‌কে যা‌বে। কোটার সঙ্গে বেকার‌ত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। কোটা পদ্ধ‌টি বা‌তিল কর‌লে বেকারত্ব দূর হবে না। কোটার ইতিবাচক নেতিবাচক দুটি দিকই আছে। অনগ্রসর জন‌গোষ্ঠী‌কে এগিয়ে নি‌য়ে যাওয়ার জন্য এ পদ্ধ‌টির প্রবর্তন হ‌য়ে ছিল। এখন য‌দি জা‌তি ম‌নে ক‌রেন এখন আর এটার প্র‌য়োজন নেই তাহ‌লে, বা‌তিল করার আগে অবশ্যই আলাপ-আ‌লোচনার মাধ্য‌মে একটা যৌক্তিক মাত্রায় গি‌য়ে পৌঁছাতে হ‌বে। তারপর প‌রিবর্তন করা যে‌তে পা‌রে। তার আগে নয়। সাক্ষাৎকার‌ নি‌য়ে‌ছেন মোহাম্মদ রু‌বেল। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো- একু‌শে টিভি অনলাইন: বাংলা‌দে‌শে এখন জনশ‌ক্তির বোনাস কাল চল‌ছে। কর্মক্ষম মানুষ এখন বে‌শি। এ জনশ‌ক্তি‌কে কিভা‌বে দক্ষ ক‌রে ‌দে‌শে এবং বি‌দে‌শের শ্রমবাজা‌রে  কা‌জে লাগা‌নো যায়?  অধ্যাপক আমিনুল হক: বাংলা‌দে‌শে এখন কর্মক্ষম জনগো‌ষ্ঠী বেশি। এ কর্মক্ষম জন‌গোষ্ঠীকে দক্ষ ক‌রে  তুলে দে‌শের কা‌জে লাগা‌তে হ‌বে। এ গোষ্ঠীকে চার‌ভা‌বে কা‌জে লাগা‌নো যে‌তে পা‌রে। যেমন- সরকারিভাবে, বেসরকারিভাবে ও নিজে ব্য‌ক্তিভা‌বে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্য‌মে এবং ব‌র্হিবি‌শ্বে দক্ষ জনশ‌ক্তি পা‌ঠি‌য়ে।   জনশক্তি নি‌য়ে, সরকা‌রে কা‌ছে সরকারি হিসাবটা খুবই সু‌র্নি‌দিষ্ট। কোন কোন সেক্ট‌রে, ‌কোন কোন ডিপার্ট‌মে‌ন্টে কতজন লোক লাগ‌বে, কত বছ‌রে সরকার তা নি‌তে পা‌রে সে হি‌সাবটা নির্ধা‌রিত। সেই হি‌সেবটা খুব বে‌শি নয় বছ‌রে মাত্র তিন থে‌কে চার লাখ।  ‌দ্বিতীয় খাত‌টি হ‌চ্ছে প্রাইভেট সেক্টর। এ সেক্ট‌রে দে‌শে অনেক ব্যাংক বীমা, ইন্স্যুরেন্সসহ বহু প্র‌তিষ্ঠান তৈরি  হ‌য়ে‌ছে এবং হ‌চ্ছে। ফ‌লে সেখা‌নে ক‌র্মের সু‌যোগ সৃ‌ষ্টি হ‌চ্ছে। জনশ‌ক্তির একটা অংশ এ সেক্টরগু‌লো‌তে যা‌চ্ছে।  তৃতীয়টি হ‌চ্ছে, নিজ উদ্যোগে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্য‌মে এ কর্মক্ষম জনশক্তি‌কে কা‌জে লাগা‌নো। অনেকে তা কর‌ছে। নি‌জ উদ্যোগে মৎস্য প্রকল্প তৈরি ক‌রছে ,কৃ‌ষি প্রকল্প তৈরি ক‌রছে  এবং ছোট ছোট দোকান ক‌রে নি‌জে যেমন স্বাভলম্বি হ‌চ্ছে, আবার এসব উদ্যোগের ফলে অনে‌কের জন্য কর্মসংস্থা‌নের সৃ‌ষ্টি হ‌য়ে‌ছে।  চতুর্থ বিষয়‌টি হ‌চ্ছে,  বিশ্ববাজা‌রে  এই জনশ‌ক্তি‌কে ছ‌ড়ি‌য়ে দেওয়া।‌ কিন্তু বর্তমা‌নে যে জনশ‌ক্তি ‌বি‌দে‌শে যা‌চ্ছে,‌ সেখানে অদক্ষ জশ‌ক্তির মাত্রা খুবই বে‌শি। অপর‌দি‌কে শি‌ক্ষিত বা স্কিল জন‌গো‌ষ্ঠী যেটা যা‌চ্ছে। সেটা ছাত্ররা যা‌চ্ছে বি‌ভিন্ন ইউ‌নির্ভাসি‌টি থে‌কে স্কলারশিপ নি‌য়ে পড়‌তে যা‌চ্ছে অথবা নিজ খর‌চে যা‌চ্ছে। তারা পড়া‌শোনা শেষ ক‌রে বিশ্ব বাজা‌রে মেধা‌ভি‌ত্তিক পর্যা‌য়ে কাজ কর‌ছে। মূল‌ বিষয়‌টি হ‌চ্ছে বর্তমা‌নে কর্মক্ষম এ বিপুল প‌রিমাণ জনগো‌ষ্ঠীকে এ চার‌টি খাতে কাজে লাগা‌তে হ‌বে। সে‌ক্ষে‌ত্রে মোট জন‌গো‌ষ্ঠী কি প‌রিমাণ আ‌ছে, তা বের কর‌তে হ‌বে। তারপর এ চার‌টি খাতে কি প‌রিমাণ জনশ‌ক্তিকে কা‌জে লাগা‌নো যে‌তে পা‌রে। এখা‌নে আরও দু‌টি বিষ‌য়ের ম‌ধ্যে এক‌টি হ‌চ্ছে,‌ দে‌শে কতজন লাগ‌বে। আরেকটি হ‌চ্ছে বি‌দে‌শে কতজন যে‌তে পার‌বে। এ দু‌টি জি‌নিস সু‌র্নি‌দিষ্ট কর‌তে হ‌বে। এভা‌বে কর‌তে পার‌লে দেখা যা‌বে, প্র‌তিবছর চাকরির বাজারে ১৫ থে‌কে ৬৪ বছর বয়সী ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।   একু‌শে‌ টি‌ভি অনলাইন: বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের স‌র্বোচ্চ ডি‌গ্রি অর্জ‌নের পরও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী চাকরি পা‌চ্ছে না কেন? ‌বেকার‌রো‌ধে এক‌টি  রা‌ষ্ট্রে কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা ও পদ্ধ‌তি দরকার? অধ্যাপক আ‌মিনুল হক: এটা সুস্পষ্ট ক‌রে জা‌তি‌কে বল‌তে হবে যে, প্র‌তিবছর ২০ লাখ লোক লেভার ফোর্সে অর্থাৎ কর্মক্ষম লোক প্র‌বেশ কর‌ছে,  তা‌দের সবাই য‌দি এম এ পাশ কেন, পিএইচ‌ডি ডি‌গ্রি অর্জন ক‌রেও আসে তবুও তা‌দের  যোগ্যতা অনুযায়ী এক‌টি দেশ সবাইকে  চাকরি দি‌তে পার‌বে না। স‌রকর মাত্র তিন থে‌কে চার লাখ লোক‌কে চাকরি দি‌তে পা‌রে। আর বা‌কিরা বেসরকারি খাতে, আবার অনেকে বা‌হি‌রে চ‌লে যায়। সব মি‌লি‌য়ে ১০ লাখ লোক ক‌র্মের ম‌ধ্যে আছে। আর বা‌কি ১০ লাখ পু‌রোপু‌রি বেকার। এদের কোনো উপার্জন নাই। সুতরাং বিশ্ব‌বিদ্যালয়ের শিক্ষা মা‌নে এই  নয় যে সবাই‌কে চাকরি দেওয়া যা‌বে। সেই যায়গা থে‌কে রাষ্ট্র এবং প‌রিবার‌কে বের হ‌য়ে আস‌তে হ‌বে। এবং উচ্চ শিক্ষায় আসার আগে শিক্ষার্থী‌কে ভাব‌তে হবে এমএ পাশ করা মা‌নেই চাকরি নয়। রা‌ষ্ট্রের প‌ক্ষে, ব্য‌ক্তির পক্ষে সব শিক্ষার্থী‌কে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। এটা বাস্তব সম্মত। আমা‌দের বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের শিক্ষার্থী‌দের ক্লা‌শে তাই ব‌লি। উচ্চ শিক্ষা নি‌তে আস‌বে জ্ঞান অর্জ‌নের জন্য। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য। শিক্ষা অর্জ‌নের জন্য। আর বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে আস‌তে হবে নিজ দায়ি‌ত্বে। চাকরির জন্য রাষ্ট্র‌কে চাপ দেওয়া যা‌বে না। রা‌ষ্ট্রের প‌ক্ষে ব্য‌ক্তির প‌ক্ষে সব শিক্ষার্থীকে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। এই বাস্তব অবস্থা‌টি সুস্পষ্ট ক‌রে ব‌লে দি‌তে শিক্ষার্থী‌কে এবং পরিবার‌কে। একু‌শে টি‌ভি অনলাইন: চলমান অর্থনী‌তির চাকার গ‌তি ধ‌রে রাখার জন্য ধারাবা‌হিক রাজনৈ‌তিক স্থীতিশীলতা বজায় রাখা কটতা গুরুত্বপূর্ণ? বর্তমান ধারাবা‌হিক স্থিতিশীলতা ধ‌রে না রাখ‌তে পার‌লে অর্থনী‌তির চাকা কি থম‌কে দাড়া‌বে? অধ্যাপক আমিনুল হক: শুধু রাজ‌নৈ‌তিক বিষ‌য়ে নয়, যে কোন দে‌শে, অর্থনী‌তির উন্ন‌য়নের অন্যতম পূর্বশর্ত গুড গভর্নেন্স অর্থাৎ সুশাসন প্র‌তিষ্ঠার বিষয়‌টি। তেম‌নি রাজনৈ‌তিক স্থি‌তিশীলতা খুবই জরুরি। কেন জরুরি? কারণ যখন রাজ‌নৈ‌তিক  দলগু‌লো ক্ষমতায় থাকে, তখন দেশ উন্নয়‌নের জন্য একজন রাষ্ট্রনায়ক অনেকগুলো পরিকল্পনা নি‌য়ে থা‌কে। তা বাস্তবায়‌নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ ক‌রে থা‌কেন। এগু‌লো দ্রুত প‌রিবর্তন হ‌য়ে যাওয়াটা যেমন খারাপ। আবার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় য‌দি প্র‌তিনিয়ত দে‌শের আন্দোলন  এবং কোন্দল ঠেকা‌তে রাষ্ট্রনায়ককে  ব্যস্ত থাক‌তে হয়। ফ‌লে তার প্লানগু‌লো বাস্তবায়ন কর‌তে পা‌রে না। উন্নয়‌নের গ‌তিও ত্বরা‌ন্বিত হয় না। দেশও পি‌ছি‌য়ে যে‌তে থা‌কে। তাই অর্থনৈ‌তিক উন্ন‌য়ন এবং অর্থনৈ‌তিক অর্জন ধ‌রে রাখার অন্যতম অপ‌রিহার্য উপাদান হ‌চ্ছে ধারাবা‌হিকভা‌বে রাজ‌নৈ‌তিক স্থি‌তিশীলতা বজায় রাখা। রাজ‌নৈ‌তিক স্থি‌তিশীলতা বজায় রাখ‌তে না পার‌লে,  প্লান বাস্তবায়ন করা যা‌য় না। দেশেরও উন্নয়ন হয় না। ফ‌লে সা‌র্বিক সুফল জনগণকে দেওয়াও যা‌বে না। একুশে‌ টি‌ভি অনলাই: তাহ‌লে‌ রাজনৈতি‌ক স্থি‌তিশীলতা বজায় রাখা জরুরি? অধ্যাপক আমিনুল হক:  অবশ্যই, রা‌ষ্ট্রের প‌রিকল্পনা অনুসা‌রে প্লান বাস্তবায়‌নের মাধ্য‌মে, জনগণ‌কে সুফল দি‌তে হ‌লে ধারাবা‌হিক রাজ‌নৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। একুশে‌ টি‌ভি অনলাই: বাংলা‌দেশ ডে‌মোগ্রা‌ফিক ডি‌ভি‌ডেন্ডে অবস্থা‌নের সময় অনেকটা পে‌রি‌য়ে‌ এ‌সে‌ছে। ‌কিন্তু এখনও এর সুফল‌টি ভোগ কর‌তে পার‌ছে না কেন? এর সীমাবদ্ধতা কোথায়? এ সু‌যোগ কা‌জে লাগা‌তে কি ধর‌ণের প‌রিকল্পনা দরকার? অধ্যাপক আমিনুল হক: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বি‌নি‌য়োগ এবং সুশাসন প্র‌তিষ্ঠা এর সঙ্গে রাজ‌নৈ‌তিক স্থিতিশীলতার বিষয় জ‌ড়িত। এ চার‌টি য‌দি একসঙ্গে কাজ না হয়। তাহ‌লে অতিরিক্ত জন‌গোষ্ঠী কোন সুফল ব‌য়ে আন‌বে না। এ নি‌য়ে রাজনী‌তি‌বিদ এবং রাজ‌নৈ‌তিক বি‌শ্লেষকরা ভা‌লো বল‌তে পার‌বে। ত‌বে আমরা যে ধারাবা‌হিকতা দেখ‌ছি, সেই ধারাবা‌হিকতায় সুশাসন এবং জবাব‌দি‌হিতা একটা বড় বিষয়। এটা যেমন যে কোন রাজ‌নৈ‌তিক দলগু‌লোর ম‌ধ্যে থাকা দরকার তেম‌নি সরকা‌রে প্র‌ত্যেক‌টি সেক্ট‌রের মধ্যে দরকার। একইভা‌বে প্রাই‌ভেট সেক্টরগু‌লোতেও থাকা দরকার। এ বিষয়গু‌লো প্র‌তিষ্ঠার জন্য সরকার চেষ্টা কর‌ছে। যেমন আমরা শিক্ষা খা‌তের বিষ‌য়ে য‌দি ব‌লি, একটা সময় ছিল কোন স্কু‌লে কি হ‌চ্ছে তা বুঝা যেত না। এখন ডিজিটা‌ল যু‌গে তথ্যপ্রযু‌ক্তির মাধ্য‌মে  ডি‌জি ইচ্ছে কর‌লে দেখ‌তে পা‌চ্ছেন কোন স্বু‌লে কতজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উপ‌স্থিত আছেন এবং শিক্ষা প্র‌তিষ্ঠানগু‌লোর সা‌র্বিক অবস্থান কি তা জান‌তে পারছেন। সর্বত্রই ম‌নিট‌রিং এর মাধ্য‌মে জবাবদি‌হিতার সুযোগ তৈরি হ‌য়ে‌ছে। এসব অর্জন আবার এসবই  সীমাবদ্ধতা।  দ্বিতীয়ত, অর্থ উপার্জ‌নের সঙ্গে দক্ষ জন‌গোষ্ঠী এক‌টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দক্ষ জন‌গোষ্ঠীর না হ‌লে উৎপাদন এবং অর্থ উপার্জন আশা করা যায় না। কারণ একজন ব্য‌ক্তি দক্ষ না থাকার ফ‌লে সে কর্মক্ষমতা হাড়া‌চ্ছে। ফ‌লে সে নি‌জেও টাকা উপার্জন কর‌তে পার‌ছে না, প‌রিবারকে সাহায্য কর‌তে পার‌ছে না, সমাজ ও দেশকে কিছু দি‌তে পার‌ছে না। বরং তার অসুস্থতার জন্য তার পেছ‌নে অর্থ খরচ হচ্ছে। তৃতীয় এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় হ‌চ্ছে অর্থনী‌তি‌তে বি‌নি‌য়োগ। এটা এক‌ দি‌নে সম্ভব নয়। এ নি‌য়ে আস্তে আস্তে আমরা অগ্রসর হ‌চ্ছি। একজন কর্মক্ষম মানুষ যা‌তে সময় মত সে উপার্জন কর‌তে পা‌রে, সীমাবদ্ধতার ম‌ধ্যে থে‌কে চেষ্টা ক‌রে যে‌তে হবে। তা করছেও স‌কার। চতুর্থ, ডে‌মোগ্রা‌ফিক ডি‌ভি‌ডেন্ডের সুফল ভোগ কর‌তে হ‌লে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন ক‌রে। সাধারণত শিক্ষা বল‌তে বিএ, এমএ পাশ করা‌কে বুঝায়। কিন্তু এখা‌নে যে বিষয়‌টি তা হ‌চ্ছে, সমা‌জে সেবা প্রদান করার মত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অর্থাৎ কা‌রিগ‌রি ভি‌ত্তিক শিক্ষা। বর্তমা‌নে যেসব শিক্ষার্থী ‌বিভিন্ন বিশ্ব‌বিদ্যালয় থে‌কে পাশ করে সা‌র্টি‌ফি‌কেট নি‌য়ে বের হ‌চ্ছে। এরপর আমরা যখন তাদেরকে চাকরি দিতে চাচ্ছি কিন্তু পারছি না। কারণ তাদের একজ‌নেরও সমা‌জে সেবা প্রধান করার মত দক্ষতা নাই। অর্থাৎ সেবা ভি‌ত্তিক কারিগরি শিক্ষার অভাব। তা‌দের শুধু সা‌র্টি‌ফি‌কেট আছে। সুতরাং ওই শিক্ষাটা দি‌তে হ‌বে। আর যা‌দের‌কে এখন পর্যন্ত প্রা‌তিষ্ঠা‌নিক শিক্ষা দেওয়া হয় নাই তা‌দের‌কে কা‌রিগরি শিক্ষা দি‌তে হ‌বে। সীমাবদ্ধতার ম‌ধ্যে থে‌কেও তা দেওয়ার চেষ্টা করা হ‌চ্ছে।  একু‌শে ‌টি‌ভি অনলাইন: আরবান অ্যান্ড রুরাল এর আওতায় এ জনশ‌ক্তি‌কে কিভা‌বে কা‌জে লাগা‌নো যায়? অধ্যাপক আমিনুল হক: এ বিষ‌য়ে যেটা বল‌তে চাই তা হ‌লো চাকরি নয়, এবার আমরা বাংলা‌দেশটা‌কে সেবা দেওয়ার চিন্তা ক‌রি। আমরা যদি আরবান অ্যান্ড রুরাল এর  আওতায় এ কর্ম‌ক্ষম গো‌ষ্ঠীকে ক্লি‌ন করার কা‌জে যুক্ত করে বাংলা‌দেশ‌কেটাকে ক্লি‌নিং করার ব্যবস্থাটা য‌দি করা যায়। তাহ‌লে হাজার হাজার কো‌টি টাকার স্বাস্থ্য খরচ ক‌মে যা‌বে। ‌কিন্তু প্রশ্ন হ‌চ্ছে আমরা কেউ কি ক্লি‌নিং এর কাজটা কর‌ছি? কিন্তু বি‌দেশের দি‌কে য‌দি তাকাই তাহ‌লে কি দেখ‌তে পাই, তারা কিন্তু ক্লি‌নিং‌য়ের কাজটা কর‌ছে। সেটা  নি‌জের দি‌য়ে হোক, আর অন্য লোক দি‌য়ে হোক। যেখা‌নে যেটা করার সেটা কর‌ছে,‌ যেখা‌নে যে রাখা দরকার সেটা রে‌খে‌ছে। আমরা য‌দি আমা‌দের জন‌গোষ্ঠী‌কে ওই ধর‌নের সব জায়গায় রাখ‌তে পা‌রি, সাজা‌নো জায়গায় রাখ‌তে পা‌রি, তাহ‌লে স্বাস্থ্য ব‌লেন এবং প‌রি‌বেশ গত যে ক্ষ‌তিগুলো হ‌চ্ছে তা কম‌বে। জি‌ডি‌পির একটা বড় অংশ বেচে যাবে। এভাবেই বি‌ভিন্ন  যায়গায় এ জন‌গো‌ষ্ঠেী‌কে কা‌জে লাগা‌নো যেতে পারে। অতি‌রিক্ত জন‌গো‌ষ্ঠীর সুফলটা ভোগ করা যা‌বে। একু‌শে‌ টি‌ভি অনলাইন: এ জনশ‌ক্তি‌কে দে‌শে এবং বি‌দে‌শের শ্রমবাজা‌রে কা‌রিগরি শিক্ষা কি ভূ‌মিকা রাখ‌তে পা‌রে?  অধ্যাপক আমিনুল হক: দে‌শে বি‌দে‌শে শ্রমবাজা‌রে কা‌রিগ‌রি শিক্ষার গুরুত্ব র‌য়ে‌ছে। কা‌রিগ‌রির আবার অনেকগু‌লো খাত র‌য়ে‌ছে। সরকারি খা‌তে কতজন কা‌রিগ‌রি লোকের প্রয়োজন, একইভা‌বে প্রাই‌ভেট সেক্ট‌রে কতজন প্র‌য়োজন । যেমন এক‌টি বি‌ল্ডিং তৈরির কা‌রিগরি ক্ষে‌ত্রে  কতগু‌লো লোক জ‌ড়িত আছে। ইঞ্জিনিয়ার থে‌কে শুরু ক‌রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারসহ ৩০ থে‌কে ৩৫ জন কা‌রিগরী লো‌কের প্র‌য়োজন হয়। শুধু একটা বি‌ল্ডিং তৈরির ক্ষে‌ত্রেই এতগু‌লো লো‌কের প্রয়োজন হয়। শুধু তাই নয় স্বাস্থ্য খাত থে‌কে শুরু ক‌রে গার্মেন্ট‌স এমন‌কি রাস্তায় পর্যন্ত  কা‌রিগরি লোক লা‌গে। কিন্তু বাংলা‌দে‌শে সমস্যা হ‌চ্ছে এক‌টি স্কুল ও এক‌টি ক‌লেজ তৈরি কর‌তে কতজন লোক লাগবে, এক‌টি বি‌ল্ডিং তৈরি কর‌তে কতজন লোক লাগবে, এক‌টি হাউজ মেইন‌টে‌ন্সের জন্য কতজন লোক লাগ‌বে। বাংলা‌দে‌শে এই ধর‌নের বি‌ভিন্ন সেবাখাতগু‌লো‌কে এখনও চি‌হ্নিত করা হয়‌নি। ওই কা‌রিগরি  কাজগু‌লো করার জন্য বাংলা‌দে‌শে কতজন কারিগরি লো‌ক আছে। তা হি‌সেব ক‌রে বের কর‌তে হ‌বে। তারপর বলা যা‌বে কতজন কারিগরি লোক লাগ‌বে। যেমন বাংলা‌দে‌শে চা‌রে কো‌টি হাউজ হোল্ড আছে। য‌দি  ৮০ শতাংশ বাসায় টি‌ভি থাকে। তাহ‌লে তিন কো‌টি ২০ লাখ টি‌ভি আছে। এর ম‌ধ্যে য‌দি ১০ শতাংশ টি‌ভি য‌দি মেরাম‌তে থা‌কে। তাহ‌লে প্র‌তি‌দিন ৩২ লাখ টি‌ভি মেরাম‌ত করা দরকার। য‌দি ৫ শতাংশ হয় তাহ‌লে প্র‌তি‌দিন য‌দি  ১৬ লাখ টি‌ভি প্র‌তি‌দিন মেরাম‌তের দরকার হয়। তাহ‌লে  একজন ব্য‌ক্তি যদি প্র‌তি‌দিন ২০টি টি‌ভি মেরামত ক‌রে। এর হি‌সেব ক‌রে বলা যায় এক্ষেত্রে কত লাখ কা‌রিগরি লোক লাগ‌বে। এইভা‌বে খাত চি‌হ্নিত ক‌রে হি‌সেব করে বের কর‌তে হ‌বে কোনখা‌তে কতজন লোক লাগ‌বে‌। সরকার‌কেই ব‌লতে ‌হ‌বে কা‌রিগরির এই খাতগু‌লো‌তে এত লাখ লোক লাগ‌বে। সে‌ক্ষেত্রে কা‌রিগরি শিক্ষায় শিক্ষা থাক‌লে তা সার্ভাইব করা যা‌বে।  ভে‌ঙ্গে  ভে‌ঙ্গে য‌দি বলা যায়, আগামী‌তে বাংলা‌দে‌শে ২০২০ সালে, ২০২৫ সা‌লে এবং ২০৩০ সাল এবং ২০৪০পর্যন্ত কোন কোন সেবা খা‌তে  কতজন লোক লাগ‌বে। তাহ‌লেই  জনশ‌ক্তিকে দক্ষ ক‌রে গ‌ড়ে তু‌লে কা‌জে লাগা‌নো যা‌বে। এ বিষ‌য়ে আমরা বি‌বিএসকে ব‌লে‌ছি, প্লা‌নিং ক‌মিশন‌কেও ব‌লে‌ছি। আশা ক‌রি তারা এ কাজগু‌লো কর‌বেন।   আরেক‌টি ‌বিষয় হ‌চ্ছে, বর্তমান ডে‌মোগ্রা‌ফি‌ক ডিভি‌ডে‌ন্ডের সুফল পে‌তে হ‌লে কাগ‌জে লি‌খিত নি‌য়োগপত্র ভি‌ত্তিক যে চাকরি তা ভু‌লে যে‌তে হ‌বে। অর্থাৎ সমা‌জে সেবা দেওয়ার ব্য‌ক্তির মধ্যে থাক‌তে হ‌বে, ব্য‌ক্তি সেই সেবার মাধ্য‌মে উপার্জনও কর‌বে। যেমন একজন ব্য‌ক্তি য‌দি ফ্রিজ মেরামত ক‌রে প্র‌তি ফ্রি‌জে ২০০ টাকা নেন, মা‌সে ২০টি ফ্রিজ মেরাম‌তের বি‌নিম‌য়ে তার ১০ হাজার টাকা উপার্জন। এভা‌বেউ কর্ম‌ক্ষেত্রে লে‌গে থাক‌তে হ‌বে। ওই গ্রেডভি‌ত্তিক চাকরির কথা ভু‌লে যে‌তে হ‌বে। কারণ  বাংলা‌দে‌শে যে প‌রিমাণ কর্মক্ষম জন‌গোষ্ঠী আছে পৃথিবীর কোন দে‌শের পক্ষেই এত লো‌কের জন্য অফিসে চেয়ার-‌টে‌বি‌ল দেওয়া সম্ভব না। তাই ব্য‌ক্তি‌কে সেবাখা‌তের মাধ্যমে উপার্জ‌নের বিষয়‌টি ভা‌বতে হ‌বে।   একু‌শে‌ টি‌ভি অনলাইন: কর্মক্ষম শ‌ক্তি‌কে কা‌জে লা‌গি‌য়ে অর্থ‌নৈতিকভা‌বে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠ‌নে বর্তমান শিক্ষা পদ্ধ‌টিতে কি ধর‌নের প‌রিবতর্ন প্রয়োজন?  অধ্যাপক আমিনুল হক:  এক্ষে‌ত্রে ২০২০ সাল‌ ২০২৫ সাল ২০৩০ পর্যন্ত বাংলাদে‌শের সেবাখাতগু‌লো কি ‌কি তা চি‌হ্নিত কর‌তে হ‌বে। অর্থাৎ  নির্ধারণ ক‌রে য‌দি বলা যায় ২০২৫ সা‌লে রি‌ফ্রিজারেটর থাক‌বে এক কো‌টি। এই এক কো‌টি রিফ্রিজারেটর মেরামত করতে এক লাখ লোকবল দরকার । এইভা‌বে সেবাখাতগু‌লো‌কে য‌দি চি‌হ্নিত ক‌রে বলা যায়। তাহ‌লে শিক্ষা খাত‌কে বলা যা‌বে এই ধরণের কারিগরী শিক্ষায় শি‌ক্ষিত লোক দরকার। যখনই নীট বলা যা‌বে, তখন স্বাভাবিকভাবে শিক্ষা কা‌রিকুলাম তৈরি হ‌য়ে যা‌বে।  অর্থাৎ শিক্ষা খাতকে উৎপাদন মু‌খী কর‌তে চাই। তাই  উৎপাদনের ক্ষেত্রগু‌লি আগেই  সৃষ্টি করা যায়, তাহ‌লে মানুষ স্বাভাবিকভাবে ওই দি‌কে চ‌লে যা‌বে। আরেকটি বিষয় হ‌চ্ছে সরকার‌কে নি‌র্দিষ্ট ক‌রে সেবাখাতগু‌লোর বিষ‌য়ে বলে দি‌তে হ‌বে। সে‌ক্ষে‌ত্রে সরকার চেষ্টা কর‌বে দক্ষ লোকবল তৈরির জন্য নি‌জে প্র‌তিষ্ঠান  করার। অথবা প্রাই‌ভেট সেক্টর‌কে নি‌র্দিষ্ট ক‌রে বল‌তে পা‌রে, আমা‌কে বছরে পাঁচ লাখ ইলেকট্রেশিয়ান তৈরি ক‌রে দি‌তে। এতে কত টাকা বি‌নি‌য়োগ কর‌তে হ‌বে? অর্থাৎ কর্মক্ষম জন‌গোষ্ঠী‌কে কর্মক্ষেত্র ক‌রে তুল‌তে হ‌লে সেবাখাতগু‌লো‌কে চি‌হ্নিত কর‌তে হ‌বে। আ‌র এভা‌বেই কর্মমূ‌খী শিক্ষার্থী‌দের জন্য কর্মমূখী কা‌রিকুলাম তৈরি কর‌তে হ‌বে।  একুশে‌ টিভি অনলাইন:‌ দক্ষ জনশ‌ক্তি গ‌ড়ে তোল‌তে শিক্ষাখা‌তে কেমন বি‌নি‌য়োগ প্র‌য়োজন? অধ্যাপক আমিনুল হক: বর্তমা‌নে উচ্চ শিক্ষার জন্য, উচ্চ মাধ্য‌মি‌কের জন্য, হাই স্কু‌লের জন্য এবং গবেষক তৈরির জন্য যেভা‌বে বি‌নি‌য়োগ করা হয়, এই অবস্থা থে‌কে বের হ‌য়ে আসতে হ‌বে আমা‌দের। অর্থাৎ শিক্ষাখা‌তে বি‌নি‌য়োগ করার আগে সেবাখাতগু‌লো‌কে চি‌হ্নিত কর‌তে হ‌বে। কোন খা‌তে কতজন লোক লাগ‌বে তার ওপর ভি‌ত্তি ক‌রে দক্ষজনশ‌ক্তি  তৈরির জন্য বি‌নি‌য়োগ‌ কর‌তে হ‌বে। যেমন- উচ্চ দক্ষতা সম্পন্ন লোক তৈরি কর‌তে ট্রে‌নিং এর জন্য বি‌দে‌শে পাঠ‌তে হ‌বে। এক্ষেত্রে কতজনকে পাঠা‌নো হ‌বে, ওই হিসাবটা ক‌রে বি‌নি‌য়োগ কর‌তে হ‌বে। একইভা‌বে কা‌রিগ‌রি শিক্ষায়ও বি‌নি‌য়োগের পূ‌র্বে ভাব‌তে হ‌বে, টেক‌নিক্যাল এবং ভো‌কেশনাল কো‌র্সের মেয়াদ কত‌দি‌নের হ‌বে। অর্থাৎ কাউকে য‌দি টি‌ভি মেকা‌নিক্স হি‌সে‌বে গ‌ড়ে তোলতে হয়, সেখা‌নে বি‌নি‌য়োগ কর‌তে হ‌বে কো‌র্সের মেয়া‌দ কত দি‌নের, তার ওপর নির্ভর ক‌রে। আবার আরেকটি বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র য‌দি ম‌নে ক‌রে তার প‌লিসি মেকার এবং দক্ষ গ‌বেষক দরকার। তাহ‌লে আগে নির্ধারণ কর‌তে হ‌বে কতজন লোক দরকার। তা‌দের তৈরির জন্য ট্রে‌নিংয়ের ব্যবস্থা দে‌শেও করা যে‌তে পা‌রে আবার দে‌শের বা‌হিরেও করা যে‌তে পা‌রে। য‌দি দে‌শে করা‌নো হয় তাহ‌লে  ভাব‌তে হ‌বে কতজন শিক্ষার্থীর জন্য কতজন শিক্ষক লাগবে, কোর্স কা‌রিকুলাম এবং ‌কো‌র্সের মেয়াদ কত‌দিনের হ‌বে, য‌দি বা‌হি‌রে পাঠা‌নো হয়, তাহ‌লেও চিন্তা কর‌তে হ‌বে কতজন‌কে পাঠা‌নো হবে ওই হিসাবটা ক‌রে শিক্ষাখা‌তে বিনি‌য়োগ কর‌তে হ‌বে। এভাবেই  সেবা খাতগু‌লে চি‌হ্নিত করে, কি প‌রিমাণ দক্ষ‌লোক লাগ‌বে তার ওপর ভি‌ত্তি ক‌রে দক্ষ জনশক্তি গ‌ড়ে তুল‌তে শিক্ষাখা‌তে বি‌নি‌য়োগ করা যা‌বে। একটা দেশ যেহেতু জা‌নে তার কতজন লোক লাগ‌বে। সুতরাং সেবাখাতগু‌লো চি‌হ্নিত কর‌তে পার‌লে কোর্স কা‌রিকুলাম এবং কতজন শিক্ষ‌কের ওপর কি প‌রিমাণ খরচ হ‌বে তা নির্ধারণ করা যা‌বে। একু‌শে‌ টি‌ভি অনলাইন: চলমান কোটা পদ্ধ‌তি বা‌তিল করলেই কি এই বেকার সমস্য সমাধান হ‌য়ে যা‌বে? কোটা ব্যবস্থা পদ্ধতি কেমন হওয়া উ‌চিৎ ব‌লে আপ‌নি ম‌নে ক‌রেন? অধ্যাপক আমিনুল হক: বর্তা‌মা‌নে বাংলা‌দে‌শে কর্মক্ষম লোক অনেক বে‌শি। প্র‌তি ‌নিয়ত ২০ লাখ লোক কর্মক্ষম হ‌চ্ছে। স‌র্বোচ্চ ১০ লাখ লো‌কে কর্ম‌ ক্ষে‌ত্রে যেতে পার‌ছে।  তারপরও ১০ লাখ লো‌কের পার্থক্যটা থে‌কেই যায়। কোটা য‌দি উঠিয়ে দে‌ওয়াও হয়। তবুও ১০ লাখ লো‌কের চাকরি  দেওয়া সম্ভব হবে না। কোটার সঙ্গে বেকার‌ত্বের কোনো সম্পর্ক নাই। আন্দোলনকারীরা হয়‌তো ভাব‌ছে বর্তমান কোটা পদ্ধ‌তির কার‌ণে চাকরিতে তারা বাধাগ্রস্ত হ‌চ্ছে। কোটা না থাক‌লে বাধাগ্রস্ত হতো না তা‌দের এই আক্ষেপটা আছে। তারা পরীক্ষার মাধ্য‌মে প্র‌তি‌যোগীতায় যে‌তে চা‌চ্ছে। মেধার প্রাতিযোগীতায় যে‌য়ে য‌দি তারা না টি‌কে বেকারও থা‌কে, তাহ‌লে হয়‌তো তা‌দের আক্ষেপ থাক‌বে না এটা ধারণা থে‌কে বল‌ছি। কিন্তু বাস্তবতা হ‌লো  কোটা পদ্ধ‌টির সঙ্গে বেকার‌ত্বের কোন সম্পর্ক নেই। কারণ ২০ লাখ কর্মক্ষম লো‌কের ম‌ধ্যে ১০ লাখ লো‌কের চাকরি দেওয়া সম্ভব না। সুতরাং ১০ লাখ বেকারতো র‌য়েই গে‌লো। তাহ‌লে কোটা পদ্ধ‌তি বা‌তিল ক‌রে লাভ কি?  একু‌শে টি‌ভি অনলাইন: বর্তমান কোটা পদ্ধ‌তি‌তে কি যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা সম্ভব? অধ্যাপক আমিনুল হক: যোগ্যতার দু‌টি দিক আছে। এক‌টি হ‌চ্ছে সমা‌জের মধ্যে অসমকে সমতায় আনতে চাওয়া আরেকটি বিষয় হ‌চ্ছে,অনগ্রসর ব্য‌ক্তি‌দের সাম‌নের দি‌কে এগিয়ে নি‌য়ে যাওয়া। কোটা পদ্ধ‌টির প্রচলনতা শুরু হ‌য়ে‌ছিল সেই যায়গা থে‌কেই। অর্থাৎ সমা‌জের কিছু কিছু গোষ্ঠী‌কে এগিয়ে নি‌য়ে যাওয়ার জন্য। এই ধরণের বাস্তব যু‌ক্তিকতা থে‌কেই কোটা পদ্ধ‌টির প্রচলন করা হ‌য়ে ছিল। ‌কিন্তু এখন য‌দি জা‌তি ম‌নে ক‌রে একটা লে‌ভেল পর্যন্ত কোটা পদ্ধ‌টির প্র‌য়োজন ছিল, এখন আর প্র‌য়োজন নাই। তাহ‌লে কোটা প‌রিবর্তন কর‌তেই পা‌রে। কিন্তু তা করার আগে অবশ্যই আলাপ-আলোচনার মাধ্য‌মে একটা যো‌ক্তিক মাত্রায় গি‌য়ে পৌঁছাতে হ‌বে, তারপর প‌রিবর্তন করা যে‌তে পা‌রে। তার আগে নয়।   একু‌শে ‌টি‌ভি অনলাইন: কোটা সংস্কা‌রের কি কোন প্র‌য়োজনীয়তা নেই? অধ্যাপক আমিনুল হক:  যে‌কোন সময় যে কোন বিষ‌য়ে সংস্কার হ‌তেই পা‌রে। সুতরাং কোটারও সংস্কার হ‌তে পা‌রে। সংস্কারের ক্ষে‌ত্রে কোন দ্বিমত নেই। আন্দোলনকারীরা একটা বিষয় নি‌য়ে চিন্তা ক‌রে আন্দোলন কর‌তেই পা‌রে। কিন্তু স‌রকারকে এ নি‌য়ে নানাভা‌বে ভাব‌তে হয়। এ নি‌য়ে রাষ্ট্র যন্ত্র‌কে চিন্তা ক‌রে ক‌মি‌টি ক‌রে তার নে‌গে‌টিভ,‌ প‌জে‌টিভ, দে‌শের কল্যাণ ব‌য়ে আন‌বে না‌কি  অকল্যান ব‌য়ে আন‌বে তা চিন্তা ক‌রে সংস্কারের সিদ্ধান্তে আস‌তে হ‌বে।  এসএইচ/

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি