ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ৪:০৮:৫৯

বেকারত্ব দূর করতে দরকার জীবনমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা: তানজীম উদ্দীন

বেকারত্ব দূর করতে দরকার জীবনমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা: তানজীম উদ্দীন

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিকতা জাগ্রত করা যায়? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দীন খানের। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারি নাই যে, আমাদের যে জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে সে জনগোষ্ঠীকে কি ধরণের শিক্ষা দেব? চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা বেশি উপযোগী তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারি নাই।  আমাদের জীবন  মানের যে গুণগত দিক বা বেকারত্ব দূর করার জন্য আমাদের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে কি ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত সে ব্যাপারেও কোনো পদক্ষেপ নেই। তাই বেকারত্ব দূর করতে জীবনমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি? তানজীম উদ্দীন খান: ছেলে-মেয়ে পাশ করে বের হচ্ছে কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না। এটা খুবই স্বাভাবিক চিত্র। এর দুটো কারণ আছে। একটি কারণ হচ্ছে-চাকরির ক্ষেত্রে যে ধরণের দক্ষতা জরুরী, বিশেষ করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া ও ভাবনার যে দক্ষতা, সেটার ঘাটতি তো থাকেই। কিন্তু শুধু যে এটার জন্য বেকারত্ম বাড়ছে তা না। এটার জন্য আমাদের যে উন্নয়ন ভাবনা, এ উন্নয়ন ভাবনা বাংলাদেশের যে আর্থ-সামাজিক চিত্র, সে চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্ব না। আমাদের শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে তো বেকারত্ব দূর করা সম্ভব না। এ উন্নয়নে প্রবৃদ্ধি নামক সংখ্যার চমক থাকে। কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে কতটা সহায়ক, সেটা দেখার বিষয়। আমাদের  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর পাশ করে যে পরিমান শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে বের হচ্ছে- তাদের বেকারত্ব দূর করার জন্যে যে ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা দরকার ছিল, সেই ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা  নেই। সেই ক্ষেত্রে আমাদের শিল্প উন্নয়ন ও কৃষি উন্নয়ন হচ্ছে না। আমরা কমপারেটিভ অ্যাডভ্যান্টেজের কথা বলে থাকি, সেটা সব সময় কৃষিতে ছিল। আমাদের ভৌগলিক বৈশিষ্ট বিবেচনায় নিলেও কৃষি এগিয়ে। কিন্তু আমরা পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল অনুস্মরণ করতে গিয়ে আমাদের কমপারেটিভ অ্যাডভ্যান্টেজ গুলিয়ে ফেলেছি। আমরা বেশি মনোযোগী হয়ে উঠলাম আমাদের শ্রমটাকে সস্তা রাখার। স্বস্তা শ্রমটাকে পুঁজি করে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি শিল্প গড়ে তুল্ল। যেখানে কৃষি উপেক্ষিত হলো। এছাড়া আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে, এই ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আসলে আমাদের জনগোষ্ঠীকে জন সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব না। আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারি নাই যে , আমাদের যে জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে সে জনগোষ্ঠীকে কি ধরণের শিক্ষা দিব। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা বেশি উপযোগি তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারি নাই।  আমাদের যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের উন্নয়ন দর্শনই সমস্যাবহুল। উন্নয়ন শুধু মাত্র সংখ্যা বা  প্রবৃদ্ধি দিয়ে হয় না। জীবন  মানের যে গুণগত দিক বা বেকারত্ম দূর করার জন্য আমাদের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্ব রেখে কি ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেই। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? তানজীম উদ্দীন খান: আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন এক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলছি, যাদের উপর আমরা নিজেরাই ভরসা করতে পারছি না। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে লোকবল আমদানি করছি। আমাদেরও জনশক্তি বিদেশে আছে। তবে সে জনশক্তি অদক্ষ ও সস্তা শ্রমের। সেদিক থেকে আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার তার ঘাটতি আছে। আমাদের মূলত কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেয়ার দরকার। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যারা ভাববেন, তাদের বেশির ভাগেরই ছেলে-মেয়ে দেখা যায় বিদেশে লেখা-পড়া করছেন। আবার যারা কলকারখানার মালিক তাদের ছেলে-মেয়েও বেশিরভাগ বিদেশে লেখা-পড়া করছে। ফলে বলা যায়, আমাদের মধ্যে আমাদের দেশ, শিক্ষা, জনশক্তি কোনটার প্রতি আমাদের নিজেদেরই আস্থা নেই এবং এ আস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও আমরা নিতে পারি নাই। ফলে আমাদের এখানে যারা লেখা পড়া করছে তারা ওই প্রতিষ্ঠানে বড় জোর একজন কর্মকর্তা হতে পারবেন। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের গুরু দায়িত্ব নিতে পারবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন এসেছে। যা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক শোনা যায়। শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন সংযোজিত সৃজনশীল পদ্ধতি কিভাবে দেখছেন? তানজীম উদ্দীন খান: প্রচলিত ‘সৃজনশীলতা’ আসলে কতটুকু সৃজনশীল এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিষয়টা হচ্ছে সৃজনশীলতার জন্য যে ধরণের শিক্ষক দরকার। আমার সে ধরণের শিক্ষক তৈরি হয়েছে কি না? সৃজনশীল পড়তে গিয়ে যদি আমাকে আবার বাজারের গাইডের প্রতি আকৃষ্ট হতে হয়, তবে সেটা সৃজনশীর কিভাবে হলো। আমার বাচ্চা যখন বড় হবে তখন তার তিনটা বিষয় সবচেয়ে বেশি জানানো দরকার। সেটা হলো-ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতা। কিন্তু আমি যদি বাচ্চাকে ১শ’টি বিষয় পড়তে দেয়, তবে সেটার মধ্যে জড়তা চলে আসে। তাকে যদি তিনটা বিষয়কে কেন্দ্র করে পড়তে দেয়। তবে সে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আবার বিনোদন বা খেলারও সুযোগ পাচ্ছে। ফলে তার লেখা-পড়ায় ভাবার সযোগও সে পাবে। কিন্তু আমরা বাচ্চার উপর ১০ থেকে ১৫টি বই চাপিয়ে দিলে সে হাফিয়ে উঠে। ফলে ভাবার সুযোগ পায় না। যতটুকু পারে মুখস্থ করার চেষ্টা করে। যার সর্বশেষ পর্যাযে সৃজনশীল আর সৃজনশীল থাকে না। বিদেশে বাচ্চাদের শিক্ষা গ্রহণে সবচেয়ে যেটির উপর গরুত্ব দেওয়া হয়, সেটি হলো বাচ্চার সময়। এখন আমরা বাচ্চাদের যেভাবে টেক্সট বুকের মধ্যে ব্যস্ত রাখি তাতে সৃজনশীল হয় না। সৃজনশীল করতে হলে শিক্ষকদের সৃজনশীল হতে হবে। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপর পরীক্ষা ও পাঠ্য বইয়ের বোঝা কমাতে হবে। বাচ্চাদের ভাবার সময় দিতে হবে। খেলার সময় দিতে হবে। তাদেরকে পরিবেশ থেকেই শিক্ষা নেয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?  তানজীম উদ্দীন খান: বাণিজ্যের এ অভিযোগ শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর না। এটা বেসরকারি হাসপাতালসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যমান। এখন কথা হচ্ছে শিক্ষা তো আসলে ব্যবসা না। শিক্ষা হচ্ছে সামাজিক কল্যাণের একটি উপাদান। সমাজকে এগিয়ে নেয়ার উপাদান। এই উপাদানকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দরকার সামাজিক ও যৌথ প্রচেষ্টা। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার এ বেসরকারিকরণের পক্ষে না। এখন রাষ্ট্র যখন এ কাজটি যথাযথ করতে পারছে না। তখন সে সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের একটি মজ্জাগত বিষয় হলো সবাই তার ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করতে চাই। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে সবাই তার ভাগ্যকে বদলাতে চাই। ভাগ্য বদলানোর এ সুযোগটা নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় তারা শিক্ষার্থীরা বেসরকারি পর্যায়ে ঝুঁকে পড়ে। / এআর /
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবকটি বিজনেস ওরিয়েন্টেড: আবুল কাসেম

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়?  অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিক জাগ্রত করা যায়? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের।যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক। তিনি নিরপেক্ষ রাজনীতি চিন্তা ও তত্ত্বে বিশেষভাবে পরিচিত। দুই পর্বের বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বেকারত্ম আমাদের দেশে অনেক বড় একটি সমস্যা।মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এ সমস্যা বাড়তে বাড়তে আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতী বেকারত্মের গ্নানি নিয়ে জীবন যাপন করছে।তারপরও আজও আমরা কার্যকরি কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি।বেকারত্ম দূর করতে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে পারিনি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে করতে পারিনি কর্মমুখী।চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃষি ও শৈল্পিক উৎপাদনের বিষয় আনতে পারলে বেকারত্ব অনেক কমে যেত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি? আবুল কাসেম ফজলুল হক: এটা জাতি হিসেবে আমাদের বড় একটি সমস্যা।যদি বেকারদের কর্মসংস্থান হতো, জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা হতো, তবে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো অনেক এগিয়ে যেত।তবে বেকারত্বের এমন ভয়াবহতা সৃষ্টির কারণ হলো আমাদের সুনির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা না থাকা। বেকার সমস্যা সামনে রেখে জাতিকে উন্নত করতে শিক্ষা ব্যবস্থা গঠনের কোন পরিকল্পনা নেই।স্বাধীনতা পরবর্তী এমন কোনো পরিকল্পনা কেউ নিতে পারেনি। ফলে বেকারত্ব দিনের পর দিন বেড়ে আজকের এ পর্যায়ে এসেছে। যদি কর্মসংস্থানের বিবেচনা সামনে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করা হয়, তবে বেকার সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধান করতে না পারলেও অনেকটা সমাধান হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কর্মসংস্থানের বিবেচনায় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন কোন দিক স্পষ্ট হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? আবুল কাসেম ফজলুল হক: শিক্ষা ব্যবস্থার একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত- দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা লাভ করার পরে সরাসরি উৎপাদনের কাজে জড়িত হতে পারে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ক্লাস ফাইভ পাশ করার পরেই কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প উৎপাদনের মতো কিছু প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষা দেওয়া যায়। এটা করলে ক্লাস ফাইভ পাশের পরই বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী এই কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা নিতে উৎসাহিত হবে। মোট কথা শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হতে হবে যে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ উৎপাদনমুখী হবে। আর একটা অংশ প্রশাসনিক কাজে যাব।তৃতীয় অংশটি বৈজ্ঞানিক-দার্শনিক বা আবিষ্কারক হবে।অর্থাৎ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে রাখতে হবে উৎপাদনমূখী শিক্ষা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরির বাজার ও বাস্তবতার ভিত্তিতে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? আবুল কাসেম ফজলুল হক: চাকরির বাজার ও বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষা কারিকুলাম শতকরা ১০ ভাগ উপযোগিতা রাখে।এর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা কমিশন। শিক্ষা কমিশন যাদের নিয়ে গঠিত তাদের মধ্যে শিক্ষার কোন উপলব্ধি-ই নাই। সর্বশেষ ২০১০ সালে গৃহিত শিক্ষা নীতিতে শিক্ষাবীদ ও শিক্ষকের ভূমিকা কম আছে। এখানে ভূমিকা আছে যারা এনজিও করেন তাদের মতো লোকের।যারা বিদেশী নানা সংস্থার সঙ্গে জড়িত বা সুশিল সমাজের হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।শিক্ষা কমিশন করতে যথেষ্ঠ জাতীয়তা বোধের দরকার আছ।শিক্ষা উপলব্ধির দরকার আছে।এটা করতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চেতনা না আসলে হবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে নতুন সংযোজন সৃজনশীল। এ পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? আবুল কাসেম ফজলুল হক: সৃজনশীল পদ্ধতি ও ঘন ঘন পরীক্ষা পদ্ধতি অবিলম্বে বাতিল করা উচিৎ।এমন একটি পদ্ধতি চালু করা উচিত যেখানে ছাত্ররা আনন্দ খুঁজে পায়। সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ আমলে যে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। প্রাইমারী-মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের সিলেবাস পরিবর্তন করতে হবে।সেখানে যুগের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহারিক বিষয় আনতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?  আবুল কাসেম ফজলুল হক: এতে কোন সন্দেহ নেই যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক একটা ব্যবসা কেন্দ্র।যারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, যারা বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার, তারা অর্থ আয়ের জন্যেই বিশ্ববিদ্যালয় করেছেন।দেখা যাচ্ছে একজন কোনো ব্যবসা করতেন। তিনি ভাবলেন একটা শিল্পকারখানা করবেন। হিসেব করে দেখলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তার জন্য শিল্পকারখানা তৈরির চেয়ে লাভজনক।তাই সে লাভের হিসেব করেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে।সেখানকার শিক্ষায় সেবার চেয়ে ব্যবসায়িক দিকটা দেখা যায় বেশি। এই ব্যবসায়িক লাভের কারণেই আজকে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এর প্রত্যেকটাই বিজনেস ওরিয়েন্টেড। যেটা একটা জাতির জন্য কখনও কল্যাণকর নয়।তারা যুক্তি দেখাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্য দেশে এ রকম বিশ্ববিদ্যালয় আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ওই সব দেশের মতো বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়। এ অবস্থায় আমাদের যেটা করণীয় সেটা হলো-বেরসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালযে যে  বৈষম্য সেটা কমিয়ে আনা।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও দেশ, ভাষা ও জাতীয়তার বিষয়গুলোও সন্নিবেশ ঘটানো। আমাদের সংস্কৃতি সেখানে ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী চেতনা নিয়ে চলছে।এটা বন্ধ করা দরকার।এরা এমন শিক্ষার্থী তৈরি করছে,যারা বিদেশি নাগরিকত্বে আগ্রহী। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?  আবুল কাসেম ফজলুল হক: আজকে যে গাইড বই, কোচিং সেন্টার এটা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুবই ক্ষতি বয়ে আনছে।শিক্ষার গতি গাইড ও কোচিং সেন্টারমুখী হওয়ার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আনন্দ নেই। তারা এক প্রকার গলাধকরণের নীতিতে বেড়ে উঠছে।অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা মনে করে কোচিং সেন্টারে যাওয়া উচিত নয়, তবে তারা এটা মনে করলেও বাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এটা বন্ধে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। এ সংক্রান্ত আরও খবর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টাকার জন্য শিক্ষাকে টার্গেট করেছে / এআর /  

বেকারত্ব দূর করতে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি: অধ্যাপক শফি আহমেদ

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব  প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়? কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিক জাগ্রত করা যায়? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় অধ্যাপক শফি আহমেদের। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৪১ বছর শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শিক্ষা আন্দোলন, শিক্ষা পদ্ধতির সংস্কার, শিক্ষার্থীদের নানাবিধ সমস্যা ও তরুণ সমাজের বেকারত্ম নিয়ে ছিলেন সরব। বর্তমানে তিনি পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সিনিয়র ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে যে, উচ্চ শিক্ষা নিয়ে চেয়ার-টেবিলের চাকরি করবো। বরং চাকরি ছাড়াও সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়-এ ধারণা পোষণ করতে হবে। তিনি বলেন. শুধু যে চাকরিতেই  সম্মান এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিদেশিরা সব ধরণের কাজকে সম্মানের সঙ্গে দেখে। সে কারণে সেখানে বেকার কেউ থাকে না। বাংলাদেশে চাকরি না পেলেই শিক্ষিতরা নিজেকে বেকার ভাবেন। কিন্তু তাকে বুঝতে হবে যে শিক্ষিত হওয়ার মানে এই নয় যে, তাকে চাকরিই করতে হবে। সে সব কাজই করতে পারবে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি? শফি আহমেদ: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ নিয়ে অনেক আগে থেকেই কথা বলে আসছি। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা দেশ ও দেশের বাইরে প্রশংসিত ও নিন্দনীয় দুটিই হয়েছে।কিছু ভালো দিকের কারণে প্রশংসিত হয়েছে।আবার শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু গলদ রয়ে গেছে, যার কারণে নিন্দনীয় হয়ে আসছে। আমাদের শিক্ষাদান ও গ্রহণের মধ্যে একেবারে মৌলিক ত্রুটি রয়ে গেছে। আর এই ত্রুটির কারণেই আমাদের গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ছেলে-মেয়েদের জ্ঞান সম্প্রসারিত হচ্ছে না। এ সমস্যা খ্যাতিমান স্কুলগুলোর ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রেও। আমরা সড়কে যানজট নিয়ে অনেক কথা বলি। অনেক কিছু করি। আমাদের বিশ্লেষকরাও নগর পরিকল্পনার কথা বলতে থাকেন। কিন্তু আসলে যে কি কি ক্ষতি হচ্ছে এ রকম তালিকা তৈরি করে আমরা কথা বলি না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও সেই রকম কিছু মৌলিক ও বাস্তবিক বিষয়ের ঘাটতি আছে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, আমি মেহেরপুরে গিয়েছিলাম একটি স্কুলের ভিজিটে। সেখানে ছেলে-মেয়েদের জিজ্ঞাসা করা হলো শব্দ শক্তি কি? তারা সহজে বইয়ের গদবাধা মুখস্থ উত্তর দিয়ে দিল।কিন্তু যখন জানতে চাওয়া হলো কি করে শব্দ শক্তি তৈরি হয়।এর ব্যবহারিক দিক বল। তখন কেউ উত্তর দিতে পারলো না।বোঝা গেল শিক্ষার্থীরা বইয়ের মুখস্ত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ আছে। তাদের জ্ঞান সম্প্রসারিত হয়নি এবং শিক্ষকরাও তাদের জ্ঞান সম্প্রসারণের শিক্ষা দেয়নি। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে প্রতিনিয়ত সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী আমরা কি আমাদের শিক্ষাকে সাজাতে পেরেছি? পারি নাই। দিন গেলেই প্রযুক্তিগত দিকগুলোর চাহিদা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেটা কতটুকু ঢোকাতে পেরেছি? পরিবর্তীত এ বিষয়গুলি অবশ্যই পাঠ্যবইয়ে আনতে হবে। তবেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কর্মমুখী হবে। এছাড়া আমাদের মনোভঙ্গির মধ্যে এখনও আছে যে, আমাদের এমএ পাস করতেই হবে। এমএ পাস করলে আমার বাবা ও পরিবার খুশি হয়, আমিও খুশি। আমি মনে করি আমাদের বেকারত্বের বড় কারণ হচ্ছে আমি কি ধরণের কর্ম করতে চাই, কিসের মাধ্যমে আমি আমার জীবনকে গড়ে নিতে পারি, কিসের মাধ্যমে আমি প্রতিষ্ঠিত হতে পারি সেই জায়গাটা স্পষ্ট হওয়া উচিত। সেই স্পষ্টটা শিক্ষার মাধ্যমেই করতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে জানাতে হবে যে প্রতিষ্ঠিত শুধু উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে নয়, কারিগরি জ্ঞান নিয়েও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা যায়। আমাদের এ দৃষ্টিভঙ্গি আনতে হবে যে উচ্চ শিক্ষা বা চেয়ার-টেবিলের চাকরি নয়, অল্প শিখে এবং চাকরি ছাড়াও সম্মানজনকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?  শফি আহমেদ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রাই সবই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। তারা কখনও কেউ হয়তো শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন, শিক্ষার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বা তাদের শিক্ষা নিয়ে ভাবনা কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল, এমন দাবি থেকেই তারা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসেছে। আমাদের দেশে গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে। যারা কিছুটা ভালো করছে। বাকিরা সবই তো নামকা অস্তে। তারা ভাড়া বাসায় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে বসেছে। ব্যবসায়িক মনোভঙ্গির কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এমন একটি পর্যায়ে এসেছে যে চাকরিদাতারা তাদের শিক্ষার্থীদের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। অর্থাৎ ব্যবসায়িক কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে গ্রেট বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের এ গ্রেট পাওয়া ছাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বি গ্রেট পাওয়া ছাত্রের মেধার সঙ্গে পেরে উঠছে না।টাকার বিনিময়ে অল্প সময়েই শিক্ষার্থীদের গ্রেট ও সনদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।যে সনদে শিক্ষার্থীরা চাকরির আবেদন পর্যায়েই পিছিয়ে পড়ছে। কারণ যখন দেখা হয় যে ভালো রেজাল্ট করেও তাদের ভীত দুর্বল। তখন বাছাই পর্ব থেকেই তাদের বাদ দেওয়া হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গ্রেটিংয়ের কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদের গ্রেটিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। আগে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রেটিং ছিল না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?  শফি আহমেদ: আমরা ছাত্র থাকাবস্থায় কোচিং নামক শব্দও ছিল না। কিন্তু এখন শিক্ষার জন্য কোচিং একটা অবিচ্ছেদ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দিন ধরেই এটা চলছে। এখানেও চলছে এক ধরণের বাণিজ্য। যেখানে মূল শিক্ষার ধারাকে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থলে কোচিংকে বড় করে দেখা হচ্ছে। যার জন্য আমাদের শিক্ষকরাও দায়ী। শিক্ষকরা মূল প্রতিষ্ঠান স্কুলে পাঠদানে মনোনিবেশ যতটা না হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে কোচিংয়ে। কারণ কোচিং থেকে তার বাড়তি আয় হচ্ছে। ফলে কোচিং আর স্কুলের বিষয়টি এখন ডাক বিভাগ আর কুরিয়ার সার্ভিসের মতো হয়ে গেছে। সাধারণ ধারণায় ডাক বিভাগ সেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আর কুরিয়ার সার্ভিস তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই বলা যায় কোচিং বন্ধে স্কুলের শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষককে নৈতিকতায় ফিরে আসতে হবে। স্কুলের বেতন তুলে কোচিংয়ের সামান্য আয়কে বড় করে দেখলে হবে না। আবার অভিভাবকদেরও কোচিং মুখীতা বন্ধ করতে হবে। মোট কথা  শিক্ষক, অভিভাবক ও সরকার সবাইকে চাইতে হবে যে কোচিং বন্ধ হবে। সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। / এআর /

শিক্ষায় বাণিজ্য বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে: অধ্যাপক আমিনুল হক

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনসংখ্যার বোনাসকাল পার করছে দেশ। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারেও প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ, বিশাল এ অর্জন ও সম্ভাবনার পেছনে চ্যালেঞ্জ ও তা টপকানোর উপায় কি হতে পারে। অন্যদিকে একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? এসবের সুলক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হকের। একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) অনলাইনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বাণিজ্য বন্ধে সরকারের এককভাবে চাপ দিয়ে কিছু হবে না। প্রকৃত অর্থে এটা বন্ধ করতে হলে দরকার সঠিক অ্যাসেসমেন্ট। দরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। উদ্যোক্তারা যদি চায় দেশের পরবর্তী প্রজন্মকে তারা সেবা দিবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গড়ে ওঠার অন্তরায় সৃষ্টি করবেন না। তাদের এমন সিদ্ধান্তে এক দিনেই শিক্ষা বাণিজ্যে পরিণত না হয়ে সেবায় পরিণত হবে। এ ব্যাপারে সবার আগে উদ্যোক্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?   আমিনুল হক: একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে দোষের কিছু নেই। কিন্তু কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একচ্ছত্রভাবে কাজ করছে। কেন তারা  খেয়ালখুশি মতো ফি নির্ধারণ করছে। এর কারণ হচ্ছে যে সমাজে শিক্ষা অর্জনের যে ইতিবাচক ধারা আমরা তৈরি করতে পেরেছি। সেখান থেকেই মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে যে না ছেলে-মেয়েদের পড়াতে হবে। তাই শিক্ষার এতো প্রসার ঘটেছে। শিক্ষা এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসা কিন্তু একটা আন্দোলনের ফসল। এখন সব বাবা-মা চাচ্ছেন যে, তাদের সন্তানরা লেখা-পড়া করুক। তাদের পিছনে খরচ করি। কিন্তু সেখানে ফি কত হবে? কি পরিমান খরচ হবে? এই অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। অ্যাসেসমেন্টটা দুই জায়গা থেকে হতে পারে। একটি হলো-সরকার এখানে রেগুলেট করবেন। আর একটা জায়গা হলো-শিক্ষা খাতে যারা উদ্যোক্তা হিসেবে আসেন তাদের মানবিক হওয়া। উদ্যোক্তাদের ভাবতে হবে যে আমি সেবা দিব?  নাকি শুধুই ব্যবসা করবো? উদ্যোক্তাদের এ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি না আসলে সরকার চাপিয়ে দিলেও কাজের কাজ কিছু হবে না। কারণ সরকার চাপ দিরে যা হবে সেটা হলো সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়বে। যারা আজ উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠা তারা যদি চিন্তা করেন যে, যারা আমার ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি তাদের আমি সেবা দিতে চাই। তাহলে কিন্তু চিত্র একদিনে পরিবর্তন হয়ে যাবে। তারা যদি সিদ্ধান্ত নেন যে , তাদের যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে তার থেকে ৫ শতাংশ লাভ করবেন। দেশের স্বার্থে এর বেশি আর লাভ করব না তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে আর বাণিজ্যের উৎস থাকবে না। শিক্ষা সেবায় পরিণত হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশে গড়ে ওঠা কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে বেপরোয়া বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই আবার স্কুলের পাঠ  নেওয়ার চেয়ে কোচিংয়ের শিক্ষাকে গরুত্ব দিচ্ছেন। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?   আমিনুল হক: এখন ৩৫ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর অনুপাতে একজন শিক্ষক আছেন। এসব শিশুদের অভিভাবকরা কোচিংয়ে টাকা দিচ্ছেন। তাদেকরে যদি বলা হয় আপনারা কোচিংয়ে টাকা দিয়েন না। আমি স্কুলে ২০ জন ছেলে-মেয়ের অনুপাতে একজন শিক্ষক নিচ্ছি। অভিভাবকরা কিন্তু স্কুলে টাকা দেবে না। অভিভাবকরা কোচিংয়ে টাকা দিয়ে শ্রম নষ্ট করে, সময় নষ্ট করলেও স্কুলে কখনও টাকা দিবে না। অভিভাবকদের এ কোচিংমুখী হওয়ার কারণে বাচ্চাদের খেলার সুযোগ নাই। সারাদিন কোচিংয়ে দৌঁড়ে সময় পার করছি। এখন কোচিংয়ে যে ছেলে বা মেয়ারা পড়াচ্ছে তাদের যদি রাষ্ট্র কর্মসংস্থান দেয় এবং অভিভাবকদের যদি কোচিংয়ের পরিবর্তে স্কুলমুখী করতে পারি তবে তো কোচিং থাকবে না। উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান ও স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান বাড়িয়ে অভিভাবকদের স্কুলের প্রতি আস্থা তৈরি করতে পারলে কোচিংয়ের রমরমা কমানো যাবে। তাছাড়া বারবার ঘোষণা দিয়ে কোচিং প্রকৃত অর্থে কমানো দূরহ ব্যাপার।   আমাদের স্কুলে ছেলে-মেয়েরা কতটুকু পড়বে কি কি বিষয় পড়বে তার  সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই ২০ ছাত্রের জায়গায় একজন শিক্ষক আছে। তারা স্কুলে সেসব শিক্ষকদের কাছ থেকে পাঠ নিয়ে সুন্দরভাবে লেখা-পড়া শেষ করছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? আমিনুল হক: এখন বাচ্চাদের বড় হওয়া বা গড়ে ওঠার ধরণ পাল্টেছে। আগে আমরা অনেক সময় পরিবারে বাবা বা বড় ভাইয়ের সঙ্গে ভয়ে কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু এখন ছেলে-মেয়েরা বাবার সঙ্গে কথা বলছে। বাবার সঙ্গে খেলছে। তাদের আবদার জানাতে পারছে নির্ভয়ে। পরিবারের সেই যে বেড়ে ওঠাটা আগের তুলনায় ভিন্ন। সেই ভিন্নতা স্কুল পর্যায়েও। আগে আমরা স্কুলের শিক্ষক দেখলে সামনে যেতে ভয় পেতাম। দূর  থেকেই মাথা নুয়ায়ে ফেলতাম। এসবের মধ্যে ভয়ও যেমন ছিল। সম্মানও তেমন ছিল। আগে একজন শিক্ষকের পরিচয় পেলেই সবাই একটা শ্রদ্ধা দেখাতো। এখন  সেই  শ্রদ্ধাবোধটা এমন পর্যায়ে এসেছে যে  একজন ছাত্র শুধু তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষককেই সালাম দিচ্ছে। আর অন্য ডিপার্টমেন্টের হলে সালাম দেওয়াটা ততটা প্রয়োজন মনে করছে না। তবে এ সালাম না দিয়ে যে সুস্পষ্টভাবে শিক্ষকের সম্মান দেওয়াকে ইগনোর করছে তা কিন্তু না। আসলে বর্তমান প্রজন্মে কাছে সেই চলটায় কমে গেছে যে একজন বয়স্ক মানুষ তাকে সম্মান করতে হবে। এটা সামাজিক রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও বন্ধন থেকে বেরিয়ে নগরায়ন প্রবণতার কারণে হয়েছে। যার কারণে দেখা যায় একটি ছেলে যখন ঢাকায় থাকছে তখন তিনি কোন বয়স্ককে সম্মান করছে না। পাশে বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাকে সালাম তো দিচ্ছেই না, উল্টো তার সামনে সিগারেট টানছে। কারণ যুবক তাকে চিনে না। সেই একই যুবক যখন গ্রামের বাড়ীতে যাচ্ছে-তখন কিন্তু  সে গ্রামের ছোট দোকান থেকেও একটি বিড়ি কিনে খেতে ইতস্তত করছে। ভাবছে কে কোথা থেকে দেখে ফেলবে। সেখানে তার সামাজি  শাসনের ভয় আছে। সেখানে বয়স্ক কেউ সিগারেট খেতে দেখলে খারাপ ভাববে, তার পরিবার বা বংশের সম্মান নষ্ট হবে। সে ধারণায় যুবককে সিগারেট টানা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে। আবার   বয়স্ককে সালামও দিতে হচ্ছে। অবশ্য যে গ্রামে যত বেশি নগরায়ণের প্রভাব পড়েছে সে গ্রামে তত বেশি এ  সম্মান দেয়ার প্রচলন কমেছে। অধিক নগরায়ণের ফলে আজ শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষক ও বয়স্কদের সম্মান দেয়া যেমন কমেছে। তেমন বেড়েছে অনৈতিক কার্যকলাপ। বলার কেউ না থাকায় বা সামাজিক শাসন না থাকায় তারা সহজেই অপকর্মে লিপ্ত হতে পারছে। ফলে মাদক, জুয়া ও বড় ধরণের অপরাধের জন্ম হচ্ছে। / এআর /       

দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষাকে করতে হবে আন্তর্জাতিক মানের: মাহফুজা খানম

অধ্যাপক মাহফুজা খানম। ১৯৬৬ সালে যিনি ছিলেন ডাকসুর ভিপি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। বর্তমানে বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের দিত্বীয় মেয়াদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়া খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক  ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বেকারত্ব-কর্মসংস্থান, ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনসহ নানাবিধ দিক নিয়ে বরেণ্য এ শিক্ষাবীদের মুখোমুখী হয়। তিন পর্বের বিশেষ এ সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? মাহফুজা খানম: আজ বাংলাদেশে চাকরি নাও পাওয়াটা  একটা বড়  প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশ লাভ করেছিলাম। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া একটি জাতিকে তিনি দাঁড় করাতে পারবেন না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে জাতি একটা শিক্ষার ভিতর দিয়ে বিশ্বপ্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করবে। সেই কারণেই তিনি কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশন করলেন। ড. কুদরহ এ খুদাকে নিয়ে ১৯৭৩ সালে শিক্ষা কমিশন হলো। এটা প্রকাশিতও হলো। কিন্তু কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু চলে গেলেন। ফলে কমিশনের বাস্তবায়নটা থমকে গেলে। এরপর যারা ক্ষমতায় এলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করতেন না। মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে তাদের অবস্থান ছিল। যে কারণে পরবর্তীতে অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন হয়েছে। কিন্তু এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাটা কি হবে? সেই শিক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জন দিয়েছেন। কিন্তু তা কতটা কার্যকরী তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ড. কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশন বলেছিল একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে। ভোকেশনাল বা কারিগরি শিক্ষা অবর্শই থাকতে হবে। এ কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। কারণ সব তরুণ যে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে সেটা দরকার ছিল না। তাই ৬০ শতাংশ যদি আমার সাধারণ শিক্ষা হয় তবে ৪০ শতাংশ আমি কারিগরি শিক্ষায় নেব। আমরা সে সময় নতুন জাতি হিসেবে মাত্র যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমরা সে সময় একটা ভগ্নদশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। সে সময়ের কুদরত এ খুদা শিক্ষা কমিশনের ভিতর দিয়ে শিল্প  ও কৃষি প্রত্যেকটা বিষয়ের কারিগরি শিক্ষাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে সেটা সম্ভব হয়নি। এরপরে আমরা দেখলাম আমাদের শিক্ষায় ৩টা দিক চলে এলো। প্রথমটি হলো সাধারণ শিক্ষা। দ্বিতীয়টি হলো মাদ্রাসা শিক্ষা। তৃতীয়টি হলো ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা। শিক্ষার এ তিন ধারায় তরুণ প্রজন্মকে বিভাজিত করা হলো। যেমন মাদ্রাসা শিক্ষাগুলোতে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র শ্রেণীর ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া শুরু হলো।যেখানে আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান কোথায় গিয়েছে তার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা আর একটা পিছনের দিকের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। আর একটা হলো ইংরেজি মাধ্যম। ইংরেজি মাধ্যমের ছেলে-মেয়েরা ও লেভেল, এ লেভেল সম্পন্ন করছে। এরপর তারা এদেশে থাকছে না। তারা এদেশে জন্মেছে। এ দেশের বায়ু নিচ্ছে, শ্বাস গ্রহণ করছে। খাদ্য খাচ্ছে। বড় হচ্ছে। তারপর অন্য দেশ নিয়ে ভাবছে। কারণ তাদের শিক্ষা কারিকুলামে নজরুল নাই। সুকান্ত নাই। রবীন্দ্রনাথ নাই। বঙ্কিম চন্দ্র নাই। ফলে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক –বাহক কিন্তু  তারা হচ্ছে না। তারা পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি অবহে গড়ে উঠছে। এদের শিকড়টা বাংলাদেশে হলেও পাস করার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশই তাদের পছন্দের জায়গা হচ্ছে। আর থাকলো সাধারণ শিক্ষা। এখন সাধারণ শিক্ষা আসলে কত শতাংশ এ শিক্ষায় শিক্ষিত। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সাধারণ ছাত্রদেরও যে সিলেবাস তাতে ছাত্রদের সঙ্গে যেন একটা গিনিপিকের মতো আচারণ করছে। এ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে চলছে একটার পর একটা পরীক্ষা। না তারা সিলেবাসের বিষয় আত্মস্থ করতে পারছে। না তারা প্রফুল্ল চিত্তে লেখা-পড়া করছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন:  আজকের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? মাহফুজা খানম: যে শিক্ষা ব্যবস্থাটি আজকে আমাদের দেশে চালু রয়েছে, সেটা অবশ্যই জ্ঞানের। তবে সেটা কোনভাবেই পরবর্তী জীবনে ব্যবহারের নয়। আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে, সেটা আমরা বাধ্য হয়ে গ্রহণ করছি। এটা আমাদের আশা আকাঙ্খার জায়গা পূরণ করতে পারছে না। এ শিক্ষায় যদি আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিজেদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিতে না পারে। তবে ভবিষ্যৎ তো আমাদের কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমি বলবো যথেষ্ঠ দেরি হয়ে গেছে। এখন আমাদের সময় এসেছে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবনার। আমাদের বড় সম্পদ আমাদের তরুণ সমাজ। এদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তারা যেন দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দাঁড়াতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কিছুদিন আগে আমরা লক্ষ্য করলাম যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের পরীক্ষায় মাত্র ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ পাস করেছে। পাসের এ হারকে আপনি কিভাবে দেখছেন? মাহফুজা খানম:  দেখুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তারাই অংশ নিয়েছিল যারা এসএসসি ও এইচএসসিতে এ প্লাস, গোল্ডেন প্লাস বা ভালো রেজাল্ট করেছে। এখন এমন একটি পরীক্ষায় যদি ৮৯ দশমিক ১১ শতাংশ পাসই না করে। তবে কি আমি বলবো যে উচ্চ শিক্ষায় আমার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে? বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে সোনার বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, সেটা পূরণ হচ্ছে? না। মেধার কোথাও না কোথায় ঘাটতি রয়েই গেছে। যার কারণে এটা হলো। এটার জন্য তৎপর হওয়া দরকার। আমাদের ঘাটতি খুঁজে বের করে তা দূর করতে হবে।  ছেলে-মেয়েদের সঠিকভাবে শিক্ষা বা জ্ঞান পাওয়ার সুযোগ করতে হবে। / এআর /

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টাকার জন্য শিক্ষাকে টার্গেট করেছে

বাংলাদেশে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক অনবদ্য নাম অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম । ছাত্র জীবন থেকেই শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে ছিলেন আগ্রসৈনিক। ১৯৬৬ সালে হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসুর) প্রথম নারী ভিপি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। একইসঙ্গে বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের দ্বিতীয় মেয়াদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়া খেলাঘরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপার্সনের দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বেকারত্ম-কর্মসংস্থান ও ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতাবিষয়ক তিন পর্বের বিশেষ এ সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম।     একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাগামহীন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাণিজ্যের এ বেড়াজাল থেকে কিভাবে বের করে আনা যেতে পারে? মাহফুজা খানম: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রান্টস কমিটি দিচ্ছে। সেখানে শিক্ষার বদলে হচ্ছে ব্যবসা। ব্যবসা করার জন্য আমরা শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছি। এর চেয়ে দুঃখের ও লজ্জার কি হতে পারে। যিনি পড়াচ্ছেন, তিনি প্রশ্ন করছেন, তিনিই খাতা দেখছেন, আবার তিনিই আমার ডিগ্রি দিয়ে দিচ্ছেন। বিষয়টি এমন হয়েছে- আমি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আরো ছাত্র চাই। আরো টাকা চাই। যার কারণে একই ব্যক্তি পড়াচ্ছেন, পরীক্ষা নিচ্ছেন ও মূল্যায়ন করছেন। আমি জানি না গ্রান্টস কমিশন কতটুকু এটার লাগাম টানতে চেষ্টা করছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কোচিং নিয়ে ব্যস্ত থাকার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোচিং সেন্টারগুলো তাদের সে আগ্রহকে পুঁজি করে বেপরোয়া ব্যবসা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা সরকার বারবার ঘোষণা দিয়েও বন্ধ করতে পারছে না। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন? মাহফুজা খানম: এরই মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি যে শিক্ষা ব্যবস্থায় এসেছিল- ‘এসো নিজে করি’। যেখানে কিছু সংযোজন ও বিয়োজন হয়েছে। তারপর তাদের উপর আনা হলো সৃজনশীল পদ্ধতি, যেখানে শিক্ষকরাই জানতে পারলো না সৃজনশীলতা সম্পর্কে। সেখানে ছাত্ররা কিভাবে ভালো করবে। শিক্ষক ও ছাত্ররা যখন বুঝতে পারছেন না, তখন অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছুটছেন। কার কাছে গেলে তার বাচ্চাকে শেখানো যাবে এ চিন্তায় তারা ব্যস্ত থাকছেন। তারা কোচিংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছেন। ফলে কোচিং বাণিজ্যও রমরমা হয়ে উঠছে। কোচিংগুলোতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রদের রেজাল্ট ভালো করতে তারা অসদুপায় অবলম্বন করে প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়ছে। যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে তো চলতে পারে না। তাই আমাদের গোটা শিক্ষা পদ্ধতিকেই ঢেলে সাজাতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? মাহফুজা খানম: মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ছেলে-মেয়েদের তৈরি হচ্ছে না। যেভাবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম নানা ধরণের অপকর্মের সাথে জড়িত হচ্ছে। অপকর্মের মধ্যে শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরাও আশঙ্কাজনক হারে জড়িয়ে পড়ছে। তারা মাদক সেবনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাতে নানা ধরণের সামাজিক সমস্যা তারা সৃষ্টি করছে। কিন্তু আগে আমাদের সময় ছাত্র সমাজ-ই ছিল মানবিক মূল্যবোধের সোপান। আমরাই তো ছয় দফা দিয়েছেলাম। মানুষ সেগুলো গ্রহণ করতো। এখন শোনা যায় ছাত্ররা চাঁদাবাজিও করে। আবার তারা দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবে না। তাদের আন্দোলনও এখন পূর্ণমাত্রায় জাতির স্বার্থে হয় না। জাতিও তাদের উপর ভরসা রাখতে পারে না। কারণ ছাত্রদের মাঝে সেই মানবিকতা নেই। আজ আমাদের তরুণ সমাজ যেন অপরাধে ডুবে গেছে। ছেলে-মেয়েদের জীবনবোধ সম্পর্কে যেমন ধারণা বা আচরণ থাকা উচিত, তেমনটি পাওয়া যাচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের কথা। ঢালাওভাবে যদি এ কথা না বলি তবে বলবো হ্যা কিছু ছেলে-মেয়ে এখনও ভালো আছে। ভালো করছে। তবে তারা এক পাসে চলে গেছে। আমি বলবো যারা আমাদের সমাজপতিরা আছেন, যারা শিক্ষক আছেন, যারা আগামীতে পথ দেখাবেন, তারা যেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় গলদ আছে, তা নিয়ে ভাবেন। এই গলদগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার জোর দাবি উঠেছে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে। তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক মনে করছেন? মাহফুজা খানম: এখন সেশনজট আগের মতো নেই। ৩৫ বছরে যদি একটি ছেলে বা মেয়ে চাকরি জীবনে ঢোকে। তো সে জীবনে অন্য কাজগুলো কিভাবে করবে? তার একটা সংসার জীবন হবে। তার পেশাগত জীবন হবে। তাকে দক্ষ ও পেশাদারি হতে হবে। যদি ৩৫ বছরে চাকরিতে প্রবেশ করে তবে এ দক্ষ হওয়ার সময়টা কখন পাবে? আমি তো চাকরিতে ঢুকেছিলাম ২২ বছরে। আমি মনে করি ৩০ বছর-ই যথেষ্ঠ। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছে। আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিভাবে দেখছেন তাদের এ কোটা সংস্কার দাবিকে? মাহফুজা খানম: তুমি ভালো ছাত্র- আর আমি খারাপ, কিন্তু কোটার কারণে আমি চাকরি পেলাম। তুমি বেকার থাকলে এটা হতে পারে না। আমি মনে করি মেধাকে সর্বোচ্চ স্থান দিতে হবে। কোটা পিছনে পড়ে থাকাদের জন্য থাকতে পারে। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য থাকতে পারে। আমি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু এ কোটা কখনও কাজে লাগায়নি। সার্টিফিকেটও নেয়নি। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে চাই-যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা মুক্তিযোদ্ধা ও তার সন্তানদের ক্ষেত্রে ঠিক আছে। অর্থাৎ নাতি-নাতনী পর্যায়ে সঠিক নয়। আমার কথা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সম্মানের জায়গাতে থাকবে। তাদের অর্থ দেয়া হচ্ছে, বাড়ি করে দেয়া হচ্ছে, আরো কিছু দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোটা রাখা হবে এটা আমি একেবারেই সমর্থন করি না। এমজে/

চাকরির চাহিদা ও শিক্ষার সমন্বয় হলে কেউ বেকার থাকবে না: আমিনুল হক

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনসংখ্যার বোনাসকাল পার করছে দেশ। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারেও প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ, বিশাল এ অর্জন ও সম্ভাবনার পেছনে চ্যালেঞ্জ ও তা টপকানোর উপায় কি হতে পারে। অন্যদিকে একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? এসব নানাবিধ প্রশ্নের সূলক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুল হকের। একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) অনলাইনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশ জনসংখ্যার বোনাসকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আবার স্বল্প উন্নত থেকে উন্নয়নশীলের কাতারে প্রবেশ করেছে।সবই আমাদের অর্জন। এ অর্জনের সুফল পেতে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমাদের দরকার সঠিক অ্যাসেসমেন্ট বা গবেষণা।গবেষণার মাধ্যমে জানতে হবে আমাদের দেশে কোন কোন খাত সম্ভাবনাময়।সেখানে কি পরিমান ও কি কি বিষয়ে লোক লাগবে। অর্থাৎ আমাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিযে বেকারত্ম ঘোচাতে দরকার চাকরির বাজারের উপর সঠিক পরিসংখ্যান।পরিসংখ্যান অনুযায়ী চাকরির চাহিদা ও শিক্ষার সমন্বয় করতে পারলে বেকারত্ম থাকবে না। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব আজ প্রকাশিত হলো- একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) অতিবাহিত করছে দেশ। এ সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারছে বলে আপনি মনে করেন? আমিনুল হক: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুযোগ আমাদের জন্য খুবই সৌভাগ্যের। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কতটা কাজে লাগাতে পেরেছি এর মূল্যায়নে আমি দেখবো-আমাদের কর্মক্ষম মানুষগুলো কর্মে নিয়োজিত আছে কি না।তাদের কর্মে নিয়োজিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা আমরা দিতে পেরেছি কি না। দেশে কর্মে নিয়োজিত হওয়ার জন্য কাঠামো আমরা তৈরি করতে পেরেছি কি না। কর্মক্ষম লোক কি ধরণের কাজে নিয়োজিত হবে রাষ্ট্র বা সরকার সে সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে কি না? দেশে কি পরিমান কর্মসংস্থান হবে, দেশের বাইরে কি পরিমান কর্মসংস্থান হবে এবং কিভাবে হবে সেগুলো আমরা কর্মক্ষম মানুষের কাছে বলতে পেরেছি কি না। অর্থাৎ কর্মক্ষম লোককে কাজে নিয়োজিত হওয়ার আগে প্রস্তুতি পর্বেই তাদের এ প্রশ্নগুলোর সমাধান দিতে পেরেছি কি না। এই প্রশ্নের উত্তর বা সমাধানের মধ্যেই আছে জনসংখ্যার বোনাসকালের সুফল। বাংলাদেশের ২০১৬-১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট ৩ কোটি ৩২ লাখ লোক কর্মক্ষম। কিন্তু সেই যুব জনগোষ্ঠী কি কাজ চায় এবং আমরা কি কাজ দিতে পারবো তার মধ্যে সমন্বয় করতে পেরেছি। যদি সমন্বয় না করতে পারি তবে আমাদের ব্যর্থতা। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের এ সুযোগ আসলে কিভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে? আমিনুল হক: এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দুইভাবে আমরা কাজে লাগাতে পারি।একটা হচ্ছে দেশে। অন্যটি দেশের বাইরে।দেশের ভিতরের গুলি হলো সরকারি, বেসরকারি ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে।অর্থাৎ সরকারি পর্যাযে বছরে কি পরিমান নিয়োগ হবে তা নিশ্চিত করতে হবে।বেসরকারি পর্যায়েও কি পরিমান নিয়োগ হবে তাও নিশ্চিত করতে হবে।আবার ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।যেমন আমার গার্মেন্টস খাতে কতজন লোক লাগবে।কি কি বিষয়ে লাগবে।তা নিশ্চিত করতে হবে।এভাবে আমাদের সব খাতে কি পরিমান লোক লাগবে তার হিসেব করতে হবে।দেশের যতগুলো খাত আছে সব খাতে কি পরিমান লোক লাগবে তার সুস্পষ্ট ধারণা কর্মক্ষমদের দিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশেও কি পরিমান লোক লাগবে এবং কোন কোন খাতে লোক লাগবে তার ধারণাও স্পষ্ট হতে হবে।তবে তারা পছন্দ অনুযায়ী কর্ম বেছে নিতে পারবে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের দক্ষও করে তোলার সুযোগ পাবে। আমরা এখনও কোন গবেষণা করি নাই যে আগামী ২০২৫ সাল বা ২০৩০ সালে দেশে কোন কোন খাতে বেশি লোক লাগবে। কি পরিমান লোক লাগবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? আমিনুল হক: ওই যে চাকরির বাজারের উপর আমাদের কোন গবেষণা নেই। ফলে একটা ছেলে অনার্স-মাস্টার্স পাসের পর ১০টা চাকরিতে আবেদনের পর যখন সে চাকরি পাচ্ছে না। তখন সে বিদেশ বেঁছে নিচ্ছে। অথবা উদ্যোক্তা হচ্ছে। এখন যদি হিসেব থাকতো যে দেশে আর কোন চাকরির পদ খালি নাই। তবে সে সময় নষ্ট না করে লেখা-পড়া শেষ করেই বিদেশ, উদ্যোক্তা বা কোন ব্যবসা বেঁছে নিতো।অথবা গবেষণা অনুযায়ী যদি জানানো যেত তাদের এই এই খাতে লোক নেয়া হবে। তখন তারা সে অনুযায়ী লেখা পড়া করে সহজেই চাকরি পেত। বেকারত্মও কমতো। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: তবে কি চাকরির বাজার চাহিদা অনুয়ায়ী শিক্ষার্থীরা লেখা-পড়া না করার করাণে-ই বেকারত্ম বাড়ছে? আমিনুল হক: একেবারে-ই তাই।চাকরির বাজারে যে পরিমান লোক দরকার আর আমরা যে পরিমান সনদ দিচ্ছি, তারমধ্যে সামাঞ্জস্যতা নেই।আমাদের দেশে যদি বেসরকারি ৬৭টি আর সরকারি যদি ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় ধরি। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলায় প্রতিবছর কতজন ভর্তি করানো হচ্ছে। ইংরেজিতে কতজন ভর্তি করানো হচ্ছে। কতজন সেখান থেকে পাস করে বের হচ্ছে।সেটা কি দেশ ও বিদেশের চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী হচ্ছে।তার কোন হিসেব আমাদের কাছে নেই।এ হিসেবে না জানার কারণে অনেকে শিক্ষিত হচ্ছে, সনদ নিচ্ছে, কিন্তু সে অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে যেটা দরকার নেই। সেই বিষয়ে শিক্ষা লাভ করা হচ্ছে।শেষমেষ সে শিক্ষা তার কর্মজীবনে কাজে লাগছে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরির বাজার চাহিদা বিবেচনায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? আমিনুল হক: বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকগুলো বিষয়-ই কর্মমুখী না। জ্ঞান অর্জনের জন্য সবগুলি ঠিক আছে। কিন্তু তার সবগুলো কর্মোপযোগী না।শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে দেশে কি পরিমান ও কোন কোন বিষয়ের লোক লাগবে। তা জানার পর পাঠ্য বইয়ে সে বিষয়গুলির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে।তবেই শিক্ষার্থীরা একাডেমিক লেখা-পড়া শেষ করেই কর্মে ঢুকতে পারবে। তাদের কোন অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া লাগবে না। আমাদের একটি ছেলে বা মেয়ে যখন গ্রাম থেকে স্কুল কলেজ কৃতিত্বের সাথে পাস করে ভালো রেজাল্ট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আসে। সে বিশ্ববিদ্যালয়েও ভালো রেজাল্ট করে।কিন্তু সে যখন বের হয়ে যায় তখন তার মলিন মুখে তাকানো যায় না।কারণ সে সময় নিজেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে।তারা বলে, স্যার এখন তো নিজেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস একটা মেয়ের চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি।কারণ পৃথিবীর সব রঙ দেখলাম। কিন্তু আমার এখন কোন কিছু নেই।আপনারা এতোদিন বলেছেন চাকরি নিতে শিক্ষা অর্জন করতে হবে।শিক্ষার শেষ পর্যায়ে এসে আমার চাকরি নাই। বয়স নাই। আমাকে ঘিরে পরিবার-পরিজনের স্বপ্নও ধূসর হয়ে যাচ্ছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হয়েছে। এখন বাংলাদেশকে পর্য্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পর্য্যবেক্ষণকালে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে গিয়ে আমাদের কী ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা লাগতে পারে এবং সে চ্যালেঞ্জগুলো টপকানোর উপায় কি? আমিনুল হক: আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পর্যবেক্ষণের তালিকায় উঠেছি। এটা আমাদের একটা অর্জন। এখান থেকে পেছানোর কোন সুযোগ নেই।তবে সামনে যে আমাদের অনেকগুলো ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে।যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা অর্জন। বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি।রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা। / এআর /

পাঠ্য বই হতে হবে চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী: আলী আহসান

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর ৩ থেকে ৪ বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের বা জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে। যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। কিন্তু কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে সে কর্মক্ষমের সুযোগ? এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আলী আহসানের। তিনি বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েরা যে হারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করছে সে হারে চাকরি হচ্ছে না। কারণ আমাদের চাকরির বাজার সংকীর্ণ। আমাদের ছেলে-মেয়েদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিধিও কম। তারা সর্টিফিকেট নিচ্ছে কিন্তু ভিতরে জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষিত ও জ্ঞানী না হওয়ার কারণে তারা চাকরি পাচ্ছে না। তাদের বদলে বাহিরের লোক এসে চাকরির বাজার দখল করে নিচ্ছে। তাই ছেলে-মেয়েদের চাকিরির উপযোগী করে তুলতে জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে।  বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যবই তৈরি করতে হবে। দুই পর্বের সাক্ষাতকারটি প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে দেশ। অথচ সরকারি হিসেবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে কেন কাজে লাগাতে পারছি না? মূল সমস্যা ও সমাধান কোথায়? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? আলী আহসান: আমাদের শিক্ষিতের হার বাড়ছে কিনা বলতে পারবো না, তবে সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা বাড়ছে এটা বলতে পারি। আপনি যেখানেই যাবেন, হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শর্টকাটে পড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আমরা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। তাতে অবিজ্ঞতা হলো যে সর্টকাটে পড়াতে পারলেই ভালো শিক্ষক। যারা বেশি পড়ায় বছর শেষে দেখা যায় তার গ্রেট অনেক নিচে নেমে গেছে। বেশি পড়ানো শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে মূল্যায়ন করে না। কাজেই আমরা একেবারেই শর্টকাটে চলে গেছি। গত বছর পরীক্ষায় যতটুকু পড়েছিল, শিক্ষক পড়িয়েছে ৫ পাতা, আর সিলেবাসে আছে ১০ পাতা। এসব কিছু কাটছাট করে আড়াই পাতা পড়েই আমাদের ছেলে-মেয়েরা পরীক্ষা দিচ্ছে। যার কারণে তাদের জ্ঞানের প্রসার ঘটছে না। সর্টকাটের কারণে আমাদের ছেলে-মেয়েদের জ্ঞান ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমাদের প্রাইমারি লেভেল থেকে সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত  ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যাসিকে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। যার কারণে তারা উপরে এসে হাবিডুবি খাচ্ছে। চাকরির জন্যও যোগ্য হয়ে উঠছে না।   একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) এর সুযোগ কাজে লাগাতে আমাদের করণীয় কি হতে পারে? আলী আহসান: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের অ্যাডভ্যান্টেজ অনেক দেশই নিয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের পর বাঁচ্চার সংখ্যা হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেল। পরে ওই বাঁচ্চারাই বড় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিল। আমাদের দেশেও তেমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা কি আমাদের সে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজের উপযোগী দক্ষ করে তুলতে পেরেছি। না পারি নাই। চাকরির বাজারের পরিবর্তীত চাহিদা অনুযায়ী কি তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছি। পারি নাই। আমাদের গার্মেন্টসগুলোতে যান। দেখবেন আগে যে কাজগুলো মানুষ করতো এখন তার অনেকটা ম্যাশিনে করছে। আর সেই একটি ম্যাশিন ১শ’ মানুষের কাজ করছে। ফলে ম্যাশিনের ওই কাজ শিখে বসে থাকলে তো বেকারই থাকতে হবে। কারণ যে কাজ এখন ম্যাশিনে হচ্ছে তার জন্য তো কোন প্রতিষ্ঠান ইমপ্লয়ি নিয়োগ দিবে না। তবে ইমপ্লয়িকে কি করতে হবে। ওই ম্যাশিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তবেই আমাদের দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগানো সম্ভব হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? আলী আহসান: আগেই বলেছি গার্মেন্টসে এখন একটি ম্যাশিন কাজ করছে ১শ’ লোকের। তাই আমাদের কাজের পরিধি কমে আসছে। যতদিন আমরা ওই ম্যাশিন পরিচালনার প্রশিক্ষণ না নিতে পারছি। ততদিন বেকারের সংখ্যা বাড়বে। আর ম্যাশিন পরিচালনা করবে বিদেশীরা এসে। তারা নিয়ে যাবে দেশের বড় একটি অংশ। কারণ তাদের শিক্ষার বিষয়ে ম্যাশিন পরিচালনা ছিল। তারা শিক্ষার সঙ্গে শিখেছে কিভাবে ম্যাশিন পরিচালনা করতে হয়। আমাদের ক্রিয়েটিভ প্রকৃত জ্ঞানিদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফলে তারাই আমাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হয়েছে। এখন বাংলাদেশকে ৬ বছর পর্য্যবেক্ষণে রাখা হবে।পর্য্যবেক্ষণকালে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে গিয়ে আমাদের কী ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা লাগতে পারে? আলী আহসান: উন্নয়নশীল হলে আমাদের কিছু ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে। যেমন আমাদের অর্থনীতির প্রাণ গার্মেন্টস খাত বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়।যেগুলো উঠিয়ে নেওয়া হবে। তাই আমাদের যাতে সেটা না উঠাতে পারে তার জন্য দেনদরবার করতে হবে। আর একান্ত উঠিয়ে নিলে তার বিকল্প  কিছু বের করতে হবে। আবার আমাদের স্বল্পসুদে যে বৈদেশীক ঋণ পায়তাম তাও উঠে যাবে। সে জন্য আমাদের বিকল্প ঋণের উৎস্য খুঁজতে হবে। এছাড়া আমাদের প্রকৃতিক দুর্যোগসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে। তা না হলে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েও আমাদের কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে। আরকে/ এআর /    

মেধার মূল্যায়নে বন্ধ করতে হবে শিক্ষা বাণিজ্য: সিরাজুল ইসলাম

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। অনেকেই কোচিংও করেছেন। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের বা জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে। যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। এই সুযোগটা কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অধ্যয়ন অনুষদের সাবেক ডিন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও একই বিভাগের অধ্যাপক মো. সিরাজুল  ইসলামের। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রতিবছর শিক্ষিতের হার বাড়ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্র তত বাড়ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে যখন এ বেকারত্মের সংখ্যা বাড়ছে। ঠিক তখন আবার বিদেশীরা আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিচ্ছেন। যা আমাদের চাকরির বাজারকে সঙ্কুচিত করছে। তবে এর জন্য আমাদের শিক্ষা বাণিজ্যও অনেকটা দায়ী। বাণিজ্যের আড়ালে আমাদের ছেলে-মেয়েরা লেখা-পড়া না করেই বছর শেষে সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতায় ঘাটতি থাকায় আমাদের ছেলে-মেয়েদের সে সার্টিফিকেট চাকরির পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন কাজে আসছে না।তাই আমাদের ছেলে-মেয়েদের  প্রকৃত শিক্ষিত, জ্ঞানি ও দক্ষ করে তুলতে হলে, তাদের মেধার মূল্যায়ন করতে হলে, চাকরি  উপযোগি করতে হলে দরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান অসুস্থ্ বাণিজ্য। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির শেষ পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে কোচিংয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বাণিজ্যের বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?  সিরাজুল ইসলাম: আসলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোন একটি খাত গড়ে উঠলে প্রাথমিকভাবে সেখানে কিছু অনিয়ম হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা এদেশে বেশিদিন আগে হয়নি। বড়জোর ২০ বছর আগে থেকে এর প্রসার ঘটেছে। এখন সময় এসেছে এগুলোকে তদারকি করার। তারা কি পড়ায়, কি পরিমান টাকা তারা আয় করছে। সরকারের খাতায় কি পরিমাণ দিচ্ছে।তাদের আরোপিত বিভিন্ন ফি শিক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে কি না।  আমাদের একটি ছেলে গ্রাজুয়েট পাসের পরও ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। কিন্তু এই দেখুন পাশের দেশ ভারত।এখানকার সব ক্রিকেটার সহজেই ইংরেজি বলতে পারে। আর আমাদের অনেক ক্রিকেটার ইংরেজি ভালো বলতে পারে না। শিক্ষাঙ্গনে আমাদের ইংরেজিসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছু যোগ হয়নি। যার কারনে ক্রিড়াসহ যব মার্কেটেও আমরা পিছিয়ে পড়ি। আসলে আমরা যে ধরণের লেখা-পড়া করার দরকার সে ধরণের লেখা-পড়া করাচ্ছি না। সেই মানের লেখা-পড়া আমরা না করিয়ে বছর শেষে সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছি। যে সার্টিফিকেট আসলে কোন কাজেই আসছে না।তাই শিক্ষা বাণিজ্যের যে অভিযোগ রয়েছে এটা অহেতুক নয়। এটা বন্ধে সরকার তথা রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষা বাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে শিক্ষায় বস্তুনিষ্ঠতা আসবে। দেশে প্রকৃত শিক্ষিত, দক্ষ ও জ্ঞানি মানবসম্পদ গড়ে উঠবে।তখনই দেশে টেকসই উন্নয়ন হবে। জ্ঞানের ঘাটতি রেখে কেউ সার্টিফিকেট না পেলে আগামী প্রজন্ম প্রকৃত জ্ঞানি হয়ে উঠবে। কেননা তারা বুঝবে যে অধ্যায়ন বা শিক্ষা ছাড়া সার্টিফিকেট   মিলবে না। কাজেই আমাকে প্রকৃত অর্থে শিখতে হবে। জানতে হবে। তখন আামদের গ্রাজুয়েটদের একটি মেইল লিখতে বা ইংরেজিতে কোন আবেদন করতে দূর্বলতা দেখা যাবে না। তারা অন্যান্য দেশের মতো শানিত মেধার অধিকারি হবে। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার মেধার মূল্যায়ন হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাকে কীভাবে নিরেট সেবায় রূপান্তর করা যায়? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের দেশের স্কুল ও কলেজগুলোতে লেখা-পড়া হয় কতদিন।বছরে তারা সময় পায় ১২ মাস। যার মধ্যে গৃষ্মের বন্ধসহ নানাবিধ বন্ধে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার মাস বন্ধ থাকে। এর ভিতরে আবার প্রতিষ্ঠানে এসএসসি পরীক্ষা, অনার্স পরীক্ষা, মাস্টার্স পরীক্ষা হচ্ছে।এতোসব পররীক্ষার সময় ক্লাস হয় কম। এসবের  মধ্যে একজন শিক্ষক পড়ানোরই সুযোগ পায় না।আর শিক্ষকের পাঠদানের ঘাটতিতে ছাত্ররা কোচিংয়ের উপযোগীতা অনুভব করে।যার কারণে কোচিং প্রসার দিনের পর দিন বাড়ছে। কোচিংগুলো সবই খারাপ না। তারা কিছু জানে বা জানায়-শিখায়। এখন কলেজ বা স্কুলে আমরা যদি ঠিকমতো পড়াতে না পারি।সময়টা ঠিকমতো না দেয়।স্বাভাবিকভাবে অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন।অভিভাবকরা চায় তার সন্তান যেন প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এসে বিশ্ববিদ্যালযে ভর্তি হতে পারে।আগে স্কুল বা কলেজে এতো পরীক্ষাও ছিল না। আবার প্রতিযোগিতাও ছিল না।বিভিন্ন পরীক্ষার পাশাপাশি কলেজগুলোতে থাকে ক্লাস নেওয়া তাড়া। সবকিছুর ডামাডোলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতি তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।শিক্ষকরা মনে করি আমি গবেষণা বা ক্লাসের ফাঁকি দিয়ে বাইরে একটা ক্লাস করাই সেখানে লাভ বেশি।লাভের বিষয়টি সেখানে বড় হয়ে দেখা দেয়। যেটা সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করা উচিত। সরকারকেও ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া উচিত।যেমন শিক্ষক যেন তার ক্লাস টাইম তথা সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কোন কোচিং বা প্রাইভেট না পড়াতে পারে সে জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সনদনির্ভর। দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। এগুলোর চর্চার অভাবে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়? সিরাজুল ইসলাম: আমরা শিক্ষক বা ছাত্র কেউই সমাজের বিচ্ছিন্ন অংশ নয়।যখন দেখা যায় পরিবারে কারো সঙ্গে কারো ভালো সম্পর্ক নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।এটা আমার দলের না। সেটা আমার দলের। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। তার সঙ্গে করো না।পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকট হয়েছে।যেখানে শিক্ষকরাও জড়িয়ে পড়েছে। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।যার ফলে দেখা যায় শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ আগের তুলনায় কম। এছাড়া মাদকের একটা ভয়াবহ রূপ আমাদের গ্রাস করেছে।এই মাদকের কারণে যে লোকটাকে আমরা উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে পারতাম।সেটা পারছি না।উল্টো তরুণ সমাজ এর ছোবলে নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে নানা অকারণে জড়িয়ে পড়ছে। খুব দ্রুত আমাদের দেশে মাদক ছড়িযে পড়ছে।কারণ একটা লোক দেখে উৎপাদনমুখী কাজে তার আয় হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। আর মাদকের কাজে গেলে তার আয় হচ্ছে ১০ লাখ টাকা।কাজেই মাদকগুলো বন্ধ করা এবং তাদের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি করার উপর জোর দিতে হবে। / এআর /  

বেকারত্ব ঘোচাতে দরকার বেসরকারি খাতের উন্নয়ন: সিরাজুল ইসলাম  

একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। অনেকেই কোচিংও করেছেন। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়? অন্যদিকে দেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের বা জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে। যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। কিন্তু কতটা কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অধ্যয়ন অনুষদের সাবেক ডিন, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও একই বিভাগের বর্তমান অধ্যাপক মো. সিরাজুল  ইসলামের। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রতিবছর শিক্ষিতের হার বাড়ছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্র তত বাড়ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এ বেকারের সংখ্যা কমাতে দরকার দেশে বেসরকারি খাতকে আরও বেশি এগিযে নেওয়া। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে দরকার ‘বেসরকারিখাত উন্নয়ন নীতি’। এটা করা গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগানো সহজ হবে। দেশ উন্নয়নশীল হওয়ার মর্যাদাও ধরে রাখা সহজ হবে। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব আজ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ অতিবাহিত করছে দেশ। অথচ সরকারি হিসেবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে কেন কাজে লাগাতে পারছি না? মূল সমস্যা ও সমাধান কোথায়? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের দেশে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমান ছাত্র পাস করে বের হচ্ছে, সেই তুলনায় চাকরির সুযোগ হচ্ছে না। এর কারণ হলো- দেশের বেসরকারিখাতে প্রয়োজনীয় পলিসি না থাকা। চাকরিটা মুলত আসবে বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু বেসরকারি খাতে যে ধরনের পলিসি দরকার ছিল, সে ধরনের পলিসি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অর্থাৎ কোপ্রাইভেট সেক্টর ডিভলপমেন্ট পলিসি দরকার। প্রাইভেট সেক্টর সামনে আগাতে গেলে যে বাঁধাগুলো পড়ে সেগুলো সরকারকে দূর করতে হবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। কারণ বৃহৎ এ শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সবাইকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া সম্ভব না। সে জন্য সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে চাকরি পাওয়ার উপযোগী করে তুলতে হবে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: জনসংখ্যার বোনাস যুগ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) এর সুযোগ কাজে লাগাতে আমাদের করণীয় কি হতে পারে? সিরাজুল ইসলাম: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগাতে আমাদের ইনকাম জেনারেটিং এক্টিভিটিসগুলো বাড়াতে হবে। যেমন আমাদের দেশে বিভিন্ন এনজিও আছ। তারা গ্রাম পর্যায়ে হ্যান্ডিক্রাফ্ট ও নকশি কাঁথাসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনে নারীদের কাজে লাগায়। সেখানে কিন্তু সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ রয়ে গেছে। আমাদের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়াতে হবে। তাতে এ ধরনের শিক্ষিত যুব সমাজকে কাজে লাগানো চেষ্টা করতে হবে। তবেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট কাজে লাগানো যেতে পারে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের দেশে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে ম্যানেজমেন্ট লেভেলে চাকরির জন্য মূলত শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীন ও কোরিয়া থেকে আসে। কারণ আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা বাইরের এসব লোকদের বেশি পছন্দ করে। দুটি কারণে তারা বাইরের এসব ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়। প্রথমটি হলো- বাইরের লোকদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। দ্বিতীয় হলো- বাইরের লোকজন তাদের বিভিন্ন ধরনের যুব এক্সপেরিয়েন্স নিয়েই তারা আসছে। তাদের দিয়ে কাজটা অনেক সহজ হয়। কিন্তু আমাদের দেশের লোকজনকে এই লেভেলে নিলে বিভিন্ন ধরনের পলিটিক্স ঢুকে যায়। যেখানে বিভিন্ন ধরনের গ্রুপের সুবিধা কাজ করে। তাই আমাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরনের ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট দরকার। আমাদের আছে যেমন বিএমডিসি ও বিআইবিএম। এ ধরনের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আরও বেশি দরকার। সেখানে আমাদের ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারাই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট লেভেলে চাকরি পাবে। তখন বিদেশিদের ওপর নির্ভর করতে হবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? সিরাজুল ইসলাম: চাকরির বাজার আসলে কি ধরনের দক্ষ লোক চায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি ধরনের গ্রাজুয়েট প্রডিউস করছে? এ দু’টার মধ্যে কোন সমন্বয় বা সমতা নেই। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ। এখানে আমরা আমাদের নিজস্ব আঙ্গিকে সিলেবাস তৈরি করি। জব মার্কেটে ন্যাশনাল ব্যাংক কি চায়। প্রাইম ব্যাংক কি চায়। বেসরকারি অন্য প্রতিষ্ঠান কি ধরনের দক্ষ লোক চায়। সেদিকে আমাদের নজর নেই। অপরদিকে প্রত্যেকটা প্রাইভেট ভার্সিটি তাদের সিলেবাস নিজেস্ব আঙ্গিকে তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাস তৈরি করে। তাদের সিলেবাসের বিষয়গুলো ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একটা যোগসূত্র থাকে। ফলে সেখানে ছেলে-মেয়েরা লেখা-পড়া শেষের সঙ্গে সঙ্গে কোথাও না কোথাও চাকরির সুযোগ নিতে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাসের সঙ্গে ইন্ডস্ট্রির চাহিদার কোন মিল নেই। ফলে গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করার পরও তাদের বেকার থাকতে হয়। সিলেবাস চাহিদা অনুযায়ী না হওয়ার কারণে ছাত্রদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা কাজ করে। কোনটা নিয়ে পড়বে আর কোনটা নিয়ে পড়বে না। এ জন্য দেখা যায় একজন ছাত্র এসএসসি পর্যন্ত হয়তোবা বিজ্ঞান শাখায় পড়লো। এসএসসি পাসের পর দেখা যায় সে বিজ্ঞান বাদ দিয়ে মানবিকের কোন সাবজেক্ট নিয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে আমাদের করণীয়টা আসলে কি হতে পারে? সিরাজুল ইসলাম: আমাদের শিক্ষার একটি বড় অংশই কর্মমুখী নয়। কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে প্রয়োজন শিল্প উদ্যোক্তাদের মতামত নেওয়া। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানতে হবে তাদের কি ধরনের লোক দরকার। সিলেবাসে কি কি হলে আপনাদের সঠিক দক্ষতাসম্পন্ন লোক দিতে পারি। যেমন আমাদের মেডিকেলগুলোতে নার্সের ব্যাপক চাহিদা আছে। সে কারণে কেহ নার্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে বেকার থাকে না। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজারমুখী সাবজেক্ট পড়ানো হয়। বিবিএ এমবিএসহ চাকরির চাহিদা সম্পন্ন মেজর সাবজেক্টগুলো এখানে পড়ানো হয়। এ রকম আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মার্কেট ওরিয়েন্টেড সাবজেক্ট হলো শিক্ষার্থীদের বেকার থাকতে হতো না। তাহলে সমস্যা অনেকটা সমাধান হয়ে আসবে। অন্যদিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিভালপমেন্ট প্রসেসে যেভাবে ইন্ডাস্ট্রিগুলো হওয়া উচিৎ। সে প্রকৃয়া খুব ধীর গতির। আমাদের কৃষিক্ষেত্রকে আরও ম্যাকানাইজ করতে হবে। তাহলে শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কৃষিতেও কাজ করার সুযোগ থাকবে। তারা কৃষিতে তারা লেবারের কাজ করবে না। তারা ম্যাশিনের কাজ করবে। ফুড প্রসেসিং থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে সফিস্টেকেটিড ওয়েতে কাজ করতে পারবে। এভাবেই আমাদের কৃষি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলে আমুল পরিবর্তন আনতে পারলে চাকরির সুযোগ বাড়বে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হয়েছে। এখন বাংলাদেশকে ৬ বছর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। পর্যবেক্ষণের সময় উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে গিয়ে আমাদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হতে পারে? সিরাজুল ইসলাম: উন্নয়নশীল দেশ এক দিনে হয়নি। এটা অনেক দিনের ফসল। এটাকে সামনে নিয়ে যেতে গেলে অর্থনীতির সব খাতকে চাঙ্গা করতে হবে। আমাদের শেয়ারমার্কেট, হাউজবিল্ডিং, রফতানি, বিনিয়োগ, পণ্যের উৎপাদন সবকিছু বাড়াতে হবে। কারণ  আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়াতে হবে। এসবগুলো নজরে রাখলে আমাদের উন্নয়নশীল হওয়াটা টেকসই ও অর্থবহ হবে।   এসএইচ/    

পিএসসি-জেএসসি ও এমসিকিউ বাদ দিতে হবে : মনজুরুল ইসলাম

কথা‌সাহিত্যিক, শিক্ষা‌বিদ  ও রাজনৈ‌তিক বি‌শ্লেষক হি‌সে‌ব সুপ‌রি‌চি‌তি অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। প্রতিথযশা এ শিক্ষাবিদ শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে আসছেন। যেগুলো জাতির জন্য দিশা হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান শিক্ষা ও প‌রীক্ষা পদ্ধ‌তি এবং কোটা পদ্ধতির সংস্কার, চাকরিতে প্রবেশের বয়সীমাসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জানতে সম্প্রতি একুশে টিভি অনলাইন মুখোমুখি হয় এ শিক্ষাবিদের। তি‌নি মনে করেন বাংলাদেশের সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার গুণগত মানে পরিবর্তন আনতে হবে। সনদমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে উৎপাদনমুখী শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাথা থেকে পরীক্ষার বোঝা কমাতে হবে।  সেজন্য পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষার পাশাপাশি এমসিকিউ পরীক্ষাও তুলে দিতে হবে।

‘চাকরির বাজার বিবেচনায় শিক্ষায় পরির্বতন আনতে হবে’

বর্তমানে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনসংখ্যার বোনাসকাল) কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কোনো দেশে যদি ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কর্মক্ষম থাকে তাহলে সে দেশকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের আওতাভুক্ত করা হয়। সে হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ডেমোগ্রাফিকট ডিভিডেন্ডে প্রকাশ করছে। ইউএনডিপির তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালের সুবিধা ভোগ করছে (১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের জনসংখ্যার অধিক্য)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ গ্রহণ করে ইতোমধ্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে জিডিপির প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিকভাবে বহু দূর এগিয়ে যাবে। আর ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডেকে যথাযথভাব কাজ লাগতে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন দরকার। এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মাদ আলী আক্কাস। সম্প্রতি একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান। একুশে টিভি অনলাইন : ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট (জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল) প্রবেশ করেছে দেশ। এ সুযোগটা আমরা কতটা কাজে লাগতে পারছি বলে আপনি মনে করেন ?    অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বাংলাদেশে ২০০৭ সালে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল শুরু হলেও পুরোপুরি প্রবেশ করছে ২০১৪ সাল থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। দেশের ১০ কোটি ৬১ লাখ লোক রয়েছে কর্মক্ষম। এর মধ্যে আমাদের কর্মশক্তি শ্রমিক রয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ। উন্নত এবং উন্নয়নশীল খুব কম দেশই এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পেয়েছে। এই শ্রমশক্তিকে আমরা বাজার মুখী পড়াশোনা, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলে এরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে। আমরা এই সুযোগটা পুরোপোরি কাজে লাগতে পারছি না। আমাদের এ জনসংখ্যাকে জনসম্পদ  সৃষ্টি করতে দরকার শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। এ সব মানুষকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে জনসংখ্যাকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ মানুষ কখনও বেকার থাকে না। গ্রামের মানুষ অশিক্ষিত হলেও বেকার নেই কারণ তারা নিজেদের কাজে দক্ষ। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত লোক ৬০ শতাংশ বেকার। এর মূল কারণ শিক্ষার্থীদের বাজারমূখী শিক্ষা দিতে পারছি না। চাকরির বাজারে কোন বিষয় চাহিদা আছে এচিন্তা মাথায় রেখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরির্বতন করতে হবে। দেখতে হবে বাজারে কি চাকরির চাহিদা বেশি্ এবং তা পেতে কি কি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন সেসব বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের শিক্ষা বব্যস্থা বাজারমূখী করতে হবে। আমাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা চাকরির সঙ্গে কোন সর্ম্পক নেই। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বর্তমান বাজারের চাকরির কথা মাথায় রেখেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাস নির্ধারণ করতে হবে। বাজারমূখী ‍শিক্ষাব্যবস্থা না থাকার কারণে আমাদের দেশের বেশি বেতনের চাকরিগুলোতে আমেরিকা, ভারত, ভুটানের লোকেরা করছে। আমাদের শিক্ষা কৌশলগত পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষকদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষ শিক্ষক অভাবের ফলে শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে দক্ষ হচ্ছে না। ফলে চাকরি পেতে অনেক দুর্ভোগ পেতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। একুশে টিভি অনলাইন : এসুযোগ কাজে লাগাদে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সঠিভাবে কাজে লাগতে হলে আমাদের আগে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আকার পরিবর্তন করতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের মানুষের এই বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যাকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। চাকরির বাজারে গুরুত্ব কথা মাথায় রেখেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তিতে কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারলে কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। বর্তমানের চীনে তথ্য-প্রযুক্তিতে কাজ করে ১০ কোটি মানুষ। ভারতে এক কোটি মানুষ কাজ করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের কয়েক লাখ মানুষ এ খাতে কাজ করে। এর সংখ্যা বাড়াতে হবে। বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যাকে আইটিতে দক্ষ করে তুলতে পারি। দিনে দিনে আইটির প্রসার ঘটছে। ফলে আর কিছুদিন পর মানুষ বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করবে না। অনলাইনে বসে সব কিছু করবে। এ কারণে তথ্য প্রযুক্তি প্রসার বাড়তে হবে। এছাড়া আমাদের বিপুল সংখ্যাক জনশক্তিকে কৃষি, সার্ভিস সেক্টর, ই-বিসনেজে কাজে লাগতে পারি। একুশে টিভি অনলাইন : বিশ্বে আর কোন কোন দেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে (জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল) প্রবেশ করেছে। ওইসব দেশ কিভাবে এ সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: চীন, থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে প্রবেশ করেছে। অনেকেই এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। এ সুযোগ আমরা কাজে লাগতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা দরকার। বাজারমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আর শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা কেন্দ্রিক হওয়া উচিৎ। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। যুব সমাজকে সঠিকভাবে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য দেশগুলো কর্মক্ষম মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আগে ‘মাস্টারপ্ল্যান করেছে। সেই অনুযায়ী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সে অনুযায়ী  বাংলাদেশে এ বিষয়ে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাই নেই। একুশে টিভি অনলাইন : ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকাল) সুযোগ কাজে লাগাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো যে সব কৌশল নিয়েছে আমরা সেগুলো অনুস্মরণ করতে পারি কি না? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বিশ্ববাজারে চাকরির  ভিত্তিতে বাংলাদেশে বিপুল কর্মক্ষম মানুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাকে বাজারমুখী করতে হবে। চাকরি বাজারে বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত তাদেরকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা তাদের চাকরির বাস্তব অভিজ্ঞতা কথা বলবে। সঙ্গে সঙ্গে চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে কি কি করতে হবে তারা সেবিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে শেয়ার করবে। এর মধ্যমে দুপক্ষে মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা বৃদ্ধি পাবে। ছাত্রজীবনে রাজনীতি সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন :  দেশে প্রচুর কর্মক্ষম মানুষ। তারা কাজ পাচ্ছে না। এদের দক্ষ করে কাজে লাগাতে হলে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বিশ্বের অন্যান দেশের মতো আমরা বিপুলসংখ্যাক কর্মক্ষম মানুষকে কর্মংস্থান নিশ্চিত করতে পচ্ছি না। আমাদের দেশের মালিক শ্রেণির তেমন কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করছে না। মালিক শ্রেণির শ্রমিকদের ভালো করে প্রশিক্ষণ দিতে পাচ্ছে না। সমন্বয়ের অভাবে দক্ষ বা কোন প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়ায় আমাদের শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাচ্ছে। ফলে অন্যন্যা দেশের শ্রমিক থেকে আমাদের শ্রমিকরা বেতন কম পায়। একুশে টিভি অনলাইন : অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। কিভাবে আমরা এর সঠিক ব্যবহার করতে পারি? অধ্যাপক এম এ আক্কাস : প্রত্যেক দেশে বিভিন্ন সময় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (কর্মক্ষম বা জনসংখ্যা) সুযোগ আসে। বাংলাদেশেও ২০০৭ সালে আসলেও পুরোপরি এসেছে ২০১৪ সালে। ইতোমধ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। সবার সম্মিলিতি প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সম্ভব। দেশ-বিদেশের কাজের সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলতে হবে। তাদের কাজে লাগাতে না পারলে এই সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হবো। একুশে টিভি অনলাইন : কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুষ্ঠু মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটা প্রশ্ন চলে আসে। আমরা সঠিকভাবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে পারছি কি না? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: আমরা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে পারছি না। আমাদের শ্রমিকদের সঠিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে পারছি না। আমরা যদি কোন শ্রমিকের গাড়ি চালক হিসেবে বিদেশে পাঠাই। যদি পাঠানোর আগে দেশে এক বছরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে সঠিক বেতন নিশ্চিত করতে পারতাম। একুশে টিভি অনলাইন: বর্তমানে বিপুলসংখ্যাক জনসংখ্যা দেশের জন্য বুঝা না সম্পদ? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: আমি কখনোই বুঝা বলবো না। কারণ আমরা যদি তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগতে পারি। তাহলে অবশ্যই সম্পদ হিসেবে পরিণত হবে। আমার মনে হয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার করা সরকারের দায়িত্ব। তেমনি কর্মসংস্থান সঠিক কাজের মাধ্যমে কাজটি ধরে রাখা আমাদের কর্তব্য। এসুযোগ যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থানের নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। একুশে টিভি অনলাইন : বর্তমানে কোন কোন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি বলে আপনি মনে করেন? অধ্যাপক এম এ আক্কাস: বর্তমানে  প্রযুক্তি খাতে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া পোষাক শিল্প অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। একুশে টিভি অনলাইন: আপনাকে ধন্যবাদ। অধ্যাপক এমএ আক্কাস: একুশে পরিবারকেও ধন্যবাদ। এসএইচ/

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি