ঢাকা, বুধবার   ২১ জানুয়ারি ২০২৬

‘নতুন বাংলাদেশ’র নীতিগত রূপরেখা তুলে ধরলেন জামায়াত আমির

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৮:২৯, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’র জন্য নীতিগত রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত পলিসি সামিট-২০২৬ এ এই রূপরেখা উপস্থাপন করেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। 

এতে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদাকে দেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখার কথা বলা হয়।

সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়, বরং ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশের জন্য শাসনব্যবস্থার নতুন দিশা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

গত ১৭ বছরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, সে সময় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণেরা তাদের অধিকার, কণ্ঠস্বর ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিল। ফ্যাসিবাদী শাসনের একটি ‘অন্ধকার সময়’ পার করে বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দেশ পুনর্গঠনের পথে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতাই বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও কর্মসংস্থানের মান কমেছে। দেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও স্বল্প মজুরিভিত্তিক।

এই বাস্তবতাগুলো সৎভাবে মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে।

জামায়াত আমির বলেন, দেশের বাইরে কর্মরত লাখো প্রবাসী শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পরিবারকে সহায়তা করার পাশাপাশি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। তবে তাদের অবদান শুধু অর্থেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি পেশাজীবী-শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা—আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের অনেকেই দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নতুন প্রজন্মকে পরামর্শ দেওয়া ও সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

জামায়াত আমির বলেন, বাংলাদেশের রয়েছে উর্বর জমি, বিস্তৃত নদীনালা, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি কৌশলগত অবস্থান।

এসব প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সম্পদ টেকসই প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বহুমুখী উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে। প্রশ্নটি আর বাংলাদেশে সম্ভাবনা আছে কি না—তা নয়; বরং প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান, নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই সম্ভাবনাকে কতটা সমৃদ্ধিতে রূপ দিতে পারছে।

অর্থনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আনার কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, কর্মসংস্থানকে বিনিয়োগের পার্শ্বফল হিসেবে নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ধীরে ধীরে অনানুষ্ঠানিক শ্রমকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। শ্রমিকের অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব সুযোগের সংযোগ ঘটাতে হবে। সামাজিক কল্যাণকে দান হিসেবে নয়, বরং অংশগ্রহণ সক্ষম করে এমন সামাজিক অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে সুশাসন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র যখন ন্যায্য ও পূর্বানুমেয়ভাবে সেবা দেয়, তখন নাগরিকদের মধ্যে আস্থা, আইন মান্যতা ও উদ্যোগ বাড়ে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার কথাও সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যকার অংশীদারত্বের ওপর। সম্পৃক্ততা, সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

জামায়াত আমিরের মতে, একটি স্থিতিশীল ও অগ্রসর বাংলাদেশ শুধু দেশের মানুষের স্বার্থেই নয়, বরং পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবারও এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ন্যায়বিচার (ইনসাফ), মর্যাদা ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। জনগণের শক্তি, প্রবাসীদের অঙ্গীকার, নারীর নেতৃত্ব, তরুণদের উদ্দীপনা এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহায়তায় বাংলাদেশ ন্যায্য, সমতাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সম্মেলনে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, কাঠামোগত নানা বাধা থাকা সত্ত্বেও নারীরা ইতিমধ্যে শিক্ষকতা, স্বাস্থ্যসেবা, উদ্যোক্তা, স্থানীয় নেতৃত্ব ও সামাজিক উদ্ভাবনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো দেশ টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।

এই পলিসি সামিটে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন,  ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কসহ ৩০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানসহ জেষ্ঠ সাংবাদিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা।

সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র  নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও  আ. ন. ম. শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আব্দুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রমুখ।

এএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি