ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১, || ফাল্গুন ২৪ ১৪২৭

বিশ্বাসী এক জোয়ান অব আর্ক

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:৩০, ২০ জানুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ১৩:৪৪, ২০ জানুয়ারি ২০২১

জোয়ান অব আর্ক। এক ফরাসি বীর যোদ্ধা, সেনাপতি ও বিপ্লবী। ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সকে বিজয়ী করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন এই বীর কন্যা। এত বড় কাজটি করার পেছনে তার একটাই শক্তি কাজ করেছিল, আর তা হচ্ছে ‘বিশ্বাস’। দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজের বীরত্বে আর বিশ্বাসে ইতিহাসে হয়েছিলেন মহানায়িকা। যদিও মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাকে পুড়িয়ে মারা হয়। এই শহীদ মহানায়িকার আদর্শকে ধারণ করে পরবর্তিতে ঐতিহাসিক শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের কাছে ইংল্যান্ড পরাজিত হয়।

জোয়ান অব আর্ক জন্মগ্রহণ করেন ১৪১২ সালে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বে ডমরেমি অঞ্চলে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। শৈশবে তিনি ছিলেন খুব ধার্মিক একজন কিশোরী। তিনি এমন এক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড যুদ্ধের কারণে চরম দরিদ্রতা বিরাজ করছিল। শৈশবের ওই সময়ে বাবা জেকের খামার থেকে তিনি কৃষি কাজ শেখেন এবং মা ইসাবেলর কাছ থেকে শেখেন সেলাইর কাজ।

তবে বারো বছর বয়সে তিনি রহস্যময় জীবন শুরু করেন। কেননা তিনি বলতে থাকেন যে, তিনি ঈশ্বরের কাছ থেকে ফ্রান্সকে পুনর্গঠন করার নির্দেশ পেয়েছেন। এটি ছিল তার ‘বিশ্বাস’। সেই বিশ্বাস থেকে তিনি দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নেয়ার লক্ষ্য স্থির করেন। এই সময় বিখ্যাত ফরাসি ধর্মগুরু সেইন্ট মাইকেল ও সেইন্ট ক্যাথরিনের কাছ থেকে তিনি ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দেয়ার উৎসাহ পান।

এর আগে ১৩৩৭ সালে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় অ্যাডওয়ার্ড অবৈধভাবে ফ্রান্সের সিংহাসন দাবি করেন। এতে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায়, যা ১৪৫৩ সাল পর্যন্ত চলে। ইতিহাসে এটি শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ নামে পরিচিত।

১৪১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা হ্যানরি পঞ্চম এক যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজিত করে ফ্রান্স দখল করেন। এর ফলে ১৪২৮ সালের দিকে ফ্রান্স অসংখ্য খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময়টায় ফ্রান্সে কোনো জাতীয় ঐক্য ছিল না। জাতীয় কোনো শক্তিশালী নেতৃত্বও ছিল না। ফ্রান্সের নেতৃত্বে ছিলেন চার্লস দ্যা পনথু, যার নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত দুর্বল। এই সময় ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দিতে দৃঢ় সংকল্প করেন জোয়ান অব আর্ক। তখন তিনি কৃষক পরিবারের ষোল বছরের এক কিশোরী মাত্র।

কথিত আছে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাঠে ভেড়ার পাল চরানোর সময় কৃষককন্যা জোয়ান দৈববাণী শুনতে পান যে, ইশ্বর তাকে মাতৃভূমির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও ফ্রান্সের রাজপুত্রকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এর আগে প্রায় শতবর্ষ ধরে ধরে চলা যুদ্ধে (১৩৩৭-১৪৫৩) ফরাসিদের অবস্থা খুবই নাজুক ছিল। ব্রিটিশদের রণকৌশলের কাছে একের পর এক ফরাসিরা পরাস্ত হতে থাকে। একপর্যায়ে ব্রিটিশরা প্রায় দু’টি রাজতন্ত্রের অধিকারী হতে চলে পাশাপাশি ফরাসিরা কয়েক প্রজন্ম ধরে কোন ধরনের যুদ্ধজয়ের মুখই দেখলো না।

এই সময় ফ্রান্সকে নেতৃত্ব দিতে দৃঢ় সংকল্প করেন জোয়ান অব আর্ক। তখন তিনি কৃষক পরিবারের ষোল বছরের এক কিশোরী মাত্র। তাকে কীভাবে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবেন রাজা? এ বিষয়টা নিয়ে তিনি ভাবলেন এবং শহরে চলে যান। তিনি একজন সেনা কমান্ডারকে বললেন যেন তাকে রাজা চার্লসের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেন। কিন্তু কমান্ডার তার কথায় ঠাট্টা করলেন। তবুও তিনি হাল ছেড়ে দিলেন না।

এক পর্যায়ে কিছু স্থানীয় এক নেতার সহায়তায় তিনি রাজার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। রাজার কাছে যাবার পথে শত্রুভূমি বার্গুন্ডিয়ানদের অধিকৃত অঞ্চলের উপর দিয়ে যেতে হয়। সেখান দিয়ে জোয়ান পুরুষ ছদ্মবেশে গমন করেন। রাজা তার কথা শুনে হেসেই অস্থির হয়ে যান।

প্রথমে রাজা সংশয়ে পড়লেন যে তিনি কীভাবে একজন তরুণ কিশোরীর হাতে একটি দেশের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব তুলে দেবেন? এই কিশোরী কি আসলেই একজন ঈশ্বরের দূত নাকি একজন উন্মাদ?

প্রথমে অবজ্ঞা প্রদর্শন করলেও ধর্মব্যবসায়ী যাজক সম্প্রদায়ের পরামর্শে পরবর্তীতে তিনি জোয়ানকে সৈন্য সাহায্য দিতে সম্মত হন। এর পরে জোয়ান পুরুষ নাইটদের পোশাক পরিধান করে একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে পঞ্চক্রুশধারী তরবারি হাতে ৪০০০ সৈন্য নিয়ে ১৪২৯ সালের ২৮শে এপ্রিল অবরুদ্ধ নগরী অর্ল্যান্ডে প্রবেশ করেন। তিনি তৎকালীন ফ্রেঞ্চ নেতৃত্বের রক্ষণাত্মক রণকৌশল পরিহার করে আক্রমণাত্মক কৌশল অবলম্বন করে অর্ল্যান্ডকে মুক্ত করেন।

এরপর তাদের একের পর এক সাফল্য আসতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা ইংরেজ সৈন্যদের কবল থেকে তুরেলবুরুজ শহর উদ্ধার করেন। এর পর পাতে’র যুদ্ধেও ইংরেজরা পরাজিত হয়। জুন মাসে জোয়ান তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শত্রুদের ব্যূহ ভেদ করে রীমস নগরী অধিকার করেন। এরপর ১৬ই জুলাই সপ্তম চার্লস ফ্রান্সের রাজা হিসেবে আবার সিংহাসনে অভিষিক্ত হন এবং জোয়ানকে তার অসামান্য সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার জন্য ফ্রান্সের রাজসভায় একটি বিশেষ সম্মানিত পদ দেয়া হয়। যদিও জোয়ান শিক্ষিত ছিলেন না তদুপরি তার মেধা এবং অসম্ভব বীরত্বের জন্য ফ্রান্স রাজসভার অন্যান্য পুরুষ সদস্যগণ তাকে মনে মনে হিংসা ও অপছন্দ করতে শুরু করলো। তারা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভয় পেয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। কেননা রাজা সপ্তম চার্লস জোয়ানকে ভীষণ পছন্দ এবং বিশ্বাস করতেন।

জোয়ান অব আর্কের সকল যুদ্ধের পেছনেই ধর্মীয় চেতনা ছিল। এরপর জোয়ান ইংরেজদের সাথে একটি যুদ্ধে লিপ্ত হলে রাজসভার ধর্মব্যবসায়ী যাজকরা রাজাকে বোঝান যে জোয়ানের এই ধর্মযুদ্ধ রাজাকে ফরাসিদের কাছে ‘ডেভিল’ এ পরিণত করবে। তৎক্ষনাৎ রাজা জোয়ানকে ডেকে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং ইংরেজদের সাথে সমঝোতায় আসতে বলেন। কিন্তু একরোখা এবং জেদী জোয়ান রাজার আদেশ অমান্য করেই যুদ্ধ চালিয়ে যান। ইংরেজরা যখন জানতে পারে রাজার কথা অমান্য করে জোয়ান যুদ্ধ করছে তখন রাজসভার অন্যান্য সদস্যদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা জোয়ানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। কঁপিএন শহরের বহির্ভাগে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ডিউক অব বেডফোর্ডের নেতৃত্বে লড়াই করছিল, ১৫ অগাস্ট তারা ফরাসি বাহিনীর মুখোমুখি হয়। প্যারিসে উভয়পক্ষের লড়াই হয়। জোয়ান এক পায়ে আঘাত পান। আঘাত নিয়েই তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান।

২৩শে মে ১৪৩০ তারিখে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তাকে আটক করে ফেলে, বার্গুন্ডিয়ানরা তাকে ঘিরে ঘোড়া থেকে নামতে বাধ্য করে। প্রাথমিকভাবে তিনি আত্মসমর্পণ করেন নি। আটক অবস্থায় জোয়ান কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করেন। একবার তিনি ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে নীচের মাটিতে লাফিয়ে পড়ে বার্গুন্ডিয়ান শহর আরাসে পালিয়ে যান। ব্রিটিশ সরকার তাকে বার্গুন্ডিয়ান ডিউক ফিলিপের কাছ থেকে কিনে নেয়।

এক ইংরেজ ধর্মজীবী পাদ্রির অধীনে ১৪৩১ সালের ৯ই জানুয়ারী তার বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়। প্রহসনের এ বিচারে তাকে কোন আইনজীবী দেয়া হয় নি। বিচারে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে ‘তার উপর ঈশ্বরের বিশেষ দয়া আছে’ তিনি এমন বিশ্বাস পোষণ করেন কিনা। জবাবে জোয়ান বলেছিলেন ‘যদি আমি তা বিশ্বাস না করি তবে ঈশ্বর যেন আমাকে যেখানে আছি সেখানেই রেখে দেন, আর যদি বিশ্বাস করি তবে ঈশ্বর যেন আমাকে রক্ষা করেন।’ আসলে এই প্রশ্নটিই ছিল সাংঘাতিক চালাকিপূর্ণ। যদি জোয়ান বলতেন ‘হ্যাঁ করি’, তবে তাকে ধর্মের বিরুদ্ধে যাবার অভিযোগ আনতেন আর যদি জোয়ান বলতেন ‘না’ তবে বলা হতো তিনি নিজের অভিযোগ নিজেই স্বীকার করেছেন।

ছলচাতুরি বিচারে আদালত তাকে ১২ নম্বর আর্টিকেল অনুযায়ী দোষি সাব্যস্ত করে। বিচারে তার কার্যকলাপকে প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করা হয়। তার কোন আইনজীবি না থাকাতে জোয়ানকে রায় বিস্তারিত পড়ে শোনানো হয় নি। জোয়ান তখন বুঝতেও পারেন নি, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। কারাগারে জোয়ানকে মেয়েদের পোশাক পরতে হয়। ক’দিন পর তাকে কারাগারের ভেতরেই লর্ড উপাধিধারী এক ‘সম্ভ্রান্ত’ ইংরেজ ধর্ষণ করে। এরপর থেকে জোয়ান আবার পুরুষদের পোশাক পরিধান শুরু করেন। এর পেছনে মূল কারণ ছিল ছেলেদের পোষাকে নিরাপত্তা বেশি পাওয়া যেতে পারে, তাছাড়া তার পরার জন্য অন্য কোন বস্ত্র ও অবশিষ্ট ছিল না।

তারপর তাকে একটি পিলারের সাথে বেঁধে ফেলা হয়। জোয়ান গীর্জার যাজকদের কাছে একটি ক্রুশ চান। জনৈক চাষী একটি ছোট ক্রুস তৈরি করে জোয়ানের পোষাকের সামনে ঝুলিয়ে দেন। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণী। যাকে বলা হত ‘দ্যা মেইড অব অরলিন্স’ বা অরলিন্সের কুমারী।

মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওই ক্রুশটি হাতে নেন। তিনি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষমা করে দেন এবং তার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে বলেন।

জোয়ানের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার কয়লা হয়ে যাওয়া শরীরকে প্রদর্শন করে যাতে কেউ কোনদিন দাবি না করতে পারে জোয়ান বেঁচে পালিয়ে গেছে। এরপর তার শরীর আরো দু’বার পোড়ানো হয় যাতে তার ছাইগুলো এতো মিহি হয়ে যায় যে কেউ তা সংগ্রহ করতে না পারে।

তার মৃত্যুর ২৫ বছর পর পোপ ক্যালিক্সটাস-৩ তার এই হত্যাকান্ডের বিচারকাজ নতুন করে শুরু করেন এবং সেই বিচারে জোয়ান নিস্পাপ ও সন্ত (Saint) এবং শহীদ প্রমাণিত হন। মৃত্যুপরবর্তী বিচারে জোয়ান নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে সন্ত বা সেইন্ট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে ফরাসিরা ফ্রান্স থেকে চিরতরে ইংরেজদের সকল অধিকার ও চিহ্ন মুছে দেয়ার প্রয়াস পায়।

অত্যাচারিদের বিচারে সে ডাইনি উপাধি পেলেও পৃথিবীর ইতিহাসে জোন অফ আর্ক এক প্রেরণার নাম। তাইতো মৃত্যুর পরে নিস্পাপ ও শহীদ হয়ে ইতিহাসে নতুন ভাবে জন্মনিয়েছে এই কিশোরী। পরবর্তিতে তার স্মরণে ফ্রান্সে অনেক স্মৃতিসৌধও নির্মিত হয়েছে।

এক সময়ের ডাইনি অপবাদের দায়ে পুড়ে মরা জোয়ান অফ আর্ক আজ ফ্রান্সের জাতীয় বীর। ফরাসিদের জন্য তার এ আত্মত্যাগে তিনি হয়ে যান ইতিহাসের এক অন্যতম মহানায়িকা।

জোয়ানের অসামান্য অবদানের কীর্তি গাঁথা নিয়ে রচিত হয়েছে গান, নির্মিত হয়েছে নাটক ও সিনেমা। এরমধ্যে ১৯২৮ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘প্যাশন অফ জোয়ান অব আর্ক’ অন্যতম।

এসএ/


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি