দেশে প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় গাছের নজরদারি, আসছে ‘মাইট্রি’ অ্যাপ
প্রকাশিত : ২০:১৭, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩২, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃক্ষরোপণকে শুধু গাছ লাগানোর কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি গাছের জন্য আলাদা ডিজিটাল পরিচয় তৈরি, তথ্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে তার বৃদ্ধি ও টিকে থাকার অবস্থা পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যেই প্রযুক্তিনির্ভর ‘মাইট্রি’অ্যাপ তৈরির কাজ করছে আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফাউন্ডেশন।
উদ্যোক্তাদের দাবি, এটি বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল গাছ পর্যবেক্ষণ অ্যাপ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। অ্যাপটির মাধ্যমে একটি গাছ রোপণের সময় থেকেই তার প্রজাতি, রোপণের তারিখ, রোপণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তথ্য, অবস্থান, ছবি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যাবে।
মাইট্রি অ্যাপের পরিকল্পনায় প্রতিটি গাছের জন্য কিউআর কোডভিত্তিক একটি ডিজিটাল গাছ পরিচয়পত্র তৈরির কথা রয়েছে। ফলে একটি গাছকে শুধু বৃক্ষরোপণের পরিসংখ্যানের অংশ হিসেবে নয়, বরং আলাদা একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
পরবর্তী সময়ে ওই গাছের পরিচর্যা, বৃদ্ধি, অবস্থান এবং বেঁচে থাকার অবস্থা সম্পর্কিত তথ্যও যুক্ত করার সুযোগ থাকবে। উদ্যোক্তাদের ভাষায়, এর মাধ্যমে ‘একটি গাছ, একটি ডিজিটাল পরিচয়’ ধারণাকে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মাইট্রির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলোর একটি হলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় রোপণ করা গাছের তথ্য নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় বৃক্ষ তথ্যভান্ডারের ভিত্তি তৈরি করা।
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, এনজিও এবং সাধারণ নাগরিকদের মাধ্যমে রোপণ করা গাছের তথ্য একটি কাঠামোবদ্ধ ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, কোন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে, কারা বা কোন প্রতিষ্ঠান গাছগুলো লাগিয়েছে এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী—এ ধরনের তথ্য ভবিষ্যতে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশে বড় পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, তা গণনা করাই যথেষ্ট নয়। রোপিত গাছের অবস্থান, প্রজাতি, পরিচর্যা এবং টিকে থাকার হার পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নজরদারিতে ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, দূর অনুধাবন প্রযুক্তি, জাতীয় বৃক্ষ তথ্যভান্ডার এবং ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা ও দূর অনুধাবন প্রযুক্তির সমন্বয়ে মানচিত্রভিত্তিক ওয়েব ড্যাশবোর্ড ও অ্যাপ তৈরির সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে মাইট্রি অ্যাপের ধারণায় গাছের নিবন্ধন, যাচাই, মানচিত্রে অবস্থান নির্ধারণ, পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন—এই পাঁচটি বিষয়কে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনায় মাইট্রি অ্যাপে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে গাছ যাচাই, কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল গাছ পরিচয়, জিপিএস ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে গাছের অবস্থান নির্ধারণ, উপগ্রহ ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য সূচকের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ, ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ, গাছের টিকে থাকার হার পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল গাছ সনদ, কার্বন তথ্য ও কার্বন ক্রেডিট-সংক্রান্ত সহায়তা, তথ্য বিশ্লেষণের ড্যাশবোর্ড, সেরা অংশগ্রহণকারী নির্বাচন ও উৎসাহব্যবস্থা
নাগরিকদের অংশগ্রহণ।
এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি গাছ রোপণের পর সেটিকে দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
মাইট্রির মূল ধারণা হলো—‘একটি গাছ, একটি ডিজিটাল পরিচয়; প্রতিটি রোপণ, একটি যাচাইযোগ্য ডিজিটাল তথ্য।’
অর্থাৎ শুধু কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, সেই হিসাবের পরিবর্তে কোথায় কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে, কে বা কোন প্রতিষ্ঠান গাছটি লাগিয়েছে, কখন লাগানো হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে গাছটি টিকে আছে কি না—এসব তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হবে।
গাছের অবস্থান ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে জিপিএস, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, উপগ্রহের তথ্য এবং ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে রোপণের পরবর্তী পর্যায়ের তথ্যও সংরক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
জাতীয় পর্যায়ে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমে তথ্যের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
একই সঙ্গে রোপিত গাছের টিকে থাকার হার পর্যবেক্ষণ, অঞ্চল ও প্রজাতিভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনায় তথ্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শিক্ষার্থী, সাধারণ নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পরবর্তী পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, বৃক্ষরোপণকে এককালীন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল বৃক্ষ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। যেখানে প্রতিটি গাছের থাকবে আলাদা ডিজিটাল পরিচয়, প্রতিটি রোপণের থাকবে যাচাইযোগ্য তথ্য এবং ভবিষ্যতে গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের বৃক্ষসম্পদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার।
এমএইচ
আরও পড়ুন










