ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৫১:৫০

কোটায় বন্দী তারুণ্যের স্বপ্ন, মুক্ত করবে কে?

কোটায় বন্দী তারুণ্যের স্বপ্ন, মুক্ত করবে কে?

স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছরে পা দিয়েছে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ, প্রায় সব ইস্পাত কঠিন বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াচ্ছে, তখন দেশের তরুণ মেধাবীরা যেনো নিজের দেশের প্রচলিত কিছু নিয়মের দ্বারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে যে বিষয়টি এখন দেশব্যাপী আলোচিত হচ্ছে তা হলো ‘চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতি’।   সকল ধরনের বৈষম্য অবসানের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে জন্ম নেওয়া স্বাধীন দেশটি আজ তাদের সন্তানদেরকে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যর নিয়মে আবদ্ধ করেছে। নির্দিষ্ট কিছু স্বল্প জনগোষ্ঠীর জন্য ৫৬% কোটা দিয়ে মেধাবীদের সুযোগকে সীমিত করেছে, যা স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও সংবিধান পরিপন্থী। কোটার প্রাধান্য দিয়ে মেধাবীদের কোণঠাসা করে দেয়ার এই উদ্ভট নিয়মের সংস্কার এখন সময়োচিত যৌক্তিক দাবী। যদি মেধার লালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তাহলে কোটা প্রথার যৌক্তিক সংস্কারের দ্বারা মেধাবী তরুণদের সুযোগ কে প্রসারিত করার বিকল্প পথ আর একটিও নেই। কারন আজকের মেধাবীরাই আগামীর স্বনির্ভর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার মূল কারিগর। অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রকে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদেরকে অবশ্যই চৌকস মেধাবী হতে হবে এবং সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে কোন বিশেষ সুবিধা ছাড়াই মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পেতে হবে। তাহলেই ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ নেতৃত্ব দেবে বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। এমন স্বপ্ন সত্যি করতেই এগিয়ে যাচ্ছে সোনার বাংলাদেশ। তাই স্বপ্ন পূরণে দরকার শুধু সঠিক পদক্ষেপ ও বৈষম্যহীন নীতিমালার।  বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা চালুর ইতিহাস: ১৯৭২ সালে এক নির্বাহী আদেশে সরকারি, বেসরকারি, প্রতিরক্ষা, আধা সরকারি এবং জাতীয়করণ করা প্রতিষ্ঠানে জেলা ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও ১০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য কোটা প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে কোটায় সংস্কার ও পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি নিয়োগে কোটা যেমন, প্রতিবন্ধী এক শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-নাতনি ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ কোটা। সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা বিদ্যমান। ফলে এর কোনো শ্রেণিতে যারা পড়েন না, তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য। সংস্কারের সুপারিশের কী হলো: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান এবং সাবেক সচিব কাজী রকিব উদ্দীন আহমদ (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার) বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার ওপর ২০০৮ সালের মার্চে একটি গবেষণা করেছেন। ৬১ পৃষ্ঠার এই গবেষণা প্রতিবেদনটি পিএসসিতে আছে। এই প্রতিবেদনে কোটা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৭ সালে এক বৈঠকে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের প্রায় সব সদস্য সরকারি নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র এম এম জামান ছিলেন কোটার পক্ষে। তবে কোটার পক্ষে সেদিন জামানের অবস্থান থাকলেও তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবস্থাটি চালু রাখার পক্ষে ছিলেন। তবে ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে কোটার হার ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন তিনি। ওই সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর দেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকার কথা নয়। তবে ওই প্রতিবেদন বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। জনসংখ্যার হার অনুযায়ী কোটা ব্যবস্থার বণ্টনঃ পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকছে পাঁচ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য এক শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ । বর্তমানে প্রায় ২৫৮ ধরনের কোটা প্রয়োগ হয় যা সত্যিই অবিশ্বাস্য। বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩০% মেধায় ও ৭০% কোটায় নিয়োগ হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীতে অফিসার নিয়োগে মেধাই আসল মানদণ্ড। কোটার কোন প্রয়োগ নেই। যা আমাদের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সৈনিক পদের নিয়োগে কোটার প্রয়োগ হয়। বিসিএস পরীক্ষায় কোটা প্রয়োগের চিত্রঃ ২৮তম বিসিএসে ৮২১টি, ২৯তম বিসিএসে ৮১৬টি, ৩০তম বিসিএসে ৮০৩টি, ৩১তম বিসিএসে ৮১১টি পদে বিভিন্ন কোটায় প্রার্থী না পাওয়ার ফলে শূন্য ছিল। কোটার শূন্য পদগুলো পূরণ করতে মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী ও নারীদের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। ওই বিসিএসেও এক হাজার ১৩০টি পদ শূন্য রাখতে হয়। শেষপর্যন্ত ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণের সিদ্ধান্ত হয়। অথচ ৩২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৯১২ জনই চাকরির সুযোগ পাননি। কারণ এক কোটা থেকে আরেক কোটায় নিয়োগ দেয়া যায় না। এছাড়া ৩৩তম বিসিএসে ৫০২টি, ৩৪তম বিসিএসে ৭২৩টি শূন্য রয়েছে। ৩৫ তম বিসিএস এ ৩৩৮ টি, ৩৬ তম বিসিএস এ ৩৬৬ টি কোটার পদ পূরণ হয়নি। প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অংশ নেন দুই থেকে সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থী। কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তাহলে তিনি চাকরি না-ও পেতে পারেন। কারণ, ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেওয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ সাত হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন। এই হলো কোটার ম্যাজিক, তাদেরকে নিয়োগ না দিয়ে উপায় নেই। কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না পেলে পদগুলো সংরক্ষণ করা হয়। মেধা তালিকায় থেকেও অনেকে চাকরি পায় না। কোটা ব্যবস্থা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান পরিপন্থীঃ বাংলাদেশের প্রচলিত বর্তমান কোটা প্রথা সরকারি চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করছে। ওই বৈষম্য অনেকটা স্পার্টা, উমাইয়া খিলাফত, দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসন, বঙ্গের প্রাচীন সেন, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনের সঙ্গে তুলনীয়। পাকিস্তানি নব্য ঔপনিবেশিক যুগেও যোগ্যতা ও মেধা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিরা ছিল সব ধরনের সরকারি চাকরিতে উপেক্ষিত। ড. মো. মাহবুবুর রহমানের মতে, `কেবল সিভিল সার্ভিসেই নয়, ফরেন সার্ভিস, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিতেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল` (বাংলাদেশের ইতিহাস : ১৯৪৭-৭১, পৃ. ৩৪১)। এই বৈষ্যম্যর বিরুদ্ধেই বাঙালিরা মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে যোগ্যতা-মেধার ভিত্তিতে সবার জন্যই সরকারি চাকরির দ্বার উন্মুক্ত করাও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যা স্পষ্ট হয়েছে : `...বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি...`। কোটা ব্যবস্থার ফলে এ দেশের মানুষের জন্য সেই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? বর্তমান প্রচলিত কোটা পদ্ধতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরুদ্ধ, কথাটি বিলকুল সত্য। সংবিধানের চেতনাবিরুদ্ধও বটে। সংবিধানের ১৯(১) ও ২৮(১) অনুচ্ছেদে যথাক্রমে বলা হয়েছে যে `সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন` ও ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ যদিও সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের `অনগ্রসর অংশের` জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে। কিন্তু বর্তমান প্রচলিত কোটাব্যবস্থায় অনগ্রসর ও অগ্রসর সবাই একটি বিশেষ শ্রেণিভুক্ত হলেই কোটা ভোগ করছে। ফলে এই সুযোগ কুক্ষিগত করতে প্রতিবছর বাড়ছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। কোটা ব্যবস্থার সংস্কারে কিছু প্রস্তাবনাঃ- মুক্তিযোদ্ধা কোটাঃ বর্তমানে রয়েছে ৩০ শতাংশ। এটাকে কমিয়ে ৭% এ আনতে হবে। কারন গত কয়েকটি বিসিএস সহ সরকারী চাকরির পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ৬% এর বেশি পাওয়া যায়নি। বাকি পদগুলো শূণ্য থেকেছে। তাই তাদের বর্তমান সংখ্যার সঙ্গে মিল রেখে এটা ৭% করলে তারা শতভাগ সুযোগ পাবে। কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে তা সাধারন মেধাবীদের দ্বারা পূরণ করতে হবে। পদ শূণ্য রাখা যাবেনা। পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে ভাতা বৃদ্ধি করাসহ সকল ধরনের সহযোগিতা করা হলে তা সব মহলে প্রশংসিত হবে। নাতি -নাতনী কোটাঃ এই ধরনের উদ্ভট কোটা বাতিল করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সুযোগ দেয়ার অন্যতম কারন হলো তারা যেনো বৃদ্ধ বয়সে তাদের পিতামাতার ভরণপোষণের সমস্ত দায়ভার বহন করতে সক্ষম হন। সন্তানেরা সেই সুবিধা পেলে নাতি নাতনী কেনো পাবে? তাদের কোন নৈতিক ও যৌক্তিক অধিকার নেই। মেধাবী প্রজন্মের জন্য নাতি নাতনী কোটা গোদের উপর বিষফোঁড়া। জেলা কোটাঃ বর্তমানের উন্নয়নের দিক দিয়ে কোন জোলা পিছিয়ে নেই। মেধাবীদের মূল্যায়ন হলে তা সারাদেশব্যপী সকল জেলার মানুষের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করবে। তাই জেলা কোটা তুলে দেয়া উচিত। প্রতিবন্ধী কোটাঃ প্রতিবন্ধী কোটা বর্তমানে আছে ১ শতাংশ। যা বৃদ্ধি করে ২ শতাংশ করা হোক। কারন তারা জন্মগতভাবে শারীরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে আছে। তাদের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ করা যায় না। উপজাতি কোটাঃ বর্তমানে আছে ৫ শতাংশ। যা কমিয়ে ১ শতাংশে আনা খুবই যুক্তিযুক্ত। রাষ্ট্রীয় কাজে যারা নেতৃত্ব দিবে তাদের মেধার পরীক্ষায় অবশ্যই অন্যান্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে। এখন পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ মন্ত্রণালয় আছে। পার্বত্য এলাকায় স্থানীয় সকল নিয়োগে তারা শতভাগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। নারী কোটাঃ নারীদের জন্য যে ১০% কোটা পদ্ধতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা তাদের মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নারীরা আজ পুরুষের চেয়ে নানা দিকে এগিয়ে। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ স্থানে। সংবিধান অনুযায়ী তারা কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সুযোগ পাচ্ছে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা পরীক্ষায় তাঁরা ছেলেদের টপকে শীর্ষস্থান অধিকার করছেন। নারী শিক্ষায় আমরা আর পিছিয়ে নেই। বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার কৃতিত্বও তাঁদের রয়েছে। অন্যান্য কোটা কমিয়ে দিলে মেধার দ্বারাই নিয়োগের সমান সুযোগ পাবে নারীরা। তাই অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের জন্য বিশেষ কোটার যৌক্তিকতা এখন আর নেই। উত্তর-আধুনিক বাংলাদেশে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রচলিত কোটা প্রথার সংস্কার সময়ের দাবি। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে কোটা প্রদানে আমাদের আপত্তি নেই। তবে, সকল নিয়োগে মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি ও প্রতিবন্ধী মিলিয়ে মোট ১০ শতাংশের বেশি কোটা থাকা বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনভাবেই যৌক্তিক নয়। কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের বর্তমান মানসিক অবস্থাঃ সত্যিকারের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি তারা নিজেদের কে সবার সামনে বুক ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দেন। কিন্তু তাদের সন্তান বা নাতি নাতনীরা কোটা সুবিধার কারনে চাকরি পেয়ে তা স্বীকার পর্যন্ত করেনা। তাদের নিয়োগ পত্র ও গেজেট না দেখা পর্যন্ত বোঝার উপায় নেই যে তারা কোটাধারী। এ কেমন আচরণ তাদের, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে তাদের গর্বিত পিতার পরিচয় সবার সামনে দিতে লুকোচুরি করে। কোটায় চাকরি পেয়ে তাদের অনেকেই মেধায় পেয়েছে বলে দাবী করে। কোটায় চাকরি পেয়ে তা স্বীকার করতে হীনমন্যতায় ভোগে। যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে লজ্জা পায় জাতি তাদের দ্বারা কি উপকার লাভ করবে তা বোধগম্য নয়। এটাতো তাদের গর্বের সঙ্গে বলা উচিত, কারন মুক্তিযোদ্ধাদের অকৃত্রিম সাহস ও জীবনের বিনিময়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। স্যালুট জানাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের। তবে তাদের সন্তানদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যাদের পিতামাতা যুদ্ধ করেছিলেন ও জীবন দিয়েছিলেন। তাদের সন্তানেরাই আজ আবার মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড গঠন করে ৩০% কোটা সংরক্ষণের জন্য মাঠে নেমেছে। পরিবার থেকে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়টা হয়তো তারা আয়ত্ত্ব করতে চায় না বা করেনি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্বীকার করে, তাদের নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করলে কেউ অখুশি হবেনা। কিন্তু আপনারা যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, সেই সন্তানদের অবদান টা কি?? এসব যৌক্তিক প্রশ্ন করলে সে আবার হয় জঙ্গি শিবির, দেশপ্রেমীক নয় বলে তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু এটা তো বাস্তবসত্য যে দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী হতে গেলে কোন নির্দিষ্ট পরিবার লাগেনা। কারন অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে দেখেছি রাজাকারদের দল করতে। দেশের ৯৯.৮৭ শতাংশ জনগণের দাবী এটা, তাই কোটা সংস্কার চাইলেই দেশপ্রেম কমে না। এসব সস্তা দোষ দিয়ে এই যুগে আর টিকতে পারবেন না, মানুষ আর এসব সস্তা কথার মূল্য দেয় না। টিকতে হলে মেধা দিয়ে টিকে থাকতে হবে, কোন বিশেষ সুযোগের মাধ্যমে নয়। কোটায় কোণঠাসা মেধাবীদের মনের কষ্টঃ সাধারন প্রার্থী অনেকেই ৪/৫ বার বিসিএস ভাইভা দিয়েও ক্যাডার হতে পারেনি, কিন্তু একবার ভাইভা দিয়ে তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েও কোটায় ক্যাডার হয়ে যায়। তুলনামূলক কম নম্বর পেয়ে কোটার কারনে এমন সুযোগ পেয়ে নিয়োগ পাওয়ার নজীর স্থাপন হয় তাদের সামনে। বিষয়টা মেধাবীদের জন্য খুবই কষ্টের ও হতাশার। এভাবে নিয়মিত বঞ্চিত হয়ে যে চাকরি তারা পায় তাতে তার হয়তো জীবিকার চাহিদা মেটে কিন্তু সেই বৈষম্যের কারণে বাদ পরার বিষয়টা সারাজীবন ভুলতে পারেনা। ফলে চাকরি প্রাপ্তিতে পরিস্কার বৈষম্যর শিকার হয়ে তার বর্তমান দায়িত্ব পালনে অনেকটা অনীহা দেখায়। কিন্তু সুযোগের সমতা থাকার পর যদি তারা পছন্দমত চাকরি না পেতো তাহলে তারা রাষ্ট্রকে দোষারোপ করতে পারতোনা, নিজের মেধার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারতো। তখন চাকরি ও ব্যক্তি জীবনে সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত হতে পারবে। সুযোগ না পাওয়ার চাপা ক্ষোভে সারাজীবন পুড়বে না। তাই প্রতিযোগিতায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য কোটার সংস্কার আবশ্যক।। এটা সকল মেধাবীর প্রাণের দাবী। প্রায় ৯৯ শতাংশ জনগণের দাবীকে মূল্যায়ন করার এখনি সঠিক সময়। বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই হোক সকল বৈষম্যের বিলুপ্তিঃ জাতির জনক বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার ছেলে চাই’। এই লক্ষ কোটি মেধাবী সোনার ছেলের দ্বারা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে প্রয়োজন সব সেক্টরে মেধাবীদের মূল্যায়ন। আগে মেধাবীদের বৈষম্যহীন সুযোগের পথকে প্রসারিত করতে হবে, তারপর আসবে সোনার বাংলা। অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের বেশি সুযোগ দিয়ে সর্বোচ্চ মেধাবীদের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে রাষ্ট্রীয় উন্নতিকে ত্বরান্বিত করা যায় না। এতে হতাশায় নিমগ্ন হয়ে তরুণরা বিভ্রান্ত হয়ে পরবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাঁড়িয়েছে। এই ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রেখে ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে মেধাবী তরুণদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নাই। আশাকরি, জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়তে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই কোটা সংস্কারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করবেন। কারন সকল বৈষম্য দূরীকরণই ছিল জাতির পিতার মূল লক্ষ্য। সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বগুণেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কোটা সংস্কারের মত জনবান্ধব পদক্ষেপ একমাত্র তিনিই নিতে পারেন। জনগণের মনের ভাষা বঙ্গবন্ধু কন্যাই বোঝেন। আর একটি সন্তানকেও যেনো কোটা পদ্ধতির শিকার না হতে হয় মানবতার মা হিসেবে এটা আপনার একান্ত দায়িত্ব। তাছাড়া ভোটের রাজনীতির হিসাবেও তরুণদের প্রাধান্য না দিয়ে উপায় নেই। কারন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর হবে দেশের তরুণ ভোটাররা। নবম সংসদ নির্বাচন থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি তরুণ ভোটারের হাতেই আগামী দিনের ক্ষমতার চাবি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। মোট জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ কোটার সংস্কার চায়। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে একটা কথাই স্পষ্ট যে, আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গঠনে তরুণরাই মূল ভূমিকা পালন করবে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব কোটা সংস্কার করে মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সকল ক্ষেত্রে মেধাবীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহন নিশ্চিত করাই হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আগামীর উন্নত বাংলাদেশে মেধাবীরাই থাকবে চালকের আসনে, মেধা দিয়েই জয় করবে বিশ্বসেরা স্বীকৃতি। কোটার সংস্কার হোক, মেধা মুক্তি পাক। এসি/
নিরন্তর কলম সাধনা বয়ে চলুক

ঢিলেঢালা সাদা পাজামা আর লম্বা পাঞ্জাবি পরে রোজ সকালে ক্যাম্পাসের সবুজ শ্যামল ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে চলা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। অসাধারণ হয়েও অতি সাধারণ জীবন যাপন মানুষটির। রাগ-গোস্বা-আভিজাত্য ছুঁতে পারে নি কখনোই। তার নেই কোনো অতৃপ্তিও। তার ধ্যানে–জ্ঞানে চিন্তায় শুধুই শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচিন্তা। তার লেখা ছাড়া আজও বড় কোনো কাগজের বিশেষ সংখ্যা বের হয় না। কয়েক যুগ ধরে ধরে তিনি বিবেচিত হচ্ছেন সাহিত্য ও জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবেই। কারো কারো মতে জ্ঞানের সাগর তিনি, যেখানে যে কেউ ডুব দিয়ে মণি-মুক্তোর খোঁজ পেয়ে থাকেন। জ্ঞানের দ্যুতি বিলানোয় যেন তার আজন্ম ধ্যানজ্ঞান।হ্যাঁ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যাঁরের কথাই বলছি। নির্মোহ এই আলোকিত মানুষটির আজ ৮২ তম জন্মদিন। আজও তিনি নিজ কর্মে নিষ্ঠাবান, একান্ত ব্রতী; আজও তার কলম সাধনা থামেনি। শুভ জন্মদিন, প্রিয় শিক্ষক। আপনার নিরন্তর কলম সাধনা বয়ে চলুক।সাধক, মনীষী, বাংলার অসাম্প্রদায়িক মুক্তচিন্তার অন্যতম অগ্রদূত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, আপনি অন্তত শতায়ু হোন। দেশ-জাতির জ্ঞান ও বিবেচনায় আরও কিছু পালক যোগ করে যান, জন্মদিনে এটাই আমাদের কামনা। আমাদের মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী পাঁচ দশকে এ দেশের মানুষের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অকুতোভয় ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম অধ্যাপক; একাধারে অতুলনীয় গবেষক, চিন্তক ও অসামান্য লেখক। তিনি শিক্ষাবিদ, কিন্তু তার শিক্ষার অহঙ্কার নেই। তিনি বিনয়ী, নিরহঙ্কারী। তার জীবনযাপন সাদাসিধে, অথচ প্রাণপ্রাচুর্যে টইটুম্বুর। অপরিসীম মানসিক ধৈর্যশক্তি এবং বয়স ও শ্রেণি-পেশার পার্থক্য ভুলে সবার সঙ্গে তার মিশে যাওয়ার ক্ষমতা ঈর্ষণীয়। তিনি লিখে চলেছেন অবিরাম। তার প্রচ্ছদ লেখা ছাড়া কাগজের বিশেষ কোনো সংখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন যেন খাপছাড়া মনে হয়। তিনি মুক্তবুদ্ধি, সুরুচি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে নিঃশঙ্কচিত্ত। কয়েক প্রজন্মের শিক্ষক হিসেবে জাতির অন্যতম অভিভাবকও তিনি। কয়েক যুগ ধরে যেকোনো সংকটে জাতিকে দিশা দিয়ে চলেছেন ক্ষুরধার লেখনিতে, বক্তৃতায়। তিনি বাচন অত্যন্ত সরল ও সাবলীল তবে গভীর চিন্তার খোরাক থাকে তাতে। থাকে দর্শন, সমাজ ও রাজনীতি চিন্তা। নির্মোহ মানুষটি নিজের জন্য কিছুই করেননি। সারাজীবন জ্ঞান,বুদ্ধি, সাধনা বিলিয়েছেন অকাতরে। তাকে নিয়েই থিসিস হতে পারে। গবেষণা হতে পারে। আনিসুজ্জামান স্যারের সাধারণ জীবন যাপন ও চিন্তার গভীরতা নিয়ে তার বন্ধু কবি শামসুর রহমান লিখেছেন, `যখন পাঞ্জাবি আর পাজামা চাপিয়ে শরীরে, সকালে কিংবা বিকেলে একলা হেঁটে যান- প্রায় প্রতিদিন দীর্ঘকায় সবুজ গাছের তলা দিয়ে তাঁকে বাস্তবিক সাধারণ মনে হয়। ...এখনও সিদ্ধির পরে, খ্যাতির শিখরে পদার্পণ করেও সাধনা তাঁর থামেনি, বরং মাঝে মাঝে এখনও গভীর রাতে ঘুমন্ত জীবনসঙ্গিনীর পাশে শুয়ে অথবা টেবিলে ঝুঁকে থিসিসের ভাবনায় কাটান প্রহর।` এই লেখায় আনিসুজ্জামান স্যারের জীবন নিয়ে সঠিক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। ১৯৩৭ সালের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা এটিএম মোয়াজ্জেম ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা ছিলেন গৃহিণী। দু`জনই ছিলেন সাহিত্যমনস্ক। পরিবারের অন্য সদস্যরাও  সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৫২ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে `রাষ্ট্রভাষা কী ও কেন?` শিরোনামের একটি পুস্তিকা রচনা করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ওপর এটিই ছিল প্রথম পুস্তিকা। ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এছাড়া ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামেও তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বক্তৃতা লেখার কাজে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে জাতিকে বুদ্ধি পরামর্শ ও লেখনি দিয়ে দিশা দিয়েছেন। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকারের গৌরব নিয়ে। ১৯৫৯ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এর মাঝে এবং ১৯৬৫ সালে `উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস :ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল` বিষয়ে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে তিনি অবসর নেন। বর্তমানে তিনি প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে পাঠদান করাচ্ছেন। এখন মাঝে মধ্যেই মলচত্বরের সবুজ ঘাসে তার ধীর হেটে চলা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জন্মদিন উপলক্ষে এই প্রাজ্ঞজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে একইরকম কর্মব্যস্তই পাওয়া গেল। ৮১ বছরের জীবন পেরিয়েও তিনি যেন এখনও একইরকম প্রাণচঞ্চল। আপনার এই নির্মাহ জীবন ও প্রাণপ্রাচুর্যনতা থাকুক চিরকাল। শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংগঠনিক কাজে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।১৯৫৬ সালে নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক, ১৯৫৮ সালে স্ট্যানলি ম্যারন রচনা পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে দাউদ পুরস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে অলক্ত পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে একুশে পদক, ১৯৮৬ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার, ১৯৯০ সালে বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ ট্রাস্ট, ১৯৯৩ সালে দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক, ১৯৯৪ সালে অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার, ২০১১ সালে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বর্ণপদক, ২০১২ সালে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ও ২০১৪ সালে ভারত সরকারের পদ্মভূষণ পদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কালজয়ী এই বিজ্ঞজন। এ ছাড়াও ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি. লিট ডিগ্রি প্রদান করে।অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের এক জীবনের এত অর্জন আর কারো পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব হবে কি না বলা মুশকিল। স্যার আপনার নিরন্তর পথচলা অব্যাহত থাকুক। জ্ঞানের দ্যুতি বিলানোর সাধনা বহমান থাকুক অনন্তকাল। জন্মদিনের এই মুহূর্ত জীবনে আসুক আরও অন্তত কয়েক যুগ।   / এআর /

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সমকালীন রাজনীতি

শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বজনদের অভিযোগ সবাই (বিশেষত: মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা) বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ৩০ লক্ষ শহীদের সঙ্গে, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে এবং সর্বোপরি সকল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। শুধু ডিসেম্বর কিংবা মার্চ  এলেই স্মরণ করা হয় জাতির ওই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আবার কখনও কখনও গানের পঙ্কক্তি ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না’ এ গানের মধ্যেই আটকে ফেলা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। সত্যি বলতে কি খুব কম লোকই তাঁদের মনে রেখেছেন। বাস্তবে তাঁরা বেঁছে আছেন কেবল তাঁদের স্বজনদের মধ্যে। লাল-সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনতে স্বাধীনতার জন্য যারা সেদিন নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন-তাঁদের কেউ শহীদ হয়েছেন, যুদ্ধাহত হয়েছেন, কেউবা পঙ্গু হয়েছেন আবার অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন। শুধু তাই নয় রক্তেভেজা পতাকা সমুন্নত রাখতে গিয়ে অনেকে হয়েছেন সহায়হীন-সম্বলহীন। আবার এদের কেউ জীবিত আছেন এক বুক দুঃখ নিয়ে, কষ্ট নিয়ে। একে ছোট করে বলতে গেলে বলতে হয়, দেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে সেদিন দেশপাগল মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যখন লড়াই করছিল, তখন অনেকেই ঘরে বসে এয়ার কন্ডিশনের (এসি- রূপক অর্থে) বাতাসে আরামে ছিল। অথচ তাঁরাই আজ বহাল তবিয়তে রাজার হালে আছেন। বিপরীতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা এত বড় ভূমিকা রাখলো, তারা কি পেল? তাদের সম্মান চাওয়া কি অন্যায় ? দেশ ও দেশের মানুষ হতে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া কি তাদের ন্যায্য অধিকার নয়? যদি অন্যায় না হয়ে থাকে, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেঅন্যদের মেলানো ঠিক হবে না। মুক্তিযোদ্ধারাতো বেশি কিছু চায়নি। তাঁরা কেবল চেয়েছে একটু সম্মান। কৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে একটু সম্মান কি আমরা তাদের দিতে পারি না! কিন্তু আমরা কি দিতে পারছি? হয়তো পারছি না। তবে সুযোগ সুবিধা কি থেমে আছে। সেটা আজ ভোগ করছে ওইসব এসির বাতাস খাওয়া, সোফায় পা দোলানো আরামপ্রিয় ব্যক্তিরা। মুক্তিযোদ্ধাদের যদি যথাযথ সম্মান দিতে হয় তাহলে ওইসব ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। এদিকে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, অধিকাংশ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা (শহীদ ও যুদ্ধাহত সহ) সুযোগের চেয়ে বঞ্চনাই বেশি পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান- এ কথা আক্ষরিক অর্থেই কেবল সত্য; বাস্তবে নয়। এ কথা সকলকে মনে রাখতে হবে, কখনোই মুক্তি বিনামূল্যে মেলেনা- বিশেষত: বাংলাদেশের সেটাতো নয়-ই। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কারো ইচ্ছায় সৃষ্টি নয়, বল প্রয়োগেও সৃষ্ট নয়। এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র মানুষের নিতান্ত প্রয়োজনেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। আর এর ফলশ্রæতিতে, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, অনেক মা-বোন নির্যাতিত-ধর্ষিত হয়েছেন। কিন্তু সেই মুক্তিযোদ্ধা বা তাঁদের স্বজনদের আমরা কতটুকু মূল্যায়ণ করতে পেরেছি। কথায় আছে, ছেলে জন্মের পর বাবা-মার মুখখানা দেখেন। আর এর মাধ্যমে ছেলের কল্যাণ হয়। কিন্তু আমি-আমরা কি দেখেছি বাবার মুখ? দেখেনি। জন্মের আগেই এতিম হয়ে গেছি আমরা। শুধু আমি নয়, আমার মতো লাখ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছি, বাবার মুখ না দেখেই। বাবার মুখ দেখেনি তাতে কি? আমরাতো লাল সবুজে মোড়া একটি পতাকা দেখেছি। চেতনা হলো মানুষের মনের গভীরে লালিত সেই আদর্শ, যা কোন ব্যক্তিকে সকল কাজে অনুপ্রেরণা যোগায়। সঙ্গত কারণেই বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশিদের মধ্যে সবক্ষেত্রে (জাতীয়ভাবে) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা আমার বাবার মতো ৩০ লক্ষ শহীদের জীবন দিয়ে পাওয়া এই দেশে অনেকেই আজ আমাদের ওপর মাতব্বরি ফলান, জমিদারি মনোভাব দেখান- যা সত্যিই বড় কষ্টের, অবমাননার ও অমর্যাদার। এরই মধ্যে লক্ষ্য করছি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের মধ্যে বৈরিতার ইতিহাস অতীতে না হলেও এখন তীব্র, দীর্ঘ এবং গভীর। আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গোড়াটি নিহিত রয়েছে ১৯৭১-এর ঘটনায়। হতাশার কথা, বাংলাদেশ বিরোধী অনুভূতি এখনো দেশের একটি অংশের গভীরে প্রোত্থিত। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ বিরোধীদের সম্পর্কে আধুনিক কালের বৈরীতা শুরু হয় ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর থেকে। সঙ্গত কারণে অনেক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রান্তিকাল দেখা গেছে। এর কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্র করে সকল কার্যক্রমে এক ধরণের নৈরাজ্য বিরাজ করে। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের, সুবিধাভোগী অমুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে অনেক সময় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কোনঠাসা হয়ে ছিলেন-আছেন। বস্তুত, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্টে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা পর থেকেই স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্টিত হয়। এরপর গোটা একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস শুনে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা তৈরি নিয়েও রাজনীতি কম হয়নি। অনেক মুক্তিযোদ্ধার পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হারিয়ে গেছেন। তাই, মুক্তিযুদ্ধের বীরদের তালিকা নিয়ে অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ হোক। লক্ষ-লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এ দেশে প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজও তাদের চাওয়া আমরা পুরোপুরি পূরণ করতে পারিনি। বরং স্বাধীনতার মূল্যবোধ এ দেশে ভূলুন্ঠিত হয়েছে। এ সুযোগে দেশে স্বাধীনতাবিরোধীরা (অধুনা বাংলাদেশ বিরোধীরা) যে অবস্থান নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে নিবে, তা তারা নিশ্চিত করেছে। তাঁরা (স্বাধীনতাবিরোধীরা) অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণে তাঁদের শেকড় সমাজের এক শ্রেনীর মানুষের হৃদয়ে একেবারে ঢুকে গেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের জন্য ভয়াল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে কত লোক আছে, তার হিসাব করতে গেলে দেখি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীর সংখ্যা এখনো নেয়াহেত কম নয়। এর অন্যতম কারণ, একাত্তরের জঘণ্যতম গণহত্যার কাহিনী হৃদয়ে ধারণ না করা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস প্রচার ও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ বিরোধী অব্যাহত ষড়যন্ত্র ইত্যাদি। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে। তবে সব যুদ্ধাপরাধীর কি দণ্ড হয়েছে? হয়নি। তাই দেশের সব ইউনিয়ন- উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে গোয়েন্দাদের দিয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের চিহিৃতকরণ, তাঁদের গণকবর শনাক্তকরণ, শহীদদের স্মৃতি ও নির্যাতনের স্মারকগুলো চিহিৃতকরণসহ প্রকৃত যোদ্ধাপরাধীদেরও শনাক্ত করতে হবে। তাঁদের বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। প্রকত মুক্তিযোদ্ধাসহ (শহীদ ও যুদ্ধাহতসহ) সাধারণ জনগণের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না ঘটাতে পারলে জনগণ শুধু রাজনীতিবিদদের স্বপ্নের জিকিরে আর ভুলবে বলে মনে হয় না। কারণ বিগত ৪৬ বছরে দেশে সংগঠিত সেই মহানাটক আজও মঞ্চায়িত হচ্ছে। জনগণের চাই-অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ অন্যান্য চাহিদা মেটানোর মত সক্ষমতা। দেশ উন্নত হচ্ছে, দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদা কি পূরণ করতে পারছে? এরই মধ্যে অনেকেই মনে করছেন, দেশে আবারও রাজনৈতিক সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। তাদের সেই সক্ষমতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সাধারণ জনগনের জন্য নতুন সমাজ গঠনোপযোগী যে সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নেয়া দরকার ছিল-তা নেয়া হয়নি ( যদিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার কিছু-কিছু কাজ করেছে)।। অন্যদিকে দেশে অনেক আগে থেকে চলে আসছে- অব্যাহত সন্ত্রাস, লুটপাট ইত্যাদি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নতো এই লুটপাট ছিলনা। দেশ স্বাধীন হলে জনগণ শান্তিতে থাকবে, এই আশায়, কেবল এই আশায় অনেকে নিজের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হলেও অস্থিতিশীল রাজনীতির কারণে দেশে পরিপূর্ণ শান্তি আসেনি। এ দেশের জনগণের দাবি খুব বেশি নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন ইস্যুতে লক্ষ্য বদলে ফেলেছে (সব রাজনীতিবিদ নয়)। সংবিধানে সকলের সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও-বাস্তবে তার বাস্তবায়ন পরিপূর্ণভাবে হচ্ছেনা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশই দুরবস্থার দিকে যাচ্ছে। তবে এত কিছুর পরেও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে আমাদের দেশে। আমার বিশ্বাষ জনগণ পরিবর্তন আনবে। সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতির আসল সমস্যা নিহিত রাজনৈতিক দলগুলোর সংকীর্ণতা ও ক্ষমতালিপ্সার মধ্যে। এ কারণে যে আদর্শে বলীয়ান হয়ে আমরা চরম ক্ষমতাধর ঔপনিবেশিক শক্তিকে ভেঙ্গে খানখান করে দিয়েছিলাম, সে আদর্শ, ঐক্য তারা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। অনেকেই আজ বলে থাকে, বর্তমানে রাজনীতি এক জঘন্য কৌশল। তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গঠন করতে হলে, দরকার রাজনৈতিক ঐক্যের। তাই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং আলোচনার ভিত্তিতে করতে হবে। আগেকার দিনের মত গণ বা সেনা অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করা যাবে না। কিন্তু দেশের বড় দুই দলের মধ্যে ক্ষমতা দখলের যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা সুখকর নয়। তাই দেশের জনগণের স্বার্থে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে এখনই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে সাবধান হতে হবে। তাহলেই সুখী- সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পাব আমরা-নচেৎ নয়। ইতিহাস বলে, ভালো কাজ না করলে কোনো কূটচাল, প্ল্যান-পায়তারাই কাজে লাগেনা। এগুলো বাদ দিয়ে জনসেবা করুন সবাই। রাজনীতি করতে হলে-এটা লাগবেই। অন্য কোন কিছুই কাজে দিবে না। লেখকএ.টি.এম. মোফাজ্জেল হোসেন (স্বাধীন)লেখক-মানবাধিকার কর্মী ও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

ভালোবাসার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নেই

আমরা ভালোবাসি আমাদের মা-বাবাকে। ভালোবাসি প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে। সমানহারে ভালোবাসি পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে। এর বাহিরেও আত্মীয়তা এবং নিবিড় সম্পর্কও রয়েছে। তাছাড়া কোনো না কোনোভাবে প্রতিনিয়ত ভালো লাগা, ভালোবাসার মানুষগুলোর সাথে ভাব বিনিময় এবং মান-অভিমান, ভুল বুঝাবুঝি, অবসান, সাথে পরম্পরা বন্ধন সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছি। বর্ষপঞ্জির নির্দিষ্ট একদিন ভালোবাসি, ভালোবাসি বলে জানান দিতে হবে। পাশাপাশি উপঢৌকন, বর্ণিল সাজে সজ্জিত হয়ে বাহিরে ঘুরাফেরা এবং পকেট কেটে নামজাদা হোটেল রেস্টুরেন্টে বসে কষ্টার্জিত অর্থব্যয়ে দামী খাবার খেতে হবে। নইলে ভালোবাসা দিবস মূল্যহীন। এমন হতে হবে কেন? তার মানে ৩৬৪ দিন অবহেলা অনাদরে ছিল। নতুন পোশাক পরিচ্ছদ না দিয়ে নোংরা মলাট কাপড়চোপড় দিয়ে ঘরের ভেতর বন্দি রাখা হয়েছিল। ভালো খাবার খেতে না দিয়ে পান্তাভাত আর কাঁচামরিচ ঢলা খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছে। এমন ঘটনা কি ঘটেছে? মোটেও না। অপ্রিয় হলেও সত্য এসব বড্ড বাড়াবাড়ি। হালের ফ্যাশন, নোংরা মানসিকতার পরিচায়ক। শহরবাসী উৎসব করে, বিভিন্ন দিবস উৎযাপন করে। পালনকারীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বরং দিনদিন মতাবলম্বীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে বয়সে তরুণ তরুণীর আধিক্য বেশি। বিবাহিত এবং জটিল সম্পর্কে যারা জড়িয়ে আছেন তাদের বেশিরভাগ অন্তরাল অথবা অন্দরমহলে নয় বরং সগৌরবে সমান তালে নিজেদের উজার করে দিচ্ছেন। আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে প্রতিনিয়ত উদ্ভট দিবস পালনের নামে ব্যভিচার বেড়ে চলছে। যোগ আছে হিন্দি সিরিয়ালের নায়ক নায়িকাদের অনুকরণ। হরহামেশা দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি জীবন ও পারিবারিক জীবন বন্ধনের উপর প্রভাব ফেলছে হিন্দি ও বাংলা সিরিয়াল। সাথে বিকৃত হচ্ছে মায়ের ভাষা। হিন্দি শব্দ ব্যবহার করে প্রিয়জনকে সম্বোধন, ভিনদেশি ভাষা অবিরাম বলতে পারলে সবার সামনে বিশেষ গুণের-গুণী বনে যান। যারা শেকড় ভুলে ভিনদেশি ভাষা ব্যবহার, চলনবলন অনুকরণ ও পোশাক আশাক ধারণ করে অহংবোধ করেন তাঁরা কেমন মানুষ? ভাবতে অবাক হই। সামনে আর কি বাকি আছে। বাকিগুলো পূর্ণতা পেলে সেদিন গুলো কেমন যাবে। মাবুদ ভালো জানেন। ক্রমে ক্রমে ভুলতে বসছি নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, স্নেহ, মমতা, শ্রদ্ধা, সম্মান, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। বর্তমান দিনকাল, অভ্যাস সবকিছু কেমন জানি অস্থিরতায় ভরপুর। অস্থিরবুদ্ধি, উদ্ভট চিন্তাজগত, উগ্র চলাফেরা, উচ্চস্বরে বাক্য বিনিময়, বেপর্দা, সেলফি, চ্যাটিং, ভিডিও কথোপকথন, লাইভ আড্ডা, চ্যাটাংচ্যাটাং কথাবার্তা এসব কিছু গ্রাস করছে সোনালি অতীত ও বর্তমান প্রজন্মকে। ভালোবাসা দিবসের নামে বর্ণিল সাজ, রগচটা পোশাক, স্পর্শের নামে নগ্নতা, আড়ালে নয় সবার নজরে আসে এমন স্থানে জড়াজড়ি, চুম্বন, কুরুচিপূর্ণ আলিঙ্গন। চলার পথ, বেড়ানোর রাস্তা, উম্মুক্ত পরিবেশ সবি যেন নির্লজ্জদের দখলে। চোখ ন্যুয়ে আসে, মুহুর্তে বিবেক ধর্ষিত হয়। ভালোবাসার অপর নাম খুব করে জড়িয়ে ধরা নয়। ভালোবাসা মানে হৃদয়ের বন্ধন, আত্মার টান, সমান শ্রদ্ধা, অধিকার নিয়ে দায়িত্বপালন। আপনার সন্তানসহ নিকটতম স্বজনের দিকে নজর দিন। কোথায় যাচ্ছে, কি করছে। নচেৎ আপনার পরিবারের সম্মানহানি হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আসুন সুস্থ চিন্তা ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে সত্য সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করি। লেখক: রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিককর্মী

ভালোবাসা শুধুই প্রেমিক-প্রেমিকার নয়

ভালোবাসার সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। ভালোবাসা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। ভালোবাসার পরিসর মহাসাগরকে হার মানায়। ভালোবাসা সর্বএ বিরাজমান, ভালোবাসা অসীম,অন্তহীন, প্রবাহমান। শুধু তরুণ-তরুণী নয়, বুড়োবুড়ির মধ্যেও গভীর ভালোবাসাবাসি থাকে। ভালোবাসা থাকে স্বামী- স্ত্রীতে, ভাইবোন ও সহপাঠীর মধ্যে।শিক্ষক শিক্ষার্থীও সহকর্মীদের মধ্যেও পারষ্পরিক ভালোবাসার বন্ধন গড়ে ওঠে। পশুপাখি,গাছপালা ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মায়। সন্তান-সন্ততির প্রতি মা বাবার অকৃএিম ভালোবাসাতো সর্বজনবিদিত। তেমনি সন্তানেরও মা বাবার প্রতি। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। পারষ্পরিক বোঝাপড়া ও অগাধ বিশ্বাসের মধ্যে ভালোবাসার জন্য।ভালোলাগা থেকে ভালোবাসার উদ্ভব। এ ভালোবাসা শুধু মানুষ নয়, বিশ্বের যেকোন প্রাণির মধ্যে আছে।ভালোবাসা একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।ভালোবাসা হচ্ছে ভাবাবেগের বহিঃপ্রকাশ।ভালোবাসাকে দিবসকেন্দ্রিক করা মেটেই উচিত নয়। ভালোবাসা একটি সার্বজনীন ও বিশ্বজনীন বিষয়। ভালোবাসার নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। ভালোবাসা মানুষের পাশাপাশি জগতের সব প্রাণির মধ্যে প্রচন্ড আবেগ- অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভালোবাসা মানুষকে আত্নবিশ্বাসী ও আত্নত্যাগী হিসেবে গড়ে তোলে। ভালোবাসার মানুষের জন্যে মানুষ তাই যেকোন কিছু করতে পারে,জীবন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না।ভালোবাসার মানুষকে পেতে বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ববিগ্রহসহ বহু কামিনী আছে। ভালোবাসার মানুষ বিশেষ করে স্নেহময়ী স্ত্রী মমতাজ মহলের জন্যে মোঘল সম্রাট শাহজাহান পৃথিবীর সপ্তম আশ্চার্যের এক দৃষ্টিনন্দন ইমারত নির্মাণ করেছিলেন- যা আগ্রার তাজমহল হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত।তবে ভালোবাসা এক তরফা কোন বিষয় নয়,বিশেষ কারণেই দু`জনের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা তৈরি হতে পারে।মানব শিশুর প্রতি যেকোন মানুষের সহজাত স্নেহ - ভালোবাসা প্রকাশ পায়।এটি অবশ্য মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।মানুষ জন্মগত ভাবে স্বার্থপর। কোন না কোন স্বার্থের কারণে মানুষের মধ্যে পারষ্পরিক বন্ধন তৈরি হয়। স্বার্থের রকমফের থাকতে পারে।আত্নমানবতার সেবার পেছনেও এক ধরণের স্বার্থ লুকায়িত থাকে। সমাজসেবার পেছনেও কাজ করে বিশেষ কোন উদ্দেশ্য।যেকোন কাজের পেছনে কোন না কোন স্বার্থ থাকে।তা ব্যক্তিগত হোক কিংবা জনস্বার্থ। ভালোবাসার পেছনেও এক ধরণের স্বার্থ থাকে।অবস্থানগত কারণে ভালোবাসার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।মন্ত্রীপাড়ার ভালোবাসা আর বস্তির মানুষের ভালোবাসার প্রকাশ একরকম নয়।কালের বিবর্তনে ভালোবাসার ধরনও পাল্টে যায়। সেকালের রাধিকারা কৃষ্ণের বাঁশির সুর শোনেই ঘর থেকে বের হয়ে আসতো।কিন্তু এ যুগের রাধিকারা দামি গাড়িরা হর্ণ ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চান না।সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসায়ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে বৈষম্য দেখা যায়।যে সন্তান বেকার তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা একরকম অন্যদিকে যে সন্তান ভালো আয় উপার্জন করে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের প্রতি ভালোবাসা ভিন্ন রকম হয়।পারষ্পরিক চাহিদা পূরণের ওপর ভালোবাসার মাএা ওঠানামা করে। প্রেম ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও আন্তরিকতা সবই ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের ওপর নির্ভরশীল। চাহিদারও আবার ভিন্নতা আছে।দুবেলা দুমুটো খাওয়ার চাহিদা আবার দামী মোটরগাড়ির কেনার চাহিদা।চাহিদার একটু হেরফের হলেই ভালোবাসায় ছন্দপতন হয়।অভাবের সংসারে তো ভালোবাসার অস্তিত্ব অবশ্লিষ্ট থাকে না। আমার এক প্রিয় কলেজ শিক্ষক প্রয়াত হিরণায় চক্রবর্তীর ভালোবাসা সম্পর্কিত একটি কথা আমার আজও মনে আছে।তা হচ্ছে " অভাব যখন দুয়ারে এসে দাঁড়ায় ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।" পরিশেষে বলতে চাই,প্রেম ভালোবাসা প্রকাশ বিশেষ দিবস কেন্দ্রিক হওয়া কোনভাবেই বাঞ্চনীয় নয়। ভালোবাসা শুধু প্রমিক প্রেমিকা আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে নয় জগতের সকল প্রাণির মধ্যে পারষ্পরিক ভালোবাসা সঞ্চারিত হতে হবে। প্রতিটি জীবকে আমাদের আন্তরিকভাবে ভালোবাসতে হবে।তাইতো বলা হয়, `জীবে দয়া করে যেজন, সেজন সেবিছে ঈশ্বর`।   লেখকঃ শিক্ষক ও সাংবাদিক

হায়রে বচন!

মেয়েরা মেয়েদের শত্রু, মেয়েরা কুটনী, মেয়েরা স্বার্থপর, ছলনাময়ী, ঝগড়াটে, রহস্যময়ী, মেয়েদের পেটে কথা থাকে না, মাথা মোটা। মেয়েরা হিংসুটে, মেয়েদের মগজ হালকা, এরা ছিচকাঁদুনে, অন্যের ভালো দেখতে পারে না, এরা পরের বাড়ির জন্য, অংক পারে না, মেয়ে মানুষ বোঝা বড় দায়, ও’তো মেয়ে, পারবে না ইত্যাদি নানা মন্তব্য গল্পে আড্ডায়, আলোচনায় মুখরোচকভাবে বলা হয় মেয়েদের সর্ম্পকে। এসব কথা বলে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন অনেকেই। সেই ছোটবেলা থেকেই পুরুষ শাসিত সমাজে এসব মন্তব্য শুনতে শুনতে মেয়েরা বড় হয়। এসব কথা শোনে সে পুরুষের কাছ থেকে, এসব কথা শোনে সে মেয়েদের কাছ থেকেও। তার শিশু মনে  দাগ কাটে কথাগুলো। কষ্ট পায় সে। কখনো প্রতিবাদ করে। কখনো কিছু বলতে পারেনা।কাঁদলেই যে তাকে বলা হবে ছিচকাঁদুনে। তখন অবচেতন মনেই এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে সে। নিজেকে সরিয়ে নেয়, গুটিয়ে নেয় সবকিছু থেকে। বাড়ির ছেলেদের চাইতে মেয়েটা মেধাবী হলেও সে তখন ভাবতে থাকে আসলেও সে বুঝি কিছু পারেনা। তার দ্বারা কিছু হবে না । হীনমনতায় তার জগত ক্রমশ ছোট হয়ে যায়। ছোট বেলাতেই কথার ইভ টিজিংয়ের শিকার হয় সে। যা চলতে থাকে সারাজীবন ভর।  যারা কথাগুলো বলেন তারা ভাবেন না কি বিষ ছড়াচ্ছেন তারা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তারা ভাবতেও পারেন না  তাদের ছুড়ে দেওয়া কথাগুলো কিভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ছে নেতিবাচক অর্থে।সেই আদিম যুগে পুরুষ নারী সমান তালে পা ফেলেছে। তারা বনে বাদারে এক সাথে শিকার করেছে। তখন বৈষম্য ছিলো না পুরুষ নারীতে।  এক সময় পুরুষ তার স্বার্থে পেশী শক্তির বড়াই করে নারীকে ঘরে বন্দী করে ফেলে। ছলনাময়ী, রহসময়ী মাথায় মগজ নাই ইতাদি নানা বিশেষনে ভুষিত করে তাকে দুর্বল করে রাখে। তার মানসিক শক্তিকে নষ্ট করে দেয়। ঘরই তার কাছে নিরাপদ আশয় বলে নির্ধারন করে দেয়া হয়। ফলে বাইরের আলো থেকে ক্রমশ বঞ্চিত হতে শুরু করে মেয়েরা। ধীরে ধীরে তার জগত হয়ে পরে সংকুচিত। আর তখনই মেয়েদের হালকা করে দেখতে শুরু করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। হেয় করে বলতে শুরু করে তারা নানা কথা। মেয়েরা ছলনাময়ী, তাদের মাথা মোটা, তারা আবিস্কার করতে পারে না, বিজ্ঞান বোঝে না, অংক পারেনা নানা কথা বলা হয় তাদের সর্ম্পকে। ছেলেরা বংশের বাতি, মেয়েরা পরের বাড়ির জন্য। ছেলেবেলাতেই এসব কথা শোনে সে। তার মন ভেঙে যায়। তার কষ্ট দেখে শুধু রাতের আকাশ। পেটে গোপন কথা ছেলে মেয়ে অনেকেই হয়তো রাখতে পারেন না কিন্তু দোষ হয় শুধু মেয়েদের। তারা হালকা  পেটে কথা রাখতে পারেনা। এভাবে নানা ভাবে সমাজ তাকে হেয় করে। মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।সময় পাল্টায়। কিছু কিছু মেয়ে নিয়ম ভাঙে তারা আকাশে ওড়ে, ছুটে বেড়ায় দশ দিগন্ত। তবুও আজও পাল্টায় না মানসিকতা। যুগে যুগে হেয় করে বলা বচনগুলো চলতে থাকে মুখে মুখে। সিনেমা নাটক গল্পে হালকা সস্তা করে দেখানো হয় নারীদের। যেনবা মেয়ে মানেই কুটনী, স্বার্থপর, ঝগড়াটে, হিংসুটে। বিজ্ঞাপনে মেয়েদের দেখানো হয় লোভনীয় ভাবে। পন্য হিসেবে। কিন্তু কেন এসব বলা ? এ কেমন মানসিকতা। যুগ যুগ ধরে একজন মেয়েকে শেখানো হয় অনের তৃপ্তিই তোমার  তৃপ্তি। ক্ষুধা লাগলেও তুমি না খেয়ে থাকবে । আগে খাবে বাড়ির ছেলেরা। বেহায়া মেয়েরা আগে খায়। বাসী খাবার নষ্ট করবে না। অকল্যাণ হয়। মায়ের বলে দেয়া কথাগুলো  শিখে নেয় মেয়ে। অথচ এই মা যদি পড়াশুনা করতেন তাহলে তার শেখানোটা হতো অনরকম ভাবে। তিনি বুঝাতে পারতেন পচা বাসী অস্বাস্থকর খাবার খাওয়া ঠিক না। ঠিক সময়ে খেতে হয় প্রতিটা মানুষকেই । এই মা কে শিখতে দেয়নি তার পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। কখনো কি পুরষরা জানতে চেয়েছেন তার স্ত্রীর কি ভালো লাগে ? সে খেয়েছে কিনা? তার সখ কি? সংসারের কোনো কারণে যদি বউ আর শাশুরির ঝগড়া লাগে বলা হয় মেয়েরা মেয়েদের শত্রু। একবারও ভাবে না তারা যে কোনো কারও সঙ্গে মতের মিল অমিল হতেই পারে। যে মা সারাজীবন তার রান্নাঘরকে তার সামাজ্য ভেবে জীবন পার করেছেন । তাকে আকড়ে ধরে একটু ক্ষমতা পেতে চেয়েছেন । তিনি হয়তো তা হারানোর ভয়ে অন্য আচরন করেছেন। যুগ যুগ ধরে পিছিয়ে থাকার ফলে হয়তোবা সে তখন আর জায়গা ছাড়তে চায়না। তখন তার ক্ষুদ্রতা, সংর্কীনতা চোখে পরে সবার। কিনতু তিনি যদি পড়াশোনা করতেন, চাকরী করতেন, বিশ^ ঘুরে দেখতেন তাহলে বুঝতেন এসব কত তুচছ বাপার কিনতু তাকে তো বুঝতে দেয়নি  সমাজ। রান্না ঘরেই কেটে যায় তার সারাজীবন। তথ্যের খোলা জানালা তাদের কাছে থাকে বন্ধ।  ফলে ভাবনার জায়গায় তারা হয়তো ছিলেন পিছিয়ে। সে বিষয়ে না যেয়ে সমাজ তাকে উপহাস করে ওতো মেয়ে মানুষ, ও পারবে না জ্ঞান বিজ্ঞান ওর জন্য নয়। যা শুনে মেয়েটি গুটিয়ে যায়। কারন তার পাশে তাকে সাহস দেবার তার আত্মবিশবাস বাড়িয়ে দেবার কেউ নেই। তার কান্না শোনে না বাড়ির কেউ। আমাদের দাদী নানী মায়েরা যদি জ্ঞানের আলোয় আরও হাটতে পারতেন পথ। আমাদের জন্য সে পথ তাহলে হয়তো আরও সহজ সরল হতো। ধর্মীয় কুসংস্কার, পড়াশোনা,অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাবে হয়তো সব মেয়েরা তার মতামত সব জায়গায় দিতে পারে না। তবে সব সামাজিক সুযোগ সুবিধা পেয়েও অনেক পুরুষ যখন (সবাই না) কর্মক্ষেত্রে, ঘরে, সামাজিকভাবে সংকীর্ণ আচরন করেন তখন তাকে কি বলবেন ? তিনি তো অনেক সুযোগ পেয়েছেন। তার তো আকাশের মতো উদার হওয়া উচিত ছিলো ? তিনি কেন তা নন ? অন্যায় সব সময়ই অন্যায়। তা ছেলে মেয়ে সবার জন্যই। তাই নিজের সুবিধার জন্য, স্বার্থের জন্য নানা বিরুপ মন্তব্য করে মেয়েদের আর পিছিয়ে রাখা ঠিক হবে না। মেয়েদের আরও সচেতন, বুদ্ধিমান, সাহসী হতে হবে । মেয়েরা যত বাইরে আসবে, পড়াশোনা করবে, তত বন্ধ দুয়ার খুলে যাবে। খনা, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম, ইলামিত্র, প্রীতিলতার দেশে বিরুপ মন্তব্য গুলোকে আবর্জনায় ফেলে আলো আনবেই মেয়েরা। তাই নারীদের পিছনে না রেখে রহস্যময়ী ছলনাময়ী, স্বার্থপর না বলে সবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে সবাইকে। / এআর /

মনোদৈহিক সমস্যা ও সামাজিক অস্তিরতার বড় কারণ ফেসবুক

আমাদের জীবন হয়ে পড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর। সবাই মিলে ঢুকে পড়েছি উৎকট হাস্যকর বাস্তবসারযুগে। ক্ষীয়মাণ হয়ে গেছে পারস্পরিক স্নেহ ভালবাসা মমতার সম্পর্ক। ইদানীং সামাজিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতার বড় কারণ ফেসবুক। ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা ও টানাপোড়েনের জন্যেও এটি দায়ী। বুঝে না বুঝে আমরা প্রযুক্তির অপরিণামদর্শী ব্যবহার করছি দিনের পরদিন। সমাজে কমছে সমমর্মিতা। বাড়ছে প্রতারণা অবিশ্বাস প্রতিহিংসা। আমাদের স্বাধীনতা বেড়েছে, সচেতনতা বাড়ে নি। আমরা নতুন প্রযুত্তি ব্যবহার করব, কিন্তু যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে আগামী প্রজন্ম # ভার্চুয়াল ভাইরাসের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি তিন জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর একজনই শিশু ( ইউনিসেফ রিপোর্ট ২০১৭) # শিশুদের অটিজম, মনোযোগ হ্রাসের জন্যে দায়ী ভিডিও গেম আসক্তি। মার্কিন তরুণদের মাঝে স্কুল থেকে ঝরে পড়া, পরিবার ও সমাজ বিচ্ছিন্নতা, তীব্র বিষন্নতার মতো আত্নঘাতী সমস্যার নেপথ্য কারণও হলো ইন্টারনেট আসক্তি। (ওয়াশিংটন পোস্ট ২০ মে ৭ ডিসেম্বার ২০১৭) #পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড এর গবেষনা অনুযায়ী, যেসব শিশু কম্পিউটার টেলিভিশন ও ভিডিও গেম নিয়ে দিনের বিশিরভাগর সময় ব্যস্ত থাকে তারা হয়ে পড়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হীনমন্যতার শিকার। ভাষ্যমতে, শিশুদের অনিদ্রা, মেদস্থুলতা, আগ্রাসী মনোভার, আত্নবিশ্বসহীনতার অন্যতম কারণ স্ক্রিন আসক্তি। (দ্য গার্ডিয়ান, ২৬জানুয়অরি ২০১৮) সচেতন হোন এখনই # বয়স ১৮ হওয়ার আগে সন্তানের হাতে স্মার্টফোন দেবেন না। # রাত ১১ টার পর ভার্চুয়াল জগত থেকে দূরে থাকুক। লেখক : আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রথিতযশা মনোচিকিৎসক      

সাগর-রুনীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে আমাদের প্রিয় দুই সহকর্মী মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনী রাজধানীর রাজাবাজারে তাদের নিজ বাসায় নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন। এই ঘটনার খবর পেয়ে সহকর্মী সাংবাদিকদের পাশাপাশি সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সাগর-রুনীর বাসায় ছুটে যান। যাদের মধ্যে ছিলেন সেই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। ভয়াবহ এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের আশ্বাস দেন। পেশাদার দুই সাংবাদিকের এই নৃশংস হত্যার খবর জেনে সারা দেশের মানুষ শিউরে উঠে। ঘটনার দু’দিন পর পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক সাংবাদিক সম্মেলন করে সাগর-রুনী হত্যাকান্ডের ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির’ কথা জানান।

‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক আসক্তি ও মাদকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই’

মস্তিস্ককে তোমরা কীভাবে ব্যবহার করবে, তার উপর নির্ভর করবে তোমার, তোমার দেশের এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তোমরা কি জানো এই মহামূল্যবান রহস্যময় মস্তিস্কটি নিয়ে এখন সারা পৃথিবীতে একটি অবিশ্বাস্য ষড়যন্ত্র চলছে? আমি নিশ্চিত তোমাদের অনেকেই নিজের অজান্তে সেই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছ। এই ষড়যন্ত্রের নাম সোশ্যাল নেটওয়ার্ক। শিক্ষক হিসেবে আমি লক্ষ করেছি ২০১৩-১৪ সাল থেকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে একধরনের গুণগত অবক্ষয় শুরু হয়েছে। তাদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা ও বিশ্লেষনী ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। আমার মনে হয়, এই ফেসবুক জাতীয় সামাজিক নেটওয়ার্কে বাড়াবাড়ি আসক্তির ফল। মাদকাসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে মাদক না পেলে অস্থির হয়ে যায়, তার মস্তিস্কে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। বিজ্ঞানিরা দেখিয়েছেন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আসক্ত একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে তার সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সময় অপচয় না করতে পারলে সে ও অস্থির হয়ে যায়। তার মস্তিস্কেও বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল নির্গত হতে শুরু করে। সহজ ভাষায় বলা যায়, সত্যিকারের মাদকসক্তির সাথে সোশ্যাল নেটওয়াকে আসক্তির কোনো পর্থ্যক্য নেই। তোমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে, কিন্তু প্রযুক্তি যেন কখনো তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে, মনে রেখো এই সব আধুনিক প্রযুক্তি কিন্তু পরজীবী প্রানীর মতো সেগুলো তোমার পুষ্টি খেয়ে বছে থাকে। (২০১৭ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের দেওয়া ভাষণের নির্বাচিত অংশ)  / এআর /

প্রীতিলতা ও নারী রাজনীতি

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। দেশকে বাঁচাতে তিনি বিস্ফোরক সরবরাহ করেছিলেন। নিয়েছিলেন জীবনের ঝুঁকি। সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব এবং ঔপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে তার অবদান অনস্বীকার্য। দেশকে মুক্ত করতে একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে যা করণীয় তিনি তাই করেছিলেন। দ্য গার্ডিয়ানে নোভারা মিডিয়ার জ্যেষ্ঠ সম্পাদক অ্যাশ সরকার একটি নিবন্ধ লিখেছেন। তার লেখা ভাষান্তর করে একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- কিছু ব্রিটিশ নারীকে ভোটাধিকার দেওয়ার শতবর্ষপূর্তি হয়েছে গত মঙ্গলবার। এখন সময় এসেছে নারীর ভোটাধিকারের ওপর সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব এবং ঔপনিবেশবিরোধী আন্দোলনগুলোতে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়ার। এখানেই চলে আসে প্রীতিলতার বিষয়টি। ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে বাংলা ছিল ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের জ্বলন্ত কড়াই। আর নারীরা ছিলেন এ পুনরুত্থান আন্দোলনের আত্মার স্থানে। এ অঞ্চলের তৎকালীন এক জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস স্টিভেনস দুই নারী শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরীর হাতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। কমলা দাশগুপ্ত ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বোমা হামলা চালানোর জন্য যুগান্তর দলকে সহায়তা করেছিলেন। আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার স্কুল শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। যুক্তরাজ্যে ১৯১৪ সালে মাত্র দুই হাজার নারী সরকারি ডকইয়ার্ড, কারখানা ও অস্ত্রাগারে কাজ কররেও যুদ্ধবিরতির সময় এ সংখ্যা বেড়ে আড়াই লাখে চলে গিয়েছিল। ১৯১৮ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে ৩০ বছরের বেশি বয়সী সম্পত্তির মালিক নারীদের ভোটাধিকার অনুমোদন করা হয়েছিল। ওই সময় স্বদেশি ভাবনাকে আঁকড়ে ধরে প্রতিবাদী বিবেকবানদের আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যান এবং নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ভাবমূর্তি বদলে গিয়েছেল। আর এ কাজটি করেছিল, ব্রিটেনে নারীর ভোটাধিকার নিয়ে প্রচারণা চালানো প্রধান সংস্থা দ্য পাংখুরস্ট। একসময় বিপথগামী রাজনৈতিক স্বার্থের নারী ভোটাধিকারীরা ও ব্রিটিশরাজ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহের অভিন্ন কারণ খুঁজে পেয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উল্লেখযোগ্য নারী ভোটাধিকারী অ্যানি বেসান্ট, ক্যাথেরিন ইমপে এবং এমেলাইন পাংখুরেস্টের মেয়ে সিলভিয়ার সময় নারীবাদের প্রথম ঢেউ উঠে। সেই সময় ঔপনিবেশবাদে ব্রিটিশ নারীদের সমঅংশ গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ তারা ছিল ভোটাধিকার বর্ধিতকরণের পক্ষে। সেই সময় এমেলাইন পাংখুরস্ট আওয়াজ তুলেছিল, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আয়তন ও সম্ভাব্য সম্পদে বিশাল’। ফ্লোরা অ্যানি স্টিলের মতো ব্যক্তিত্বরা উপনিবেশ দেশগুলোতে স্বদেশিদের ওপর শ্বেতাঙ্গ নারীদের শাসন পরিচালনার সক্ষমতা দেখে মূল ব্রিটেনে নারীদের রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের আরও বেশি দাবির যৌক্তিকতা খুঁজে পান। ভারতের গৃহস্থালি ও রান্নাবান্না বিষয়ে ১৮৮৮ সালে স্টিল লিখেছিলেন, উপনিবেশ দেশগুলোর গৃহস্থালি কাজের লোকদের ওপর নারীর কর্তৃত্ব ছিল একটি ক্ষুদ্র সাম্রাজ্যের মতো। ইংরেজ মিসেসদের প্রথম দায়িত্ব ছিল আদেশ দেওয়া। আর দ্বিতীয়টি ছিল তার আদেশ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া। ১৯১৮ সালের দিকে ব্রিটিশের যুদ্ধ চেষ্টায় ঔপনিবেশিক বিষয়াবলিতে অবদান এবং ভারতীয় ও আফ্রিকানদের নারীর ভোটাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিতি সত্ত্বেও নারীর ভোটাধিকার সীমিত রাখা হয়েছিল। শুধু মূল ব্রিটেনে বসবাসকারী নারী এবং উপনিবেশ দেশগুলোতে বসতি স্থাপনকারী শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে।  ইউরোপের নারীরা ১৯১৯ সালের শুরুতেই কেনিয়ায় ভোট দিতে পারলেও আফ্রিকার নারী-পুরুষদের একই অধিকারের জন্য ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আর ভারতজুড়ে নারীরা সীমিত আকারে প্রাদেশিক পরিষদে ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েছিল ১৯২০ সালের মাঝামাঝি থেকে। এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী নারীদের জন্য ঔপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ছিল রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের প্রাথমিক স্তর। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্তর্ভুক্তির দাবি তখনও ছিল না। ছিল শুধু সাম্রাজ্যবাদ পুরোপুরি উৎখাতের দাবি। ১৯২৫ সালে প্রথম নারী হিসেবে সরোজিনি নাইডু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ভারতের নারীদের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে গান্ধীবাদী গণআন্দোলনই একমাত্র পথ ছিল না। যেখানে ভারত ছাড় আন্দোলনের পরিচিতির কৌশল ছিল সত্যগ্রহ, সেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ব্রিটিশরাজকে পরাজিত করার পেছনে। সূর্যসেন, প্রীতিলতা এবং আরও ৬০ জন মিলে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের দুটি অস্ত্রাগার দখল করে নেন। তারা ইউরোপিয়ান ক্লাব থেকে কয়েকজনকে জিম্মি করার এবং কলকাতার সঙ্গে রেললাইন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেন। ব্রিটিশরাজের মূল অস্ত্রসম্ভারের সন্ধান পেতে ব্যর্থ হলেও বিপ্লবীরা টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ লাইন কেটে দিতে এবং রেল নেটওয়ার্ক ওলটপালট করে দেন। প্রীতিলতা রিজার্ভ পুলিশ লাইন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সফল এক অভিযানে অংশ নেন। পরের দুই বছরজুড়ে প্রীতিলতা বিস্ফোরক সরবরাহ করেন। এ ছাড়াও জাতীয়তাবাদী লিফলেট লিখেন এবং সূর্যসেন ও ফাঁসির দিন গুণতে থাকা তার কারাবন্দি সহযোগী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের মধ্যে অবৈধ যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রীতিলতা নিজেকে বাংলার মোস্টওয়ান্টেড তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি নিজের সর্বশেষ রেইডে অংশ নেন। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে একজন পাঞ্জাবি পুরুষের ছদ্মবেশে যোদ্ধাদের নিয়ে হামলায় নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রীতিলতা ও তার সঙ্গীরা ক্লাবটি জ্বালিয়ে দেন। এক ব্রিটিশ নারীকে হত্যা এবং আরও ১১ জনকে জখম করেন তারা। হামলার সময় প্রীতিলতা একটি বুলেটের আঘাতে আহত হয়ে পুলিশের হাতে আটক হন। জেলে বন্দি হয়ে থাকার চেয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। এর দুই বছর পরই ব্রিটিশদের হাতে নির্যাতন ও ফাঁসির শিকার হন সূর্যসেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে প্রীতিলতা ও অন্য নারী অংশগ্রহণকারীরা ঔপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে পুনরুত্থিত করেছেন। নিজের প্রকাশিত সর্বশেষ শব্দগুচ্ছে প্রীতিলতা লিখেছেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, আমার বোনেরা নিজেদের আর দুর্বল হিসেবে ভাববে না। এবং নিজেদের তৈরি রাখবে সব ধরনের বিপদ ও কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলায় এবং হাজার হাজার বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেবে।’ ব্রিটেনে ভোটাধিকারপ্রাপ্ত নারীরা তাদের রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের জন্য বিতর্ক করেছেন নিজেদের পুরুষ প্রতিপক্ষকে যুদ্ধবিগ্রহে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থনদানের মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে উপনিবেশ দেশগুলোতে নারীরা নিজেরাই সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ব্রিটিশ নারীদের ইতিহাস কখনও ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ড ধারণ করেনি। ভোটাধিকারপ্রাপ্তির বিষয়ের প্রতিযোগিতা দেখা যায়, অধিকার রাষ্ট্র পাইয়ে দেয় না, এর কাছ থেকে জোর করে আদায় করে নিতে হয়। আহেদ তামিমি থেকে ইরিসা গারনার পর্যন্ত এখনকার নারীরাও স্মরণ করিয়ে দেন, রাজনৈতিক অধিকার ভোটের বাক্সে প্রবেশের থেকে আরও বহুদূর বিস্তৃত। আমাদের অধিকার কেবল সামান্য প্রতিনিধিত্বের জন্য নয়, পরিপূর্ণ মুক্তি ছাড়া আর কিছুতেই এটি নিহিত নয়। প্রীতিলতার কর্মকাণ্ড ভোটাধিকার অর্জনের নেপথ্যে বৈচিত্র্য প্রকাশ করে।   একে//এসএইচ

প্রযুক্তির অপব্যবহার: বিপর্যয়ে সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা

শুন্য থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যাকে ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগের প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণের কৌশলকেই আভিধানিক অর্থে ডিজিটাল প্রযুক্তি বলে। বর্তমানে সারা বিশ্বে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।এমনকি বাংলাদেশেও। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সব কাজ (যোগাযোগের) সহজেই করা যায়-শুরুতে এমনটিই বলা ও ভাবা হয়েছিল। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমকে (কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, বিভিন্ন অ্যাপলিকেশন সফটওয়্যার, বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও অ্যাপস, ইত্যাদি) আমরা দ্রুত যোগাযোগের অন্যতম বাহন হিসেবে গণ্য করতে পারি। মোট কথা, তথ্য প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক কাজ করা যায়।  এজন্যই ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তির প্রতি মানুষের এত মনযোগ বা আকর্ষণ। দেশে অব্যাহত ভাবে চলছে নির্বিচারে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশেষত মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক ও হিন্দি চ্যানেলের অপব্যবহার। এছাড়া তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর অন্যান্য মাধ্যমের ভয়ানক আগ্রাসন তো আছেই! দেশের বিরাট এক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তির আসক্তির মধ্যে রয়েছে। ফলে দেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন (এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ মাত্রায় নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে)। আর এর মূল ভুক্তভোগী হচ্ছে শিশু, কিশোর, যুবকসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। অন্যদিকে বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন বাজার হচ্ছে ধর্ম (রূপক অর্থে), বাজার স্বর্গ (রূপক অর্থে) বাজারই পরমন্তপঃ হে। সেই বাজারের নিয়ন্ত্রকেরা স্বল্প সময়ে মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতায় আমাদের মত নিম্ন-মধ্যম আয়ের (হতে চলা) দেশকে ‘টার্গেট মার্কেট’ ধরে তাদের প্রযুক্তির পণ্য-সেবা সমূহের আগ্রাসী বিপণন কার্যাক্রম চালাচ্ছে আমাদের এখানে। এখন কেনই বা আজ আমদের দেশের মানুষেরা কাজ-কর্ম ছেড়ে দিয়ে (সবাই না তবে অনেকেই) মোবাইল ফোন, ফেসবুক,  ইন্টারনেট সহ বিভিন্ন অ্যাপস ও প্রোগ্রামে ব্যস্ত হয়ে পরেছে তার কার্যকর কারণগুলোর দিকে নজর দিব আমরা। সাধারণভাবে অবসর সময় কাটানোর জন্য মানুষ বিভিন্ন প্রোগ্রামমুখী হয়। অনেকে আবার জীবনের অস্তিত্ববাদী সংকটের কারণেও প্রোগ্রামমুখী হয়। আমাদের সমাজের মানুষের ভয়ানক ডিজিটাল প্রোগ্রাম আসক্তির অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হলো-হৃদয় মাঝে অতিমাত্রায় অমানবিকতার উপস্থিতি, অসামজিকতা, মানসিক বৈকল্য, বেকারত্ব, কু-সামাজিকীকরণ, এটাকে ফ্যাশন হিসেবে নেওয়া, সুষ্ঠু বিনোদনের অভাব, শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, সামাজিকীকরণের মাধ্যমসমূহ প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া, সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব, মাঠ-পার্কের অভাব হেতু খেলাধুলার প্রতি অনীহা, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের প্রয়োজনীয় তদারকির অভাব, যৌথ পরিবারের বিলুপ্তি, জীবনে প্রকৃত ধর্ম চর্চার অভাব ও উক্ত শিক্ষা বাস্তবায়নের অভাব, নিঃসঙ্গতা, বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন, আদব শিক্ষার অভাব, মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিচারহীনতা ইত্যাদি। মোট কথা সুষ্ঠু সামাজিক বিকাশের জন্য আদর্শমান কৃষ্টি-কালচারের অনুপস্থিতি (সর্বপর্যায়ে)। ফলতঃ বিজাতীয় কৃষ্টি-কালচার, পর্নগ্রাফি, ডিজিটাল প্রযুক্তির নানান রকমের খারাপ প্রোগ্রাম মানুষের মনোজগতকে গ্রাস করার প্রয়াস পাচ্ছে। সঙ্গগত কারণেই  এগুলোর প্রচার ও প্রসারে সেন্সর করা উচিত। মানুষ বড় বিচিত্র জীব। আরো বিচিত্র তাঁর চিন্তা জগৎ ও মানুষের আচরণ। আমাদেরকে বুঝতে হবে, কম্পিউটার-ফেসবুক-ইন্টারনেট চালাতে পারলেই মানুষ মহাপুরুষ হয়ে যায় না। অন্যদিকে মানুষের আত্মার চাহিদা ও সমাজ বাস্তবতা আমরা একদম ভুলে গেছি। একথাও মনে রাখতে হবে, উন্নতির চরম শিখরে পৌছালেও সেখানে মূল্যবোধ, মানবিকতা না থাকলে তা (সে সভ্যতা) অস্তিত্বহীন হয়ে পরবে অভিবাবকদের সম্পদের পিছনে না ছুটে সন্তানকে সময় দিতে হবে। কারণ, অতি প্রিয়জনের মমতার স্পর্শ অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বেচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়। আমাদের পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের সঙ্গী ও সুযোগের অভাব রয়েছে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে বাবা-মাদের। বাবা-মায়েদের বুঝতে হবে ভিনদেশী কালচার-ভাষা শেখার জন্য নিজস্ব সংস্কৃতিকে-ভাষাকে ভুলিয়ে দেবার দরকার নেই। এটা বাচ্চাদের নয়, বাবা-মা আর কিছু শিক্ষকদের দোষ। প্রয়োজনে ভিনদেশী আকাশ-সংস্কৃতির (খারাপ) অবাধ প্রবাহ এখনই বন্ধ করতে হবে। তবে তাদের ভালো গুণ (প্রোগ্রাম) গ্রহণ করা যেতে পারে। অন্যদিকে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুকের অপব্যবহারও রোধ করতে হবে-যা অপরাধ প্রবণতার জন্য অনেকাংশেই দায়ী। মোট কথা আমরা আধুনিক হচ্ছি, উন্নত হচ্ছি ঠিকই-কিন্তু একই সঙ্গে পুরানো ঐতিহ্য , ভালোবাসা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধগুলো হারিয়ে ফেলছি। একই সঙ্গে উন্নয়ন, আধুনিকতা, পুরানো ঐতিহ্য হাত ধরাধরি করে থাকবে, যেখানে সবাই থাকবে সুরক্ষিত-তবেই সমাজ হবে শান্তিময়। আমাদের মাথাকে (মস্তিষ্কে) সৎ ভাবনায় পরিপূর্ণ করলে মানুষ চিন্তা চেতনায় সৎ, যোগ্য ও নির্ভীক হবে-লোপ পাবে বিকৃত রুচি, বিকলাঙ্গবাধীদের সংখ্যা যারা কিনা সহিংস হয়। মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হতে হলে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। শিশুদেরসহ  সবাইকে নৈতিকতায় শিক্ষা দিতে হবে সবার আগে। প্রথম বা আদি প্রতিষ্ঠান পরিবার থেকেই তাদেরকে আদব শিক্ষা দিতে হবে। বর্তমানে এসবের বালাই নেই প্রায় পরিবারে। শিশুদের জন্য অবারিত সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে করে তারা ভিনদেশি কালচারের দিকে অতিমাত্রায় ধাবিত না হয়। আমাদের দেশে পাশ্চাতের আগডুম-বাগডুম (অহেতুক অনেক সিলেবাস) শেখানো হয়, শেখানো হয় না নৈতিকতা-মানবিকতা, আদব কায়দা-যা বড়ই পরিতাপের বিষয় দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের ‘গোড়াতেই গলদ’। শিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষায় অমূল পরিবর্তন এনে, চরিত্র গঠনোপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে সর্বত্র। তাহলেই সৎ মানুষ গড়ে উঠবে সমাজে।যারা হবে অসহিষ্ণু-সংস্কৃতিমনা-দেশপ্রেমিক। যারা কিনা লিপ্ত থাকবে না কোনরূপ সহিংসতায়। সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে বুদ্ধি আর বিবেচনায় ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে সবাইকে।এ কথা ঠিক যে, আমাদের বিনোদন মাধ্যমগুলো আগেকার দিনের মত আর ভালো মানের হৃদয়গ্রাহী প্রোগ্রামসমূহ উপহার দিতে পারছে না (তবে সবাই না)। আমরা খুব সংস্কৃতিমনা, ইতিহাস সচেতন সমাজমনষ্ক-দর্শনপ্রীত, রাজনৈতিক সচেতন জাতি নই; খুব মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল, সামাজিক কৃষ্টি-ঐতিহ্য অবহেলায় নষ্ট করে ফেলি। এর সুযোগে আমাদের সামাজিক শত্রুরা প্রকরান্তরে দেশের শত্রুরা তো আর বসে নেই! আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে, বিভিন্ন মাধ্যমে তারা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঠিকই চালাচ্ছে। সংস্কৃতিক প্রবাহ তো আর বাধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। শুধু নীতিমালা আর ক্ষমতার জোরে বিশ্বায়নের অবাদ সাংস্কৃতিক আটকে রাখা কঠিন। একমাত্র দেশপ্রেম ও মানসম্পন্ন-যুগোপযোগী প্রোগ্রাম দিয়েই তা মোকাবেলা করতে হবে। সাংস্কৃতিক প্রবাহকে ইতিবাচক ধারায় সঞ্চারিত করে দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। দেশের প্রকৃত সংস্কৃতি ধারণ করার জন্য সভ্যতা-ইতিহাস-দর্শন-সমাজবিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়বলীর চর্চা বাড়াতে হবে। জীবন জাগানোর আনন্দের অন্বেষণে অন্যকে সাহায্য করতে হবে। মানুষের সুকুমার হৃদয় বৃত্তিকে জাগিয়ে, সুষ্ঠু বিনোদন-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জারকরসে মানুষকে তৃপ্ত করে, ভরিয়ে দিয়ে মানুষের পরিশুদ্ধ চিন্তা ও ভাবনা প্রকাশে সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের হৃদয় বৃত্তিতে বড় ও মহৎ হতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে বর্তমানে জীবন এক ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাড়িয়ে আছে। কী এক বেদনাদায়ক অগ্নি পরীক্ষার মুখোমুখি অথবা সমগ্র মানবজাতি এমনকি দেশবাসী! যার ফলফল চারিদিকে শুধু যদ্ধ আর যুদ্ধ। একমাত্র সেবা, ত্যাগে, সহিষ্ণুতার মাধ্যমে মানবধর্মের প্রতি সু-বিচার করে এই অবস্থা হতে উত্তরণ পাওয়া যেতে পারে। মানুষকে সু-বিবেচনা প্রসূত বোধোদয়ের পরিচয় দিতে হবে, স্বার্থপর, সহিংস হলে হবে না। আরো প্রয়োজন নিঃঅহংবাদী নীতির প্রচার ও প্রসার। একটি সুন্দর মনই পারে সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করতে। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারে আজকাল পরকীয়া, পড়ালেখায় অমনোযোগীতা, অসহিষ্ণুতাসহ , অসমপ্রেমের জোয়ারে ভেসেছে সমাজ। যা সকল প্রকার সহিংসতার অন্যতম কারণ। সর্বত্র এখন চলছে পরকীয়া প্রেম  সহিংসতা, তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক ডিজিটাল দুর্নীতিই মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে। আর সমাজে এ ধারার অপ্রতিরোধ্য উত্থানের ফলে-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে সর্বত্র বাজছে ভাঙ্গনের সুর। যা প্রকারান্তরে সহিংসতা, ভংগুর পরিবারে রূপ নিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সমাজে কদর বাড়ছে পাপারাজিদের, বিকলাঙ্গবাদীদের। শিথিল হচ্ছে সামাজিক বন্ধন। মানুষের মাঝে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে সভ্যতাই আজ হুমকির মুখে পড়েছে। তবে এর প্রধান শিকার হচ্ছে প্রায় পুরো মানব সমাজ। দিন দিন যেন সবাই আরও নতুন উদ্যোমে ধরা দিচ্ছে-পরকীয়া, সাইবার অপরাধের মায়াজালে। এখন শহুরে-গ্রাম্য বধূর পরকীয়া প্রেম, বিয়ে ও সাইবার অপরাধের ঘটনায় আইনি লড়াই হচ্ছে সর্বত্র। এক জনের  বধূ বা স্বামী র্দীর্ঘদিন ঘর সংসার করার পর স্বামী বা স্ত্রীকে ছেড়ে প্রেমিক বা অবৈধ প্রেয়সীকে বিয়ের ঘটনায় বাংলার প্রায় এলাকাতেই আজ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়ে অরাজকতায় রূপ নিচ্ছে। এই চাঞ্চল্য, অরাজকতা আজ দেখা দিয়েছে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে। এ ধারায় আর ভাটা পড়বে বলে মনে হয় না। সবদিক বিবেচনা করে বলা যায় যে, সমাজ পরিবার এখন তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক অপরাধ , পরকীয়া, অসম প্রেমের দিকে ঝুঁকছে বেশ জোরে শোরেই। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদেরকে সচেতন হয়ে সঙ্গী বা সঙ্গীনি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দৃষ্টির প্রসারতা বাড়াতে হবে। যাতে করে সঠিক লোক নির্বাচনে কোন ভুল না হয়। আর এ সবের সঠিক ব্যবহারের উপর নজর দিতে হবে, সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে হবে। লেখাপড়া করার কোনো বিকল্প নেই। অথচ লেখা ড়ার সোনালি সময় হেলায় পার করে দিচ্ছে সন্তানরা। টিভি নয়, কম্পিউটার নয়, ইন্টারনেট নয়, ফেসবুক নয়, মোবাইল নয়, ব্যস্ততার ভ্যানিটি নয়; বরং আপনার সন্তানটিকে পড়ার অভ্যাস গড়তে সাহায্য করুন। রাজনীতিবীদসহ বিনিয়োগকারীদের প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি-দেশ গড়তে হলে আগে ভালো মানের স্কুল গড়ে তুলুন (ভাল মানুষ গড়ার উদ্দেশ্যে)। আমি বলি, যে দুঃখ-দৈন্যের বাংলাদেশে আজ আমরা বাস করছি, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা (নৈতিকতা সম্পন্ন), সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চা, সামাজিক ন্যায় বিচার আমাদের সেই দুঃখ-দুর্দশার অবসান ঘটাতে পারে। কারণ অজ্ঞতা থাকা আর অন্ধকারেরর মাঝে থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অতএব, এখনই সময়-জেগে উঠার- “ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে”। লেখক:  মানবাধিকার কর্মী ও একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান টিকে

বিএনপির সভায় শোকপ্রস্তাব : একটি পর্যবেক্ষণ

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে। ওই সভায় যুদ্ধাপরাধের দায়ের মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত দলটির সাবেক নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য শোক প্রস্তাব আনা হয়। যা দেশের রাজনৈতিক মহলসহ নানা অঙ্গনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের একজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীকে নিয়ে দলটির নেতাদের মায়াকান্নায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিএনপির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি একদিকে দাবি করে তাদের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অন্যদিকে দলটি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে আছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের সাঁজার বিরোধিতা এবং যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত ইসলামকে জোট সঙ্গী করে একই পথে  হাঁটছে দলটি। বিএনপির এই দ্বৈতনীতিতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দলটি যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। বিএনপি-জামায়াত জোট শুধু রাজনৈতিক জোট নয়, পাকিস্তানি অ্যাজেন্টের জোট।      বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হওয়ায় তারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধাবান্ধব দল হিসেবে দাবি করে আসছে। তবে দলটি শুরু থেকেই  স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত ঘেষা রাজনীতি করে আসছে। তাদেরকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয় ও পূণর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। এখনও জোটসঙ্গী করে একই মেরুতে সন্তুষ্টচিত্তে পথ চলছে। শুধু তাই নয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত বেশ কয়েকজন মানবতাবিরোধী অপরাধীর সাজার বিরোধিতা করেছে। সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অধিবেশনেই শোক প্রস্তাব পাঠ করেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন। শোক প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর সব নেতা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। ফাঁসি কার্যকর হওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছাড়াও সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম এ মাজেদ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন, ইস্পাহানি গ্রুপের চেয়ারম্যান মির্জা আলী বেহরুজ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব হোসেন, সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতা আলতাফ মাহমুদ এবং চিকিৎসক ডা. রশিদ উদ্দিন, নায়ক রাজ্জাক, লেখক শওকত আলী, সংগীতজ্ঞ সুধীন দাশ, কবি রফিক আজাদ, কন্ঠ শিল্পী আবদুল জাব্বার, বারী সিদ্দিকী, শাম্মী আখতার, লাকি আখান্দ, অভিনেতা নাজমুল হুদা বাচ্চু, নৃত্যশিল্পী রাহিজা খানম ঝুনু ও কথা সাহিত্যিক জুবাইদা গুলশানারা, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আর এ গনি, এম কে আনোয়ার, আসম হান্নান শাহ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হারুনুর রশীদ খান মুন্নু, ফজলুর রহমান পটল, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী, নুরুল হুদা, খুলনার সাবেক মেয়র শেখ তৈয়বুর রহমানসহ দলের চার শতাধিক নেতাকর্মী ছাড়াও বাসদ নেতা আ ফ ম মাহবুবুল আলম ও জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানের নামেও শোক প্রস্তাব আনা হয়। এদের মধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জাগপা নেতা শফিউল আলম প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে `সেভেন মার্ডার` এর মতো কুখ্যাত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিতর্কিত ছিলেন। এই শোক প্রস্তাব ও যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারদের নিয়ে বিএনপির পূর্বাপর অবস্থান (চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের রাজনীতিতে সুযোগ করে দেওয়া, মন্ত্রিসভায় ঠাই দেওয়া, জোট করে একসঙ্গে পথ চলা) এটাই প্রমাণ করে যে, দলটি স্বাধীনতাবিরোধীদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিএনপি, জামায়াত এবং পাকিস্থান মূলতএকই বৃন্তের ৩টি ফুল। আদর্শগত ভাবে এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মৌলিক ভাবে এরা একে অপরের পরিপূরক। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, যুদ্ধাপরাধীরদের বিষয়ে সর্ব প্রথম শোক প্রকাশ করে জামায়াত। এরপর পাকিস্তান তার পার্লামেন্টে শোক প্রস্তাব আনে। সর্বশেষে, বিএনপি তাদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সভায় একজন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে শোক প্রস্তাব এনেছে। তাদের এই মায়া কান্না প্রমাণ করে তারা কোনো রাজনৈতিক দল নয় বরং তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল এদেশে পাকিস্তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। মূলত রাজাকার ও মানবতাবিরোধীদের পক্ষে সদা বিএনপির অবস্থানের কারণে তাদের কোনো নৈতিক অধিকার নেই স্বাধীন দেশে রাজনীতি করার। তাদের এরূপ কর্মকাণ্ড শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবমাননা নয় বরং ৩০ লাখ শহীদ ও ৫ লাখ নির্যাতিতা মা-বোনের দীর্ঘশ্বাসের প্রতি চরম অপমান। তাই সময় এসেছে বিএনপি-জামাত জোটকে রাজনৈতিক জোট না বলে পাকিস্থানি এজেন্টদের জোট নামে সম্বোধন করার । / এআর /

মৃত্যুবার্ষিকীতে এম আর সিদ্দীকীকে শ্রদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বঙ্গবন্ধু সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রদূত, স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্প-বাণিজ্যকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা লায়ন মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকীর (এম আর সিদ্দিকী) ২৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯২ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম এম আর সিদ্দিকী। তিনি ১৯২৫ সালের ১ মার্চ সীতাকুণ্ড উপজেলার দক্ষিণ-রহমতনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী। ১৯৪৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫১ সালে তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে চাটার্ড-একাউন্টেন্সিতে (সিএ) পড়তে যুক্তরাজ্যে যান এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তার মেধা ও বিচক্ষণতা কাজে লাগাতে বঙ্গবন্ধু তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুরি নির্দেশে এম আর সিদ্দিকী ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এম আর সিদ্দিকী নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি সীতাকুণ্ড এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আগরতলায় নির্বাসিত থেকে মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম শুরু করেন। এসময় বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকাসহ চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা নিয়ে গঠিত ইস্টার্নজোন লিবারেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে তিনি পুনরায় জাতীয় সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। এম আর সিদ্দিকী ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এম আর সিদ্দিকী ষাটের দশকের শুরুতে একজন শিল্পোদ্যাক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এস কে এম জুট মিলস, থেরাফিউটিক্স বাংলাদেশ লিমিটেড, সিডকো লিমিটেড ও ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড তাঁর হাতেগড়া অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বেশকটি ব্যাংকও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজসেবায় তিনি চট্টগ্রামে লায়নিজমের জনক হিসেবে খ্যাত। এম আর সিদ্দিকীর পৃষ্ঠপোষকতায় সীতাকুণ্ডসহ এই অঞ্চলে অসংখ্য স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর সহযোগিতায় ছোটকুমিরায় লতিফা সিদ্দিকী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রসঙ্গত অন্যতম শিল্পপতি ও এ কে খান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এ কে খান এম আর সিদ্দিকীর শ্বশুর। **লেখক- সভাপতি, সীতাকুণ্ড সমিতি- চট্টগ্রাম / এআর /

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি