ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ৪:৫৫:১৬

বেশি কথা মোবাইলে কান যাবে অকালে

বেশি কথা মোবাইলে কান যাবে অকালে

সুইজারল্যান্ডের জুরিখের একটি স্কুল। বছর চারেক আগে সে স্কুলের শিক্ষার্থীরা হঠাৎ কেমন অ স্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করল। শিক্ষকরাও যেনও কিছুটা বদমেজাজি ও খিটখিটে হয়ে উঠলেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না।পরবর্তীতে জানা গেল স্কুল সংলগ্ন মোবাইল ফোনের অতিকায় টাওয়ার থেকে নির্গত রেডিয়েশনই এই কারণ, যা মানব মস্তিস্কের সহ্য শক্তির অতীত। মোবাইল কোম্পানির নামে মামলা হল। বিলিয়ন ডলার ক্ষতি পূরণ দিয়ে টাওয়ার সরিয়ে নিতে বাধ্য হল তারা। আমাদের দেশেও এখন বাছ বিচারহীন ভাবে মোবাইল টাওয়ার বসানো হচ্ছে।জনসংখ্যা-অনুপাতে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোবাইল ব্যবহারকারির দেশ। গাড়ি চালাতে চালাতে বা রেল লাইনের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফোনে কথা বলছে, এমন দৃশ্য আজকাল অহরহ দেখা যায়। সাথে মরণঘাতী সেলফির হুজুগ তো আছেই। প্রশ্ন হল, মোবাইল ফোন ব্যাবহার কি বিপদজনক? আমি বলবো, এটা আসলে বিপদজনকের বেশি কিছু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী একটি মোবাইল ফোন মাইক্রোওয়েভ ওভেনের সমপরিমান রেডিয়েশন ছড়িয়ে থাকে। ১৫মিনিট একটানা মোবাইলে কথা বললে মস্তিস্ক রক্ত সঞ্চালন বাড়তে থাকে। ফলে কান সংলগ্ন ত্বক আগুনের মতো লাল হয়ে যায়। কান গরম হয়ে যায়, শুরু হয় মাথা বেথা। এখানেই শেষ নয়। এর সঙ্গে আছে এন্টেনার রেডিয়েশন, যা মস্তিস্কোর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে ১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইট অবধি। আমরা জানি ১০১ ডিগ্রিতেই শিশুদের খিঁচুনি হয়। তাহলে মস্লিস্কের তাপমাত্রা যখন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের প্রভাবে মারাত্নক ক্ষতির শিকার হন ১৬ বছরের কম বয়সী শিশু ও অন্তঃস্বত্তা নারীরা। বাচ্চা খেতে না চাইলে অনেক মা মোবাইলে কিছু একটা চালু করে দেন। বাচ্চা ওটা একঘন্টা ধরে দেখতে থাকে আর মা খাইয়ে দেন।কিন্তু তিনি খেয়াল করেন না যে,সন্তান এই একঘন্টা ধরে রেডিয়েশনও হজম করছে।অর্থাৎ পুষ্টি যতটুকু নিচ্ছে তার চেয়ে অপুষ্টি নিচ্ছে বরং বেশি।দীর্ঘ গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্জানীরা বলছেন, বয়স ১৬ হওয়ার আগে কোনো অবস্থাতেই মোবাইল ব্যবহার করা উচিত না।সাম্প্রতিক সময়ে অটিজম - আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বিশ্বজুড়েই বেড়ে যাচ্ছে আশংকাজনকভাবে। ১৯৮০ সালে যা ছিলো প্রতি ৫০০ জনে একজন,এখন সেটা ৬৮ জনে একজন। অটিজমে আক্রান্ত শিসু সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ কোরিয়ায়। এর অন্যতম কারণ হিসেবে সে দেশের বিজ্জানীরা দায়ী করছেন বেশি বয়সে সন্তানধারণ ঘনঘন আলট্রাসনোগ্রাফি ও মোবাইল ফোনের রেডিয়েশনকে।মোবাইল ফোনে বহু সময় ধরে কথা বললে আপনি অবসন্ন হয়ে পড়বেন।মাথাব্যথা করবে।অনেকক্ষণ কথা বরে ঘুমাতে গেলেন, ঘুম আসবে না। আর বিরামহীন ভাবে যারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের স্মৃতিশক্তিতে ধস নামে এবং কাঁধ,কনুই ও কব্জির জয়েন্ট ক্রমশ অকেজো হয়ে যায়। মস্তিষ্ক কে সুরক্ষা দেয়ার জন্যে এর চারপাশে ব্রাড ব্রেন ব্যারিয়ার নামে একটি আবরণ আছে।অল্প কিছু ছাড়া অধিকাংশ ওষধই এই দেয়াল অতিক্রম করতে পারে না।এই দেয়ালের জন্যেই অনেক ওয়েভ ব্রেনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে না।কিন্তু অনেক সময় ধরে মোবাইল ফোনে কথা বলার ফলে মস্তিষ্কেরতাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং েরর রক্তনালী গুলো সম্প্রসারিত হয়ে ওঠে।রক্তনালীর দেয়ালগুলো তখন উন্মুক্ত হয়ে যায়।আর মোবাইলের মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন সরাসরি এন্ডোথেলিয়াল সেলের প্রোটিন কাঠামোকে বদলে দেয়,সে সুযোগে টক্সিন মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবেশ করে।আরেকটি সাধারণ প্রশ্ন হলো,মোবাইলের রেডিয়েশন কি ব্রেন টিউমার সৃষ্টি করতে পারে?টক্সিনের প্রভাবে নার্ভ সেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ডিএনএ-র কর্মকাঠামো বদলে যায়।কোনো ডিএনএ যদি একবার অস্বাভাবিক হয়ে যায় তাহলে সে সবসময় অস্বাভাবিক ডিএনএই রেপ্লিকেট করবে।ফলে ব্রেন টিউমার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।ব্রেন ক্যান্সার সংক্রান্ত বিস্তর গবেষণার আলোকে বিজ্জানীরা দেখিয়েছেন,একজন মানুষ যদি এক থেকে পাঁচ বছর অতিমাত্রায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন,তাহলে তার ব্রেন টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ১২৫ শতাংশ।পাঁচ থেকে ১০ বছর করলে সম্ভাবনা বাড়বে ২৫০ শতাংশ। আর যারা ১৫ বছর ধরে ব্যবহার করছেন তাদের সম্ভাবনা বাড়ে ২৭৫ শতাংশ পর্যন্ত।একজন ইএনটি সার্জন হিসেবে আমার অভিজ্জতা হলো,গত কয়েক বছরে কানের পার্শ্ববর্তী ক্যারোটিড ও স্যালাইভা গ্ল্যান্ডের টিউমার বাংলাদেশে বহুগুণ বেড়ে গেছে।এর পেছনেও আছে মোবাইল ফোনের ভূমিকা। তাই আমি বরি,বেশি কথা মোবাইলে, কান যাবে অকালে।এখন করণীয় কী? প্রথমত,মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময়সীমা কমিয়ে দিতে হবে।মোবাইলে কারো সাথে আলাপের আদর্শ সময় হলো ২০ সেকেন্ড।কিন্তু তিন মিনিট কথা বলে ফেলেন তাহলে পরবর্তী ১৫ মিনিটের মধ্যে তার আর ফোন ব্যবহার করা একেবারেই উচিত হবে না। দ্বিতীয়, হেডসেট বা স্পিকার ব্যবহার করুন।অ্যানালগ বা ল্যান্ডফোন যদি হাতের নাগালে থাকে তাহলে সেলফোন ব্যবহার করবেন না।পারতপক্ষে মোবাইল ফোন শিশুদের নাগালের বাহিরে রাখুন।আবার অনেকে আছেন যারা ঘুমানোর সময় ফোনটি বিছানায় এমনকি মাথার ঠিক কাছেই রাখেন,এটা কখনোই করা যাবে না।তৃতীয়, যেখানে সেখানে মোবাইল ফোনের এন্টেনা বসানো যাবে না।আসলে যেকোন ব্যাপারে ব্যক্তিগত সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি।এটা মেনে নিতেই হবে যে,মোবাইল ও কম্পিউটার আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।অনেক কাজজ আগের চেয়ে বেশ সহজ হয়ে গেছে।আবার এদের আছে অদৃশ্য বিপদ।এই স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলোর ব্যাপারে পূর্বসতর্কতা নিলে আমরা নিরাপদে থাকতে পারবো। **অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও প্রখ্যাত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ। গত ১মে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মাসিক মুক্ত আলোচনায় এই বক্তব্য দেন।
এ বি এম আবুল কাসেম একজন ত্যাগী ও পরিশ্রমী জননেতা

আজ (২৪ নভেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ) সীতাকুণ্ডের দু’বারের সাবেক এমপি ও প্যানেল-স্পীকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি ও সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সভাপতি এ বি এম আবুল কাসেম মাস্টার এর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিক। ২০১৫ সালের এদিনেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রয়াত এ নেতার মৃত্যুদিবসে এ বি এম আবুল কাসেম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে স্মরণসভাসহ নানান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ত্যাগী এ নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক-জীবনাবলম্বনে আমার-ই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘কাসেম মাস্টার’ শিরোনাম শীর্ষক এ বি এম আবুল কাসেম স্মারকগ্রন্থ। কাসেম মাস্টার ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি সীতাকুণ্ড উপজেলার দক্ষিণ-সলিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল জলিল, মা আমেনা খাতুন। তিনি পড়াশোনা করেন কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম সরকারি সরকারি সিটি কলেজে। কাট্টলী হাই স্কুলে তিনি শিক্ষকতাও করেন। এ কারণেই তিনি কাসেম মাস্টার হিসেবে পরিচিত। তাই তাঁর জীবনাবলম্বনে রচিত স্মারকগ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে ‘কাসেম মাস্টার’। কাসেম মাস্টার সত্যিকার অর্থে তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠা একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি এমপি নির্বাচিত হননি। শেখড় থেকে তিনি শিখরে ওঠেছিলেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত টানা ১৫বছর তিনি সলিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। দু’বার তিনি চট্টগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সীতাকুণ্ড সংসদীয় এলাকা থেকে দু’বার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে প্রথম এমপি নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পীকারের দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ-সদস্য থাকাকালীন তিনি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৯৭ সালে তিনি সংসদীয় দলের সদস্য হিসেবে চীন সফর করেন। দ্বিতীয়বার এমপি হওয়ার পর কাসেম মাস্টার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে তিনি বাংলাদেশ-কোরিয়া পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। কাসেম মাস্টার আওয়ামী লীগের একজন পোঁড়খাওয়া ত্যাগী নেতা ছিলেন। টানা একযুগের বেশিসময় তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগেরও তিনি আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন। দীর্ঘসময়ে তিনি সীতাকুণ্ড আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা ছিলেন। বলা যায়, এমপি থাকাকালীন সীতাকুণ্ডের আওয়ামী-রাজনীতি ছিল তাঁরই একক নিয়ন্ত্রণে। দলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়। তাঁর স্মরণ শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে তাঁর সরাসরি সম্পর্ক ছিল। তাদের নামধাম ছিল তাঁর নখদর্পণে। সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত বিয়েশাদি থেকে শুরু করে সামাজিক যেকোনো ছোটখাটো অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি সকলের নজর কাড়তো। কাসেম মাস্টার একজন সমাজ হিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। লতিফপুর আলহাজ্জ আবদুল জলিল উচ্চবিদ্যালয়, দক্ষিণ সলিমপুর আমেনা বিদ্যানিকেতন, সলিমপুর আবাসিক এলাকা বিদ্যাপীঠ, বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ধর্মপুর আবুল কাসেম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি সীতাকুল্ড ডিগ্রি কলেজ, সীতাকুণ্ড বালিকা বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়, বিজয় স্মরণী কলেজ, মোস্তফা হাকিম কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন। অন্যদিকে তিনি রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য, চট্টগ্রাম কেন্দ্রিীয় কারাগারের পরিদর্শক ছাড়াও এলাকার বহু সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। সীতাকুণ্ড এলাকার সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এ জনপ্রিয় রাজনীতিক ব্যক্তিত্বের একক প্রচেষ্ঠায় সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর করা হয়। সীতাকুণ্ডের উত্তর-বগাচতর থেকে ছোটকুমিরা পর্যন্ত গ্রামের ভেতর দিয়ে হাবিব আহমেদ চৌধুরী নামক যে সড়ক (হাবিবরোড) রয়েছে সেটিকে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতায় এনে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধন করেন। ১৯৯৬ সালে ২১বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এমপি আবুল কাসেম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সীতাকুণ্ডে এনে যুগান্তকারী নানান উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। হাবিব রোড ছাড়াও উত্তর বগাচতর এলাকায় বিদ্যুতায়ন, সীতাকুণ্ডসদরে টিএন্ডটির পিসিও (পাবলিক কল অফিস) ভবনে ৫০০লাইনের ডিজিটাল টেলিফোন একচেঞ্জ স্থাপন, যানজট নিরসনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড বাজার (উপজেলা সদর) ও কুমিরা বাজার এলাকায় বাইপাস-রোড নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক স্থাপন, সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথধামকে মহাতীর্থ করার প্রচেষ্টা চালানো, সীতাকুণ্ডে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করাসহ গ্রামীণ অবকাঠামো ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে নজিরবিহীন অবদান রাখেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৫ পুত্র ও ১কন্যা সন্তান রেখে যান। বর্তমানে তাঁর বড়ছেলে এস এম আল মামুন সীতাকুণ্ড উপজেলার চেয়ারম্যান।   লেখক : প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী

দার্শনিকের দর্শন ও অদার্শনিকের দর্শন: একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

বিস্ময়, সংশয় ও কৌতূহল থেকেই দর্শনের যাত্রা শুরু বলা যায়। মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতেই বিভিন্ন মৌলিক সমস্যা নিয়ে তারা কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। আর এভাবেই বিভিন্ন মত ও পাল্টা মতের উদ্ভব হয়েছে। যেগুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন পদ্ধতি হিসেবে অভিহিত হয় এবং সমৃদ্ধ করেছে দর্শনের ইতিহাসকে। দর্শনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হচ্ছে জ্ঞানবিদ্যা। যেখানে জ্ঞান সম্পর্কীয় বিভিন্ন বিষয় যেমন- জ্ঞানের পদ্ধতি, জ্ঞানের উৎপত্তি, জ্ঞানের সরূপ ও বিষয়বস্তু, জ্ঞানের ক্যাটাগরি, সত্য-মিথ্যা নিরূপণের প্রশ্ন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়ে থাকে। দর্শনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিগত আলোচনার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে, কেননা দর্শন মৌলিক সমস্যাবলীর বিচারমূলক অনুসন্ধানে নিয়োজিত থাকে। আর এ কারণে বিভিন্ন ধারণার বিচার-বিশ্লেষণ এবং মৌলিক সমস্যাবলির সমাধানকল্পে বিভিন্ন পদ্ধতি এসেছে। যেসব পদ্ধতি হয় তার পরবর্তী দার্শনিকরে মধ্যে আরো বিকাশ লাভ করেছে কিংবা সমালোচিত হয়ে নতুন পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে। এই পদ্ধতিগত আলোচনার যাত্রা শুরু হয়েছিল (মনে করা হয়) খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে অর্থাৎ থেলিসের (৬৫০-৫৪৬) সময় থেকে। থেলিসই প্রথম এ জগতের মৌলিক উপাদান অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রথম প্রশ্ন করেছিলেন- এ জগতের মৌলিক উপাদান কি বা এ জগতের উৎপত্তি কোথা থেকে? তখন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দর্শনের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বেশ জটিল ও বিতর্কমূলক বিষয় নিয়ে আলোচিত হয়েছে। আর এ যাত্রাপথ সাধারণ মানুষের অনন্ত কৌতূহলের সমাধান দিতে চেষ্টা করেছে বারবার। যে বিষয়টির গুরুত্ব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরে ২০০২ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব দর্শন দিবসের ঘোষণা দেয়। যা পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ইউনেস্কোর এক সাধারণ সভায় প্রতি বছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহষ্পতিবার বিশ্ব দর্শন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর সেই প্রতীক্ষিত বিশ্ব দর্শন দিবস। যেহেতু দর্শন মানুষের জন্য ও জীবনের জন্য তাই সকলের দর্শন চর্চার অধিকার রয়েছে। আর পাশাপাশি এ কথাও সত্য যে, দার্শনিক  হওয়ার জন্য দর্শনের ছাত্র হওয়া আবশ্যক নয়। দর্শন চর্চা করেও একজন অদার্শনিক থেকে যেতে পারেন, আবার দর্শন বিষয়ে অধ্যয়ন না করেও একজন দার্শনিক মনন ধারণ করতে পারেন। দর্শন বিষয়ে যে ভুল তত্ত্ব প্রচার হয় সে দায় আসলে কিছু অ-দার্শনিক সম্প্রদায়ের (তারা দর্শন বিষয়ে অধ্যয়ন করাও হতেও পারেন আবার নাও পারেন)। দর্শনকে যারা অন্ধকার ঘরে অস্তিত্বহীন কালো বিড়ালের সাথে তুলনা করেন তারা আসলে দর্শন বিষয়ে জানেন না। কিছু উাহরণের সাহায্যে এমন উদ্ভট প্রচারের বিরোধিতা করা যাক- ‘দর্শনের বিষয়বস্তুকে যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে মূল্যবিদ্যা একটি। এই মূল্যবিদ্যারই একটি শাখামাত্র তর্কশাস্ত্র বা ন্যায়শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ্যা। কিছু অ-দার্শনিক আছেন যারা নিজেদের অতি পণ্ডিত ভেবে দর্শনের ছাত্ররে কটাঙ্ক করেন বিভিন্ন অবৈধ যুক্তি দিয়ে। যেখানে তারা এটা উপলব্ধিই করতে পারেন না যে যুক্তির একটা কাঠামো আছে, একটা নিয়ম আছে। তারা বরং এমন সব যুক্তি দিয়েই ব্যাঙ্গ হাসি দিতে থাকেন যে- “গরু ঘাস খায়, মানুষ গরু খায়, অতএব মানুষ ঘাস খায়।”  তারা আসলে নিজেদের জানাকে সঠিক ভেবেই এমন সব উদ্ভট যুক্তি দিতে থাকেন। কিন্তু তাদের জানা উচিত যে, ন্যায় বা যুক্তির ক্ষেত্রে আকারগত সত্যতা ও বস্তুগত সত্যতা বলে কিছু ধারণা আছে। বীজগণিতের মত মধ্যপদের মাধ্যমে প্রধান পদ ও অপ্রধান পদের মধ্যে একটা আবশ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপার আছে। দর্শনের মর্যাদাকে হেয় করার প্রয়াসে অ-দার্শনিকের আরো এমন অভিযোগ আসে যে, ‘দর্শন কেবল সমস্যার কথা বলে, সমাধানের পথ বলে দেয়না’। এখানেও সার্বিকভাবে সাধারণীকরণ করা হয়েছে দর্শনকে। পৃথিবীর কোন বিদ্যা আছে যা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছেনা? আরো উন্নততর রূপ পাচ্ছেনা? আপেক্ষিকতাবা অনূসারে সব কিছুই পরিবর্তনশীল। তাই যেখান থেকে র্শনের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা যতই পরিবর্তিতই হোক না কেন, প্রতিটি নতুন তত্ত্বই করেছে এক একটি নতুন যুগের সূচনা, দিয়েছে নতুন জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করে। প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছে দর্শন আর বিজ্ঞান পেয়েছে নতুন গবেষণার উপাদান। প্রকৃত দার্শনিক প্রশ্ন করেন, অনুসন্ধান করেন, ব্যাখ্যা করেন, মূল্যায়ন করেন ও সবশেষে তত্ত্ব দেন এবং তা সকলের সমালোচনার জন্য উন্মোক্ত রাখেন। যে কারণে দর্শন হয়ে উঠে জ্ঞানের আঁধার, অজ্ঞানের এক আলোকবর্তিকা। তাই আজ দর্শন দিবসে এই আবেদন থাকবে বিশ্বব্যাপী-দর্শন জানুন, চিন্তা করুন, সঠিক পদ্ধতিতে সত্যের কাছে পৌঁছান এবং একজন দার্শনিকের মনন তৈরী করুন। দর্শন আপনাকে সমস্যা নয় কেবল, সমাধানের পথও বলে দিবে।   লেখক: ফরহাদ আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের সংস্কার জরুরি

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন `সংবিধান`। এটি একটি লিখিত দলিলও বটে। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল মাত্র ৯ মাসে জাতিকে একটি সুলিখিত ও যথোপযুক্ত সংবিধান উপহার দেয়া। অথচ ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারত দুই বছরে সংবিধান রচনা করলেও পাকিস্তানের ৯ বছর সময় লেগেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়। গণপরিষদের একমাত্র কাজ ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালের ১১ অক্টোবর এ কমিটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কাজ শেষ করে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে এ সংবিধান গৃহীত হয় এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে সংবিধান কার্যকর হয়। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সংবিধান রচিত হয়েছে। তবে বাংলাকে মূল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ সংবিধানে ১টি প্রস্তাবনা, ১১টি ভাগ, ১৫৩টি অনুচ্ছেদ ও ৪টি তফসিল ছিল। সংবিধানের প্রথমভাগে প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ, দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ, তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকারসমূহ, চতুর্থ ভাগে নির্বাহী বিভাগ, পঞ্চম ভাগে জাতীয় সংসদ, ষষ্ঠ ভাগে বিচার বিভাগ, সপ্তম ভাগে নির্বাচন, অষ্টম ভাগে মহাহিসাব নিরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রক, নবম ভাগে কর্মকমিশন, দশম ভাগে সংবিধান সংশোধন ও একাদশ ভাগে বিবিধ বিষয়াবলী স্থান পেয়েছে। গণপরিষদে সংবিধানের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহিদের রক্তে লিখিত। এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।” সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান মান্য করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। তবে কর্তব্যপালনের পূর্বশর্ত হলো সে-ই কর্তব্য সম্পর্কে জানা বা পরিস্কার ধারণা অর্জন করা। কিন্তু আমাদের সংবিধান রচিত হয়েছে সাধু ভাষায়– যার প্রচলন বর্তমানে নেই বললেই চলে। দেশের শিক্ষিত জনসমাজের পারস্পরিক ভাববিনিময় ও কথোপকথনের উপযুক্ত বাহন হচ্ছে চলতি ভাষা। সাধু ভাষা একটি অপরিবর্তনীয় ভাষা। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনশীল ভাষা হিসেবে বর্তমানে চলতি ভাষা বেশ সমাদৃত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে পত্র-পত্রিকাসহ সর্বত্র চলতি ভাষা অনুসরণ করা হয়। সাধু ভাষা যেহেতু বেশ প্রাচীন, সেহেতু আধুনিক ভাষা হিসেবে চলতি ভাষা-ই এখন সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর আগে সাধু ভাষায় রচিত বাংলাদেশের সংবিধান পড়ে পাঠকেরা সহজে এটি বোঝতে পারে না। ভাষাগত জটিলতার কারণে সংবিধান পাঠের ইচ্ছেপোষণ করলেও পাঠকেরা পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাদের সম্মানিত সংসদ সদস্যরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করেন কি না- করলেও এ নিয়ে কোনো আইনপ্রণেতাকে কোনো উচ্চবাচ্য করতে কখনো শুনিনি। তাই রাষ্ট্রের এ সর্বোচ্চ আইনটি সকলের জন্যে সহজ-সরল, সাবলীল, সুন্দর ও বোধগম্য ভাষায় সংস্করণ করা এখন সময়ের দাবী। আমাদের পূর্বসূরি রাজনীতিকেরা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, স্বাধীনতা অর্জনের এক বছরের মাথায় একটি শাসনতন্ত্র তথা সংবিধান উপহার দিয়ে গেছেন। অথচ বর্তমান রাজনীতিকেরা আমাদের সংবিধানকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিতে পারছেন না। বর্তমানে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। জাতীয় সংসদে এ ব্যাপারে একটি বিল উত্থাপন করে আমাদের সংবিধানকে চলতি ভাষায় রচনার সিদ্ধান্ত নেয়া অতীব জরুরি। লেখক : প্রধান-সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী   /ডিডি/

বিশ্ব দর্শন দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

বর্তমানে বিশ্বে বিভিন্ন দিবসের প্রচলন রয়েছে। তবে উচ্চতর পর্যায়ের পাঠ্য বিষয়ের নামে দিবসের প্রচলন করা বিষয়টা গভীর চিন্তার উদ্রেগ করে। কেন পাঠ্য বিষয়ের নামে দিবস ঘোষণা। শিক্ষা জগতের মধ্যে আমরা নানা বিষয়ের সন্ধান পেয়েছি এবং বর্তমানেও নিত্য নতুন বিষয় আমাদের সামনে আসছে যা আমাদের কারিকুলামে অন্তর্ভূক্ত হয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও জ্ঞানের জগতের পরিধি বৃদ্ধি করছে। তবে দর্শন বিষয়ের নামে কেন দিবস ঘোষণা এবং পালন করা হয়, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে হয়। কেন এই বিশ্ব দর্শন? এর উত্তরে ইউনেস্কো বলেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও অভিযাত্রা বর্তমান বিশ্বে অস্থিতিশীলতা, অশান্তি, সন্ত্রাস, অন্যায়, সহিংসতা, অনৈতিকতা, নিরাপত্তাহীনতা মোটেই কমাতে পারেনি। তাই এসব বিষয় থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে দর্শন বিষয়ের শিক্ষ ও অনুশীলন। কেননা দর্শনের জীবনবোধ নীতি নৈতিকতা, মানবিকতা, নান্দনিকতা, যুক্তিবোধ ও মননশীলতা বর্তমান বিশ্বের নানাবিধ সংকট ও সমস্যা থেকে মানবজাতিকে দিতে পারে কাক্ষিত লক্ষ্যের সন্ধান। আর এ লক্ষ্যেই জাতিসংঘের ইউনেস্কো ২০০২ সালের ২১ নভেম্বর প্রথমবার দর্শন দিবস ঘোষণা করে। ইউনেস্কোর তৎকালীন ডাইরেক্টর জেনারেল কইচিরো মাতুসুয়ারা বিশ্ববাসীর প্রতি এক বার্তা প্রেরণ করেন যাতে ফুটে উঠেছে দর্শন বিষয়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। তিনি মানবাধিকার, ন্যায়-নীতি,  গণতন্ত্রকে সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দারিদ্র্য, বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার, নারী অধিকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি সমকালীন বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা এবং এসব সমস্যা সমাধানে বিশ্লেষণের গভীরে প্রবেশ করে দার্শনিক বিশ্লেষণ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাই ইউনেস্কোর কাজ। এই দর্শন দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তরুণ সমাজ তথা বিশ্ববাসীর মাঝে যে প্রভাব ফেলে তা পর্যবেক্ষণ করে ২০০৫ সালের ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব দর্শন দিবসে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর থেকে ইউনেস্কোর আমন্ত্রণে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিবছর নভেম্বর মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব দর্শন দিবস। এবছর ১৭ নভেম্বর পালিত হয় দিবসটি। শিক্ষার বিষয় হিসেবে দর্শন খুবই একটি প্রাচীন বিষয়। যে দেশ যত ধনী এবং যত শিক্ষিত সেই দেশে বর্তমানে দর্শন বিষয়ের কদর বেশি। দর্শনকে এসব দেশ সব শিক্ষার মাতৃরূপে গ্রহণ করেছে। তাই আমরা দেখি যেসব দেশের দর্শন চর্চা যত বেশি সেসব দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবিকতা তত বেশি উন্নত। দার্শনিক কোঁতে ও পলসনের মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যায়, ‘দর্শন হলো সব বিজ্ঞানের বিজ্ঞান। ‘দর্শন হলো সমস্ত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমষ্টি’। (Philosophy is the science of all sciences. Philosophy is the sumtotal of all Scientitic Knowledge.) আর বর্তমান পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে বিষ্ময়কর উত্থান ও প্রসার এর যাত্রা শুরু হয়েছিল দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন ও রেঁনে দেকার্তের হাত ধরে। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কার আমাদের জীবনযাত্রা আমূল পাল্টে দিলেও সঠিকভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যদি আমরা কাজে না লাগাই, তাহলে তা মানব সভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিবে। বিশ্বে সাধিত হবে বিশ্ব ধ্বংসলীলা। এক্ষেত্রে দর্শনের হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে মানবজাতি রক্ষা পাবে বর্তমানের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অনিশ্চয়তা, আশান্তিময় পরিস্থিতি থেকে। দর্শন দিবস ঘোষণার কারণে দর্শনের প্রচার-প্রসার হচ্ছে বা হবে তা নয়। বিশ্ববাসী বর্তমান বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও অস্থির বিশ্ব থেকে মুক্তি পেতে দর্শনের কাছে সাহায্যে প্রর্থনা করছে। দর্শনের কাছে চাচ্ছে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার দিকনির্দেশনা। কেননা পৃথিবীতে দর্শন এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়, যেখানে নীতি নৈতিকতা, যুক্তি, নান্দনিকতা, মানবতা, চিন্তা-চেতনা তথা জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়। দর্শন মানুষের আত্মসত্তাকে জাগিয়ে তোলে, প্রশ্ন করতে শেখায় কে তুমি? পৃথিবীতে কি তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্য? বিশ্ববরেন্য দার্শনিক সক্রেটিসের মনে করেন- বিষ্ময়, কৌতুহল, সংশয়, জিজ্ঞাসা, প্রয়োজনবোধ এবং জ্ঞানপ্রীতি থেকে দর্শন চিন্তার উৎপত্তি। দর্শন চিন্তার মূলে কাজ করেছে মানুষের মহান মানবিক মূল্যবোধ। এই মানবিকতা মূল্যেবোধের মধ্য দিয়ে মানুষ পৃথিবীতে তার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে যুগ যুগ ধরে। আর দর্শনের তিনটি কাজ- অনুধ্যানমূলক, সমালোচনামূলক ও গঠনমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে সচেষ্ট। দর্শন বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারনার অভাবে বিষয়টির অবমূল্যায়ন এবং অপপ্রচারও হয়ে থাকে। বিশ্বদর্শন দিবসের প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব ও তাৎপর্য সাধারন ও শিক্ষিত মানুষের মধ্যে জীবনের সর্বস্তরে নৈতিকতা প্রয়োগ ও পরিব্যাপ্তির ধারনাকে প্রসার ঘটাবে বলে আমরা আশা রাখি। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মানবজাতির বিকাশের ধারায় যত সভ্যতার সংকট সামনে এসেছে তার মূলে রয়েছে মূলত নীতি নৈতিকতার সংকট। মানব জীবনে সব  ধরনের দুঃখ দুর্দশার মূলেও রয়েছে নৈতিক সংকট। সভ্যতার সঙ্কট, মানব সঙ্কট থেকে উত্তরনের পথ বিজ্ঞান প্রযুক্তি, পারমানবিক অস্ত্র, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা অফুরন্ত সম্পদ দিতে পারবে না। এই সঙ্কট থেকে উত্তরনের একমাত্র পথ নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষা ব্যতীত একদিকে যেমন বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও সাফল্য কোন ভাল ফল বয়ে আনবে না, অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীর অফুরন্ত সম্পদ মানুষের কোন কাজে আসবে না। তাই পৃথিবীর সর্বস্তরে সুখ, শান্তি ও কল্যানের জন্য মানবজাতিকে নৈতিক শিক্ষার মাতৃভূমি দর্শনের কাছে আসতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে পাশ্চাত্যের  প্রভাবশালী দার্শনিক এফ এইচ ব্রাডালির বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি  বলেছেন, মানুষ যেদিন তার শ্রেষ্ঠত্ব, বিবেক, মর্যাদা, স্বতন্ত্রতা হারিয়ে অমানবিক ও পশুর পর্যায়ে নিঃপতিত হবে সেদিনই সে কেবল দার্শনিক জ্ঞান ও সত্য অনুসন্ধানের মহৎ পথ থেকে নিজেদের পরিহার করতে পারবে। ব্রাডলির এই বক্তব্য মানব জাতির জন্য একটা বড় ম্যাসেজ। কেননা জ্ঞান ও সত্যের অন্বেষণ ছাড়া পৃথিবীর বুকে মানবজাতির টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই একথা নিশ্চিত করে বলা যায় উন্নত মানবিক জীবনের যৌক্তিক, নৈতিক ও নান্দনিক দিকের অনুসন্ধানের জন্য দর্শন শিক্ষা অপরিহার্য। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা থেকে প্রায় দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বিবেকবোধ, স্মৃতি, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। সমাজ ব্যবস্থা যেন অসচেতন ও অসংবেদনশীল হয়ে পড়ছে, হারিয়ে ফেলছে তার মূল্যবোধ ও নৈতিকতা। ব্যক্তি মানুষ দিন দিন দয়া, মায়া, মমতা, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বন্ধন, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলছে। সঠিক শিক্ষা তথা নৈতিকতা সম্পৃক্ত মানবিক আদর্শিক শিক্ষার অভাবে এমনটি হচ্ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এরূপ বাস্তবতা থেকে উত্তরনের পথ হবে দর্শনের শিক্ষাগ্রহণ অনুশীলন ও তার প্রয়োগ। দর্শনবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থনৈতিক দিক থেকে খাদ্য, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসায়, প্রযুক্তিক দিক থেকে প্রাচুর্য আসবে কিন্তু কখনো সুখ বা শান্তি আসবে না। তাই একটি দেশ বা সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক বিষয় দর্শনের বিষয়ের অন্তর্ভূক্তি, অনুশীল ও প্রয়োগ আজ সময়ের দাবী। পরিশেষে বলা যায় দর্শনের বিষয়বস্তু ও নির্দেশের প্রতি মানুষের মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। ইউনেস্কো বুঝতে পেরেছে যে দর্শনের বিষয়বস্তুর চর্চা ও প্রসারের মাধ্যমে আসবে মানব জাতির প্রকৃত মুক্তি। সে লক্ষ্যেই ইউনেস্কো বলছে সব দেশের সব মানুষের জন্য বিশ্ব দর্শন দিবস। তাই আজ সময় এসেছে দর্শনের মর্মবানী উপলব্ধি করে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করে মানব কল্যাণের মহান পথে অগ্রসর হওয়া। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।   এসএইচ/

মুস্তাফিজুর রহমান আমার প্রথম সম্পাদক : কানাই চক্রবর্তী

আমি যাদের সম্পাদক হিসাবে পেয়েছি, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্রদ্ধাভাজন এ বি এম মূসা (প্রয়াত), গোলাম সারোয়ার, আবেদ খান, হারুন হাবিব, ইহসানুল করিম হেলাল (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব), আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং আবুল কালাম আজাদ (প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সচিব)। কিন্তু আমার সাংবাদিক পেশার জীবনের প্রথম সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান। সম্পাদক হিসেবে আমি অন্য যাদের নাম উল্লেখ করেছি, তারা সবাই সংবাদ জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। একেকজন একেকটি ধ্রুবতারা। সবাই সাংবাদিক হিসেবে পেশায় যোগ দিয়েছিলেন| নিজ যোগ্যতা ও অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষার পর সম্পাদক হয়েছিলেন। আমার উপরের তালিকায় আরেকজন সম্পাদকের নাম যোগ করা যায়। তিনি আমানউল্ল্যা কবির। যদিও উনার স্বাক্ষরে আমাকে এবং অনেককে একসময় (২০০২) ‘বাসস’ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। তারপরেও বলবো তিনিও প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং সম্পাদক ছিলেন। আমার প্রথম সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান তাদের মতো সাংবাদিক থেকে সম্পাদক ছিলেন না । দৈনিক রুপালী নামের পত্রিকার তিনি ছিলেন প্রকাশক ও মালিক। পত্রিকার ভাষায় আমরা যাকে বলি মালিক সম্পাদক। স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক সম্পাদকরা তার চেয়ে এগিয়ে থাকবেন- এটাই সত্য এবং বাস্তব। কিন্তু তাই বলে সম্পাদকের কোন গুণাবলী তার মধ্যে ছিলো না এমনটি কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। সাংবাদিক, গণমাধ্যম এবং সংবাদ- এসব বিষয়ে তিনি যে যথেষ্ট ধারণা নিয়ে প্রত্রিকা প্রকাশনায় নিয়োজিত ছিলেন, পরবর্তী সময়ে তার কর্মকান্ডে এবং চিন্তা-ভাবনায় প্রকাশ পেয়েছিলো অনেকবার। ব্যক্তিগত জীবনে মুস্তাফিজুর রহমান শুধু সম্পাদক ছিলেন না| তার বহুমাত্রিক স্বত্তাও ছিল। তার কর্মযজ্ঞ ছিলো বিশাল। তিনি ছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিক, সমাজসেবক, দানবীর, রাজনীতিবিদ এবং সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য (সাংসদ লিখলাম না। এ শব্দটি তিনি পছন্দ করতেন না)। সারাদেশে বিশেষ করে সন্দ্বীপে আকাশসম জনপ্রিয়তা ছিলো তার। আমি সেদিকে যাবো না। শুধু সম্পাদক হিসেবেই আলোচনা সীমিত রাখবো এ লেখায়। পরম মমত্ব এবং ভালোবাসা দিয়ে দৈনিক রুপালী প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এর আগে সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ, স্বদেশ খবর এবং মাসিক ব্যাংকার প্রকাশ করেন। পরে সিনে এবং ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকাও বের করেন। রাজনীতি এবং মিডিয়া দুটোই ছিলো তার প্রধান স্বত্ত্বা। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে রাজনীতি থেকেও মিডিয়াই ছিলো তার ধ্যান-প্রাণ। এর মাধ্যমে অমরত্বও পেতে চেয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন মৃত্যুর পরও তার সৃষ্ট পত্রিকার মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। যদিও তার সেই স্বপ্ন বাস্তবতা পায়নি- সে অন্য কথা। আমি দৈনিক রুপালীতে যোগ দিই ১৯৯১ সালের অক্টোবরে। এর তিন মাস আগে পত্রিকাটি বাজারে আসে। আমার যোগদান পর্বটিও ছিলো একটু অন্য ধরনের। এ সময় আমি ঢাকায় আমার বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসি। সে সময় ফিরোজ ভাইও ঢাকায় ছিলেন। ফিরোজ ভাই (দিদারুল ইসলাম ফিরোজ) তখন মুস্তাফিজুর রহমানের খুবই কাছের মানুষ। তিনি আমাকে একদিন ফকিরাপুলের রুপালী অফিসে নিয়ে যান। সেখানে রাজিব হুমায়ুন স্যারও ছিলেন। ফিরোজ ভাই আমাকে মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার নাম বলার আগেই উনি আমাকে চিনেন বলে জানান। অনুযোগ করলেন সেই যে একবার উনার কাছে এসেছিলাম আর কোন যোগাযোগ রাখিনি। আমার নাটকের খোঁজ-খবরও নিলেন তিনি। এ সময় তিনি আক্ষেপ করে রাজিব স্যারকে বলেন, উনার কাছে যারা আসেন বেশির ভাগ পিওন অথবা অন্যান্য পদের চাকরির জন্য। কিন্তু লেখালেখি কিংবা সাংবাদিক হওয়ার জন্য কেউ আসে না। সাংবাদিক হিসেবে তিনি সন্দ্বীপের ছেলে-মেয়েদেরও দেখতে চান বলে জানান। রাজিব স্যার সাথে সাথে আমাকে দেখিয়ে বলেন, ‘ওকে নিয়ে নিন।’ মুস্তাফিজুর রহমান আমার দিকে তাকালেন এবং সন্দ্বীপের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘হেতে আঁর ইয়ানে চাকরি কইরতো ন।’ পাল্টা রাজিব স্যার বলেন, কেনো করবে না? অবশ্যই করবে। তাহলে এখনই জয়েন করতে হবে মুস্তাফিজুর রহমানের ঘোষণা। পাল্টা রাজিব স্যার বললেন, এখনই করবে? আমি একদম দর্শক হিসেবে বসা। কিছুটা অপ্রস্তুতও। এর মধ্যে দরখাস্তের কাগজও আমার সামনে এসে গেলো। আমি অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে জানালাম, আমাকে সন্দ্বীপ যেতে হবে। সামনে আমার পারিবারিক (দাদুর বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান) অনুষ্ঠান আছে। আমি এখনই জয়েন করতে পারবো না। অনুষ্ঠান শেষ করে এসে যোগ দিতে বললেন তিনি। সাথে এটিও বললেন নিয়োগপত্র নিয়ে যাতে কেটে না পড়ি। এর মধ্যে নিয়োগপত্রেও স্বাক্ষর করে ফেলেন তিনি। বেতন ২ হাজার ৫শ টাকা। শিক্ষানবীশ প্রতিবেদকের জন্য তখন বরাদ্ধ ছিলো ১৮শ টাকা। আমার জন্য ৭শ টাকা বেশি। ছয় মাস পর ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী আমাকে তৃতীয় গ্রেডে বেতন দেয়া হবে। তখন তৃতীয় ওয়েজ বোর্ডের থার্ড গ্রেডে বেতন ছিলো তিন হাজার আটশ টাকার মতো। অষ্টম ওয়েজ বোর্ডে যা এখন ৩৯ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। যাহোক, নিয়োগপত্র নিয়ে আমি সন্দ্বীপ চলে আসি এবং বাবার অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে আমি দৈনিক রুপালীতে পেশাগত জীবন শুরু করি। তবে শুরুর দিনেই আমার জন্য যে আরো চমক অপেক্ষা করছিল তাকি আমি জানতাম?  দুই গত লেখায় রুপালীতে যোগদানের দিন চমকের কথা বলেছিলাম। আসলে এটাকে চমক না বলে প্রথম অভিজ্ঞতা বলাটাই যুক্তিযুক্ত ছিল বেশি। দৈনিক রুপালীর সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি সন্দ্বীপের নির্বাচিত সংসদ সদস্যও । স্বভাবতো কারনে পত্রিকার সাংবাদিক এবং অন্যান্যরা আমাকে বেশ সাদরেই বরন করে নিচ্ছিলেন। সবাইর সাথে পরিচিত হচ্ছি। হাত মিলাচ্ছি। টুক টাক কথা বলছি। হঠাৎ করে চোখ গেলো চার দিক থেকে বসা বড় টেবিলটায় । পত্রিকার ভাষায় এটাকে বলে সেন্ট্রাল ডেস্ক। এই সেন্ট্রাল ডেস্কে কাজ করেন সিনিয়র এবং অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা। পদবি সাব এডিটর , সিনিয়র সাব এডিটর , শিপট ইন চার্জ ইত্যাদি। স্বভাবতই তারা রিপোর্টারদের রিপোর্ট এডিট করেন , ভুলভ্রান্তি ধরেন। তো আমার চোখ সিনিয়র দের কাটিয়ে যার উপর স্থির হলো তিনি কোন সিনিয়র নন। তারুন্যে ভরপুর সদাহাস্য-উজ্জ্বল এবং প্রানবন্ত এক তরুণ। আমাকে দেখে তার দেয়া হাসির মধ্যেই যেন আমি বার্তাটা পেয়ে গেলাম। আমার কোন সমস্যা হবেনা। তার উপর নির্ভর করতে পারি। এতদিন পরে স্বীকার করছি আমি তার অভিব্যাক্তিতে ভরসা করার মত কিছু পেয়েছিলাম। সাংবাদিক হিসেবে আমার অভিষেকের দিনেই উপলব্দি করলাম এই অফিসে আপাতত সেই আমার সবচেয়ে শুভকাঙ্খি আপনজন-আত্নীয়ও বটে । তার বাড়ি সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নে । নাম সোহেল মাহমুদ । যাহোক আমার অভিষেকের এ দিনেই রাতে সন্দ্বীপ নিয়ে একটি রিপোর্ট করি। রিপোর্ট করার আগে সন্দ্বীপে আমি যথেষ্ট হোমওর্য়াক করে আসি। আমার রিপোর্টের বিষয়বস্তু ছিলো সন্দ্বীপ শহর নদী ভাঙ্গন রোধে পদক্ষেপ নেয়া হলে তার জন্য যা ব্যয় হবে তার কয়েক গুণ টাকার সম্পদ রক্ষা হবে। টাকার অঙ্কে আমি তা বিশ্লেষণ করি। রাতে রিপোর্টটি জমা দিয়ে আমি বোনের বাসায় চলে যাই। সারারাত উত্তেজনায় ঘুম আসে না, কখন ছাপার অক্ষরে দেখতে পাবো জীবনের প্রথম রিপোর্টটি। পরের দিন দুপুরের পর অফিসে ঢুকেই পরিবেশ অন্যরকম আবিষ্কার করি। কেমন একটা থমথমে ভাব। সবাই চিন্তিত। শাহজাহান ভাই (শাজাহান সর্দার) অথবা ফজলু ভাই আমাকে আস্তে করে ডেকে নিয়ে জানতে চান আমি রিপোর্টটি সম্পাদক সাহেবকে দেখিয়েছিলাম কি-না? আমি ‘না’ বলার পর সবার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। কারণ, সন্দ্বীপের কোন নিউজ রুপালীতে প্রকাশের আগে মুস্তাফিজুর রহমানকে দেখানোর একটা কৌশলগত নির্দেশনা ছিলো, আমার তো তা জানার কথা নয়। আর উনারা ভেবেছিলেন আমি সম্পাদক সাহেবকে দেখিয়েই জমা দিয়েছি। সেদিন মুস্তাফিজুর রহমান অফিসে আসার আগ পর্যন্ত এক ধরনের অস্থিরতা সবার মধ্যে দেখতে পাই। যাহোক, বিকেলে মুস্তাফিজুর রহমান অফিসে এসেই প্রথমে আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমিতো ভয়ে অস্থির। তবে সেটা আমার জন্য যতটুকু নয় যারা আমার রিপোর্টটি ছেড়েছে তাদের জন্য বেশি। ভেতরে যাওয়ার পর আমার রিপোর্টটি নিয়ে তিনি (মুস্তাফিজুর রহমান) যেভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, তা আমি ভাবতেও পারিনি। আমার জন্য রুপালীতে সাময়িক জমে থাকা মেঘ কেটে যাওয়ায় পুরো অফিস জুড়েই স্বস্তির ভাবটা ফিরে এলো। সুধাময় করদা (প্রয়াত, উনার অধীনেই আমি কাজ শুরু করি ) খুশীতে এবং বিপদমুক্ত হওয়ায় বলেন, বিয়ের রাতেই আমি বিড়াল মারতে পেরেছি । মুস্তাফিজুর রহমান কয়েকবার পিঠ চাপড়ে দিয়ে রিপোর্টটির উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা করলেন। তিনি বলেন, সন্দ্বীপ নিয়ে তিনি এ ধরনের রিপোর্ট চান। শুধু তাই নয়, সবাইকে ডেকে নিয়ে রিপোর্টটির প্রশংসা করলেন এবং এখন থেকে সন্দ্বীপ সম্পর্কিত কোন নিউজ যাবে কি যাবে না তা বিবেচনার দায়িত্ব তিনি আমাকে অর্পণ করেন। এটি ছিলো একটা কঠিন দায়িত্ব। একদিন আমাকে ডেকে সন্দ্বীপ থেকে আসা কয়েকটি নিউজ আমাকে ধরিয়ে দেন। তখন উনার কক্ষে অনেক লোক বসা। নিউজগুলো দেখে আমি খুবই বিরক্ত। এগুলো কোনো জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হতে পারে না। উনি মনে হয় আমার মনোভাবটা বুঝতে পেরেছিলেন। সন্দ্বীপের লোকজন চলে যাওয়ার পর আবার আমাকে ডাকলেন। সবার সামনে বিশেষ করে সন্দ্বীপের লোকজনের সামনে আমাকে তিনি ‘আপনি’ করে সম্বোধন করতেন। একা যখন-তখন ‘তুমি’ বলেন। আমাকে বলেন, উনি সন্দ্বীপের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তাই অনেককে খুশি রাখতে হয়। সন্দ্বীপের নিউজ আসলেই দিতে হবে এমন কথা নয়। যেটি যাওয়ার মতো হবে, সেটি যেন দিই। এতে করে আমার বিপদ কিন্তু আরে বাড়ে । যাদের বা যে প্রতিষ্ঠানের নিউজ ছাপা হতোনা তাদের একটা ক্ষোভ আমার উপর জন্মাতো । তবে বলতে কি, আমি যতদিন রুপালীতে ছিলাম এ স্বাধীনতাটুকু আমি পুরোপুরি ভোগ করতে পেরেছিলাম। আর তা পেরেছিলাম বলেই তিনি যে সন্দ্বীপকে কতটা ভালোবাসতেন তা অনুভব করতে পেরেছি। অবশ্য সন্দ্বীপের প্রতি তার আন্তরিকতা এবং ভালোবাসা আমি এর আগেও একবার টের পেয়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছিলাম। ১৯৮৯ সালে সন্দ্বীপে সন্দ্বীপ থিয়েটার থেকে নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছিলাম। উৎসবের আগে আমি এবং সন্দ্বীপ থিয়েটারের সচিব সিরাজ (সিরাজুল মাওলা, বর্তমানে মুস্তাফিজুর রহমান কলেজের বাংলার শিক্ষক) ঢাকায় আসি রাজিব স্যারের পরামর্শ নেয়া ও উপস্থিতি নিশ্চিত করাসহ মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেয়ার জন্য। আমরা নাট্যোৎসবটি মুস্তাফিজুর রহমানকে দিয়েই উদ্বোধন করাতে চেয়েছিলাম। নাট্যোৎসবের কথা শুনে স্যার তৎক্ষণাৎ মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের কাছে ফোন দিয়ে আমাদের অভিপ্রায়ের কথা জানান। তিনি আরো বলেন, উনার কাছে অনেকেই যে কারণে দেখা করতে যান আমরা তা নই। টেলিফোনে স্যারের ভাষা ছিলো উনি সন্দ্বীপের দুÕজন ক্রিমকে পাঠাচ্ছেন। মুস্তাফিজুর রহমান তাৎক্ষণিকভাবেই আমাদের পাঠিয়ে দিতে বললেন। স্যারের আহ্বানে তিনি যে এভাবে সাড়া দিবেন তা আমাদের কল্পনাতেও ছিলো না। আমরা মতিঝিলে মুস্তাফিজুর রহমানের বিসিআই কর্মস্থলে হাজির হওয়ার পরেই তা যেনো টের পাই। গেটে আমাদের পরিচয় দেয়ার সাথে সাথেই আমাদের দ্বীপবন্ধুর কক্ষে পৌঁছে দেয়া হয়। মনে হয় যেন সবাই আমাদের আসার অপেক্ষায় ছিলেন। যাহোক, মুস্তাফিজুর রহমানকে আমাদের আসার উদ্দেশ্য জানাতেই তিনি অবাক বিস্ময়ে আমাদের মুখপানে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ পরে পাশে বসা একজনকে (পরে জেনেছি মন্ত্রী) খুবই আবেগতাড়িত কন্ঠে সন্দ্বীপের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ওঠেন, দেখেন দেখেন, ওরা আমার সন্দ্বীপের ছেলে। সন্দ্বীপের মতো জায়গায় নাট্যোৎসব করছে। মন্ত্রীও খুব অবাক হলেন সন্দ্বীপের সংস্কৃতির উর্বরতা দেখে। মুস্তাফিজুর রহমানের সেদিনের উচ্ছ্বসিত মুখায়ব এখনো ভোলার নয়। প্রকৃতপক্ষে এ উচ্ছ্বাস দিয়ে তিনি মন্ত্রীকে সন্দ্বীপের মর্যাদাই তুলে ধরেছিলেন। মুস্তাফিজুর রহমানও বুঝাতে চেয়েছিলেন সন্দ্বীপ কোন অবস্থাতেই চরাঞ্চল নয়। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অনেক এগিয়ে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের পাঠানোর জন্য রাজীব স্যারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন দেন। একই সাথে উৎসবে উপস্থিত থাকার কথাও বলেন। যদিও পরে উৎসবের তারিখ পরিবর্তন হওয়ার কারণে উনার আসা সম্ভব হয়নি।  তিন আমি দৈনিক রুপালীতে যত বছর ছিলাম (১৯৯১-৯৭) সন্দ্বীপ সংশ্লিষ্ট সংবাদ ছাড়া কোন সংবাদেই মুস্তাফিজুর রহমানকে হস্তক্ষেপ করতে দেখিনি। সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই তিনি সবকিছু বিবেচনা করতেন। রিপোর্টারদের রিপোর্টে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে কোন বিতর্ক হলে তিনি সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের পক্ষ অবলম্বন করতেন। আমি একবার একটা রিপোর্ট নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে যাই। আমি সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যাক্তি দুর্নীতির নিউজ করতাম না। পক্ষে অনেক ডকুমেন্ট থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়ে একবার (’৯৪-এর মার্চ হতে পারে) একটি নিউজ করে ফেলি। এতে সে সময়ের অনেক রাঘব বোয়াল সংশ্লিষ্ট হয়ে যান। এদের মধ্যে অনেকেই সে সময়ের ক্ষমতাসীন দলের হোমরা-চোমড়া ব্যবসায়ী ছিলেন। খুব সম্ভবত তারা চিনি আমদানিকারক ছিলেন। রিপোর্টটি প্রকাশিত হওয়ার পর তারা সরাসরি মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে চলে আসেন এবং প্রকাশিত সংবাদটির প্রতিবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানান। এদের মধ্যে দু’একজন মুস্তাফিজুর রহমানের পরিচিতও ছিলেন। এদের অনেক আবেদন-নিবেদনের পরও মুস্তাফিজুর রহমান তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। উনার বক্তব্য হচ্ছে, যিনি রিপোর্টটি করেছেন এটা তার ব্যাপার। তিনি এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। তবে তিনি তাদের বলেন, যদি তারা আমাকে রাজি করাতে পারে তাহলে উনার আপত্তি নেই। উনি কোনভাবেই আমাকে আদেশ বা অনুরোধ জানাতে পারবেন না। ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এবার সরাসরি আমার কাছে আসে। এর আগে মুস্তাফিজুর রহমান আমারে কাছে সাপোর্টিং পেপার যথেষ্ট রয়েছে কি-না জানতে চান। যদিও উনার বিশ্বাস ছিলো কোন কাগজপত্র ছাড়া এবং ব্যক্তিগত লাভে এ নিউজ করেনি। আমি উনাকে বলি, আমার কাছে আরো যা ডকুমেন্ট রয়েছে তা দিয়ে দু’তিনটা নিউজ করতে পারবো। ব্যাস! এ পর্যন্তই। তখন সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদকদের একটি সংগঠন ছিলো। মুস্তাফিজুর রহমান সেই সংগঠনের সভাপতিও ছিলেন। একদিন সবাই দলবেধে আবার উনাকে প্রতিবাদপত্র ছাপার অনুরোধ জানাতে থাকেন। মুস্তাফিজুর রহমানের একই কথা সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলেন। এদের মধ্যে একজন খুবই সিরিয়াস ছিলেন। নানাভাবে আমাকে প্রলুব্ধ করতে থাকেন। যাতে আমি রাজি হই। আমার কেনো জানি মনে হলো, উনি ওই পক্ষ থেকে কোন সুবিধা নিয়েছেন, এখন আমাকেও তা দিতে চাইছেন। আমি উনাকেও একই কথা বলি। প্রতিবাদ ছাপাবো এবং সাথে প্রতিবেদকের বক্তব্যও যাবে। কিন্তু উনাদের আবদার প্রতিবেদকের বক্তব্য ছাড়াই প্রতিবাদ ছাপাতে হবে। আমার সম্পাদক যখন আমার পাশেই আছেন, তখন তাদের হুমকি-ধামকি কোন কাজেই লাগবে না আমি জানি। এর মধ্যে অনেক দিন চলে গেছে। তাদের চেষ্টা-তদবির আপতত নেই। কিন্তু আমি কি জানতাম, তারা অন্য পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে? এপ্রিলের প্রথম দিকে সম্পাদক এবং আমার বরাবরে হঠাৎ একটি উকিল নোটিস আসে । প্রকাশিত মিথ্যা (তাদের ভাষায়) সংবাদের প্রতিবাদ প্রথম পৃষ্ঠায় না ছাপালে তারা সম্পাদক এবং আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে। সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান আমাকে ডেকে উকিল নোটিসটি ধরিয়ে দিলেন। কিন্তু কোন কিছুই বললেন না। কেনো জানি না, এ উকিল নোটিস দেখে আমার কোনো ভয়ই অনুভূত হলো না। সময় এবং বয়স বলেই কথা। আর সবচেয়ে বড় কথা উনি (সম্পাদক) নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে পারতেন। আমার মতো নবীন সাংবাদিকের সিদ্ধান্তে তিনি আমল না দিলেও পারতেন। এতোদিন পরে বুঝতে পারি উনি মালিক সম্পাদক হলেও উনার ভেতরে ছিলো পেশাধারী সম্পাদকের মন। যাহোক, মুস্তাফিজুর রহমান কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাকে প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সেটি মালিক সম্পাদক বা পেশাধারী সম্পাদক, কোনটি থেকেই নয়। তার সেই প্রস্তাবে আমি উনার মধ্যে পিতৃত্বের একটা ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। সন্তানের প্রতি পিতাদের যে অনুভূতি থাকে অনেকটা সে রকম। এরই মধ্যে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। বিয়ে করতে চট্রগ্রামে যাবো। যাওয়ার আগে উনার কাছ থেকে আশির্বাদ চাইতে গেলাম। উনি খুব খুশি। শুভ কামনা জানানো শেষে আমাকে হঠাৎ করে বলেন, ‘প্রতিবাদপত্রটি ছাপিয়ে গেলে ভালো হতো না?’ আমিতো হতচকিত। কিন্তু আরো আবেগাপ্লুত হওয়ার পালা পরের সংলাপে। উনার বক্তব্য হচ্ছে মাথার ওপর মামলার হুমকি নিয়ে আমি একটা শুভ কাজে কেন যাচ্ছি। এতে উনার ভালো লাগছে না। যদি এর ভেতর মামলা-টামলা হয়ে যায়? আমাকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন, মামলা হলেতো উনার বিরুদ্ধেও হবে কিন্তু তিনি মামলা-টামলাকে ভয় করেন না। কিছুদিন আগেইতো জেল খেটে এসেছেন। উনার ভাবনা আমাকে নিয়ে। আমি যেনো কোন ঝামেলাতে না পড়ি। আপনারাই বলুন, এটা কি পিতৃমন থেকে উৎসরিত নয়? যাহোক, আমি উনাকে দৃঢতার সাথে জানালাম, মামলা করার সাহস ওরা পাবে না। ওরা জানে আমার কাছে কি আছে। এতে তাদের আরো ক্ষতি হয়ে যাবে। বললাম, ওরা জাস্ট ভয় দেখানোর জন্য নোটিস পাঠিয়েছে। আসলে পরে আর মামলা হয়নি বা সাহস করেনি। আসলে তিনি শুধু রুপালীতে আমার সম্পাদক ছিলেন না, অভিভাবকও ছিলেন। পরবর্তি কিস্তি সেই সময়ের (’৯৬) তথ্যমন্ত্রীকে নিয়ে আমার একটি লেখার প্রতিক্রিয়া এবং সম্পাদকের অবস্থান। চার ১৯৯৭ সালের ঘটনা। তখন মুস্তাফিজুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য। তার দলও ক্ষমতায়। কিন্তু দৈনিক রুপালীর অবস্থা তখনও প্রায় নাজুক। মাত্র দল সরকারে এসেছে। ডিএফপির বিজ্ঞাপনই একমাত্র সম্বল। এদিয়েই সাংবাদিকদের বেতন। কিন্তু আমার এক লেখায় সেটিও হারাবার উপক্রম। এবারের সংকটের সাথে রুপালীর সবার স্বার্থ জড়িত। তখন তথ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদ ভাই। আমার খুব প্রিয় লোক। বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক ছিলেন । বাকশালের তরুন গভর্নর ছিলেন। লেখালেখিতেও ভালো । উনি একটা বক্তৃতায় বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্রদের হাতে অতীতের সরকারগুলোর মতো অস্ত্র তুলে দেবে না। সবার হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেবে। আমি এর জবাবে, ‘প্রিয় তথ্যমন্ত্রী আপনি কতজনকে নিয়োগপত্র তুলে দিবেন?’ শিরোনামে একটি কলাম লিখি। এটি প্রকাশের পর তথ্যমন্ত্রী কেনো জানি ভয়ংকরভাবে ক্ষেপে যান। তিনি সকাল থেকেই টেলিফোনের পর টেলিফোন করতে থাকেন মুস্তাফিজুর রহমানকে। অন্যদের কাছেও তিনি এ লেখা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করতে থাকেন। রুপালী সম্পাদক মন্ত্রীর ফোন না ধরে আমার অপেক্ষা করতে থাকেন। আগে উনি আমার সাথে কথা বলবেন, তারপর মন্ত্রীর সঙ্গে। যাহোক, যথারীতি দুপুরে আমি অফিসে এসেতো হতভম্ব। সবার দৃষ্টিতে মনে হয় আমি একজন আসামী এবং সে সময়ে তথ্যমন্ত্রী খ্যাপা মানে ভাগ্য-লক্ষ্মী বিমুখ হওয়া। আর সেটা আমার কারণেই হলো। আমার নিজেকেও খুব অপরাধী মনে হলো। নয়-ছয় ভাবতে ভাবতেই মুস্তাফিজুর রহমান দ্রুত অফিসে আসলেন এবং যথারীতি আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি যেতেই উনি জানালেন, আজকের লেখাটি উনার পড়া হয়নি। মন্ত্রীকে কিছু বলতে পারবেন না, তাই উনার ফোন ধরেও নিজেকে রুপালীর সার্কুলেশন ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পড়ার আগে আমার কাছে জানতে চাইলেন এ লেখাতে আমি কি বুঝাতে চেয়েছি? আমি জানালাম, লেখাটি উনার বিরুদ্ধে নয়। বরঞ্চ আগের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে। লেখাতে আমি বলতে চেয়েছি, আগের সরকারগুলো নিয়োগ বন্ধ রেখে দেশে প্রচুর শিক্ষিত বেকার রেখে গেছে। তাদের ব্যর্থতা এবং ভুলের কারনে সবাইকে নিয়োগপত্র দেয়া যাবে না। এরমধ্যে অনেকেই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সও হারিয়ে ফেলেছে। আমি সেই সময়ে দেশে শিক্ষিত বেকারের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছিলাম, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না করে এতো বেকারদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেয়া সম্ভব হবে না। এতক্ষণে উনারও লেখাটি পড়া শেষ হয়ে গেছে। উনি লাফ দিয়ে উঠলেন এবং বললেন, এ লেখায় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিছুই নেই। বর্তমান বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে। এ ধরনের লেখাই উনি চান। আমাকে বার বার ভয় না পাওয়ার কথা বললেন এবং আরো লিখে যেতে বললেন। জানালেন, এখনই তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। আমি যতটুকু জানি মন্ত্রীর মন গলানো যায়নি। এটি উনার বিরুদ্ধে লেখা এ ধারণা মন্ত্রী অনেক দিন পর্যন্ত পোষণ করেছেন। তবে বিজ্ঞাপনে হাত দেননি। এখানেই একজন মুস্তাফিজুর রহমান । যিনি আর্থিক ক্ষতির কথা না ভেবে মন্ত্রীর সঙ্গে জি হুজুর করেননি। বলেননি, ভুল হয়ে গেছে। এখনই ওই সাংবাদিককে আমি চাকরিচ্যুত করছি। তা না করে তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এ ধরনের আরো লেখার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এখন কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় অনেক সাংবাদিকের চাকুরীও যায় ।   লেখক পরিচিতি : কানাই চক্রবর্তী, উপপ্রধান প্রতিবেদক, বাসস।   /ডিডি/  

আমরা খাদ্য সচেতন হবো কবে?

পেশাগত কারণে আমি বিশ্বের ৭৯টি দেশে ঘুরে বেড়িয়েছি। পেশার তাগিদে বিভিন্ন দেশে গেলেও ভ্রমণের সময় নিবিড় চিন্তা চেতনা দিয়ে উপলব্ধি করেছি বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনধারা। সুদীর্ঘ প্রবাস জীবনে থেকে ভুলে যাইনি নিজ দেশ ও দেশের কৃষ্টি -কালচার। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে মানুষের খাদ্যাভাস পরিবর্তনের বিষয়টি। মানুষ এখন প্রকৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুস্বাদু খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। ফাস্ট ফুডের মতো জাঙ্ক ফুড থেকে দূরে থাকছে মানুষ। নানা রোগব্যাধী ছাড়াও মুটিয়ে যাওয়ার কারণে শাক-সবজি ও ফলমূলের দিকে ঝুঁকছেন অষ্ট্রেলিয়ার মানুষ। আমাদের দেশের শিশুরা স্কুল থেকে বেরিয়ে বাইরের জাঙ্ক ফুড যেমন চটপটি, ফুসকা, আচার, ঝালমুড়ি ইত্যাদি খাবারের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। অপরদিকে, অপেক্ষাকৃত ধনী পরিবারের সন্তানরা ফাস্ট ফুডের দোকানে ভিড় করছে। পিজা, ম্যাকডোনালস, কেএফসি এসব দোকানে না খেলে যেন তাদের আভিজাত্যের ভাব প্রকাশিত হয় না। আর এই ধরণের খাবার এসেছে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে। অথচ সেই পশ্চিমা বিশ্বই এসব খাবার এড়িয়ে চলছে। অষ্ট্রেলিয়ায় স্কুলের বাচ্চাদের খাদ্যাভাস নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১০টা সবজির আইটেম রাখতে বলা হয়েছে। স্কুলের টিচাররা বাচ্চাদের খাবারের বক্স খুলে দেখেন নির্দেশনা অনুযায়ী খাবার আনা হয়েছে কিনা। খাবারের বক্সে টমেটো, গাজর, আপেল আছে কিনা দেখা হয়। কোনো সফট ডিংকস এলাউড না। সবজি আর ফল ছাড়া শুধুমাত্র সিম্পল ওয়াটার পারমিট রয়েছে। বাচ্চারা দিনদিন ওবিস (স্থুল) হয়ে যাচ্ছে। এতে করে তাদের চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোর উপর চাপ বাড়ছে। বাচ্চারা অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, অল্প বয়সে চিকিৎসকের  কাছে যেতে হচ্ছে। পেট বেড়ে যাচ্ছে, ডায়াবেটিস সমস্যা বেড়েই চলেছে। সরকারের স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়ছে। তারপরও আমাদের দেশে ক্রমেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ফাস্ট ফুড। কিন্ত যেই  ইডরোপের দেশ থেকে এসব সংস্কৃতি আমাদের অঞ্চলে আসলো সেই ইউরোপেই এখন নিরাপদ খাবারের আন্দোলন করছে। ইউরোপজুড়ে এখন নিরাপদ খাবারের আন্দোলন গড়ে উঠছে। স্বাস্থ্য সচেতন থাকতে অফিস-  আদালতে জিম চালু করা হয়েছে। এখন অনেকেই  চাকরি করার আগে দেখছে বেতনের সঙ্গে ফ্রি জিমের অফার আছে কি না? অনেকের বেতনের সঙ্গে  ফ্রি জিমের ভাউচার দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সপ্তাহে ৫ দিন দুই ঘণ্টা করে জিমের জন্য সময় দেওয়া হচ্ছে অফিস থেকে। এক্সিকিউটিভরা পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে অফিস যাতায়াত করেন। অথচ আমাদের দেশের মানুষ এখনও এতটাই আরামপ্রিয় হয়ে গেছেন যে আয়ের অনেকাংশেই চলে যায় ডাক্তার আর হাসপাতালে। অথচ স্বাস্থ্য সচেতন থাকলে অনেক রোগব্যাধী তো বটেই, ভালো থাকা যায়, সুস্থ্য থাকা যায়।  নুসাতুন অস্ট্রেলিয়ার একটা রাজ্যের ‍মূখ্যমন্ত্রী। সেই মহিলা প্রতিদিন ২৫কি.মি দূর থেকে ট্রেনে করে অফিস যাতায়াত করেন। রাস্তায় জনগণের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আসেন,মানুষের সমস্যাগুলো শোনেন।    অষ্ট্রেলিয়ায় জাঙ্ক ফুডের দাম এখন কমে গেছে। যেসব মুরগি খোলামেলা জায়গায় বেড়ে উঠে, সেসব মুরগির ডিমের দাম বেশি। যেটা ফার্মের মুরগির চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। অথচ বাংলাদেশে ঘটনাটা উল্টো। দেশে আমরা দিন দিন এতো কেমিকেল খাচ্ছি যে এন্টিবায়োটিকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। আমাদের দেশে সার দিয়ে বড় পেয়ারা উৎপাদন করা হচ্ছে, এর ফলে শরীরে নানান রাসায়নিক উপাদান ঢুকে পড়ছে। অষ্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া আমাদের দেশের মতোই। শুধু ওখানে ঠান্ডার সময় আমাদের এখানে গরম, আর আমাদের ঠান্ডার সময় ওখানে গরম। ওখানে এখন প্লেন কোম্পানিগুলো মোটা মানুষদের নিতে চায় না। আর নিলেও ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। ইউরোপে মোটা মানুষদের বাড়তি সমস্যা নিয়ে গবেষণা চলছে। কারণ, তাদের জায়গা বেশি লাগে, ফুয়েল বেশি বার্ণ হচ্ছে এসব নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে। সময় এসেছে আমাদের দেশেও এ বিষয়ে সচেতনতার। অষ্ট্রেলিয়ায় ইতোমধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ ম্যাগডোনালস বন্ধ হয়ে গেছে। ২০ বছর আগেও দেখা গেছে, যে এলাকায় ম্যাগডোনালস নাই সেখানে ঘরবাড়ি হতো না। এখন বিভিন্ন এলাকায় ম্যাগডোনালসের প্রতিষ্ঠান খুলতে গেলে আশপাশের লোকদের চিঠি দিতে হয়। কাউন্সিলে পাশ হতে হয়, তারপর দোকান দিতে হয়। আমার এলাকাতে কমার্শিয়াল ভবন আছে সেখানে ম্যাগডোনালস এলাউড না। কারণ, এসব খাবার স্বাস্থ্যকর না। ফলে ম্যাগডোনালসের খাবারের দামও কমে গেছে। এ কারণে এ কোম্পানির শেয়ারের দামও কমে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে ম্যাগডোনালস এখন ব্যবসার ধরণ পাল্টেছে। এর বিপরীতে অনুন্নত দেশগুলোতে কেএফসি ঢুকে পড়ছে। মানুষ সেগুলোতে হুমরি খেয়ে পড়ছে। পিৎজা যে কত খারাপ সেটা বলে বোজানো যাবে না। এর প্রতিক্রিয়া অনেক খারাপ। সম্প্রতি এক ছোট ভাই স্টোক করেছে। বয়স ৩৫ হবে। তার এক সময় প্রিয় খাবার ছিলো চিস আর ফাস্ট ফুড। অনেকে বুঝতে পারছেন না এর প্রভাব কতটা খারাপ। চিস রক্তে জমাট বাঁধে, চর্বি সৃষ্টি করে ব্লকেজ করে। রক্ত স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না। অষ্ট্রেলিয়াতে ডাঃ এবং নার্সরা এটার সম্পর্কে ক্যাম্পেইন করে যে মোটা হওয়া যাবে না,স্থূল হওয়া যাবে না।এমনকি  অফিস ২-৩ ঘন্টা ব্যায়ামের কারনে  আপনাকে কাজ থেকে রিলিফ দেবে। এ ব্যাপারে সরকার খুব জোড় দিচ্ছে। এটা বাড়তি সুবিধা।   অষ্ট্রেলিয়ায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি। শিক্ষার্থীরা শর্ট টাইম কাজের মাধ্যমে টিকে থাকে। ফাস্ট ফুডে জব করে, ড্রাইভিং করে। অষ্ট্রেলিয়ায় প্রচুর গরু আছে। একেকটার ১৫০০ কেজি পর্যন্ত মাংস হয়। গরুগুলো প্রচুর দুধ দেয়, অষ্ট্রেলিয়া থেকে প্রচুর গরু প্লেনে করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। এটা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বড় বড় তৃণভূমিতে গরুগুলো ছেড়ে দেয়া হয়। ওখানকার আয়ের বড় অংশ হচ্ছে কৃষি। একেকটি খামার অনেক বড়। কৃষকরাই সেখানে ধনী। হাজার হাজার একর জায়গাজুড়ে প্রোজেক্ট। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সুপার ভাইস করা হয়। চাষিদের হেলিকপ্টারও আছে। এই হেলিকপ্টার দিয়ে ফড়িঙের মতো গরুগুলোকে দৌড়ানো হয়। কারণ, গরু যদি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে খায় তাহলে গরুর হজমে সমস্যা হতে পারে। তাই গরুগুলোকে দৌড়ানো হয়। অর্থাৎ গরুগুলো যেন ফার্মের মুরগির মতো না হয়। প্রাকৃতিক খাবারের জন্য কৃষিতে ট্যাক্স কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। কৃষিতে সরকার উৎসাহিত করছে। সেখানে তৃণভোজী গরুর অনেক চাহিদা। প্রচুর পরিমানে আবাদ হয়। ৯০ শতাংশ আবাদ করা হয়। অনেক ফল- ফলাদি, সবজি উৎপাদন হচ্ছে। মেক্সিকো,  নিকারাগুয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রফতানি করা হয়। দেশটা অনেক বড় আর লোক সংখ্যা খুবই কম। ওখানে ইন্ডিয়ান অনেক লোক প্রচুর কলা চাষ করে। এছাড়া আপেল কমলা অনেক হয় সেখানে। আমাদের দেশে মায়েরা সন্তানদের ফাস্ট ফুড খেতে উৎসাহিত করে। তাই এ ব্যাপারে মায়েদের আগে শেখানো দরকার। লেখক : তিন দশক ধরে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী।  কেআই/ডব্লিউএন    

স্মৃতির মণিকোঠায় বাবু ভাই

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়ীকভাবে বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাথে আমার আত্মীয়তার বন্ধন যেমন ছিল তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কটাও ছিল সমান্তরালভাবে। জননেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় নাম। শুধুই কী রাজনীতি? ব্যবসা বাণিজ্য, সমাজসেবা, বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধ সবখানেই আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু’র গৌরবগাঁথা স্মৃতি চিরভাস্বর হয়ে আছে। তাঁর এতো পরিচিতি, যশ-খ্যাতির মাঝেও চট্টগ্রামের আপামর জনসাধারণের কাছে তিনি ‘দানবীর বাবু মিয়া’ নামে সমধিক পরিচিত। বাবু ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক আত্মীয়তার। সম্পর্কে তিনি আমার মামাতো ভাই। বয়সে আমার চেয়ে প্রায় আট বছরের বড়। আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘চৌধুরী বাড়ী’ হলো আমার নানার বাড়ি। আমার নানা মরহুম আবদুল হাকিম চৌধুরী আর বাবু ভাইয়ের দাদা (পিতামহ) মরহুম আবদুল করিম চৌধুরী দুইজনে ছিলেন আপন ভাই। আমার নানারা জমিদার ছিলেন। বার্মায় (মিয়ানমার) আকিয়াবে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যও ছিল। বাবু ভাইয়ের বাবা উকিল নুরুজ্জামান চৌধুরী আমার মামা। আমাদের দু‘জনের ছোটকালের অম্ল-মধুর কত স্মৃতি আমার মানসপটে জমা হয়ে আছে তা আমাকে আজও নস্টালজিক করে তোলে। বাবু ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সে কথাগুলো আজ আমার বার বার মনে পড়ছে। নানার বাড়িতে বেড়াতে গেলে মামা আবদুস সোবহান চৌধুরী, নাদেরুজ্জামান চৌধুরী এবং মামাতো ভাই আখতারুজ্জামান চৌধুরীর আপত্যস্নেহ এখনো আমার স্মৃতির মণিকোটায় জ্বল জ্বল করে। মনে পড়ে সেদিনের কথা, নানার বাড়ির সামনে পুকুরের ঘাটে পুকুরের জলে পা ভিজিয়ে রেখে সিড়িতে বসে থাকার কথা। পুকুরে সবাই সাতার কাটছে , আমি বসে বসে তা দেখছি। কারণ আমি সাঁতার জানি না। এমন সময় বাবু ভাই আসলেন গোসল করতে। বসে থাকতে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি সাঁতার শিখবে? মাথা নেড়ে আমি সায় দিলাম। তিনি বললেন ‘চল আজ তোমাকে সাঁতার শেখাব’। সেদিনই পুকুরে নেমে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে সাঁতার শেখার তালিম দিলেন বাবু ভাই। আমার সাঁতার শেখার প্রথম তালিমের স্মৃতিটুকু আমার মনের মাঝে এখনও গেঁথে আছে । অত্যন্ত মমতামাখা স্মৃতি দিয়ে বাবু ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কের ভীতটা রচিত হয়েছিল, যা মৃ্ত্যু পর্যন্ত অটুট ছিল। এখনো বাবু ভাইয়ের কথা মনে হলে আমি স্মতিকাতর হই, চোখের কোণা ভিজে ওঠে। আজ বাবু ভাইয়ের না ফেরার দেশে চলে যাবার ৫ম বছর। অগণিত মানুষের দোয়া নিয়ে এই মানুষটি বেঁচে আছেন সকলের অন্তরে। ঢাকার বুকে একখণ্ড চট্টগ্রাম খ্যাত ঐতিহ্যবাহী ‘চট্টগ্রাম সমিতি-ঢাকা’ জীবন সদস্য ছিলেন বাবু ভাই। তিনি ‘চট্টগ্রাম ভবন’ এর অন্যতম দাতা সদস্য । ৩২ তোপখানা রোডে আমরা যখন বহুতল বিশিষ্ট চট্টগ্রাম ভবন নির্মাণের ফান্ড গঠনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে গিয়েছিলাম বাবু ভাই তখন আমাদেরকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনুদান দিয়েছিলেন। তারও আগে তোপখানা রোড়ের জায়গা ক্রয়ের জন্যও তিনি ১৯৭৫ সালে অনুদান দিয়েছেন। ১৯৯০-৯১, ১৯৯৬-৯৭ এবং ১৯৯৮-৯৯ সালে আমি চট্টগ্রাম সমিতি-ঢাকা’র সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এসময় সমিতির বিভিন্ন সংকটে, উন্নয়নে বাবু ভাই সবসময় আমাকে বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। ১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম সমিতির নির্বাচনে সাবেক উপ-প্রধান মন্ত্রী জামাল উদ্দিন সভাপতি আর আমি সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। কিছু অতি উৎসাহী লোক বাবু ভাইকে না জানিয়ে আমাদের প্যানেলের বিপরীতে সভাপতি পদে তাকে প্রার্থী করেছিলেন। বিষয়টি আমি জানার পর সাথে সাথে বাবু ভাইকে অবগত করি। আমার কথা শুনে বাবু ভাই বললেন, ‘তুমি জেনারেল সেক্রেটারী হচ্ছো’, আমাকে তো কেউ বলেনি- কাগজ দাও আমি নমিনেশন উইথড্রো করলাম।’  আমার প্রতি বাবু ভাইয়ের অগাধ বিশ্বাস দেখে সেদিন আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। আমার মাকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। জীবদ্দশায় আমার মাকে দেখতে তিনি বেশ কয়েকবার আমার বাসায় গিয়েছেন। আমার মা বাবু ভাইকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। ষাটের দশকে আমি যখন ছাত্র রাজনীতিতে ক্রমশঃ সক্রিয় হতে থাকলাম। ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে নেতৃত্ব দিতে থাকলাম, তখন আমার মা প্রায় সময় আমাকে বলতেন আমি যেন সবসময় বাবু ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ রেখে চলি। জানি না তৎকালীন উত্থাল রাজনৈতিক পরিবেশে আমাকে নিয়ে আমার মা উদ্বিগ্ন ছিলেন কিনা, কিন্তু তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন আমি যাতে বাবু ভাইয়ের সাথে সুসম্পর্ক রাখি। আমার মায়ের সে নির্দেশ আমি পালন করে গেছি, বাবু ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, সম্মান আর আমার প্রতি বাবু ভাইয়ের স্নেহ আমৃ্ত্যু অটুট ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাই। এরপরও জিয়া সরকার এবং পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী আমাকে রাজনীতিতে ফিরে আসার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানান প্রলোভন দেখায়। কিন্তু আমি কখনো গোয়েন্দাদের ফাঁদে পা ফেলিনি। বাবু ভাই একথা জানতেন। আমার সিদ্ধান্তে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন। আমার সাথে তিনি অনেক বিষয় শেয়ার করতেন। রাজনীতির পাশাপাশি পারিবারিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক বিষয়ও আলোচনায় বাদ যেত না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাবু ভাইয়ের সাথে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়। ৭০ এর নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে নেতা ও কর্মীদের করণীয় শীর্ষক দিক নির্দেশনামূলক লিফলেট ‘নির্বাচন ও ছাত্রসমাজ’ নামে সারাদেশব্যাপী বিতরণ করা হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে জোরালো করার জন্য টিম গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে আমাকে এবং জাহিদ সরওয়ার নিজামকে (বিসিসিআই ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও পরবর্তীকালে আফ্রিকার জাম্বিয়াতে দুটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার একটি হলো ‘ফাইন্যান্স ব্যাংক জাম্বিয়া লিমিটেড যেটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন তিনি নিজেই এবং অপর ব্যাংকের নাম ছিল ‘ক্রেডিট আফ্রিকা ব্যাংক লিমিটেড’ যার চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন) দায়িত্ব প্রদান করা হয়। পাকিস্তান জাতীয় সংসদের আনোয়ার, বাশঁখালী, কুতুবদিয়া নির্বাচনী আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতাউর রহমান কায়সার এবং প্রাদেশিক পরিষদের প্রার্থী আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভাইয়ের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালানোর জন্য। কেন্দ্রের নির্দেশনা মতো নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি আমরা কিছুটা কৌশলও অবলম্বন করেছিলাম। বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফাকে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা যেমন অব্যাহত থাকবে অন্যতায় আমাদেরকে একদফা অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে যেতে হবে। এই বক্তব্যই ছিল ৭০ এর নির্বাচনের প্রচারের অন্যতম কৌশল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেমন একসূত্রে গাঁথা, তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে বাবু ভাইয়ের পরিবার অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তারও আগে অসহযোগ আন্দোলনের সময় বাবু ভাইয়ের পাথরঘাটাস্থ বাসা জুপিটার হাউস থেকে সংগ্রাম কমিটির সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবু ভাই লন্ডন ও নিউইয়র্কে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাবু ভাইয়ের বড় ভাই বশিরুজ্জামান চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এবং চট্টগ্রাম সিটি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি আমেরিকায় হার্ট অপারেশনের সময় মারা যান। ছোটভাই বশরুজ্জামান চৌধুরী মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে চট্টগ্রাম শহরের চেরাগী পাহাড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধেরও পর বাবু ভাই বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দেশ গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে জাতির জনককে হত্যার পর অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার মতো বাবু ভাইকেও অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। সামরিক সরকারের রক্তচক্ষু আর গোয়েন্দাদের প্রলোভনকে উপেক্ষা করে বাবু ভাই সেদিন তাঁর নীতিতে অটল ছিলেন। বাবু ভাই যদি ঐসময় এতটুকু নীতিভ্রষ্ট হতেন তাহলে তিনি অনেক আগেই মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ‘‘বাবু মিয়া’’ সে পথে হাঁটেননি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের প্রতি তাঁর মতো এত মমত্ববোধ, ভালোবাসা খুব কম সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতার ছিল বলে আমি মনে করি। শুধুই কি তাই, পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কান্ডারী ছিলেন বাবু ভাই। তাই আজ বাবু ভাইকে বাদ দিয়ে যদি আওয়ামী লীগের ইতিহাস রচিত হয় , সেই ইতিহাস অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। বাবু ভাই অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে কেউ কোনোদিন খালি হাতে ফিরে আসেনি। যাকে যেভাবে পেরেছেন সাহায্য করেছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য মানুষের। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্প কারখানা ছাড়াও ব্যাংক-বীমায়ও অসংখ্য বেকার যুবককে তিনি চাকরি দিয়েছেন। চাকরি দিতে গিয়ে তিনি কখনো কে কোন দলের বা মতাদর্শের তা দেখেননি, সব দল ও মতের মানুষকে তিনি চাকরি দিয়েছেন। এখানেই তাঁর উদার মানসিকতার পরিচয় আমরা দেখতে পাই। বাবু ভাইয়ের আরেকটি বড় গুণ হলো তিনি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করতেন। একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। নিজের পকেট থেকে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালিয়েছেন। বড়ভাই বশিরুজ্জামান চৌধুরীর নামে নিজগ্রাম হাইলধরে এবং ছোটভাই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বশরুজ্জামান চৌধুরীর নামে বরুমছড়ায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে তিনি আনোয়ারা কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। আখতারুজ্জামান চৌধূরী বাবু আজ আমাদের মাঝে নেই। বড়ো অসময়ে তিনি চলে গেছেন তিনি। লেখক ব্যবসায়ী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা।

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা কোন পথে?

কাতালোনিয়া স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যা স্পেনের উত্তর-পূর্ব দিকে আইবেরিয়ান পেনিনসুলার কাছাকাছি অবস্থিত। কাতালোনিয়ানদের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা। অঞ্চলটি বহুকাল ধরে পৃথিবীর বুকে সমৃদ্ধ ও আধুনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। ১৯৩৬-১৯৩৯ পর্যন্ত স্পেনে যখন গৃহযুদ্ধ চলছিল তখনও কাতালোনিয়ান অঞ্চলটি পূর্ন স্বাধীনতা ভোগ করে। তাই বলা যেতে পারে যে, কাতালোনিয়ানদের ধমনীতে স্বাধীনতার রক্তপ্রবাহ বহুকাল ধরেই চলে আসছে, যা এখনো হচ্ছে। গৃহযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের আগ পর্যন্ত স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রান্সিস ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনের সময় কাতালোনিয়ার স্বায়ত্তশাসন কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর কাতালোনিয়ার জাতীয়তাবাদী জনগণের তীব্র আন্দোলনের ফলে তাদেরকে আবার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার। মাঝেমধ্যেই কাতালোনিয়ানরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন এবং স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। একপর্যায়ে কাতালোনিয়ানরা তাদের নিজেদেরকে একটি স্বাধীন স্বত্তা হিসেবে দেখতে চাইল। স্পেনের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করল। কাতালান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি মূলত ৪টি  (বার্সেলোনা, জিরনা, লেইদা এবং তারাগোনা) প্রদেশ নিয়ে গঠিত। এই প্রদেশগুলোর মধ্যে বার্সেলোনার পরিচিতি ফুটবলের স্বর্গরাজ্য ও পর্যটন নগরী হিসেবে। কাতালোনিয়ানদের দীর্ঘ দিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গত ১ অক্টোবর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র বাধা সত্ত্বেও কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষ দমে যায়নি বরং তারা তীব্র প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার জন্য গণভোট অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে কেন্দ্রে উপস্থিত ভোটারদের মধ্যে ৯০% ভোট পড়ে।  যদিও স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার কাতালোনিয়ানদের এই গণভোটকে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা দিয়েছে। স্পেনের সংবিধানের ১৫৫ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে বিদ্রোহী অঞ্চলের কর্তৃত্ব নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের আছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবে স্পেনের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কাতালোনিয়ার আঞ্চলিক সরকার ভেঙ্গে দিয়েছেন এবং আঞ্চলিক সরকারের প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজদেমনসহ অন্যদের বহিস্কারও করেছে। সেই সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ২১ ডিসেম্বর কাতালোনিয়ায় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী মাঝখানের এই সময়ে কাতালোনিয়ার শাসনভার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয় এর নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকবে বলে ঘোষণা করেন। এখন প্রশ্ন হলো, কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন তাহলে কোন দিকে যাচ্ছে ? কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নে অটল থাকলেও সত্যিই কি তারা বিশ্বের বুকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? আন্তর্জাতিক রাজনীতিক পর‌্যবেক্ষকদের বেশিরভাগই মনে করছেন, কাতালোনিয়ানদের স্বাধীনতা বাস্তবে রূপ নাও নিতে পারে। এর একটি কারণ হলো কাতালোনিয়ার প্রেসিডেন্ট গত ২৭ অক্টোবর স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের পরাশক্তিধর দেশগুলোর একটিও তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেনি। কোনো দেশ এই স্বাধীনতাকে স্বীকৃতিও দেয়নি। এছাড়া পরাশক্তিধর দেশগুলোসহ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর অধিকাংশ দেশই কাতালোনিয়ার এই স্বাধীনতা আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আন্দোলন হিসেবে মনে করছে। সবশেষে বলা যেতে পারে, কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন কোথায় গিয়ে গড়ায় তা দেখতে এই গ্রহের বাসিন্দাদের আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে অবস্থাদৃষ্টে এ কথা বলা যেতে পারে যে, কাতালোনিয়ানদের স্বাধীনতা আন্দোলনের বাস্তবতা সুদূর পরাহত-ই মনে হচ্ছে। লেখক সহকারী সচিব বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন E-mail: [email protected]  //এআর //

সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা প্রসঙ্গে

বাংলাদেশের রাজনীতির যে গতি-প্রকৃতি, তাতে দৈব-দুর্বিপাক ছাড়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। আমার সামান্য যেটুকু জ্ঞান, তাতে এটা আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি। প্রার্থী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অন্তত যা বিবেচনায় আনে, এনেছে, আনবে এবং আনা উচিত- ১. ধনী ২. কম বয়সী ৩. কর্মঠ ৪. মাঠে সক্রিয় ৫. জনপ্রিয় ৬. কেন্দ্রে সক্রিয় সন্দ্বীপে দুইবার সংসদ সদস্য ছিলেন প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান। দ্বীপবন্ধু হিসেবে যিনি এখনও দ্বীপের মানুষের কাছে পরিচিত। কিংবদন্তিতুল্য মানুষটির প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে মূল্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে সন্দ্বীপে নৌকার দায়িত্ব দিয়েছে তার সন্তান মাহফুজুর রহমান মিতাকে। এর আগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এ আসন থেকে নৌকার প্রার্থী। সেবার জিতেছিল বিএনপি। দ্বিতীয় হয়েছিলেন মিতা। তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মিতা ২০০৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যদিও পরে আর সে নির্বাচন হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আর, সন্দ্বীপে দলের দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মিতা। বিএনপিবিহীন এ নির্বাচন নিয়ে নানান কথা আছে। এরপরও, সরকার গঠিত হয়েছে। সংসদ বসেছে। তাতে, আইন তৈরি হচ্ছে। যারা ওই নির্বাচনকে মানছেন না, তারাও কিন্তু সেই সংসদে বানানো আইনগুলো মেনে চলেছেন। সেই সংসদে মাহফুজুর রহমান মিতাও এমপি। কিছুই থেমে নেই। একদম আনাড়ি মানুষও দায়িত্ব পেলে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারেন। মেধা থাকলে, সামান্য ক্ষমতায় অনেকে অনেক কঠিন কাজও শেষ করতে পারেন। এমপি হবার পর- মুস্তাফিজের রক্ত যার ধমনিতে- তিনি নিজেকে মেলে ধরবেন না এটাই সবার কাম্য। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে বাবা মুস্তাফিজুর রহমানের সাথে সুসম্পর্কের সুবাদে ছেলে মাহফুজুর রহমান অতি স্নেহভাজন হয়ে আছেন। মিতা ঢাকায় থাকেন। বড় ব্যবসায়ী। আয় রোজগার বেশ ভালো। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে ওঠাবসা তার। এখন রাজনীতি করতে কানেকশন লাগে, কানেকশন। সাথে টাকাও। এলাকায় মিতার ভালো ভোট ব্যাংক আছে বাবার কারণে। আর এখন নিজেরও কিছু অনুসারী তৈরি করতে পেরেছেন। দলে যারা উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান আর পৌর চেয়ারম্যান জাফর উল্লাহ টিটুর বিরোধী তারা সরল অংকে মিতার অনুসারী। এমন নানা যোগ বিয়োগে মিতার পাল্লা বেশ ভারী। মনোনয়ন দৌঁড়ে বিশ্বাস করুন মিতার কাছাকাছি আপাতত কেউ নেই। যাদের মনে করা হচ্ছে, তারা রাজনীতির এখনকার কৌশলের কাছে অসহায়। দক্ষতা বলুন আর এই কৌশল, আপাতত মাহফুজুর রহমান মিতা ছাড়া আমার পর্যবেক্ষণ আর বিচারেও কেউ নেই। কিন্তু, এরপরও বলি সন্দ্বীপে এখন আর আওয়ামী লীগ নেই। আছে মিতা লীগ, নইলে শাহজাহান লীগ বা টিটু লীগ। এমনিতে সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগ-বিরোধী পক্ষ খুব শক্তিশালী, খুব। আওয়ামী লীগে নিবেদিত প্রাণ কিছু মানুষ আছে বলেই দল আছে। সাংগঠনিক কাঠামোটা এখনো আছে। এর সাথে ব্যক্তির ভাবমূর্তি যোগ হয়েছে। তো, এই শক্ত সংগঠনের এখন কিন্তু খুব বাজে অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে দলে প্রভাবশালী, উপজেলা চেয়ারম্যান আর পৌর মেয়র ৬ মাস ধরে কোনঠাসা। তাদের অনুসারীরা বেকায়দায়। পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ছাত্রলীগে, যুবলীগে এখন মিতার রমরমা অবস্থা। এই রমরমা ভাব সাংগঠনিকভাবে উত্থিত নয়। নেতা-কর্মীদের প্রায় সবাই ব্যক্তি অনুসারী হয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের গৃহদাহ কোনোভাবেই আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী মনোনয়নে প্রভাব ফেলবার মতো হয়নি এখনো। কিন্তু, হয়ে যেতেও পারে। এটি আশাবাদ নয় যদিও, বিচিত্র কিছুও নয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হলে, সন্দ্বীপে যে কেউ জিতবে। বিএনপি নির্বাচনে এলেও আওয়ামী লীগ যদি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মতো করে, দিনের ১১টার মধ্যে সব ভোট নেয়া শেষ করে ফেলে, তাহলে সবাই নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন। যদি সেভাবে না হয়? মিতা আবারো দলের মনোনয়ন পাবেন, এটা বুঝতে গবেষক হতে হবে না। এজন্য, প্রচারস্বর্বস্ব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সত্যায়নেরও দরকার নেই। নির্বাচন কাছাকাছি এলে এমন ফরমায়েশি কাজ আরো সামনে আসবে। সেদিকে, নজর না দিয়ে, সময় নষ্ট না করে বরং নিজেদের মালিন্য দূর করার উদ্যোগ নেয়া দরকার। আপনাদের আওয়ামী লীগার হওয়া দরকার। এখন কি হয়ে আছেন, বোঝেন? সোহেল মাহমুদ, আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক

উপজেলা আদালত জেলা সদরে থাকায় বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ চরমে

উপজেলা পদ্ধতি পুন:প্রবর্তন করা হলেও উপজেলা আদালত জেলা সদরে থাকায় জনস্বার্থ দারুণভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। জনগণের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলা সদরে নির্মিত আদালত ভবনগুলো পরিত্যক্ত রেখে কার স্বার্থে উপজেলা আদালত জেলা সদরে বহাল রাখা হল তা বোধগম্য নয়। উপজেলা আদালত জেলা সদরে অবস্থানের কারণে মামলা-মোকাদ্দমার সাথে সংশ্লিষ্টদের বিশেষ করে মফস্বলের বিচার প্রার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার। নানামুখি হয়রানি, সময় ও অর্থের অপচয় তো হচ্ছেই, পাশাপাশি সুবিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে হরহামেশাই। আইনজীবী, বিচারক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ উপজেলা কোর্ট উপজেলা সদরে রাখার পক্ষপাতি। কেউ কেউ উপজেলা আদালত জেলা সদরে রাখার যুক্তি দেখালেও সার্বিক বিবেচনায় বিচার কার্যক্রম জনগণের দোরগোড়ায় থাকা-ই যুক্তিযুক্ত। উপজেলা আদালত পুনরায় উপজেলার আগের ভবনে চালু করতে নতুন করে কোনো কিছু আয়োজনের প্রয়োজন নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক উপজেলা সদরে বিচার বিভাগ (আদালত) পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নিতে পারে অনায়াসে। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন। ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এরশাদ জনকল্যাণমূলক যে’কটি কাজ করেছিলেন, তার মধ্যে উপজেলা পদ্ধতি অন্যতম। অবশ্য প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় আনার স্বপ্ন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বিগত ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়ে এরশাদের উপজেলা পদ্ধতি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে। অবশেষে ১৯৯৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করা হয়। উপজেলা কোর্ট নিয়ে যাওয়া হয় জেলা কোর্ট ভবনে। এ ঘটনা সেদিন জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এরশাদ স্বৈরাচার হলেও তার পদক্ষেপ তো (উপজেলা পদ্ধতি) গণমুখিই ছিল। বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে সেদিন বিএনপি সরকার এরশাদ প্রবর্তিত উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করেছিল। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিএনপি সরকার কর্তৃক বিলুপ্ত উপজেলা পদ্ধতি পুনরায় চালু করে। উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ এর প্রথম তফসিলের তৃতীয় কলামে থানাকে উপজেলা করা হয়েছে। থানা শব্দের পরিবর্তে উপজেলা শব্দ ব্যবহারের আদেশ জারি করা হয়। উপজেলা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে আংশিক; পুরোপুরি নয়। উপজেলা পদ্ধতির অন্যতম দিক, যা জনগণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেই বিচার ব্যবস্থা জেলা সদরে বহাল রাখা হয়েছে। উপজেলা সদরে এখন আদালতের কার্যক্রম চালু করা সময়ের দাবী। উপজেলা পর্যায়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হলে এখানে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে। আগের সেই আদালভবনগুলো আবার মুখরিত হয়ে ওঠতো জন উপস্থিতিতে। উপজেলা সদরে কোর্টের কার্যক্রম শুরু হলে জনগণ তাদের হাতের কাছেই একজন ম্যাজিস্ট্রেট পেতো। উপজেলা ক্যাম্পাসে ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য নির্ধারিত বাসা আছেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা সদরে ম্যাজিস্ট্রেটের প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যক। জেলা সদর থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আসতে যে সময় লাগে ততক্ষণে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি ওলটপালট হয়ে যায়। ইউএনও’র কাছে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকলেও তিনি জনগণের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচিত নন। বর্তমানে ১৬৪ ধারায় আসামীর স্বীকারোক্তি ও ভিকটিমের ডায়িং ডিক্লেরেশনের কাজ সারতে লোকজনকে জেলা কোর্টে ধর্ণা দিতে হয়। পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্রের (পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি,ডিগ্রি ও মাদ্রাসা পরীক্ষা) উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু উপজেলা সদরে ম্যাজিস্ট্রেট থাকলে এ সংকট হতো না। ১৯৮২ সালে দেশে ৪৬০টি উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করা হয়। ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট জেলা সদরে স্থানান্তর করে এবং পরবর্তী সময়ে জেলা সদরে স্থানান্তরিত ‘উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত’ নামটি রহিত করা হয়। তবে বর্তমানে উপকূলীয় ১৫টি উপজেলায় উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে-কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া (কক্সবাজার), লামা (বান্দরবান), সন্দ্বীপ, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম), হাতিয়া (নোয়াখালী), মনপুরা (ভোলা), কলাপাড়া (পটুয়াখালী), পাইকগাছা, কয়রা (খুলনা), আমতলী, পাথরঘাটা (বরগুনা) জকিগঞ্জ (সিলেট) ও দুর্গাপুর (নেত্রকোনা)। এদিকে উপজেলা কোর্ট জেলা সদরে স্থানান্তরিত হওয়ায় বিচারপ্রার্থী জনগণের দুর্ভোগ ও হয়রানির শেষ নেই। আদালত প্রাঙ্গণে লোকজনের ভিড় এতোবশি যে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। বিচারক, আইনজীবী, বাদী-বিবাদী, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের উপচেপড়া ভিড়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনায় সুষ্ঠু ও নিরিবিলি পরিবেশ বজায় থাকে না। ৩০-৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দেশের অনেক উপজেলার লোকজনকে বিচারের আশায় জেলা সদরে আসতে হয়। কোনো কারণে মামলা ধরা না হলে মামলার সাথে সংশ্লিষ্টদের আবার ফিরে আসতে হয় নতুবা জেলা সদরের হোটেলের বাসিন্দা হতে হয়। আর্থিক ক্ষতি, মানসিক যন্ত্রণাসহ নানামুখি ঝামেলায় দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। বাদী-বিবাদীদের উপজেলা আদালতে যে মামলা নিষ্পত্তি করতে দেড়-দু’হাজার টাকা লাগতো, বর্তমানে জেলা কোর্টে খরচ হয় ১০ হাজার টাকার ওপরে। তবে জেলা সদরের কোর্টে গিয়ে গ্রামীণ মানুষ যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয় তার সমাধান একটাই তাহলো, উপজেলা কোর্ট উপজেলা সদরে স্থানান্তরিত করা। এতে করে সব ল্যাঠা চুকে যায়। উপজেলা কোর্ট উপজেলা সদরে স্থানান্তরে আইনগত কোনো বাধা নেই; প্রয়োজন শুধু সরকারি বিশেষ ঘোষণার। উপজেলা কোর্ট উপজেলা সদরে স্থানান্তরের পাশাপাশি ঢাকার বাইরে বিশেষ করে বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি। দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে মামলা-মোকাদ্দমাও বেড়েছে কয়েকগুণ। বেড়েছে মামলার প্রকারভেদও। যেমন- পারিবারিক আদালত, দেউলিয়া আদালত, নারী ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধ আদালত, জননিরাপত্তা আইন আদালত, শ্রম আদালত ইত্যাদি। হাজার হাজার মামলা জেলা সদরের আদালতে স্তূপিকৃত রয়েছে। লাখ লাখ মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন আছে। আমাদের দেশে যাতায়াত ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয়। রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়সহ দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা থেকে ঢাকা হাইকোর্টে গিয়ে মামলা পরিচালনা করা সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ এবং সাধারণ মানুষের সাধ্যাতীত। এসব বিষয় বিবেচনা করে দেশের শাসনতন্ত্রে ঢাকা ছাড়া অন্যান্য উপযুক্তস্থানে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার বিধান আছে। সেই লক্ষ্যে হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছিল। উপজেলা পর্যায়ে মামলাগুলো সহজে নিষ্পত্তি করতে উপজেলা সদরে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের গোড়াপত্তন হয়েছিল। ন্যুনতস সময়ে ও কম খরচে উপজেলা কোর্টে বিচারকার্য সুসম্পন্ন হতো। হাইকোর্টের বেঞ্চ চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল. রংপুর ও যশোর- এ ছয়টি স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কোর্ট বসার বিল্ডিং করা হয়, জজদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। একটি রিভিশন মামলা তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয়ে হাইকোর্টে দায়ের করে তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে মামলা নিস্পত্তি হতো। একই মামলা একই জজ এর কাছে হাইকোর্টে করতে গেলে কমপক্ষে ৪০-৫০ হাজার টাকা লাগে। ৫-৭দিন ঢাকায় অবস্থান করতে হয় মামলার বাদী-বিবাদীদের। ৫-৭ বছরেও মামলার নিস্পত্তি হয় না। এ পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা কেন্দ্রিক কোর্ট কাছারি স্থাপন এবং রাজধানীর বাইরে অন্তত বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে জনসাধারণকে অযথা হয়রানি, সময় ও আর্থিক অপচয় থেকে রক্ষা করা সম্ভব। বিচার ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত ও দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্যে উপজেলা কোর্ট উপজেলা সদরে স্থানান্তর করা জরুরি প্রয়োজন। জনস্বার্থকে পাশ কাটিয়ে বিশেষমহলের সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়ে উপজেলা কোর্টকে জেলা কোর্টভবনে বহাল রাকা কারও কাম্য হতে পারে না। তাই বিচার ব্যবস্থাকে জনগণের দোগোড়ায় এনে বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি ও হয়রানি লাঘবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে- এটাই সবার প্রত্যাশা। লেখক- প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী  

মুক্তিযুদ্ধবন্ধু ফাদার রিগন

মুক্তিযোদ্ধা ফাদার মারিনো রিগন আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন সত্যিকারের প্রকৃত বন্ধু হারালো। একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পক্ষ থেকে ফাদার রিগনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইলো। রিগনের প্রিয় বন্ধু ও স্নেহভাজন বাংলাদেশের পুঁথি শিল্পী কাব্য কামরুল তাঁকে নিয়ে বেশ কিছুদিন আগে একটি লেখা প্রকাশ করেছিলেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সেই লেখাটি প্রকাশ করা হচ্ছে - ১৯৭১ সাল। চারদিকে যুদ্ধের দামামা। বাঙালি জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধ। প্রাণপণ যুদ্ধ করছে এদেশের আবাল-বৃদ্ধ, জনতা। এরকম নাজুক পরিস্থিতিতে দলে দলে বিদেশিরা চলে যাচ্ছে নিজ দেশে। বহির্বিশ্বে প্রচার পেল বাংলাদেশের ভয়াবহতা সম্পর্কে। কিন্তু কিছু বাংলাপ্রেমী মহান বন্ধু সেই দুঃসময় বাঙালির পাশে ছিলেন নিছক মানবতার মূলমন্ত্র নিয়ে। তাদের মধ্যে ফাদার মারিনো রিগন অন্যতম। যিনি ঝুঁকি জেনেও বাঙালির ন্যায্য সংগ্রামে নিজেকেও জড়িয়ে ফেলেন একজন দেশপ্রেমিক বাঙালির মতো। তিনি যুদ্ধকালীন সময়ে ছিলেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বানিয়ারচর ক্যাথলিক মিশনে। প্রধান পুরোহিত হিসেবে তখন দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহুসংখ্যক নিরীহ বাঙালি শহর থেকে গ্রামে আশ্রয় নিতে লাগল। বানিয়ারচর গ্রামেও আশ্রয় নিতে লাগল বিপদগ্রস্ত মানুষ। খ্রিষ্ট সমাজ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আপত্তি তুলল জোরেশোরে। অনেকেই বিশেষ করে হিন্দুদের আশ্রয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করতে লাগল। সাপ্তাহিক প্রার্থনা সভায় ফাদার রিগন দরাজ কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আশ্রয় প্রার্থীকে অবশ্যই আশ্রয় দিতে হবে। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যীশুখ্রিষ্টের মহান বাণী। তার কথা শুনে এলাকাবাসী উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের মত পাল্টালেন এবং ফাদারের সঙ্গে এককাতারে দাঁড়ালেন। ফাদার রিগন তার চিকিৎসা কেন্দ্রটিকে নতুন করে ঢেলে সাজালেন। কেন্দ্রের ডাক্তার ও নার্সদের নিয়ে যুদ্ধপীড়িত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কৌশল হিসেবে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে লাগলেন রাতের বেলায়। যুদ্ধপীড়িত মানুষের আশ্রয় ও খাবারেরও ব্যবস্থা করলেন তিনি। মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও তিনি নিবেদিত ছিলেন মানবসেবায়। মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় বৃহত্তম গেরিলা বাহিনী ছিল হেমায়েত বাহিনী। বাহিনীপ্রধান হেমায়েত উদ্দিন বীর বিক্রমকেও চিকিৎসা সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন ফাদার রিগন। হানাদারদের সঙ্গে এক সম্মুখযুদ্ধে হেমায়েত উদ্দিনের মুখম-লে গুলিবিদ্ধ হয়। তার মুখের বাম পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে ডান চোয়ালের ১১টি দাঁত পড়ে যায়। জিহ্বার একটা টুকরাও পড়ে যায়। দুঃসাহসিক এই যোদ্ধাকে ফাদার রিগন চিকিৎসা সেবা দিলেন সেই উত্তাল দিনে। এ প্রসঙ্গে হেমায়েত উদ্দিন বীর বিক্রম ফাদার রিগন সম্পর্কে বলেন, সেই দৃশ্য আজো আমার মনে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে গুরুতর আহত অবস্থায় ফাদার রিগনের কাছ থেকে যদি চিকিৎসাসেবা না পেতাম হয়ত আমি      বাঁচতে নাও পারতাম। আমি না বাঁচলে আমার ৫৫৫৮ জন মুক্তিবাহিনী সঠিক নেতৃত্বহীনতায় বিভ্রান্ত হতো। হেমায়েত বাহিনী একমাত্র বাহিনী যারা ভারতের মাটিতে না গিয়ে বাংলাদেশে থেকেই যুদ্ধ সংঘটিত করে। মুক্তিযুদ্ধে ফাদার রিগনের কথা কখনোই ভুলবার নয়। আমি মনে করি, ফাদার রিগনও একজন মুক্তিযোদ্ধা। ফাদার রিগন মুক্তিযুদ্ধকালীন নিয়মিতভাবে ডায়েরি লিখতেন। তার মুক্তিযুদ্ধকালীন তার ডায়েরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দলিল। তার ডায়েরিতে সাক্ষী হয়ে রয়েছে পাক হানাদারদের বর্বরতার কথা। তার ডায়েরি থেকে কিয়ৎ অংশ উদ্ধৃত করছি : ১৯৭১ সালের ১২ জুন সকাল ৮টায় ২৩ জন মিলেটারিবিশিষ্ট দুটি লঞ্চ জলিলপাড়ে ভিড়ল। তাদের সঙ্গে কয়েকজন বাঙালিও ছিল। সৈন্যরা সমস্ত বাজার আগুন দিয়ে পোড়াল । শুধু বাজার নয়, তারা গ্রামে ঢুকে কলিগ্রামের ৫০টি, জলিলপাড়ের ১৮টি এবং বনগ্রামের ২৬টি বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। বাজারে একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। কলিগ্রামের পাষাণের ছেলে রবিদাস কোনো মতে জীবন বাঁচাল। তারা কলিগ্রাম অক্সফোর্ড মিশনের স্যামুয়েল বিশ্বাসকেও আঘাত করল। বনগ্রামে মিলিটারিরা ৪ জনকে হত্যা করে। শিশির, তন্ময়, উপেন দাস, বাবু মালাকার, নারায়ণ বাড়ৈ এবং আরো অনেককেই আহত করল। বিকেলে তারা ধ্বংসযজ্ঞ শেষ করে ৬টি খাসি ও অনেক জিনিসপত্র নিয়ে গ্রাম ত্যাগ করল। এই বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞের পর আমি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেখতে গেলাম। কী করুণ সে আর্তনাদ! বাঁচার জন্য মানুষের কী আকুতি! ... ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফাদার রিগন তার ইতালীয় ভাষায় লিখিত ডায়েরি এবং ডায়েরির ইংরেজি অনুবাদ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন তার হাতে তোলা আলোকচিত্র জাদুঘরকে দান করেন। মুক্তিযুদ্ধবন্ধু ফাদার রিগনের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি একাধারে অনুবাদক, গবেষক, সমাজসেবক, শিক্ষা উদ্যোক্তা এবং সর্বোপরি অসাধারণ এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনিসের অদূরে ভিল্লাভেরলা গ্রামে। তিনি কর্মসূত্রে এদেশে আসেন ১৯৫৩ সালে। দেশের নানা জায়গা ঘুরে অবশেষে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন সুন্দরবন ঘেঁষা মংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে। ২০০৮ সালে সরকার তার অসাধারণ অবদানের জন্য প্রদান করে বাংলাদেশের সম্মানজনক নাগরিকত্ব। ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে প্রদান করা হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা। এছাড়াও দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। ফাদার রিগন একজন খ্রিষ্ট সন্ন্যাসী হলেও তার ধ্যান-জ্ঞান রবীন্দ্রনাথ ও লালনের মতো। তাই তিনি অকপটে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ তার মাথায় আর লালন থাকে তার অন্তরে। এই হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধবন্ধু ফাদার মারিনো রিগন। রবীন্দ্রনাথের মতো করেই তিনি বলেন, মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।   লেখক : ফাদার মারিনো রিগনের প্রিয় বন্ধু পুঁথি শিল্পী কাব্য কামরুল।

ফারুক মঈনউদ্দীনের জন্মদিনে শুভেচ্ছা

৮ অক্টোবর, ২০১৭ সাল। আজ আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ শ্রদ্ধেয় ফারুক মঈনউদ্দীনের ৫৯তম জন্মদিন।তাঁর এ শুভ দিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও পুষ্পাভিনন্দন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি সৃজনশীল এ গুণধর ব্যক্তিত্ব পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস রচনাসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় অর্থনীতি ও ব্যাংকিংবিষয়ক লেখালেখি এবং টিভি টকশো’তে মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দিয়ে জাতীয় জীবনে অবদান রেখে আসছেন। ফারুক মঈনউদ্দীন বর্তমানে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার উত্তর-ইদিলপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ অক্টোবর ফারুক মঈনউদ্দীনের জন্ম।তাঁর বাবা মলকুতুর রহমান ছিলেন থানা শিক্ষা অফিসার।মায়ের নাম বেগম কামালুল হায়া। সীতাকুণ্ডে এটি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম।বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবদীপ্ত মহান মুক্তিযুদ্ধে এ পরিবারের গর্বিত সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিনের (ফারুফ মঈনউদ্দীনের বড়ভাই)রয়েছে  অনন্য অবদান। আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরি ও ‘জয়বাংলা’শ্লোগান আবিস্কারের পেছনে রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে ধাপে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা সর্বজনবিদিত।বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে সভাপতি ও আ স ম আবদুর রবকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের যে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় সেখানে ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিন সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ৬দফাভিত্তিক সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১দফার সমর্থনে আয়োজিত প্রতিটি কর্মসূচিতে তিনি তৎপর ছিলেন। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির আহসান উল্লাহ হলের ২০৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন ইউসুফ সালাউদ্দিন।এই কক্ষটি ছিল আন্দোলনের সংগ্রামের সূতিকাগার ও সব কেন্দ্রীয় নেতাদের আড্ডাস্থল।তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, কাজী আরিফ আহমেদ, হাসানুল হক ইনু, শেখ শহিদুল ইসলামসহ তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের আড্ডা আবর্তিত হত ২০৪ নম্বর কক্ষকে ঘিরে। রাজনৈতিক সতীর্থদের প্রায় সবাই স্বাধীনতার পরবর্তীতের মন্ত্রী-এমপি হলেও জাতীয় রাজনীতিতে এতো অবদান রাখার পরও ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিন প্রতিদানে কখনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা আদায়ে সচেষ্ট হননি। দেশপ্রেম,নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ থেকে চুল পরিমাণও তিনি বিচ্যুত হননি। একইভাবে তাঁরই অনুজ ফারুক মঈনউদ্দিনও আত্মমর্যাদা, নীতি ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে কর্মস্থলে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি।সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাঁর মধ্যে নেই কোনো অহংবোধ ও ভণিতা শঠতা, চাটুকারিতা। একজন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও কর্মঠ ব্যাংক-কর্মকর্তা হিসেবে কর্মক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি রয়েছে। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেড-এ তাঁর ব্যাকিং-ক্যারিয়ার শুরু। ফারুক মঈনউদ্দীন একজন ব্যতিক্রমধর্মী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ।পরোপকার ও আন্তরিকতার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।তাঁর মতে, পরের জন্যে জীবন উৎসর্গ করার মতো সুখ আর নেই।স্বার্থপরতা জীবনের চরম উদ্দেশ্য নয়, এতে সুখ ও আনন্দ পাওয়া যায় না।প্রীতি, ভালোবাসা,সেবাব্রত ও কল্যাণসাধনের জন্যে মানুষের জন্ম।তাই প্রতিটি মানুষকে অপরের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করা উচিত।তাই সারা জীবন তিনি মানুষের সাধ্যমতো উপকার করার চেষ্টা করেছেন।মার্জিত রুচিবোধ, সুন্দর আচার-আচরণ ও সহজ-সরল-মধুর ব্যবহারের জন্যে সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধবসহ সর্বমহলে তিনি একজন পরিপূর্ণ ভদ্রলোক হিসেবে সমাদৃত। শিক্ষার প্রতি রয়েছে তাঁর প্রচণ্ড দুর্বলতা।শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনা- বহুমুখি দিক থেকে যদি শিক্ষা অর্জন করা না যায় তবে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হয় না।এর জন্যে মনের দরজাগুলো খুলে দিয়ে অসীম বিশ্বের দিকে থাকাতে হয়। আর এ থেকে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, সেই জ্ঞানে জীবনের অন্ধকার দূরকরে আলোর সন্ধান পাওয়া যায়।তিনি আরও মনে করেন, শিল্প-সাহিত্য আর সংস্কৃতিচর্চা ছাড়া জীবন কখনো অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে না।ফারুক মঈনউদ্দীন প্রকৃতির বুক থেকে রূপ, রস ও গন্ধ আহরণ করে ভাষার ছন্দ-মাধুরী মিশিয়ে আঁকতে পারেন গল্প ও কাব্যের আলপনা।কাব্যরসে সবাইকে তিনি মুগ্ধ ও সঞ্জীবিত করতে পারেন। তিনি শুধু দেশভ্রমণ করেন না; ভ্রমণশেষে অর্জিত অভিজ্ঞতা লেখালেখির মাধ্যমে অন্যের মাঝে বিলিও করেন। রচনা করেন ভ্রমণবিষয়ক পাঠকপ্রিয় গল্পগ্রন্থ।বিশ্বভ্রমণে তাঁর উদগ্র বাসনা থাকলেও নিজ মাতৃভূমির প্রতি রয়েছে তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।তিনি একজন সুশিক্ষিত, সজ্জন ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত মানুষ।দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ও সচেষ্ট।সকলপ্রকার লোভ ও স্বার্থান্বেষী মনোভাবের বিপরিতে তাঁর সুদৃঢ় অবস্থান। ব্যাংকিংপেশায় যোগদানের আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে তাঁর পেশা ছিল সাংবাদিকতা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ালেখার সময় কবিতা রচনার পাশাপাশি সত্তরের দশকের শেষদিকে  ছোটগল্প দিয়েই তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় ১৯৭৮ সালে।১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ। এ যাবৎ প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ তিনটিসহ তাঁর মোট গ্রন্থের সংখ্যা ১৭টি। লেখক- প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি