ঢাকা, সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭ ৮:১৩:১৬

ফারুক মঈনউদ্দীনের জন্মদিনে শুভেচ্ছা

ফারুক মঈনউদ্দীনের জন্মদিনে শুভেচ্ছা

৮ অক্টোবর, ২০১৭ সাল। আজ আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ শ্রদ্ধেয় ফারুক মঈনউদ্দীনের ৫৯তম জন্মদিন।তাঁর এ শুভ দিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও পুষ্পাভিনন্দন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি সৃজনশীল এ গুণধর ব্যক্তিত্ব পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস রচনাসহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় অর্থনীতি ও ব্যাংকিংবিষয়ক লেখালেখি এবং টিভি টকশো’তে মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দিয়ে জাতীয় জীবনে অবদান রেখে আসছেন। ফারুক মঈনউদ্দীন বর্তমানে ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার উত্তর-ইদিলপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ অক্টোবর ফারুক মঈনউদ্দীনের জন্ম।তাঁর বাবা মলকুতুর রহমান ছিলেন থানা শিক্ষা অফিসার।মায়ের নাম বেগম কামালুল হায়া। সীতাকুণ্ডে এটি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম।বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবদীপ্ত মহান মুক্তিযুদ্ধে এ পরিবারের গর্বিত সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিনের (ফারুফ মঈনউদ্দীনের বড়ভাই)রয়েছে  অনন্য অবদান। আমাদের জাতীয় পতাকা তৈরি ও ‘জয়বাংলা’শ্লোগান আবিস্কারের পেছনে রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে ধাপে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা সর্বজনবিদিত।বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে সভাপতি ও আ স ম আবদুর রবকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের যে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় সেখানে ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিন সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ৬দফাভিত্তিক সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১দফার সমর্থনে আয়োজিত প্রতিটি কর্মসূচিতে তিনি তৎপর ছিলেন। বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির আহসান উল্লাহ হলের ২০৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন ইউসুফ সালাউদ্দিন।এই কক্ষটি ছিল আন্দোলনের সংগ্রামের সূতিকাগার ও সব কেন্দ্রীয় নেতাদের আড্ডাস্থল।তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, কাজী আরিফ আহমেদ, হাসানুল হক ইনু, শেখ শহিদুল ইসলামসহ তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের আড্ডা আবর্তিত হত ২০৪ নম্বর কক্ষকে ঘিরে। রাজনৈতিক সতীর্থদের প্রায় সবাই স্বাধীনতার পরবর্তীতের মন্ত্রী-এমপি হলেও জাতীয় রাজনীতিতে এতো অবদান রাখার পরও ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিন প্রতিদানে কখনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা আদায়ে সচেষ্ট হননি। দেশপ্রেম,নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ থেকে চুল পরিমাণও তিনি বিচ্যুত হননি। একইভাবে তাঁরই অনুজ ফারুক মঈনউদ্দিনও আত্মমর্যাদা, নীতি ও মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে কর্মস্থলে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি।সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাঁর মধ্যে নেই কোনো অহংবোধ ও ভণিতা শঠতা, চাটুকারিতা। একজন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও কর্মঠ ব্যাংক-কর্মকর্তা হিসেবে কর্মক্ষেত্রে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি রয়েছে। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেড-এ তাঁর ব্যাকিং-ক্যারিয়ার শুরু। ফারুক মঈনউদ্দীন একজন ব্যতিক্রমধর্মী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষ।পরোপকার ও আন্তরিকতার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।তাঁর মতে, পরের জন্যে জীবন উৎসর্গ করার মতো সুখ আর নেই।স্বার্থপরতা জীবনের চরম উদ্দেশ্য নয়, এতে সুখ ও আনন্দ পাওয়া যায় না।প্রীতি, ভালোবাসা,সেবাব্রত ও কল্যাণসাধনের জন্যে মানুষের জন্ম।তাই প্রতিটি মানুষকে অপরের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করা উচিত।তাই সারা জীবন তিনি মানুষের সাধ্যমতো উপকার করার চেষ্টা করেছেন।মার্জিত রুচিবোধ, সুন্দর আচার-আচরণ ও সহজ-সরল-মধুর ব্যবহারের জন্যে সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধবসহ সর্বমহলে তিনি একজন পরিপূর্ণ ভদ্রলোক হিসেবে সমাদৃত। শিক্ষার প্রতি রয়েছে তাঁর প্রচণ্ড দুর্বলতা।শিক্ষা নিয়ে তাঁর ভাবনা- বহুমুখি দিক থেকে যদি শিক্ষা অর্জন করা না যায় তবে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হয় না।এর জন্যে মনের দরজাগুলো খুলে দিয়ে অসীম বিশ্বের দিকে থাকাতে হয়। আর এ থেকে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, সেই জ্ঞানে জীবনের অন্ধকার দূরকরে আলোর সন্ধান পাওয়া যায়।তিনি আরও মনে করেন, শিল্প-সাহিত্য আর সংস্কৃতিচর্চা ছাড়া জীবন কখনো অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে না।ফারুক মঈনউদ্দীন প্রকৃতির বুক থেকে রূপ, রস ও গন্ধ আহরণ করে ভাষার ছন্দ-মাধুরী মিশিয়ে আঁকতে পারেন গল্প ও কাব্যের আলপনা।কাব্যরসে সবাইকে তিনি মুগ্ধ ও সঞ্জীবিত করতে পারেন। তিনি শুধু দেশভ্রমণ করেন না; ভ্রমণশেষে অর্জিত অভিজ্ঞতা লেখালেখির মাধ্যমে অন্যের মাঝে বিলিও করেন। রচনা করেন ভ্রমণবিষয়ক পাঠকপ্রিয় গল্পগ্রন্থ।বিশ্বভ্রমণে তাঁর উদগ্র বাসনা থাকলেও নিজ মাতৃভূমির প্রতি রয়েছে তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।তিনি একজন সুশিক্ষিত, সজ্জন ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত মানুষ।দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ও সচেষ্ট।সকলপ্রকার লোভ ও স্বার্থান্বেষী মনোভাবের বিপরিতে তাঁর সুদৃঢ় অবস্থান। ব্যাংকিংপেশায় যোগদানের আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্যে তাঁর পেশা ছিল সাংবাদিকতা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ালেখার সময় কবিতা রচনার পাশাপাশি সত্তরের দশকের শেষদিকে  ছোটগল্প দিয়েই তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত। তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলায় ১৯৭৮ সালে।১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ। এ যাবৎ প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ তিনটিসহ তাঁর মোট গ্রন্থের সংখ্যা ১৭টি। লেখক- প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী
‘গ্লাস্কো’র মতো আন্তর্জাতিক মানের ওষুধশিল্প গড়তে চাই’

মো. রাইসূল উদ্দিন সৈকত। বন্দরশহর চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডের কৃতীসন্তান। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ২১ জানুয়ারি স্বনামধন্য পরিবারে জন্ম। নতুন প্রজেন্মের প্রতিনিধি তিনি। বয়সে নবীন হলেও অভিজ্ঞতায় প্রবীণ। দেশের যেসব মেধাবী ও তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা উদ্যম, সাহস ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রেখে আসছেন, সৈকত তাদেরই একজন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ও তথ্য-প্রযুক্তির ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় ও স্বপ্নপূরণের লড়াই চলছে তিনি তার সক্রিয় অংশীদার। সম্ভাবনাময় এ তরুণ শিল্পোদ্যাক্তা একটি উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ, রূপান্তরিত উৎপাদন ব্যবস্থা, নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি- সব মিলিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখতে চান। বাবার অর্পিত ব্যবসায়িক দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার মাধ্যমে পারিবারিক  সুনাম ও ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। দিনে দিনে তাঁর ব্যবসায়িক সুনাম ও সমৃদ্ধি বেড়েই চলেছে। চট্টগ্রামের প্রায় সকল রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে উদীয়মান তরুণ এ শিল্পপতির রয়েছে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসে বাবার ব্যবসায়ের হাল ধরেন তিনি। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও জনহিতকর কাজেও তিনি নিয়োজিত। সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে দুটি ওষুধ ফ্যাক্টরি রয়েছে। একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ‘গ্লাক্সো স্মীথক্লাইন’ আর অন্যটি হলো এলবিয়ন গ্রুপের ‘এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড’। সৈকতের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। তিনি তার নতুন নির্মাণাধীন এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেডকে গ্লাস্কোর মতো আন্তর্জাতিক মানের বৃহদায়তনের ওষুধশিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। তিনি মনে করেন, যেকোনো ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন পরিশ্রম, সাধনা, অধ্যবসায়। এছাড়াও প্রয়োজন সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেও বহু বাধা বিপত্তি ও অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করতে হয়। একাগ্রতা, ধৈর্য ও সাহসের সাথে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে পূরণ করতে হয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। সহজপথে পৃথিবীতে কোনোকিছুই অর্জন করা যায় না। এলবিয়ন গ্রুপকেও বর্তমান পর্যায়ে আনতে আমাদের বিশেষ করে তারা বাবাকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল এর ভূতপূর্ব সভাপতি, এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত এর সাথে সম্প্রতি তাঁর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে অনেকক্ষণ আলাপ হয়। এলবিয়ন গ্রুপের গোড়াপত্তনের ইতিহাস, ওষুধশিল্পের সমুজ্জ্বল সম্বাবনা ‍ও সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড শিল্পপল্লীতে নির্মাণাধীন ওষুধশিল্প এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেড নিয়ে আলোচনা হয়। আলাপ-আলোচনায় যা ওঠে এসেছে তা হল-  ১৯৯১ সালে মাত্র ১০০ কর্মী ও ৩০ আইটেমের ওষুধ নিয়ে চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ভাড়া করা ভবনে ক্ষুদ্রপরিসরে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের যাত্রা শুরু। বাবা আলহাজ্ব নেজাম উদ্দীনের কঠোর সাধনা ও পরিশ্রমের ফসল এ ওষুধ কারখানা। ৮ শতাধিক লোক এখানে কর্মরত। শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের দক্ষিণ-রহমতনগর এলাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কারখানাটির অবস্থান। ফুলে-ফলে পল্লবিত হয়ে কালক্রমে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ এখন এলবিয়ন গ্রুপ। বর্তমানে ৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে এ গ্রুপের। বেশিরভাগ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠান। পশুখাদ্য উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের কারখানাও আছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এলবিয়ন রপ্তানি বাজারে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বর্তমান কারখানা থেকে অনতিদূরে নিজস্ব জায়গার উপর সম্পূর্ণ কমপ্লায়েন্স কারখানার নির্মাণকাজ জোরেশোরে চলছে। এলবিয়ন গ্রুপের ১২০কোটি টাকা বিনিয়োগের এ নতুন ইউনিট এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেড ২০১৯ সালের মধ্যে বিদেশে ওষুধ রপ্তানির লক্ষমাত্রা নিয়ে এগুচ্ছে। ১২ ’একর জায়গার উপর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গড়ে তোলা শতভাগ রপ্তানিমুখি নির্মিতব্য এ কারখানায় ৩ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। একই সীমানার মধ্যে এখানে ৫টি কমপ্লেক্স হবে। প্রায় ৪৫০টি মানব স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ওষুধের আইটেম থাকবে। নতুন পণ্য হিসেবে ওয়ানটাইম ইনজেকশন সিরিঞ্জ, ড্রপ, ইনজেকটেবল আইটেম উৎপাদন করা হবে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মিয়ানমার ও আফ্রিকায় ওষুধ রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এখানে মানব স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ৩শটির অধিক আইটেম ওষুধ ও পশুস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট আরও ২শ আইটেম ওষুধ ও অন্যান্য পণ্য প্রস্তুত করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এলবিয়নের ৩২৫টি আইটেম ওষুধ তালিকাভুক্ত আছে। এরমধ্যে রয়েছে অ্যান্টাসিড, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। ওষুধের গুণগতমানের জন্যে আইএসও ২০০১ ও ২০০৮ সনদও অর্জন করেছে এলবিয়ন গ্রুপ। গত কয়েকবছর ধরে ১২-১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কোম্পানিটি। দেশে ওষুধশিল্পের অমিত সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার চিত্র তুলে ধরে এলবিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত বলেন, “ পাঁচ লাখেরও বেশি লোক ওষুধশিল্পের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এ শিল্পের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বলে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কাঁচামালের বিদেশ নির্ভরতা কমাতে পারলে উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে যায়। সরকার যদি ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা দূর করে এ খাতে সহজশর্তে ও কমসুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করে তাহলে ওষুধশিল্প দ্রুত বিকশিত হবে এবং কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সরকারি কোষাগার সমৃদ্ধ হতো। এছাড়া দেশ যদি শিল্পোন্নত না হয়, তাহলে বর্তমান সরকারের ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন রয়েছে তা বাস্তবায়ন হবে না। তাই তরুণ শিল্পোদ্যাক্তাদের জন্যে সরকারকে শিল্পবান্ধব প্রণোদনামূলক যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।” সৈকতের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকার। বেশ কয়েকবছর আগে থেকে ওষুধশিল্পে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পন্ন। স্কয়ার, এসিআই, রেনাটা, ইনসেপটা, এসকেএফসহ অনেক দেশি কোম্পানিই এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা মহাদেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের ১২০টি দেশে ৮২.১ মিলিয়ন ডলার বা ৬৫০কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হয়েছে। আগামীতে গার্মেন্টস এর পরে ওষুধ-ই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিপণ্য। সৈকত এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠনের সাথে জড়িত। তিনি কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উপদেষ্টা, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ(আইবিএফবি), চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক সমিতির জীবন-সদস্য এবং সীতাকুণ্ড সমিতি- চট্টগ্রাম এর পৃষ্টপোষক সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। ব্যক্তিগতজীবনে সৈকত দুই সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী তাসনিন মাহমুদ। ছেলে আহমেদ জায়ান অ্যারিশ ক্লাস ওয়ানে পড়ে আর মেয়ে ইয়ারিকা ইলমিয়াত এখনো খুবই ছোট্ট। তিনি শিল্পপতি ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত কাজে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপ, মায়ানমার,অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, জার্মানি, চেক রিপাবলিক, নিউজিল্যান্ড, তুর্কিস্তান, হংকং, ডুবাই, চীন, জাপান, আবুধাবিসহ বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেন।   লেখক- প্রধান সম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী    

পাটপণ্যের ব্যবহারে সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে

পাট ও পাটজাতপণ্য ব্যবহার নিশ্চিতকরণে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় তৎপর হয়ে ওঠেছে। সর্বক্ষেত্রে পরিবেশ বান্ধব পণ্য হিসেবে পাটের বহুমুখী ব্যবহার করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার কাছে পত্র লিখে সহায়তা কামনা করেছে। এদিকে সিনথেটিক পণ্য বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন ব্যাগে দেশের হাট-বাজার সয়লাব হয়ে আছে। দেদারছে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হলেও সেদিকে কারো নজর নেই, নেই এর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন তৎপরতাও। শুধু বস্ত্র ও পাটমন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে হাটবাজার ও শপিংমলকে সিনথেটিক পণ্যমুক্ত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অপরিহার্য। পাটজাত পণ্য ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে ডিসি-ইউএনও ও জনপ্রতিনিধিরা (এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি মেয়র-কাউন্সিলর, পৌর মেয়র-কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বার) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অবদান রাখতে পারে। পাটজাত পণ্যকে জনপ্রিয় করে তুলতে শিক্ষামন্ত্রণালয় সবচেয়ে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার ও গুরুত্ব সম্পর্কিত প্রবন্ধ স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করলে নতুন প্রজন্ম দেশীয় পণ্য বিশেষ করে পাটজাত পণ্য ব্যবহারে আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত হবে। “দেশীয় পণ্য, কিনে হও ধন্য”- এ শ্লোগানে সর্বস্তরের জনগণকে সামিল করতে সরকারকে সর্বাত্মকভাবে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে তথ্যমন্ত্রণালয় পাটজাত পণ্যকে জনগণের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে এর ফলাওভাবে প্রচারের জন্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে কাজে লাগাতে পারে। দেশের সর্বসাধারণ যদি পাটজাত পণ্য ব্যবহারে এগিয়ে আসে, সিনথেটিক পণ্যের জায়গা যদি পাটজাত পণ্য দখল করতে পারে তাহলে আদমজী জুট মিলসসহ বন্ধ সব পাটকল চালু করা যাবে। এতে করে প্রচুর লোকের কর্মসংস্থান হবে। পলিথিন ব্যাগ ফ্যাক্টরিগুলো বন্ধ করে দিয়ে সেখানকার শ্রমিক-কর্মচারিদের পাটকলে নিয়োগ ও পদায়নের ব্যবস্থা করা যাবে। পাটজাত পণ্যের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার যদি চাঙ্গা হয় তাহলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে স্বপ্ন রয়েছে তা সহজে পূরণ হতো। আমাদের দেশের অন্যতম কৃষিজাত অর্থকরী ফসল হচ্ছে পাট। তাই এটিকে ‘স্বর্ণসূত্র’ বলা হয়। স্বাধীনতার পর বিশ্বের উৎপন্ন পাটের আশি ভাগই বাংলাদেশ উৎপাদন করতো। পাট নিচু জমিতে খুব ভালো জন্মে। যে দেশের ভূমি নিচু, সে দেশে পাট বেশি জন্মে। বর্তমানে আমেরিকা ও মিশরেও কিছু কিছু পাট উৎপন্ন হচ্ছে। কিন্তু তার পরিমাণ অতি নগণ্য। বাংলাদেশের পাটের মতো উৎকৃষ্ট মানের পাট পৃথিবীর অন্য কোনো স্থানে জন্মে না। পাট শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাব্য সব উপাদান বিদ্যমান থাকলেও ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে কোনো পাটকল গড়ে ওঠে নি। ১৯৫১ সালে এক হাজার তাঁত নিয়ে নারায়ণগঞ্জের আদমজীনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম পাটকল। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, লোকসানের অজুহাতে ২০০২ সালে সরকার বিশ্বের এ বৃহত্তম আদমজী জুট মিলস্ বন্ধ করে দেয়। পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো বলেই একে ‘স্বর্ণসূত্র’ বা ‘সোনালী আঁশ’ বলা হতো। একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ অর্জিত হতো এ পাট থেকে। তবে নানাকারণে বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা কমে যাওয়া, ব্যাপক পরিমাণে কৃত্রিম তন্তুর আবির্ভাব ও পাটের মূল্য কমে যাওয়ায় চাষীরা পাট চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। দেশের পাটকলগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। এ অবস্থায় পাটের সনাতনী ব্যবহার ছেড়ে বহুমুখি পাটপণ্য উৎপাদন, ব্যবহার এবং বিপণনের ধারণা আসে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বন্ধ পাটকলগুলো চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি পাট সেক্টরকে লাভজনক করার জন্যে নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। শতোভাগ দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাট পণ্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ রক্ষার্থে সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে প্রাকৃতিক তন্তুজাত পণ্যের ব্যবহারে গুরুত্ব প্রদানের কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাট ও পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব। চারা গজানো থেকে আঁশ সংগ্রহ পর্যন্ত প্রায় ১২০ দিন জমিতে থাকে। এ ১২০ দিন বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত নিঃসরিত ১২ মেট্রিক টন কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ এবং ১১ মেট্রিক টন অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। পাটগাছের শেকড় থেকে শুরু করে প্রতিটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ। পাট পঁচে মাটিতে পরিণত হলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। প্রতি একর জমিতে ঝড়েপড়া পাটের পাতা থেকে প্রায় ২.৫ টন জৈবসার পাওয়া যায়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ প্রান্তিক চাষী এবং বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি), বাংলাদেশ জুটমিলস্ এসোসিয়েশন (বিজেএমএ), বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স এসোসিয়েশন (বিজেএসএ) এর প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার শ্রমিকের জীবিকা ও কর্মসংস্থান পাট উৎপাদন ও পাটশিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এ ছাড়াও বহুমুখি পাটপণ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার সাথে আরো প্রায় ৭০ হাজার লোক জড়িত রয়েছে। পাটখাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে বহুমুখি পাটজাত পণ্যের বিকল্প নেই। তাই দেশের পাটকলগুলো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণির উদ্যোক্তা বহুমুখি পাটপণ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রচলিত পাটপণ্যের পাশাপাশি বহুমুখি পাটপণ্য উৎপাদনে এবং বিদেশে তা রপ্তানি ও দেশের বাজারে বিপণনের জন্যে সরকারিভাবে বিজিএমসি বেসরকারিভাবে বিজিএমএ ও বিজিএসএ এর সদস্যভূক্ত কিছু মিল এবং এ মন্ত্রণালয়াধীন জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) এর উদ্যোক্তারা কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে যেসব বহুমুখি পাটপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পাটের তৈরি কাগজ, অফিস আইটেম বিশেষ করে বিজনেস কার্ড, ফাইলকভার, ম্যাগাজিন হোল্ডার, কার্ডহোল্ডার, পেপারহোল্ডার, বক্সফাইল, পেনহোল্ডার, টিস্যুবক্স কভার, ডেক্স কেলেন্ডার ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার ব্যাগ যেমন- সেমিনার ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, স্কুলব্যাগ, লেডিস পার্ট, ওয়াটারক্যারি ব্যাগ, মোবাইল ব্যাগ, পাসপোর্ট ব্যাগ, ভেনিটি ব্যাগ, শপিং ব্যাগ, গ্রোসারি ব্যাগ, সোল্ডার ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, সুটকেস, ব্রীফকেস, হ্যান্ড ব্যাগ, মানি ব্যাগ ইত্যাদি। পাটের সূতা, নার্সারী আইটেম- জুটটেপ, নার্সারী সীট ইত্যাদি, হোম টেক্সটাইল- বেডকভার, কুশনকভার, সোফাকভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোরম্যাট, শতরঞ্জি ইত্যাদি। পরিধেয় বস্ত্র, ব্লেজার, ফতোয়া, কটি, শাড়ি ইত্যাদি এবং বিভিন্নধরনের সোপিস। এসব পণ্যসামগ্রির বেশকিছু পণ্য বিদেশের বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু দেশীয় বাজারে এসব পণ্যের বাজার খুবই সীমিত। ফলে এ খাতে উদ্যোক্তারা কাঙ্খিত সুবিধে পাচ্ছেন না। চাহিদা অনুযায়ী নতুন পাটজাত পণ্য উদ্ভাবনে প্রতিনিয়ত নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি উদ্ভাবিত ও ফিল্ডট্রায়ালে সফলভাবে পরীক্ষিত জুট জিও- টেক্সটাইলস্ (জেজিটি) পণ্যটি সম্পন্ন পাট দ্বারা তৈরি এক ধরনের কাপড়। নদীরপাড় ভাঙ্গন, পাহাড়ের ভূমিধস রোধ ও মাটির ক্ষয়রোধে জুট জিও- টেক্সটাইলস্ ব্যবহার করা হয়। ইতোমধ্যে জুট জিও-টেক্সটাইলস্ এর মাধ্যমে ৫টি রাস্তা, ৩টি নদীরপাড় ভাঙ্গনরোধ এবং ২টি পাহাড়ধস রোধসহ মোট ১০টি ফিল্ডট্রায়াল সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকার হাতিরঝিল প্রকল্পেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। জুট জিও- টেক্সটাইলস্ এর ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন নদীরপাড় সংরক্ষণ ও পাহাড়ধস রোধসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জাতীয় স্বার্থে ব্যাপকভাবে জুটজিও-টেক্সটাইলস্ ব্যবহার করতে পারে। “দেশীয় পাটপণ্য, কিনে হও ধন্য”-এ শ্লোগানকে সামনে রেখে আমাদের মন্ত্রী- এমপি ও সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজেরা পাটজাত পণ্য ব্যবহার করেন এবং সভা-সমাবেশ ও বিভিন্ন ফোরামে বক্তৃতা-বিবৃতিতে দিয়ে পাটজাত পণ্য ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন তাহলে পাটপণ্য অবশ্যই দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠবে। জনগণ পাটপণ্যের ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মন্ত্রী-এমপিরা পাটপণ্য নিয়ে কতটুকু আন্তরিক ও সরব। নিজ মন্ত্রণালয় বহির্ভূত নানা বিষয়ে প্রতিদিন মন্ত্রীরা বহুকথা বলেন কিন্তু পাট ও পাটজাত পণ্য নিয়ে মন্ত্রীদের কখনো কথা বলতে শোনা যায় না। জাতীয় প্রচার মাধ্যম পাটপণ্য নিয়ে খুব একটা মাতামাতি করে না। বিশেষ করে আমার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এ ব্যপারে সবচেয়ে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারলেও অজ্ঞাতকারণে তা করছে না। জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয় নিয়ে জাতীয় সংসদে গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয় না। দেশের সব রাজনৈতিক দল পাটপণ্য নিয়ে প্রায় নীরব। সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোও পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখছে না। সরকারের সকল মন্ত্রণালয় পাটপণ্যের ব্যবহারে সমন্বিতভাবে কাজ না করলে এর সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।   লেখক: প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী।        

‘ফলাফল’ শব্দের ব্যবহার ও প্রাসঙ্গিক কিছুকথা

দেশের পাবলিক পরীক্ষাসহ যে কেনো পরীক্ষার সঙ্গে ‘ফলাফল’ শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তবে ‘ফলাফল’ শব্দের মর্মার্থ না বোঝে সকলেই এর যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবরের শিরোনামে বলা হয়,“পরীক্ষার ‘ফলাফলে’ প্রধানমন্ত্রীর সন্তোষ।”আসলে প্রধানমন্ত্রী যে ‘ফলে’ সন্তুষ্ট হয়েছেন, ‘ফলাফলে’ নয়- তা কেউ উপলব্ধি করছে না।  ভুলে হোক কিংবা অজ্ঞাতকারণে হোক বাংলা বহু শব্দ সঠিকভাবে ব্যবহার কিংবা প্রয়োগ করা হচ্ছে না। কথাবার্তায়, বক্তৃতা-বিবৃতি, পত্রপত্রিকায় ও বৈদ্যুতিক মাধ্যমে যেসব শব্দের হরহামেশাই অপপ্রয়োগ পরিলক্ষিত হয় তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি শব্দ হল ‘ফলাফল’। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল  যখন বের হয়, তখন ‘ফলাফল’ শব্দটির সর্বত্র ভুল ব্যবহার হয়। মন্ত্রী-এমপি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান থেকে শুরু করে বলতে গেলে কেউ এই শব্দটির সঠিকভাবে ব্যবহার করছেন না। দেশে বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞের অভাব নেই। তারপরও বহুল-ব্যবহৃত এই বাংলা ‘ফলাফল’ শব্দের ওপর ‘অত্যাচার’ চললেও এ নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করছেন না। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে আমরা বাংলা ভাষার জন্যে মায়াকান্না করি। কিন্তু শুদ্ধ করে আমরা বাংলা পড়তে, লিখতে ও উচ্চারণ করতে যত্নবান ও সতর্ক হই না।‘ফলাফল’ শব্দের সন্ধিবিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায়- ফল+অফল=ফলাফল। ইংরেজিতে পাশ-ফেল আর বাংলাতে কৃতকার্য়Ñঅকৃতকার্য। অর্থাৎ পাশ-ফেল মিলেই ‘ফলাফল’। একইভাবে ‘গুণাগুণ’ শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে হয়- গুণ+অগুণ=গুণাগুণ। ইংরেজিতে বলা হয় মেরিট-ডিমেরিট। লোকটির গুণাগুণ ভালো বললে যেমন ঠিক হয় না তেমনিভাবে অমুক স্কুল-কলেজ কিংবা শিক্ষাবোর্ড ভালো ফলাফল করেছে- এটা বলাও ঠিক হয় না। ভালো ফল করেছে বলা যায়। তবে ভালো ফেল করেছে-এ কথাতো বলাই যায় না। এক্ষেত্রে আমরা পরীক্ষার ফল বা রেজাল্ট শব্দটি ব্যবহার করতে পারি। বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় এর পরিবর্তে যদি স্কুল-ইউনিভার্সিটি শব্দ ব্যবহার করতে পারি তাহলে রেজাল্ট শব্দ ব্যবহার করতে অসুবিধা কোথায়?সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাবলিক পরীক্ষার ফল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পত্রিকায় প্রচার করে থাকে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের শিরোনামে পরীক্ষার “ফলাফল বিবরণী” লেখাটি দেখা যায়। তবে বিজ্ঞাপনে শুধু ফল কিংবা পাশের বিবরণী থাকে। তাই শুধু পাশের কথা উল্লেখ থাকায় “ফল বিবরণী” হওয়ার কথা। তবে পাশ-ফেল দুটোই থাকলে তখন “ফলাফল বিবরণী” হতে পারতো।অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের বেলায় পত্রিকাগুলো বানানের ভুলত্রুটি না দেখে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবিকল ছাপিয়ে দেয়। তাই পত্র-পত্রিকায় যে কোনো খবর কিংবা বিজ্ঞাপনের বানানে ভুল থাকা কোনো ভাবেই কাম্য নয়। শুধু পরীক্ষার বেলায় নয়, সবকাজেই ফলাফল থাকে। ভাল-মন্দ নিয়েই কাজ। কাজ করতে গেলেই সেখানে ভালো-খারাপের মুখোমুখি হতে হয় সবাইকে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে মানুষকে পরীক্ষা দিতে হয়। যেখানে পরীক্ষা সেখানেই ‘ফলাফল’ শব্দটি জড়িত। তাই কথা বলার সময় ‘ফলাফল’ শব্দটি মানুষ বেশি ব্যবহার করে। বহুল ব্যবহৃত এ ‘ফলাফল’ শব্দটির সঠিক ব্যবহার কোথাও হচ্ছে না। ‘ফলাফল’ শব্দটির যথাযথ ব্যবহার ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। বাংলা শব্দমালার সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলা একাডেমিও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু ‘ফলাফল’ নয় আরও যেসব শব্দের অপপ্রয়োগ হচ্ছে, সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে। শব্দমালার ব্যবহার ও প্রয়োগই শুধু নয়, সাধু-চলিত ভাষার সংমিশ্রণ, ণত্ব ও ষত্ব-বিধি অনুসরণ না করা, বিশেষ করে বানান ভুলের মাত্রা এতো ছাড়িয়ে গেছে যে, এসব ভুলভ্রান্তি দেখার যেন কেউ নেই। সাইনবোর্ড, ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট, ফেস্টুন ইত্যাদির ক্ষেত্রে বানান ভুলের বিষয়টি হরহামেশাই চোখে পড়ে। পত্রপত্রিকায়ও বানান ভুলের চিত্র দৃষ্টিগোচর হয়; যা কোনোক্রমেই কাম্য নয়। এখানেই শেষ নয়, দেশের সর্বোচ্চ সরকারি প্রশাসন-ভবন সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্ত-পরিদপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে ইস্যু করা চিঠিপত্রেও বানান ভুলের ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত হয়।তবে বাংলা একাডেমি ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলা বানানকে নিয়মিত, অভিন্ন ও প্রমিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে একটি নিয়ম দাঁড় করিয়েছিল। যার পরিমার্জিত ও সংশোধিত সংস্করণ ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ করা হয়। একাডেমির সেই ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বইয়ে বলা হয়েছে- ‘এখন থেকে বাংলা একাডেমি তার সকল কাজে, তার বই ও পত্রপত্রিকায় এই বানান ব্যবহার করবে।’ ভাষা ও সাহিত্যের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি সংশ্লিষ্ট সকলকে (লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বিশেষভাবে সংবাদপত্রগুলোকে, সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে) এই বানান ব্যবহারের সুপারিশ ও অনুরোধ করেছে। বানানের বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলা একাডেমি নিয়ম প্রবর্তন করলেও বাস্তবে তা তেমন একটা কার্যকর হচ্ছে না। বাংলা বানান ও বানানের নিয়ম সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা না থাকায় শুধু বানানের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি হচ্ছে তা নয়, শব্দ প্রয়োগ ও ব্যবহারেও তার বিরূপপ্রভাব পড়ছে। ‘ফলাফল’ শব্দের ব্যবহার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। তাই শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানবৃন্দ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর মিডিয়ার সামনে অমুক শিক্ষাবোর্ড কিংবা অমুক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাল ‘ফলাফল’ করেছে না বলে ভালো ‘ফল’ করেছে বললে সর্বসাধারণের ‘ফলাফল’ শব্দ ব্যবহারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। লেখক: প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী।              

অর্বাচীনে পরাভূত মানবতা

মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিল ৯ বছরের শফিউল আলম। মাঠে খেলা শেষে এসে দেখে তার বাবা-মা’র লাশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পাঁচ বছরের ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় বাড়ি থেকে। একদল লোক আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশ অভিমুখে আসছে দেখে সেও তাদের দলে যোগ দেয়। কিছুক্ষণ পর তার বাড়ি থেকে একটু চাল আনতে মন চায়। কিন্তু চাল বহনের ক্ষমতা না থাকায় এক রকম না খেয়েই ৯ দিন পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে চলে আসে। উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় একটি ঝুপড়িতে ছোট ভাইকে রেখে খাবারের সন্ধানে বের হয় শফিউল। ফিরে দেখে ভাইটিও নেই সেখানে। একমাত্র বড়বোন কোথায় জানে না। এই পৃথিবীতে বড় একা হয়ে গেল সে। গুলিবিদ্ধ হয়েও অনেকে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু পরে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে আগুনে পোড়ানো হয়। চোখের সামনে দা’য়ের কোপে কারো বৃদ্ধ মা’কে জবাই করা হয়। এর মাঝে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে পা হারানোদের কান্না। মানবতার এমন পরাজয়ে বাকরুদ্ধ রোহিঙ্গারা। আর নাফ নদীতে ভেসে আসা নারী ও শিশুদের লাশ দেখেও যদি সার্বিক বিষয়টাকে ‘স্থিতিশীলতা রক্ষায়’ মিয়ানমারের প্রচেষ্টা জানিয়ে নৃশংসতাকে সমর্থন দেয়া হয়? তবে তাকে অন্তত বিশ্ব রাজনীতি না বলে বিকৃতি রাজনীতির কাছে মানবতার পরাজয় ধরে নিতে হয়। আর মিয়ানমারকে সমর্থন দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সেই দেশটিকে অর্বাচীন বলাই বাঞ্ছনীয়। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভায়ও চীন মিয়ানমারকে সমর্থন দেয়। আজ আবারো মিয়ানমারের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে চীন। ফলে আপাতত দৃষ্টিতে রোহিঙ্গা সংকটের মোড়ল সমাধানের পথ আটকে যায়।  তবে ব্রিটেন এবং সুইডেনের অনুরোধে আগামীকাল বুধবার আবারো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। এতে সমব্যাথীদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও বড় বড় প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগে মিয়ানমারের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের যে কোন একটি যদি কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেয়, তাহলে সেটি আটকে যায়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকে তাই ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, চীন এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমার সরকারের গৃহীত সব ব্যবস্থাকে শতভাগ সমর্থন জানিয়ে চলেছে। আজ মঙ্গলবার চীন আবারও বলেছে, তারা ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ রক্ষায় মিয়ানমার সরকারের পাশে আছে। রাশিয়ার অবস্থানও মিয়ানমারের পক্ষে বলে মনে করা হলেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবে গনেশ উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের উপর কিছুটা হলেও চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার রাখাইনের নৃশংসতাকে  `টেক্সটবুক এথনিক ক্লিনজিং` অর্থাৎ জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের সংগে তুলনা করেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো মাথা গলাক, সেটা চীন চায় না। নিরাপত্তা পরিষদের আরেক স্থায়ী সদস্য অবশ্য রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙ্গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, সহিংসতার মুখে যেভাবে রোহিঙ্গারা তাদের বাড়ি-ঘর ছাড়া হয়েছে তাতে বোঝা যায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে বেসামরিক মানুষকে নিরাপত্তা দিচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিষদের অপর স্থায়ী সদস্য ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের অবস্থান এখনও পরিষ্কার নয়। তবে  অতীত ইতিহাস এবং পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংকট সমাধানে মানবতা নয়, বড় বাধা ‘মুসলিম’ শব্দটি। সিরিয়া এবং ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে বিশ্ব নেতাদের যতটা না আগ্রহী দেখা গেছে কার্যক্ষেত্রে সমস্যা টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা তারচেয়ে বেশি দেখা গেছে। সম্প্রতি তেহরান টাইমসে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মার্কিন কলামিস্ট স্টিফেন লেন্ডমেন তাই বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনি এবং অন্যান্য নিপীড়িত মানুষের জন্য জাতিসংঘের বর্তমান এবং সাবেক মহাসচিবরা কী করেছেন- অর্থহীন কথা-বার্তা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি।’ আর রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে তার মন্তব্য হচ্ছে, ‘একই ধরনের পরিস্থিতি যদি পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকদের ক্ষেত্রে হতো তাহলে আন্তর্জাতিক সব সংগঠন, প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যবস্থা নিতো।’ রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের ভূমিকাও মানবিক বলা যায় না। বরং মুসলমি শব্দটার কারণে তারা বিব্রতবোধ করছে। কথিত রোহিঙ্গা বিদ্রোহী দমন অভিযানের প্রশ্নে সম্প্রতি আকস্মিক সফরে মিয়ানমারে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অং সান সু চির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। মোদির সফরের পর পরই সু চি রোহিঙ্গা সংকটকে কাস্মীর সমস্যার সঙ্গে তুলনা করেন।   গত ৮ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড পার্লামেন্টারি ফোরাম অন সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট’নামক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় ঘোষণাপত্র মেনে নেয়নি ভারত। বরং দেশটিতে থাকা ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। মানবতার পরাজয়েও যারা চিরাচরিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না সেই অর্বাচীনদের হাতে মানবতার পরাজয় ছাড়া আর কিছু আশা করা অবান্তর।  

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল : সম্ভবনা ও প্রতিবন্ধকতা

কোনো ব্যক্তি চমৎকার কোনো ভাবনা বা আইডিয়া আত্মস্থ করার পর ব্যস্ত হয়ে পরেন আইডিয়াটি বাস্তবায়নে। তার ধারনা, আইডিয়াটি অতুলনীয়, অভূতপূর্ব এবং বিশ্বসেরা। এমন চমৎকার আইডিয়া এর আগে কখনও কারো মাথায় আসেনি। কিন্তু বাস্তবায়ন যে কঠিন ভারী। অনেক কিছু দরকার। একটা অফিস, এবং/অথবা কারখানা। কাঁচামাল, কর্মচারি, প্রচার; আরও কত কি! আর এসব কিছু জোগাতে প্রয়োজন, টাকা। কোথায় মিলবে টাকা? ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে হবু উদ্যোক্তা এক সময় ‘মূল্যবান কিছু’ অর্জন করে। অর্থ নয়, অভিজ্ঞানঃ ব্যাংকের ঋণ তাদের জন্য নয়। স্বপ্নের জন্য তার বুকে তুমুল ভালবাসা। নিজের জমানো টাকা দিয়ে তাই, হাঁটি হাঁটি পা পা করে, শুরু করে। আইডিয়াটা, মহিরুহ থেকে কাটছাট করে, বনসাই আকারে শুরু করে। পথে নামলে পথ চেনা যায়। কিছু কিছু সহায়তা মেলে। পরিবার থেকে। বন্ধুদের থেকে। কিন্তু হায় স্বপ্ন-গাছ যত বাড়ে, ততই যে তার খিদে বাড়ে! টাকা দরকার। আরও টাকা। অভাগা যেদিকে চায়, সাগরও শুকায়ে যায়। কত সম্ভবনাময় মহীরুহ অঙ্কুরে মারা যায়! ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এই অঙ্কুরগুলোকে মহীরুহ না হোক বৃক্ষ, বা নিদেন পক্ষে ঝোপঝাড় হয়ে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণেরর জন্য পুঁজির জোগান দেয়। তবে সব ব্যবসায় নয়। যে ব্যবসা উদ্ভাবনীয়, বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ আছে, সেটাই পছন্দ। উদ্ভাবন শুধু যে বৈজ্ঞানিক হবে তা নয়- নতুন ধরনের পণ্য বা সেবা অথবা নতুন কোনো চাহিদা মেটানোও হতে পারে। কারণ এসব ব্যবসায় লাভের সম্ভবনা বেশি। লাভের সাথে ঝুঁকিও হাত ধরাধরি করে যায়। তাই, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল একটা ‘অধিক লাভ অধিক ঝুকি’ মডেলের অর্থায়ন। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র কাজের পদ্ধতি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম বা কোম্পানি নির্দিষ্ট উদ্দেশে (যেমন আইটি, আইটিইএস, বায়ো মেডিক্যাল ইত্যাদি) গঠিত ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড বা তহবিল’ উত্তোলন করে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন। সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারীকে এই ধরনের তহবিলে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ এতে ঝুঁকি বেশি এবং ফল আসে দেরিতে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম বা কোম্পানি এই তহবিল ব্যবস্থাপনা করে। বিনিময়ে তারা ব্যবস্থাপনা ফি পায়। ভেঞ্চার ফান্ডের মেয়াদ দীর্ঘ। ৫ থেকে ১৫ বছর। ভেঞ্চার ফান্ডে যারা বিনিয়োগ করে তাদের লিমিটেড পার্টনার বা এলপি বলে। আর যারা এই ফান্ড ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ করে তাদের জেনারেল পার্টনার বা জিপি বলে। জেনারেল পার্টনাররা টাকার সাথে সাথে নিজেরা তহবিল  ব্যবস্থাপনায় জড়িত থাকেন। স্টার্ট আপ বাছাই করেন, নিরীক্ষা বা ডিউ ডেলিজেন্স করেন। বিনিয়োগের পর বিনিয়োজিত প্রতিষ্ঠান দেখভাল করেন, তাদের পর্ষদে পরিচালক হিসাবে বসেন। ভেঞ্চার ফান্ড থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়। ভেঞ্চার ফার্ম বা কোম্পানি এই বিনিয়োগের ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদের। তিন থেকে আট বছর পর্যন্ত। বিনিয়োগ প্রধানত সাধারণ শেয়ার ও আংশিক পুঁজির (কোয়াজি ইক্যুটি) মাধ্যমে করা হয়। মেয়াদ শেষে অথবা সুবিধাজনক সময়ে ভেঞ্চার ফার্ম সেই শেয়ার বিক্রি করে দেয়। কখনও লাভে আবার কখনও লোকসান দিয়ে। বিনিয়োজিত কোম্পানি দেউলিয়া হলে পুরো বিনিয়োগ জলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এসোসিয়েশন এর হিসাব অনুযায়ী সেদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিনিয়োগ এর ৫ বছরের গড়ে দেখা যায়, ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে ক্রয় মুল্যের কমে অর্থাৎ লোকসান দিয়ে শেয়ার বিক্রয় করতে হয়েছে। পক্ষান্তরে ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে, প্রায় পৌনে ৬ বছরে, বিক্রয় মূল্যের ১০ গুণ বা ততোধিক মূল্য মিলেছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সম্ভবনা উদ্যোক্তা উন্নয়নে ভূমিকাঃ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল একটি উদ্যোগের বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থায়ন করে; যথাঃ সিড বা বীজ, অর্থাৎ ব্যবসা যখন উদ্যোক্তার মনে আইডিয়া আকারে থাকে (২) প্রাথমিক পর্যায় – উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরুর জন্য কাজ শুরু করেছে কিন্তু বিক্রয় শুরু হয়নি (৩) সম্প্রসারণ – বিক্রি শুরু হয়েছে কিন্তু কোম্পানি লাভ করছে না (৪) বর্ধিষ্ণু – আইডিয়া পরিক্ষিত, ভালো আয় আসছে, ব্রেক ইভেন হয়েছে বা কাছাকাছি। আমরা জানি, নতুন কোনো উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান উপরোক্ত পর্যায়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয় না। তবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে, তার পূর্ববর্তী রেকর্ড বা অন্যান্য ব্যবসার উপর নির্ভর করে। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় নিয়ামক (১) ব্যবসাটি লাভজনক হতে হবে (২) ব্যবসা বা উদ্যোক্তার পূর্ব সাফল্যর উদাহরণ থাকতে হবে  (৩) জামানত হিসাবে বন্ধক দেয়ার মত স্থাবর সম্পত্তি থাকতে হবে। নতুন উদ্যোক্তার এইসব কোনো যোগ্যতাই থাকে না। সেক্ষেত্রে ভেঞ্চার ক্যাপিটালই তার একমাত্র ভরসা। শুধু দুস্প্রাপ্যতা বা প্রাপ্তির জটিলতা নয়, নতুন উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংক ঋণ, প্রকৃতিগতভাবে, অসুবিধাজনক। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পর থেকেই সুদ আরোপ শুরু হয়। অথচ ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে লোকসান হওয়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে সুদ- বোঝার ওপর শাঁকের আটি। তদুপরি ঋণ বা ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য বড় জোর ৩ বা ৬ মাস গ্রেস পিরিয়ড পাওয়া যায়। তারপর ঋণ পরিশোধ করতে হয়- অথচ বাড়ন্ত শিশুর খাদ্য চাহিদার মত ব্যবসারও তখন প্রয়োজন অতিরিক্ত অর্থের। ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে বলা হয় স্মার্ট মানি। এখানে শুধু অর্থ নয়, তারও অধিক কিছু মিলে। বুদ্ধি পরামর্শ, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র (বিনিয়োজিত কোম্পানিতে) বিনিয়োগ, ঋণের মত, নিরাপদ নয়। ঋণের ক্ষেত্রে জামানত থাকে। জামিনদার  থাকে। আইনের সুরক্ষা থাকে। ঋণীকে একগাদা আইনি কাগজপত্রে সাক্ষর দিতে হয়। পক্ষান্তরে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, বিনিয়োজিত কোম্পানির লাভ লোকসানের ভাগিদার। উক্ত কোম্পানির লোকসান মানে তার লোকসান। তাই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র পার্টনাররা বিনিয়োজিত কোম্পানিতে অনেক বেশি জড়িত হয়। আগ্রহ নেয়। সে জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিনিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক কম। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র সাফল্যঃ যুক্তরাষ্ট্র ভেঞ্চার ক্যাপিটেল’র সুতিকাগার। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালে ‘ক্ষুদ্র  ব্যবসা বিনিয়োগ আইন’ প্রনয়ন করে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবসা শুরু করেছে। ভারতে ১৯৯৬ সালে, পাকিস্তানে ২০০১ সালে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আইন প্রনিত হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির ডটকম বিপ্লবের পেছনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র অবদান অনস্বীকার্য। আমেরিকা উদ্যোক্তার জাতি। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের তাই সেখানে রমরমা অবস্থা। অথবা ভেঞ্চার কেপিটাল এর কারণেই আমেরিকা এত উদ্যোক্তা’র মুখ দেখতে পেয়েছে। মাইক্রোসফট, স্টারবাক্স, অ্যাপল, ইন্টেল, ফেসবুক, গুগল, ই-বে, আমাজন এরকম অনেক জগত বিখ্যাত কোম্পানি’র বেড়ে ওঠার পেছনে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সহায়ক হাত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র বাড়ন্ত চেহারা নিচের সারনিতে দেখা যাবেঃ সাল ভিসি ফার্মের সংখ্যা ভিসি ফান্ড সংখ্যা ফান্ড  $B ডিল সংখ্যা বিনিয়োগ $B ২০১৩  ৮৭৪ ১৩৩১ ১৯২.৯ ৪০৪১ ২৯.৫ ২০০৬ ১০২২ ১৭১৬ ২৮৮.৯ ৩৮৮২ ২৭.৫ ২০০৩ ৯৫১ ১৭৮৮ ২৬৩.৯ ৩০২৪ ১৯.৬ ১৯৯৩ ৩৭০ ৬১৩ ২৯.৩ ১২১১ ৩.৬ ১৯৮৫ ২৯৪ ৫৩২ ১৭.৬ ১৩৪৮ ২.৮   ২০১৩ সালে  আইটি সেক্টরে ২৩৬০টি কোম্পানিতে ২৭৮৪ ডিলে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। যার মধ্যে নতুন কোম্পানি ১০০৯টি, যাতে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। মোট বিনিয়োগের ৩৭% সফটওয়্যার, ১৫% বায়োটেকনোলজি, ১০% মিডিয়া এন্টারটেইনমেন্টে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এগুলো নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ। ভারতে ২০১১ সালে ৫৩১টি ডিলে ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার ও ২০১২ সালে ৫৫১ টি ডিলে ১০.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। তম্মধ্যে আইটি ও আইটি উদ্ভুত সেবা খাতে ২০১১ সালে ২৭% ও ২০১২ সালে ৪০% বিনিয়োগ করা হয়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বিধায় প্রচুর চাকুরি তৈরি হয়, যা নিচে দেখান হয়েছেঃ   আইপিও’র সময় কর্মী সংখ্যা বর্তমানে (২০১২) কর্মী সংখ্যা স্টার বাক্স ৬৫০ ৩৩১,০০০ মাইক্রোসফট ১১৫৩ ৯৪০০০ ইন্টেল ৪৬০ ১০০,১০০ আপ্যাল ১০১৫ ৭৬,০০০ গুগল ৩০২১ ৫৩,৮৬১ পুঁজিবাজারে প্রভাবঃ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োজিত কোম্পানি থেকে আইপিও’র(উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে) মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করে (লক-ইন পিরিয়ড শেষে) বের হতে পারে। তার মাধ্যমে ভালো মুনাফা অর্জনের সুযোগ মেলে। তাই, বিনিয়োগ নয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এর আসল সাফ্যলের মাপকাঠি এক্সিট। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক বছরের চিত্র নিচের সারণিতে দেখা যাবেঃ   মোট আইপিও ভেঞ্চার অর্থায়নকৃত কোম্পানির আইপিও ২০১৩ ১৬৯ ৮১ ২০১২ ১১৩ ৪৯ ২০১১ ৯৮ ৫১ ২০১০ ১০৩ ৭০ ২০০৯ ৩৯ ১৩   আইপিওতে আসার জন্য নতুন কোম্পানি সৃজনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’র ভূমিকা উপরের সারণিতে প্রতিভাত। অবশ্য ভেঞ্চার অর্থায়িত কোম্পানির একটি ক্ষুদ্র অংশ আইপিওতে আসে। বড় অংশ মার্জার একুজিসন (২০১৩: ৮০২), ট্রেড বিক্রয় এর মাধ্যমে এক্সিট করে থাকে। বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিতঃ বাংলাদেশ সিক্যুরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০১৫ সালে বিকল্প বিনিয়োগ নীতি প্রনয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশে ৮/৯টি কোম্পানি আল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড ম্যানেজার হিসাবে বিএসইসির সাথে নিবন্ধিত হয়েছে। আরো ৭/৮টি বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) ফান্ড, দেশে কাজ করছে। বিদেশি ভিসি ফান্ড বাংলাদেশে এলে শুধু অর্থ নয় সাথে জ্ঞানও আসে। বাংলাদেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটালে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি নেই। বিদেশি ভিসি ফার্ম সেই অভাব দূর করতে পারে। এ বছর অর্থ বিলে অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের আয়ের উপর কর অবকাশ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বিভাগকে এজন্য ধন্যবাদ। বিকল্প বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো চরিত্রগতভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠা কিন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩ এর অধীনে নিবন্ধিত নয় বলে তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানএর বিভিন্ন কাঠামো গত সুযোগ সুবিধা (যেমন বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের সিআইবি তথ্যে প্রবেশ অধিকার) পাচ্ছে না, যা তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে সহায়ক হত। ভেঞ্চার তহবিল ট্রাষ্ট হিসাবে নিবন্ধনের নিয়ম। সেক্ষেত্রে ২% নিবন্ধন ফি দিতে হবে। মিচ্যুয়াল ফান্ডের জন্য যা থোক টাকা ধরা আছে। ২০০ কোটি টাকার তহবিলের উপর ২% মানে ৪ কোটি টাকা যা অনেক বড় খরচ। এই ফি থোক টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় আইন/নীতিমালা প্রনয়ন করে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবসার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিলে, বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের অপার সম্ভবনা তৈরি হবে।  লেখক : সাধারণ সম্পাদক, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইক্যুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (প্রস্তাবিত)। ডব্লিউএন

শেকসপিয়র-কেনেডির শিক্ষা ও আমাদের পড়ালেখার মান

১৫০০ খ্রিস্টাব্দের কথা বলছি। ইংরেজ কবি শেকসপিয়র যে স্কুলটিতে পড়তেন সেটার নাম কিংস নিউ স্কুল। শেকসপিয়রকে সে সময় যেসব মাস্টার মশাই পড়াতেন তাদের লেখাপড়া দেখলে রীতিমতো চমকে উঠতে হয়। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন অক্সফোর্ড-কেমব্র্রিজ থেকে পাস করা দিগ্গজ। এদের মধ্যে ছিলেন জন ব্রাউনশোডের মতো লাতিন কবি, ওয়াল্টার রোশের মতো আইনজ্ঞ। অন্যদিকে আমেরিকার ৩৫তম রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির ওপর তার স্কুলের হেড মাস্টার মহাশয় যে কি রকম প্রভাব বিস্তার করেছিলেন সেটা পরিলক্ষিত হয় ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন। কারণ সে দিনই আমেরিকার জনসাধারণের উদ্দেশে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বক্তৃতা তিনি করেছিলেন, ‘দেশ তোমার জন্য কী করবে সে দিকে ধ্যান না দিয়ে বরং তুমি দেশের জন্য কী করতে পার সে চিন্তা কর। ’ মজার ব্যাপার হচ্ছে কেনেডি, কানেক্টিকাট চোয়াট গ্রামার স্কুলে লেখাপড়া করার সময় সেই প্রধান শিক্ষক কেনেডিকে উদ্দেশ করে প্রায়ই বলতেন উপরোক্ত বক্তৃতার কথাগুলো। একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ হচ্ছে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, যে শিক্ষায় আনন্দ নাই সে শিক্ষা, শিক্ষা নয়। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ পরিহার করার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে—এক. শরীরিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার ভয়। দুই. নিরস ও আনন্দবিহীন শিক্ষা। সুপ্রিয় পাঠক, আমার এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে কিছুদিন আগে প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যার্থীদের ফলাফল অধঃপতনের কারণ, শিক্ষার মানহ্রাস প্রভৃতি বিষয়গুলোর সুলুক সন্ধান। মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সম্মানিত পাঠকদের দু-একটি গল্প শোনাতে ইচ্ছা করছে। তাতে হয়তো পরবর্তী আলোচনাটা সহজেই এগিয়ে নেওয়া যাবে। ১৮১৭ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে যে কলেজটি সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় সেটার নাম হিন্দু কলেজ। বর্তমানে সেটির নাম প্রেসিডেন্সি কলেজ। কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ারসহ সে সময়ের আরও বেশকিছু শিক্ষানুরাগী। যদিও রাজা রামমোহন রায় হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী। তারপরও কলেজটি মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালীন উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারের ছেলেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্যে। হিন্দু কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে হিন্দু ঘরের ছেলেরা সাধারণত পড়ত টোলে আর মুসলমান ঘরের ছেলেরা মক্তব ও মাদ্রাসায়। সেই হিসেবে মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা কিন্তু সাধারণ স্কুল-কলেজের শিক্ষারও আগে সূচিত হয়েছিল। আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা বাংলা রেনেসাঁ যুগের সূচনা লগ্নের কথা। বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মাইকেল মধুসূদন, রামতনু লাহিড়ী এঁদের সময়ের কথা। বেশির ভাগ পাঠক বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম কিংবা মধুসূদনের নাম শুনে থাকলেও রামতনু লাহিড়ীর নাম শুনেছেন এমন মানুষ হয়তো পাওয়া যাবে হাতেগোনা দু-চারজন। অথচ সে সময় শিক্ষা-দীক্ষায় সমাজ সংস্কারে রামতনু লাহিড়ী ছিলেন অগ্রগণ্য একজন ব্যক্তিত্ব। মাইকেল মধুসূদন নিঃসন্দেহে ক্লাসে ভালো ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তিনি ক্লাসের সেরা ছাত্র ছিলেন না। ক্লাসে তার সতীর্থ সহপাঠী ছিলেন রাজনারায়ণ বসু। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তা ছাড়া মধুর অন্যান্য সহপাঠী যেমন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, গৌরদাস বসাক, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ভোলানাথ চন্দ্র প্রমুখও মধুর চেয়ে কোনো অংশে খারাপ ছাত্র ছিলেন না। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে রাজনারায়ণ বসু থেকে শুরু করে ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র সবাই কিন্তু সে সময় লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও কৃতবিদ্য হিসেবে দারুণ নাম করেছিলেন। স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজ মহিমায় এরা সবাই ছিলেন উজ্জ্বল ও ভাস্বর। রামতনু লাহিড়ী অবশ্য মধুসূদনের চেয়ে বছর ছয়-সাতেক বড় ছিলেন। রামতনু লাহিড়ীর কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তিনি ১৮৩৩ সালে হিন্দু কলেজ থেকে পাস করে ওই কলেজেই শিক্ষক হিসেবে ঢুকেছিলেন চাকরিতে। অন্যদিকে রাজনারায়ণ বসু ও মাইকেল মধুসূদন দত্তরা হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন ১৮৪০ সালে। সেই হিসেবে মাইকেল মধুসূদন ছিলেন রামতনু লাহিড়ীর আট-দশ বছরের অনুজ। তো হয়েছে কী, রামতনু লাহিড়ী তখন হিন্দু কলেজের ছাত্র। একবার তিনি আক্রান্ত হলেন ভয়ানক কলেরা রোগে। খবরটি কানে গেল হিন্দু কলেজের শিক্ষক ডেভিড হেয়ার সাহেবের। খবরটি পেয়েই ওষুধ হাতে তিনি ছুটলেন রামতনু লাহিড়ীর গৃহে। তারপর নিজ হাতে তাকে সেবা শুশ্রূষা করে সারিয়ে তুললেন। ডেভিড হেয়ার ছাত্রদের ভীষণ মারপিট করতেন। কিন্তু তারপরও ছাত্রদের প্রতি তিনি ছিলেন দয়ার সাগর। আর একটি ঘটনা। হেয়ার সাহেবের আরেকটি ছাত্রের নাম ছিল চন্দ্রশেখর দেব। একদিন সন্ধ্যাবেলা সে এসেছে হেয়ার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। হঠাৎ শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। হেয়ার সাহেব বললেন, বসো। বৃষ্টি থামুক তারপর যেও। দোকান থেকে কিনে আনলেন মিষ্টি। নিজে খেলেন ছাত্রকে খাওয়ালেন। বৃষ্টি থামতে থামতে বেশ রাত হয়ে গেল। হেয়ার সাহেব বললেন, চল তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি। চন্দ্রশেখর বলল, না স্যার, আমি একাই যেতে পারব। কিন্তু সে কথা শুনলেন না তিনি। ডেভিড হেয়ার যখন চন্দ্রশেখরকে নিয়ে কলকাতার বৌ-বাজারের কাছে পৌঁছলেন তখন চন্দ্রশেখর বলল, আমি এবার একাই বাড়ি যেতে পারব। স্যার আপনি বরং ফিরে যান। হেয়ার বললেন, ঠিক আছে চলো তোমায় আমি মাধব দত্তের বাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি। চন্দ্রশেখরকে গোলদিঘির কাছে ছেড়ে দিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর বাড়ি পৌঁছে জামা-কাপড় ছাড়বে, ঠিক এমন সময় দরজায় টোকা। বাড়ির লোকজন দরজা খুলে দেখে দরজার সামনে হেয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে উদ্বেগ। ‘ইজ চন্দ্র ইন’, অর্থাৎ চন্দ্র কি ফিরেছে? হেয়ার সাহেব ছিলেন এমনি ধরনের শিক্ষক। গল্প গুলো এখানে বললাম এ কারণে যে, একজন শিক্ষকের তার ছাত্রের প্রতি দরদ-ভালোবাসা না থাকলে এবং ছাত্রটির সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ না করলে তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা আদৌ সম্ভব হয়ে ওঠে না।   এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। এই যে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল গতবারের চেয়ে খারাপ হলো। শুধু গতবার হবে কেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষিত সচেতন মহলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দীর্ঘদিনের। একে তো পাসের হার বেশ খানিকটা কমে গেছে এবার তার ওপর বর্তমান শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে সন্দেহ, শঙ্কা ও ক্ষোভ। এর জন্য দায়ী কে? এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা তাদের নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য বলির পাঁঠা বানাচ্ছে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের। রাজনীতিবিদদের অপরাজনীতি সুশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা এটি যেমন একটি কঠিন বাস্তবতা, ঠিক তেমনি এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে শিক্ষকদের মানও হ্রাস পেয়েছে ভয়ানক রকম। এর আবার দুটো দিক আছে। এমন কিছু শিক্ষক আছেন যারা একেবারেই অযোগ্য। অন্যদিকে আবার কিছু শিক্ষক আছেন যারা যোগ্য বটে কিন্তু তাদের রয়েছে সুষ্ঠু পাঠদানে চরম অনীহা। আর এসবেরই ঘেরাটোপে আবদ্ধ আমাদের আজকের শিক্ষাব্যবস্থা। বর্তমান জামানার শিক্ষকরা হয়ে পড়েছেন মারাত্মক রকমের ‘কমার্শিয়ালাইজড’ তারা টাকা ছাড়া কিছু বোঝেন না। সর্বক্ষণ তারা ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং ক্লাস নিয়ে। জীবন সংসারে টাকার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু টাকা অর্জনই যদি একজন শিক্ষকের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়, তবে শিক্ষকতা কেন? হীরে কিংবা সোনার খনিতে কাজ নিলেই তো হয়। এ জন্য বোধকরি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদর্শ শিক্ষক সম্পর্কে বলেছেন, ‘যাদের উচিত ছিল জেলের দারোগা বা ড্রিল সার্জেন্ট বা ভূতের ওঝা হওয়া তাদের কোনোমতেই উচিত হয় না ছাত্রদিগকে মানুষ করিবার ভার লওয়া। ছাত্রদের ভার তাঁরাই লইবার অধিকারী যাঁরা নিজের চেয়ে বয়সে অল্প, জ্ঞানে অপ্রবীণ ও ক্ষমতায় দুর্বলকেও সহজেই শ্রদ্ধা করিতে পারেন। ’ অথচ একসময় এই শিক্ষকগণ ছিলেন সমাজে সবচেয়ে শ্রদ্ধার পাত্র। বঙ্কিম বাবুর মতো নাক উঁচু লেখক পর্যন্ত বলেছেন, ‘রাজার অপেক্ষাও, যাঁহারা সমাজের শিক্ষক, তাঁহারা ভক্তির পাত্র। ...যাঁহারা বিদ্যা বুদ্ধি বলে, পরিশ্রমের সহিত সমাজের শিক্ষায় নিযুক্ত, তাঁহারাই সমাজের প্রকৃত নেতা, তাহারাই যথার্থ রাজা। ’ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর দিকে যদি তাকানো যায় দেখা যাবে যে, সে সব দেশ কিন্তু এমনি এমনি আজ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শেখরে পৌঁছায়নি। শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড। তবে সমাজের মস্তিষ্ক হচ্ছেন আদর্শ শিক্ষক। আমি যখন ঢাকা কলেজে পড়ি সে সময়টায় আমার শিক্ষক ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। কী যে অসাধারণ ছিল তার পাঠদান পদ্ধতি, সে কথা বলে বোঝানো যাবে না। পড়ানোর সময় মনে হতো তিনি আসলে আমাদের পড়াচ্ছেন না। আমাদের গল্প শোনাচ্ছেন। তার ক্লাসে তিল ধারণের ঠাঁইও থাকত না। ঢাকার বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা এসে ভিড় জমাত তার বক্তৃতা শুনতে। এমন শিক্ষক বাংলাদেশে সত্যি বিরল। দীর্ঘ সময় একঘেয়ে ক্লাস করা, কড়া শাস্তি প্রভৃতি কারণে অনেক ছাত্রের বিদ্যালয়ের প্রতি জন্মায় অনীহা। বিখ্যাত অনেক মনীষীও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, জ্যাক লন্ডন, হারপার লি., উইলিয়াম ফকনার, ম্যাক্সিম গোর্কি, মার্ক টোয়েন, জর্জ বার্নাড শ প্রমুখ ব্যক্তিরা স্কুল পালালেও উত্তরকালে বিখ্যাত সব লেখক হয়েছিলেন। প্রথমে শেকসপিয়র প্রসঙ্গে বলেছে, তিনি কিন্তু স্কুল পালাননি। কিন্তু সে সময়কার স্কুলের কড়া শাসন যে তার ধাতে সয়নি সেটা কিন্তু সহজেই বোঝা যায় তার কয়েকটা নাটক পড়লে। যেমন ‘হেনরি দ্য সিক্সথ’ নাটকের দ্বিতীয় পর্বে, গণবিদ্রোহের এক নেতা যার নাম জ্যাক কেড সে একজন লর্ডের মৃত্যুদণ্ডের হুকুম দেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর একটা হলো এই যে, দেশে গ্রামার স্কুল বসিয়ে লর্ড নাকি ছেলে ছোকরাদের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। শেকসপিয়রের নাটকে স্কুলে যাওয়ার প্রসঙ্গটা কিন্তু বারবার অনিচ্ছা আর গড়িমসির দৃষ্টান্ত হিসেবেই এসেছে। যেমন তার আর একটি নাটক ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ এ জ্যাকুয়েস নামের চরিত্রটি ছেলেবেলার কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনিচ্ছুক পড়ুয়া ছাত্রটি বইয়ের থলে নিয়ে শম্বুক গতিতে স্কুলে যাওয়ার করুণ ছবিটা স্মরণ করে। পাঁচশত বছর আগে কেমন ছিল শেকসপিয়রের ছেলেবেলার স্কুল? কিংবা কী বা পড়ানো হতো তার স্কুলে? সকাল ৭টা থেকে স্কুল চলত বেলা ৫টা পর্যন্ত। মাঝে দুবার খাবার বিরতি বাদ দিলেও প্রায় আট-ন ঘণ্টা পড়া, সপ্তাহে ছ’দিন। চার-পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হতো ছেলেরা। প্রথমে একটানা দুই বছর একজন শিক্ষকের কাছে অক্ষরজ্ঞানের তালিম নিতে হতো সে সময়ের ছাত্রদের। এই গুরুমশাইকে বলা হতো ‘আশার’ অর্থাৎ পথপ্রদর্শক। এ ছাড়াও তারা মুখস্থ করত কিছু প্রার্থনা, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ধর্ম আর নীতি শিক্ষার অ আ ক খ। পড়ালেখার ভীতটা পাকা হলে ছেলেরা পড়ত লাতিন ব্যাকরণ, লাতিন অনুবাদে ইশপের গল্প, লাতিন কবিদের নানা নীতিবাক্যে ভরা পদ্য, এরসামুস, ভিভেস প্রমুখ ইউরোপের রেনেসাঁ যুগের গ্রিক লাতিন জানা মনীষীদের লাতিন সংলাপ। আরেকটু উঁচু ক্লাসে মাস্টারগণ পড়াতেন লাতিন অলঙ্কার শাস্ত্র, ওভিদ, ভার্জিল, হোরেসের মতো প্রাচীন লাতিন কবিদের রচনা। এ ছাড়াও অভ্যাস করতে হতো অলঙ্কার শাস্ত্রের বিধি মেনে কাল্পনিক সংলাপ লেখা ও পড়ে শোনানো। একদিকে ভাষার অবাধ উচ্ছ্বাস অন্যদিকে চরিত্র ও বিষয়ের যুক্তি মেনে রচনার সংযম খেলিয়ে বলা আর মেপে বলা। এ দুটি গুণই শেকসপিয়র পেয়েছিলেন স্কুলের অনুশীলন থেকে। বর্তমান সময়ে আমাদের ছেলেমেয়েরা কী পড়ছে। বলতে হয় পড়ছে অনেক কিছুই, আবার কিছুই পড়ছে না। দিন দিন শুধু স্কুলব্যাগের ওজনই বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিখছে না কিছুই। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী তো বটেই বহু কমপেটেটিভ পরীক্ষাতেও দেখা যায়, বিদ্যার্থীরা কোনো তান্ত্রিকের মন্ত্র পড়ার মতো করে পড়া মুখস্থ করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তারা না বুঝেই মুখস্থ করছে। আমি এক বিসিএস শিক্ষার্থীকে দেখেছি, জিকির তুলে মুখস্থ করতে। ভুটানের রাজধানী থিম্পু। থিম্পু, থিম্পু, থিম্পু। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ভুটান দেশটি সম্পর্কে কি তোমার ন্যূনতম কোনো জানা-শোনা আছে। ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বার কাউন্সিলের অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখে তো রীতিমতো অবাক হওয়ার অবস্থা। সেখানে জানতে চাওয়া হয়, চুরির ধারা কত? কিংবা হত্যাকাণ্ডের ধারা কত। আমি বলি, ধারা জেনে একজন ছাত্রের কী লাভ। বরং প্রশ্নগুলো এমন হওয়া উচিত নয় কী—একটি ঘটনায় কী কী উপাদান থাকলে আমরা বুঝব যে, চুরিটি সংগঠিত হয়েছে। আমাদের তো আইনের দর্শনগুলো আগে ভালো করে বুঝতে হবে। আমরা বুঝতেই চাই না যে, আসলে মুখস্থ বিদ্যায় বেশি দূর এগোনো যায় না। এ জন্যই বোধকরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মুখস্ত করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি! যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই-বা কম কী করিল?’ শিক্ষকদের দরদ দিয়ে সেই সঙ্গে মন-প্রাণ উজাড় করে ছাত্রদের পড়াতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর আগে একজন শিক্ষককেও ব্যাপক পড়াশোনা করতে হয়। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ ছাত্রছাত্রীই মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসে। হাতেগোনা কিছু বড় বড় পাস দেওয়া শিক্ষিত শ্রেণির ছেলেমেয়েকে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তারা বাবা-মা ও বাড়ির পরিবেশ থেকেই অনেক কিছু শিখে নেয়, কিন্তু তাদের সংখ্যা নিতান্তই হাতেগোনা। সবাই রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ হয় না। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। লক্ষ্মীনারায়ণ নামে একজন শিক্ষক একদিন ক্লাসে পড়া নিচ্ছিলেন। ছেলেদের তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বলতো পি, ইউ, ডি, ডি, আই, এন, জি কী হয়? ছাত্ররা সব চুপ। অবনীন্দ্রনাথও হয়তো ভয়ে উত্তর দিলেন না। মাস্টার মশাই নিজেই বলে দিলেন উত্তরটা। পাডিং। উত্তর শুনে ছোট্ট অবনীন্দ্রনাথ তো অবাক। একি! এ তো ভুল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। স্যার, ওটার উচ্চারণ পাডিং নয়, পুডিং। আমরা রাতের বেলায় রোজই ওটা খাই। এক ফোঁটা ছেলের মুখে তার মতো জাঁদরেল মাস্টার মশায়ের ভুল ধরা শুনে লক্ষ্মীনারায়ণ বাবু রেগে-মেগে হয়ে গেলেন লাল। —দাঁড়াও বেঞ্চের ওপর। অবনীন্দ্রনাথ দাঁড়ালেন। আর তার পিঠের ওপর পড়তে লাগল সপাং-সপাং বেতের মার। বলো, পুডিং নয়, পাডিং। অবনীন্দ্রনাথ মিথ্যা বলতে নারাজ। তাই আবার মার। তাতেও সাধ মিটল না মাস্টার মশায়ের। তিনি হুকুম দিলেন— টানা পাখার দড়িতে ছুটির পরও বেঁধে রাখ ওকে। ব্যস। তার পরের দিন থেকেই স্কুলে ইস্তফা। বাবা গুণেন্দ্রনাথ রাগে গড়গড় করতে করতে হুকুম দিলেন, অবন যেন কাল থেকে আর ওই স্কুলে না যায়। ভারতবর্ষের মেয়েদের জন্য সর্বপ্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দু’কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করছি। ছেলেদের জন্য প্রথম বিদ্যালয়টি ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও মেয়েদের স্কুলে পড়ার দোর খুলতে সময় লেগেছিল আরও ৩২ বছর। অনেক দৌড়ঝাঁপ ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর পর জন এলিয়ট ড্রিংকওয়াটার বেথুন নামে সুহূদয়বান এক ইংরেজ সঙ্গে রামগোপাল ঘোষ, বিদ্যাসাগর, মোদনমোহন তর্কালংকায় প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৮৪৯ সালে। পেশায় বেথুন ছিলেন ব্যারিস্টার ও গভর্নর দফতরের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। স্কুল তো খোলা হলো কিন্তু ছাত্রী পাওয়া যায় কোথায়? সে সময় সমাজের মানুষজন ছিল ভয়ানক রকমের গোঁড়া। তারা মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতেন না। একদিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার বন্ধু মোদনমোহন তর্কালংকারের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন কোনো একটি বিশেষ কাজে। গৃহে প্রবেশ করতেই তিনি দেখলেন মোদনমোহনের মেয়ে দুটি বেথুন সাহেবকে ঘোড়া বানিয়ে তাঁর পিঠে চড়ে বসে খেলায় লিপ্ত। বিদ্যাসাগর বললেন আরে করেছ কী তোমরা, বেথুনের মতো এত বড় একজন ব্যারিস্টারের পিঠে চড়ে তোমরা খেলা করেছ। তখন বেথুন বললেন— শুধু ঘোড়া কেন ওরা যদি চায় আমি পাখি হয়ে ওদের নিয়ে উড়ে যেতে পারি। কারণ ওরা আমার স্কুলে পড়তে রাজি হয়েছে। মোদনমোহনের দুই মেয়ে কুন্দমালা আর ভুবনমালা ছিল বেথুন স্কুলের প্রথম দুই ছাত্রী। ওরা ছিল যোগ্য বাবার যোগ্য কন্যা। অন্যদিকে মোদনমোহন স্কুলের মেয়েদের জন্য কবিতা লিখলেন— ‘পাখি সব করে রব। রাত্রি পোহাইলো/ কুসুমে কানন কলি সবই ছুটিলো। ’ বেথুন প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি আজ কলকাতার বিখ্যাত বেথুন কলেজ নামে পরিচিত। লেখক : গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। ই-মেইল :  [email protected] //এআর

বেড়িবাঁধের অভাবে দুর্বিষহ সীতাকুণ্ডবাসীর জীবনযাত্রা

নানামুখী সঙ্কটাবর্তে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। সীতাকুন্ড উপজেলার ভাগ্যাহত মানুষগুলো প্রতিনিয়ত হাবুডুবু খেলেও এসব দেখার যেন কেউ নেই। বেকারত্ব, সেচসঙ্কট, জলাবদ্ধতাসহ বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি বেড়িবাঁধ না থাকাটাই এখানের প্রধানতম সমস্যা। জীবন-মরণ সমস্যা বললেও অত্যুক্তি হয় না। কেননা, বেড়িবাঁধ মানে প্রাণরক্ষা বাঁধ। আবহমানকাল থেকে সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় জনসাধারণ বেড়িবাঁধ-সমস্যার বেড়াজালে আটকে থাকলেও এর কোনো সমাধানের আলামত নেই। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যাদের তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। বেড়িবাঁধ না থাকায় সন্দ্বীপ-চ্যানেলের অব্যাহত ভাঙ্গনে শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডের সলিমপুর, ভাটিয়ারি, সোনাইছড়ি, কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। বাস্তুহারা হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। বেড়িবাঁধ না থাকায় আতঙ্কে দিন কাটে সমুদ্র উপকূলীয় বাসিন্দাদের। দক্ষিণ সীতাকুণ্ডের সমুদ্রোপকূলে চর জাগায় নদীভাঙ্গন বন্ধ হলেও বাঁশবাড়িয়া এলাকায় নদীভাঙ্গন ও জোয়ারের পানির উপদ্রপে জনজীবনে দুগর্তি ও ভোগান্তির শেষ নেই।। বেড়িবাঁধ না থাকায় উপকূলীয় অঞ্চলের ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার জনপদ ভেসে যায় জোয়ারের পানিতে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস পেলে এ এলাকার মানুষের মানসিক অবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একানব্বইয়ের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পরে কুমিরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আ ফ ম মফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে বেড়িবাঁধ বাস্তবায়ন পরিষদ গঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এ পরিষদ অজ্ঞাতকারণে ঝিমিয়ে পড়ে। রাজা আসে রাজা যায় কিন্তু জনগণের জানমাল রক্ষার জন্যে অতিপ্রয়োজনীয় বেড়িবাঁধনির্মাণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার সমুদ্রোপকূলীয় এলাকার মধ্যে প্রায় আট কিলোমিটার জনপদ বিভিন্ন সময়ে জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচশ’ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সীতাকুণ্ড বর্তমানে তিনশ’ বর্গ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। ৬০, ৬৩, ৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস পুরো সীতাকুণ্ডকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ সেদিন প্রাণ হারিয়েছিল। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে উত্তর সীতাকুণ্ডের বগাচতর থেকে বাঁশবাড়িয়া পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধহীন চারটি ইউনিয়নে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। তছনছ করে দিয়েছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। কেড়ে নিয়েছিল সহস্রাধিক মানুষের তাজাপ্রাণ। বিষমভাবে ক্ষতি হয়েছিল ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, গাছপালাসহ নানা সহায়-সম্পদের। অতীতে সব সরকারের আমলে বেড়িবাঁধ নির্মাণের আশ্বাস মিলেছিল। ১৯৯৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন সংসদ সদস্য এ বি এম আবুল কাসেমের উদ্যোগে পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম দক্ষিণ সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধবিহীন উপকূলীয় ভাঙ্গন-এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। মন্ত্রী সেদিন বেড়িবাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অতীতে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে দেনদেরবার করেও কোনো কুলকিনারা করতে পারেননি। এদিকে দক্ষিণ সীতাকুণ্ডের সলিমপুর, ভাটিয়ারি, সোনাইছড়ি, দক্ষিণ কুমিরা এলাকায় নদীর তলদেশ ভরাট ও চর জেগে ওঠায় ভাঙ্গন বন্ধ হলেও জোয়ারের পানির জ্বালায় মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অন্যদিকে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রোপকূলীয় এলাকায় ভাঙ্গন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় উপকূলবাসী মহাবিপদে আছে। সিকদারখাল থেকে আকিলপুর পর্যন্ত বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানি বাড়িঘরে ঢুকে শতশত পরিবারের স্বাভাবিক জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। জোয়ারের জলে পুরো এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে; চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠির অভাব নিত্যসঙ্গী হয়ে পড়েছে। বছরখানেক আগে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আজিজুল হকের উদ্যোগে বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে ভাঙ্গন এলাকায় মানববন্ধন পালন করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, বেড়িবাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে শিপব্রেকিং ব্যবসায়ীরা বড় বাধা। শিপব্রেকিং ইয়ার্ড না থাকলে এতদিনে সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়ে যেতো। অতীতে শিপব্রেকিং ব্যবসায়ীরা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে বিভ্রান্ত করেছে। সীতাকুণ্ড বেড়িবাঁধ বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক আ ফ ম মফিজুর রহমান বলেন, “আমরা বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্যে দেনদরবার করলেও শিপব্রেকিং ব্যবসায়ীরা এর বিরোধিতা করেন। তাদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে ১৯৯৬ সালে পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থাকলে বেড়িবাঁধের দরকার নেই।” যুগের যুগের যুগ বেড়িবাঁধের অভাবে শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডের সমুদ্রোপকূলীয় এলাকার লাখলাখ মানুষ এভাবে জোয়ারের পানিতে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ঘটবে প্রাণহানি আর আমাদের জনপ্রতিনিধিদের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকবে না, তারা বার বার বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়ে নিজেদের আখের গোছাবে- তা তো হতে পারে না। অতীতের সরকারগুলো না হয় আর্থিকভাবে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল বলে বেড়িবাঁধ নির্মাণের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নিতে পারেনি। কিন্তু বর্তমান সরকার তো আর্থিকভাবে অনেক সচ্ছল। তারপরও সরকারের মেয়াদ শেষ হতে চললেও সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণে পানিসম্পদমন্ত্রীকে রাজি করানোর ব্যর্থতা কার- তা উপলব্ধি করতে আমাদের আর কতো সময় লাগবে?   লেখক- প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী।               

যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্বের স্বার্থে ছাত্র সংসদ সচল করা জরুরি

ঢাকসু নির্বাচনের দাবিতে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা জেগে উঠেছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে ছাত্রশিক্ষক মল্লযুদ্ধও হয়ে গেছে। গত ৯ আগস্ট শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে ‘দুই চাক্কার মিছিল’বের করে। এরপরদিন ১০ আগস্ট একই দাবিতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ঢাবি’র মধুর ক্যান্টিনের সামনে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দেরিতে হলেও ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বোধোদয় হয়েছে; সোচ্চার হয়ে উঠেছেন তাদের প্রাণের দাবি আদায়ে। শুধু ঢাকসু নয়, দেশের সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালেয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়ার এখনই সময়। তবে ঢাকসু দিয়ে এর শুরুটা হোক- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। যোগ্য ও মেধাবী ভবিষ্যত রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বার্থে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরি হলেও দীর্ঘ দু’যুগ ধরে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ‘নেতৃত্ব তৈরির কারখানা’ছাত্র সংসদকে কেন অচল করে রাখা হয়েছে- তা বোধগম্য নয়। দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরার পরও এর চাকা সচল হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়, প্রতিভাবান ও যোগ্য-নেতৃত্ব তৈরি, মুক্তবুদ্ধিচর্চা, জাতির ক্রান্তিলগ্নে অগ্রণী ভূমিকা পালন ও জাতি গঠনমূলক কাজে ছাত্র সংসদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ছাত্রসংসদের নেতারা বায়ান্নোর ভাষাআন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ জাতির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। গণতন্ত্রের বিকাশে মুক্তবুদ্ধিচর্চার কোনো বিকল্প নেই। অথচ প্রায় সিকিশতাব্দি ধরে মুক্তবুদ্ধিচর্চার সূতিকাগার ঢাকসু, চাকসু, জাকসু, রাকসু ও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, আবাসিক হল ও বিভাগগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। এর অন্যতম একটি ‍প্রধান কারণ হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ছাত্রসংগঠনের নেতারা চান না ছাত্র সংসদ সচল হোক। কেননা বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের যেসব ছাত্রনেতা আছেন, তারা দলীয় কর্মীদের ভোটে নির্বাচিত নেতা নন; তারা সংগঠনের নেতা হয়েছেন দলীয় হাইকমান্ডের করুণা ও আশীর্বাদে। তারা ভালো করে জানেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন যদি দেয়া হয়, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মন জয় করে ভোটে নির্বাচিত হতে পারবেন না। কেননা, সে-ই ইমেজ তাদের নেই। আর যদি নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদ গঠিত হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনের নেতাদের কর্তৃত্ব ও গুরুত্ব আর থাকবে না। তাই ছাত্রনামধারী নেতারাই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও চায় না ছাত্র সংসদ সচল করে তাদের একতরফা সুবিধাভোগের পথে ‘বাড়তি ঝামেলা’ তৈরি হোক।    পুঁথিগত জ্ঞানার্জন আর সনদপ্রাপ্তিই কেবল উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হতে পারে না। পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানার্জনের জন্য আরো অনেককিছু জানা অত্যাবশ্যক। উচ্চশিক্ষার বিষয়টি আরো ব্যাপক। পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসমাজের এসব অনুসঙ্গগুলো পূরণ করতে প্রয়োজন ছাত্র সংসদ। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিদাওয়া তুলে ধরার প্লাটফরম হচ্ছে এ ছাত্র সংসদ। শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নানামুখি সমস্যার মুখোমুখি হয়। অপর্যাপ্ত পরিবহন, লাইব্রেরিতে বইসঙ্কট, হলে সীট না পাওয়া, নিম্নমানের খাবার ইত্যাদি সমস্যা তাদের নিত্যসঙ্গী। অথচ ছাত্র সংসদ না থাকায় এসব সমস্যা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার কোনো মাধ্যম নেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো প্লাটফরমে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। ফলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত দু’যুগের বেশি সময় ধরে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে। অন্যদিকে ছাত্রনামধারী নেতারা ছাত্রদের কল্যাণ করার পরিবর্তে নিজেদের আখের গোছানোয় ব্যস্ত। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হল দখল, ফাও খাওয়াসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে তারা। ছাত্র সংসদ সচল হলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রনামধারী ‘গুণ্ডা-পাণ্ডারা’ বিতাড়িত হতে বাধ্য হতো। ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল সোনালী সেই অতীত আবার পুনরুদ্ধার হতো। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে বিশেষ করে সরকার ও রাজনৈতিক দল পরিচালনায় যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্বের যে চরম সঙ্কট চলছে – তা দূর হতো, অতীতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি সর্বসাধারণের যে শ্রদ্ধাবোধ ছিল- সেই প্রবণতা ফের জেগে উঠতো। দেশের ‘দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ’ ছাত্র সংসদ সচল না হওয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না। সরকার চাইলে যেকোনো মুহূর্তে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ সচল করার নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু নানা আশঙ্কার কথা ভেবে শাসকদল চাইছে না ছাত্র সংসদ সচল করে ‘খাল কেটে কুমির আনতে’। অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে, দেশের বেশিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রসংসদে সরকারবিরোধী সংগঠনের অনুসারীরা জয়লাভ করে। ছাত্ররা সচরাচর অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি কোনো বিশেষ ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে তা সরকারের জন্যে হয়ে ওঠে অত্যন্ত ভীতিকর ও বিব্রতকর। সরকার সমর্থক ছাত্র সংসদ থাকলে সরকার মোটামুটি স্বস্তিতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে যদি বিরোধীদলের অনুসারি থাকে তাহলে সরকার সর্বদা প্রচ্ছন্ন স্নায়ুচাপের মধ্যে থাকে। অত্যন্ত সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করে চলতে হয় সরকারকে। কখন কোন্ ইস্যুতে ছাত্ররা ফুঁসে ওঠে সে ভয়ে তটস্থ থাকতে হয় সরকারকে। কিন্তু বর্তমানে ছাত্র সংসদ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি নেতৃত্বহীন। শাসকদলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছুই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আর সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা একাকার হয়ে সকল সুযোগ-সুবিধে ভোগ করে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি চলে সমানে। সম্মানিত শিক্ষকদের অনেককে সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থকে পরিহার করে নিজস্বার্থে তথাকথিত ছাত্রনেতাদের সমীহ করে চলতে দেখা যায়। পদ-পদবী ধরে রাখতে, নতুনপদে আসীন হতে নিজছাত্রের কাছে আত্মসমর্পন করতে অনেক শিক্ষকের মোটেও লজ্জাবোধ হয় না। ক্যাম্পাসে সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠনের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে যায়। এ অবস্থা আর বেশিদিন চলতে পারে না।  লেখক : প্রধান-সম্পাদক, চাটগাঁর বাণী  

পর্যটনমন্ত্রীর ঘোষণার পরও সীতাকুণ্ড পর্যটনকেন্দ্র স্থাপিত হয়নি

পর্যটন মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দু’দশক অতিবাহিত হলেও সীতাকুণ্ড পর্যটনকেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। ১৯৯৭ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন পর্যটন মন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে এখানে পর্যটনকেন্দ্র গোড়াপত্তনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর ঘোষণার ১ মাস পর অর্থাৎ ২৬ নভেম্বর ১৯৯৭ বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ম্যানেজার (পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, পরিসংখ্যান ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক) এ এন এমদাদুল হকের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের একটি টিম পর্যটনস্পট নির্মাণের লক্ষ্যে এখানের সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। প্রাথমিকভাবে এখানে একটি পর্যটনস্পট, ১টি রেস্তোরাঁ ও ১টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হবে বলে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়। এসব স্থাপনের জন্যে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণপূর্বক স্থানের বিবরণী অতিসত্ত¡র পাঠানোর জন্যে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর কিছুদিন পর পর্যটনমন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর রদবদল হয়। পর্যটন মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী হন প্রতিবেশি উপজেলা মীরসরাইয়ের কৃতিসন্তান বর্তমান গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। স্বাভাবিকভাবেই সীতাকুণ্ডবাসী আশা পোষণ করেছিল, অচিরেই সীতাকুণ্ড পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হবে। কিন্তু অজ্ঞাতকারণে পর্যটনকেন্দ্র বিষয়ক ফাইলের আর ঊর্ধ্বমুখি যাত্রা শুরু হয়নি। সীতাকুণ্ড পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন পর্যটনমন্ত্রী হওয়ার পর কেন তা বন্ধ করা হয়েছিল- সেই রহস্যের আজও কোনো কুলকিনারা হয়নি। প্রয়োজনীয় সম্ভাব্য সকল প্রাকৃতিক উপাদান বিদ্যমান থাকার পরও শুধু সরকারি সদিচ্ছা ও উদ্যোগের অভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডে পর্যটনকেন্দ্র ও পিকনিকস্পট গড়ে ওঠেনি। সৈকতশহর কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্নস্থানে গড়ে ওঠা পর্যটনস্পটগুলোর চেয়ে সীতাকুণ্ড কোনো অংশে কম নয়। বিভিন্ন সময়ে এখানে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা ‘রূপে ররাণী’ সীতাকুণ্ডকে বাংলার দার্জিলিং বলে অভিহিত করেন। পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি হিন্দুসম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থস্থান সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ ধামকে জাতীয় মহাতীর্থ করা গেলে এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়শীর্ষে অবস্থিত মঠ-মন্দিরের মতো সীতাকুণ্ডেও চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে রূফওয়ে পদ্ধতি কিংবা ক্যাবল-কার এর ব্যবস্থা করা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের আগমনে সীতাকুণ্ড আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় রূপান্তরিত হতো। এতে বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিকমুদ্রা আয়ের পথও সুগম হতো। গিরি-সৈকতের ছায়াতলে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলসড়কের দু’পাশে অবস্থিত শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ডের খ্যাতি রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সনাতনধর্মীদের তীর্থস্থানের কারণে রয়েছে এর বিশ্বজোড়া পরিচিত। চন্দ্রনাথ, স্বয়ম্ভুনাথ, বিরূপাক্ষ, গয়াকুণ্ড, পাতালপুরী, শংকরমঠসহ অনেক মঠমন্দির রয়েছে এখানে। আছে বার আউলিয়া মাজার, গফুরশাহ মসজিদসহ নানা পীর আউলিয়ার দরগাহ। এছাড়া রয়েছে ছোট-বড়- মাঝারি মিলিয়ে দেড়শতাধিক শিল্পকারখানা ও শতাধিক শিপব্রেকিং ইয়ার্ড। পূর্বের বিশাল পর্বতমালা, পশ্চিমে সমুন্দ্র; বুকচিরে বয়ে গেছে জাতীয় অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক ও রেলসড়ক। সমুদ্র উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সংলগ্ন এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠেছে বনাঞ্চল। উত্তরসীতাকুণ্ডের পাহাড়ে আছে ঐতিহাসিক ‘সহস্রধারা’- যেখানে কবি সাহিত্যিকেরা তাদের সরস উপকরণ খোঁজে পান। আর শিল্পীর তুলি খোঁজে পায় জীবনের অসাধারণ স্বাদ। বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে রয়েছে সেই বহুল আলোচিত অগ্নিকুণ্ড-যেখানে অবিরত জ্বলছে আগুন। অবাক-বিষ্ময়ে থমকে দাঁড়ায় দর্শনার্থীরা। ভূতত্ত¡বিদেরা অবশ্য অগ্নিকাণ্ডের এ ঘটনাটিকে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নিঃসরণের কথা বললেও ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা আবহমানকাল থেকে এটিকে পূণ্যার্জনের মাধ্যম হিসেবে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করে আসছে। গয়া, কাশি ও বৃন্দাবনের মতো সীতাকুণ্ডও বাংলাদেশি সনাতন স¤প্রদায়ের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র। শুধু তাই নয়, সীতাকুণ্ডে তীর্থকাজ সম্পন্ন না করলে কোনো তীর্থই সম্পন্ন হয় না হিন্দুধর্মালম্বীদের। প্রতিবছর শিবচতুর্দশী মেলার সময় এখানে সমাগম ঘটে লাখ লাখ মানুষের। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকেও একসময় প্রচুর পুণ্যার্থী এখানে আসতেন। মেলার সপ্তাহখানেক আগে থেকে বিশেষ ট্রেনে ছুটে আসতেন মাড়োয়ারিরা। বর্তমানে বিদেশী পুণ্যার্থীরা আগের মতো না আসলেও মেলা উপলক্ষে চন্দ্রনাথধামে অগণিত মানুষের ঢল নামে। হিন্দুধর্মালম্বী ছাড়াও অন্য ধর্মের অনুসারীরাদেরও মেলার ভিড়ে হারিয়ে যেতে দেখা যায়। শীতমৌসুমে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধামে দর্শনার্থীদের ভীড় সবার নজর কাড়ে। পিকনিক পার্টির তৎপরতা তো আছেই। বিশেষ করে প্রতি শুক্র-শনিবার কিংবা সরকারি ছুটির দিনে চন্দ্রনাথের পাদদেশে পিকনিকের যানগুলোর দাপট লক্ষ্য করা যায়। অসংখ্য বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ইত্যাদি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তরুণ-তরুণীদের আনাগোনায় এ সময় মুখরিত হয়ে ওঠে নীরব-নিস্তব্ধ পাহাড়ি পরিবেশ। এখানের পাহাড়ের বিশাল মৌনতা পর্যটকদের ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যায়। স্রোতস্বিনী ঝর্ণার অনন্য ধ্বনির তালে তালে, আমলকি, হরিতকির ছায়া মাড়িয়ে দর্শনার্থীরা প্রিয়জনকে নিয়ে হারিয়ে যেতে পারে পাহাড়ের অলিতে-গলিতে। প্রতিবছর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত¡ বিভাগের শিক্ষকদের নেতৃত্বে ছাত্রছাত্রীরা বাস্তব জ্ঞান আহরণের জন্যে খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে সপ্তাহ ও পক্ষকালব্যাপী অনুসন্ধানকাজ চালাতে দেখা যায়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা এখানের প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, গালফ্রা হাবিব লিমিটেডসহ বিভিন্ন কলকারখানায় কারগরি দিক দর্শন করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে থাকে। সীতাকুণ্ডের পশ্চিমে রয়েছে সুদীর্ঘ সমুদ্রোপকূলীয়-বেড়িবাঁধ। এখানে আছে উপকূলীয় বনবিভাগের সাফল্য বেড়িবাঁধ ও এর পশ্চিমে এক-দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা নিবিড় অরণ্য। সামুদ্রিক পাখির কলকাকলী, পালতোলা নৌকায় বসা মাঝি-মাল্লার ভাটিয়ালী সুর, বাবলাগাছের ছায়ায় বসে জোয়ার-ভাটার খেলা ও মাছধরার দৃশ্য দেখা, রাখালের বাঁশের বাঁশির অপূর্ব নিনাদ, গরু-ছাগল, মহিষ-ভেড়ার অবাধ বিচরণ, সূর্য পশ্চিমদিগন্তে বিলীন হওয়ার মূহুর্তেও দৃশ্য, সবুজ গাছ-গাছালির সমারোহ সবকিছু মিলে এক অনির্বচনীয় মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়-যা শুধু দেখার, উপভোগ ও উপলব্ধি করা যায়। বর্ণনা করা যায় না। মনমাতানো উপকূলীয় এ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দর্শন থেকে শুধুমাত্র যোগাযোগের দৈন্যতার কারণেই ভ্রমণপিপাসুরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানকার অন্য একটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হচ্ছে ভাটিয়ারির মিলিটারি একাডেমি ও গলফ ক্লাব সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় সৃষ্ট লেকগুলোর পরিবেশ। এখানে পড়ন্ত বেলায় দেশি-বিদেশি নানা বয়সী মানুষগুলো অবসরের সময়টুকু ব্যয় করেন নৈসর্গিক সৌন্দর্য আস্বাদনে। লেকের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে বিলাসবহুল দামি গাড়িগুলোর বহর। এসময় ওঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের উদাস মনে ঘোরা-ফিরা, আড্ডা দেওয়া ও নানা  গল্পগুজবে মেতে ওঠার চিত্র এখানে নিত্য দিনের দৃশ্য। অন্যদিকে সমুদ্রোপকূলীয় এলাকার বগাচতর, মহানগর, বাঁকখালী, সৈয়দপুর, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করে আনন্দ ও জিজ্ঞাসার চূড়ান্তপ্রাপ্তি ঘটে- যা দর্শনার্থীর জন্যে বাকি জীবনের বিরাট এক সঞ্চয়। এখন যা প্রয়োজন তা হল, সমুদ্রোপকূলীয় ও পাহাড়ি এলাকায় বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসার সুবিধার্থে আন্তঃযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত পশ্চিমে যেসব গ্রামীণসড়ক রয়েছে সেগুলোর সংস্কার ও প্রশস্ত করা। সড়কগুলো হচ্ছে- কমর আলী-কমলদহ সড়ক, টেরিয়াইল সী রোড, বাংলাদেশ সীরোড (বড় দারোগা হাট বাজারের পশ্চিমে), মীরের হাট সীরোড, গোলাবাড়িয়া সীরোড, মুরাদপুর-ফকিরহাট রোড,মান্দারিটোলা সীরোড, বাঁশবাড়িয়া সীরোড, কুমিরা ঘাটঘর রোড, শীতলপুর রোড ও লতিফপুর সড়ক। অপর দিকে সমতলভূমি থেকে প্রায় ১৪শ ফুট উচু পাহাড়ে অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে শুরু হয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে তিন কিলোমিটার লম্বা মাইক্রোয়েভ সড়কটি ফকিরহাট এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে মিশেছে। ইট বিছানো এ রাস্তাটি ১৯৬৯ সালে নির্মিত হয়। এ রাস্তাটিকে ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন করা গেলে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা অনায়াসে পাহাড় শীর্ষে ওঠে একনজরে জল-স্থল ও অন্তরীক্ষের অনেক কিছু দেখার সুযোগ পাবে। উল্লেখ্য, একুশবছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সীতাকুণ্ডের এমপি আলহাজ্ব এ বি এম আবুল কাসেম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সীতাকুণ্ড পরিদর্শন করান এবং সীতাকুণ্ডের উন্নয়নে যুগান্তকারী নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। সড়ক ও জনপথ (সওজ) এর অধীনে এনে উত্তর বগাচতর থেকে ছোটকুমিরা পর্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভেতর দিয়ে অবস্থিত হাবিব আহমদ চৌধুরী রোডের ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন, উত্তর বগাচতর এলাকায় বিদ্যুাতায়ন, সীতাকুণ্ড সদরের টিএন্ডটির পিসিও (পাবলিক কল অফিস) ভবনে ৫০০ লাইনের ডিজিটাল টেলিফোন একচেঞ্জ স্থাপন, যানজট নিরসনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের  সীতাকুণ্ড বাজার (উপজেলা সদর) ও কুমিরা বাজার এলাকায় বাইপাস রোড নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ, সীতাকুণ্ড সদর ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক স্থাপন, সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ ধামকে জাতীয় মহাতীর্থ করার প্রচেষ্টা, সীতাকুণ্ডে পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করাসহ গ্রামীণ অবকাঠামো ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে নজিরবিহীন অবদান রাখেন। সীতাকুণ্ডের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ওপর ভর করে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক নির্মাণ করা হলেও পর্যটকদের সুবিধার্থে তেমন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় প্রায় সময় ছিনতাই ও খুন-খারাবির মতো ঘটনা এখানে ঘটছে।    আমাদের প্রত্যাশা, সীতাকুণ্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পর্যটনের এ অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উদ্যোগী হবেন।লেখক: প্রধানসম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী।    

সীতাকুন্ডের তিন সেচ-প্রকল্প ২৫ বছর ধরে ফাইলবন্দি

সীতাকুন্ডের কৃষিক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন তিনটি প্রস্তাবিত সেচ-প্রকল্প পঁচিশ বছর ধরে পানিসম্পদ-মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। সময়ের ব্যবধানে প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ এলাকার জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তন হলেও আলোর মুখ দেখেনি সেচ প্রকল্প তিনটি। ফলে এ এলাকার কৃষকদের দীর্ঘদিনের সেচ-সমস্যা রয়েই গেছে। প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এল কে সিদ্দিকী। পরবর্তীতে পানিসম্পদমন্ত্রী হয়েও তিনি তার স্বপ্নের এ সেচ-প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান অর্থ ছাড় না দেয়ায় প্রকল্পত্রয় আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্প তিনটির বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল তখন ৫ কোটি ১১লাখ টাকা ও ১৫শ মেট্রিক টন গম। বর্তমানে এর ব্যয় আরও বাড়বে। ১০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সীতাকুন্ডের অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ এ তিনটি সেচ-প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। শিল্পাঞ্চল সীতাকুন্ড কৃষিতেও সমৃদ্ধ একটি জনপদ হিসেবে পরিচিত। সীতাকুন্ডকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের ‘সবজিজোন’ বলা হয়। চট্টগ্রামশহরসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে শাক-সবজি যোগানের ক্ষেত্রে সীতাকুন্ডের অবদান অনস্বীকার্য। এখানের কৃষকদের আয়ের উৎস জমির আইলে উৎপাদিত সীম। সীতাকুন্ডের সীম প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয়। সীতাকুন্ডকে অনুসরণ করে দেশের অন্যান্য স্থানেও সীম উৎপাদন শুরু হয়েছে। সীতাকুন্ডের ভূগর্ভে পানির স্তর না থাকায় গভীর নলকূপ(সেচ) বসানোর সুযোগ নেই। ফলে সেচ সংকট এখানে তীব্র। চাষাধীন মাত্র ৫ শতাংশ জমিতে সেচ সুবিধা রয়েছে। সেচ সংকটের কারণে তৃতীয় ফসল বোরো চাষ করা যাচ্ছে না বলেই বছরে এখানে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতি হয়। অথচ চাষাধীন ১০০ ভাগ জমি সেচসুবিধার আওতায় আনা হলে সীতাকুন্ডের খাদ্য-চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি খাদ্যশস্য অন্যত্র সরবরাহের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। সীতাকুন্ডের সেচ সংকট দূরীকরণের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে ইঞ্জিনিয়ার এল কে সিদ্দিকী এমপি এখানের খালের ওপর সেচ-প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সেচ-প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ অঞ্চলের প্রধান তিনটি খাল যথাক্রমে বোয়ালিয়া খাল, গুপ্তাখালি খাল ও নোনাছড়া খালকে সেচ-প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। প্রস্তাবিত এ তিন সেচ-প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, দুই পাহাড়ের মধ্যে আড়াআড়ি বাঁধনির্মাণ করে পানি সংরক্ষণাগার সৃষ্টি করা এবং আবাদি জমিতে সেচ প্রদান করে উচ্চফলনশীল ধানসহ অন্যান্য মৌসুমী ফসল উৎপাদন করা। তাছাড়া প্রস্তাবিত সেচপ্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত হলে এলাকার পানি নিষ্কাশন, বণ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মৎস্যচাষের ব্যাপক উন্নতি হবে বলে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বোয়ালিয়া সেচ-প্রকল্প সীতাকুন্ড উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বোয়ালিয়াকুল এলাকায় প্রকল্পটির অবস্থান। এ প্রকল্পের উত্তরে পোল্ডার নম্বর ৬১/১, পূর্বে বিশাল পাহাড়, দক্ষিণে সোনাইছড়ি উপপ্রকল্প ও পোল্ডার নম্বর ৬১/১, সীতাকুন্ড পাহাড় থেকে একটি প্রাকৃতিক জলস্রোত উৎপন্ন হয়ে বোয়ালিয়া খাল নাম নিয়ে পোল্ডার নম্বর ৬১/১ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইচ ১৬ ও ১৬এ দ্বারা সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়, সীতাকুন্ড পাহাড়ের যে স্থান থেকে বোয়ালিয়া খালের উৎপত্তি হয়েছে সেই উৎপত্তিস্থলে তিনদিক পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে মাত্র একদিকে ৩০০ মিটার লম্বা ও ১০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১.৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাবিশিষ্ট একটি পানি সংরক্ষণাগার বা রিজার্ভার তৈরি করা সম্ভব। যেখানে বর্ষাকালে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্কমৌসুমে বিভিন্ন পানি নিয়ন্ত্রক অবকাঠামো, চেক স্ট্রাকচার ও লো-লিফট পাম্পের মাধ্যমে ভাটির দিকে জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা এবং সারা বছর মৎস্য চাষ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত পানি সংরক্ষণাগারে মোটামুটি পানি ধারণক্ষমতা হবে ১১,২৫,০০০ ঘনমিটার (৩০ শতাংশ পানি অপচয় ধরে) যার দ্বারা প্রায় ৭৫০ হেক্টর উচ্চফলনশীল ধানের জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২০ হাজার লোক এবং ৩ হাজার পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে ।প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১কোটি ৮০ লাখ টাকা। গুপ্তাখাল সেচ-প্রকল্প এই প্রকল্পের উত্তরে সীতাকুন্ড উপজেলা সদর, পূর্বে সীতাকুন্ড পাহাড়, দক্ষিণে বোয়ালিয়া খাল সেচ-প্রকল্প ও পশ্চিমে পোল্ডার নম্বর ৬১/১। বাড়বকুন্ড পাহাড় থেকে একটি প্রাকৃতিক জলস্রোত উৎপন্ন হয়ে গুপ্তাখালী খাল নামে পোল্ডার নম্বর ৬১/১ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইচ নম্বর ৫-৬ দ্বারা সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক জরিপে বলা হয়, বাড়বকুন্ড পাহাড়ের যে স্থান থেকে গুপ্তাখালী খালের উৎপত্তি হয়েছে সেখানের তিনদিক পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত বলে একদিকে ৩০০ মিটার লম্বা ও পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি পানি সংরক্ষণাগার তৈরি করা সম্ভব। প্রস্তাবিত পানি সংরক্ষণাগারে পানি ধারণক্ষমতা হবে ১,১২,৫০,০০০ ঘনমিটার। এ পানি দ্বারা ৫৫০ হেক্টর উচ্চফলনশীল ধানের জমিতে সেচসুবিধা ছাড়াও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যাবে। প্রকল্প এলাকার ৩/৪ হাজার লোকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গুপ্তাখালী খাল পুনঃখননের জন্যে গম ধরা হয় ৫শ মেট্রিক টন। নোনাছড়া সেচ-প্রকল্প প্রকল্পটির উত্তরে পোল্ডার নম্বর ৬১/১ এর উত্তরাংশ, পূর্বে সীতাকুন্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়, দক্ষিণে সীতাকুন্ড উপজেলা ও পৌরসভা সদর ও পশ্চিমে পোল্ডার নম্বর ৬১/১। সীতাকুন্ড পাহাড় থেকে প্রাকৃতিক জলস্রোত উৎপন্ন হয়ে নোনাছড়া নামে পোল্ডার নম্বর ৬১/১ এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইচ নম্বর ১৩ সি ও ১৩-১৪ দ্বারা সন্দ্বীপ চ্যানেলে পড়েছে। প্রকল্পটির তিনদিক পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাই একদিকে ২০০ ও ১৫০ মিটার লম্বা ও ১০মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট মাটির বাঁধ নির্মাণ করে পাহাড়ের মধ্যে প্রায় ১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা যেতে পারে। এ পানি সংরক্ষণাগারে পানি ধারণ ক্ষমতা হবে ৭৫,০০০০০ ঘনমিটার (৩০% পানি অপচয় ধরে)। যা দিয়ে ৫শ হেক্টর উচ্চফলনশীল ধানের জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এখানের ১৫ হাজার লোক ও ২ হাজার পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রকল্প তিনটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকার উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। এলাকার ভৌত পরিবেশের প্রভুত উন্নতি ঘটবে। প্রকল্পে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্তির কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে। আশা করি, জনস্বার্থে বিষয়টি নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিরা সক্রিয় হবেন।    লেখক: প্রধান সম্পাদক, চাটগাঁর বাণী।  

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে তৃণমূলে কমিউনিটি ব্যাংকিং

প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যখন সামাজিক যোগাযোগতত্তের মাধ্যমে উন্নয়নে ভূমিকা রাখে তখন তা মোট জাতীয় উৎপাদনশীলতায় সংযুক্তি ঘটে। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় যখন সামাজিক যোগাযোগতত্তটি কাজ করে তখন এটি মানুষের অস্তিত্ব ও বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে হত দরিদ্র ও দরিদ্রদের মধ্যে কাজ করে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ তত্তের কারণেই বর্তমান সরকার আর্থিক অন্তর্ভূক্তিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে যার মাধ্যমে মানুষ সঞ্চয় বিনিয়োগে উৎসাহী হয় এবং ভোগ প্রবণতায় তার দক্ষতা ও পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়ে থাকে। আর্থিক অন্তর্ভূক্তিকরণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রসঞ্চয়ের জন্য বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য বিশেষত দারিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্য বর্তমান একবিংশ শতকের দ্বিতীয় যুগে সামাজিক যোগাযোগ যথেষ্ট মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি অলিখিতভাবে হাজার বছর ধরে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্রে যারা দেশে দেশে কালে কালে যুক্ত রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগতত্তটি বহুল প্রচলিত একটি ব্যাপার। সামাজিক যোগাযোগতত্তের মাধ্যমে মানুষের ক্ষমতায়ন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয়ভাবেই ঘটে থাকে। পরিবর্তিত বিশ্বের কারণে প্রাচীনকাল থেকে অলিখিতভাবে চলে আসা সামাজিক গণমাধ্যম/ইন্টারনেট/মোবাইল সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে আর্থিক পরিবেশ জানার জন্যে ইন্টারনেট/ মোবাইল ব্যবস্থাপনা অতি দ্রুত কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের একটি গ্রামের কথাই ধরা যাক, যেখানে পূর্বে যোগাযোগে অনেক বিলম্বিত হতো, এখন মুহূর্তের মধ্যে মোবাইল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পলকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ করে খবর সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। গ্রামীণ একজন কৃষক মোবাইলের কল্যাণে শহরে ফোন করে জানতে পারে কি দরে তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ২০১৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য বছর। এ সময়ে অর্থনীতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। যদিও বৈশ্বিক সমস্যা ছিল, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে আগের রমরমা অবস্থা নেই। ফলে বিদেশ থেকে প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণ কিছুটা কমা স্বাভাবিক। অন্যদিকে, গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এবং একবিংশ শতকের প্রথম দশকে যেখানে পোশাক খাত থেকে রপ্তানিলব্ধ আয় ছিল গড়ে ৭৫%-এর মতো তা কিন্তু বর্তমানে বেড়ে ৮২% হয়েছে। অবশ্য হিসাব করে দেখেছি, রপ্তানিলব্ধ আয়ের ক্ষেত্রে, বিশেষত পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে ভ্যালু এডিশন হচ্ছে মাত্র ৩০%। বর্তমান সরকার যেখানে পেটে-ভাতে রাজনীতির বাস্তবায়নে সাফল্য দেখাচ্ছেন সেখানে ব্যাংকিং সেক্টরকে আরো দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। ড. আতিউর রহমানের পরবর্তী মানে বাংলাদেশ ব্যাংক আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের ক্ষেত্রে আগের মতো জোর দিচ্ছেন না। এ নির্দেশনার বাস্তবায়নে ব্যাংকিং সেক্টরকে অবশ্যই দৃঢ় ভূমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান যুগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বতন ভূমিকা কেবল মুদ্রানীতি পরিচালনা, বিনিময়হার নির্ধারণ, লেন্ডার অব দি লাস্ট রিসোর্ট, মার্জিন রিকোয়ারমেন্টের উপর নির্ভর করে পরিচালনা বন্ধ হয়ে গেছে। আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা পরিচালনা, মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পাশাপাশি ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন করে থাকে। দীর্ঘ কাল ধরে যে পুঞ্জীভূত দুর্নীতি বিরাজ করছিল, সরকারের প্রয়াস সত্ত্বেও তাতে তেমন সাফল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ভারতে বর্তমানে কালো টাকা বন্ধে যে পদ্ধতিগ্রহণ করা হয়েছে একজন অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমি মনে করি এটি বেশ কঠোর পদক্ষেপ হয়ে গেছে।  এর ফল সে দেশে কতটুকু সুফল বয়ে আনবে ভবিষ্যত্ই বলবে। তবে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বেশ ভালো। তবে এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো রপ্তানি বহুধা-বিভক্তকরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এমনকি বিদেশস্থ বাংলাদেশের এম্বেসি সমূহ দায়সারা গোছের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর উত্সাহে এসডিজি বাস্তবায়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এসডিজির যে১৭টি মূল লক্ষ্য রয়েছে সেগুলো হচ্ছে: দারিদ্র্যের সকল ধরনের পরিসমাপ্তি, ক্ষুধার পরিসমাপ্তি, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, খাদ্য উপাদানের মান উন্নয়নএবংস্থায়িত্বপূর্ণ কৃষির প্রসারমানতা, স্বাস্থ্য-সেবার উন্নয়ন এবং সব বয়সের মানুষের কল্যাণ সাধন, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সকলের জন্যে সমস্ত জীবনভর শিক্ষার ব্যবস্থা; নারী-পুরুষ সমঅধিকার এবং নারীর ক্ষমতায়ন; পানিওপয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রাপ্যতা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা; সকলের জন্যে জ্বালানির প্রাপ্যতা, সহজলভ্যতা এবং টেকসই পদ্ধতির বাস্তবায়ন; অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক অগ্রগতির টেকসই, বাস্তবসম্মত কর্মসংস্থান পদ্ধতি এবং উপযুক্ত কর্মসংস্থান; অবকাঠামো তৈরি করা, শিল্পায়নকে প্রসারিত ও টেকসই করা এবং অভিনবত্ব আনয়ন করা; দেশের অভ্যন্তরে অসাম্যদূর করা; টেকসই ভোগ প্রবণতা এবং উত্পাদন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; আবহওয়া জনিত পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা; সমুদ্র, নদ নদী এবং জলজ সম্পদের সুস্পষ্ট ব্যবহার যার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব, যাতে করে ইকোব্যবস্থা ঠিক থাকে, বনায়ন ব্যবস্থাপনা করা এবং বন সংরক্ষণ করা; ভূমির সংরক্ষণ এবং জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করা; শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ব্যবস্থা করা; সকলের জন্যে ন্যায়বিচার ও সমতা বিধান করা; কার্যকর হিসাব রক্ষণ করা এবং সর্ব ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা করা, সঠিকভাবে নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণ করে কল্যাণমুখী কার্যক্রম সমূহের বাস্তবায়ন করা এবং বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ মন্তব্য করেছেন যে, সরকার দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও মানবকল্যাণের জন্যে এসডিজি বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যা দেশ এবং দেশের মানুষের উন্নয়নমুখী জীবন যাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আসলে এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত আর শর্তমুক্ত বৈদেশিক সহযোগিতা সমন্বিত ভূমিকা দেশের উন্নয়নের জন্যে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাত সচরাচর সেখানেই বিনিয়োগ করে থাকে যেখানে তাদের বিনিয়োগ ধনাত্মক হয় এবং অনেক খানি মুনাফা অর্জন করতে পারে। অন্যদিকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো সচরাচর শর্তযুক্ত সাহায্য, অনুদান এবং ঋণ প্রদান করে থাকে যা অনেক সময় গ্রহীতা রাষ্ট্রের জন্যে মঙ্গল বয়ে আনে না। এমনকি যারা শর্ত আরোপ করে নিজের দেশের মুনাফা বৃদ্ধি করতে চায় তা শেষ পর্যন্ত আবার তাদের দেশেরই ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে এসডিজি বাস্তবায়নের কলাকৌশল অবশ্যই আমাদের দেশের মতো করে আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে নির্ধারিত হতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে যদিও বৈশ্বিক মানদণ্ড রয়েছে তবে তা আমাদের দেশের জন্যে কতটুকু অনুকূলতা কিন্তু নীতিনির্ধারকদের ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হবে। নচেত্তাদেশের মানুষের জন্য মঙ্গলজনক নাও হতে পারে। তবে এসডিজি বাস্তবায়নে প্রচুর পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আশা করা যাচ্ছেভিশন২০২১এর মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে। খুব বেশি হলে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই তা অর্জন করা যাবে যদি বর্তমান ধারায় অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সুষম বন্টন ব্যবস্থা, জীবনমান উন্নয়নধারা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ উদ্যোগ বহাল থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আগামী বছরগুলোয় প্রায়৬৫% হারে প্রতি বছর বৃদ্ধি পাওয়া দরকার। দেশে সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ দাতাগোষ্ঠী কর্তৃক নির্ধারিত না হয়ে বরং দেশের উপযুক্ত ও লাগসই হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের ব্যবস্থা আরো বাস্তবসম্মতভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। নচেৎ এই সম্পদের অনেক খানি প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ে নিতে পারে। কারিগরি কলা-কৌশল উদ্ভাবনে আধুনিকতা ও বৈশ্বিকতার পাশাপাশি এদেশের উপযোগী নানামুখী প্রযুক্তি তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশীয় জনবল তৈরি করতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতা সব সময়ে দেশের জন্যে ইতিবাচক যাতে হয় সেজন্য দরকষাকষি ও শর্তাবলি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ, বৈজ্ঞানিক কলা-কৌশল ও জনকল্যাণের বিষয়টি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য যে১৭টি লক্ষ্যমাত্রার রয়েছে সেগুলো বিভিন্নমুখী কর্মকাণ্ড ও কর্তৃপক্ষের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। তার বদলে একটি টাস্কফোর্সগঠনকরে একক কমিটির নেতৃত্বে এসডিজির সকল লক্ষ্য বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এদেশের সিংহভাগ জনসংখ্যা বর্তমানে ত্রিশের নিচে। এদের প্রতি লক্ষ রেখে কেবল সরকার নয়, বেসরকারি খাতকে ও তাদের কর্মসংস্থান কৌশল তৈরি করতে হবে। এদিকে  বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে বাংলাদেশ দায়ী না হলেও এখন পর্যন্ত কেবল বাংলাদেশ নয়, অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশই ক্ষতিকারক দেশ থেকে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেনা। দেশে পরিবেশগত মান উন্নয়নে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কিছু অসাধু উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী আছেন যারা অপরের সম্পদ কিংবা নদ-নদী-খাল-বিলকে নিজের মনে করে আত্মসাৎ করে থাকে। আসলে প্রকৃতিকে কেউ ধ্বংস করলে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তার পরিণাম ভোগ করতে হয়। প্রকৃতির প্রতিশোধ বড় নির্মম। দেশ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করতে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ৫১ লাখ ২০ হাজার প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, বিধবা ও শারিরীকভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝে সরকার বিভিন্ন ধরনের ভাতা প্রদান করছে। পল্লী সমাজ সেবা কার্যক্রমের আওতায় সুফলভোগীর সংখ্যা ২৪,১৫,০০০জন। দরিদ্র নারীদের ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য পল্লী মাতৃকেন্দ্র কার্যক্রমের আওতায় বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলায় ৩১৮টি কর্মসূচির আওতায় সুফলভোগীর সংখ্যা ৮৩৪৯৬০। ২০১৬ সালে বয়স্ক ভাতার হার ৪০০টাকা থেকে ৫০০টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যা এখন ৩১.৫ লক্ষ। বিধবা ভাতার হার ও ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, উপকার পাচ্ছেন ১১.৫ লক্ষ দুস্থ ও বিধবা নারী। ৭০ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তির ২০১৬-১৭ সালের বাজেট নির্ধারিত হয়েছে ৪৭.৮৮ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ১৪ লাখ ৯০ হাজার ১০৫ জন শারীরিক প্রতিবন্ধীকে শনাক্ত করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ১০০টি শাখা উদ্বোধনকরা হয়েছে। অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় সুফলভোগীর সংখ্যা বর্তমানে৭.৫০ লক্ষ।২০১৬-১৭ অর্থ বছরে তাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ হয়েছে ৬০০ টাকা হারে ৫৪০কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আটটি উদ্যেগের একটি হচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্প। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২য় পর্যায়ে ২৩৮টি প্রকল্পের অধীনে সুফলভোগীর সংখ্যা২২,০৪০টিপরিবার। এই প্রকল্পের অধীনে ১ লক্ষ ২২ হাজার পরিবারের মধ্যে ৯৭ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে। দেশের জনগণকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আটটি উদ্ভাবনী উদ্যোগের অন্যতম একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। এছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘চরজীবিকায়ন কর্মসূচি-২’, ‘সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচি’, ‘পল্লিজনপদ (উন্নতআবাসন) সৃজন’, ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্টঅফ দি পুওরেস্ট’,  মিল্কভিটার কার্যক্রম সম্প্রসারণ, বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লীউন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা ক্ষুদ্রক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক খামারের সংখ্যা ১৮.৭২ লক্ষ। ডিজিটাল বাংলাদেশের অবদানে সুবিধাভোগীরা অনলাইনের মাধ্যমে ২৫৭৩ কোটি টাকা লেনদেন করেছে। ইতোমধ্যে ৬৪ জেলার ৪৮৫টি উপজেলায় এ অনলাইন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বিআরডিবির আওতায় এ পর্যন্ত ১,৯৯,৬৮৮টি সমিতি ও দল গঠন করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেচ কার্যক্রমের আওতায় সদস্যদের মাঝে১৮,৪৬০টি গভীর নলকূপ, ৪৪,৫২৩টি অগভীর নলকূপ, ১৯,৪০৫টি শক্তিচালিত পাম্প এবং ২,৭৩,০০০টি হস্তচালিত পাম্প বিতরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ৮৮টিপ্রশিক্ষণ, অবহিতকরণ এবং কর্মশালা সংগঠনের মাধ্যমে ৩,৬৫১জন অংশগ্রহণকারীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। চরজীবিকায়ন কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম,জামালপুর, গাইবান্ধা,বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জ জেলার২৮টি উপজেলার২.৫০ লক্ষ মানুষপ্রত্যক্ষ এবং প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ পরোক্ষভাবেউপকৃতহচ্ছে। ড. কাজীখলীকুজ্জমান আহমেদের নেতৃত্বে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) জনকল্যাণে তাদের সহযোগী ১৯৫টি পার্টনার অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে কাজ করে চলেছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)কে ঢেলে সাজানো উচিত। নচেৎ এটি মুখ থুবড়ে পড়া একটি সংস্থায় পরিণত হবে। জনকল্যাণের বিষয়টি উপেক্ষিত হবে। সর্বক্ষেত্রে দারিদ্র্যদূরীকরণের জন্য ৬ষ্ঠ এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকার নানামুখী ব্যবস্থা নিয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়২৮,৭৯৩কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুত। দেশি বিদেশি সব বাধাকে নস্যাৎ করে  দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির এ প্রয়াস সাধুবাদযোগ্য। দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করতে হয়। ১,১৮,০০০কোটি টাকা ব্যয়ে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে যে, এ প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে ২৪০০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। তবে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া দরকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে বিশেষ অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। প্রশাসন যন্ত্র পরিচালনায়-ই-গভর্নেসের ব্যাপ্তি ঘটছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার২ শ৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপিত হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে এর ভালো দিকগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সাইবারক্রাইম ঠেকানোর জন্য সাইবার পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সার্বিক কর্মকাণ্ড ঢেলে সাজানো দরকার। আশা করা যাচ্ছে, এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে যা ২০২১ সাল নাগাদ কাজ শুরু করতে সক্ষম হবে। লেইক এবং হাকফেলট (১৯৯৮) সালে মন্তব্য করেছেন যে, সামাজিক পুঁজি যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে যা নাগরিকদের মধ্যে একটি সম্পর্ক উন্নয়ন করে থাকে, সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধি করে এবং কৌশল হিসাবে রাজনৈতিক উপায় ও প্রক্রিয়াকে অনেকাংশে সাফল্য দিতে সক্ষম হয়। লিডবিরটর (১৯৯৭) সালে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সামাজিক উদ্যোক্তা উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী হয়ে থাকে। তার এ বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য। যখন কোনো উদ্ভাবনই ঘটে থাকে তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এ উদ্ভাবনী শক্তিকে মানুষ যদি তার ও সমাজের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিচালিত করে তবে তা দেশ ও জাতির জন্যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। আবার খারাপ কাজে ব্যবহার করলে তা কিন্তু হিতসাধনের বিপরীত ভিন্নমুখীতা দেয়। রাথানআউয়ে বুনজম এবং আলি বলেন, আরও নিবিড় ও বাস্তবমুখী নীতিবিশেষ করে স্ব-প্রণোদিত উদ্যোক্তাদের জন্য সামাজিক উদ্যোগ উন্নয়নের জন্য উন্নত করা উচিত। গবেষণা কাজ থেকে অভিজ্ঞতা, তারা পালন করে গ্রামীণ দরিদ্র সংগঠিত এবং স্ব-নিয়ন্ত্রিত কমিউনিটি ভিত্তিক সংগঠন যা সামাজিককল্যাণ এবং Pareto optimality নিশ্চিত একসঙ্গে কাজ করছে। নেই শুধু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের, কিন্তু এছাড়াও মাইক্রো উদ্যোগের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ অগ্রাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তি পাওয়া উচিত দারিদ্র্য বিমোচন, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি কৌশলগত মিত্রতার উপর বিশেষ জোর দিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ খাতে প্রয়োজনীয় যথাযথ পদক্ষেপ উন্নয়নশীল জন্য প্রয়োজন হচ্ছে দেশের ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের। রাজনৈতিক দর্শনই বর্তমানে সামাজিক পুঁজি গড়ে উঠতে সহায়তা প্রদান করছে যা জনমানুষের বহুমুখী দরিদ্রতা থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হচ্ছে।পরিবেশ অবশ্যই সামাজিক উন্নয়ন, ন্যায়বিচারও সুষম বন্টন ব্যবস্থার উপর জোর দিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে অতি দরিদ্রের সংখ্যা যেভাবে হ্রাস পাচ্ছে তা বস্তুত সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের পাশাপাশি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আশার কথা সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অন্তর্ভূক্তির ক্ষেত্রে আট ধাপ অবস্থান উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে। কমিউনিস্ট ব্যাংকিং তৃণমূল পর্যায়ে করা গেলে গতিময়তা পাবে। সামাজিকযোগাযোগের ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসাবে বিবেচিত হয় সামাজিকবুদ্ধিমত্তা। রিগো (২০১৪) মন্তব্য করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাধারণ চলার মতো গুণ এবং সমাজের অন্যদের সাথে একীভূতভাবে কর্মসম্পাদন করার ক্ষমতা বোঝার। রিগোর এ বক্তব্য অতিশয়তাৎপর্য মণ্ডিত। আমরা যদি মনুষ্যসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করি তবে দেখব যে, অগ্রসারমান জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে সামাজিক বুদ্ধিমত্তা একটি অন্যতম উপাদান হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। আসলে যুথবদ্ধভাবে সমাজে বাস করতে গেলে সামাজিক বুদ্ধি অত্যন্ত প্রয়োজন হয়, যা সমাজের নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে থাকে। আমরা যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করি পারমাণবিক বোমা উদ্ভাবনের পর নাগাসাকি ও হিরোশিমাকে তা মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আবার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে সামাজিক উদ্যোক্তারা সমাজে দক্ষতা, কার্যকারিতার মাধ্যমে যোগ মূল্যসংযুক্ত করতে সক্ষম হয়ে থাকে। এদেশে আবহমানকাল থেকে সামাজিক ব্যবসা প্রচলিত ছিল যার মূলভিত্তিভূমি ছিল সামাজিক পুঁজি, বিনিয়োগও শ্রম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের উপর জোর দিচ্ছেন। এটি সামাজিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্রসঞ্চয়কে একত্রিত করে সামাজিক পুঁজিতে রূপান্তর ও পাশাপাশি মানবপুঁজি এবং যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন, কর্মদক্ষতা ও কার্যকারিতা পরিদর্শন করা সম্ভব হয়। উদ্যোক্তাকে অবশ্যই সামাজিক উন্নয়নে জনগণের প্রয়োজনের নিরিখে স্বল্প মূল্যে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। অবশ্য সরবরাহজনিত ব্যবস্থাপনার অপ্রতুলতার কারণে অধিকাংশ কৃষক ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত হচ্ছে। মাঝখান থেকে মধ্যস্বত্ব ভোগীরা লাভ করছে। তারপর ও ৩০/৪০ বছর আগে কৃষক,  মৎস্যজীবীসহ অন্যান্য পেশার লোকদের আগের মতো ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে অবশ্যই বন্টন ব্যবস্থাকে সুষম ও জনমুখী করার প্রয়োজন রয়েছে। নচেৎ এ ব্যবস্থাপনায় যে ত্রুটিসমূহ চিহ্ণিত হবে প্রকারান্তরে তা বাজার ব্যবস্থাপনার সকল ত্রুটিবিচ্যুতিকে দূর করবে না। বরং তথ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা বহাল থাকবে। এজন্যে অবশ্য সরকার মধ্যস্বত্বভোগীদের দূর করার প্রয়াস ও গ্রহণ করেছেন এবং সরাসরি পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবস্থাপনায় জোর দিচ্ছেন। ধীরে ধীরে গ্রামীণ অর্থনীতি যত শক্তিশালী হচ্ছে তত কিন্তু নানামুখী পরিবর্তনশীলতার মাধ্যমে প্রবাহিত হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপাদানসমূহ। এক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিকযোগাযোগ ব্যবস্থাপনা কাজ করে থাকে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্ববাজার ব্যবস্থায় ক্ষমতায়ন, ক্রয়ক্ষমতা এবং সামাজিক উদ্যোক্তা একত্রিতভাবে সামাজিকযোগাযোগ ব্যবস্থাপনাকে একটি দেশের উন্নয়নে কাজ করে অতি দারিদ্র্য কিংবা দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্র থেকে মুক্তি দেয়। এক্ষেত্রে মোবাইল কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অথবা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসাবে পালন করে থাকে। একটি তাত্ত্বিক মডেল উদ্ভাবন: উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আবহমান কাল থেকে চাল সামাজিক যোগাযোগ ও জনগণের ক্ষমাতয়নের একটি তত্ত বা মডেল সচিত্র নিম্নে দেখানো হলো:   চিত্র নং : ১ দেখা যায় যে, পরিবেশও বেশ গুরুত্ব বহন করে থাকে। মোবাইল, প্রযুক্তি, ডিজিটাল এবং ওয়েব ইন্টারফেসের গ্রামাঞ্চলে একটি অনুকূল গ্রামীণ গতিবিদ্যাসহ সামাজিক মিডিয়া তৈরি করবে| প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সামাজিক নেটওয়ার্কিং অনুষ্ঠিত হবে, যাতে জনগণ তথ্যপ্রতি সাম্য করতে অন্তর্ভুক্তি পেতে পারেন | সম্প্রদায় (কমিউনিটি)  ব্যাংকিং মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতে, আনুষ্ঠানিক খাতে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মধ্যে আসা উচিত| কমিউনিটি ব্যাংকিং একটি কম খরচে, যা ব্যাংকিং চ্যানেলে এবং ডাকঘরে বিকল্প একটি বিশেষ নিয়ম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রবিধান এক্ষেত্রে কাজ করতে হবে|  Win-Win অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। কার্যকারিতা ও দক্ষতা দেশীয় এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে এ মূল্য সংযোজনের সাধা সাহায্য করবে| সামাজিক উদ্যোক্তাদের সামাজিক সঞ্চয়ী, সামাজিক পুঁজি এবং সামাজিক নেটওয়ার্কিং থেকে প্রেরণা পেতে এবং সমাজে জনগণের ক্ষমতায়নের তৈরি করবে|  যদি সামাজিক বিনিয়োগ সাহায্যে সামাজিক নিরাপত্তা সামাজিক এন্টারপ্রাইজ উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা যাবে না এমন ঘটতে পারে সামাজিক সঞ্চয়ী সামাজিক বিনিয়োগ প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না যদি বদলে নিষ্কাশন অপচয় সৃষ্টি করতে পারে| টাকার অভাবে কেবল খুলনায় দুটো গ্রামে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে সামাজিক যোগাযোগতত্ত জনগণের ক্ষমতায়নে কাজ করে থাকে। এ লেখকের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল Social Networking অর্থাৎ সামাজিক নেটওয়ার্কিং নামে একটি তত্ত্ব পরীক্ষা করে দেখছেন। প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর কথাই যথার্থ। ক্ষুদ্র ঋণ নয়, বরং ক্ষুদ্র সঞ্চয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জনকল্যাণ করে থাকে। গবেষণার মাধ্যমে এটি পরিষ্ফূটিত হয়েছে যে হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যে সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধন নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রমে সহায়তা করে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংক এখন মান্ধাতার আমলের ধ্যান-ধারণায় কেবল মুনাফামুখী কর্মকাণ্ড করছে। ঋণগ্রহী তাদের ক্ষতি করছে। তবে সরকার বর্তমানে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা, হিজড়া, দলিতও বেদে, বয়স্কদের জন্যে নানামুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে বেশি হিত সাধনে ব্যাপৃত হয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। আসলে প্রতিবন্ধীদেরও যে অধিকার রয়েছে, সামাজিক মর্যাদার রয়েছে এ ব্যাপারে আগে কেউ এভাবে ভাবেননি। উপরোক্ত মডেলটি দেশে বিদেশে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করার জন্যে সরকারও বেসরকারিখাত এবং বিদেশি গবেষকদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। পাশাপাশি আশা করা সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার তাত্তিক বিশ্লেষণকে মানব উন্নয়নে ও আত্মমর্যাদাশীল করে তুলতে হলে আর্থিক অন্তর্ভূক্তিকরণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রসঞ্চয় বাংলাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এ ব্যাপারে সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।   লেখক : অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ E-mail: [email protected]  

দেশের পারমাণবিক ক্ষেত্র, এখনি ভাবার সময়

১৯৫৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজ্যান হাওয়ার্সের ‘এটমস ফর পিস’বক্তৃতা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরমাণু শক্তি ব্যবহারে বিশ্ববাসী যে মানবিক বির্পযয়ে ছিল তা থেকে দৃষ্টি সরানো। পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি কীভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করা যায় সে সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে আস্থায় আনা। এছাড়া পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক প্রযুক্তি যাতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয় সে লক্ষে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) প্রতিষ্ঠা করা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৭ সালে অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আইএইএ আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ১৯৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনসহ ৫টি দেশের সমন্বয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধকল্প চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে এ পাঁচটি দেশ নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র অধিকারী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়। অতপর আইএইএর মাধ্যমে ৫ মার্চ ১৯৭০ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য সকল দেশকে আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সালে আইএইএর সদস্যপদ লাভ করে, কিন্তু জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয় ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ৩১শে আগস্ট ১৯৭৯ সালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিটি মূলত: পারমাণবিক জ্বালানি অতিমাত্রায় সমৃদ্ধিকরণ থেকে নিবৃত্তকরণ, নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তিপূর্ণ প্রয়োগ-এ তিনটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। এ পর্যন্ত বিশ্বের ১৯১টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং এখনও স্বাক্ষর করেনি ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল। উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করলেও ঘোষণা দিয়ে তাঁরা চুক্তি থেকে বের হয়ে আসে। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার-১৫, ১৯৭৩ এর মাধ্যমে দেশে পরমাণু শক্তি শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন গঠন করেন। যুক্তরাজ্যের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আদলে দেশে পরমাণু গবেষণাগার তৈরির জন্য সাভারে ২৬৫ একর জমি বরাদ্দ দেন এবং সেখানে পরে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের বৃহত্তর পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অত:পর এ প্রতিষ্ঠানেই ১৯৮৬ সালে স্থাপন করা হয় ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন পারমাণবিক গবেষণা চুল্লি। আইএইএর প্রধান অঙ্গগুলো হচ্ছে সাধারণ সম্মেলন, নিয়ন্ত্রক সভা ও মহাপরিচালকের নেতৃত্বে সচিবালয়। সাধারণ সম্মেলনে বছরে একবার এক সপ্তাহের জন্য নীতি নির্ধারণের কাজে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ মিলিত হন। তবে নিয়ন্ত্রক সভা সারা বছর ধরে একাধিকবার মিলিত হয়ে সংস্থার সনদ অনুযায়ী নীতি নির্ধারণীমূলক সকল প্রকার কাজকর্মের নিয়মিত নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। আইএইএর প্রধান কার্যক্রম হলো ১৬৮ সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু মানব কল্যাণে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে-   ১. পারমাণবিক উপাদান ব্যবহার ও এতদ্সংক্রান্ত কার্যকলাপ শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের লক্ষে রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সংস্থার আইনসম্মত চুক্তির ভিত্তিতে পরিদর্শন; ২.নিরাপত্তার মান নির্ধারণ, নিয়ম ও নির্দেশাবলি প্রস্তুতকরণ এবং সেগুলোর প্রয়োগে রাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা প্রদান; ৩.শক্তি, কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পারমাণবিক পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান। বর্তমানে বিশ্বের ৩০টি দেশে ৪৪৯টি পারমাণবিক চুল্লি চালু রয়েছে, ৬০টি নির্মাণাধীন, ১৬০টি পরিকল্পনাধীন এবং আরও ৩২০টি প্রস্তাবনাধীন রয়েছে। এছাড়া সাবমেরিনে যুক্ত পারমানবিক চুল্লি ও গবেষণা চুল্লি বিবেচনায় নিলে বিশ্বে প্রায় এক হাজারটি পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে। থ্রি-মাইল আইল্যান্ড (১৯৭৯), চেরনোবিল (১৯৮৬) ও ফুকুশিমার (২০১১) পারমাণবিক দুর্ঘটনা বিশ্ববাসীকে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারকে অনাস্থায় ফেলে দিয়েছে সত্য, কিন্তু প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে পারমাণবিক প্রযুক্তি একটি পরীক্ষিত ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদন উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে কারিগরি ত্রুটি, মানবভুল ও প্রকৃতির বিরূপ আচরণের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে প্রয়োজন নিত্য-নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার যা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। সদস্যপদ লাভ থেকেই বাংলাদেশ আইএইএ’র সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আইএইএ কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এ যাবৎ মোট ১৩৮টি জাতীয় প্রকল্প এবংআঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তির অধীনে ১১১টি আঞ্চলিক প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। আইএইএর কারিগরি সহযোগিতায় পরমাণু শিক্ষা ও গবেষণা, খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন, পানিতে আইসোটোপ কৌশল প্রয়োগ, পরিবেশ সুরক্ষা, নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিংয়ের মতো শিল্প সহায়তা, শস্য ও গবাদি পশুর উন্নয়ন এবং পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের মতো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। এ ছাড়াও আইএইএর কারিগরি সহযোগিতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার (বিনা) এর উচ্চ ফলনশীল জাত ও লবণাক্ত সহিষ্ণু শষ্য জাতের উন্নয়ন ও উদ্ভাবন এবং দেশে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেবায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এর ফলশ্রুতিতে বিনা ১৩টি শস্য প্রজাতির উন্নয়নে নিউক্লিয়ারসহ বিকিরণ এবং অন্যান্য অগ্রসর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ১৫টি সরকারি নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্র এবং ছয়টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর ৪ লাখেরও বেশি রোগীকে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতি সম্প্রতি ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। চলতি বছরের ৩০ মে-১ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো ভিয়েনায় আইএইএর কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করে দেশের এ সমস্ত অর্জন অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। তিনি পারমাণবিক শক্তিকে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে বিদ্যুতের সবচেয়ে টেকসই উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাই বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে রূপপুর থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দুই হাজার চারশ মেগাওয়াট ছাড়াও ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পারমাণবিক উৎস থেকে আরও দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা রয়েছে সরকারের। ১৯৮৬ সালে আইএইএর মহাপরিচালক হেন্স ব্লিক্স সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সফর করেন। এরপর ২০১০ সালে ইউকিয়ো আমানো বর্তমান সরকারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দৃঢ়সংকল্প ব্যক্তকরণের পর বাংলাদেশ সফরে আসেন। তিনিই আবার আগামী ৩-৪ জুলাই দুইদিনের সফরে বাংলাদেশে আসবেন। পরমাণু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল একটি জটিল, স্পর্শকাতর ও পেশাদারিত্বের বিষয়। এ ধরনের প্রযুক্তি রপ্ত করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অপরদিকে, পরমাণু প্রকৌশলবিদ্যা মানব কল্যাণে শান্তিপূর্ণ উপায়ে প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি বহুশাস্ত্রীয় উচ্চ প্রযুক্তি বিধায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় সুদৃঢ় ভৌত অবকাঠামো, পরমাণু আইন, রেগুলেসন, পেশাদারী স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, দক্ষ ও পেশাদার জনবলের প্রয়োজন। নিন্মে প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিবেচনায় এনে আইএইএর মহাপরিচালকের সাথে মত বিনিময় করলে বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার ভীত মজবুত হতে অনেকটা সহায়ক হতে পারে। ১. বাস্তবায়নাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আইএইএ সেইফগার্ডস দ্রুত বাস্তবায়ন বিষয়ে সহায়তা প্রদান; ২.পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের রেগুলেশন, সেইফটি, সিকিউরিটি ও সেইফগার্ডস সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরণের কারিগরি গাইড তৈরিতে সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা প্রদান; ৩. পারমাণবিক ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এবং উন্নতকরণে সহায়তা প্রদান; ৪. দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন; ৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণে সহায়তা প্রদান। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইউকিয়ো আমানোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষা এবং গবেষণা অধিক গুরুত্ব পাবে।   লেখক: ড. মো. শফিকুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি