ঢাকা, বুধবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ১৬:৫০:০৮

‘পেছন ফিরে তাকাই যখন’   

‘পেছন ফিরে তাকাই যখন’   

আজ থেকে চুয়ান্ন বছর আগের কথা। কেমন করে যে এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, তা ভাবতেও অবাক লাগছে। আব্বার রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ও ভাষা সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই সময়টাই ছিল এমন। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে যমুনা নদীর তীর ঘেঁষা শহর সরিষাবাড়ী গার্লস হাইস্কুলে পড়তাম। তখনও দেখেছি মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের অনীহা ছিল। আর এ কারণেই স্কুলের চারজন আয়া সকালে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রীদের নিয়ে স্কুলে আসত; আবার স্কুলছুটির পর বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিত।  ১৯৬৩ সালে আব্বা শায়েস্তাগঞ্জে বদলি হলেন। বদলির কারণে আব্বার আর আমাদের মন ভীষণ খারাপ ছিল। বিশেষ করে আমার। কারণ শায়েস্তাগঞ্জে তখন মাধ্যমিক স্তরের কোনো গার্লস স্কুল ছিল না। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও  আমাদের নিয়ে ১৯৬৩ সালের এপ্রিল মাসে আব্বা চলে এলেন শায়েস্তাগঞ্জে। এখানে এসেই আব্বার সঙ্গে গিয়ে আমি আর আমার দুই ভাই শায়েস্তাগঞ্জে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে আমি অষ্টম শ্রেণিতে এবং দুই ভাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। প্রথম প্রথম ছেলেদের স্কুলে পড়তে বেশ অস্বস্তিতে ভুগছিলাম। নতুন জায়গায় কিছুটা নতুনত্ব ছিল বৈকি! কিন্তু নিজেকে যেন সহজে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। তবে ধীরে ধীরে সব ঠিক হতে লাগল। স্কুলটি কিন্তু আমার প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিল। ছায়া সুনিবিড়। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। শান্ত পরিবেশ। স্কুলের পূর্বদিকে বহমান খোয়াই নদী, উত্তরে শায়েস্তাগঞ্জ-সিলেট রেললাইন সমান্তরাল চলার অনুপম চিত্র ও পশ্চিম পাশেই বিশাল খেলার মাঠ। তাছাড়া রেল স্টেশন ও বাজার থেকে প্রায় এক মাইল দূরত্বে সুন্দর শান্ত পরিবেশ। বৃহদাকারের হৃষ্টপুষ্ট অসংখ্য ডালপালাসমৃদ্ধ শিরিষ গাছগুলোর ছায়া যেন আরো শীতল ও শান্ত করে রেখেছিল স্কুলের পরিবেশ। প্রায় এক হাজার ছাত্রের মধ্যে মাত্র দশ-বারো জন ছাত্রী ছিলাম আমরা। আমাদের জন্য আলাদা বসার কোনো রুম ছিল না। টিচার্স কমনরুমেই তিন-চারটি বেঞ্চে আমরা বসতাম। তাই বলে আমাদের জন্য শিক্ষকদের কোনো অসুবিধা হতো বলে আজো মনে করি না। ক্লাসে যাওয়ার সময় আমরা স্যারদের পেছনে পেছনে যেতাম। ক্লাস শেষে আমরা আবার আমাদের জায়গায় এসে চুপচাপ বসে থাকতাম। অষ্টম শ্রেণিতে একশ’র মতো ছাত্র ছিল আর আমরা ছাত্রী ছিলাম মাত্র আটজন। বার্ষিক পরীক্ষার পর মাত্র দুজন ছাত্রী আমি আর হেনা প্রমোশন পেয়ে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম। বাকি ছয়জন ঝরে পড়ল। তখনকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি তো আর এখনকার মতো ছিল না। মেয়েদের শিক্ষার হার ছিল খুবই নগণ্য। তাছাড়া ছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বাধানিষেধ। লেখাপড়া করার ইচ্ছা সবার; কিন্তু সামাজিক বাধানিষেধের কারণে তা সম্ভব হতো না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। মুসলিম পরিবারের মেয়েদের স্কুলে লেখাপড়া করাটাকে মেনে নেওয়ার মনমানসিকতা ছিল না তখনকার সমাজে। কিছু কিছু অভিভাবক মনে করতেন প্রাইমারি পাস করে চিঠিপত্র পড়তে ও লিখতে পারলেই যথেষ্ট। আবার কেউ কেউ সেটাও মেনে নিতেন না। মেয়েরাও যে উচ্চশিক্ষিত হয়ে চাকরি করে ছেলেদের সমপর্যায়ে বা পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে সেই চিন্তা কোনো কোনো অভিভাবকের মনেও হয়নি। এছাড়া ছিল বাল্যবিয়ের প্রকোপ। বারো-তেরো বছর হলেই বিয়ের কাজটা শেষ করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন অভিভাবকরা। অনেকের ধারণা ছিল, মেয়েদের বেশি পড়ালেখার প্রয়োজন নেই। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে আমার তিন বছরের অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু দেখেছি, তখনকার ছেলেরা অত্যন্ত সভ্য, ভদ্র ও মার্জিত ছিল। সবার একমাত্র লক্ষই ছিল লেখাপড়া শিখে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা। যতদিন এ স্কুলে পড়াশোনা করেছি, এ সময়ের মধ্যে আমরা কোনোদিন কোনো ছাত্রের সঙ্গে কথা বলিনি। এখন কি এটা সম্ভব? অথচ আমরা অনেকেই একই পথে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। আমাদের শিক্ষকরাও তাদের পেশাকে নেশা হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাদের যোগ্যতা দিয়েই ছাত্রছাত্রীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। তাঁরা আমাদের স্নেহ, ভালোবাসা, শাসন, আদেশ, উপদেশ দিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দু-তিনজন স্যার ছাড়া বাকি সবাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আমরা তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি। আমরাও মরণসমুদ্রের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে আছি। যতদিন বেঁচে থাকব, আদর্শ মানুষ হিসেবে যেন বেঁচে থাকি। সবার ভালোবাসা ও দোয়া প্রত্যাশা করি। এসি  
আরব বসন্ত ও সিরিয়া সংকট, কালের চলমান অগ্নিগর্ভ

আমাদের পৃথিবী হলো কতগুলো স্থলভাগ আর জলভাগের সমষ্টি। স্থলভাগগুলোতে আবার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ভুখণ্ড নিয়ে এক একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। এক একটি রাষ্ট্র শাসন করে এক একজন নৃপতি। সে হিসেবে বর্তমানে গোটা দুনিয়া শাসন করছে শ’দুয়েকের মতো নৃপতি। পৃথিবীর বেশিরভাগ নৃপতিদের ইতিহাস হলো তাঁরা যখন মসনদে বসে শাসনের ছড়ি ঘোরায় তখন তাঁরা ভেবে বসেন তাঁরাই অনন্তকাল তখতে বসে ভুখন্ড শাসন করে যাবে। ঐসব স্বৈরাচারী শাসকদের অবিরাম বিচ্যুতির আড়ালে ভূমি বিপ্লবের জন্যে তৈরি হয়। তারপর কোন এক মামুলি কারণে ঘটতে থাকে দুনিয়া কাঁপানো এক একটি ঘটনা।  তেমনি একটি ঘটনা ঘটে ১৯১৪ সালের ২৮ জুন। এদিন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে একজন সার্বিয়াবাসী অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্ডিনান্ডকে হত্যা করে। তার ঠিক একমাস পর অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারপর ধীরে ধীরে দেশ দুটির বন্ধু রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের ময়দানে জড়ো হতে থাকে। একপক্ষে আসলো ওসমানীয় সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানি ও বুলগেরিয়া অক্ষশক্তি হয়ে, আর অপরপক্ষে মিত্রশক্তি হয়ে আসলো সার্বিয়া, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়া ও আমেরিকা। এই যুদ্ধ চললো ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত। ইতিহাসে এটিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সর্বগ্রাসী সে যুদ্ধে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ মারা যায় আর আহত হয় আরো প্রায় সোয়া দুই কোটি। ধ্বসে পড়ে চার চারটি সাম্রাজ্য, উলট-পালট হয়ে যায় পৃথিবীর যাবতীয় ভুখণ্ডের ভৌগোলিক-জ্যামিতিক ইতিহাস। ঠিক একইভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দেনা-পাওনার ইতিহাস থেকে জন্ম নেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের, যা ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণ এবং জাপানের চীন আক্রমণের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়। এই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে প্রায় সোয়া সাত কোটি আদম সন্তান ! জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, ইতিহাসের শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আসলেই কেউ শিক্ষা নেয় না। অন্তত নৃপতিরাতো নয়ই। তাই ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে মাটির পৃথিবীতে ছোট কিংবা বড় স্কেলে, শুধু কালের সন তারিখগুলো পরিবর্তিত হয়। তেমনি ইতিহাসের এক রিকন্সিলিয়েশন হচ্ছে ইউরেশিয়া, ভুমধ্যসাগর আর ভারত মহাসাগরের সঙ্গমস্থলে-আরব ভূখণ্ডে। ঘটনার সূত্রপাত একজন সাধারণ মানুষের সংক্ষুদ্ধতা থেকে। ১৮ ডিসেম্বর ২০১০ সাল। তিউনিসিয়ার একজন ফলব্যবসায়ী ফেরিওয়ালা মুহাম্মদ বোয়াজিজি পুলিশে দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারে ক্ষুদ্ধ হয়ে নিজের গায়ে গ্যাসোলিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। ব্যস! বোয়াজিজির শরীরের এই আগুন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এমন না যে পৃথিবীতে বোয়াজিজিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সংক্ষুদ্ধ হয়ে আগুনে আত্মাহুতি দেন। বরং আমরা অনেকবারই আমাদের পৃথিবীতে এইসব দেখেছি। দেখেছি তিব্বতের ভিক্ষুরা চীনের শাসনের প্রতিবাদে অনেকেই এভাবে প্রাণ দিয়েছেন। তাহলে তিউনিসিয়ার আগুন কেন দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়লো এশিয়া, ইউরোপে, আফিকায় কিংবা বাকী বিশ্বে! আসলে ঘুষ, দুর্নীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক নিপীড়ন আর স্বৈরশাসনের ফলে ওখানে ভূমি আগেই রেডি হয়ে গিয়েছিলো। বোয়াজিজি শুধু শুরুর ঘণ্টায় হ্যামারের বাড়ি দেন। এভাবেই হয়। প্রতিটি সভ্যতায় এভাবেই হয় এবং হবে। তিউনিসিয়ার বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়লো সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে। আরবে বসন্ত কালে শুরু হয়েছিলো বলে ইতিহাসে এই জাগরণকে বলা হলো আরব বসন্ত। আরব জাগরণে প্রথমেই ভেঙ্গে পড়লো তিউনিসিয়ার জেন এল আবেদিন বেন আলির তখত। মাত্র ২৮ দিনের জেসমিন বিপ্লবের ফলে ১৪ জানুয়ারি ২০১১ সালে ২৩ বছরের স্বৈরশাসকের সিংহাসন ভেঙ্গে পড়লো এবং তিনি দৌড় দিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে গেলো। তারপর জেগে উঠলো মিশর। ২৫ জানুয়ারিতে টলে উঠলো হোসনী মুবারকের ৩০ বছরের সিংহাসন। জেগে উঠলো তাহরির স্কয়ার। মাত্র ১৮ দিনের গণবিদ্রোহে স্বৈরশাসক মুবারক পরিত্যক্ত হলেন। ক্ষমতা হারান ইয়েমেনের ৩৩ বছরের স্বৈরশাসক আলি আব্দুল্লাহ সালেহ। ক্ষমতা ও জীবন হারান ৪২ বছরের স্বৈরশাসক মুয়াম্মর গাদ্দাফি। এভাবেই আরব জাগরণের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়লো সিরিয়ায়, আলজেরিয়ায, জর্দানে, আর্মেনিয়ায়, আজারবাইজানে, জর্জিয়ায়, ইউরোপের আলবেনিয়ায়, ক্রোয়েশিয়ায়, স্পেনে, সাব সাহারান অঞ্চলের বারকিনা ফাসোয়, জিবুতিতে, উগান্ডায়, মালদ্বীপে, চীনে এবং সর্বশেষ আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটে! আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে স্বৈরাচারী সরকারগুলো পড়তে থাকলো। কিন্তু লিবিয়ায় স্বৈরশাসক গাদ্দাফি তখত ছিলো লৌহকঠিন। এখানে আন্দোলন দমিত হতে থাকলে পশ্চিমারা বিদ্রোহীদের সহায়তা দিতে থাকলো। শেষে গাদ্দাফি নিজের শহরেই নিহত হলো। ততদিনে আন্দোলন আরব উপত্যকা ছেড়ে ইউরোপ, আমেরিকা আর কিছুটা চীনের দিকে হাওয়া দিতে লাগলো। এবার পশ্চিমারা সচেতন হলো। তারা আন্দোলনের রাশ টেনে ধরলো, শুধু সিরিয়ার বাশার আল আসাদের পতন ছাড়া। আন্দোলনের বিশ্বায়ন থামানো তাদের জন্যে ফরজ হয়ে গেলো কারণ ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল কর’-আন্দোলনে বিশ্বের ধনী-দরিদ্রের শ্রেণিযুদ্ধের হিসাব ও ডাক এলো। অতএব পশ্চিমারা আন্দোলনটা সিরিয়ায়ই আটকে রাখলো। কিন্তু সিরিয়ার সমীকরণ হয়ে গেলো জটিলতর। সিরিয়ায় বাশারের পরিবার ৪৭ বছর ধরে ক্ষমতায়। তাঁর পিতা হাফেজ আল-আসাদ ১৯৭০ সালে বাথ পার্টির অভ্যন্তরে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এবং প্রায় তিন দশক যাবত সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর বাশার ক্ষমতায় আসেন। সিরিয়ায় শিয়ারা মাত্র ১২ ভাগ। সেখানে ৭৫ ভাগ লোক সুন্নি আর বাকীরা খ্রিস্টান। বাশারের পরিবার সংখ্যালঘু শিয়ার হয়েও গত ৪৭ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি বড় বিস্ময়। মধ্যপ্রাচ্যের সব সংঘাত শিয়া-সুন্নিকে কেন্দ্র করে। এই হলো সিরিয়া সংকটের আসল প্যাঁচ। সিরিয়ায় আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধ চলছে ২০১১ সাল থেকে। এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে ৪ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, ১২ থেকে ১৫ লাখ মানুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছে, ৫০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং দেশের ভিতরেই বাস্তুচ্যুত ও স্থানান্তরিত হয়েছে ৬ লাখের বেশি মানুষ।  সিরিয়ার যুদ্ধ চলছে বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে নিজ দেশের অনেকগুলো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মাঝে। সাত বছরে এত ক্ষয়ক্ষতির পরেও এখনো বাশার কিভাবে টিকে আছে! কারণ বাশারের সাথে প্রথম থেকেই রাশিয়া এবং ইরান আছে, আছে লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যের সবশিয়া সম্প্রদায়! সিরিয়া এখন একটি অগ্নগর্ভ । কারণ এখানে খেলতেছে বহু আঞ্চলিক ও আন্তির্জাতিক শক্তি। সৌদি আরব প্রথম থেকেই বাশারের পতনের জন্যে আদাজল খেয়ে লেগে আছে। এই লক্ষ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তাও পাচ্ছে। এই লক্ষ্যে প্রথমে আইএসও সৃষ্টি করা হলো। আইএস শেষে উল্টো চৌবল দিতে এলে সবাই সর্বশক্তি দিতে আইএস ধ্বংস করলো। সর্বশেষ দুমায় নিরীহ জনগণের উপর আসাদ বাহিনীর রাসায়নিক হামলার জবাবে গত ১৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সিরিয়ায় একযোগে মিশাইল হামলা চালায়। রাশিয়া এই হামলায় তীব্র নিন্দা করে বলেছে সিরিয়ায় পশ্চিমাদের আরো হামলা হলে পৃথিবী অশান্ত হবে। পুতিনের এই হুমকিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই কারণ সিরিয়ার রাশিয়া এবং ইরানের সৈন্য আছে। সুতরাং এই হামলা তাঁদের নিজেদের উপরই হামলা। সিরিয়ার রণক্ষেত্রে চিরবৈরী ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ থেকে খুব অল্পদুরত্বেই অবস্থান করছে। ইরান-ইসরায়েল হুমকি-পাল্টাহুমকি এখন আর জল্পনাকল্পনার পর্যাযে নেই। ইরান সিরিয়ায় একটি বিমানঘাঁটি তৈরি করেছে যেখান থেকে ইসরায়েলে সরাসরি হামলা চালানো যাবে। ইতোমধ্যে ইরানের একটি সামরিক ড্রোন ইসরায়েলের আকাশসীমা অতিক্রম করলে ইসরায়েল ড্রোনটি ভূপাতিত করে এবং ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানের বিমানঘাঁটিতে হামলা করে ইরানের কুদস ফোর্সের সাত সদস্যকে হত্যা করে। ইরান বলেছে এর জবাব দিবে। এটিই হলো সিরিয়া সংকটের সর্বোচ্চ নাজুক সময়। কারণ ইরান ও ইসরায়েল যদি সিরিয়ার রণক্ষেত্র সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে যায় তবে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরে আসতে বাধ্য। যুক্তরাষ্ট্র আসলে রাশিয়ায় যুদ্ধে অংশগ্রহন ছাড়া উপায় নেই। তখন এই যুদ্ধ আর সিরিয়ায়, আরবে কিংবা নিছক মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেনা। অবশ্যই তা’ বিশ্বের বিভিন্ন ভুখন্ডে ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের সমগ্র পৃথিবীটাই বর্তমানে অগ্নিগর্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আমাদের সভ্যতাটিকে অনেক অনেক দূর নিয়ে এসেছি জ্ঞানে বিজ্ঞানে । কিন্তু পরিহাস হলো, পৃথিবীটা মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে যে পরিমাণ মারণাস্ত্র লাগবে আমরা তারচেয়ে অনেকগুণ বেশিই তৈরি করে বসে আছি। আর সেগুলোর উপর ক্ষমতাবান স্রেফ কয়েকজন নৃপতি। এদের ভিতরে এমনও কেউ কেউ আছেন, যাঁদের নৈতিকতা নিয়ে অনেক আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। এদের দু’চার দশজনের হটকারীতায়ও সমস্ত পৃথিবী তুলোর মতো উড়ে যেতে পারে।   লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট                                                                                           

সমাজ উন্নয়ন, শিক্ষাবিস্তার ও শিক্ষক

মানুষ আল্লাহ্ তায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি- আশরাফুল মাখলুকাত। মানুষ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে তার শিক্ষা, আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, মানবতাবোধ এবং সততা দিয়ে; এই চারিত্রিক গুণাবলীই তাকে সমাজে আলাদা করে অবস্থান করে দেয়। সব গুণাবলীর কথা বলতে ও শুনতে ভালো লাগে বটে কিন্তু সত্যিকার অর্থে তা অর্জন করা কঠিন, তবে অর্জন অসাধ্য নয়। এজন্য চাই প্রতিশ্রুতি, দৃঢ় মনোবল, সুষ্ঠু পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ। মানুষ সমাজ গড়ে, সমাজ মানুষ গড়ে না। যখনই সমাজের ওপর মানুষ নির্ভরশীল হয়ে যায় তখনই মানুষ পড়ে যায় বিপাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত উপরোক্ত মানবিক ও চারিত্রিক ওণাবলী একজন মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত না হয়, ততক্ষণ তার শরীরে জন্তুর বাস বলে ধরা হয়। এটা অনস্বীকার্য যে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে পশুসুলভ অভ্যাস বিরাজমান থাকে। পুঁথিগত শিক্ষা নয় বরং সুশিক্ষা বা সামাজিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপরোক্ত গুণাবলী অর্জন করে একজন মানুষ সুশিক্ষিত হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে নয় মাসের রক্তমাখা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। দেশের এই স্বাধীনতা সমগ্র মানবগোষ্ঠীর অর্জন এবং এর কৃতিত্ব আমাদের সকলের। আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের গর্বিত নাগরিক। দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, উন্নতিও হয়েছে, তবুও উন্নত জাতি হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারিনি। কারণ শিক্ষিত হলেও এখনও আমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারিনি। যেহেতু সুশিক্ষার যথেষ্ট অভাব রয়েছে, সেহেতু শিক্ষার হার বেড়েছে বটে মান বাড়েনি- এই নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। অহরহ প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। শিক্ষক যিনি মানুষ গড়ার কারিগর- তার ওপর হাত উঠছে। অনেক শিক্ষিতজনই আজকাল নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছেন। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, অথচ সেই জনগণই আজ অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত। স্বাধীনতা হলো এক বিশেষ অর্জন, নিয়মনীতি, সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের সঠিক ধারণার ওপরই প্রতিষ্ঠিত। হাত-পা যথেচ্ছ ছুড়তে পারাকেই স্বাধীনতা বলে না। স্বাধীনতা অর্জন করা যথা সহজ, তাকে রক্ষা করা আরো কঠিন। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া- সমাজের উন্নয়নে সুশিক্ষাই বিশেষ প্রয়োজন। এই সুশিক্ষাই মানুষের মধ্যে ঐক্য ও মানবতাবোধ জাগ্রত করে। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুশিক্ষা যত বেশি প্রসারিত হবে, মানুষের মন ততই বড় হবে এবং সুষ্ঠু সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে উঠবে।একজন শিক্ষক যদি শুধু টাকার বিনিময়ে শিক্ষা বিতরণ করেন, তা হলে কি শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে শিক্ষা কিনে প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ গড়তে পারবেন? না পারবেন না। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, মেরুদণ্ড শক্ত হলে মানুষ দাঁড়াতে পারে। কিন্তু জাতির মেরুদণ্ড যদি দুর্বল ও শক্তিহীন হয়, জাতি তখন কীভাবে দাঁড়াবে? যে জাতি যত বেশি সুশিক্ষায় শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত ও শক্তিশালী। উন্নত পশ্চিমা দেশগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচেষ্টায় অর্জিত জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে নবায়ন করা এবং ঐতিহ্যের সম্পদ হস্তান্তরের ক্ষেত্র হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এবং এটাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বাহন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান করেন শিক্ষক, তারাই মানুষ গড়ার কারিগর। তাদেরকে উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসতে দিতে হবে। সেই আসনে আসীন হয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি ও মানব কল্যাণে আগ্রহ, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সৎ-সাহস ও উৎসাহ প্রদান করবেন, এটাই কাম্য। তবেই তিনি হবেন প্রকৃত শিক্ষক ও জীবন গড়ার কারিগর। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘শিক্ষা সম্বন্ধে একটা মহা সত্য আমরা শিখিয়াছিলাম, মানুষ মানুষের কাছ থেকেই শিখতে পারে, যেমন জলের দ্বারাই জলাশয় পূর্ণ হয়, শিক্ষার দ্বারাই শিখা জ্বালিয়ে উঠে। প্রাণের দ্বারাই প্রাণ সঞ্চারিত হইয়া থাকে।’ সেই শিক্ষকের দ্বারাই শিক্ষার্থী পূর্ণতা লাভ করবে এবং সমাজ উপকৃত হবে। একজন ভালো মানুষ শিক্ষক যে কোনো দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আমাদের প্রয়োজন ভালো শিক্ষক তার নিজ পাঠকে চিত্তাকর্ষক করে তোলেন এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মধ্যে যে গুণ বা মেধা লুক্কায়িত তা তিনি আবিষ্কার করবেন; আবার তেমনিভাবে শিক্ষকরাও তাদের কাজের পরিধি বিস্তার ও জ্ঞান বৃদ্ধিকল্পে সচেষ্ট হবেন। শিক্ষক হবেন আদর্শের প্রতীক। তারা নিজেদের কার্যকলাপের দ্বারা এমন বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করবেন যাতে ছাত্রছাত্রীরা তাদেরকে অনুসরণ করে নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে পারে। কাজেই শিক্ষকদের কর্তব্য হবে নিজেদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতার উদাহরণ স্থাপন করা। যে ব্যক্তি চিন্তা, কর্ম ও অনুশীলনে সৎ নয়, সে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে সৎ নয়। এ কথাটি স্বয়ং রাসুল (সা.) বলেছেন। এই কথাটি অনুধাবনযোগ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ সততা কখনও আংশিক হয় না, সততা মানেই হচ্ছে মন প্রাণ চিন্তা ও কর্মের সার্বিক ও সর্বতোমুখী পরিচ্ছন্নতা। এভাবেই গড়ে ওঠে সুখ সমৃদ্ধ সমাজ। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, প্রকৃত সংজ্ঞা দেয়াও সম্ভব নয়। শিক্ষা মানেই কোনো না কোনো জ্ঞান; এই জ্ঞানই আলো। জ্ঞানকে শক্তি বলে বিবেচনা করা হয়। সূর্য যেমন জগতের আলো, জ্ঞান তেমনি হৃদয় ও মনের আলো। ইংরেজ চিন্তাবিদ Lord Brougham বলেছেন, ‘Education makes a people easy to lead but difficult to drive; easy to govern but impossible to enslave. বিশ্বের সর্বত্র সংঘাত-সংঘর্ষ-বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি বিরাজমান। আমাদের নিজেদের ও সমাজের দিন দিন নীতি নৈতিকতার অবক্ষয় চলছে। সমাজ সত্যের পথ থেকে অনেকটা মিথ্যার দিকে ধাবিত। মিথ্যার গায়ে সত্যের পোশাক পরিয়ে সত্যের নামে অশান্তির বীজ বপন চলছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, সত্যবাদিতা সর্বদাই মুক্তির পথ প্রশান্ত করে এবং মিথ্যাচারিত ধ্বংসের পথ ত্বরান্বিত করে। ভারতের জাতির পিতা গান্ধীজি বলেছেন, ‘সত্যই ঈশ্বর’। ‘God is truth & Truth is God’ আক্রোশের বশে মিথ্যাচার করে যত সহজে মানুষে মানুষে অনৈক্য ও বিভেদ এবং জাতিতে জাতিতে বিভাজন সৃষ্টি করা যায়, তত সহজে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করা যায় না। এতে করে কারো কোনো উপকার হয় না; বরং ক্ষতি হয় দেশ ও জনগণের। জীবন ক্ষণস্থায়ী সত্য ও মানব কল্যাণ চিরস্থায়ী। মানুষের জন্য কল্যাণকর কিছু করাই মানব জীবনের ধর্ম; সর্ব ধর্মই কল্যাণের কথা, সত্যের কথা বলেÑ সকল মানুষই যার যার ধর্ম মানে। ছেলেমেয়েদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাদানেরও প্রয়োজন আছে । ধর্ম ছাড়া জীবন চলে না; কারণ ধর্ম ছাড়া একজন মানুষ পশুতে পরিণত হতে পারে। আল্লাহ যে আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তৈরি করেছেন এবং সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবোধ জানানোর জন্য স্রষ্টার কাছে নত হওয়া উচিত। ধর্মীয় আচার-আচরণের মাধ্যমে মানুষ তার জীবন নিয়ন্ত্রণ করেই কেবল সেই কৃতজ্ঞতাটুকু জানাতে পারে। দেশ জাতি ও মানবগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ যুবকেরা, যৌবন দীপ্ত তরুণ-তরুণীরা ভাঙা ও গড়ার শক্তিশালী কারিগর। ইদানীং একশ্রেণির যুবক অবৈধ পণ্যের ব্যবসা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানাবিধ অপকর্মের সাথে জড়িত হয়ে গোটা যুবসমাজকে কলুষিত করছে। তরুণ সমাজ বিপথে চালিত হওয়া শুভ কল্যাণ নয়। প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন। নিজেকে চিনতে হবে, দেশকে ভালোবাসতে হবে। সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের ভবিষ্যতের নেতৃত্বদান- দেশ পরিচালন করার দক্ষতা ও ক্ষমতা অর্জন করে একটি সুন্দর সমৃদ্ধ শক্তিশালী দেশগড়ার প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে, তাদের নিরাশ হলে চলবে না। একটি প্রাচীন উক্তি ছিল- Know your work, know your food and your mate. এখন আধুনিক প্রবাদ হচ্ছে- Know your nation, your religion and your civilization. ইতিহাস অতীতের কথা বলে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী Sir Winston Churchill এর একটি বিখ্যাত উক্তি- ‘The longer you can look back, the further you can look ahead’ বাংলায় বললে যত দূরবর্তী অতীত ইতিহাস তুমি জানবে, তত দূরতম ভবিষ্যৎ তুমি দেখবে। পৃথিবীতে যেসব জাতি উন্নতি লাভ করছে, তাদের ব্যাপারে একটি সত্য কথা হলো, তারা তাদের সুদূর অতীত থেকে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও মানবচরিত্র সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধান করে এবং সেই সুবাদে প্রেরণা লাভ করে এবং বর্তমানের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই কেবল সুন্দর ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। যে জাতি অতীত নিয়ে ভাবে না, তার সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয় বলেই বিবেচিত হয়। পরিশেষে বলতে চাই, ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যই সমাজে আইন প্রণয়ন হয়। আইনের প্রয়োগ সকলের ক্ষেত্রেই সমান্য। এতে ব্যত্যয় হলেই মানুষ তার নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, সমাজে অঘটন ঘটে, দেখা দেয় সামাজিক বিপর্যয়, যা মোটেই কাম্য নয়। যাই হোক, অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার যেন বিলম্ব না হয়, বিচার বিলম্ব হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা। ইংরেজিতে বলা হয়, ‘Justice delayed, Justice denied’। আবার সমাজে আইন-শৃঙ্খলার নামে বেশি বেশি আইন প্রণয়ন করাও ঠিক নয়। বেশি ন্যায়বিচার হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এরই প্রেক্ষাপটে প্রায় হাজার বছর আগে খ্রিষ্টপূর্ব এক রোমান দেশীয় আইনজ্ঞ ডাস্টিনিয়ান বলেছিলেন, ‘What the society need today not more laws but more justice.’ অর্থাৎ বেশি বেশি আইন প্রণয়নের চেয়ে দরকার বেশি বেশি ন্যায়বিচার। লেখক: বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৫৬ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্র

জীবনটা আমার, নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাতো আমার নেই...  

জীবনটা আমার, অথচ আমার নয়! চলায়-ফেরায়, ভাবনায়, খাবার-দাবারে, রোগ-শোকে কোনোটাতেই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাতো আমার নেই!!    অথচ জীবনটা আমার, আমারই ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার, সন্তানদের ভবিষ্যত, আমার কিছু একটা হয়ে গেলে রাতা-রাতি নিঃস্ব হবে তারাই! নিশ্চিৎ জ্বলবেনা তাদের দাওয়ায় রঙিন আলো আর, বিজলীর গতিতে অনেকেই সরে যাবে তাদের কাছ থেকে যোজন দূরত্বে... চলে যায়, হয়তোবা চলে যেতে হয় বৈকি, কি জানি নিয়মটা বোধহয় এমনই... জীবদ্দশায়ইতো কোনো কিছু চলে না আমার নিয়মে... আর মরণের পরে...? এই ভাবনাটাতো আহাম্মকী...নিয়ম কোথায় পাবো, তাই যদি পেতাম তবে কি মাত্র ১৩ বছরের শিশু চালকের লেগুনাগাড়িতে চড়ে বসতাম ১৩জন বিবেকবান(?) মানুষ! সবার আগেই যাবো, এই প্রবণতাকেতো ভাবনা থেকে দূর করতে পারি না, পারছিওনা...! সড়কের উপর কলার খোসা আর পাবলিক প্লেসে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে-করতে বলছি, ‘না এই দেশটার কিচ্ছু হবে না...’! হেন কোনো খাবার নেই যেখানে ভেজাল খাচ্ছি না...!!! পৃথিবীতে বোধকরি আমরাই এইমাত্র আত্মহত্যা প্রেমী জাতি, যারা নিজেদের খাবারে বিষ মিশিয়ে ক্রমাগত আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাই...! না হয় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের দিকে... আর ওখানে ! বিধাতার পরে মানুষ নাকি সবচেয়ে বেশি আশাবাদী হয় চিকিৎসকদের ওপর... ভরসাও করে, কিন্তু ক’জন চিকিৎসক আজকাল অবতার ডাক্তার হতে পারেন, রোগীকে চিকিৎসা করাতে আসা পরিবারিক এটেনডেন্ট মানুষটাও নিজের অজান্তেই রোগী হয়ে যান চিকিৎসকদের অযাচিত প্যাথলজি টেস্টের ফাঁদে পড়ে... পকেটমার গোপনে আর ছিনতাইকারীরা নির্জনে অস্ত্র ঠেকিয়ে লুটে নেই... কিন্তু বিভিন্ন সেবামূলক দফতরে কিছু নির্লজ কর্মকর্তা আছে যারা প্রকাশ্যে ঠেকিয়ে অর্থের সঙ্গে বিশ্বাসটুকুও লুটে নেয়... সন্তানকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে না দিলে মহাশয় নাকি তার বিষয়টিতে ফেল করিয়ে দেন... আপনি পড়াতে বাধ্য, প্রাইভেট পড়লে শিক্ষক/শিক্ষিকা মহোদয় পরীক্ষার আগে উত্তরপত্রের শিট্ তৈরী করে দেন, এতে করে আমার বা আপনার সন্তান পাশ...! নচেৎ ফেল করার অপরাধে আমার, আপনার সন্তানকে ওই প্রতিষ্ঠান অযোগ্য ঘোষণা করে বের করে দেবে...! আমি ও আপনি নিরুপায়... বার্থ সার্টিফিকেট উত্তোলন করতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয়! ডেড সার্টিফিকেট তুলতেও তাই...! মাঝখানের সময়টুকুতে আর পরিত্রাণ কোথায়...? ‘আম-জাম-কাঁঠাল’ আপনি ও আমি নিজেকে যে জনতা’ই মনে করি না কেন, ওই যে বললাম- ‘জীবনটা আমার, অথচ আমার নয়! চলায়-ফেরায়, ভাবনায়, খাবার-দাবারে, রোগ-শোকে কোনোটাতেই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাতো আমার নেই!!’ এসি  

লাশের মিছিলে আমাদের অপেক্ষা   

মৃত্যু যেন এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমরা এখন কারো মৃত্যু দেখে বিচলিত হইনা। কারো মৃত্যুর খবর শুনে দাঁড়াবারও সময় কারো হয়ে ওঠে না। তবু কিছু কিছু মৃত্যু আমাদেরকে নাড়া দিয়ে যায়। আমরা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠি। জ্বলে ওঠি। আমাদের ক্ষোভগুলো কয়লার আগুনের মতো জ্বলতে থাকে। কিছু মৃত্যু আমাদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দপতন ঘটায়। চিন্তাশক্তিকে খানিকটা ধাক্কা দেয়। তেমনি আজ ধাক্কা পেলাম দুই বাসের চাপায় হাত হারানো স্বপ্নবাজ তরুণ রাজিবের মৃত্যুতে।     হাসপাতালের বেড়ে ছটপট করতে করতে রাজিব চলে গেল না ফেরার দেশে। জানি, কেউ কোনো দিন আর জানতে চাইবে না, রাজিব কে? রাজিবের খোঁজও কেউ নেবে না। সে সময়ও কারো নেই। কিন্তু এভাবে কত রাজিব যে অকালে চলে যাচ্ছে তার খবরই বা কে রাখে। দুটি বাসের চাপে হাত হারানো মৃত রাজীব অল্প কয়দিনে সবার পরিচিত হয়ে ওঠেছে। তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেমন ঝড় চলছে, তেমনি চাপা আগুন বিরাজ করছে আমাদের সবার মনে। আমাদের সড়কে চলা যানবাহনগুলো যেন একেকটি মরণ ফাঁদ। এই ফাঁদে পড়ে কত মায়ের বুক যে খালি হয়েছে তার হিসেব নেই। কত মেধাবী মুখ যে রাজীবের মতো অকালে ঝরে গেছে তার হিসেব কে রাখে। কিন্তু এসবের মাঝে রাজিবের মৃত্যুটা ব্যতিক্রম।  রাজীব পনের দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে হেরে গেছে। সোমবার রাত পৌনে একটায় নিথর হয়ে গেল তার দেহ। সাদা চাদরে ঢেকে যায় তার স্বপ্নগুলো। রাজীবের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল, রাজীব নিজে দেখেছে তার হাত নিজের শরীর থেকে ছিঁড়ে যাচ্ছে। আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এটা কতো বড় নির্মম ট্রাজেডি তা হয়তো ভুক্তভোগীই ভাল জানেন। এই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত রাজীব নিতে পারেননি। আমরা এ সমাজের সাধারণ নাগরিক। রাষ্ট্র নিম্ন মধ্যম আয়ের হলেও বা `উন্নয়নশীল` তকমা পেলেও আমরা অধিকাংশ মানুষ সকালে ঘুম থেকে ওঠে ভাবি, আজকের দিনটি আমাদের কেমন যাবে, কি খাব, কি করবো। অস্বীকার করার উপায় নেই রাজীব সেই সমাজের প্রতিনিধি মাত্র। দৃশ্যত রাজীব হাত হারিয়েছে। ধাক্কা সামলাতে না পেরে সে মারা গেছে। কিন্তু এটা কী সত্য নয়, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলো সবাই রাজীবের মতো এমন ঝুঁকিতে আছি। ‘সড়ক দূর্ঘটনা’ শব্দটি যতোই পরিচিত হোক না কেন, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই সেই শব্দটি একটা অজুহাত মাত্র। এগুলো খুন। পরোক্ষ ভাবে মানুষ খুনের যতোগুলো বিষয় আছে তার মধ্যে আমরা স্বাভাবিক স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছি এই খুনকে। হয়তো বুঝিনা। বা বুঝেও না বুঝার ভান করি। মাঝে মাঝে এরকম কোনো কোনো খুন আলোচনায় আসে। হৈ চৈ হয়। আমরা মানববন্ধন করি, সভা সমাবেশ করি। তারপর অব্যবহৃত পুকুরের মতো শান্ত স্থির হয়ে যায় সব। কিন্তু এ সমস্যা ততোদিন মিটবে না, যতোদিন আমরা ভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবো না। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৭ বছর। এই ৪৭ বছরেও আমাদের রাজনীতি বাস চালকদের ইউনিফর্ম পরাতে পারেনি। গাড়ির নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করতে পারেনি। যত্রতত্র যাত্রী উঠা নামা বন্ধ করতে পারেনি। চলন্ত অবস্থায় গাড়িতে উঠা নামা বন্ধ করতে পারেনি। মুখে `সিটিং সার্ভিস` বললেও গাদাগাদি করে লোক নেওয়া বন্ধ করতে পারেনি। চালকদের প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করতে পারেনি। বাসের চালক, হেল্পারদের জন্য `পরিবহন শ্রমিক` তকমা লাগানো নানা ধরনের সংগঠন আছে। রাজনীতি আছে। ভোট আছে। ধর্মঘট আছে। কিন্তু আমি আমরা আমাদের জন্য কোনো সংগঠন নেই, রাজনীতি নেই। আমাদের ভোট নিয়েও কেউ চিন্তিত নয়। দু`মুঠো খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত থাকা মানুগুলো আবার এসব আন্দোলন করবে কখন। রাজীবদের জন্য কেউ নেই। কারণ, আমরা সবাই রাজীব। আমরা বড় জোর নিজ যোগ্যতায় (?) লাশ হতে পারি। এসো লাশ হই। আমরা অপেক্ষা করছি লাশের মিছিলে। আআ/এসি  

মুজিবনগর দিবসের স্মৃতিকথা

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের স্মৃতিকথা লিখতে বসে কত কথা আমার মানসপটে ভেসে উঠছে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্বপরিকল্পিত `অপারেশন সার্চলাইট` নামে গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনি। ভাষণে তিনি জাতির জনককে `বিশ্বাসঘাতক` আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, `শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের আরও আগেই গ্রেফতার করা উচিত ছিল, আমি ভুল করেছি। দিস টাইম হি উইল নট গো আনপানিস্‌ড।` ২৭ মার্চ কারফিউ শিথিল হলে আমরা কেরানীগঞ্জ চলে যাই। কেরানীগঞ্জ পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই রেডিওতে শুনতে পেলাম চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এমএ হান্নানের ভাষণ। বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত `স্বাধীনতার ঘোষণা`র কথা উল্লেখ করে তিনি বলছেন, "বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান `স্বাধীনতার ঘোষণা` প্রদান করে বলেছেন, `এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আপনাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে`।" কেরানীগঞ্জে বোরহানউদ্দিন গগনের বাড়িতে আমরা আশ্রয় গ্রহণ করি। জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানসহ শেখ ফজলুল হক মনি ভাই, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ভাই, আমি ও স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো, মনি ভাই, আমি, মনসুর আলী সাহেব এবং কামরুজ্জামান সাহেবকে নিয়ে ভারতের দিকে যাব। বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য আগেই বাসস্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন। মনে পড়ে, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে ভুট্টো যখন টালবাহানা শুরু করে তখন সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছিল যে, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। বঙ্গবন্ধু এটা উপলব্ধি করেছিলেন আরও আগেই। ১৯৭১-এর ৩ জানুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ১০ লক্ষাধিক সংগ্রামী মানুষের মহাসমাবেশে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ করিয়েছিলেন এবং ৬ দফার ভিত্তিতেই শাসনতন্ত্র রচিত হবে সেই ঘোষণা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ৬ দফা প্রশ্নে তিনি কোনো আপস করবেন না। `৭১-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনক জাতীয় চার নেতার সামনে আমাদের এই ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন, `সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।` ২৯ মার্চ কেরানীগঞ্জ থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া হয়ে এপ্রিলের ৪ তারিখ আমরা ভারতের মাটি স্পর্শ করি এবং সানি ভিলায় আশ্রয় নিই। এপ্রিলের ১০ তারিখ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে `বাংলাদেশ গণপরিষদ` গঠন করে, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলাকে `মুজিবনগর` নামকরণ করে রাজধানী ঘোষণা করা হয় এবং জারি করা হয় `স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র` তথা `চৎড়পষধসধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব`। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন করা হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৬ নম্বর প্যারায় লেখা আছে, `বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন` এবং ১০ নম্বর প্যারায় লেখা আছে, `আমরা বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী ঘোষণা করিতেছি এবং উহা দ্বারা পূর্বাহেপ্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করিতেছি।` স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে `গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ` রাষ্ট্র গঠিত হয় এবং `বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার` রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আরও যা ঘোষিত হয় তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে `সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন।` যেহেতু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, সেহেতু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এই মর্মে বিধান রাখা হয় যে, `কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করিতে না পারেন অথবা তাহার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল ক্ষমতা ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করিবেন।` `স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র` মোতাবেক উপ-রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন এবং জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী, জাতীয় নেতা এএইচএম কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও খোন্দকার মোশতাক আহমদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দান করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের সভায় কর্নেল ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা হয়। `স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র`- এই সাংবিধানিক দলিলটির মহত্তর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা `বাংলাদেশ গণপরিষদ` সদস্যগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম, `আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে কার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে।` অর্থাৎ যেদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেছিলেন সেই দিন থেকে কার্যকর হয়। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা অনুসারে বলতে হয়, `স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র` আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সংবিধান। এই সংবিধান মোতাবেক স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগরে। তাজউদ্দীন ভাইয়ের সঙ্গে আমি সীমান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। একটি বিশেষ প্লেনে তাজউদ্দীন ভাই, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মনি ভাই এবং আমি যখন শিলিগুড়ি পৌঁছাই, তখন ওখানে পূর্বাহেপ্ত ধারণকৃত তাজউদ্দীন ভাইয়ের বেতার ভাষণ শুনলাম। বাংলার মানুষ তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপসহীন, এককাতারে দণ্ডায়মান। পরবর্তী সময়ে ১৭ এপ্রিল যেদিন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারিত হয়, তার আগে ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে মনি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আমি- আমরা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, একটা গাড়িতে করে রাত ৩টায় নবগঠিত সরকারের সফরসঙ্গী হিসেবে কলকাতা থেকে রওনা করি সীমান্ত সন্নিহিত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা তথা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী মুজিবনগরের উদ্দেশে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রবেশ করি প্রিয় মাতৃভূমির মুক্তাঞ্চল মেহেরপুরের আম্রকাননে। আমাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি অনেক সাংবাদিক ছিলেন। কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল। আশঙ্কা ছিল পাকিস্তান বাহিনী সেখানে বোমা হামলা চালাতে পারে। মেহেরপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রচুর লোকসমাগম হয়েছিল। মুহুর্মুহু `জয় বাংলা` রণধ্বনিতে আকাশ-বাতাস তখন মুখরিত। আন্তর্জাতিক বিশ্ব বিস্ময়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করছিল নবীন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভব। সেদিনটি ছিল শনিবার। সকাল ১১টা ১০ মিনিটে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দৃপ্ত পদক্ষেপে মঞ্চের দিকে এলেন। দেশ স্বাধীন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সমবেত সংগ্রামী জনতা গগনবিদারী স্বরে `জয়বাংলা` জয়ধ্বনি দিল। শপথ অনুষ্ঠানস্থলে একটি ছোট্ট মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথমে মঞ্চে আরোহণ করেন। ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সশস্ত্র দল রাষ্ট্রপ্রধানকে `গার্ড অব অনার` প্রদান করেন। এরপর মঞ্চে আসেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ এবং প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। উপস্থিত স্বেচ্ছাসেবকরা পুষ্পবৃষ্টি নিক্ষেপ করে নেতৃবৃন্দকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। সরকারের মুখপত্র `জয় বাংলা` পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি আবদুল মান্নান, এমসিএ`র (গবসনবৎ ড়ভ ঈড়হংঃরঃঁবহঃ অংংবসনষু) উপস্থাপনায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমেই নতুন রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দলিল `স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র` পাঠ করেন চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা মায়ের চারজন বীরসন্তান প্রাণ ঢেলে গাইলেন জাতীয় সঙ্গীত `আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি`। উপস্থিত সবাই তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলালাম। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম ইংরেজিতে প্রদত্ত ভাষণের শুরুতে বলেন, `ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমি তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেছি এবং তার পরামর্শক্রমে আরও তিনজনকে মন্ত্রীরূপে নিয়োগ করেছি।` এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দকে পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর ঘোষণা করেন প্রধান সেনাপতি পদে কর্নেল ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম তার আবেগময় ভাষণের শেষে দৃপ্তকণ্ঠে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, `আমাদের রাষ্ট্রপতি জনগণনন্দিত ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নির্যাতিত মানুষের মূর্ত প্রতীক শেখ মুজিব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আজ বন্দি। তার নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম জয়ী হবেই।` প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তাজউদ্দীন আহমদ অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় বলেন, `পাকিস্তান আজ মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে। পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যায় মত্ত হয়ে ওঠার আগে ইয়াহিয়ার ভাবা উচিত ছিল তিনি নিজেই পাকিস্তানের কবর রচনা করছেন।` মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বক্তৃতার শেষে তিনি বলেন, `আমাদের এই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে আমরা কামনা করি বিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড় জাতির বন্ধুত্ব।` ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই তৎকালীন বাস্তবতায় যা বলার প্রয়োজন ছিল তা-ই তারা বলেছেন। আমাদের শীর্ষ দুই নেতার এই দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ ছিল ঐতিহাসিক এবং অনন্য। পাবনার জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের খান, মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিকসহ আরও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছার শতভাগ প্রতিফলন ঘটিয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে, রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করে সেদিন রাষ্ট্র ও সরকার গঠিত হয়েছিল। আর এসব কিছুর বৈধ ভিত্তি ছিল `স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র`। পরে ৩০ লক্ষাধিক মানুষের রক্তস্নাত আত্মদান ও চার লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সার্বিক সাফল্য নিশ্চিত হয়েছিল এ দিনটিতেই। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তথা `৭১-এর এপ্রিলের ১০ ও ১৭ তারিখে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিকভাবে রাজনৈতিক বৈধতা নিশ্চিত করে মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করে সুমহান বিজয় ছিনিয়ে আনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনের গুরুত্ব অপরিসীম। লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী।

মঙ্গল শোভাযাত্রা অভিনব ও চিরায়ত

মঙ্গল শোভাযাত্রা একেবারে হালের উৎসব। সমষ্টির কল্যাণ কামনা করে সাজসজ্জা নিয়ে ঢোলনহবৎ বাজিয়ে সম্মিলিতভাবে রাজপথ পরিক্রমণের মধ্যে অভিনবত্ব রয়েছে, তবে এর অবলম্বন যে নতুন বছরের প্রথম দিন, সেখানে রয়েছে চিরায়ত এক মাত্রা। এ চিরায়তের আধার বাঙালির নববর্ষ, বৈশাখের প্রথম দিবস। নববর্ষ আবাহনের পদ্ধতি ইতিহাসের পথপরিক্রমণে নানাভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গভূমিতে সাল-গণনার বিভিন্ন ধরন বজায় ছিল, তার মধ্যে একটা সমন্বয় আনার চেষ্টা করেন মধ্যযুগের মোগল সম্রাট আকবর; তার শাসনামলেই রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে প্রবর্তিত হয় বঙ্গাব্দ, ফসলি সাল হিসেবে পরিচয়প্রাপ্ত এ বর্ষপঞ্জির সূচনার মাস হিসেবে বৈশাখকে নির্ধারণ করা হয়। সেই সঙ্গে বর্ষগণনার সূচনাকাল হিসেবে ধার্য হয় মক্কা থেকে মদিনায় নবী করিমের (সা.) হিজরত গ্রহণের বছর। ইতিহাসই বুঝি বাঙালির ললাটে মিলন-মিশ্রণের সংস্কৃতির তিলক কেটে দিয়েছিল এবং অন্তঃসলিলাভাবে হলেও সেই পরিচয় বহন করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। হিন্দু পণ্ডিতের সব আচার-অনুষ্ঠান-উৎসব যে পঞ্জিকা অনুসারে নির্ধারিত হচ্ছে, সেখানে ইসলামের ইতিহাসের সম্পৃক্তি তাই রয়ে গেছে অমোচনীয়ভাবে। ফসলি সালের সঙ্গে বাংলা বর্ষবরণের যে যোগ সেটা ঔপনিবেশিক আমলে ক্ষীণভাবে বহমান ছিল জমিদারের খাজনা আদায় ও পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে, আর এর জের হিসেবে টিকেছিল ব্যবসায়ীদের হালখাতা অনুষ্ঠান, যখন সাবেকি ধারকর্জ চুকিয়ে নতুনভাবে খোলা হতো হিসাবের খাতা। সমাজজীবনে এই উৎসব আনন্দময় ও কর্ম-প্রাসঙ্গিক করে তোলার অবলম্বন ছিল বৈশাখী মেলা। এসব মিলেই গড়ে উঠেছিল বাঙালির বর্ষ-আবাহনের চারিত্র্য, এর সঙ্গে ধর্মের যোগ ছিল, তবে তা ছিল অপ্রধান। চৈত্রসংক্রান্তি কিংবা শিবের গাজনে এর যে প্রকাশ সেখানে ধর্মাচারের পাশাপাশি ছিল লোকাচার; লোকরঞ্জক ভূমিকা ছিল প্রধান। সেই বিচারে বৈশাখ ঘিরে বাঙালি সমাজে আলোড়নের ছিল এক সেকুলার মাত্রা এবং ছিল সর্বজনীনতা। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন পদানত জাতিগুলোর ঐতিহ্যিক জীবনধারা তছনছ করে দিয়েছিল। আফ্রিকার বহু দেশে তা পাল্টে দিয়েছিল জনগোষ্ঠীর ধর্ম, তাদের ভাষা, আচার, পোশাক; কিন্তু সবকিছুর পরও একেবারে মুছে দেওয়া যায়নি তাদের লোকাচার ও লোকসংস্কৃতি। নাগরিক সংস্কৃতি নিজ দেশ ও নিজ সমাজের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করলেও অন্তরের গভীরে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য জাতি নানাভাবে লালন করে চলেছিল। জাতির পুনর্জাগরণ ও সংহতি রচনায় তাই সংস্কৃতি পালন করেছিল নিয়ামক ভূমিকা। আফ্রিকার বহু দেশের মানুষ ভুলে গেছে তাদের মাতৃভাষা, হারিয়েছে তাদের ধর্ম, তাদের নাম-পদবি। শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যসন-ভূষণ, জীবনবৃত্তি ও জীবনাচারে তারা শেকড়চ্যুত রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম, সেই পতিত জনগোষ্ঠীর জন্যও তো জাগরণের অবলম্বন হয়েছিল সংস্কৃতি। পতিত দশার উদাহরণ হিসেবে মনে পড়ে সেনেগালের কবি ও রাষ্ট্রপতি লিওপোল্ড সেংঘর সম্পর্কে পাশ্চাত্যের উচ্ছ্বাসের বিপরীতে এক আফ্রিকি তরুণ বীতশ্রদ্ধভাবে আমাকে বলেছিল, সেংঘর ফরাসিতে কথা বলেন, ফরাসিতে কবিতা লেখেন এবং এমনকি ফরাসিতে স্বপ্ন দেখেন। এর পাশাপাশি জাগরণের সূত্র হিসেবে আমরা দাখিল করতে পারি আফ্রিকার মুক্তি-আন্দোলনের নেতা গিনি-বিসাউয়ের আমিলকার কাবরালের উক্তি, সত্তরের দশকে ইউনেস্কোর এক সেমিনারে তিনি বলেছিলেন, অ্যান অ্যাক্ট অব কালচার ইজ অ্যান অ্যাক্ট অব লিবারেশন, সাংস্কৃতিক কোনো কর্মকাণ্ড নিহিতার্থে মুক্তিরই কর্মপ্রয়াস। নিজের দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বুঝেছিলেন, আফ্রিকানরা যখন হারিয়েছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, পদানত জাতি হিসেবে খুইয়েছে তার অর্থনৈতিক-সামাজিক অধিকার ও স্বকীয়তা, নগরে প্রশ্রয় পেয়েছে ভিনদেশীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি, তখনও রয়ে যায় তার লোকায়ত সংস্কৃতি, হয়তো প্রকাশ্য নয়, সরব নয়, মূলধারায় তার অবস্থান নেই; কিন্তু দূর অরণ্যে পাহাড়ের কন্দরে কেউ যখন মাদলে বাজায় বোল, মেতে ওঠে গানে-নৃত্যে, সেখানেই মেলে জাতি ও জনগোষ্ঠীর নিজেকে আবার ফিরে পাওয়ার অবলম্বন, জাগরণের সূত্র। তবে এসব তো তত্ত্বের কথা। বাস্তবের দিকে মুখ ফেরালে আমরা দেখি সাতচল্লিশের দেশভাগ সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের ভিত্তিতে যে বিভাজন ও বিদ্বেষ সমাজে আরোপ করেছিল, দ্বিজাতিতত্ত্বভিত্তিক যে ধর্মীয় জাতীয়তাবোধ চাপিয়ে মুছে ফেলতে চেয়েছিল বাঙালি সত্তা, তার বিপরীতে বাঙালির জাগরণ ছিল ভাষাভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক জাতিচেতনা নিয়ে, স্বভাবগতভাবে যা অসাম্প্রদায়িক, বিভাজনের বিপরীতে সংযুক্তির আদর্শবহ। এরই অসাধারণ প্রকাশ আমরা পাই বাংলা ভাষার অধিকারের দাবিতে একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে, যা বাঙালিকে সচকিত করেছিল নিজ সংস্কৃতি বিষয়ে এবং জুগিয়েছিল এ উপলব্ধি যে, ধর্ম-পরিচয় জাতিসত্তা মুছে ফেলে না, বরং নানা ধর্মের মানুষের মিলনক্ষেত্র রচনা করে জাতীয়তা, বাংলার হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমান সবাই বাঙালি পরিচয়ে ভূষিত ও গর্বিত। কিন্তু বাঙালিত্ব দমন করে মুসলিম ধর্ম-পরিচয়কে জাতি-পরিচয় হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার জবরদস্তিতায় মেতে উঠেছিল পাকিস্তান। অথচ পাকিস্তান তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্র হলেও সে দেশে পাঠান-পাঞ্জাবি-বেলুচ-সিন্ধিদের অবস্থান ও জাতি-পরিচয় মুছে দেয়ার সাধ্য তার নিজেরও হয়নি। বাঙালিত্ব খারিজ করতে গিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে শাসকগোষ্ঠী এক সময় কায়েম করেছিল এক ইউনিট, বাতিল করেছিল সেখানকার জাতিভিত্তিক প্রদেশগুলো, যেন পাকিস্তানে কোনো জাতিসত্তা নেই, আছে কেবল ইউনিট। সেই এক ইউনিটও বাতিল হল বাঙালির আন্দোলনের ফলে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনকালে। পাকিস্তান আবার ফিরে পেল জাতিসত্তাভিত্তিক প্রদেশগুলো, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষেও জাতিসত্তা অস্বীকার করা যে সম্ভব নয়, এ ছিল তার আরেক প্রকাশ। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল ভাষার সূত্রে, হয়েছিল সাংস্কৃতিক জাগরণের অবলম্বন, শেকড়ের সন্ধানে যাত্রা, মিলনক্ষেত্র তৈরির পরিসর। ভাষাকে অবলম্বন করে শুরু হয়েছিল পূর্ব বাংলার বাঙালির ব্যতিক্রমী জাগরণ, শহীদ মিনার হয়ে উঠল যার প্রতীক, যে প্রতীক ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে, সেকুলার এক সম্মিলনী রূপে। বাঙালির মিলনের এ উপলক্ষ চরিত্রগতভাবে সাংস্কৃতিক এবং কাঠামোগতভাবে রাজনৈতিক। একুশে জাতির অন্তরে মূর্ত হয়ে ওঠার পেছনে সাহিত্যিক-সাঙ্গীতিক-সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোই ছিল প্রধান। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত প্রভাতসঙ্গীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, তবে একমাত্র নয়। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলন সাহিত্যিক যৌথতার নবযাত্রা সূচিত করেছিল। আরও কতভাবেই না গানে-কবিতায়-গল্পে-উপন্যাসে-চলচ্চিত্রে-নাটকে মূর্ত হয়ে উঠল একুশে এবং জাতির অন্তরে খোদিত করে দিল এর স্থায়ী রূপ, যা প্রতীকী ব্যঞ্জনা পেয়েছিল নভেরা আহমেদ আর হামিদুর রহমান কৃত শহীদ মিনারের নকশায়। ইউনেস্কো যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করল, তখন আমরা উদ্বেলিত হয়েছি বাংলা ভাষার এ বৈশ্বিক স্বীকৃতিতে, তবে আমরা লক্ষ করি না, এর অপর পিঠে রয়েছে বিশ্ব সভ্যতায় বাঙালির অবদান। বিশ্বায়ন আরোপিত সংস্কৃতির সমরূপত্বের সংকটকালে বাঙালির একুশে বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় মাতৃভাষার গুরুত্ব, ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার তাৎপর্য, যা আমরা কোনোভাবে যেন খুইয়ে না ফেলি। একুশের পথ বেয়ে জাতির সংহত হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ছিল আরও অনেক কাজ, অনেক উপলক্ষ। তারই জোগান দিল ১৯৬৭ সালে ছায়ানট আয়োজিত রমনার অশ্বত্থ-তলে বর্ষবরণের সঙ্গীতানুষ্ঠান। উন্মুক্ত প্রান্তরে প্রকৃতির আশ্রয়ে নতুন বছরের প্রথম প্রভাতে ভৈরবী রাগনির্ভর যে সুর ভেসে এলো তা জাতিকে অনুপ্রাণিত করল বিপুলভাবে। এ উৎসব অচিরেই পেল প্রতীকী মর্যাদা এবং ক্রমে পেতে শুরু করল বিস্তার। নগর থেকে বিতাড়িত বাংলা নববর্ষ আবার ফিরে এলো শহরে নতুন মাত্রা নিয়ে। নতুন করে সবার নজর ফিরল গ্রামীণ বর্ষবরণ, গ্রামীণ মেলা ও ক্রীড়া নবপ্রাণ লাভের সুযোগ যেন পেল এবার। ছায়ানটের এমন সীমিত আকারের ছোট আয়োজন যে এত প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারল তার কারণ এমন এক উৎসবের জন্য জাতি বুঝি প্রস্তুত হয়েছিল। বৈশাখ হয়ে উঠল বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উৎসব-আয়োজন। এই বাঙালিই বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে রাজনৈতিক ঐক্য সংহত করেছিল জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে এবং একাত্তরে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। স্বাধীন বাংলাদেশে বৈশাখী উৎসব ক্রমে বিস্তৃতি অর্জন করেছে, শেকড়ের সন্ধানে বাঙালি আরও নিষ্ঠাবান হতে চেয়েছে এবং খুঁজে ফিরছে জাতীয় মানস ও জাতীয় সংস্কৃতির রূপ। বাধা-বিঘ্ন এসেছে অনেক, বিশেষভাবে বাঙালিকে তার অসাম্প্রদায়িক উদার জাতিসত্তা থেকে বিচ্যুত করে ধর্মান্ধতা ও কূপমণ্ডূকতার পথে ঠেলে দিতে আয়োজন হয়ে ওঠে প্রতাপশালী, একপর্যায়ে লাভ করে রাষ্ট্রশক্তির সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা। সংস্কৃতি ঘিরে চলছিল এক লড়াই। এ প্রয়াসে জাতি যেন দাবি করছিল তার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত নতুন আরও অনেক আয়োজন, উৎসব-আনন্দে মিলিত হওয়ার আরও অনেক উপলক্ষ। এ উপলক্ষের জোগান এলো চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে, তরুণ শিক্ষকদের প্রণোদনায়। সমষ্টিমঙ্গল কামনা করে সজ্জিত শোভাযাত্রার ধারণা তাদের মধ্যে দেখা দেয় প্রথম, সেজন্য উপযুক্ত উপলক্ষ খুঁজছিল নবীন শিল্প-শিক্ষার্থীরা, কেবল উপলক্ষ নয়, খুঁজছিল উপযুক্ত ফর্মও, যা প্রকাশ করবে বাঙালির সত্তা ও আকুতি। স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা যায়, এ প্রেরণার উৎস শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পশিক্ষা, যিনি লোকায়ত শিল্পরূপের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে ছিলেন সদা-উন্মুখ। জয়নুল আবেদিন প্রয়াত হলেও এ শিল্পছাপ রয়ে গিয়েছিল তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষালয়ে। ১৯৮৬ সালে শিল্প শিক্ষালয়ের নবীন স্নাতকরা যশোরে আয়োজন করেছিল বর্ষবরণের সজ্জিত শোভাযাত্রার। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে জয়নুল জন্মোৎসবে মুখোশ-মুকুট-ফেস্টুন নিয়ে আনন্দ-শোভাযাত্রার আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা। এ আয়োজনে লোকসমাজের সাড়া তারা অনুভব করেছিলেন এবং সেটাই তাদের ব্রতী করে বাংলা বর্ষবরণের শোভাযাত্রার আয়োজনে। ১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখ সকালে ঢাকঢোল নিয়ে সুসজ্জিত যে শোভাযাত্রা বের হয় চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে, তা তারুণ্যের আনন্দ-উৎসব হিসেবে মন কেড়ে নেয় শহরবাসীর। স্বৈরশাসন-পীড়িত বাংলাদেশে বৈশাখের শোভাযাত্রা কেবল আনন্দময় ছিল না, ছিল প্রতিবাদীও। কেবল মনোমুগ্ধকরতা ছিল না এর অবয়বে, ছিল গভীরতাশ্রয়ী অনুসন্ধানও। যেসব প্রতীক তারা বেছে নেন শোভাযাত্রাকারীদের বহন করার জন্য, তার উৎস ছিল লোকশিল্প। ফলে বাংলার বর্ষবরণে অভিনব মাত্রা বয়ে আনল চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে প্রবর্তিত শোভাযাত্রা, পরের বছর যা অভিহিত হল মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে এবং চিরায়ত উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করে অভিনব মাত্রা। অশ্বত্থ-তলের বৈশাখী সঙ্গীতায়োজনের মতো, কিংবা তারও চেয়ে অনেক বেশি দ্রুততায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। এখানেও চারুকলার স্নাতক কিংবা শিক্ষার্থীদের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। শিল্পশিক্ষা এখন পেয়েছে বিস্তার, ঢাকার বাইরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অনেক শিক্ষালয়, তারা হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার শৈল্পিক জোগানদার। ঢাকায় শিক্ষাপ্রাপ্ত শিল্পী কিংবা শিল্প-নবিশরা তাদের নিজ নিজ জেলা-উপজেলা শহরে গিয়ে হাত লাগান মঙ্গল শোভাযাত্রা সজ্জাকরণের কাজে। ফলে বৈশাখের প্রথম প্রভাত প্রায় দেশব্যাপী জাতীয় এক শোভাযাত্রার রূপ নিয়েছে যা অভাবিত, অনন্য ও অভিনব। সাংস্কৃতিক জাগরণে যে শৈল্পিক মাত্রা প্রয়োজন সেটা আমরা অনেক সময়ে ভুলে যাই রাজনীতির চাপে। ছায়ানটের প্রভাতি সঙ্গীতায়োজন কিংবা দেশব্যাপী প্রকৃতির কোলে এমনি সঙ্গীতায়োজনের শৈল্পিক মাত্রাই তাকে এত প্রভাবসঞ্চারী করে তুলতে পেরেছে। এ আয়োজন দেশ, মানুষ, সমাজ, সঙ্গীত, সংস্কৃতি একত্রে গেঁথে প্রকৃতি-বন্দনা ও মানব-বন্দনায় মুখর হয়ে ওঠে। মঙ্গল শোভাযাত্রাও নিছক কোনো আনন্দ-আয়োজন নয়, আনন্দ তার অনুষঙ্গ বটে, তবে সেই সুবাদে এখানে আমরা পাই লোকশিল্পের নবায়ন ও নব-উদ্ভাসন, ঐতিহ্যিক শিল্পের রূপশ্রী অবলম্বন করে সম্মিলিতভাবে রাজপথ পরিক্রমণ নিবিড় এক আনন্দ ও গভীর এক বার্তা সঞ্চার করে সবার মনে। মঙ্গল শোভাযাত্রা সবাইকে একত্র করে শিল্পের ঐতিহ্যিক ধারায়, এর নানা রূপানুসন্ধান শৈল্পিক অভিযাত্রায় ব্রতী করে অনেককে। এ সাধনার সম্মিলিত মাত্রা একে জোগায় জাতীয় জাগরণের নতুন শক্তি। এসবের স্বীকৃতি আমরা দেখি ইউনেস্কোর ঘোষণায়, বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণে। স্বীকৃতি প্রদানের বার্তায় ইউনেস্কো যে উপলব্ধির পরিচয় দিয়েছে তা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ইউনেস্কো বলেছে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে উঠেছে সজীব ঐতিহ্য নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের গর্ব, সেই সঙ্গে সত্য ও ন্যায়প্রতিষ্ঠায় এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের প্রত্যয় ও সাহসের পরিচয়।’ মঙ্গল শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে বটে; তবে এর মর্মবাণী সমাজে প্রতিষ্ঠার জন্য আরদ্ধ রয়েছে অনেক কাজ। সমষ্টিমঙ্গলের বার্তা আমরা পাই বৈশাখী শোভাযাত্রা ও প্রভাতি সঙ্গীতের দেশব্যাপী উদ্যোগ আয়োজনে; কিন্তু সমাজে এর প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয়, আরও প্রত্যয়ী ও আরও সাহসী হওয়ার বাণী আমরা শুনতে পাই সঙ্গীতের ও শোভাযাত্রার আয়োজনে। নতুন বছরে সেই নতুন পণ গ্রহণ করবে বাঙালি- এমনটাই সবার প্রত্যাশা। মফিদুল হক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

দাবী, আন্দোলন এবং আন্দোলনের প্রক্রিয়া

আমি ইউভার্সিটিতে ছেলে-মেয়েদের পড়াই, তারা পাশ করে চাকরী-বাকরী পাবে কী পাবে না সেটা নিয়ে কখনো মাথা ঘামাইনি। দেখেছি সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছেলে বা মেয়েটাও কোথাও না কোথাও ঢুকে পড়ছে। তাই দুর্ভাবনা করার কোনো কারণও ছিল না। তবে ইদানিং সহকর্মীদের কেউ কেউ ছেলে মেয়েদের বিসিএস নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে শুরু করেছেন। তাদের মতে ক্লাসের লেখাপড়া নিয়ে তাদের মনোযোগ নেই, তারা নাকী দিন রাত বিসিএস গাইড বই মুখস্ত করে! সত্যি মিথ্যা যাচাই করার কোনো উপায় নেই। তাই আমি সেটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। পত্রপত্রিকায় দেখেছি বিসিএসের কোটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, বিষয়টা গভীরে ঢোকার চেষ্ঠা করিনি। চারদিন আগে ভোরবেলা উঠে খবরে দেখলাম আগের রাতে সরকারি চাকুরীর কোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রীতিমত রণক্ষেত্র হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের এ ব্যাপারে কী করার আছে কে জানে, কিন্তু তার বাসাটা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ডিপার্টমেন্টে সবাই বিষয়টা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেছে এবং আমার তরুণ সহকর্মীরা তখন আমাকে কোটা সংক্রান্ত জটিলতা বুঝিয়ে দিল। মূল চাকরীর ৫৬ শতাংশ নানা ধরণের কোটা থেকে আসে শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। কেউ অস্বীকার করবে না সংখ্যাটা যথেষ্ট বেশি। সেদিন দুপুর বেলাতেই আমাকে একজন সাংবাদিক কোটা সংক্রান্ত বিষয়ে আমার কী ভাবনা জানতে চাইল। আমি মোটেও এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই তারপরও আমার ভাবনাটুকু বললাম, আমার ধারণা ছাত্রছাত্রীদের কোটা সংস্কারের দাবীটি যৌক্তিক একটা দাবী। তারপরই আমার কাছে যে কথাটি আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেটাও তাদের জানিয়ে দিলাম। আমি বললাম, যেহেতু এই কোটাগুলোর মাঝে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সন্ততির জন্যে একটা অংশ আছে তাই আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে যেন কোনোভাবেই কোটার সংস্কারের দাবীতে ভুলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিন্দুমাত্র অসম্মান প্রকাশিত না হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ছেলেমেয়েরা চাকরী পাবে সেই আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি, আমরা তাদের যথাযথ সম্মান দেইনি, তাদের সেভাবে সাহায্য করিনি। কাজেই কোনোভাবেই যেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মান দেখানো না হয়। পরদিন ক্লাস নিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম ছাত্রছাত্রী বিশেষ নেই। এই সেমিস্টারে আমার অনেকগুলো কোর্স নিতে হচ্ছে, মাঝখানে পুরো এক মাস ক্লাস নিতে পারিনি তাই ক্লাশ নেওয়ার ভীষণ চাপ। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা জানালো তারা কোটা নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে সেই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে, তাই এখন ক্লাশ করবে না। আন্দোলন মানেই কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া, কাজেই মেনে নেওয়া ছাড়া গতি কী? আন্দোলন শেষ হবার পর শুক্র শনিবার ক্লাশ নিয়ে বাড়তি ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করতে হবে সেভাবে চিন্তা ভাবনা করছি। একটা যৌক্তিক দাবী নিয়ে ছেলে মেয়েরা যদি ক্লাশ পরীক্ষা বন্ধ করে আন্দোলন করতে চায় কে তাদের বাধা দেবে? পরদিন খবর পেলাম পুরো ঢাকা শহরকে ছেলেমেয়েরা অচল করে দিয়েছে। একেকটা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজেদের এলাকার রাস্তা ঘাট বন্ধ করে ফেলেছে। ঢাকা শহরের অবস্থা আমরা জানি, শহরের এক কোণায় কিছুক্ষণ ট্রাফিক বন্ধ থাকলেই কিছুক্ষণের মাঝে পুরো শহরে তার প্রভাব পড়ে। কাজেই শহরের বড় বড় ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা সবাই যদি নিজেদের এলাকাকে অচল করে রাখে তার ফল কী ভয়াবহ হবে সেটা চিন্তা করা যায় না। এই পদ্ধতিটি নূতন নয়, এর আগে একবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একই পদ্ধতিতে তাদের দাবী আদায় করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা সাত খুন মাপ তারা যখন খুশী পুরো শহর, প্রয়োজন হলে পুরো দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফেলতে পারে। তাদের কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। তাদের এই কর্মকাণ্ডে যে শিশুটি স্কুলে যেতে পারেনি, যে রোগীটি হাসপাতালে যেতে পারেনি, গার্মেন্টেসের যে মেয়েটি কাজে যেতে পারেনি, যে রিকশাওয়ালা তার পরিবারের খাবার উপার্জন করতে পারেনি তাদের কারো জন্যে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের এই ছাত্রছাত্রীদের কোনো মায়া নেই। তাদের দাবীটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা সৈরশাসকের পতনের মতো জাতীয় কোনো দাবী নয়, নিজেদের একটা চাকরী পাওয়ার সুযোগটা বাড়িয়ে দেওয়ার দাবী। গ্রাম থেকে একটা মেয়ে যদি শহরে এসে গার্মেন্টসে একটা চাকরীর চেষ্টা করতো, কিংবা কো্নো একজন তার জমি বিক্রি করে মালয়েশিয়াতে চাকরী পাবার চেষ্টা করতো তাহলে তাদের পাশে দেশের সব বড় বড় অধ্যাপকেরা এসে দাড়াতেন না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের পাশে তারা এসে দাড়িয়েছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কিন্তু তাদের পাশে যারা দাড়িয়েছে তাদের সম্মানটুকু রক্ষা করেনি। তারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে, যারা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল তাদেরকেও অপরাধী করে দিয়েছে। যদি আমি জানতাম তারা এরকমটি করবে তাহলে তাদের দাবীর বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে একশ হাত দূরে থাকতাম। বিসিএস পরীক্ষায় কী প্রশ্ন করা হয় কিংবা ভাইভাতে কী জিজ্ঞেস করা হয় আমি জানি না। আমি যদি সেই পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে থাকতাম তাহলে তাদের নিচের প্রশ্নটি করতাম: তোমার দাবী আদায় করার জন্যে তুমি কী সবাইকে নিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে পুরো শহরকে জিম্মি করে ফেলার বিষয়টি সমর্থন করো? যারা এই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরী নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে তারা কী উত্তর দিতো? আমার খুব এটি জানার ইচ্ছা। টিকে

আমরা কখন এমন হব?

২০০৬ সালের মে মাস। আমেরিকার টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি`-র সাথে তিউনিসিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অফ টিউনিস- এল্ মানার’-এর এক যৌথ গবেষণা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে মাত্র। এ উপলক্ষে দু’সপ্তাহের জন্য আমাকে যেতে হয়েছিল তিউনিসিয়ার রাজধানী ‘তিউনিস’-এ। সুদূর উত্তর আফ্রিকায় ভূ-মধ্যসাগরের পাড়ে, লিবিয়া আর আলজেরিয়ার মাঝখানে এক কোটি লোকের ছোট্ট দেশ তিউনিসিয়া। সে দেশের এক বড় অংশকে সাহারা এমনিতে গ্রাস করে ফেলেছে। তার ওপর মরুভূমির বালুর চাদর আগ্রাসী আক্রোশে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে তিউনিসিয়ার অবশিষ্ট সবুজাঞ্চলের দিকে। এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও সে দেশের সংগ্রামী মানুষ টিকে আছে শত শত বছর ধরে। তথাপি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘জেসমিন বিপ্লব’-এর আগে, বাংলাদেশের অনেক লোক এ দেশটির নামও জানতেন না। সে দেশের কথা আমি প্রথম শুনেছি মাত্র ১৯৭০ সালে যখন তৎকালীন জর্ডানের বাদশাহ্ হোসেন বিন তালাল পিএলও এবং ইয়াসির আরাফাতকে তাঁর দলবলসহ জর্ডান থেকে বের করে দেন তখন। ওই সময় তিউনিসিয়া সরকার ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর অস্থায়ী ভ্রাম্যমাণ সরকারকে আশ্রয় দিয়ে সারা মুসলিম বিশ্বের সম্মান ও সুনাম অর্জন করেছিল। ন্যাসভিল থেকে শিকাগো এবং প্যারিস হয়ে আমি যখন তিউনিস গিয়ে পৌঁছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে মাত্র একটুখানি হেলেছে। কাস্টমস্ এবং ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে আধা ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে এলাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম আগমনী এলাকায় আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন পেশাগত বন্ধু ও তিউনিসে আমার সেবারকার আমন্ত্রয়িতা‘শিহেব বোডউইন’। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই বুঝলাম, ভর দুপুরে মরুভূমি দেশের লুহাওয়ার উত্তাপ কতখানি প্রখর। গাড়িতে ওঠার পরই শিহেব বললেন, ‘সন্ধ্যা নামতে এখনো অনেক দেরি, যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে চলো হোটেলে যাওয়ার আগে তোমাকে এক চক্কর তিউনিস শহর ঘুরে দেখিয়ে নিয়ে যাই’। আমি তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। দেখলাম এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে শহরে যাওয়ার পথ খুব সুন্দর, সাজানো গোছানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে তকতকে। দু’দিকে রাস্তা, মাঝখানে সবুজ আয়ল্যান্ড-হরেক রকমের রঙিন ফুল আর নানা জাতের বাহারি গাছগাছালি দিয়ে খুব রুচি সম্মতভাবে সাজানো। শিহেব গাড়ি চালাচ্ছেন, শহর ঘুরেফিরে দেখাচ্ছেন আর ধারাবাহিক বর্ণনা দিচ্ছেন। এর মধ্যে এক সময় সাগর পাড়েও নিয়ে গেলেন। সাগরের দিকে চোখ তুলে বললেন তিউনিসিয়ার সমুদ্র সৈকতের সঙ্গে ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের ন্যূনতম দূরত্ব মাত্র ত্রিশ-পয়ত্রিশ মাইল। দুঃসাহসী তিউনিসীয়রা সাধারণ নৌকো চড়ে ওই পথে ইটালি চলে যায়। তার আগে এক জায়গায় নিয়ে তিনি আমাকে একটি তিন-চারতলা বড় বিল্ডিং দেখিয়ে বললেন, সত্তর সালে যখন পিএলওর লটবহর নিয়ে চেয়ারম্যান আরাফাত এদেশে এসে আশ্রয় নেন, এটাই ছিল তাঁর হেডকোয়ার্টার। কথা প্রসঙ্গে এক সময় তিনি গৌরবের সাথে বললেন তাঁরা মহান মনিষী ইবনে খালদুনের উত্তরাধিকারীর। এর আগে আমি জনতাম না ইবনে খালদুনের মত মহান পুরুষের জন্ম হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। সেবার তিউনিস থেকে ফিরে এসে ইবনে খালদুনের ওপর আমার বিশেষ আগ্রহ জন্ম নেয়। কিছু লেখাপড়া করি তাঁর ওপর, এখনো পড়ছি, তাঁকে জানার ও বুঝার চেষ্টা করছি। যতই পড়ছি ততই অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে, ইবনে খালদুন কত বড় মাপের ইতিহাসবিদ এবং কত বড় সমাজতাত্তি¡ক ছিলেন! এর মধ্যে তাঁর জীবন ও কাজের ওপর একটি রচনাও লিখেছি। গেল শতকে তিউনিসিয়া ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল, তারও আগে দীর্ঘদিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, দেশটি রোমানদের অধীনে ছিল। এ-সব বিদেশী শাসন ও শোষণে তাঁরা এক দিকে অনেক কিছু হারিয়েছে, আবার অন্য দিকে তাঁদের সমাজ ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধও হয়েছে। কিভাবে সে লম্বা ব্যাখ্যাতে আজ আর নাই বা গেলাম। আমার সে-দিনের ট্যুর গাইড তাঁর দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নমুনা দেখাতে নিয়ে গেলেন যাদুঘরে। ঘুরে ঘুরে দেখলাম প্রাচীন সব আর্ট ইফেক্টস। যাদুঘরের পাশেই রোমান আমলের গোলাকার গ্লেডিয়েটার-অবাক হয়ে দেখলাম, পাথরের বাঁধানো সেই প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় অক্ষতই আছে। এখানে বন্দি ক্রিত দাসরা বাঘ ও সিংহপুরুষের মত বীরদর্পে হীংস্র বন্য জানোয়ারের সাথে লড়াই করত, প্রাণ দিত। আর চার দিকে গোল হয়ে নিরাপদে বসে রোমানরা কাপুরুষের মত মানুষের সাথে পশুর লড়াই উপভোগ করত, মানবতাকে পদদলিত করত! শিহেবের সাথে গাড়িতে করে তিউনিস ঘুরতে ঘুরতে দেশটি সম্পর্কে আমার মধ্যে একটা দারুণ ইতিবাচক ধারণা জন্মালো। যদিও আমি অর্থনীতির ছাত্র, তবু আমার জানা ছিল না আফ্রিকার কোনো দেশ এত সুন্দর, এত উন্নত হতে পারে। বন্ধু শিহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা এত অল্প সময়ে এত এগিয়ে গেলে কেমন করে’? শিহেব জানালেন, সম্ভবত দুই কারণে, প্রথমত, গত দুই যুগ ধরে তাঁদের সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা এবং মানব সম্পদের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। দ্বিতীয়ত, তাঁদের ‘ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপের কাছে এটিও একটি বড় অনুষঙ্গ’- অর্থাৎ ইউরোপের সাথে তিউনিসিয়ার নৈকট্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় তাঁদেরকে কিছুটা হলেও বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরো বললেন, সকালবেলা মনস্থ করে তাঁরা দুপুরে প্যারিস পৌঁছে যান এবং কাজ সেরে রাতে ফিরেও আসতে পারেন। ইউরোপের সাথে এই ঘনিষ্ট যোগাযোগ তাঁদের জনগণের মাঝে একটি আস্থা এবং প্রতিতির জন্ম দিয়েছে, ‘ইউরোপ যদি পারে তো এত কাছে থেকে আমরা পারব না কেন’। বুঝতে আমার অসুবিধে হলো না, শিহেব আমাকে যে পথে নিয়ে ঘুরছেন সেটা ‘নিউ তিউনিস’ অর্থাৎ তিউনিসের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল এবং নতুন অংশ। নিশ্চয়ই তিউনিসেও ময়লা দুর্গন্ধ, ঘিঞ্জিময় পুরনো অঞ্চলও আছে, আছে গরিবদের থাকার জায়গা, বস্তিতূল্য অঞ্চল। বোধগম্য কারণেই প্রথম দিন তিনি আমাকে সে পথে নিয়ে যাচ্ছেন না। মনে মনে নতুন ঢাকার সঙ্গে নিউ তিউনিসের তুলনা করলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ১০০’র মধ্যে তিউনিস ৮০ পেলে ঢাকা পাবে বড়জোর ১০ কি ১২, এর বেশি নয়। ২০১৬তে তিউনিসিয়ার গড় মাথাপিছু জিডিপি ছিল বাাংলাদেশের ৪ গুণেরও বেশি। তিউনিসিয়ার শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ। এ-সব বিবেচনায় নিয়েও আমি বলতে চাই, বুঝলাম আমরা গরিব, লেখাপড়ায় পিছিয়ে, তার না হয় ঐতিহাসিক কারণ আছে, কিন্তু আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় এত পেছনে পড়ে থাকব কেন, এর কারণ কী? সস্প্রতি লন্ডনভিত্তিক ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক সমীক্ষায় দেখা যায় পৃথিবীর ১৪০টি জনবহুল নগরের মধ্যে বসবাস যোগ্যতার মানদণ্ডে সবার ওপরে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন এবং সবার নিচে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আমার প্রিয় ঢাকা শহর। এর আগে ঢাকার অবস্থান ছিল নিচের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে। জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারের একটু ওপরে। এখন আমরা সবার নিচে, অর্থাৎ নোংরামির বিচারে সবার ওপরে। আমার প্রশ্ন, কেন আমাদের এই করুণ দশা, কে দেবে এ প্রশ্নের জবাব, সরকার, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, না তাঁরা কেউ নন। এই কঠিন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হবে ঢাকায় বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিককে। কেউই এ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। সরকার কিংবা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে একা একা এতবড় একটি শহরকে পরিষ্কার করে রাখা সম্ভব নয়। এ কাজে সবার দায়িত্ব আছে যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে সবাইকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে, ঢাকা শহরের মানসম্মান বাঁচাতে হবে। ঘোরাঘুরি করে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তখন শিহেব এক দোকান থেকে আমাকে কিছু বোতলের পানি, মিষ্টি ফল, আর শুকনো খাবার কিনে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন। যাওয়ার সময় তিনি বলে গেলেন, ‘তুমি একটুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গোসল সেরে ইচ্ছে করলে এখানে এই সব রেস্টুরেন্টে এসে রাতের খাবার খেতে পার’। আমি গোসল করলাম ঠিকই, কিন্তু বেরোতে ইচ্ছে হলো না, সফর ক্লান্তিতে চোখ দুটো বুজে আসছিল। একটি কলা, কয়েক টুকরো বিস্কুট এবং তিন চার ঢোক বোতলের পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সাধারণত বিছানা বদলে আমার ঘুমের সমস্যা হয়, কিন্তু সে-রাতে তেমন কোনো অসুবিধা হলো না। অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে এক ঘুমে ভোর বেলা উঠলাম। সকালে হোটেলের বেসমেন্টে নাস্তা খেয়ে সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ভাবলাম, উত্তর আফ্রিকায় প্রথম এসেছি, দেশটি কেমন, তার মানুষজন কেমন, একটু দেখি। হোটেলটি যে সড়কের উপর সেটা অনেকটা ঢাকার মিরপুর রোডের মতন। চওড়া রাস্তা এবং যান চলাচলেও বেশ ব্যস্ত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকালাম। কয়েকটি জিনিস আমার চোখে ধরা পড়ল। প্রথমত, ছোটবড় বাড়ি, বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং সর্বত্র বিল্ডিংএর ছাদে, ঘরের দেয়ালে টিভির ডিশ অ্যান্টেনা। বুঝলাম সবাই স্যাটেলাইট টিভি দেখেন। উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর ছাদে, বারান্দায় ও বেলকনিতে লোকজন রঙ-বেরঙের ভেজা কাপড় মেলে দিয়েছেন। বুঝলাম এব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে একটি মিল আছে। আরেকটা বিষয় আমার নজর কাড়ল, সেটা হলো রাস্তায় রিক্সা বা ওই জাতীয় কোনো ধীর গতির যানবাহন নেই। সবাই গাড়িতে চলছে। আরো ভালো করে খেয়াল করে যা দেখলাম তাতে অবাক না হয়ে পারলাম না। গুনে দেখলাম প্রতি ১০টি গাড়ির মধ্যে ৬টির স্টিয়ারিং হুইল ধরে যিনি বসে আছেন তিনি একজন নারী। অর্থাৎ তিউনিসিয়ার নারী সমাজ খুব অগ্রসরমান, তাঁরা রান্নাঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ নয়, ঘরের বাইরেও তাঁদের আরেকটি জগৎ আছে যেখানে তাঁরা কাজ করেন, নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে চলাফেরা করেন। চেহারা সুরতে, চলনে বলনে এবং বেশ ভূষায় তিউনিসীয় নারীগণ একেবারে ইউরোপীয়দের মতন। আধুনিক ভাষায় যাকে বলে স্মার্ট। কতক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার পর হোটেলের উল্টোদিকে কিছুদূর হাঁটলাম। ওদিকে দেখলাম একটি বিশাল আবাসিক এলাকা। সবই বড় ও মাঝারি সাইজের পাকা বাড়ি। সবকটা বাড়িই দেয়াল ঘেরা। ভেতরে বাড়ির সামনে আছে সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান। দেখে মনে পড়ল ষাটের দশকের ধানমন্ডির কথা। ওই সময় ঢাকার ধানমন্ডি এ-রকমই সুন্দর ছিল-একেবারে ছবির মতন। আবাসিক এলাকায় লোক চলাচল তেমন নেই, নেই ফেরিয়ালাদের হাঁকডাক ও ফকির মিসকিনদের আহাজারি। মাঝে মাঝে দেখলাম বাড়ির সামনে বাগানে লোকজন ফুলগাছের পরিচর্যা করছেন। দু’তিন রাস্তা পরপর মোড়ের কোণায় কোণায় ছোট ছোট দোকান। এ-সব দোকানে চাল, ডাল, ডিম, রুটি, তেল, পানি, তরিতরকারি, ফলমূল, কুকি-বিস্কুট, চকলেট, ললিপপ ইত্যাদি পাওয়া যায়। এ-ভাবে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে পারলাম রোদের তেজ বাড়ছে, আর বেশি সময় বাইরে থাকা যাবে না, তাই সোজা হোটেলে ফিরে এলাম। দুপুরের দিকে শিহেব আসলেন। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে গেলেন। একটি ক্লাসে গেলাম। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বললাম। তাদের সাথে পরিচিত হলাম। তাদের কতাবার্তা ও চিন্তা ভাবনার কথা জেনে অবাক হলাম! তারা খুব চটপটে, আধুনিক। আমেরিকার প্রতি তাদের কৌতূহলের সীমা নেই, তবে তারা একেবারেই অন্ধ আমেরিকা অনুসারীও নয়। কথাবার্তায় পরিশীলিত, কাপড়ে চোপড়ে ভদ্র ও শালীন। তারা চারটি ভাষায় স্বচ্ছন্দে কথা বলতে জানে। আরবি, ফরাসি, ইংরেজি এবং এই তিন ভাষার সংমিশ্রণে চতুর্থ আরেক ভাষা যার কোনো নাম নেই। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজে চারটি নয়, তিনটি নয়, মাত্র দু’টি ভাষা শেখানো হয়, তাও কতিপয় শহুরে স্কুল ছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি তো জানেই না, বাংলাটাও ঠিকমত রপ্ত করতে পারে না। সব মিলে উত্তর আফ্রিকার একটি ছোট্ট দেশ তিউনিসিয়ার সাথে আমার জন্মভূমি বাংলাদেশের তুলনা করে হতাশ হলাম। মনে বড় কষ্ট পেলাম। ভাবলাম, আমরা কখন এমন হব? এ-কথা বললেও ‘তিউনিয়া’ কিন্তু আমাদের আদর্শ নয়, আমরা বৈষয়িক উন্নতি, নৈতিক ও চারিত্রির বলে দুনিয়ার সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে চাই। এই হোক আমাদের অঙ্গীকার! লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক - টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিএডিটর : জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজEmail: awahid2569@gmail.com

কোটা সংস্কার যে কারণে জরুরি

রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায়ও একই বিক্ষোভ চলছে। তরুণদের আমি বলবো সাধারণ মানুষের যেন কষ্ট না হয়। আর সরকারকে বলেবা, কেন এই তরুণরা দিনের পর এভাবে আন্দোলন করছে কেউ কী ভেবে দেখেছেন? একটু খোঁজ নিন। আজকের তারুণ্য কেন সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সংস্কার চাইছে -একটু বোঝার চেষ্টা করুন। আমি নিশ্চিত আন্তরিকভাবে শুনলে আপনারা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হবেন। কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে এই তরুণরা বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করছে। এর মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু সেটি নিয়েও বিপত্তি বাঁধিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কোটায় শূন্য থাকা সিটে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, এক কোটার শূন্য আসন অন্য কোটা দিয়ে পূরণ করা হবে। এটা রীতিমত প্রহসন। বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরিতে শতভাগ কোটা। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৫৬ ভাগ কোটা। এর ফলে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ প্রার্থীরা। প্রচলিত এই পদ্ধতির সংস্কার চাইছে তারুণ্য। কোটার সংস্কার চাইলে অনেকেই সেটাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে উড়িয়ে দেন। যারা এমন কথা বলেন তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর সরকারের একটা সিদ্ধান্তের কথা জানাই। ১৯৭৪ সালে সরকার যে অ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভ সার্ভিস রিঅর্গানেইজেশন কমিটি (এএসআরসি) গঠন করে সেই কমিটি প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে কোন ধরনের কোটা না রাখার সুপারিশ করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুও সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে জাতির জনককে হত্যার পর সেই কাজ থেমে যায়। আবারও উল্টো পথে চলা শুরু করে জাতি। যারা এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চান তারা বাংলাদেশ লোক প্রশাসন পত্রিকার ষষ্ঠদশ সংখ্যা পড়তে পারেন। আমি নিশ্চিত বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজকে কোটার এই কাটা থাকতো না। শুধু বঙ্গবন্ধুর সরকার নয় এরপরেও অসংখ্যবার সরকারের কমিটিগুলো কোটা সংস্কারের সুপারিশ করেছে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। আমিও আগেও বলেছি আমাদের সংবিধান বা মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা তাতে সবার জন্য সমান সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। কাজেই কোটা সংস্কার চাওয়া মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে থাকা। আমি এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কথা বলতে চাই। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভূমিকা নিয়ে নিশ্চয়ই আপনাদের সন্দেহ নেই। সেই আনিসুজ্জামান স্যারও বলেছেন, বর্তমানে ১০ শতাংশের বেশি কোটা থাকা উচিত।’ স্যার বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের নামে যে কোটা আছে, সেটা এখন আর থাকা উচিত নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের সন্তানরাও এখন বড় হয়ে গেছে। তাই এটা এখন কোনভাবেই চলা উচিত নয়। এটা মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা।’ আরেক মুক্তিযোদ্ধা ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলেছেন, নিয়োগ পদ্ধতি হওয়া উচিত প্রতিযোগিতামূলক। সেখানে সবচেয়ে যোগ্য জনবল দরকার। সেখানে কোটা থাকা উচিত নয়। আর কোটার জন্য কেউ যুদ্ধ করেনি। পিএসসির উদ্যোগে যে গবেষণা হয়েছে সেখানে আকবর আলী খান এবং সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিনও কোটা সংস্কারের সুপারিশ করেছেন। আকবর আলীকে যারা শুধুই সুশীল মনে করেন তাদের মনে করিয়ে দেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি হবিগঞ্জের মহুকুমা প্রশাসক বা এসডিও ছিলেন এবং যুদ্ধকালীন সময়ে সক্রিয়ভাবে মুজিবনগর সরকারের সাথে কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধ কালে পাকিস্তান সরকার অনুপস্থিতিতে তাঁর বিচার করে এবং ১৪ বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি সরকারি চাকুরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর আগের অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সমর্থন দেন। পাকিস্তান বাহিনীর আক্রমণ শুরু হলে হবিগঞ্জ পুলিশের অস্ত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অণুপ্রাণিত করেন। মুজিবনগর সরকার তখনো প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় অনেক সরকারি কর্মচারীই লিখিত অণুমতি ছাড়া অস্ত্র যোগান দিতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু আকবর আলী খান নিজ হাতে লিখিত আদেশ তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র, খাদ্য ও অর্থ যোগান দেবার আদেশ প্রদান করেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য তহবিল তৈরি করতে ব্যাংকের ভল্ট থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা উঠিয়ে ট্রাকে করে আগরতলায় পৌঁছে দেন। সেই আকবর আলী খান বলেছেন, কোটার সংস্কার করা উচিত। আবারও বলছি আমাদের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোটা। যারা মনে করেন কোটা পুরস্কার তাদের বলি সংবিধানে পরিস্কার করে বলা আছে, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কোটা। আমার প্রশ্ন, যে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি চাকুরি করেছে, যার সন্তান চাকুরি করেছে তার নাতি কী করে পিছিয়ে পড়া? আর পারলে বিশ্লেষণ করুন চলমান নারী কোটায় কী ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়া একটি মেয়ে কোটার সুবিধা পাচ্ছে নাকি কুড়িগ্রামের একটি মেয়ে? বর্তমান জেলা কোটায় কারা ‍সুবিধা পাচ্ছে- ঢাকা নাকি পঞ্চগড়? যারা কথায় কথায় কোটার সাথে মুক্তিযুদ্ধকে মেলান তাদের বলি এদেশের অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেই। অসহায় অবস্থায় দিনযাপন করে বহু মুক্তিযোদ্ধা। তাদের কী কোটা দিতে পেরেছেন? শহীদের সন্তানরা কেন কোটা পাবে না? কেন পাবে না বীরাঙ্গনার সন্তানরা? আর বাস্তবতা যদি বলেন, রাজাকার আর গুটিকয়েক লোক বাদে ৭১ এ পুরো বাংলাদেশই তো স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। গ্রামেগঞ্জে প্রচুর মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাহলে তারা কেন কোটার সুবিধা পাবে না? তাদের কথা না হয় বাদ দিলাম এ দেশের ৩০ লাখ শহীদের কারও কী মুক্তিযোদ্ধা সনদ আছে? কয় লাখ ধর্ষিতার মুক্তিযোদ্ধা সনদ আছে? বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের কতোজন সনদ নিয়েছেন? তার মানে আপনারা যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটা চাইছেন তারা আসলে সনদধারীরা জন্য কোটা চাইছেন তাই তো। কোন সন্দেহ নেই, যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তারা জাতির বীর সন্তান। তাদের মধ্যে যারা সনদধারী তারা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাবেন বাংলাদেশে সেটা আমি সানন্দে মেনে নিতে রাজি। কিন্তু তাদের সন্তান আর নাতি পুতিরা কী এমন করলো যে তাদেরও কোটা দিতে হবে? কোটার কারণে মেধাবীরা কীভাবে বঞ্চিত হবে শুনবেন? প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অংশ নেন সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থী (চলতি বছরের হিসাবে)। কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তাহলে তিনি চাকরি নাও পেতে পারেন। কারণ ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেওয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ সাত হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন। চলমান কোটা পদ্ধতির যে সংস্কার প্রয়োজন সেটা যে কোনো বোধসম্পন্ন মানুষই স্বীকার করবে। এমনকি সরকারি কর্ম-কমিশনও (পিএসসি) প্রতিবছর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই কোটা সংস্কারের কথা বলে আসছে। ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটা প্রস্তাব সরকারকে দেয় পিএসসি। কিন্তু বাস্তবে কোটা সংস্কারের সব প্রস্তাবই কাগজে বন্দি হয়ে রয়েছে। আবারও বলি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান এবং সাবেক সচিব কাজী রকিব উদ্দীন বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার ওপর ২০০৮ সালের মার্চে একটি গবেষণা করেন। ৬১ পৃষ্ঠার এই গবেষণা প্রতিবেদনে কোটা কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৭ সালে এক বৈঠকে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের প্রায় সব সদস্য সরকারি নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কমিশনের সদস্যদের মধ্যে একমাত্র এম এম জামান ছিলেন কোটার পক্ষে। তবে কোটার পক্ষে সেদিন জামানের অবস্থান থাকলেও তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবস্থাটি চালু রাখার পক্ষে ছিলেন। তবে ১৯৮৭ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে কোটার হার ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার কথা বলেছিলেন তিনি। ওই সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর দেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোটা থাকার কথা নয়। তবে ওই প্রতিবেদন বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি। চলমান কোটা পদ্ধতি নিয়ে প্রতিদিন শত শত তরুণের সঙ্গে আমার কথা হয়। তারা সবাই কোটা পদ্ধতিকে মেধাবী তরুণদের জন্য অভিশাপ বলে মনে করেছেন। তারা এই কোটা পদ্ধতির সংস্কার চান। অন্যদিকে মেধানির্ভর জনপ্রশাসন গড়তেও এই কোটা পদ্ধতির সংস্কার দরকার। তবে প্রশ্ন হলো কবে সেটি হবে? আর কতোদিন মেধাবী তারুণ্যকে এই কোটার যন্ত্রণায় ভুগতে হবে? আমি মনে করি খুব দ্রুতই কোটা সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর যতো দ্রুত সেটা হয় ততোই দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের চৈতন্যোদয় হোক। শুভ বুদ্ধি জাগ্রত হোক সবার। লেখক: ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট ও ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান

সীতাকুণ্ডের মানববন্ধন আগামীদিনের মাইলফলক

কবি হেলাল হাফিজের ভাষায়, ‘Now who is in youth,it is the best time for him to go to the procession. Now who is in youth,it is the best time for him to go to the war.’ ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় তার’। যুবক কিংবা তরুণেরাই সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের সকল অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কালে কালে রুখে দাঁড়িয়েছে। তরুণেরাই পারে সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে। বিশ্বসভ্যতায় যা কিছু অর্জন তার পেছনে অবদান এ তরুণ সমাজের। সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আজ তারুণ্যের জোয়ার ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল মানববন্ধন কর্মসূচিকে ঘিরে। লাগাতার সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদে ও নিরাপদ মহাসড়কের দাবীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ পূর্বঘোষিত ১ঘণ্টার (সকাল ১০-১১টা) এ মানববন্ধন কর্মসূচিতে স্বতঃষ্ফূর্তভাবেই অংশ নেয়। বিভিন্ন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজনহারা মানুষেরাও ব্যানার, ফেস্টুন প্লেকার্ড হাতে আজকের মানববন্ধনে সামিল হয়েছিল। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে সীতাকুণ্ডের কোনো মা সন্তানহারা, স্ত্রী স্বামীহারা কিংবা সন্তান পিতৃহারা  আর না হোক-এ আকুল আকুতিই ছিল ভুক্তভোগী স্বজনহারা মানুষগুলোর কণ্ঠে। তাদের এ দীর্ঘশ্বাস ও বোবা কান্নার আওয়াজ দুর্ঘটনা কমানোর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তা ব্যক্তিদের কানে ঢুকবে কি না- এমন প্রশ্নও করেছেন অনেকেই। আসলে সীতাকুণ্ডের মানুষগুলো বেশিরভাগই সহজ-সরল, আইনের প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল। তবে দেশের অন্য এলাকার তুলনায় নাগরিক-অধিকার সচেতন নয় বলেই যুগে যুগে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে শোষণ-বঞ্চনার শিকার। প্রভাবশালী সরকারি-বেসরকারি মহলের দ্বারা এখানের নিরীহ মানুষগুলো নানাভাবেই অত্যাচার ও প্রতারণার জালে আবদ্ধ স্মরণাতীতকাল থেকেই। শিল্পাঞ্চল হয়েও এখানকার হাজার হাজার যুবক বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত। শুধু সড়ক-দুর্ঘটনা নয়, সকল অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ডের সচেতন যুবসমাজকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে; পালন করতে হবে সাহসী ও অগ্রণী ভূমিকা। আজকের মানববন্ধনকে ঘিরে সীতাকুণ্ডবাসী জেগে ওঠেছে। এ জাগরণের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। স্বাধীনদেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের বিশেষকরে তরুণ প্রজন্মকে তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে আরও সচেতন ও সজাগ হতে হবে। সীতাকুণ্ডের জনগণ সচেতন হলে এখানে সড়ক দুর্ঘটনাও কমে আসবে। শুধু সীতাকুণ্ড নয়, সারাদেশের জন্যে এটি প্রযোজ্য। দুর্ঘটনার জন্যে এককভাবে শুধু চালকেরাই দায়ী নয় এর পেছনের আরও নানাবিধ কারণ রয়েছে। ওই কারণগুলো সম্পর্কে সচেতন প্রতিটি মানুষের কম বেশি ধারণা আছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণ সচেতন হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা দায়িত্বপালন করতে বাধ্য হবেন। শুধু মানববন্ধনই শেষ নয় এর ফলোআপ কর্মসূচি হিসেবে অচিরেই সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ক মানববন্ধন বাস্তবায়ন পরিষদ স্থানীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসবে। সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিশিষ্ট জনদের সমন্বয়ে যান ও মালবাহন তদারকির জন্যে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। গাড়িগুলো যাতে ওভারটেকিং ও ওল্টোপথে চলাসহ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করতে না পারে- তা দেখভাল করতে সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্পটে স্থানীয় বেকার যুবকদের (ট্রাফিক আইনে দীক্ষা দিয়ে) মোতায়েন করা হবে। এখানের শিল্প কারখানার মালিক ও বিত্তশালীদের সহায়তায় গাড়ি তদারককারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হবে। মহাসড়কের পাশে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারের জন্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু ওভারব্রিজ নির্মাণ নয়,সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী যাতে উড়াল সেতু ব্যবহার করে- তার জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি আরোপ করতে হবে। জনগণ সচেতন হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহনীয় পর্যায়ে এসে যাবে। জাতীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য অর্থ যোগানদাতা শিল্পাঞ্চল সীতাকুণ্ড-ই হচ্ছে আমাদের ‘মিনি বাংলাদেশ’। আমরা-ই এ ‘মিনি বঙ্গদেশ’ এর জনগণ। আমরা যদি সার্বিকভাবে সচেতন ও সতর্ক হই, চোখ-কান খোলা রাখি তাহলে আমাদের কারো দ্বারা কখনো শোষণ, বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার হতে হবে না। পরিশেষে বলতে চাই, সীতাকুণ্ডের সড়ক-দুর্ঘটনা বিষয়ক এ নজিড় বিহীন মানববন্ধন সরকারের যোগাযোগমন্ত্রকের জন্যে বিশেষ এক বার্তা। সড়ক-দুর্ঘটনা অবশ্য শুধু সীতাকুণ্ডের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় তথা আন্তর্জাতিক সমস্যাও বটে। যেভাবে দেশে সড়ক-দুর্ঘটনা ক্রমাগত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, সরকার যদি এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয় তাহলে এর জন্যে চরম মাশুল দিতে হবে। লেখক: প্রধানসম্পাদক, সাপ্তাহিক চাটগাঁর বাণী

লক্ষ্য কি শুধুই বিসিএস?

ক্যাম্পাসের এক জুনিয়রের সঙ্গে দেখা। জানতে চাইলাম, পড়াশোনার বাইরে আর কী করো? বললো, একদম সময় পাই না ভাইয়া। - সময় পাওনা কেন? - ডিপার্টমেন্টে পড়ার চাপ। লাইব্রেরিতে বিসিএসের পড়াশোনা। সপ্তাহে তিনদিন আইএমএলে ফ্রেঞ্চ ভাষা শেখার ক্লাস। দুটো টিউশনি। সামনের সপ্তাহ থেকে এক ভাইয়ের কাছে জব ম্যাথ শুরু করবো ভাবছি। আমি অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাত্রই থার্ড সেমিস্টারে পড়ে। চোখেমুখে লেগে আছে মফস্বলের ছোঁয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশালতা অনুভবের এই তো শ্রেষ্ঠ সময়। অথচ কে বা কারা এই বয়সেই ছেলেটার মধ্যে জাগতিক হিসাব-নিকাশ ঢুকিয়ে দিয়েছে! চারপাশে এমন ছেলে-মেয়ের সংখ্যাই দিন দিন বাড়ছে। এদের জন্যে মায়া হয় আমার। পাশ করে কী করবে, কোনদিকে আগাবে- বৈষয়িক এমন তাড়নায় এরা না পারে ক্যাম্পাস উপভোগ করতে, না পারে জীবনের ফোকাস ঠিক করতে। মাঝখান দিয়ে চলে যায় বসন্তের দিন, বুকের গহীণে জমা হতে থাকে হতাশা। বড় জানতে ইচ্ছে করে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানে কী ক্লাসের পড়াশোনা বাদ দিয়ে কেবল বিসিএস বা চাকরির প্রস্তুতি নেয়া? দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাস কী তাই বলে? আমি জানি অপরাজেয় বাংলার সামনে দাঁড়িয়ে এদের অনেকেই কোনদিন অনুভব করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধের সুবিশাল মহত্ত্ব। কার্জন হল কিংবা মধুর ক্যান্টিনের সামনে দিয়ে হেঁটে যাবার সময় ঐতিহাসিক অনুভূতিতে কখনোই শিউরে ওঠেনি শরীর! অথচ ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার পতনসহ জাতির সকল ক্রান্তিকালেই কী গৌরাবান্নিত অবদানই না রেখে গেছে এদের পূর্বসূরিরা! পড়াশোনার ফাঁকে ফুলার রোডের আড্ডা, চারুকলায় জলের গান, টিএসসিতে সংগঠন করাকে অনেকের কাছেই সময় নষ্ট মনে হয়। এদের কাছে জীবনের মানে দিন শেষে নিজেকে ভালো চাকুরে হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সুশান্ত পালরা সুনিপুন ভাবে বিসিএসের মাপকাঠিতে সাফল্য মাপতে শিখিয়ে দিয়েছে এদের। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মানে এখন বিসিএস প্রিপারেশন, আইইএলটিএস, সাইফুরস ম্যাথ শেষের তাড়াহুড়ো। হলের লাইব্রেরিগুলোতে ক্লাসের পড়ার বদলে চাকরির পড়াশোনার মচ্ছব। অথচ ক্লাস শেষে টিএসসিতে বন্ধুর মায়ের জন্য সাহায্যের টাকা তুলে, সন্ধ্যায় মল চত্ত্বরে ফুটবল খেলে, মধ্যরাতে পলাশীতে সমবেত কন্ঠে গান গেয়ে, ভোর হয় হয় রাতে যে ছেলেটাকে হলে ফিরতে দেখি ওর মধ্যেও আমি জীবনের ভিন্ন মানে খুঁজে পাই। যে ছেলেটা নিজের রক্ত দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচায়, যুক্তির ঝড় তোলে বিতর্কের মঞ্চে, তার ভেতরে বেঁচে থাকতে দেখি সমাজ বদলের আশাগুলোকে। সবাই কী ক্লাসে ফার্স্ট হতে কিংবা ফার্স্ট ইয়ার থেকেই চাকরির প্রস্তুতি নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে? সবার সাফল্যের আইকন কি বিসিএস ফার্স্ট? কেউ কেউ তো জীবনের বহুরঙা ভিন্ন মানেও খুঁজে নেয়। ভরা পূর্ণিমায় বেরিয়ে পড়ে জোছনা স্নানে। হেমন্তের সন্ধ্যায় খোঁজে শিউলি ফুলের ঘ্রাণ। শুধু বিসিএস কোচিং নয়, কারো কারো বুকের ভেতর তো নির্ঘুম জাগে অন্নহীন পথশিশুদের ভাগ্যবদলের স্বপ্নও। বিশ্বাস করো, দিনশেষে ওই ছেলেগুলোকেও আমি ব্যর্থ হতে দেখিনি। জীবন এক বৈচিত্র্যময় অনুভূতির অ্যালবাম। টুকরো টুকরো গল্প, রঙ-বেরঙের স্মৃতি তাতে পূর্ণতা দেয়। সায়াহ্নে এসে সাবারই একবার উঁকি দিতে ইচ্ছে হয় অ্যালবামটাতে। ফেলে আসা পুরনো দিন দেখে কেউ তৃপ্তির নি:শ্বাস ফেলে, কারো আবার ঝরে আফসোসমাখা দীর্ঘশ্বাস...! প্রিয় অনুজ, জীবনের স্মৃতির অ্যালবামটা কতটা বর্ণিল গল্পে সাজাবে, এ সিদ্ধান্ত তোমার। মনে রেখো, চলে যায় বসন্তের দিন, চলে যায় স্মৃতি তৈরীর শ্রেষ্ঠ সময়...! লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক এসএ/  

এখনও ঝুঁকি চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুটে, মেলেনি ক্ষতিপূরণ

১৮ প্রাণের বিনিময়েও নিরাপদ হয়নি চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুট। ঘাট পরিচালনা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় দুর্ঘটনার এক বছর পরও ক্ষতিপূরণ পায়নি নিহতদের পরিবার। তবে দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ঘাট পরিচালনায় যুক্ত সরকারি তিন সংস্থা- বিআইডব্লিউটিসি, বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই রুটে যাত্রীরা প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির এমন প্রতিবেদনের পরও এ রুটে সেবার মান উন্নয়নে মনোযোগ নেই সরকারি তিন সংস্থার। উল্টো তা আরও খারাপ হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় এ রুটে দুটি জাহাজ চলাচল করলেও এখন একটিও নেই। স্পিডবোট ও পণ্যবাহী ট্রলারেই এখন উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে হচ্ছে দ্বীপের সাড়ে চার লাখ মানুষকে। এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। তাদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আর নিহতদের স্মরণে সন্দ্বীপে কর্মসূচি পালন করে স্কুল শিক্ষকদের সংগঠন। ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপ যাওয়ার পথে এক নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নারী-শিশুসহ ১৮ জন। জাহাজ থেকে নেমে লাল বোটে করে তীরে ওঠার সময় বোটডুবিতে তাদের মৃত্যু হয়। সেই লাল বোট এখনও চলছে কুমিরা-গুপ্তছড়া রুটে। এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান ও তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুর রশিদ বলেন, ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌরুটে যাত্রী পারাপার বাবদ টোল আদায় করলেও সেবা বাড়াতে মনোনিবেশ করছে না। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের `আমরা সন্দ্বীপবাসী` সংগঠনের আহ্বায়ক ডা. রফিকুল মাওলা বলেন, মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই সাগর পাড়ি দিচ্ছে সন্দ্বীপের সাড়ে চার লাখ মানুষ। চারদিকে পানি বেষ্টিত এ দ্বীপের বাসিন্দাদের চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌ পথ। গতকাল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে `আমরা সন্দ্বীপবাসী`। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রফিকুল মাওলা। সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি একেএম বেলায়েত হোসেন বলেন, নৌ দুর্ঘটনায় নিহত ১৮ জনের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন `আমরা সন্দ্বীপবাসী`র সংগঠক ফোরকান উদ্দিন রিজভী, আবুল কাসেম ও মোহাম্মদ ওমর ফয়সাল। টোল আদায় নিয়ে চলছে কাড়াকাড়ি চট্টগ্রাম থেকে সন্দ্বীপে যাতায়াতের রুটটিতে কোনো সংস্থারই একক নিয়ন্ত্রণ নেই। কুমিরা-গুপ্তছড়া নামে পরিচিত এ রুটে জাহাজ কিংবা সি-ট্রাক চালানোর অনুমতি দেয় বিআইডব্লিউটিসি। এখানে কমিশন এজেন্ট নিয়োগ করে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতি বছর ১২ লাখ টাকা আয় করছে তারা । যে জেটি দিয়ে স্টিমার কিংবা সি-ট্রাকে উঠতে হয় সেটির মালিক বিআইডব্লিউটিএ । নির্মাণ ত্রুটির কারণে দুই জেটির একটি ব্যবহার করা না গেলেও প্রতিবছর ৪০ লাখ টাকা যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়ে যাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ। আবার ঘাটে থাকা তীরের মালিক জেলা পরিষদ। তাই প্রতি বছর খাজনা বাবদ তারা যাত্রীদের কাছ থেকে ইজারাদারের মাধ্যমে নিচ্ছে সাড়ে তিন কোটি টাকা। সরকারের এ সেবা সংস্থাগুলো টোলের বিনিময়ে যাত্রী নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তিন সংস্থাই এ ব্যাপারে উদাসীন বলে অভিযোগ যাত্রীদের। স্বজনহারাদের দুর্বিষহ জীবন গত বছরের নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রহমতপুরের মাস্টার ইউসুফ, মাস্টার ওসমান গণি, টেকনাফের সামছুল আলম, কাছিয়াপাড়ের মাইনুদ্দীন, মুছাপুরের হাফিজ উল্ল্যা, বাউরিয়ার নিজাম উদ্দীন, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ মাগুরার কামরুজ্জামান, শিশু তাহসিন, নিহাসহ ১৮ জন। তাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। এক বছর পার হলেও নিহতদের পরিবার কারও কাছ থেকে পায়নি ক্ষতিপূরণ। সরকারি তিন সংস্থা একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে এড়িয়ে গেছে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি। দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। কেআই/টিকে

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি