ঢাকা, বুধবার, ২০ জুন, ২০১৮ ৯:৩২:৫০

ঈদের দিন বাবার সঙ্গে দেখা হতো জেলখানায়: সিমিন হোসেন রিমি

ঈদের দিন বাবার সঙ্গে দেখা হতো জেলখানায়: সিমিন হোসেন রিমি

বুঝ হওয়ার পর থেকেই ঈদের দিনটায় দেখতাম বাবা জেলখানায়। সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হতো আমাদের। ঈদে দিনে  বাবার সঙ্গে দেখা করতে ময়মনসিংহ যেতাম তখন একটা ঈদ ঈদ ভাব কাজ করতো মনে। যেমন ভালো খাবার দাবার, সবাই একটু খুশি খুশি মেজাজ। ট্রেনে যেতাম। ফুলবাড়ীয়া ষ্টেশন থেকে তখন ট্রেন ছাড়তো। ১৯৬৯ সালের ঈদের কথা আমার খেয়াল আছে। সম্ভবত সেবার ঈদ হয়েছিল ডিসেম্বর মাসে। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। বাবা সেবার রাজনীতি নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, ঈদে বাবার দেখাই আমরা পাই নাই। ১৯৭০ সালে বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। বাবা তখন বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত। দিন রাত দৌড়াচ্ছেন। সঙ্গে আরো নেতাকর্মীরা আছেন। নিজের হাতে লাশ তোলাসহ সব কাজ করছেন। বড় নেতাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি দীর্ঘদিন উপকূলীয় এলাকাগুলোতে কাজ করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও আমরা বাবাকে দেখিনি। তারপর আসলো ১৯৭১ সাল। সে বছর ঈদ হয়েছিল নভেম্বর মাসে। আপনারা জানেন, বাবা একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন দেশ যতোদিন স্বাধীন না হয় ততোদিন তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকবেন না। তখন তিনি অন্য অনেকের সঙ্গে ব্যারাকে থাকতেন। তিনি বলতেন, আমি যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী। আমি যদি স্বাভাবিক সংসার যাপন করি, তাহলে আমার যোদ্ধারা মনোবল হারাবে। আমি অনেক পরে জানতে পেরেছিলাম, বাবা রণাঙ্গনে থাকাবস্থায় যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। অন্য সবার বাবা আছে। আমাদের বাবা নেই। সবাই ঈদের দিন বাবাকে দেখবে। আমরা দেখব না। আমরা দিনের পর দিন বাবার স্নেহ বঞ্চিত। এটা নিয়ে আমাদের কোনো আক্ষেপ ছিল না। তখন আমরা ধানমন্ডির যে বাড়িটিতে থাকতাম- আমাদের আশ-পাশে যারা ছিলেন সবার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা নিজের বাড়ির মতো সেসব বাড়িতে আসা যাওয়া করতাম। আমরা ঈদে কাপড় এখনকার মতো কিনতাম না। আম্মা কাপড় সেলাই করতেন। আমরা সেই কাপড় পড়ে ঈদ করতাম। আম্মার হাতের সেলাই এত সুন্দর ছিল যে, আমরা কখনো দর্জি দিয়ে কাপড় সেলাই করিনি। আমরা ভাই-বোনরা প্রতি ঈদে একটা করে জামা পেতাম। কেউ না দেখার জন্য সেটা বালিশের নিচে রেখে দিতাম। সকালে মায়ের হাতে তৈরি সেমাই খেতাম। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম দুটো ঈদে বাবা রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে ছিলেন। ফলে সেবারও আমরা বাবাকে পাইনি। ১৯৭৩ সালের কথা আমার মনে আছে। সেবার সম্ভবত ঈদ হয়েছিল সেপ্টেম্বরে। আম্মা তখন দেশের বাইরে ছিলেন। মহিলা পরিষদ থেকে তিনি একটা কনফারেন্সে গিয়েছিলেন। সেবার ঈদে আমরা বাবাকে পাই। ঈদের কয়েকদিন আগে বাবা আমাকে বললেন, এবার তো তোর মা নেই। সেমাই রান্না করবে কে? আমি বললাম, বাবা আমি করবো। বাবা বললেন, দেখিস অন্যদের মতো করিস না। তোর মা যেভাবে রাঁধে সেভাবেই রাধিস। তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর। আমি সেবার ঈদে সেমাই রান্না করেছিলাম। বাবা খেয়ে খুব প্রশংসা করেছিলেন। তখন ওইটুকুন বয়সে আমি শিখে গিয়েছিলাম কীভাবে বাড়ীর দায়িত্ব নিতে হয়। কীভাবে সংসার সামলাতে হয়। এখনকার সময়ে ১২ বছরের বাচ্চারা এরকম দায়িত্ব নেবে- এটা অকল্পনীয় ব্যাপার। সোহেলের (তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ) বয়স তখন মাত্র তিন বছর। আমাদের তখন চাহিদা কম ছিল। অল্পে সন্তুষ্ট থাকতাম। এখনকার মতো অস্থিরতা ছিল না। ভোগ করার যে প্রতিযোগিতা তা তখন কল্পনাও করা যেতোনা। বাবার সঙ্গে আমাদের শেষ ঈদ ১৯৭৫ সালে। বাবা তখনো জেলখানায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে রাখা হয়েছে। আমাদের পরিবারটি তখন গৃহবন্দী। সারাক্ষণ সবকিছু নজরদারি করা হচ্ছে। আমরা একমাসের বেশি সময় গৃহবন্দী ছিলাম। ১৫ আগস্টের এক সপ্তাহ পর বাবাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেবারও বাবাকে দেখতে আমরা জেলখানায় যাই। আমি আমার বইতেও লিখেছি, অক্টোবরের শেষ দিকে তিনি (তাজউদ্দীন আহমেদ) বলেছিলেন, আমাদেরকে সম্ভবত আর বাঁচিয়ে রাখবে না। সেজন্য তিনি কারাগারে যে ডায়েরিটা লিখেছিলেন ৫৬৭ পৃষ্টার তা মাকে যত্নে রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু পরে ডায়েরিটা আর পাওয়া যায়নি। তখনকার কারা কর্তৃপক্ষ ডায়েরিটা ফেরত দেয়নি। ১৯৭৫ এর পরের সময়গুলো ছিল খুব ভয়াবহ। বাবাকে হত্যা করার পর থেকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা ক্ষণ আমাদের কাছে এক একটা ইতিহাস। এরপর আমরা আর কখনও ঈদ পাইনি। তখন আমাদের সংসার চলতো বাসা ভাড়ার টাকায়। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা এক পর্যায়ে বাসা ছেড়ে দিল। তাজউদ্দীন সাহেবের বাড়ি শুনলে কেউ বাসা ভাড়া নিতে চাইত না। আমার মা ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগের কনভেনর হলেন। তখন পর্যন্ত চার জনের বেশি লোক একসঙ্গে বনানী কবরস্থানে (যেখানে বাবাকে কবর দেওয়া হয়েছে) যেতে দেওয়া হতো না। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বনানী কবরস্থানে পাহারা ছিল। লেখক: সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সন্তান। অনুলিখন: আলী আদনান / এআর /
আন্ত:সম্পর্ক, ভূরাজনীতি, সীমান্ত ও ভালোবাসা  

মধ্যযুগের বাংলার এক মহান কবি বড়ু চণ্ডীদাস বলে গিয়েছেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। এই বাণী তাঁর জন্মের আগে কিংবা পরে মানব ইতিহাসের সর্বকালেই প্রাসঙ্গিক এবং বর্তমানে সভ্যতার এই নাজুক সময়ে এটি আরো ব্যাপক প্রাসঙ্গিক। বাঙালীর বিশ্বকে দেওয়ার মতো এটিই সম্ভবত সবচেয়ে দরকারী ম্যাসেজ। মানব ইতিহাসে বাঙালীর আরো বহু অবদান আছে। তবে গত শতাব্দী থেকে বিশ্বকে বাঙালী তথা ভারতীয় উপমহাদেশ যা দিতে পেরেছে তার ভিতরে সবচেয়ে বড় দান হলো রবীন্দ্রনাথের চিন্তা।   ভারত বিশ্বের বিরল বহুত্ববাদী একটি বিশাল দেশ। এই সমগ্র উপমহাদেশকে এক রবীন্দ্রনাথই ধারণ করেছেন পরম আদরে, পরম যত্নে। ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ আমাদের পৃথিবী ছেড়ে চলে যান কিন্তু আমরা যখনই বিপদে পড়েছি, পথ খুঁজেছি, তখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে এসেছেন আমাদের দিশা দিতে। আমরা কিছুটা তাঁকে বুঝতে পেরেছি, কিছুটা পারিনি, কিছুটা বুঝেও মানিনি কিংবা মানতে পারিনি। যদি মানতে পারতাম তবে বিশ্বকে আমরাই নেতৃত্ব দিতে পারতাম ধনে মানে জ্ঞানে বিজ্ঞানে দর্শনে। ১৯৪৭ সালে আমরা যখন ভাগ হচ্ছি তখনো রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে এসেছিলেন তাঁর ১৯১১ সালের বলে যাওয়া সেই স্তোত্রগুলো নিয়ে, ‘পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ/ বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা উচ্ছলজলধিতরঙ্গ। অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী/ হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী। পূর্ব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে, প্রেমহার হয় গাঁথা/ জনগণ-ঐক্য-বিধায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!’-এই মন্ত্র আমাদের সামনেই ছিলো। আমরা পড়েছি, তবে মানিনি। আমরা তখন বড়ু চণ্ডীদাসের মানুষ না হয়ে, হয়ে যাচ্ছিলাম ধর্মী আর রবীন্দ্রনাথের ভারতীয় না হয়ে হয়ে যাচ্ছিলাম অচেনা অজানা জাতির কৃতদাস। সেই অপরাধে গত সাতদশক ধরে আমরা দিকভ্রান্ত আর ভ্রাতৃঘাতী উৎভ্রান্ত। সাতচল্লিশে মানব ইতিহাসের সব অর্জনকে উপেক্ষা করে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে জন্ম হলো ভারত আর পাকিস্তান। ভাগ হলো প্রায় পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতা। ভাগের উন্মাদনায় প্রাণ হারালো দুই তিন কিংবা পাঁচ লাখের অধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হলো প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ, ঘটলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দেশত্যাগের ঘটনা। বাটোয়ারা হলো ৪০ কোটি মানুষ। ভাগ হলো মাটি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি, এমনকি কয়েকমাস আগে ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা ৬০টি হাঁসও। পাকিস্তান, প্রায় বারশ মাইল দূরত্বের দুটি ভূখন্ড নিয়ে গঠিত একটি বিরল কিম্ভুতকিমাকার রাষ্ট্র, যার মাঝে আর একটি বিশাল দেশ ভারত। পূর্ব ও পশ্চিম দুই পাকিস্তানের মাঝে শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, ছিলো ভাষার দূরত্ব, সংস্কৃতির দূরত্ব। ছিলো মূল্যবোধে, বিশ্বাসে আর চিন্তায় দূরত্ব। শুধু মিলের মাঝে মিল হলো ধর্ম। পাকিস্তান তখন ধর্মোন্মাদ। তাদের আইনসভা তখন যেন ধর্মসভা। কিন্তু এভাবেতো চলতে পরেনা। এই ভুল ভাংতে দেরিও হলোনা। মাত্র চব্বিশ বছরে আমরা আমাদের চেতনা ফিরে পেলাম। সেই মসিবতের সময়, সেই পূণর্জন্মের মুহূর্তেও আমরা আবারো আবিষ্কার করলাম; আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মাটির টান আর আমাদের রবীন্দ্রনাথই আমাদের দিশা দিচ্ছেন। বাস্তবিকই বাঙালীর আজো আপনজন রবীন্দ্রনাথ। ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞগণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশলবিদগণ বহু হিসেব দিতে পারেন কিন্তু মাটির গন্ধ শুঁকে আমরা আজো বলে দিতে পারি, আজো বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথসম্পদগুলোর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ৫৪টি অভিন্ন নদী নয়, একই আবহাওয়া- জলবায়ু নয়, এমনকি ৪,১৫৬ কিলোমিটারের সীমান্তরেখাও নয়। এখনো আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যৌথমূলধন হলো রবীন্দ্রনাথ। শান্তি নিকেতনে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর `বাংলাদেশ ভবন` উদ্বোধনে এটি আবারো প্রমাণিত হলো। বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতার পালে প্রচুর হাওয়া। এই কাজে এখানে উইন্ডমিলেরও দরকার হয়না। কিন্তু সত্য হলো, জন্মের পর থেকে ভারত তার স্থল ও জল সীমান্ত মিলে যে ১০টি দেশের সাথে সীমান্তিক মনস্তত্ত্বে লড়ে যাচ্ছেন তার ভিতরে একমাত্র বাংলাদেশের জন্যেই তারা এ যাবত সবচেয়ে বেশি উৎসর্গ করে গেছেন। এই সত্য আমরা আজো বুঝতে পারিনি। গত সাতচল্লিশ বছরে আমরা জাতিকে বহু ভয় দেখিয়েছি ভারত বাংলাদেশ দখল করতে চায় বলে। কিন্তু সত্য হলো আমরা সাতচল্লিশ বছরে বহু দুর্বল সময় অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু ভারত আমাদের সীমান্তের এক বর্গইঞ্চি জায়গাও আজো দখলে নেয়নি। আমাদের স্বীকার করতে হবে, ভারতের রক্তে, অর্থে আর শক্তিতে মুক্তিযুদ্ধে লড়ার অসীমসাহস পেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আমরা আমাদের শত্রুর বন্ধু চীন থেকে অবিরাম অস্ত্র কিনে গেছি , শত্রুর সাথে চুক্তি করে গেছি। আমাদের জন্মের বিরোধিতাকারীদের থেকে আমরা সাবমেরিন কিনে গেছি, পণ্য কিনে গেছি অকাতরে চলতি হিসাবের ভারসাম্যের হিসাব ছাড়া কিন্তু ভারত মাটি টানে সেই শুরু থেকে আমাদের প্রতি আজো প্রতিশ্রুতিটা ধরে রেখেছেন। পঁচাত্তরের মহাবিপর্যয়ের পর তাঁরা অবাক হয়েছেন, বিস্মিত হয়েছেন, হয়তো আবেগের সম্পর্কটাকে বাস্তাবতায় আর বিবেকের কাঠগড়ায় নিয়ে গেছেন কিন্তু সম্পর্কটাকে একেবারে চুকিয়ে ফেলেননি। বর্তমান বিশ্বে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি শরণার্থীকে বিশ্বের সবরাষ্ট্র মিলেও নিতে পারতেছেনা। কিন্তু একাত্তরে সেই অভাবের যুগেও ভারত একাই এক কোটি শরণার্থীকে নিয়েছিলো। এশিয়ার লৌহমানবী ইন্দিরা গান্ধীর মতো মহামানবীর জন্ম না হলে সেদিন এই বিপন্ন মানবস্রোত কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো একমাত্র আল্লাহই জানেন! তারপর উৎপীড়িত জাতির মুক্তির জন্যে তাঁরা লড়েছেন অকাতরে, বিনে হিসেবে রক্ত দিয়ে, সম্পদ দিয়ে আর জীবন দিয়ে। মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, ভারতীয় বাহিনী আমাদের মুক্তিযুদ্ধে হয়ে গিয়েছিলো একাকার, ভাই-ভাই। বিনিময়ে ভারত কিন্তু কিছু দাবি করেনি। যুদ্ধ শেষে ফিরে গিয়েছে নিজ ভূবনে। পরিহাস হলো, আমাদের দেশের কিছু ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের আজকের যুগের প্রাণভোমরাই হলো ভারত বিরোধিতার পুঁজি। ভারত দল হিসেবে আওয়ামীলীগকে বিশ্বাসে পেয়েও অন্যদলগুলোর শাসনের সময়েও রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের তেমন ব্যত্যয় করেননি। পঁচাত্তরের পনের আগস্টের বাঙালীর মহাবিপর্যয়ের পর প্রথম শোক সভাটি হয় ভারতে। দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভারতের সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে শোকসভা করেছিলেন। তিনিই বলেছিলেন, শেখ মুজিব সোনার বাংলা গড়ে তোলার এবং উপমহাদেশে শক্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন, শেখ সাহেব গোটা বিশ্বেই মহান জাতীয় নেতা। তিনিই বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন সেই কঠিন সময়ে যখন তাঁদের পৃথিবী হয়ে গিয়েছিলো এতটুকু। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর পরও ভারত বাংলাদেশকে ছেড়ে দেয়নি। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান দিল্লির আমন্ত্রণে ভারতে গেলে তাঁকে রাষ্ট্রপতিভবনে নৈশভোজে অ্যাপ্যায়িত করেছিলো ভারত। গত সাতচল্লিশ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু অঘটন ঘটে গেছে, বহুবার বিশ্বাস টলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো। তবুও এখনো ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রটোকল ভেংগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানায়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে আতিথ্য দেওয়া হয়। এশিয়ার আর কোন দেশের নেতা এই মর্যাদা ভারতের নিকট থেকে পায়না। এই সময়েইও আমাদের দুই দেশের অনেক প্রাপ্তি আছে। আমরা ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি-বণ্টন চুক্তি, ২০১৫ সালের স্থলসীমানা চুক্তি, চিটমহল বিনিময়, আমাদের দু’দেশের মাঝের বর্ধিষ্ণু জন-যোগাযোগ, স্থল রেল জল পথে যোগাযোগ, আমাদের ইতিহাস, ভূগোল, ভাবাবেগ আর স্বার্থকে আরো কাছে নিয়ে আসবে। ভারত আসলে একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ চায়, যা স্থিতিশীল ভারতের জন্যে দরকারী। ভারত চায় তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নবাদীরা বাংলাদেশে প্রশ্রয় না পাক, ভারত চায় ঐ দুর্গম অঞ্চলের উন্নয়নে বাংলাদেশও অংশগহন করুক, সেখানে মানবিক পণ্যগুলো পৌঁছাতে বাংলাদেশ তার ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দিক, বাংলাদেশ ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে নিয়ন্ত্রণ করুক। এইতো! গত নয় বছরে ভারত বাংলাদেশের কাছে সেগুলো পেয়েছে বা পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ চায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়তা, বিদ্যুত ও জ্বালানি সহায়তা, জল ও জলবায়ুর শেয়ারিং। বাংলাদেশ সেগুলোর কিছুটা পেয়েছে, কিছুটা পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে। আমাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, জলবায়ু এক। আমরা গঙ্গায়-পদ্মায়-মেঘনায়-যমুনায়-তিস্তায় একাকার। আমরা বিশ্বাস করি এখনো বিশ্বের মূল স্থাবর সম্পত্তি জ্ঞান বিজ্ঞান ও দর্শন। সে হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় যৌথসম্পদ হলো আমাদের চণ্ডীদাস, লালন, জীবনানন্দ, সুকান্ত, নজরুল, অবন ঠাকুর আর সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ। এইই আমাদের যৌথ ভালোবাসা। এই ভালোবাসা দিয়ে সবই জয় করা সম্ভব। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট এসি    

ঈদুল ফিতর রোজাদারদের জন্য আল্লাহ তায়ালার সেরা উপহার

সবাইকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পরে অামাদের মাঝে এলো ঈদুল ফিতর। মহা খুশীর, মহা অানন্দের  দিন। ঈদুল ফিতর সবার জন্য মহা অানন্দের। সে বাচ্চা হোক কিংবা কিশোর কিশোরী কিংবা যুবক, কিংবা বয়স্ক মানুষ- সে ধনী কিংবা গরীব, সমগ্র মানবজাতির জন্য  ঈদ মহা আনন্দের দিন। শুধু মুসলমান নয় বরং অমুসলিমদের জন্যও ঈদ মহা আনন্দের দিন।অমুসলিমদের কথা এজন্য বলছি, মুসলামানদের আনন্দ দেখে অমুসলিমরা অনেক কিছু শিখতে পারে। তারাও এটি দেখে আনন্দিত হয়। অমুসলিমরাও এটা দেখে অনেক কিছু শিখতে পারে। বলে, এত সুন্দর একটা জীবন বিধান। আমাদের ঈদের আনন্দ নির্মল আনন্দ। এখানে কোন হৈ চৈ, মারামারি নেই। এখানে কোনো চিৎকার চেঁচামেচি নেই। অমুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানরাও আমাদের ঈদে শুভেচ্ছা জানায়। এতে প্রমাণিত হয় মুসলমানদের ঈদে অমুসলিমরাও অনুপ্রাণিত হয়।ঈদুল ফিতর সম্পর্কে একটা হাদীস আছে। আল্লাহর রাসূল ( সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটো খুশি। একটা হলো ইফতারের সময়। আরেকটা হলো যেদিন আল্লাহর কাছ থেকে রোজার পুরষ্কার নিবে, সেদিন। ইফতারের যে আনন্দ আমরা তা প্রতিদিন উপলব্ধি করি। তার চূড়ান্ত উপলব্ধি করি ঈদুল ফিতরের দিন। ঈদুল ফিতরের দিন আমাদের যে উপলব্ধি হয় তা হলো, পুরো একমাস আমরা সিয়াম সাধনা করেছি।  দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত থেকেছি। যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থেকেছি। কিন্তু ঈদের দিন থেকে আমাদের উপর সেই বিধি নিষেধ তুলে দেওয়া হয়।একটা বিষয় ভেবে দেখুন, নববিবাহিত বর-কণে বিয়ের পরপরই যদি রমজান মাস শুরু হয়ে যায় তাহলে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যৌন মিলন থেকে বিরত থাকে। ঈদের দিন যখন সেই বিধি নিষেধ প্রত্যাহার হয় তখন বান্দা স্বাভাবিকভাবেই মহা আনন্দিত হয়। এটা হলো ভোগের দিক থেকে আনন্দ। আরেকটি আনন্দ আছে। সেটি হলো আধ্যাত্মিক দিক থেকে আনন্দ। সেটাকে আমরা বলি রূহানি আনন্দ। আল্লাহ আমাদেরকে মাসব্যাপী রোজা রাখার সুযোগ দিয়েছেন। অনেক মানুষ এটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে না। রোজা রাখা শুরু করে অসুস্থ হয়ে যায় এমন অনেকে আছেন। আমি- আমরা তা করতে পেরেছি তা বিশাল আনন্দের। ঈদুল ফিতরে আমরা সর্বস্তরের মানুষ মহাআনন্দ উপভোগ করি। ঈদে সব পরিবারের শিশুরা নতুন পোশাক কিনে। এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে পরিবারের শিশুদের নতুন কাপড় কিনে দেওয়া হয় না। সে যত গরীবই হোক, বাচ্চার জন্য কিছু কিনবেই। অর্থাৎ শিশুরা ঈদুল ফিতরের আনন্দ উপভোগ করছে।  আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ ঈদের আনন্দে জসগণকে সামিল করে নেন। প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবন গণভবনে সর্বস্তরের মানুষ ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করে। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানরা তো একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেনই অমুসলিমরা রাষ্ট্র প্রধানরাও এই কাতারে অংশ নেন।অর্থাৎ ঈদ সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর উপহার। মানুষ যখন খুশি হয় তখন আল্লাহ তায়ালা নিজেও খুশি হন। মানুষকে আনন্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে যার যতো ভূমিকা আল্লাহ তার প্রতি তত বেশি রহমত নাযিল করেন। আল্লাহর ফেরেশতারা এই আনন্দ আয়োজনে ব্যস্ত থাকেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) যাকে সৃষ্টি না করলে বিশ্বব্রক্ষ্মান্ড সৃষ্টি করতেন না তিনিও তার উম্মতদের আনন্দে আনন্দিত হন।তবে মনে রাখা ভালো, ঈদের নামে কোন অনৈতিক, অনৈসলামিক কার্যকলাপ পছন্দ করেন না। আল্লাহর সন্তুষ্টির অর্জনের পরিবর্তে তখন অসন্তুষ্টি দেখা দিবে।[লেখক পরিচিতি: খতিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ]অনুলিখন: আলী আদনান।

পথশিশুদের ঈদ আনন্দে ভাগীদার হোন আপনিও

রাজধানীর বাড্ডা থেকে কারওয়ান বাজারে অফিস আসতে ফুটপাতে অনেক পথশিশুকে দেখা যায়। রিতু, ঝরণা, সোনালি এ রকম অনেক নামের শিশু। এরা সবাই ফুটপাতে থাকে। এদের কারো বাবা নেই, কারো মা নেই। এরা রাস্তার পাশেই বেড়ে ওঠেন। রাস্তার পাশেই হাত পেতে যা পান তা দিয়ে পার করে দেন দিনের পর দিন আবার মাসের পর মাস। এভাবেই কেটে যায় তাদের জীবন। তবে, সবাই হাত পেতে চলে না, অনেকেই ফুল বা চকলেট বিক্রি করেও দিন পার করে দেন। এভাবেই চলার চেষ্টা চালান অনেক ছিন্নমূল শিশু। আর একিদিন পরেই মনে হয় ঈদ। রাজধানীর বড় বড় শপিং মলগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। এতে বিক্রেতারাও বেশ খুশি ভালো বিক্রি করতে পেরে। এই ঈদকে ঘিরে বড় ধরণের লেনদেন হয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- ক্রেতাদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা হলো কে কতো দামে পণ্য কিনলো। সবচেয়ে ভালো ব্যান্ডের পণ্য কিনলো। বেশি দামে পণ্য কিনতে পারলে সে বেশি খুশি। সে সবার মধ্যে বড়াই করতে পারে সে অনেক বেশি দামে কিনেতে পারছে। এর চেয়ে বড় কথা হলো কে কতো বেশি দামের পণ্য উপহার দিতে পারলো। এ নিয়ে বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে কথার কাটাকাটি হয়। বিশেষ করে নারীরা তাদের বান্ধবী বা ভাবিদের সামনে বড়াই করেন, তার স্বামী বেশি দামের পণ্য উপহার দিয়েছেন।  ধনীর দুলাল-দুলালীদের কাছে ঈদ মানে বেশি দামের নতুন পোশাক বা নতুন কোনো পণ্য। এছাড়াও ছোট শিশুরা ঈদের দিন নতুন পোশাক পড়ে ঘুরাঘুরি করে থাকেন মনের আনন্দে। মা-বাবা বা বড়রা ছোটদের ঈদ উপহার হিসেবে নতুন পোশাক দিয়ে থাকেন। কিন্তু একবার ভাবুন তো যাদের মা-বাবা নেই। পথের ধারেই ধুলো-বালিতে পড়ে মানুষ হচ্ছে তাদের ঈদ কেমন কাটে। তারা কি নতুন কোনো পোশাক পড়ে। তাদের নতুন পোশাকের জন্য বায়না ধরার কেউ নেই। তারা হয়তো পথ পানে চেয়ে থাকেন যদি কেউ একটা পোশাক দেন। অনেক সময় কোনো হৃদয়বান মানুষ  এগিয়ে আসেন তাদের জন্য। তাদের হাসি ফুটানোর জন্য। ছোট এই পথশিশুদের ঈদ নিয়ে কারো কি মাথা ব্যথা আছে। অনেকেই তাদের কথা হয়তো ভাবেন। জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশে কয়েক লাখ পথশিশু রয়েছে যাদের ৮০ ভাগেরই জন্ম ফুটপাথে। অবহেলা-অযতনে বেড়ে ওঠা এই শিশুদের ‘টোকাই’, ‘পথকলি’, ‘ছিন্নমূল’ বা ‘পথশিশু’ বলা হয়ে থাকে। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য মতে, বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ পথশিশুই রয়েছে রাজধানীতে। তাদের মধ্যে শতকরা ৫৩ ভাগ ছেলে আর ৪৭ ভাগ মেয়ে। নোংরা পরিবেশ আর অপুষ্টিতে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর ৮৫ ভাগই রোগাক্রান্ত। পথশিশুদের জীবনযাপন অত্যন্ত দুর্বিষহ। অধিকাংশ সময়ই রাস্তা, পার্ক, ট্রেন-বাস স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, সরকারি ভবনের নিচে ঘুমায় এবং প্রতিনিয়তই নাইটগার্ড কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এই পথশিশুদের একটি বড় অংশ শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পৌঁছার আগেই জড়িয়ে পড়ে চুরি, ছিনতাই, মাদক বিক্রি, পিকেটিংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বলে প্রায় এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। এর জন্য পুরাপুরি এদের দোষ দেওয়া যায় না বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। বিআইডিএস ও ইউনিসেফের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। কেবল ঢাকা শহরে রয়েছে সাত লাখ পথশিশু। তবে এ সংখ্যা বাড়ছে। আর ২০২৪ সাল নাগাদ সংখ্যাটা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জন। পথশিশুদের ৮৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট এবং ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে থাকে। ঢাকায় এদের কমপক্ষে ২২৯টি মাদকের স্পট রয়েছে। অন্য এক জরিপে মাদকাসক্ত শিশুদের মাদক গ্রহণ ও বিক্রয়ে ৪৪ শতাংশ, পিকেটিংয়ে ৩৫ শতাংশ, ছিনতাই, নেশাদ্রব্য বিক্রয়কারী এবং অন্যান্য অপরাধে জড়িত ২১ শতাংশ পথশিশুর যুক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এই পথশিশুদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে পারলে রাষ্ট্র, সমাজ সবারই উপকার হবে বলে মনে হয়। এ নিয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নেই। কিন্তু এ পথশিশুদের নিয়ে কথা ভাবা হচ্ছে। ভাবলেও সেই ভাবনার অগ্রগতি কেমন। এই পথশিশুদের কল্যাণে আরও ভালো উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না তাও ভাবা দরকার। মনে হয়, সময় এসেছে এই পথশিশুদের নিয়ে আরও ভাবা। যাতে তারা সমাজের মুল ধারার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।  যারা সামজকে নিয়ে চিন্তা করেন, সমাজের উন্নয়নে ভাবেন তাদের নতুন করে ভাবতে হবে এই শিশুদের নিয়ে। যাতে তারা মৌলিক অধিকারগুলো পায়। তারা যাতে অধিকার বঞ্চিত না হয়। সব কথার শেষ কথা হলো- ঈদের আনন্দ সবার জন্য শুধু কাগজ কলমেই নয়। এটা বাস্তবে রুপ দেওয়ার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার। এই নাম না জানা পথশিশিুরা একটু সহানুভূতি পেতে পারেন। তাদের ঈদের আগে বেশি দামের না হলেও একটু কম দামের নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে মন্দ হয় না। আপনার একটু সহানুভূতিতে ফুটতে পারে ওই শিশুদের মুখে হাসি। তাদের মুখের হাসি ফুটানোর জন্য একটু সহানুভূতির হাত প্রসারিত করলে আপনিও পেতে পারেন চরম তৃপ্তি। এদের শত কষ্টের মধ্যেও একটি নতুন পোশাক এনে দিতে পারে সুখানুভূতি। এ জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে নেওয়া যেতে পারে উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টরা এটা নিয়ে ভাববেন আশা রাখি। দেশে কোটিপতি বা ধনী শ্রেণির মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এই ধনী শ্রেণির মানুষগুলো এগিয়ে আসতে পারেন তাদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য। আসুন না সবাই মিলে এই পথশিশুদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য এগিয়ে আসি, এমনটাই কাম্য সবার প্রতি। লেখক: সাংবাদিক।      

চে গুয়েভারা : শুভ জন্মদিন

বাবা-মা’র দেয়া নাম আর্নেস্তো গুয়েভারা। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে ১৯২৮ সালের ১৪ জুন তার জন্ম। বাবা গুয়েভারা লিঞ্চ ও মা সেলিয়ার পাঁচ সন্তানের মধ্যে আর্নেস্তো গুয়েভারা সবার বড়। বাবা-মা তাকে ‘তেতে’ বলে ডাকতেন। তিনি যখন গুয়েতেমালায় যান তখন তাঁর বন্ধু নিকো তাকে ‘চে’ নামে সম্বোধন করে ( চে’র অর্থ হলো ‘হে বব্ধু’) । তার পর থেকে জগৎ বিখ্যাত এ মানুষটিকে কেউ আর ‘আর্নেস্তো’ কিংবা ‘তেতে’ বলে ডাকে না, ডাকে চে গুয়েভারা নামে। চে’র জীবন-চলায় তার মা সেলিয়ার অনেক প্রভাব আছে বলে অনেকেই মনে করেন । কারণ তার মা ছিলেন একজন সংস্কার-বিরোধী, নারীবাদী প্রগতিশীল মহিলা। বাবা লিঞ্চ শান্তশিষ্ট স্বভাবের লোক ছিলেন। চে ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত যে জিনিষটি সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়েছেন তাহলো ‘হাঁপানি’। ইনহেলার সঙ্গে রাখতে হতো। বাবা-মা হাওয়া বদলের চেষ্টা করেও কোন ফল হয়নি। শেষতক ডাক্তার হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু ‘হাপানি’ ছাড়াতে পারেননি।অসুস্থতার কারণে স্কুল শুরুটা কিছুটা বিলম্বিত হয়। স্কুলে ভর্তি হন নয় বছর বয়সে। লেখাপড়ার চেয়ে দূরন্তপনাই ছিলো বেশী। বন্ধুরা ডাকতো ‘ফুসের’ বলে( ‘ফুসের’ মানে হলো ‘ক্ষীপ্ত ঝড়ের ছোবল’)। ফুটবল, দাবা এমনকি রাগবি খেলায় ছিলেন পারদর্শী। কবিতার প্রতি ঝোঁক ছিল। বাড়িতে প্রচুর বই থাকার দরুন মার্ক্স, লেনিন, এঙ্গেলস শৈশবেই পড়া শেষ। টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, গোর্কির লেখা পড়ে নিপিড়িত মানুষের বেদনা অনুভব করতেন। চে’র মূল শারীরিক অবয়বটি ফুঠে ওঠে আঠারো বছর বয়স থেকে। লম্বাদেহ, চওড়া কাঁধ, মাথায় লম্বা চুল- একটা পরিণত মানুষ। তখন সে হাই স্কুলের ওপরের ক্লসের ছাত্র। ছোটবেলায় চে’র সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। রাজিৈতক বক্তৃতা শুনতেন কিন্তু জড়িয়ে পড়া যাকে বলে তা হয়নি। বরং তৎকালীন আর্জেন্টাইন কমিউনিস্ট পার্টির লোকজনদের আচার -আচরণ তার ভালোও লাগতো না।তবে লাতিন আমেরিকাকে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিরে- কুটে খাচ্ছিলো সেটা তিনি পরিষ্কার বুঝেছিলেন। আর লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য ডাক্তারের সহযোগী হিসেবে জাহাজে কাজ করা, দোকানে কাজ করা, ফেরি করার মতো অনেক কাজই করেছেনৃ। ঘুরে বেড়ানোটা ছিলো মূল কাজ। বাইশ বছর বয়সে বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন সমগ্র লাতিন আমেরিকা ঘুরে দেখবেন বলে। সঙ্গে ইঞ্জিন লাগানো একটি বাইসাইকেল আর লাতিন প্রকৃতি ও জীবনকে জানার আকুল অগ্রহ। বিভিন্ন এলাকার নানা রকম মানুষের নানা রকম জীবন-যাপন- চিন্তা -চেতনা তাকে নতুন কিছু ভাবতে শেখালো, ধরা পড়ল চলমান সমাজের নানা সীমাবদ্ধতা। ডায়েরিতে লিখলেন,“আমার মধ্যে নতুন এক ধারণা জন্মাচ্ছে ও রুপ নিচ্ছে তা হলো এই সভ্যতাকে ঘৃণা করা। বিশাল হৈচৈ আর হট্টেগোলের মধ্যে লোকোমোটিভ ইঞ্জিনের মতো শহরে যান্ত্রিক মানুষদের উদ্ভট জলছবি এক শান্তি বিঘ্নকারী জঘন্য চরিত্র”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাল ফৌজের কাছে জার্মানির পরাজয়, চীনে মাও সে তুং –এর গেরিলা নেতৃত্ব ও বিজয় তাকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল। নিজেকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী মনে করতেন। ১৯৫১ সালে তার ভ্রমণ আপাত শেষ করে আবার ডাক্তারি পড়ায় মন দেন। ১৯৫৩ সালে পড়াশুনা শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না লাতিন আমেরিকা ঘুরে-বেড়ানোর কাজ। মা সেলিয়ার আকুতি –মিনতি তাকে ক্ষান্ত করতে পারেনি। এবার যাত্রা গুয়েতেমালা। সঙ্গী মেডিকেল কলেজের বন্ধু কালিকো। চে’র ভ্রমণটাকে অমরা নিছক ঘুরে বেড়ানো ধরলে ভ’ল হবে। আসলে সে সময়টাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার সস্পদ- সম্পত্তি লুন্ঠনের চূড়ান্ত মাত্রায় ছিল। সরকারগুলো ছিল পুতুল সরকার । জনগণ ছিল নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিত। গুয়েতেমালা, বলিভিয়া, চিলি, কিউবা, ভেনিজুয়েলা কোন দেশই আমেরিকার কব্জার বাইরে ছিল না। চে এ করুণদশাগুলো নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন। তবে এবার প্রয়োজনে রাজনীতিতে জড়িয়ে করতে হবে এমন বাসনাও ছিল। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসের ২৬ তারিখ ফিদেল ক্যাস্ত্র’র নেতৃত্বে একদল তরুন বিপ্লবী কিউবার তৎকালীন স্বৈরশাসক বাতিস্তার বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করে সান্তিয়াগো শহরের কাছে মানকাদা ব্যরাকে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ফিদেল ক্যাস্ত্র ও তার ভাই রাউল ক্যাস্ত্র’র জেল হয়ে যায় এবং দেশ ছাড়েন অনেক বিপ্লবী। তাদেরই একজন নিকো। নিকোর সঙ্গে এবং কিউবান অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে অনেক ভাব হয়। নিকোই আর্নেস্তোকে ‘চে’ নামে সম্বোধন করেন। সেই থেকে আর্নেস্তো গুয়েভারা আজতক পৃথিবীর মানুষের মনে জায়গা করে নিলেন চে গুয়েভারা হিসেবে। হিলদা নামের একটি মেয়ে মেক্সিকোতে চে’কে কিউবান বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। হিলদার কথা একটু বলতে হয়। চে তার ভ্রমণকালে লািতন আমেরিকার পেরু, এল সালভেদর, কোস্টারিকা, পানামা, গুয়েতেমালা, বলিভিয়া ঘুরে বেরিয়েছেন। হিলদা পেরুর মেয়ে। সেখানকার মার্ক্সবাদী রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন। রাজধানী চিলিতে চে’র সঙ্গে দেখা এবং সেসময় থেকেই বন্ধুত্ব। অভিজাত পরিবারের ডাক্তার-বুদ্ধিমান ছেলে সব কিছু ছেড়ে গরীবদের কথা ভাবছে-এ ছিলো হিলদার চে’কে ভালো লাগার কারণ। হিলদাকে পরে চে বিয়ে করেন। মেক্সিকোতেই ১৯৫৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী হিলদা- চে’র প্রথম কন্যা হিলদিতার জন্ম হয়। হিলদা আর হিলদিতাকে নিয়ে তথাকথিত সুখী সংসার দিয়েই গল্পের শেষ হতে পারতো কিন্তু তাতে করে বিশ্ববিপ্লবী চে’র জন্ম হতো না। তা কী করে হয়! ক্যস্ত্রো’র সাথে সাক্ষাৎ-এর পর থেকেই চে নিজেকে ক্যাস্ত্রোর দলের সাথে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ফেললেন। প্রশিক্ষণ শিবিরে চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন। পুরোপুরি সক্রিয় বিপ্লবী যেমনটি হয়। কিন্তু সমস্যাটা হলো যে, মেক্সিকোতে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীরা কিছুটা নিরাপদ থাকলেও ‘কম্যুনিস্ট’দের বেলায় তা ছিলো না। চে’র গতিবিধি-আচার- আচরণে সামাজিক বিপ্লবের আভাস পেয়েছিলো মেক্সিকান পুলিশ। চে ছিলেন মাও সে তুং-এর অনুরাগী। ব্যস ধরে জেলে পুরে দেওয়া হলো। ক্যস্ত্রোর সামনে কিউবামূখী অভিযান, এমূহুর্তে চে জেলে, তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শেষতক পুলিশের সাথে একটা রফা করে চে’কে জেল থেকে বের করে আনা হলো । কিন্তু শর্ত ছিলো চে’কে মেক্সিকো ছাড়তে হবে। চে ভাবলেন অন্য কোথাও গেলে তো হবে না তাঁকে যেতে হবে কিউবার যুদ্ধে। যুদ্ধযাত্রায় সবমিলিয়ে বিরাশিজন, চে একাই আর্জেন্টাইন বাকিরা সব কিউবান। ভরসা হালকা নৌযান ‘গ্রানামা’। কিউবার সিয়েরে মায়েস্তায় যাবার সিদ্ধান্ত হলো । এখানকার জনগণ ক্যাস্ত্রোর বিপ্লবকে সমর্থন করে এবং ২৬ জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করে। দিনক্ষণ ঠিক হলো ১৯৫৬ সালের ১৫ নভেম্বর। সেমতে রওনাও হওয়া গেল কিন্তু প্রকৃতি এতটাই বিরুপ ছিলো যে পাঁচ দিনের পথ পাড়ি দিতে হলো সাত দিনে। কিন্তু সমস্যাতো বিলম্ব না , সমস্যা হলো বাতিস্তা সরকারের কাছে এ অভিযানের খবর পৌঁছে যায়। তাই কিউবান তীরে পৌঁছানের সাথে সাথে বিমান হামলা শুরু হয়ে যায় এবং এত করে বিরাশি জনের মধ্যে ষাট জনকেই বাতিস্তার সরকার মেরে ফেলে। দিকবিদিক ছুটো ছুটি করতে গিয়ে চে’র ঘাড়েও গুলি লাগে । জখম নিয়ে চে যখন এক কৃষকের বাড়িতে অন্যান্য যোদ্ধাদের সাথে মিলিত হন তখন তারা ক্যস্ত্রোসহ মাত্র বারজন।শসস্ত্র সংগ্রামের সফলতার একটি বড় দিক হলো জনসম্পৃক্ততা। এটা চে এবং ক্যস্ত্রোর অজানা ছিলো না। হয়তো এজন্যই সিয়েরা মায়েস্তা । অঞ্চলটি হয়ে ওঠে ছোট খাটো একটা ক্যন্টনমেন্ট। কয়েকটি বাহিনীর মধ্যে চতুর্থটর নাম ছিলো ,‘শত্রু বিভ্রান্ত করার বাহিনী’। এই বাহিনীর কমান্ডেন্ড নিযুক্ত করা হয় চে গুয়েভারাকে কী হয় না এখানে- জুতা, চুরুট, পাউরুটি, কার্তুজের বেল্ট আরো কত কী! প্রতিষ্ঠিত হয় জেলখানা, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করণ কারখানা, ট্রেনিং সেন্টার, স্কুল, রেডিও সেন্টার। এসবই পরিচালিত হয় স্থানীয় জনগণ এবং ২৬ জুলাই আন্দোলনের কর্মী দ্বারা। যুদ্ধ পরিচালনায় আর্থিক সহায়তা দিত স্থানীয় জোতদাররা। আক্রমনে জয় পরাজয়ের ভিতর দিয়ে ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে স্বাধীন অঞ্চল যা চে আর ক্যস্ত্রোর নিয়ন্ত্রনে থাকে। ১৯৫৮ সারের ১৬ ডিসেম্বর চে তাঁর বাহিনী নিয়ে ধ্বংস করে দেয় শান্তাক্লারার রেল ও সড়ক সেতু। বাতিস্তার বাহিনীও থেমে থাকেনি। অবিরাম বিমান আক্রমণ চালিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও চে’ বাহিনীই জয়লাভ করেছে, আত্মসমর্পণ করেছে বাতিস্তার বাহিনী। ‘জয় আমাদের সুনিশ্চিত’- চে’র এ ঘোষনা শোনার পর কিউবার জনগণকে অপেক্ষা করতে হয়েছে মাত্র চৌদ্দ দিন। স্বৈরাচারী বাতিস্তার পতন ঘটে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি। লাতিন আমেরিকায় মার্কিনীরা প্রথম বারের মতো মাথা অবনত করে আর বাতিস্তা তার পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান ডোমিনিকান রিপাবলিকে। কিউবা এখন মুক্ত। চে নিযুক্ত হন শিল্পমন্ত্রী এবং স্টেট ব্যাংকের প্রধান। কিন্তুু চে’র কথা হলো শুধু কিউবা নিয়ে ভাবলেই হবে না, ভাবতে হবে সমগ্র লাতিন আমেরিকা তথা বিশ্বের নির্যাতিত মানুষদের কথা। রাশিয়ার গোয়েন্দারা চে’ কে “কৌশলগত ভয়ংকর” হিসেবে বিবেচনা করতো। চে’র এই কঠোর নীতির কারণে তাঁর মা সেলিয়াকেও তিন মাস জেল খাটতে হয়েছিলো। তাই কিউবান সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কীভাবে লাতিন আমেরিকা থেকে মার্কিন প্রশাসনের দালালদের উৎখাত করতে হবে সে বিষয়টি সর্বদাই মনে জাগ্রত ছিলো। কিন্তু শুধু মনে জাগ্রত থাকলে তো চলবে না, বাস্তব রূপ দিতে হবে। তাহলে উপায় তো একটাই- চে’কে কিউবা ছাড়তে হবে। ছেড়েও দিলেন কিউবা, পড়ে রইল মন্ত্রিত্ব। তাকে লাতিন আমেরিকা জয় করতে হবে, হবে সাধারণ মানুষের মুক্তির ব্যবস্থা।১৯৬৫’র এপ্রিল থেকে তাকে আর হাভানায় দেখা যায়নি। কোথায় গেলেন তিনি? নির্দ্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেন না। তবে তানজানিয়া, কঙ্গো, জার্মানিতে তার কর্মকান্ডের অনেক নজিরের কথা শোনা যায়। নিশ্চিত হওয়া গেল যখন মার্কিন গোয়েন্দারা চে’কে ঘিরে ফেলল বলিভিয়ার একটি গ্রামে। সেখানেই তাকে কাপুরুষের মতো হত্যা করা হয়।বিশিষ্ট লেখক মনির জামান চে’র শেষ দিনটাকে লিখেছেন এভাবে-“ ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ সম্পূর্ণ মানুষটিকে গুলি করা হয় উনচল্লিশ বছর বয়সে। কিন্তু এ থেকে জন্ম নেয় এক কিংবদন্তী... আজ বিশ্বের ঘরে ঘরে বিপ্লবের উজ্জল নাম চে। আর্নেস্তো চে গুয়েভারা।”হে মহান, তোমার নব্বইতম জন্মদিনে নিপিড়িত মানুষের লাল সালাম। লেখক: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। এসএইচ/      

সাঁইত্রিশ বছর পর!

বহু বছর আগে কবি জসিম উদ্দিন তার বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতায় লিখে গেছেন, ‘এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে/ তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে..., অথচ আমি কী নির্লজ্জের মতো বলছি, দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর পর আমার প্রথম শিশুপুত্রের কবর প্রথমবারের মতো জিয়ারত করে এসেছি মাত্র আজ! বলুন তো, শুনতে কেমন লাগে! পুরনো এই ঘায়ে, নতুন করে ব্যথার আঁচড় আজই লাগেনি, লাগতে শুরু করেছে কয়েক মাস আগে থেকেই, যখন আমি বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরছিলাম! দিনটি ছিল এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি। সম্মেলন শেষে ব্যাংকক থেকে ন্যাশভিল ফেরার পথে শেষ ফ্লাইটে শিকাগো এসে বিমানে উঠে বসেছি মাত্র। স্থানীয় সময় রাত ন’টা কি সাড়ে ন’টা হবে। উড়োজাহাজ তখনও গেটে দাঁড়িয়ে, যাত্রীরা একে একে উঠে যার যার আসনে বসছেন। মেঘবিহীন রাতের আসমানে তর্জন-গর্জন ছাড়া মাঝে মাঝে যেমন অকারণে বিজলি চমকায়, তেমনি যথাযথ পরিবেশ-পটভূমি ছাড়া একেবারে সূত্রবিহীনভাবে হঠাৎ আমার প্রথম সন্তানের কথা মনে পড়ে গেল! শুধু কী মনে পড়ল, বুঝলাম ক্ষণিকের মাঝে আমার শরীরের সমস্ত রসায়ন বদলে গেছে! আরও বুঝলাম, অন্তরে আচমকা ঝড়ো হাওয়া বইছে, এলোপাতাড়ি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বাতাসে হৃদয়টি দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে! আর দু’চোখ দিয়ে অনবরত বয়ে চলেছে অশ্রুবারি! মনের অস্থিরতাও কাটছে না আবার চোখের পানিও বাঁধ মানছে না। এ রকম অভিজ্ঞতা আগে  কখনও হয়নি। একদিকে একমনে প্লেনের মাঝখানে আয়েল সিটে বসে কাঁদছি, আরেক দিকে নিজেকে নিজে ধিক্কার দিচ্ছি!  এ কেমন পাষাণ বাবা আমি! সারা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছি, অথচ ছোট্ট ছেলেটাকে ও’ক গাছের নিচে সেই যে একা ফেলে এলাম, আর কোনোদিন ও-পথে পা বাড়ালাম না! তার কবরে গিয়ে দু’ফুঁটো চোখের জল ফেললাম না! তার আত্মার উদ্দেশ্যে একটু দোয়াদুরুদ পড়লাম না! আল্লাহ কাছে মাগফেরাত চাইলাম না! কত স্বার্থপর আমি! পিতা হলেই হয় না, ‘পিতা’ নামের কলঙ্ক আমি! আমি অপরাধী! আমি আজ আসামির কাঠগড়ায়! ঊনিশ শ’ একাশি সালের ৭ আগস্ট বোস্টনের উপশহর ‘ব্রাইটন’-এর ‘সেন্ট এলিজাবেথ মেডিক্যাল সেন্টারে’ তার জন্ম হয়েছিল। বড় খায়েস করে নাম রেখেছিলাম, ‘উমর’, কিন্তু ছেলেটি আমার বাঁচল না দু’সপ্তাহও! মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার শক্তি সঞ্চয়ের আগেই ছোট্ট সোনা আমার কোনো ধরনের প্রতিবাদ প্রতিরোধ ছাড়াই ১৯ আগস্ট নীরবে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল! জন্মের স্বাদ পাওয়ার আগেই মৃত্যু তাকে টেনে নিয়ে গেল। কে জানে, তরুণ বয়সে তাকে এতো সহজে ভুলে গিয়েছিলাম বলেই সে হয়তো তার ন্যায্য পাওনা আজ কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নিচ্ছে! না হলে তিন যুগ পর তার স্মৃতি কেন আমাকে এত তীব্রভাবে নাড়া দিচ্ছে! এত নিগূড়ভাবে কাঁদাচ্ছে! তাকে হারানোর ব্যথা পাষাণ হয়ে বারবার কেন আজ আমার বুকে আঘাত হানছে! হৃৎপিণ্ডের রক্তপ্রবাহে যন্ত্রণার ঢেউ তুলছে আর আমার ধমনী-শিরা-উপশিরা ওই কষ্ট-সঙ্কেতগুলোকে পৌঁছে দিচ্ছে শরীরের তাবৎ কোষে কোষে।  কান্নায় এক ধরনের স্বস্তি পেলেও, কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলছে না। ভাবছি, দায়মুক্তির কি কোনো পথ আছে? পথ থাকুক বা না থাকুক, শিকাগোর প্লেনে বসেই তৎক্ষণাৎ ঠিক করলাম, অনেক হয়েছে, আর দেরি নয়, ঠাণ্ডার প্রকোপ কমলেই সপরিবারে বোস্টন যাব। বাড়িতে এসেই আমার ছেলে-আসাদকে বললাম, মে মাসে তোমার ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে যাব, তুমি তার সেমিটারির সাকিন ঠিকানা ও কবরের বিস্তারিত খোঁজখবর নাও এবং সবার টিকেট কর। ঠিক হলো, ওই মাসের ১২ তারিখ শনিবার সকালে রওয়ানা দিয়ে সবাই দুপুরের দিকে  মোটামুটি একই সময় গিয়ে বোস্টন পৌঁছব। সরাসরি এয়ারপোর্ট থেকে গোরস্থান, তারপর শহর দেখাদেখির কাজ যা পারি তাই করব এবং পরদিন বিকেলে যার যার গন্তব্যে ফিরে আসব। আসাদ, তার মা ও আমি ন্যাশভিলের যাত্রী, বাল্টিমোর থেকে আসবে আমার বড় মেয়ে - নাজলা, ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকে ছোট মেয়ে - নায়লা, সেও এসে যোগ দেবে একই জায়গায়। সবার টিকেট এবং বোস্টনে এক রাতের জন্য হোটেলে দুই রুম বুকিং দেওয়া হলো। এভাবে সফরসূচির সব ঠিক হয়ে গেলো। আসাদ দফায় দফায় ফোন করে ‘বোস্টন সিটি অফিস’ থেকে উমরের কবরস্থানের ঠিকানা, কবরের লট নং,  ইত্যাদি যতদূর সম্ভব যোগাড় করে নিল।  যাওয়ার দিন যখন ঘনিয়ে এলো তখন দেখা যায়, শনি ও রোববার বোস্টনের আবহাওয়া থাকবে রীতিমত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ! সারা দিন দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি হবে এবং ‘সেলসিয়াসে’ তাপমাত্রা উঠবে সর্বোচ্চ ৫০-এর কোঠায়। সবার মন খারাপ! আমিও ভাবনায় পড়ে গেলাম, কিভাবে এত অল্প সময়ের মাঝে নিরাপদে জরুরি কাজটি সেরে ঘরে ফিরব! তার ওপর ফ্লাইট বিভ্রাটের আশঙ্কা তো রয়েই গেল! মনে আরও প্রশ্ন দেখা দিল, বৃষ্টি-বাদলের মাঝে এত বড় সেমিটারি, ঠিকমতো বাচ্চাদের সেকশন খুঁজে পাব তো, সেই ও’ক গাছের নিচে আমার ছেলের কবরটি সনাক্ত করতে পারব তো, ইত্যাদি, ইত্যাদি। গিন্নি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, ‘এত বছর যখন দেরি করেছ, তো আরও দু’মাস পরে গেল কী হতো, জুলাই-আগস্টে বৃষ্টি হলেও ঠাণ্ডা তো আর থাকতো না?’ আরও দু’মাস যে আমি, কিংবা তুমি, কিংবা আমরা দু’জন বেঁচে থাকব, তার কোনো নিশ্চয়তা তুমি দিতে পারবে? এ ব্যাপারে আমার গুরুগম্ভীর মনোভাব বুঝতে পেরে তিনি আর কথা বাড়ালেন না। যাওয়ার দিন ন্যাশভিলের আকাশ ফকফকা, রোদ ঝলমল। ওদিককার অবস্থা যেমনই থাকুক, নাজলা-নায়লার ফ্লাইটেও কোনো অসুবিধা হয়নি। সময়মতো সবাই গিয়ে মিলিত হলাম বোস্টনের ‘লোগান’  আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী বোস্টনে নেমে দেখি, আকাশ ঘনকালো মেঘে ঢাকা, ঝরঝর বৃষ্টি, ঝরছে তো ঝরছে, থামাথামির কোনো আলামত নেই। প্রকৃতির এমন কান্না দেখে আমাদেরও কাঁদো কাঁদো অবস্থা! আমি সবার মনে একটু সান্ত্বনা  দেওয়ার কোশেশ করলাম এই বলে যে, দেখ, আমরাতো বেড়াতে আসিনি, একটি আবেগঘন ধর্মীয় ও পারিবারিক কাজে এসেছি। আল্লাহ্ তো দেখছেন, প্রতিকূলতা যত বেশি হবে, আমরা ‘হাসানাও’ তত বেশি পাব, কিন্তু আমার কথাটি কারো মনকে এতটুকু নাড়া দিতে পারল বলে মনে হলো না। তার ওপর আমাদের মাঝে কেউ একজন বলে বসলেন, ‘আব্বু, কাল বৃষ্টি থেমে যাবে, আমাদের ফিরতি ফ্লাইট তো সেই বিকেল বেলা, আগামীকাল সকালে গ্রেভইয়ার্ডে গেলে কেমন হয়’। আরেকজন বললেন, ‘না, আসল কাজটি আজকেই সেরে ফেলা উচিৎ,’ আমিও জোর দিলাম, আজই যাব এবং এখনই। আগে থেকেই বলা ছিল, স্যুটকেস ছাড়া সবাই এক প্রস্থ কাপড় পরে ছোট হ্যান্ডবেগ নিয়ে আসবে। তাই হলো, ‘উবার’ ডেকে প্রথমে গেলাম ডাউনটাউনের কাছে ‘ব্যাক ব্যে’ এরিয়াতে, সেখানে একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে আরেকটি ‘উবার’ নিয়ে সোজা  বেছরের পুরনো এবং দেশের সবচেয়ে বড় বড় সেমিটারির অন্যতম। যাওয়ার পথে  ১৯৮১-৮৩-তে  আসাদ-নাজলা-নায়লার জন্মের আগে বোস্টনের যে অঞ্চলে আমরা থাকতাম, যে ইউনিভার্সিটিতে আমি পড়তাম, যে সব রাস্তা দিয়ে দিন-রাত হাঁটাহাঁটি করতাম, তাদেরকে সেসব দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ে গেলাম। যে হাসপাতালে আসাদের জন্ম হয়েছিল, তার সামনে দিয়ে গেলাম, আসাদ ডানে-বাঁয়ে চেয়ে দেখল, পরিবর্তন কিছুই হয়নি। এর মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে বিরামহীম, পিচ্ছিল পথে এঁকেবেঁকে চলছে গাড়ি, সবার মাঝে সংশয়, শঙ্কা, নিরাপদে সঠিক জায়গায় সময়মতো পৌঁছব তো! কারো মুখে কথা খুব একটা ফুটছে না, যেন সবার মনে দুঃখ, আবেগ, উত্তেজনা এক সঙ্গে এসে ভর করেছে! যেন সবার বুকে দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা কান্না উথলে ওঠার জন্য আকুলি বিকুলি করছে! এভাবে চলতে চলতে সেমিটারির জুইশ অংশের দ্বিতীয় গেটে এসে ‘উবার’ থামল, আমরা দরজা খুলে নামলাম। টপ টপ বৃষ্টি পড়ছে, সঙ্গে ভেজা ভেজা ঠাণ্ডা বাতাস। আমি ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছি, আসাদ ও নায়লা সেল ফোনে বিশাল গোরস্থানের নকশা ডাউনলোড করে বোঝার চেষ্টা করছে, কোথায় ‘সেন্ট ভিনসেন্ট চিলড্রেন’ সেকশন যেখানে সাত এবং আট নম্বর পিলারের মাঝখানে ছোট্ট ও’ক গাছের তলে আমার ‘উমর’কে শুইয়ে রেখেছিলাম ১৯৮১ সালের ২০ আগস্ট বেলা ১টার দিকে। নায়লা ভাবনাচিন্তা করে একটি সূত্র বের করেছে। তার অনুমান, জুইশ সেমিটারির যেদিকে আমরা এসে ঢুকেছি সেই প্রান্তেই উমরের কবর। ফের গাড়িতে উঠে ফিরে গেলাম ওই দিকে। গেট দিয়ে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, সঠিক জায়গায় এসেছি। ড্রাইভারকে আগেই বলা ছিল, জায়গামতোই গাড়ি থামল। দরজা খুলে মাটিতে পা রাখার আগেই আমার বুক ফেটে জমা-কান্না বেরিয়ে এলো। মনের তরল কান্না নীরবে অশ্রু হয়ে সহজেই ঝরে পড়ে, কিন্তু চাপা পড়া জমাট বাঁধা পুরনো কান্নার গতিপ্রকৃতিই আলাদা, সে বড় বেয়াড়া, সে এমনি এমনি প্রকাশিত হয় না, বাতাসে শব্দতরঙ্গ তুলে হঠাৎ বিষ্ফোরিত হয়! আমার বেলা তাই হলো। ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠলাম, কথা বলা তো দূরে থাক, নিঃশ্বাস প্রশ্বাসেও কষ্ট হচ্ছিল। পেছনে ফিরে দেখি বউ-ছেলেমেয়ে সবার একই অবস্থা! বাঙালির এমন বাঁধভাঙ্গা  কান্না দেখে মেক্সিকান ‘ফবারওয়ালা’ তো হতভম্ব! তারা এমন আবেগঘন কাঁদাকাটিতে অভ্যস্ত নয়! বুঝলাম, খুশিবাসির মতো কান্নাকাটিও মানুষের সংস্কৃতির একটি অংশ। জাতিতে জাতিতে যেমন আনন্দ-উদযাপনে ভিন্নতা আছে, তেমনি আছে ব্যথাবেদনার বহিঃপ্রকাশেও। সেই ছোট্ট ও’ক গাছের চারা - আজ বিশাল বৃক্ষ! দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছরে মাটির ‘উমর’ মাটির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, অথচ গাছটি এখনও সবুজ, সতেজ, ক্রমবর্ধমান! আমি একবার আমার ছেলের কবরের দিকে তাকাই, আরেকবার দেখি গাছটাকে। অদ্ভুত এক মনের অবস্থায় হতবিম্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি! পরপর আমি যেন দু’টো কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি। ভারী অভিমানের সুরে ‘উমর’ যেন বলছে, ‘বাবা, এতদিন পর আমার কথা মনে পড়ল!’ আমি কী উত্তর  দেবো, গাছটি যেন আমার হয়ে জবাব দিচ্ছে, ‘ভয় নেই বন্ধু, আমি তো আছি!’ কথা তো ঠিকই, এ-তো কেবলই একটি বনের গাছ নয়, সেও আমার প্রিয়, আমার ছেলের বন্ধু যে, আমি আমার প্রাণপ্রিয় শিশুসন্তানকে এখানে ফেলে গেছি, এই গাছের তলে। গাছটি তো তাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে যায়নি কোথাও। সে-ই তো তার আপন বন্ধু, একমাত্র বন্ধু, সে-ই তাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সঙ্গ দিচ্ছে, ছায়া দিচ্ছে, মায়া দিচ্ছে! কী ঝড়, কী বৃষ্টি, কী তুষারপাত, কী আঁধার, কী আলো, - জগতের তাবৎ বিপদে আপদে ও’ক গাছই আমার ছেলেকে আগলে রেখেছে! বিনিময়ে কিছুই চায় না, চাইবেও না! একটি গাছ, সে কত বড়, কত মহৎ! জীবিত মানুষকে ফল দেয়, ফুল দেয়, ছায়া দেয়, ঝরা পাতা দেয়, নিজেকে পুড়িয়ে মানুষকে আলো দেয়, তাপ দেয়, আসবাবপত্র হয়ে আদম সন্তানের ঘরে ঘরে শোভা পায়! মৃত মানুষের আত্মাকে সঙ্গ দেয়, হয়তোবা আরও কত কিছু দেয় যা আমরা জানি না! আজ আমি আমার প্রয়াত ছেলের কাছে অপরাধী, ক্ষমাপ্রার্থী! ও’ক গাছের কাছে আমি ঋণী, চির ঋণী! আমি আজ মেঘে ঢাকা বোস্টনের আকাশের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আকাশ তার কান্না থামিয়ে আমাদের কাঁদতে দিল। যতক্ষণ ‘উমরের’ কবরের পাশে ছিলাম, ততক্ষণ বৃষ্টি পড়েনি এক ফোঁটাও। আমরাও এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে কসুর করিনি, সবাই মিলে ‘চার-কুল’ পড়লাম, সুরা ফাতেহা পড়লাম, আল্লাহ কাছে কাঁদলাম, দোয়া করলাম, মাগফেরাত চাইলাম! ও’ক গাছের ছবি তুলে নিয়ে এলাম। ‘উবার’ ড্রাইভার আমাদের ফেলে গেল না, গাড়িতে বসে বসে সব দেখল! কী বুঝল, কে জানে? গোরস্থানের আনুষ্ঠানিকতা সেরে, গাড়িতে এসে বসলাম, সে টিস্যু এগিয়ে দিল, ফের নিয়ে এল বোস্টন! তার কাছেও আমি ঋণী, চির ঋণী! লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক - টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি। এসএইচ/

গণতন্ত্রের কারামুক্তির দিন আজ

আজ ১১ জুন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি, জননেত্রী শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগ শেষে ২০০৮ সালের এই দিনে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। ওয়ান-ইলেভেনের অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাকে গ্রেফতার করা হয়। আমরা যদি একটু পেছন ফিরে দেখি, তাহলে দেখতে পাই ২০০৭ সালে একটি চেপে বসা অপশক্তি কী প্রতাপে দেশ শাসন করে গেছে! চেপে বসা শাসকদের চাপে পিষ্ট গণতন্ত্র। রাজনীতি তখন যেন গর্হিত অপরাধ। রাজনীতিক পরিচয় দিতেও অনেকে কুণ্ঠিত। চার বছরের জোট অপশাসনের পর চেপে বসা শাসককুল তখন রীতমতো ত্রাস। রাতারাতি সব কিছু বদলে ফেলার আভাস দিয়ে রাজনীতি থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করার কথা তখন এমন করে বলা হয়, যেন রাজনীতি এক গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত। অবশ্য চার বছরের জোট অপশাসন রাজনীতিকে অনেকটাই সে পর্যায়ে নিয়ে যায়। আর সেই সুযোগেই চেপে বসে তত্ত্বাবধায়ক নামের নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থা। ওয়ান-ইলেভেন নামের পটপরিবর্তনের পর সরকার পরিচালনায় আসা এই সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। সাহসী রাজনীতির পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাসকে মুছে ফেলার কী কুিসত, নির্মম ও ভয়াবহ চক্রান্তই না করেছিল প্রতিক্রিয়াশীল চক্র! চেষ্টা করেছে সংকীর্ণ রাজনীতির হীনম্মন্যতার ছদ্মাবরণে তার ভাবমূর্তি নস্যাৎ করতে। রাজনৈতিক নিষ্ঠুর প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও চক্রান্তের জাল বিছিয়েছে গোপনে! আমরা যদি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই জীবনের বেশির ভাগ তাকে থাকতে হয়েছে কারা অভ্যন্তরে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহান নেতাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি পশ্চিম পাকিস্তানের চেপে বসা শাসকগোষ্ঠী। বঙ্গবন্ধুর মতোই যেন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে তার কন্যা শেখ হাসিনাকে। দেশের মানুষ যখন অধিকারবঞ্চিত, ১৯৮১ সালে তিনি চেপে বসা শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে দাঁড়িয়েছেন অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে। যেমন দাঁড়িয়েছিলেন জাতির পিতা। শেখ হাসিনার চলার পথটা সহজ ছিল না কোনো দিনই। এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে জেল-জুলুম নতুন কোনো ঘটনা নয়। মহৎ রাজনীতিকরা কারাগারে বসেই তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন—এমন অনেক নজির আছে। জননেত্রী শেখ হাসিনাও নির্জন কারাবাসকালে অলস সময় কাটাননি। কারাগারের নির্জনতাকে তিনি তার সৃজনশীল রাজনৈতিক চিন্তায় সময় পার করেছেন। তার চরিত্রের যে বিষয়টি সবারই নজর কাড়ে, তা হচ্ছে তার গভীর প্রত্যয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ জননেত্রী গভীর সংকটেও জনগণের কল্যাণচিন্তা করেন। সেই চিন্তার প্রতিফলন এরই মধ্যে ঘটেছে। এক স্মৃতিচারণায় জননেত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা, তা সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে নিঃসঙ্গ দিনগুলোতেই তৈরি করেছিলেন তিনি। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক উত্থান-পতন লক্ষ করা যায়। রাজনীতির ইতিহাসে কিছু ঘটনা ঘুরে ঘুরে আসে। যদি বলা হয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধুকে কোনো দিন মুছে ফেলা যাবে না; যদিও তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার অনেক চেষ্টাই হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতিতে অভিষেক যেমন তার জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, তেমনি মসৃণ ছিল না তার রাজনৈতিক চলার পথটিও। পায়ে পায়ে পাথর ঠেলে শেখ হাসিনাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। কিন্তু জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক কল্যাণের যে পথযাত্রা শুরু হয়েছিল তার, তা থেকে তাকে বিচ্যুত করা যায়নি। ১৯৮১ থেকে এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাটি একেবারেই কুসুমাস্তীর্ণ বলা যাবে না, বরং কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। বাবার মতোই অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন। দীর্ঘদিন কাটাতে হয়েছে নিঃসঙ্গ পরবাস। স্বামী-সন্তান নিয়েও গভীর বেদনার দিন পার করতে হয়েছে তাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়েও স্বদেশে ফিরতে পারেননি তিনি। দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পরও ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করেছে ঘাতক। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন। বসেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনে। জনস্বার্থে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করলেন। এরপর যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রাম। তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে কয়েকবার—চট্টগ্রামে, কোটালীপাড়ায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। বাংলার মানুষের ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়েছে শত্রু। এর পরও ষড়যন্ত্র কম হয়নি তাকে নিয়ে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাকে গ্রেফতার করাটাও ছিল গভীর এক ষড়যন্ত্র। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হয়ে দেশে ফিরে আসার পর থেকে ১৯৮৩, ১৯৮৫, ১৯৯০ ও ২০০৭ সালেও গ্রেফতার করা হয় তাকে। আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে অনেক কালো অধ্যায় পার হয়ে আসতে হয়েছে। এখনো বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে চলতে হচ্ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার চলার পথটা মসৃণ ছিল না কোনো দিনই। পায়ে পায়ে পাথর সরিয়ে শেখ হাসিনা গত ১০ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর এক ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে দেশ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে বের করতে হবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। বঙ্গবন্ধুকন্যাই পারেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরে উন্নয়নের নতুন পথে শনৈঃ শনৈঃ এগিয়ে নিয়ে যেতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর এখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি দেশের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের বর্তমান। ব্যক্তিগতভাবে বর্তমানকে ভোগ করেন না তিনি। আর সে কারণেই বাঙালির সঙ্গে তার জন্মান্তরের নিবিড় যোগসূত্র। দেশের মানুষের আস্থা ও অস্তিত্বে তার স্থায়ী আসন। অমৃতের সন্তান শেখ হাসিনা চেপে বসা তত্ত্বাবধায়কদের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ২০০৮ সালের ১১ জুন। তার মুক্তিতে সেদিন যেন মুক্তি পেয়েছিল গণতন্ত্র। ১১ জুন তাই গণতন্ত্রের মুক্তির দিন। আজ আমরা দেখতে পাই দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৎপর। ঘাপটি মেরে আছে রাজনৈতিক অপশক্তিও। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উদারনৈতিক ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সম্মিলিত প্রয়াস। গণতন্ত্রের মুক্তির এই দিনে সেই মন্ত্রে নতুন করে উজ্জীবিত হতে হবে। লেখক : অস্ট্রিয়াপ্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক। এসএইচ/

শাহবাগ আন্দোলনের নেতাদের হালচাল

শাহবাগ আন্দোলনের জন্ম একটি মাহেন্দ্রক্ষণে, কাদের মোল্লা উপাখ্যানে। এই সময়ে কিছু তরুণ নেতার জন্ম হয়। তারা ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন কি-না জানি না, তবে এই ধরণের নেতাদের রাজনৈতিক জন্ম দেয় কালের রসায়ন। সময় তার প্রয়োজনে কিছু মানুষের জন্ম দেয়। সেসব মানুষের মাঝে কেউ কেউ মহাকালে টিকে যায়, কেউ কেউ হারিয়ে যায় অমানিশার ঘোর অন্ধকারে। খুব বেশি বড় নেতাদের সঙ্গে তুলনা করলে ইতিহাসের পরিমিতবোধের সীমালঙ্ঘন করা হয়। তবুও বুঝার জন্যে আমি তুলনা ব্যবহার করবো। যেমন ইয়াসির আরাফাতের জন্ম। গোটা পৃথিবীতে তো বটেই, এমনকি খোদ ফিলিস্তিনেও প্রয়াত আরাফাতের চেয়ে জ্ঞানে-গুণে-ক্যালিবারে আরও উত্তম বহু মানুষের জন্ম হয়েছে। কালের নিয়মে তারা আবার বিলীনও হয়ে গেছেন। কেউ কেউ মহাকালে আঁচড়ও দিয়ে গেছেন। ইতিহাস কিন্তু সবারে মনে রাখে না, সবারে ধরেও রাখে না। ইতিহাস তাকেই মনে রাখে যিনি ইতিহাসের হক পূরণ করেন। ইতিহাসের নিয়মেই ইতিহাসের প্রাকৃতিক নির্বাচন হলেন ইয়াসির আরাফাত। কারণ তিনি এমন একটি সময়ে জন্ম নিলেন এবং তিনি সময়ের ভাষা যাঁরা বুঝেন তাঁদের সহযাত্রী হলেন। তারপর ধীরে ধীরে সারা ফিলিস্তিনিদের সাড়ে তিন হাজার বছরের কষ্ট নিজের ভিতরে ধারণ করলেন, বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জবর দখলের পর ফিলিস্তিনিদের কষ্টের ইতিহাসকে ধারণ করলেন মনেপ্রানে। জনাব আরাফাতকে ইতিহাস নির্বাচন করে দিলেন আর তিনি নিজেই নিজেকে আর ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা আন্দোলনকে এগিয়ে নিলেন, হলেন প্যালেস্টাইন লিবারেশন ওরগানাইজেশন-পিএলও-র প্রাণ পুরুষ। সত্য হলো, ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জবর দখল প্রতিষ্ঠা না হলে ব্যক্তি আরাফাতের জন্ম হলেও ইতিহাসের নেতা ইয়াসির আরাফাতের জন্ম হতো না। একটি জাতির প্রতিদিনের সব কর্মকাণ্ডই ইতিহাস নয়। ইতিহাস হলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, সেই বহমান কালের বাঁক, যেখান থেকে একটি জাতির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। বিংশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বাঙালি জাতির ইতিহাসের গতিপথের মোটামুটি একটি ধারা আমরা লক্ষ্য করি। আর তা হলো, প্রতি দুই যুগ পর জাতির জেগে উঠা। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো এবং ভাগ হলো সিন্ধুসভ্যতার পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো জনপদ। এক মায়ের শরীর কেটে মানব সভ্যতার সব অর্জনকে পাশ কেটে জন্ম হলো দুটি রাষ্ট্রের, ভারত আর পাকিস্তান। ইতিহাসের কষ্টিপাথর দেখে তখনই বলে দেওয়া সম্ভব ছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রটি টিকবে না। টিকার কথাও নয়। প্রায় বারশ’ মাইল দূরত্বের দুটি রাষ্ট্র; যাদের ভাষা সংস্কৃতি প্রথা বিশ্বাস ও মূল্যবোধের কোন মিল নেই তারা শুধু ধর্মের উপর ভর করে টিকতে পারেনা। হলোও ঠিক তাই। দুই যুগ পর বাঙালী জেগে উঠলো। ঊনসত্তরে থেকে একাত্তর বাঙালী জাতির আধুনিক ইতিহাসের উত্তুঙ্গ সময়। একাত্তরে স্বাধীনতার মহাকাব্য। স্বাধীনতার প্রশ্নে বাঙালী অনেক চড়া মূল্য দিলো কিন্তু ছাড় দিলোনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র স্বাধীনতার জন্য এতো কম সময়ে এত বেশি রক্ত দেয়নি, করেনি এত বড় ত্যাগ। নয় মাসে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মদান, দুই লক্ষ নারীর সম্মান আর এক কোটির অধিক লোকের বাস্তুহারার ইতিহাসের বিনিময়ে বাঙালী তার মুক্তির মূল্য দিলো। এটি সম্ভবত মিশরে ইহুদি জাতির দাসজীবন থেকে মুক্তির আর এক্সোডাসের বিনিময়মূল্য থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি।     স্বাধীনতার পর পঁচাত্তরে হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বটবৃক্ষের পতন হলো। একটি বড়বৃক্ষের পতন হলে রাষ্ট্রের ভুমি কেঁপে উঠে। তারপর রাষ্ট্র ভুল পথে চলতে থাকে প্রায় চব্বিশ বছর। আমরা দেখলাম প্রায় দুইযুগ পর আবারো নব্বইতে জাতি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জেগে উঠলো। সেই ঘুমন্ত জাতি জেগে উঠার সময়ে ইতিহাস যাঁদের প্রাকৃতিক নির্বাচন করলো তাঁরাই জাতিকে পরের দুই যুগ নেতৃত্ব দিলো, আজো অনেকটা দিচ্ছেন। নব্বইয়ের প্রায় দুই যুগ পর জাতি স্বমহিমায় ২০১৩ সালে আবারো জেগে উঠলো রায়ের পর যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার অনামিকা ও মধ্যমা দুই আঙ্গুল তুলে বিজয় প্রদর্শনের ধৃষ্টতা দেখানোর পর। এবার ইতিহাস প্রাকৃতিক নির্বাচন করলো শাহবাগের কিছু তরুণকে। তাদের এক অংশের নেতা ইমরান এইচ সরকার। জাতি জেগে উঠে জাতির ইতিহাসের রসায়নে। নেতা নির্বাচিত হয় প্রাকৃতিক নির্বাচনে। মানে এই ইমরান সরকারদের মতো ছেলেপেলেরা না থাকলেও জাতি কিন্তু ঠিকই জেগে উঠতো। এই ধরণের ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলন আসলে জেগে উঠে মাটি ভেদ করে স্বত:স্ফূর্তভাবে, যেমন উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অনিবার্যভাবে ভেদ করে উঠে অঙ্গুরিত উদ্ভিদের বীজ। ইতিহাস প্রাকৃতিক নির্বাচন করে ছেড়ে দেয়। জাতিকে এবং নেতাকে এরপর ইতিহাসের সত্য ধরে ধরে খনি শ্রমিকের মতো পাথর কেটে কেটে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু শাহবাগের ইমরান সরকাররা বিজয়ের পর কি করলেন! প্রথমত: তারা নিজেরাই বিভিন্ন দলে উপদলে বিক্ষিপ্ত হয়ে ফিল্ডি ল্যাঙ্গুয়েজে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণে লেগে রইলেন। দ্বিতীয়ত: তারা সরকারের সমালোচনা আর প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধিতার পার্থক্য ভুলে গেলেন। তারা ক্রমাগত সরকার বিরোধিতা আর মিথ্যাচারেও রত রইলেন। তারা ভুলে গেলেন কোথায় মূলত তাদের সেইফ জোন। যে আওয়ামীলীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের ক্ষমতায়নে সমগ্র বাংলাদেশের এক বর্গইঞ্চি জায়গা তাদের জন্যও নিরাপদ নয়, প্রতিদিন সেই আওয়ামী লীগের নামে সত্য মিথ্যা এবং বানোয়াট সংবাদ দিতে থাকলেন। আমরা কেইস টু কেইস সব বলবোনা। শুধু নমুনা হিসেবে কোটা আন্দোলন নিয়েই বলবো। নীতিগত আর বিশ্বাসগতভাবে কোটা আন্দোলনকে আমরা সমর্থন করেছিলাম এবং এখনো করি। কিন্তু কোটা আন্দোলনে তারা কি করলেন! তারা নানান অপপ্রচারের গুজব রটালেন, মিথ্যা মৃত্যুর গুজব রটালেন, এমনকি ছাত্রলীগের ৬৯ বছরের ইতিহাসে বহু অপবাদ বদনামের অভিযোগ থাকলেও কেউ যা দিতে পারেনি সেই রগকাটার গুজবও রটালেন। সুফিয়া কামাল হলে ছাত্রলীগের এক নারীনেত্রীকে গুজবের উপর ভর করে চরম লাঞ্ছিত করালেন। প্রকৃতি নির্বাচন করলেও প্রকৃতি কোনো মিথ্যা আর খলনায়ককে ধরে রাখে না। সত্যের উপর না থাকলে ইতিহাস সবারেই স্রোতে ভাসিয়ে দেয়। বাঙালির ইতিহাসের সত্য হলো, এদেশে মিথ্যা আর গুজবের উপর  ভর করে রাজনীতি করে পাকিস্তানি ভাবধারার প্রতিক্রিয়াশীলরা। আর বাঙালির ভাবধারা হলো সত্য--সেই বড়ু চণ্ডীদাসের ` সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই`। কথা হলো অন্যায়, অসত্য আর জুলুমের প্রতিরোধে বর্তমানে রাষ্ট্র যেখানে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের বহু নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদেরই ছাড়তেছেনা, সেখানে আপনি কোন রসগোল্লা যে প্রতিদিন একটি করে সরকার বিরোধী সত্যকে মিথ্যা দিয়ে মোড়ানো উদ্ভট উস্কানি দিবেন, আর সরকার আপনাকে কিছুই করবে না! তবে আমার মনে হলো রাষ্ট্র এবারও ইমরান সাহেবকে ফেভার দিলো। মিথ্যার বেসাতি করে তিনি যখন হারিয়ে যাচ্ছিলেন তখন সরকার তাকে আবার জীবিত আর প্রাসঙ্গিক করে দিল। কোনো রাজনীতি বা আন্দোলন যখন সত্যের উপর থাকে না, মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে থাকে না, তখন তা এমনিতেই হারিয়ে যায়। আর তাই গ্রেফতার থেকে থেকে তিনি লাভবান হবেন। রাজনীতিবিদের প্রথম সার্টিফিকেট হলো জেল। জেল হলো রাজনীতির সবচেয়ে বড় পাঠশালা। গত শতাব্দীতে পৃথিবীর বেশিরভাগ দরকারী রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়েছে জেলে জেলে। এমনকি বহু দার্শনিকেরও জন্ম হয়েছে জেলে জেলে। রাষ্ট্রকে ধন্যবাদ যে তাকে জেলে নিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার সুযোগ না দেওয়ার জন্য, অন্তত এই প্রতিক্রিয়াশীল মন নিয়ে রাজনীতি করার সময়। তবে সবচেয়ে ভালো হতো যদি তাকে উপেক্ষা করা যেতো। যিনি প্রতিক্রিয়াশীল আর গুজব নির্ভর হয়ে যাচ্ছেন তাকে কনসেনট্রেশনে রেখে প্রাসঙ্গিক রাখার দরকার নেই। শাহবাগ আন্দোলনের সেই ইমরানকে আমরা মনে রাখবো। তার হালের প্রতিক্রীয়াশীল রূপও আমরা মনে রাখবো। জনপ্রিয়তা বিক্রি করে সমৃদ্ধির আশায় মন্ত্রীর কন্যাকে বিয়ে করার সেই রূপও আমরা মনে রাখবো। আমরা আবারো সবারে মনে রাখতে বলবো, সমালোচনা মানে বিরোধিতা নয়। সমালোচনা মানে প্রতিক্রিয়াশীলতাও নয়। গঠনমূলক সমালোচনা হলো রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরামর্শ। কিন্তু আপনার সমালোচনায় যদি আইএসআইয়ের উপকার হয়, যদি মোসাদ উজ্জীবিত হয়, যদি স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র বিরোধীরা হয় উৎফুল্ল ও বেনিফিসিয়ারী, তবে আমরা বসে থাকতে পারিনা। এই রাষ্ট্র আমাদের। এই রাষ্ট্র আমাদের খাওয়ায়, পরায়, নিরাপত্তা দেয়, আলো বাতাস জল দেয়। এখানে কোন ষড়যন্ত্র হলে আমরা কাউকেই ছেড়ে কথা বলতে পারিনা। যে রাষ্ট্র, যে রাজনৈতিক দর্শন আমাদের নিরাপত্তা দেয়, যে চেতনার সীমানা প্রাচীর ধ্বসে পড়লে আমরা নিজেরাই বিপন্ন ও উদাও হয়ে যাবো সে দর্শনকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ০৭.০৬.২০১৮

মানবিক মানুষ হতে চাই, গল্প নয় সত্যি!  

৩০শে মে, কক্সবাজার যাওয়ার পথে কর্ণফুলী ব্রিজের উপরে দাঁড়ালাম ব্রিজ থেকে নদীর কিছু ছবি তুলবো বলে। বিশাল ব্রিজ, চমৎকার ভিউ। দূরে ব্রিজের উপরের অংশে কাপড়ের পোটলার মতো কিছু একটা পড়ে আছে আর শত শত মানুষ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কেউ কেউ পোটলার দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু কেউ থামছে না। প্রচণ্ড রোদে তেঁতে হয়ে আছে রাস্তা। আমার রোদে দাড়িয়ে থাকতেই কষ্ট হচ্ছিল তবু আরেকটু ভালো ভিউয়ের জন্যে আমার ফটোগ্রাফার নিকলাসকে বললাম, চলো উপরের দিকে যাই আরও ভালো ভিউ পাওয়া যাবে। কিছু দুর উঠার পরেই কাপড়ের পোটলাটিকে আমার মনে হল এটা কোন কাপড়ের পোটলা নয় বরং একজন মানুষ পড়ে আছে। আমার হৃদপিণ্ডে ধাক্কার মতো লাগলো। আগুণের মতো গরম ব্রিজ, জুতা থাকার পরেও পায়ে গরম অনুভব করছি। এই রাস্তায় কারো পক্ষে শুয়ে থাকা সম্ভব না। আমি একটু দৌড়ের মতো করেই জোরে হেঁটে কাছে গেলাম ভালো ভাবে দেখার জন্যে।   ৭০/৭৫ বছরের একজন বৃদ্ধা পরে আছেন। ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো মুখ হা করে দম নিচ্ছেন। আর মুখ দিয়ে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে। যে কোন মুহূর্তে আত্মা বেড়িয়ে যাবে মনে হচ্ছে। হয়তো পেশাব করে দিয়েছেন শারীরিক যন্ত্রণায়, কারন পানির একটা রেখা নিচের দিকে বয়ে গেছে তাঁর কোমরের কাছ থেকে। হয়তো রোজা রেখেছে হেঁটে ব্রিজ পাডর হচ্ছিলেন এবং তাঁর হিট স্ট্রোক হয়েছে। আমার নিজের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কি করবো বুঝে উঠতে সময় লাগছিল। ততক্ষণে নিকলাস ও আমার সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার লর্স (স্টকহোম ফিল্মস্কুলে ২০০৬-২০০৮ আমাদের সাউন্ড পড়িয়েছেন তিনি) কাছে এসে পড়েছেন। লর্স আমার পাশে বসে বৃদ্ধার পালস দেখলেন। নিকলাস নিজের গায়ের জামা খুলে বৃদ্ধার উপরে ছায়া দিলেন। লর্স বৃদ্ধার মুখে পানি দিলেন। উনাকে এখনি হাসপাতালে নেয়া দরকার কিন্তু আমাদের গাড়ি রাস্তার উল্টা পাশে কক্সবাজারের দিকে মুখ করা। সেটাকে আসতে হলে অনেক দূর ঘুরে আসতে হবে। চট্ট্রগ্রামের ট্রাফিকে সেটা অনেক সময়ের ব্যপার। আমি লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে গেলাম রিক্সা গাড়ি যা পাই তাই থামানোর জন্যে। কিন্তু কেউ থামছে না। আমাকে পাশ কাটিয়ে সাই সাই করে চলে যাচ্ছে সবাই। আমি আবেগপ্রবণ, মানুষের অবহেলা আর নিষ্ঠুরতা হজম করার শক্তি আমার নেই। চিৎকার করে মানুষকে গালাগালি শুরু করেছি। কেউ আমার গালির প্রতিবাদ করছে না, কাপুরুষেরা কখনো সেটা করেও না। তবে একজন নির্মাণ শ্রমিক এগিয়ে এলেন রাস্তার ওপার থেকে। সে আর আমার সহকারী খোকনদা একটা ব্যটারি রিক্সা থামালেন। লর্স কোলে করে বৃদ্ধাকে রিক্সায় তুললেন। তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হল। আমার বিদেশি বন্ধুদের কাছে আমি সব সময় বাঙালির কমল হৃদয়ের গল্প করি কিন্তু সেই দিনের সেই ব্রিজের উপরে যা হল তার লজ্জা আমাকে এখনো যন্ত্রণা দিচ্ছে। আমি কখনোই হয়তো আর বাঙালির কমল হৃদয় নিয়ে বিদেশি বন্ধুদের সামনে কোন বাক্য বলতে পারবো না। একটা কাক মরে গেলে হাজার হাজার কাক জোড়ো হয়ে যায় কিন্তু মানুষ মানুষের জন্যে না! কি মানে আমাদের এই সভ্যতার যদি আমরা চোখের সামনে একজনকে মরতে দেখেও এক মুহূর্তের জন্যে না দাঁড়াই? এতো বিদ্যা, এতো উন্নয়ন দিয়ে আমাদের কি হবে যদি আমরা মানুষই হতে না পারি? এসি    

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা ভালোভাবে শেষ হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া প্রায় নিয়মিত একটা ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা খুব দুর্ভাবনায় ছিলাম। কিন্তু এবারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে খুব কঠিনভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, হাইকোর্ট থেকে একটা কমিটি করে দিয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রনালয় শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছিল যে, আগে প্রশ ফাঁস হয়েছে, আর যেন না হয়। সেজন্য বেশ কয়েকটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আইন শৃংখলা বাহিনীও যথেষ্ট সতর্ক ছিল। সব মিলিয়ে সবার সবরকম উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কাজে লেগেছে, পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। বলা যেতে পারে আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর বিশ্বাস আবার ফিরে আসা শুরু হয়েছে।   পরীক্ষা শেষ হয়েছে, পৃথিবীর সবদেশেই যখন ছেলে মেয়েদের পরীক্ষা শেষ তারা লেখাপড়ার চাপ থেকে মুক্তি পায়। নূতন করে লেখাপড়া শুরু করার আগে তারা তাদের সখের কাজকর্ম করে, ঘুরতে বের হয়, বই পড়ে, নাটক সিনেমা দেখে। আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের সেই সৌভাগ্য হয় না। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথে এই দুর্ভাগা ছেলেমেয়েগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেবার জন্য “কোচিং” শুরু করে দিতে হয়। কী ভয়ংকর সেই কোচিং সেন্টার, কী তাদের দাপট। কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছিল বলে সেই কোচিং সেন্টারগুলো মিলে কী হম্বিতম্বি!  যাই হোক, এই বছর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকে ছেলে মেয়েরা একটুখানি বিভ্রান্ত হয়ে আছে। তারা সবাই দেখেছে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সব কয়টি ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলরদের ডেকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। আমরা সবাই জানি তার অনুরোধটি আসলে অলিখিত একটা আইনের মতো, এটি সবাইকে মানতে হবে। কাজেই সবাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে আছে যে এই বছর সমন্বিত একটি ভর্তি পরীক্ষা হবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে চেয়েছেন সাথে সাথে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হয়েছে। আমরা তো আশা করতেই পারি যে, তিনি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা চেয়েছেন তাই এবারে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা হবে। কাজেই যদি এই দেশের ছেলেমেয়েরা এই বছর সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার একটি স্বপ্ন দেখতে শুরু করে তাদেরকে মোটেও দোষ দেওয়া যাবে না। কিন্তু যে বিষয়টা নিয়ে সবাই বিভ্রান্ত, সেটা হচ্ছে সমন্বিত নিতে হলে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যে একটি প্রক্রিয়া শুরু করবে আমরা কেউ সেই প্রক্রিয়াটি এখনো শুরু হতে দেখছি না। আমরা সবাই জানি দেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় আগ্রহী নয়, তাই তারা নিজেরা উদ্যোগ নিবে সেটি আমরা কেউ আশা করি না। আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মাঝে থাকি আমি জানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই দেশের ছেলেমেয়েদের জন্যে বিন্দুমাত্র মায়া নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নিলে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষকেরা যে পরিমাণ বাড়তি টাকা উপার্জন করেন তার জন্য তাদের এক ধরণের লোভ আছে কাজেই তাদেরকে যদি বাধ্য করা না হয় তাহলে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হবে না। এতোদিন আমি সব সময়েই ভেবে এসেছি কে তাদের বাধ্য করবে? বিড়ালের গলায় ঘন্টাটি কে বাঁধবে? শেষ পর্যন্ত যখন মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে  এগিয়ে আসতে দেখেছি আমি প্রথমবার আশায় বুক বেধেছি। গত বছরই এটি হওয়ার কথা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কূট কৌশলে সেটি হয়নি। এই বছরও সময় চলে যাচ্ছে কেউ মুখ ফুটে কথা বলছে না, কাল ক্ষেপন করে যাচ্ছে, এক সময় অজুহাত দেখানো হবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার জন্যে এখন আর যথেষ্ট সময় নেই! এই দেশের ছেলেমেয়েদের জীবনটাকে একটা অসহায় বিপর্যয়ের মাঝে ঠেলে দেয়া হবে। শুধুমাত্র অল্প কয়টি বাড়তি টাকার জন্য! ২) সমন্বতি ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হলে সেটি নেওয়ার কথা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে। ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয় একটা ছেলে বা মেয়ের ইণ্টারমিডিয়েট সিলেবাসের ওপর। সদ্য পরীক্ষা দিয়ে শেষ করার পর এই বিষয়ের ওপর পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে তাদের পুরোপুরি প্রস্তুতি থাকে। যত দেরী করা হয় ছেলেমেয়েদের জীবন ততো কঠিন হয়ে পড়ে কারন ভর্তি পরীক্ষাওর জন্যে তাদের আবার নতুন করে লেখাপড়া করতে হয়। শুধু তাই নয় তখন এই দেশের যত কোচিং সেন্টার আছে তারা এই ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা ভয়ংকর ব্যবসা করার সুযোগ পায়। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে যদি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাটি নিয়ে নেয়া যেতো তাহলে এই কোচিং সেন্টারগুলোর ব্যবসা রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া যেতো। এই দেশের অসংখ্য মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত সন্তানদের সময় বাঁচতো, টাকা বাঁচতো। সেই সময় এবং টাকা দিয়ে তারা অন্যকিছু করতে পারতো যেটি দিয়ে তাদের জীবনটাকে আরো একটু আনন্দময় করা যেতো! ৩) সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার জন্যে কাউকে না কাউকে উদ্যোগ নিতে হবে। কে উদ্যোগ নেবে আমি জানি না, তবে বেশ কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন একবার আলাপ আলোচনা শুরু করেছি তাই আমার ধারণা এই উদ্যোগ নেওয়ার জন্যে তারাই সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান। বেশ কিছুদিন আগে কোনো একটি অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন তাদের সাফল্যের তালিকাটি তুলে ধরেছিল। ঘটনাক্রমে আমাকেও সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তখন আমি এই সাফল্যের তালিকায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাটিও দেখার আগ্রহ দেখিয়েছিলাম। সেখানে উপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিদ, ভাইস চ্যান্সেলর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন এই দেশের ছেলেমেয়েদের অমানবিক নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে এই বছর অবশ্যই এটি করা হবে। সেই থেকে আমি আশা করে বসে আছি, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি এই বছরও দেখতে দেখতে সময় পার হয়ে যাচ্ছে। এখনও উদ্যোগটি শুরু হচ্ছে না। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার জন্য কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে। যেহেতু সব বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয় তাই কী কী করতে হবে সবাই যানে। এর মাঝে রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপার আছে, ছাত্র বা ছাত্রীদের পছন্দের বিষয় ঠিক করার ব্যাপার আছে, প্রশ্নপত্র রেডি করে ছাপানোর ব্যাপার আছে, কে কোথায় পরীক্ষা দেবে সেটা ঠিক করার ব্যাপার আছে, পরীক্ষা নেবার পর ফল প্রকাশের ব্যাপার আছে – এক কোথায় বলে দেয়া যায় সব মিলিয়ে একটা বিশাল দজ্ঞযজ্ঞ। তবে এর কোনোটিই অসাধ্য কোন ব্যাপার নয়। প্রথমে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে একটা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে। সিদ্ধান্তটি নেয়ার পর কোন কোন কাজ করতে হবে নিজ থেকে নির্ধারিত হয়ে যাবে, তখন একটি একটি করে সেই কাজগুলো করতে হবে। আমি খুব জোর দিয়ে এই কথাগুলো বলি কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একবার সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল। শুনে অবিশ্বাস মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার কারণে একেবারে শেষ মুহুর্তে আমরা পরীক্ষাটি নিতে পারিনি। সোজা ভাষায় আমি ঘরপোড়া গরু তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যি সত্যি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া না হচ্ছে আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকব। ৪) এটি নির্বাচনের বছর তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার দেশের মানুষকে খুশি রাখার জন্য নানা পরিকল্পনা করছে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা হয়েছে, বাজেটে নূতন কোনো ট্যাক্স বসানো হচ্ছে না, দেখতে দেখতএ পদ্মা ব্রীজ দাড়িয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমার ধারণা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাটি খুব সহজেই আগামী নির্বাচনের জন্য সরকারের একটি মাইল ফলক হতে পারে। আমাদের দেশের মানুষজন শেষ পর্যন্ত লেখাপড়ার গুরুত্বটি ধরতে পেরেছে, একেবারে খুব সাধারণ মানুষও চেষ্টা করে তার ছেলে বা মেয়েটি যেন লেখাপড়া করে। কাজেই লেখাপড়ার ব্যাপারে যে কোনো উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনকে স্পর্শ করতে পারে। দেশের প্রায় প্রতিটী পরিবারের পরিচিত কেউ এস.এস.সি নাহয় এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী থাকে কাজেই এই পরীক্ষার্থীদের জীবনটা যদি একটুখানি সহজ করে দেওয়া হয়, যদি ভবিষ্যতটুকু একটু খানি নিশ্চিত করে দেওয়া হয় থাওলে সেটি একটা পদ্মা ব্রীজ কিংবা একটা মেট্রোরেল থেকে কোনো অংশে কম হবে না। জীবনকে আনন্দময় করার উন্নয়ন অবকাঠামো উন্নয়ন থেকেও বড় উন্নয়ন। ৫) এই দেশে প্রায় চল্লিশটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি এবং সবাই ভর্তি পরীক্ষা নেয় তাহি সবাইকে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়। কেউ কী এই প্রশ্নগুলো যাচাই বাছাই করে দেখেছে? প্রশ্নপত্র তৈরি করার জন্য একটি দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া সবাই একটা গতানুগতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে যে কারণে খুবই নিম্নমানের বিদঘুটে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। এই প্রশ্নগুলো নানা কোচিং সেন্টারে গাইড বইয়ে পাওয়া যায়। আমাকে একবার হাইকোর্ট থেকে দায়িত্ব দেওয়ার কারণে আমি আবিষ্কার করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ইউনিটের প্রশ্নপত্রের প্রত্যেকটা প্রশ্ন কোনো না কোনো গাইড বই থেকে নেয়া হয়েছে। যদি ঢাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এতো বড় একটা বিশ্ববিদ্যালয়েই এটা ঘটে তাহলে দেশের ছোটখাটো বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হতে পারে সেটা অনুমান করা কঠিন নয়। শুধু যে নিম্নমানের প্রশ্ন হয় তা নয়, ভুল প্রশ্ন হয় এবং দেখিয়ে দেওয়ার পরও ভুল প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। কোথাও কোন স্বচ্ছতা নেই। আমার কাছে মাঝে মাঝে মনে হয় এরকম নিম্নমানের ভুলে ভরা অস্বচ্চ একটা ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া থেকে লটারী করে ছেলেমেয়ের ভর্তি করা সম্ভবত বেশি মানবিক একটা ব্যাপার। এই বছর এইচ.এস.সি পরীক্ষাটি ভালোভাবে শেষ হয়েছে। আমার ধারণা, যদি আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে এই এইচ.এস.সি পরীক্ষার ফলাফলকে ব্যবহার করে ছাত্রছাত্রীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় সেটি গতানুগতিক পদ্ধতি থেকে কোনো অংশেই খারাপ একটি প্রক্রিয়া হবে না। কলেজগুলোতে এই পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করা হয় এবং আমার ধারণা সেখানে চমৎকার একটি পদ্ধতি দাঁড়িয়ে গেছে। সেটাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত সহজ একটি সমাধান হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কী হবে আমরা জানি না। যারা সিদ্ধান্ত নেবেন এখন তাদের কাছে প্রচুর তথ্য উপাত্ত আছে, আধুনিক প্রযুক্তি আছে আমি বিশ্বাস করি দেশের তরুণ ছেলেমেয়েদের জন্যে তাদের এক ধরণের স্নেহ এবং মমতাও আছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবাই মিলে আমরা কী আমাদের ছেলেমেয়েদের একটি সুন্দর জীবন উপহার দিতে পারি না? প্রয়োজন শুধু একটি সিদ্ধান্তের। এসি    

অভিনব প্রতারক চক্র থেকে সাবধান!  

রাজধানীতে প্রতিদিন নানান বিষয়ক কয়েক’শ অনুষ্ঠান হচ্ছে। অনুষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই প্রধান অতিথি আর বিশেষ অতিথিও থাকেন।     এবার বোধহয় প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি ও অনুষ্ঠান আয়োজকরা একটু সচেতনতার সঙ্গে সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। কারণ ইদানিং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের প্রতারনতার ফাঁদে ফেলার জন্য একটি সংঘবদ্ধ ও চৌকষ প্রতারক চক্র সক্রিয় উয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। প্রতারক চক্রের সদস্যরা টার্গেট করা অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার আগেই কৌশলে অনুষ্ঠানের ধরণ ও প্রধান অতিথি এবং বিশেষ অতিথিদের সম্পর্কে জেনে নেয়। পরে এক বা একাধিক ব্যাক্তিকে টার্গেট করে এবং ওই ব্যাক্তির সঙ্গে অনুষ্ঠান ভেন্যুতে প্রবেশ করে। অনুষ্ঠানের আয়োজকরা ভেবে নেন ওই ব্যাক্তিরা (প্রতারক চক্র) বুঝি অতিথির সঙ্গী। এই সময় ওরা অতিথির বেশ কিছু ছবি তোলেন এবং তার কাছ থেকে ভিজিটিং কার্ড অথবা মোবাইল ফোন নম্বর নিয়ে নেন। আবার অতিথিরাও মনে করেন, ওরা বুঝি আয়োজকদেরই কেউ। পরে প্রতারক চক্র ছবিগুলো প্রিন্ট করে ভিজিটিং কার্ডের ঠিকানায় অতি দ্রুত পৌঁছে যায় অতিথির কাছে। গিয়ে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাদের পাঠানো হয়েছে ছবিগুলো দিয়ে এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে কৌশলে বুঝিয়ে থাকে যে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে তাদের মোটা অংকের লোকসান গুনতে হয়েছে। তাই আয়োজকরা তাদের পাঠিয়েছেন কিছু টাকা দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য! সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রটিতে নারী সদস্যও রয়েছে, ওরা সবাই বেশ-ভূষা আর কথা-বার্তায় এতোই চৌকষ যে অতিথি তৎক্ষণাত তাদের বিশ্বাস করে বসেন এবং প্রতারিত হন। তিনি এমনভাবে প্রতারিত হন তা জানতে পারেন অনেক পরে...। কেউ-কেউ হয়তো কোনোদিনই জানতেও পারেন না, যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অথচ ভেবে বসেন আছেন তিনি আয়োজকদের আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের হাত থেকে বাঁচার জন্য অতিথিগণ ও আয়োজকগণকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। এই সতর্কতা বা সাবধানতা অবলম্বনের পথ হতে পারে-১. অনুষ্ঠান স্থলে প্রবেশ করা প্রতিটি নারী ও পুরুষের পরিচয় নিশ্চিৎ করা, তিনি যার অতিথি তাকে জানানো...।২. অনুষ্ঠানের (আয়োজক) কর্তাব্যাক্তিদের সঙ্গে আলোচনা না করে কারো সঙ্গে একটি টাকাও নগদ লেন-দেন না করা।৩. কর্তাব্যাক্তি ব্যাতিত অন্যকোনো ব্যাক্তি অতিথির সঙ্গে অর্থ লেন-দেনের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তাকে সন্দেহের আওতায় রেখে আয়োজকদের সঙ্গে ফোনে/মোবাইলে কথা বলে নিশ্চিৎ হতে হবে।৪. প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত হলে অতিথি এবং আয়োজক মিলেই তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া। ** লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক এসি      

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি