ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ৪:০৯:৩২

জন্মদিনে রেজাউদ্দিন স্টালিনের তিনটি কবিতা

জন্মদিনে রেজাউদ্দিন স্টালিনের তিনটি কবিতা

কবি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রেজাউদ্দিন স্টালিনের আজ (২২ নভেম্বর) ৫৫তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ম্যাজিক লণ্ঠন, বাংলাদেশ সাহিত্য পরিষদ ও পারফর্মিং আর্ট সেন্টার রাজধানীর সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র পরিবাগে মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৪১টি। কবিতার অ্যালবাম পাঁচটি। তার কবিতা বিশ্বের বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, মধুসূদন পুরস্কার, দার্জিলিং নাট্যচক্র পুরস্কার, সিটি আনন্দ আলো পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। এক. বিচ্ছেদের বর্ণমালা আমাদের দেখা আর কখনো হবে না কোনোদিন এমনকি কণ্ঠস্বর টেলিফোনে হবে না মুদ্রিত স্মৃতির পাখিরা এসে বলে যাবে সুরঞ্জনা শোনো : কাল সারারাত জেগে বিচ্ছেদের বেদনা লিখেছি ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ পরস্পর ক্ষোভে ও ঘৃণায়, কে জানতো মুহূর্তের মরীচিকা কেড়ে নেবে আলো বুকের ভেতর থেকে জেগে ওঠা একখণ্ড ভূমি দখল করবে এসে নগরের নিকৃষ্ট মাতাল পৃথিবীর দীর্ঘতম সেতুর উপরে উভয়ের দেখা হবে, কথা ছিলো নক্ষত্রের বিশাল টাওয়ারে শিশিরের শিহরণে, স্বপ্নগর্ভ আকাশের নিচে জোছনার টার্মিনালে অন্তহীন অপেক্ষা করবো   মাইক্রোওয়েভ থেকে আমাদের ধ্বনিপুঞ্জগুলি শুনবে পৃথিবীবাসী, আমরা থাকবো বহুদূরে আরণ্যক স্তব্ধতায়, ফরেস্ট বাঙলোর কোনো রুমে কথা ছিলো বাঙলোর সংলগ্ন সড়কে যদি হর্ন দেয় মার্সিডিজ বেঞ্জ, আমরা ছুটবো ভিন্নগ্রহে আমাদের সব ইচ্ছা স্বপ্নসাধ মুহূর্তের ভুলে ভেঙে গেছে, যার ফলে মর্মন্তুদ বিচ্ছেদের নদী সৃষ্টি হলো আজ দেখো জীবনের প্রতিপার্শ্বব্যেপে এখন কী করে বলো সহ্য করি এতোটা নির্মম   আমাদের দেখা আর কখনো হবে না কোনোদিন এমনকি কবিতারা টেলিফোনে হবে না মুদ্রিত নীরব নায়িকা এসে বলে যাবে, শোনাও তো দেখি নিদ্রাহীন লাল চোখে লিখেছো যে, কষ্টের কবিতা   দুই. সহমরণ সহমরণের তৃষ্ণা ও রাত্রি অপরিসীম সমুদ্রের চিতায় স্বেচ্ছায় উঠেছে আকাশ ঢেউঅগ্নি ঝলসে দিচ্ছে তার দেহ আগুন আর অনন্তের এমন অলৌকিক ভূবিজ্ঞানে নেই কলম্বাসের পরে এই দৃশ্য আর কেউ দেখেছিলো কি না সেই কথা রহস্যজনিত ও হাওয়া সৈকতের স্নিগ্ধ চোখে ঘুম কে তাকে তুলবে সাম্পানে মৎস্যযাত্রায় লবণের লোভ থেকে মুক্ত হওয়া ভার ঝিনুক-নুড়ির গান অনেক প্রাচীন সেই কবে বিগল জাহাজে ডারউইন এসেছিলো পূর্বপুরুষ অন্ত্যজ শামুকের খোঁজে আর কেউ এসেছিল নাকি ভাস্কোদাগামার সাথে রক্ত পুঁজ সিফিলিস আরো কতো মারি এসে জোয়ার জরিপ করে গেছে   ও চাঁদ রাত্রির একান্ত প্রজাতি সাগরকন্যার পাণিপ্রার্থী হও না হলে শুনতে হবে ভ্যাম্পায়ার ভাটার ভর্ৎসনা নীল ও অলড্রিন ভেঙে দেবে তোমার পৌরুষ আকাশের সাথে উঠে এসো সমুদ্রচিতায় আত্মদানের এ সুযোগ অভূতপূর্ব এর চেয়ে চিরন্তন মৃত্যু আর হতেই পারে না   তিন. জানাতেই হবে প্রার্থনা মঙ্গলের প্রভু এ জীবন মুক্ত করো মরীচিকা থেকে সুন্দরের আরাধনা ক্লান্তি থেকে ত্রাণ করো মানব রচিত বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়ে হৃদয়কে বিচ্ছিন্ন করো জাগতিক থেকে স্বনির্বাচিত করো সংমুদ্ধ সময়ে //ডিডি//
বাংলাদেশ তো আমারই দেশ : জহর সেনমজুমদার

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পাঠকপ্রিয় কবি জহর সেনমজুমদার। দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় তিনি। এ পর্যন্ত তার ১৬টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম’, ‘বিপজ্জনক ব্রহ্মবালিকাবিদ্যালয়’, ‘ভবচক্র : ভাঙা সন্ধ্যাকালে’ শীর্ষক গ্রন্থগুলো ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ বছরের একুশে বইমেলায় কাগজ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার কাব্য সংকলন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। সদ্য সমাপ্ত আন্তর্জাতিক সাহিত্যের আসর ‘ঢাকা লিট ফেস্টে’ অংশগ্রহণ করেন তিনি। উৎসবের সমাপনী দিন ১৮ নভেম্বর একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য এ কবি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সিনিয়র সহ-সম্পাদক দীপংকর দীপক একুশে টেলিভিশন অনলাইন : ৭ম ঢাকা লিট ফেস্টে’ আপনাকে স্বাগতম। আন্তর্জাতিক এ সাহিত্য আসরে এসে কেমন লাগছে? জহর সেনমজুমদার :‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ ইতিমধ্যেই বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ উৎসবে বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করছেন। বিশ্ব সাহিত্যের এ আসরে আমাকে একজন কবি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোয় নিজেকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে। গত বছরও আমি ‘ঢাকা লিট ফেস্টে’ অংশগ্রহণ করেছি। তবে এবারের আসরটিকে আমার আরো প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। এখানে এসে বিভিন্ন দেশের অনেক গুণি ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পেরেছি। সব মিলিয়ে চমৎকার একটি সময় পার করেছি। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অভিযোগ আছে, এখানে ইংরেজি সাহিত্য প্রাধান্য পাচ্ছে। বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন? জহর সেনমজুমদার : ইংরেজি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। তাই এ ভাষাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তবে আমি মনে করি, ‘লিট ফেস্ট’ বাংলাদেশে আয়োজিত হওয়ায় এখানে বাংলা ভাষাকেই সর্বোচ্চ প্রধান্য দেয়া উচিত। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরো ভাবতে হবে। তবে গত বছরের চেয়ে এবারের উৎসবে বাংলা সাহিত্যের চর্চা বেশি হয়েছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : এ বছর মোট ৪ জন জেমকন সাহিত্য পুরুস্কার পেয়েছে। আপনি এ পুরস্কার আসরের একজন বিচারক ছিলেন। পুরস্কৃত ব্যক্তিদের সাহিত্যের মান কতটা উন্নত মনে হয়েছে? জহর সেনমজুমদার : এবারের পুরস্কৃত ব্যক্তিরা হচ্ছেন- মোহাম্মদ রফিক, আশরাফ জুয়েল, মামুন অর রশিদ ও নুসরাত নুসিন। তিন বিভাগে মোট চারজনকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদ রফিক তার “দু’টি গাথাকাব্য” গ্রন্থের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি ৮ লাখ টাকা পেয়েছেন। তরুণ কথাসাহিত্যিক হিসেবে আশরাফ জুয়েল এবং মামুন অর রশিদ যৌথভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। তাছাড়া জেমকন তরুণ কবি হিসেবে ‘দীর্ঘ স্বরের অনুপ্রাস’ পাণ্ডুলিপির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন নুসরাত নুসিন। তিনি পেয়েছেন এক লাখ টাকা। তাদের প্রত্যেকের লেখার ধরন আমার কাছে মানসম্পন্ন বলে মনে হয়েছে। অর্থের দিক থেকেও এটি একটি মানসম্পন্ন পুরস্কার। সবমিলিয়ে এ পুরস্কার তরুণ সমাজকে লেখায় আরো উদ্বুদ্ধ করছে। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : বাংলাদেশের আতিথিয়তা কতটা পছন্দ হয়েছে? জহর সেনমজুমদার : আতিথিয়তায় বাংলাদেশের বেশ সুনাম রয়েছে। এখানকার মানুষের মধ্যে মমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ অনেক বেশি। আমাদের সবাই খুব খাতির-যত্ন করেছেন। এখানকার খবার-দাবারও অনেক রুচি সমৃদ্ধ। তাছাড়া বাংলাদেশ তো আমারই দেশ। কারণ, আমার পূর্বপুরুষের ভিটা বরিশালে। তাই এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।  একুশে টেলিভিশন অনলাইন : আপনার কোনো বই বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কী? জহর সেনমজুমদার : এপার বাংলা থেকে আমার নতুন কোনো মৌলিক বই প্রকাশিত হয়নি। তবে এ বছরের একুশে গ্রন্থমেলায় কাগজ প্রকাশন আমার কাব্য সংকলন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করেছে। এখানে আমার অধিক জনপ্রিয় কবিতাগুলো স্থান পেয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনলাইন পরিবেশক রকমারি ডট কমেও আমার কয়েকটি কাব্য সমগ্র পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘মধ্যযুগের কাব্য স্বর ও সংকট’, ‘অপরূপ সমগ্র’, ‘প্রসবসমগ্র’, ‘সূর্যাস্তসমগ্র’ ও ‘অগ্নিসমগ্র’। বইগুলো কলকাতা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। শুনেছি এ বইগুলো বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। একুশে টিভি অনলাইন : আপনার ‘জীবনানন্দ ও অন্ধকারের চিত্রনাট্য’ শীর্ষক গ্রন্থটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। অনুভূতি কেমন? জহর সেনমজুমদার : আমার গ্রন্থ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শিখছে, এটা ভাবতেই গর্ব হচ্ছে। একজন লেখক কিংবা কবি চান, তার জ্ঞানাদর্শ সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়–ক। তরুণ সমাজ সম্মুখে পথ চলার সঠিক নির্দেশনা পাক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছাড়াও বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠনের সদস্যরা আমার কবিতা নিয়মিত পাঠ করছেন। সত্যিকারার্থে সবার এমন ভালোবাসায় আমার লেখক জীবন সার্থক বলে মনে হচ্ছে। একুশে টেলিভিমন অনলাইন : আপনার বেশ কিছু কবিতা আমি পড়েছি। এসব কবিতা পড়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে, আপনি সীমাবদ্ধ কালের গণ্ডিকে পেরিয়ে গেছেন। আপনার লেখায় অতিত-বর্তমান ও ভবিষ্যত- সময়ের এ তিন চক্রই প্রাধান্য পেয়েছে। এ বিষয়ে কিছু বলুন। জহর সেনমজুমদার : কবিতার মাধ্যমে আমি পুরো সময়চক্রকে আয়ত্ত্ব করতে চেষ্টা করেছি। অক্ষর বিন্যাস ও শব্দ চয়নেও অতিতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছি। অনেকেই আমার লেখার এ ধরনকে পছন্দ করছেন। তবে কেউ কেউ সমালোচনা করতেও ছাড়ছেন না। প্রকৃতপক্ষে একজন কবিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকবেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকেও নানা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই এ নিয়ে আক্ষেপ করার কিছু নেই। একুশে টেলিভিশন অনলাইন : কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে দুই বাংলার মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছেন কী? জহর সেনমজুমদার : স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কিছুটা পার্থক্য তো থাকবেই। এপার বাংলার লেখকদের মধ্যে প্রতিরোধী ধারা খুবই সক্রিয়। অন্যদিকে ওপার বাংলায় বৃদ্ধিবৃত্তিক চর্চাটা বেশি হচ্ছে। তবে দুই বাংলার লেখকরাই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তুলে ধরছেন। তাদের লেখনীতে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনচিত্র পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠছে।  

নির্মলেন্দু গুণের ৩টি প্রেমের কবিতা

শুধু তোমার জন্য   কতবার যে আমি তোমোকে স্পর্শ করতে গিয়ে গুটিয়ে নিয়েছি হাত-সে কথা ঈশ্বর জানেন। তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও কতবার যে আমি সে কথা বলিনি সে কথা আমার ঈশ্বর জানেন। তোমার হাতের মৃদু কড়ানাড়ার শব্দ শুনে জেগে উঠবার জন্য দরোজার সঙ্গে চুম্বকের মতো আমি গেঁথে রেখেছিলাম আমার কর্ণযুগল; তুমি এসে আমাকে ডেকে বলবে- `এই ওঠো, আমি, আ…মি…।` আর অমি এ-কী শুনলাম এমত উল্লাসে নিজেকে নিক্ষেপ করবো তোমার উদ্দেশ্যে কতবার যে এরকম একটি দৃশ্যের কথা আমি মনে মনে কল্পনা করেছি, সে-কথা আমার ঈশ্বর জানেন। আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য, আমার গায়ে জ্বর এসেছে তোমার জন্য, আমার ঈশ্বর জানেন- আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য। তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে, আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।       তোমার চোখ এতো লাল কেন?   আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক, শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য। বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাত পাখা নিয়ে কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না। আমি জানি এই ইলেকট্রিকের যুগ নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে। আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক- আমার জল লাগবে কিনা, আমার নুন লাগবে কিনা, পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরোও একটা তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা। এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি। আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন ভেতর থেকে আমার ঘরের দরোজা খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক। কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করুক- তোমার চোখ এতো লাল কেন?       পূর্ণিমার মধ্যে মৃত্যু   একদি চাঁদ উঠবে না, সকাল দুপুরগুলো মৃতচিহ্নে স্থির হয়ে রবে; একদিন অন্ধকার সারা বেলা প্রিয় বন্ধু হবে, একদিন সারাদিন সূর্য উঠবে না।   একদি চুল কাটতে যাব না সেলুনে একদিন নিদ্রাহীন চোখে পড়বে ধুলো। একদিন কালো চুলগুলো খ’সে যাবে, কিছুতেই গন্ধরাজ ফুল ফুটবে না।   একদিন জনসংখ্যা কম হবে এ শহরে, ট্রেনের টিকিট কেটে একটি মানুষ কাশবনে গ্রামে ফিরবে না। একদিন পরাজিত হবো।   একদিন কোথাও যাব না, শূন্যস্থানে তুমি কিম্বা অন্য কেউ বসে থেকে বাড়াবে বয়স। একদিন তোমাকে শাসন করা অসম্ভব ভেবে পূর্ণিমার রাত্রে মরে যাব।     [কবি পরিচিতি : পুরো নাম নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী। ১৯৪৫ সালের ২১ জুন তিনি নেত্রকোনার বারহাট্টায় জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক কবি হিসাবে খ্যাতিমান হলেও কবিতার পাশাপাশি চিত্রশিল্প, গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনীতেও তিনি স্বকীয় অবদান রেখেছেন। ১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ "প্রেমাংশুর রক্ত চাই" প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার কবিতায় প্রেম ও নারীর পাশাপাশি স্বৈরাচার বিরোধিতা ও শ্রেণীসংগ্রামের বার্তা ওঠে এসেছে। তার জনপ্রিয় কবিতাসমূহের মধ্যে রয়েছে- হুলিয়া, মানুষ, আফ্রিকার প্রেমের কবিতা, একটি অসমাপ্ত কবিতা ইত্যাদি।]   /ডিডি/

হুমায়ূন বিশেষজ্ঞ

আমাদের মশিউর ভাইকে শুধু ‘হুমায়ূনভক্ত’ বলেই বাক্য শেষ করা যাবে না। শেষ করলে সেটা হবে অন্যায়, অবিচার। সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে কী করতে হবে? ‘হুমায়ূনভক্ত’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ‘হুমায়ূনবিশেষজ্ঞ’ও বলতে হবে। এটা তার জোরালো দাবি। আর আমরা তার এই মামাবাড়ির আবদার টাইপের দাবি পূরণ করে আসছি ম্যালাদিন ধরে। তবে এই দাবি পূরণ করতে গিয়ে যা বুঝলাম তার সারমর্ম হচ্ছে, তিনি হুমায়ূনভক্তও নন, হুমায়ূনগবেষকও নন, হুমায়ূনবিশেষজ্ঞও নন। তিনি আসলে হুমায়ূনসমালোচক।            মশিউর ভাইয়ের সমালোচনার লক্ষবস্তু হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের কিছু বই। বইগুলো তিনি নিজের টাকা দিয়ে কিনেছেন, এমনটা ভুল করেও ভাবা যাবে না। হয় এগুলো বন্ধুদের কাছ থেকে এনে মেরে দিয়েছেন, না হয় এর-ওর কাছ থেকে গিফট পেয়েছেন। আর এই বইগুলোকেই যখন-তখন সহ্য করতে হচ্ছে তার সমালোচনার যন্ত্রণা। আমাদের একজন তো একদিন তাকে বলেই বসল হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে এই আজগুবি সমালোচনার দায়ে আপনাকে তিনি জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়তেন।            মশিউর ভাইয়ের সমালোচনার একটা বিশেষ স্টাইল আছে। স্টাইলটা মোটেই সুবিধার কোনো স্টাইল নয়। তবু এই স্টাইলটাকে তিনি চাপার জোরে ‘স্বকীয়তা’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। তো স্টাইলটা হচ্ছে, তিনি বইয়ের লেখা নিয়ে সমালোচনা করেন না। সমালোচনা করেন বইয়ের নাম নিয়ে। আসলে লেখা নিয়ে সমালোচনা করতে হলে তো পুরো বইটা পড়ে তবেই সমালোচনা করতে হবে। তার হাতে অত সময় কই? তাই নামের উপর দিয়েই কাজ চালিয়ে দেন। সাপও মরল, আবার লাঠিও আস্ত থাকল।            সেদিন ‘সবাই গেছে বনে’ বইয়ের নামটি নিয়ে একদম সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিলেন মশিউর ভাই। বললেন, তোমরাই বলো, সবাই যাওয়ার মতো বন কি এখন দেশে আছে? মানু সব বন ধংস করে ফেলেছে না? তবু বাদ দিলাম সেসব কথা। ধরলাম বনে গেলোই। কিন্তু সবাই বনে চলে গেলে বাড়িটা একেবারে খালি হয়ে গেল না? বাড়ি খালি রেখে সবার বনে যাওয়াটা কি ঠিক হলো? বাড়ির দারোয়ানটা অন্তত গেটে রেখে যেতে পারত! আমরা বললাম, দারোয়ান রেখে যায়নি, এমনটা কি কোথাও বলা আছে?               মশিউর ভাই বললেন, আলাদা করে বলা থাকতে হবে কেন? ‘সবাই গেছে বনে’ নামটা শুনে কী মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে দারোয়ানকেও প্যান্ট-শার্ট পরিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। এটা ঠিক নয়। কখন বাড়িতে চোর ডাকাত ঢোকে! উফ! নিজের বাড়ির প্রতি কেন যে মানুষের এই দায়িত্ববোধটুকু নেই! সবাই বনে যাওয়ার আগে দরজায় যে তালাটি মেরেছে, সেটি নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। মেড ইন চায়না তালা মেরে থাকলে কিন্তু সেটা খোলা চোরের জন্য ওয়ান টুর ব্যাপার।              ‘হিমু এখন রিমান্ডে’ নামটি নিয়ে বলতে গেলে নাক সিটকিয়েছেন মশিউর ভাই। তার বক্তব্য- এটা একটা কথা হলো? তিনি এতো বড় লেখক, তার উপন্যাসের নায়ককে রিমান্ডে নেওয়া হলো অথচ তিনি কোনো পদক্ষেপই নিলেন না। আরে বাবা, তার কি উচিত ছিল না হিমুকে রিমান্ডে নেওয়ার আগেই তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করা? তিনি তো থানায় একটা ফোন করলেই হিমুকে ছেড়ে দিত। ফোনের কলরেটও তো বেশি না। নাহ্, হিমুর প্রতি এই অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। অন্তত আমার মতো সচেতনরা তো মেনে নিতে পারেই না।               ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’ বইয়ের নাম নিয়েও তার সমালোচনার শেষ নেই। তার কড়া জিজ্ঞাসা-  মেঘ কোথায় যাবে? মেঘের কি শ্বশুরবাড়ি আছে যে বেড়াতে যাবে? নাকি খালুর বাড়িতে বেড়াতে যাবে? আর মেঘ নাকি বলেছে যাবো যাবো। মেঘের ভাবটা এমন যেন সে যেতে চাচ্ছে কিন্তু ব্যস্ততার জন্য যেতে পারছে না। মেঘের আবার ব্যস্ততা কিসের শুনি! মেঘ কি নয়টা-পাঁচটা অফিস করে? নাকি নিজের কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালায়? তাহলে কিসের ব্যস্ততা মেঘের? বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত না?              প্রায় প্রতিটা নাম নিয়ে সমালোচনা করেই মশিউর ভাই আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। আমাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো বিসিএসের ভাইভা বোর্ডের প্রশ্নের চেয়েও কঠিন মনে হয়। আর তিনি সেটা অনুমান করতে পারেন আমাদের হাবভাব দেখেই। এটাও অনুমান করতে পারেন, আমরা তাকে জবরদস্ত জ্ঞানী মনে করছি। মনে করছি, তার মতো জ্ঞানী সচরাচর জন্মায় না। আমাদের এই মনে করাটাকে পাকাপোক্ত করতে তিনি আবার ফিরে যান সমালোচনায়। টেনে আনেন ‘হিমুর মধ্য দুপুর’ নামটিকে।              চেয়ারে হেলান দিয়ে মোড়লের ভঙ্গিতে বসতে বসতে মশিউর ভাই বলেন, আমি বুঝতে পারছি না হিমুর প্রতি কেন এমন অবিচার করা হলো। মধ্য দুপুর মানে বোঝো? ঠাঠা রোদ। ছাতা মাথায় দিয়ে বাইরে বের হলেও চান্দি গরম হয়ে যায়। অথচ লেখক এই মধ্য দুপুরেও হিমুকে বাইরে বের করে দিয়েছেন ছাতা-টাতা ছাড়াই। তোমরা বইটার প্রচ্ছদের দিকে তাকাও। তাকালেই দেখবে হিমুর মাথায় কোনো ছাতা নেই। কেন, একটা ছাতা কিনতে আর কয় টাকাই বা লাগে! এখন আশি-পঁচাশি টাকায়ই কত ভালো ছাতা পাওয়া যায়! নতুন ছাতা তিনি না হয় না-ই কিনলেন। তার বাসায় তো নিশ্চয়ই পুরনো ছাতা ছিল। ফেরত দেওয়ার শর্তে হিমুকে একটা ছাতা দিলে কী হতো?            আবারও সেই বিসিএসের ভাইভা বোর্ডের প্রশ্ন। আমরা মাথা নত করে ফেলি। কিন্তু এইটুকু নততে খুশি হন না মশিউর ভাই। তিনি চান আমাদের মাথা নত হতে হতে একেবারে মাটিতে গিয়ে বাড়ি খাক। আর সেই ইচ্ছেতেই তিনি পরবর্তী প্রশ্নের ক্ষেত্র তৈরির জন্য চলে যান পরবর্তী সমালোচনায়। তার এবারের টার্গেট ‘দারুচিনি দ্বীপ’। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তিনি মুখটা পানসে বানিয়ে বললেন, মাংস আমিষ জাতীয় খাদ্য। কিন্তু সেই মাংস আমরা মাসে কয়দিন খাই?            আমরা বললাম, আপনিই বলেন। মশিউর ভাই বললেন, মাসে আমরা মাংস খাই একদিন বা দুইদিন। তাহলে আমরা দারুচিনি দ্বীপ দিয়ে করবোটা কী! দারুচিনি হচ্ছে গরমমসলা। এটা নিয়ে মাংস রান্না করে। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ নিয়ে না লিখে তিনি কাঁচা মরিচ দ্বীপ কিংবা গোলআলু দ্বীপ নিয়ে লিখতে পারতেন। কারণ, এই জিনিসগুলো আমাদের প্রতিদিন কাজে লাগে। সব খাবারে দিতে হয়। কাঁচা মরিচ দিয়ে আলুভর্তা বানিয়ে তো আমি রোজ খাই। কাঁচা মরিচে কিন্তু ভিটামিনও বেশি। ঠিক কিনা?              ভাইভা বোর্ডের এই প্রশ্নটা মনে হয় একটু সহজই হলো। আর এই সুযোগে আমাদের মুখপোড়া তৈমুর বলে উঠল, ভাই, আপনি যে বললেন কাঁচামরিচ আর গোলআলু নাকি সব খাবারে দিতে হয়, কথাটা কিন্তু ঠিক না। মনে করুন আপনার বাসায় লাচ্ছা সেমাই কিংবা পায়েস রান্না করল। সেখানে কি আপনি কাঁচা মরিচ আর গোলআলু দেবেন? দেওয়াটা কি উচিত হবে? তবু যদি দিয়েই ফেলেন, আপনার পরিবারের সদস্যরা কি ঘুষি মারার জন্য আপনার দিকে তেড়ে আসবে না?              প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন আসবে, এটা বোধ হয় ভাবতে পারেননি মশিউর ভাই। তাই তিনি একটা পরিপূর্ণ ঢোক গিলে বললেন, একটা গুরুত্বপূর্ণ কথার মধ্যে আরেকটা অপ্রাসঙ্গিক কথা ঢুকিয়ে দেওয়া খুবই অন্যায়। তোমরা ছোট মানুষ, জ্ঞান বুদ্ধি কম। কী আর বলবো। তবে ‘কী আর বলবো’ বললেও বলার বিষয় খুঁজে পেতে দেরি হলো না তার। তিনি কথা বলতে শুরু করলেন হুমায়ূন আহমেদের সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোথাও কেউ নেই’ নিয়ে। যা নাটক হিসেবেও প্রচারিত হয়েছে টিভিতে।            মশিউর ভাই ‘কোথাও কেউ নেই’ এর সমালোচনা করতে গিয়ে বললেন, সেই প্রাগৈতিহাসিক আমলের পরিবেশ নিয়ে কথা বললে তো চলবে না। সেই আমলে না হয় জনসংখ্যা কম ছিল, তাই কোথাও কেউ ছিল না। কিন্তু এখন সেই পরিবেশ নেই। এখন সব জায়গায় মানুষ গিজগিজ করে। ধরে নিলাম উপন্যাসটা অনেক আগের লেখা। আগে লেখা তো কী হয়েছে? রি-প্রিন্ট করার সময় নামটা পাল্টে দিলেই হতো। ‘কোথাও কেউ নেই’ এর পরিবর্তে লেখা যেত ‘সব জায়গায়ই কেউ না কেউ আছে’। এছাড়া...             মশিউর ভাইয়ের কথার গতিটা থামিয়ে দিয়ে সজীব বলল, কিন্তু ভাই, এই উপন্যাসে তো জনসংখ্যা নিয়ে কথা বলা হয়নি। তাহলে এই ধরনের নাম কেন দেওয়া হবে? এছাড়া আপনি এর আগে আরো যেসব সমালোচনা করলেন, সেগুলোও তো কেবল নাম নিয়ে। বইয়ের ভেতরে কী আছে সেটা না জেনে শুধু নাম নিয়ে মন্তব্য করাটা কি ঠিক? এবার খুব ভালোভাবেই ক্ষেপে গেলেন মশিউর ভাই- এই মিয়া, আমি কি তোমাদের মতো ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে চলি? আমাকে পুরো জিনিস পড়তে হবে কেন? আমার মতো জ্ঞানীর জন্য ইশারাই কাফি।             মশিউর ভাইয়ের এই হুম্বিতুম্বি দেখে আমি বললাম, ঠিকই বলেছেন ভাই, আপনার মতো জিনিয়াস লোককে পুরো বই পড়ে সমালোচনা করতে হবে কেন! তবে একটা অনুরোধ ভাই, আপনার এই জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা যাতে পুরো জাতি পড়তে পারে, তাই চাচ্ছিলাম সমালোচনাগুলো কোনো পত্রিকায় ছেপে দিতে। দেবো নাকি? মশিউর ভাই এবার গলার স্বর নামিয়ে বললেন, পত্রিকায় আমার সমালোচনা ছাপা হলে কি সেটা  হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের চোখে পড়বে? আমি বললাম, কেন বলেন তো?                মশিউর ভাই বললেন, না মানে তাদের চোখে পড়লে উল্টাপাল্টা সমালোচনা করার অপরাধে তারা আমার খবর করে দিতে পারে তো! আমি বললাম, তাহলে ধরে নেন তাদের চোখে পড়বে না। মনে করেন তারা বাসয় পত্রিকাই রাখে না। মশিউর ভাই বললেন, তাহলে ছাপতে পারো। তবে সমালোচনার জন্য তো বিল নিশ্চয়ই হয়? বলে দিও বিলটা যাতে ক্যাশে দেয়। ঠিক আছে?   লেখক : ইকবাল খন্দকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এ পর্যন্ত তার ৫৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পত্রিকায় লিখছেন। আগামী বইমেলায়ও তার কয়েকটি বই প্রকাশিত হবে।              /ডিডি/

ময়রা

এই ছেলের নাম বোঁদে কেন হল তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। বেঁটে মতোন দেখতে তাই বোঁদে, বোধবুদ্ধির বালাই নাই সে কারণে বোঁদে, কিংবা আরেকটু দুঃসাহসী হলে বলা যায়, সে অন্যের বাড়ি বয়ে গিয়ে মানুষের পাছায় বা পোঁদে বাঁশ প্রবিষ্ট করাতে বিশেষ দক্ষ বলে নিন্দুকেরা তার নাম দিয়েছে বোঁদে। আমার উদ্দেশ্য কারো নাম নিয়ে নামতাবিলাস নয়, বরং বোঁদের মতো মানুষ যে কেন বেঁচে আছে তাই নিয়ে ভাবছি। আমি নিশ্চিত, পুরো কাহিনি জানলে আপনিও সুখে-দুঃখে নির্বিকার দার্শনিকের মতো নিশ্চুপ বসে থাকতে পারবেন না।        টাঙ্গাইল যেতে এলেঙ্গা মোড়ে মনু ময়রার দোকানে সে কাজ করছে আট বছর। মনু ব্যবসা বোঝে। সে বেশ ভাল করেই জানে, আজকের বাজারে মাসে হাজার পাঁচেক দিয়েও বোঁদের মতো বিশ্বস্ত আর কর্মঠ লোক সে পাবে না। শুধু তাই নয়, রসগোল্লার পাক আর ছানার জিলিপির প্যাঁচ কষতে ওর মতো চৌকস আর কে আছে! মনুর দোকানের মিষ্টির স্বাদই আলাদা। দিনভর তার দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। নানান কিসিমের কাস্টমার মাছির মতো সারাক্ষণ ভনভন করে। মনু ময়রা ক্যাশ সামলাতে হিমশিম খায়। বাকি কাজ সব বোঁদেই করে থাকে। কেউ কেউ বলে, ওর হাতে নাকি জাদু আছে।       মনুর দোকানে সব রকম ক্রেতাসমাগম হয়। কাউকে সে নিরাশ করে না। লালমোহন, রসগোল্লা, মোহনভোগ, রসকদম, ছানার জিলিপি, ক্ষিরপুরি, মেওয়া-লাড্ডু, পানতুয়া, বালুশাহী, শাহীচুম্বন, কাঁচাগোল্লা এখানে সুলভে পাওয়া যায়। শুধু কি তাই, একেবারে নীচুতলার লোকেদের জন্য আছে বোঁদের বানানো ভেরি স্পেশাল এন্ড সস্তাদামের বোঁদে। বিশেষত রিকশাওয়ালা শ্রেণীর খদ্দেররা সকাল সকাল মনুর দোকানে এসে এক পেল্ট বোঁদের সাথে দুটো পরোটা মেরে দিয়ে কাজে বেড়িয়ে যায়।       সে গুটিগুটি বোঁদে বানাতে বিশেষ ওস্তাদ, এ কারণেও ওর নামকরণ ‘বোঁদে’ হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। সে যাই হোক, বোঁদের শ্রম-ঘাম আর নির্বুদ্ধিতাকে পুঁজি করে এই থানাশহরে বেশ রমরমা ব্যবসা ফেঁদেছে মনু ময়রা।     বোঁদের চেহারা মোটেও দৃষ্টিসুখকর নয়। বেঁটোখাটো গড়ন, খাঁদা নাক, গায়ের রঙ বেশ কালো। বাঁ পাটা খানিক ছোট তাই সামান্য খুঁড়িয়ে চলে বোঁদে। সস্তাদামের সিনথেটিক লুঙ্গিখানা ধুতির মতো মালকোঁচা মেরে ভোর ভোর কাজে নেমে পড়ে। বুদ্ধিটা অবশ্য মনুরই। লুঙ্গির খুঁট খোলা থাকলে পেলায় সাইজ জালায় ধরে রাখা মিষ্টির সিরকায় লোটাবে, নয়তো কাজের চাপে ওর ল্যাগবেগে বিশেষ যন্ত্রখানা বেরিয়ে পড়ে ডেঁপো ছেলে-ছোকরাদের গভীর কৌতুকের বিষয় হবে!      বলা বাহুল্য, শীত-গ্রীষ্ম সব সময় বোঁদের উর্ধ্বাঙ্গ খোলাই থাকে। চুলোর গনগনে আগুনে সে রীতিমতোঘামে, তাই শীতবোধ কী জিনিস বোঁদে জানে না। তাতে মনুর বরং খরচ বাঁচে। ফিবছর নতুন নতুন হাতঅলা গেঞ্জি কিনতে গুচ্ছের পয়সা খসাতে হয় না।    বোঁদে বোকা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। একবার এক ঘটনা ঘটলো। মনু ময়রা বেশি মুনাফার লোভে দুধে পাউডার মিশিয়ে দিয়েছিল। গ্রামের গরুসমাজ সবুজ ঘাসের দাবিতে দুধপ্রদান কমিয়ে দিল। তাই দুধে গুঁড়ো না মিশিয়ে উপায় কি! ব্যবসা তো আর বসিয়ে রাখা যায় না! বোঁদেকে সে বলে নি যে ব্যাপারটা যেন পাঁচ-কান না হয়। তাতে দোকানের সুনাম নষ্ট হবে, খদ্দের কমে যাবে।     কপাল এমনই, ঠিক সেদিন শহর থেকে বড়সায়েবরা এলেন এলেঙ্গা রিসর্টে বেড়াতে। বিবি সাহেবার মিষ্টি ভীষণ পছন্দ। বাতিক বলতে পারেন। ওসব ডায়েটফায়েট তার একদম চলে না। মিষ্টি চাই। ভাল মিষ্টি। মিষ্টি লিবেন সাব! মনু ময়রার দোকানে যান। ছিঃ ছিঃ কষ্ট করে যাবেন কেনে! আমিই বরং এত্তেলা পাঠাচ্ছি। দামের সাথে বাড়তি কিছু ধরে দিলেই হল। একজন বলল, এরা অনেকটা ছুঁচোর মতো। সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকে। মওকা বুঝে দালালি ফড়েগিরি করে বাড়তি দু’পয়সা কামায়।    সায়েব বিবিকে নিয়ে মনুর দোকানে হাজির। শহুরে কাস্টমার পেয়ে সে ভীষণ খুশি। হাঁকুনি পেড়ে বলল, এই বোঁদে, ভাল দেখে কিলোপাঁচেক মিষ্টি প্যাক করে দে তো! সায়েব বহুত দূর থেইক্কা আইছেন।    মনু খুশি তো বোঁদেও খুশি। এজন্যই লোকে তারে বোকা বলে! আরে হাঁদারাম, মিষ্টির দোকান দিয়ে মনুর দুই-তিনতলা বাড়ি হল, চেহারায় চটক এলো, তার বউ বাচ্চা বিয়োলো, তোর কী হল রে বেকুব! তুই ক্যান ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার লাহান দুই পা তুলে নাচস!    সে যে যাই বলুক, বোঁদে নিমকহারাম নয়। যার নুন সে খায়, তার গুণ গাইতে বোঁদে মোটেও কসুর করে না। মনু তার মা-বাপ। মনু ময়রা আছে বলেই না সে বেঁচে আছে। নইলে কবেই আচমকা আষাঢ়ের বেনোজলে ভেসে যেত!       কি রে, দুধ খাঁটি তো, নাকি পানি মিশিয়েছিস! সাহেব বললেন। মনু ময়রা এক বিঘত জিভ কেটে বলল, ছিঃ ছিঃ সাব, এ কি বলছেন! আপনারে জাইনা-শুইনা আমি ভেজাল জিনিস দিমু! এক্কেবারে খাঁটি দুধ সায়েব। এট্টুও মিশাল নাই।      বোকা বোঁদে সোৎসাহে মালিকের কথার পিঠে বলে, সে কি কতা স্যার! ভেজাল কেনে দিবো! আমার মালিক খুব সজ্জন মানুষ। দুধে সুস্বাদু গুঁড়া মিলাইয়া মিষ্টিতে বাহার আনছেন। লিয়ে লন সাব। বাসায় গিয়া চেটেপুটে খাইবেন!   অ্যাঁ, কী বললে! গুঁড়া মিলাইছে! পাউডার মিল্ক! হারামজাদা! তোদের ধরে পুলিশে দেয়া উচিত। দুধেও ভেজাল! শালা, দেশটা ভেজালে ভেজালে সয়লাব হয়ে গেল! মিষ্টি না নিয়ে বরং জেলের ভয় দেখিয়ে সায়েব চলে গেলেন।      এর পরের ঘটনা খুব সহজেই অনুমেয়। মনু মালিক, বোঁদে চাকর। বোঁদের বোকামোর জন্য তার চরম বেইজ্জতিই শুধু না, পাঁচকিলো মাল দোকানে পড়ে থাকলো। এই রাগে ওর চুলে মুঠি ধরে ইচ্ছেমতো ঝাঁকালো মনু। শালা বোকার হদ্দ! তোর মতো আচ্ছা বেকুবের পাল্লায় পড়ে আমার সব গোল্লায় যাবে রে! ভিটেয় ঘুঘু চরবে!    এই আমাদের বোঁদে। এলেঙ্গা রোডের মনু ময়রার দোকানের খাস কামলা। দিনভর মিষ্টির মাঝে থেকেও যার জীবনে তেতোস্বাদ একটু গেল না। এমনই আসলে হয়! ভারবাহী গাধা জীবনভোর চিনির বস্তা বয়েই যায়, একদানা চিনি কখনও চেখে দেখার ফুরসত পায় না।      সময়ের সাথে সাথে বোঁদের জীবনে পরিবর্তন আসে। তবু তার পেশাবদল হয় না। মনু ময়রা কাঁচাটাকা চুষে-চিবিয়ে দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে, বোঁদেও বাড়ছে। তবে আখেরে নয়, স্রেফ ঘাড়েগর্দানে। বোঁদে ইদানিং কেমন যেন উরু উরু, কাজেকর্মে মন নেই তার। মনু বুঝতে পারে, প্রকৃতির নিয়মে ওর এখন নারীর ছোঁয়া চাই। তলানি মিষ্টি আর মুখে রোচে না বোঁদের।   মনু ময়রা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, কি রে বোঁদে, বিয়ে করবি! মন বড় উচাটনঅইছে, তাই না রে! জানিস তো, ঘর বাঁধতে দড়ি, আর বিয়ে করতে কড়ি লাগে! কত জমিয়েছিস? তাতে হবে!     বোঁদেও হাসে। মনে মনে সে মনিবের তারিফ করে। মনু তার মনের কথা ধরে ফেলেছে। লোকটা অন্তর্যামী নাকি! বুঝলো কি করে বোঁদের এবার বউ চাই!    ঠিক আছে, হবে! তুই মেয়ে দ্যাখ। আমি তোর বিয়ের খরচ দেব, মনু বলল। তবে একখান শর্ত আছে। বিয়ার পর কিন্তু বউরে নিয়া ভাগবার পারবি না। আমার দোকানে তোর কাম করতে আইবো। কিচ্ছু ভাবিস না, মিঞা-বিবির সংসারে যাতে চোট না লাগে সেইমত টেকা বাড়াইয়া দিমু। তুই আমার আপন লোক বোঁদে। তোরে কি আমি কষ্টে রাখতে পারি! মনু ময়রা যেন দয়ার সাগর, বিনয়ের অবতার! এই না হলে মনিব। ভীষণ খুশি বোঁদে।     খুব একটা খুঁজতে হয় না। মেয়ে পাওয়া যায় সহজেই। গাঁও গেরামে সোমস্ত মেয়েকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো বাপ আর কই! ছেলের পিছে খরচ করলে বেশি লাভ। বুড়ো বয়সে ছেলেরাই দেখে। মেয়ে থাকে তার সোয়ামির সংসারে!      যথাসময়ে মনু ময়রার চেষ্টা তদবিরে বোঁদের বিয়ে হয়। মেয়ের নাম খুশি। স্বভাবে একটু চাপা, তবে চেহারা মন্দ নয়। গায়ে গতরে আছে, পেটে বিদ্যেও একেবারে খালি নয়। সেভেন ক্লাস অব্দি পড়েছে খুশি। বোঁদে খুশি, ওর বউ খুশিও খুশি।     বোঁদের কাজে এখন আগের চেয়ে ঝোঁক বেশি। মনু ময়রার প্রতি তার কৃতজ্ঞতার যেন শেষ নেই। নিজের ছেলের মতো দাঁড়িয়ে থেকে মনু তাকে বিয়ে করিয়েছে। ছাতি-লাঠি, হাতঘড়ি, দুপাখি জমিও সে পেয়েছে শ্বশুরের তরফে। সম্বন্ধী বলেছে, খুশির সাথে আচরণ ভাল করলে বোঁদের চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে ভিটের উপর ঘরও একখানা বঁধিয়ে দেবে। তাছাড়া অবরে-সবরে কলাটা-মুলোটা তো থাকছেই।   যাচ্ছলে! ভাগ্য বোঁদের ভালই বলতে হবে। এ যেন রাজ্যসহ রাজকন্যে!        দিন ভালই যাচ্ছিল। মনু ময়রার নোকর হয়ে কেটে যাচ্ছে বোঁদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু খুশি স্বভাবে চাপা হলেও আখের গোছাতে জানে। একরাতে রিরংরাজনিত ক্লান্তি কেটে গেলে খুশি ওর গলা জড়িয়ে বলল, দেখো বোঁদে, পরের দোকানে জনমভর খাটবে এ কিন্তু আমার ইচ্ছে নয়। আড়ালে-আবডালে লোকে আমারে গাধি বলে! তুমি যে গাধার মতো পরের বোঝা বয়ে বেড়াও!    তুমি কী বলবার চাও খুশি? বোঁদে বাধ্য ছেলের মতো বউয়ের গলা জড়ায়। বটবৃক্ষের ন্যায় পায়ে পায়ে শিকড় বেঁধে পুনর্বার ডানা ঝাঁপটায়। নারীতে উপগত হয়ে ক্রমাগত ক্রিয়াশীল হয়। এ এক অন্য রকম শিহরণ। অল্পতে তেষ্টা মেটে না! বারবার ভেজাতে মন চায়।       তুমি নিজে একখান দোকান দিলে হয় না! কাজকাম তো ভালই জানো। খুশি বোঁদেকে গভীর আশ্লেষে বেঁধে ওর ঘেমো বুকে মুখ ঘষতে থাকে। এও নারীর এক কলা বৈ কি! পুরুষের কাছে নিজেকে অত্যাবশ্যক প্রমাণের মোক্ষম সময়! শ্রেণী, শিক্ষা বা দেহমাধুর্য নির্বিশেষে নারীকুল এ কৌশল বোধ করি বেশ ভালই জানে! রীতিমতো পারঙ্গম!      কিন্তু পয়সা কোথায় পাবো! মেলা পুঁজি লাগে দোকান দিতে! বোঁদে নিজের স্ত্রীকে অক্ষমতার জানান দেয়। এত টাকা তার নেই। হবেও না কোনদিন! তাই নিজে দোকান দেবার কথা সে স্বপ্নেও ভাবে না।   খুশি এত সহজে নিরাশ হয় না। সে কলাবতী মেয়ে। উদ্দেশ্য হাসিলের সব রকম কলাকৌশল তার জানা!         খুশি বোঁদের পুরুষ্টু ঠোঁটে আগ্রাসী ছোবল মেরে বলল, সে ভার আমার। তুমি জায়গা দেখো। দোকান তোমার হবেই হবে।      এরপর আরো কিছুদিন যায়। খুশিকে নিয়ে কানাঘুষো শোনা যায়। গাঁয়ের মাতব্বর রমজান আলী মনু ময়রার পার্মানেন্ট কাস্টমার। প্রায়ই সে মনুর দোকানে এসে গোপালভোগ চাখে। বোঁদের সাথে খোশমেজাজে বাতচিৎ করে। যেন সম্পর্কে তারা ভায়রাভাই। এই মাতব্বরকে ঘিরেই কানাঘুষোর জাল বিস্তৃত হয়। কানেমুখে কথাটা মনু ময়রার কানেও পৌঁছায়। আর যাই হোক, সে বোঁদের খারাপ চায় না।    একদিন বোঁদেকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, বোঁদে, তুই শুনিস নি কিছু? চিরকাল তুই বেকুবই রয়ে গেলি! বোকা গাধা কোথাকার!     বোঁদে ফ্যালফেলে চোখে তাকায়। সত্যিই সে কিছু বুঝতে পারে না। মনু অবশ্য এর বেশি ভাঙে না। বেচারা বোঁদে কষ্ট পাবে। বোকাসোকা মানুষ! ঘটে যার বুদ্ধি আছে তার জন্য ইশারাই কাফি। খোঁটাপিটা খেয়ে দিব্যি শুধরে যায়। কিন্তু বেকুব বোঁদের কোন রকম বোধোদয় হয় না। খুশিকেন্দ্রিক ফিসফিসানি আরো জোরালো হয়। তবে বিষয়টা এমন যে হাঁক পেড়ে কাউকে বলাও যায় না। আর পেছনে যদি মাতব্বর খোদ রমজান আলী থাকে তবে তো কোন কথাই নেই!   শুধু রমজান কেন, শোনা যায়, পাশগ্রামের টাকাঅলা দু’চারজনেরও খুশির ঘরে অবাধ যাতায়াত! শালা বোঁদে এসব চোখে না দেখুক, শুনতে তো পায় নাকি! অকালকুষ্মাÐ একটা!           পাড়ার ডেঁপো ছেলেরা এ বিষয়ে রসের ঝাঁপি খুলে বসে। কিন্তু যাকে নিয়ে এতসব কাÐ সেই খুশির কিন্তু কোন হেলদোল নেই। সে দিব্যি আছে। বোঁদেও কিছু খারাপ নেই।             মনু ময়রা শেষমেশ স্বীকার করে, বোঁদের মতো মহাবেকুব মানুষ যে জীবনে দেখে নি! নিজের বউকেও সে বশে রাখতে পারে না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তারপরও ব্যাটা মফিজ কোন স্টেপ নিল না! বলি হারি যাই ওর খুশিপ্রেম! প্রেমে অন্ধ একেবারে! কানামোনা যাকে বলে!    কিন্তু তখনও বোধ হয় গাঁয়ের মানুষের জানার কিছু বাকি ছিল। মনু ময়রার ঘোরতর শত্রæ গোপনে কোথাও বেড়ে উঠেছে সে খবর মনু রাখছে কি!     ঠিক ছ’মাস বাদে এক সকালে বোঁদে বলল, আমি আর কাজ করুম না ভাই। নিজে দোকান দিমু। মনু ময়রা বোধ হয় ‘দেশে আর কোনদিন লোডশেডিং হবে না’ শুনলেও এতটা আশ্চর্য হতো না! বোঁদে এ কী বলছে!   মনু শ্লেষ্মারুদ্ধ ঘর্ঘরে স্বরে বলল, পেট গরম হয়েছে তোর! নাকি ভূত দেখেছিস! দোকান দিবি, টাকা  পাবি কোথায়!  সে আমার আছে। বোঁদে জানালো। সে আরো জানায়, দোকানের জায়গা কেনা হয়ে গেছে। শহর থেকে মিষ্টি সাজানোর র‌্যাক, রেকাবি, খামির-খুন্তি, হাঁড়িপাতিল-কড়া আসছে খুব শিগগিরই। এ কাজে খুশি ওর সহযোগী হবে।      মনু ময়রার চোখে পলক পড়ে না। বুঝতে পারে, বোঁদে এবার সত্যি মালিক হবে। দোকান মালিক! পেছনে কেরামতি কার! ভ্রষ্টা কলাবতী খুশির!      মনু তবু রহস্যপাঠের শেষ চেষ্টা করে। আন্তরিক সুরে বলে, বোঁদে, তুই টাকা কোথায় পেলি, সত্যি করে বল তো! মাইরি বলছি, আমি তোর খদ্দেরে ভাগ বসাবো না।        বোঁদে কিছু বলে না। মিটিমিটি হাসে। যেন বোঝাতে চায়, তোমরা যতটা বোকা আমাকে ভেবেছো, ততটা কিন্তু নই। এবার নিজের ব্যবসা সামলাও মনু। খুশি তোমার দোকান চৌপট করে দেবে। সে ব্যবসা বোঝে। একই প্লেটে হাজার লোক খেলে যদি তা নষ্ট না হয়, খুশি কেন হবে! ব্যবহারের আগে ভাল করে ধুয়ে নিলেই হয়! এমন কত হচ্ছে! কেবল টের পেলেই দোষ!      বোঁদে হাসে। হাসতেই থাকে! নির্মল নিপাট হাসি!   /ডিডি/

ছেলেবেলায় কবিতা লেখা শিখতে চাননি হুমায়ূন আহমেদ!

সাধারণ মানুষের জানার আগ্রহ থাকে তাদের প্রিয় কবি সাহিত্যিকরা ছেলেবেলায় কি হতে চাইতেন। বিশেষ করে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা আরও প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। তেমনি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম দিকপাল প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ ছেলেবেলায় কি হতে চেয়েছিলেন এ নিয়ে অনেকের আগ্রহের কমতি নেই। ওই সময়ের একজন কবি তাকে কবিতা লিখা শিখিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আর এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই না। অর্থাৎ তার কবিতা লিখার ইচ্ছে ছিল না ওই সময়ে এমনটিই জানা যায় তার ‘আমার ছেলেবেলা’ নামক বইয়ের সাহিত্য বাসর অধ্যায়ে। সাহিত্য বাসর অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন - বাবার অসংখ্য বাতিকের একটি হল-সাহিত্য-বাতিক। মাসে অন্তত দু’বার বাসায় ‘সাহিত্য বাসর’ নামে কী যেন হত। কী যেন হত বলছি এই কারণে যে, আমরা ছোটরা জানতাম না কী হত। আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সাহিত্য চলাকালীন আমরা হৈ চৈ করতে পারতাম না, উঁচু গলায় কথা বলতে পারতাম না, শব্দ করে হাসতেও পারতাম না। এর থেকে ধারণা হত, বসার ঘরে তাঁরা যা করছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে একদিন খানিকটা শুনলাম। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হল। একজন খুব গম্ভীর মুখে একটা কবিতা পড়ল। অন্যরা তার চেয়েও গম্ভীর মুখে শুনল। তারপর কেউ বলল, ভালো হয়েছে, কেউ বলল মন্দ এই নিয়ে তর্ক বেধে গেল। নিতান্তই ছেলেমানুষী ব্যাপার। একদিন একজনকে দেখলাম রাগ করে তার লেখা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। অম্নি দু’জন ছুটে গেল তাকে ধরে আনতে। ধরে আনা হল। বয়স্ক একজন মানুষ অথচ হাউমাউ করে কাঁদছে। কী অদ্ভুদ কাণ্ড! কাণ্ড এখানে শেষ হয় না। ছিঁড়ে কুচিকুচি করা কাগজ এরপর আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হতে লাগল। সেই লেখা পড়া হল, সবাই বলল, অসাধারণ এই হচ্ছে বাবার প্রাণপ্রিয় সাহিত্য বাসর। সারাটা জীবন তিনি সাহিত্য সাহিত্য করে গেলেন। কতবার যে তিনি ঘোষণা করেছেন, এবার চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি সাহিত্যে মনোনিবেশ করবেন! চাকরি এবং সাহিত্য দুটো একসঙ্গে হয় না। ট্রাংকে বোঝাই ছিল তাঁর অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। গল্প কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ। থরেথরে সাজানো। বাবার সাহিত্যপ্রেমের স্বীকৃতি হিসেবে আমাদের বসার ঘরে বড় একটা বাঁধানো সার্টিফিকেট ঝোলানো, যাতে লেখা- ‘ফয়জুর রহমান আহমেদকে সাহিত্য সুধাকর উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।’ এই উপাধি তাঁকে কারা দিয়েছে, কেন দিয়েছে কিছুই এখন মনে করতে পারছি না। শুধু মনে আছে বাঁধানো সার্টিফিকেটটির প্রতি বাবার মমতার অন্ত ছিল না। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিফলকে আমি এই উপাধি এবং শোকগাথায় রবীন্দ্রনাথের দু’লাইন কবিতা ব্যবহার করি। দূরদূরান্ত থেকে কবি-সাহিত্যকদের হঠাৎ আমাদের বাসায় উপস্থিত হওয়া ছিল আরেক ধরনের ঘটনা। বাবা এঁদের কাউকে নিমন্ত্রণ করে আনতেন না। তাঁর সামর্থ্য ছিল না, তিনি যা করতেন তা হচ্ছে মনিঅর্ডার করে তাঁদের নামে পাঁচ টাকা বা দশ টাকা পাঠিয়ে কুপনে লিখতেন- জনাব, আপনার…কবিতাটি…পত্রিকার…সংখ্যায় পড়িয়া মনে বড় তৃপ্তি পাইয়াছি। উপহার হিসেবে আপনাকে সামান্য কিছু অর্থ পাঠাইলাম। উক্ত অর্থ গ্রহণ করিলে চির কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ থাকিব। ইতি প্রতিভামুগ্ধ- ফয়জুর রহমান আহমেদ (সাহিত্য সুধাকর) ঐ কবি নিশ্চয়ই তাঁর কাব্যের জন্য নানান প্রশংসাবাক্য শুনেছেন, কিন্তু মনি অর্ডারে টাকা পাওয়ার ব্যাপারটা না ঘটারই কথা। প্রায় সময়ই দেখা যেত, আবেগে অভিভূত হয়ে যশোর বা ফরিদপুরের কোনো কবি বাসায় উপস্থিত হয়েছেন। এমনিভাবে উপস্থিত হলেন কবি রওশন ইজদানী। পরবর্তীকালে তিনি খাতেমুন নবীউন গ্রন্থ লিখে আদমজী পুরস্কার পান। যখনকার কথা বলছি তখন তাঁর কবিখ্যাতি তেমন ছিল না। আমার পরিষ্কার মনে আছে, লুঙ্গি-পরা ছাতা-হাতে এক লোক রিকশা থেকে নেমে ভাড়া নিয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন। জানলাম, ইনি বিখ্যাত কবি রওশন ইজদানী। আমাদের বল দেওয়া হল যেন হৈ চৈ না করি, চিৎকার না করি। ঘরে একজন কবি বাস করছেন। কবিতা লেখার মুডে থাকলে ক্ষতি হবে। দেখা গেল, কবি সারা গায়ে সরিষার তেল মেখে রোদে গা মেলে পড়ে রইলেন। আমাকে ডেকে বললেন- এই মাথা থেকে পাকা চুল তুলে দে। কবি-সাহিত্যিকরা আলাদা জগতে বাস করেন, মানুষ হিসেবে তাঁরা অন্যরকম বলে যে প্রচলিত ধারণা আছে কবি রওশন ইজদানীকে দেখে আমার মনে হল ঐ ধারণা ঠিক না। তাঁরা আর দশটা মানুষের মতোই, আলাদা কিছু না। আমার আদর-যত্নে, খুব সম্ভব পাকা চুল তোলার দক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে তিনি আমাকে একদিন ডেকে বললেন, খাতা-কলম নিয়ে আয়, তোকে কবিতা লেখা শিখিয়ে দিই। আমি কঠিন গলায় বললাম, আমি কবিতা লেখা শিখতে চাই না। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, তাহলে কি শিখতে চাস? কিছুই শিখতে চাই না। আসলেই তা-ই। শৈশবে কারওর কাছ থেকে আমি কিছুই শিখতে চাইনি। এখনও চাই না। অথচ আশ্চর্য, আমার চারপাশে যাঁরা আছেন তাঁরা ক্রমাগত আমাকে শেখাতে চান।‘জানবার কথা’ নামের একটি বই শৈশবেই ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেলেছিলাম এই কারণেই। এসএইচ/ডব্লিউএন

জন্মদিনের উপহারের লোভ ঘুমুতে দিতো না হুমায়ূনকে

প্রতিটি মানুষের ছেলেবেলা আছে। হোক সে বিখ্যাত বা অখ্যাত। বিশেষ করে বিখ্যাত বা প্রতিথযশা মানুষদের জীবনী সম্পর্কে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। তেমনি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের ছেলেবেলা নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই পাঠকের। ছেলাবেলার স্মৃতি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিজেই লিখে গেছেন ‘আমার ছেলেবেলা’ নামক বইটি। এ বইটির মাধ্যমেই জানা যায় তার ও তার ভাই-বোনদের ছেলেবেলা। তার প্রথম জন্মদিন উদযাপনের কাহিনী। জানা যায় তার ছেলেবেলার ছোট ছোট অনুভূতির কথা। ১৯৪৮ সালের এ দিনে সবার প্রিয় এ লেখক জন্ম নিয়েছিলেন। তার জন্মদিনকে ঘিরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা আয়োজন করেছে। তার জন্মদিন পালনের বেশ আগ্রহ ছিলো। প্রথমবারের মতো জন্মদিন উযদাপন করা হয় তার আগ্রহেই। পারুল নামে একজনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের ছোটবেলায় সখ্য গড়ে উঠে। তারা তাদের প্রতিবেশি ছিল। কিন্তু একদিন ওই প্রতিবেশীরা অন্য জায়গায় চলে যান। এ নিয়ে মন খারাপ হয়ে যায় তার। আমার ছেলেবেলায় হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন- পারুল আপা নেই, কাজেই স্কুলের দুঃসহ দুঘণ্টা কোনোক্রমে পার করে দেবার পরের সময়টা মহানন্দের। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‌‌‌‘কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা’। সাজানো গোছানো সুন্দর বাড়ি দেখলেই হুট করে ঢুকে পড়ি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তৎক্ষণাৎ বের করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি বাড়িতে ভিন্ন ব্যাপার হল। এই বাড়িটিও মীরাবাজারেই। আমাদের বাসার কাছে। বিশাল কম্পাউন্ড, গাছগাছালিতে ছাওয়া ধবধবে সাদা রঙের বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি। এই বাড়িতে কে থাকনে তাও আমরা জানি, সিলেট এম. সি. কলেজের অধ্যাপক। আমাদের কাছে তাঁর পরিচয় হচ্ছে প্রফেসর সাব, অতি অতি অতি জ্ঞানী লোক-যাঁকে দূর থেকে দেখলেই পূণ্য হয়। তবে এই প্রফেসর সাহেব নাকি পাকিস্তানে থাকবেন না, দেশ ছেড়ে কলকাতা চলে যাবেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নাকি চাকরিও হয়েছে। তিনি চেষ্টা করছেন বাড়ি বিক্রির। এক দুপুরে গেট খোলা পেয়ে হুট করে সেই বাড়ির ঢুকে পড়লাম। গাছপালার কী শান্ত শান্ত ভাব। মনে হয় ভুল করে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এক বাড়ির বাগানে ঢুকে পড়েছি। আনন্দে মন ভরে গেল। একা একা অনেক্ষণ হাঁটলাম। হঠাৎ দেখি কোনোর দিকের একটি গাছের নিচে পাটি পেতে একটি মেয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার হাতে একটা বই। সে বই পড়ছে না- তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি আমার জীবনে এত সুন্দর মেয়ে আর দেখিনি। মনে হলো তার শরীর সাদা মোমের তৈরি। পিঠভরতি ঘন কালো চুল। ষোলো-সতেরো বছর বয়স। দৈত্যের হাতে বন্দিনী রাজকন্যারাও এত সুন্দর হয় না। মেয়েটি হাত-ইশারায় ডাকল। প্রথমে ভাবলাম দৌড়ে পালিয়ে যাই। পর মুহূর্তেই সেই ভাবনা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে গেলাম। কী নাম তোমার খোকা? কাজল। কী সুন্দর নাম!কাজল। তোমাকে মাখতে হয় চোখে। তা-ই না? কিছু না বুঝেই আমি মাথা নাড়লাম। অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছি, তুমি একা একা হাঁটছ। কী ব্যাপার? আমি চুপ করে রইলাম। কী জন্য এসেছ এ বাড়িতে? বেড়াতে। ও আচ্ছা- বেড়াতে? তুমি তাহলে অতিথি। অতিথি নারায়ণ। তা-ই না? আবার না বুঝে আমি মাথা নাড়লাম। সে বলল, তুমি এখানে চুপচাপ দাঁড়াও। নড়বে না। আমি আসছি। মেয়েটি চলে গেল। ভেবে পেলাম না সে অনধিকার প্রবেশের জন্যে শাস্তির ব্যবস্থা করতে গেল কি না। দাঁড়িয়ে থাকাটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে? পালিয়ে যাওয়াই উচিত। অথচ পালাতে পারছি না। মেয়েটি ফিরে এসে বলল, চোখ বন্ধ করে হাত পাতো। আমি তা-ই করলাম। কী যেন দেয়া হল আমার হাতে। তাকিয়ে দেখি কদমফুলের মতো দেখতে একটা মিষ্টি। খাও, মিষ্টি খাও। মিষ্টি খেয়ে চলে যাও। আমি এখন পড়াশোনা করছি। পড়াশোনার সময় কেউ হাঁটাহাঁটি করলে বড় বিরক্তি লাগে। মন বসাতে পারি না।   আমি চলে এলাম এবং দ্বিতীয় দিনে আবার উপস্থিত হলাম। আবার মেয়েটি মিষ্টি এনে দিল। কোনো সৌভাগ্যই একা একা ভোগ করা যায় না। আমি তৃতীয় দিনে আমার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত। মেয়েটি মিস্মিত হয়ে বলল, এ কে? আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, এ আমার ছোট বোন। এ-ও মিষ্টি খুব পছন্দ করে। মেয়েটির মুখে মৃদু হাসি খেলে গেল। সে হাসতে হাসতে বলল, খুকি, তোমার নাম কী?  আমার বোন উদ্বিগ্ন চোখে আমার দিকে তাকাল। নাম বলাটা ঠিক হবে কি না সে বুঝতে পারছে না। আমি ইশারায় তাকে অভয় দিতেই সে বলল, আমার নাম শেফু। শেফু? অর্থাৎ শেফালি। কী সুন্দর নাম! তোমরা দু’জন চোখ বন্ধ করে দাঁডিয়ে থাকো। আমরা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। আজ অন্য দিনের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। এক সময় চোখ মেললাম। মেয়েটি সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ বিষন্ন। সে দুঃখিত গলায় বলল, আজ ঘরে কোনো মিষ্টি নেই। তোমাদের জন্য একটি বই নিয়ে এসেছি। খুব ভালো বই। বইটা নিয়ে যাও। দাঁড়াও, আমার নাম লেখে দিই। সে মুক্তার মতো হরফে লিখল, দু’জন দেবশিশুকে ভালোবাসা ও আদরে- শুক্লাদি। বই নিয়ে বাসায় ফিরলাম। বইটার নাম ‌ক্ষীরের পুতুল। লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাতায় পাতায় ছবি। তিনি ওই বইয়ের পদ্মপাতার জল নামক অংশে লিখেছেন- আমাদের পাশের বাসায় থাকত নাদু দিলুরা। তারাও আমাদের মতোই অল্প আয়ের বাবা-মা’র পুত্র-কন্যা। সবাই একসঙ্গে ধুলোমাটিতে গড়াগড়ি করে বড় হচ্ছি। ওমা! একদিন শুনি ওরা বড়লোক হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে ওদের কাপড়চোপড় পাল্টে গেল। কথাবার্তার ধরন-ধারণও বদলে গেল। এখন আর ওরা দাঁড়িয়াবান্দা কিংবা ছি-বুড়ি খেলার জন্যে আমাদের কাছে আসে না। ঈদ উপলক্ষে ওরা নতুন কাপড় তো পেলই, সেই সঙ্গে ট্রাই সাইকেল। ট্রাই সাইকেলটি শিশুমহলে বিস্ময়ের সৃষ্টি করল। আমিও এর আগে এই জিনিস দেখিনি। কী চমৎকার ছোট্ট একটা রিকশা। এর মধ্যে আবার বেলও আছে। টুং টুং করে বাজে। এই বিস্ময়কর বাহনটিতে একবার শুধু চড়তে পারার দুর্লভ সৌভাগ্যের জন্যে আমি তখন আমার সমস্ত পৃথিবী দিয়ে দিতে পারি। চেষ্টা করে বিফল হলাম। সব সময় নাদু দিলুর সঙ্গে একজন কাজের মেয়ে থাকে। আমি কাছে গেলেই সে খ্যাঁক করে ওঠে। হাত দিয়ে একটু দেখার অনুমতি চাইলাম, সেই অনুমতিও পাওয়া গেল না। আমরা শিশুরা সমস্ত কাজ-কর্ম ভুলে ট্রাই সাইকেল ঘিরে গোল হয়ে বসে রইলাম। অনেক চিন্তা করে দেখলাম ট্রাই সাইকেল কেনার কথা বাবাকে কি বলা যায়? মনে হলো সেটা ঠিক হবে না। বাবার তখন চরম আর্থিক সমস্যা যাচ্ছে। তাঁর সবচেয়ে আদরের ছোট বোন অসুস্থ। সেই বোনের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার তাঁর বহন করতে হচ্ছে। ঈদে আমরা ভাই-বোনেরা কোনো কাপড়চোপড় পাইনি। শেষ মুহূর্তে বাবা আমাদের তিন ভাইবোনকে তিনটা প্লাস্টিকের চশমা কিনে দিলেন, যা চোখে দিলে আশপাশের জগৎ নীল বর্ণ ধারণ করে। কাপড় না পাওয়ার দুঃখ রঙিন চশমায় ভুললাম। তার চেয়েও বড় কথা, দিলু এই চশমার বিনিময়ে আমাকে তার ট্রাই সাইকেল খানিকটা স্পর্শ করার দুর্লভ সুযোগ দিল। সে বড়ই আনন্দময় অভিজ্ঞতা। যতই দিন যেতে লাগল, এদের রমরমা সমসমা বাড়তেই লাগল। শুনলাম তাদের জন্যে বিশাল দোতলা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। বাড়ি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম কষ্টে-সৃষ্টে এখানেই থাকবে। এর মধ্যে এ দুই ভাইবোনের জন্মদিন হলো। জন্মদিন বলে যে একটা ব্যাপার আছে আমার জানা ছিল না। এই দিনে উৎসব হয়। খানাদানা হয়। উপহার নিয়ে লোকজন আসে কে জানত। আমরা অভিভূত। শেফু একদিন বাবাকে গিয়ে বলল, আমার জন্মদিন করতে হবে। বাবা খানিকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ঠিক আছে মা, করা হবে। কিন্তু শুধুই একবার। এই উৎসব আমি দ্বিতীয়বার করব না। তোমরা বড় হওয়ার চেষ্টা করো। অনেক বড়, যাতে সারা দেশের মানুষ তোমাদের জন্মদিনের উৎসব করে। বাবা-মা’র করতে না হয়। শেফু বলল, সে প্রাণপণ চেষ্টা করবে বড় হওয়ার। আমি দেখলাম সুযোগ ফসকে যাচ্ছে। শুধু শেফুর জন্মদিন হবে আমার হবে না, এ কেমন কথা! আমি গম্ভীর গলায় বললাম, বাবা আমিও খুব বড় হওয়ার চেষ্টা করব। আমারও জন্মদিন করতে হবে। বাবা বললেন, আচ্ছা তোমারও হবে। শুধু ইকবাল ঘোষণা করল সে বড় হতে চায় না। ছোটই থাকতে চায়। তার জন্মদিন লাগবে না। আমরা গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। নভেম্বরের ৯ তারিখ শেফুর জন্মদিন। দেখতে দেখতে ৯ তারিখ এসে পড়ল। আমরা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে লক্ষ করলাম এ উপলক্ষে কাউকে বলা হলো না। বাবা বললেন, আমরা নিজেরা নিজেরা উৎসব করব। কাউকে বলব না। পায়েস ছাড়া অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য তৈরি হলো না। আমাদের মন ভেঙে গেল। সন্ধ্যার পর জন্মদিনের উৎসব শুরু হলো। বাবা ‘বীর পুরুষ’ কবিতা আবৃত্তি করলেন। প্রাণেশ কাকু তিনটা গান গাইলেন। পায়েস খাওয়া হলো। তারপর বাবা ছোট্ট একটা বক্তৃতা দিয়ে শেফুর হাতে একটা উপহারের প্যাকেট তুলে দিলেন। সেই উপহার দেখে আমাদের সবার বিস্ময়ে বাকরোধ হয়ে গেল। আমার দরিদ্র বাবা খুবই দামি উপহার কিনেছেন। চীনেমাটির চমৎকার খেলনা ‘টি সেট’, যা দেখলে একালের শিশুদেরও চোখ কপালে উঠে যাওয়ার কথা। বাবা বললেন, পছন্দ হয়েছে মা? শেফু কাঁদতে কাঁদতে বলল, এত সুন্দর জিনিস সে তার জীবনে দেখেনি। আনন্দে সারারাত সে ঘুমাতে পারল না। বারবার বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দেখে আসে টি সেট ঠিকঠাক আছে কি না। সেই রাতে আমি নিজেও উদ্বেগে ঘুমুতে পারলাম না। আর মাত্র তিন দিন পর আমার জন্মদিন। না জানি কী অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। গোপন সূত্রে খবর পেলাম, আমার জন্যে দশগুণ ভালো উপহার অপেক্ষা করছে। খবর দিলেন মা। মা’র খবর খুবই নির্ভরযোগ্য। জন্মদিন এসে গেল। গান, কবিতা আবৃত্তির পালা শেষ হওয়ার পর আমার হাতে উপহারের প্যাকেট তুলে দেওয়া হলো। প্যাকেট খুলে দেখি একটা বাঁধানো ফ্রেমে দীর্ঘ একটি কবিতা। বাবা ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে একটি কবিতা লিখে ফ্রেমে বাঁধিয়ে নিয়ে এসেছেন। কবিতার প্রথম দুটি চরণ— সাতটি বছর গেল পরপর আজিকে পড়েছো আটে তব জন্মদিন নয়তো মলিন ভয়াল বিশ্ব হাটে... বাবা খুবই আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে, উপহার পছন্দ হয়েছে? অনেক কষ্টে কান্না চাপা দিয়ে বললাম—হ্যাঁ। তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে পছন্দ হয় নাই। আমি চুপ করে রইলাম। বাবা খানিকক্ষণ শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, এই উপহার এখন তোর কাছে সামান্য মনে হচ্ছে। এমন একদিন আসবে, যখন আর সামান্য মনে হবে না। / এআর /

যদি মন কাঁদে...

কথার জাদুকর। বাংলা সাহিত্যের ধ্রুবতারা, কিংবদন্তি। যার লেখায় মোহিত হননি এমন বাঙালি পাঠক পাওয়া দুষ্কর। তিনি সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। যিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। আজ পালিত হবে তার ৭০তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা তেমন পছন্দ ছিল না হুমায়ূন আহমেদের। তবুও রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রিয়জনদের নিয়ে কাটতেন জন্মদিনের কেক। সকাল হলে ভক্তরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন প্রিয় লেখককে। এছাড়া দিনব্যাপী নানা আয়োজন তো থাকতই। আর আজ সকালে নুহাশ পল্লীতেও থাকছে বিশেষ অনুষ্ঠান। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে আজ চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে ‘হুমায়ূন মেলা’। বিকাল ৩টা ৫ মিনিটে তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই চত্বরে হুমায়ূন মেলার উদ্বোধন পর্বে উপস্থিত থাকবেন- নাট্যব্যক্তিত্ব, কবি-সাহিত্যিকসহ দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজন, চ্যানেল আই পরিচালক, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও হুমায়ূন আহমেদ পরিবারের সদস্যরা। মেলায় থাকবে হুমায়ূন আহমেদের বই, চলচ্চিত্র, নাটকসহ তার কর্মজীবনের নানা সামগ্রীর স্টল। মেলা চলবে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। মেলা প্রাঙ্গণ মঞ্চে পরিবেশিত হবে হুমায়ূন আহমেদের লেখা গান, নাচ, আবৃত্তি, স্মৃতিচারণ পর্ব ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রকাশকদের আয়োজনে বিকাল সাড়ে ৩টায় পাবলিক লাইব্রেরিতে শুরু হবে হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে সাত দিনব্যাপী একক বইমেলা। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। বিশেষ অতিথি থাকবেন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও লেখকের অনুজ কার্টুনিস্ট লেখক আহসান হাবীব। এছাড়া বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলেও অনুষ্ঠিত হবে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনের নানা আয়োজন। হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে গড়া গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালিতে অবস্থিত স্বপ্নের নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেক কাটা, পুরো নুহাশ পল্লীকে আলোকসজ্জায় সজ্জিতকরণ ও মরহুমের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ। নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বুলবুল জানান, হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে নুহাশ পল্লীর পক্ষ থেকে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। আজ সকালে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন তার ছেলে নিষাদ ও নিনিতকে নিয়ে নুহাশ পল্লীতে মরহুমের কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের সংগঠন হিমু পরিবহনের উদ্যোগে গাজীপুরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সকালে ক্যান্সার সচেতনতামূলক ৩০ জনের একটি সাইকেল শোভাযাত্রা জেলা শহর থেকে নুহাশ পল্লীতে যাবে। পথে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হবে। সংগঠনের ১৫ সদস্যের অপর একটি দল ঢাকা থেকে খালি পায়ে হেঁটে নুহাশ পল্লীতে যাবে। হুমায়ূন আহমেদ এর বাবা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীদ হন। বাবা লেখালিখি ও পত্র-পত্রিকায় তা প্রকাশ করতেন। বগুড়া থাকাকালীন তিনি একটি গ্রন্হও প্রকাশ করেছিলেন। নাম ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক। সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট। হুমায়ুন আহমেদের ছোট তিন বোন শিকু, শিফু ও মনি। ছোটকালে হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। ডাকনাম কাজল। তার বাবা নিজের নাম ফয়জুর রহমানের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন। বাবার চাকরি সূত্রে নেত্রকোনা, দিনাজপুর, বগুড়া, সিলেট, পঞ্চগড়, রাঙামাটি, বরিশালে শৈশব কেটেছে তার। সেই সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সব গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। পরে ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ৫৬৪ নং কক্ষে তার ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। জনপ্রিয় কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা তার রুমমেট ছিলেন। এমএসসি শেষে হুমায়ূন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তবে প্রচারবিমুখ এই বিস্ময় পুরুষ সাধারণত নামের শেষে কখনও ‘ড.’ উপাধি ব্যবহার করতেন না। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মে প্রবেশ করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ লিখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এক সময় অধ্যাপনা ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭৩ সালে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রথমা স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। ভালোবেসে তিনি গুলতেকিনকে বিয়ে করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের উত্থান ও তার প্রথম জীবনের সংগ্রামে নেপথ্যের নায়িকা হয়ে ছিলেন তার স্ত্রী। নিজের লেখা ‘হোটেল গ্রেভার ইন’ বইতে সেই সাক্ষ্য নিজেই দিয়ে গেছেন তিনি। হুমায়ূন-গুলতেকিন দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে। তারা হলেন- মেয়ে বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগ থেকে শীলার বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ওই বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যা মারা যায়। সেই কন্যার নাম রেখেছিলেন লীলাবতী। তাকে একটি বইও উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ূন। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ছাত্র জীবনে সাহিত্যে যাত্রা শুরু করেন ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে, ১৯৭২ সালে। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তার দ্বিতীয় গ্রন্হ। তারপর থেকে যেখানেই হাত দিয়েছেন হুমায়ূন, সেখানেই সোনা ফলেছে। সময়ের অববাহিকায় দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্হ। যা বিশ্ব সাহিত্যে একজন লেখক হিসেবে তাকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। তার রচনাসমগ্রের মধ্যে এইসব দিনরাত্রি, জোছনা ও জননীর গল্প, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথাও, সৌরভ, নি, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরীপুর জাংশান, বহুব্রীহি, আশাবরি, দারুচিনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, আমার আছে জল, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, মাতাল হাওয়া, শুভ্র গেছে বনে, বাদশাহ নামদার, এপিটাফ, রূপা, আমরা কেউ বাসায় নেই, মেঘের ওপারে বাড়ি, আজ চিত্রার বিয়ে, এই মেঘ, রৌদ্রছায়া, তিথির নীল তোয়ালে, জলপদ্ম, আয়নাঘর, হুমায়ূন আহমেদের হাতে ৫টি নীলপদ্ম ইত্যাদি অন্যতম। এ ছাড়া লিখেছেন অসংখ্য ছোট গল্প। তার ছোট গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ভৌতিক গল্পেও জুড়ি নেই হুমায়ূনের। এর বাইরে কবিতা ও গান লেখাতেও হাত চালিয়েছেন। বিশেষ করে একজন গীতিকবি হিসেবে হুমায়ূন ‘বরষার প্রথম দিনে’, ‘যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো’, ‘চাঁদনি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’, ‘চাঁদনী পসরে কে আমারে স্মরণ করে’, ‘আমার ভাঙা ঘরে’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খিরে’ ইত্যাদি গানে নিজেকে কালজয়ী করে রেখেছেন। বাংলা সাহিত্যের নতুন যুগের স্রষ্টা ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। বাংলা সাহিত্যকে সার্বজনীন করে তুলতে এই কিংবদন্তি কথাশিল্পীর অবদান ইতিহাস হয়ে থাকবে। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘হিমু’ জনপ্রিয়তায় বিশ্ব সাহিত্যেও বিস্ময়। এর বাইরে ‘মিসির আলী’, ‘রুপা’, ‘শুভ্র’, ‘মাজেদা খালা’, ‘বাকের ভাই’, ‘মোনা’, ‘ছোট মামা’ ইত্যাদি চরিত্রগুলোও দারুণ জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্যে। এই চরিত্রগুলো নাটক ও চলচ্চিত্রের হাত ধরে চিরদিনের মতো থেকে গেল আশ্চর্য রকম জীবন্ত। হুমায়ূন আহমেদের তৈরি করা বিচিত্র সব চরিত্র মানুষকে হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে, স্বপ্নে ভাসিয়েছে। এক একটি চরিত্র পাঠক-দর্শকদের কাছে একেকটি নতুন আবিষ্কার। সাহিত্যের চরিত্রগুলোই বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে তার নাটক-সিনেমায়। হুমায়ূনের গড়া এসব চরিত্রে কখনও কখনও তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন নিজেরই প্রতিরূপ। হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে আমরা তাই খুঁজে পাই কখনও হিমু, কখনও বা মিসির আলী, আবার কখনও শুভ্রকে। তার তৈরি করা চরিত্রের জনপ্রিয়তা ব্যক্তি হুমায়ূনকেও কখনও কখনও যেন ছাড়িয়ে গেছে। একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। হুমায়ূন আহমেদে মৃত্যতে শোক প্রকাশ করে স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘সব গুণী মানুষ একে একে চলে যাচ্ছে। হুমায়ূনকে হারিয়ে অনুভব করছি, আপনজন হারানোর বেদনা। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্রের জন্য আমরা যারা কাজ করে আসছি, হুমায়ূন আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি মানুষকে হলমুখী করেছিলেন।’ মূলত তার চলচ্চিত্র নির্মাণের আগ্রহ তৈরি হয় নব্বই দশকের প্রথম দিকে। এই আগ্রহ আর সীমাহীন স্বপ্ন ছিল জীবনের শেষভাগেও। মোট ৮টি ছবি নির্মাণ করে গেছেন তিনি। ছবিগুলো হলো ‘আগুনের পরশমনি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’, ‘আমার আছে জল’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। দীর্ঘদিনের সাহিত্য জীবনে একজন লেখক হিসেবে প্রায় সবই তিনি অর্জন কিংবা জয় করে নিয়েছিলেন। পাঠক, ভক্ত, সম্মান, টাকা-সব কিছুই তিনি পেয়েছিলেন দু’হাত ভরে। আর স্বীকৃতিস্বরুপ নানা সময়ে ঘরে উঠেছে নানা পুরস্কার। তার মধ্যে রয়েছে- সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসুদন পদক, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক এবং চলচ্চিত্রে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪), বাচসাস পুরস্কার ইত্যাদি। হুমায়ূন আহমেদ চিরদিন সম্মানিত হয়ে থাকবেন আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, ডলি জহুর, সুবর্ণা মুস্তাফা, আলী জাকের, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন, স্বাধীন খসরু, ডা. এজাজ, মাহফুজ আহমেদ, কুদ্দুস বয়াতি, বারী সিদ্দিকী, ফারুক আহমেদ, বিপাশা হায়াত, শমী কায়সার, প্রাণ রায়, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শামীমা নাজনীনের মতো অসংখ্য নন্দিত শিল্পীদের কারও কারও উত্থান ও কারও বা অনিন্দ্য বিকাশের কারিগর হিসেবে। মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন কোলন ক্যান্সারে ভুগছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আরোগ্যের আশায় দীর্ঘ ৯ মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) নিউইয়র্কের বেলেভ্যু হসপিটালে স্থানীয় সময় ১১টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপুরুষ। সাহিত্যের আড়ালে হুমায়ূন আহমেদ খুব হালকা ভাষায় বলে যেতেন মানবজীবনের চরম বাস্তবতার কথা। তেমনি এক লেখায় বলেছিলেন- ‘তুমি হাসলে সবাই তোমার সাথে হাসবে, কিন্তু তুমি কাঁদলে কেউ তোমার সাথে কাঁদবে না। মানুষকে কাঁদতে হয় একা একা।’ খুব জানতে ইচ্ছে করে, কত মানুষ তার বিরহে আজ একা একা কাঁদে সে কথা কি প্রিয় হুমায়ূন জানেন? কিংবা দেখতে পান? আরকে// এআর

বুকার পেলেন মার্কিন লেখক জর্জ স্যান্ডার্স

এ বছর ম্যান অব বুকার পুরস্কার জিতেছেন মার্কিন লেখক ৫৮ বছর বয়সী জর্জ স্যান্ডার্স৷ প্রথম উপন্যাস ‘লিঙ্কন ইন দ্য বারদো’ লিখেই এ পুরস্কার পান তিনি । লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ডাচেস অফ কেমব্রিজ কেট উইলিয়াম ৷ সেইসঙ্গে ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থমূল্য পান তিনি৷ দ্বিতীয় আমেরিকান হিসাবে এই পুরস্কার পেলেন জর্জ স্যান্ডার্স৷ যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের ঠিক এক বছর আগের সময়কাল অর্থাৎ ১৮৬২ সালকে জর্জ স্যান্ডার্স তার ‘লিঙ্কন ইন দ্য বারদো’ উপন্যাসের জন্য বেছে নিয়েছেন৷ নাম থেকে স্পষ্ট আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে কেন্দ্র করে সাজিয়েছেন গল্পটি৷ ঐতিহাসিক ঘটনাকে তুলে ধরার পাশাপাশি আশ্রয় দিয়েছেন নিজের কল্পনাকেও৷ উপন্যাসে উঠে এসেছে লিঙ্কনের ছোট ছেলের কথা৷ গতবছর আমেরিকান লেখক পল বেট্টির লেখা ‘দ্য সেলআউট’ উপন্যাসটি বুকার পায়৷ এই বছর ফের মার্কিন ঝুলিতেই গেল সাহিত্যের অন্যতম এ পুরস্কার৷ এর আগে বুকার পুরস্কার ব্রিটিশ কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সাহিত্যিকদের দেওয়া হত৷ ২০১৪ সালের পর সেই প্রথা তুলে দেয় বুকার কমিটি৷ সূত্র:দ্যা গর্ডিয়ান এম     

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্মদিন আজ

আজ ১৬ অক্টোবর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ৬১তম জন্মবার্ষিকী। কবির জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একুশে টেলিভিশন অনলাইন’র পক্ষ থেকে গভীর ভালোবাসা। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁর পিতার কর্মস্থল বরিশালের আমানতগঞ্জ রেডক্রস হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডাঃ শেখ ওয়ালীউল্লাহ এবং মাতা শিরিয়া বেগম। তাঁর মূল বাড়ি বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার অন্তর্গত সাহেবের মেঠ গ্রামে। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রুদ্রের শৈশবের অধিকাংশ সময় তাঁর কেটেছে নানাবাড়ি মিঠেখালি গ্রামে (বাগেরহাট জেলার মংলা থানার অন্তর্গত)। এখানকার পাঠশালাতেই তাঁর পড়াশুনা শুরু। ১৯৭২ সালে ঢাকায় এসে ওয়েস্ট এ্যান্ড হাইস্কুল ভর্তি হয়ে ১৯৭৪ সালে চার বিষয়ে লেটার মার্কসসহ এসএসসিতে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। এর পর ১৯৭৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। অতঃপর ১৯৮০ সালে সম্মানসহ বিএ এবং ১৯৮৩ সালে এমএ পাস করেন তিনি। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ময়দানে তিনি ছিলেন অন্যতম। জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে প্রধান উদ্যোগীদের তিনি ছিলেন একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বিষ্ফোরক দিনগুলোতে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বিপ্লবের সহগামী এক মানুষ। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার স্বল্পসময়ের জীবনে রচনা করেছেন সাতটি কাব্যগ্রন্থসহ গল্প, কাব্যনাট্য ও অর্ধ শতাধিক গান। তাঁরই কবিতার লাইন “জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে পুরনো শকুন” আজও অবিস্মরণীয়। এরকম অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন রুদ্র। রাজনীতির ভন্ডামী আর সমাজের বৈশাদৃশ্যের ছবি তিনি তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন নিপুন তুলির টানে। “সোনালি শিশির” তাঁর একমাত্র গল্পের বই। তাঁর ‘বিষ বিরিক্ষির বীজ’ নামক একটি নাট্যকাব্য রয়েছে। এছাড়া উপদ্রুত উপকূল (১৯৭৯), ফিরে পাই স্বর্ণগ্রাম ১৯৮২, মানুষের মানচিত্র (১৯৮৪), ছোবল (১৯৮৬), গল্প (১৯৮৭), দিয়েছিলে সকল আকাশ (১৯৮৮), মৌলিক মুখোশ (১৯৯০) কাব্যগ্রন্থগুলোও ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আর তাঁর বিখ্যাত ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি জন্য তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি প্রদত্ত ১৯৯৭ সালের শ্রেষ্ঠ গীতিকারের (মরনোত্তর) সম্মাননা লাভ করেন। রুদ্র আলোচিত নারীবাদী কবি-লেখিকা তসলিমা নাসরীনকে বিয়ে করেন ১৯৮১ সালে। ১৯৮৮-তে তাদের সাত বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটে। এর কিছুকাল পরে ঢাকার বাসভবনে কবির অকালপ্রয়ান ঘটে।   এসএ/এআর

যেখানে সেখানে

সেখানে আলো ছিল না বটে তবে অন্ধকারও ছিল না, ঘুঁটঘুটে ভাব ছিল চারিদিকে পোকা মাকড়ের শব্দ ছিল গাছ-গাছালির সবুজাভ রং অক্সিজেনে ভরা, নিঃশ্বাসের আকর্ষণে ঘেরা- অপেক্ষা শুধু কখন আলো কিম্বা উল্টো অভিপ্রায় নিয়ে সেখানে আসা।   শুদ্ধতার প্রতীক ছিল না সেখানে তবে অশুদ্ধ আচরণও রয়ে যায়নি। যে রংটা যার পছন্দ তার নির্লিপ্ত ছোঁয়া থেকে রং বদলে যায়। এ যেন নেশার মতো- দৃষ্টি প্রতিবন্ধী যেভাবে রঙের গন্ধ বোঝে সেভাবেই রং কথা বলে, মানুষ চেনে, প্রকৃতি নির্ভর সবুজ তাইতো পাতা বাহার হয়ে কখনো নিত্য ধারায়। হারানোর ভয় ছিল না সেখানে তবে সুরক্ষার দুর্গওতো ছিল না। যে পারে তার উদয়-অস্ত একাকার করে নিয়ে পথ খুঁজে নিত। আমার পথ তেমন ছিল না জানা। আমি অবশ্য জানতাম পথে নামলেই পথ বলে দেবে, কোন পথে এগোতে হবে। তাই সে পথের নাগাল খোঁজাই ছিল আমার সবিশেষ অভিপ্রায়।   সেখানে আমার অদেয় কিছু ছিল না না পাওয়াও কিছু ছিল না তারপর।   ১৭/০২/২০১৭        

এ পি জে আব্দুল কালামের বিখ্যাত কিছু উক্তি

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এ পি জে আব্দুল কালাম (আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আব্দুল কালাম)। তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন বিজ্ঞানী হিসেবে। পরে তিনি ঘটনাচক্রে রাজনীতিবিদে পরিণত হন। ভারতের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশযানবাহী রকেট উন্নয়নের কাজে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে ‘ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র মানব’ বা ‘মিসাইল ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ বলা হয়। ২০০২ সালে তিনি তৎকালীন শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি ও বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পাঁচ বছর এই পদে আসীন থাকার পর তিনি শিক্ষাবিদ, লেখক ও জনসেবকের সাধারণ জীবন বেছে নেন। ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে স্বপ্নের মহান এই ফেরিওয়ালা পরলোগ গমন করেন। স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রম তাঁর জীবনকে বিজয়ীর আসনে নিয়ে এসেছিলো। ইটিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য কিছু বিখ্যাত উক্তি তুলে ধরা হলো। ১) স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন সেটা যেটা তোমায় ঘুমোতে দেয় না।’ ২) সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে হলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে। ৩) যারা হৃদয় দিয়ে কাজ করতে পারে না; তাদের অর্জন অন্ত:সারশূন্য, উৎসাহহীন সাফল্য চারদিকে তিক্ততার উদ্ভব ঘটায়। ৪) যদি তুমি তোমার কাজকে স্যালুট কর, দেখো তোমায় আর কাউকে স্যালুট করতে হবে না। কিন্তু তুমি যদি তোমার কাজকে অসম্মান কর, অমর্যাদা কর, ফাঁকি দাও, তাহলে তোমায় সবাইকে স্যালুট করতে হবে। ৫) প্রতিদিন সকালে এই পাঁচটা কথা মনে মনে বলো : ক. আমি সেরা। খ. আমি করতে পারি। গ. সৃষ্টিকর্তা সব সময় আমার সঙ্গে আছে। ঘ. আমি জয়ী। ঙ. আজ দিনটা আমার। ৬) উৎকর্ষতা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ৭) আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই। পুরো মহাবিশ্ব আমাদের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ। যারা স্বপ্ন দেখে এবং কাজ করে শুধু তাদেরকেই শ্রেষ্ঠটা দেওয়ার জন্য চক্রান্তে লিপ্ত এই বিশ্ব। ৮) জীবন একটি কঠিন খেলা। ব্যক্তি হিসেবে মৌলিক অধিকার ধরে রাখার মাধ্যমেই শুধু তুমি সেখানে জয়ী হতে পারবে। ৯) ভিন্নভাবে চিন্তা করার ও উদ্ভাবনের সাহস থাকতে হবে, অপরিচিত পথে চলার ও অসম্ভব জিনিস আবিষ্কারের সাহস থাকতে হবে এবং সমস্যাকে জয় করে সফল হতে হবে। এ সকল মহানগুণের দ্বারা তরুণদের চালিত হতে হবে। তরুণ প্রজন্মের প্রতি এই আমার বার্তা। ১০) যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়, তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা, মা এবং শিক্ষক। ১১) সমস্যাকে কখনো এড়িয়ে যেতে চাইবে না। বরং সমস্যা এলে তার মুখোমুখি দাঁড়াবে। মনে রাখবে, সমস্যাবিহীন সাফল্যে কোনো আনন্দ নেই। সব সমস্যার সমাধান আছে। ১২) জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমি আলোকপাত করি। সেগুলো হলো: ক. জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, খ. জ্ঞান আহরণ, গ. অনেক বড় সমস্যায় পড়লেও লক্ষ্য থেকে সরে না আসা এবং ঘ. কোনো কাজে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোকেই নেতৃত্বগুণে সামাল দিতে পারা। ১৩) হতাশ না হয়ে নিজেকে স্বপ্নপূরণের কতটা কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারছ, সেদিকে নজর রাখবে। কখনোই সাহস হারাবে না। নিজের একটি দিনও যাতে বৃথা মনে না হয়, সে চেষ্টা করো। ১৪) সমস্যাকে কখনো আমার ওপর চেপে বসতে দেব না। যত কঠিন সময়ই আসুক না কেন, কখনোই হাল ছেড়ে দেব না। ১৫) এখন থেকে সবকিছুতে দেশের কথা মাথায় রাখবে। কোনো স্বপ্ন দেখলে নিজের সঙ্গে দেশকে নিয়েও দেখবে, কোনো চিন্তা করলে দেশকে নিয়ে করবে আর কোনো কাজে মগ্ন হলে দেশের জন্য করবে।   টিকে

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক চিত্রা দেব আর নেই

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক চিত্রা দেব আর নেই। আজ সোমবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। বেশ কিছুদিন ধরে চিত্রা দেব ক্যানসারে ভুগছিলেন। চিত্রা দেব জন্মেছিলেন বিহারের পূর্ণিয়ায় ১৯৪৩ সালের ২৪ নভেম্বর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাংলায় এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় আনন্দবাজার পত্রিকার গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সেখান থেকেই তাঁর মূল কর্মজীবন শুরু হয় এবং সেখান থেকেই তিনি অবসর নেন। চিত্রা দেব অনেকগুলো বই লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে আছে ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’, ‘ঠাকুরবাড়ির বাহির মহল’, ‘অন্তঃপুরের আত্মকথা’, ‘বুদ্ধদেব দেখতে কেমন ছিলেন’ ইত্যাদি। তিনি মুন্সী প্রেম চাঁদের ‘গো দান’ এবং ‘নির্মলা’র হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। সম্পাদনা করেন ‘সরলা বালা রচনা সমগ্র’। এ ছাড়া তিনি কবি চন্দ্রের মহাভারত, বিষ্ণুপুরী রামায়ণ হিন্দি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। সোমবার বিকেলে দক্ষিণ কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে চিত্রা দেবের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ডব্লিউএন  

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি