ঢাকা, রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:১৬:০৭

তোর স্মরণে

তোর স্মরণে

তোর স্মরণে প্রতিক্ষণে হৃদয়টাকেদগ্ধ করি, আঘাত করি মৃত্যুবানেতোর বিরহে উলট-পালট জীবন আমারধ্বংস দ্বারে, প্রভু জানে-তুই শুনিস না, কষ্ট পাবিনষ্ট হবার গল্প শুনে-ফের যদি তোর কান্না আসেবন্যা বহে অভিমানে;আমার দুখে অশ্রু ঝরুককাজলটানা তোর নয়নেচাই না আমি-যেই নয়নের গহীন জলেআজও আমি সাঁতার কাটিপাই না আমি। //এআর
ময়মনসিংহ গীতিকার ভাষা ও নারীর প্রেমশক্তি

                                                                                                                                             এক শ্রেণির আখ্যানমূলক লোকগীতি বাংলাসাহিত্যে গীতিকা নামে খ্যাত। গীতিকাগুলো মূলত গান হিসেবে গাওয়ার জন্যেই রচিত। গ্রামবাংলার প্রচলিত সুরে এগুলো গাওয়া হয়। এতে সুরের চেয়ে কাহিনীরই প্রাধান্য থাকে। কাহিনীর মধ্যদিয়ে গীতিকার রস শ্রোতার কাছে উপস্থাপিত হয়। ছোট গল্পের মতই একটি মাত্র কাহিনীর ধারা অনুসরণ করে গীতিকা অগ্রসর হয়ে থাকে। সাহিত্য বিচারে ময়মনসিংহ গীতিকা লোকগীতিরই অংশ বিশেষ। গ্রামের সাধারণ মানুষ অবসর সময়ে পালাগানের অনুষ্ঠান উপভোগ করত। পল্লীজীবনের মাধুর্য মিশ্রিত এসব গান সবশ্রেণির মানুষের হৃদয়কে আকর্ষণ করে।ড. দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্যোগে এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের আনুকূল্যে চন্দ্রকুমার দে ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করেন। চন্দ্রকুমার দে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে নেত্রেকোণার অন্তর্গত আইথর নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার পূর্বাংশে নেত্রেকোণা, কিশোরগঞ্জের বিল, হাওর ও বিভিন্ন নদনদী প্লাবিত বিস্তৃত ভাটি অঞ্চল থেকে বাংলার এ শ্রেষ্ঠ গীতিকাগুলো তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে মহুয়া, মলুয়া, কমলা, চন্দ্রাবতী ও জয়চন্দ্র, ঈশাখা দেওয়ান, দস্যু কেনারাম, রূপবতী, ফরোজ খাঁ দেওয়ান, মহরম খাঁ দেওয়ান, দেওয়ান ভাবনা, ছুরত জামাল ও আধুয়া সুন্দরী, কাজল রেখা, অসমা, ভেলুয়া সুন্দরী, কঙ্ক ও লীলা, মদনকুমার ও মধুমালা, গোপিনী কীর্ত্তন, দেওয়ানা মদিনা, বিদ্যাসুন্দর প্রভৃতি পালাগানগুলো বর্তমান যুগেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।এ পালাগানগুলোর ভাষা সহজ সরল সাধারণ মানুষের ভাষা কিন্তু মর্মস্পর্শী। তৎসম শব্দের ব্যবহার খুবই কম। প্রসঙ্গত বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের গোরার দিকের সংস্কৃতপ্রেমী পণ্ডিতরা তৎসম শব্দবহুল যে কৃত্রিম সাধু ভাষার প্রচলন করেছিলেন, ময়মনসিংহ গীতিকার ভাষা সে রূপ নয়। এ ভাষা প্রাকৃত ভাষার সহোদর। বাংলা সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত বলে কেউ কেউ মনে করেন সংস্কৃত যুগের পূর্ব সাহিত্য বিশেষত ময়মনসিংহ গীতিকাগুলো পাঠ করলে সে ভুল ঘুচে যাবে। খাঁটি বাংলা যে প্রাকৃতের কত কাছের এবং সংস্কৃত হতে কত দূরে তা পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়। এ দেশের সাধারণ মানুষ ‘আত্তি’ বলত ‘হস্তি’ বলত না। ‘শাওন’ বলত ‘শ্রাবণ’ বলত না, ‘মিডা’ বলত ‘মিষ্টি’ বলত না। আত্তি, শাওন, মিডা প্রভৃতি শব্দগুলো প্রাকৃতভাবেই ব্যবহৃত। গ্রামের চাষারা এখনো এ ভাষাতেই কথা বলেন।প্রসঙ্গত ময়মনসিংহ গীতিকার মলুয়া পালা থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো-“আগরাঙ্গ্যা সাইলের খেত পাক্যা ভূমে পড়েপন্থে আছে বইনের বাড়ী যাইব মনে করে।।মায়ের পেটের বইন গো তুমি শুন আমার বাণী।শীগারে যাইতে শীঘ্র বিদায় কর তুমি।ঘরে ছিল সাচি পান চুন খয়ার দিয়া।ভাইয়ের লাগ্যা বইনে দিল পান বানাইয়া।।উত্তম সাইলের চিড়াগিষ্টেতে বান্ধিলঘরে ছিল শবরি কলা তা ও সঙ্গে দিল।।কিছু কিছু তামুক আর টিক্কা দিল সাথেমেলা কইরা বিনোদ বাহির হইল পথে।।যত দূর দেখা যায় বইনে রইল চাইয়াশীগারে চলিল বিনোদ পালা কুড়া লইয়া”উল্লিখিত উদাহরণ থেকে আমরা স্পষ্টতই বুঝতে পারি ময়মনসিংহ গীতিকার ভাষা একান্তই গণমানুষের। এ ভাষায় রঙরস আছে, কারুকাজ আছে কিন্তু কৃত্রিমতা নেই। এগুলোর মধ্যে অতি সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবনবোধ, আবেগ অনুভূতির পরিচয় মেলে। ময়মনসিংহ গীতিকার কাহিনীগুলোর কথা গ্রাম্য কবিরা পয়ারে গেঁথে রেখেছেন  যাতে খুঁজে পাওয়া যায় অফুরন্ত কারুণ্য ও কবিত্যের সন্ধান। গীতিকাগুলোর কবিরা আজ নেই; তাদের অশ্রু ফুরিয়েছে কিন্তু এসব কাহিনীর শ্রোতাদের অশ্রু কখনো ফুরাবে না। উত্তরে গারো পাহাড়, জয়ন্তা ও খাসিয়ার অসম শৈলশ্রেণি... তাদের পদস্পর্শে এক দিকে সোমেশ্বরী ও অপর দিকে কংস চলে গেছে। তাছাড়া দক্ষিণ-পূর্বে নানা ধারায় ধনু, ফুলেশ্বরী, বাজেশ্বরী, ঘোড়া-উৎরা, সুন্ধা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র কখনো ভৈরব রবে কখনো বা বীণার ন্যায় মধুর নিক্বনে প্রবাহিত হয়েছে। তা ছাড়া এখানে রয়েছে অসংখ্য বিল-ঝিল। বিলগুলোকে এ অঞ্চলে ‘হাওর’ বলা হয়ে থাকে। এ হাওর অঞ্চলই ময়মনসিংহ গীতিকার নায়ক-নায়িকাদের বিচরণ ক্ষেত্র।ময়মনসিংহ গীতিকার কাহিনীগুলো মূলত নারীর প্রেম-শক্তির জয় গান এবং নারীর ব্যক্তিত্ব, আত্মবোধ, স্বাতন্ত্র্য ও সতিত্ব প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য এতে প্রকাশমান। এ গানের নায়িকারা অপূর্ব প্রেমশক্তির অধিকারিণী হয়ে তাদের নারীধর্ম ও সতিত্ব রক্ষা করেছে। প্রেমের জন্য দুঃখ, তিতিক্ষা, আত্মত্যাগ ইত্যাদি সর্বসমর্পণ করে নারী যে কী অসীম মহিমা লাভ করতে পারে, গীতিকাগুলো তারই পরিচায়ক। পল্লী-কবির সহজ সরল দৃষ্টি শাশ্বত নারীর অকৃত্রিম রূপ এখানে ফুটে উঠেছে। চরিত্রগুলো হাওর অঞ্চলের প্রাকৃতিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাদের স্বভাবের মাধুর্য ও সৌন্দর্যের সাথে সর্বসংস্কার মুক্ত প্রেমের বিকাশ ঘটেছে। পল্লীসমাজের সহজ প্রেম গীতিকাগুলোর উপজীব্য হয়ে তৎকালীন সমাজকে প্রতিফলিত করেছে। তাই সামাজিক কবিতা হিসাবে এগুলো অবশ্যই মূল্যবান।গীতিকাগুলোর মধ্যে মহুয়ার পালাটি বেদের এক অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে মহুয়ার সঙ্গে বামনকান্দার জমিদার ব্রাহ্মণ যুবক নদের চাঁদের দুর্জয় প্রণয় কাহিনী অবলম্বনে রচিত। পল্লীকবি দ্বিজকানাই আশ্চর্য দক্ষতার সাথে এই বিষাদাত্মক প্রণয়কাহিনী বর্ণনা করেছেন এবং এতে কবির সুগভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়।নায়ক-নায়িকার প্রেমানুভূতি কবি নাটকীয়গুণে সমৃদ্ধ করে উপস্থাপন করেছেন।“জল ভর সুন্দরী কন্যা জলে দিছ ঢেউ।হাসিমুখে ‘কওনা কথা সঙ্গে নাই মোর কেউ।’নাহি আমার মাতা পিতা গর্ভ-সুদর ভাইসুতের হেওলা অইয়া ভাইস্যা বেড়াই” মনসুর বয়াতি রচিত দেওনা মদিনার পালায় বানিয়াচঙ্গের দেওয়ান সোনাফরের পুত্র আলাল ও দুলালের বিচিত্র প্রেমের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এ কাহিনীতে মদিনার ত্যাগ ও নীরব সহিষ্ণুতার মাধ্যমে নারী জীবনের মাধুর্য কবি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। গীতিকাগুলোর সর্বত্রই নারীহৃদয়ের প্রেমের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য সার্থকতা সহকারে রূপায়িত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিয়োগাত্মক প্রেমকাহিনী গীতিকাগুলোর উপজীব্য। প্রেমের গতি যে কত বিচিত্র ও জটিল, অন্তঃপ্রবৃত্তির সঙ্গে বহিঃসংস্কারের সংঘাত যে কত প্রবল ময়মনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন নারী চরিত্রে তার নিদর্শন বিদ্যমান।উল্লিখিত কবিগণ রচিত এ কাহিনী-কাব্যগুলো পড়লেই বুঝা যায় প্রেমের কী দুর্জয় শক্তি। লীলার লীলাবসান, সোনাই-এর নির্বাক ও নির্ভীক মৃত্যু, কাজল-রেখার চরিত্রের সহিষ্ণুতা এবং প্রগাঢ় প্রেমনিষ্ঠার জীবন্ত সমাধি, চন্দ্রার তপোনিরত শান্তি বাস্তবিকই গৌরব করা মত। ময়মনসিংহ গীতিকার উদার মুক্ত-ক্ষেত্রে প্রেমের অনাবিল যে ধারা ছুটেছে তা প্রস্রবণের মত অবাধ ও নির্ঝরের মত নির্মল। এ গীতিকা থেকে আমরা মালঞ্চমালা, কঙ্খনমালা, কাঞ্চনমালা এবং পুষ্পমালার কথা পাই প্রেমের রাজ্যে এরা সহোদরা। তারা প্রেমের শক্তিতে বলীয়ান। স্বামীর প্রতি মলুয়ার ভালোবাসা অকৃত্রিম। এতে ধর্ম বা মত প্রচার নেই বা কোন যুগোচিত সমস্যার সমাধান নেই। এর আদর্শ সনাতন প্রেমের আদর্শ এবং এর প্রেমে-সুধা অফুরন্ত। যত দিন মানুষ থাকবে মানুষের হৃদয় থাকবে এ প্রেম-সুধারও প্রয়োজন থাকবে।কোন বিশেষ দার্শনিক বিশ্বাস কিংবা তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত গীতিকা-রচয়িতাদের জীবন-দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করেনি। জীবন বিরোধী সবকিছুই অস্বীকৃত হয়েছে এ কাব্যমালায়। এখানে বাস্তব বা কল্পনা সবই জীবন-নির্ভর। কবিরা সরলভাবে জীবন ও যৌবনের গান গেয়েছেন। চরিত্র-চিত্রণের নৈপুণ্যে প্রেম বিশুদ্ধ অনুভূতির স্তর অতিক্রম করে স্পষ্ট বাস্তবতায় প্রত্যেকটি কাহিনী অসাধারণ হয়েছে।পরিশেষে বলা যায়, ময়মনসিংহ গীতিকা মূলতই মুক্ত প্রেমের জয়গান। স্বাধীনভাবে জীবন সাথী বেছে নেবার স্বীকৃতি এখানে আছে। এ গীতিকার নারীরা কখনো ধর্মীয় কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করেছে কখনো বা অভিভাবকের অভিমতের বিরুদ্ধে পতি মনোনয়নের জন্যে গৃহ ত্যাগ করেছে। এটা অলৌকিক, অসম্ভব বা অবাস্তব নয়। এটাই নারীর শক্তি, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক মূল্যবোধের জয়গান।লেখক: শিক্ষাবিদ ও কথাশিল্পী; সদস্য বাংলা একাডেমি//এআর

সংশপ্তক

ঝালের চোটে শিষ টানতে টানতে হেঁসেল থেকে বেরুতেই জুঁই দেখল আবুল বাশার টেবিলে মাথা গুঁজে কী সব হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। ফুউউউ...। ওগো শুনছ। ফুউউউ...। উফ্ আমার দিকে তাকাও তো একটু। এত সাত সকালে কি সব হিসাব-টিসাব নিয়ে বসেছ। কাল ঈদ, তোমার তো একটু বাজারে যেতে হবে চট করে। বেশ কিছু জিনিসপত্র কেনা এখনও বাকি। কেনাকাটায় ফাইনাল টাচটা না হলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাব আমি।টেবিলের ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে আবুল বাশার জুঁইকে বলল- কি এত ফুউ... ফুউ... করছ। মরিচ-টরিচ খেয়েছ নাকি গোটা কয়েক।-কী সব অদ্ভুত কথা যে বল মাঝে মধ্যে। গায়ে জ্বালা ধরে যায়। মরিচ খাব কেন শুধু শুধু। আগামীকালের জন্য গরুর মাংস কষাচ্ছিলাম। ভুলবশত মরিচ ঢেলে ফেলেছি বেশি। মাংস সেদ্ধ হয়েছে কিনা পরীক্ষা করতে গিয়েই মুখে যেন আগুন ধরে গেল। আমারই যদি এ অবস্থা হয় ছেলেটা যে কীভাবে তরকারি মুখ তুলবে ভেবেই অস্থির হচ্ছি। কাগজপত্র, কলম এগুলো গুটিয়ে রেখে আবুল বাশার চেয়ারটা ঈষৎ ঘুরিয়ে জুঁইয়ের দিকে তাকাল। চোত-বোশেখের পাকা বাঙ্গির মতো গায়ের রং জুঁইয়ের। গৌরবর্ণ শরীরের অনেকটাই ঘামে ভেজা। টিয়া রঙের জমিনের ওপর লাল পেড়ে শাড়িতে আজ বেশ মানিয়েছে তাকে। লাল পাড়ের সঙ্গে ম্যাচ করা লাল রঙের ব্লাউজটা জায়গায় জায়গায় ঘামে ভিজে লেগে আছে শরীরের সঙ্গে। ব্লাউজের আড়ালে বায়াস্য পাখির গায়ের রঙের অন্তর্বাসের ফিতেগুলো সে জন্য অনেকটাই স্পষ্ট। ঠোঁটের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম। ভ্রমরের পাখার মতো কুচকুচে কালো কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত অবাধ্য চুলগুলো খোঁপা করে তাদের আজ একেবারে কাবু করে রেখেছে জুঁই।-কষা মাংসের ঝাল কমানোর জন্য একটি উপায় আমি তোমায় বাতলে দিতে পারি কিন্তু। এই বলে আবুল বাশার চেয়ার ছেড়ে জুঁইকে পেছন থেকে আলত করে জড়িয়ে ধরল।-এই কী হচ্ছে এসব। ছাড় বলছি। ছেলেটি পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। এক্ষুনি চলে আসবে কিন্তু। বুড়ো বয়সে ভীমরতি।-আচ্ছা ভীম বুড়ো বয়সে কার সঙ্গে রতি করেছিল। বলত। স্মিত হেসে বলল আবুল বাশার।-আমি কি জানি। ভীম কারও সঙ্গে আদৌ রতি করেছিল নাকি করেনি। এসব তো জানার কথা তোমার। রোজ রাত জেগে এত এত যে পড়।-তুমি অবশ্য ঠিকই বলেছ। মহাভারত তো আমি পড়েছি। কিন্তু সত্যি সত্যি মনে পড়ছে না যে ভীম বুড়ো বয়সে কার সঙ্গে এসব করেছিল। আচ্ছা তুমি আমাকে বুড়ো বললে কেন। এই তো গত বছর আমি সবে মাত্র তিপান্ন অতিক্রম করলাম। পঞ্চাশ অতিক্রম করলেই কি মানুষ বুড়ো হয়ে যায়? আর শোন বার্ধক্যকে আমি কখনও ভয় পাই না। দেশের যা অবস্থা তাতে করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মরে যাওয়াই ভালো। তা হলে আর এসব গুম, খুন-হত্যা, রাহাজানি, ব্যভিচার সেই সঙ্গে বিবিধ অনাচার স্বচক্ষে দেখতে হয় না। তবে কি জানো যৌবনের মতো বার্ধক্যও জীবনের আর একটি অধ্যায়। বার্ধক্যে জীবনকে উপভোগ করতে হয় ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে। তখন অনিবার্যভাবেই দৃষ্টি হয় সুদূর প্রসারিত। যৌবনে মানুষ যেমন সৃষ্টি, সম্ভোগ ও অতৃপ্তি নিয়ে ব্যাপৃত থাকে। পড়ন্ত বেলায় এসে মানুষের আচরণও হয় ঠিক একেবারে উল্টো। তখন সে হয় ধিরস্থির শান্ত ও নির্লিপ্ত। মানুষ বুঝতে পারে অন্তিম শয়নে পৃথিবী থেকে আসলে কিছুই নিয়ে যেতে পারবে না সে। বরং রেখে যায় তার কৃতকর্মের ফল।-আজকালকার সব বিত্ত ও শক্তিশালী পৌঢ় মানুষজন দেখে কি তোমার আসলে তাই মনে হয় যে, তারা ধিরস্থির, শান্ত, নির্লিপ্ত ও তৃপ্ত। পরিহাসের স্পষ্ট আভাস জুঁইয়ের কণ্ঠে।-আমি শুধু বাংলাদেশের মানুষদের উপলক্ষ করে এ কথা বলছি না। আমার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিশ্বজনীন।-আচ্ছা তুমি এই যে এত এত বই পড়। একেবারে যাকে বলে জ্ঞানের আধার। বিদ্যার ঢেঁকি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তো এত ভালো রেজাল্ট করলে। কিন্তু লাভটা হল কী। জীবনে তো কিছুই করতে পারলে না। তোমার এত পড়াশোনা জীবনে কি কাজে লাগল বলত। একটি দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করলে কিছুদিন। মালিকপক্ষের সঙ্গে মনমালিন্য করে অবশেষে সেটিও একদিন ছেড়ে দিলে দুম করে। তোমার মতো ব্যর্থ জ্ঞানী কি সমাজে আর আছে দুটি?-আবুল বাশার মনে মনে ভাবে। সত্যি কথাই তো বলেছে জুঁই। তার চেয়ে খারাপ রেজাল্ট করে তার সতীর্থ বন্ধুরা আজ বাস করে প্রাসাদতুল্য বাড়িতে। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে দাবড়ে বেড়ায় সর্বত্র। কিন্তু সবাইকে দিয়ে তো আর সবকিছু হয় না। জুঁই সেটি কিছুতেই মানতে চায় না। আবুল বাশারের মাঝে মাঝে মনে হয় জুঁই কেন যে তাকে ভালোবাসল। কিংবা বিয়ে করে ঘর বাঁধল। এর কারণ কি এটাই যে, ক্লাসে সে ছিল সেরা ছাত্র। নাকি আবুল বাশার ভালো কবিতা আবৃত্তি করত এবং মাঝে মধ্যে পত্রিকা-টত্রিকাগুলোতে তার কবিতা বেরোত। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল বলে জুঁই হয়তো ধরেই নিয়েছিল যে, তার ভবিষ্যৎ হবে নিশ্চিত ও সমৃদ্ধ। কিন্তু বিধিবাম। জীবনে কিছুই হলো না তার। ভাগ্য ভালো যে ছাত্রী হিসেবে জুঁইও ছিল অসাধারণ। তাই তো লেখাপড়া শেষ করেই ভালো বেতনে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে ও। ওর বেতন দিয়েই তো আজকাল সংসারটা অন্তত চলছে। আবুল বাশার নিজে যৎসামান্য যা করে সেটিকে অবশ্য কাজ বলা চলে না। অন্য কারও দৃষ্টিতে নয় এটি স্বয়ং আবুল বাশারের-ই অভিমত। আর সে জন্য সে তার কাজের কথা কাউকে বলতেও সাহস করে না।-এই চুপ করে কি এত ভাবছ বলত। জুঁই আবুল বাশারের শরীরে আলত স্পর্শ করে জানতে চায়।-অন্যমনস্কতা কেটে গিয়ে সম্বিত ফিরে পায় আবুল বাশার। না মানে এমনি কিছু একটা ভাবছিলাম। সে তোমার না জানলেও চলবে। কই দাওনা বাজারের ব্যাগটা এনে। বাজারটা সেরে আসি ঝটপট। আচ্ছা সিসিম কি ঘুমাচ্ছে নাকি এখনও।-ঘুমাবে না আবার। ঈদ উপলক্ষে কলেজ তো বন্ধ। আজ তো আর কলেজে যাওয়ার তাড়া নেই। সে জন্যই বোধহয় আয়েস করে ঘুমাচ্ছে।শরীরে ইস্ত্রি করা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি গলিয়ে নিউমার্কেটের দিকে রওনা হলেন আবুল বাশার। রিকশাযোগে নিউমার্কেটের দিকে যেতে যেতে তিনি লক্ষ করলেন ঈদ উপলক্ষে পুরো শহর ব্যস্ততায় যেন একেবারে নুয়ে পড়েছে। সকালে যদিও আকাশে ঈষৎ মেঘের আভাস ছিল বটে। কিন্তু বেলা গড়াতেই সেই মেঘ কেটে গিয়ে রোদে ঝলমল করছে চারদিক। সেই সঙ্গে গরমও পড়েছে ভয়ানক। অসহ্য উত্তাপে কুলকুল করে ঘামছিলেন তিনি। নীলক্ষেতের সামনে আসতেই দেখা গেল ফুটপাতের পাশে রাস্তার প্রান্তে দুটি সারমেয় পশ্চাদদিক থেকে যুগলবন্দি হয়ে কুঁইকুঁই করছে। ওরেব্বাস! ভাদ্র মাস আসতে না আসতেই এ অবস্থা! আবুল বাশারের অজান্তেই ঠোঁট ফসকে কথাগুলো বেরিয়ে আসে। ফুটপাতের ওপাশের হোটেল থেকে কেউ একজন এক গামলা হাড়মাংস সুদ্ধ এঁটেকুটো রাস্তার ওপর ফেলতেই মাদি কুকুরটি ওর সঙ্গীকে টেনে নিয়ে ধাবমান হয় রাস্তার ওপর পতিত এঁটেকুটোগুলোর দিকে। আর তখনই কুকুর দুটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় একটি অপরটি থেকে। চারদিক ভিড়ে ভিড়াক্কার হলেও নীলক্ষেতের সেকেন্ড হ্যান্ড বই দোকানিদের অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। সেখানে তেমন ভিড় নেই। ঈদ উপলক্ষে হয়তো বই কেনা বা পড়ার প্রয়োজনীয়তা নেই বেশিরভাগ ইঁদুরেদের। বরং ভিড় উপচে পড়েছে রিকশাভ্যানে বিক্রীত শার্ট, প্যান্ট, জাঙ্গিয়া, গেঞ্জি কিংবা সস্তা দামের প্লাস্টিকের সেন্ডেল এ সবের ওপর। প্রচণ্ড গরমের কারণে ডাব বিক্রেতাদেরও পয়মন্ত অবস্থা। ডাব বিক্রি হচ্ছে ধুমিয়ে। আবুল বাশারও বেশ তৃষ্ণার্থ। একবার ভাবলেন রিকশা থামিয়ে একটু ডাবের পানি খেয়ে নিলে ভালো হয়। তৃষ্ণাটা অন্তত নিবারণ করা যায়। কিন্তু রিকশাওয়ালার ভাবগতিক খুব একটা সুবিধের মনে হলো না। ঈদ উপলক্ষে সবাই ব্যস্ত। যত বেশি খেপ তত বেশি আয়। আবুল বাশার সরাসরি চলে এলেন নিউমার্কেটে। প্রথমেই তাকে সারতে হবে কিছু টুকটাক কেনাকাটা। তারপর কাঁচাবাজারে গিয়ে সেখান থেকে করতে হবে বাদবাকি সদাই।নিউমার্কেটের দোকানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে যখন এসব সাত পাঁচ ভাবছিলেন। ঠিক তখনই লক্ষ করলেন একটু দূরে জুতার দোকানের সামনে হট্টগোল ও বেশকিছু মানুষের জটলা। মা গো... বাবা গো... আমারে ছাইড়া দেন আমি আর করুমনা। এসব বলে কেউ একজন আহাজারি করছে। কচি কণ্ঠনিঃসৃত আর্তচিৎকারের নিনাদে মূর্ছিত হচ্ছে আশপাশ একটু ধাতস্ত হতেই আবুল বাশার বুঝতে পারলেন জনাবিশেক লোক একটি কিশোর ছেলের ওপর ভয়ানক প্রহারে লিপ্ত। কেউ লাঠি হাতে, কেউ আবার শুধু হাত ব্যবহারের মাধ্যমেই তাদের শরীরের শক্তিমত্তা প্রকাশে ব্যস্ত- কিল, ঘুষি, চড়-থাপ্পড় কিছুই বাদ যাচ্ছে না। একটু কাছে এগোতেই দেখা গেল ছেলেটির মুখের কষ বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। গায়ের জীর্ণ মলিন শার্টটি ছিঁড়ে ছত্রখান। পঁচিশ-ত্রিশজনের মতো লোক ছেলেটাকে ঘিরে রাখলেও আসলে মারপিটে লিপ্ত আছে চার-পাঁচ জনের মতো। বাকি লোকগুলো নামাজে দাঁড়ানোর মতো করে বুকের কাছে হাত দুটো বেঁধে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। আবুল বাশার বোঝার চেষ্টা করলেন আসলে হচ্ছেটা কী? পাশের দোকানের জনৈক কর্মচারী (মালিকও হতে পারে) শ্লেষ মিশেল কণ্ঠে বললেন- ‘আর বইলেন না, জুতা চুর। ঈদের আগে এইসব চুরগুলার কামই হইল দোকানে দোকানে চুরিচামারি করা। এইবার চুর বুঝতেছে কত চাউলে কত ধান। আরে কথায় আছে না- চুরের দশদিন আর দোকানির একদিন। এখন সেই একদিনের হিসাব লওয়া হইতেছে।’-ভাই থামান না, ছোট একটি ছেলে। মরে টরে যেতে পারে। আবুল বাশারের বুকটা হুহু করে ওঠে।-কি যে বলেন। চুরের শরীল হইল বিলাইয়ের শরীল। যতই মারেন-পিটেন একটু পরেই দেখবেন ঝাড়া দিয়া উইঠা দৌড় দিব। তখন সে দিব্যি সুস্থ মানুষ।-আবুল বাশারের কানে লোকটির কথাগুলো বিষবৎ শোনায়। তিনি একাই এগিয়ে যান জটলার দিকে। এই যে ভাই, ছেলেটিকে আর কত মারবেন। দয়া করে থামেন এবার। মুখের চোয়াল শক্ত করে কথাগুলো বলল আবুল বাশার।-ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ একজন বলল- আপনি কে ভাই। জুতা কি আপনার দোকান থেকে চুরি করছে। আপনার এত দরদ উতলাইতেছে ক্যান, বুঝলাম না তো।-আবুল বাশার বিপন্নের মতো বলল- দেখেন ভাই একজোড়া জুতার জন্য তো ছেলেটির প্রাণটাই যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। ওকে মাফ করে দিন এবার। জুতা জোড়ার দাম না হয় আমিই দিয়ে দিচ্ছি। এই বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে হাজার দুয়েকের মতো টাকা মুঠো ভরে বের করে আনলেন আবুল বাশার।-ভিড়ের মধ্য থেকে আরেকজন বলল- জুতা চুরি করছে এই ছ্যামড়া। আর টাকা দিতে চাইতাছেন আপনি। ব্যাপারটা তো বুজগতিক মনে হইতেছে না।একজন বলল- আরে এই ব্যাটাই হইল এই পাতি চোরের ওস্তাদ। দূরে দাঁড়াইয়া থ্যাইকা এই ছ্যামড়ারে দিয়া চুরি করাইতেছিল। এখন আসছে ভুজুং ভাজুং দিয়া শাগরেদরে ছাড়াইয়া নিতে। ব্যাটারে ধর। এই বলে ভিড়ের একাংশ এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল আবুল বাশারের ওপর। আবুল বাশারের হাতের টাকাগুলো সব পত্র মর্মরের মতো শব্দ না করেই শুকনো পাতার মতো উড়ে গেল দিগি¦দিক। আষাঢ়ের বৃষ্টির মতো মারের বর্ষণ শুরু হল আবুল বাশারের শরীরে।কোন এক ভালো মানুষের ছেলে হয়তো মারামারি শুরুর সঙ্গে সঙ্গে খবরটি সন্তোর্পণে পৌঁছে দিয়েছিল পুলিশের কাছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দু’জনকে পাকড়াও করে নিয়ে গেল থানায়। তারপর তাদের নিক্ষেপ করল গারদে। ওসি খোদাবক্স আবুল বাশারকে জিজ্ঞেস করলেন- কি মিয়া এসব কামধামে আছ কতদিন। ওস্তাদ সাগরেদ মিলে ভালোই তো চালাচ্ছ মনে হয়। মাল কড়ি যা জমিয়েছ সেখান থেকে এখন ছাড় কিছু আমাদের জন্য। আবুল বাশার প্রতিউত্তরে বলল- আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না। জুতা তো আমি চুরি করিনি। চুরি করেছে এই ছেলেটা। আমি তো ওকে মারের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম মাত্র।খোদাবক্স বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন- প্রথম প্রথম সবাই এ কথাই বলে। পশ্চাদদেশে গো-বেড়েন পড়লেই মুখ দিয়ে ফরফর করে সব বেরিয়ে আসবে। চিন্তা করো না চান্দু। তা কি করো তুমি? আবুল বাশার বলল- এখন কিছু করি না। দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতাম এক সময়। বছরখানেক আগে ছেড়ে দিয়েছি চাকরি। এখন সম্পূর্ণ বেকার। খোদাবক্স ঝাঝালো কণ্ঠে বলল- ভুয়া সাংবাদিকের পরিচয় দিয়ে আসলে তো করো চুরি, তাই না। এসব আমাদের কিছুই অজানা নয়। টাকা পয়সা জমিয়েছ কেমন? আমার সাফ কথা, এখান থেকে ছাড়া পেতে পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে। তোমার লোকজনদের খবর দাও। টাকা নিয়ে আসতে বল। তা না হলে মারের চোটে শরীরের হাড্ডি মাংস আলাদা হবে।গারদখানার ছোট এই প্রোকষ্ঠের ভেতর ভয়ানক গরম। গলগল করে ঘাম ঝরছে আবুল বাশারের তামাটে শরীর থেকে। ঘামে ভিজে সাদা পাঞ্জাবিটার যে অংশটুকু লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে সে অংশটুকু কচি তালের শাঁসের মতো দেখাচ্ছে। কক্ষের এক কোণে হাঁটু ভেঙে বসে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে আবুল বাশার স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে বলল- তোর নামটাই তো জানা হল না এখনও। কি নাম রে তোর? থাকিস কোথায়? চুরিদারির মতো এমন বাজে কাজ করতে গিয়েছিলি কেন। তোর যে শরীর-স্বাস্থ্য তাতে তো যে কোনো একটা বয়-বেয়াড়ার কাজ জুটিয়ে নেয়া এমন কোনো কঠিন কিছু নয়।ছেলেটি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল- আমার নাম সনু। আমরা থাকি কেরানীগঞ্জ বস্তিতে। বাপজানের একজোড়া জুতা দরকার। এ জন্য চুরি করতে গেছিলাম। এ পর্যন্ত বলে অঝরে কাঁদতে শুরু করে সনু। তিন-চার দিন কামলা দিয়া পাঁচশ টাকাও তো গুছাইতে পারলাম না। কী করুম।তোর বাবার জুতার প্রয়োজন? কিন্তু কেন? আবুল বাশার ঈষৎ কৌতূহলী হয়ে জানতে চায় সনুর কাছে। বাপজান মাছ, মুরগি, তরিতরকারি এগুলো ফেরি করে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রাস্তায় মেলা পানি জমছে। ড্রেনের পচা পানিতে হাঁইটা হাঁইটা বাপজানের পায়ে হাজা হইছে। সেন্ডেল জোড়াও একেবারে নষ্ট হইয়া গেছে। বাপজান পায়ের বিষে হাঁটতে পারে না। আমার আরও তিনডা বোইন আছে ছোড ছোড। মা, বোইনসহ পরিবারে পাঁচ-ছয়জন মানুষ। বাবায় কামে যাইতে পারে না বইলা দুই-তিন দিন ঘরে খাওন নাই। বাপজান কইল একজোড়া জুতা থাকলে কষ্ট কইরা হইলেও কামে যাওন যাইত। আমি দোকানের সামনে দিয়া যাইতেছিলাম। দেখলাম দোকানের সামনে অনেক জুতা সাজাইয়া রাখছে। ভাবলাম একজোড়া জুতা হইলেই তো বোইনগুলার মুখে খাওন জুটব। এই জন্য..। কথা আর এগোয় না সনুর মুখ দিয়ে। আবুল বাশার মনে মনে ভাবে সরকার রাতদিন উন্নয়নের মহাফিরিস্তি দিয়ে মুখে ফেনা তুললেও দেশের অনেক মানুষ যে কত কষ্টে আছে সেটি এ সনুকে দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।এএসপি মনিরুল জিপ থেকে নেমে সিঁড়ির পাশে গারদখানার সামনে দিয়ে উঠে যাচ্ছিলেন দোতালায়। আবুল বাশারের কালো মোটা ফ্রেমের চশমার স্বচ্ছ গ্লাস ভেদ করে তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ে মনিরুলের ওপর। তিনি মনিরুলকে উদ্দেশ করে বললেন- এক্সকিউজমি, এক গেলাস পানি পাওয়া যাবে। মনিরুল লোহার গারদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অবশ্যই পাওয়া যাবে। কিছুটা স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি কি রাজনীতি-টাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আবুল বাশার বললেন- না। তা হলে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী। জুতা চুরির অভিযোগে এ যুবকটির সঙ্গে আমাকেও ধরে আনা হয়েছে এখানে। আসলে আমি গিয়েছিলাম মারের হাত থেকে ছেলেটিকে উদ্ধার করতে। কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে আবুল বাশার। মনিরুল ইসলাম সাগ্রহে জানতে চায়, আপনি কী করেন। মানে আপনার পেশা জানতে চাইছি। আপাতত এখন কিছু করি না। বছরখানেক আগে কাজ করতাম একটা পত্রিকায়। ও আপনি তাহলে সাংবাদিক। বলতে পারেন একরকম- আবুল বাশার নির্লিপ্তভাবে বলে কথাগুলো। আচ্ছা আপনি অপেক্ষা করুন। দেখছি আপনার জন্য কী করা যায়।এএসপি মনিরুল আবুল বাশারকে ডেকে পাঠালেন তার নিজের খাস কামরায়। আবুল বাশারের দিকে ইশারা করে বললেন, বসুন চেয়ারটায়। ওসি খোদাবক্সকেও ডেকে আনা হয়েছে রুমে। তিনিও দাঁড়িয়ে আছেন টেবিলের একপাশে। মনিরুল ইসলাম ওসির দিকে তাকিয়ে বললেন- সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পরও তুমি ওনাকে কেন গারদে ঢোকালে। ওসি আমতা আমতা করে বলল, আমি খোঁজ নিয়ে জানলাম ওনার ওই পত্রিকা তো এক বছর আগেই উঠে গেছে। সে জন্য ভাবলাম উনি হয়তো মিথ্যে পরিচয় দিয়ে আমাদের ধাপ্পা দিচ্ছে। এএসপি মনিরুলের পাল্টা প্রশ্ন- উনাকে দেখতে কি জুতা চোর মনে হয়? ভাগো এখান থেকে-ওসির প্রতি ধমক লাগালেন মনিরুল। আবুল বাশারকে উদ্দেশ করে বললেন, আচ্ছা আপনার নাম তো আবুল বাশার তাই না। আপনার নামেই আরেকজন উপন্যাসিক আছেন চেনেন নাকি তাকে। কি যে অসাধারণ তার লেখা। আমি তার একনিষ্ঠ গুণমুগ্ধ বলতে পারেন। ভাবছিলাম ঠিকানা পেলে এক সময় গিয়ে দেখা করে আসব তার সঙ্গে।আবুল বাশার মনিরুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে ভাবলেসহীন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ওনার কোন কোন উপন্যাস পড়েছেন আপনি। মনিরুলের চটপট উত্তর- উজানভাটি, চোরাবালি, একটি নক্ষত্রের পত্তন প্রভৃতি উপন্যাসগুলো পড়া আছে।একটু নড়েচড়ে বসে আবুল বাশার বলল- আপনার মনে ধরেছে বলেই বলছি। ওগুলো আমারই লেখা উপন্যাস। আমিই সেই অখ্যাত লেখক, আবুল বাশার।কী বলছেন আপনি? মনিরুল ইসলামের চোখে মুখে বিস্ময়ের বিচ্ছুরণ।এএসপি মনিরুল ইসলাম চেয়ার ছেড়ে সটান দাঁড়িয়ে ভাবমুগ্ধ কণ্ঠে বললেন, কী সৌভাগ্য আমার! আমি তো আমার চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার অতি প্রিয় লেখক আজ আমারই সামনে বসে! মনিরুল কপট অভিমানী গলায় বললেন, তখন যে বললেন কিছুই করেন না আপনি। এটা কেন বললেন? অন্য উপন্যাসগুলোর কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। শুধু আপনার উজানভাটি উপন্যাসই আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে শতশত বছর। হ্যাঁ, এই তো সপ্তাখানেক আগেও একটি মিটিংয়ে আমাদের আইজি মহোদয় আপনার উজানভাটি উপন্যাসটির ভূয়সী প্রশংসা করলেন।আবুল বাশার লজ্জায় রক্তিম হয়ে বললেন, দেখুন, আপনাদের মতো কিছু পড়–য়া মানুষের কাছে আমার দু-একটি উপন্যাস হয়তো ভালো লেগেছে। উপন্যাসগুলোর ভাগ্যে খ্যাতি জোটেনি এতটুকুও। আমার প্রকাশক সাহেব উপন্যাসখানা ছেপেছিলেন এক হাজার কপির মতো। কিন্তু তিনশ কপিও তো বিক্রি হল না। তা হলে কী করে বলি যে আমি একজন লিখিয়ে, লেখালিখি আমার পেশা।মনিরুল ইসলাম উল্লোসিত গলায় বললেন, এই কথা, জানেন তো শেক্সপিয়রের লেখা জনপ্রিয় হতে দু’শ বছর লেগেছিল। এসব ইতিহাস কি আর আমি আগে জানতাম। বিসিএস পরীক্ষা দিতে গিয়ে পড়তে হয়েছিল এসব। রাজসিক আদর আপ্যায়ন শেষে মনিরুল ইসলাম বিদায় জানালেন তার প্রিয় লেখককে।আবুল বাশার বাড়ি ফিরে এলেন খালি হাতে। তার হাতে বাজারের ব্যাগ না দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠে জুঁই। তুমি কেমন মানুষ গো? কাল ঈদ। অথচ তুমি ফিরে এলে খালি হাতে। আর তোমার একি অবস্থা! ছিনতাইকারী- টিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলে নাকি। আবুল বাশার জুঁইকে সব কিছু খুলে বলল। সব শুনে জুঁই নির্বাক ও নিস্তব্ধ। এমন পরিস্থিতিতে প্রিয় স্বামীকে কি-ই বা আর বলা যায়। বাড়ির সবার ঈদ কাটল নিরানন্দ ও নিরাসক্ততায়।আবুল বাশারের সঙ্গে যা যা ঘটেছে সেগুলো নিয়ে তিনি এতটুকুও উচ্চবাচ্য করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন সবকিছু ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখতে। কিন্তু তিনি যা চাইবেন সবকিছু সে রকমই হবে তেমন তো কথা নয়। জুঁই স্বয়ং নিজে ফোন করে আবুল বাশারের সতীর্থ বন্ধুদের সবকিছু জানালেন। ঈদের একদিন পর কয়েকটি সংবাদপত্র ফলাও করে সবিস্তারে সংবাদটি ছাপল। দু’দিন পরের ঘটনা। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা খুলতেই আবুল বাশার দেখলেন সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে ওসি খোদাবক্সকে। খবরটি পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল আবুল বাশারের। পুরো দিন ঘরের ভেতর পায়চারি করলেন একা একা। আর ভাবতে লাগলেন কী করা যায়।আইজি বদরুল আলম খন্দকার অফিস কক্ষে বসে ঊর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। এমন সময়ে বেয়ারা এসে বদরুল সাহেবকে জানালেন- এক সাংবাদিক সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে অপেক্ষা করছে বাইরে। বদরুল আলম বেয়ারাকে ইশারা করে তাকে ভেতরে নিয়ে আসতে বললেন।রুমে ঢুকেই হাতখানা বাড়িয়ে আইজি সাহেবের সঙ্গে করমর্দন করতে করতে নিজের পরিচয় দিলেন আবুল বাশার। তারপর বললেন- পেশায় আমি সাংবাদিক হলেও একটু আধটু লিখালিখিও করি।আইজি সাহেব চোখে মুখে প্রসন্নতা এনে বললেন, আরে বসুন বসুন। আপনার উপন্যাস আমি পড়েছি কয়েকটা। দুর্দান্ত ও অনবদ্য। আপনার মতো গুণী মানুষের সঙ্গে যা হয়েছে সত্যি সেটি দুঃখজনক। ওই ওসিকে কিন্তু সাময়িকভাবে সাসপেন্ডও করা হয়েছে ইতিমধ্যে। আপনি এখন সন্তুষ্ট নিশ্চয়ই।আবুল বাশার বললেন, আসলে আমি এ কারণেই এসেছি আপনার কাছে। সাসপেন্ড অর্ডারটি বাতিল করতে হবে।কী বলছেন? কিন্তু কেন? আবুল বাশার মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধিত করে অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, আমি কারও পেটে লাথি মারতে চাই না। এ রকম আরও শতশত খোদাবক্স পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। একজনকে ছাঁটাই করে কী করবেন। তাতে কি সব অনাচার বন্ধ হয়ে যাবে। জানি হবে না। যদি সম্ভব হয় দেশের এ পুলিশ ডিপার্টমেন্টটাকে একটি ইন্সটিটিউশনে রূপান্তরিত করুন। পারবেন।বদরুল আলম বললেন, সেটি কি আর আমার একার হাতে সাহিত্যিক সাহেব। চাইলে সেটি পারেন আমাদের ওপরওয়ালারা। যা হোক, আপনার এ সিদ্ধান্তে আমি মুগ্ধ হলাম। লেখক : আইনজীবী, গল্পকার ও কথাসাহিত্যিকই-মেইল :  [email protected]//এআর

এমটিসিএ গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড পেলেন প্রফেসর মোবাশ্বের আলী (মরণোত্তর)

বাংলা ভাষার গবেষণা, উন্নয়ন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের এমটিসিএ গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড (মরণোত্তর) পেলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক ও ভাষা সৈনিক প্রফেসর মোবাশ্বের আলী। আজ মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) মরহুম প্রফেসর মোবাশ্বের আলীকে পুরষ্কার প্রদান করা হয়। ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্সের মিলনায়তনে পরিবারের পক্ষ থেকে তার দৌহিত্র নওয়াজিশ মুহাম্মদ আলী পুরষ্কার গ্রহণ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি প্রফেসর আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।   পুরষ্কার প্রদান উপলক্ষে এমটিসিএ গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী ও সংগঠক প্রফেসর ভোলানাথ দত্ত বলেন, এ ধরনের কৃতি পুরুষকে সম্মানিত করতে পেরে দু দেশের সম্পর্কের বন্ধন আরো জোরালো হবে।    

অণুকাব্য

এক স্রোতস্বিনী বহেদিনক্ষণ কি বা রাত ভোর বাতাসেএকটা গান ভেসে ভেসে আসেঅদেখা ছবি, নীরবে সহেআর দণ্ডিত দ্বিধায়ফসলের বীজকোষ বেড়ে ওঠে একাযাচে সহজ সখ্যতা, অথবা মাগে আকাশএ তার কোন দায়? দুই আমি আছি আকাশেমেঘের মতো, কখনো সাদা কখনো কালোরং বদলায তবে আজন্ম ভাসমানআমি আছি সমুদ্রেবালুচর ছুঁয়ে যাই,তৃষ্ণার্ত চাতক আর মাটির তৃষ্ণা মিটাইস্থিরতা নেই, চিরকাল আবহমানতিন শ্রাবণের পূর্ণিমা রাতজোৎস্না আর বৃষ্টির প্রেম ডাকে বারবারচলো সবুজে রাখি একে অন্যের হাতডেকেছে রূপালী আলোর বাণনদী আর পাহাড়ে পাতালো মিতালীকী করে ফেরাবো এ আহ্বান? চার যাইযাচ্ছি কিন্তু..আর বলবো না, এবার কিন্তু যাবোইএভাবে বলতে বলতেই একদিন ঠিক চলে যাবোকখনো কাঁটাতার যদি প্রেমিকার সাদা ওড়না হয়অথবা জেলখানা হয় পদ্মফুলের আসনতবে ফিরবো একদিন অতিথি হয়েতোমাদের এ নগরীতে।এখনো সীমান্ত খোলা আছে আমারদু’চোখ সতেজ, সদ্য ঘাসে ঝরা শিশিরের মতোতাই যাচ্ছিযাই কিন্তুযেতে যেতে পিছু ফিরবো না আর। পাঁচচৈত্রের শেষ বিকেলআলো ছায়ার খেলার মাঝে বিন্দু বিন্দু অভিমান জমে অন্ধকারেই মৃত্যু হলো একটা গল্পেরপ্রতিদিন দ্বন্দ্ব কিংবা প্রেম আজ দ্রোহের রুপে মুরতি একতবু নি:শ্বাস যা বাকি আছে, নাম নিয়ে টানে এফোঁড় ওফোঁড়কি বেহায়া নি:শ্বাস!যে কেউ অনায়াসে গলা টিপে হত্যা করতে চাইবে সে বেহায়া নি:শ্বাস। ছয় তোমার আকাশ ঝুলছে হাওয়ায়শহরে অতিথি কাকডাকে ভোরে, সঙ্গীদেরআর ডালে ডালে ডানা ঝাপটায়.. সাত ঝড়ের সাথে বৃষ্টি নাকি বৃষ্টির সাথে ঝড়?বৈশাখী এলোকেশ, দ্বন্দ্ব;নাকি অসম অণুস্বর..? 

ডেল কার্নেগীর বিখ্যাত ৫টি উক্তি

মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার করে আছেন ডেল কার্নেগী। তার বিখ্যাত ‘হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আজও এই বইটির জুড়ি নেই। কার্নেগীর গবেষণার বিপুল ভাণ্ডার থেকে পাঁচটি উক্তি- জীবনে পাওয়ার হিসাব করুন, না পাওয়ার দুঃখ থাকবে না। আত্মসম্মান, আত্মজ্ঞান, আত্মনিয়ন্ত্রণ- এই তিনটিই শুধু মানুষকে গড়ে তুলতে পারে। সঠিক জীবনযাপন নির্ভর করে এদের উপরে। অনুকরণ নয়, অনুসরণ নয়, নিজেকে খুঁজুন, নিজেকে জানুন, নিজের পথে চলুন। জগতে যা সবচেয়ে খারাপ হতে পারে তা মেনে নাও। তুমি যদি সবচেয়ে বড় হতাশাগ্রস্ত হও তাহলে মেনে নাও মৃত্যু তোমার জন্য সবচেয়ে খারাপ হতে পারে। এখন তুমি তোমার কাজে মনোযোগী হও। মনে রেখ শরীরের জন্য জীবন নয় বরং জীবনের জন্য শরীর। তুমি হয়তো বা ‘চালস ডিকেন্স’ বা শেক্সপিয়ার হতে পারবে না। কিন্তু তুমি তোমার সময়কালের সেরা একজন হতে পার। নিজের ইচ্ছাকে রোজ কাজে লাগান। যতবার পারেন চেষ্টা করুন। কঠিন কোনো কাজের চেষ্টা করুন। যে কাজ করতে আপনার আদৌ কোনো ইচ্ছে নেই। ‘সুখকে’ একবার ফিরিয়ে দিন। সুখকে অন্তত একবারের মতো ত্যাগ করুন। এটাই হলো ইচ্ছা সমন্বিত কাজের পথ, নিয়মিত কাজের পথ, সৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত কাজের পথ। ডব্লিউএন

তিন ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটি একইসঙ্গে ইংরেজি, হিন্দি ও জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হবে বলে জানিয়েছেন আগামী প্রকাশনের স্বত্তাধিকারী ওসমান গণি। তিনি বলেন, বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করবে আগামী প্রকাশনী। হিন্দি সংস্করণ কোলকাতার একটি প্রকাশনা সংস্থা এবং জার্মানের একটি প্রকাশনা সংস্থা জার্মান ভাষায় বইটি প্রকাশ করবে। ওসমান গণি বলেন, ইংরেজি সংস্করণ আগামী বইমেলায় প্রকাশ করা হবে। ইংরেজি অনুবাদের কাজ চলছে, হিন্দি ও জার্মান ভাষায় অনুবাদ কাজের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তিনি জানান, শেখ হাসিনার ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইটি প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে কলকাতা বইমেলায়। ওই সময় কলকাতার বইমেলা উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কলকাতার প্রকাশনা সংস্থা ‘সাহিত্যম প্রকাশনালয়’ মেলায় বইটি প্রকাশ করে। আগামী প্রকাশনী থেকে বইটির বাংলাদেশ সংস্করণ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশের বইমেলায়। ওই সময় থেকে বইটির ব্যাপক চাহিদা থাকায় সাতটি সংস্করণ হয়। সর্বশেষ সংস্করণ হয় ২০১৭ সালের বইমেলায়। ১১৪ পৃষ্ঠার বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। বইটিতে পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে ভূমিকা লিখেছেন ড. রফিকুল ইসলাম ও প্রস্তাবনা লিখেছেন পার্থ ঘোষ। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে, শেখ মুজিব আমার পিতা, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সেনাবাহিনী, ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। তৃর্তীয় অধ্যায়ে রয়েছে, স্মৃতির দখিন দুয়ার-এক, স্মৃতির দখিন দুয়ার -দুই ও স্মৃতি বড় মধুর বড় বেদনার। তৃতীয় অধ্যায়ে ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী, বেগম জাহানারা ইমাম ও নূর হোসেনের তিনটি লেখা রয়েছে। শেষ অধ্যায়টির শিরোনাম হচ্ছে ‘একানব্বইয়ের ডায়েরি। সূত্র : বাসস। আর/ডব্লিউএন

মনের পশু, কোরবানির পশু কার্ল মার্কস ও আব্রাহাম লিংকন

২২ সেপ্টেম্বর ১৮৪২ সাল। ভোরের আলো ইতিমধ্যে বেশ খানিকটা ফুটে উঠেছে চারদিকে। জেমস শিল্ডস তার গায়ে চাপানো ওয়েস্ট কোটের পকেট থেকে ঘড়িটি বের করে বারবার শুধু চোখ বুলাচ্ছেন। তবে কি লিংকন আসবে না লড়তে তার সঙ্গে। মিসিসিপি নদীর এক পাশে মিজৌরি অন্য পাশে ইলিনয় রাজ্য। জেমস শিল্ডস এবং আব্রাহাম লিংকন দু’জনেরই আবাস ইলিনয় রাজ্যে হলেও অসিযুদ্ধের স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে নদীর যে পাশটায় মিজৌরি রাজ্য সেখানটায়। কারণ অন্য কিছু নয় ১৮৩৯ সালেই আইন করে ইলিয়ন রাজ্যে ডুয়েলিং অর্থাৎ অসি যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জেমস শিল্ডস ও আব্রাহাম লিংকন দু’জনই আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। এই তো কিছুদিন আগেই আব্রাহাম লিংকন বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ইলিয়ন রাজ্যের সংসদ সদস্য হিসেবে। অন্যদিকে জেমস শিল্ডস ওই রাজ্যের নামডাকওয়ালা আইনজীবী। দু’জনই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই হয়তো তাদের মধ্যে এই অসিযুদ্ধ দেখার জন্য সহস্র লোকের আগমন ঘটেছে মিসিসিপি নদীর তীর ঘেঁষে। লিংকন ও শিল্ডস এই দু’জনের মধ্যে অসন্তোষ ধুমায়িত হয়ে উঠার পেছনের কারণটি নিছক তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন। ইলিয়ন রাজ্যের একটি পত্রিকার নাম ‘সানগামো’। সেই পত্রিকায় রেবেকা নামে জনৈক ছদ্মবেশী লেখিকা জেমস শিল্ডসের নামে নিন্দে-মন্দ করে কিছু চিঠি লিখেছিলেন। সানগামো পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে সেই চিঠিগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। লেখিকা রেবেকা শিল্ডসকে এই বলে দোষারোপ করতে থাকেন যে, একজন আইনজীবী হয়ে কিভাবে শিল্ডস ইলিয়ন রাজ্যের মানুষের অমঙ্গল হয়- এমন কিছু আইন তৈরিতে ভূমিকা রাখলেন। এ জন্য চিঠিগুলোতে তাকে কাপুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং যেহেতু তার পূর্ব পুরুষ আয়ারল্যান্ড থেকে এসেছিলেন সেহেতু শিল্ডসকে আয়ারল্যান্ড ফিরে যেতে বলেন রেবেকা নামের ছদ্মবেশী সেই লেখিকা। জেমস শিল্ডসের ধারণা যে, চিঠিগুলো হয়তো রেবেকা নামের ছদ্মবেশে আসলে আব্রাহাম লিংকন কিংবা লিংকনের প্রণয় কন্যা মেরি টড লিখে পত্রিকায় পাঠাচ্ছেন। এ জন্য তিনি লিংকনকে অসিযুদ্ধে আহ্বান করলেন। যেহেতু প্রথমে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন জেমস শিল্ডস। সেহেতু ডুয়েলিংয়ের নিয়ম বেঁধে দেওয়ার অধিকার লিংকনেরই। লিংকন বললেন, অসিযুদ্ধের অস্ত্র হবে তলোয়ার। আর স্থান মিজৌরির মিসিসিপি নদীর পাশে। রৌদ্রের তেজদীপ্ত আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার আগেই লিংকনও এসে উপস্থিত হলেন সেখানে। ছয় ফুট চার ইঞ্চি দীর্ঘকায় লিংকনের সামনে জেমস শিল্ডসকে বেশ খানিকটা খর্বকায়ই মনে হচ্ছিল। শিল্ডসকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ক্রোধে তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। অসিযুদ্ধের শুরুতেই অতিকায় লিংকন এক কোপে জেমস শিল্ডসের পাশের উইলো গাছের একটি প্রশাখা কচুকাটা করে দিলেন। এরপরই ঘটল ঘটনাটি। হঠাৎ দৈববাণীর মতো লিংকনের মনে কি যেন এক ভাবোদয়ের সৃষ্টি হল কে জানে? তিনি মনে মনে ভাবলেন কেন তিনি আজ শিল্ডসের সঙ্গে এখানে এই অসিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। যদিও সব দোষ জেমস শিল্ডসেরই। তিনিই লিংকনকে এখানে এই যুদ্ধে আহ্বান করেছেন। কিন্তু তারপরও তিনি কেন তার মনের অবাধ্য এই হিংস্র পশুটির নাগাল টেনে ধরতে ব্যর্থ হলেন। তবে কী জেমস শিল্ডসকে হারিয়ে তিনি তার হৃদয়শ্বরী মেরি টডকে মুগ্ধ ও বিমোহিত করতে চেয়েছিলেন। ছিঃ...ছিঃ... ছিঃ... নিজেকে আজ যথেচ্ছা ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হল তার। লিংকন শিল্ডসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, দেখতেই পাচ্ছ শিল্ডস। আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমার হাত দুটোও তোমার হাতের চেয়ে বেশ লম্বা। আমি চাইলেই আমার তলোয়ারের এক ঘায়ে তোমার মুন্ডুটি ধড় থেকে আলাদা করে দিতে পারি। কিন্তু এ যুদ্ধে আমি অংশ নিতে চাই না। আমাকে তুমি শুধু শুধুই সন্দেহ করছ। আমি সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ ও নিরপরাধ। এসো তোমার প্রতি আমি আমার বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। ইত্যবসরে জেমস শিল্ডসও তার ভুল ঝুঝতে পারলেন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে তারা একজন আরেকজনের বন্ধু হিসেবেই রইলেন। ঈদুল আজহা উৎসবটি বছরান্তে আমাদের মাঝে ফিরে আসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে। নানা রঙ ও বর্ণের গবাদিপশুর সমারোহে খণ্ড খণ্ড হাট বসে শহর-গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে। হরেক রঙের গরু, মহিষ, উট কিংবা ছাগল, ভেড়াগুলোকে দেখে মনে হয় যেন শিল্পীর পটে আঁকা কোন ছবি। আমরা আমাদের সাধ্যমতো যে কোনো একটি পশু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দিয়ে থাকি। গরিব-দুস্থদের মধ্যে গোশত বিলি-বণ্টন ছাড়াও এর অন্য একটি বৃহৎ তাৎপর্য রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই আমরা সেই তাৎপর্যটি বেমালুম ভুলে যাই। একটি কোরবানি সম্পাদন করার মধ্য দিয়ে প্রত্যেক মানুষের মনের পশুটিকেও কোরবানি দিতে হয়। কিন্তু সমাজে আমরা ক’জন সেই মনের পশুটির কথা একটিবার চিন্তা করি। মনের পশু তো অনেক দূরের কথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই যে আমরা কোরবানি দিচ্ছি সেটাই ভুলে যাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। আমাদের সমাজে কোরবানি বিষয়টি বর্তমানে পরিণত হয়েছে একটি অলঙ্কারিক ও লোক দেখানো উৎসবে। অনেক মানুষই হাটের সবচেয়ে বড় ও তাগড়া গরুটি কিনে আশপাশের দু’চারপাড়া-মহল্লা ঘুরিয়ে এনে তারপর কোরবানি দেন। এটা করেন সাধারণত নিজের বিত্তবৈভব ও প্রতিপত্তি জাহির করার প্রয়াসে। সমাজে বর্তমানে এটি একটি হাস্যকর ও অসার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর কোরবানি ঈদে ১০ কোটি পশু কোরবানি হয়। তার মধ্যে শুধু পাকিস্তানেই কোরবানি হয় এক কোটি পশু। সত্যি করে বলতে গেলে বলতে হয়, বিশ্বজুড়ে ১০ কোটি কোরবানির পশু থেকে আহরিত গোশতের কতটুকু অংশ দুস্থ ও নিরন্ন মানুষের ভাগ্যে জোটে- সেটা বোধকরি সহজেই অনুমেয়। বিশেষ করে আমাদের দেশে দেখা যায় কোরবানি ঈদের আগেই ফ্রিজ রেফ্রিজারেটর কেনার মহোৎসব পড়ে যায় যাতে করে কোরবানির গোশতগুলো ভালো করে মজুদ করে রাখা যায়। ঈদুল আজহার অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগের ভোজ। তবে এই আত্মত্যাগ শুধু ভোজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়, এই আত্মত্যাগ হওয়া প্রয়োজন মনের পঙ্কিলতা, বিদ্বেষ ও হিংস্রতার। ঈদুল আজহার এই তাৎপর্য ও চেতনা আমাদের যেন কিছুই শেখাতে পারছে না আজকাল। আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মনের ভেতরই বাস করে ভয়াবহ দৈত্যবৎ এক হিংস্র পশু যা আমাদের প্রায় প্রত্যেককেই গ্রাস করে রাখে। আজকাল আমরা এতটাই হিংস্র হয়ে উঠেছি যে, কারও কাজে ও কর্মে কিঞ্চিৎ ক্ষতিগ্রস্ত হলেই আমরা আমাদের সেই অঘোষিত প্রতিপক্ষকে আরও অধিক ও ভয়ানকভাবে আক্রমণ করি। অনেক ক্ষেত্রেই সেই আক্রমণ হয় কাপুরুষোচিত। ছুরি বসিয়ে দিই পেছন থেকে। রাজনৈতিক হীনস্বার্থসিদ্ধির জন্য রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে আসি প্রতিপক্ষের কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে। চিরদিনের জন্য তাকে পাঠিয়ে দিই অজ্ঞাত কোনো স্থানে। মানুষের মনোজগতের এই যে ব্যাপক পরিবর্তন এটা কিন্তু অতীতে ছিল না। এই তো পঞ্চাশ-একশ’ বছর আগেও কারও সঙ্গে কারও শত্রুতা থাকলে সেই শত্রুতা নিরসনে একজন আরেকজনকে অসি যুদ্ধে অর্থাৎ ডুয়েলিংয়ে আহ্বান করতেন। ইতিহাসে এরকম শত সহস্র উদাহরণ পাওয়া যাবে। তবে এই মুহূর্তে আমার কার্ল মার্কসকে নিয়ে একটি ঘটনা মনে পড়ছে। সেটা ছিল ১৮৩৬ সাল। কমিউনিজম দর্শনটির জন্মদাতা বিশ্ব বিশ্রুত কার্ল মার্কস যখন কলেজের পাঠ চুকালেন তখন তাকে তার বাবা হেনরিক মার্কস পাঠিয়ে দিলেন জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবার দুই চোখে স্বপ্ন ছেলে একদিন অনেক বড় আইনজীবী হবে। এটা হয়তো অনেকেরই জানা নেই যে ছাত্রাবস্থায় কার্ল মার্কস মেধাবী কিংবা মনোযোগী ছাত্র ছিলেন না। আইন পড়ায় মন না দিয়ে ডুবে রইলেন মদ, জুয়া, নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ও কুসংসর্গে। মার্কসের বাবা ছেলের জন্য যে পরিমাণ টাকা পাঠাতেন তাতে পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জলপানির খরচ হয়তো বা কোনো মতে নির্বাহ হতো কিন্তু তার এই জুয়ার টাকা জোগান দেবে কে? আর এ জন্যই কার্ল মার্কসকে টাকা ধারের জন্য হাত পাততে হতো ক্লাসের সতীর্থদের কাছে। কিন্তু ধীরে ধীরে ধার জমে গেল বিস্তর। ধার শোধ দেয়ার সামর্থ্য নেই কার্ল মার্কসের। এদিকে বন্ধুরা সব প্রতিনিয়ত তাগাদা দিচ্ছে। অবশেষে এক বন্ধু কার্ল মার্কসকে আহ্বান জানালেন- ধার শোধ দাও নইলে অসিযুদ্ধে অবতীর্ণ হও। প্রতিপক্ষ বন্ধুর ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ ফিরিয়ে দেয়ার উপায় নেই- কারণ তা না হলে বন্ধুর পাওনা সমুদয় অর্থ শোধ করতে হবে তাকে। সে সামর্থ্যও নেই কার্ল মার্কসের। অবশেষে অসিযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন তিনি। সেই ডুয়েলিংয়ে বেশ ভালোরকম আহত হন কার্ল মার্কস। নাকের ডগা থেকে কান অব্দি গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয় বন্ধুর তরবারির আঘাতে। সেই ক্ষতস্থান ঢাকতে ১৪টি সেলাই দিতে হয় ডাক্তার বেচারাকে। মার্কসের বাবা এসব শুনে নিদারুণ মর্মাহত হন। অবশেষে ছেলের যাবতীয় দেনা শোধ করে বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে নতুন করে ভর্তি করিয়ে দিলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে।আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যে সব মানুষ আলোকিত ও বুদ্ধিমান তারা তাদের প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে। যা হোক, মনের পশু নিয়ে কড়চা অনেক হলো এবার বনের পশু অর্থাৎ কোরবানি ঈদ নিয়ে দু-চার কথা বলা যাক। আরব সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিস্টাব্দে রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে সেই যে যখন যুদ্ধ করেছিলেন সেই তখন থেকে শুরু। ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এর অনুষঙ্গ হিসেবে ইসলামিক উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠানেরও বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। তবে বাংলাদেশে ঈদুল আজহা তথা কোরবানি শুরু হয় মুঘল আমলে বঙ্গের রাজধানী ঢাকা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অর্থাৎ ১৬০৮ সালের দিকে। তবে সেই মুঘল আমল থেকে ইংরেজ আমলের অনেক দিন পর্যন্ত গরু কোরবানি হতো শুধু ঢাকায়। সে সময়ে মুসলমানদের জন্য ঢাকার বাইরে কোরবানি ঈদ পালন করাটা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। কেন না স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা মুসলমান প্রজাদের কোরবানি দিতে বাধা দিতেন। ৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯০ সালের ‘সুধাকর’ পত্রিকাটির মাধ্যমে জানা যায় যে, বগুড়া জেলার নারহাট্টার জমিদারদের আমলারা মুসলমানদের কোরবানি দিতে দেয়নি। মুসলমানদের কোরবানি করতে না দেয়ার কারনে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ততা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। অন্যদিকে ইংরেজ সরকার তা দেখেও না দেখার ভান করত। কারণ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব তাদের শাসনকার্যের সুবিধার্থে বিশেষভাবে প্রয়োজন ছিল। কোরবানি ঈদের আরেকটি নাম যে ‘বকরি’ ঈদ সেই নামটিও এ কারণেই উদ্ভব হয়। হিন্দু জমিদারের আওতাধীন মুসলমানরা যেহেতু গরু কোরবানি দিতে পারত না, সেই জন্য তারা ছাগল কিংবা খাসি কোরবানি দিত। আর বকরি নামটি সম্ভবত এসেছে আরবি সূরা বাকারা থেকে যার অর্থ গাভী। আরবি বাকারা শব্দটির অর্থ গাভী হলেও শব্দটি আংশিক বিকৃত হয়ে ছাগল শব্দটির সমার্থক শব্দ ‘বকরি’ হিসেবে কালক্রমে বিশেষভাবে প্রচলিত হতে থাকে।প্রথাগতভাবে শুধু একটি পশু কোরবানি করে আমাদের দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। যদিও ধর্মীয় রীতিনীতির কারণে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমরা কোরবানি দিয়ে থাকি কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যও আমাদের অনুধাবন করতে হবে। মনের সব জটিলতা, হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে ঈদকে করতে হবে আরও মানবিক ও অর্থবহ- তবেই ঈদের খুশি হবে সার্বজনীন ও সবার জন্য কল্যাণকর।লেখক : আইনজীবী, কথা সাহিত্যিক, কলামিস্ট।//এআর

-----শ্যামল মেয়ে-----

ওগো শ্যামল মেয়ে কি দেখছো চেয়ে, পুকুর জলে আলো ছায়ার মিতালি! নাকি ভাবছো কেমন করে দূরের ওই আকাশ ডুবলো এই পুকুরে! ভাবছো বুঝি সূর্যটার বসত এই পুকুর তলে! আকাশেও সূর্য পুকুরেও সূর্য, কোনটা আসল, কোনটা নকল ভেবেই হচ্ছো ব্যাকুল। বোঝ না কেন আকাশ কখনো ডুবতে পারে না পুকুর তলে। দেখছো যা আসল নয় তা, সবই তোমার চোখের ভুল। প্রতিবিম্বকে ভাবছো আসল, আসলে তা নয়তো আসল। কার বিরহে কাতর অমন! সইছো কার ছলনা! কাকে তুমি আসল ভেবে, বেসেছিলে ভালো অমন। আমি আছি তোমারই পাশে, বাড়িয়ে হাত, ধরবে কখন ! আসল চেনো, নকল ছাড়ো। ছায়ার পিছে ছুটো না, ছায়া তোমায় দেবে ধোঁকা, কিছু বলতে পারবে না। তাইতো বলি এসো মেয়ে, আসল হাতটি ধরো এসে, সুখে থাকবে অবশেষে।

নজরুলের সাম্যবাদ ও তার উৎস-সন্ধান

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের শেষ অভিভাষণে বলেছেন আমার কাব্য আমার গান আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নিয়েছে। বিনা কারণে তিনি কিছুই সৃষ্টি করেন নাই। ‘এ নহে বিলাস বন্ধু...‘ গানে যেন তিনি এ কথাই বলেছেন। একজন মহাপুরুষকে বুঝতে হলে তাঁর আগমনকালীন সমাজ ব্যবস্থা, পরিবেশ-পরিস্থিতিকে বুঝতে হয়। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে চুরুলিয়ায় তাঁর জন্ম। ন’বছর বয়সে হন এতিম। পূর্বপুরুষ ছিলেন ভারতের বিচার বিভাগের উচ্চ পদস্থজন। কাজী উপাধি তারই সাক্ষ্য বহন করে। একটি পরাধীন দেশে তাঁর জন্ম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতের সব কিছু লুটপাট করে সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে পাচার করছিল। দারিদ্রের কষাঘাত, ধনী-গরীবের আকাশ-পাতাল তারতম্য, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, মারামারি, হিন্দু-মুসলমানে দিন রাত হানাহানি ইত্যাদি ছিল সেই সময়ের চিত্র। ১৯১৯ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যখন নজরুল সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, তখন পৃথিবীর ৭২ শতাংশ রাষ্ট্র ছিল উপনিবেশ, আর প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ ছিল পরাধীন। উপনিবেশ আর পরাধীনতার কষাঘাতে জর্জরিত মানুষ, পর্যুদস্ত মানবতা। অপরদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রেও যে সকল মানুষ সুখী নয় তা তো বলাই বাহুল্য। মোটকথা, পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পদ, ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কতিপয় লোকের হাতেÑ যা তখনও ছিল এখনও আছে। নজরুল এসেছিলেন সব ধরনের বৈষম্য দূর করার জন্য। কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদের এমন জোরালো প্রবক্তা পৃথিবীতে কোনো কবি-সাহিত্যিক পৃথিবীতে আমাদের জানামতে আর কেউ নেই। বলাবাহুল্য নজরুলের সাম্যবাদ হৃদয়লব্ধ বস্তু। প্রজ্ঞার চেয়ে আবেগের প্রাধান্য তার মধ্যে বেশি। অনেক জায়গায় উচ্ছ্বাসের মুখে নজরুল কবিতার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেননি। এতদসত্ত্বেও তাঁর সাম্যবাদের মধ্যে যে সমাজ সচেতনতা, যে সংস্কার মুক্তিপ্রবণতা ও যে সাম্যপ্রীতি প্রকাশিত হয়েছে তা অনন্যসাধারণ। নজরুলের সাম্যবাদে ঈশ্বরের অস্বীকৃতি নেই। নজরুলের সাম্যবাদী উক্তি তাদের বিষয়েই, যারা মানুষের সমাজে কৃত্রিম ভেদাভেদ রচনা করে নিজেদের স্বার্থসাধনে রত। এই জগতে সকলেই অসাধু ভণ্ড নয়; কেননা   ‘অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান।’ কাম, প্রলোভন ইত্যাদি মানবিক প্রবৃত্তি তো দেহধারী মাত্রের মধ্যেই উপস্থিত, কিন্তু এদের জয় করার সাধনস্পৃহাও সকল হৃদয়ে বর্তমান। নজরুলের সাম্যবাদে মানবিক দুর্বলতা স্বীকৃত এবং সেই সঙ্গে এই দুর্বলতাকে জয় করে নবসমাজ গঠনের ইঙ্গিতও পরিস্ফুট। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতাটিতে তিনি পতিতা নারীর মাতৃত্বকেই মা বলে সম্বোধন করেছেন। পতিতাবৃত্তিকে তিনি সতীকর্ম বলেননি। কামনার পথেই সন্তান আসে। পতিতার ক্ষেত্রে এই কামনা অবৈধ সন্দেহ নেই। কিন্তু পতিতার ভাল হবার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়াকে নজরুল সমর্থন করেননি। কেননা ‘পাপ করিয়াছি বলিয়া নাই কি পুণ্যের অধিকার? ‘ অসৎ চরিত্রের জন্যে যেমন নারী পতিতা হয়, তেমনি চারিত্রিক দোষের জন্যে নরকেও পতিত করা উচিত। নরনারীকে সমান সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবার আকাক্সক্ষা থেকেই নজরুলের ‘বারাঙ্গন‘, ‘নারী’ প্রভৃতি কবিতার জন্ম। [নজরুল-চরিত মানস, ড. সুশীলকুমার গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা (এপ্রিল ২০১২) পৃ. ১৬৬] নজরুলের সাম্যবাদ সর্বব্যাপী, সর্বপ্লাবী। এর মধ্যে নেই কোনো অস্পষ্টতা, নেই কোনো ভণিতা-ভণ্ডামি। এটি অবশ্য নজরুল-মানসের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যে, তিনি যা বিশ্বাস করেছেন তাই বলেছেন এবং যা বলেছেন তাই করেছেন। কোনো কিছু পাশ কাটিয়ে মহাকাব্য রচনার কবি তিনি নন। বরং সবকিছুকে হৃদয়ে ধারণ করে, জীবনের সবটুকু আকুতি দিয়ে মানবমুক্তির সনদ রচনার মহামানব তিনি। তিনি কবিÑ এটি তার আংশিক পরিচয়; প্রকৃত অর্থে গোটা পৃথিবীকে সৌন্দর্যময় মহাকাব্যে রূপান্তরের মহাকবি তিনি। সেই অর্থে তিনি মানবকুলের অন্তরঙ্গ বন্ধুদের অন্যতম। মানুষকে নিয়েই পৃথিবী, মানুষের সুখ-শান্তির মধ্যেই সমগ্র পৃথিবীর সৌন্দর্য। মানুষ বলতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকেই বুঝতে হবে, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই যদি সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়, প্রতিটি মানুষের যদি মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তা মেলে, তবেই পৃথিবী সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হবে। আর এমন পৃথিবীই মানব জাতির সকলেই কামনা করেন, কেবল অত্যাচারীরা ব্যতীত। সুন্দর পৃথিবী-প্রত্যাশী মানবগোষ্ঠীর মধ্যে মুষ্ঠিমেয় যে ক’জন নকীবের ভূমিকা পালন করেছেন তাঁদেরই অন্যতম কাজী নজরুল ইসলাম। চলমান ঘুণেধরা বিশ্বব্যবস্থার ভিত্ কাঁপানো নজরুলের শ্রেষ্ঠতম কবিতা  ‘বিদ্রোহী’ যেন মানবমুক্তির আকুল-আকুতি যার শেষাংশে নজরুল-মানস পরিস্ফূটিত হয়েছে এভাবে  ‘মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি  সেই দিন হব শান্ত! ’ (বিদ্রোহী: কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল কেবল সাম্যের বাণী প্রচার করেননি, তিনি অসাম্যের কদর্য রূপটি প্রত্যক্ষ করেছেন, এর ভয়াবহতা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর সকল কর্ম ও সাধনা দিয়ে সব ধরনের অসাম্য দূর করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সেই পথচলায় সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের গোটা সাহিত্য, রেখে গেছেন মানবমুক্তির চিরকালীন উপাদান। নজরুলের সাম্যবাদ চাপিয়ে দেয়া কোন বিষয় নয়, কারও দয়ার দানও নয়। বরং এটি প্রকৃতির আইনেরই অংশ যা অলঙ্ঘণীয়। এ পৃথিবীর মালিকানা কোন ব্যক্তি, জাতি, গোষ্ঠী বা দেশ বিশেষের নয়। মালিকানা একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহর সৃষ্ট জীব হিসেবে সকল মানুষের সমঅধিকার রয়েছে সবকিছুর মধ্যে। আর এটিই সাম্যের মূলমন্ত্র। নজরুলের ভাষায় রবি শশী তারা প্রভাত-সন্ধ্যা তোমার আদেশ কহে ‘এই দিবা রাতি আকাশ বাতাস নহে একা কারো নহে। এই ধরণীর যাহা সম্বল বাসে-ভরা ফুল, রসে ভরা ফল, সু-স্নিগ্ধ মাটি, সুধাসম জল, পাখির কণ্ঠে গান, সকলের এতে সমঅধিকার, এই তাঁর ফরমান!’ (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) সাদা আর কালোর মধ্যে কোন বৈষম্য আনয়নের নৈতিক বা আইনগত অধিকার কারোর নেই। কেননা শ্বেত পীত কালো করিয়া সৃজিলে মানবে, সে তব সাধ। আমরা যে কালো, তুমি ভালো জান, নহে তাহা অপরাধ! তুমি বল নাই, শুধু শ্বেতদ্বীপে জোগাইবে আলো রবি-শশী-দীপে, সাদা র’বে সবাকার টুঁটি টিপে, এ নহে তব বিধান।’ (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) কিন্তু বিধির বিধানকে পদদলিত করে অসাম্যের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে অস্থির করে রেখেছে মানুষ নামধারী লোভী আর ঈর্ষাতুর কতিপয় পাপাত্মা। এরা কখনো রাজা, কখনো জমিদার, কখনো বা মহাজন সেজে অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন করে। নজরুলের কলমে তা ফুটে ওঠেছে এভাবে তোমারে ঠেলিয়া তোমার আসনে বসিয়াছে আজ লোভী, রসনা তাহার শ্যামল ধরায় করিছে সাহারা গোবী! মাটির ঢিবিতে দু’দিন বসিয়া রাজা সেজে করে পেষণ কষিয়া! সে পেষণে তারি আসন ধসিয়া রচিছে গোরস্থান! ভাই-এর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে বীরের আখ্যা পান!’ (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) মানুষে মানুষে যারা বৈষম্যের জগদ্দল পাথর সৃষ্টি করে যাচ্ছে তাদের মূলোৎপাটন তো দূরের কথা, উল্টো তাদেরকে বীরের আখ্যা দেয়া হয়। প্রকৃতির বিধানের সাথে এ যেন এক নির্মম পরিহাস। কবি এ চিত্রটি এঁকেছেন এভাবে-           জনগণে যারা জোঁকসম শোষে তারে মহাজন কয়,           সন্তানসম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।                    মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ,                    মাটির মালিক তাঁহারাই হন           যে যত ভণ্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান্। নিতি নব ছোরা গড়িয়া কসাই বলে জ্ঞান-বিজ্ঞান। (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) কিন্তু বৈষম্য সহ্য করা কোন মানুষেরই উচিত নয়। অত্যাচারিতদের বাহ্যত দুর্বল মনে হলেও কার্যত এরাই শক্তিশালী। কেননা এদের যে কেবল সংখ্যাধিক্যের শক্তি রয়েছে তা-ই নয়, এদের রয়েছে সততার অপরাজেয় শক্তি। অত্যাচারিতদের অপরিমেয় সেই শক্তির উদ্বোধন কামনা করেছেন নজরুল। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে তিনি শত শতাব্দীর ঘুম ভেঙে সামনে যাবার স্বপ্ন-সাহস দেখিয়েছেন, অধিকার-হারা মানবগোষ্ঠীকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছেন, তাদের শিখিয়েছেন দৃপ্ত উচ্চারণ- তোমার দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বী সকলে করিব ভোগ, এই পৃথিবীর নাড়ী সাথে আছে সৃজন-দিনের যোগ। তাজা ফুলে ফলে অঞ্জলি পুরে বেড়ায় ধরণী প্রতি ঘরে ঘুরে, কে আছে এমন ডাকু যে হরিবে আমার গোলার ধান? আমার ক্ষুধার অন্নে পেয়েছি আমার প্রাণের ঘ্রাণ এতদিনে ভগবান! (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) যারা উদার আকাশে কালিমা লেপন করছে, শান্তির বেলুন যারা গুলির আঘাতে জর্জরিত করছে, তাদের মূলোৎপাটন করতে না পারলে সত্যিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই তো নজরুল-কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে- যে-আকাশ হ’তে ঝরে তব দান আলো ও বৃষ্টি-ধারা সে-আকাশ হ’তে বেলুন উড়ায়ে গোলাগুলি হানে কারা? উদার আকাশ বাতাস কাহারা করিয়া তুলিছে ভীতির সাহারা? তোমার অসীম ঘিরিয়া পাহারা দিতেছে কা’র কামান? হবে না সত্য দৈত্য-মুক্ত? হবে না প্রতিবিধান? (ফরিয়াদ : কাজী নজরুল ইসলাম) অসাম্যের প্রতিবিধান অবশ্যই হবে। কারণ ‘সাম্য’ সত্য। আর অসাম্য হ’ল দৈত্যরূপী মিথ্যা। দৈত্যের হাত থেকে সত্যকে মুক্ত করে সুন্দর পৃথিবী প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নজরুলকে আমরা পাই আপোসহীন হিসেবে, একজন নিরন্তর সাধক হিসেবে। তাঁর এ সাধনাকে দেখেছেন ‘সুন্দরের সাধনা’ হিসেবে। মানবসৃষ্ট অসাম্যের সকল প্রাচীর ভেঙে নজরুল সাম্যের গান শুনিয়েছেন। মানব-সাগরে তিনি সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং সাম্যের বার্তা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন- গাহি সাম্যের গান- যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুস্লিম ক্রীশ্চান। (সাম্যবাদী : কাজী নজরুল ইসলাম) সাম্যের এমন সাবলিল আহ্বান কেবল বাংলা সাহিত্যেই নয়; বরং বিশ্ব সাহিত্যেও আর কোন কবির কাব্যে আমরা পাইনি। তিনি মানুষকে দেখেছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হিসেবে। মানুষের মধ্যে তিনি পারস্পরিক আত্মার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। ফলে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সাম্যের সুললিত বাণী গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্। নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।- (মানুষ : কাজী নজরুল ইসলাম) মানুষ এমন জীব যার মাঝে স্বয়ং স্রষ্টার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আর এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাজেজা। কিন্তু মানুষ যখন আপন স্রষ্টাকে আপনার মাঝে না খুঁজে অন্যত্র খুঁজে বেড়ায়, তখন একদিকে যেমন স্রষ্টার সাথে তার সহজাত সম্পর্কে ছেদ ঘটে, ঠিক তেমনি বিব্রত বোধ করেন স্বয়ং স্রষ্টা, অপদস্থ হয় গোটা মানব-সত্তা। তাই স্রষ্টাকে খুঁজতে হবে নিজের মধ্যে। তাতে স্রষ্টা এবং সৃষ্টি উভয়ের মাঝে সহজাত সম্পর্কটি অটুট থাকবে এবং মানুষ তার মর্যাদার জায়গাটি ধরে রাতে সক্ষম হবে। কে তুমি খুঁজিছ জগদীশে ভাই আকাশ-পাতাল জুড়ে? কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে, কে তুমি পাহাড়-চূড়ে? হায় ঋষি-দরবেশ, বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ-দেশ! সৃষ্টি রয়েছে তোমা পানে চেয়ে তুমি আছ চোখ বুঁজে, স্রষ্টারে খোঁজো-আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে! (ঈশ্বর : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল প্রতিটি মানুষের মাঝেই স্রষ্টাকে প্রত্যক্ষ করেন। মানব-হৃদয় হ’ল স্রষ্টাকে পাবার তীর্থস্থান। ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই’ কিংবা ‘কারো মনে তুমি দিও না আঘাত/ সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে/ মানুষেরে তুমি যত কর ঘৃণা/ খোদা যান তত দূরে সরে সাম্যের এসব অমোঘ বাণী যাঁর কাব্য-কাননে জোরে-শোরে বিঘোষিত হয়েছে, তিনি আমাদের নজরুল, সাম্যের সার্থক রূপকার এক অনন্য মহাপুরুষ। নজরুলের সাম্যের রূপরেখাটি এরকম গাহি সাম্যের গান বুকে বুকে হেথা তাজা সুখ ফোটে, মুখে মুখে তাজা প্রাণ! বন্ধু এখানে রাজা-প্রজা নাই, নাই দরিদ্র-ধনী, হেথা পায় না ক’ কেহ ক্ষুদ-ঘাঁটা, কেহ দুধ-সর-ননী। অশ্ব-চরণে মোটর-চাকায় প্রণমে না হেথা কেহ, ঘৃণা জাগে না ক’ সাদাদের মনে দেখে হেথা কালা-দেহ। সাম্যবাদী স্থান নাই কো এখানে কালা ও ধলার আলাদা গোরস্থান। (সাম্য : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল পাপকে ঘৃণা করেছেন, কিন্তু পাপীকে নয়। চোর-ডাকাত, মিথ্যাবাদী তথা সকল পাপীর প্রতি তিনি বাড়িয়ে দিয়েছেন পরম মমতার হাত। সাম্যের গান গাই যত পাপী-তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই। (পাপ : কাজী নজরুল ইসলাম) আদম হইতে শুরু ক’রে এই নজরুল তক্ সবে কম-বেশি করে পাপের ছুরিতে পুণ্যে করেছে জবেহ্। বিশ্ব পাপস্থান অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান ধর্মান্ধরা শোনো অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো! (পাপ : কাজী নজরুল ইসলাম) একজন পাপীকে এমন করে ভালবাসা যিনি দিতে পারেন, তিনিই তো আমাদের নজরুল। কিন্তু তাই বলে পাপকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। উমর ফারুক (রা.) যখন মদ্যপানের অপরাধে আপন ছেলেকে দোররা মেরে হত্যা করেন, সেই বিষয়টিকে নজরুল দ্বিধাহীনভাবে চিত্রিত করেছেন এভাবে এত যে কোমল প্রাণ, করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক’ অপমান! মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে মেরেছ দোর্রা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের প’রে। ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি ‘অপরাধ করে তোরি মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী!’ (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ফারুক (রা.) সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাম্যের এ বিধান এমনি কঠোর এবং অলঙ্ঘণীয় যে, তা আত্মীয়-অনাত্মীয় মানে না, এমনকি পিতার হাতে পুত্রকে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও সামান্যতম বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। এমন সাম্যই তো নজরুলের আরাধ্য। তাই তো তিনি লিখেছেন আবু শাহমার গোরে কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে। (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) হযরত উমর ফারুককে নিয়ে নজরুল যে ‘নান্দীপাঠ’ রচনা করেছেন তা বিশ্ব সাহিত্যের সেরা সম্পদ। কিন্তু কেন এ নান্দীপাঠ? নজরুল নিজেই এর জবাব দিয়েছেন ... হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট! অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ, মানুষেরে তুমি বলেছো বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই! (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) ইসলামের সাম্যের সুমহান আদর্শকে হযরত উমর (রা.) বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের ইতিহাসে যে উপমা স্থাপন করেছেন তা নজরুলকে আলোড়িত করেছে। তিনিও এমন সাম্যই প্রতিষ্ঠা করতে চান যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়, রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্রে কোন তফাৎ থাকে না, দরিদ্রের কুটিরে স্বয়ং খলিফা আপন পিঠে করে খাবারের বোঝা পৌঁছে দেন, ভৃত্যকে উটের পিঠে চড়িয়ে খলিফা সে উটের রশি ধরে তপ্ত মরুতে এগিয়ে চলেন। ইসলামের সাম্যের বিধানের সার্থক প্রয়োগকারী উমর ফারুকের মধ্যে নজরুল দেখেছেন একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। মদীনা থেকে জেরুজালেম যেন সাম্যের এক মহাগাঁথা। সেই মহাগাঁথার মহাকবি হযরত উমর ফারুক (রা.)। আর নজরুলের কলমের তুলিতে তা হয়ে উঠেছে অনবদ্য। সাম্যের সেই মহানায়কের জেরুজালেম যাত্রাকে নজরুল যেভাবে চিত্রিত করেছেন তা নিম্নরূপ হেরি পশ্চাতে চাহি তুমি চলিয়াছ রৌদ্র্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি। দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা, বলেছে শত্র“ শেষে উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর দেয় এসে! হায় রে! অর্ধেক ধরার মালিক আমিরুল মুমিনীন শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন। সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু’খানা শুকনো ‘খবুজ’ রুটি, একটি মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু-তিন মুঠি! প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি চলেছে মাত্র একটি ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি! মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে, সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর ’পরে। কিছুদূর যেতে উট হতে নামি কহিলে, ‘ভৃত্যে ভাই, পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এই বার আমি যাই উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বসো উটে; তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে!’   ... ভৃত্য দস্ত চুমি কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ করো তুমি? উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?’   খলিফা হাসিয়া বলে, ‘তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে! রোজ-কিয়ামতে আল্লা যেদিন কহিবে, উমর! ওরে, করেনি খলিফা মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে!’ কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই? আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু! মোর অধিকার নাই আরাম সুখের, -মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা! ইসলাম বলে সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কে-বা!’ ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি, মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী! জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্পবৃষ্টি হইল কি- না, কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি, বিশ্ববীণা! জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব,- অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, ‘জয় জয় হে মানব!’...   আসিলে প্যালেস্টাইন, পারায়ে দুস্তর মরুভূমি, ভৃত্য তখন উটের উপরে, রশি ধরে চলো তুমি! জর্ডন নদী হও যবে পার, শত্র“রা কহে হাঁকি ‘যার নামে কাঁপে অর্ধ পৃথিবী, এই সে উমর নাকি?’ খুলিল রুদ্ধদুর্গ-দুয়ার! শত্র“রা সম্ভ্রমে কহিল- ‘খলিফা আসেনি, এসেছে মানুষ জেরুজালেমে!’ সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি শত্র“-গির্জা ঘরে বলিলে, ‘বাহিরে যাইতে হইবে এবার নামাজ তরে!’ কহে পুরোহিত, ‘আমাদের এই আঙিনায় গির্জায়, পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায়?’ হাসিয়া বলিলে, ‘তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ নামাজ আদায় করি, তবে কাল অন্ধ লোকসমাজ ভাবিবে- খলিফা করেছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি আজ হতে যেন এই গির্জারে মোর মসজিদ করি! ইসলামের এ নহে কো ধর্ম, নহে খোদার বিধান, কারো মন্দির গির্জারে করে ম’জিদ মুসলমান!’ কেঁদে কহে যত ঈসাই ইহুদি অশ্র“-সিক্ত আঁখি ‘এই যদি হয় ইসলাম- তবে কেহ রহিবে না বাকি, সকলে আসিবে ফিরে গণতন্ত্রের ন্যায় সাম্যের শুভ্র এ মন্দিরে!’ (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল এমন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সকলে মিলে ন্যায় ও সাম্যের শুভ্র ঠিকানা প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে মানুষের মাঝে পারস্পরিক কোন ভেদাভেদ থাকবে না। এমনকি পাপী-তাপী, চোর-ডাকাতদেরও মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার সার্বিক প্রয়াস চালানো হবে পরম মমতায়। চোর-ডাকাত কবিতায় কবি বিশ্বব্যাপী অসাম্যের কারণ অনুসন্ধানে প্রয়াসী হয়েছেন। প্রচলিত অর্থে আমরা যাদের চোর-ডাকাত হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দেই এবং সমাজচ্যুত করি, এদের চেয়েও ভয়ংকর হ’ল তারা যারা অন্যের সম্পদ লুট করে ‘পেতেছে বিশ্বে বণিক-বৈশ্য অর্থ-বেশ্যালয়’। আর এদের কারণেই অন্ন, স্বাস্থ্য, প্রাণ, আশা, ভাষা হারায়ে সকল-কিছু, দেউলিয়া হয়ে চলেছে মানব ধ্বংসের পিছু পিছু, পালাবার পথ নাই, দিকে দিকে আজ অর্থ-পিশাচ খুড়িয়াছে গড়খাই। (চোর-ডাকাত : কাজী নজরুল ইসলাম) নজরুল সাহিত্যে সাম্যের যে অমিয়ধারা প্রবাহিত হয়েছে তার উৎসমূল কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরে বোধ হয় এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, তাঁর সৃষ্টি কোন বিলাসিতা ছিল না; বরং জীবনের অভিজ্ঞতা-সঞ্চিত। ড. সুশীলকুমার গুপ্ত লিখেছেনÑ ‘নজরুল কাব্যের এই বিদ্রোহাত্মক ভাবই পরবর্তী বাঙলা সাহিত্যে সাম্যবাদী ধারণা প্রচারে নজরুলের অবদান অবশ্য স্বীকার্য। ...বহু শিরোনামায় বিভক্ত ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় নজরুল সাম্যবাদের প্রতি যে বিশ্বাস ও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তার তুলনা বাঙলা সাহিত্যে প্রায় নেই বললেই চলে।’ সাম্য এবং উদারতা নজরুলের পারিবারিক ও ধর্মীয় উত্তরাধিকার। এর একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন ড. সুশীলকুমার গুপ্ত ‘নজরুলের পূর্বপুরুষেরা পাটনার অন্তর্গত হাজীপুরের অধিবাসী ছিলেন। সম্রাট শাহ আলমের সময় তাঁরা বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়ায় এসে বসবাস আরম্ভ করেন। মোগল রাজত্বকালে এখানে যে একটি বিচারালয় ছিল তার কাজীর আয়মা সম্পত্তি প্রাপ্ত হন। কাজী নজরুল এই কাজীদেরই বংশধর। তাঁর বাড়ির পূর্বদিকে ছিল রাজা নরোত্তম সিংহের গড় আর দক্ষিণে পীরপুকুর। এই পুকুরের পূর্বপারে পীরপুকুরের প্রতিষ্ঠাতা সাধক হাজী পাহলোয়নের মাজার শরীফ এবং পশ্চিমপারে একটি ছোট সুন্দর মসজিদ। নজরুলের পিতা ও পিতামহ সমস্ত জীবন ধরে এই মাজার শরীফ ও মসজিদের সেবা করে পরিবারের ভরণপোষণ করে যান। মুসলমানধর্মের প্রতি অসাধারণ নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও নজরুলের পিতা অন্য কোন ধর্মমতের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিলেন না। ধর্মের ক্ষেত্রে পিতার এই উদারতা নজরুল উত্তরাধিকার হিসাবে পেয়েছিলেন। তাছাড়া ফারসী ও বাংলা কাব্যের প্রতি গভীর অনুরাগও তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছ থেকে।’ নজরুলের পিতার মৃত্যুর পর (১৯০৮) সংসারে নেমে আসে ভয়াবহ আর্থিক দুর্যোগ। নজরুল হাল ধরেন সংসারের। বাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত পীরপুকুরের পূর্বপারে আল্লাহর অলি হাজী পাহলোয়ানের মাজার শরীফের খাদেম এবং পশ্চিমপারে অবস্থিত মসজিদে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং মক্তবের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব কাজ থেকে পরিবারের জন্যে যতটা না অর্থের সংস্থান করেছেন তার চেয়ে ঢের বেশি তিনি নিজের জন্যে সঞ্চয় করেছেন ভবিষ্যত-পুঁজি। মসজিদে তিনি আজান দিয়েছেন, নামাজ পড়তে মুসল্লিগণ সমবেত হয়েছেন এবং তিনি দেখেছেন এক কাতারে, একই সমতলে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকলে নামাজ পড়ছেন; ধনী, দরিদ্রে, রাজা-প্রজার কোন ভেদাভেদ নেই। ইসলামের সুমহান এ সাম্য নজরুলের কচি-মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণেই তিনি বড় হয়ে বলতে পেরেছেন ‘ইসলাম সে তো পরশ-মানিক তারে কে পেয়েছে খুঁজি? পরশে তাহার সোনা হলো যারা তাদেরই মোরা বুঝি।’ (উমর ফারুক : কাজী নজরুল ইসলাম) ইসলামের সুমহান সাম্য এবং সৌন্দর্য্যরে যে অপরূপ চিত্রটি নজরুল প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁর শৈশবেই তা তাঁকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে যা পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। তবে পতিত মুসলমানদের বিষয়ে তাঁর আক্ষেপের সীমা ছিল না। বিশ্বসভ্যতাকে সুরক্ষার জন্যে তিনি বারবার ফিরে গেছেন ইসলামের প্রাথমিক যুগে, স্বর্ণালী সময়টিতে। সাহায্য প্রার্থনা করেছেন আল্লাহ পাকের দরবারে, করুণ মিনতি জানিয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ‘পাঠাও বেহেশত হতে হজরত পুনঃ সাম্যের বাণী, (আর) দেখিতে পারি না মানুষে মানুষে এই হীন হানাহানি।’ বিশ্ব নিখিলের মুক্তির রূপটি নজরুল প্রত্যক্ষ করেছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে মানুষে মানুষের অধিকার দিল যে-জন ‘এক আল্লাহ ছাড়া প্রভু নাই কহিল যে-জন, মানুষের লাগি চির দীন বেশ ধরিল যে-জন বাদশাহ-ফকিরে এক শামিল করিল যে-জন (আজি) মাতিল বিশ্ব-নিখিল মুক্তি কলরোলে॥ কিন্তু মহানবীর আদর্শ থেকে বিচ্যুতির ফলে আজ বিশ্ব জুড়ে হানাহানি আর মানুষে মানুষে বৈষম্যের সীমাহীন প্রাচীর গড়ে উঠেছে। ফলে অশান্তি বিরাজ করছে সর্বত্র। ব্যথিত নজরুল তাই হযরতকে স্মরণ করে লিখেন তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ, ক্ষমা করো হজরত। ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ তোমার দেখানো পথ। বিলাস বিভবে দলিয়াছ পায়ে, ধূলি সম তুমি প্রভু, তুমি চাহ নাই আমরা হইব বাদশা-নওয়াব কভু। এই ধরণীর ধন-সম্ভার সকলের তাহে সম-অধিকার, তুমি বলেছিলে, ধরণীতে সবে সমান পুত্রবৎ। তোমার ধর্ম্মে অবিশ্বাসীরে তুমি ঘৃণা নাহি করে আপনি তাদের করিয়াছ সেবা ঠাঁই দিয়ে নিজ ঘরে। ভিন-ধর্ম্মীয় পূজা মন্দির ভাঙিতে আদেশ দাওনি, হে বীর, আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারি নাকো পর মত্॥ তুমি চাহ নাই ধর্ম্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি, তলওয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী। মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা সার করিয়াছি ধর্ম্মান্ধতা, বেহেশত হতে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত॥ (নজরুল-গীতি, অখণ্ড : পৃ. ১৯২) ইসলাম ধর্মের অনুসারী বলে দাবিদার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের বাণীর পূর্ণ প্রতিফলন না দেখে নজরুল যেমন আহত হয়েছেন এবং এর প্রতিকারে সচেষ্ট হয়েছেন, ঠিক তেমনি হিন্দুধর্মের অনুসারীদের মধ্যে বিরাজমান জাতিভেদ প্রথা তাকে কতটা মর্মাহত করেছে তার প্রমাণ মেলে ‘জাতের নামে বজ্জাতি’সহ আরও অনেক লেখায়। কেবল একটি উদাহরণ দিচ্ছি জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া। ছু’লেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া। হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান, তাই ত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশ-খান! এখন দেখিস ভারত-জোড়া, প’চে আছিস বাসি মড়া, মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কা হুয়া॥ জানিস না কি ধর্ম্ম সে যে বর্ম্ম সম সহন-শীল, তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁওয়া-ছুয়ির ছোট্ট ঢিল। যে জাত-ধর্ম্ম ঠুনকো এত, আজ নয় কাল ভাঙবে সে ত, যাক না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥ দিন-কানা সব দেখতে পাসনে দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে, কেমন করে পিষছে তোদের পিশাচ জাতের জাঁতা-কলে তোরা জাতের চাপে মারলি জাতি, সূর্য্য ত্যজি নিলি বাতি, তোদের জাত-ভগীরথ এনেছে জল জাত বিজাতের জুতো ধোওয়া। মনু ঋষি অণু সমান বিপুল বিশ্বে যে বিধির, বুঝলি না সেই বিধির বিধি, মনুর পায়েই নোয়াস শির। ওরে মূর্খ ওরে জড়, শাস্ত্র চেয়ে সত্য বড়, তোরা চিনলি নে তা চিনির বলদ, সার হল তাই শাস্ত্র বওয়া॥ সকল জাতই সৃষ্টি যে তাঁর, এ বিশ্ব মায়ের বিশ্ব-ঘর, মায়ের ছেলে সবাই সমান, তাঁর কাছে নাই আত্মপর। তোরা সৃষ্টিকে তাঁর ঘৃণা করে, স্রষ্টায় পূজিস জীবন ভরে, ভস্মে ঘৃত ঢালা সে যে বাছুর মেরে গাভী দোওয়া॥ বলতে পারিস বিশ্ব-পিতা ভগবানের কোন সে জাত? কোন ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁওয়া অশুচি হন জগন্নাথ? নারায়ণের জাত যদি নাই, তোদের কেন জাতের বালাই? তোরা ছেলের মুখে থু থু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোয়া॥ ভগবানের ফৌজদারী-কোর্ট নাই সেখানে জাত-বিচার, তোর পৈতে টিকি টুপি টোপর সব সেথা ভাই একাক্কার! জাত সে শিকেয় তোলা র’বে, কর্ম্ম নিয়ে বিচার হবে, তার পর বামুন চাড়াল এক গোয়ালে, নরক কিংবা স্বর্গে থোওয়া ॥ এই আচার বিচার বড় করে প্রাণ-দেবতায় ক্ষুদ্র ভাবা। বাবা এই পাপেই আজ উঠতে বসতে সিঙ্গী-মামার খাচ্ছ থাবা! তাই, নাই ক অন্ন, নাই ক বস্ত্র, নাই সম্মান, নাই ক অস্ত্র, এই জাত-জুয়াড়ীর ভাগ্যে আছে আরো অশেষ সুখ সওয়া॥ নজরুল তাঁর জীবনের উষালগ্নেই রুটির দোকানে কাজ করে শ্রমজীবীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেছেন, যৌবনে যুদ্ধের ময়দানে মানবতার বিপর্যয় অবলোকন করেছেন, জীবনের নানাবিধ ঘাত-প্রতিঘাতে ধনী-দরিদ্রের প্রকট বৈষম্য, হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মানুষে মানুষে হানাহানি, লোভাতুরের নির্মম থাবা ইত্যাদি দেখেছেন, হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে এ সকল অনাচার-অবিচারের মূলোৎপাটনের চেষ্টা করেছেন, সৃষ্টি করে গেছেন অনবদ্য সব সাহিত্য; বাংলা সাহিত্যকে দিয়ে গেছেন অহংকারের একটি জায়গা যা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়। ..................................................................................................................... লেখক: নজরুল গবেষক, টিভি অনুষ্ঠান নির্মাতা ও উপস্থাপক; যুগ্ম কর-কমিশনার, ট্যাক্সেস। মেইল: [email protected]

বাংলা সাহিত্যে প্রথম সৈনিক-কবি কাজী নজরুল ইসলাম

চুরুলিয়া হলো বর্ধমান জেলার কয়লাখনি অঞ্চল। ইংরেজদের শাসনামলে এই গ্রামে আণ্ডাল থেকে চুরুলিয়া পর্যন্ত একটা রেলপথও চালু ছিল। ভারতের স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে এই রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। নজরুল তাঁর জন্মস্থান চুরুলিয়া গ্রাম থেকে এক সময় বেরিয়ে পড়েন। এই বেরিয়ে পড়া নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখার আগ্রহ নিয়ে। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন তিনি। ছোট পৃথিবী ছেড়ে বড় পৃথিবীর স্বপ্ন, লেখাপড়া শিখেছেন নানান স্কুলে। রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলে, বর্ধমানের মাথরুন বিদ্যালয়ে। আবার বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কাজীর শিমলায় দরিরামপুর হাইস্কুলে। এসব তাঁর খাম-খেয়ালির মতো ব্যাপার ছিল না। আসলে যাঁরা বড় মাপের মানুষ হন, বিশেষ করে স্বপ্ন দেখা ভাবুক মানুষ তাঁদের ভিতরে অস্থিরতা থাকে। জীবনকে, দেশকে, জগতকে দেখার জন্য তাদের সব সময়ই মনে হয়, হোথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনো খানে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভুষণের মতো মানুষদের মধ্যেও এমনটা ছিল। পৃথিবীর অন্য অনেক বিখ্যাত লেখকদের জীবনেও এমনটা দেখা যায়। এ যেন তাদের এক স্বপ্নের দেশ, স্বপ্নের পৃথিবী খুঁজে বেড়ানো। কবি নজরুল খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। ধরাবাধা গতানুগতিক পথ যেন তার জন্য নয়। সিয়ারসোল হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় বসার আগেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। দেশের যারা যুবক তারা অনেক স্বপ্ন দেখতেন যে, বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক হতে পারলে অস্ত্র চালনা শেখা যাবে। সেই অস্ত্র উঁচিয়ে ধরা যাবে ভারতের ইংরেজ শাসকদের উপর। লেখা-পড়ার চাইতে তাঁরা তখন দেশ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। এসই স্বপ্নই তাঁকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। কত কষ্ট করেছেন ঘর ছেড়ে বের হবার পর। কাজী বাড়ির ঠুনকো আভিজাত্য ভেঙে রুটির দোকানে কাজ করেছেন। কিন্তু এসবের মধ্যেও ছেলেবেলার লেখা-পড়ায় দারুণ আগ্রহ ছিল তাঁর। সেই আগ্রহেই ময়মনসিংহের মতো অতো দূরের এখনকার বাংলাদেশের গণ্ডগ্রামে গিয়ে থেকেছেন। সেখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন। নজরুল যদি যুদ্ধে যোগ না দিতেন তাহলে তাঁর জীবন কেমন হতো কে জানে। কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই তাঁকে সৈনিক কবি করে তুলেছিল। পৃথিবীর নানান দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ তাঁকে উৎসাহী করে তুলেছিল। করাচির সেনানিবাসে থাকার সময় তিনি লেখেন প্রথম কবিতা ও গল্প। কলকাতার পত্রিকাতে তা ছাপা হয়। করাচিতে নজরুল ছিলেন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার। এই যুদ্ধক্ষেত্রেই পল্টনের আরো দু’জনের সঙ্গে নজরুলের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন ডিসিপ্লিন ইনচার্জ শম্ভু রায়। অন্যজন মণিভুষণ মুখোপাধ্যায়। এই মণিভূষণ পরবতীকালে ‘লাঙল’ পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। তাঁর আরেকটি প্রতিভা ছিল সংগীত প্রতিভা। মণিভূষণ নিয়মিতভাবে নজরুলের সঙ্গে সংগীতের তালিম নিতেন, এছাড়া আরো একজনের নাম উল্লেখ করা যায়। তিনি হলেন হাবিলদার নিত্যানন্দ দে – যাঁর বাড়ি ছিল হুগলীর ঘু্টিয়া বাজারে। এই নিত্যানন্দের কাছ থেকেই নজরুল অরগ্যান বাজানো শিক্ষা গ্রহণ করেন। নজরুলের জীবনে করাচি সেনানিবাসে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সৈনিকের জীবন-যাপন করেও তিনি লেখাপড়া ও সাহিত্য চর্চায় নিয়মিত ডুবে থাকতেন। করাচি সেনানিবাসে থেকেও তিনি তৎকালীন সমস্ত বিখ্যাত পত্র-পত্রিকা পাঠ করতেন। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, বঙ্গবাণী, সওগাত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা ও বিজলী’র গ্রাহক ছিলেন। এছাড়া রুশ বিপ্লব সম্পর্কিত নানা পত্র-পত্রিকা তিনি নিজের হাতের কাছে রাখতেন সব সময়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত রুশ বিপ্লব নজরুলকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। রুশ বিপ্লব সম্পর্কে যাবতীয় পত্র-পত্রিকা নজরুল অত্যন্ত খুঁটিয়ে পড়তেন। জাতীয়তাবাদী পত্র-পত্রিকাতেও রুশ বিপ্লব সম্পর্কে অনেক খবরাখবর প্রকাশিত হতো। যদিও এদেশে তখনো অবধি কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেনি। ঠিক এ রকম একটা পরিস্থিতিতে সেনা বিভাগের কঠিন কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ থেকেও ব্রিটিশ নেতৃত্বাধীন ভারতের একজন হাবিলদার হয়ে কীভাবে রুশ বিপ্লব সম্পর্কে এতটা আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তা থেকেই কাজী নজরুলের স্বদেশচেতনা এবং বিপ্লবী মানসিকতার প্রকৃত ছবিটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যাইহোক, সৈনিক থাকা অবস্থায় নজরুলের সাহিত্য-জীবনের উন্মেষ ঘটে। করাচি থেকেই তিনি নিয়মিত কলকাতার পত্র-পত্রিকাতে বিস্তর লেখা পাঠাতে থাকেন। তাঁর বেশ কয়েকটি লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাতে ছাপা হতেই বাঙালি পাঠক মহলে এই নতুন অসামান্য প্রতিরোধের বাঙালি কবির একটি স্বতন্ত্র জায়গা নির্দিষ্ট হয়ে গেল। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই কাজী নজরুলই প্রথম সৈনিক কবি। নজরুলের ‘মুক্তি’ শীর্ষক কবিতাটি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছাপা হয়। যতদূর জানা যায়, এটিই ছিল পত্রিকায় ছাপানো তাঁর প্রথম কবিতা। এরপর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মে-জুন সংখ্যায় মাসিক ‘সওগাত’ প্রথমবর্ষ সপ্তম সংখ্যায় নজরুলের একটি গল্প ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। গল্প হলেও লেখাটি অনেকটা আত্মস্মৃতিমূলক। ‘মুক্তি’ কবিতাটি প্রকাশের পর নজরুলের সাহিত্য-সৃষ্টিতে যেন বাণ ডাকতে শুরু করে। একটার পর একটা গল্প, কবিতা, উপন্যাস তিনি লিখতে শুরু করেন। লিখলেন, ‘ব্যথার দান’ গল্প, ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় প্রকাশিত হলো। প্রকাশ হলো ‘হেনা’ গল্পটি। ‘ব্যথার দান’ গল্পে রুশ বিপ্লব সম্পর্কে কবি নজরুলের চিন্তা-ভাবনা কোন স্তরে ছিল তার বিবরণ পাওয়া গেল। শুধু দেশপ্রেম নয়, নজরুল ইসলামের এই গল্পের ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিকতাও ফুটে উঠেছে। যা আমাদের বাংলা সাহিত্যের নতুন দিক বলতে হবে। ‘রিক্তের বেদন’ গল্পটিও নজরুল ইসলাম করাচি সেনানিবাসে বসে লেখেন। নজরুল ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কলকাতায় ফিরে ১৯২০ সাল থেকে কবিতা ও গান লিখে গোটা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে মাতিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি অন্যতম প্রিয় সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর। সুভাষচন্দ্র বলতেন, ‘নজরুলের গান না শুনলে মনের মধ্যে জোশ তৈরি হয় না।’ নজরুল ছিলেন মানবতাবাদী লেখক। তিনি বলতেন, ‘এই উপমহাদেশের কোনো মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদাভেদ থাকা চলবে না। নারী ও পুরুষের মধ্যে চলে আসা হাজার বছরের ব্যবধান দূর করতে হবে। মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা না করলে জাতিকে রক্ষা করা যাবে না।’ তিনিই প্রথম মানুষ, লিখিত আসরে উপমহাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার কথা যাঁর মধ্যে উচ্চারিত হয়েছিল। মাত্র ৪৩ বছর বয়সেই তিনি বাকহারা ও স্মৃতিশক্তিহীন হয়ে পড়েন। বাইশ তেইশ বছরের সাহিত্য সাধনা তাঁর। এর মধ্যেই উপমাহদেশীয় জীবনের যে মূল বাণী সেই বৈচিত্রের মধ্যেই ঐক্যসাধনের মন্ত্রটিকে তিনি চমৎকার  ‍কুশলতায় চিত্রিত করে তুলেছেন তাঁর কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ ইত্যাদি অজস্র সৃষ্টির মাধ্যমে। বাংলা ভাষায় এত অধিক সংখ্যক সংগীত আর কোনো কবি সৃষ্টি করেননি। তিনি তাঁর ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে বলেছেন, ‘এই উপমহাদেশ শুধু হিন্দুর নয়, শুধু মুসলমানের নয়, খ্রিস্টানের নয়— এই উপমহাদেশ সব মানুষের মহা মানবের মহান তীর্থমাত্র।’ আজীবন তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন-সকল রকম সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহ ছিল অশান্ত। ধর্মের উগ্রতা সমাজের সকল ইতরতার বিরুদ্ধে উদার উদাত্ত কন্ঠে সাম্যের আহ্বান। তাই তাঁর শেষ পরিচয় তিনি বাঙালি মানবতার কবি। ডব্লিউএন

মিল্কীওয়ে

আমি একটা নিহারীকার পথ বেয়ে চলেছি ছায়াপথ ধরে সেই পথের শেষপ্রান্ত খুঁজেছি যাদের সঙ্গে দেখা হলো তারা নিজেরাও নীহারীকার পথটাকে খুঁজে পেয়েছে কিনা জানিনে।   কখনো কুয়াশাচ্ছন্ন মনে হয়েছে তাদের ভালো করে ছোঁয়া যায়না পথটাকে মিল্কীওয়ে নামে অনেকে জানে   সেখানে একজনের সঙ্গে আমার দেখা হলো কেমন যেন মুটিয়ে গেছে অথচ শীতের প্রচন্ডতায় ওর শুকিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কেন তা হলো না তবে কি ও না ফেরার দেশে থেকে আমায় হাতছানি দিচ্ছিল।   এ গমন যদি হয় স্বেচ্ছাগমন তবে তো আর কারো সাথে দেখা হওয়ার কথা না বিশ্বলোকালয়ে যদি তেমন ঘটনা আরো কারো সাথে ঘটে যায় সেও কি তবে অচেনাই থাকবে? চেনা প্রহরের শব্দ উচ্চারণ তাকে কি কাঁপাবেনা? আত্মীয় অনাত্মীয় আরো কতজন তো চলে গেলো কই সবাইকে তো হিরন্ময় পাখির মতো কাঁদতে দেখিনি।   একজন যোদ্ধা হয়ে তুমি যখন চলে যাও পরিবার পরিজন ছেড়ে দিয়ে চলে যাও তুমি কি সেই মিল্কীওয়ের ঠিকানা খুঁজে পাও কি? তবু ছায়াপথ ধরে বারবার ফিরে ফিরে আমাকে দেখ ছায়াপথ ধরে ধরে আমাকে টেনে নিয়ে যাও দূর সুদূরে আমি নীহারীকা হয়ে যাই তোমার মত।  

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি