ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ১৪:১৮:২৮

অতীতের গল্প

অতীতের গল্প

অতীত হলো জীবনের উৎসভূমিঅতীত পরিত্যাক্ত বজ্রের গন্ধঅনুকূল্যের কাছে অতীত পরিত্যাজ্যচেতনা ও উন্মত্তার কাছে অতীত মৃত। তবুও, অতীত হেঁটে চলে পথ,প্রজন্ম খুঁজে নিখুঁত অতীতের ব্যাখ্যাসকল অতীতের প্রতি সহানুভূতি জাগেঅতীতে জন্ম নেয় মন্দবৃক্ষক্রুশের বৃক্ষ, প্রশংসা-ঘৃনা-স্মৃতির বৃক্ষ। অতীত নৌকায় যাত্রা করে অতীত যাত্রা করে দৈবের নৌকায় চড়েঅতীতের কোলাহল রসালো হয়ে উঠে অতীতে অবসাদ-ক্লান্তি শুয়ে থাকে গভীর ঘুমেও পড়ে থাকে তৃষ্ণা মৃত্যুঅতীতে আত্মার সিঁড়ি একটি দীর্ঘপথ অতীত বহুদূর সমুদ্রপাড়েঅতীত বহুদূর মধ্যপ্রাচ্যেঅতীত বহুদূর বাসা ও কর্নিশেঅতীত বহুদূর পার্কে ও শপিংমলেঅতীত একটি জঘণ্য দানবঅতীত ধূর্ত, চতূরের মতো।অতীতে মন্দের অভাব নেইঅতীত হয়ে উঠুক জগতের সত্যশপথ করে বলছি অতীতের সন্ধান করি আমি প্রতিনিয়ত।।  
মায়াবী জীবন

জীবন সুন্দর! তবুও জীবন থেকে পালাতে চেষ্টা করিছায়া-রোদে ঘুরিবৃষ্টি-রোদে ঘুরিকত পথ চলি, ধূলি-ধূসরে ঘুরিবর্ষা এলে, বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে দেহেবৃষ্টিভেজা দেহে স্বপ্নের জাল বুনিমনে কৃষ্ণচুড়া ফুঁটে থাকে থরে থরেমনে মনে ভাবি জীবনের মূল্য কী?ছুটে যাই বনেবন্য ফুল ফুঁটে থাকে ডালে ডালেছুটে যাই নদীর কিনারেনদীর জল মনের ভেতর করে খলখল।কাক ডাকে ভোরে, নিসর্গের ছোঁয়া পড়ে শরীরেডাকে পাখি, দৃষ্টিনন্দনে ভরে যায় আঁখিজীবন হয়ে উঠে মধুময়মনের প্লাজায় ভেসে ওঠে শ্রাবণ সন্ধ্যারাতের গভীরে অশ্রুসিক্ত স্মৃতিস্মৃতি উঁকি মারে অনির্বিঘ্ন বিশ্রামের ফাঁকে ফাঁকেপবিত্র আত্মায় সবুজ ঘাস চোখ মেলে তাকায়নির্দোষ মনের কিনারা ডুবে থাকে শ্যামলিমায়,রানীহাঁস দিঘীর পথেচষে বেড়ায় খালে-বিলেএকটু দূরেই বুনোহাঁস পাখনা মেলেই ফুটফুটে সাদা।দিঘীর পাড়ের ঠাসবুনোটগাছগাছালি উঁকি মারে জ্যোৎস্না আলোয়,চিরকাল বেশ এভাবেই চলে জীবনজীবন সুন্দর! বুকের মধ্যটায় অচেনা জীবন,ফাঁকে ফাঁকে অজস্র স্মৃতি লুকোচুরি খেলেঅস্পষ্ট স্মৃতিগুলো জীবন থেকে বেরিয়ে যাবার পথ খুঁজেপালাবো কোথায়? জীবন অতি মায়াময়।   এসএইচ/  

অনুশোচনা

কলিম উল্লাহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। মুখে লম্বা চাপ দাঁড়ি এবং সব সময় মাথায় টুপি পড়ের। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। সবাইকে নামাজ পড়ার জন্য আহŸান জানান। তবে এই মূহুর্তে তিনি টুপি খুলে রেখেছেন। কলিম উল্লাহ যখন রেগে যান, তখন মাথায় টুপি রাখেন না। তিনি রেগে আছেন। রাগের কারণ হলো, তাঁর সাড়ে চার বছরের ছেলে জজ উল্লাহ বায়না ধরেছে পূজা দেখতে যাবে। ছেলের আবদার শুনে কলিম উল্লাহ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন। হুজুরের ছেলে কি না পূজা দেখতে যাবে? বয়স অল্প না হলে এতক্ষণে চর থাপ্পর লাগিয়ে দিতেন ছেলের গালে............. কলিম উল্লাহর স্ত্রী রাফিয়া বিবি সাধারণত স্বামীর কথার উপর কথা বলেন না। কিন্তু ছেলের কান্নাও তিনি সহ্য করতে পারছেন না। শেষমেষ ভয়ে ভয়ে স্বামীর কাছে যেয়ে ছেলের কথাটা বললেন, পূজা দেখাতে নিয়ে গেলে ক্ষতি কি? “বাচ্চা ছেলে, ও ধর্মের কি বোঝে.....পূজার মেলা দেখে একটু আনন্দ পাবে।” কলিম উল্লাহ অবাক হয়ে স্ত্রী রাফিয়া বিবির দিকে তাকালেন। বললেন তোমার মাথা ঠিক আছে তো ?”ছেলেটা অনেক কাঁদছে একটু ভেবে দেখো......কাঁদুক। এসব নাজায়েজ শখ পূরণ করা যাবে না। এছাড়া মানুষ কী বলবে? হুজুর পূজায় গেছে....... ছি! ছি! ছি!। শুধুতো দেখতে যাবে। পূজা’ত করতে যাবে না .....।মুখে মুখে কথা বল কেন? বলছি যাওয়া যাবে না।কিন্তু ছেলেটার কি দোষ? ও তো পূজাও বোঝে না, নামাজও বোঝে না, প্রার্থনাও বোঝে না।ওর উপর ধর্ম চাপায় দিচ্ছেন কেন? শিশুদের তো ধর্ম নাই। বড় হলে সেঠিকই বোঝে নেবে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক।কলিম উল্লাহ কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। মনে মনে ভাবলেন “কোন আক্কেলে যে শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করেছিলাম......শুধু তর্ক করে।” কলিম উল্লাহ উঠে গিয়ে পাশের ঘরে ছেলেকে শাসাতে গেলেন। এখন থেকে শাসন না করলে ছেলে মাথায় উঠে যাবে.......পোলাপানকে শাসনের উপর রাখতে হবে। না হলে বেয়াদব হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে নিজের শশুড় শাশুড়ীর কথা ভাবলেন। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। ছোট ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখ ফোলা গাল দু’টো এখনো ভিজা। কলিম উল্লাহর ভিতরটা একটু দোলে উঠলো। পিতৃত্বের জায়গাটা বোধ হয় অনেক উপরে সাম্প্রদায়িকতা সেখানে পৌঁছতে পারে না.....। দশ মিনিটের মধ্যে ছেলেকে কোলে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন। সাড়ে চার বছর বয়সী ছেলে মূর্তি পূজা ঠিক বেঠিক বোঝে না। সে বোঝে রঙ বেরঙের আলো, হৈ চৈ, বেলুন, সন্দেশ, বাতাসা.....। কলিম উল্লাহ বিস্ময়ের সাথে ছেলের আনন্দ দেখছেন। নিজের ছেলেকে এতটা আনন্দিত তিনি কখনও দেখেননি। পরক্ষণেই ভাবলেন, শুধুই কি তার ছেলে আনন্দিত? তিনি নিজে কি আনন্দিত নন? বুঝতে পারলেন একজন পিতার সবচেয়ে বড় আনন্দ তার সন্তানকে খুশি করা এবং এটা আসলে সহজ একটা কাজ। দুঃখের বিষয়, মানুষ সহজ কাজের মূল্য বুঝতে চায় না। একটু পরে কলিম উল্লাহর মোবাইলে একটা কল এলো,কলিম ভাই, আসসালামু আলাইকুম।ওয়ালাইকুম আসসালাম।আপনে কই ?এই তো ভাই, ছেলেকে নিয়ে একটু উৎসবে আসছি।দূর্গা পূজা উৎসব। কন কী? পূজা?আরে ভাই, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। লেখক: অডিট এন্ড একাউন্টস অফিসার ‘অডিট ভবন’, ঢাকা

শুভ্র মনের শুভ্রতার গল্প

পাশের বাসার মেয়ে শুভ্রতা। নামের মতোই শুভ্র গায়ের রঙ। নামকরা স্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। নাচ শিখতো, ভালো গানও গাইতো। ঘটনাচক্রে একবার মেয়েটার নাচ দেখেছিলাম। চমৎকার। একদিন মায়ের কাছে শুনলাম শুভ্রতা হাসপাতালে। সুইসাইড অ্যাটেম্পট। কী সাংঘাতিক কথা! এলাকার সব খবর রাখে মাহবুব। ফোন দিলাম। জনালো, মেয়েটা ওর প্রাইভেট টিচার অর্ক ভাইয়ের প্রেমে পড়েছিল। অর্ক ভাই এলাকার ক্রেজ। স্কুল-কলেজে গোল্ডেন প্লাস রেজাল্ট। আর্কিটেকচারে পড়েন। বেজায় স্মার্ট, দারুণ পর্সোনালিটি। সবার সঙ্গে মিশতেন না। নিজের মতো থাকতেন। হাই রেঞ্জের দু-একটা টিউশনি করতেন। জুনিয়রদের মধ্যে মাহবুবই কেমন করে যেন ঘনিষ্ট ছিল মানুষটার। শুভ্রতার ঘটনাটা তাই ডিটেইলসেই জানলাম ওর কাছে। মাহবুব জানালো, অর্ক ভাই মেয়েটার খুব কেয়ার নিতেন। জীবনের চমৎকার সব সম্ভাবনার কথা বলতেন। শুভ্রতা মুগ্ধ হতো। মেয়েটার জন্মদিন কিংবা ঈদে উপহার দিতেন হুমায়ূনের বই। অর্ক ভাই বলতো, শুভ্রতার মতো মেধাবী মেয়ে দু`টো হয় না। কিন্তু প্রিয় ছাত্রীর প্রতি এই নির্দোষ আন্তরিকতাই সর্বনাশ ডেকে আনলো। বয়:সন্ধি আবেগে মেয়েটা অর্ককে স্বপ্নের পুরুষ ভাবতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠলো প্রকট। অর্ক যতদিনে বুঝলো, দেরি হয়ে গেল খুব। মেয়েটিকে উপেক্ষা করা এবং টিউশনি বাদ দেয়া ছাড়া আর উপায় থাকলো না। কিন্তু শুভ্রতা অর্কের এমন আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। অর্কর আন্তরিকতাকে সে ভালোবাসা ভেবেছিল। যে ভালোবাসার আরেক নাম জীবন। ব্যাস, জীবনের প্রতি মায়া উবে গেল। ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়লো সিলিং ফ্যানে। ভাগ্যিস, ঠিক সময়ে কাজের মেয়েটা এসে পড়েছিল। ওই ঘটনায় জীবন ফিরে পেলেও অনেক কিছু হারাতে হলো শুভ্রতাকে। নিজের আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশে গেল। পাড়াজুড়ে শুরু হলো অদ্ভূত কানাকানি। সকল কানাঘুষা আর সমালোচনা কেবল শুভ্রতাকেই ঘিরে, ১৪ বছরের মেয়েটির বোকামি আর হতবুদ্ধিতাকে ঘিরে। কেউ কেউ বলতো, শুভ্রতার মা-ই নাকি ভালো ছেলে পেয়ে মেয়েকে উসকে দিয়েছিলেন! ফলাফল, বছর খানেকের মধ্যেই শুভ্রতারা এলাকা ছাড়া। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ওই ঘটনা অর্ক ভাইয়ের জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। আমি শুভ্রতাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। মাহবুব মনে করিয়ে দিল। গতকাল ফেসবুকে বললো, শুভ্রতাকে মনে আছে? বললাম, হ্যাঁ। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, শেষমেষ কি হয়েছিলো রে? ও বললো, বাজে কথার ভয়ে মেয়েটা স্কুলে যেতে পারতো না। বাসায় পড়াশুনা করে কোন রকম এসএসসি দিয়েছিল। এতোকিছুর পরও মেয়েটা এ প্লাস পায়। তবুও আর পড়াশোনা করায়নি বাবা-মা। বিয়ে দিয়ে দেয়। শুনেছি দুটো ছেলেও আছে। -আর অর্ক? -উনি তো আমেরিকায়। বেশ আছেন। আমার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল। বয়:সন্ধিকালের ছোট্ট ভুলে সম্ভাবনাময় একটা ফুল ফোঁটার আগেই ঝরে গেল। অথচ শুভ্রতা হতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! হতে পারতো বিসিএস ক্যাডার! এমনকি মনোযোগী চিকিৎসকও! কিছুই হতে না পারুক, একটা শুভ্র জীবন তো পেতে পারতো মেয়েটা! ভুল কী ওর একার ছিল? বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পরিপক্ক অর্কের ছিল না? তার কী মনে হয়নি, খামোখা আন্তরিকতা মেয়েটাকে ভুল পথে নিতে পারে? বয়সে বড় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে অর্কের দায়িত্ববোধ কী আরো বেশি ছিল না? নাকি মেয়েটার আকর্ষণকে নিজের ব্যক্তিত্ত্বের অনন্য যোগ্যতা ভেবে কিছুটা আত্মসুখে ভূগতেন তিনি? ক্যাস্পাসে, ফেসবুকে, আশেপাশের চেনাজগতে এমন বহু অর্ক ভাইকেই দেখি, যারা শুভ্রতাদের বয়:সন্ধি আকর্ষণবোধে ভীষণ আত্মসুখে ভোগেন। কিন্তু নিজের দায়িত্ববোধটা ভুলে থাকেন বিপুল বিক্রমে! লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক টিকে

ফাঁস

বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ ও লেখক অধ্যাপক হাসনাত হারুন রচিত ধারাবাহিক উপন্যাস `ফাঁস`। উপন্যাসটি ধারবাহিকভাবে প্রকাশ করছে ইটিভি অনলাইন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে তৃতীয় পর্ব- সবুজের বাবা ছিল সামান্য একজন সরকারে চাকুরে।উদার প্রকৃতি, নীতিবান আর্দশবাদি, সৎ চরিত্রের মানুষ ।কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা সম্ভব হয় নি । তবু বই পড়ার প্রতি আছে একটা তীব্র নেশা।সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দেশি বিদেশী লেখকদের নানা বই ।বেতনের এক চতুর্থাংশ টাকা ব্যয় করেছে এই বই কেনার পেছনে । অর্থ বিত্তের অভাব আছে, কিন্তু মনের দীনতা বলতে কিছু নেই । এখন অবসরে আছে । তবু দীর্ঘবছর ধরে মেনে চলা রুটিনের কোন ব্যতিক্রম করে না ।ভোরের আযান হলে মসজিদে যায় । নামাজ শেষ করে মিনিট বিশেক, এদিক ওদিক ঘুরে, ভোরের আলো বাতাসে নিজেকে সতেজ করে নেয় ।ঘরে ফিরে একমুঠো মুড়ি, কখনো আবার একটুকরো বিস্কিট দিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নেয় । আবারো অজু করে কোরান শরীফটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে । ‘ফাবি আইয়্যে আলায়ে রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ । আটটায় তিনটে রুটি, সবজী ও এক কাপ চা খেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়ের তলায় এসে বসে । হাতে থাকে একটি বই । বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে জোহরের ওয়াক্ত হয়ে আসে ।গোসল নামাজ খাওয়া শেষ করে আধঘন্টা সময় বিছানায় গড়াগড়ি । সবুজের মা ঘর সংসারের নানা অভিযোগ নিয়ে কোন কথা বলতে আসলে, মুখ চিবিয়ে হাসে ।বলে, ঘর গৃহস্তালী থাকলে অভাব থাকবে । এজন্য তো এর নাম সংসার ।কখনো আবার অপন মনে বলে ওঠে,হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান । সংসারে তিন ছেলে দুই মেয়ে । বড় ছেলে বিএ পাশ করে, একটা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে । মেজটা আই এ পাশ । বছর তিনেক একটা পোশাক কোম্পানিতে চাকরি করেছে ।এখন কোন কাজ কর্ম করে না । রাস্তার মোড়ে, দোকানে বসে দেশ উদ্ধারের প্রয়োজনে, দিনরাত রাজা উজির মারে । দুটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে, ভাল পরিবারে ।মেয়ে দুটি সুখে আছে । ছোট ছেলে সবুজ । ছাত্র হিসেবে বেশ মেধাবী ।পরিবারের নানা অভাব অনটন থাকা সত্বেও নিজ সাধনা বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিটা হাতে নিয়ে এসেছে । সবুজের বাবা তার ছেলে মেয়েদেরকে সব সময় শেখাতে চেষ্টা করেছে জীবনের উদ্দেশ্য কি, সৌর্ন্দয, মাহাত্ম্য কোথায় । স্কুল কলেজ জীবনে সবুজ তার বাবার এই দর্শনকে সম্মানের সাথে সমীহ করে চলেছে ।বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলার সময় বাবার উদাহরণ টেনেছে ।বাবার ধ্যান ধারনা ও বিশ্বাসকে নিয়ে সবুজ সেই সময়ে অহংকারও করেছে । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সবুজকে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হয় । বড়লোক বাবার ছেলে মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে গিয়ে একটা নিরেট সত্যি সবুজের উপলদ্ধিতে এসেছে, জীবনে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে হলে নীতিবাক্যের ফুলঝুড়ি দিয়ে জীবন সাজানো চলবে না ।জীবন চলে টাকার স্রোতে, টাকায় জীবনে গতি আনে, সুখ আনে, সৌর্ন্দয আনে, জীবনকে করে অর্থবহ, সার্থক । টাকাহীন জীবন বদ্ধ জলাশয়, জঙ্গম স্থবির । সবুজের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয় ।তার চোখে স্বপ্ন ভাসে, একদিন সে অনেক অনেক বড়লোক হবে । শহরে বাড়ি হবে, গাড়ি হবে, সুন্দরী বউ হবে ।তবে তার জীবন চলবে সহজ সরল রেখায় । আধুনিকতার ছল করে কোন অশ্লীল উগ্রতায় জড়িয়ে নিজের অতীতকে বিসর্জন দেবে না ।হাজার বছর ধরে তার রক্তে বহমান পুর্ব পুরুষের ঐতিহ্য-সংস্কার বা বিশ্বাসকে ও সে কখনো অবহেলা অসম্মান করবে না ।  সবুজ গ্রামের ছেলে, জীবন হবে তার সবুজ প্রকৃতির মতো পেলব সুন্দর, মসৃণ । তবে তার বাবার মতো টানটান জীবন নয় । তার অর্থ থাকবে ।দুই হাতে মুঠোভরে সে টাকা খরচ করবে । তার ভবিষ্যত বংশধরদেরকে অভাব শব্দটার সাথে কখনো পরিচয় করিয়ে দেবে না । গ্রামের বাড়িতেও সে একটা সুন্দর ঘর করবে । এই স্বপ্ন তার সেই শিশু-শৈশবকাল থেকে তার মনের ভেতর সুপ্ত হয়ে আছে । গ্রামের বাড়িতে শহরের মতো করে সুন্দর ঘর করবে । মা বাবাও তার সাথে থাকবে । মা বাবার জন্য দক্ষিণ দিকে থাকবে একটি বড়সড় ঘর । দক্ষিনের খোলা হাওয়ায়, সুখে আনন্দে কেটে যাবে, তাদের শেষ দিনগুলো । ইট সিমেন্টের পাকা ঘর হলেও সবুজ গ্রামীন সৌর্ন্দযকে হণন করবে না । সবুজের বাড়ি হবে সবুজে সবুজে সবুজময় । বাড়ির চারপাশ ঘিরে থাকবে সুপারি গাছ । গাছগুলো বড় হয়ে ছাদ পযন্ত ওঠে যাবে ।ছাদের ওপর বসে সবুজ চারপাশের সবুজকে তার বুকের গভীরে টেনে নেবে । আকাশের ভাসমান মেঘমালা দেখবে, দেখবে নীল সামিয়ানায় তলে তারাকা রাজির মিটিমিটি লুকোচুরি খেলা ।জোছনায় নিজেকে ভাসিয়ে নেবে দুর দেশের অজানা সৌন্দযে । রবি ঠাকুরের গান শুনবে । নজরুলের কবিতা পড়বে । “ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না ।” এসব সে জেগে জেগে ভাবে ।রাতের ঘুমেও সেইসব ভাবনা স্বপ্ন হয়ে তার মনে ভাসে । সবুজ তার শিক্ষকদের মুখে শুনেছে, মনীষিদের জীবনীপাঠে জেনেছে, জীবনের সুখস্বপ্ন সত্যি হয়, মেধা শ্রম আর সাধনার বলে । সবুজ মেধাবী, প্রতিটি সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সে তার মেধার যোগ্যতা দিয়েছে ।সবুজ পরিশ্রম আর সাধনা ছিল বলেই তো সে আজ তার চারপাশের লোকজনের কাছে সবুজ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছে । কিন্তু সবুজ কর্মজীবন, কি করবে, কোথা থেকে কিভাবে শুরু করবে । ভাবনার শেষ থাকে না, কিন্তু কোন সিদ্বান্তেই সবুজ স্থির হতে পারে না ।সবচেয়ে বড় সম্যসা-সংকট অর্থের । বহু দিন মাস নানা ভাবনায়, হেলাফেলায় সে শেষ করে । তার পর মধ্যবিত্তের শেষ ভরষার স্থল চাকরি বাজারে যাতায়াত শুরু করে । একটা চাকরির জন্য সে নানা জায়গায় তার পরিচয় ও যোগ্যতার সার্টিফিকেট জমা করে । সবুজ চাকরির জন্য এদিক ওদিক হন্য হয়ে চরকী ঘোরা ঘুরে । চাকরি হয় না, কিন্তু, কেন চাকরি হয় না, তার উত্তরও সবুজের জানা হয় না । বছর খানেক পরে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছোটমাপের একটি চাকরি পাওয়া যায়, তাও নিজের যোগ্যতায় নয়, প্রতিষ্ঠানের বড় সাহেব তার এক নিকটতম বন্ধুর কাকা । বন্ধুর অনুরোধে সবুজকে চাকরিটা পাইয়ে দেয় । সবুজের জীবনের সব সুন্দর ইতিবাচক ভাবনাগুলো নেতিয়ে পড়ে । ভাঁটার স্রোতে ভাসতে ভাসতে তার জীবনের জোরালো নীতি-আর্দশগুলোতে গুণেপোকা বাসা বাঁধতে শুরু করে । সবুজ নব বিশ্বাসে স্থিত হয়, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে, মেধা শ্রম সাধনা কিছুই নয়, দরকার ক্ষমতাবান আত্মীয়ের । সামনে এবং পেছনে ডাল তলোয়ার হাতে নিয়ে যারা তার জীবন চলার পথকে করে দেবে মসৃণ, ঝেড়ে মুছে লক্ষ্যে পৌঁছার সিঁড়িগুলোকে করে দেবে ঝকঝকে তকতকে । কেউ একজন হাত ধরে সামনে টেনে নিয়ে যাবে, অন্য একজন পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ওপরের দিকে তুলে নিয়ে যাবে ।সবুজ অস্থির হয়ে ভাবে, কেউ একজন, যে আমার সামনে শক্ত হাতে মই ধরে রাখবে, আমি তার ওপর বিশ্বাস করে, নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সপে দিয়ে তরতর করে ওপরে ওঠে যাব । কিন্তু, কে সেই, কে । অস্থির সব নানা ভাবনায় সবুজ সারাক্ষণ কাটা ঘুড়ির মতো শুন্যে ঘুরপাক খেতে থাকে ।  আলো আঁধারীর ভাবনাকাশে হঠাৎ করে উঁকি দেয়, যদি কোন বড়লোক বাবার অর্থব মেয়ের গলায় ঝুলে যেতে পারা যায়, তাহলে ও হয়তো জীবনের স্বপ্নগুলো সত্যি হয়ে জ্বলে ওঠবে । সবুজ তার বন্ধুসম খালাতো ভাইয়ের্ সহযোগিতায় পেয়ে যায় সেই স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি । চিত্রাই সেই চাবি, যে তাকে পেছন থেকে ঠেলবে, আর তার ব্যবসায়ী শ্বশুর বাবা তাকে সামনে থেকে টেনে নিয়ে যাবে । চিত্রার সাথে সবুজের বিয়ে হয় । বিয়ের অনুষ্ঠানে সবুজ বুঝতে পারে, কত বড় ঘরের মেয়েকে সে তার জীবন সঙ্গীনি করে নিয়েছে ।বিয়েতে আগত অতিথিদের পোশাক, বেশভূষা, পরিচয়, জীবন বৃত্তান্ত শুনে দেখে সবুজ বুঝতে পারে, তার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব ।একই অনুষ্ঠানে দুই দুইটি বিয়ে । চিত্রার আর চিত্রার ছোটবোন চয়নার । চিত্রার মা বাবা পুলিশ জামাইকে স্বীকার করে নিয়ে নব সাজে বরণ করে নিয়েছে । (চলবে) লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ফাঁস পর্ব ১ পর্ব-২ ফাঁস / এআর/

তাঁতির গান তাঁতের গান

ঐতিহাসিক কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘বাঙালি তন্তুবায় দেশি তাঁতে যে কারিকরী দেখাইয়াছে, তাঁতের ঝাঁপে এখনও যেরূপ ফুল তুলিয়া আসিতেছে, তাহা জগতের অন্য জাতির অনুকরণযোগ্য। গড়া হইতে আরম্ভ করিয়া সবনাম বা আবরোঁয়া পর্যন্ত ক্রমোচ্চ স্তরে বঙ্গীয় সভ্যতার ক্রমবিকাশও লক্ষ্য করিবার যোগ্য। সেকালে দেশের সর্বত্র সরুমোটা দেশি কাপড় বুনিয়া, তাঁতঘরে ভদ্রলোকের বৈঠক বসাইয়া, আস্তে সুস্থে দৈনিক কার্য্য সমাধা করিয়া, বাঙালি তন্তুবায় নিরীহ লোকের অগ্রণী হইয়াছে। ভাল মানুষ বলিয়াই ঐ জাতিতে বুদ্ধির অভাব কল্পিত হইয়াছে; শিল্পকলার এই অদ্ভুত বুদ্ধি গণনায় আসে নাই।’ যদি প্রশ্ন করা হয় যে, বাংলার লৌকিক শিল্পকলার সবচেয়ে প্রাণময় রূপটি কি? অনেকেরই মতামত হবে সঙ্গীত। লোকসঙ্গীত। ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, বাউল, ভাবসঙ্গীত ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে জনসমাজের জীবনেরই কথা দিয়ে। কখনও কখনও সেসব গীত বেদনার উপাখ্যান হয়ে দেখা দিয়েছে। মাঝি-মালা, গাড়োয়ান, চাষী তার পেশাগত কাজের ফাঁকেই গীত রচনা করেছেন। ফলে বাংলার লোকসঙ্গীতের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর কথা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী অন্যতম প্রধান পেশাভিত্তিক কারুশিল্পী দল তাঁতিদের সঙ্গীত কিন্তু আলাদা করে আমাদের লোকসঙ্গীতে জায়গা করে নিতে পারেনি। অথচ তাঁতিদের জীবনে নানা বঞ্চনা, দুঃখ, দুর্দশা, ক্ষুধা-মন্দা ও ঠকে বেঁচে থাকার হাহাকার ভরা গান, কথা প্রবচন ছিল, আছে। কিন্তু তা গণমানুষের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারেনি। হতে পারে তাঁত ঘরে নিভৃতে জন্ম নেয়া, সুতা কাটুনির চরকায় সুতা কাটতে কাটতে গাওয়া গানগুলো বাইরের পৃথিবীর সংস্পর্শে আসতে পারেনি। ফলে তাঁতখানার ভেতরেই রয়ে গেছে বিশেষায়িত সে সব কথারা। সামাজিক বঞ্চনা, বৈষম্য, অবজ্ঞাপূর্ণ পেশা ধরে রাখার সাথে সাথে তাদের সেসব গীত গানের কথারাও টিকে আছে বংশপরম্পরায়। লোকসঙ্গীতের নানা বিভাগের মধ্যে একটি হলো কর্মসঙ্গীত। সুতরাং তাঁত কাজে মগ্ন বয়নশিল্পীর একঘেয়ে খাটুনির মধ্যে রচিত গান কর্মসঙ্গীতের পর্যায়ভুক্ত বলে চিহ্নিত করা যায়। কর্মের সময় শারীরিক শ্রম লাঘবের উদ্দেশ্যে যে গান গীত হয় তাই কর্মসঙ্গীত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য বিশেষ কতগুলো গান নির্দিষ্ট থাকে- যা সর্বদা সেসব ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়, অন্যত্র নয়। বাংলাদেশে ধান ভানার গান প্রচলিত আছে। আগেকার দিনের প্রথা অনুযায়ী মেয়েরা সাধারণত সারারাত জেগে ধান ভানত। তখন নিজেদের জাগিয়ে রাখবার জন্য দীর্ঘ আখ্যানমূলক গান গাইত। নৌকা চালনা, গরুর গাড়ি চালিয়ে যাওয়া, ধান বোনা কিংবা অট্টালিকার ছাদ পেটানোর সময় বিশেষ সঙ্গীত প্রচলিত ছিল। যেমন ছিল বা আছে তাঁত বোনার সময় তাঁতিদের দ্বারা গীত অনুরূপ একশ্রেণীর কর্মসঙ্গীত। যা প্রচলিত আজও। দীর্ঘ একটানা কাজের একঘেয়েমি দূর করার জন্য এসব গান খুব ফলপ্রসূ বলেই যেমন ধরে নেয়া যায়, তেমনি ব্যথাতুর মনে কিংবা নেহাৎ আনন্দে তাঁতি জীবনের ব্যথাচিত্রাবলী এই গানের কথারূপকে ব্যক্ত হয়েছে। যেমনÑ তাঁতঘরে আমার গ্যালি যে য্যবন ওরে তুরা মন দিয়া শোন তাঁতঘরে আমার গ্যালি যে য্যবন চেকন নলী মোটা ক্যরি যুগ্যালীরা আইজ ন্যলি ভরে মাকুতে ঢোকে না নলী কারিগরের হয় সময় হরণ ওরে তোরা মন দিয়া শোন তাঁতঘরে আমার গ্যালি যে য্যবন হপ্তা গেলি হাটবারে কারিগররা মজুরি চ্যালি মহাজন কয় মজুরি থাকপি বাকির খাতায় খোঁজ লিয়া দেহ বেচা কিনার বাজার যা-তা ওরে তুরা মন দিয়া শোন তাঁতঘরে আমার গ্যালি যে য্যবন আমার বয়স ছিল দশ বছরে একদিন কাজ হল্যি তাঁতের ঘরে এহন বয়স চলিশ হইলে ধরছে আমায় যক্ষ্মা রোগে এইবার কবে য্যেন আমার হয় মরণ ওরে তুরা মন দিয়া শোন তাঁতঘরে আমার গ্যালি যে য্যবন (নিজস্ব সংগ্রহ, পাবনা এলাকায় তাঁতিদের মধ্যে প্রচলিত গান) সামাজিক নানা অনিয়ম, উৎপীড়ন, নির্যাতন তথা শ্রেণী শোষণের স্বরূপ ও নিপুণ বাস্তবতায় উঠে আসে লোককবির গানে। শ্রেণী, বর্ণ বৈষম্যের কুপ্রভাবে যাদের জীবনযাত্রা তাদের মধ্যে তাঁতিও আছে.... তাদের উদ্দেশ্যে গানে গানে উচ্চারিত হয়Ñ ‘....কেউবা থাকে সুখের নিদ্রায় কেউবা হাটে রাত্রিদিন। ওভাই কামার-কুমার, তাঁতি-জোলা চাষাভুষা নিঃসম্বল আরও আছে যারা যারা সবাই তানরা একই দল’।১ কাপড় বোনা নিয়ে কুবির গোসাই এর গান বাঁধলেনÑ অতি সাবধানে ঘুরাই প্রেমের নাটা ভসকে যখন যাবে সুতা লবো তুলে কলেবলে ভয় কি তার অত কতশত ঘুচাই জড়পটা। নাটিয়ে করব পাতা দেখবনা তা বাধবে না কোন নেটা।। যখন সুতো করবো নাতি লাগবো তায় পাতায় পাতায় খই ভিজে মাতি। দু’এক ঘড়ি ছাড়া জটা শেষে কাড়িয়ে তানা গাঁথা সানা। সানপেতে শাড়ির ঘটা।। হয় যদি তার কানা ঘরে গুটিয়ে লব শেষে দিব আলগা খেই পুরে এক নজরে দেখাব সেটা। শেষে রোয়া গেঁথে নাচলিতে জুড়ে ফেলব তানাটা।২ সুতা ছিঁড়লে তার সমাধান, মাড় দেয়া, সানা গাঁথা, আলগা খেই এর মত নানা কারিগরি কথা উঠে এসেছে গানের কথায়। যুগীর ব্যবসা ভাতছানা। এই সুতোর গায়ে মাখিয়ে তাই কাড়াই তানা।। আমার দুইদিকে খাটুনি। আমি একবার কাড়াই একবার করি তাসুনী।। আমি গেঁথে সানা মেড়ো তানা করি নরাজ গুটানী। দুই রোয়া জুড়ে গেঁড়েয় পড়ে, ঝাপে ঝোপে তাঁত বুনি।। ভারি সুতোয় বাজার আক্কারা হয়েছে যুগী তাঁতি পুলিশ-সৈন্য শিখছে কেয়াজ করা। এখন কাপড় বোনায় লভ্য নাইক উল্টো দেনায় হয় সারা।। কাপাস তুলো নেইক দেশে কেশের ফুলকোয় মাঠ ভরা তাতে হয়না সুতো অনাহত ভাবছে যত চাষীরা।। এখন দায়ে পড়ে পৈতে ছিঁড়ে দস্তী হবে দ্বিজরা এখন মাকু বেছে কাঁকু চুসে বেড়ায় যত জোলারা কলার পেটোর কপ্নি পরবে যত বাইল নেড়ারা।।৩ সুতার উচ্চমূল্য, কাপড় বোনায় স্বল্প লাভ, তুলার চাষ নেই ইত্যাদি সমস্যার ফলে তাঁতি, জোলা সম্প্রদায়ের দুরবস্থার কথা ফুটে উঠেছে তাদের গানে। অতি সাবধানে ঘুরাই প্রেমের নাটা। যখন খেঁই যাবে ছিঁড়ে লব জুড়ে ফেলব না তার এক ফোঁটা। সদা ইষ্ট প্রতি নিষ্ঠে রতি আছে আমার মন আটা।। ভসকে যখন যাবে সুতো লব তুলে কলে বলে ভয় তি তায় এতো কতশত ঘুচাই জড়পটা। নাটিয়ে করব পাতা দেখব তা বাধবে না কোন নেটা।। যখন সুতা করব মাতি। লাগাব তায় পাতায় পাতায় খৈ-ভিজে মাতি দুই এক ঘড়ি ছাড়াব জটা। শেষে কাড়িয়ে তানা গাঁথা সানপেতে শাড়ির ঘটা। হয় যদি তায় কানা ঘরে গুটিয়ে লব শেষে দিব আলগা খেই পুরে এক নজরে দেখাব সেটা। শেষে রোয়া গেঁথে নাচলিতে জুড়ে ফেলব তানাটা। প্রথমে বিশকরম বলে চালিয়ে মাকু আঁকু বাঁকু করব না ভুলে তায় ঝাপ তুলে ঘা দিব নাটা। তবে ঝাপ ঝোপে বুনব কাপড় দিয়ে ও সাবির কাটা।। কলে বলে নলি চালাব। ছিঁড়বে না খেঁই খাব সে দেই সাঁদ মেরে যাব খুব দেখাব আমার গুণ যেটা। কাপড় বুনব কিসে নরাজ ঘিসে রাখব না দশি কাটা।। ভাল কাপড় বুনতে জানি। চিরুন কোটা শালের বোটা ঢাকাই জামদানি তার ঢের কানি তা বুঝে দেয় কেটা।। কুবির চরণ ভেবে বলে এবার এ দফাতে নাই ঘোটা।। ৪ নানা রূপকের আশ্রয়ে সাধারণ তাঁত শিল্পীদের দুরবস্থার জন্য ফড়িয়া, মহাজন, পাইকার, দালালদের বিষয়বুদ্ধির প্রতি তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয় গানে গানেÑ নামটি আমার খালেক সরকার করি আমি সুনাম প্রচার দক্ষিণে সমুদ্র আর উত্তরে পাহাড় পশ্চিমেতে যমুনা বলি পুবেতে কাছাড় ফইড়া মহাজন নাম ফুটাইছে বড় লোকি আচার।। ভাইরে করি তার সুনাম প্রচার- সোনায় চিনে সোনারু লোহায় চিনে কামার লুইচ্চায় চিনে গোপন পিরিত গাধায় চিনে সোয়ার কাপড় চিনে তাঁতিরা সব নাপিত চিনে কাঁচির ধার ফইড়া মহাজনরা চিনে রক্ত চুষতে জোলার।। তারা হইলেন দালাল ফইড়া ভাইরে করি তাগো সুনাম প্রচার।। (নিজস্ব সংগ্রহ, নরসিংদী) বংশপরম্পরায় শেখা কৌশল ও যন্ত্রপাতির ব্যবহারে অভ্যস্ত কারুশিল্পীরা খুব সহজে নতুন যন্ত্রপাতির কৌশলকে গ্রহণ করতে পারেনি। তাদের কাজের অভ্যস্ততাই হয়তো প্রাথমিকভাবে সেসবে অনাগ্রহী করে থাকবে। তেমনি বয়ন কারিগর তথা তাঁতিদের ব্যবহার্য প্রাচীন ঘরানার তাঁত এর জায়গায় একসময় চিত্তরঞ্জন তাঁত আমদানি হলে মহাজনরা অল্প সময়ে আরও বেশি বস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যে অপেক্ষাকৃত সহজ আধুনিক সুবিধা সংবলিত তাঁত আমদানি করলে তৎকালীন তাঁত কারিগরদের মধ্যে প্রথমদিকে অনীহা দেখা গিয়েছিল হয়তো। যার প্রমাণ নিচে উল্লেখিত গানটিÑ আইলো চিত্তরঞ্জন মেশিন বাইরে তাঁতের দফা করতে সারা এই মেশিনে বুইনচে যারা বাহার মাইরচে তারা শা, মুচি কামার কুমার আবাল বামুন যারা আইচ চ্যাংরা প্যাংরায় বরচে ববিন তাঁতির তাতে রইলো না চিন।। ব্যানব্যালা উইট্যারে বাই রওনা দেয় তাঁতি কেউ ন্যায় বাতের হানকি কেউ জুতা ছাতি গায়ে কারো প্যান শাট কেউ স্যুট কোট পইর্যা যায় বুক পকেটে কলম ন্যায় কেউ আমরা তাঁতি শরোমে মরি।। তাঁতির গরের মা-বউ-জিরা সকাল হন্দ্যা হারাদিন চরকা তুলে, হুতা হুকায় আর দ্যায় পারি তারা পেন্দে আইচ চিত্তরঞ্জন মেশিনের শাড়ি হারাদিন তাঁত চালায়্যা তাঁতি যহুন আইসে বাড়ি গরের বউরে ডাক দিয়া কয় বিচন্যাডো দে জলদি পারি। কি কমু আর দুক্কুর কতা আইচ চ্যাংরা প্যাংরায় বরচে ববিন তাঁতির তাতে রইলো না চিন।। (নিজস্ব সংগ্রহ- শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ) বয়নশিল্পীদের এসব কথা, গান তাদের মেহনত কালের ‘কর্মসঙ্গীত’ কেবল নয়, তা হয়ে উঠেছে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের টানাপড়েন ও জীবনজীবিকার অনুষঙ্গ। যাতে বিধৃত হয় তাদের কষ্টকর জীবনের গ্লানিময় উপসর্গ। কথা হয়ে আসে পেশা, আচার, কৃষ্টি, মহাজন, ফড়িয়া, পাইকারের দৌরাত্ম্য। সর্বোপরি তাদের জীবনের নানা অপ্রাপ্তির কথারা ভিড় করে। শোকে সংলাপে সে সব কথারা হয়ে ওঠে তাঁতি জীবনেরই জাজ্বল্যমান প্রতিচ্ছবি। বস্ত্রের উপর নকশার সুক্ষ্ম কারুকার্য সবসময়ই দর্শনীয় ও আদরণীয় হয়েছে। আবার বস্ত্রশিল্পীরা নকশার সাথে নানা  গীত, ছড়া, কবিতা, কথা ও জুড়ে দিয়ে বুনা নকশায় বস্ত্রকে করেছেন বিশেষায়িত। শুধু তাই নয় তৎকালীন সমসাময়িক প্রাসঙ্গিক ঘটনাও তাতে বিবৃত হতো। তেমনি বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের সময় শান্তিপুরের তন্তুবায়গণ কাপড়ের পাড়ে বিধবাবিবাহ সম্বন্ধীয় অনেক গানের কথা বয়ন করিয়া দিয়াছিল।৫ তার মধ্যে চন্দননগর-খলসিনীর ‘ধীরাজ’ (বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়) কর্তৃক রচিত গীতটি এইরূপÑ বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হ’য়ে সদরে ক’রেছ রিপোর্ট বিধবা রমণীর বিয়ে।। কবে হ’বে হেন দিন, প্রকাশ হ’বে এ আইন, জেলায় জেলায় থানায় থানায় বেরুবে হুকুম. বিধবা রমণীর বিয়ের লেগে যাবে ধুম। মনের সুখে থাকবো মোরা মনোমত পতি ল’য়ে। এমন দিন কবে হ’বে, বৈধব্য যন্ত্রণা যাবে, আবরণ পরিব সবে, লোকে দেখবে তাই, আলোচাল কাঁচকলা মালসার মুখে দিয়া ছাই, ত্রয়ো হ’য়ে যাব সবে বরণডালা মাথায় ল’য়ে। কবিবর হেসে কয়, ঘুচিল নারীর ভয়, সকলের হাতে খাডু হইল অক্ষয়। সবে বল বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জয়।। ৬ তাঁত কর্মসঙ্গীত বৃহত্তর সমাজে তেমন জনপ্রিয় তো নয়ই এমনকি তত পরিচিতও নয়। তাঁত কাজের বেশির ভাগ অংশই সম্পাদিত হয় বাস্তুভিটায় বা গৃহাভ্যন্তরে। ফলে এ কাজে চাষ এর কাজ, মাঝি মাল্লা, বা গাড়োয়ান এর কাজের মতো উচ্চকণ্ঠে গাওয়া গীতল সুরের দেখা পাওয়া যায় না। বরং এ কাজ গৃহাভ্যন্তরের বলে গানের প্রচলিত কথা ও তার সুর স্বভাবতই নিচুস্বরের। কিন্তু স্বর যত নিচুই হোক, কথার বিচারে, ভাব অনুভবের বিচারে, সামাজিক উৎপীড়ন, উৎপ্রেক্ষা, শোষণ, অবহেলার শিকার এই শিল্পী সমাজও কিন্তু বৃহত্তর সমাজেরই অংশ। পেশা বিচারে আপাত বিচ্ছিন্ন মনে হলেও তারাও এই গ্রাম সমবায়ের উত্তরাধিকার। তাই শেষ বিচারে তাদের ‘কথা-গান’ সমাজে মানব উদ্বোধনের প্রয়াসী সে কথা বলাই শ্রেয়। হ রোম, ইটালি তথ্যসূত্র : ১. লোক সংস্কৃতি বিবেচনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, আবুল আহসান চৌধুরী, পৃ. ১৮, ২. ৩. ৪. জামদানি, মোহাম্মদ সাইদুর, পৃ. ৪৫, ৪৬, ৫. দেশ, ১৩৪৬ ৬. শান্তিপুর পরিচয়, কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, পৃ. ১৫১ এই রচনায় প্রখ্যাত মাইম শিল্পী পার্থপ্রতিম মজুমদার (প্যারিস, ফ্রান্স) ও সংবাদপত্রসেবী হানযালা হান (ঢাকা) এর ব্যক্তিগত তথ্য সহযোগিতা প্রণিধানযোগ্য। লেখক : ইতালি প্রবাসী লেখক ও চিত্রশিল্পী

আসাহি সিম্বুন ও আমরা

জাপানে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ এক নম্বর পত্রিকাটির নাম আমাদের অনেকেরই অজানা। তবে প্রচার সংখ্যায়  শীর্ষস্থানে থাকা পত্রিকাটির নাম আবার অনেকেই জানেন। পত্রিকাটির নাম আসাহি সিম্বুন (ASAHI SIMBUN)। জাপানি ভাষায় আস্ হা শব্দের অর্থ ভোর বা সকাল। আর সিম্বুন শব্দের অর্থ পত্রিকা বা কাগজ। বাংলায় আসাহি সিম্বুনের নাম বলা যায়, ভোরের পত্রিকা বা ভোরের কাগজ; সকালের পত্রিকা বা সকালের কাগজ। তিন দশক আগে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত আসাহি সিম্বুনের অন্যতম সদর দপ্তর তিন-তিনবার সরজমিনে পরিদর্শনের সৌভাগ্য হওয়ায় এ পত্রিকাটির প্রকাশনা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা হয়। দীর্ঘদিন পর আমি আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের সাথে এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বিষয়ে কিছু তথ্য ভাগাভাগি করার লক্ষ্যেই আজকে আমার এ লেখার উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সময়ে এনালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে বিশ্বের ছোট-বড় অনেক দেশ। ডিজিটাল উন্নয়নের এ ধারা এখন মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। ফলে এখন আর থাকছে না জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্মশূন্যতা। হালে বাংলাদেশও ডিজিটালের কল্যাণে এগিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। জাপানের আসাহি সিম্বুনের প্রকাশনায় তৎকালীন আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি দেখার পর আমার কি ধারণা হতে পারে তা এখন সবাই সহজেই অনুমান করতে পারেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নকালে বারবার মাস্টার্স পরীক্ষার তারিখ পেছানোর এক পর্যায়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইন্সটিটিউটে জাপানি ভাষার ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস করছিলাম। এরই মধ্যে মাস্টার্স পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা ও পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ার কারণে জাপানি ভাষার ক্লাস করা তথা ডিপ্লোমা কোর্সটি সম্পন্ন করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। যদিও একই সময়ে আমি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম জাপানির ভাষার সামান্যতম শিক্ষাটুকুও বুঝি আমার জন্য নিরর্থকই হয়ে যাবে। কিন্তু না, ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ‘ইয়ু লিডারশিপে’র ওপর জাপান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছয় মাসের এক বৃত্তি নিয়ে আমি জাপান যাই। নিপ্পন কেনসিকাই (NIPPON KENSIKAI) নামের যে যুব সংস্থার কল্যাণে বৃত্তিটি পেয়ে আমার জাপান যাওয়া, তারা যখন জানতে পারলো আমি পেশায় একজন সাংবাদিক; তখন তারা তাদের কর্মসূচিতে কিছু পরিবর্তন এনে সাংবাদিক হিসেবে আমাকে আমার কাঙ্খিত বেশকিছু ক্ষেত্রে বিচরণে অগ্রাধিকারও দেয়। আলোচিত কর্মসূচিতে এশীয় অঞ্চলের আরও ৭/৮টি দেশের যে যুবক ও তরুণেরা অংশগ্রহণ করেন তাদের সঙ্গে একই বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অবসর সময়ে আমার কাঙ্খিত ক্ষেত্রে আমাকে নিয়ে যাওয়া হতো। একথা হয়তো আমাদের সবারই জানা, আমন্ত্রিতদের হোমস্টেতে রেখে জাপানিরা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সকল কর্মকান্ড এবং জাতীয় উন্নয়নের সবকিছুই অন্যকে দেখাতে ভালোবাসে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের প্রতিবছরই জাপানে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, জাপান থেকেও প্রায় বিশ হাজার তরুণ-তরুণীকে সরকারি খরচে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক অবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকান্ড সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য। জাপানে যখন যাই তখন আমি টগবগে তরুণ এক পেশাদার রিপোর্টার সাংবাদিক। ছোটবেলা বই-পুস্তকে পড়েছি ‘সূর্যোদয়ের দেশ জাপান’। তাই জাপান ও সে দেশের মানুষ সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল আমার আগে থেকেই। জাপান সূর্যোদয়ের দেশ- কথাটি যে আসলে সিম্বোলিক বা প্রতীকী তা বুঝতে পারি জাপান যাওয়ার পরেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জাপান প্রতিহিংসার রাজনীতিতে না জড়িয়ে ‘ফ্লাওয়ার মুভমেন্ট’ বা শান্তির আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা শুরু করে সেখান থেকেই জাপানের সূর্যোদয়ের দেশের খ্যাতি। যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বের মানুষই উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর ফলে বিশ্বের অনেক দেশই এখন উন্নত বা উন্নয়নশীল উন্নত দেশ। একদিন নিপ্পন কেনসিকাই প্রধান হাম্মাদা সানকে জাপানের শ্রেষ্ঠ পত্রিকার প্রকাশনা কার্যক্রম দেখার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি আমাকে জাপানে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ পত্রিকাটির নাম বললেও প্রচার সংখ্যায় দ্বিতীয় শীর্ষ পত্রিকা ‘আসাহি সিম্বুন’-এর টোকিও সদর দপ্তর পরিদর্শনের ব্যবস্থা করলেন। প্রথম যেদিন আসাহি সিম্বুন পত্রিকা অফিসে যাই তখন আমাকে রিসেপশন কক্ষে টেলিভিশন মনিটরে পত্রিকাটির প্রকাশনা কার্যক্রম দেখানো হয়। কেননা ওই দিন ভিতরে ঢুকে সরজমিনে দেখার অনুমতি আমার ছিল না। অবশ্য সাধারণের সরজমিনে পর্যবেক্ষণের কোন নিয়মও তখন চালু ছিল না। পত্রিকাটির প্রকাশনা কার্যক্রম টেলিভিশন মনিটরে দেখে আমি তৃপ্ত না হওয়ায় হাম্মাদা সান আসাহি সিম্বুন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্বিতীয়বারের মত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করলেন। এবার পত্রিকা অফিসের ভিতরে গিয়ে অসংখ্য কম্পিউটার মনিটর দেখে আমারতো মাথা খারাপ। কেননা এর আগে বাংলাদেশে কোন পত্রিকা অফিসে কম্পিউটারে কম্পোজ ব্যবস্থা দেখিনি এবং আমাদের দেশের সংবাদপত্রে জাপানের তৎকালীন ডিজিটাল আধুনিকতার হাওয়া মোটেই লাগেনি বললে চলে। আগে থেকেই আমাকে বলা হলো এবং পরে দেখানো হলো রিপোর্টারদের কম্পোজে ভুল হলে সঙ্গেসঙ্গেই ভুল সংশোধন করা যায়। ঠিক ওই সময়ে আমার ধারণা ছিল শুধুমাত্র টাইপ রাইটার সম্পর্কেই। আলোচিত সময়ে বাংলাদেশে সংবাদপত্রে কম্পিউটার কম্পোজতো দূরের কথা কম্পিউটার প্রযুক্তিই ছিল দুর্লভ এবং যা ছিল তখন সবার চিন্তারও বাইরে। তখন বাংলাদেশে সংবাদপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রে ছাপাখানায় সিশার টাইপে হ্যান্ড কম্পোজই ছিল একমাত্র ভরসা। এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার নয়শ’ বিশ বর্গমাইল আয়তনের বিশ্বের ৬১তম বৃহৎ দেশ জাপান। যার ৭৩ শতাংশ এলাকাই পাহাড় পর্বত ঘেরা। জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৬৮ লাখ। যা ৫৫ হাজার বর্গমাইল আয়তনের বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটির চেয়ে প্রায় চার কোটি কম। জাপানের অধিকাংশ মানুষই শিক্ষিত। তাই পত্রিকার পাঠক সংখ্যাও বেশি। অথচ বাংলাদেশে শুধু পত্রিকার সংখ্যাই সাত শতাধিক কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় পত্রিকার পাঠক সংখ্যা কম। ২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী জাপানে পত্রিকা প্রকাশনার সংখ্যা মোট ১১০টি। এরমধ্যে জাতীয় পত্রিকার সংখ্যা পাঁচটি। শীর্ষ একনম্বর পত্রিকার নাম ইয়োমিউরি (YOMIUR)। রক্ষণশীল দৈনিক হিসেবে পরিচিত বাম রাজনীতির ধারক এ পত্রিকার সারাদেশে প্রকাশ সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৪৩ হাজার। উদারপন্থী বা Liberal হিসেবে পরিচিত দ্বিতীয় শীর্ষ দৈনিক আসাহি সিম্বুনের (ASAHI SIMBUN)প্রচার সংখ্যাও বর্তমানে এক কোটির উপরে। উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত অপর তিনটি পত্রিকার প্রত্যেকের প্রচার সংখ্যাও ষাট লাখের উপরে। আলোচিত আসাহি সিম্বুন তার উদারনৈতিক সাংবাদিকতার জন্য জাপানে এখনও সর্বজনগ্রাহ্য একটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত। টোকিও ছাড়াও পত্রিকাটি আরও পাঁচটি প্রশাসনিক অঞ্চল (প্রেফেকচার) থেকে একযোগে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির অন্যতম প্রকাশনা সদর দপ্তর ওসাকা প্রশাসনিক অঞ্চলে। আসাহি সিম্বুন ১৮৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয় ওসাকা সদর দপ্তর থেকেই। তখন এর প্রচার সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার কপি। টোকিও সদর দপ্তর থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা শুরু হয় ১৮৮৮ সালের ১০ জুলাই। তখন পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার কপি। ইংরেজি ভাষায় সকাল ও বিকেলে দু’টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সকালের সংস্করণ প্রকাশের সংখ্যা ৭.৯৬ মিলিয়ন বা ৭০ লাখ ৯৬ হাজার এবং বিকেলের সংস্করণ ৩.১ মিলিয়ন বা ৩১লাখ কপি। ছিয়ানব্বুই বছর পরের কথা। ১৯৮৪ সালে আমার টোকিও সদর দপ্তরস্থ আসাহি সিম্বুন পরিদর্শনের সময় তার কার্যালয়ের অবস্থান ছিল মহানগরীর কিয়োবাসি (KYOBASI) এলাকার মতোসুকিয়াকোতে (MOTOSUKIYACHO)। তখনকার আসাহি সিম্বুন ভবনের আটতলার ছাদে ছিল তিনটি হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন ও অবতরণের ব্যবস্থা। দেশের কোথাও কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলে রিপোর্টার-ফেটাগ্রাফারসহ প্রয়োজনীয় দল ছুটে যেতো সেখানে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য খোদ টোকিও মহানগরীতেই নিয়োজিত ছিল ২২শ’ (২২০০) রিপোর্টার। পত্রিকা ছাপা হওয়ার পর তার গ্রাহক বা এজেন্টের কাছে পৌঁছানোর জন্য নাম-ঠিকানা লেখা, প্যাকেট করা এবং তা গাড়িতে ওঠানোর ব্যবস্থাও করা হয় সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতেই। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কতজন রিপোর্টার কাজ করেন তার কোন সঠিক তথ্য কারও কাছে আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রশ্ন করা হলে কেউ হয়তো অনুমান ভিত্তিক একটি সংখ্যাও বলে দেবেন। এ সংখ্যা হয়তো হবে ৫/৬ হাজার। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কতজন সদস্য তার একটা সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু পাওয়া যাবে না গোটা দেশ কিংবা শুধু ঢাকায় কর্মরত সংবাদ মাধ্যমগুলোর রিপোর্টারদের সঠিক পরিসংখ্যান। চীন আন্তর্জাতিক বেতার (CRI), বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল বাংলাভিশন এবং কয়েকটি সংবাদপত্রে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমার সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কর্মরত প্রকৃত রিপোর্টারের সংখ্যা শুধু আসাহি সিম্বুনের টোকিও মহানগরিতে কর্মরত রিপোর্টারের সংখ্যার চেয়ে খুব একটা বেশি হবে বলে আমার মনে হয় না। সংবাদপত্র প্রকাশনা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিন দশক আগে আমরা কোথায় ছিলাম, আর এখন কোথায় আছি- সে কথাই ভাবছি। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

সূর্যোদয়ের দেশে

পূর্বদিকে সূর্য ওঠে- এ কথাটি দ্রুব সত্য। কিন্তু বিশ্বের কোন দেশে প্রথম সূর্য ওঠে সে কথাটি আমাদের অনেকের কাছেই এখনো অজানা। তিন দশক আগে এ বিষয়টি আমার কাছেও ছিল অজানা। আমরা ছোটবেলা থেকেই একথা জেনে এসেছি যে, সূর্যোদয়ের দেশ হচ্ছে জাপান। অপরদিকে জাপান ভূমিকম্পের দেশ হিসেবেও সবার কাছে পরিচিত। তবে আমার এ লেখার বিষয়টি ‘সূর্যোদয়ের দেশ’ নিয়েই। আমাদের অনেকের মনেই এখনো এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, বিশ্বে জাপানেই সকালে প্রথম সূর্য ওঠে। হ্যাঁ, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত  জাপানেও প্রতিদিন সকালে পূর্বদিকেই সূর্য ওঠে। তবে বিশ্বে জাপানই যে প্রথম সূর্যোদয়ের দেশ নয়–সে কথাও দ্রুব সত্য। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে জাপানই যে সূর্যোদয়ের দেশ-এ কথাটি তাহলে এলো কোত্থেকে। ছোটবেলা পাঠ্যপুস্তকে পড়ে আমার মনেও এ বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল যে, জাপানই বিশ্বে প্রথম সূর্যোদয়ের দেশ। আর তখন থেকেই স্বপ্নের সূর্যোদয়ের এ দেশটি দেখা ও তার সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মে আমার মনে। আর এ স্বপ্নও আমার একদিন পূরণ হয় জাপান সফরের মধ্য দিয়ে। বিশ্বে প্রথম সূর্যোদয়ের দেশ জাপান- আমার এ ধারণা পাল্টে যায় এখন থেকে তেত্রিশ বছর আগে। নিপ্পন কেনসিকাই (Nippon Kenseikai) নামের একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে জাপান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৃত্তি পেয়ে তখন জাপান সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এ সফরের আগে থেকেই আমার ভেতরে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। আমার সফরের মুল কর্মসূচির বাইরে আমি কি করবো, কি দেখবো এবং কি জানবো সে সম্পর্কেও আমি অলিখিত কিছু কর্মসূচীও ঠিক করলাম। যদিও আমার ব্যক্তিগত কর্মসূচির একটি বাদে সবগুলোই পূরণ হয়েছিল। উপরন্তু আমি অতিরিক্ত আরও অনেক কিছু দেখতে পেরেছি এবং উপভোগ করতে পেরেছি। সূর্যোদয়ের এ ধারণা হয়তো আমার আজীবনই থেকে যেতো যদি আমার জাপান যাওয়ার সুযোগ না হতো। জাপান যাওয়ার আগে আমার মনে যে উত্তেজনা কাজ করে তা হচ্ছে- প্রথমত: আমি আমার ছোটবেলা পাঠ্যপুস্তকে পড়া স্বপ্নের সূর্যোদয়ের দেশ জাপান যাচ্ছি। দ্বিতীয়তঃ আমি তখন একজন পেশাদার তরুণ সাংবাদিক হিসেবে সে দেশের প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ পত্রিকার অফিস পরিদর্শনসহ পত্রিকা প্রকাশনার সার্বিক কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করবো। তৃতীয়তঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর নিক্ষিপ্ত আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরী দুটো  পরিদর্শনসহ সেদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করবো। আর সূর্যোদয় সম্পর্কে সার্বিকভাবে অবগত হওয়ার বিষয়টি তো ছিলই। আমার জাপান সফরের সময় শুধু দেখা হয়নি আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরী দুটোকে। কেননা এ দুটি নগরীই ছিল আমার জাপান সফরের মূল কর্মসূচী বহির্ভূত। অবশেষে সব প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৯৮৪ সালের ২০জুন জাপানের রাজধানী টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে আমার ছয় মাসের জাপান সফরের কর্মসূচী শুরু হয়। ওই দিন নারিতা বিমানবন্দরে আমাকে স্বাগত জানানোর জন্য আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষমান ছিলেন নিপ্পন কেনসিকাই প্রতিনিধি ইয়ামাগুচি ও তার এক বান্ধবী। ওই তরুণ এর আগে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। যে কারণে জাপান পৌঁছে বিমানবন্দরে নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে আমাকে কোন অসুবিধায় পড়তে হয় নি। জাপান সফরের প্রথম দুই সপ্তাহ আমাকে রাখা হয় টোকিওর অশোকসাবাসি (Asakusabasi) এলাকার চারতারা হোটেল বেলমনটে (Belmonte) । ওই হোটেলেই প্রতিদিন আমার জন্য জাপানি ভাষায় দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিষয়ের ওপর প্রাথমিক ধারণা দেওয়া ও পরে তা কার্যক্ষেত্রে সরেজমিনে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। এই কাজে সহায়তা করতেন জাপান সরকারের মনোনীত এক তরুণী (নাম মনে নেই)। জাপানি ভাষাভাষী আমার প্রশিক্ষক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতেন। বলে রাখা ভাল, সত্তরের দশকের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নকালে বার বার পরীক্ষা পেছানোর প্রেক্ষাপটে আমি জাপানি ভাষার ওপর ডিপ্লোমা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভর্তি হয়ে ক্লাসও করি অনেকদিন। পরে সাংবাদিকতা বিভাগের পরীক্ষা এসে যাওয়ায় জাপানি ভাষার কোর্সটি আর শেষ করা যায়নি। তবুও জাপানি ভাষা ব্যবহারের ওপর আমার মনে ইতোমধ্যেই প্রাথমিক কিছুটা ধারণাও সৃষ্টি হয়। যা আমার জাপান সফরের শুরুতে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণে অনেক সহায়ক হয়েছিল। টোকিও পোঁছানোর পর থেকেই জাপানে সূর্যোদয়ের বিষয়টি জানার জন্য আমি আমার উত্তেজনা যেন আর কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিলাম না। আমার প্রশিক্ষক ওই তরুণীকে একদিন খুব বিনয়ের সাথেই জিজ্ঞাসা করলাম সূর্যোদয়ের বিষয়টি। তরুণী আমার প্রশ্নের পর আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন জাপানে সূর্যোদয় সংক্রান্ত আমার অজ্ঞতার বিষয়টি। তিনি হেসেই বললেন, হ্যাঁ জাপানেই প্রথম সূর্য ওঠে।তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আর সে সূর্যোদয় প্রাকৃতিক সূর্যোদয় নয়। সে সূর্যোদয় হচ্ছে (Symbolic) প্রতীকী। ওই সময় তিনি তার হাতে থাকা ডায়েরিটা খুলে ধরলেন আমার সামনে। তিনি ডায়েরির পাতায় তর্জনী রেখে বললেন, এটি জাপানের জাতীয় পতাকার ছবি। আমি জাপানের পতাকার ছবিটি দেখে রীতিমত বিস্মিত হলাম। কেননা এর আগে জাপানের জাতীয় পতাকার ব্যাপারে তেমন কোনো ধারনাই আমার ছিলনা। প্রশিক্ষককে আমি আমার সদ্য শেখা জাপানি ভাষায়ই তখন বললাম, ‘দাই তাই ওনাজি’। যার বাংলায় অর্থ হচ্ছে, প্রায় একই রকম। অর্থাৎ জাপান ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দেখতে প্রায় একই রকম। তবে পার্থক্য শুধু জাপানের পতাকায় সাদার মাঝে লাল সূর্য। আর বাংলাদেশের পতাকায় সবুজের মাঝে লাল সূর্য। জাপানে প্রথম সূর্যোদয়ের বিষয়টি যে প্রতীকী তা আমার কাছে তখনো অস্পষ্ট মনে হলেও ধীরে ধীরে তা স্পষ্ট হতে থাকে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরীতে দুটি আণবিক বোমা ফেলে। ৬ আগস্ট লিটল বয় (Little Boy) নামের প্রথম আণবিক বোমাটি ফেলে হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট ফ্যাট ম্যান (Fat Man) নামের দ্বিতীয় বোমাটি ফেলে নাগাসাকি নগরীতে। ওই বোমার তেজস্ক্রিয়তার ফলে দুটি নগরীতে যে বিরূপ প্রভাব পড়ে তা ছিল সারা বিশ্বে মানব সভ্যতার জন্য বিরল এক ঘটনা। আজও বিধ্বস্ত নগরী দুটোতে জন্ম নিচ্ছে বিকলঙ্গ শিশু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে সেই কবে। বাহাত্তর বছরেও সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। আণবিক বোমার বিভীষিকা এখনো তাড়িয়ে বেরাচ্ছে জাপানে আলচিত নগরী দুটোর মানুষকে। স্বভাবতই বিশ্বের কোনো দেশ বহিঃশত্রুর আক্রমণের শিকার হলে পাল্টা আক্রমনের মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু না, জাপান তা করেনি। যুদ্ধ শেষে জাপান সারা বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ‘ফ্লাওয়ার মুভমেন্ট’ নামে শান্তির আন্দোলন শুরু করে। জাপানের পূর্ব দিগন্তে উদয় হয় উন্নয়নের সূর্য। যে আন্দলনের ফলে আধুনিক জাপান আজ সারা বিশ্বে এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী উন্নত দেশের মডেলে পরিণত হয়েছে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকারি পর্যায়ে নেওয়া দেশের উন্নয়ন কর্মসূচিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে দেশটির সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মসূচী সফল করে তোলে এবং এখনো সফল করে চলছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর ২০(বিশ) হাজার তরুণ-তরুণী, যুবক–যুবতিকে সরকারি খরচে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতিকে জাপানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সে দেশে দীর্ঘ সময় অবস্থানের অনুমতি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে প্রতি বছর। আমন্ত্রিতদের রাখা হয় দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে হোমস্টেতে। এমনি এক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্যই আমি বৃত্তি পেয়ে জাপান যাই। ওই কর্মসূচিতে অংশ নেয় বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও কয়েকটি দেশের যুবক-যুবতি প্রতিনিধিরা। এদের মধ্যে একমাত্র আমিই পেশায় সাংবাদিক হওয়ায় আমাকে আমার কাঙ্ক্ষিত স্থান এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিদর্শনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এমনি করে আমি অনেক অজানার অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানের ‘ফ্লাওয়ার মুভমেন্ট’ বা শান্তির আন্দোলনের কর্মসূচিকেই জাপান নতুন সূর্যোদয় হিসেবে আক্ষায়িত করে এবং দেশটিকে সারা বিশ্বে সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় বছরখানেক আগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লেখক সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন। এ তথ্য অনুযায়ী প্রাকৃতিক নিয়মে প্রকৃত সূর্যোদয়ের দেশ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। আর উন্নয়নের মডেলের প্রতীকী সূর্যোদয়ের দেশ হচ্ছে জাপান। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

‘সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য’ পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা

বিনোদন-বিষয়ক পত্রিকা সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করেছে। সিটিব্যাংক এন. এ., বাংলাদেশ সম্প্রতি এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরষ্কার প্রদানের আয়োজন করেছে।  সিটিব্যাংক, এন. এ., বাংলাদেশ ও আনন্দ আলো যৌথ ভাবে বিগত ১০ বছর ধরে `সাহিত্য পুরস্কার` আয়োজন করে আসছে। এই আয়োজনটি বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি পুরস্কার।    দেশের শিল্প এবং সাহিত্য অঙ্গনের স্বনামধন্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত স্বাধীন বিচারক মন্ডলী পাঁচটি বিভাগে শতাধিক আবেদন যাচাই বাছাই করে চূড়ান্ত বিজয়ীদের নির্বাচন করে থাকেন।  এবার যারা পুরস্কার পেলেন- বাবুই থেকে ফারুক হোসেনের ‘পানামা রহস্য’ তরুণ লেখক ক্যাটাগরিতে (জীবনের প্রথম বই)- চৈতন্য থেকে প্রকাশিত সেজুতি বড়ুয়ার গ্রন্থ ‘হৃৎ’ দোয়েল থেকে মিষ্টি মারিয়ার গ্রন্থ ‘কন্যা’ আনন্দম থেকে প্রকাশিত কৌশিক মজুমদার শুভর গ্রন্থ ‘একটি ধুমকেতু ও কয়েকটি বিশ্বযুদ্ধ’ দৃষ্টি থেকে প্রকাশিত মীর রবির গ্রন্থ ‘অ্যাকোয়ারিয়ামে মহীরুহ প্রাণ’। “সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮” পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, জনাব এন. রাজাশেকারান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিটি কান্ট্রি অফিসার, জনাব ফরিদুর রেজা সাগর - ব্যবস্থাপনা পরিচালক ,চ্যানেল আই, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ও বিচারকমন্ডলীর প্রধান, প্রফেসর শামসুজ্জামান খান ও বিচারকমন্ডলীর সদস্য ইমদাদুল হক মিলন।    এসি  

কবি জাফর ওবায়দুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী আজ

কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খানের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। এ উপলক্ষে বরিশালের বাবুগঞ্জে কবির নিজ গ্রাম বাহেরচরে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ স্মৃতি পাঠাগারের উদ্যোগে ঢাকায় কবির আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালের বাবুগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। কবির শৈশব-কৈশোর কেটেছে পিতার কর্মস্থল বিভিন্ন মহকুমা ও জেলা শহরে। তবে ছুটিতে, বিশেষ করে গরমের ছুটিতে প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়ি বাহেরচরে। সেখানে বাড়ির উঠানে ভাইবোন আর গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে মেতে উঠতেন নাটক, গান, কবিতা আবৃত্তিতে। কিশোর বয়স থেকেই তার কবিতা লেখা শুরু। ইংরেজি সাহিত্যে একজন মেধাবী ছাত্র আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এম এ পরীক্ষার ফল বেরুনোর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু তখনকার ধারা অনুসারে এবং বিশেষ করে পরিবারের আগ্রহে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। এরপর দক্ষ প্রশাসক হিসেবে মহকুমা ও জেলা পর্যায় অতিক্রম করে সরকারের সচিব, টেকনোক্রেট মন্ত্রী হিসেবে এদেশের কৃষি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো গড়ে তোলেন তিনি। ঢাকার খামার বাড়ী, কৃষি গবেষণার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বরিশালের রহমতপুরের কৃষি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও প্রতিষ্ঠান তার স্বাক্ষর বহন করছে। -বিজ্ঞপ্তি  

সুরা, সুরা পান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ব্যাংককের পথে শিকাগো গিয়ে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ইস্তাম্বুল ফ্লাইটে উঠে বসেছি মাত্র। প্রান্তিক আসন আমার জন্য আগেই সংরক্ষিত ছিল। একই সারিতে ডান পাশের দু’টো বসার জায়গা এখনো খালি। বিমান প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ, ভাবছি আর যদি কেউ না আসে তাহলে আজ তিন আসন নিয়ে শুয়ে-বসে আরাম করে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া যাবে। এমন সময় হাতে জ্যাকেট ও কাঁধে হ্যান্ডব্যাগ ঝুলিয়ে এক ভদ্রমহিলা হাঁটতে হাঁটতে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন, জানান দিলেন, আমাকে ডিঙিয়ে জানালা-সিটের মালিক তিনি। কী আর করা, আমার আশায় গুড়ে বালি! পথ করে দিলাম, তিনি তাঁর জায়গায় গিয়ে বসলেন। ইতিমধ্যে বিমানের  প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রীরা নিজ নিজ আসনে থিতু হয়েছেন। আমার ঠিক ডানের যাত্রী অনুপস্থিত, তাই অবস্থানগত দিক থেকে আমাদের দু’জনের মাঝে  মাত্র এক আসন বরাবর তফাৎ। হলে কী হবে, অপরিচিত মানুষদের মতামত ও মত বিনিময়ের দূরত্ব অজানা, অপরিসীম! দুর্ভাগ্যক্রমে, এ দূরত্ব মাপার কোনো যন্ত্র আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়নি!  এ সব বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমি যখন সফরে বের হই  তখন লেখালেখির উপাদানের খোঁজে সব কিছুই কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি, অজানা অচেনা মানুষের সাথে কথা বলারও লোভ সামলাতে পারি না। এতে মাঝেমধ্যে আমাকে অসুবিধায়ও পড়তে হয়, আর ব্যক্তিটি যদি নারী হন তাহলে তো কথাই নেই - নিঃসন্দেহে, ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়, তথাপি আগুপাছু না ভেবে, সহযাত্রিণীকে জিজ্ঞেস করে ফেলললাম, আপনি কি ইস্তাম্বুলেই থাকেন? ‘না, আমি লরেন্স-ক্যানসাসে থাকি, তেহরান যাচ্ছি অসুস্থ বাবাকে দেখতে,’ উত্তর দিলেন তিনি। প্রশ্নে যা চেয়েছি, জবাব তার চেয়ে বেশি মিলল। তাঁর দেশ সম্পর্কে এমনিতে আমার অনেক জানার আছে, কৌতূহলও আছে। ভাবলাম, নিশ্চয়ই আজ আপনাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মত কিছু না কিছু নতুন জ্ঞান পাওয়া যাবে। অবশ্য ওদিকে যাওয়ার আগে ভদ্রমহিলা নিজ থেকেই বলে বসলেন যে, তাঁর মনটা খুব খারাপ, কারণ সাম্প্রতিক ওয়াল স্ট্রিটের টালমাটাল অবস্থা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তিনি তাঁর কতগুলো স্টক বিক্রি করে সাড়ে সাত হাজার ডলার লোকসান গুনেছেন! এ বিষয়ে আমি যেটুকু জানি ও বুঝি তার ওপর ভর করে তাঁকে একটু আশার কথা শোনাবার চেষ্টা করলাম। মনে হলো তিনি আমার বয়ান মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, সমঝে নিলেন এবং দু’দণ্ড স্বস্তিও পেলেন। পরক্ষণেই একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন রাখলেন, ‘আপনি এতকিছু জানেন কী করে?’ আমি অর্থশাস্ত্রের এক জন ছাত্র এবং স্টক মার্কেট সম্মন্ধে আমার সামান্য কিছু অভিজ্ঞতা আছে, এই যা, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। ওয়াল স্ট্রিট ওঠা-নামার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যদি সত্যি সত্যি বুঝতে পারতাম তা হলে আমি আজ এখানে না বসে ফার্স্ট ক্লাসেই বসতাম, সংক্ষেপে এই ছিল আমার জবাব। তিনি একটু মুচকি হেসে চুপ মেরে গেলেন। লম্বা বিরতির পর আবার কথোপকথন শুরু হলো। এবার তিনি নিজ দেশ সম্মন্ধে  আমাকে যা অবহিত করলেন, সংক্ষেপে তা এইরূপ:  বহির্বিশ্বের অবরোধ উঠে গেলেও এখনো ইরানের আর্থসামাজিক অবস্থা খুবই নাজুক। জীবনযাত্রার জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, তার ওপর মুদ্রাস্ফীতি লাগামহীন হারে বেড়েই চলেছে।  বিত্তবানরা সৌখিন জিনিসপত্র টাকা দিয়েও মেলাতে পারে না। জনগণের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়ন অব্যাহত আছে। সম্প্রতি রাজপথে যেটুকু উত্তেজনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল তা থেমে গেছে। এখন মানুষের মুখে প্রতিবাদের কোনো ভাষা নেই। মনে হলো ভদ্রমহিলা ঘোর সরকারবিরোধী। ইরানে এটা নেই, ওটা নেই বলতে বলতে তিনি এক পর্যায়ে বলে বসলেন, তাঁর দেশ এমনভাবে দেউলিয়া হয়েছে যে, তেহরান এয়ারপোর্টের বাথরুমে নাকি টয়লেট পেপার রাখার সামর্থও হারিয়ে ফেলেছে। আরও বললেন, তিনি এতে ভীষণভাবে লজ্জিত ও বিব্রতবোধ করেন। হাফিজ, সাদী, আত্তার, খৈয়াম ও ফেরদৌসীর দেশ - ইরানে দেখার মতন অনেক কিছু আছে, এ সব ছাপিয়ে ওই মুহূর্তে তেহরান বিমানবন্দরের বাথরুম দেখার উদগ্র বাসনা আমার মাঝে জেগে উঠলো, কিন্তু আমার এ ইচ্ছের কথা কোনোমতেই তাঁকে বুঝতে দিলাম না। সচেতন অথবা অবচেতন মনে তিনি তাঁর দেশকে নিয়ে খানিকটা গর্ববোধও করলেন। বললেন, তিনি তেহরানে যে ল্যাসিক সার্জারি করিয়েছিলেন, জনৈক আমেরিকান চোখের ডাক্তার তা দেখে অবাক হয়ে বলেছেন, ‘কাজটি নিখুঁত হয়েছে!’ আরও জানালেন, ইনস্যুরেন্স কোপেমেন্টের কারণে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমআরআই করাতে অসমর্থ। এবার তেহরানের সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে কাজটি সেরে যাবেন। আমি বললাম, তাহলে আপনার দেশে কিছু ভালো ও ইতিবাচক কাজও হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ দিনের এই কঠিন অবরোধের মাঝে ইরান অত্যাধুনিক মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি আমদানী কিভাবে করে, কোত্থেকে করে? তিনি এর জবাব দিতে পারলেন না। আমিও এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাইনি। তারপর এক সময় আমি ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার দেশে কি মেয়েদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক? তিনি জানালেন, ‘হ্যাঁ’। আমি বললাম, হিজাব ছাড়া এয়ারপোর্টে গিয়ে নামলে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না? বললেন, ‘আমার হ্যান্ডব্যাগে হিজাব আছে। সময়মত পরে ফেলব’। না পরলে কী হবে? আমার পরের প্রশ্ন। ‘পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, জেলে পুরবে, নির্যাতনও করতে পারে!’ দারুণ অসহায়ের সাথে বলতে বলতে তাঁর চোখেমুখে এক করুণ ছবি ভেসে উঠলো! আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল!  ইরানি নারীর সাথে আমার কাজের কথা মোটামুটি এখানেই শেষ। এরপর ডিনার পরিবেশিত হলো। খাওয়াদাওয়ার পর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘন্টা দু’এক বাদে চোখ খুলে দেখি, আমার সহযাত্রিণী মনের আনন্দে আচ্ছাসে সুরা এস্তেমাল করছেন! মনে মনে ভাবলাম, আপনার দেশের সরকার, পুলিশ, প্রশাসন আপনার ওপর জুলুম করছে, কিন্তু আপনিও যে নিজের ওপর জুলুম করছেন তা বেমালুম গাফেল হয়ে আছেন! আজকাল আমরা এমন এক জমানায় বাস করছি যখন অত্যাচারী যে, সে তো অত্যাচারীই, যে অত্যাচারিত সেও আজ অত্যাচারীর বেশে আবির্ভূত হয়েছে! আর কাউকে না পারলে,  জেনে হোক, না জেনে হোক, ন্যুনতম পক্ষে নিজের ওপর নিজেই অত্যাচার করে চলেছে! সুরা ও সুরা পানের কথা কিন্তু এখানেই শেষ নয়, সামনে আরও আছে। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। এ রাত গেল, পরের দিনও গেল, আকাশে উড়ছি তো উড়ছি, পথ আর শেষ হচ্ছে না! অবশেষে ইস্তাম্বুলে কয়েক ঘন্টা বিরতির পর তৃতীয় দিন স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ন’টার দিকে ব্যাংককে অবতরণ করলাম। যথারীতি ইমিগ্রেশন ও কাস্টম্স সেরে ট্যাক্সিতে উঠে হোটেলের দিকে রওয়ানা দিয়েছি। নতুন দেশ, এ-দিক ও-দিক দেখছি, ভালোই লাগছে। রাস্তাঘাট নিখুঁত, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এয়ারপোর্ট থেকে যতই শহরের দিকে এগোচ্ছি, ততই পরিবেশটা যেন কেমন কেমন লাগছে! মেঘবিহীন আকাশ, সূর্য আছে, উত্তাপ আছে, আলো আছে, ছায়াও আছে, তবু কী যেন একটা নেই! কী  নেই, তা আবার বুঝতেও পারছি না! আকাশটা যেন মলিন, মনমরা, ঘোলাটে  ঘোলাটে লাগছে; ধোঁয়ামাখা, ধোঁয়াটে। আকাশের গাঢ় নীল রঙ বদলে গেছে! হে আল্লাহ্, এ কী হেরিলাম আমি ব্যাংককে! সভ্যতার এ কী বীভৎস বিকৃত রূপ, উন্নয়নের এ কী বিধ্বংসী বিষাক্ত বহিঃপ্রকাশ! এতক্ষণে  বুঝলাম কী হয়েছে! দূষণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অগণিত খাল-নালা ও নদী যেমন মরে গেছে, ব্যাংককের আকাশ ও আজ মৃত! এত বড় শহর, লক্ষ লক্ষ লোকের বাস, বিরাট, বিস্তৃত, উন্মুক্ত আকাশ! এত বড় আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে, আকাশের ঘন নীল রঙ ফিকে হয়ে আছে! বৃষ্টি, ঝড়, বাতাস কোনো কিছুই এই ধোঁয়া কাটাতে পারছে না। আমি বিস্ময়ে হতবাক, আমি স্তম্ভিত! আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা হরহামেশা ব্যাংকক যায়-আসে, তাদের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, কিন্তু ব্যাংককের এই বিবর্ণ অম্বরের কথা কেউ আমাকে বলেনি, কোনো দিন বলেনি। আমার এক শ্রীলঙ্কান বন্ধু সাংহাই-এ থাকে। তার কাছে  শুনেছি, সাংহাই ও বেইজিং-এ নীল আকাশ দেখা যায় না। আজ ফিকে আকাশ, মৃত আকাশ ব্যাংককেই দেখে ফেলেছি। ধূসর আকাশ দেখতে ও’দিকে আর না গেলেও চলবে! এ কোন জগতে আমার বাস করছি! মানুষ শুধু জমিন, পানি ও হাওয়ার স্বাদ ও গন্ধ বিকৃত করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা চৌহদ্দিবিহীন উদাম উন্মুক্ত আসমানের রঙও বদলে দিয়েছে! নিঃসন্দেহে এটা মানব সভ্যতার এক ক্রান্তিকাল!  ব্যাংককের আকাশ দেখে দেখে আমার ক্লান্ত চোখজোড়া নেমে এল মাটির ধরায়। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে চেয়ে দেখি ট্যাক্সি ড্রাইভারের লাইসেন্স ঝুলছে। ভদ্রলোকের নাম, মি. সুরা পান। তাঁকে বললাম আপনার নামটা বড়ই সুন্দর! আমাদের ভাষায় এ নামের অর্থ মদ্যপান। আপনি কি সুরা পান করেন? তিনি অকপটে বললেন, বিকেল বেলা কিঞ্চিৎ সেবন করে থাকেন। সুরা ও সুরা পান নিয়ে আমার মূল কথা এখানেই শেষ, তবে আপনাদের আগ্রহ থাকলে এ নিয়ে আরো দু’একটি কথা বলতে পারি।  ধৈর্য ধরে পড়ুন, আশা করি নিরাশ হবেন না। সুরা ও সুরা পান পাশ্চাত্য সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এত দিন আমেরিকায় থেকেও দু’একটি মাত্র শব্দ ছাড়া এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানি না। এ লেখা শুরুর আগে গুগল-অনুসন্ধান করে সুরা সস্মন্ধীয় আরো কয়েকটি শব্দমালা আবিষ্কার করি, যেমন: ভদকা, হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, ভারমাউথ, কগন্যাক, বিয়ার, পোর্ট ওয়াইন, রাম, জিন, স্কচ, লিকার, বোরবন, স্টাউট, ফেনি, শ্যাম্পেন, টাকিলা, রেড ওয়াইন, হোয়াইট ওয়াইন ইত্যাদি, ইত্যাদি। এরপর বন্ধু মাহবুবকে ফোন করলাম এই ভেবে যে, সে কী জানে। আমি তাকে বললাম, দেখ, আমি হরেক রকম মদের একটি তালিকা তৈরি করেছি, দেখি তুই কতটার কথা জানিস। আমাকে বলল, ‘পড় তো দেখি কী কী পেয়েছিস’। আমি পড়তে লাগলাম, ভোদকা, হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, ভারমাউথ। ‘ভারমাউথ’ বলতেই মাহবুব হেসে দিয়ে আমাকে থামালো, বলল, ‘এটা ‘ভারমাউথ’ নয়, ‘ভারমুথ’’। আমি ধাক্কা খেলাম, একটি নতুন শব্দ শিখলাম। ‘তারপর বল’, মাহবুবের তাগাদা। আমি গড় গড় করে পড়ে যাচ্ছি, ‘কগন্যাক’, এবার সে আরো জোরে হেসে দিয়ে বলল, এটা ‘কগন্যাক’ নয়, এর উচ্চারণ ‘কনিয়াক’। ফ্রান্সের একটি জায়গার নাম ‘কনিয়াক’। ওই জায়গার নামানুসারে এই মদের নাম হয়েছে ‘কনিয়াক’। আমি বললাম, তুই এত কিছু জানিস কী করে? তাহলে নিশ্চয়ই তুই লুকিয়ে লুকিয়ে মদ খাস, হা হা করে দুই বন্ধু অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম। বুঝলাম, আমার বন্ধুর পাণ্ডিত্যের সাথে পেরে ওঠার কোনো উপায় নেই! মদ না খেয়েই মদের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখে, এতে যদি তার আসক্তি থাকত, তাহলে দু’একটি নতুন মদ হয়তো সে আবিষ্কারই করে ফেলত। সুরা ও সুরা পান নিয়ে মাহবুবের বাকি কথা বলতে গেলে আমার এ লেখা আজ শেষ হবে না। তাই ওদিকে আর যাচ্ছি না।   মি. সুরা পান আমাকে ‘অ্যাম্বেসেডর’ হোটেলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। হোটেলে চেকইন করার সময়ই বুঝতে পারলাম, এই হোটেলের অধিকাংশ অতিথি বাংলাদেশী। কেউ বেড়াতে এসেছেন, কেউ ব্যবসার কাজে, তবে বেশিরভাগের আগমন চিকিৎসার্থে। রোগীর সাথে আসা কয়েক জনকে জিজ্ঞেস করলাম, ঢাকায় এত নামীদামী হাসপাতাল হলো -  সেখানে কি এই মানের চিকিৎসা হয় না? ‘স্কয়ার’, ‘ইউনাইটেড’, ‘ল্যাব এইড’ থাকতে এত কষ্ট করে, এত টাকা খরচ করে আপনারা কেন এখানে আসেন? তাঁদের কাছে যে উত্তর পেলাম তা কেবল নৈরাশ্যজনকই নয়, বরং বিভীষিকাময়! বাংলাদেশের রোগীরা, নিজ দেশের ডাক্তার ও হাসপাতালকে বিশ্বাস করেন না। তাঁরা জানালেন, শুধু মোটা অঙ্কের বিল করার জন্য,  ডাক্তার ও হাসপাতাল মিলে অকারণে রোগীদের ওপর অস্ত্রোপচার করে ফেলে। শুনে আমার পিলে চমকে উঠলো! এ কথা আমাকে একজন, দু’জন নয়, অনেকেই বলেছেন। নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় দেশ ও জাতিকে কোথায় এনে দাঁড়  করিয়েছে! এই গভীর খাদ থেকে উত্তরণের উপায় কী, ভাবতে হবে সবাইকে।   ‘অ্যাম্বেসেডর’ ও তার আশেপাশে সব সময় অসংখ্য বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা হাঁটাহাঁটি করেন। হোটেল চত্বরের মধ্যে তাঁদের অনেকের দোকানও আছে। কয়েক জনের সাথে আমার কথা হয়েছে, যেমন - এই যে আপনারা ব্যাংকক আসা-যাওয়া করেন, আপনাদের কি কখনো নজরে পড়েছে যে, ব্যাংককের আকাশ মরে গেছে! এখানে মেঘহীন আকাশের রঙ বদলে গেছে! ‘আমরা তো খেয়াল করিনি। তবে হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমরা তো কখনো এভাবে দেখিওনি, ভাবিওনি’। মোটামুটি সবার মুখে একই কথা। আমি বললাম, গত দশ বছর দেশে যাই না, বলেন তো, ঢাকার আকাশেরও কি রঙ এ রকম ফিকে হয়ে আছে? বন্ধুরা ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে থাকেন, ‘কী জানি, আমরা তো ঢাকার আকাশ খেয়াল করে দেখিনি, দেখার দরকারও মনে করিনি’। বাহ! আমার দেশের মানুষ, ঢাকায় থাকেন, অথচ ঢাকার আকাশ গাঢ় নীল না ধোঁয়ায় ঢাকা, বলতে পারেন না। বলেন তো, আমি হাসব না কাঁদব! এবার ব্যাংককে বিদেশীদের সামাজিক সম্পর্কের ওপর সামান্য আলোকপাত করতে চাই। এআইটির অধ্যাপক ফজলে করিম সাহেবের বাসায়  এক ছোট্ট ঘরোয়া আড্ডায় যে গল্প শুনেছি তা আমার মত করে আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। কথায় কথায় করিম ভাই বলেছিলেন, সম্প্রতি তিনি জটিল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা সেলে কয়েক দিন ছিলেন। ওই সময় তাঁকে দেখতে বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষে তাঁর সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবের অনেকেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন খ্রীষ্টান, তিনি শুধু দেখতেই যাননি, বরং একই দিন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অনেক দূরে অনেক কষ্ট করে চার্চে গিয়েছিলেন কেবল বন্ধু রোগীর জন্য প্রার্থনা করতে। আরেকজন ছিলেন ভারতীয় মহিলা, জাতিতে জৈন, তিনি রোগী দেখতে রাতের বেলা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। হাসপাতাল থেকে বের হতে হতে দেরি হয়ে যায়, তথাপি বাড়িতে না গিয়ে তিনি সরাসরি ব্যাংককের জৈন টেম্পলে চলে যান। সেখানে করিম ভাইয়ের জন্য প্রার্থনা করে গভীর রাতে ঘরে ফিরেন। যে কথা শুনে আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো, করিম ভাই যে নাপিতের কাছে নিয়মিত চুল কাটাতেন তাঁর পেরেশানি ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখে। অনেক দিন করিম ভাইয়ের দেখা না পেয়ে নাপিত হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজতে থাকেন, বাড়িতে ফোন করে খবর নেন। এত দিনে রোগী বাড়িতে চলে এসেছেন, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হননি। এ কথা জেনে নাপিত করিম ভাইয়ের বাড়িতে এসে তাঁর চুল কেটে দিয়ে যান। আগেকার দিনে বাঁধা নাপিত  নিয়মিত জমিদারবাড়িতে এসে সকলের চুল কেটে, দাড়ি ছেঁটে দিয়ে যেতেন। করিম ভাই শুধু এআইটির শিক্ষকই নন, ব্যাংককের জমিদারও বটেন! পরিশেষে করিম ভাই ও ভাবির মুখে শোনা একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আজকের মত বিদায় নেব। কয়েক বছর আগে গোটা এআইটি ক্যাম্পাস এক প্রলয়ঙ্করী বন্যায় প্লাবিত হয়। ছয় থেকে আট ফুট পানি পুরো ক্যাম্পাসের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। যত দিন তাঁদের বাড়িঘর পানির তলে ছিল তত দিন তাঁরা সিটি সেন্টারে একটি হোটেলে ছিলেন। পানি সরে যাওয়ার পর প্রথম যেদিন ঘরে এসে ঢুকলেন তখন দেখেন নিচতালার যাবতীয় জিনিসপত্র কাদামাটি  মেখে লন্ডভন্ড হয়ে বিধ্বস্ত মেঝেতে লুটিয়ে আছে। এর মাঝে শুধু একটি ব্যতিক্রম ছিল - কোরআন শরীফ, যেটা টেবিলের ওপর পেয়েছেন - যেন কেউ যত্ন করে তুলে রেখেছে!  এখানে বলে রাখা দরকার, পবিত্র কোরআন খানাও পানিতে ডুবেছে, ভেসেছে, ভিজেছে, কারণ এর কাভার, কাগজ, ছাপা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, পাতা উল্টিয়ে তার পাঠোদ্ধার অসম্ভব হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো - সবকিছু মাটিতে, শুধু কোরআনখানা টেবিলের ওপর! লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক- টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি এডিটর - জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ

ফাঁস

সবুজ নিজের মতো করে মেয়ে খুঁজে বেড়ায় ।বন্ধুরা সবুজের জন্য হন্য হয়ে মেয়ে খোঁজে । মেয়ে পাওয়া যায়, মেয়ে পছন্দ হয়, কিন্তু, মেয়ের পরিবার পছন্দ হয় না ।আবার কোনটার পরিবার পছন্দ হলে, মেয়েটা সবুজের মনোমত হয় না । পছন্দ অপছন্দের গ্যাঁড়াকলে পড়ে সবুজের বসন্ত বন থেকে এক বছরের বেশি সময় হাওয়া হয়ে ওড়ে যায় । হঠাৎ এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, দুর সম্পর্কীয় সবুজের এক খালাত ভাই সবুজকে নিয়ে চিত্রাদের বাড়িতে হাজির হয় । সবুজ বলে, এই বাড়িটা মেয়ের বাবার ।শহরের বুকে, বেশ খোলামেলা জায়গায় বাড়িটা দেখতেও বেশ সুন্দর ।মেয়েদের নিজের গাড়ি আছে ।পরিবারও তোর পছন্দ হবে ।সবাই খুব হাসি খুশি মিশুক । গাড়ি বাড়ির মালিক হলেও মনের ভেতর কোন অহংকার নেই । চিত্রার মা বাবার সাথে সবুজের সাক্ষাৎ হয় ।চিত্রার সাথে সবুজের দেখা হয়, কথা হয় ।চিত্রা গান করতে পারে না, কিন্তু কণ্ঠস্বর বড়বেশি সুরেলা, আহ্লাদে ভরা, ভারি মিষ্টি । চিত্রার চোখে মুখে চড়ুই পাখির অস্থিরতা । আর গায়ের রং স্বর্ণলতার মতো হলুদ । চিত্রা রুপবহ্ণি, চোখে তার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, হাসিতে মুক্তো ঝরছে । চিত্রা বড়বেশি কথা বলে, কলকলিয়ে নদীস্রোতের মতো সেই শব্দধ্বনি । মিনিট দশ পনরের মধ্যে চিত্রা তার ভেতর বাইরের সব সৌর্ন্দয সবুজকে জানিয়ে দেয়, বুঝিয়ে দেয় । সবুজ কোন কথা বলে না, বলার সুযোগ সে পায় না । চিত্রা বলে, সবুজ শুনে যায় ।সবুজ মুগ্ধ, বিমোহিত, এরকম চঞ্চলা হরিনীকে তো সবুজ মনে মনে এতদিন খোঁজে ফিরছে । শুধু চিত্রাকে নয়, চিত্রার পরিবারও সবুজের পছন্দ হয় ।  চিত্রার বাবা ছোটখাট একজন ব্যবসায়ী ।সপরিবারে শহরে থাকে । নিজের কেনা জমিতে একতলা দালান, গাড়ি আছে, বাসায় কাজের ছেলে মেয়ে আছে ।ভদ্রলোকের দুই মেয়ে, দুই ছেলে । চিত্রা সন্তানদের মধ্যে প্রথম । চিত্রার বাবা সবুজের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে ।চৌদ্দজাতের মানুষ নিয়ে তার কারবার ।মিনিট কয়েকে সবুজেকে চিত্রার বাবা চিনে নিতে ভুল করে না ।গ্রামের ছোপ ছোপ সবুজমাখা সবুজের ভেতরটা পড়ে আসতে তার খুব একটা অসুবিধা হয় না ।   চিত্রার বাবা হাস্যমুখে সবুজের কাছে নিজ পরিবারের গল্প করে যায় । কোন কথা গোপন রাখে না । বলে, দেখ বাবা, আমিও গ্রামের ছেলে, পরিশ্রম আর সাধনায় আমি আজ এখানে এসে, হা হা হা । চিত্রার বাবা খুব হাসিখুশি মানুষ । মুখে তার হাসি লেগেই থাকে ।চিত্রার বাবা হাসতে হাসতে বলে, মেয়ে দুটি হয়েছে, সালেহার মতো, আমার স্ত্রী, বুদ্ধিমান, বেশ চালাক চতুর ।প্রথম জীবনে চাকরি করেছি, মাসগোনা   পয়সায় সালেহার মন ভরে না । ওর জ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে শুর করি ব্যবসা । হা হা । ভাল আছি, সুখেই আছি ।  আর একটা কথা, তুমি নিশ্চয় শুনেছ, এসব কথা তো লুকিয়ে রাখা যাবে না, দুর্গন্ধ তো সবার আগেই ছড়ায় । না শুনলেও দুই একদিনের মধ্যে শুনে যাবে । বলার লোকতো আর কম নেই । তার চেয়ে আমার মুখে শুন, আমার ছোট মেয়ে, নাম, চয়না,  সে কলেজে ভর্তি হতে না হতেই এক ছেলেকে তার প্রেমের ফাঁদে আটকে নিয়ে বিয়ে করে বসেছে । চিত্রার বাবা আবারও হা হা করে হাসে । বলে, আমি বাবা হয়েও বুঝতে পারি নাই, আমার মেয়ের পেঠের ভেতর এত বুদ্ধি ।বুঝেছ বাবা, ছেলেটা পুলিশ বিভাগে চাকরি করে । ফ্যামেলিও ভাল । বুঝতে পারছ, কি বিচক্ষন মেয়ে আমার, একটা জ্বলজ্যান্ত পুলিশ অফিসারের গলায় ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে ।যেখানে পুলিশ, চিত্রার বাবা আবারও শব্দ করে হাসে । তুমি কি এবার একটু চুপ করবে । চিত্রার মা বলে । চিত্রার মা কিন্তু এখনো মেয়ে জামাইকে স্বীকার করে নেয় নাই । অপেক্ষা করছে, পুলিশ বিভাগে চাকরি করার মতো মেধা সাহস, জ্ঞানবুদ্ধি ছেলেটার সত্যি আছে কিনা, খুব সাবধানী চোখে বিষয়গুলো চিত্রার মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে । আর আমি, গোপনে মেয়েটার সাথে এক আধটু কথা বলি, তবে জামাই বাবাজীর সাথে এখনো কোন কথা বলা হয়নি । হা হা হা । চিত্রার মা ধমক দিয়ে বলে, তোমার আক্কেল জ্ঞান কবে হবে, বলতে পার । কি সব যাতা বলে যাচ্ছ । ছেলেটা কি ভাবছে, বল তো । সবুজ একটা বোধাই টাইপের হাসি দিয়ে বলে, না না, আমি কিছুই ভাবছি না । ওনার কথা শুনতে আমার খুব ভালো লাগছে । সাদামাটা মনের মানুষ, মনের ভেতর কোন রকম ঘোর প্যাঁচ নেই ।আজকাল তো এরকম মানুষের দেখা মেলা ভাগ্যের ব্যাপার । আঙ্কেল, আপনি বলুন । চিত্রার বাবা মুখ বন্ধ করে রাখে । চিত্রার মা মুখ খোলে ।  চিত্রার মা মেয়ের মত রং সুন্দরী । কথার সুরটা ঠিক মেয়েলি নয়, শাসকের সুরে সে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে ।সবুজকে তার ছাত্র মনে করে, নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করে তুলে । সবুজ ঘর্মাক্ত শরীরে, ভীত স্বরে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায় ।সবুজের আচরণে ব্যবহারে চিত্রার মা-বাবা দুইজনে খুব  খুশি হয় । চিত্রার মা মনে মনে বলে, এরকম একটা ছেলেই আমি এতদিন ধরে আমার চিত্রা মায়ের জন্য খুঁজছি ।হে আল্লাহ, সত্যিই তুমি রাহমানুর রাহিম ।সব কিছু ভালোই ভালোই যেন শেষ করতে পারি, সেই দয়াটুকু করো । চিত্রার মা হাসিমুখে চিত্রা সম্পর্কে এক গাদা ভালো ভালো কথা সবুজকে শুনিয়ে দেয় ।বলে, দেখ, আমার মেয়েটার গুনগান তোমার কাছে আমি করবো না । তবে মেয়েটার দোষ যদি বলতে হয়, তাহলে বলবো, মেয়েটা আমার একটু অস্থির স্বভাবের ।বয়স কম, কলেজে পড়ে, আর আমাদের প্রথম সন্তান । ওর বাবা ওকে বেশি সোহাগ দিয়ে দিয়ে একটু জেদি স্বভারের বানিয়ে দিয়েছে ।বাইরে কারো সাথে অবশ্য এই জেদ দেখায় না । বাপের আহ্লাদি মেয়ে, বাপের কাছেই যত আব্দার আর জেদ ।অইসব নিয়ে ভাববার কিছু নেই, বিয়ের পর মেয়েদের এসব জেদ ফেদ কোথায় চলে যায় । চিত্রার বাবা বলে, কি শুরু করলে তুমি, মেয়ে তো বাবার কাছে নানা আব্দার করবে, এটাকে তুমি দোষ বলে প্রচার করছ কেন ।আমার মেয়েটার গুনগুলো সবুজকে শুনিয়ে দাও । ওসব শুনতে সবুজের ভালো লাগবে । সবুজ চিত্রার মা বাবার এই সরলতা দেখে মুগ্ধ হয় । ভাবে, একেই তো বলে পরিবার । কি সুন্দর আন্ডারস্টেডিং । চিত্রা শিকারি দৃষ্টিতে সবুজের আপাদমস্তক বার কয়েক দেখে নেয় । সবুজের গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা, লম্বা, তবে শরীর-স্বাস্থ্যটা একটু রোগা রোগা । সবচেয়ে, বড় সম্যস্যা সবুজের পোশাক, কেমন যেন ক্ষেতক্ষেত মার্কা । কালো প্যান্ট, সাথে হলুদ রংয়ের ফতুয়া । কর্থাবার্তায়ও সবুজ খুব একটা স্মার্ট বলে চিত্রার মনে হয় না । কেমন একটা মুখচোরা স্বভাবের বলে তার বিশ্বাসে দানা বাঁধে ।সবুজকে তার পছন্দ হয়, আবার হয় না । দোটানার দোলাচলে সে দুলতে থাকে । চিত্রার মা, মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ায় । গুজুর গাজুর, ফিসফাস করে সে মেয়েকে বুঝিয়ে বলে, এরকম ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । কোন রকম ওজর আপত্তি করো না । মা, ছেলেটাকে আমিও খারাপ বলছি না, আগেকার গুলোর চেয়ে এই ছেলেটা অনেক ভালো, কিন্তু,পোশাকে আশাকে কেমন একটা গেঁয়ো ভাব আছে । তুমি মায়ের কথা শোন, ঐ গেঁয়ো গন্ধ দুইচার মাসের সাবান শ্যাম্পু জলের ধাক্কা খেলে বাপ বাপ করে কোথায় যে পালিয়ে যাবে,, সেটা তুমিও বুঝে ওঠতে পারবে না ।তোমার ভবিষ্যত সাজিয়ে গুছিয়ে দেবার দায়িত্বতো তোমার মায়ের । মায়ের ওপর ভরষা রাখো, বিশ্বাস রাখো, দেখ, কি হয় । মা, ওর পরিবার । ওর পরিবার ধুয়ে কি আমরা পানি খাব নাকি । আমাদের দরকার একটা মেয়ে জামাই, ওর পরিবার নয় ।আর বিয়ের পর, তুমি তো ওর পরিবার নিয়ে থাকবে না । থাকবে তুমি আর সবুজ । সেখানে বাইরের কেউ, আসে কি করে । সেইসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না । ছেলেটা নিজের পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তার মা বাবার পছন্দকে নয় ।ওর খালাতো ভাইয়ের সাথে আমার আর তোমার বাবার আগেই সব কথা ফাইনাল হয়ে আছে । তবু বলছি, ওর মা বাবা, ভাই বোন । বলছি তো, বেশি কিছু এখন জানার দরকার নেই, সময়ে সব জানতে পারবে । চিত্রা তার মাকে তার সম্মতি জানিয়ে দেয় । সবুজের বাবা মায়ের অমতে সবুজের খালাত ভাই, সবুজের অভিভাবক হয়ে বিয়ের কথা পাকা দিয়ে আসে । (চলবে) লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ কুমিল্লা ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ।

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি