ঢাকা, বুধবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ১৪:৫১:০৬

অনুশোচনা

অনুশোচনা

কলিম উল্লাহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। মুখে লম্বা চাপ দাঁড়ি এবং সব সময় মাথায় টুপি পড়ের। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। সবাইকে নামাজ পড়ার জন্য আহŸান জানান। তবে এই মূহুর্তে তিনি টুপি খুলে রেখেছেন। কলিম উল্লাহ যখন রেগে যান, তখন মাথায় টুপি রাখেন না। তিনি রেগে আছেন। রাগের কারণ হলো, তাঁর সাড়ে চার বছরের ছেলে জজ উল্লাহ বায়না ধরেছে পূজা দেখতে যাবে। ছেলের আবদার শুনে কলিম উল্লাহ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছেন। হুজুরের ছেলে কি না পূজা দেখতে যাবে? বয়স অল্প না হলে এতক্ষণে চর থাপ্পর লাগিয়ে দিতেন ছেলের গালে............. কলিম উল্লাহর স্ত্রী রাফিয়া বিবি সাধারণত স্বামীর কথার উপর কথা বলেন না। কিন্তু ছেলের কান্নাও তিনি সহ্য করতে পারছেন না। শেষমেষ ভয়ে ভয়ে স্বামীর কাছে যেয়ে ছেলের কথাটা বললেন, পূজা দেখাতে নিয়ে গেলে ক্ষতি কি? “বাচ্চা ছেলে, ও ধর্মের কি বোঝে.....পূজার মেলা দেখে একটু আনন্দ পাবে।” কলিম উল্লাহ অবাক হয়ে স্ত্রী রাফিয়া বিবির দিকে তাকালেন। বললেন তোমার মাথা ঠিক আছে তো ?”ছেলেটা অনেক কাঁদছে একটু ভেবে দেখো......কাঁদুক। এসব নাজায়েজ শখ পূরণ করা যাবে না। এছাড়া মানুষ কী বলবে? হুজুর পূজায় গেছে....... ছি! ছি! ছি!। শুধুতো দেখতে যাবে। পূজা’ত করতে যাবে না .....।মুখে মুখে কথা বল কেন? বলছি যাওয়া যাবে না।কিন্তু ছেলেটার কি দোষ? ও তো পূজাও বোঝে না, নামাজও বোঝে না, প্রার্থনাও বোঝে না।ওর উপর ধর্ম চাপায় দিচ্ছেন কেন? শিশুদের তো ধর্ম নাই। বড় হলে সেঠিকই বোঝে নেবে কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক।কলিম উল্লাহ কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। মনে মনে ভাবলেন “কোন আক্কেলে যে শিক্ষিত মেয়ে বিয়ে করেছিলাম......শুধু তর্ক করে।” কলিম উল্লাহ উঠে গিয়ে পাশের ঘরে ছেলেকে শাসাতে গেলেন। এখন থেকে শাসন না করলে ছেলে মাথায় উঠে যাবে.......পোলাপানকে শাসনের উপর রাখতে হবে। না হলে বেয়াদব হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে নিজের শশুড় শাশুড়ীর কথা ভাবলেন। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। ছোট ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখ ফোলা গাল দু’টো এখনো ভিজা। কলিম উল্লাহর ভিতরটা একটু দোলে উঠলো। পিতৃত্বের জায়গাটা বোধ হয় অনেক উপরে সাম্প্রদায়িকতা সেখানে পৌঁছতে পারে না.....। দশ মিনিটের মধ্যে ছেলেকে কোলে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন। সাড়ে চার বছর বয়সী ছেলে মূর্তি পূজা ঠিক বেঠিক বোঝে না। সে বোঝে রঙ বেরঙের আলো, হৈ চৈ, বেলুন, সন্দেশ, বাতাসা.....। কলিম উল্লাহ বিস্ময়ের সাথে ছেলের আনন্দ দেখছেন। নিজের ছেলেকে এতটা আনন্দিত তিনি কখনও দেখেননি। পরক্ষণেই ভাবলেন, শুধুই কি তার ছেলে আনন্দিত? তিনি নিজে কি আনন্দিত নন? বুঝতে পারলেন একজন পিতার সবচেয়ে বড় আনন্দ তার সন্তানকে খুশি করা এবং এটা আসলে সহজ একটা কাজ। দুঃখের বিষয়, মানুষ সহজ কাজের মূল্য বুঝতে চায় না। একটু পরে কলিম উল্লাহর মোবাইলে একটা কল এলো,কলিম ভাই, আসসালামু আলাইকুম।ওয়ালাইকুম আসসালাম।আপনে কই ?এই তো ভাই, ছেলেকে নিয়ে একটু উৎসবে আসছি।দূর্গা পূজা উৎসব। কন কী? পূজা?আরে ভাই, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। লেখক: অডিট এন্ড একাউন্টস অফিসার ‘অডিট ভবন’, ঢাকা
শুভ্র মনের শুভ্রতার গল্প

পাশের বাসার মেয়ে শুভ্রতা। নামের মতোই শুভ্র গায়ের রঙ। নামকরা স্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্রী। নাচ শিখতো, ভালো গানও গাইতো। ঘটনাচক্রে একবার মেয়েটার নাচ দেখেছিলাম। চমৎকার। একদিন মায়ের কাছে শুনলাম শুভ্রতা হাসপাতালে। সুইসাইড অ্যাটেম্পট। কী সাংঘাতিক কথা! এলাকার সব খবর রাখে মাহবুব। ফোন দিলাম। জনালো, মেয়েটা ওর প্রাইভেট টিচার অর্ক ভাইয়ের প্রেমে পড়েছিল। অর্ক ভাই এলাকার ক্রেজ। স্কুল-কলেজে গোল্ডেন প্লাস রেজাল্ট। আর্কিটেকচারে পড়েন। বেজায় স্মার্ট, দারুণ পর্সোনালিটি। সবার সঙ্গে মিশতেন না। নিজের মতো থাকতেন। হাই রেঞ্জের দু-একটা টিউশনি করতেন। জুনিয়রদের মধ্যে মাহবুবই কেমন করে যেন ঘনিষ্ট ছিল মানুষটার। শুভ্রতার ঘটনাটা তাই ডিটেইলসেই জানলাম ওর কাছে। মাহবুব জানালো, অর্ক ভাই মেয়েটার খুব কেয়ার নিতেন। জীবনের চমৎকার সব সম্ভাবনার কথা বলতেন। শুভ্রতা মুগ্ধ হতো। মেয়েটার জন্মদিন কিংবা ঈদে উপহার দিতেন হুমায়ূনের বই। অর্ক ভাই বলতো, শুভ্রতার মতো মেধাবী মেয়ে দু`টো হয় না। কিন্তু প্রিয় ছাত্রীর প্রতি এই নির্দোষ আন্তরিকতাই সর্বনাশ ডেকে আনলো। বয়:সন্ধি আবেগে মেয়েটা অর্ককে স্বপ্নের পুরুষ ভাবতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠলো প্রকট। অর্ক যতদিনে বুঝলো, দেরি হয়ে গেল খুব। মেয়েটিকে উপেক্ষা করা এবং টিউশনি বাদ দেয়া ছাড়া আর উপায় থাকলো না। কিন্তু শুভ্রতা অর্কের এমন আচরণ কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না। অর্কর আন্তরিকতাকে সে ভালোবাসা ভেবেছিল। যে ভালোবাসার আরেক নাম জীবন। ব্যাস, জীবনের প্রতি মায়া উবে গেল। ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়লো সিলিং ফ্যানে। ভাগ্যিস, ঠিক সময়ে কাজের মেয়েটা এসে পড়েছিল। ওই ঘটনায় জীবন ফিরে পেলেও অনেক কিছু হারাতে হলো শুভ্রতাকে। নিজের আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সম্মান ধুলোয় মিশে গেল। পাড়াজুড়ে শুরু হলো অদ্ভূত কানাকানি। সকল কানাঘুষা আর সমালোচনা কেবল শুভ্রতাকেই ঘিরে, ১৪ বছরের মেয়েটির বোকামি আর হতবুদ্ধিতাকে ঘিরে। কেউ কেউ বলতো, শুভ্রতার মা-ই নাকি ভালো ছেলে পেয়ে মেয়েকে উসকে দিয়েছিলেন! ফলাফল, বছর খানেকের মধ্যেই শুভ্রতারা এলাকা ছাড়া। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ওই ঘটনা অর্ক ভাইয়ের জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। আমি শুভ্রতাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। মাহবুব মনে করিয়ে দিল। গতকাল ফেসবুকে বললো, শুভ্রতাকে মনে আছে? বললাম, হ্যাঁ। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম, শেষমেষ কি হয়েছিলো রে? ও বললো, বাজে কথার ভয়ে মেয়েটা স্কুলে যেতে পারতো না। বাসায় পড়াশুনা করে কোন রকম এসএসসি দিয়েছিল। এতোকিছুর পরও মেয়েটা এ প্লাস পায়। তবুও আর পড়াশোনা করায়নি বাবা-মা। বিয়ে দিয়ে দেয়। শুনেছি দুটো ছেলেও আছে। -আর অর্ক? -উনি তো আমেরিকায়। বেশ আছেন। আমার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল। বয়:সন্ধিকালের ছোট্ট ভুলে সম্ভাবনাময় একটা ফুল ফোঁটার আগেই ঝরে গেল। অথচ শুভ্রতা হতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! হতে পারতো বিসিএস ক্যাডার! এমনকি মনোযোগী চিকিৎসকও! কিছুই হতে না পারুক, একটা শুভ্র জীবন তো পেতে পারতো মেয়েটা! ভুল কী ওর একার ছিল? বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পরিপক্ক অর্কের ছিল না? তার কী মনে হয়নি, খামোখা আন্তরিকতা মেয়েটাকে ভুল পথে নিতে পারে? বয়সে বড় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে অর্কের দায়িত্ববোধ কী আরো বেশি ছিল না? নাকি মেয়েটার আকর্ষণকে নিজের ব্যক্তিত্ত্বের অনন্য যোগ্যতা ভেবে কিছুটা আত্মসুখে ভূগতেন তিনি? ক্যাস্পাসে, ফেসবুকে, আশেপাশের চেনাজগতে এমন বহু অর্ক ভাইকেই দেখি, যারা শুভ্রতাদের বয়:সন্ধি আকর্ষণবোধে ভীষণ আত্মসুখে ভোগেন। কিন্তু নিজের দায়িত্ববোধটা ভুলে থাকেন বিপুল বিক্রমে! লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক টিকে

আসাহি সিম্বুন ও আমরা

জাপানে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ এক নম্বর পত্রিকাটির নাম আমাদের অনেকেরই অজানা। তবে প্রচার সংখ্যায়  শীর্ষস্থানে থাকা পত্রিকাটির নাম আবার অনেকেই জানেন। পত্রিকাটির নাম আসাহি সিম্বুন (ASAHI SIMBUN)। জাপানি ভাষায় আস্ হা শব্দের অর্থ ভোর বা সকাল। আর সিম্বুন শব্দের অর্থ পত্রিকা বা কাগজ। বাংলায় আসাহি সিম্বুনের নাম বলা যায়, ভোরের পত্রিকা বা ভোরের কাগজ; সকালের পত্রিকা বা সকালের কাগজ। তিন দশক আগে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত আসাহি সিম্বুনের অন্যতম সদর দপ্তর তিন-তিনবার সরজমিনে পরিদর্শনের সৌভাগ্য হওয়ায় এ পত্রিকাটির প্রকাশনা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা হয়। দীর্ঘদিন পর আমি আমার সাংবাদিক সহকর্মীদের সাথে এই পত্রিকাটির প্রকাশনা বিষয়ে কিছু তথ্য ভাগাভাগি করার লক্ষ্যেই আজকে আমার এ লেখার উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সময়ে এনালগ যুগ থেকে ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে বিশ্বের ছোট-বড় অনেক দেশ। ডিজিটাল উন্নয়নের এ ধারা এখন মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। ফলে এখন আর থাকছে না জেনারেশন গ্যাপ বা প্রজন্মশূন্যতা। হালে বাংলাদেশও ডিজিটালের কল্যাণে এগিয়ে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। জাপানের আসাহি সিম্বুনের প্রকাশনায় তৎকালীন আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি দেখার পর আমার কি ধারণা হতে পারে তা এখন সবাই সহজেই অনুমান করতে পারেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নকালে বারবার মাস্টার্স পরীক্ষার তারিখ পেছানোর এক পর্যায়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইন্সটিটিউটে জাপানি ভাষার ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস করছিলাম। এরই মধ্যে মাস্টার্স পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা ও পরীক্ষা শুরু হয়ে যাওয়ার কারণে জাপানি ভাষার ক্লাস করা তথা ডিপ্লোমা কোর্সটি সম্পন্ন করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হয়নি। যদিও একই সময়ে আমি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম জাপানির ভাষার সামান্যতম শিক্ষাটুকুও বুঝি আমার জন্য নিরর্থকই হয়ে যাবে। কিন্তু না, ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ‘ইয়ু লিডারশিপে’র ওপর জাপান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছয় মাসের এক বৃত্তি নিয়ে আমি জাপান যাই। নিপ্পন কেনসিকাই (NIPPON KENSIKAI) নামের যে যুব সংস্থার কল্যাণে বৃত্তিটি পেয়ে আমার জাপান যাওয়া, তারা যখন জানতে পারলো আমি পেশায় একজন সাংবাদিক; তখন তারা তাদের কর্মসূচিতে কিছু পরিবর্তন এনে সাংবাদিক হিসেবে আমাকে আমার কাঙ্খিত বেশকিছু ক্ষেত্রে বিচরণে অগ্রাধিকারও দেয়। আলোচিত কর্মসূচিতে এশীয় অঞ্চলের আরও ৭/৮টি দেশের যে যুবক ও তরুণেরা অংশগ্রহণ করেন তাদের সঙ্গে একই বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অবসর সময়ে আমার কাঙ্খিত ক্ষেত্রে আমাকে নিয়ে যাওয়া হতো। একথা হয়তো আমাদের সবারই জানা, আমন্ত্রিতদের হোমস্টেতে রেখে জাপানিরা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সকল কর্মকান্ড এবং জাতীয় উন্নয়নের সবকিছুই অন্যকে দেখাতে ভালোবাসে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের প্রতিবছরই জাপানে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, জাপান থেকেও প্রায় বিশ হাজার তরুণ-তরুণীকে সরকারি খরচে প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট দেশের সামাজিক অবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকান্ড সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য। জাপানে যখন যাই তখন আমি টগবগে তরুণ এক পেশাদার রিপোর্টার সাংবাদিক। ছোটবেলা বই-পুস্তকে পড়েছি ‘সূর্যোদয়ের দেশ জাপান’। তাই জাপান ও সে দেশের মানুষ সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল আমার আগে থেকেই। জাপান সূর্যোদয়ের দেশ- কথাটি যে আসলে সিম্বোলিক বা প্রতীকী তা বুঝতে পারি জাপান যাওয়ার পরেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জাপান প্রতিহিংসার রাজনীতিতে না জড়িয়ে ‘ফ্লাওয়ার মুভমেন্ট’ বা শান্তির আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা শুরু করে সেখান থেকেই জাপানের সূর্যোদয়ের দেশের খ্যাতি। যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বের মানুষই উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর ফলে বিশ্বের অনেক দেশই এখন উন্নত বা উন্নয়নশীল উন্নত দেশ। একদিন নিপ্পন কেনসিকাই প্রধান হাম্মাদা সানকে জাপানের শ্রেষ্ঠ পত্রিকার প্রকাশনা কার্যক্রম দেখার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি আমাকে জাপানে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ পত্রিকাটির নাম বললেও প্রচার সংখ্যায় দ্বিতীয় শীর্ষ পত্রিকা ‘আসাহি সিম্বুন’-এর টোকিও সদর দপ্তর পরিদর্শনের ব্যবস্থা করলেন। প্রথম যেদিন আসাহি সিম্বুন পত্রিকা অফিসে যাই তখন আমাকে রিসেপশন কক্ষে টেলিভিশন মনিটরে পত্রিকাটির প্রকাশনা কার্যক্রম দেখানো হয়। কেননা ওই দিন ভিতরে ঢুকে সরজমিনে দেখার অনুমতি আমার ছিল না। অবশ্য সাধারণের সরজমিনে পর্যবেক্ষণের কোন নিয়মও তখন চালু ছিল না। পত্রিকাটির প্রকাশনা কার্যক্রম টেলিভিশন মনিটরে দেখে আমি তৃপ্ত না হওয়ায় হাম্মাদা সান আসাহি সিম্বুন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্বিতীয়বারের মত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করলেন। এবার পত্রিকা অফিসের ভিতরে গিয়ে অসংখ্য কম্পিউটার মনিটর দেখে আমারতো মাথা খারাপ। কেননা এর আগে বাংলাদেশে কোন পত্রিকা অফিসে কম্পিউটারে কম্পোজ ব্যবস্থা দেখিনি এবং আমাদের দেশের সংবাদপত্রে জাপানের তৎকালীন ডিজিটাল আধুনিকতার হাওয়া মোটেই লাগেনি বললে চলে। আগে থেকেই আমাকে বলা হলো এবং পরে দেখানো হলো রিপোর্টারদের কম্পোজে ভুল হলে সঙ্গেসঙ্গেই ভুল সংশোধন করা যায়। ঠিক ওই সময়ে আমার ধারণা ছিল শুধুমাত্র টাইপ রাইটার সম্পর্কেই। আলোচিত সময়ে বাংলাদেশে সংবাদপত্রে কম্পিউটার কম্পোজতো দূরের কথা কম্পিউটার প্রযুক্তিই ছিল দুর্লভ এবং যা ছিল তখন সবার চিন্তারও বাইরে। তখন বাংলাদেশে সংবাদপত্র প্রকাশনার ক্ষেত্রে ছাপাখানায় সিশার টাইপে হ্যান্ড কম্পোজই ছিল একমাত্র ভরসা। এক লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার নয়শ’ বিশ বর্গমাইল আয়তনের বিশ্বের ৬১তম বৃহৎ দেশ জাপান। যার ৭৩ শতাংশ এলাকাই পাহাড় পর্বত ঘেরা। জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৬৮ লাখ। যা ৫৫ হাজার বর্গমাইল আয়তনের বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটির চেয়ে প্রায় চার কোটি কম। জাপানের অধিকাংশ মানুষই শিক্ষিত। তাই পত্রিকার পাঠক সংখ্যাও বেশি। অথচ বাংলাদেশে শুধু পত্রিকার সংখ্যাই সাত শতাধিক কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় পত্রিকার পাঠক সংখ্যা কম। ২০০৯ সালের হিসাব অনুযায়ী জাপানে পত্রিকা প্রকাশনার সংখ্যা মোট ১১০টি। এরমধ্যে জাতীয় পত্রিকার সংখ্যা পাঁচটি। শীর্ষ একনম্বর পত্রিকার নাম ইয়োমিউরি (YOMIUR)। রক্ষণশীল দৈনিক হিসেবে পরিচিত বাম রাজনীতির ধারক এ পত্রিকার সারাদেশে প্রকাশ সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৪৩ হাজার। উদারপন্থী বা Liberal হিসেবে পরিচিত দ্বিতীয় শীর্ষ দৈনিক আসাহি সিম্বুনের (ASAHI SIMBUN)প্রচার সংখ্যাও বর্তমানে এক কোটির উপরে। উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত অপর তিনটি পত্রিকার প্রত্যেকের প্রচার সংখ্যাও ষাট লাখের উপরে। আলোচিত আসাহি সিম্বুন তার উদারনৈতিক সাংবাদিকতার জন্য জাপানে এখনও সর্বজনগ্রাহ্য একটি দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত। টোকিও ছাড়াও পত্রিকাটি আরও পাঁচটি প্রশাসনিক অঞ্চল (প্রেফেকচার) থেকে একযোগে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির অন্যতম প্রকাশনা সদর দপ্তর ওসাকা প্রশাসনিক অঞ্চলে। আসাহি সিম্বুন ১৮৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয় ওসাকা সদর দপ্তর থেকেই। তখন এর প্রচার সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার কপি। টোকিও সদর দপ্তর থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা শুরু হয় ১৮৮৮ সালের ১০ জুলাই। তখন পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার কপি। ইংরেজি ভাষায় সকাল ও বিকেলে দু’টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সকালের সংস্করণ প্রকাশের সংখ্যা ৭.৯৬ মিলিয়ন বা ৭০ লাখ ৯৬ হাজার এবং বিকেলের সংস্করণ ৩.১ মিলিয়ন বা ৩১লাখ কপি। ছিয়ানব্বুই বছর পরের কথা। ১৯৮৪ সালে আমার টোকিও সদর দপ্তরস্থ আসাহি সিম্বুন পরিদর্শনের সময় তার কার্যালয়ের অবস্থান ছিল মহানগরীর কিয়োবাসি (KYOBASI) এলাকার মতোসুকিয়াকোতে (MOTOSUKIYACHO)। তখনকার আসাহি সিম্বুন ভবনের আটতলার ছাদে ছিল তিনটি হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন ও অবতরণের ব্যবস্থা। দেশের কোথাও কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলে রিপোর্টার-ফেটাগ্রাফারসহ প্রয়োজনীয় দল ছুটে যেতো সেখানে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য খোদ টোকিও মহানগরীতেই নিয়োজিত ছিল ২২শ’ (২২০০) রিপোর্টার। পত্রিকা ছাপা হওয়ার পর তার গ্রাহক বা এজেন্টের কাছে পৌঁছানোর জন্য নাম-ঠিকানা লেখা, প্যাকেট করা এবং তা গাড়িতে ওঠানোর ব্যবস্থাও করা হয় সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতেই। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কতজন রিপোর্টার কাজ করেন তার কোন সঠিক তথ্য কারও কাছে আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রশ্ন করা হলে কেউ হয়তো অনুমান ভিত্তিক একটি সংখ্যাও বলে দেবেন। এ সংখ্যা হয়তো হবে ৫/৬ হাজার। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) কতজন সদস্য তার একটা সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু পাওয়া যাবে না গোটা দেশ কিংবা শুধু ঢাকায় কর্মরত সংবাদ মাধ্যমগুলোর রিপোর্টারদের সঠিক পরিসংখ্যান। চীন আন্তর্জাতিক বেতার (CRI), বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল বাংলাভিশন এবং কয়েকটি সংবাদপত্রে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমার সম্পৃক্ততা। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কর্মরত প্রকৃত রিপোর্টারের সংখ্যা শুধু আসাহি সিম্বুনের টোকিও মহানগরিতে কর্মরত রিপোর্টারের সংখ্যার চেয়ে খুব একটা বেশি হবে বলে আমার মনে হয় না। সংবাদপত্র প্রকাশনা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিন দশক আগে আমরা কোথায় ছিলাম, আর এখন কোথায় আছি- সে কথাই ভাবছি। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

সূর্যোদয়ের দেশে

পূর্বদিকে সূর্য ওঠে- এ কথাটি দ্রুব সত্য। কিন্তু বিশ্বের কোন দেশে প্রথম সূর্য ওঠে সে কথাটি আমাদের অনেকের কাছেই এখনো অজানা। তিন দশক আগে এ বিষয়টি আমার কাছেও ছিল অজানা। আমরা ছোটবেলা থেকেই একথা জেনে এসেছি যে, সূর্যোদয়ের দেশ হচ্ছে জাপান। অপরদিকে জাপান ভূমিকম্পের দেশ হিসেবেও সবার কাছে পরিচিত। তবে আমার এ লেখার বিষয়টি ‘সূর্যোদয়ের দেশ’ নিয়েই। আমাদের অনেকের মনেই এখনো এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, বিশ্বে জাপানেই সকালে প্রথম সূর্য ওঠে। হ্যাঁ, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত  জাপানেও প্রতিদিন সকালে পূর্বদিকেই সূর্য ওঠে। তবে বিশ্বে জাপানই যে প্রথম সূর্যোদয়ের দেশ নয়–সে কথাও দ্রুব সত্য। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে জাপানই যে সূর্যোদয়ের দেশ-এ কথাটি তাহলে এলো কোত্থেকে। ছোটবেলা পাঠ্যপুস্তকে পড়ে আমার মনেও এ বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল যে, জাপানই বিশ্বে প্রথম সূর্যোদয়ের দেশ। আর তখন থেকেই স্বপ্নের সূর্যোদয়ের এ দেশটি দেখা ও তার সম্পর্কে জানার আগ্রহ জন্মে আমার মনে। আর এ স্বপ্নও আমার একদিন পূরণ হয় জাপান সফরের মধ্য দিয়ে। বিশ্বে প্রথম সূর্যোদয়ের দেশ জাপান- আমার এ ধারণা পাল্টে যায় এখন থেকে তেত্রিশ বছর আগে। নিপ্পন কেনসিকাই (Nippon Kenseikai) নামের একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে জাপান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৃত্তি পেয়ে তখন জাপান সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এ সফরের আগে থেকেই আমার ভেতরে একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। আমার সফরের মুল কর্মসূচির বাইরে আমি কি করবো, কি দেখবো এবং কি জানবো সে সম্পর্কেও আমি অলিখিত কিছু কর্মসূচীও ঠিক করলাম। যদিও আমার ব্যক্তিগত কর্মসূচির একটি বাদে সবগুলোই পূরণ হয়েছিল। উপরন্তু আমি অতিরিক্ত আরও অনেক কিছু দেখতে পেরেছি এবং উপভোগ করতে পেরেছি। সূর্যোদয়ের এ ধারণা হয়তো আমার আজীবনই থেকে যেতো যদি আমার জাপান যাওয়ার সুযোগ না হতো। জাপান যাওয়ার আগে আমার মনে যে উত্তেজনা কাজ করে তা হচ্ছে- প্রথমত: আমি আমার ছোটবেলা পাঠ্যপুস্তকে পড়া স্বপ্নের সূর্যোদয়ের দেশ জাপান যাচ্ছি। দ্বিতীয়তঃ আমি তখন একজন পেশাদার তরুণ সাংবাদিক হিসেবে সে দেশের প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ পত্রিকার অফিস পরিদর্শনসহ পত্রিকা প্রকাশনার সার্বিক কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করবো। তৃতীয়তঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর নিক্ষিপ্ত আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরী দুটো  পরিদর্শনসহ সেদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করবো। আর সূর্যোদয় সম্পর্কে সার্বিকভাবে অবগত হওয়ার বিষয়টি তো ছিলই। আমার জাপান সফরের সময় শুধু দেখা হয়নি আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরী দুটোকে। কেননা এ দুটি নগরীই ছিল আমার জাপান সফরের মূল কর্মসূচী বহির্ভূত। অবশেষে সব প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৯৮৪ সালের ২০জুন জাপানের রাজধানী টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে আমার ছয় মাসের জাপান সফরের কর্মসূচী শুরু হয়। ওই দিন নারিতা বিমানবন্দরে আমাকে স্বাগত জানানোর জন্য আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষমান ছিলেন নিপ্পন কেনসিকাই প্রতিনিধি ইয়ামাগুচি ও তার এক বান্ধবী। ওই তরুণ এর আগে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। যে কারণে জাপান পৌঁছে বিমানবন্দরে নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে আমাকে কোন অসুবিধায় পড়তে হয় নি। জাপান সফরের প্রথম দুই সপ্তাহ আমাকে রাখা হয় টোকিওর অশোকসাবাসি (Asakusabasi) এলাকার চারতারা হোটেল বেলমনটে (Belmonte) । ওই হোটেলেই প্রতিদিন আমার জন্য জাপানি ভাষায় দৈনন্দিন ব্যবহার্য বিষয়ের ওপর প্রাথমিক ধারণা দেওয়া ও পরে তা কার্যক্ষেত্রে সরেজমিনে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। এই কাজে সহায়তা করতেন জাপান সরকারের মনোনীত এক তরুণী (নাম মনে নেই)। জাপানি ভাষাভাষী আমার প্রশিক্ষক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতেন। বলে রাখা ভাল, সত্তরের দশকের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নকালে বার বার পরীক্ষা পেছানোর প্রেক্ষাপটে আমি জাপানি ভাষার ওপর ডিপ্লোমা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ভর্তি হয়ে ক্লাসও করি অনেকদিন। পরে সাংবাদিকতা বিভাগের পরীক্ষা এসে যাওয়ায় জাপানি ভাষার কোর্সটি আর শেষ করা যায়নি। তবুও জাপানি ভাষা ব্যবহারের ওপর আমার মনে ইতোমধ্যেই প্রাথমিক কিছুটা ধারণাও সৃষ্টি হয়। যা আমার জাপান সফরের শুরুতে প্রাপ্ত প্রশিক্ষণে অনেক সহায়ক হয়েছিল। টোকিও পোঁছানোর পর থেকেই জাপানে সূর্যোদয়ের বিষয়টি জানার জন্য আমি আমার উত্তেজনা যেন আর কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিলাম না। আমার প্রশিক্ষক ওই তরুণীকে একদিন খুব বিনয়ের সাথেই জিজ্ঞাসা করলাম সূর্যোদয়ের বিষয়টি। তরুণী আমার প্রশ্নের পর আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন জাপানে সূর্যোদয় সংক্রান্ত আমার অজ্ঞতার বিষয়টি। তিনি হেসেই বললেন, হ্যাঁ জাপানেই প্রথম সূর্য ওঠে।তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আর সে সূর্যোদয় প্রাকৃতিক সূর্যোদয় নয়। সে সূর্যোদয় হচ্ছে (Symbolic) প্রতীকী। ওই সময় তিনি তার হাতে থাকা ডায়েরিটা খুলে ধরলেন আমার সামনে। তিনি ডায়েরির পাতায় তর্জনী রেখে বললেন, এটি জাপানের জাতীয় পতাকার ছবি। আমি জাপানের পতাকার ছবিটি দেখে রীতিমত বিস্মিত হলাম। কেননা এর আগে জাপানের জাতীয় পতাকার ব্যাপারে তেমন কোনো ধারনাই আমার ছিলনা। প্রশিক্ষককে আমি আমার সদ্য শেখা জাপানি ভাষায়ই তখন বললাম, ‘দাই তাই ওনাজি’। যার বাংলায় অর্থ হচ্ছে, প্রায় একই রকম। অর্থাৎ জাপান ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দেখতে প্রায় একই রকম। তবে পার্থক্য শুধু জাপানের পতাকায় সাদার মাঝে লাল সূর্য। আর বাংলাদেশের পতাকায় সবুজের মাঝে লাল সূর্য। জাপানে প্রথম সূর্যোদয়ের বিষয়টি যে প্রতীকী তা আমার কাছে তখনো অস্পষ্ট মনে হলেও ধীরে ধীরে তা স্পষ্ট হতে থাকে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরীতে দুটি আণবিক বোমা ফেলে। ৬ আগস্ট লিটল বয় (Little Boy) নামের প্রথম আণবিক বোমাটি ফেলে হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট ফ্যাট ম্যান (Fat Man) নামের দ্বিতীয় বোমাটি ফেলে নাগাসাকি নগরীতে। ওই বোমার তেজস্ক্রিয়তার ফলে দুটি নগরীতে যে বিরূপ প্রভাব পড়ে তা ছিল সারা বিশ্বে মানব সভ্যতার জন্য বিরল এক ঘটনা। আজও বিধ্বস্ত নগরী দুটোতে জন্ম নিচ্ছে বিকলঙ্গ শিশু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে সেই কবে। বাহাত্তর বছরেও সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। আণবিক বোমার বিভীষিকা এখনো তাড়িয়ে বেরাচ্ছে জাপানে আলচিত নগরী দুটোর মানুষকে। স্বভাবতই বিশ্বের কোনো দেশ বহিঃশত্রুর আক্রমণের শিকার হলে পাল্টা আক্রমনের মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু না, জাপান তা করেনি। যুদ্ধ শেষে জাপান সারা বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ‘ফ্লাওয়ার মুভমেন্ট’ নামে শান্তির আন্দোলন শুরু করে। জাপানের পূর্ব দিগন্তে উদয় হয় উন্নয়নের সূর্য। যে আন্দলনের ফলে আধুনিক জাপান আজ সারা বিশ্বে এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী উন্নত দেশের মডেলে পরিণত হয়েছে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকারি পর্যায়ে নেওয়া দেশের উন্নয়ন কর্মসূচিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে দেশটির সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে এবং সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মসূচী সফল করে তোলে এবং এখনো সফল করে চলছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সরেজমিনে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর ২০(বিশ) হাজার তরুণ-তরুণী, যুবক–যুবতিকে সরকারি খরচে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি অন্য দেশ থেকেও তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতিকে জাপানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সে দেশে দীর্ঘ সময় অবস্থানের অনুমতি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে প্রতি বছর। আমন্ত্রিতদের রাখা হয় দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে হোমস্টেতে। এমনি এক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্যই আমি বৃত্তি পেয়ে জাপান যাই। ওই কর্মসূচিতে অংশ নেয় বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও কয়েকটি দেশের যুবক-যুবতি প্রতিনিধিরা। এদের মধ্যে একমাত্র আমিই পেশায় সাংবাদিক হওয়ায় আমাকে আমার কাঙ্ক্ষিত স্থান এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিদর্শনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এমনি করে আমি অনেক অজানার অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানের ‘ফ্লাওয়ার মুভমেন্ট’ বা শান্তির আন্দোলনের কর্মসূচিকেই জাপান নতুন সূর্যোদয় হিসেবে আক্ষায়িত করে এবং দেশটিকে সারা বিশ্বে সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় বছরখানেক আগে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লেখক সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন। এ তথ্য অনুযায়ী প্রাকৃতিক নিয়মে প্রকৃত সূর্যোদয়ের দেশ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। আর উন্নয়নের মডেলের প্রতীকী সূর্যোদয়ের দেশ হচ্ছে জাপান। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

সুরা, সুরা পান ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ব্যাংককের পথে শিকাগো গিয়ে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের ইস্তাম্বুল ফ্লাইটে উঠে বসেছি মাত্র। প্রান্তিক আসন আমার জন্য আগেই সংরক্ষিত ছিল। একই সারিতে ডান পাশের দু’টো বসার জায়গা এখনো খালি। বিমান প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ, ভাবছি আর যদি কেউ না আসে তাহলে আজ তিন আসন নিয়ে শুয়ে-বসে আরাম করে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া যাবে। এমন সময় হাতে জ্যাকেট ও কাঁধে হ্যান্ডব্যাগ ঝুলিয়ে এক ভদ্রমহিলা হাঁটতে হাঁটতে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন, জানান দিলেন, আমাকে ডিঙিয়ে জানালা-সিটের মালিক তিনি। কী আর করা, আমার আশায় গুড়ে বালি! পথ করে দিলাম, তিনি তাঁর জায়গায় গিয়ে বসলেন। ইতিমধ্যে বিমানের  প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। যাত্রীরা নিজ নিজ আসনে থিতু হয়েছেন। আমার ঠিক ডানের যাত্রী অনুপস্থিত, তাই অবস্থানগত দিক থেকে আমাদের দু’জনের মাঝে  মাত্র এক আসন বরাবর তফাৎ। হলে কী হবে, অপরিচিত মানুষদের মতামত ও মত বিনিময়ের দূরত্ব অজানা, অপরিসীম! দুর্ভাগ্যক্রমে, এ দূরত্ব মাপার কোনো যন্ত্র আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়নি!  এ সব বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমি যখন সফরে বের হই  তখন লেখালেখির উপাদানের খোঁজে সব কিছুই কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি, অজানা অচেনা মানুষের সাথে কথা বলারও লোভ সামলাতে পারি না। এতে মাঝেমধ্যে আমাকে অসুবিধায়ও পড়তে হয়, আর ব্যক্তিটি যদি নারী হন তাহলে তো কথাই নেই - নিঃসন্দেহে, ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়, তথাপি আগুপাছু না ভেবে, সহযাত্রিণীকে জিজ্ঞেস করে ফেলললাম, আপনি কি ইস্তাম্বুলেই থাকেন? ‘না, আমি লরেন্স-ক্যানসাসে থাকি, তেহরান যাচ্ছি অসুস্থ বাবাকে দেখতে,’ উত্তর দিলেন তিনি। প্রশ্নে যা চেয়েছি, জবাব তার চেয়ে বেশি মিলল। তাঁর দেশ সম্পর্কে এমনিতে আমার অনেক জানার আছে, কৌতূহলও আছে। ভাবলাম, নিশ্চয়ই আজ আপনাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মত কিছু না কিছু নতুন জ্ঞান পাওয়া যাবে। অবশ্য ওদিকে যাওয়ার আগে ভদ্রমহিলা নিজ থেকেই বলে বসলেন যে, তাঁর মনটা খুব খারাপ, কারণ সাম্প্রতিক ওয়াল স্ট্রিটের টালমাটাল অবস্থা দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তিনি তাঁর কতগুলো স্টক বিক্রি করে সাড়ে সাত হাজার ডলার লোকসান গুনেছেন! এ বিষয়ে আমি যেটুকু জানি ও বুঝি তার ওপর ভর করে তাঁকে একটু আশার কথা শোনাবার চেষ্টা করলাম। মনে হলো তিনি আমার বয়ান মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, সমঝে নিলেন এবং দু’দণ্ড স্বস্তিও পেলেন। পরক্ষণেই একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন রাখলেন, ‘আপনি এতকিছু জানেন কী করে?’ আমি অর্থশাস্ত্রের এক জন ছাত্র এবং স্টক মার্কেট সম্মন্ধে আমার সামান্য কিছু অভিজ্ঞতা আছে, এই যা, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। ওয়াল স্ট্রিট ওঠা-নামার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যদি সত্যি সত্যি বুঝতে পারতাম তা হলে আমি আজ এখানে না বসে ফার্স্ট ক্লাসেই বসতাম, সংক্ষেপে এই ছিল আমার জবাব। তিনি একটু মুচকি হেসে চুপ মেরে গেলেন। লম্বা বিরতির পর আবার কথোপকথন শুরু হলো। এবার তিনি নিজ দেশ সম্মন্ধে  আমাকে যা অবহিত করলেন, সংক্ষেপে তা এইরূপ:  বহির্বিশ্বের অবরোধ উঠে গেলেও এখনো ইরানের আর্থসামাজিক অবস্থা খুবই নাজুক। জীবনযাত্রার জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, তার ওপর মুদ্রাস্ফীতি লাগামহীন হারে বেড়েই চলেছে।  বিত্তবানরা সৌখিন জিনিসপত্র টাকা দিয়েও মেলাতে পারে না। জনগণের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়ন অব্যাহত আছে। সম্প্রতি রাজপথে যেটুকু উত্তেজনা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছিল তা থেমে গেছে। এখন মানুষের মুখে প্রতিবাদের কোনো ভাষা নেই। মনে হলো ভদ্রমহিলা ঘোর সরকারবিরোধী। ইরানে এটা নেই, ওটা নেই বলতে বলতে তিনি এক পর্যায়ে বলে বসলেন, তাঁর দেশ এমনভাবে দেউলিয়া হয়েছে যে, তেহরান এয়ারপোর্টের বাথরুমে নাকি টয়লেট পেপার রাখার সামর্থও হারিয়ে ফেলেছে। আরও বললেন, তিনি এতে ভীষণভাবে লজ্জিত ও বিব্রতবোধ করেন। হাফিজ, সাদী, আত্তার, খৈয়াম ও ফেরদৌসীর দেশ - ইরানে দেখার মতন অনেক কিছু আছে, এ সব ছাপিয়ে ওই মুহূর্তে তেহরান বিমানবন্দরের বাথরুম দেখার উদগ্র বাসনা আমার মাঝে জেগে উঠলো, কিন্তু আমার এ ইচ্ছের কথা কোনোমতেই তাঁকে বুঝতে দিলাম না। সচেতন অথবা অবচেতন মনে তিনি তাঁর দেশকে নিয়ে খানিকটা গর্ববোধও করলেন। বললেন, তিনি তেহরানে যে ল্যাসিক সার্জারি করিয়েছিলেন, জনৈক আমেরিকান চোখের ডাক্তার তা দেখে অবাক হয়ে বলেছেন, ‘কাজটি নিখুঁত হয়েছে!’ আরও জানালেন, ইনস্যুরেন্স কোপেমেন্টের কারণে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমআরআই করাতে অসমর্থ। এবার তেহরানের সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে কাজটি সেরে যাবেন। আমি বললাম, তাহলে আপনার দেশে কিছু ভালো ও ইতিবাচক কাজও হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ দিনের এই কঠিন অবরোধের মাঝে ইরান অত্যাধুনিক মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি আমদানী কিভাবে করে, কোত্থেকে করে? তিনি এর জবাব দিতে পারলেন না। আমিও এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পাইনি। তারপর এক সময় আমি ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার দেশে কি মেয়েদের জন্য হিজাব পরা বাধ্যতামূলক? তিনি জানালেন, ‘হ্যাঁ’। আমি বললাম, হিজাব ছাড়া এয়ারপোর্টে গিয়ে নামলে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না? বললেন, ‘আমার হ্যান্ডব্যাগে হিজাব আছে। সময়মত পরে ফেলব’। না পরলে কী হবে? আমার পরের প্রশ্ন। ‘পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, জেলে পুরবে, নির্যাতনও করতে পারে!’ দারুণ অসহায়ের সাথে বলতে বলতে তাঁর চোখেমুখে এক করুণ ছবি ভেসে উঠলো! আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল!  ইরানি নারীর সাথে আমার কাজের কথা মোটামুটি এখানেই শেষ। এরপর ডিনার পরিবেশিত হলো। খাওয়াদাওয়ার পর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘন্টা দু’এক বাদে চোখ খুলে দেখি, আমার সহযাত্রিণী মনের আনন্দে আচ্ছাসে সুরা এস্তেমাল করছেন! মনে মনে ভাবলাম, আপনার দেশের সরকার, পুলিশ, প্রশাসন আপনার ওপর জুলুম করছে, কিন্তু আপনিও যে নিজের ওপর জুলুম করছেন তা বেমালুম গাফেল হয়ে আছেন! আজকাল আমরা এমন এক জমানায় বাস করছি যখন অত্যাচারী যে, সে তো অত্যাচারীই, যে অত্যাচারিত সেও আজ অত্যাচারীর বেশে আবির্ভূত হয়েছে! আর কাউকে না পারলে,  জেনে হোক, না জেনে হোক, ন্যুনতম পক্ষে নিজের ওপর নিজেই অত্যাচার করে চলেছে! সুরা ও সুরা পানের কথা কিন্তু এখানেই শেষ নয়, সামনে আরও আছে। একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। এ রাত গেল, পরের দিনও গেল, আকাশে উড়ছি তো উড়ছি, পথ আর শেষ হচ্ছে না! অবশেষে ইস্তাম্বুলে কয়েক ঘন্টা বিরতির পর তৃতীয় দিন স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ন’টার দিকে ব্যাংককে অবতরণ করলাম। যথারীতি ইমিগ্রেশন ও কাস্টম্স সেরে ট্যাক্সিতে উঠে হোটেলের দিকে রওয়ানা দিয়েছি। নতুন দেশ, এ-দিক ও-দিক দেখছি, ভালোই লাগছে। রাস্তাঘাট নিখুঁত, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এয়ারপোর্ট থেকে যতই শহরের দিকে এগোচ্ছি, ততই পরিবেশটা যেন কেমন কেমন লাগছে! মেঘবিহীন আকাশ, সূর্য আছে, উত্তাপ আছে, আলো আছে, ছায়াও আছে, তবু কী যেন একটা নেই! কী  নেই, তা আবার বুঝতেও পারছি না! আকাশটা যেন মলিন, মনমরা, ঘোলাটে  ঘোলাটে লাগছে; ধোঁয়ামাখা, ধোঁয়াটে। আকাশের গাঢ় নীল রঙ বদলে গেছে! হে আল্লাহ্, এ কী হেরিলাম আমি ব্যাংককে! সভ্যতার এ কী বীভৎস বিকৃত রূপ, উন্নয়নের এ কী বিধ্বংসী বিষাক্ত বহিঃপ্রকাশ! এতক্ষণে  বুঝলাম কী হয়েছে! দূষণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অগণিত খাল-নালা ও নদী যেমন মরে গেছে, ব্যাংককের আকাশ ও আজ মৃত! এত বড় শহর, লক্ষ লক্ষ লোকের বাস, বিরাট, বিস্তৃত, উন্মুক্ত আকাশ! এত বড় আকাশ ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে, আকাশের ঘন নীল রঙ ফিকে হয়ে আছে! বৃষ্টি, ঝড়, বাতাস কোনো কিছুই এই ধোঁয়া কাটাতে পারছে না। আমি বিস্ময়ে হতবাক, আমি স্তম্ভিত! আমার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা হরহামেশা ব্যাংকক যায়-আসে, তাদের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, কিন্তু ব্যাংককের এই বিবর্ণ অম্বরের কথা কেউ আমাকে বলেনি, কোনো দিন বলেনি। আমার এক শ্রীলঙ্কান বন্ধু সাংহাই-এ থাকে। তার কাছে  শুনেছি, সাংহাই ও বেইজিং-এ নীল আকাশ দেখা যায় না। আজ ফিকে আকাশ, মৃত আকাশ ব্যাংককেই দেখে ফেলেছি। ধূসর আকাশ দেখতে ও’দিকে আর না গেলেও চলবে! এ কোন জগতে আমার বাস করছি! মানুষ শুধু জমিন, পানি ও হাওয়ার স্বাদ ও গন্ধ বিকৃত করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা চৌহদ্দিবিহীন উদাম উন্মুক্ত আসমানের রঙও বদলে দিয়েছে! নিঃসন্দেহে এটা মানব সভ্যতার এক ক্রান্তিকাল!  ব্যাংককের আকাশ দেখে দেখে আমার ক্লান্ত চোখজোড়া নেমে এল মাটির ধরায়। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে চেয়ে দেখি ট্যাক্সি ড্রাইভারের লাইসেন্স ঝুলছে। ভদ্রলোকের নাম, মি. সুরা পান। তাঁকে বললাম আপনার নামটা বড়ই সুন্দর! আমাদের ভাষায় এ নামের অর্থ মদ্যপান। আপনি কি সুরা পান করেন? তিনি অকপটে বললেন, বিকেল বেলা কিঞ্চিৎ সেবন করে থাকেন। সুরা ও সুরা পান নিয়ে আমার মূল কথা এখানেই শেষ, তবে আপনাদের আগ্রহ থাকলে এ নিয়ে আরো দু’একটি কথা বলতে পারি।  ধৈর্য ধরে পড়ুন, আশা করি নিরাশ হবেন না। সুরা ও সুরা পান পাশ্চাত্য সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এত দিন আমেরিকায় থেকেও দু’একটি মাত্র শব্দ ছাড়া এ বিষয়ে তেমন কিছুই জানি না। এ লেখা শুরুর আগে গুগল-অনুসন্ধান করে সুরা সস্মন্ধীয় আরো কয়েকটি শব্দমালা আবিষ্কার করি, যেমন: ভদকা, হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, ভারমাউথ, কগন্যাক, বিয়ার, পোর্ট ওয়াইন, রাম, জিন, স্কচ, লিকার, বোরবন, স্টাউট, ফেনি, শ্যাম্পেন, টাকিলা, রেড ওয়াইন, হোয়াইট ওয়াইন ইত্যাদি, ইত্যাদি। এরপর বন্ধু মাহবুবকে ফোন করলাম এই ভেবে যে, সে কী জানে। আমি তাকে বললাম, দেখ, আমি হরেক রকম মদের একটি তালিকা তৈরি করেছি, দেখি তুই কতটার কথা জানিস। আমাকে বলল, ‘পড় তো দেখি কী কী পেয়েছিস’। আমি পড়তে লাগলাম, ভোদকা, হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, ভারমাউথ। ‘ভারমাউথ’ বলতেই মাহবুব হেসে দিয়ে আমাকে থামালো, বলল, ‘এটা ‘ভারমাউথ’ নয়, ‘ভারমুথ’’। আমি ধাক্কা খেলাম, একটি নতুন শব্দ শিখলাম। ‘তারপর বল’, মাহবুবের তাগাদা। আমি গড় গড় করে পড়ে যাচ্ছি, ‘কগন্যাক’, এবার সে আরো জোরে হেসে দিয়ে বলল, এটা ‘কগন্যাক’ নয়, এর উচ্চারণ ‘কনিয়াক’। ফ্রান্সের একটি জায়গার নাম ‘কনিয়াক’। ওই জায়গার নামানুসারে এই মদের নাম হয়েছে ‘কনিয়াক’। আমি বললাম, তুই এত কিছু জানিস কী করে? তাহলে নিশ্চয়ই তুই লুকিয়ে লুকিয়ে মদ খাস, হা হা করে দুই বন্ধু অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম। বুঝলাম, আমার বন্ধুর পাণ্ডিত্যের সাথে পেরে ওঠার কোনো উপায় নেই! মদ না খেয়েই মদের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখে, এতে যদি তার আসক্তি থাকত, তাহলে দু’একটি নতুন মদ হয়তো সে আবিষ্কারই করে ফেলত। সুরা ও সুরা পান নিয়ে মাহবুবের বাকি কথা বলতে গেলে আমার এ লেখা আজ শেষ হবে না। তাই ওদিকে আর যাচ্ছি না।   মি. সুরা পান আমাকে ‘অ্যাম্বেসেডর’ হোটেলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। হোটেলে চেকইন করার সময়ই বুঝতে পারলাম, এই হোটেলের অধিকাংশ অতিথি বাংলাদেশী। কেউ বেড়াতে এসেছেন, কেউ ব্যবসার কাজে, তবে বেশিরভাগের আগমন চিকিৎসার্থে। রোগীর সাথে আসা কয়েক জনকে জিজ্ঞেস করলাম, ঢাকায় এত নামীদামী হাসপাতাল হলো -  সেখানে কি এই মানের চিকিৎসা হয় না? ‘স্কয়ার’, ‘ইউনাইটেড’, ‘ল্যাব এইড’ থাকতে এত কষ্ট করে, এত টাকা খরচ করে আপনারা কেন এখানে আসেন? তাঁদের কাছে যে উত্তর পেলাম তা কেবল নৈরাশ্যজনকই নয়, বরং বিভীষিকাময়! বাংলাদেশের রোগীরা, নিজ দেশের ডাক্তার ও হাসপাতালকে বিশ্বাস করেন না। তাঁরা জানালেন, শুধু মোটা অঙ্কের বিল করার জন্য,  ডাক্তার ও হাসপাতাল মিলে অকারণে রোগীদের ওপর অস্ত্রোপচার করে ফেলে। শুনে আমার পিলে চমকে উঠলো! এ কথা আমাকে একজন, দু’জন নয়, অনেকেই বলেছেন। নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় দেশ ও জাতিকে কোথায় এনে দাঁড়  করিয়েছে! এই গভীর খাদ থেকে উত্তরণের উপায় কী, ভাবতে হবে সবাইকে।   ‘অ্যাম্বেসেডর’ ও তার আশেপাশে সব সময় অসংখ্য বাংলাদেশী ভাই ও বোনেরা হাঁটাহাঁটি করেন। হোটেল চত্বরের মধ্যে তাঁদের অনেকের দোকানও আছে। কয়েক জনের সাথে আমার কথা হয়েছে, যেমন - এই যে আপনারা ব্যাংকক আসা-যাওয়া করেন, আপনাদের কি কখনো নজরে পড়েছে যে, ব্যাংককের আকাশ মরে গেছে! এখানে মেঘহীন আকাশের রঙ বদলে গেছে! ‘আমরা তো খেয়াল করিনি। তবে হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমরা তো কখনো এভাবে দেখিওনি, ভাবিওনি’। মোটামুটি সবার মুখে একই কথা। আমি বললাম, গত দশ বছর দেশে যাই না, বলেন তো, ঢাকার আকাশেরও কি রঙ এ রকম ফিকে হয়ে আছে? বন্ধুরা ফ্যাল ফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে থাকেন, ‘কী জানি, আমরা তো ঢাকার আকাশ খেয়াল করে দেখিনি, দেখার দরকারও মনে করিনি’। বাহ! আমার দেশের মানুষ, ঢাকায় থাকেন, অথচ ঢাকার আকাশ গাঢ় নীল না ধোঁয়ায় ঢাকা, বলতে পারেন না। বলেন তো, আমি হাসব না কাঁদব! এবার ব্যাংককে বিদেশীদের সামাজিক সম্পর্কের ওপর সামান্য আলোকপাত করতে চাই। এআইটির অধ্যাপক ফজলে করিম সাহেবের বাসায়  এক ছোট্ট ঘরোয়া আড্ডায় যে গল্প শুনেছি তা আমার মত করে আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। কথায় কথায় করিম ভাই বলেছিলেন, সম্প্রতি তিনি জটিল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা সেলে কয়েক দিন ছিলেন। ওই সময় তাঁকে দেখতে বাঙালি অবাঙালি নির্বিশেষে তাঁর সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবের অনেকেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন খ্রীষ্টান, তিনি শুধু দেখতেই যাননি, বরং একই দিন হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অনেক দূরে অনেক কষ্ট করে চার্চে গিয়েছিলেন কেবল বন্ধু রোগীর জন্য প্রার্থনা করতে। আরেকজন ছিলেন ভারতীয় মহিলা, জাতিতে জৈন, তিনি রোগী দেখতে রাতের বেলা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। হাসপাতাল থেকে বের হতে হতে দেরি হয়ে যায়, তথাপি বাড়িতে না গিয়ে তিনি সরাসরি ব্যাংককের জৈন টেম্পলে চলে যান। সেখানে করিম ভাইয়ের জন্য প্রার্থনা করে গভীর রাতে ঘরে ফিরেন। যে কথা শুনে আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে তা হলো, করিম ভাই যে নাপিতের কাছে নিয়মিত চুল কাটাতেন তাঁর পেরেশানি ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখে। অনেক দিন করিম ভাইয়ের দেখা না পেয়ে নাপিত হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজতে থাকেন, বাড়িতে ফোন করে খবর নেন। এত দিনে রোগী বাড়িতে চলে এসেছেন, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হননি। এ কথা জেনে নাপিত করিম ভাইয়ের বাড়িতে এসে তাঁর চুল কেটে দিয়ে যান। আগেকার দিনে বাঁধা নাপিত  নিয়মিত জমিদারবাড়িতে এসে সকলের চুল কেটে, দাড়ি ছেঁটে দিয়ে যেতেন। করিম ভাই শুধু এআইটির শিক্ষকই নন, ব্যাংককের জমিদারও বটেন! পরিশেষে করিম ভাই ও ভাবির মুখে শোনা একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আজকের মত বিদায় নেব। কয়েক বছর আগে গোটা এআইটি ক্যাম্পাস এক প্রলয়ঙ্করী বন্যায় প্লাবিত হয়। ছয় থেকে আট ফুট পানি পুরো ক্যাম্পাসের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। যত দিন তাঁদের বাড়িঘর পানির তলে ছিল তত দিন তাঁরা সিটি সেন্টারে একটি হোটেলে ছিলেন। পানি সরে যাওয়ার পর প্রথম যেদিন ঘরে এসে ঢুকলেন তখন দেখেন নিচতালার যাবতীয় জিনিসপত্র কাদামাটি  মেখে লন্ডভন্ড হয়ে বিধ্বস্ত মেঝেতে লুটিয়ে আছে। এর মাঝে শুধু একটি ব্যতিক্রম ছিল - কোরআন শরীফ, যেটা টেবিলের ওপর পেয়েছেন - যেন কেউ যত্ন করে তুলে রেখেছে!  এখানে বলে রাখা দরকার, পবিত্র কোরআন খানাও পানিতে ডুবেছে, ভেসেছে, ভিজেছে, কারণ এর কাভার, কাগজ, ছাপা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, পাতা উল্টিয়ে তার পাঠোদ্ধার অসম্ভব হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো - সবকিছু মাটিতে, শুধু কোরআনখানা টেবিলের ওপর! লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক- টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি এডিটর - জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ

আলো আমার আলো ওগো

বারো বছরের কেভিন জন্মের পর থেকেই ছটফটে। কখনই চুপচাপ থাকতে পারে না। পাঁচ মিনিটও কোথাও বসে না! স্কুলে মাস্টাররা তাকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যায়। বাড়িতে মা সেরীল প্রতি মুহূর্তেই আতঙ্কে থাকেন, কখন কোন অঘটন করে ও! বলেন, ও যে আমাকে জ্বালাতেই আসছে তা বুঝতাম পেটে যখন অনবরত হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করে আমাকে পেরেশান করতো। বাবা কনরাড একটি ফার্মের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি। সব সময় কোম্পানির গাড়িতে জার্মানি আর আশেপাশের দেশগুলি চষে বেড়ান। তাদের অনেক প্রডাক্টস। এসব জিনিসের প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক। পঁচিশটি ইউরোপিয়ান কম্যুনিটি অন্তর্ভুক্ত দেশগুলিতে একই মুদ্রার চলন। কোন সীমান্ত নেই। ব্যবসায় তাই কম্পিটিশান অনেক বেড়ে গেছে। মাঝে মাঝে শনি-রবিবারেও কনরাড বাড়িতে আসতে পারে না। মোট কথা একমাত্র সন্তান কেভিনকে একা সামলান সেরীল। গত বছর সেরীলের বাবা কিছুদিন রোগে ভুগে হঠাৎ মারা গেলেন। সেরীলের মা তাকে দশ বছরের রেখে মারা যাবার পর, বাবা আর বিয়ে করেন নি। মেয়েকে বড় করে, পড়াশুনা করিয়ে, তার বিয়ের পর মেয়ের সাথেই থাকতেন। বাড়িটাও তারই। সেরীলই একমাত্র সন্তান। ওরা গত পাঁচ পুরুষে এক সন্তানেরই পরিবার। কনরাড বহুবার বলেও সেরীলকে আরেকটি সন্তান ধারণে রাজি করাতে পারে নি। তার কথা, আমাদের পরিবারের এতদিনের ঐতিহ্য আমি নষ্ট করবো না। তারপর দিন দিন কেভিন যেরকম দুরন্ত হয়ে উঠল, তার কোন ভাই বা বোন এলে সংকট আর ঝামেলা যে আরও বাড়বে তাতে এখন স্বামী স্ত্রী দুজনেই একমত। দাদুর মৃত্যুর পর কেভিনের চাঞ্চল্য একটু কমে গেল। দাদুর ঘরে প্রায়ই গিয়ে ওর বড় সোফাটিতে চুপ করে বসে থাকে। সেরীল বাবার ঘরটি আগের মত করেই রেখে দিয়েছে। বিছানার চাদর বালিশ নিয়মিত বদলায়। টেবিল, চেয়ার, র‌্যাক পরিষ্কার করে। দিনে জানালা দরজা খুলে দেয়। হাওয়া চলাচল করে। বাবার মৃত্যুকে সে এখনও মেনে নিতে পারে নি। বাড়ির পরিবেশে সে কোন পরিবর্তন আনে নি। সব কিছু দেখে মনে হয় ওর বাবা বাইরে গেছে, এখনি ফিরবে। কনরাড কিছু বলতে গেলে, সেরীল এমন করুণভাবে তাকায় যে ও প্রসঙ্গ বাদ দেয়। শ্বশুর মারা যাবার পর ও ভেবেছিল ওর ঘরটিতে সে তার কাজকর্ম করবে। এখনকার কাজের জায়গাটি খুব ছোট। দাদুর ঘরটিই বাড়ির মধ্যে সবচাইতে বড়। কিন্ত যেভাবে সেরীল বাপের ঘরের যত্ন আত্তি করে, প্রস্তাবটি করারই সাহস পায় নি। বাইরে খেলতে খেলতে কেভিন হঠাৎ বসার ঘরে এসে দেয়ালে শিল্পির আঁকা দাদুর বড় লাইফ-পোট্রেটটির দিকে একভাবে চেয়ে থাকে অনেক্ষণ। মা সেরীলের দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল। কি ব্যাপার! এটাতো ওর প্রকৃতির সাথে মোটেই মেলে না। কেভিন ১০/১২ মিনিট দাদুর ঘরে বসে আছে বা তার ছবির সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে! তাকে যারা কাছে থেকে চিনত, চোখে না দেখা পর্যন্ত বিশ্বাস করতে চাইত না। স্কুলে কেভিনের টিচার মিসেস রাখেল টেলিফোনে সেরীলকে জানালেন, কয়েকমাস ধরে কেভিন ছুটির সময় আগের মত খেলাধুলা করে না। মাঝে মাঝেই একা একা মাঠের বড় বার্চ গাছটির নিচে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। ক্লাসেও আর আগের মত হৈ চৈ করে না। তিনি এটা ভালো মনে করছেন না। তাকে পরামর্শ দিলেন কোন শিশু-সাইকোলজিস্টের কাছে কেভিনকে নিয়ে যেতে। কনরাড শুনে বলল, কেভিন দুষ্টামি করলে তুমিই তো অনুযোগ করো, ও কেন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে না। এখন তাই করে মাঝে মাঝে। কিন্ত এতেও তোমার চিন্তা! বয়স বাড়ছে ওর। এখন একটু শান্ত তো হবেই। সেরীল এ ব্যাখ্যায় খুশি হতে পারে না। তার মনে হয়, কেভিন একটু অচেনা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করবে, বাসনপত্র ভাঙবে, চেঁচিয়ে কথা বলবে, খেতে বসে অল্প খেয়েই উঠে যেতে নানা রকম বাহানা করবে। এই কেভিনকেই সে জন্মের পর  থেকে চেনে। এখন খাওয়ার সময় শান্ত হয়ে সব খেয়ে তারপর উঠে। মার তো এতে খুশি হবারই কথা। খোশামদ ছাড়াই্ ছেলে পেটপুরে খাচ্ছে। কিন্ত সেরীলের মন মানে না। আগে কথার খই ফুটতো মুখে। এখন অনেক সময় কিছু জিজ্ঞেস করলেও কোন উত্তর দেয় না। মাঝে মাঝে একদিকে চেয়ে থাকে, কোথায় তা ও নিজেই জানে না। চোখদুটি কেমন নিষ্প্রাণ মনে হয়। মনে হয় ও এখানে থেকেও এখানে নেই। মনের তরী বেয়ে কোথাও দূরে চলে গেছে। মা বলেন, কেভিন, কী দেখছিস? কেভিন বলে, না কিছু না। বলে উঠে যায়। আর কিছুই বলে না। মা শঙ্কিত হয়ে উঠেন। দিন দিনই ছেলেটা অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এবারের জন্মদিনে বাবা একটা সাইকেল উপহার দিলেন। কিছুটা পরিবর্তন এল। স্কুলে যাতায়াত করে এখন সাইকেলে। মা তাকে গাড়িতে করে স্কুলে দিয়ে ও নিয়ে আসত। কিন্তু কেভিন সাইকেল পাওয়ার পর আর গাড়িতে উঠতে চায় না। কনরাড বলল, সাইকেলেই যাক। এটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার লক্ষণ। দায়িত্ববোধও বাড়বে। কিন্ত মা ভেতরে ভেতরে অশান্ত। এতটুকু বাচ্চা ছেলে এতটা পথ একা সাইকেলে! একটু নিশ্চিন্তও হন। দু বাড়ি পরেই কেভিনের চেয়ে একটু বড় একটি মেয়ে একই স্কুলে সাইকেলে যায়। মা চেলসীকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করেছেন, সাইকেল চালানোর সময় কেভিনকে সে যেন দেখে শুনে রাখে। দুজনে যেন পাশাপাশি সাইকেল চালায়। কেভিনের আবার চেলসির খবরদারী ভালো লাগে না। ও প্রায়ই দ্রুত আগে চলে যাবার চেষ্টা করে। স্কুল থেকে আসার পরও, নাকে মুখে কিছু গুঁজে দিয়েই সাইকেল নিয়ে শিশুপার্কে চলে যায়। ওখানে বাচ্চাদের সাইকেল চালানোর নানা ধরনের ট্র্যাক আছে। সেরীল কিন্ত ভয় পান। না জানি আবার ওখানে কবে কোন দুর্ঘটনা হয়। অঘটন একদিন সত্যিই ঘটল। এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এসে সাইকেল নিয়ে শিশু পার্কে যাবার সময় পেছন থেকে একটা গাড়ি তাকে চাপা দিল। সাইকেলসহ ছিটকে রাস্তার পাশে খাঁড়িতে পড়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে এক পথচারীর টেলিফোনে কয়েক মিনিট পরেই এম্বুলেন্স এল। দেখা গেল তার হার্ট বন্ধ হয়ে আছে। এভাবেই কেভিনের ‘প্রায় মৃত্যুর অভিজ্ঞতার সূচনা হল। হাসপাতালে তাকে এমারজেন্সিতে নেবার পর ডাক্তাররা তার প্রাণযন্ত্র পুনরায় চালু করার জন্য সম্ভাব্য সমস্ত ব্যবস্থা নেন। হার্ট মেসেজ করার পরও যখন কোন পরিবর্তন হল না, সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে তাকে আদ্রেনালিন ইঞ্জেকশান দেয়া হল বিকল হৃদযন্ত্রে। এবার একজন ডাক্তারের জবানিতেই শুনুন: কেভনি জ্ঞান ফিরে পাবার পর সে ধীরে ধীরে কয়েকদিন ধরে আমাকে ‘প্রায় মৃত্যু অভিজ্ঞতার একটি পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দিয়েছে যা আমার দীর্ঘ তিরিশ বছরের চিকিৎসক-জীবনের ইতিহাসে একটি বিরল এবং অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী অভিজ্ঞতা। কাহিনির বড় অংশটিই হাসপাতালে এমারজেন্সিতে তাকে পুনর্জীবিত করার জন্য আমরা ডাক্তার-নার্সরা যে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি সে সংক্রান্ত। তাকে যখন এমারেজেন্সিতে আনা হল সে সময় প্রায় বিশ মিনিট ধরে তার হার্ট-বিট বন্ধ! ক্লিনিকালি ডেড! তার বর্ণনা খুবই সংহত এবং প্রগাঢ়। আমি পরে তার চিকিৎসার  সমস্ত রিপোর্ট, ও ‘প্রায় মৃত্যুর’ বিবরণ, ‘মৃত্যুর পরে জীবন’ এর গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ডা. রেমন্ড এ. মুডির কাছে পাঠাই। ডা. রেমন্ড মুডি: আমি দুর্ঘটনায় প্রাণ ফিরে পাবার তিন বছর পর কেভিনের সাক্ষাৎকার নেই। এ সময় তার বয়স পনেরো। ওর সাথে আলাপের আগে আমি বিশেষ পরীক্ষা নিয়ে নিশ্চিত হই যে কঠিন দুর্ঘটনায় তার ব্রেনের কোন ক্ষতি হয় নি। ওর সাথে কথা বলে আমি জেনেছি এবং পাঠকরাও বুঝতে পারবেন দুর্ঘটনায় রাস্তার পার্শ্বে সে চিৎ হয়ে পড়ে যায়। পিঠে প্রচণ্ড আঘাত পায়। কিন্তু মাথায় কোন আঘাত লাগেনি। কেভিন: আমার বয়স যখন বারো, এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঐ বছর জন্মদিনে আমি একটি নতুন সাইকেল উপহার পেয়েছিলাম। একদিন বিকেলে ওটা চালানোর সময়ই পেছন থেকে একটা মটরগাড়ি এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। আমি গাড়ি দেখতে পাই নি। পড়ে যাবার পর আমার কি হল, আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্ত এক সময়ে আমি উপর থেকে নিচে আমাকে দেখতে পেলাম। আমার দেহটি আমি দেখতে পেলাম সাইকেলের নিচে পড়ে আছে। আমার ডান পা ভেঙে গেছে। ভীষণ রক্ত পড়ছে। আমার এখনও মনে আছে আমার চোখদুটি ছিল বন্ধ। কিন্তু আমি উপরে! আমার শরীরের এক দেড় মিটার উপরে আমি ভেসে আছি। চারদিকে অনেক লোক ভীড় করে আছে। একজন আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে একটা এম্বুলেন্স এল। আমি বুঝতে পারলামনা সবাই এত উত্তেজিত কেন? আমি তো ভালই আছি! আমি দেখলাম কিভাবে আমার অচৈতন্য দেহকে হাসপাতালের গাড়িতে তোলা হল। আমি বলতে চাইলাম, আরে, আমাকে তুলছ কেন? আমার তো কিছুই হয়নি। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনছে না। কিন্তু আমি শুনছিলাম, ওরা কি বলছে। একজন বলল, ওকে ভালো করে ধরুন। মনে হয় ও মরে গেছে, তবুও হাসপাতালে নিয়ে আমরা চেষ্টা করব, আরেকজন বলল। অ্যাম্বুলেন্স দ্রুতবেগে রওনা হয়ে গেল। আমি চেষ্টা করলাম গাড়ির সাথে যেতে। উপরে আমি ভেসে ভেসে যাচ্ছি। এখন আমার মনে হল, আমি বোধহয় আসলেই মরে গেছি। কারণ এই সময় আমি একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে এসে গেছি। একদিকের মাথা উজ্জ্বল সাদা রঙে আলোকিত। মনে হল সুড়ঙ্গটি ক্রমাগতই বাইরের দিকে চলে গেছে। আমি আরেকমুখ দিয়ে আলোর কাছে ভেসে চলে এলাম। দেখি আলোর মধ্যে বহু লোকের জমায়েত। কাউকে আমি চিনিনা। আমি তাদের আমার দুর্ঘটনার কথা বললাম। তারা বলল, তোমাকে ফিরে যেতে হবে। তাদের কথা, আমি এখনও মরার জন্য তৈরি নই। আমাকে বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে হবে। আমি অনেকক্ষণ এ আলোর মধ্যে ছিলাম। অন্তত: আমার তাই মনে হল। সবাই এখানে হাসিখুশি। আমার মনে হয় এ আলোটি স্বয়ং ঈশ্বর। পানির ঝরনার মধ্যে স্নান করার মত আমি আলোয় আলোকিত হচ্ছিলাম। আমার কোন ধারনাই ছিল না, আমি এখানে কেন এবং আমি যাবই বা কোথায়? কিন্ত এ জায়গা ছেড়ে, এ আলোর বন্যা ছেড়ে কোথাও যেতেও ইচ্ছা করছিল না। আমার শরীর  নিয়েও আমার কোন চিন্তাই আর ছিল না। এ সময় দাদু এলেন। তাকে দেখে আমি খুব খুশি। এখন আমরা একসাথে থাকবো। কিন্তু তিনি বললেন, কেভিন, তোমার মা খুব কষ্ট পাচ্ছে। চল আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। বলে উপরে হাত বাড়িয়ে আমাকে নিচে নামিয়ে এনে সাথে করে সুড়ঙ্গের বাইরে নিয়ে এলেন। সারা রাস্তা দাদু আমাকে সঙ্গ দিয়েছে। এক সময়ে বললেন, এবার তুমি ফিরে যাও। সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আমি হাসপাতালে চলে এলাম। দাদু আর সাথে নেই। তিনি আবার আলোর রাজ্য ফিরে গেছেন। দুজন ডাক্তার আমার দেহের যত্ন নিচ্ছেন। তারা আমার নাম ধরে ডাকছেন, কেভিন, কেভিন! অপারেশান টেবিলে আমার শরীর। রং নীল। এখন আমি জানি আমাকে ফিরেই আসতে হবে। সুড়ঙ্গের লোকেরা সবাই তাই বলেছে। আমি ডাক্তারদের বলার চেষ্টা করলাম, আমি ভালো আছি। একজন আমার বুকে একটা রবারের থালা চেপে ধরলেন। হঠাৎ আমার দেহটি লাফিয়ে উপরে উঠে গেল। আমি জেগে উঠে ডাক্তারকে বললাম, আমি আপনাকে দেখেছি। যখন আপনি রবারের থালা বারবার আমার বুকে চেপে ধরছিলেন। মাকেও এটা আমি বলতে চেয়েছি। কিন্ত আমার কথা কেউ শুনতে চায় না। ডা. মুডি: তুমি এসব ঘটনার কি কোন ব্যাখ্যা দিতে পারো? তিন বছর আগের কথা। তোমার কি মনে হয়না যে কোনভাবেই হোক বর্ণনায় কিছু পরিবর্তন এসে গেছে? তোমার কি মনে হয়? এসবের অর্থ কি? কেভিন: আমি খুবই ভেবেছি এটা নিয়ে। আমার দৃঢ় ধারণা ঐ সময়ে আমি সত্যিই মারা গিয়েছিলাম। আমি ওখানেই গিয়েছিলাম যেখানে মৃত্যুর পর সবাইকে যেতে হবে। ওখানে গিয়েই আমি জানতে পেরেছি, জীবনের সব চাইতে প্রয়োজনীয় জিনিস হলো ভালোবাসা। যতদিন মানুষ বেঁচে থাকে। গত বছর আমার ক্লাসের একটি ছেলে মারা গেল। তার রক্তকণিকায় ক্যান্সার হয়েছিল। কেউ এটা নিয়ে কথা বলত না। কিন্তু আমি বলেছি, ডন এখন যেখানে আছে, ভালই আছে। মৃত্যু কোনো মতেই ভয়াবহ কিছু নয়। আমি সবাইকে বলি এটা আসলে কি। আমি কোথায় গিয়েছিলাম যখন হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে আমি কুড়িমিনিট মরে ছিলাম। তারপরেই আমাদের শিক্ষয়িত্রী এ বিষয় নিয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করলেন। ডা. মুডি: কেভনি, সুড়ঙ্গে যাদের সাথে তেমার দেখা হয়েছিল, তাদের কিছু কি তুমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছ? কেভিন: সুড়ঙ্গ আর আলো ছাড়া আমি তেমন বিশেষ কিছু দেখিনি। লোকজন তো আর ব্যতিক্রম কিছু নয়। সব সময়ই দেখি। শুধু দাদুর কিছু কথা আমায় আজও বিষ্ময় লাগে। তিনি আলোর রাজ্যে এত আনন্দে আছেন। বেঁচে থাকতে আমাকে কত আদর করতেন। কিন্তু আমাকে কেন ফিরিয়ে দিলেন? এত শুভ্র আলো এত উজ্জ্বল আলো আমার মনে হয় পৃথিবীতে কোথাও নেই। এত ধবধবে কিন্তু চোখে লাগে না। মনে হয় শান্তিই শান্তি। আলোয় ভুবন ভরা। ডা. মুডি: একটু আগেই বললে, তুমি নিশ্চিত যে ঐ সময়ে মারা গিয়েছিলে। কেন তোমার এই দৃঢ় বিশ্বাস? কেভিন: আমি তাহলে কিভাবে আমার মৃত শরীর রাস্তার পাশে, গাড়িতে এবং হাসপাতালে দেখতে পেলাম? তারপর ঐ যে অবিশ্বাস্য বর্ণনাতীত শুভ্র সুন্দর আলো? সুড়ঙ্গ? কোনটাই তো এখন আর দেখতে পাইনা। কারণ আমি বেঁচে আছি। শুধু যারা দেহত্যাগ করে তারাই ঐ ঐশ্বরিক দিব্যজ্যোতি দেখতে পায়। তা সে স্থায়ীভাবেই হোক বা কয়েক মুহূর্তের জন্যই হোক। যে দেখে সে আত্মা এবং দেখতে হলে আত্মাকে একাকি হতে হয়। দেহের মধ্যে থেকে এটা সম্ভব নয়। ডা. মুডি পনেরো বছরের কেভিনের এ ব্যাখ্যায় শুধু যে চমৎকৃতই হলেন না, তাকে বিশ্বাসও করলেন। এ ধরনের অভিজ্ঞতা কেউ বানিয়ে বলতে পারে না। কেভিনের বয়স পনেরো কিন্তু সে মৃত্যু সম্পর্কে অনেক বয়স্ক ব্যক্তির চাইতেও পরিপক্ক হয়ে গেছে। কারণ সে মৃত্যুকে কাছে থেকে দেখেছে। তার বাবা-মাও বলেছে মৃত্যুর দুয়ার থেকে আরেক কেভিন ফিরে এসেছে। আগের মত আর ছটফটে নয়, শান্ত, চিন্তাশীল।  এখন তার একমাত্র বাসনা, সবাইকে ভালোবেসে একদিন সে আবার সেই আলোর রাজ্যে চলে যাবে। আর তাকে ফিরে আসতে হবে না। কেউ তাকে ফিরে আসতেও বলবে না। লেখক: জার্মান প্রবাসী (al-harun-abdullah@online.de) টিকে

বেনাপোলের অভিজ্ঞতা

সকালে অফিসে রওনা হবার আগে মনজুর মোরশেদ দৈনিক পত্রিকা দেখেন। এটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। খুব জরুরি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কিছু না হলে পুরো খবর পড়েন না। হেডিং দেখেই ছেড়ে দেন। পত্রিকার পাতা উল্টে-পাল্টে দেখার সময় পেছনের পৃষ্ঠায় একটা খবরে নজর আটকে যায়- বেনাপোলে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ। তুচ্ছ ঘটনায় জের ধরে এটা ঘটেছে। ইমিগ্রেশন পুলিমের এক কর্মকর্তা ভারত থেকে আসা দুই লাগেজ-পার্টি নিয়ে বিনা তল্লাশিতে কাস্টমস চেকপোস্ট পার করাচ্ছিলেন। এতে বাধা দেওয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও অফিস ভাংচুর। পরে এ ঘটনার জের ধরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। কারণ হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে সেখানকার কাস্টমস্‌ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন কর্ম-বিরতিতে যায়। হামলায় গুরতর আহত কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবরটা পড়ার পর মনজুর মোরশেদের মনে পড়ে গেল বেনাপোলের কথা। একজন কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে তিনিও সেখানে কর্মরত ছিলেন এক যুগ। কম করে আঠারো বছর তো হবেই, সেখান থেকে তিনি বদলি হয়ে চলে এসেছেন। তারপর আর যাওয়া হয়নি। সেটা নানা ব্যস্ততার কারণে। দেশ জুড়ে অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন, তাতে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এবং সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলও আর আগের মতো নেই- নিশ্চয় পাল্টে গেছে। সেখানেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। সেটাই স্বাভাবিক। বড় ব্যস্ত এলাকা। রাতদিন সেখানে কাজ চলে। ভারত থেকে ট্রাকের পর ট্রাক ভরে মাল আসছে, বাংলাদেশ থেকেও যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব আহরণের অন্যতম স্থলবন্দর হলো বেনাপোল। আর এটা মাথায় রেখে সেখানকার কর্মস্থলে পা রেখেছিলেন। যদিও ঢাকা ছেড়ে যেতে তার বড় একটা ইচ্ছে ছিলো না। একে তো পরিচিত মহানগর, পরিচিত বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজন। তারপর সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারটাও ছিল। কে যেতে চায় মহানগর ছেড়ে অজ মফস্বলে! যদিও অনেকেই মুখিয়ে থাকে বেনাপোলে পোস্টিং নেতে। সেটা যে উপরি আয়ের টানে মনজুর মোরশেদের তা অজানা নয়। কিন্তু তিনি আর পাঁচজন থেকে কিছুটা আলাদা। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থটাই তার কাছে বড়। চাকরি জীবনের শুরু থেকে এটাই তিনি মেনে এসেছেন, এখনও মানছেন। একজনস পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মনজুর মোশেদ তার বাসভবন থেকে অফিসে গাড়িতে চড়েই রওনা হলেন অফিসের দিকে। সময় মতো যাতে কর্মস্থলে পৌঁছুতে পারেন- তাই আগেভাগেই বেরিয়ে পড়েন। আজকাল ঢাকায় শুধু জনসংখ্যাই নয়, যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে খুব। একমাত্র ছুটির দিনগুলি ছাড়া সাবলীলভাবে এগুনো দায়। কোথাও না কোথাও জ্যামে আটকা পড়তে হয়। আজও পড়লেন যথারীতি। তবে একবার ফ্লইওভারে উঠতে পারলে অফিসে পৌঁছে যাবেন দেখতে দেখতে। ফের বেনাপোলের স্মৃতি তাকে পেয়ে বসে। সেখানে জয়েন করার পরই টের পেয়েছিলেন চারদিকে অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা। এই যে আজ চেকপোস্ট নিয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশ আর কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাঝে হাতাহাতির খবর পত্রিকায় বেরিয়েছে তখনকার পরিস্থিতি কী খুব একটা ভালো ছিল? চেকপোস্টের কথাই ধরা যাক। তখন চেকপোস্ট ছিল পাসপোর্টধারী যাত্রীদের হয়রানির কেন্দ্র। চেকপোস্ট পার হতে গেলে সাধারণ যাত্রদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। তখন মুশকিল আসানের ভূমিকা নিতো কোনো দালাল। স্বাচ্ছন্দ্যে চেকপোস্ট পার করার প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা নানা কৌশলে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতো। সেই অর্থর বখরা পেত চেক পোস্টের একশ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই দুর্নীতির কারণে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চেকপোস্টে যে হয়রানি আর দুর্ভোগ পোহাতে হয়, মনজুর মোরশেদ সেটা মেনে নিতে পারছিলেন না। বেনাপোল কাস্টসম হাইসের একজন সহকারী কমিশনার বিসেবে এক্ষেত্রে কার কি কারণীয় কিছু নেই ?। এই প্রশ্ন তার মাঝে জেগে ইঠার পর এক দালালকে ডেকে বললেন – তোমরা যে চেকপোস্টে যাত্রী সাধারণেদের জিন্মি করে রেখেছো  এটা কী ঠিক হচ্ছে? দালাল জবাব দেয়- কী করবেন স্যার, একা তো অনেক দিন ধরে চলে আসছে। কথাটা মেনে নিতে পারেননি মনজুর মোরশেদ। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, বেনাপোল কাস্টমস চেক পয়েন্টের অনিয়ম ও বিশৃঙ্থা দূর করতে হবে। আর সে সেটা করতে গিয়ে টেল পেলেন। মৌকাকে যেন ছুঁড়েছেন। শুধু কিছু কাস্টমস এবং ইশগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়। তাদের দোসর দলালের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও  মাস্তুানও  তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যেহেতু সবার স্বার্থে আঘাত লেগেছে। নানাজনের হুমকি আর হম্বিতম্বি কানে এলও তিনি দমে যায়নি। তার উদ্যোগের ফলে  কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কিছু পদক্ষেপ নেয়।ফলে চেকপোস্টে শৃঙ্খা ফিরে আসে । ঢাকা এবং যশোরের পত্র-পত্রিকায় এই মর্মে খবর ও বেরোয় যে বেনাপোল সীমান্তে চেক পোস্টের পরিবেশ পাল্চে গেছে রাতারাতি। দলালদের দৌরত্ন যেমন আগের মতো নেই তেমনি নেই তেমনি নেই পাসপোর্টধারী যাত্রীদের ভোগান্তি। জ্যামে আটকে থাকা গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। সকাল থেকেই উজ্জ্বল রোদ। শীতকালে চললেও ঢাকায় এখনও ঠাণ্ডা পড়েনি পুরোদমে। মনজুর মোরশেদ দেখছেন ঢাকার তুলনায় বেনাপোলে শীতচা বেশিই পড়ে। এবারও নিশ্চয় ব্যতিক্রয় হবার কথা নয়। বখেন নিশ্চয় কন কনে ঠান্ঠা পড়েছে। ওখানকার কোয়ার্টারের কথা মনে পড়ে। বেশ নির্জন জায়গা, আশে পাশে নানা গাছগাছালি এতদিনে নিশ্চয় সেখানে পরিবর্তন হয়েছে। একদিন সদ্ধ্যা ড্রইংরুমে বসে স্ত্রীর আর ছেলেমেয়ের সঙ্গে টিভি দেখছিলেন। রাত কিছুটা গড়াবার পর বেজে ওঠে কলিংবেল। ওই কলিংবেলের শব্দ শোনার সময়ও ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, কয়েকজন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত এসেছিল তাকে হত্যা করতে। মনজুল মোরশেদ জানতেন, স্বার্থহানী হওয়ায় বেনাপোলের কিছু লোক তার ওপর চটে গেছে। তাই বলে তারা যে সশস্ত্র গুন্ডা পাঠাবে তাকে মারার জন্য- সত্যিই কখনো ভাবতে পারেননি। বেনাপোলে থাকা অবস্থায় বরাবরই তিনি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার ছিলেন। কোনো অপরাধ করেননি। শুধু নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করার চেষ্টা করেছেন মাত্র। এতে স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়াতে কেউ তার ওপর ক্ষুব্ধ হলেও করার কিছুই ছিলনা। বেনাপোল কাস্টম হাউজে যোগদানের পর মনজুর মোরশেদ শুধু চেকপোস্টে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা নয়, তিনি লক্ষ্য করলেন কাস্টমস হাউস দিয়ে বৈধ আমদানির ছদ্মাবরণে ভারত থেকে অবৈধ মালামাল নিয়ে আসা হয়। এতে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব সরকারের হাতছাড়া হচ্ছিল। একজন কাস্টমস কর্মকর্তা হিসেবে দেশের এই ক্ষতি মেনে নেয়াটা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগে তিনি অনুসন্ধানে নেমে দেখতে পান, স্টেনলেস স্টিলের ক্রোকারিজ সামগ্রি, শাড়ি এবং থ্রি-পিস জাতীয় বস্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি গ্রানাইড মার্বেল পাথর, কেমিক্যালস, কাগজ ইত্যাদি পণ্যেও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। সংঘবদ্ধ চক্র এসব বেআইনি কাজ করছে। মনজুর মোরশেদ অবাক হয়ে গেলেন এই চোরাচালান চক্রের সাথে বেনাপোলের কিছু অসৎ ব্যক্তির যোগসাজশ দেখে। যে কারণে ভারত থেকে পণ্য বোঝাই ট্রাক বেনাপোল চেক পোস্ট দিয়ে বন্দরে প্রবেশ করলে অনেক সময় এন্ট্রিই করা হয় না। বেনাপোল স্থল বন্দরের উল্টোদিকে সীমান্তের ওপারে ভারতের পেট্রোপোল বন্দর। সেখান থেকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে- এমনকি কখনো কখনো ঘোষণা না দিয়েই পণ্য চালান বেনাপোল ঢুকে পড়ছে। পয়লা পয়লা ব্যাপারটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ঠেকেঠিল মনজুর মোরশেদের কাছে। পরে বুঝতে পারলেন, এটা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারসাজি। নিরাশ হলেন না তিনি। অনুসন্ধান চালিয়ে যান। একদিন দেখতে পেলেন, স্টিল জাতীয় পণ্য ১৫০ বান্ডিল ঘোষণা দিয়ে ৩০০ বান্ডিল আনা হচ্ছে। শাড়ি, থ্রিপিস ১৯০ প্যাকেজ ঘোষণা দিয়ে ৩৮০ প্যাকেজ আনা হচ্ছে। অবাক করা কান্ড হলো, একটি চালানের পণ্য সঠিক রেখে একই ডকুমেন্টস দেখিয়ে ঘোষণাভিত্তিক পণ্য চালানগুলো বারবার বন্দর থেকে গেট পাস ছাড়াই বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দেখা গেল, দুই ট্রাকের পণ্যের রাজস্ব পরিশোধ করে বন্দর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে চার ট্রাক মাল। গেটপাসের ক্ষেত্রেও অনিয়ম আর অপকৌশল। এভাবে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেখে মনজুর মোরশেদের মাথা প্রায় খারাপ হবার অবস্থা। কাস্টমসের একজন সহকারী কমিশনার হিসেবে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠেন। একদিন কাজের অবসরে নিজের বিবেকের কাছেই প্রশ্ন করেন- সরকার আমাদের বেনাপোলে পাঠিয়েছে কেন? জবাব পেলেন- কর্তব্য পালনের জন্য এই কর্তব্য পালনের বিনিময়ে আমরা কী পাচ্ছি? বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, উপরন্তু পুরস্কার। তাহলে বেনাপোল বন্দরে এই যে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি চলছে, এটা জেনে চুপচাপ কিংবা নিষ্ক্রিয় থাকাটা ঠিক হবে? মোটেই না। বরং নিশ্চুপ আর নিষ্ক্রিয় থাকাটা শুধু অন্যায়ই হবে না, অপরাধের সামিল হবে। সহকারী কমিশনার মনজুর মোরশেদ সিদ্ধান্ত নেন, কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি জানেন, বেনাপোল কাস্টম হাউজে বৈধ আমদানির ছদ্মাবরণে অবৈধ পণ্য আমদানির নেপথ্যে আছে সংঘবদ্ধ চক্র। তারা টিভি-সিনেমায় দেখে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের চেয়ে কম নিষ্ঠুর নয়। স্বার্থে ঘা লাগলে ওরা মানুষ খুন করতে পারে। কাজেই সাবধানে পা ফেলতে হবে। চোরাচালান সিন্ডিকেটের একশেণির সিএন্ডএফ এজেন্ট জড়িত। এরা চোরাচালানি এবং অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে সেতুবন্ধনের কাজ করে। তাদের স্বার্থে এহেন কাজ নেই যা করতে পারেনা। ওরা মাস্তানও পোষে। তাই বলে মনজুর মোরশেদ পিছপা হবেন না। দেশের স্বার্থে ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে একজন নিষ্ঠাবান  কর্মকর্তার ভূমিকা রাখতে চান। কিছু বিশ্বস্ত কর্মকর্তার ভূমিকা রাখতে চান। তাই কিছু বিশ্বস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেছে নেন তিনি। সোর্সও নিয়োগ করলেন। কৌশলে কয়েকটি চালান আটক করেন। গাজীপুরের এক প্যাকেজ ইন্ডাস্ট্রিজ ৩০০ জিএসএম ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে ২২০ মেট্রিক টন ২২৪ জিএসএম ডুপ্লেক্স বোর্ড আমদানি করে। কাস্টমস হাউজে বিল অব এন্ট্রি দাখিলও করে। কিন্তু আমদানিকৃত ডুপ্লেক্স বোর্ড দেখে সহকারী কমিশনার মনজুর মোরশেদের সন্দেহ হয়। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হন আমদানি করা ডুপ্লেক্স বোর্ড ৩০০ জিএসএম নয়, ২২৪ জিএসএম। বাংলাদেশ ৩০০ জিএসএমের নিচে ডুপ্লেক্স বোর্ড আমদানি করা নিষিদ্ধ। কাজেই তিনি মিথ্যা ঘোষণার দায়ে ওই পণ্য আটক করার ব্যবস্থা করলেন। এই মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছিল। একবার শুরু করার পর মনজুর মোরশেদ আর পিছনে তাকাননি। যা হবার হবে, তিনি শুধু তার দায়িত্ব পালন করবেন। তখন বেনাপোল দিয়ে টিস্যু পেপার আমদানির নামে সিগারেট পেপার আমদানি চলতো। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মনজুর মোরশেদ প্রায় ৪০ মেট্রিক টন টিস্যু পেপারের নামে আমদানি করা সিগারেট পেপার আটক করেন। ওই পেপার খালাসের চেষ্টাকালে আটক করা হয়। একই কায়দায় ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান দুটি চালানের মাধ্যমে ১৪০ মেট্রিক টন সিগারেটর পেপার আমদানি করেছিল। ওই দুটি চালানও আটক করা হয়। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে আমদানি করা সিগারেট পেপার আটকের ঘটনা স্মরণ করতে গিয়ে কত কিছুই মনে পড়ছে মনজুর মোরশেদের। আটক ছাড়াও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অগোচরে পণ্য খালাস করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে- এমন নয়টি চালান সনাক্ত করেছিলেন। ভারতের পেট্রোপোল কাস্টম হাউজে চালান এন্ট্রি হলেও বেনাপোল তো হয়নি। এমন কি বেনাপোল কাস্টমসের কাছে কোনো কাগজপত্রও জরা পড়েনি। মাল বেনাপোলে আসা মাত্রই তা সরাসরি পাচার করে দেওয়া হয়। মনজুর মোরশেদ বুঝতে পারেন, সংঘবদ্ধ চক্র কতটা শক্তিশালী হলে এ ধরণের প্রায় অভিশ্বাস্য ঘটনা ঘটাতে পারি। প্রতিটি চালানের টিস্যু পেপারের ঘোষণা ছিল। মনজুর মোরশেদ হিসাব করে দেখেছিলেন, টিস্যু পেপার হলে সরকার বঞ্চিত হবে প্রায় ৫২ লাখ টাকা রাজস্ব আয় থেকে । আর সিগেরেট পেপার হলে বঞ্চিত রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাড়াঁবে প্রায় এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা। টিস্যু পেপারের চেয়ে সিগারেট পেপারের ট্যারিক ভ্যালু অনেক বেশি। বেনাপোল স্থলবন্দর ব্যবহারকারী সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, একজন সহকারী কমিশনার হওয়া সত্ত্বেও মনজুর মোরশেদ তাতে বিচলিত ছিলেন না। চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব যথারীতি পালন করে যান। ঢাকার পশ্চিম কাফরুল এলাকার এক গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ভুয়া এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে ৪৫ হাজার ৫৭ গজ ভিসকস পলিয়েস্টার এবং ফিলামেন্ট কাপড় নিয়ে আসে। আমদানিকারক হিসেবে তাদের কোনো পাসবই ছিল না। এ ধরেণের প্রতারনার খবর জানতে পেরে মনজুর মোরশেদ দেরি করেননি। ওই চালন আটক করেন। ঢাকার আরেকটি প্রতিষ্ঠান মিক্সার গ্রিন্ডার আমদানির  সময় এইচএস কোডের মিথ্যা ঘোষণা দেয়। গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়ে মনজুর মোরশেদ পণ্য খালাস নেওয়ার প্রাক্কালে তা আটক করেন এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করেন। তবে এ ধরনের তৎপরতার ফলে চোরাচালানিদের টনক নড়ে। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বৈধ আমাদানির ছদ্মাবরণ অবৈধ আমাদানি বন্ধের উদ্যোগ এবং স্থলবন্দর থেকে শুল্কায়নের আগেই পাচার হয়ে যাওয়া নয়টি চালানের বিষয়ে তদন্ত শুরু করলে তারা আর নিশ্চুপ থাকতে পারেনি। টেলিফোনে মনজুর মোরশেদের কাছে আসতে  থাকে হুমকির পর হুমকি। একদিন তো একজন বলেই ফেললো- এটা বেনাপোল। এখানে আইন-টাইন আর সততা দেখাতে আসবেন না। তাহলে টিকতে পারবেন না। জান নিয়ে টানাটানি পড়বে। এমন হুমকিতে ভীত ছিলেন না মনজুর মোরশেদ । আরেকদিন তো জবাব দিয়েই বসলেন- এসব ভয়-টয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না্। আমার যা কাজ সেটা করবো। -দেখেন, সেরের উপর সোয়া সের থাকে । উপর মহলে আমাদের লোক আছে। তারপর আমাদের হতে সাংবাদিকও আছে, এমন রিপোর্ট করবো যে আপনার চাকরি রক্ষা করাই কঠিন হবে। -যখন হয় তখন দেখা যাবে। হুমকিতে টলানো যাচ্ছে না দেখে চোরাচালানি চক্র প্রলোভনও দেখায়। তাদের হয়ে একজন বলে-ভাই, এসব ঝামেলা করে কী লাভ। তার চেয়ে আসেন, মিলেমিশে কাজ করি। যাতে আপনারও উপকার হয়। মনজুর মোরশেদের স্পষ্ট জবাব- আমার পক্ষে এমন কিছু করা সম্ভব নয়, যাতে দেশের ক্ষতি হয়। - আরে ভাই, এত দেশ দেশ করলে নিজের জন্য করবেন কী? আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এই বেনাপোল থেকে যা কামিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবেন সারা জিন্দেগিতে আপনাকে আর টাকার জন্য ভাবতে হবে না। - সরি ভাই, অত টাকার দরকার আমার নেই। সরকার আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে বেতন দিচ্ছে। চোরাচালানে জড়িত সংঘচক্র হুমকি দিয়ে আর প্রলোভন দেখিয়ে মনজুর মোরশেদকে বাগে নিতে না পেরে ভিন্ন পথ ধরে । তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এক রাতে যখন বোনাপোলের সরকারি বাসায় বসে সপরিবারে টেলিভিশন দেখছিলেন তিনি তখনই দরজার বাইরে কলিংবেলের সুইচ টিপে দুর্বৃত্তরা। সকালের দিকে কয়েকটা পয়েন্ট ছাড়া ঢাকার রাস্তায় জ্যাম ততটা জমাট বাধে না। যাথাসময়ে মনজুর মোরশেদ অফিসে পৌঁছেন এবং দাপ্তরিক  কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েন। লাঞ্চ আওয়ারের বিরতির সুযোগ নিয়ে সতের-আঠার বছর আগে ফেলে আসা বেনাপোল আবার তার মানে আবার উঁকি দেয়। হ্যাঁ, সেই রাতটা তার চাকরি জীবনে একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়েই থাকবে। ভাগ্যিস, বুলেট ড্যাম থাকায় দুর্বৃত্তদের পিস্তলটা অকেজো হয়ে পড়ে। নইলে অন্যরকম কিছু ঘটতে পারতো। এমনকি তার প্রাণ বিপন্ন হয়ে ওঠাও অস্বাভবিক কিছু ছিল না। রাত তখন নয়টা হবে । ড্রয়ই রুমে বসে মনজুর মোরশেদ স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে টিভি দেখছিলেন। কলিংবেল বেজে উঠলে বাড়িতে নিয়োজিত কর্মচারী রহমান খুলতে যায়। রহমান শুধু বলিষ্ঠই নয়, একাধারে বিশ্বস্ত, সাহসী ও চালাক-চতুর ছিল। দরজা খুলে দেখে কয়েক যুবক। তবে ওদের চিনতে তার ভুল হয়নি। ওরা ঘরে ঢুকতে চাইলে রহমান চিৎকার করে বাধা দেয়। ওরা তখন পিস্তলের গুলি বেরোয়নি। বরং ধস্তাধস্তিতে পিস্তলটা ছিটকে পড়ে। ততক্ষণে রহামানের এবং দুর্বৃত্তদের উপস্থিতি টের পেয়ে মজনুর মোরশেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের চিৎকার শুণে কোয়ার্টার্সের লোকজন ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে তাকে। দুর্বৃত্তরা বেগতিক অবস্থা আঁচ করে আর দেরি করেনি, রাতের অন্ধকারের ভেতর পালিয়ে যায়। বেনাপোল কাস্টসম হাউসের একজন সহকারী কমিশনারের প্রাণনাশের ঘটনা তখনকার জাতীয় এবং আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তা বিভিন্ন মহলের দৃষ্টিতে পড়ে। তবে ওই ঘটনার মনজুর মোরশেদ মনোবল হারায়নি। যদিও অনেকের কাছ থেকে সাবধানে থাকার পরামর্শ তাকে শুনতে হয়েছিল । তিনি বেনাপোল থেকে বিদায় নেওয়ার আগ পর্যন্ত তার কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন বলেই বেনাপোল কাস্টম হাউজে বৈধ আমাদানির ছদ্মবরণে অবৈধ পণ্য আমাদানি প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। চেকপোস্টে শৃঙ্খলা ফিরে আসাসহ অনেক অনিয়ম বন্ধও হয়। নিজ উদ্যোগে ঝুঁকিবহুল দায়িত্বপালন করেছিলেন বলেই সোখানে যোগদানের পর প্রথম ছয়মাসে তিন কেটি ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫৪ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তথ্যের জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ঢাকা শুল্ক ভবন এবং শুল্ক, আবগরি ও ভ্যাট (উত্তর) ঢাকা চাঞ্চল্যকর শুল্ক এবং ভ্যাট ফাঁকির জালিয়াতি উদঘাটন করেছিল। তার চেয়ে বড় কথা হলো, বেনাপোলে তার অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরদের উদ্বুদ্ধ করে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে পেরেছিলেন। বদলির চাকরি। মনজুর মোরশেদকে এক পর্যায়ে বেনাপোল কাস্টম হাউস থেকে বদলি হয়ে চলে আসতে হয়। তবে বিদায়ের আগে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকি উদঘাটনের পাশাপাশি কী করে তা রোধ করা যায়- সেই পথ খুঁজে বের করতে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পেট্রাপোলস্থ ভারতীয় শুল্ক কর্মকর্তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেন। তাদের সহযোগহিতা নিয়ে শুল্ক ফাঁকি বন্ধের পদ্ধতি সংক্রান্ত সুপারিশমালা স্থল শুল্ক স্টেশনে বাস্তবায়িত হলে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা সম্ভব- সেই চিত্র তিনি সবিস্তারে তুলে ধরেছিলেন। বেনাপোল স্থল বন্দরে তার পদক্ষেপ এবং সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে মনজুর মোরশেদের তা জানা নেই। তবে ওখানকার কর্মব্যস্ত কাস্টম হাউস, চেক পোস্ট আর বিশাল ইয়ার্ডের পাশাপাশি কাস্টমস কোয়ার্টার্সের সেই নিরিবিলি পরিবেশ তার মন থেকে কখনও বিস্মৃত হবে না। মো. মতিউর রহমান, কমিশনার, বৃহৎ করদাতা ইউনিট (মূল্য সংযোজন কর) / এম / এআর

কুয়াশাকাল

(১) ২০১৭’র ডিসেম্বর মাস। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক গান, শ্লোগান ও উৎসবকে ছাপিয়ে একটা টানা শৈত্যপ্রবাহ গিলতে থাকে বাংলাদেশকে। রাত নামার পর রাস্তায় হাঁটলে আজকাল একটা লাইন মাথায় ঘোরে- ‘শহরে নামছে প্লাটুন প্লাটুন শীত’। কার লেখা কবিতার লাইন তা ভাবতে ভাবতেই ভাবনার ল্যাজ ধরে আসে প্রশ্ন- এই যে প্লাটুন প্লাটুন শীত নামছে, এরা কই থেকে আসে, ক্যান্টনমেন্ট? সেই ক্যান্টনমেন্ট আবার কই? কিছু ক্যান্টনমেন্ট আছে শহর থেকে খানিক বাইরে, গ্রামমত এলাকায়। কিছু আবার শহরের হৃৎপিণ্ডের ঠিক মধ্যিখানে। সেইখানে ঘাপটি মেরে থাকে প্লাটুন প্লাটুন শীত? যখন উপর মহলের নির্দেশ পায়, কেবল তখনই তারা ছেয়ে ফেলে পুরো শহর? ওই সময়টা সান্ধ্য আইনের মতো। তখন রাত নামলে শহরবাসী পারতপক্ষে বাইরে বের হতে চায় না। কিন্তু গ্রামে? সেখানে তো প্রতিদিনই প্লাটুন প্লাটুন শীত, প্রতিদিনই সান্ধ্য আইন, প্রতিদিনই কার্ফু। কবির নাম খুঁজতে গিয়ে শহর এবং গ্রাম, ক্যান্টনমেন্ট এবং কার্ফু বিষয়ক অগণতান্ত্রিক এক জটিলতার ভিতর নিমজ্জিত হই আমি। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলেছে এই কার্ফু, মানে সান্ধ্য আইন, মানে শৈত্যপ্রবাহ চলবে আরও চারদিন। আমি তাদের কথার অর্ধেক বিশ্বাস করে বাকি অর্ধেক মগজ থেকে ফেলে দেই। ধরে নেই, শৈত্যপ্রবাহ চলবে দুইদিন ধরে। তারপর কী হবে এজন্য আবারও তাদের শরণাপন্ন হব, এবং আবারও তাদের কথার অর্ধেক রেখে বাকি অর্ধেক ফেলে দিব। কেননা, আমি দেখেছি, আমাদের এখানে যেকোনো প্রকার বিবৃতির (রাষ্ট্রিক/প্রাতিষ্ঠানিক/সাংগঠনিক)উপরে অর্ধেক বিশ্বাস এবং অর্ধেক অবিশ্বাসের জ্যামিতি স্থাপন করলে জীবনের চলরেখা সরল হয়। তাদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস কখনও কখনও আমাকে এমন কিম্ভুত সত্যের মুখোমুখি করেছে যে তাতে আমাকে থেমে যেতে হয়েছে, কিছুদিনের জন্য হলেও। আবার তাদের কথা শতভাগ অবিশ্বাস করলেও জীবন হয়ে ওঠে নিরালম্ব। তাই আমার মধ্যবিত্ত চেতনা, খুঁজে খুঁজে বের করেছে অর্ধেক সত্য বিশ্বাস করার এই সহজ আর মাঝারি পথ। পেটে দুটা-চারটা খাবার দেই। চিড়া আর নাড়ু আর পানি। নাড়ু এসেছে বাড়ি থেকে, মায়ের কাছ থেকে, দুই-চারদিন আগে। শরীর শান্ত হলে মনকে সঙ্গে নিয়ে বসি পড়ার টেবিলে। সবুজ কাগজে মোড়ানো টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকি বেশ খানিকক্ষণ। হাত বাড়িয়ে বুকশেলফের বইগুলো স্পর্শ করি। কাকে নেব, এই চিন্তা করে হাত বাড়িয়ে দিলেও বইগুলোর স্পর্শ আমাকে তাদের সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। ভাবি, বাল্মীকি ফ্রয়েড রাসেল ইলিয়াস আর শহিদুল জহির, কেমন আছে তারা এই হিমযুগের মত সুদীর্ঘ শৈত্যপ্রবাহকালে? তাদেরকে খুব বন্দী আর অক্ষম লাগে। তাদের চিন্তা, শিল্প আর জীবনকে আমার চার তাকের বাঁশের শেলফের নির্ঘুম চৌকিদার মনে হয়। চার তাক আর চার পায়া আমার বাঁশের শেলফ। আর সরাসরি সামনের দেয়ালেই একটা চারফুট বাই দুই ফুট বাংলাদেশের মানচিত্র। ভাবি, দেশের কি পায়া আছে? যদি থাকে, কয়টা? দুই, নাকি চার?  এইসব পিঁপড়ার সারির মত সার বেধে চলা অসংখ্য মনে-হওয়া আমাকে টেবিলে বসিয়ে রাখে অনেক মিনিট। হয়ত অনেক ঘণ্টা। দাঁতভাঙ্গা করাতের মতো এসব মিনিট আর ঘণ্টা আমার চারপাশের দেয়াল কাটতে থাকে। কাটতে থাকে গায়ে শিরশির ধরানো অসহ্য এক শব্দ করে। বাঁশের বুকশেলফ, সবুজ টেবিল, চারদেয়াল আর দেয়ালের ওপাশের শীতের মার্চপাস্ট সেই এবড়োথেবড়ো করাতে কাটা শেষ হলে দেখি, একটা পত্রিকা মেঝেতে পড়ে আছে। সেখানে অর্ধেক পাতাজুড়ে হাসছে এক উজ্জ্বল রমণী। সেই রমণীর একহাত কোমড়ে, আরেক হাতে মদির ইশারা। কেমন আবেদনময় সেই ইশারা! রমণীর নিচে লেখা ‘শীঘ্রই আসছে’। কী আসছে, কেন আসছে তা আর কিছুই লেখা নেই। তার ইশারাময় হাতের ঠিক উপরে একটা কলামজুড়ে একটা খবরের শিরোনাম চোখে পড়ে, ‘পালাতে পারলেন না সুবোধ’। মেঝেতে পড়ে থাকা এই পত্রিকা তুলে নিয়ে আমাকে পাঠ করতে হয় না খবরটা। যেন খুব অনায়াসলব্ধ এই খবর, যেন খবরের প্রতিটা শব্দ পাঠ ছাড়াই অনুভূত হয়। এ অনুভব এমন, যেন কোনো পাঠকারী আমাকে সব পড়ে শোনায়। আর চলচ্চিত্রের মতই সব কিছু দৃশ্যমান হয়। যেন আমি ঘটনার এক দর্শক। আমি দেখি, সুবোধ নামের এক ব্যক্তি গভীর মনোযোগের সঙ্গে চারপাশটা দেখতে দেখতে হাঁটে। সে হাঁটে জনাকীর্ণ ফুটপাত ধরে। খানিক বাদে সন্ধ্যা নামে। রাত হয়। চারপাশে তীব্র আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু সেই আলোকে গিলতে গিলতে মৃদু করে ফেলে কুয়াশা। সুবোধ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়। আমি দেখি, সে দেখে, কুয়াশার সঙ্গে মিশে আছে হালকা লালচে রঙ এক আকাশ। আনন্দ, বেদনা এবং তারকাহীন এক আকাশ। হঠাৎ খেয়াল হয়, সুবোধ হাঁটছে কোনো একটা রেলিং এর ওপর দিয়ে। কিসের রেলিং? ব্রিজ? সামনে তাকিয়ে এর আবার শাখা-প্রশাখা দেখা যায়। ব্রিজের কি শাখা-প্রশাখা থাকে? ফ্লাইওভার হতে পারে। কুড়িল-মহাখালী-মেয়র হানিফ-খিলগাঁও কোনো একটা। সে রেলিং বরাবর হাঁটতে হাঁটতে ফ্লাইওভারের সঙ্গেই ওপরে উঠতে থাকে। তারপাশে সাদা কারের সারি অসুস্থ বিড়ালের মত একজায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে গড়গড় করতে থাকে। এইসব অসুস্থ গড়গড়, মানে একসার সাদা বিড়াল, মানে আটকে থাকাসাদা প্রাইভেটকারের সারি দেখে মনে হয়, হয়ত এটা মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। সে ডানে তাকায়। দেখে, সাদা বিড়ালগুলো অসুস্থ হতে হতে মরে যাচ্ছে। বামে তাকায়। দেখে, অসংখ্য বহুতল ভবনের মগজহীন করোটিকেঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠছে হিম যুগের অনন্ত কুয়াশা জাল। নিচে তাকায়। দেখে, একটা রাস্তা। যে রাস্তায় অনেক মানুষ হাঁটছে। সে ভাবে, জীবন মানে পায়ে ভর দিয়ে পথ হাঁটা। যে জীবন থেমে থাকতে থাকতে ঘায়ে পচন ধরে মরে যাচ্ছে, সুবোধভাবে, তার থেকে তার মুক্তি চাই। সুবোধ ফ্লাইওভার থেকে নিচের রাস্তায়, যে রাস্তায় অসংখ্য মানুষ পিঁপড়ার মতো হাঁটছে, লাফিয়ে পড়ে। কিন্তু লাফ দেবার পর দেখা যায়, রাস্তার মানুষজন তাকে ঘিরে জট পাকাচ্ছে। কেউ কেউ তারস্বরে বলছে, একে হাসপাতালে নেন। কেউ বলে, হালায় সুইসাইড করবার লাগছিল! এই কথা শুনে সুবোধ আঁতকে ওঠে। তার দুই পা ভেঙ্গে গেছে। বাম পাশের হাঁটুর নিচের হাড় বাইরে বের হয়ে এসেছে এবং গলগল করে রক্ত ঝরছে। কিন্তু সুবোধকে ব্যথা দেয় মানুষের দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা। এটা সেই ব্যথা যা তাকে ক্রমশ ব্যথাহীন করতে থাকে। সুবোধ ক্রমশ ব্যথাহীন হতে থাকে। (২) ছিমছাম একটা কক্ষ। দুইটা ডেস্ক। ডেস্কে দুইটা কম্পিউটার। তিনজন মানুষ। দুইজন কম্পিউটারের সামনে বসা, একজন একটা ডেস্কের সামনে, অতিথি চেয়ারে। ব্যক্তি ১- ভাই সাহেব, একটা নিউজ করতেছি। ইন্টারেস্টিং, সিগনিফিকেন্ট অ্যান্ড সিম্বোলিক। একইসঙ্গেই তিনটাই! ব্যক্তি২- ইন্টারেস্টিং নইলে সিগনিফিকেন্ট ছাড়া তো আমরা নিউজই করি না। টুয়েন্টিফোর মার্কা নিউজপোর্টাল তো আমরা না যে যা পাব তাই রসিয়ে কসিয়ে পাবলি করে গেলাব! - নারে ভাই, শুনলেই বুঝবেন, আমি যেটা করতেছি এটা আলাদা, খুবই আলাদা। আর হট টপিক, পাবলিক খাবে। অথচ ঘটনা অতি সিম্পল। - আচ্ছা কইয়া ফালান। -সুবোধের কথা মনে আছে আপনার? -কোন সুবোধ? -শহরের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকল কারা জানি, খাঁচাবন্দি  সূর্য হাতে, লিখে রাখল, সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না। -হ্যাঁ হ্যাঁ! কিছুদিন আগে তো গোয়েন্দারাও নড়েচড়ে বসছিল এর আর্টিস্টকে ধরার জন্য! -ঘটনা হল, গতকাল রাতে মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে এক লোক লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। মরতে তো পারেই নাই, বরং পা দুটো ভেঙ্গে এখন হাসপাতালে ভর্তি। এই লোকের নাম সুবোধ। -ওয়াও!   এই দুই ব্যক্তি আরও কিছুক্ষণ হাসপাতালে ভর্তি সুবোধ আর গ্রাফিতির সুবোধ সম্পর্কে আলাপ চালায়। আমি তাদের আলাপ থেকে ধারণা করে নিই তারা হয়তো কোনো বড় পত্রিকা অফিসের সাংবাদিকের কাজ করে। এই দুইজন শেষ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা করে বিশেষ ওই খবরটার শিরোনাম সম্পর্কে মত পোষণ করে যে, শিরোনাম হবে ‘পালাতে পারলেন না সুবোধ’। তারা সেই খবরে গ্রাফিতির আর ফ্লাইওভারের দুই সুবোধকে একত্রিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেইসঙ্গে তারা মৌচাক ফ্লাইওভারের তীব্র যানজটের মধ্য থেকে লাফিয়ে পড়ার ঘটনার প্রতীকী তাৎপর্যের দিকে প্রচ্ছন্ন ইশারা রাখার কথাও বলে। এমন সময় তৃতীয় ব্যক্তি কথা বলে ওঠে। এতক্ষণ আমি এই তৃতীয় ব্যক্তির অস্তিত্ব প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রথম দুই ব্যক্তি তারুণ্যের শেষ দিককার মাঝবয়সী হলেও তৃতীয় ব্যক্তিটিকে কিছুতেই এদের কাতারে ফেলা যায় না। তার ফরফরে সাদা চুল এবং ঝুলে যাওয়া গালের মাংস- এই দুই প্রধান মুখমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্যকেও ছাড়িয়ে গেছে এক ধরণের নির্লিপ্তভাব। ওদের কথার মাঝেই সে খুবই অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে ওঠে, তার বাড়ি পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকার দক্ষিণ মৈশুন্দির ভূতের গলি। এই কথা শুনে, বাকি দুজন সাংবাদিক কিছুটা বিরক্তই প্রকাশ করে। সুবোধ সংক্রান্ত মচমচে পরিবেশনযোগ্য খবর রেখে ভূতের গলির কথা কোত্থেকে নিয়ে আসে এই বুড়া- এটাই মনে হয় এই দুইজন চোখে-চোখে পরস্পরকে বলে। কিন্তু মূলত চুপ করে থাকে। অপেক্ষা করে বুড়ার কথা শেষ হবার। বুড়া বলে, ‘মহল্লার নানান আজিব জিনিসের মধ্যে একটা জিনিস ছিল, সুবোধ, সুবোধচন্দ্র দাস আর তার বউ স্বপ্না রানী দাস’। তরুণ সাংবাদিক দুইজন এইবার কিছুটা মনোযোগী হয় তার কথায়। সে জানায়, সুবোধ তিন থেকে চার বার, ১৫ বছরের ব্যবধানে বারবার মহল্লায় আসে। আর প্রতিবারই তার বউ, স্বপ্না রাণীকে নিয়ে কুয়োর মধ্যে পড়ে মরে যায়। শুরুটা ছিল ৭১ সালে। রাজাকার সংক্রান্ত একটা ঘটনায় সুবোধ আর তার বউ স্বপ্না রানী কুয়োয় পড়ে মরে। এরপর বিভিন্ন সময়ে, বারবার, বিভিন্ন রূপে কিন্তু একই নামে সুবোধ আসতে থাকে আর বউকে নিয়ে কুয়োয় পড়ে মরতে থাকে। তারপর বেশ কিছু বছর পার হলে এই ভূতুড়ে কাহিনির শেষ হয়। পরে এই কাহিনি লিপিবদ্ধ করে তখনকার এক অখ্যাত লেখক, শহীদুল জহির।‘ এতসব, বাবারা, তোমাগো কইবার কারণ একটাই’। বৃদ্ধ কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকে। বলে, যে সুবোধকে নিয়ে তোমরা নিউজ করতে যাচ্ছ, এমনও তো হতে পারে, এরও পুরো নাম সুবোধ চন্দ্র দাস। এরও বউয়ের নাম স্বপ্না রাণী দাস। কথা শুনে দুই সাংবাদিক কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে যায়। এই বয়োজ্যেষ্ঠ এবং নির্লিপ্ত চেহারার লোকটির এমন আষাঢ়ে গল্পের প্রেক্ষিতে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা বুঝে উঠতে পারে না দুইজন। বৃদ্ধ আবার বলতে উদ্যত হয়, যেন নিজ উদ্যোগেই, যেন কিছু একটা প্রেরণা একজন চুপচাপ থাকা মানুষকে হঠাৎ বাচাল বানিয়ে দিয়েছে। সে বলে, এইবার দেখার বিষয়, সুবোধের এই ঘটনা আমাদের ভূতের গল্লির ৭১ এর ঘটনার মত পুনরাবৃত্তি হতে থাকে কিনা। মানে,  সুবোধ বারবার মৌচাক ফ্লাইওভার থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে থাকে কিনা। বাকি দুইজন এইবার হোহো করে হেসে ওঠে। বলে, তাহলে কিন্তু ওস্তাদ বেশ মজাই হবে! অন্তত আমাদের মত খবর ব্যবসায়ীদের জন্য। ঘটনাকে আরও সুস্বাদু করে খাওয়ানো যাবে জনগণকে। হাহাহা! (৩) ‘ওস্তাদ’? ওই বৃদ্ধকে ওরা ওস্তাদ বলে নাকি! আমি অবাক হই সম্বোধন শুনে। বাকি কথাগুলো যেন কানে ঢুকলেও মনে ঢোকে না। আমি বৃদ্ধের পরিচয় সম্পর্কে ভাবতে থাকি। সে কি ওদের মতই সাংবাদিক, নাকি নিছকই তাদের পরিচিত বা অর্ধপরিচিত বা অপরিচিত কেউ? বৃদ্ধের কথাবার্তা, তার অস্তিত্ব, তার পরিচয় আমার মগজজুড়ে থাকলেও হঠাতই আমার নিজের সম্পর্কে একটা মৌলিক প্রশ্ন খেলে যায় মাথায়। আমি তাদের সঙ্গে এই কক্ষে কী করছি, আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না কেন। এবার আমি তাদের কথার বিষয়বস্তু, সুবোধ নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনি, বৃদ্ধর আষাঢ়ে গল্প সব ভুলে যাই। ভুলে যাওয়া মাত্র এইসব দৃশ্য যেন সামন থেকে মুছে যায়। একমাত্র যা নিয়ে আমি চিন্তিত হই, তা হল, আমার নিজের অস্তিত্ব এবং পরিচয়। চোখ বুজি। প্রাণপণ ভাবতে থাকি। স্মৃতি হাতড়াতে থাকি। হঠাৎ যেন সদ্য ভূমিষ্ঠ এক শিশুর মত ফাঁকা মগজ হয়ে গেছে আমার। খানিক শীত করতে থাকে শরীরে। শৈত্যপ্রবাহের হিম হাওয়া গায়ে লাগে। ধরার মত কিছুই খুঁজে পাই না। শুধু একটা মৃদু গুঞ্জন। আমের সময়ে গ্রামে যে নীল ভোঁয়া মাছিগুলো দেখা যায়, তাদের মত শব্দ। ভোঁয়া মাছির আওয়াজ ক্রমশ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে মনে হয় অনেকগুলো ভোঁয়া মাছি আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোখ খুলি। দেখি, লোহায় তৈরি বড় একটা ফুটওভার ব্রিজ। নতুন। চকচকে। জনশূন্য। আমি ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে। বাম পাশে কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে নেমে গেছে দুইটা সিঁড়ি, ডান পাশে নেমে গেছে আরও দুইটা। মোট চারটা সিঁড়ি। চারপাশে দেখা যায় বহুতল ভবনদের মগজহীন করোটি। নিচে অসংখ্য সবুজ আর অসংখ্য কালো। সবুজগুলো সব সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তাদের ইঞ্জিনের সম্মিলিত গুঞ্জনে আকাশকে এক বিরাট ভোঁয়ামাছি মনে হয়। কালোগুলো মানুষের কালো-কালো মাথা। পিলপিল করে তারা স্থির গুঞ্জনরত সবুজগুলোর ফাঁকে-ফাঁকে ছুটতে চাইছে। কিন্তু ধাক্কা খাচ্ছে সামনের মানুষের সাথে, সিএঞ্জির সঙ্গে। এগুতে আর পারছে না। পিলপিল করছে যেন একটা ছোট্ট বৃত্তের পরিধির ভিতরেই। মানুষ আর সিএনজির ক্রমশ বড় হতে থাকা গুঞ্জনধ্বনি এই জনশূন্য ওভারব্রিজে আমার ওপর এক ধরণের ভীতিকর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। মনে হতে থাকে, আকাশ একটা বিরাট ভোঁয়ামাছি হয়ে উড়ে এসে আমাকে গিলে খাবে, অথবা তুলে নিয়ে যাবে হিমযুগের অনন্ত কুয়াশার আড়ালে, এই জনহীন ওভারব্রিজের উচ্চতা থেকে। আমি পালানোর পথ খুঁজতে থাকি উচ্চতার এই বিপজ্জনক একাকীত্ব থেকে। যে চারটা নামার রাস্তা আছে, আমার ডানে এবং বামে, সেগুলো দিয়ে মাটি পর্যন্ত যেতে হলে আমাকে পার হতে হবে কম হলেও ৭১ ফুট। এদিকে বাড়তে বাড়তে ভোঁয়ার গুঞ্জনধ্বনি আমাকে প্রায় ধরে ফেলেছে। নিচে তাকাই। মনে হয় ঠিক ৪১ ফুট নিচেই অসংখ্য মানুষ কিলবিল করছে। যদিও তাদের উদ্দেশ্য, গন্তব্য এবং কর্ম কিছুই আমার জানা নেই, তবু মনে হতে থাকে, সেখানে গেলেই আমি নিরাপদ। যেভাবেই হোক, আমাকে নামতেই হবে সমস্ত মানুষের আর যানবাহনের আটকে থাকা ভীড়ে। আমি সংক্ষিপ্ত পথটাই বেছে নিই। আমি দ্রুত লাফ দেই ওভার ব্রিজের রেলিং টপকে। এবং লাফিয়ে পড়ার পরমুহূর্তে, পতনের ঠিক আগমুহূর্তে, আমার সন্দেহ হয়, আমি কি সুবোধ?  ছোট গল্প। এসএইচ/

নব্য দোসর

অগ্রহায়ণ মাস প্রায় ফুরিয়ে এলো। সূর্য ওঠে আর ডোবে কুয়াশার পর্দা ঘিরে। কোনো দিন আবছা ধোয়াটে কুয়াশা তো কোনোদিন গাঢ় সাদায় চারদিক অস্পষ্ট। আজ সকালে এক হাত দূরের মানুষও চোখকে ফাঁকি দিচ্ছে কুয়াশার জন্য। রতন গাছি দুয়োর খুলে যখন উঠোনে দাঁড়ালো একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপ্টা যেন চামরায় সূচ ফুটালো। গায়ের চাদর দিয়ে যখন কান মাথা ঢেকে নিচ্ছে রতন গাছি তখন আশরাফ উদ্দিনের ঘর থেকে ভেসে আসা অনবরত কাশির আওয়াজ রতনকে ব্যস্ত করে তোলে। রতন গাছি দৌড়ে যায় গোলপাতাও ছাওয়া ঘরটাতে। শীতের কুয়াশা পাতার আবরণ ভেদ করে আশরাফ উদ্দিনের ছালা বিচুলির বিছানাটা স্যাঁতস্যাঁতে করে দিয়েছে।" বাজান, একটু পানি খাবা?" বলে ঝিনুইয়ে করে একটু পানি ধরে আশরাফ উদ্দিনের মুখের কাছে।মাথা উঁচিয়ে পানিটা মুখে নেবার চেষ্টা করে আশরাফ উদ্দিন। পারে না, কাশির দমক আর শরীরের অক্ষমতায় পানি টুকু ঠোটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে। গায়ের চাদর দিয়ে রতন গাছি পরম মমতায় বাবার মুখটা মুছিয়ে দেয়। "শ্বাস নিতি কষ্ট হচ্ছে বাজান? একটু ঠেকনা দিয়ে বসায়ে দেবো?"  স্যাঁতস্যাঁতে দু`টো কাঁথা আর কিছু ছেঁড়া ছালার দঙ্গল আশরাফ উদ্দিনের গা থেকে সরাতে সরাতে বলে রতন গাছি।ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে আশরাফ উদ্দিন, কিছু বলে না। রতন গাছি আর একটা শুকনো কাঁথা দিয়ে তার বাজানকে জড়িয়ে বেড়ায় ঠেকনা দিয়ে বসিয়ে দেয়।" আজ কাম শেষে ঝিকরগাছা বাজারে যাবো নে বাজান। তোমার জন্য কফের ওষুধ আনতি হবি। আর কিছু খাতি ইচ্ছে হলে বলবা কিন্তু। আমি বাজার থিকে আনি দিবো।" বলতে বলতে রতন মাঝি আশরাফ উদ্দিনের বুকে আস্তে আস্তে হাত বুলায়। বাবার শ্বাসের কষ্ট রতন মাঝিকেও খুব কষ্ট দেয়। তাই বাজানকে বিভিন্নভাবে আরাম দেবার চেষ্টা করে সে। আর করবেই বা না কেনো। বাজান রতন মাঝির সব কিছু। মা তো সেই কবেই রতন গাছিকে ১০ বছরের রেখে মারা গেছে। এরপর থেকে বাজান তার সবকিছু। বাপ-বেটার এই গরীব সংসারে যেটুকু সুখ,যেটুকু আনন্দ দেওয়া যায় তার সবটা দিয়েছে বাজান তাকে। সারাদিন পর কাজ শেষে ঘরে ফিরে নিত্য চাল ডাল ফুটিয়ে তাকে উপাদেয় করতে একটু ঘি ফেলে হোক বা ঈদের দিন গ্যাঁটের প্রায় সব টাকা শেষ করে সেমাই আর মোরগ কিনে এনে হোক, সব ভাবেই চেষ্টা করতো আশরাফ উদ্দিন ছেলের মুখে একটু হাসি ফোটাতে। চিনি কম হওয়া ল্যাটা সেমাই খেয়েও যখন রতনের চোখ মুখ খুশীতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো, তখন আশরাফ উদ্দিন লুকিয়ে চোখের জল মুছতো।রতন গাছি বাজানের ঘর থেকে গলা বাড়িয়ে বৌকে ডাকে।" ও বৌ, আজ বাজানের জন্যি একটা বাচ্চা মুরগী পাঠায়ে দেবো নে, তুমি পেঁপে দিয়ে পাতলা করে পাক করে দিও।" বউ উত্তর  দেয় না। রতন গাছি বউয়ের সারা না পেয়ে ঘরের বাইরে আসে। হাসি উঠানের এক কোণায় পলিথিনে ঢাকা শুকনো পাতাগুলো টেনে বার করছে।" আজ উনুন জ্বালাতি কষ্ট হবে নে, সব পাতা নিহরে ভিজে গ্যাছে। নতুন পলিথিন নিয়ে আসবেন আজ।" দু`হাত ভরে পাতা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যায় হাসি। "এখনো উনুনে আঁচ দেও নি বউ, বাজানের ক্ষিধে পেয়ে যাবে নে।" রতন গাছি একটু অধৈর্য্য হয়ে ওঠে।" আপনি রস নিয়ে আসতি আসতি হয়ে যাবা নে।" বলে হাসি চাল ডাল মিশিয়ে পাতলা জাউ রান্না করার প্রস্তুতি নেয়।রতন গাছি কাছি আর দড়ি বাঁধা কয়েকটা হাড়ি হাতে এগোয় বাড়ির সামনের খেজুর গাছগুলোর দিকে। কাল সন্ধ্যায় বেঁধে আসা রস ভরা হাড়িগুলো এখন খুলবে। আর খেজুর গাছের কিছু অংশ কাছি দিয়ে আবার কেটে নতুন হাড়ি বেঁধে আসবে। তবে প্রথম কাটায় যে রস মেলে তা থেকেই যে সুঘ্রাণের পাটালি হয়, দোকাটায় আর তা হয় না। তা থেকে ঝোলা গুড় বানায় রতন গাছি।রসের হাড়িগুলো যখন সব নামিয়ে নতুন হাড়ি বাঁধতে যাবে তখন চেয়ারম্যানের কাছের এক সাগরেদ এসে দাঁড়ায়। " রতন গাছি কি সব হাড়ি নামায়ে ফেলেছো?" লোভী চোখে হাড়িগুলো দেখতে দেখতে বলে।বিরক্তে চোখ মুখ কুঁচকে যায় রতনের।" হ, তা সে খবর আপনের কি দরকার।" বিরক্ত হয়ে বলে রতন।" চেয়ারম্যান পাঠালো যে আমারে, একটা ভাল দেখে রসের হাড়ি নিয়ে যেতে। আর তার গাছের রস তো সেই আগে খাবে নাকি তুমি তা মানতি চাও না।" বলেই মুখে একটি বিদ্রুপের হাসি ঝুলায় লোকটা।তীব্র রাগটা লুকিয়ে রতন গাছি একটা বড় হাড়ি সাগরেদ টার হাতে দেয়। ছয়টা খেজুর গাছওল বাড়ির সামনের আঙিনাটা চেয়ারম্যানের কাছে বিক্রি করেছে রতন এবছরেই। যদিও বলতে গেলে বাধ্য করেই জায়গাটা নিয়েছে চেয়ারম্যান। এখন গাছগুলো বউয়ের একজোড়া সোনার দুল দিয়ে লিজ নিয়েছে। এই গাছগুলোই যে রতন গাছির জীবিকার একমাত্র উপকরণ। " চেয়ারম্যান আজ কখন বাড়ি থাকবি? আমার দেখা করতি হবি।" সাগরেদ টাকে উদ্দেশ্য করে বলে রতন। " আজ দুপুরের পরে আসো। দেখা করতি পারবানে।" বলেই লোকটা হাঁটা শুরু করে।রতন গাছি রসের হাড়িগুলো নিয়ে গজগজ করতে করতে বাড়ির ভিতরে আসে। ততক্ষণে সূর্য কুয়াশাকে হারিয়ে তাপ ছড়াচ্ছে একটু একটু। রতন উঠে আসে আশরাফ উদ্দিনের ঘরে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাজানকে কোলে নিয়ে বারান্দার রোদে হাসির করে রাখা বিছানায় শুইয়ে দেয়। সারাদিন বাজানকে এভাবেই হাসির চোখের সামনে রেখে যায়। আর পরের বাড়ির মেয়ে হাসিও পরম মমতায় বাজানকে সারাদিন আগলে রাখে। একটা টিনের থালায় জাউ ভাতে একটু সরিষার তেল ঢেলে রতনের হাতে দেয় হাসি। আর একটি বড় বাটিতে জাউভাতে বয়াম চেঁছে শেষ ঘি টুকু নেয় হাসি।" বাজানের ঘি কিন্তু শেষ হয়ে গেলো ; আনতি হবি আজ।" বলে বারান্দায় শুয়ে থাকা বাজানের পাশে গিয়ে বসে। ঝিনুইয়ে করে একটু একটু জাউ ঢালতে থাকে বাজানের মুখে হাসি। পাশে বসে তাড়াহুড়ো করে খেয়ে নেয় রতন গাছি।রসের হাড়িগুলো নিয়ে হাশেম মিয়ার জমিতে বানানো বড় চুলায় জ্বাল দিতে নিয়ে যায়। হাড়ি থেকে রস ঢালে তাপালে। রস জ্বাল হতে হতে ঘন হতে থাকে। বাতাসে গুড়ের মিষ্টি গন্ধ ছড়াতে থাকে। রতন গাছি বুক ভরে সেই মিষ্টি গন্ধ নেয়। বাজানরে এই গুড় ঘনদুধে জ্বাল দিয়ে খাওয়াতি হবি, ভাবে রতন গাছি। হাসি চিতই পিঠা দুধে পছন্দ করে খুব। আর এই সুঘ্রাণের পাটালি পালি হাসিও খুব খুশী হবে নে, ভাবতে ভাবতেই রতন গাছি গুড় বানাতে থাকে।কিছু গুড় বাড়ির জন্য রেখে বাকি গুড় বাজারে গিয়ে সুধেন সাহার মুদি দোকানে বিক্রি করে রতন গাছি। বাজানের জন্য কফের ওষুধ কিনে চেয়ারম্যানের বাড়ি যায়। দাওয়াই বসে অপেক্ষা করতে থাকে। ভাতঘুম দিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক পর চেয়ারম্যান আসে।" কি রে রতন, কয় কেজি গুড় বাঁধিছিস আজ।" পান চিবোতে চিবোতে বলে চেয়ারম্যান।" কেজি চারেক মতন হবি। সে কথা বাদ দেন চাচা। বাজানের ভাতা-র ব্যবস্থা করতি পারলেন?" কিছুটা ব্যতিব্যস্ত  রতন গাছি।" সরকারের অফিসে তো জমা দিছি তোর বাপের কাগজ, খবর পালাম দুই মাস পরে হবি।" ঠাণ্ডা গলায় বলে চেয়ারম্যান।" এক মাসের মধ্যি ভাতা-র কাগজ করি দেবেন বলে জায়গাটা লিখে নিলেন। বাজান এত কষ্ট পাচ্ছে যে কি বলবো। এই ভাতা পালি চিকিৎসা করাতি পারতাম। প্রতি মাসে বাজানের ওষুধ কিনতি অনেক পয়সা লাগে। ভাতাটা পালি বাজানের দেহের ব্যাথা কমাতি ওষুধ পথ্যি সব করতি পারতাম। দ্যাশের জন্যি যুদ্ধ করিছিলো। দ্যাশ তো কিছুই দেয় নাই বাজানরে। এটুকুন ভাতা পাতিও এত সময় লাগে! অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেও বাজান আমার ভাতা পায় না আর যারা যুদ্ধের সময় অন্য দ্যাশে পলাইছিলো তারা ভাতা খায় বসি বসি। আর ভাতা লাগবি নানে, বাজানের যুদ্ধের কাগজ ফেরত দিয়ে দেন আমারে" অসহিষ্ণু রতন গাছি।" তুই কি বলতিছিস রতন? কে যুদ্ধ না করি ভাতা খায়।" চমকে উঠে বলে চেয়ারম্যান।"সে বলতি গেলে অনেক কথা। সবাই সবকিছু জানিও চুপ করে থাকে ভয়ে। আপনে আমার মুখ খুলায়েন না। বাজানের কাগজ ফেরত দেন।" ক্ষেপে ওঠে রতন গাছি।" তুই আমারে ভয় দেখাচ্ছিস। কত বড় বাপেরবেটা তুই দেখছি দাঁড়া" চিৎকার করে ওঠে চেয়ারম্যান।চেয়ারম্যান কিছু বলার আগেই তার সাগরেদগুলো দুমদাম কিলঘুষিতে রতন গাছির দুনিয়া অন্ধকার করে ফেলে। হাতে রাখা গুড় আর বাজানের কফের ওষুধ ছিটকে পড়ে মাটিতে। রতন গাছি সেদিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে। নিজেও কিলঘুষি ফেরত দিতে থাকে চেয়ারম্যানের সাগরেদদের। অনেক কষ্টে ওদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে চেয়ারম্যানের সামনে এসে দাঁড়ায়। চিৎকার করে বলে," আপনে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। ভুয়া ভাতা খান আপনে। আমার বাজান যুদ্ধ করি স্বাধীন করছে দ্যাশ। আমি বাজানের ভাতাও আপনেরে ভিক্ষা দিলাম। আপনে একটা ভিক্ষুক।" একদলা থু থু ফেলে চেয়ারম্যানের সামনে।"বাজানরে আমি সুস্থ করবো নে। দ্যাশের কোনো সাহায্য লাগবি না। দ্যাশ থাকুক আপনের সাথে।” ঘৃণা উগরে দৃঢ় রতন গাছি ওষুধ আর গুড় ধুলো ঝেড়ে গায়ের চাদরে জড়িয়ে বাড়ির দিকে এগোয়, পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে চেয়াল ঝুলিয়ে অবনত দ্যাশের প্রতিনিধি!ছোট গল্পএসএইচ/

হুমায়ূন বিশেষজ্ঞ

আমাদের মশিউর ভাইকে শুধু ‘হুমায়ূনভক্ত’ বলেই বাক্য শেষ করা যাবে না। শেষ করলে সেটা হবে অন্যায়, অবিচার। সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে কী করতে হবে? ‘হুমায়ূনভক্ত’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ‘হুমায়ূনবিশেষজ্ঞ’ও বলতে হবে। এটা তার জোরালো দাবি। আর আমরা তার এই মামাবাড়ির আবদার টাইপের দাবি পূরণ করে আসছি ম্যালাদিন ধরে। তবে এই দাবি পূরণ করতে গিয়ে যা বুঝলাম তার সারমর্ম হচ্ছে, তিনি হুমায়ূনভক্তও নন, হুমায়ূনগবেষকও নন, হুমায়ূনবিশেষজ্ঞও নন। তিনি আসলে হুমায়ূনসমালোচক।            মশিউর ভাইয়ের সমালোচনার লক্ষবস্তু হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের কিছু বই। বইগুলো তিনি নিজের টাকা দিয়ে কিনেছেন, এমনটা ভুল করেও ভাবা যাবে না। হয় এগুলো বন্ধুদের কাছ থেকে এনে মেরে দিয়েছেন, না হয় এর-ওর কাছ থেকে গিফট পেয়েছেন। আর এই বইগুলোকেই যখন-তখন সহ্য করতে হচ্ছে তার সমালোচনার যন্ত্রণা। আমাদের একজন তো একদিন তাকে বলেই বসল হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে এই আজগুবি সমালোচনার দায়ে আপনাকে তিনি জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়তেন।            মশিউর ভাইয়ের সমালোচনার একটা বিশেষ স্টাইল আছে। স্টাইলটা মোটেই সুবিধার কোনো স্টাইল নয়। তবু এই স্টাইলটাকে তিনি চাপার জোরে ‘স্বকীয়তা’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। তো স্টাইলটা হচ্ছে, তিনি বইয়ের লেখা নিয়ে সমালোচনা করেন না। সমালোচনা করেন বইয়ের নাম নিয়ে। আসলে লেখা নিয়ে সমালোচনা করতে হলে তো পুরো বইটা পড়ে তবেই সমালোচনা করতে হবে। তার হাতে অত সময় কই? তাই নামের উপর দিয়েই কাজ চালিয়ে দেন। সাপও মরল, আবার লাঠিও আস্ত থাকল।            সেদিন ‘সবাই গেছে বনে’ বইয়ের নামটি নিয়ে একদম সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিলেন মশিউর ভাই। বললেন, তোমরাই বলো, সবাই যাওয়ার মতো বন কি এখন দেশে আছে? মানু সব বন ধংস করে ফেলেছে না? তবু বাদ দিলাম সেসব কথা। ধরলাম বনে গেলোই। কিন্তু সবাই বনে চলে গেলে বাড়িটা একেবারে খালি হয়ে গেল না? বাড়ি খালি রেখে সবার বনে যাওয়াটা কি ঠিক হলো? বাড়ির দারোয়ানটা অন্তত গেটে রেখে যেতে পারত! আমরা বললাম, দারোয়ান রেখে যায়নি, এমনটা কি কোথাও বলা আছে?               মশিউর ভাই বললেন, আলাদা করে বলা থাকতে হবে কেন? ‘সবাই গেছে বনে’ নামটা শুনে কী মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে দারোয়ানকেও প্যান্ট-শার্ট পরিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। এটা ঠিক নয়। কখন বাড়িতে চোর ডাকাত ঢোকে! উফ! নিজের বাড়ির প্রতি কেন যে মানুষের এই দায়িত্ববোধটুকু নেই! সবাই বনে যাওয়ার আগে দরজায় যে তালাটি মেরেছে, সেটি নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। মেড ইন চায়না তালা মেরে থাকলে কিন্তু সেটা খোলা চোরের জন্য ওয়ান টুর ব্যাপার।              ‘হিমু এখন রিমান্ডে’ নামটি নিয়ে বলতে গেলে নাক সিটকিয়েছেন মশিউর ভাই। তার বক্তব্য- এটা একটা কথা হলো? তিনি এতো বড় লেখক, তার উপন্যাসের নায়ককে রিমান্ডে নেওয়া হলো অথচ তিনি কোনো পদক্ষেপই নিলেন না। আরে বাবা, তার কি উচিত ছিল না হিমুকে রিমান্ডে নেওয়ার আগেই তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করা? তিনি তো থানায় একটা ফোন করলেই হিমুকে ছেড়ে দিত। ফোনের কলরেটও তো বেশি না। নাহ্, হিমুর প্রতি এই অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। অন্তত আমার মতো সচেতনরা তো মেনে নিতে পারেই না।               ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’ বইয়ের নাম নিয়েও তার সমালোচনার শেষ নেই। তার কড়া জিজ্ঞাসা-  মেঘ কোথায় যাবে? মেঘের কি শ্বশুরবাড়ি আছে যে বেড়াতে যাবে? নাকি খালুর বাড়িতে বেড়াতে যাবে? আর মেঘ নাকি বলেছে যাবো যাবো। মেঘের ভাবটা এমন যেন সে যেতে চাচ্ছে কিন্তু ব্যস্ততার জন্য যেতে পারছে না। মেঘের আবার ব্যস্ততা কিসের শুনি! মেঘ কি নয়টা-পাঁচটা অফিস করে? নাকি নিজের কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালায়? তাহলে কিসের ব্যস্ততা মেঘের? বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত না?              প্রায় প্রতিটা নাম নিয়ে সমালোচনা করেই মশিউর ভাই আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। আমাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো বিসিএসের ভাইভা বোর্ডের প্রশ্নের চেয়েও কঠিন মনে হয়। আর তিনি সেটা অনুমান করতে পারেন আমাদের হাবভাব দেখেই। এটাও অনুমান করতে পারেন, আমরা তাকে জবরদস্ত জ্ঞানী মনে করছি। মনে করছি, তার মতো জ্ঞানী সচরাচর জন্মায় না। আমাদের এই মনে করাটাকে পাকাপোক্ত করতে তিনি আবার ফিরে যান সমালোচনায়। টেনে আনেন ‘হিমুর মধ্য দুপুর’ নামটিকে।              চেয়ারে হেলান দিয়ে মোড়লের ভঙ্গিতে বসতে বসতে মশিউর ভাই বলেন, আমি বুঝতে পারছি না হিমুর প্রতি কেন এমন অবিচার করা হলো। মধ্য দুপুর মানে বোঝো? ঠাঠা রোদ। ছাতা মাথায় দিয়ে বাইরে বের হলেও চান্দি গরম হয়ে যায়। অথচ লেখক এই মধ্য দুপুরেও হিমুকে বাইরে বের করে দিয়েছেন ছাতা-টাতা ছাড়াই। তোমরা বইটার প্রচ্ছদের দিকে তাকাও। তাকালেই দেখবে হিমুর মাথায় কোনো ছাতা নেই। কেন, একটা ছাতা কিনতে আর কয় টাকাই বা লাগে! এখন আশি-পঁচাশি টাকায়ই কত ভালো ছাতা পাওয়া যায়! নতুন ছাতা তিনি না হয় না-ই কিনলেন। তার বাসায় তো নিশ্চয়ই পুরনো ছাতা ছিল। ফেরত দেওয়ার শর্তে হিমুকে একটা ছাতা দিলে কী হতো?            আবারও সেই বিসিএসের ভাইভা বোর্ডের প্রশ্ন। আমরা মাথা নত করে ফেলি। কিন্তু এইটুকু নততে খুশি হন না মশিউর ভাই। তিনি চান আমাদের মাথা নত হতে হতে একেবারে মাটিতে গিয়ে বাড়ি খাক। আর সেই ইচ্ছেতেই তিনি পরবর্তী প্রশ্নের ক্ষেত্র তৈরির জন্য চলে যান পরবর্তী সমালোচনায়। তার এবারের টার্গেট ‘দারুচিনি দ্বীপ’। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তিনি মুখটা পানসে বানিয়ে বললেন, মাংস আমিষ জাতীয় খাদ্য। কিন্তু সেই মাংস আমরা মাসে কয়দিন খাই?            আমরা বললাম, আপনিই বলেন। মশিউর ভাই বললেন, মাসে আমরা মাংস খাই একদিন বা দুইদিন। তাহলে আমরা দারুচিনি দ্বীপ দিয়ে করবোটা কী! দারুচিনি হচ্ছে গরমমসলা। এটা নিয়ে মাংস রান্না করে। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ নিয়ে না লিখে তিনি কাঁচা মরিচ দ্বীপ কিংবা গোলআলু দ্বীপ নিয়ে লিখতে পারতেন। কারণ, এই জিনিসগুলো আমাদের প্রতিদিন কাজে লাগে। সব খাবারে দিতে হয়। কাঁচা মরিচ দিয়ে আলুভর্তা বানিয়ে তো আমি রোজ খাই। কাঁচা মরিচে কিন্তু ভিটামিনও বেশি। ঠিক কিনা?              ভাইভা বোর্ডের এই প্রশ্নটা মনে হয় একটু সহজই হলো। আর এই সুযোগে আমাদের মুখপোড়া তৈমুর বলে উঠল, ভাই, আপনি যে বললেন কাঁচামরিচ আর গোলআলু নাকি সব খাবারে দিতে হয়, কথাটা কিন্তু ঠিক না। মনে করুন আপনার বাসায় লাচ্ছা সেমাই কিংবা পায়েস রান্না করল। সেখানে কি আপনি কাঁচা মরিচ আর গোলআলু দেবেন? দেওয়াটা কি উচিত হবে? তবু যদি দিয়েই ফেলেন, আপনার পরিবারের সদস্যরা কি ঘুষি মারার জন্য আপনার দিকে তেড়ে আসবে না?              প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন আসবে, এটা বোধ হয় ভাবতে পারেননি মশিউর ভাই। তাই তিনি একটা পরিপূর্ণ ঢোক গিলে বললেন, একটা গুরুত্বপূর্ণ কথার মধ্যে আরেকটা অপ্রাসঙ্গিক কথা ঢুকিয়ে দেওয়া খুবই অন্যায়। তোমরা ছোট মানুষ, জ্ঞান বুদ্ধি কম। কী আর বলবো। তবে ‘কী আর বলবো’ বললেও বলার বিষয় খুঁজে পেতে দেরি হলো না তার। তিনি কথা বলতে শুরু করলেন হুমায়ূন আহমেদের সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোথাও কেউ নেই’ নিয়ে। যা নাটক হিসেবেও প্রচারিত হয়েছে টিভিতে।            মশিউর ভাই ‘কোথাও কেউ নেই’ এর সমালোচনা করতে গিয়ে বললেন, সেই প্রাগৈতিহাসিক আমলের পরিবেশ নিয়ে কথা বললে তো চলবে না। সেই আমলে না হয় জনসংখ্যা কম ছিল, তাই কোথাও কেউ ছিল না। কিন্তু এখন সেই পরিবেশ নেই। এখন সব জায়গায় মানুষ গিজগিজ করে। ধরে নিলাম উপন্যাসটা অনেক আগের লেখা। আগে লেখা তো কী হয়েছে? রি-প্রিন্ট করার সময় নামটা পাল্টে দিলেই হতো। ‘কোথাও কেউ নেই’ এর পরিবর্তে লেখা যেত ‘সব জায়গায়ই কেউ না কেউ আছে’। এছাড়া...             মশিউর ভাইয়ের কথার গতিটা থামিয়ে দিয়ে সজীব বলল, কিন্তু ভাই, এই উপন্যাসে তো জনসংখ্যা নিয়ে কথা বলা হয়নি। তাহলে এই ধরনের নাম কেন দেওয়া হবে? এছাড়া আপনি এর আগে আরো যেসব সমালোচনা করলেন, সেগুলোও তো কেবল নাম নিয়ে। বইয়ের ভেতরে কী আছে সেটা না জেনে শুধু নাম নিয়ে মন্তব্য করাটা কি ঠিক? এবার খুব ভালোভাবেই ক্ষেপে গেলেন মশিউর ভাই- এই মিয়া, আমি কি তোমাদের মতো ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে চলি? আমাকে পুরো জিনিস পড়তে হবে কেন? আমার মতো জ্ঞানীর জন্য ইশারাই কাফি।             মশিউর ভাইয়ের এই হুম্বিতুম্বি দেখে আমি বললাম, ঠিকই বলেছেন ভাই, আপনার মতো জিনিয়াস লোককে পুরো বই পড়ে সমালোচনা করতে হবে কেন! তবে একটা অনুরোধ ভাই, আপনার এই জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা যাতে পুরো জাতি পড়তে পারে, তাই চাচ্ছিলাম সমালোচনাগুলো কোনো পত্রিকায় ছেপে দিতে। দেবো নাকি? মশিউর ভাই এবার গলার স্বর নামিয়ে বললেন, পত্রিকায় আমার সমালোচনা ছাপা হলে কি সেটা  হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের চোখে পড়বে? আমি বললাম, কেন বলেন তো?                মশিউর ভাই বললেন, না মানে তাদের চোখে পড়লে উল্টাপাল্টা সমালোচনা করার অপরাধে তারা আমার খবর করে দিতে পারে তো! আমি বললাম, তাহলে ধরে নেন তাদের চোখে পড়বে না। মনে করেন তারা বাসয় পত্রিকাই রাখে না। মশিউর ভাই বললেন, তাহলে ছাপতে পারো। তবে সমালোচনার জন্য তো বিল নিশ্চয়ই হয়? বলে দিও বিলটা যাতে ক্যাশে দেয়। ঠিক আছে?   লেখক : ইকবাল খন্দকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এ পর্যন্ত তার ৫৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পত্রিকায় লিখছেন। আগামী বইমেলায়ও তার কয়েকটি বই প্রকাশিত হবে।              /ডিডি/

ময়রা

এই ছেলের নাম বোঁদে কেন হল তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। বেঁটে মতোন দেখতে তাই বোঁদে, বোধবুদ্ধির বালাই নাই সে কারণে বোঁদে, কিংবা আরেকটু দুঃসাহসী হলে বলা যায়, সে অন্যের বাড়ি বয়ে গিয়ে মানুষের পাছায় বা পোঁদে বাঁশ প্রবিষ্ট করাতে বিশেষ দক্ষ বলে নিন্দুকেরা তার নাম দিয়েছে বোঁদে। আমার উদ্দেশ্য কারো নাম নিয়ে নামতাবিলাস নয়, বরং বোঁদের মতো মানুষ যে কেন বেঁচে আছে তাই নিয়ে ভাবছি। আমি নিশ্চিত, পুরো কাহিনি জানলে আপনিও সুখে-দুঃখে নির্বিকার দার্শনিকের মতো নিশ্চুপ বসে থাকতে পারবেন না।        টাঙ্গাইল যেতে এলেঙ্গা মোড়ে মনু ময়রার দোকানে সে কাজ করছে আট বছর। মনু ব্যবসা বোঝে। সে বেশ ভাল করেই জানে, আজকের বাজারে মাসে হাজার পাঁচেক দিয়েও বোঁদের মতো বিশ্বস্ত আর কর্মঠ লোক সে পাবে না। শুধু তাই নয়, রসগোল্লার পাক আর ছানার জিলিপির প্যাঁচ কষতে ওর মতো চৌকস আর কে আছে! মনুর দোকানের মিষ্টির স্বাদই আলাদা। দিনভর তার দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। নানান কিসিমের কাস্টমার মাছির মতো সারাক্ষণ ভনভন করে। মনু ময়রা ক্যাশ সামলাতে হিমশিম খায়। বাকি কাজ সব বোঁদেই করে থাকে। কেউ কেউ বলে, ওর হাতে নাকি জাদু আছে।       মনুর দোকানে সব রকম ক্রেতাসমাগম হয়। কাউকে সে নিরাশ করে না। লালমোহন, রসগোল্লা, মোহনভোগ, রসকদম, ছানার জিলিপি, ক্ষিরপুরি, মেওয়া-লাড্ডু, পানতুয়া, বালুশাহী, শাহীচুম্বন, কাঁচাগোল্লা এখানে সুলভে পাওয়া যায়। শুধু কি তাই, একেবারে নীচুতলার লোকেদের জন্য আছে বোঁদের বানানো ভেরি স্পেশাল এন্ড সস্তাদামের বোঁদে। বিশেষত রিকশাওয়ালা শ্রেণীর খদ্দেররা সকাল সকাল মনুর দোকানে এসে এক পেল্ট বোঁদের সাথে দুটো পরোটা মেরে দিয়ে কাজে বেড়িয়ে যায়।       সে গুটিগুটি বোঁদে বানাতে বিশেষ ওস্তাদ, এ কারণেও ওর নামকরণ ‘বোঁদে’ হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। সে যাই হোক, বোঁদের শ্রম-ঘাম আর নির্বুদ্ধিতাকে পুঁজি করে এই থানাশহরে বেশ রমরমা ব্যবসা ফেঁদেছে মনু ময়রা।     বোঁদের চেহারা মোটেও দৃষ্টিসুখকর নয়। বেঁটোখাটো গড়ন, খাঁদা নাক, গায়ের রঙ বেশ কালো। বাঁ পাটা খানিক ছোট তাই সামান্য খুঁড়িয়ে চলে বোঁদে। সস্তাদামের সিনথেটিক লুঙ্গিখানা ধুতির মতো মালকোঁচা মেরে ভোর ভোর কাজে নেমে পড়ে। বুদ্ধিটা অবশ্য মনুরই। লুঙ্গির খুঁট খোলা থাকলে পেলায় সাইজ জালায় ধরে রাখা মিষ্টির সিরকায় লোটাবে, নয়তো কাজের চাপে ওর ল্যাগবেগে বিশেষ যন্ত্রখানা বেরিয়ে পড়ে ডেঁপো ছেলে-ছোকরাদের গভীর কৌতুকের বিষয় হবে!      বলা বাহুল্য, শীত-গ্রীষ্ম সব সময় বোঁদের উর্ধ্বাঙ্গ খোলাই থাকে। চুলোর গনগনে আগুনে সে রীতিমতোঘামে, তাই শীতবোধ কী জিনিস বোঁদে জানে না। তাতে মনুর বরং খরচ বাঁচে। ফিবছর নতুন নতুন হাতঅলা গেঞ্জি কিনতে গুচ্ছের পয়সা খসাতে হয় না।    বোঁদে বোকা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। একবার এক ঘটনা ঘটলো। মনু ময়রা বেশি মুনাফার লোভে দুধে পাউডার মিশিয়ে দিয়েছিল। গ্রামের গরুসমাজ সবুজ ঘাসের দাবিতে দুধপ্রদান কমিয়ে দিল। তাই দুধে গুঁড়ো না মিশিয়ে উপায় কি! ব্যবসা তো আর বসিয়ে রাখা যায় না! বোঁদেকে সে বলে নি যে ব্যাপারটা যেন পাঁচ-কান না হয়। তাতে দোকানের সুনাম নষ্ট হবে, খদ্দের কমে যাবে।     কপাল এমনই, ঠিক সেদিন শহর থেকে বড়সায়েবরা এলেন এলেঙ্গা রিসর্টে বেড়াতে। বিবি সাহেবার মিষ্টি ভীষণ পছন্দ। বাতিক বলতে পারেন। ওসব ডায়েটফায়েট তার একদম চলে না। মিষ্টি চাই। ভাল মিষ্টি। মিষ্টি লিবেন সাব! মনু ময়রার দোকানে যান। ছিঃ ছিঃ কষ্ট করে যাবেন কেনে! আমিই বরং এত্তেলা পাঠাচ্ছি। দামের সাথে বাড়তি কিছু ধরে দিলেই হল। একজন বলল, এরা অনেকটা ছুঁচোর মতো। সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকে। মওকা বুঝে দালালি ফড়েগিরি করে বাড়তি দু’পয়সা কামায়।    সায়েব বিবিকে নিয়ে মনুর দোকানে হাজির। শহুরে কাস্টমার পেয়ে সে ভীষণ খুশি। হাঁকুনি পেড়ে বলল, এই বোঁদে, ভাল দেখে কিলোপাঁচেক মিষ্টি প্যাক করে দে তো! সায়েব বহুত দূর থেইক্কা আইছেন।    মনু খুশি তো বোঁদেও খুশি। এজন্যই লোকে তারে বোকা বলে! আরে হাঁদারাম, মিষ্টির দোকান দিয়ে মনুর দুই-তিনতলা বাড়ি হল, চেহারায় চটক এলো, তার বউ বাচ্চা বিয়োলো, তোর কী হল রে বেকুব! তুই ক্যান ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার লাহান দুই পা তুলে নাচস!    সে যে যাই বলুক, বোঁদে নিমকহারাম নয়। যার নুন সে খায়, তার গুণ গাইতে বোঁদে মোটেও কসুর করে না। মনু তার মা-বাপ। মনু ময়রা আছে বলেই না সে বেঁচে আছে। নইলে কবেই আচমকা আষাঢ়ের বেনোজলে ভেসে যেত!       কি রে, দুধ খাঁটি তো, নাকি পানি মিশিয়েছিস! সাহেব বললেন। মনু ময়রা এক বিঘত জিভ কেটে বলল, ছিঃ ছিঃ সাব, এ কি বলছেন! আপনারে জাইনা-শুইনা আমি ভেজাল জিনিস দিমু! এক্কেবারে খাঁটি দুধ সায়েব। এট্টুও মিশাল নাই।      বোকা বোঁদে সোৎসাহে মালিকের কথার পিঠে বলে, সে কি কতা স্যার! ভেজাল কেনে দিবো! আমার মালিক খুব সজ্জন মানুষ। দুধে সুস্বাদু গুঁড়া মিলাইয়া মিষ্টিতে বাহার আনছেন। লিয়ে লন সাব। বাসায় গিয়া চেটেপুটে খাইবেন!   অ্যাঁ, কী বললে! গুঁড়া মিলাইছে! পাউডার মিল্ক! হারামজাদা! তোদের ধরে পুলিশে দেয়া উচিত। দুধেও ভেজাল! শালা, দেশটা ভেজালে ভেজালে সয়লাব হয়ে গেল! মিষ্টি না নিয়ে বরং জেলের ভয় দেখিয়ে সায়েব চলে গেলেন।      এর পরের ঘটনা খুব সহজেই অনুমেয়। মনু মালিক, বোঁদে চাকর। বোঁদের বোকামোর জন্য তার চরম বেইজ্জতিই শুধু না, পাঁচকিলো মাল দোকানে পড়ে থাকলো। এই রাগে ওর চুলে মুঠি ধরে ইচ্ছেমতো ঝাঁকালো মনু। শালা বোকার হদ্দ! তোর মতো আচ্ছা বেকুবের পাল্লায় পড়ে আমার সব গোল্লায় যাবে রে! ভিটেয় ঘুঘু চরবে!    এই আমাদের বোঁদে। এলেঙ্গা রোডের মনু ময়রার দোকানের খাস কামলা। দিনভর মিষ্টির মাঝে থেকেও যার জীবনে তেতোস্বাদ একটু গেল না। এমনই আসলে হয়! ভারবাহী গাধা জীবনভোর চিনির বস্তা বয়েই যায়, একদানা চিনি কখনও চেখে দেখার ফুরসত পায় না।      সময়ের সাথে সাথে বোঁদের জীবনে পরিবর্তন আসে। তবু তার পেশাবদল হয় না। মনু ময়রা কাঁচাটাকা চুষে-চিবিয়ে দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে, বোঁদেও বাড়ছে। তবে আখেরে নয়, স্রেফ ঘাড়েগর্দানে। বোঁদে ইদানিং কেমন যেন উরু উরু, কাজেকর্মে মন নেই তার। মনু বুঝতে পারে, প্রকৃতির নিয়মে ওর এখন নারীর ছোঁয়া চাই। তলানি মিষ্টি আর মুখে রোচে না বোঁদের।   মনু ময়রা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, কি রে বোঁদে, বিয়ে করবি! মন বড় উচাটনঅইছে, তাই না রে! জানিস তো, ঘর বাঁধতে দড়ি, আর বিয়ে করতে কড়ি লাগে! কত জমিয়েছিস? তাতে হবে!     বোঁদেও হাসে। মনে মনে সে মনিবের তারিফ করে। মনু তার মনের কথা ধরে ফেলেছে। লোকটা অন্তর্যামী নাকি! বুঝলো কি করে বোঁদের এবার বউ চাই!    ঠিক আছে, হবে! তুই মেয়ে দ্যাখ। আমি তোর বিয়ের খরচ দেব, মনু বলল। তবে একখান শর্ত আছে। বিয়ার পর কিন্তু বউরে নিয়া ভাগবার পারবি না। আমার দোকানে তোর কাম করতে আইবো। কিচ্ছু ভাবিস না, মিঞা-বিবির সংসারে যাতে চোট না লাগে সেইমত টেকা বাড়াইয়া দিমু। তুই আমার আপন লোক বোঁদে। তোরে কি আমি কষ্টে রাখতে পারি! মনু ময়রা যেন দয়ার সাগর, বিনয়ের অবতার! এই না হলে মনিব। ভীষণ খুশি বোঁদে।     খুব একটা খুঁজতে হয় না। মেয়ে পাওয়া যায় সহজেই। গাঁও গেরামে সোমস্ত মেয়েকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো বাপ আর কই! ছেলের পিছে খরচ করলে বেশি লাভ। বুড়ো বয়সে ছেলেরাই দেখে। মেয়ে থাকে তার সোয়ামির সংসারে!      যথাসময়ে মনু ময়রার চেষ্টা তদবিরে বোঁদের বিয়ে হয়। মেয়ের নাম খুশি। স্বভাবে একটু চাপা, তবে চেহারা মন্দ নয়। গায়ে গতরে আছে, পেটে বিদ্যেও একেবারে খালি নয়। সেভেন ক্লাস অব্দি পড়েছে খুশি। বোঁদে খুশি, ওর বউ খুশিও খুশি।     বোঁদের কাজে এখন আগের চেয়ে ঝোঁক বেশি। মনু ময়রার প্রতি তার কৃতজ্ঞতার যেন শেষ নেই। নিজের ছেলের মতো দাঁড়িয়ে থেকে মনু তাকে বিয়ে করিয়েছে। ছাতি-লাঠি, হাতঘড়ি, দুপাখি জমিও সে পেয়েছে শ্বশুরের তরফে। সম্বন্ধী বলেছে, খুশির সাথে আচরণ ভাল করলে বোঁদের চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে ভিটের উপর ঘরও একখানা বঁধিয়ে দেবে। তাছাড়া অবরে-সবরে কলাটা-মুলোটা তো থাকছেই।   যাচ্ছলে! ভাগ্য বোঁদের ভালই বলতে হবে। এ যেন রাজ্যসহ রাজকন্যে!        দিন ভালই যাচ্ছিল। মনু ময়রার নোকর হয়ে কেটে যাচ্ছে বোঁদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু খুশি স্বভাবে চাপা হলেও আখের গোছাতে জানে। একরাতে রিরংরাজনিত ক্লান্তি কেটে গেলে খুশি ওর গলা জড়িয়ে বলল, দেখো বোঁদে, পরের দোকানে জনমভর খাটবে এ কিন্তু আমার ইচ্ছে নয়। আড়ালে-আবডালে লোকে আমারে গাধি বলে! তুমি যে গাধার মতো পরের বোঝা বয়ে বেড়াও!    তুমি কী বলবার চাও খুশি? বোঁদে বাধ্য ছেলের মতো বউয়ের গলা জড়ায়। বটবৃক্ষের ন্যায় পায়ে পায়ে শিকড় বেঁধে পুনর্বার ডানা ঝাঁপটায়। নারীতে উপগত হয়ে ক্রমাগত ক্রিয়াশীল হয়। এ এক অন্য রকম শিহরণ। অল্পতে তেষ্টা মেটে না! বারবার ভেজাতে মন চায়।       তুমি নিজে একখান দোকান দিলে হয় না! কাজকাম তো ভালই জানো। খুশি বোঁদেকে গভীর আশ্লেষে বেঁধে ওর ঘেমো বুকে মুখ ঘষতে থাকে। এও নারীর এক কলা বৈ কি! পুরুষের কাছে নিজেকে অত্যাবশ্যক প্রমাণের মোক্ষম সময়! শ্রেণী, শিক্ষা বা দেহমাধুর্য নির্বিশেষে নারীকুল এ কৌশল বোধ করি বেশ ভালই জানে! রীতিমতো পারঙ্গম!      কিন্তু পয়সা কোথায় পাবো! মেলা পুঁজি লাগে দোকান দিতে! বোঁদে নিজের স্ত্রীকে অক্ষমতার জানান দেয়। এত টাকা তার নেই। হবেও না কোনদিন! তাই নিজে দোকান দেবার কথা সে স্বপ্নেও ভাবে না।   খুশি এত সহজে নিরাশ হয় না। সে কলাবতী মেয়ে। উদ্দেশ্য হাসিলের সব রকম কলাকৌশল তার জানা!         খুশি বোঁদের পুরুষ্টু ঠোঁটে আগ্রাসী ছোবল মেরে বলল, সে ভার আমার। তুমি জায়গা দেখো। দোকান তোমার হবেই হবে।      এরপর আরো কিছুদিন যায়। খুশিকে নিয়ে কানাঘুষো শোনা যায়। গাঁয়ের মাতব্বর রমজান আলী মনু ময়রার পার্মানেন্ট কাস্টমার। প্রায়ই সে মনুর দোকানে এসে গোপালভোগ চাখে। বোঁদের সাথে খোশমেজাজে বাতচিৎ করে। যেন সম্পর্কে তারা ভায়রাভাই। এই মাতব্বরকে ঘিরেই কানাঘুষোর জাল বিস্তৃত হয়। কানেমুখে কথাটা মনু ময়রার কানেও পৌঁছায়। আর যাই হোক, সে বোঁদের খারাপ চায় না।    একদিন বোঁদেকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, বোঁদে, তুই শুনিস নি কিছু? চিরকাল তুই বেকুবই রয়ে গেলি! বোকা গাধা কোথাকার!     বোঁদে ফ্যালফেলে চোখে তাকায়। সত্যিই সে কিছু বুঝতে পারে না। মনু অবশ্য এর বেশি ভাঙে না। বেচারা বোঁদে কষ্ট পাবে। বোকাসোকা মানুষ! ঘটে যার বুদ্ধি আছে তার জন্য ইশারাই কাফি। খোঁটাপিটা খেয়ে দিব্যি শুধরে যায়। কিন্তু বেকুব বোঁদের কোন রকম বোধোদয় হয় না। খুশিকেন্দ্রিক ফিসফিসানি আরো জোরালো হয়। তবে বিষয়টা এমন যে হাঁক পেড়ে কাউকে বলাও যায় না। আর পেছনে যদি মাতব্বর খোদ রমজান আলী থাকে তবে তো কোন কথাই নেই!   শুধু রমজান কেন, শোনা যায়, পাশগ্রামের টাকাঅলা দু’চারজনেরও খুশির ঘরে অবাধ যাতায়াত! শালা বোঁদে এসব চোখে না দেখুক, শুনতে তো পায় নাকি! অকালকুষ্মাÐ একটা!           পাড়ার ডেঁপো ছেলেরা এ বিষয়ে রসের ঝাঁপি খুলে বসে। কিন্তু যাকে নিয়ে এতসব কাÐ সেই খুশির কিন্তু কোন হেলদোল নেই। সে দিব্যি আছে। বোঁদেও কিছু খারাপ নেই।             মনু ময়রা শেষমেশ স্বীকার করে, বোঁদের মতো মহাবেকুব মানুষ যে জীবনে দেখে নি! নিজের বউকেও সে বশে রাখতে পারে না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তারপরও ব্যাটা মফিজ কোন স্টেপ নিল না! বলি হারি যাই ওর খুশিপ্রেম! প্রেমে অন্ধ একেবারে! কানামোনা যাকে বলে!    কিন্তু তখনও বোধ হয় গাঁয়ের মানুষের জানার কিছু বাকি ছিল। মনু ময়রার ঘোরতর শত্রæ গোপনে কোথাও বেড়ে উঠেছে সে খবর মনু রাখছে কি!     ঠিক ছ’মাস বাদে এক সকালে বোঁদে বলল, আমি আর কাজ করুম না ভাই। নিজে দোকান দিমু। মনু ময়রা বোধ হয় ‘দেশে আর কোনদিন লোডশেডিং হবে না’ শুনলেও এতটা আশ্চর্য হতো না! বোঁদে এ কী বলছে!   মনু শ্লেষ্মারুদ্ধ ঘর্ঘরে স্বরে বলল, পেট গরম হয়েছে তোর! নাকি ভূত দেখেছিস! দোকান দিবি, টাকা  পাবি কোথায়!  সে আমার আছে। বোঁদে জানালো। সে আরো জানায়, দোকানের জায়গা কেনা হয়ে গেছে। শহর থেকে মিষ্টি সাজানোর র‌্যাক, রেকাবি, খামির-খুন্তি, হাঁড়িপাতিল-কড়া আসছে খুব শিগগিরই। এ কাজে খুশি ওর সহযোগী হবে।      মনু ময়রার চোখে পলক পড়ে না। বুঝতে পারে, বোঁদে এবার সত্যি মালিক হবে। দোকান মালিক! পেছনে কেরামতি কার! ভ্রষ্টা কলাবতী খুশির!      মনু তবু রহস্যপাঠের শেষ চেষ্টা করে। আন্তরিক সুরে বলে, বোঁদে, তুই টাকা কোথায় পেলি, সত্যি করে বল তো! মাইরি বলছি, আমি তোর খদ্দেরে ভাগ বসাবো না।        বোঁদে কিছু বলে না। মিটিমিটি হাসে। যেন বোঝাতে চায়, তোমরা যতটা বোকা আমাকে ভেবেছো, ততটা কিন্তু নই। এবার নিজের ব্যবসা সামলাও মনু। খুশি তোমার দোকান চৌপট করে দেবে। সে ব্যবসা বোঝে। একই প্লেটে হাজার লোক খেলে যদি তা নষ্ট না হয়, খুশি কেন হবে! ব্যবহারের আগে ভাল করে ধুয়ে নিলেই হয়! এমন কত হচ্ছে! কেবল টের পেলেই দোষ!      বোঁদে হাসে। হাসতেই থাকে! নির্মল নিপাট হাসি!   /ডিডি/

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি