ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৩:১২:৫১

হুমায়ূন বিশেষজ্ঞ

হুমায়ূন বিশেষজ্ঞ

আমাদের মশিউর ভাইকে শুধু ‘হুমায়ূনভক্ত’ বলেই বাক্য শেষ করা যাবে না। শেষ করলে সেটা হবে অন্যায়, অবিচার। সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে কী করতে হবে? ‘হুমায়ূনভক্ত’ বলার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ‘হুমায়ূনবিশেষজ্ঞ’ও বলতে হবে। এটা তার জোরালো দাবি। আর আমরা তার এই মামাবাড়ির আবদার টাইপের দাবি পূরণ করে আসছি ম্যালাদিন ধরে। তবে এই দাবি পূরণ করতে গিয়ে যা বুঝলাম তার সারমর্ম হচ্ছে, তিনি হুমায়ূনভক্তও নন, হুমায়ূনগবেষকও নন, হুমায়ূনবিশেষজ্ঞও নন। তিনি আসলে হুমায়ূনসমালোচক।            মশিউর ভাইয়ের সমালোচনার লক্ষবস্তু হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের কিছু বই। বইগুলো তিনি নিজের টাকা দিয়ে কিনেছেন, এমনটা ভুল করেও ভাবা যাবে না। হয় এগুলো বন্ধুদের কাছ থেকে এনে মেরে দিয়েছেন, না হয় এর-ওর কাছ থেকে গিফট পেয়েছেন। আর এই বইগুলোকেই যখন-তখন সহ্য করতে হচ্ছে তার সমালোচনার যন্ত্রণা। আমাদের একজন তো একদিন তাকে বলেই বসল হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে এই আজগুবি সমালোচনার দায়ে আপনাকে তিনি জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়তেন।            মশিউর ভাইয়ের সমালোচনার একটা বিশেষ স্টাইল আছে। স্টাইলটা মোটেই সুবিধার কোনো স্টাইল নয়। তবু এই স্টাইলটাকে তিনি চাপার জোরে ‘স্বকীয়তা’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। তো স্টাইলটা হচ্ছে, তিনি বইয়ের লেখা নিয়ে সমালোচনা করেন না। সমালোচনা করেন বইয়ের নাম নিয়ে। আসলে লেখা নিয়ে সমালোচনা করতে হলে তো পুরো বইটা পড়ে তবেই সমালোচনা করতে হবে। তার হাতে অত সময় কই? তাই নামের উপর দিয়েই কাজ চালিয়ে দেন। সাপও মরল, আবার লাঠিও আস্ত থাকল।            সেদিন ‘সবাই গেছে বনে’ বইয়ের নামটি নিয়ে একদম সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিলেন মশিউর ভাই। বললেন, তোমরাই বলো, সবাই যাওয়ার মতো বন কি এখন দেশে আছে? মানু সব বন ধংস করে ফেলেছে না? তবু বাদ দিলাম সেসব কথা। ধরলাম বনে গেলোই। কিন্তু সবাই বনে চলে গেলে বাড়িটা একেবারে খালি হয়ে গেল না? বাড়ি খালি রেখে সবার বনে যাওয়াটা কি ঠিক হলো? বাড়ির দারোয়ানটা অন্তত গেটে রেখে যেতে পারত! আমরা বললাম, দারোয়ান রেখে যায়নি, এমনটা কি কোথাও বলা আছে?               মশিউর ভাই বললেন, আলাদা করে বলা থাকতে হবে কেন? ‘সবাই গেছে বনে’ নামটা শুনে কী মনে হচ্ছে? মনে হচ্ছে দারোয়ানকেও প্যান্ট-শার্ট পরিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। এটা ঠিক নয়। কখন বাড়িতে চোর ডাকাত ঢোকে! উফ! নিজের বাড়ির প্রতি কেন যে মানুষের এই দায়িত্ববোধটুকু নেই! সবাই বনে যাওয়ার আগে দরজায় যে তালাটি মেরেছে, সেটি নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। মেড ইন চায়না তালা মেরে থাকলে কিন্তু সেটা খোলা চোরের জন্য ওয়ান টুর ব্যাপার।              ‘হিমু এখন রিমান্ডে’ নামটি নিয়ে বলতে গেলে নাক সিটকিয়েছেন মশিউর ভাই। তার বক্তব্য- এটা একটা কথা হলো? তিনি এতো বড় লেখক, তার উপন্যাসের নায়ককে রিমান্ডে নেওয়া হলো অথচ তিনি কোনো পদক্ষেপই নিলেন না। আরে বাবা, তার কি উচিত ছিল না হিমুকে রিমান্ডে নেওয়ার আগেই তাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করা? তিনি তো থানায় একটা ফোন করলেই হিমুকে ছেড়ে দিত। ফোনের কলরেটও তো বেশি না। নাহ্, হিমুর প্রতি এই অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। অন্তত আমার মতো সচেতনরা তো মেনে নিতে পারেই না।               ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’ বইয়ের নাম নিয়েও তার সমালোচনার শেষ নেই। তার কড়া জিজ্ঞাসা-  মেঘ কোথায় যাবে? মেঘের কি শ্বশুরবাড়ি আছে যে বেড়াতে যাবে? নাকি খালুর বাড়িতে বেড়াতে যাবে? আর মেঘ নাকি বলেছে যাবো যাবো। মেঘের ভাবটা এমন যেন সে যেতে চাচ্ছে কিন্তু ব্যস্ততার জন্য যেতে পারছে না। মেঘের আবার ব্যস্ততা কিসের শুনি! মেঘ কি নয়টা-পাঁচটা অফিস করে? নাকি নিজের কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালায়? তাহলে কিসের ব্যস্ততা মেঘের? বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিত না?              প্রায় প্রতিটা নাম নিয়ে সমালোচনা করেই মশিউর ভাই আমাদের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দেন। আমাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো বিসিএসের ভাইভা বোর্ডের প্রশ্নের চেয়েও কঠিন মনে হয়। আর তিনি সেটা অনুমান করতে পারেন আমাদের হাবভাব দেখেই। এটাও অনুমান করতে পারেন, আমরা তাকে জবরদস্ত জ্ঞানী মনে করছি। মনে করছি, তার মতো জ্ঞানী সচরাচর জন্মায় না। আমাদের এই মনে করাটাকে পাকাপোক্ত করতে তিনি আবার ফিরে যান সমালোচনায়। টেনে আনেন ‘হিমুর মধ্য দুপুর’ নামটিকে।              চেয়ারে হেলান দিয়ে মোড়লের ভঙ্গিতে বসতে বসতে মশিউর ভাই বলেন, আমি বুঝতে পারছি না হিমুর প্রতি কেন এমন অবিচার করা হলো। মধ্য দুপুর মানে বোঝো? ঠাঠা রোদ। ছাতা মাথায় দিয়ে বাইরে বের হলেও চান্দি গরম হয়ে যায়। অথচ লেখক এই মধ্য দুপুরেও হিমুকে বাইরে বের করে দিয়েছেন ছাতা-টাতা ছাড়াই। তোমরা বইটার প্রচ্ছদের দিকে তাকাও। তাকালেই দেখবে হিমুর মাথায় কোনো ছাতা নেই। কেন, একটা ছাতা কিনতে আর কয় টাকাই বা লাগে! এখন আশি-পঁচাশি টাকায়ই কত ভালো ছাতা পাওয়া যায়! নতুন ছাতা তিনি না হয় না-ই কিনলেন। তার বাসায় তো নিশ্চয়ই পুরনো ছাতা ছিল। ফেরত দেওয়ার শর্তে হিমুকে একটা ছাতা দিলে কী হতো?            আবারও সেই বিসিএসের ভাইভা বোর্ডের প্রশ্ন। আমরা মাথা নত করে ফেলি। কিন্তু এইটুকু নততে খুশি হন না মশিউর ভাই। তিনি চান আমাদের মাথা নত হতে হতে একেবারে মাটিতে গিয়ে বাড়ি খাক। আর সেই ইচ্ছেতেই তিনি পরবর্তী প্রশ্নের ক্ষেত্র তৈরির জন্য চলে যান পরবর্তী সমালোচনায়। তার এবারের টার্গেট ‘দারুচিনি দ্বীপ’। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে তিনি মুখটা পানসে বানিয়ে বললেন, মাংস আমিষ জাতীয় খাদ্য। কিন্তু সেই মাংস আমরা মাসে কয়দিন খাই?            আমরা বললাম, আপনিই বলেন। মশিউর ভাই বললেন, মাসে আমরা মাংস খাই একদিন বা দুইদিন। তাহলে আমরা দারুচিনি দ্বীপ দিয়ে করবোটা কী! দারুচিনি হচ্ছে গরমমসলা। এটা নিয়ে মাংস রান্না করে। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ নিয়ে না লিখে তিনি কাঁচা মরিচ দ্বীপ কিংবা গোলআলু দ্বীপ নিয়ে লিখতে পারতেন। কারণ, এই জিনিসগুলো আমাদের প্রতিদিন কাজে লাগে। সব খাবারে দিতে হয়। কাঁচা মরিচ দিয়ে আলুভর্তা বানিয়ে তো আমি রোজ খাই। কাঁচা মরিচে কিন্তু ভিটামিনও বেশি। ঠিক কিনা?              ভাইভা বোর্ডের এই প্রশ্নটা মনে হয় একটু সহজই হলো। আর এই সুযোগে আমাদের মুখপোড়া তৈমুর বলে উঠল, ভাই, আপনি যে বললেন কাঁচামরিচ আর গোলআলু নাকি সব খাবারে দিতে হয়, কথাটা কিন্তু ঠিক না। মনে করুন আপনার বাসায় লাচ্ছা সেমাই কিংবা পায়েস রান্না করল। সেখানে কি আপনি কাঁচা মরিচ আর গোলআলু দেবেন? দেওয়াটা কি উচিত হবে? তবু যদি দিয়েই ফেলেন, আপনার পরিবারের সদস্যরা কি ঘুষি মারার জন্য আপনার দিকে তেড়ে আসবে না?              প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন আসবে, এটা বোধ হয় ভাবতে পারেননি মশিউর ভাই। তাই তিনি একটা পরিপূর্ণ ঢোক গিলে বললেন, একটা গুরুত্বপূর্ণ কথার মধ্যে আরেকটা অপ্রাসঙ্গিক কথা ঢুকিয়ে দেওয়া খুবই অন্যায়। তোমরা ছোট মানুষ, জ্ঞান বুদ্ধি কম। কী আর বলবো। তবে ‘কী আর বলবো’ বললেও বলার বিষয় খুঁজে পেতে দেরি হলো না তার। তিনি কথা বলতে শুরু করলেন হুমায়ূন আহমেদের সেই বিখ্যাত উপন্যাস ‘কোথাও কেউ নেই’ নিয়ে। যা নাটক হিসেবেও প্রচারিত হয়েছে টিভিতে।            মশিউর ভাই ‘কোথাও কেউ নেই’ এর সমালোচনা করতে গিয়ে বললেন, সেই প্রাগৈতিহাসিক আমলের পরিবেশ নিয়ে কথা বললে তো চলবে না। সেই আমলে না হয় জনসংখ্যা কম ছিল, তাই কোথাও কেউ ছিল না। কিন্তু এখন সেই পরিবেশ নেই। এখন সব জায়গায় মানুষ গিজগিজ করে। ধরে নিলাম উপন্যাসটা অনেক আগের লেখা। আগে লেখা তো কী হয়েছে? রি-প্রিন্ট করার সময় নামটা পাল্টে দিলেই হতো। ‘কোথাও কেউ নেই’ এর পরিবর্তে লেখা যেত ‘সব জায়গায়ই কেউ না কেউ আছে’। এছাড়া...             মশিউর ভাইয়ের কথার গতিটা থামিয়ে দিয়ে সজীব বলল, কিন্তু ভাই, এই উপন্যাসে তো জনসংখ্যা নিয়ে কথা বলা হয়নি। তাহলে এই ধরনের নাম কেন দেওয়া হবে? এছাড়া আপনি এর আগে আরো যেসব সমালোচনা করলেন, সেগুলোও তো কেবল নাম নিয়ে। বইয়ের ভেতরে কী আছে সেটা না জেনে শুধু নাম নিয়ে মন্তব্য করাটা কি ঠিক? এবার খুব ভালোভাবেই ক্ষেপে গেলেন মশিউর ভাই- এই মিয়া, আমি কি তোমাদের মতো ক্ষুদ্র জ্ঞান নিয়ে চলি? আমাকে পুরো জিনিস পড়তে হবে কেন? আমার মতো জ্ঞানীর জন্য ইশারাই কাফি।             মশিউর ভাইয়ের এই হুম্বিতুম্বি দেখে আমি বললাম, ঠিকই বলেছেন ভাই, আপনার মতো জিনিয়াস লোককে পুরো বই পড়ে সমালোচনা করতে হবে কেন! তবে একটা অনুরোধ ভাই, আপনার এই জ্ঞানগর্ভ সমালোচনা যাতে পুরো জাতি পড়তে পারে, তাই চাচ্ছিলাম সমালোচনাগুলো কোনো পত্রিকায় ছেপে দিতে। দেবো নাকি? মশিউর ভাই এবার গলার স্বর নামিয়ে বললেন, পত্রিকায় আমার সমালোচনা ছাপা হলে কি সেটা  হুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের চোখে পড়বে? আমি বললাম, কেন বলেন তো?                মশিউর ভাই বললেন, না মানে তাদের চোখে পড়লে উল্টাপাল্টা সমালোচনা করার অপরাধে তারা আমার খবর করে দিতে পারে তো! আমি বললাম, তাহলে ধরে নেন তাদের চোখে পড়বে না। মনে করেন তারা বাসয় পত্রিকাই রাখে না। মশিউর ভাই বললেন, তাহলে ছাপতে পারো। তবে সমালোচনার জন্য তো বিল নিশ্চয়ই হয়? বলে দিও বিলটা যাতে ক্যাশে দেয়। ঠিক আছে?   লেখক : ইকবাল খন্দকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এ পর্যন্ত তার ৫৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পত্রিকায় লিখছেন। আগামী বইমেলায়ও তার কয়েকটি বই প্রকাশিত হবে।              /ডিডি/
ময়রা

এই ছেলের নাম বোঁদে কেন হল তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। বেঁটে মতোন দেখতে তাই বোঁদে, বোধবুদ্ধির বালাই নাই সে কারণে বোঁদে, কিংবা আরেকটু দুঃসাহসী হলে বলা যায়, সে অন্যের বাড়ি বয়ে গিয়ে মানুষের পাছায় বা পোঁদে বাঁশ প্রবিষ্ট করাতে বিশেষ দক্ষ বলে নিন্দুকেরা তার নাম দিয়েছে বোঁদে। আমার উদ্দেশ্য কারো নাম নিয়ে নামতাবিলাস নয়, বরং বোঁদের মতো মানুষ যে কেন বেঁচে আছে তাই নিয়ে ভাবছি। আমি নিশ্চিত, পুরো কাহিনি জানলে আপনিও সুখে-দুঃখে নির্বিকার দার্শনিকের মতো নিশ্চুপ বসে থাকতে পারবেন না।        টাঙ্গাইল যেতে এলেঙ্গা মোড়ে মনু ময়রার দোকানে সে কাজ করছে আট বছর। মনু ব্যবসা বোঝে। সে বেশ ভাল করেই জানে, আজকের বাজারে মাসে হাজার পাঁচেক দিয়েও বোঁদের মতো বিশ্বস্ত আর কর্মঠ লোক সে পাবে না। শুধু তাই নয়, রসগোল্লার পাক আর ছানার জিলিপির প্যাঁচ কষতে ওর মতো চৌকস আর কে আছে! মনুর দোকানের মিষ্টির স্বাদই আলাদা। দিনভর তার দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। নানান কিসিমের কাস্টমার মাছির মতো সারাক্ষণ ভনভন করে। মনু ময়রা ক্যাশ সামলাতে হিমশিম খায়। বাকি কাজ সব বোঁদেই করে থাকে। কেউ কেউ বলে, ওর হাতে নাকি জাদু আছে।       মনুর দোকানে সব রকম ক্রেতাসমাগম হয়। কাউকে সে নিরাশ করে না। লালমোহন, রসগোল্লা, মোহনভোগ, রসকদম, ছানার জিলিপি, ক্ষিরপুরি, মেওয়া-লাড্ডু, পানতুয়া, বালুশাহী, শাহীচুম্বন, কাঁচাগোল্লা এখানে সুলভে পাওয়া যায়। শুধু কি তাই, একেবারে নীচুতলার লোকেদের জন্য আছে বোঁদের বানানো ভেরি স্পেশাল এন্ড সস্তাদামের বোঁদে। বিশেষত রিকশাওয়ালা শ্রেণীর খদ্দেররা সকাল সকাল মনুর দোকানে এসে এক পেল্ট বোঁদের সাথে দুটো পরোটা মেরে দিয়ে কাজে বেড়িয়ে যায়।       সে গুটিগুটি বোঁদে বানাতে বিশেষ ওস্তাদ, এ কারণেও ওর নামকরণ ‘বোঁদে’ হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। সে যাই হোক, বোঁদের শ্রম-ঘাম আর নির্বুদ্ধিতাকে পুঁজি করে এই থানাশহরে বেশ রমরমা ব্যবসা ফেঁদেছে মনু ময়রা।     বোঁদের চেহারা মোটেও দৃষ্টিসুখকর নয়। বেঁটোখাটো গড়ন, খাঁদা নাক, গায়ের রঙ বেশ কালো। বাঁ পাটা খানিক ছোট তাই সামান্য খুঁড়িয়ে চলে বোঁদে। সস্তাদামের সিনথেটিক লুঙ্গিখানা ধুতির মতো মালকোঁচা মেরে ভোর ভোর কাজে নেমে পড়ে। বুদ্ধিটা অবশ্য মনুরই। লুঙ্গির খুঁট খোলা থাকলে পেলায় সাইজ জালায় ধরে রাখা মিষ্টির সিরকায় লোটাবে, নয়তো কাজের চাপে ওর ল্যাগবেগে বিশেষ যন্ত্রখানা বেরিয়ে পড়ে ডেঁপো ছেলে-ছোকরাদের গভীর কৌতুকের বিষয় হবে!      বলা বাহুল্য, শীত-গ্রীষ্ম সব সময় বোঁদের উর্ধ্বাঙ্গ খোলাই থাকে। চুলোর গনগনে আগুনে সে রীতিমতোঘামে, তাই শীতবোধ কী জিনিস বোঁদে জানে না। তাতে মনুর বরং খরচ বাঁচে। ফিবছর নতুন নতুন হাতঅলা গেঞ্জি কিনতে গুচ্ছের পয়সা খসাতে হয় না।    বোঁদে বোকা, তাতে কোন সন্দেহ নেই। একবার এক ঘটনা ঘটলো। মনু ময়রা বেশি মুনাফার লোভে দুধে পাউডার মিশিয়ে দিয়েছিল। গ্রামের গরুসমাজ সবুজ ঘাসের দাবিতে দুধপ্রদান কমিয়ে দিল। তাই দুধে গুঁড়ো না মিশিয়ে উপায় কি! ব্যবসা তো আর বসিয়ে রাখা যায় না! বোঁদেকে সে বলে নি যে ব্যাপারটা যেন পাঁচ-কান না হয়। তাতে দোকানের সুনাম নষ্ট হবে, খদ্দের কমে যাবে।     কপাল এমনই, ঠিক সেদিন শহর থেকে বড়সায়েবরা এলেন এলেঙ্গা রিসর্টে বেড়াতে। বিবি সাহেবার মিষ্টি ভীষণ পছন্দ। বাতিক বলতে পারেন। ওসব ডায়েটফায়েট তার একদম চলে না। মিষ্টি চাই। ভাল মিষ্টি। মিষ্টি লিবেন সাব! মনু ময়রার দোকানে যান। ছিঃ ছিঃ কষ্ট করে যাবেন কেনে! আমিই বরং এত্তেলা পাঠাচ্ছি। দামের সাথে বাড়তি কিছু ধরে দিলেই হল। একজন বলল, এরা অনেকটা ছুঁচোর মতো। সারাক্ষণ তক্কে তক্কে থাকে। মওকা বুঝে দালালি ফড়েগিরি করে বাড়তি দু’পয়সা কামায়।    সায়েব বিবিকে নিয়ে মনুর দোকানে হাজির। শহুরে কাস্টমার পেয়ে সে ভীষণ খুশি। হাঁকুনি পেড়ে বলল, এই বোঁদে, ভাল দেখে কিলোপাঁচেক মিষ্টি প্যাক করে দে তো! সায়েব বহুত দূর থেইক্কা আইছেন।    মনু খুশি তো বোঁদেও খুশি। এজন্যই লোকে তারে বোকা বলে! আরে হাঁদারাম, মিষ্টির দোকান দিয়ে মনুর দুই-তিনতলা বাড়ি হল, চেহারায় চটক এলো, তার বউ বাচ্চা বিয়োলো, তোর কী হল রে বেকুব! তুই ক্যান ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার লাহান দুই পা তুলে নাচস!    সে যে যাই বলুক, বোঁদে নিমকহারাম নয়। যার নুন সে খায়, তার গুণ গাইতে বোঁদে মোটেও কসুর করে না। মনু তার মা-বাপ। মনু ময়রা আছে বলেই না সে বেঁচে আছে। নইলে কবেই আচমকা আষাঢ়ের বেনোজলে ভেসে যেত!       কি রে, দুধ খাঁটি তো, নাকি পানি মিশিয়েছিস! সাহেব বললেন। মনু ময়রা এক বিঘত জিভ কেটে বলল, ছিঃ ছিঃ সাব, এ কি বলছেন! আপনারে জাইনা-শুইনা আমি ভেজাল জিনিস দিমু! এক্কেবারে খাঁটি দুধ সায়েব। এট্টুও মিশাল নাই।      বোকা বোঁদে সোৎসাহে মালিকের কথার পিঠে বলে, সে কি কতা স্যার! ভেজাল কেনে দিবো! আমার মালিক খুব সজ্জন মানুষ। দুধে সুস্বাদু গুঁড়া মিলাইয়া মিষ্টিতে বাহার আনছেন। লিয়ে লন সাব। বাসায় গিয়া চেটেপুটে খাইবেন!   অ্যাঁ, কী বললে! গুঁড়া মিলাইছে! পাউডার মিল্ক! হারামজাদা! তোদের ধরে পুলিশে দেয়া উচিত। দুধেও ভেজাল! শালা, দেশটা ভেজালে ভেজালে সয়লাব হয়ে গেল! মিষ্টি না নিয়ে বরং জেলের ভয় দেখিয়ে সায়েব চলে গেলেন।      এর পরের ঘটনা খুব সহজেই অনুমেয়। মনু মালিক, বোঁদে চাকর। বোঁদের বোকামোর জন্য তার চরম বেইজ্জতিই শুধু না, পাঁচকিলো মাল দোকানে পড়ে থাকলো। এই রাগে ওর চুলে মুঠি ধরে ইচ্ছেমতো ঝাঁকালো মনু। শালা বোকার হদ্দ! তোর মতো আচ্ছা বেকুবের পাল্লায় পড়ে আমার সব গোল্লায় যাবে রে! ভিটেয় ঘুঘু চরবে!    এই আমাদের বোঁদে। এলেঙ্গা রোডের মনু ময়রার দোকানের খাস কামলা। দিনভর মিষ্টির মাঝে থেকেও যার জীবনে তেতোস্বাদ একটু গেল না। এমনই আসলে হয়! ভারবাহী গাধা জীবনভোর চিনির বস্তা বয়েই যায়, একদানা চিনি কখনও চেখে দেখার ফুরসত পায় না।      সময়ের সাথে সাথে বোঁদের জীবনে পরিবর্তন আসে। তবু তার পেশাবদল হয় না। মনু ময়রা কাঁচাটাকা চুষে-চিবিয়ে দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে, বোঁদেও বাড়ছে। তবে আখেরে নয়, স্রেফ ঘাড়েগর্দানে। বোঁদে ইদানিং কেমন যেন উরু উরু, কাজেকর্মে মন নেই তার। মনু বুঝতে পারে, প্রকৃতির নিয়মে ওর এখন নারীর ছোঁয়া চাই। তলানি মিষ্টি আর মুখে রোচে না বোঁদের।   মনু ময়রা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, কি রে বোঁদে, বিয়ে করবি! মন বড় উচাটনঅইছে, তাই না রে! জানিস তো, ঘর বাঁধতে দড়ি, আর বিয়ে করতে কড়ি লাগে! কত জমিয়েছিস? তাতে হবে!     বোঁদেও হাসে। মনে মনে সে মনিবের তারিফ করে। মনু তার মনের কথা ধরে ফেলেছে। লোকটা অন্তর্যামী নাকি! বুঝলো কি করে বোঁদের এবার বউ চাই!    ঠিক আছে, হবে! তুই মেয়ে দ্যাখ। আমি তোর বিয়ের খরচ দেব, মনু বলল। তবে একখান শর্ত আছে। বিয়ার পর কিন্তু বউরে নিয়া ভাগবার পারবি না। আমার দোকানে তোর কাম করতে আইবো। কিচ্ছু ভাবিস না, মিঞা-বিবির সংসারে যাতে চোট না লাগে সেইমত টেকা বাড়াইয়া দিমু। তুই আমার আপন লোক বোঁদে। তোরে কি আমি কষ্টে রাখতে পারি! মনু ময়রা যেন দয়ার সাগর, বিনয়ের অবতার! এই না হলে মনিব। ভীষণ খুশি বোঁদে।     খুব একটা খুঁজতে হয় না। মেয়ে পাওয়া যায় সহজেই। গাঁও গেরামে সোমস্ত মেয়েকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর মতো বাপ আর কই! ছেলের পিছে খরচ করলে বেশি লাভ। বুড়ো বয়সে ছেলেরাই দেখে। মেয়ে থাকে তার সোয়ামির সংসারে!      যথাসময়ে মনু ময়রার চেষ্টা তদবিরে বোঁদের বিয়ে হয়। মেয়ের নাম খুশি। স্বভাবে একটু চাপা, তবে চেহারা মন্দ নয়। গায়ে গতরে আছে, পেটে বিদ্যেও একেবারে খালি নয়। সেভেন ক্লাস অব্দি পড়েছে খুশি। বোঁদে খুশি, ওর বউ খুশিও খুশি।     বোঁদের কাজে এখন আগের চেয়ে ঝোঁক বেশি। মনু ময়রার প্রতি তার কৃতজ্ঞতার যেন শেষ নেই। নিজের ছেলের মতো দাঁড়িয়ে থেকে মনু তাকে বিয়ে করিয়েছে। ছাতি-লাঠি, হাতঘড়ি, দুপাখি জমিও সে পেয়েছে শ্বশুরের তরফে। সম্বন্ধী বলেছে, খুশির সাথে আচরণ ভাল করলে বোঁদের চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে ভিটের উপর ঘরও একখানা বঁধিয়ে দেবে। তাছাড়া অবরে-সবরে কলাটা-মুলোটা তো থাকছেই।   যাচ্ছলে! ভাগ্য বোঁদের ভালই বলতে হবে। এ যেন রাজ্যসহ রাজকন্যে!        দিন ভালই যাচ্ছিল। মনু ময়রার নোকর হয়ে কেটে যাচ্ছে বোঁদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু খুশি স্বভাবে চাপা হলেও আখের গোছাতে জানে। একরাতে রিরংরাজনিত ক্লান্তি কেটে গেলে খুশি ওর গলা জড়িয়ে বলল, দেখো বোঁদে, পরের দোকানে জনমভর খাটবে এ কিন্তু আমার ইচ্ছে নয়। আড়ালে-আবডালে লোকে আমারে গাধি বলে! তুমি যে গাধার মতো পরের বোঝা বয়ে বেড়াও!    তুমি কী বলবার চাও খুশি? বোঁদে বাধ্য ছেলের মতো বউয়ের গলা জড়ায়। বটবৃক্ষের ন্যায় পায়ে পায়ে শিকড় বেঁধে পুনর্বার ডানা ঝাঁপটায়। নারীতে উপগত হয়ে ক্রমাগত ক্রিয়াশীল হয়। এ এক অন্য রকম শিহরণ। অল্পতে তেষ্টা মেটে না! বারবার ভেজাতে মন চায়।       তুমি নিজে একখান দোকান দিলে হয় না! কাজকাম তো ভালই জানো। খুশি বোঁদেকে গভীর আশ্লেষে বেঁধে ওর ঘেমো বুকে মুখ ঘষতে থাকে। এও নারীর এক কলা বৈ কি! পুরুষের কাছে নিজেকে অত্যাবশ্যক প্রমাণের মোক্ষম সময়! শ্রেণী, শিক্ষা বা দেহমাধুর্য নির্বিশেষে নারীকুল এ কৌশল বোধ করি বেশ ভালই জানে! রীতিমতো পারঙ্গম!      কিন্তু পয়সা কোথায় পাবো! মেলা পুঁজি লাগে দোকান দিতে! বোঁদে নিজের স্ত্রীকে অক্ষমতার জানান দেয়। এত টাকা তার নেই। হবেও না কোনদিন! তাই নিজে দোকান দেবার কথা সে স্বপ্নেও ভাবে না।   খুশি এত সহজে নিরাশ হয় না। সে কলাবতী মেয়ে। উদ্দেশ্য হাসিলের সব রকম কলাকৌশল তার জানা!         খুশি বোঁদের পুরুষ্টু ঠোঁটে আগ্রাসী ছোবল মেরে বলল, সে ভার আমার। তুমি জায়গা দেখো। দোকান তোমার হবেই হবে।      এরপর আরো কিছুদিন যায়। খুশিকে নিয়ে কানাঘুষো শোনা যায়। গাঁয়ের মাতব্বর রমজান আলী মনু ময়রার পার্মানেন্ট কাস্টমার। প্রায়ই সে মনুর দোকানে এসে গোপালভোগ চাখে। বোঁদের সাথে খোশমেজাজে বাতচিৎ করে। যেন সম্পর্কে তারা ভায়রাভাই। এই মাতব্বরকে ঘিরেই কানাঘুষোর জাল বিস্তৃত হয়। কানেমুখে কথাটা মনু ময়রার কানেও পৌঁছায়। আর যাই হোক, সে বোঁদের খারাপ চায় না।    একদিন বোঁদেকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, বোঁদে, তুই শুনিস নি কিছু? চিরকাল তুই বেকুবই রয়ে গেলি! বোকা গাধা কোথাকার!     বোঁদে ফ্যালফেলে চোখে তাকায়। সত্যিই সে কিছু বুঝতে পারে না। মনু অবশ্য এর বেশি ভাঙে না। বেচারা বোঁদে কষ্ট পাবে। বোকাসোকা মানুষ! ঘটে যার বুদ্ধি আছে তার জন্য ইশারাই কাফি। খোঁটাপিটা খেয়ে দিব্যি শুধরে যায়। কিন্তু বেকুব বোঁদের কোন রকম বোধোদয় হয় না। খুশিকেন্দ্রিক ফিসফিসানি আরো জোরালো হয়। তবে বিষয়টা এমন যে হাঁক পেড়ে কাউকে বলাও যায় না। আর পেছনে যদি মাতব্বর খোদ রমজান আলী থাকে তবে তো কোন কথাই নেই!   শুধু রমজান কেন, শোনা যায়, পাশগ্রামের টাকাঅলা দু’চারজনেরও খুশির ঘরে অবাধ যাতায়াত! শালা বোঁদে এসব চোখে না দেখুক, শুনতে তো পায় নাকি! অকালকুষ্মাÐ একটা!           পাড়ার ডেঁপো ছেলেরা এ বিষয়ে রসের ঝাঁপি খুলে বসে। কিন্তু যাকে নিয়ে এতসব কাÐ সেই খুশির কিন্তু কোন হেলদোল নেই। সে দিব্যি আছে। বোঁদেও কিছু খারাপ নেই।             মনু ময়রা শেষমেশ স্বীকার করে, বোঁদের মতো মহাবেকুব মানুষ যে জীবনে দেখে নি! নিজের বউকেও সে বশে রাখতে পারে না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তারপরও ব্যাটা মফিজ কোন স্টেপ নিল না! বলি হারি যাই ওর খুশিপ্রেম! প্রেমে অন্ধ একেবারে! কানামোনা যাকে বলে!    কিন্তু তখনও বোধ হয় গাঁয়ের মানুষের জানার কিছু বাকি ছিল। মনু ময়রার ঘোরতর শত্রæ গোপনে কোথাও বেড়ে উঠেছে সে খবর মনু রাখছে কি!     ঠিক ছ’মাস বাদে এক সকালে বোঁদে বলল, আমি আর কাজ করুম না ভাই। নিজে দোকান দিমু। মনু ময়রা বোধ হয় ‘দেশে আর কোনদিন লোডশেডিং হবে না’ শুনলেও এতটা আশ্চর্য হতো না! বোঁদে এ কী বলছে!   মনু শ্লেষ্মারুদ্ধ ঘর্ঘরে স্বরে বলল, পেট গরম হয়েছে তোর! নাকি ভূত দেখেছিস! দোকান দিবি, টাকা  পাবি কোথায়!  সে আমার আছে। বোঁদে জানালো। সে আরো জানায়, দোকানের জায়গা কেনা হয়ে গেছে। শহর থেকে মিষ্টি সাজানোর র‌্যাক, রেকাবি, খামির-খুন্তি, হাঁড়িপাতিল-কড়া আসছে খুব শিগগিরই। এ কাজে খুশি ওর সহযোগী হবে।      মনু ময়রার চোখে পলক পড়ে না। বুঝতে পারে, বোঁদে এবার সত্যি মালিক হবে। দোকান মালিক! পেছনে কেরামতি কার! ভ্রষ্টা কলাবতী খুশির!      মনু তবু রহস্যপাঠের শেষ চেষ্টা করে। আন্তরিক সুরে বলে, বোঁদে, তুই টাকা কোথায় পেলি, সত্যি করে বল তো! মাইরি বলছি, আমি তোর খদ্দেরে ভাগ বসাবো না।        বোঁদে কিছু বলে না। মিটিমিটি হাসে। যেন বোঝাতে চায়, তোমরা যতটা বোকা আমাকে ভেবেছো, ততটা কিন্তু নই। এবার নিজের ব্যবসা সামলাও মনু। খুশি তোমার দোকান চৌপট করে দেবে। সে ব্যবসা বোঝে। একই প্লেটে হাজার লোক খেলে যদি তা নষ্ট না হয়, খুশি কেন হবে! ব্যবহারের আগে ভাল করে ধুয়ে নিলেই হয়! এমন কত হচ্ছে! কেবল টের পেলেই দোষ!      বোঁদে হাসে। হাসতেই থাকে! নির্মল নিপাট হাসি!   /ডিডি/

স্বপ্নের উপাদান

অনেকদিন পর সুখ-স্বপ্নময় নির্ঘুম একটি রাত কাটালো লাল মিয়া। যৌবন তার ভাটির দিকে। তবু শরীরের অটুট গঠন আর তাকত যে এখনো তার ফুরিয়ে যায়নি গতকাল আবার সেটা প্রমাণ হয়েছে। গৌরবর্ণের এই মানুষটির নাম তার বাপ-মা কেন যে, লাল মিয়া রেখেছিল তা হয়তো লাল মিয়ারও অজানা। পরের বাড়িতে বদলি খেটে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে-পুড়ে গায়ের রঙ এখন তামাটে। দু’চারটে চুলে পাকও ধরেছে। ফসলের মাঠে মাটির সঙ্গেই তার যত কাজ। হয়তো এ কারণেই প্রকৃতিও তাকে আপন করে নিয়েছে। না হলে এত পরিশ্রম আর অসম আহার-বিহার করার পরও মধ্য চলি­শের ঘরে বসে এতটা নিরোগ ও বলিষ্ঠ স্বাস্থ্যের অধিকারী থাকে কি করে! অন্তত কুড়ি-বাইশজন যুবা-বুড়া কামলার কেউই সাহস করেনি মাঠে পাওয়া এই সম্ভাব্য সোনার ডিব্বাটি নিজের দখলে নিয়ে যায়। সবাই লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছে কেবল। কারো সাহস হয়নি এর হিস্যা চাওয়ারও। এমন কি যে আবু তাহের নিজে দৌড়ে গিয়ে জিনিসটি কুড়িয়ে এনেছে সে-ও সেটা খুলে পর্যন্ত দেখেনি। অবশ্য লাল মিয়াও এখনো তা খুলে দেখেনি কি আছে তাতে। তবে এতে যে কোনো গুপ্ত-সম্পদ রয়েছে এবং এ সম্পদ যে তার এই পোড়া কপালের ভাগ্য বদলে দিতে পারে এ ব্যাপারে সে অনেকটাই নিশ্চিত। আশঙ্কা কেবল গ্রামে এটা ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়ে গেলে না আবার অনাকাক্সিক্ষত ফ্যাসাদে পড়তে হয়। গ্রামের নাম ঠনঠনিয়া। ঠনঠনিয়া বিলের পাশেই এর অবস্থান। বৃহত্তর মোমেনশাহীর নেত্রকোণা-কিশোরগঞ্জ আর সিলেটের হবিগঞ্জ-সুনামগঞ্জের মিলনস্থলটা একটা বিশাল জলাধার বললে ভুল হবে না। ধেনু গাঙ-এর মত বিশাল নদী যেমন আছে তেমনি বহু হাওড়-বাওড় ও বিলঝিল রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই নিন্মাঞ্চলটিতে। এর মধ্যেও বিশাল মাছের পিঠের মত জেগে আছে স্থলভাগ। শুষ্ক মওসুমে জেগে ওঠে বিশাল ফসলের মাঠ আর বর্ষায় পানি থৈ থৈ। বন্যায় বাড়ি-ঘরেও পানি ওঠে। দুর্ভোগ বাড়ায় খেটে খাওয়া মানুষদের। তবু এসবের সাথে যাদের আজন্ম পরিচয় তারা কি আর ডরে? মোটেও না, এ যেন তাদের জীবন-যাপনেরই একটা অংশ। চির সখ্য তাদের পানির সঙ্গে। পানি নেমে গেলে গ্রামবাসী দল বেঁধে নেমে যায় মাঠে। ফসল বুনে। প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট অনিষ্ট থেকে রক্ষাও করে তা। ঘরে না ওঠা পর্যন্ত স্বস্তি আসে না কৃষক পরিবারে। ঠনঠনিয়া গ্রামটা যদিও অনেক উঁচুতে তবু বর্ষায় এর সমস্ত ফসলের ক্ষেতই তলিয়ে যায়। অধিক বৃষ্টি আর উজানের ঢল নামলে তো বাড়িঘরও তলায়। এ গ্রামেও তাই ত্রি-ফসলী জমি নেই বললেই চলে। দ্বি-ফসল বা এক ফসল। তাও তো যাদের পর্যাপ্ত জমি আছে। বেশিরভাগ মানুষের জমি-জিরাত আছে নামমাত্র। দাদার আমলের দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোররাই এখন ভূঁইয়ের একচেটিয়া মালিক বলা যায়। কৃত্রিম সেচ বা নিষ্কাসনের ব্যবস্থা না থাকায় আগের দিনের কৃষকক‚ল খরায় বন্যায় সর্বস্বান্ত হয়ে যেত। আর দ্বারস্ত হত মহাজনের। তাদের ঋণের দায়ে একে একে জমাজমি সব ওই মহাজন শ্রেণীর হস্তগত হয়। ফলে গরিব আরো গরিব আর পয়সাওয়ালা সুদী মহাজনরা হয়ে ওঠে জোতদার। সাবেকী জোতদারের সংখ্যাও এখানে অনেক কম। ফলে খেটে খাওয়া কামলা মজুরের সংখ্যাই এ গ্রামে বেশি। শিক্ষা-দীক্ষা সভ্যতা-ভব্যতা তাদের খুব একটা তাড়িত করে না। বড়জোর গ্রামের প্রাইমারী স্কুল। স্বল্পসংখ্যক জমিনদারদের জন্যই ওসব বিলাশ। অন্যরা অঘোষিত সেবক তাদের। তাই গ্রামের মানুষ বলা যায় এ দুটি শ্রেণীতেই বিভক্ত। লাল মিয়া ওই কামলা শ্রেণীরই একজন। গাঁয়ে তার পরিশ্রমী কামলা হিসেবে সুনাম আছে। তাই কাজের মওসুমে তার কদর বেড়ে যায় বহুগুণে। অনেক জোতদারই চায় তাকে পুরো সিজনের জন্য বুকিং দিতে। ফলে রেট বেড়ে যায়। এবার যেমন কাশেম মেম্বার তাকে সিজন চুক্তিতে নিয়েছে। ফজরের আযান শুনে সুখস্বপ্নের ঘোর কাটে লাল মিয়ার। সে বুঝতেই পারে না রাতটি নির্ঘুম কেটেছে নাকি স্বপ্নময় ঘুমে। চোখ দুটো জ্বলতে শুরু করেছে। আযান শুনে আজ ফজরের নামায পড়তে সিদ্ধান্ত নেয় মনে মনে, যদিও সে জুমার নামায ছাড়া নিয়মিত নামায পড়ে না। এমন ভাবনার মাঝেই পাশ ফিরে শোয় সে এবং যথারীতি ঘুমিয়ে পড়ে। নামায পড়া আর হয়ে ওঠে না। ঘুম ভাঙে অনেক বেলা করে। উঠোনে তখন রোদ বেশ তাপ ছড়িয়েছে। তবু তার মনে হয় ঘুমের অভাব রয়েছে। আড়মোড়া ভেঙে বিছানায় ওঠে বসে। বেমালুম ভুলে যায় কাশেম মেম্বারের ক্ষেতে কাজে যাবার কথা। বউ দু’তিনবার ডাকাডাকি করে তার গভীর ঘুম ভাঙাতে না পেরে মনে করেছে হয়তো শরীর খারাপ। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে। খানিকটা না হয় ঘুমিয়েই কাটাক। প্রাতঃক্রিয়া সেরে বদনা হাতে যখন সে ওঠোনে আসে তখনই দেখা হয় কাশেম মেম্বারের সঙ্গে। নিশ্চয়ই কাজে না যাওয়ার ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছে। কিন্তু কাশেম মেম্বার এ ধরনের কোনো প্রশ্ন না করে গভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। অবাক হয় লাল মিয়া। সে নিজেই কিছু বলতে যাচ্ছিল এ সময় মুখ খুলে কাশেম মেম্বার। কিরে আলাদীনের চেরাগ পাইছিস শুনলাম। কাম কাজ বুঝি আর করতে অইবো না? তা গুপ্তধনের ডিব্বাটা আমার ক্ষেতেই পাইলি অথচ আমারে তুই জানানোর গরজটাও দেখালি না! মনে হয় একলাই ভোগ করবি সব? বিড়ি খাওয়া ময়লাযুক্ত দুর্গন্ধময় দাঁত বের করে হাসে লাল মিয়া। কি যে কন মেম্বার সাব! আমগো গরিব মাইনষের আঙ্গুল ফুইলা কি আর কলাগাছ অইবো! শরীরটা ভাল­াগছে না। যামু, এহনই ক্ষেতে যামু কামে! বইবেন নাহি? বইতে আসি নাই। আনতো দেহি, কি পাইছোস কালকে! লাল মিয়া বুঝলো মেম্বারের নজর পড়েছে পাওয়া জিনিসটায়। গোপন থাকার বিষয় নয়। মাঠের কামলা-মজুররা সবাই দেখেছে। মেম্বারের কানে যেতে কতক্ষণ। তাই ক্ষেতের কাজে না যাওয়ার কসুরের চেয়ে গুপ্ত-সম্পদের লোভটাই তাকে কামলা-বাড়ি টেনে এনেছে। শেষ চেষ্টা করে লাল মিয়া বলেÑ আপনেও যেমুন কতা কন! কি পাইমু, একটা খালি গুঁড়া দুধের ডিব্বা! আমি এইটা খুইলাই দেহি নাই। তাইলে আন দেহি তোর খালি দুধের ডিব্বা! সবাই কইল কাইল বিকালে সেই যে কৌটা নিয়া বাড়িতে হান্দাইছস, আর নাকি বার হস নাই! কই নাই শইলডা খারাপ! খালি দুধের কৌটা, পুলাপানে খেইলা কই ফালাইছে কে জানে! মেম্বারের মনে এবার সন্দেহ গাঢ় হয়, চোখে জ্বলে ক্ষোভের অনল। রুক্ষকণ্ঠে বলে ওঠে লাল মিয়া! তুই আমারে দুধের পোলা পাইছোস! সাত-পাঁচ বুঝাইবার চাস? আমার জমিনে পাওয়া সম্পদ তুই একলা ভোগ করবি আর আমি চাইয়া চাইয়া দেখুম! কই লুকায়া রাখছোস বাইর কর, নইলে খারাপ অইব কইলাম! সকালবেলার খালি পেট। ক্ষুধায় এবং রাগে তার শরীর কাঁপে। তবু মেম্বারের মত গর্জে ওঠতে পারে না। অনেকটা শীতল গলায়ই মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে বলে পাইছি, সাত রাজার ধন, মানিক রতন! আমি পাইছি, আফনারে দিমু ক্যান? মেম্বার রাগ আর সামলাতে পারে না। হুংকার ছেড়ে বলেÑ কেন দিবি সেইটা বার করুম নে। আমি এহন গেলাম; নসিবে খারাবি আনতে না চাইলে জিনিসটা নিয়া বাড়িতে দিয়া আইবি। ভালয় ভালয় দিলে তোরে না দিয়া খামু না। নইলে...! কথা শেষ করে না মেম্বার। ‘নইলে’ শব্দটা দাঁত কিড়মিড় করে এমনভাবে উচ্চারণ করে যেন তাতেই লাল মিয়া ভস্ম হয়ে যাবে। মেম্বার চলে গেলে লাল মিয়া ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে কতক্ষণ। ডিব্বাটা যে সে নিজেই এখনো খুলে দেখেনি কি আছে তাতে! সে এটা খুলে দেখার চেয়ে নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে রাখাটাই প্রথমকর্ম স্থির কর। **শেষ শরতের রোদমরা বিকেলে অন্য কামলা-মজুরদের সাথে মেম্বারের ধান ক্ষেতে নিড়ানি দিচ্ছিল সে। চারদিকে সবুজ ধান ক্ষেত। উত্তর-পূর্ব কোণে বিশাল ঠনঠনিয়া বিলে স্বচ্ছকালো পানি। নীচে সবুজের চাদর আর সুনীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। এইতো ঠনঠনিয়া গ্রামের এ সময়ের চিরচেনা দৃশ্য। লাল মিয়া আপন মনে নিড়ানি দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ। শব্দের প্রচণ্ডতায় উপরে তাকায় সবাই। বেশ নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক যানটি। বিশাল পাখার  ঘূর্ণন এমন কি দরজা-জানালা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে দেখে সবাই। তাদের মাথার উপরে যখন এটি- ঠিক তখনি কি একটা জিনিস হেলিকপ্টার থেকে নিচে পড়তে দেখা যায়। অনেকদিন আগে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে এরকম উড়োজাহাজ থেকে এটাসেটা ফেলা হত। বন্যার সময় একবার খাবারের প্যাকেট ফেলা হয়েছিল। জন্মনিয়ন্ত্রণের উপদেশসহ লিফলেট ফেলেছিল। লাল মিয়া অন্তত এইটুকু জানে, উপর থেকে যা-ই নিচে ফেলানো হোক না কেন তা কোন না কোন কাজের জিনিসই হবে।জিনিসটা চোখের সামনে ধান ক্ষেতেই পড়ল। চারদিক থেকে ছুটে আসছে মাঠে কাজেরত কিষাণ-কামলারা। এবার গর্জে ওঠে লাল মিয়াÑ কেউ ধরবে না এইটা! আবু তাহেরের কাছে পড়ায় ততক্ষণে সে এটা তুলে হাতে নিয়েছে। অন্যেরা কাড়াকাড়ির জন্য ছুটে এলেও লাল মিয়ার গর্জনে ভয়ে বোকার মত হাসতে লাগল। কেউ কেউ বললাম দে, ওস্তাদরে দিয়া দে।আবু তাহের গুঁড়া দুধের ডিব্বা সদৃশ চকচকে নতুন কৌটা খুলতে চেষ্টা করেনি। দু’বার শুধু ঝাঁকি দিয়ে চেষ্টা করেছে কি আছে তা বোঝার জন্য। লাল মিয়ার ধমকে সে অপরাধীর মত মুখ করে ফিরিয়ে দেয় জিনিসটি।রতন মাস্টার সেদিক দিয়েই যাচ্ছিল। জটলা দেখে ছাতাটা বগলের তলায় চেপে দাঁড়িয়ে পড়লেন গোপাটে। পাখির কলকাকলির মত কলকল ধ্বনিতে সবাই সমস্বরে মাস্টারের কাছে বয়ান করল ঘটনা। লাল মিয়া কেবল বুকে আগলে ধরে আছে ডিব্বাটি। বিস্মিত সবাই মাস্টারের মুখের দিকে চেয়ে থাকে, মাস্টার কি বলে তা শোনার জন্য। মাস্টার গম্ভীর মানুষ। সকলের জিজ্ঞাসু চোখের দিকে চেয়ে বললেন, মূল্যবান কিছুও তো হতে পারে, তোমরা আবার এ নিয়ে ঝগড়া করো না।মাস্টারের কথায় অনেকেরই চোখ চকচক করে ওঠলেও না পাওয়ার বেদনা মনের গভীরে খোঁচাতে থাকে। তবে মুখে তা প্রকাশ করে না। * * বিষয়টা এত জটিল আকার ধারণ করবে তা কল্পনায়ও ছিল না লাল মিয়ার। পুরো গ্রাম এখন দু’টিভাগে বিভক্ত। কাশেম মেম্বার আর লাল মিয়া দু’দলের নেতৃত্বে। সম্পদ যাই থাক অন্যে ভাগ পাক বা না পাক কিষাণ-কামলা শ্রেণী সবাই লাল মিয়ার দলে আর বিত্তবান জোতদার শ্রেণীর সাথে সখ্যতার সুবাদে তারা কাশেম মেম্বারের দলে। কাশেম মেম্বারের ধারণা ওটাতে গুপ্তধন আছে এবং এই সময়ের মধ্যে হয়ত লাল মিয়া তা লুকিয়েও ফেলেছে। তার এমন ধারণার পক্ষে যুক্তিও আছে। অনেকেই তাকে বলেছেÑ চোরাচালানের কোন অবৈধ চালান যা আকারে ছোট হলেও খুবই মূল্যবান, হতে পারে তা সোনার অলংকার, বার, বিস্কিট বা এ জাতীয় কিছুÑ ধরা পড়ে যাবার ভয়ে বিমান থেকে নিচে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালানীদের দ্বারা এমনটা হতেই পারে। এমন সম্ভাবনা তার মনে বদ্ধমূল হবার পর সে লাল মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লেগেছে। অন্যদিকে লাল মিয়াও মেম্বারের এহেন তৎপরতা দেখে অনুমান করতে পারছে যে এতে নিশ্চয়ই এমন মূল্যবান কোন সম্পদ রয়েছে যা তার ভাগ্য খুলে দিতে পারে। এ নিয়ে সারা গাঁয়ে যখন তোলপাড় তখন ক’জন সমাজদরদী এর সমাধানে আয়োজন করেছে সালিশের। পুরো গ্রামের লোকজনের সিদ্ধান্ত মতে রায় হবে কে এটার মালিক হবে। তার আগে সকলের সামনে তা হাজির করতে হবে এবং কি আছে তা জানতে হবে। তেমন কিছু হলে লাল মিয়া ও কাশেম মেম্বারকে কিছু অংশ দিয়ে বাকিটা সমাজকল্যাণমূলক কোন কাজে লাগানো হবে। কিছু ক্লাব, সংগঠন আর সমাজপতিরা এ নিয়ে খুচরো দেন-দরবারও চালিয়ে যাচ্ছে। লাল মিয়া ডিব্বাটি তার বাড়ির আঙিনায় কোন এক গোপন স্থানে পুঁতে রেখেছে। এ ব্যাপারে সে এতটাই সচেতন যে তার স্ত্রী-পরিজনেরও কাউকে জানায়নি কোথায় তা লুকিয়ে রেখেছে। লেখাপড়া না জানলেও জমি চষতে গিয়ে সোনার ঘড়া পাওয়া কৃষক ও তার বোকা স্ত্রীর গল্প সে শুনেছে। তাই তার এ সতর্কতা।লাল মিয়া চকচকে অ্যালোমিনিয়ামের ডিব্বাটি পাওয়ার পর থেকেই স্বপ্ন দেখে আসছেÑ এই বুঝি তার ভাগ্য খুলে যাচ্ছে। লাল মিয়া সত্যিই এবার লাল হয়ে যাবে এমন কথা গ্রামের লোকজনের মুখেও শোনা যায়। অতএব লাল মিয়া তা ভাবতেই পারে। সে ভাবে তার অভাব নিয়ে। পয়সা-কড়ির অভাবে বড় মেয়েটার বিয়ের নামও নিতে পারছে না। বয়স আঠার-ঊনিশ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় মেয়েটারই তো জন্ম গতবারের আগের বড় পানির সময়। লাউয়ের ডগার মত শত অভাবের মাঝেও মেয়ে দুটি কেমন তিরতির করে বড় হয়ে গেছে। গাঁয়ের যা পরিবেশ, কখন কোন অঘটন ঘটেÑ এ আশঙ্কায় কাটে তার দিন। এমনিতেই পাশের বাড়ির ছমিরুদ্দিনের পোলাডা কিছুদিন ধরে তার বাড়ির আশপাশে ঘুর ঘুর করে। অকারণে শিশ দেয়, গানে টান মারে। কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে তার মেয়ের দিকে। লাল মিয়ার ভয়ে এখনো পাড়ার ছেলে-ছোকরারা যদিও ইজ্জতের ওপর আক্রমণের সাহস দেখায়নি তবু সে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। কারণ নিজের সন্তানের ওপরই আস্থা রাখা যায় না। একদিন সন্ধ্যায় তো ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে নিজের মেয়ে ফুলবানু আর ছমিরুদ্দিনের পোলা বশারকে ফিসফিসিয়ে  কিসব বলাবলি করতেও দেখেছে। তখন থেকেই হুঁশিয়ার হয় লাল মিয়া। ইজ্জত খোয়ানোর ভয় আর শঙ্কায় নিজের ভেতরটা তোলপাড় করতে থাকে। ছিন্ন বসনে মেয়েটার বাড়ন্ত শরীর বুঝি বা আর ধরে রাখা যায় না। তার চেয়েও গরীব ঘরের একটা কর্মঠ ছেলের কাছে মেয়েটাকে তুলে দিতে গেলেও কম করে হলে দশ পনের হাজার টাকা দরকার। কোথায় পাবে সে এত টাকা? দুটো গরু কিনে বড় করেছিল মেয়ের বিয়ের জন্য। কিন্তু এবারের বন্যায় যখন নিজেদেরই বসবাসের সংস্থান নেই তখন পানির দামে গরু দুটি বিক্রি করে দিতে হয়। সেই টাকাও বন্যার অভাবে কিছুটা খরচ হয়ে গেছে। এখন দুটো বাছুর কিনে নিলে হয়তো বছর দুয়েকের মধ্যে একটা ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু এতদিনে কি হয় কে জানে! হয়ত মেয়েদুটোর কপাল গুণেই হাতে এসেছে এই গুপ্তধনÑ ভাবে লাল মিয়া।কথিত গুপ্তধনের ডিব্বাটা পাওয়ার পর লাল মিয়ার ভাবনারাও শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে থাকে। যদি এমন হয় যে এতে প্রচুর সোনার গয়না রয়েছে তাহলে দুই কন্যা আর তার বউকে কিছু অলংকার দিয়ে বাকিটা বিক্রি করে মেয়েদের বিয়ে দেয়াসহ তার অভাব মোচনের একটা হিলে­ হয়। কিন্তু কাশেম মেম্বার যেভাবে লেগেছে তাতে না আবার তার আশার গুড়ে বালি মিলে * *ঠনঠনিয়া গ্রামের মানুষ বহুদিন এত বিশাল সালিশ প্রত্যক্ষ করেনি। সকাল থেকেই মতি মোড়লের বাড়ির আঙিনা লোকজনে ভরে যায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে লোকজন আরও বাড়তে থাকে। পূর্বঘোষিত সময়ে মাতবর-সমাজপতিদের সকলেই উপস্থিত না হওয়ায় বিলম্ব হচ্ছে। পুরো গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই ছুটে এসেছে লাল মিয়ার গুপ্তধন পাওয়ার সংবাদে। কি গুপ্তধন পেয়েছে সেটা না কি লাল মিয়া স্বীকার করছে না। এবার দেখি ব্যাটা লুকিয়ে রাখে কি করে!রমজান মাতবর, তমসুর ডাক্তার (পল­ীচিকিৎসক ও ফার্মেসী মালিক), রতন মাস্টার থেকে শুরু করে ফটকা জালাল, গরুর দালাল জাহেদালীসহ কেউই বাদ নেই। মোটামুটি যার যার প্রভাব ও প্রতিপত্তি অনুযায়ী আসন অলংকৃত হয়েছে। বাকীরা দুর্বাঘাসের পিঁড়িতে আয়েশ করে বসে পড়ে। সালিশের বাদী-বিবাদীর চেয়ে দর্শক-শ্রোতা তথা আয়োজক সমাজপতিদেরই যেন গরজ বেশি। এসব বুঝেই হয়তো রাতের অন্ধকারে কাশেম মেম্বার গিয়ে হাজির হয়েছিল লাল মিয়ার কুটিরে। প্রস্তাব রেখেছিল সততার সাথে সমান ভাগ হবে, সালিশের প্রয়োজন নেই। আমরা আপস করে ফেলেছি, জানিয়ে দিলেই হল।রাজি হয়নি লাল মিয়া। গ্রামবাসীকে সাত-পাঁচ বুঝিয়ে কাশেম মেম্বার মানাতে পারলেও তার সে ক্ষমতা নেই। বরং পুরো গ্রামের মানুষের কাছে সে আরও ছোট হয়ে যাবে।সালিশ বৈঠকে বেশি সময় লাগেনি লাল মিয়ার মুখ থেকে সত্য বের করতে। কোথায় লুকিয়ে রেখেছে গুপ্তধনের ডিব্বাটি তাও জেনে গেছে। বিশ্বস্ত চার জোয়ানকে পাঠানো হল পুঁতে রাখা ডিব্বাটি নিয়ে আসতে। যাতে সালিশে নিয়ে আসার আগে কেউ সেটা খুলে না ফেলে তা তদারকির জন্য গেল রতন মাস্টার। সাথে লাল মিয়া ও কাশেম মেম্বারও যায়। সময় লাগে না বেশি। অল্পক্ষণ পরেই তারা এটি উদ্ধার করে নিয়ে আসে জমায়েতের সামনে। ডিব্বা খুলার আগে নেতৃস্থানীয়দের সাথে ফুসুর-ফাসুর করে সালিশের রায় ঘোষণা করে রমজান মাতবর। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাপ্ত সম্পদের তিন ভাগের একভাগ সমান অংশ করে পাবে লাল মিয়া ও কাশেম মেম্বার, বাকি দু’ভাগ সমাজকল্যাণে সমাজপতিদের মাধ্যমে ব্যয় হবে।এবার ডিব্বা খোলার পালা। সবাই উৎকর্ণ হয়ে আছে কি আছে এতে জানার জন্য। কোন ধমক বা নির্দেশ ছাড়াই পিনপতন নীরবতা নেমে আসে জমায়েতে। রমজান মাতবর তাহের মিয়ার গামছা দিয়ে ডিব্বার গায়ে লেগে থাকা ধুলোমাটি পরিষ্কার করে নেয়। তারপর জমায়েতকে উদ্দেশ করে বলেÑ আপনারা সবাই দেখুন, কৌটা খোলা হচ্ছে। তারপর চাবির রিং থেকে একটা বড় চাবি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুব কায়দা করে খুলে ফেলে ডিব্বার মুখ। মাথা নীচু করে একই সাথে পাঁচ-সাতজন সালিশদার ঝুঁকে পড়ে দেখতে যায় ডিব্বার ভেতরের সম্পদ এবং প্রায় সাথে সাথেই ‘ওয়াক থু’ বলে কেউ কেউ বমিই করে দেয়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা উৎকট দুর্গন্ধে আশপাশের সকলেই নাক চাপা দিয়ে ধরে। পাঁচদিন আগের মানুষের মলের গন্ধে ভারি হয়ে পড়ে আশপাশের বাতাসও। রমজান মেম্বার দু’হাতে ছুড়ে মারে ডিব্বাটি অপেক্ষাকৃত ময়দানের দিকে। সেটি গিয়ে পড়ে শুয়ে থাকা এক কুকুরের গায়ে। ঘেউ ঘেউ শব্দে বকে প্রতিবাদ জানিয়ে কুকুরটি লেজ গুটিয়ে সরে যায়। ছেলে ছোকরাদের অনেকেই ছুটে যায় ডিব্বার কাছে। কিন্তু দুর্গন্ধে খুব নিকটে যাওয়া বাদ দিয়ে তারা খিলখিল করে হাসতে থাকে।‘কি আছে, কি পেল’ হৈচৈয়ের মাঝে সমবেত জনতা জেনে যায় আসল ঘটনা। অনাকাক্সিক্ষত বস্তু পেয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় মাতবররা চুপ। হাসির গমকে অনেকের দম বন্ধ হবার উপক্রম। হাসি নেই মাতবরদের মুখে, কাশেম মেম্বার আর লাল মিয়ার মুখে। মাতবরদের বিকৃত গম্ভীর মুখের দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে কাশেম মেম্বারÑ জুচ্চোর, জালিয়াত! লালু গেরামের সব মানুষের মুখে চুনকালি দিয়েছে, তার উচিত বিচার হওয়া দরকার!নির্বাক নিশ্চল লাল মিয়া। অজানা উত্তেজনায় কাঁপছে তার পা। কোনমতে একটা ঢোক গিলে ধরা গলায় বলেÑ বিশ্বাস করেন আফনেরা, আল­াহর কসম, আমি এইটা খুইলা দেহি নাই!কাশেম মেম্বার আরও ক্রুদ্ধ হয়ে লাল মিয়াকে গালিগালাজ করতে থাকে। শালা ছোটলোকের বাচ্চা, ভিতরের জিনিস সরিয়ে এই অপকর্ম করেছে! ওকে আচ্ছা করে পেটালেই মাল বেরিয়ে আসবে!লাল মিয়ার চোখে রক্ত এসে যায়। ইচ্ছে করে মেম্বারের গালে কষে একটা চড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব নয়, পরেও হবে না। কারণ এই রাগটা পরে আর অবশিষ্ট থাকবে না হয়ত।দুরন্ত গ্রাম্য বালকরা তখন লম্বা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে ডিব্বার রহস্য উৎঘাটন করে চেঁচাতে লাগলÑ হে. হে. হি. হি, গু, গু পাইছে ডিব্বায়!লাঠির গুঁতোয় বেরিয়ে আসে মল মোছা টয়লেট পেপার। অনেক চিৎকার চেঁচামেচি, কানাঘুষা, হাসাহাসির পর বুদ্ধিমান মাতবররা এই সিদ্ধান্তে আসে যে এ বিষ্ঠা দু’একদিনের নয় বরং বিষ্ঠাশুদ্ধই এটি পড়েছে হেলিকপ্টার থেকে। তাছাড়া লাল মিয়ার টয়লেট পেপার ব্যবহার করার কথা নয়। তবু যদি দেখা যায় অল্পসময়ের ব্যবধানে লাল মিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক অস্বাভাবিক পরিবর্তন এসেছে তাহলে না হয় আবার বসা যাবে। লাল মিয়া তো আর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে না, তার বিচার যে কোন সময় করা যাবে।পরিবেশ শান্ত হয়ে এলে সালিশের লোকজন যে যার পথে চলে যায়। চেয়ার, বেঞ্চ, মোড়া, জলচৌকি, পিঁড়ি, পাটি এসব গুটিয়ে নিচ্ছিল মাতবর বাড়ির দু’জন তরুণ কামলা। রাগে গজরাতে গজরাতে চলে গেল কাশেম মেম্বারও। মলযুক্ত খোলা টিনের কৌটাটি পড়ে আছে রাস্তার ধারে। আশাহত লাল মিয়া তাকিয়ে থাকে ওই বস্তুটার প্রতি যা কিছুক্ষণ আগেও তার কাছে ছিল অপার আশাজাগানিয়া এক মূল্যবান ধন। গভীর একখানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। মাছের চোখের মত নিষ্পলক চোখে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। মাতবর বাড়ির শূন্য উঠোনে থেকেও যেন তার মন অন্যকোন নতুন স্বপ্নের ঠিকানা খোঁজে ফিরে। নয় বছরের একমাত্র ছেলেটার ডাকে সে সম্বিত ফিরে পায়।: বাপজান, চল বাড়ি যাই গা!ছোট ছেলের মাথায় হাত রাখে লাল মিয়া। টলতে টলতে পা বাড়ায় বাড়ির পথেÑ হ, চল! যাই গা।লেখক: সাংবাদিক ও কথাশিল্পী।  

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি