ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, || আশ্বিন ৮ ১৪২৮

ইতিহাসের পটভূমিকায় বঙ্গবন্ধু

আনিসুজ্জামান

প্রকাশিত : ১৫:৫৯, ১ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট: ১১:২১, ৫ আগস্ট ২০২১

পাকিস্তান-আন্দোলনের কালে মুসলিম লীগের মূল কথাটা এই ছিল যে, ভারতীয় মুসলমানেরা এক জাতি- তাদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাই। লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়েছিল দুটি রাষ্ট্র চাই। জাতি এক, তাহলে রাষ্ট্র দুই কেন? 

বোধহয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। পরে দিল্লিতে মুসলিম লীগ লেজিসলেটরদের সম্মেলনে বলা হলো, না, দুই রাষ্ট্র নয়, এক রাষ্ট্রই হবে। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন ফজলুল হক; দু’রাষ্ট্রের জায়গায় এক রাষ্ট্রের প্রস্তাবক ছিলেন সোহরাওয়ার্দী। পরে এদের দু’জনকেই পাকিস্তানিবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ।

ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দানের প্রতিশ্রুতি বয়ে নিয়ে এসেছিলেন মাউন্টব্যাটেন। যখন তিনি দেখলেন, মুসলিম লীগ ভারতকে খণ্ডিত করতে বদ্ধপরিকর, তখন তিনি বললেন, তাহলে পাঞ্জাব ও বাংলাও ভাগ করতে হবে। জিন্নাহ চমকে উঠে বললেন, সে কী করে হয়? বহু শতাব্দী ধরে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে পাঞ্জাবি ও বাঙালিরা একই ঐতিহ্য বহন করে এসেছে, এদের ভাগ করা যায় কী করে? 

মাউন্টব্যাটেন বললেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওই দোহাই তো অন্যেরা গোটা ভারতবর্ষ সম্পর্কেই দিচ্ছে। ভারত ভাগ হলে পাঞ্জাব ও বাংলাও ভাগ হতে পারে- নয়তো কোনটাই ভাগ হবে না। অগত্যা জিন্নাহ রাজি হলেন।

তখন মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম একদিকে আর কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণশঙ্কর রায় অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানের বাইরে অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্রের প্রস্তাব করলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ বাঙালির আলাদা রাষ্ট্র হতে হবে সকল ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে। জিন্নাহ নাকি আপত্তি করেননি, গান্ধীও চেষ্টা করে দেখতে বলেছিলেন। 

পরে উভয়েরই মত ঘুরে গিয়েছিল। জিন্নাহকে বোস-সোহরাওয়ার্দী ফর্মুলার বিরুদ্ধে বুঝিয়েছিলেন নাজিমউদ্দিন-আকরম খাঁ, গান্ধীকে সরদার প্যাটেল। কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা এসেছিল হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে থেকে। তিনি বলেছিলেন অখণ্ড বঙ্গে হিন্দুর স্বার্থ বিপন্ন হবে, তার চেয়ে বঙ্গভঙ্গই ভালো। তাই হলো।

কিন্তু যারা এতদিন বলে আসছিলেন যে, ভারতীয় মুসলমানেরা এক জাতি তাদের কেউ হিন্দু-মুসলমান মিলিত বাঙালির কথা বললেন কেমন করে? বোধহয় তার প্রধান কারণ, তখনই প্রথমবারের মতো একথা স্পষ্ট হয়েছিল যে, ভারতীয় মুসলমানেরা এক জাতি হলেও তারা একটি রাষ্ট্র গঠন করতে যাচ্ছে না- ভারতে মুসলমান থেকে যাবে, পাকিস্তানে হিন্দু থেকে যাবে- যাকে বলে জনসংখ্যার বদল, তা হবে না। 

সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের যুক্তবঙ্গের পরিকল্পনায় ভারতীয় মুসলমানের এক-জাতিতত্ত্বের ধারণা প্রথমবারের মতো পরিত্যক্ত হয়।

বাকিটা করে দিলেন জিন্নাহ স্বয়ং। পাকিস্তান গণপরিষদের উদ্বোধন করতে গিয়ে জিন্নাহ- একই সঙ্গে কায়েদে আজম, গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি, মুসলিম লীগের প্রধান- বলে দিলেন যে, এখন থেকে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না, মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না- সকলে হবে পাকিস্তানের নাগরিক। ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক থাকবে না। সব ধর্মের মানুষ মিলে পাকিস্তান জাতি গড়ে তুলবে। 

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারতীয় মুসলিম লীগের সর্বশেষ অধিবেশনে এই মনোভাব থেকে সোহরাওয়ার্দী প্রস্তাব করেছিলেন যে, পাকিস্তান অর্জিত হওয়ার পরে আমাদের রাজনৈতিক দলের দ্বার অমুসলমানদের জন্যে উন্মুক্ত করা দরকার। তার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি, জিন্নাহ বোধহয় বিরক্তই হয়েছিলেন, কেননা তিনি ভারতে মুসলিম লীগ রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিলেন।

কিন্তু অখণ্ড বঙ্গের প্রস্তাবে এবং গণপরিষদে জিন্নাহর উদ্বোধনী বক্তৃতায় দ্বি-জাতিতত্ত্বকে যে বিদায় দেওয়া হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। জিন্নাহ আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী, মুসলিম কথাটা বাদ দিয়ে। সোহরাওয়ার্দী অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন, কিন্তু সার্বভৌম অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনা করা সত্ত্বেও বাঙালির স্বতন্ত্র স্বার্থের কথা কতটুকু ভেবেছিলেন, তা দুষ্কর। 

অবশ্য তার ভ্রাতুষ্পুত্রী শায়েস্তা ইকরামুল্লাহ ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বলেছিলেন, পূর্ববাংলার মানুষ অনুভব করে যে, ওই অঞ্চলকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবু রাষ্ট্রভাষা ইত্যাদির প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর মনে অনেক সংশয় ছিল।

এই সংশয় থেকে মুক্ত হয়েই কেবল নতুন জাতিসত্তার বিকাশ ঘটতে পারতো। সেই বিকাশের সম্ভাবনা প্রথম দেখা দেয় ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনে। শেখ মুজিবুর রহমান এই আন্দোলনের এক নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। পাকিস্তান-আন্দোলনের কর্মী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠার পরে মোহমুক্তি ঘটতে তার সময় লাগেনি। 

পূর্ব বাংলার মানুষ যে ন্যায্য সম্মান ও প্রাপ্য সুবিধা লাভ করছে না, সেকথা অনুভব করেছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাকে সভাপতি করে যখন মুসলিম লীগ বিরোধী নতুন রাজনৈতিক দল আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন আরও একজন নেতারূপে দেখা দিলেন শেখ মুজিব। তারা শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে তুললেন, আন্দোলনের জোয়ার বইয়ে দিলেন এবং ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগকে উচ্ছেদ করতে বড় ভূমিকা পালন করলেন। ১৯৫৫ সালে তারাই আওয়ামী মুসলিম লীগকে আওয়ামী লীগে রূপান্তরিত করলেন।

মুসলিম লীগের নেতারা আঁকড়ে ধরে রাখলেন ধর্মীয় পরিচয়- রাজনীতিতে সুবিধে করার জন্য ধর্মের ব্যবহার করে চললেন। ১৯৪৩-এ, ১৯৪৬-এ, ১৯৪৭-এ জিন্নাহ একাধিকবার বলেছিলেন, পাকিস্তান ধর্মীয় রাষ্ট্র হবে না। তার মৃত্যুর পরে তার সহকর্মীরা পাকিস্তানকে ইসলামী রাষ্ট্র বানাতে বদ্ধপরিকর হলেন এবং ১৯৫৬ সালে দেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র হলো। আওয়ামী লীগের রাজনীতি বরাবরই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর স্বায়ত্তশাসনের দাবির পথ নিয়েছিল। 

তারা দেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেন নি, তবে অন্তত একটি কাজ করেছিলেন- তা হলো পূর্বাঞ্চলে যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এক্ষেত্রে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইনসভায় সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিব দু’জনেই স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী একটা বড় ভুলও করেছিলেন। একে পূর্ববাংলা শোষিত হচ্ছিল, তার ওপরে তিনি মেনে নিলেন সংখ্যাসাম্যের নীতি। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের সংখ্যাধিক্যও আর পাকিস্তানে স্বীকৃত হলো না।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে আসসালামু আলাইকুম বললেন, কিন্তু তারপর তার ও শেখ মুজিবের পথ আলাদা হয়ে গেল। তিনি নিখিল পাকিস্তান ভিত্তিতে দল গড়লেন, সমাজতন্ত্রের কথা বললেন, জোর দিলেন পররাষ্ট্রনীতির ওপরে এবং এই শেষ সূত্রে গণতন্ত্র-অপহরণকারী আইয়ুবের পক্ষ সমর্থন করলেন। 

শেখ মুজিব ক্রমেই প্রদেশে তার নেতৃত্ব ও সংগঠন সংহত করলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা বললেন, সংখ্যার গুরুত্ব-প্রতিষ্ঠার দাবি জানালেন এবং জোর দিলেন স্বায়ত্তশাসনের ওপরে- এই শেষ সূত্রে তিনি উপস্থাপন করলেন ৬-দফা। আইয়ুব তার উত্তর দিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তৈরি করে। ওতেই কাজ হলো। শেখ মুজিবকেই মানুষ পূর্ববাংলার একমাত্র স্বার্থরক্ষক হিসেবে দেখল। ছাত্রেরা ৬-দফাকে ১১-দফার অন্তর্ভুক্ত করে আন্দোলনে নামল। মওলানা ভাসানীও সে আন্দোলন সমর্থন করলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব বিদায় নিলেন, শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হলেন।

এমন যে হতে পারল, তার কারণ বঙ্গবন্ধুর একাগ্রতা। বিশ্বাস না করে তিনি কোন কথা বলেননি, যা বলেছেন তা যথাসাধ্য পালন করেছেন: ভয়ে বা লোভে পড়ে আপস করেন নি। ৬-দফার পক্ষে জনসভা করতে গিয়ে এমন জায়গা নেই যেখানে তিনি গ্রেফতার হননি। আজ যশোর, কাল খুলনা, পরশু রাজশাহী, তার পর দিন সিলেট, তারপরে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম। গ্রেফতার হয়েছেন, জামিন পেতে যে সময়টুকু অপচয় হয়েছে তারপর আরেক জায়গায় ছুটে গেছেন।

আবার গ্রেফতার হওয়া, জামিন পাওয়া, অন্যত্র ছুটে যাওয়া। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরিণাম কী হতে পারত, আমরা জানি না। এটুকু জানি যে, আইয়ুব তাকে শাস্তি দিতে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাতে ভীত হননি। শেষ পর্যন্ত তিনি টিকে গেলেন, বিদায় নিতে হলো আইয়ুবকে। আইয়ুবের উত্তরাধিকারীরা পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে না মেনে পারেনি। তবে এর চেয়ে বেশি মানতে রাজি হয়নি তারা- তাদের কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে মুজিব দাঁড়িয়েছিলেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিঘ্ন সৃষ্টির বহু চেষ্টা হয়েছিল। মওলানা ভাষানীও ভোটের আগে ভাত চেয়েছিলেন, ব্যালট বাক্সে লাথি মানতে বলেছিলেন। ২৩ বছরে পাকিস্তানে একবারও সাধারণ নির্বাচন হয়নি, একথা মনে রাখলে নির্বাচন না-চাওয়া বিস্ময়কর মনে না হয়ে পারে না। নির্বাচন হলো এবং বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেন। তার সমালোচকেরা বলল, এবারে তিনি আপস করবেন। আপস হয়নি। 

সারা পৃথিবী সংগ্রামের এক নতুন রূপ দেখেছিল। সেদিন এ সংগ্রামে সারাদেশের মানুষ তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স ৫০ বছর। তার চেয়ে বর্ষীয়ান ও অভিজ্ঞ নেতা অনেক ছিলেন দেশে। মানুষ কিন্তু বঙ্গবন্ধুকেই তাদের নেতা বলে, তাদের স্বার্থের রক্ষক বলে জেনেছিল। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অন্তত মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। তার সমালোচকেরা বলল, তিনি কেন তৈনি হননি? দেখা গেল, মানুষ নীরবে আক্রমণ মেনে নিল না। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলেন। তার সমালোচকেরা বলল, তিনি ধরা দিলেন। আবার তার প্রাণসংশয় হলো। তিনি দমলেন না। আন্তর্জাতিক চাপে এবারে তিনি ছাড়া পেলেন।

যুদ্ধের ৯ মাস তিনি অনুপস্থিত, কিন্তু তার প্রেরণা ছিল সর্বক্ষণ। সাতই মার্চে তার বক্তৃতা সর্বদেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতার একটি। ওই বক্তৃতায় মানুষ স্বাধীনতার ডাক শুনতে পেয়েছিল এবং যারা প্রস্তুত হওয়ার তারা প্রস্তুত হচ্ছিল। তার প্রভাব এত সর্বব্যাপী ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানের সঙ্গে আপস করার চেষ্টা যারা করেছিল তারাও তার নাম ব্যবহার করেছিল।

বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে মানুষের কাছে আত্মত্যাগ দাবি করলেন, তখন বিপুল সাড়া পেতে তার বিলম্ব হয়নি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে তিনি হাত দিয়েছিলেন, অল্প সময়ে এর অবকাঠামো উদ্ধার করেছিলেন, সংবিধান রচনা করেছিলেন, সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছিলেন।

কিন্তু সময়টা আর আগের মতো ছিল না। অস্ত্রের ব্যবহার নাগরিক সমাজকে বদলে দিয়েছিল, রাজনীতির ধরনটাই পালটে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং পরিণামে সব কিছুর মূল্য বৃদ্ধি পেল, পাটের চাহিদা কমে গেল।

মানুষের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ ঘটলো না। দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র শুরু হলো বাংলাদেশকে ঘিরে। বামপন্থি ও দক্ষিণপন্থিরা আদাজল খেয়ে লাগলেন, পরস্পর বিরোধী দাবিতে রাজপথ মুখর হতে থাকল। কেউ চায় পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচার; কেউ চায় পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনে যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি। 

কেউ চায় ঘাতক-দালালের বিচার; আবার দালাল আইন প্রত্যাহার না করলে আন্দোলন করবেন বলে স্বয়ং মওলানা ভাসানী ঘোষণা করলেন। ... যে খোন্দকার মোশতাক যুক্তফ্রন্টের আমলে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের কালে বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছিলেন, তাকে তিনি বিশ্বাস করলেন ...। পাকিস্তান-ফেরত প্রায় সকল সেনা-অফিসারকে তিনি পুনর্বহাল করলেন, এমনকি পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য যাদের মজ্জাগত তেমন সামরিক-বেসামরিক আমলাদেরও।

কিন্তু ১৯৭৫-এর পনের আগস্ট তার এবং নারী ও শিশুসহ তার পরিবারের উপস্থিত সব সদস্যকে নির্মমভাবে যে হত্যা করা হয়েছিল সে হত্যার কারণ এর কোনটাই নয়। যারা তাকে হত্যা করেছিল, তারা পাকিস্তানের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চেয়েছিল। 

তাই যে তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে একবছর আগে বিদায় নিয়েছিলেন, তাকেও কারাগারে প্রাণ দিতে হয়েছিল। ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছিল পাকিস্তান- যদিও বাংলাদেশ আজও ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়ে ওঠেনি, কিন্তু ১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্টের পরে আমরা সেদিকেই যাত্রা করেছি। ধর্মনিরপেক্ষতা গেল, বাঙালি জাতীয়তাবাদ গেল, সমাজতন্ত্র গেল আর গণতন্ত্র? তার পরের ১৫ বছর তো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের অধীনে কাটল আর এককালের গণতন্ত্রের প্রধান অবদান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল ও ব্যক্তির পুনর্বাসন। 

এখন ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হয়েছে: বায়তুল মোকাররমের খতিব বলছেন, গাদ্দাররা পাকিস্তান ভেঙ্গেছিল; এরশাদের ঝাড়ুদার হুঙ্কার দেয়, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানি মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাদের দোসররা দাবি করছে ইসলামি সংবিধান। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথে আজও আইনের বাধা রয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিকার হতে পারে কেবল এদের প্রতিরোধ করে। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিষ্ঠুর হত্যার বিচার হওয়া প্রয়োজন ছিল আইনের শাসনের স্বার্থে, সভ্যতার স্বার্থে। তবে যে বাংলাদেশ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার যে চার নীতি তিনি সংবিধানে স্থাপন করেছিলেন, তাকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কোন পথ নেই, আমাদেরও মুক্তি নেই। আমরা যদি এ কাজ করতে না পারি তাহলে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয়বার মৃত্যু ঘটবে।

বাংলাদেশের জন্যে সংগ্রাম করার শাস্তি দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে এবং তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের। তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে ইতিহাস থেকে। যতই বিকৃত করার চেষ্টা হোক না কেন, বাংলাদেশের ইতিহাস আছে। সরকারি ছাপা বইতে সে ইতিহাস নেই, তা আছে মানুষের স্মৃতিতে এবং হৃদয়ে। সেখানেই আছেন বঙ্গবন্ধু, সেখানেই থাকবেন চিরকাল- ইতিহাসের সৃষ্টিরূপে এবং স্রষ্টারূপে।

(লেখাটি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু গ্রন্থ থেকে নেয়া)

লেখক: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক ছিলেন।
এএইচ/
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি