ঢাকা, মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯, || কার্তিক ২৮ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ইন্দ্রপাত

অন্নদাশঙ্কর রায়

প্রকাশিত : ০০:১৪ ২০ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট: ০০:১৬ ২০ আগস্ট ২০১৯

বারো বছর আগে জার্মানি থেকে ফেরার পথে আমার বিমানসঙ্গী ছিলেন চট্টগ্রামের ইস্পাহানি সাহেব। সেকালের নাম করা বণিক ইস্পাহানির পুত্র। ফ্রাঙ্কফুট থেকে আমরা লুফট-হানসার বিমানে উঠি ও পাশাপাশি আসনে বসি।

‘ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে পার্টিশন একটা সর্বনাশা ব্যাপার। আমাদের কারবার ছিল প্রশস্ত পরিধিজুড়ে। তাকে টুকরো টুকরো করতে হয়েছে। পুর্ব পাকিস্তানের ভার পড়েছে আমার ওপরে। ওইটুকু গণ্ডীর ভেতরে প্রসারণের পরিসর কোথায়?’ তিনি আপসোস করেন।

অর্থনীতির প্রসঙ্গ থেকে আমরা রাজনীতির প্রসঙ্গে আসি। তিনি বলেন, ‘আইয়ুব খান যে বেসিক ডেমোক্র্যাসি প্রবর্তন করতে যাচ্ছেন তার ফল ভালো হবে না। মাত্র ৮০ হাজার জন ভোটার। টাকা ছড়িয়ে ৪১ হাজার জন ভোটারকে হাত করা অতি সহজ। আইয়ুব চান চিরস্থায়ী হতে।’

আমি জিজ্ঞাসা করি তার নিজের মতে কী করা উচিত। তিনি এর উত্তরে বলেন, ‘রাজনীতিকদের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলেই হয়। আগেকার মতো প্রত্যক্ষ নির্বাচনে যারা জিতবেন তারাই সরকার চালাবেন।’

‘কিন্তু সরকার চালাবার মতো যোগ্য লোক কি পূর্ব পাকিস্তানে কেউ আছেন?’ আমার নিজের মনেই সংশয় ছিল।

‘কেন? শেখ মুজিবুর রহমান।’ তিনি নিঃসংশয়ে রায় দেন।

‘শেখ মুজিবুর রহমান কি পারবেন একটা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হতে?’ আমি তার সম্বন্ধে সন্দিহান ছিলুম।

‘কেন পারবেন না? তাকে একটা সুযোগ দিলে ক্ষতি কী?’ তিনি শেখ মুজিবকে চিনতেন ও তার ওপর আস্থাবান ছিলেন।

ইস্পাহানি বাঙালি নন। মুজিব বাঙালি। কিন্তু লক্ষ্য করলুম তার মধ্যে প্রাদেশিকতা নেই। তার কারণ বোধহয় তিনি ইরান দেশের আগন্তুক। পাকিস্তানি নাগরিক হলেও তার মানসিকতা পূর্ব পাকিস্তানি সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে। কলকাতাতেই তিনি ভালো ছিলেন। হিন্দু ... তিনি পছন্দ করেননি।

‘আপনার সঙ্গে কলকাতা অবধি গিয়ে সেখান থেকে অন্য ফ্লাইটে চট্টগ্রাম যাওয়াই আমার পক্ষে সুবিধের। আমি ব্যবসায়ী মানুষ। আমার সময়ের দাম আছে। কিন্তু ওরা কি সেটা বুঝবে? নিয়ম করে দিয়েছে করাচিতেই রাতের মাঝখানে নামতে হবে। করাচি থেকেই ফ্লাই করতে হবে ঢাকায়। সেখান থেকে চট্টগ্রামে। একটা দিন নষ্ট। আর রাতের ঘুমটাও।’ তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তখন থেকেই আমার জানা যে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের অদ্বিতীয় নেতা। পরে একদিন তার আরও এক প্রকার পরিচয় পাই। আমার এক বন্ধুপুত্র ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে কাজ করতেন। কিছুকাল তাকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনে নিযুক্ত থাকতে হয়। সেখান থেকে বদলি হয়ে এসে আমাদের তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিব ভারতের কাছে অস্ত্র চেয়েছিলেন। আর মুক্তিসৈনিকদের ভারতের মাটিতে তালিম। পণ্ডিত নেহেরু সম্মত হন না।’

আমি তা শুনে তাজ্জব বনে যাই। মানুষ কী পরিমাণ মরিয়া হলে সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা করে! আইয়ুব খান মুজিবকে মুখ্যমন্ত্রী হতে না দিয়ে কোন পথে ঠেলে দিচ্ছেন? তখতে বসিয়েছেন কিনা মোনায়েম খানকে। ময়মনসিংহে থাকতে একদিন ওকে আমার আদালতে বসে থাকতে দেখেছিলুম। মিনিস্টার চেহারা। দারুণ কমিউনাল বলে ওর দুর্নাম। হয়তো সেইটেই ওর যোগ্যতার মাপকাঠি।

আইয়ুব খানের পতনের পর শেখ মুজিবের সুদিন আসে। বেসিক ডেমোক্র্যাসি পরিত্যক্ত হয়। প্রত্যক্ষ নির্বাচন পুনঃপ্রবর্তিত হয়। সাবালকদের সবাইকে ভোটের অধিকার দেওয়া হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতে মুজিবের দলের জয়জয়কার। শতকরা ৯৯টা আসন কোন দল কবে কোন দেশের ইতিহাস পেয়েছে? মুজিবের তো সারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা।

সেই সময়ে কতকগুলো গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি হয় ঢাকায়। একটি ছাত্রের বাড়ি ঢাকায়। সে পড়ে শান্তিনিকেতনে। তাকে পাঠাই বই কিনে আসতে। সে বই নিয়ে আসে। উপরন্তু আনে কয়েকটি রেকর্ড। আমাকে বাজিয়ে শোনায়, কিন্তু হাতছাড়া করে না। রেকর্ড শুনে আমি চমকে উঠি। পাকিস্তান সরকার বার করতে দিচ্ছে অমন সব রেকর্ড। তাতে শেখ মুজিবের বজ্রকণ্ঠ। কণ্ঠে বিদ্রোহের সুর। পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা। সে কী উন্মাদনাভরা গান! গেয়েছে তরুণ-তরুণীরা। আবার যেন সেই ১৯০৫ সালের স্বদেশী আমল ফিরে এসেছে। লোকে পাকিস্তানের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্য পাগল। যে বাংলাদেশ তাদের একান্ত আপনার।

আজ বাদে কাল রাম রাজা হবেন, কিন্তু তা তো হবার নয়। তেমনি শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। তার বদলে তিনি পশ্চিম পাঞ্জাবের এক দুর্গম স্থানে হলেন রাজবন্দি। যখন ফিরে এলেন তখন তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। আমার সেই রেকর্ড শোনার বারো মাসের পরেই রেডিওতে তার সংবর্ধনার বিবরণ শোনা। তার ভাষণ শোনা। রামের মতো তিনি ফিরে এলেন পুষ্পক বিমানে।

তিনি যে প্রাণ নিয়ে ফিরে এলেন এতেই আমরা কৃতার্থ। কারণ তার প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়েছিল। ঢাকায় পাকিস্তানি ফৌজ আত্মসমর্পণ না করলে, রাতারাতি ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ না করলে, পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে মুক্তি দিয়ে লন্ডনে পাঠিয়ে না দিলে লন্ডন থেকে তিনি দিল্লি ও দিল্লি থেকে ঢাকায় পৌঁছতেন না। তার দিল্লির সংবর্ধনার বিবরণও শুনেছি। সেখানেও তিনি বাংলায় ভাষণ দেন।

একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে যোগদানের আমন্ত্রণে ঢাকা যেতে পারিনি। পরে ডিসেম্বর মাসে আসে অন্য এক আমন্ত্রণ। ততদিনে শেখ সাহেব স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণ করেছেন, বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী সাহেবকে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি পদ। ইতোমধ্যে কলকাতায় চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তিনি আমার ‘পথে প্রবাসে’র থেকে আবৃত্তি করে আমাকে অবাক করে দেন। পরে ঢাকায় বঙ্গভবনে মধ্যাহ্নভোজনে আপ্যায়িত করেন। তখন জানতে পাই তিনি ছাত্র বয়সে তার পত্রিকার জন্য আমাকে চিঠি লিখে লেখা চেয়েছিলেন।

তার পরের একুশে ফেব্রুয়ারিতে যাওয়া হয় না। কিন্তু পরবর্তী একুশে ফেব্রুয়ারিতে সদলবলে নিমন্ত্রণ। ভারতীয় প্রতিনিধিমণ্ডলীর নেতা হয়ে বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিই। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর দক্ষিণ পার্শ্বে শিক্ষামন্ত্রী, তার পাশেই আমি। খুব কাছাকাছি পাই শেখ সাহেবকে। আমার অন্যতম হীরো। কিন্তু কথা বলার অবাকশ পাই নে। পেতুমও না, যদি না সম্মেলনের উদ্যোক্তারা আমাদের প্রত্যাবর্তনের দিন তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতেন।

সেই অবিস্মরণীয় দিনটির কথা আমি ফিরে এসে লিখি ও তার নাম রাখি ‘ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে’। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পূর্ণ বিবরণ তাতে ছিল না। তিনি নিজেই আমাদের বারণ করেছিলেন। আজ তিনি নেই। আমারও তো বয়স হলো একাত্তর। আর কতদিন আছি কে জানে! কেউ না কেউ লিখে না রাখলে ভাবীকাল জানতেই পাবে না শেখ মুজিব কী করেছিলেন ও কেন করেছিলেন। তার নিষেধ তার জীবৎকালে মান্য করেছি। এখন তিনি সব আপদ-বিপদের ঊর্ধ্বে। মরণোত্তর মানহানিরও শঙ্কা নেই। তিনি অমর।

এ বিবরণ আনুপূর্বিক নয়। পরেরটা আগে, আগেরটা পরে, যখন যেটা মনে আসছে তখন সেটা কলমের মুখে আসছে। ভাষা ও ভঙ্গি শেখ সাহেবের নয়, তবে বক্তব্যটা তারই। ভুলচুক যদি ঘটে থাকে তবে সেটা আমার স্মৃতির ভ্রম।

‘দেখুন, আমি দুই দুইবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। প্রথমবার আইয়ুব খানের বন্দিশালায়। ষড়যন্ত্রের মামলায়। আমার এক সাথী আমাকে হুঁশিয়ার করে দেয় যে সন্ধ্যাবেলা সেলের বাইরে গিয়ে নিয়মিত বেড়ানোর অভ্যাসটি বিপজ্জনক। পেছন থেকে গুলি করবে আর বলবে পালিয়ে যাচ্ছিল বলে গুলি করেছি। অন্যের বেলা ঘটেও ছিল ওরকম গুলি চালনা। দ্বিতীয়বার ইয়াহিয়া খানের কারাগারে। আমার সামনেই আমার কবর খোঁড়া হচ্ছে। বুঝতে পারছি  যে আমার শেষ মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে। মনটাকে তৈরি করে নিই যে মরতে যখন হবেই তখন মিছে ভয় কেন? শান্ত মনে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করি।’ শেখ সাহেব বলে যান।

সেদিন তিনি বেশ খোশমেজাজে ছিলেন। সাতজন আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে লাহোরে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে নিয়ে যেতে। তিনি তাদের সাফ বলে দিয়েছেন যে আগে স্বীকৃতি, তারপরে সম্মেলনে যোগদান। এখন কী হয় দেখা যাক। আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ঘণ্টা কয়েক যেতে না যেতেই পাকিস্তান দেয় স্বীকৃতি আর রাত পোহাতে না পোহাতেই শেখ উড়ে যান লাহোরে। সেখানে পড়ে যায় সংবর্ধনার ধুম।

শেখ সাহেবকে আমরা প্রশ্ন করি, ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটা প্রথম কবে আপনার মাথায় এলো?’

‘শুনবেন?’ তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে। তিনি ও শরৎচন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। আমিও চাই সব বাঙালির এক দেশ। বাঙালিরা এক হলে কি-না করতে পারত। তারা জগৎ জয় করতে পারত। 'They could conquer the world.'

বলতে বলতে তিনি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন। তারপর বিমর্ষ হয়ে বলেন, ‘দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোস। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ কেউ রাজি নয় তাদের প্রস্তাবে। তারা হাল ছেড়ে দেন। আমিও দেখি যে আর কোন উপায় নেই। ঢাকায় চলে এসে নতুন করে আরম্ভ করি। তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নিই। কিন্তু আমার স্বপ্ন কেমন করে পূর্ণ হবে এই আমার চিন্তা। হবার কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। লোকগুলো যা কমিউনাল! বাংলাদেশ চাই বললে সন্দেহ করত। হঠাৎ একদিন রব উঠল, আমরা চাই বাংলাভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে এমন একদিন আসে যেদিন আমি আমার দলের লোকদের জিজ্ঞাসা করি, আমাদের দেশের নাম কী হবে? কেউ বলে পাক বাংলা। কেউ বলে, পূর্ব বাংলা। আমি বলি, না, বাংলাদেশ। তারপর আমি স্লোগান দিই, জয় বাংলা। তখন ওরা বিদ্রূপ করে বলে, জয় বাংলা না, জয় মা কালী। কী অপমান! সে অপমান আমি সেদিন হজম করেছি। আসলে ওরা আমাকে বুঝতে পারেনি। জয় বাংলা বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলুম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয়। যা সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে।’

‘জয় বাংলা’ আসলে একটি মন্ত্র। যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ বা দাদাভাই নওরোজীর ‘স্বরাজ’ বা গান্ধীজীর ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বা নেতাজী সুভাষের ‘চলো দিল্লি’। এ হলো শব্দব্রহ্ম। একটি শব্দের বা শব্দের সমষ্টির মধ্যে অসীম শক্তি নিহিত। সে শক্তি অসাধ্য সাধন-পটীয়সী।

একটি কমিউনাল পার্টিকে ন্যাশনাল পার্টিতে রূপান্তরিত করা চারটিখানি কথা নয়। বার বার জেলে গিয়ে বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তিনি একদিন সত্যি সত্যিই পেয়ে যান তার স্বপ্নের বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ অবিভক্ত না হলেও সার্বভৌম ও স্বাধীন। আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের দিনই পেলেন পাকিস্তানের স্বীকৃতি। পরে ইউনাইটেড নেশনসে আসন। একজন ব্যক্তি তার ৫৫ বছর বয়সে এর চেয়ে বেশি সার্থকতা প্রত্যাশা করতে পারে কি? আর কেউ কি পারতেন?

সেদিন আমাদের বিশ্বাস করে আরও একটি কথা বলেন শেখ সাহেব। সঙ্গে সঙ্গে বলিয়ে নেন যে আমরা প্রকাশ করব না। আমি এখন কথার খেলাপ করছি ইতিহাসের অনুরোধে। আমি প্রকাশ না করলে কেউ কোনদিন করবে না।

‘আমার কী প্ল্যান ছিল, জানেন? অকস্মাৎ আমরা একদিন পাওয়ার সিজ করব। ঢাকা শহরের সব কটা ঘাঁটি দখল করে নেব। আর্মিতে, নেভিতে, এয়ারফোর্সে, পুলিশে, সিভিল সার্ভিসে আমাদের লোক ছিল। কিন্তু একটা লোকের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য সব পণ্ড হয়। নেভির একজন অফিসার বিশ্বাস করে তার অধীনস্থ একজনকে জানিয়েছিলেন। সে ফাঁস করে দেয়। তখন আমরা সবাই ধরা পড়ে যাই।’

তিনি আক্ষেপ করেন।

আমি প্রশ্ন করি, ‘ঘটনাটা ঘটত কোনো তারিখে?’

তিনি মৃদু হেসে উত্তর দেন, ‘বলব না।’

আমি চুপ। বুঝতে পারি অশিষ্টতার মাত্রা অতিক্রম করেছি।

বহু তপস্যার ফলে মর্ত্যের মানুষ স্বর্গের ইন্দ্র হয়। পূণ্যবল ক্ষয় হলে বা অসুররা প্রবল হলে পরে একদিন সেই ইন্দ্রের পতনও হয়। দুই দুইবার মরণের মুখ থেকে বেঁচে এসে তিনবারের বার তাকে মৃত্যুর কবলে পড়তে হলো। পাওয়ার সিজ করল তারই স্বদেশবাসী ও স্বজাতি। অদৃষ্টের বিড়ম্বনা।

এর কি কোনো দরকার ছিল? সাক্ষাৎকারের দিনই তো শেখ সাহেব আমাদের বলেছিলেন যে তিনি আর ক্ষমতার আসনে থাকতে চান না, কী করবেন, তার দলের লোক যে তাকে যেতে দিচ্ছে না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে তার কাজ সারা হয়েছে। তিনি যা যা চেয়েছিলেন সব কিছুই পেয়েছেন।

ঠিক সময়ে সরে গেলে দলের মধ্যে ভাঙন ধরত। সে ভাঙন শুধু স্বার্থঘটিত কারণে নয়, মতবাদঘটিত ও পলিসিঘটিত কারণেও। সব বাঙালি কখনও এক হতে পারে না, সব বাংলাদেশি কখনও এক হতে পারে না, সব মুসলমানও কি কখনও এক হতে পারে? সব মুসলমানের জন্যে পাকিস্তান একটি অনাসৃষ্টি। তার এক অংশের থেকে অপর অংশ হাজার মাইল দূরে। মাঝখানে সমুদ্র নয়, অপর এক দেশ। তার কোনো স্বাভাবিক কেন্দ্রস্থল ছিল না। কেন্দ্রীয় সরকার কোনকালেই মেজরিটি ভোট মেনে নিত না। ভোটবল ছিল পূর্বপ্রান্তের বাঙালি মেজরিটির। অস্ত্রবল ছিল পশ্চিমপ্রান্তের পাঞ্জাবি ও পাঠান মাইনরিটির। একদিন না একদিন একটা বলপরীক্ষা হতোই।

শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সেই অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক পরিবর্তনটি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়। তিনি ছিলেন ক্রান্তদর্শী পুরুষ। আপন ব্রতে নিবেদিত কর্মবীর। একটি স্বপ্ন নিয়েই তার যাত্রারম্ভ। যাত্রাশেষও সেই স্বপ্নের রূপায়ণে।

সময়ে পদত্যাগ করলে বাঁচতেন তিনি আরও কিছুকাল নিশ্চয়। কিন্তু বাঁচতেন কী নিয়ে? যুক্তবঙ্গের লেশমাত্র সম্ভাবনা ছিল না। তিনিও সে আশা ত্যাগ করেছিলেন। এমনভাবে ত্যাগ করেছিলেন যে তার কারবার ছিল দিল্লির সঙ্গে, কলকাতার সঙ্গে নয়। ভারত সরকারের সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে নয়; আমরাও বাংলাদেশে গেলে বাঙালি বলে চিহ্নিত হতুম না, হতুম ভারতীয় বলে, ইন্ডিয়ান বলে। বাংলা সাহিত্যের সম্মেলনেও আমরা বিদেশি অতিথি বলে অভ্যর্থনা পাই, যেমন পান সোভিয়েত রাশিয়ার বা পূর্ব জার্মানির প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত সাবধান ছিলেন যাতে কেউ কখনও মনে না করে বাঙালিতে-বাঙালিতে তলে তলে একটা একতার চেষ্টা হচ্ছে। তাই আমাদের প্রতি তাদের একটা ছাড়া ছাড়া ভাব।

ওদিকে আবার একদল সক্রিয় ছিলেন মুসলমানে-মুসলমানে একতার চেষ্টায়। শেখ সাহেবকে তারা বিশ্বাস করতেন না। তাদের অবিশ্বাস থেকেই এই ঘাতকতা।

(লেখাটি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু গ্রন্থ থেকে নেওয়া)

এএইচ/এসি

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি