উপকূলে বিশুদ্ধ পানির জন্য অপেক্ষা শেষ হবে কবে?
প্রকাশিত : ১২:২৬, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। চারদিকে নদী, খাল, পুকুর আর জলাশয় থাকলেও এসব এলাকার মানুষের কাছে নিরাপদ খাবার পানি এখনও সহজলভ্য নয়। কোথাও নলকূপের পানি লবণাক্ত, কোথাও মিষ্টি পানির পুকুর শুকিয়ে যায়, আবার কোথাও এক কলসি পানি সংগ্রহ করতেও পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ।
পানির এই সংকট নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন উপকূলের বহু পরিবার। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন সময় পানি সরবরাহের প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল সব এলাকায় স্থায়ীভাবে পৌঁছেছে এমন চিত্র দেখা যায় না। ফলে সুপেয় পানির জন্য মানুষের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না।
চারদিকে পানি, পান করার উপযোগী পানি কোথায়?
খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বহু এলাকায় পানির প্রধান সমস্যা লবণাক্ততা। উপকূলীয় অঞ্চলের এই সংকটের অন্যতম কারণ পানির উৎসের লবণাক্ততা। নদী ও জলাশয়ে প্রচুর পানি থাকলেও তার সবটুকু পান করার উপযোগী নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পুকুরের পানি পরিশোধনের জন্য স্থাপন করা অনেক ফিল্টার ও পানি সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও মিষ্টি পানির পুকুর শুকিয়ে যায়, কোথাও সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি ফুরিয়ে আসে। ফলে নিরাপদ পানির বিকল্প উৎস সীমিত হয়ে পড়ে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে দূরের উৎসের ওপর নির্ভর করে।
প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী,এসব এলাকায় প্রায় সারা বছরই পানির সংকট থাকে; এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তা আরও তীব্র হয়। পানির স্তর নেমে যাওয়া ও বৃষ্টির অভাবে অনেক উৎস কার্যকর থাকে না।
পানি সংগ্রহেই কাটে দিনের বড় সময়
সুপেয় পানির অভাব কেবল তৃষ্ণার সমস্যা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে নারী ও কিশোরীদের ওপর পড়ে। ফলে তাঁদের ঘরের কাজ, বিশ্রাম ও পড়াশোনার সময় কমে যায়।
দূর থেকে পানি বহন করা শারীরিকভাবেও কষ্টকর। বিশেষ করে প্রবীণ, শিশু ও অসুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সংগ্রহ আরও কঠিন। কোথাও পুকুরের পানি পরিশোধন করে পান করতে হয়, কোথাও আবার বাধ্য হয়ে অনিরাপদ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
প্রকল্প আছে, স্থায়ী সমাধান কোথায়?
উপকূলের পানিসংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর খনন, পুকুরের পানি পরিশোধন এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং স্থানীয় মানুষের জন্য সহজলভ্যতার ওপর।
কোনো এলাকায় পানির ট্যাংক স্থাপন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, যদি প্রয়োজনের সময় সেই ট্যাংকে পানি না থাকে। একইভাবে, পানি শোধনাগার স্থাপন করেও লাভ নেই, যদি কিছুদিন পর সেটি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের অবকাঠামো থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এ কারণেই উপকূলের মানুষের কাছে নতুন প্রকল্পের ঘোষণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সারা বছর নিরাপদ পানির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা।
সমাধানের উদ্যোগ আছে, প্রয়োজন বিস্তৃত বাস্তবায়ন
সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াঘাট ও কৈখালী গ্রামে বেসরকারি উদ্যোগে দুটি রিভার্স অসমোসিস (আরও) পানি শোধনাগার চালু হয়েছে। এসব শোধনাগারের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের সুপেয় পানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও উপকূলের বৃহত্তর পানিসংকটের তুলনায় এর পরিসর সীমিত।
এ ধরনের উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর পানি সরবরাহব্যবস্থা এবং নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষা জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, মিঠাপানির পুকুর রক্ষা ও পুনঃখনন, নষ্ট ফিল্টার ও শোধনাগার সচল রাখা এবং লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকার উপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন।\
একই সঙ্গে পানি সরবরাহের কেন্দ্রগুলো এমন জায়গায় স্থাপন করতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও সহজে পানি সংগ্রহ করতে পারেন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সেটি দীর্ঘদিন সচল রাখার ব্যবস্থাও প্রকল্পের অংশ হতে হবে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই সংকট
উপকূলের সুপেয় পানির সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বর্ষায় বৃষ্টির পানি পাওয়া গেলেও শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় সংকট আবার প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে মানুষকে প্রতি বছর একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়।
সরকারের পর সরকার এসেছে, উন্নয়নের অগ্রাধিকারও বদলেছে। কিন্তু নিরাপদ খাবার পানির মতো মৌলিক প্রয়োজন যদি মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো না যায়, তাহলে উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উপকূলের মানুষের প্রয়োজন সাময়িক ত্রাণ নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নিরাপদ পানির জন্য প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটতে হবে না, অনিরাপদ পানি পান করার ঝুঁকি নিতে হবে না।
খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর এই বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা খুব সাধারণ: বাড়ির কাছেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি। সেই প্রত্যাশা পূরণে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে প্রয়োজন সমন্বিত, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।
সুপেয় পানি মানুষের মৌলিক অধিকার; তাই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
ঐ.মিষ্টি//
আরও পড়ুন










