ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২০:১১:১৬

Ekushey Television Ltd.

কোমল পানীয় না বিষ?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৮:৩৭ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৮:৪২ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সোমবার

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বাড়িতে বা অফিসে পার্টিতে, পথে-ঘাটে হরদম খেয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোমল পানীয়। বছর দশেক ধরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনার্জি ড্রিংকস। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিত্যনূতন বিক্রয়-কৌশল আর চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপনের হুজুগে এগুলো বিক্রি করে যাচ্ছেন। কিন্তু কী আছে এসব পানীয়ে আর মানবদেহের ওপর তার প্রভাবটাই-বা কেমন, এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছেই। যা থেকে প্রায়ই বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন সব বিস্ময়কর তথ্য। নিজের ও পরিবারের সুস্থতা তো বটেই, সর্বোপরি একজন সচেতন মানুষ হিসেবেও আমাদের সবারই বিষয়গুলো জানা থাকা প্রয়োজন।

ইথিলিন গ্লাইকল : আর্সেনিক-সদৃশ বিষ!

ফ্রিজে চার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার কম তাপমাত্রায় কোনো তরল দীর্ঘক্ষণ রাখলে তা জমে বরফ হয়ে যায়। কিন্তু কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না। কারণ এগুলোতে এন্টি-ফ্রিজার হিসেবে মেশানো হয় একটি রাসায়নিক উপাদান। যার নাম ইথিলিন গ্লাইকল। এটি মানবদেহের জন্যে স্বল্প মাত্রার আর্সেনিকের মতোই একটি বিষ। মূলত শিল্প-কারখানায় ব্যবহারযোগ্য হলেও স্বচ্ছ বর্ণ গন্ধহীন এ উপাদানটি বিভিন্ন পানীয়ে এন্টি-ফ্রিজার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে হরদম। গবেষকদের মতে, ইথিলিন গ্লাইকল মানবদেহে নীরব বিষক্রিয়া ঘটাতে সক্ষম। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, হৃৎপিণ্ড, লিভার এবং কিডনি জটিলতা এমনকি দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বৈকল্য পর্যন্ত ঘটাতে পারে এটি।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ধারণা, বিশ্বজুড়ে গত কয়েক দশকে সববয়সী বিশেষত শিশুদের মধ্যে কিডনি রোগ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো এই কোমল পানীয়।

ইথিলিন গ্লাইকলের পাশাপাশি কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকসে মেশানো হয় কিছু কৃত্রিম রঙ। যেমন টারট্রাজিন, কারমোসিন, ব্রিলিয়ান্ট ব্লু, সালফেট ইয়েলো ইত্যাদি। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে এগুলোর বিক্রয় নিষিদ্ধ। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এ উপাদানগুলো ক্যান্সার সৃষ্টির কারণ। এছাড়াও কোমল পানীয়তে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয় সোডিয়াম বেনজয়েট বা বেনজয়িক এসিড। এ উপাদানটি কারো কারো ক্ষেত্রে হাঁপানি ও চর্মরোগের কারণ হতে পারে।

কোনো তরল কতটা এসিডিক হবে তা নির্ভর করে তার pH মানের ওপর যে পানীয়ের pH মান যত কম সে পানীয় তত এসিডিক। কোনো পানীয়ের pH মান ৫.৫ বা তার কম হলে সে পানীয় শরীরের জন্যে ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপারটি হলো, ব্রিটিশ কোমল পানীয় সমিতি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কোমল পানীয়ের মাত্রা শনাক্ত করে যে ছকটি প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, এদের প্রত্যেকটির মান ৩-এর কম। আর বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় কোমল পানীয়টির pH মান ২.৪ থেকে ২.৮ এর মধ্যে। কোমল পানীয় পানের ফলে শরীরে ক্রমান্বয়ে জমা হতে থাকা এই এসিড দাঁত ও হাড়সহ শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতিসাধন করে।

ঝাঁঝালো স্বাদে জীবনক্ষয়-

কোমল পানীয়তে ঝাঁঝালো স্বাদের জন্যে মেশানো হয় ফসফরিক এসিড, যা ইতোমধ্যেই দাঁতের এনামেল আর শরীরের হাড়ের জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত। পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোমল পানীয়ের বোতলে একটি দাঁত ফেলে রেখে দিলে তা ১০ দিনের মধ্যে পুরোপুরি গলে যায়। ব্রিটিশ ডেন্টাল এসোসিয়েশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিবার কোমল পানীয় গ্রহণের প্রায় একঘণ্টা পর্যন্ত দাঁতের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব বজায় থাকে। কারণ, ওই পানীয়তে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলোর প্রভাব অকার্যকর করতে মুখের লালার প্রায় একঘণ্টা সময় লাগে।

কোমল পানীয়ে থাকা ফসফরাস শরীরে জমে দীর্ঘমেয়াদে হাড়কে ভঙ্গুর করে দেয়। শুধু তা-ই নয়, ভারী কোনো পরিশ্রমের পর কোমল পানীয় পান করলে এর ক্যাফেইন শরীরের ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে। ফলে শরীর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়, যা হাড়ক্ষয় তরান্বিত করার পাশাপাশি হৃদযন্ত্রে গোলযোগ ঘটাতে পারে।

নিয়মিত কোমল পানীয় পানের ফলে শরীর থেকে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান মূত্রের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। ফলে বাড়তে থাকে হাড়ক্ষয়ের সম্ভাবনা ও থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা হাইপোথাইরয়েডিজম ইত্যাদি জটিলতার সম্ভাবনা। যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্টন ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে ব্যাপক আকারে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারীরা নিয়মিত কোমল পানীয় পান করেন তাদের কোমরের হাড়ের ঘনত্ব কমে গেছে।

উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন : আসক্তির প্রধান কারণ

কোমল পানীয় প্রীতির অন্যতম কারণ এর অত্যধিক ক্যাফেইন। তাই এগুলো একবার খেলে বার বার খেতে চায় মন। বলা হয়, কোনো খাবার বা পানীয়ে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন কাজ করে একটি আসক্তিকর মাদকের মতোই, যা শরীরের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম বা কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সাময়িকভাবে উত্তেজিত করে তোলে। হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই সাময়িক উত্তেজনার শেষ পরিণতি হলো অবসন্নতা। উপরন্তু, এর ফলে ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে অনিদ্রা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা বা নার্ভাসনেস, উদ্বেগ। অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীরের স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনকে বাধাগ্রস্ত করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন গর্ভপাত, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব, কম ওজনের সন্তান প্রসব ও গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি ঘটানোর মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

এছাড়াও মূত্রাশয় ও পাকস্থলীর ক্যান্সারসহ কমপক্ষে ছয় ধরনের ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ এই অতিরিক্ত ক্যাফেইন। পাকস্থলীর ভেতরের আবরণের ওপরও রয়েছে ক্যাফেইনের ক্ষতিকর প্রভাব। কোমল পানীয়ের আরেকটি উপাদান হলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড, যা আমরা শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় শরীর থেকে বর্জ্য হিসেবে বের করে দিই। অথচ কোমল পানীয় পানের মাধ্যমে এটি শরীরে প্রবেশ করে।

গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, স্বাদ মিষ্টি করার জন্যে প্রতি বোতল কোমল পানীয়তে মেশানো হয় গ্লুকোজ, সুক্রোজ, ফ্রুক্টোজ, স্যাকারিন ইত্যাদি। আর এক বোতল বা এক ক্যান কোমল পানীয়তে থাকা ক্যালরির পরিমাণ হলো ১৬০, যা প্রায় ১০ চামচ চিনির সমান। এ পরিমাণ ক্যালরি পোড়াতে একজন মানুষকে ভারী ব্যায়াম করতে হবে সপ্তাহে চার ঘণ্টারও বেশি। এবং স্বাভাবিকভাবেই তা করা হয়ে ওঠে না। যা শেষপর্যন্ত মেদস্থুলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এর পরিণতি হলো ডায়াবেটিস, মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল, গলব্লাডারে পাথর, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, রক্তনালীর স্থায়ী সংকোচন, স্ট্রোক ও অকালমৃত্যু।

গত কয়েক দশকে সারা বিশ্বে এসব রোগে অকালমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার একটি সাধারণ কারণ হিসেবে কোমল পানীয়ের উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য-গবেষকরা।

বোস্টন চিলড্রেন্স হসপিটাল ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব শিশু নিয়মিত এসব পানীয় পান করতে অভ্যস্ত, তাদের অতিরিক্ত ওজনধারী হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৬০ ভাগ বেড়ে যায়।

এছাড়াও সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এসব চিনিযুক্ত পানীয় বা সুগার ড্রিংক কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বলা হচ্ছে, বিভিন্ন ধরনের কোলা, সোডা, চিনিযুক্ত পানীয় যারা নিয়মিত পান করেন তাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিক একজন মানুষের চেয়ে শতকরা ৩৩ ভাগ পর্যন্ত বেশি। এ ব্যাপারে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. এলেইন ওরচেস্টার বলেন, এসব পানীয় নিয়মিত পানের ফলে মুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর এ থেকেই বাড়ে কিডনিতে পাথর জমার ঝুঁকি। এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান সোসাইটি অব নেফ্রোলজি জার্নালে।

এর প্রেক্ষিতে শুধু পাশ্চাত্যেই নয়, আমাদের দেশেও এখন সচেতন শিশু-বিশেষজ্ঞরা এসব ব্যাপারে মা-বাবা অভিভাবকদের কোমল পানীয়ের ব্যাপারে সাবধান করে দিচ্ছেন। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে আয়োজিত একটি সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিশুদের মধ্যেও যে ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে, তার অন্যতম কারণ হলো কোমল পানীয়ের প্রতি ক্রমবর্ধমান আসক্তি। তাই যেসব মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানটির বায়না রাখতে কোমল পানীয় কিনে দিচ্ছেন, তিনি আসলে সন্তানের অকালমৃত্যুকেই ডেকে আনছেন। চিনির মাত্রাধিক্যের কারণে সিঙ্গাপুর সরকার ১৯৯২ সালে কোকাকোলা, পেপসিসহ সকল ধরনের কোমল পানীয় স্কুল পর্যায়ে বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

হজম নয়, বদহজমের চূড়ান্ত

তথ্যগত বিভ্রান্তির ফলে আমরা অনেক সময় আমাদের জীবনযাপনে চূড়ান্ত বোকামির প্রকাশ ঘটাই। এর মধ্যে সবচেয়ে হাস্যকর বোকামিটি হচ্ছে বিয়ে বা কোনো উৎসবে ভরপেট খাওয়ার পর মহানন্দে কোমল পানীয় পান করা। অধিকাংশেরই ধারণা, এতে খাবারটা ভালো হজম হবে। এ ধারণার অসারতা বুঝতে কিছু তথ্য জানা প্রয়োজন।

খাবার সবচেয়ে ভালো হজম হয় যখন পাকস্থলীর তাপমাত্রা থাকে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এ তাপমাত্রায় পাকস্থলীর এনজাইম বা পাচক-রস খাবার হজমের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী অবস্থায় থাকে। কিন্তু ভরপেট খাওয়ার পরই আপনি যখন আপনার পাকস্থলীতে শূন্য থেকে চার ডিগ্রি তাপমাত্রার কোমল পানীয় ঢেলে দেন তখন স্বাভাবিকভাবেই হজমের পুরো প্রক্রিয়াটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হজমের বদলে তখন পাকস্থলীতে থাকা খাবার গাঁজন প্রক্রিয়ায় পচতে শুরু করে। কোমল পানীয় পানের কিছুক্ষণ পর খাবার হজমের লক্ষণ মনে করে আপনি যে তৃপ্তির ঢেঁকুরটি তোলেন, তা আসলে খাবার পচনের ফলে সৃষ্ট গ্যাস।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন থেকে সংগৃহীত।

এসএইচ/



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি