ঢাকা, শুক্রবার   ১৮ অক্টোবর ২০১৯, || কার্তিক ৩ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ছাত্রলীগের নতুন কমিটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৯:২৯ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সবার প্রত্যাশা অনুযায়ী দল পরিচালনা ও হারানো ইমেজ ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ছাত্রলীগের নতুন কমিটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা। 

আজ সোমবার বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করবেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য।  

দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, দলের সমন্বয় সাধন,ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনা ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলকে গুছিয়ে সম্মেলনের আয়োজন করা। মোটকথা, আগামী ১০ মাসের রোডম্যাপ তৈরি ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য একনিষ্ঠতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সংগঠনে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে তাদের।

এদিকে, সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার পরামর্শ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, শোভন-রাব্বানীর ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করাই হবে জয়-লেখকের প্রধান কাজ।

গতকাল রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সামনে আসেন জয়-লেখক। এ সময় তারা বলেন, পুষ্পস্তবক অর্পণের পর ছাত্রলীগের একমাত্র অভিভাবক শেখ হাসিনা ও ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে আমাদের কর্মপরিকল্পনা নির্দিষ্ট করব।

এর আগে গত শনিবার ধারাবাহিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, অভিযোগ ও সমালানোচনার মুখে ছাত্রলীগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয় সাবেক দুই শীর্ষ নেতা রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে। 

একই সঙ্গে সংগঠনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আল-নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সম্মেলন পর্যন্ত তারা কমিটি গঠন থেকে শুরু করে ছাত্রলীগের সব ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করবেন।

এই কমিটিকে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নানা ধরনের মন্তব্যের পাশাপাশি পরামর্শও দিয়েছেন। তাদের মতের ভিত্তিতেই উঠে এসেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা অনুযায়ী সংগঠন গোছাতে নতুন দুই নেতাকে প্রধানত আটটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ পূর্ণ হয়ে পরবর্তী সম্মেলন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করবেন। এ সময় তারা কমিটি গঠন থেকে শুরু করে সংগঠনের সব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

ছাত্রলীগকে সুনামের ধারায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব কর্মকাণ্ড লোকে পছন্দ করে না, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে। ছাত্রলীগকে ভালো খবরের শিরোনাম হতে হবে।

এর আগে রোববার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভূলতা ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হল।তাদের বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করানো হয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই ছাত্রলীগের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দেখভাল করছেন বলেও জানান তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে এই সময়ের মধ্যে সংগঠন গোছাতে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে- কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পদবঞ্চিতদের পদায়ন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন।

সাংগঠনিক জেলাগুলোতে নতুন কমিটি দিতে হবে। চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ ও অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ মনোভাব দেখাতে হবে। সংগঠনে পর্যাপ্ত সময় দেয়ার পাশাপাশি সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় মনোযোগী হতে হবে। সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নেতৃত্ব দিতে হবে।

এ ছাড়া স্বল্পসময়ে অধিক কাজ সম্পন্ন করার মানসিকতা নিয়ে ১০ মাসের রোডম্যাপ তৈরি ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে। আর মোটা দাগে বললে- শোভন-রাব্বানীর করে যাওয়া ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করাই জয়-লেখকের প্রধান কাজ হবে বলে মনে করছেন তারা।

ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দু’বছর। ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়। ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে শনিবার সন্ধ্যায় তাদের পদ থেকে বাদ দেয়া হয়। সেই হিসাবে বর্তমান কমিটির হাতে সময় রয়েছে ১০ মাস ১৫ দিন। এ সময়ের মধ্যে নতুন দুই নেতাকে সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে।

যেহেতু শোভন-রাব্বানীর সময়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বত্রই টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছিল, তাই তাদেরকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করে দলে শৃঙ্খলা ফেরানোর পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছেন শোভন-রাব্বানী। অন্তত ১৫ দফায় প্রতিশ্রুতি দিয়েও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করেননি তারা। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেঁধে দেয়া সময় ২২ এপ্রিলের মধ্যেও কমিটি গঠন করেননি তারা।

উপেক্ষিত হয়েছে আ’লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বেঁধে দেয়া সময়ও। শেষ পর্যন্ত গত ১৩ মে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ৩০১ সদস্যের এ কমিটির মধ্যে কমপক্ষে ৯৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার আসামি থেকে শুরু করে বিবাহিত, বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্টতা, মাদক গ্রহণ ও ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীর অভিযোগ উঠেছে।

বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের পদায়নে দফায় দফায় সময়সীমা ঘোষণা দিয়েও বাস্তবায়ন করেননি তারা। গত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ ও অবস্থানে থাকা অন্তত ৫০ নেতাকে পদায়ন করা এখন জয়-লেখকের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

এদিকে বিতর্কিত নেতাদের নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান হয়নি। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চার মাস পার হলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করা হয়নি। ফলে তৃণমূলে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
শোভন-রাব্বানী দায়িত্ব গ্রহণের পর ১১১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মাত্র ২টি শাখার নতুন কমিটি হয়েছে। 

অন্যদিকে জেলা কমিটি গঠন না করে কেন্দ্র থেকে উপজেলা কমিটি গঠন- এ সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভেঙে পড়েছে সংগঠনের ‘চেইন অব কমান্ড’। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধান করে বাকি ১০৯টি সাংগঠনিক ইউনিটের কমিটি দেয়া বর্তমান নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখককে চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ ও অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ভূমিকায় থাকতে হবে। কারণ তাদের পূর্বসূরি শোভন-রাব্বানীকে পদ থেকে অপসারণের অন্যতম কারণ এসব অভিযোগ।

সে জন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে বর্তমান নেতৃত্বকে। সংগঠনে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় মনোযোগী হতে পারলে তারা এ চ্যালেঞ্জ অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, সংগঠন পরিচালনায় উদাসীনতা ও ব্যক্তিগত আখের গোছানোর বাসনাই শোভন-রাব্বানীর এ করুণ পরিণতি ডেকে এনেছে। তাই জয়-লেখককে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ তাদের।

শোভন-রাব্বানীর নেতৃত্ব প্রদানে চরম অযোগ্যতা ও অদক্ষতার ফলে ছাত্রলীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে বহুধাবিভক্ত রাজনীতি শুরু হয়েছে। এমনকি তাদের ঘনিষ্ঠজনরা স্বার্থের দ্বন্দ্বে সংঘর্ষেও জড়িয়েছে একাধিকবার।
পাশাপাশি পদবঞ্চিত প্রায় অর্ধশত নেতার পৃথক একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। যার ফলে সব গ্রুপের সমন্বয় সাধন করে চলতে হবে জয়-লেখককে। এর সঙ্গে স্বল্পসময়ে অধিক কাজ সম্পন্ন করার মানসিকতা নিয়ে ১০ মাসের রোডম্যাপ ও তার বাস্তবায়ন করতে হবে।

অন্যথায় কাজ গুছিয়ে উঠতে পারবেন না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আই/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি