ঢাকা, বুধবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ৫:২৬:২৮

Ekushey Television Ltd.

নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ : কারণ, ঝুঁকি ও চিকিৎসা

ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

প্রকাশিত : ১১:২৭ এএম, ১৭ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০২:০৬ পিএম, ১৭ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশন প্রায়ই একটি স্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচিত। এর জন্য চিকিৎসা ও প্রতিরোধ দুটিই জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি হঠাৎ করে মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ কি : স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো সেই বল, যার সাহায্যে রক্ত শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছায়। হৃদপিণ্ডের পাম্পিং ক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তচাপ তৈরি হয়, যার একক নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। বিভিন্ন বয়সের সঙ্গে সঙ্গ একেকজন মানুষের শরীরে রক্তচাপের মাত্রা ভিন্ন এবং একই মানুষের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিক এই রক্তচাপও বিভিন্ন রকম হতে পারে।

উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অধিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। ঘুমের সময় এবং বিশ্রাম নিলে রক্তচাপ কমে যায়। রক্তচাপের এই পরিবর্তন স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে। অধিকাংশ সময় রক্তচাপের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার ভিতরেই থাকে। সাধারণত বয়স যত কম, রক্তচাপও তত কম হয়।

যদি কারও রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রার চাইতে বেশি হয় এবং অধিকাংশ সময় এমনকি বিশ্রামকালীনও বেশি থাকে, তবে ধরে নিতে হবে তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী।

উচ্চ রক্তচাপের বিপদ : উচ্চ রক্তচাপ ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে ভীতিকর দিক। যদিও অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগীর বেলায় কোনো লক্ষণ থাকে না, তবুও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্যই উচ্চ রক্তচাপকে `নীরব ঘাতক` বলা যেতে পারে।

অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

যেসব জটিলতা হতে পারে : রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অঙ্গে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- হৃৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিস্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংশপেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে। দুর্বল হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং এই অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর।

রক্তনালির গাত্র সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা ইনফার্কশন হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, মস্তিস্কে স্ট্রোক হতে পারে; যা থেকে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এছাড়া চোখের রেটিনাতে রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে হতে পারে।

যেসব কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয় : ৯০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, একে প্রাইমারি বা এসেন্সিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধারণত বয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে। কিছু কিছু বিষয় উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা বাড়ায়। সাধারণত বংশানুক্রমিক, ধূমপান, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মদ্যপান, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা ছাড়াও কিডনির রোগ, অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার, ধমনীর বংশগত রোগ, গর্ভধারণ অবস্থায় একলাম্পসিয়া ও প্রি একলাম্পসিয়া, অনেকদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ির ব্যবহার, স্টেরয়েড জাতীয় হরমোন গ্রহণ এবং ব্যথা নিরাময়কারী কিছু কিছু ওষুধ খেলে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।

ঝুঁকি কমাতে করনীয় : জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বংশগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা কমানো সম্ভব নয়। তবে এ রকম ক্ষেত্রে যে সব উপাদান নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। এ জন্য অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে, খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন, যেমন- কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে, খাসি বা গরুর গোস্ত, কলিজা, মগজ, গিলা, গুর্দা, ডিম কম খেতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননি তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি- যেমন সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে। বেশি আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা ভালো। আটার রুটি এবং সুজি জাতীয় খাবার পরিমাণমতো খাওয়া ভালো, লবণ নিয়ন্ত্রণ, মদ্যপান, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান বর্জন।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ :যাদের ডায়াবেটিস আছে, তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, তত আগে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জটিল রোগ বা প্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। উচ্চ রক্তচাপ দূর হয় না, একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর জন্য অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত চেক করতে হবে।

মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে: নিয়মিত বিশ্রাম, সময়মতো ঘুমানো, শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দিতে হবে। নিজের সখের কাজ করা, নিজ ধর্মের চর্চা করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। নিজ ধর্মচর্চার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা: নিয়মিত চিকিত্সকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা যায় এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ততই জটিল রোগ বা প্রতিক্রিয়া হতে রক্ষা পাওয়া যায়।

এছাড়া যে সব ওষুধ ব্যবহারে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া তা কোনোক্রমেই ব্যবহার করা যাবে না।

চিকিৎসা : উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়যোগ্য নয়, একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর জন্য নিয়মিত ওষুধপত্র সেবন করতে হবে। অনেক রুগী কিছুদিন ওষুধ খাবার পর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসলে ওষুধ বন্ধ করে দেন, মনে করেন রক্তচাপ ভালো হয়ে গেছে, কাজেই ওষুধ খাওয়ার দরকার কি? এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কোনোক্রমেই ডাক্তারের নির্দেশ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করা যাবে না।

অনেকেই আবার উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জানার পরেও ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন বা খেতে চান না। কারো কারো ধারণা একবার ওষুধ খেলে তা আর বন্ধ করা যাবে না। আবার কেউ কেউ এমনও ভাবেন যে, উচ্চ রক্তচাপ তার দৈনন্দিন জীবন প্রবাহে কোনো সমস্যা করছে না বা রোগের কোনো লক্ষণ নেই, তাই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেতে চান না।

মনে করেন ভালোইতো আছি, ওষুধের কি দরকার? এই ধারণাটাও সম্পূর্ণ ভুল। এই ধরনের রোগীরাই হঠাত্ করে হূদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, এমনকি মৃত্যুও হয়ে থাকে। তাদেরকে অবশ্যই ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত চেক করতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। একমাত্র রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি এবং তা প্রতিরোধকল্পে সবার সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : ডিন, মেডিসিন অনুষদ অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

/ এআর /

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি