ঢাকা, শুক্রবার   ১৪ আগস্ট ২০২০, || শ্রাবণ ৩০ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

যে কারণে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে রাশিয়া বিশ্বকাপ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৫:২২ ১৮ জুলাই ২০১৮

রাশিয়া বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ছিল আগে থেকেই৷ কিন্তু সব ছাপিয়ে ঘটন-অঘটন-অতিঘটনের এক বিশ্বকাপ উপহার দিলো দুই মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা দেশটি৷

এই বিশ্বকাপ শুরুর আগে কত আলোচনা! আয়োজনের ভার কেন দেয়া হলো রাশিয়াকে? সেখানে রাজনৈতিক চাপ ছিল কতটা৷ কতটা হলো টেবিলের তলের হিসেব৷ কিংবা সোচি অলিম্পিকের কথা মনে করিয়ে দিতে ভুলেননি কেউ৷ স্বাগতিক অ্যাথলেটদের ডোপিং কেলেঙ্কারিও মনে পড়েছে অনেকের৷

এর বাইরেও ছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েন৷ বিশেষ করে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তো সম্পর্ক যায় যায় অবস্থা৷ যোগ দেয় ইউরোপের অন্য অনেক দেশও৷ কিন্তু সবকিছুর পরও শুরু হলো বিশ্বকাপ৷

যতই দিন গড়াতে লাগলো, সবার মুখে শুধু রাশিয়ানদের প্রতি মুগ্ধতা৷ আতিথেয়তার প্রশংসা৷ অনেকের ধারণা তো ১৮০ ডিগ্রিই পাল্টে গেল৷ তবে সবচেয়ে কঠিন হয়ে রইলো ভাষার প্রতিবন্ধকতা৷ ইংরেজি বলতে না পারা রাশিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগটা ঠিকভাবে হচ্ছিলো না৷ অবশ্য এই বিষয়টিই দর্শনার্থীরা যুগ যুগ ধরে মনে রাখবেন৷ তাই এই বিশ্বকাপকে মনে রাখার এটি একটি কারণ বলা যেতে পারে।

কিন্তু সংস্কৃতির আদান প্রদানের চেয়ে খেলাটাই মুখ্য এমন আসরে৷ সেদিক থেকেও হতাশ তো করেইনি, বরং রীতিমতো একের পর এক চমক নিয়ে এসেছে৷ দু-একটা ম্যাচ হবার পর থেকেই বোঝা যেতে লাগলো যে দূরত্ব কমে এসেছে ‘বড়` দলগুলোর সঙ্গে ‘ছোট` দলগুলোর৷ যেমন, লুকাকু-ফেলাইনিরা খেললেও বেলজিয়ামের কথা কেউ ভাবেনি যে দলটি এতদূর যাবে, এবং দাপট দেখিয়ে খেলবে৷ ক্রোয়েশিয়াকে এমন রূপে দেখা যাবে, কে ভেবেছিল? ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স ও ২০১০ সালে স্পেন প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিল এবং ট্রফিও জিতেছে৷ ২০১৮-তে ক্রোয়েশিয়াও ফাইনাল খেললো প্রথমবার৷ যদিও জিততে পারেনি৷

কিংবা স্বয়ং পুতিনও হয়তো ভাবেননি যে, তাঁর রাশিয়া শেষ চারের টিকেট প্রায় নিশ্চিতই করে ফেলবে৷ তাই এই চমকগুলো বহুদিন মনে থাকবে সবার৷ এবার আসুন, তারকাদের প্রসঙ্গে৷ ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো, মেসি আর নেইমার – এই তিন মায়েস্ত্রোর দিকে চোখ ছিল সবার৷ কিন্তু দু-একটা ম্যাচের পরই সবার মনে হয়েছে, না, চোখ অন্যদিকে ঘোরাতে হবে!

রোনাল্ডোর শুরুটা স্বপ্নময় ছিল, স্পেনের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক দিয়ে৷ কিন্তু এরপর থেকেই ম্রিয়মান হতে থাকেন তিনি৷ যদিও একা কতটা টানবেন দলকে, সে প্রশ্নও আছে৷ তবে প্রথম ম্যাচের মতো তাঁকে পরের ম্যাচগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায়নি৷

এদিকে, আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বড় আশা ছিল যে, ৩২ বছরের খরা এবার কাটবে৷ কাটাবেন তাঁদের ভরসা মেসি৷ কোচেরও ভরসা ছিলেন মেসি৷ কিন্তু মেসিকে যেন তাঁর ছায়াই মনে হচ্ছিল৷ যদিও ফ্রান্সের বিপক্ষে আশা জাগানিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি৷ কিন্তু এমবাপ্পের গাঢ় নীলের আলোকছটায় তাঁর আকাশি রং আরো ফিকে হয়ে যায়৷

রোববার রাতে ৪-২ গোলে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ২০ বছর পর আবার বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে ফ্রান্স৷ ম্যাচের আগে দুই দলের সফলতা কামনা করে একে অপরকে অভিবাদন জানাচ্ছেন ফাইনালের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্স আর ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ আর কোলিন্ডা গ্রাবার-কিটারোভিচ৷

নেইমারও হতাশ করেছেন ব্রাজিল সমর্থকদের৷ যদিও কখনো কখনো তিনি অপার্থিবও হয়ে উঠছিলেন তাঁর নৈপুণ্য আর কৌশলে৷ কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই কিছুদিন আগের পিএসজি`র নেইমারকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না৷ বরং আরো বিতর্কিত হলেন তাঁর অভিনয়ের কারণে৷

কিন্তু এই বিশ্বকাপ চিনিয়েছে এমবাপ্পেকে৷ বলের পেছনে এই টিনএজ দৌঁড়ান বোল্টের চেয়েও জোরে৷ স্কিলও আছে৷ আছে বিগ ম্যাচ টেম্পারামেন্ট৷ যেমন, তিনি জ্বলে উঠেছিলেন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে৷ গোল করেছেন ফাইনালে৷ বুঝিয়েছেন যে তিনি ফ্লুক নন৷ লম্বা রেসের ঘোড়া৷

একইভাবে, লুকা মদ্রিচের বুকে জ্বলজ্বলে আরেকটি তারকা জুড়ে দিল এই বিশ্বকাপ৷ ক্রোয়েশিয়া দলে তিনি ছিলেন খেলনার চাবি৷ তিনি ঘুরলেই ক্রোয়েশিয়া এগোতো সামনের দিকে৷ সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে যেভাবে গোল করিযেছেন কিংবা নিজে করেছেন, তা এক কথায় অতিমানবীয়৷ শুধু দলকে সেরা মুকুটটা পরাতে পারলে হয়তো সব কষ্ট ভুলে যেতেন৷ তারপরও ফিফা যোগ্য সম্মান তাঁকে দিয়েছে৷ সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল উঠেছে তাঁর হাতে৷

তবে গোল্ডেন বুট যাঁর ঘরে গিয়েছে, তিনি তাঁর বিষয়ে প্রশ্ন করছেন তাঁর দেশের লোকেরাই৷ বলছি, হ্যারি কেনের কথা৷ পানামা বা টিউনিশিয়ার জন্য তিনি ‘ভয়ঙ্কর` হয়ে উঠলেও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তাঁকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি৷ বরং ‘ওয়ার্ল্ডকাপ কামিং হোম` বলে বলে যাঁরা গলা ফাটিয়েছেন, তাঁদের কাছে শূন্য হাতে ফিরেছেন তিনি৷ ভুল বললাম, গোল্ডেন বুট ঘরে নিয়ে গেছেন তিনি৷

অবশ্য গোলরক্ষকদেরও মনে রাখবে এবারের বিশ্বকাপ৷ পেনাল্টি শুটআউটে স্পেনকে বিদায়ের দিন রাশিয়ার গোলরক্ষক আকিনফ্যিফের পড়ে গিয়েও পা দিয়ে লাথি মেরে বল আটকে দেয়ার মুহূর্তটুকু কে ভুলতে পারবে?

কিংবা ওচোয়া, কোর্তোয়া, শ্মাইকেল, সুবাসিচ, কাওয়াশিমা, জমারদের দুর্দান্ত সব সেভগুলো কি মনে দাগ কেটে থাকবে না?

আরেকটি কারণে এবারের বিশ্বকাপ মন থেকে মুছতে পারবেন না কেউই৷ তা হলো, অতিরিক্ত সময়ের গোল৷ গ্রুপ পর্বেই তো অতিরিক্ত সময়ে গোল হলো ১৯টি৷ এতেই বোঝা যায়, খেলার মোড় যে পরতে পরতে ঘুরেছে, তা ভোলার নয়৷

এছাড়া যুক্ত হয়েছে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর প্রযুক্তি৷ এ প্রযুক্তি অনেকাংশেই খেলার স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে৷ অনেক খেলার ফলাফলই বদলে গেছে এই প্রযুক্তির কারণে৷ এমনকি ফাইনালেও দেখুন, পেরিসিচের হ্যান্ডবলটি না হলে খেলার চূড়ান্ত ফলাফল অন্যকিছুও হতে পারতো৷

সব মিলিয়ে এক স্বপ্নের বিশ্বকাপ৷ ফ্রান্স হেসেছে শেষ হাসি৷ ক্রোয়েশিয়াও হেসেছে মন খারাপের হাসি৷ কিন্তু আরো হেসেছেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী৷ হৃদয়ও ভেঙেছে তাঁদের অনেকের৷

সে যা-ই হোক, ফুটবল তো আর শুধু খেলা নয়৷ ফুটবল একটা জীবনপদ্ধতি৷ ফুটবল একটা অনুভূতি৷ সেই অনুভূতির চুড়ান্ত রূপ বিশ্বকাপ৷ তার প্রকাশ তো এমনই হবে৷
তবে কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, শেষ হাসি ফ্রান্সের নয়, এই হাসির প্রাপ্য ব্যক্তি হলে পুতিন।

এমজে/


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি