ঢাকা, রবিবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, || আশ্বিন ৫ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

শেখ মুজিব থেকে জাতির পিতা: প্রেরণায় বঙ্গমাতা

অধ্যাপক ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত : ১০:২৭ ৯ আগস্ট ২০২০

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে আজীবন বঞ্চিত মানুষের কথা বলে বারবার নির্যাতিত হয়েছেন যে মানুষটি তিনি আমাদের জাতির জনক, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চোখ-মুখ দেখেই তিনি বুঝে যেতেন শত শত বছর অধিকার বঞ্চিত নিগৃহীত বাঙালি জাতির মনের কথা, তাদের না পাওয়া ও চাওয়ার কথা। তিনি স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং বিশ্বজুড়ে এদেশের মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচা। প্রকৃত অর্থে শস্য-শ্যামলা ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠা করা।

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। আর বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করতে এবং বীরের জাতি হিসেবে এদেশের মানুষ যাতে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে পারে সে বিষয়েও নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু আফসোস আমরা তাকে ধরে রাখতে পারিনি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। বঙ্গবন্ধুর এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় পেছন থেকে সাহস, অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দিয়ে গেছেন এক মহিয়সী নারী। তিনি আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তার মতো জীবন সঙ্গিনী পেয়েছিলেন বলেই হয়তো টুঙ্গীপাড়ার অজপাড়া গাঁয়ের সেই ছোট্ট খোকা একটি জাতির নিয়ন্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।

খোকা থেকে শেখ মুজিব। শেখ মুজিব থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি। আবার বঙ্গবন্ধু থেকে পেয়েছি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে। আর এর পেছনে সলতের মতো জ্বেলে জ্বেলে আজীবন স্বামীকে সাহস জুগিয়েছেন, দিয়েছেন অনুপ্রেরণা ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও। যা অনস্বীকার্য।

যুবক বয়স থেকে শুরু করে মানুষের কথা বলতে গিয়ে বহুবার জেলে যেতে হয়েছে তাকে। তার অবর্তমানে দলের পাশে থাকার পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন তিনি। নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও জননী রূপে বঙ্গমাতার কাছে আশ্রয় নিতেন, অভাব অভিযোগ শুনতেন, বাড়িয়ে দিতেন সহযোগিতার হাত। এভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাশে থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শকে বাস্তবায়ন করেছেন শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে প্রচণ্ড বিশ্বাস করতেন। এই মানুষও তাকে ভালোবাসে। তার প্রতি ভালোবাসা হিসেবে আপামর ছাত্রজনতা তাকে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
বাংলার দিন মজুর, শ্রমিক মেহনতী মানুষকে প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছেন রাজনীতির এই মহানায়ক। তার অবর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের মাঝেও।

পড়াশোনায় তিনি বড় ডিগ্রিধারী নন, কিন্তু মনের দিক থেকে বেগম মুজিব ছিলেন অনেকের চেয়ে বিশাল বড় হৃদয়ের অধিকারী। দুর্দিনে দলীয় কর্মীদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ও আশ্রয়স্থল ছিলেন তিনি। হোক সে দলী কর্মী অথবা সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষ, তার কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ কখনও খালি হাতে ফেরত গেছেন এমনটা কখনও শোনা যায়নি। ১৯৪৬ সালে দেশ ভাগের পর দাঙ্গা শুরু হয়। এ সময় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অসুস্থ, নিজে অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও স্বামীকে আক্রান্ত এলাকায় যেতে বারণ করেননি। বরং উৎসাহ দিয়ে তিনি চিঠিতে লিখেছেন, ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর উপরে আমার ভার ছেড়ে দিন।’

তখন কতই বা বয়স ছিল তার। ১৯৩০ সালে ৮ আগস্ট জন্মের হিসেবে ১৬ বছরের মতো হবে। এই বয়সে এক জন কিশোরী বধূ নিজের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে দেশের প্রয়োজনকেই বড় করে দেখেছেন। এটা কেবল বেগম মুজিব বলেই সম্ভব হয়েছে। তাই তো তিনি হয়েছেন বাঙালির ‘বঙ্গমাতা’।

শৈশবে বাবা-মাকে হারানোর পর শেখ ফজিলাতুন্নেছা বেড়ে ওঠেন দাদা শেখ কাশেমের কাছে। তাকে মাতৃস্নেহে আগলে রাখেন চাচি এবং পরবর্তীতে শাশুড়ি শেখ মুজিবের মা সায়েরা খাতুন। পিতার অভাব বুঝতে দেননি বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফুর রহমানও। শৈশবেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে সম্পর্কে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বার-তের বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুইবোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধহয় তিন বছর হবে।’

বিয়ে হলেও বঙ্গবন্ধু এন্ট্রান্স পাস করার পরই মূলত তাদের সংসার জীবন শুরু হয়। ১৯৪২ সালে শেখ মুজিব ভর্তি হন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। সেখানেই তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। এই সময়টায় বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে সময় কাটতো শেখ ফজিলাতুন্নেছার। তিনি ছিলেন সূক্ষ প্রতিভাসম্পন্ন জ্ঞানী, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান ও ধৈর্যশীল। জাতির পিতার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লেখার ক্ষেত্রেও মূল প্রেরণা ও উৎসাহ ছিল তার। শেখ মুজিব তার আত্মজীবনীতেও সহধর্মিণীর সেই অবদানের কথা স্মরণও করেছেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ এক অনুষ্ঠানে জাতির পিতা বলেন, ‘আমার জীবনেও আমি দেখেছি যে গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোন দিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে, অনেকবার আমার জীবনের ১০/১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোন দিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলে-মেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তার দান যথেষ্ট রয়েছে।’

জীবন সংগ্রামের সব কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে তিনি পরিবারও সামলেছেন বেশ গুছিয়ে। সব কিছুর পরও তিনিই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের রাজনীতির শ্রেষ্ঠ ছায়াসঙ্গী। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখনই প্রয়োজন হয়েছে তখনই সর্বাত্মক দিয়ে আওয়ামী লীগ ও নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন তিনি। আন্দোলনের সময়ও তিনি প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় দেখা করার সময় বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করতেন। সেখানে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ শুনে তা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের তা জানাতেন বেগম মুজিব।

অন্যদিকে কারাগারে সাক্ষাৎ করে বঙ্গবন্ধুর মনোবল দৃঢ় রাখতেও সহায়তা করতেন তিনি। বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে তখন বাঙালি মুক্তির সনদ ৬ দফা কর্মসূচি সফলের ক্ষেত্রেও তার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কলকাতায় অবস্থানকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত স্বামী শেখ মুজিবের যখনই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতো তখনই পিতৃ সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ বিনা দ্বিধায় পাঠিয়ে দিতেন তিনি।

আর বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায় নিজের ঘরের আসবাবপত্র, অলঙ্কার বিক্রি করেও দল ও নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। একজন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী হয়েও সাধারণ মানুষের মতো জীবন-যাপন করতেন তিনি। তার বাড়িতে কোনো বিলাসী আসবাবপত্র ছিলো না, ছিলো না কোনো অহংবোধ।

তার সদয় আচরণ ও বিনয়ে মুগ্ধ ছিল সবাই। সন্তানদের যেমন ভালোবেসেছেন তেমন শাসনও করেছেন। পিতা-মাতা উভয়েরই কর্তব্য পালন করে গেছেন তিনি। কোমলে কঠোরে মিশ্রিত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সাহসী নারী স্বামীর আদর্শে অনপ্রাণিত হয়ে সন্তানদের গড়ে তোলেন।

১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ বাঙালি সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্য এবং পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা করে পাকিস্তান সরকার। যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত। এ মামলায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হলে তিনিসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবিতে রাস্তায় নামে বাঙালি জনতা। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে।

উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকেও গ্রেফতারের হুমকি দেয়। কিন্তু তিনি বিচলিত না হয়ে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মামলাটি আইনিভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে আইনজীবীদের অর্থ জোগানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে পিছু হটে আইয়ুব খানের সরকার।

ঐ সময় লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বেঁকে বসেন বেগম মুজিব। এ বিষয়ে তিনি জোরালো আপত্তি জানান। পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি দেখে বেগম মুজিব হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন- প্যারোলে নয়, পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হবে।

কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্গমাতা বলেন, তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোর বৈঠকে না যান। তিনি এও বুঝতে পেরেছিলেন, শেখ মুজিবের ব্যাপারে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। তাই বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধুও প্যারোলে মুক্তিতে অসম্মতি জানান।

এরই মাঝে শেখ মুজিবসহ রাজবন্দিদের মুক্তির আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে; রূপ নেয় গণঅভ্যূত্থানে। এক পর্যায়ে আন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আইয়ুব সরকার। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে তিনি মুক্তি পান। প্যারোলে মুক্তি না নেওয়া নিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

১৯৫৪ সালে শেখ মুজিব তখন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য। ঐ বছরই ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন বেগম মুজিব। তারা ওঠেন ঢাকার গেণ্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী লেনের একটি বাড়িতে। বঙ্গবন্ধু মন্ত্রী হলে সরকারি বাসা পান, তারা ওঠেন মিন্টো রোডের সরকারি বাড়িতে। কিন্তু পাকিস্তান যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দিলে অল্প দিনের নোটিশেই ছাড়তে হয় সেই বাড়ি। এ রকম অনেকবার বাসা পাল্টাতে হয়েছে তাদের।

এক পর্যায়ে ১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বাড়ি করেন বঙ্গবন্ধু। এটি ছিল জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার প্রিয় বাড়ি। এই বাড়ি নির্মাণেও বঙ্গমাতার অনেক কষ্ট ও শ্রম জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর নিজেদের বাড়িতে ওঠেন তারা। এরপর এই বাড়িটিই হয়ে ওঠে নেতাকর্মীদের আপন ঠিকানা।

প্রখ্যাত কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘মাথায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে বহুদিনের আত্মগোপনকারী ছাত্রনেতা কিংবা রাজনৈতিক কর্মী অভুক্ত, অস্নাত অবস্থায় মাঝ রাতে এসে ঢুকেছেন বত্রিশের বাড়িতে, তাকে সেই রাতে নিজের হাতে রেঁধে মায়ের স্নেহে, বোনের মমতায় পাশে বসে খাওয়াচ্ছেন বেগম মুজিব। এই দৃশ্য একবার নয়, বহুবার দেখেছি।’

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকেই পরিচালিত হয়েছে দলীয় ও মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনামূলক নানা কার্যক্রম। বঙ্গবন্ধুর কারাগারে থাকার সময় ঐ বাড়িতেই বঙ্গমাতার কাছে ছুটে এসেছেন নেতাকর্মীরা। তিনিও বুদ্ধি-পরামর্শসহ নানাভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বঙ্গমাতার বুদ্ধিমত্তার ছাপ। ঐ দিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে গত বছর বঙ্গমাতার জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চ ভাষণের আগে কতজনের কত পরামর্শ, আমার আব্বাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে! সবাই এসেছে-এটা বলতে হবে, ওটা বলতে হবে। আমার মা আব্বাকে খাবার দিলেন, ঘরে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। আব্বাকে সোজা বললেন, তুমি ১৫টা মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নিবা। অনেকেই অনেক কথা বলবে। তুমি সারা জীবন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছ, তুমি জেল খেটেছ। তুমি জান কী বলতে হবে, মানুষ কী শুনতে চায়? তোমার মনে যে কথা আসবে, সে কথা-ই বলবা।

এরপর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে উত্তাল জনসমুত্রে তর্জুনী উঁচিয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম- আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম- স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তার সেই ডাকেই স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতি।

আর বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ডাকে ছিল বঙ্গমাতার মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন। এই সমর্থন তাকে সাহস জুগিয়েছিল। আজ এই ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনেও বঙ্গবন্ধুর প্রধান উদ্দীপক ও পরামর্শক হিসেবে বিবেচনা করা যায় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে।

শুধু তাই নয়, মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয়টি মাস অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্য্য নিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এই সময়টায় অনেকটা বন্দিদশায় কেটেছে তাদের। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর সেখান থেকেই লন্ডনে যান। এরপর ওখান থেকে শেখ মুজিবের সঙ্গে বঙ্গমাতার প্রথম কথা হয়।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এরপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান তিনি। অনেক বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন জীবন দেন।

বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের মা।’ বঙ্গমাতা বলেন, ‘এই বীরাঙ্গনা রমণীদের জন্য জাতি গর্বিত। তাদের লজ্জা কিংবা গ্লানিবোধের কোনো কারণ নেই। কেননা তারাই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে, কেবল বাংলাদেশের ছেলেরাই নয়, মেয়েরাও আত্মমর্যাদাবোধে কী অসম্ভব বলীয়ান। (দৈনিক বাংলার বাণী, ১৭ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)।’

আন্তর্জাতিকভাবে দেশকে তুলে ধরতেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অবদান রেখেছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তার সঙ্গে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। বিশ্বনেতারা বাংলাদেশ সফরকালেও বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকতেন তিনি। সহধর্মিণী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে আজীবন প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইতিহাসের কালজয়ী মহানায়ক শেখ মুজিবের অনুপ্রেরণাদায়িনী হয়ে পাশে ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে সপরিবারে তাদের হত্যা করে স্বাধীনতা বিরোধীরা। বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ধাপে বঙ্গমাতার অবদান রয়েছে। আর সেটা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয়, একজন নীরব দক্ষ সংগঠক হিসেবে। যিনি ধূপের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়সম আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। চলতি বছরে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে বাঙালি জাতি। এরই মধ্যে ২০২০-২১ সালকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে তো বটেই, বিশ্বজুড়ে চলছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের নানা আয়োজন।

শেখ মুজিব-শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনা। পিতার আদর্শে ও তার দেখানো পথে ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে তিনি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলার মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলও এই শেখ হাসিনা-ই। এ অবস্থায় উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন নিজ নিজ জায়গা দেশের কল্যাণে অবদান রাখা। বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কারিগরি ও বিজ্ঞানমনষ্ক শিক্ষা ব্যবস্থার। আমাদের তরুণদের বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে। বেগম মুজিবকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়তে হবে। শুধু পড়লেই হবে না, তার আদর্শ ধারণ করতে হবে। মুজিববর্ষ সফল হোক।

লেখক: শিক্ষাবিদ; উপাচার্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর, বাংলাদেশ।

(আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত)

এমএস/
 


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি