ঢাকা, সোমবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৮ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

সাত দশকে আওয়ামী লীগের অর্জন

প্রকাশিত : ০৮:১৬ ২৩ জুন ২০১৯ | আপডেট: ০৮:২০ ২৩ জুন ২০১৯

২৩ জুন ২০১৯ আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ এ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অর্জন অনেক। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে কোন স্বাধীন ভূখণ্ড ছিল না।

আওয়ামী লীগ অতুলনীয় রাজনৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন বিশ্বমানের একজন নেতা তৈরি করেছে। বিশ্ব রাজনীতির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতার একক নেতৃত্বে মাত্র ২২ বছরের কম সময়ের মধ্যে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। শেখ মুজিব তার ৪ দশকের রাজনৈতিক জীবনে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

আওয়ামী লীগের ৭০ বছরকে মোটা দাগে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের পুরোভাবে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। মাঝখানে ৬ বছর বাদ দিয়ে ৩৮ বছর ধরে দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

পিতা ও কন্যার মধ্যে আওয়ামী লীগে কার অবদান বেশি- সেই বিচারের ভার ইতিহাসের। তবে এটুকু বলতে পারি, কঠিন চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে ৭০ বছরের আওয়ামী লীগকে আজকের অবস্থানে আনতে নিঃসন্দেহে পিতা-কন্যাই সর্বোচ্চ অবদান রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

বলা যায়, একে অপরের পরিপূরক। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যথার্থই বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। আর দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন তার কন্যা শেখ হাসিনা।’

এটা ঠিক, আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনাকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ গঠনের পর থেকেই পশ্চিমা শোষক, শাসক ও পাকিস্তান সামরিক চক্র এ দলের বিরোধিতা করে আসছে।

পাকিস্তানের ২২ বছরে প্রায় ১২ বছর শেখ মুজিবকে জেলে অন্তরীণ রাখা হয়। শুধু পূর্ব বাংলার মানুষের পক্ষে ন্যায্য কথা বলার জন্য শেখ মুজিবকে দু’বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে হয়েছে। শেখ মুজিব তার কঠিন রাজনৈতিক জীবনে কোনদিন আত্মগোপনে যাননি। তিনি যে কতবার গ্রেফতার হয়েছেন, এর সঠিক হিসাব এ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি।

জেলে যাওয়ার জন্য একটি ছোট্ট বেডিং সব সময়ই রেডি থাকত। জেলখানাকে বলা হতো মুজিবের দ্বিতীয় বাসভবন। বাংলা ও বাঙালির দুঃখী মানুষের নেতা শেখ মুজিবের কোন পারিবারিক জীবন ছিল না। জেল থেকে বের হয়ে নৌকায়, সাইকেলে ও হেঁটে সারা বাংলা ঘুরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেছেন।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের চাটুকার গভর্নর মোনায়েম খান প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমি যতদিন গভর্নর থাকব, শেখ মুজিব ততদিন সূর্যের মুখ দেখতে পারবে না।’ অর্থাৎ মুজিবকে জেলের ভেতরেই থাকতে হবে। মোনায়েম খান এমন কথাও বলেছিলেন, ‘কোন সরকারি কর্মকর্তা শেখ মুজিবের মেয়েকে বিয়ে করলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে।’

কিন্তু ফাঁসির মঞ্চে নিয়েও সাহসের বরপুত্র শেখ মুজিবকে দমাতে পারেনি। আসলে শেখ মুজিবের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কামিয়াব হন। তরুণ নেতা শেখ মুজিবসহ অন্য নেতারা পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই বুঝে ফেলেন, এ অদ্ভুত আকৃতির দেশ দীর্ঘকাল টিকে থাকবে না।

১৯৪৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জুন পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগের দ্বিতীয় কাউন্সিলে মুসলিম লীগের প্রথম সারির নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান পূর্ব বাংলার নেতাদের একাংশকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

এই সম্মেলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা ১৯৪৯-এর ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির কেএম দাশ লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেন হলরুমে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে একটি সম্মেলনে মিলিত হন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।

শেরেবাংলা একে ফজলুল হক সম্মেলনে কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত থেকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সভায় পূর্ব বাংলায় একটি আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমএলএ) শামসুল হক ‘মূল দাবি’ নামক একটি লিখিত পুস্তিকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, জনগণের প্রত্যাশা ইত্যাদি বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

সারা দেশ থেকে শ’তিনেক প্রতিনিধি ওই সম্মেলনে উপস্থিত হন। এই সম্মেলনেই পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করা হয়। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করা হয়। যুবনেতা শেখ মুজিব কারাগারে থেকেই মাত্র ২৯ বছর বয়সে দলের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

কমিটির অন্য নেতারা হলেন- সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন (ঢাকা চেম্বারের প্রেসিডেন্ট), আলী আহমদ এমএলএ, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ খান, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান, ২নং যুগ্ম সম্পাদক খোন্দকার মোশতাক আহমদ, সহ-সম্পাদক- একেএম রফিকুল হোসেন এবং কোষাধ্যক্ষ- ইয়ার মোহাম্মদ খান।

কারাগার থেকে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত শেখ মুজিব মুক্তিলাভ করেন জুলাইয়ের শেষ দিকে। জেল থেকে বের হয়ে তিনি বিরাজমান খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন।

মুজিব সেপ্টেম্বরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে গ্রেফতার হয়ে কয়েকদিন পর বের হয়ে আসেন। অক্টোবরে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভায় পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের পদত্যাগ দাবি করেন শেখ মুজিব।

১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিব দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৮ বছরের মাথায় ১৯৫৫ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দেয়া না হলে দলীয় সদস্যরা আইনসভা থেকে পদত্যাগ করবেন।’

এভাবেই আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসন দাবির মাধ্যমে স্বাধীনতার সোপান তৈরি করে। গোড়া থেকেই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় যে শেখ মুজিবের ছিল, তা গণপরিষদের প্রদত্ত তার বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়। ২৫ আগস্ট (১৯৫৫) করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রদত্ত বক্তব্যে শেখ মুজিব বলেন, ‘আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলা নামে ডাকেন।

বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য। এই নাম আপনারা আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিবর্তন করতে পারেন। আপনারা যদি ওই নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমাদের বাংলায় আবার যেতে হবে এবং সেখানকার জনগণের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তারা নাম পরিবর্তনকে মেনে নেবে কিনা।’

এভাবে আইনসভায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের আপনারা আর পূর্ব পাকিস্তানিদের আমরা বলে উল্লেখ করে মুজিব জানান দিলেন, পাকিস্তান এক সময় দুই টুকরা হয়ে যাবে।

ওই বছরই (১৯৫৫) ২১ অক্টোবর দলের বিশেষ কাউন্সিলে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কাউন্সিলে শেখ মুজিব দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

১৯৫৭ সালের ৩০ মে শেখ মুজিব পুরো সময় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন। আওয়ামী লীগ আজকে বঙ্গবন্ধু ও দলের সেই আদর্শ থেকে দূরে সরে এসেছে। ওই সময় সিদ্ধান্ত ছিল, যিনি মন্ত্রী হবেন, তিনি দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে পারবেন না।

১৯৭২ সালে দলের বিশেষ কাউন্সিলে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে দিলে জিল্লুর রহমান সেই পদে নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে ওই পদে আসেন এএইচএম কামারুজ্জামান।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস। একটি মাত্র নিবন্ধে এই ঐতিহ্যবাহী দল সম্বন্ধে কোনোকিছুই লেখা সম্ভব নয়। আইয়ুবের সামরিক শাসনের বেড়াজালের মধ্যে ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের বাসভবনে অনুষ্ঠিত সভায় আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করা হয়।

১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ শেখ মুজিব সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে ৬-দফা দাবি পেশ করেন বাংলার নেতা মুজিব। আওয়ামী লীগ নেতারা ৩ মাসের প্রচারণায় ছয়-দফাকে জনপ্রিয় দাবিতে পরিণত করে তোলেন।

এরপর আবার শুরু হলো গ্রেফতার, হয়রানি, নির্যাতন। আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। বেশ কয়েকবার গ্রেফতার ও জামিনে মুক্তির পর ’৬৬-এর ৮ মে রাতে মুজিব, তাজউদ্দীনসহ বড় নেতাদের গ্রেফতার করা হয় দেশরক্ষা আইনে। গ্রেফতারের প্রতিবাদে ও ছয় দফার সমর্থনে স্বৈর-সামরিক শাসনের মধ্যেই ৭ জুন সফল হরতাল পালন করা হয়। এরপর মুজিবকে হত্যার জন্য নয়া ষড়যন্ত্র করে আইয়ুব-মোনায়েম চক্র।

১৯৬৮-এর ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে এক নম্বর আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ১৭ জানুয়ারি রাতে বঙ্গশার্দুল মুজিবকে মুক্তি দিয়ে জেলগেটে পুনরায় গ্রেফতার করে সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয় ১৯ জুন। এ সময় জেলে থেকেই শেখ মুজিব বাংলার মানুষের মুকুটহীন সম্রাটে পরিণত হন।

গণঅভ্যুত্থানে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে মুজিবসহ ৩৪ জনকে মুক্তি দেয়া হলো। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা কারাগারে গুলিতে হত্যা করে পাকি সামরিক চক্র। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ লোকের সমাবেশে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ’৬৯-এর ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীর স্মরণসভায় পূর্ব পাকিস্তানের নামকরণ করেন বাংলাদেশ।

১৯৬৯-এর ২৫ মার্চ আইয়ুবের বিদায়ের পর জেনারেল ইয়াহিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। আগেই বলেছি, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর বড় অর্জন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশে পরিণত করা। ’৭০-এর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় ১৬৯ (১৬২+৭) আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭ (১৬০+৭) আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পায় আওয়ামী লীগ। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে ইয়াহিয়ার সামরিক চক্র।

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের কামান-বন্দুকের সামনে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ সারা বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানো হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক চক্র বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। ওই রাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করে। শত্রুর হাতে বন্দী বঙ্গবন্ধু মুজিবকেই করা হয় রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়।

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও তাজউদ্দীন-নজরুলদের যোগ্য পরিচালনায় ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে আসেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র দশ মাসে জাতিকে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য সংবিধান উপহার দেয়। সরকার অল্প সময়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশের স্বীকৃতি আদায় করে। স্বাধীনতার শত্রুরা সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে।

জিয়ার সামরিক চক্র আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠন করে। জিয়া, এরশাদ, খালেদা তিনজনই জাতির পিতা হত্যার বিচার বন্ধ, স্থগিত ও আত্মস্বীকৃত খুনিদের পুরস্কৃত করেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কামড়াকামড়ির মধ্যে দিল্লি প্রবাসী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৭ মে দেশে ফিরে তিন ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ৩ মাসের মধ্যে ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর সেনাপ্রধান জিয়া উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এরপর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতির গদি ছিনতাই করে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।

ঘাতক সর্দার জিয়া শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যা-ষড়যন্ত্রে মদদ দেননি, তিনি বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করেন। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের দালালদের ক্ষমতায় বসান। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেন।

ইতিহাস একদিন বলবে, মুক্তিযোদ্ধা জিয়া প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাযুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী ছিলেন। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা তিনজনই পাকিস্তানের প্রেতাত্মা। এ তিন কুচক্রী মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা নেতৃত্বে এসে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনেন।

জিয়া-এরশাদ তো স্বাধীন বাংলাদেশকে প্রায় পূর্ব পাকিস্তানে রূপান্তরিত করেছিল। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আসলে জিয়ার বানানো পূর্ব পাকিস্তানেই ফিরে আসেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগকে ভারতীয় কংগ্রেসের ধারায় ফিরিয়ে এনেছেন।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতীয় কংগ্রেস একাধারে ৩০ বছর ক্ষমতায় ছিল। কংগ্রেসের নেতৃত্বেই ভারত স্বাধীন হয়। স্বাধীনতাবিরোধী জিয়া চক্র বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রপিতাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

শেখ হাসিনা জনক হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা ২০০৮ থেকে পর পর ৩ বার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এনেছেন। যদ্দুর জানা যায়, গণতান্ত্রিক বিশ্বে ভোটের মাধ্যমে এভাবে অন্য কোন নেতা শেখ হাসিনার মতো ৪ বার নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়নি।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি