ঢাকা, রবিবার   ২৫ অক্টোবর ২০২৬

দৃষ্টান্ত স্থাপন ভিক্ষুক নারীর, সোহানার পাশে দাঁড়ালেন জেলা প্রশাসক

নরসিংদী প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১২:৫৩, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:০১, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

বয়স মাত্র সাত বছর। শৈশব মানেই নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহের পরশ, হাসি-খেলা আর স্বপ্নের সূচনা। যে বয়সে মায়ের আঁচলে মুখ লুকিয়ে থাকার কথা, বাবার হাত ধরে পৃথিবী চেনার কথা, যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলনা আর রঙিন স্বপ্নে মেতে ওঠে-সেই বয়সেই সোহানার জীবনে নেমে এসেছে কঠিন বাস্তবতা। 

জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় সে ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। আপনজনের স্নেহ-নিরাপত্তায় বেড়ে ওঠার বদলে তার দিন কেটেছে নরসিংদী শহরের একটি জীর্ণ বস্তিঘরে, অনিশ্চয়তা আর অবহেলার মধ্যে।

জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুটির নাম সোহানা। যাঁদের কাছে তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা, সেই আপনজনদের কাছ থেকেই সে পরিত্যক্ত হয়েছে। নরসিংদী রেলস্টেশন সংলগ্ন বানিয়াছল এলাকায় রাস্তার পাশের ড্রেন ও আবর্জনার কাছে অসহায় অবস্থায় দিন কাটানোর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করে। 

নিজের প্রয়োজন কিংবা কষ্টের কথা স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও আধো স্বরে আজও বাবা-মাকে ডাকে সোহানা। কিন্তু পাশে নেই সেই ডাকের সাড়া দেওয়ার কেউ। তবে সোহানার এই অসহায় জীবনের গল্পে এখন যুক্ত হয়েছে আশার নতুন অধ্যায়। 

অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বলে। সোহানার জীবনে সেই আলো হয়ে এসেছে এক অসহায় নারীর মমতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল উদ্যোগ। 

আপনজনের আশ্রয় হারানোর মধ্যেও শিশুটিকে একা ফেলে রাখেননি আম্বিয়া বেগম। এই অসহায় নারী নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও নিঃস্বার্থ মমতায় শিশুটিকে আগলে রেখেছেন। 

আর এবার তার নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পাশে দাঁড়িয়েছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) নরসিংদী রেলস্টেশন সংলগ্ন বানিয়াছল এলাকায় সোহানাকে দেখতে যান জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। শিশুটির বর্তমান অবস্থা, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন জেলা প্রশাসক। 
তাঁর নির্দেশনায় সোহানার প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে সুবর্ণ নাগরিক কার্ডের ব্যবস্থা করা এবং জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসময় জেলা প্রশাসক সোহানার হাতে নতুন পোশাক, খাবার ও শুকনো খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন। 
পাশাপাশি শিশুটির প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্ব পালনের জন্য জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন তিনি। 

সোহানার জন্য এসব উদ্যোগ কেবল তাৎক্ষণিক সহায়তা নয় বরং তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমেই তৈরি হবে শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার পাশাপাশি তার আইনগত পরিচয় ও প্রাপ্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

এ সময় উপাস্থত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), নরসিংদী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অন্যান্য প্রতিনিধিরা।

সোহানার ভবিষ্যৎ নিয়েও জেলা প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট। শিশুটির বাবা-মা ও অভিভাবকদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা শিশুকে পরিত্যাগের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। 

আর যদি শিশুটির বাবা-মা তার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান কিংবা তার নিরাপদ লালন-পালন নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষে জেলা প্রশাসন তার সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি শিশু পরিবারে ভর্তিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দেখভালের আশ্বাসও দেন তিনি।

এদিকে নিজের অভাব ভুলে অন্যের শিশু সোহানাকে আগলে রেখে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে চলা জীবনের এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন আম্বিয়া বেগম। নিজেরই দুবেলা খাবার জোটে না তাঁর। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরে রয়েছে নানা অসুস্থতার চাপ। 

প্রতিদিনের জীবন যেখানে তাঁর নিজের জন্যই সংগ্রামের, সেখানে তিনি সোহানাকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। ভিক্ষা করে পাওয়া সামান্য অর্থ থেকে শিশুটির মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন তার ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব কিছুটা হলেও কমাতে। 
রক্তের সম্পর্ক নেই, নেই আর্থিক সামর্থ্য কিংবা শিশুটিকে বড় করে তোলার পর্যাপ্ত সুযোগ। তবু সোহানার ক্ষুধা ও অসহায়ত্ব তাঁর হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। আপনজনের স্নেহ থেকে বঞ্চিত শিশুটির জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন আপৎকালীন আশ্রয়। এই মমতার মূল্য অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। নিজের কষ্টের মধ্যেও অন্যের কষ্ট অনুভব করার যে ক্ষমতা, আম্বিয়া বেগম যেন তারই প্রতিচ্ছবি। 

আম্বিয়া বেগমের এই মহৎ উদ্যোগের জন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। তিনি বলেন, “আম্বিয়া বেগমরাই আমাদের সত্যিকারের বাংলাদেশ। তাঁদের মতো মানুষই আমাদের ভালো কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জোগায়।” 
একজন অসহায় নারীর এই সামান্য সামর্থ্যের মধ্যেও অসাধারণ মানবিক ভূমিকা সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা। 

ভিক্ষাবৃত্তি করা আম্বিয়া বেগম জানিয়েছেন, তিনি দীর্ঘ বছর ধরেই নরসিংদী শহরে থেকে অন্যের বাড়িতে কাজের পাশাপাশি ভিক্ষা করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। গত ৫ বছর আগে সাগর-লিজা দম্পতি এই অঞ্চলেই বসবাস করতেন। তাদের দাম্পত্য কলোহ আর অভাব অনটনের ফলে প্রতিবন্ধী এই শিশুটিকে ফেলেই চলে যায় তারা, কোথায় গেছেন সেটিও জানেনা কেউ। এরপর থেকেই নিজের কাছে রেখে সোহানাকে লালন-পালন করে আসছিলেন তিনি।

সম্প্রতি প্রতিবেশি শিশুদের সঙ্গে গিয়ে ড্রেনের পাশে পরে গেলে সেই ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে আলোচনায় আসে শিশুটি এবং তার দায়িত্বে থাকা আম্বিয়ার মানবিকতা। 

এএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি