ঢাকা, শনিবার   ১৬ মে ২০২৬

প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং: নেতৃত্ব, কৌশল ও মানবিকতার প্রতিচ্ছবি

নাজমুল হক রাইয়ান

প্রকাশিত : ১৯:৩৪, ১৫ মে ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এমন কিছু নেতা আছেন, যাদের সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের ভবিষ্যৎই বদলায় না, বরং বদলে দেয় পুরো বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং ঠিক তেমনই একজন নেতা। কেউ তাঁকে বলেন আধুনিক চীনের স্থপতি, কেউ বলেন কৌশলী রাষ্ট্রনায়ক। আবার চীনের সাধারণ মানুষের চোখে তিনি একজন দূরদর্শী ও মানবিক নেতা, যিনি শুধু অর্থনৈতিক শক্তিতেই নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাবেও চীনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শি চিনপিং বুঝিয়ে দেন, তিনি শুধু পাঁচ বছরের রাজনীতি করতে আসেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন। সেই লক্ষ্য থেকেই আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো ও সংযোগভিত্তিক উদ্যোগ “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (বিআরআই)। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপজুড়ে শত শত বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প শুধু রেললাইন, বন্দর কিংবা সড়ক নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বেইজিংয়ের ভাষায়, এটি ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের একটি নতুন পথ।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও উঠে এসেছে, এই উদ্যোগ বৈশ্বিক বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়েই নয়, নিজের দেশেও বড় পরিবর্তনের বার্তা দেন শি চিনপিং। চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বে প্রায় ১০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে আনা হয়েছে। “টার্গেটেড পোভার্টি অ্যালিভিয়েশন” কর্মসূচির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আন্তর্জাতিক অনেক বিশ্লেষকও এটিকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় বিশ্ব যখন ভয় ও অনিশ্চয়তায় স্থবির, তখনও আলোচনায় আসে চীনের ভূমিকা। বিভিন্ন দেশে মেডিকেল সরঞ্জাম, মাস্ক, ভ্যাকসিন এবং জরুরি সহায়তা পাঠানোর মাধ্যমে বেইজিং নিজেদের “মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ” ধারণাকে সামনে আনে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি চীনের সহায়তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক বার্তা দেয়।

তবে এত কিছুর পরও পশ্চিমা বিশ্ব প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টায় রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন শুধু উন্নয়ন নয়, ভূরাজনৈতিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে। কিছু দেশ ঋণের চাপে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এসব বিশ্লেষক।

তবে সাধারণ মানুষের যুক্তি এক্ষেত্রে ভিন্ন। তাঁদের মতে, শি চিনপিং এমন এক সময়ে নেতৃত্বে আসেন, যখন চীনকে শুধু “বিশ্বের কারখানা” পরিচয় থেকে বের হয়ে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নেতৃত্ব দিতে হতো। তাঁর আমলে চীন সেই পরিবর্তনের পথেই এগিয়েছে। আজ বিশ্বের দ্রুততম হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী প্রযুক্তি শিল্প এবং মহাকাশ অভিযানের বড় অংশই চীনের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শি চিনপিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তিনি শুধু বর্তমানের সংকট দেখেন না, বরং আগামী কয়েক দশকে চীন কোথায় দাঁড়াবে, সেই লক্ষ্য নিয়েই রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেন। আর এখানেই তাঁকে অন্য অনেক নেতার চেয়ে আলাদা করে দেখা হয়।

আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক এবং ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট—আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে শি চিনপিং এমন এক নেতা, যাঁর সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন থেকে ব্রাসেলস, মস্কো থেকে ঢাকা পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। আর সেই কারণেই অনেকের কাছে তিনি শুধু চীনের প্রেসিডেন্ট নন, বরং বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নির্মাতা।

এমআর// 
 


** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।
Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি