ঢাকা, সোমবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, || আশ্বিন ৫ ১৪২৮

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী হুবহু লিখলেন আনিসুর’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২৩:৩৪, ৬ ডিসেম্বর ২০১৭

সুন্দর দ্রুত হাতের লেখা প্রশিক্ষণ দেন আনিসুর রহমান। ২০০৬ সাল থেকে পেশায় রয়েছেন তিনি। রাজধানীর ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে পেইনটিং অ্যান্ড রাইটটিং স্কুলের ১৯টি শাখা। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসামান্য ভালোবাসা থেকে নিজ হাতে লিখেছেন বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে তিনি বইটি হুবহু লিখেছেন।

আনিসুর রহমানের বিস্ময়কর প্রতিভা ও নিজ হাতে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী হুবহু লেখার গল্প নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন ইটিভি অনলাইনের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক।

ইটিভি অনলাইন: সুন্দর হাতের লেখা শেখার প্রথম দিকের গল্পটা শুনতে চাই।

আনিসুর: আমার জন্ম পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে।আমার বাবা নাসির উদ্দিন মাদ্রাসার শিক্ষকতা করতেন। তিনি শিল্প সম্মত রুচির মানুষ ছিলেন।নানান ধরণের নকশা ও পাথরের উপর খোদায় করে অক্ষর লিখতে পারতেন তিনি। এসব করেই আনন্দ পেতেন। আমি তন্ময় হয়ে দেখতাম তার শৈল্পিক কাজ কর্ম। বাবার সৃষ্টিশীল কর্ম আমাকে শৈশব থেকেই আমাকে ভাবাত। আমারও ইচ্ছে করতো বাবার মতো লিখি কিংবা আঁকি। এই কাজগুলি আমার হৃদয়কে প্রায়শ আন্দোলিত করতো।

আমার বয়েস যখন পাঁচ, তখন বাবা আমাকে হাতের লেখার হাতেখড়ি দিলেন। আমাকে যখন `অ` লিখতে বললেন আমি `অ` হুবহু লিখলাম।আমার কাঁচা হাতের লেখা দেখে বাবা খুশি হয়ে গেল। এরপর লেখা অক্ষরটি সবাইকে দেখালেন। এতে আমি অনেক উৎসাহবোধ করি। সবগুলি বর্ণ বাবার মতো লিখতে পারলাম। সেই থেকে লিখার প্রতি আমি আরও মনোযোগী হলাম এবং সুন্দর হাতের লেখা নিয়ে সাধনা শুরু করি। স্কুলের শিক্ষকেরা হাতের লেখার অনেক প্রশংসা করলেন। ক্লাসের সকলের লেখা অনুকরণ করতে পারতাম। যা দেখে বন্ধুরা সবাই অবাক হত।

ইটিভি অনলাইন: কেন উদ্দেশে আপনি এই পেশায় এলেন? কোন কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

আনিসুর রহমান: অনেকের হাতের লেখা খারাপ, যার কারণে পরীক্ষায় ফলাফল খারাপ করে। সুন্দর হাতের লেখা একটি শিল্প।এই শিল্প সকলের মাঝে বিকশিত হোক এই লক্ষ্য নিয়ে আমি এই প্রশিক্ষণকে কর্মসূচিকে পেশা হিসেবে নিয়েছি। যাদের হাতের লেখা খারাপ তাদের জন্য কাজ করার চিন্তা সেই ছোট বেলা থেকেই ছিল। মূলত এসব কারণে এটাকে পেশা হিসেবে নেয়ার কারণ।

দিনভর ক্লাস নিতাম আর রাত হলেই দেয়ালে দেয়ালে প্রচারণা চালাতাম।এই ভাবেই মূলত উঠে আসা। প্রথমে অনেক কষ্ট করেছি। বাড়ি থেকে টাকা আনতাম না।আমার দুই ভাইকে আমি এই পেশায় এনেছি। এখন ওরা আমাকে স্কুল পরিচালনায় সাহায্য করে। ছোট ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে পাস করেছে। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

ইটিভি অনলাইন: সুন্দর হাতের লেখার স্কুল সম্পর্কে বলুন?

আনিসুর রহমান: ২০০৬ সালে সুন্দর ও দ্রুত হাতের লেখা প্রশিক্ষণের স্কুল প্রতিষ্ঠা করি `পেইংটিং অ্যান্ড রাইটিং স্কুল`।প্রথমে একটি রুম ভাড়া করি। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হত স্কুল পরিচালনা করতে। মাত্র ৫ জন নিয়ে শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুলটি শুরু করি। পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়তে থাকে।

বর্তমানে ১৯টি শাখায় এ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ঢাকার ফার্মগেটে, মোহাম্মদপুর, ধানমুন্দি, আজিমপুর, সিদ্ধেশ্বরী, শাহজাহানপুর, বাসাবো, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ি, উত্তরা, বনশ্রী,গাজিপুর, সিলেটসহ আরও অন্যান্য গুলিতে প্রশিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতি শুক্রবার,শনিবার ৩টি শাখাতে আমি ক্লাস নিই। ৪০জন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধায়নে ১হাজার শিক্ষার্থী এই প্রশিক্ষণের আওতায় রয়েছে। এই পর্যন্ত ২০হাজার শিক্ষার্থীকে আমি এ প্রশিক্ষণ দিয়েছি।

ইটিভি অনলাইন: আপনার কাজের পরিধি সম্পর্কে জানতে চাই?

আনিসুর রহমান: আমি মূলত, বাংলা,ইংরেজি,আরবি ভাষায় মোট ৮০৫ প্রকার হাতের লেখা লিখতে পারি।এছাড়া ডানহাতে, বামহাতে, বিপরীত দিক থেকেও লিখতে পারি। দেয়াল লিখন, ব্যানার লিখা, ক্যালিগ্রাফি, চিত্রাঙ্কনসহ হস্তশিল্পের কাজে আমি পারদর্শী। শিক্ষার্থীদের এ প্রশিক্ষণ নিতে ৬০০০ হাজার টাকা দিতে হয়।

ইটিভি অনলাইন: বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিজ হাতে কেন লিখলেন? গল্পটি একটু শুনতে চাই।

আনিসুর রহমান: বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিজ হাতে দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে হুবহু লিখেছি। প্রতি লাইনের শুরু থেকে শেষের দিক পর্যন্ত ঠিক রেখেছি। এই বইতে মোট ১০ প্রকার হাতের লেখা ব্যবহার করেছি। এমন কি পৃষ্ঠা নাম্বার, নিঘন্ত পর্যন্ত ঠিক রেখেছি। বেশ ক`বছর আগে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নাম্বার বাড়িতে গেলাম, সবকিছু দেখে আমার মন কেঁদে উঠলো।

বাড়ির সামনের বুকস্টল থেকে একটা অসমাপ্ত আত্মজীবনী কিনলাম, বইটি পড়ার সময় বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি চিত্র দেখে আমার মনে হল আমি এই বইটি হুবহু নিজ হাতে লিখবো। সেই ২০১৪ সাল থেকে লেখা শুরু করলাম। ২০১৬ সালের অগাস্ট মাসে লেখার কাজ শেষ হয়। এরপর নিজহাতে লেখা বইটি বই আকারে বাইন্ডিং করলাম। বই আকারে দেখতে পেয়ে আনন্দে মন ভরে গেল। ভাবলাম বইটি যেহেতু নিজ হাতে লিখেছি,আর তাই জাতির জনকের কন্যার হাতে তুলে দিব।সেই আশায় আজোও স্বপ্ন দেখি।

ইটিভি অনলাইন: বইটি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কি?

আনিসুর রহমান: সুন্দর হাতের লেখা ছাড়া আমার তো অন্য কোন পুঁজি নাই আর তাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান দেখাতে আমার এই প্রচেষ্টা। সম্পুন্ন হাতে লেখা বইটি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার হিসেবে দিতে চাই। অনেক চেষ্টা তদবির করেও তিনি আজো পৌঁছাতে পারেনি। আমার বিশ্বাস এই বইটির সব থেকে ভালো হয় যদি এটি বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে দিতে পারি। এটি জননেত্রি শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ ও সুন্দর থাকবে।

 

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি